Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

সতেরো – রেনো’র রাত

আমাকে ঘরে বসিয়ে ডিনা ঘুরে-ফিরে ওর নতুন ড্রেসটা দেখাল, তার রং আর এটা-সেটা বোঝাল। তারপর জানতে চাইল, ওকে কেমন দেখাচ্ছে।

‘আপনাকে সবসময়ই ভালো দেখায়।’ আমি বললাম, ‘আজ বিকেলে লিউ ইয়ার্ড আর পিট দ্য ফিন এলিহুর সঙ্গে দেখা করতে গেছিল।’

‘আপনি আমাকে, বা আমি কী পরেছি তাই নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবিত নন।’ মুখ বেঁকিয়ে বলল মেয়েটা, ‘ওরা ওখানে কী করছিল?’

‘আলোচনা-টনা করছিল বোধ হয়।’

‘আচ্ছা,’ চোখের পাতা বারকয়েক ফেলে ডিনা জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি সত্যিই জানেন না, ম্যাক্স কোথায় আছে?’

‘খুব সম্ভবত উইলসনের বাড়িতে।’ আমাকে মানতেই হল, ‘তবে আমি সত্যিই এটা নিয়ে আগ্রহী নই।’

‘পয়জনভিলের হাওয়ায় আপনার মাথা গুবলেট হয়ে গেছে। ম্যাক্স আপনাকে আর আমাকে পছন্দ করে না। ভালো কথা বলি, শুনুন। ওকে চটপট ছবি করে দিন। নইলে আপনার, এবং এই অবলার মেয়াদ ফুরোল বলে।’

‘আপনি তো আসল কথাটাই জানেন না।’ আমি হেসে বললাম, ‘নুনানের ভাইকে ম্যাক্স মারেনি। টিম ‘‘ম্যাক্স’’ বলেনি। ও মরার আগে ‘ম্যাকসোয়েন’ বলার চেষ্টা করছিল।’

‘কী সর্বনাশ!’ মেয়েটা আমার কলার ধরে ঝাঁকাতে লাগল। ওর গরম নিশ্বাস আমার মুখে আছড়ে পড়ছিল। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়ায় গালের রুজ লাল স্টিকারের মতো দেখাচ্ছিল। দাঁতে দাঁত লাগা অবস্থায় ডিনা বলল, ‘আপনি ওকে ফাঁসিয়েছেন, আর তাতে আমাকে কাজে লাগিয়েছেন। ওকে মারুন! এক্ষুনি!’

আমি এরকম ব্যবহার পছন্দ করি না। সেই ব্যবহার যদি এমন কোনো মহিলার হয় যাকে রূপকথা থেকে বেরিয়ে আসা কোনো রাগী দেবীর মতো দেখতে লাগছে, তাতেও আমার আপত্তি আছে।

‘শান্ত হোন।’ মেয়েটার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বললাম, ‘আপনি এখনও বেঁচে আছেন।’

‘আছি। কিন্তু আপনি ম্যাক্সকে আমার মতো চেনেন না। তাও যদি ও খুনটা করত! আর সেটা ছাড়াই ওর ওপর… আমি শেষ!’

‘এত ভাববেন না।’ আমি উত্তেজিত অবলাটিকে সামলাতে চেষ্টা করলাম, ‘আপনি তৈরি হোন। আমরা বেরোব। হেব্বি খিদে পেয়েছে। খাওয়া-দাওয়া করলেই দেখবেন, মনমেজাজ ফুরফুরে হয়ে যাবে।’

‘অসম্ভব। এই অবস্থায় আমি কিছুতেই বেরোব না! তা ছাড়া ড্যান এখনও হাসপাতালে। আপনাকেই এখানে থেকে আমার দেখাশোনা করতে হবে।’

‘পারব না। আমার কাজ আছে, সেগুলোর জন্য আমাকে বেরোতেই হবে। আরে, আপনি এত ভাবছেন কেন? চলুন চলুন!’

