আঠেরো – কাউন্টডাউন
ঘরটায় এমন কিছু ছিল যা দিয়ে আমাদের মন বা পেট ভরে। একটা বালতিতে জমা জল ফুটিয়ে কোনোক্রমে বানানো কফি দিয়েই ব্রেকফাস্ট সারলাম আমরা। মাইলটাক হেঁটে একটা ফার্মহাউস পেলাম। সেখানে একটা ছেলে কয়েক ডলার নিয়ে আমাদের শহরে পৌঁছে দিতে রাজি হল। ছেলেটার প্রচুর প্রশ্ন ছিল। আমরা সেগুলোর বানানো উত্তর দিলাম, বা কালা সাজলাম।
কিং স্ট্রিটের একটা রেস্তরাঁর সামনে ছেলেটা আমাদের নামাল। সেখানে পেট ভরিয়ে একটা ট্যাক্সি নিলাম। ডিনা-র বাড়িতে যখন পৌঁছোলাম, তখন প্রায় ন-টা বাজে। আমি বাড়িটা আপাদমস্তক খুঁজেও সেখানে বহিরাগত কারো আসার চিহ্ন খুঁজে পেলাম না।
‘আপনি কখন আসবেন?’ আমাকে দরজায় পৌঁছে দিয়ে জানতে চাইল ডিনা।
‘এখন থেকে মাঝরাতের মধ্যে একবার আসবই, তবে কতক্ষণ থাকব বলতে পারব না। লিউ ইয়ার্ড কোথায় থাকে?’
‘১৬২২ পেইন্টার স্ট্রিট। এখান থেকে চার ব্লক পরেই। আপনি ওখানে যাবেন কী করতে?’ আমি কিছু বলার আগেই আমার হাত ধরে মেয়েটা বলল, ‘আপনি দয়া করে ম্যাক্সের কিছু করুন। আমার সত্যি ভয় করছে।’
‘আমি ওর পেছনে নুনানকে লাগিয়ে দেব তাহলে। তবে সবই নির্ভর করছে এরপর কী হয়, তার ওপর। দেখা যাক।’
মেয়েটাক আমাকে স্বার্থপর, হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর ইত্যাদি অনেক কিছু বলল। আমি পেইন্টার স্ট্রিটে গিয়ে লালরঙা ইটের বাড়িটা খুঁজে বের করলাম। কিছুটা দূরে একটা ভাড়া করা গাড়িতে বসে ছিল ডিক ফোলে। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী সমাচার?’
ডিক আমাকে টেলিগ্রাফের ভাষায় জানাল, আগের দিন বেলা দুটো থেকে ও লিউ ইয়ার্ডের পিছু নিয়েছে। সাড়ে তিনটের সময় লিউয়ের পিছু নিয়ে ও উইলসনের বাড়িতে যায়। সেখানে মিকিও পিটের পিছু নিয়ে এসেছিল। মিটিঙের পর পাঁচটায় ও আবার ইয়ার্ডের পিছু পিছু এখানেই ফিরে আসে আর রাত তিনটে অবধি নজরদারি করে। অনেকেই তারপর ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে-গেছে, তবে ও তাদের কাউকে অনুসরণ করেনি। পাঁচটার সময় ও আবার কাজে ফিরে আসে। তখন থেকে এখনও অবধি কেউ আসেনি।
‘এই কাজটা ছেড়ে তুমি বরং উইলসনের ওপর নজর রাখো।’ আমি বললাম, ‘খবর আছে, হুইস্পার ওখানে লুকিয়ে আছে। ওকে নুনানের হাতে তুলে দেওয়া ঠিক হবে কি না, সেটা ঠিক করার আগে ওর ওপর নজর রাখাটা জরুরি।’
ডিক সায় দিল। আমি হোটেলে ফিরেই দেখলাম, গুরুদেবের টেলিগ্রাম এসেছে।
‘কেন এবং কোন অবস্থায় বর্তমান কাজটি নেওয়া হয়েছে তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা এবং এখনও অবধি প্রতিদিনের কাজের রিপোর্ট ফিরতি মেইলেই পাঠাতে হবে।’
টেলিগ্রাম পকেটে ভরলাম। বুঝতে পারছিলাম, আমার মাথার ওপর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। ঝটপট কিছু জোগাড় করা দরকার। নইলে রিপোর্ট হিসেবে যা পাঠাতে হবে তার সঙ্গে আমার পদত্যাগপত্রর খুব একটা পার্থক্য থাকবে না। পোশাক বদলে সিটি হলে হাজির হলাম।
‘আসুন আসুন!’ নুনান আমাকে অভ্যর্থনা জানাল, ‘আমি আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম। হোটেলে খোঁজ করেছিলাম। ওরা বলল, আপনি নাকি কাল রাতে ফেরেননি।’
নুনানের মুখ-চোখ সুবিধের ঠেকছিল না। তবে এটুকু বুঝছিলাম, ও সত্যিই আমাকে দেখতে পেয়ে খুশি হয়েছে। আমি বসতে বসতে ফোন এল। নুনান ফোন তুলে ‘হ্যালো’ বলল। কিছুক্ষণ শুনে ও বলল, ‘তুমি নিজেই গিয়ে দেখো, ম্যাক।’
ফোনটা জায়গামতো রাখতে ওকে কসরত করতে হচ্ছে দেখেই বুঝলাম, ব্যাপার গুরুতর। গলায় জোর আনার চেষ্টা করে ও বলল, ‘লিউ ইয়ার্ড খুন হয়েছে। ও বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিল, তখনই গুলি করা হয়েছে।’
আমি ডিককে ওখান থেকে সরানোর জন্য মনে মনে নিজেকে প্রভূত গালাগাল দিলাম। নুনানকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর কিছু জানা গেল?’