‘আপনি…!’ মেয়েটা আমার মুখের কাছে নিজের মুখ নিয়ে এল। ওর চোখ দেখে মনে হল, আমি মানুষ নই, কোনো দানব-টানব। ‘আপনি জঘন্য একটা…! আপনার কাছে আমি কিচ্ছু না। আমার কী হল, না হল, তাতে আপনার কিচ্ছু যায় আসে না। আপনি শুধু আমাকে ওই ডিনামাইট হিসেবে দেখছেন।’

‘আপনি ডিনামাইটই।’ আমি ওকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম, ‘কিন্তু আপনি যেভাবে দেখছেন সেভাবে নয়। এখন দয়া করে চলুন। আমি খিদেয় দুর্বল বোধ করছি, নইলে আমাকে ওভাবে ঝাঁকাতে পারতেন না।’

‘আপনি কোথাও যাচ্ছেন না।’ মেয়েটা শক্ত গলায় বলল, ‘আমরা এখানেই খাব।’

দেখা গেল, মেয়েটার কথার নড়চড় হয় না, বিশেষত ভয় পেলে। ওই নতুন পোশাক ছেড়ে ও একটা অ্যাপ্রন পরল। তারপর আইসবক্স ঘেঁটে যা ছিল সব বের করল। আমি বেরিয়ে আরও কিছু খাবার জোগাড় করলাম। শেষ অবধি খাওয়ার ঘরে আমরা যখন খাদ্য ও পানীয় নিয়ে গুছিয়ে বসলাম, তখন ওর ভয় অনেকটাই কমেছে। রাঁধুনি হিসেবে ও খুব একটা দড় নয়, তবে আমি সেটা বুঝতে দিইনি। ওসব শেষ হলে মেয়েটার মুড এতটাই ভালো হল যে ও বলল, কোথায় কে ওর ওপর রেগে আছে তাতে ওর বয়ে গেল! ও যা করছে তা না পোষালে সেই লোকটি জলে ঝাঁপ দিতে পারে, গলায় দড়ি দিতে পারে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

শেষ অবধি ডিনা বলল, ‘ও সিলভার অ্যারো-তে রেনো’র পার্টিতে যাবেই যাবে। আমাকেও ওর সঙ্গে যেতে হবে।

‘রেনো আবার কে?’

‘রেনো স্টার্কি। আলাপ হলে দেখবেন, আপনার ভালো লাগবে ওকে। আমি ওকে বলেছিলাম, ওর পার্টিতে যাব। তাই আমি যাবই!’

‘পার্টিটা কী উপলক্ষ্যে?’

‘ও আজ জেল থেকে বেরিয়েছে। আচ্ছা, এই অ্যাপ্রনটা আমি খুলতে পারছি না কেন?’

‘কারণ যে দড়িগুলো টেনে ওটা খুলতে হয়, সেগুলো ভুলভাল টেনে আপনি গিঁট বাঁধিয়েছেন। ঘুরে দাঁড়িয়ে স্থির হয়ে থাকুন। রেনো জেলে গেছিল কেন?’

‘মাসছয়েক আগে ও, পাট কলিন্স, ব্ল্যাকি হোয়ালেন, হ্যাংক ও’মারা, আর দেড়ফুট… একটা খোঁড়া আর বেঁটে লোক, মিলে একটা ডাকাতি করেছিল। টারলক-স জুয়েলারি। লিউ ইয়ার্ড সব সামলে নিত। কিন্তু জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন একেবারে কোমর বেঁধে লেগেছিল। নুনান আর ওর ডিটেকটিভদের কিছু করার ছিল না, ওদের গ্রেফতার করা ছাড়া। তাতে ও জামিন পেয়েছে। এর আগেও গোটাতিনেক কেসে এরকম হয়েছে। আমরা জানি, ওদের আর কিছুই হবে না। এবার আপনি আরেকটা ড্রিঙ্ক বানান, আমি তৈরি হয়ে আসি।’

সিলভার অ্যারোর অবস্থানটা পার্সনভিল আর মক লেকের মাঝামাঝি জায়গায়। ডিনা ব্র্যান্ডের ছোট্ট গাড়িটা ছোটাচ্ছিলাম আমরা।

‘জায়গাটা খারাপ না।’ আমাকে ডিনা বোঝাচ্ছিল, ‘পলি ডি ভোটো ওটা চালায়। ও মোটামুটি ভালো জিনিসই বেচে। আর যতক্ষণ অবধি আপনি হল্লা না করছেন, ওখানে কেউ কিছু বলবে না। ওই যে! আমরা এসে গেছি।’

গাছপালার মধ্যে দিয়ে দেখা লাল-নীল আলোগুলো কাছে এল। দেখলাম, বাড়িটা একটা কাসলের অনুকরণে বানানো। আলোয় জায়গাটা ঝলমল করছিল। কিন্তু গুলি চলার আওয়াজও একেবারে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল বেশ কিছুটা দূর থেকেই।

‘আপনি যে বললেন, এখানে হল্লা চলে না!’ আমি বললাম, ‘তাহলে এসব কী?’

‘কিছু একটা হচ্ছে।’ ঠোঁট কামড়ে মেয়েটা গাড়ি থামাল।

দু-জন লোক এক মহিলাকে ধরাধরি করে সামনের দরজা দিয়ে বেরোল, তারপর অন্ধকারের আশ্রয় নিল। একটা লোক পাশের দরজা দিয়ে পালাল। গুলির আওয়াজ পেলেও আমি কোনো আগুনের ঝলক দেখতে পাচ্ছিলাম না। পেছনের দরজা দিয়ে আরও একজনকে পালাতে দেখলাম।

দোতলার জানলা দিয়ে একজন ঝুঁকে পড়ল। তার হাতের বন্দুকটা আমিও দেখতে পেলাম। পাশে ডিনা জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে লাগল। রাস্তার ধারের একটা ঝোপ থেকে একটা কমলা ঝলক দেখা গেল। জানলার মানুষটির হেলদোল হল না। সে বন্দুকটা তুলে ঝোপের দিকে গুলি চালাল। ঝোপ থেকে জবাব এল না।

জানলার মানুষটি এক পা বাইরে বের করল। তারপর গোটা শরীরটা ঝুলিয়ে দিয়ে নীচে ঝাঁপাল। নীচের ঠোঁট কামড়ে ডিনা গাড়ির অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিল। লোকটার পেছনে গাড়িটা নিয়ে গিয়ে ও চেঁচাল, ‘রেনো!’

লোকটা গা থেকে ধুলো ঝাড়ছিল। ও যতক্ষণে পেছনে ঘুরল ততক্ষণে ডিনা গাড়ির দরজা খুলে ফেলেছে। রেনো সেখানে বসার আগেই ও গাড়িটা চালিয়ে দিল। আমাদের দিকে গুলি চলছিল। তার মধ্যেই আমি কোনোক্রমে লোকটাকে ধরে রাখলাম। কাজটা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল, কারণ ওই ঝুলন্ত অবস্থাতেই লোকটা গুলির পালটা জবাব দিচ্ছিল।

একটু পরেই আমরা সিলভার অ্যারো থেকে দূরে চলে এলাম। পার্সনভিলের উলটো রাস্তা ধরেছিল ডিনা। আমি দেখে নিলাম, নিজের হাত-পা ঠিকঠাক আছে কি না।

‘বাঁচালে।’ রেনো বলল, ‘নইলে বেরোতে পারতাম না।’

‘সে নাহয় হল।’ ডিনা বলল, ‘তুমি এরকম পার্টি দিচ্ছ নাকি আজকাল?’

‘কয়েকজন অনাহূত অতিথি এসে পড়েছিলেন। তুমি ট্যানার রোড চেন?’

‘চিনি।’

‘ওটা নাও। মাউন্টেন বুলেভার্ড ধরতে পারব তাহলে। ওইদিক দিয়েও শহরে ফেরা যাবে।’

মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল ডিনা। নিরাসক্তভাবে বলল, ‘ওই ‘‘অনাহূত অতিথি’’দের কাউকে কি আমি চিনব?’