নুনান নিজের কোলের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমরা কি একবার গিয়ে দেখব?’
‘না।’ নিজের মাথাটা নীচু রেখে ক্লান্ত স্বরে নুনান বলল, ‘সত্যি বলতে, আমার মনে হয় না আমি আর এসব নিতে পারব। এই খুনোখুনি দেখতে-দেখতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’
‘খুনটা কে করতে পারে বলে আপনার মনে হয়?’
‘ঈশ্বর জানেন।’ জড়ানো গলায় নুনান বলল, ‘সবাই সবাইকে মেরে ফেলছে। এসব কবে থামবে?’
‘খুনটা কি রেনো করতে পারে?’
ছ্যঁাকা খাওয়ার মতো চমকে উঠল নুনান। মুখ তুলে আমার দিকে তাকাতে যাচ্ছিল ও, কিন্তু মাঝপথেই থেমে গেল। বলল, ‘কে জানে!’
আমি অন্য অ্যাঙ্গল ধরলাম, ‘কাল রাতে সিলভার অ্যারোর যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি কীরকম?’
‘মাত্র তিনজন।’
‘তারা কারা?’
‘ব্ল্যাকি হোয়ালেন, পাট কলিন্স, আর ডাচ জেক ওয়াল। ওরাও রেনোর সঙ্গেই জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিল। পার্টিই করছিল, তবে জোশের বশে বোধ হয় একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল।’
‘এরা সবাই কি লিউ ইয়ার্ডের লোক?’
‘আমি কী করে বলব?’
আমি উঠে পড়লাম। দরজার কাছে গেছি, তখন পেছন থেকে প্রায় আর্তনাদ শুনলাম, ‘আমাকে এভাবে ফেলে যাবেন না! হ্যাঁ, ওরা সবাই ইয়ার্ডের লোক ছিল।’
চেয়ারে ফিরে এলাম। নুনান টেবিল পর্যবেক্ষণ চালু রাখল। ওর মুখ দেখে একতাল পুডিঙের কথা মনে পড়ছিল।
‘হুইস্পার এলিহু-র বাড়িতে আছে।’ আমি বললাম।
এক ঝটকায় ওর মাথাটা সোজা হল। চোখের সাদাটে ভাব সরে গিয়ে সেগুলোতে গাঢ় একটা ছায়া দেখা দিল। তারপর ওর মুখটা একবার কাঁপল। আবার ওর মাথাটা নীচু হয়ে গেল।
‘না। আমি পারব না। আমার… ঘেন্না ধরে গেছে এসবে।’
‘এতটাই ঘেন্না ধরেছে যে টিমের খুনের বদলা নিতেও ইচ্ছে করছে না?’ আমি জানতে চাইলাম।
‘হ্যাঁ।’
‘ভেবে দেখুন, এই পুরো ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল ওই দিয়ে।’ আমি মনে করালাম, ‘যদি সেটাই আপনি ভুলতে রাজি থাকেন, তাহলে এই খুনোখুনি থামতেই পারে।’
ক্ষুধার্তকে বিরিয়ানি খাওয়ানোর লোভ দেখালে সে যেভাবে তাকায়, নুনানও সেভাবেই আমার দিকে তাকাল। আমি বললাম, ‘বাকিদেরও নিশ্চয় অবস্থাটা ভালো লাগছে না। আপনি তাদের এটা বোঝান। সবাইকে একসঙ্গে ডেকে একটা শান্তিবৈঠক টাইপের কিছু করে নিন।’
‘ওরা ভাববে, আমার কিছু একটা ধান্দা আছে।’ নুনান ঘ্যানঘ্যান করল।
‘উইলসনের বাড়িতে মিটিং করুন। হুইস্পার ওখানে আছে। আপনি ওই বাড়িতে গেলে সবচেয়ে বড়ো বিপদের আশঙ্কা থাকবে আপনারই। আপনি কি সেই ঝুঁকিটা নিতে রাজি আছেন?’
‘আপনি যাবেন আমার সঙ্গে?’ ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল নুনান।
‘আপনি চাইলে যাব।’
‘বাঁচালেন।’ একটা বড়ো শ্বাস ফেলে বলল শহরের পুলিশ চিফ, ‘তাহলে একটা চেষ্টা করা যেতে পারে।’