‘ওসব নিয়ে ভেব না। গাড়িটা আরও জোরে যেতে পারে কি না, সেটা দেখলে বেশি কাজ দেবে।’

গাড়ির স্পিড এবং রাস্তার ঝাঁকুনি, দুটোই এত বেড়ে গেল যে আমরা কেউই তারপর বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার অবস্থায় ছিলাম না। একটা ভদ্রগোছের সোজা রাস্তায় উঠে রেনো বলল, ‘তাহলে হুইস্পারের সঙ্গে তোমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে?’

‘হুঁ।’

‘লোকে বলছে, তুমি নাকি পয়সা খেয়ে ওকে ফাঁসিয়েছ?’

‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে। কিন্তু তুমি কী ভাবছ রেনো?’

‘ওকে ছেড়ে দেওয়াটা ঠিকই ছিল। কিন্তু একজন গোয়েন্দার সঙ্গে ভিড়ে যাওয়া, আর তার কাছে সব বলে দেওয়া… নাহ্‌! এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।’

বলার সময় রেনো আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। আমিও ওকে দেখছিলাম। বয়স পঁয়ত্রিশ, বেশ লম্বা, চওড়া কাঁধ, ভারী কিন্তু মজবুত চেহারা। ওই কম আলোতেও লোকটার সাদামাটা, কিন্তু মোটামুটি সুদর্শন মুখ, আর ক্লান্ত বাদামি চোখজোড়া আমার নজর এড়াল না। আমি কিছু বললামও না।

‘তুমি সেরকম ভাবলে…’ মেয়েটা কথা শুরু করেছিল। ওকে মাঝপথে থামিয়ে রেনো গর্জাল, ‘সামলে!’

সামনে রাস্তায় একটা কালো গাড়ি আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে একটা ব্যারিকেড তৈরি করেছিল। আমাদের দিকে গুলির পর গুলি ছুটে এল। আমি আর রেনো যথাসাধ্য জবাব দিলাম। ইতিমধ্যে মেয়েটা আমাদের, আর মাঝপথের দুশমনদেরও অবাক করে দিল। রাস্তার বাঁ-দিকে গাড়িটা নিয়ে গেল ও। পাশের উঁচু ঢালে বাঁ-দিকের চাকা তুলে ও এতই স্পিড তুলল যে আমাদের ওজন নিয়েও গাড়িটা সেই ঢালে উঠে গেল। সেভাবেই গাড়িটাকে পাশ কাটিয়ে ও আবার রাস্তায় নামল। যতক্ষণে আমরা এলাকা ছাড়লাম, ততক্ষণে পেছন দিকে গুলিবৃষ্টি করে আমরা বন্দুক ফাঁকা করে ফেলেছি।

নিজের অটোমেটিকে আরেকটা ক্লিপ ভরে রেনো বলল, ‘সলিড চালালে, মানতেই হবে।’

আমিও একমত হলাম। ডিনা জিজ্ঞেস করল, ‘এবার?’

‘এবার শহর থেকে যথাসম্ভব দূরে যেতে হবে। ফেরার রাস্তায় ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। সোজা চলো।’

আমরা আরও দশ-বারো মাইল গেলাম। রাস্তায় গোটা দুই গাড়ি আমাদের পাশ কাটাল। একটা ছোটো ব্রিজ পার হলে রেনো বলল, ‘সামনের টিলার মাথা থেকে ডান দিকে বাঁক নাও।’

রাস্তা নেই, স্রেফ পাথর আর ঘাসের ওপর দিয়েই মিনিট পাঁচেক সাবধানে গাড়ি চালাল ডিনা। তারপর রেনো আমাদের থামতে বলল। আমরা কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। প্রায় আধ ঘণ্টা আমরা ওই অন্ধকারেই বসে রইলাম। তারপর রেনো বলল, ‘এই রাস্তায় আরও মাইলটাক গেলে একটা ফাঁকা ঝুপড়ি টাইপের জায়গা পাবে। ওখানেই আজ রাতের মতো আশ্রয় নিতে হবে।’

শহরে ফিরতে পারলেই খুশি হতাম, কিন্তু এই প্রস্তাবটা মেনে নিতে হল। খুব আস্তে আস্তে কিছুক্ষণ চলার পর হেডলাইটের আলোয় একটা কোনোক্রমে দাঁড়িয়ে থাকা ঘর নজরে পড়ল।

‘এটাই?’ ডিনা রেনোর দিকে ঘুরে জানতে চাইল।

‘হুঁ।’ রেনো নেমে দরজার তালাটা খুলল, ভেতরে ঢুকল। তারপর একটা লন্ঠন জ্বালিয়ে আমাদের ভেতরে আসতে বলল। ঘরটায় ঢুকে দেখলাম, বেশ ক-টা খাটিয়া, প্রচুর কম্বল, তাস, গ্যাসবাতি, শেলফে বেশ কিছু শুকনো খাবারের টিন, জল, তেল… মানে অনেক কিছুই আছে সেখানে।

‘মন্দ নয়, কী বলেন?’ রেনো আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনারা গুছিয়ে বসুন। আমি গাড়িটা লুকিয়ে রেখে আসছি।’

ডিনা খাটিয়া আর কম্বল পর্যবেক্ষণ করে জানাল, এক রাত ওখানে শুলে ও মারা যাবে না। আমি একটা স্কচভরতি ফ্লাস্ক বের করায় ওর মুড আরও ভালো হল। ওর সঙ্গে আমিও এক ঢোঁক নিলাম। ইতিমধ্যে গাড়ির আওয়াজটা হালকা হয়ে আসছিল।

বেরিয়ে দেখলাম, হেডলাইটের সাদা আলোগুলো অন্ধকারে হারিয়ে গেল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমি ঘরে ঢুকে মেয়েটাকে বললাম, ‘এখান থেকে কি হেঁটে বাড়ি ফিরবেন?’

‘মানে?’

‘রেনো গাড়িটা নিয়ে ভাগলবা হয়েছে।’

‘কী বজ্জাত পাবলিক! যাকগে, অন্তত রাত্তিরটা আরামে কাটানোর মতো জায়গায় আমাদের ছেড়েছে, এটাই বাঁচোয়া।’

‘সে গুড়ে বালি।’

‘কেন?’

‘এখানে ঢোকার চাবি রেনোর কাছে ছিল। যারা ওর পেছনে লেগেছে, তারা এটার সম্বন্ধে জানবেই। সেজন্যই রেনো আমাদের এখানে রেখে গেছে। যারা এখানে আসবে, আমরা যতক্ষণ তাদের খাতির করব, ততক্ষণে ও আরও দূরে চলে যেতে পারবে।’

মেয়েটা ক্লান্তভাবে খাটিয়া থেকে উঠল। তারপর রেনো, আমি এবং জগৎসংসারের সব পুরুষের উদ্দেশে বাছাই করা অপশব্দাবলির সঙ্গে অভিশাপ বর্ষণ করল। শেষে তেতো মুখে আমাকে বলল, ‘আপনি তো সবই জানেন বোঝেন। তাহলে আমাদের এখন কী করা উচিত, সেটাও নিশ্চয় জানেন।’

‘খোলা আকাশের নীচেই একটা মোটামুটি আরামদায়ক জায়গা বাছতে হবে। সেটা এখান থেকে বেশি দূরে বা কাছে হলে চলবে না। সেখানে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’

‘কম্বলগুলো কিন্তু আমি নিচ্ছি।’

‘একটা কম্বল নিলে ক্ষতি নেই। তার বেশি হলে কিন্তু ওরা বুঝে যাবে।’

‘বুঝুক গে!’ চেঁচিয়েও মেয়েটা একটা কম্বলই নিল।

আমি লন্ঠন নিভিয়ে, দরজাটা ভেজিয়ে দিলাম। গাড়ি থেকে একটা ফ্ল্যাশলাইট বের করে নিয়েছিলাম। তার আলোয় পায়ে-চলা পথ ধরে আমরা একটা নীচু জায়গা খুঁজে পেলাম যেখান থেকে রাস্তা, আর ওই ঘর, দুটোই দেখা যাবে। জায়গাটায় গাছপালার আড়াল ছিল, তাই আমরা আলো না জ্বালালে বা দৃষ্টি আকর্ষণ না করলে আমাদের দেখতে পাওয়ার কথা নয়। সেখানে কম্বলটা বিছিয়ে আমরা বসলাম।

মেয়েটা আমার গায়ে হেলান দিয়ে বলল, মাটিটা ভিজে। তারপর বলল, ফার কোট পরেও ওর ঠান্ডা লাগছে। তারপর বলল, ওর পায়ে ক্র্যাম্প হয়েছে। শেষে বলল, ওর একটা সিগারেট চাই। আমি স্কচের ফ্লাস্কটা দিলাম। মিনিট দশেকের জন্য শান্তি পাওয়া গেল। তারপর আবার শুরু হল।

‘আমার ঠান্ডা লেগে যাচ্ছে। যতক্ষণে কেউ আসবে, মানে যদি কেউ আসে, আমি এত জোরে হাঁচব আর কাশব যে শহর থেকেও শোনা যাবে।’

‘মাত্র একবার কাশবেন।’ আমি বললাম, ‘তারপরেই আপনাকে গলা টিপে মেরে ফেলা হবে।’

‘কম্বলের তলায় একটা ইঁদুর ঘুরঘুর করছে।’

‘ইঁদুর না। সাপ-টাপ হবে।’

‘আপনার বিয়ে হয়েছে?’

‘এই কথাগুলো এখন বলার কোনো মানে আছে?’

‘তার মানে হয়েছে?’

‘না।’

‘মেয়েটা বেঁচে গেছে।’

এই কথার কী উত্তর হতে পারে, সেটাই ভাবার চেষ্টা করছিলাম। তখনই দূরে একটা আলোর আভা দেখলাম। আমি ‘শশশ’ করে মেয়েটাকে চুপ করালাম, ততক্ষণে সব অন্ধকার হয়ে গেছিল।

‘কী হল?’

‘একটা আলো দেখলাম। এখন নেই। তার মানে আমাদের অতিথিরা গাড়ি রেখে পদব্রজে বাকিটা আসছেন।’

অনেকক্ষণ কেটে গেল। মেয়েটা আমার গায়ে গাল ঠেকিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল। পায়ের শব্দ, অন্ধকার আকাশের পটভূমিতে কয়েকটা ছায়া, এসব থেকে বুঝতে পারছিলাম, ঘরটাকে ঘিরে ফেলা হচ্ছে। একটু পরেই একটা আলো পড়ল ঘরের দরজায়।

‘মেয়েটাকে মারব না। ওকে বাইরে পাঠাও।’ একটা ভারী গলা শোনা গেল। ভেতর থেকে কোনো উত্তর এল না। ওই গলাটাই ফের শুধোল, ‘কেউ আসছে?’ এবারও উত্তর এল না, স্বাভাবিকভাবেই।

গুলির শব্দ নৈঃশব্দ্য ফালা ফালা করে দিল। আমি মেয়েটাকে ফিসফিসিয়ে বললাম, ‘ওরা এই করুক। আমরা বরং ওদের গাড়িটা নিয়ে পালাই।’

‘ওদের ছাড়ুন।’ মেয়েটা আমার হাত টেনে আমাকে বসাল, ‘আজ রাতে আর এসব পারব না। বরং এখানে রাত্তিরটুকু কাটিয়ে দিই।’

মেয়েটাকে আমি রাজি করানোর চেষ্টা করছিলাম। ইতিমধ্যে আমাদের অতিথিরা দরজা লাথিয়ে ভেতরে ঢুকে বুঝে গেছিল, ঘরটায় কেউ নেই। তারা সদলবলে গাড়িতে ফিরে, যে পথে রেনো উধাও হয়েছিল সেই পথেই চলে গেল। আমি গুনেছিলাম, দলে মোট আটজন ছিল।

‘আমরা বরং ঘরটাতেই ঢুকি।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম আমি, ‘ওরা আজ রাতে আর আসবে না।’

মেয়েটার হাত ধরে তুললাম। ও জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার ফ্লাস্কটা খালি হয়ে যায়নি তো?’