Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

উনিশ – শান্তি(?)বৈঠক

সেই রাতে ন’টা নাগাদ আমি আর নুনান উইলসনের বাড়িতে হাজির হলাম। শান্তিবৈঠকে ভাগ নেওয়া বাকি লোকজন ততক্ষণে এসে গেছিল। সবাই আমাদের দিকে নড্‌ করল।

আমরা উইলসনের লাইব্রেরি টেবিলে বসে ছিলাম। টেবিলের মাথায় বসে বুড়ো এলিহু আমাদের সবাইকে মাপছিল। ওর ডান দিকে বসে স্থির, কুতকুতে চোখে তাকিয়ে আমাদের দেখছিল শহরে মদের চোরাচালানের বেতাজ বাদশা পিট দ্য ফিন। ওর সঙ্গে এর আগে দেখা হয়নি আমার। লোকটা টেকো, শক্ত চোয়াল, বছর পঞ্চাশেক বয়স, তবে শরীরটা বিশাল। রেনো স্টার্কি ওর পাশে ভাবলেশহীন মুখ-চোখ নিয়ে বসে ছিল।

ম্যাক্স থ্যালার উইলসনের ডান দিকে একটা চেয়ার পেছন দিকে হেলিয়ে অলসভাবে বসে ছিল। আমি ওর পাশে বসলাম। নুনান আমার ডান দিকে বসল।

মিটিং শুরু করল এলিহু উইলসন। বুড়ো বলল, ব্যাপার যেভাবে চলছে, সেটা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা সবাই সুস্থ মস্তিষ্কের, বুঝদার লোক। এই লড়াই থামানোর জন্য আপোশ করতে হবে সবাইকেই। ‘ঘণ্টাখানেক সঙ্গে এলিহু’ টাইপের একটা আলোচনার পর যে মিটমাট হবেই, এ ব্যাপারে ও নিশ্চিত।

বক্তৃতাটা খারাপ ছিল না। ওটা শেষ হওয়ার পর মিনিটখানেকের জন্য ঘর একদম চুপচাপ হয়ে গেল। তারপর থ্যালার মুখ বাড়িয়ে আমার পাশে বসা নুনানের দিকে তাকাল। ওর দৃষ্টি থেকে বোঝাই যাচ্ছিল, ও নুনানের কাছ থেকে কিছু একটা শুনতে চায়। আমরাও পুলিশ চিফের দিকে তাকিয়ে রইলাম। নুনানের মুখটা ক্রমেই লাল হয়ে উঠল। ও উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হুইস্পার, তুমি টিমকে খুন করলেও সেটা আমি আর মাথায় রাখব না। কথা দিচ্ছি।’

নিজের আন্তরিক ভাবটা বোঝানোর জন্য নুনান হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেদিকে তাকিয়ে হুইস্পারের ঠোঁটজোড়া বেঁকে একটা হিংস্র হাসির আকার নিল।

‘তোমার ওই বেজন্মা ভাইকে খুন করার দরকার ছিল বটে।’ ঠান্ডা গলায় ফিসফিস করে বলা কথাগুলো আমাদের কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল, ‘তবে আমি ওকে মারিনি।’

নুনানের মুখের লাল রংটা বেগুনি হয়ে উঠছিল। আমি জোর গলায় বললাম, ‘দাঁড়ান, নুনান। এভাবে হবে না। যতক্ষণ না আমরা সবাই সত্যি বলছি ততক্ষণ এই অবস্থা শুধরোবে না। আপনি এটা স্বীকার করুন যে আপনি জানেন, ম্যাকসোয়েন টিমকে খুন করেছিল।’

নুনান হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি অন্যদের দিকে ঘুরে বললাম, ‘এটা সবার কাছে পরিষ্কার হল তো? এবার অন্য ব্যাপারগুলো নিয়ে কথা হোক।’

আমি পিট দ্য ফিন-এর দিকে ঘুরে বললাম, ‘কাল আপনার গুদামে, আর সেখানে যারা কাজ করছিল তাদের সঙ্গে হওয়া দুর্ঘটনা নিয়ে আপনি কী ভাবছেন?’

‘দুর্ঘটনাই বটে!’ দাঁতে দাঁত ঘষে বলল ফিন।

‘নুনান সত্যিই জানতেন না যে ওই গুদামটা আপনার।’ আমি ব্যাখ্যা করলাম, ‘উনি ভেবেছিলেন, ওটা ফাঁকা থাকবে। ওই অপারেশনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল শহর থেকে নজরদারি কমানো। কিন্তু গুদামের ভেতর থেকে আপনার লোকেরা গুলি চালায়। তখন ওঁর মনে হয়, উনি ঘটনাচক্রে থ্যালারের গোপন আড্ডা খুঁজে পেয়েছেন! কিন্তু পরে, আসল জিনিসটা বোঝার পর ওঁর মাথা বিগড়ে যায়। তারপরেই উনি জায়গাটা জ্বালিয়ে দেন… ভুল করে।’

থ্যালার আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে ছিল, তবে ওর চোখে একটা হালকা, ক্রূর হাসি খেলা করছিল। রেনো নীরব ও নিথর। এলিহু উইলসন সামনে ঝুঁকে সতর্ক চোখে আমায় দেখছিল। নুনান… না, নুনানের দিকে তাকানোর ঝুঁকি আমি নিচ্ছিলাম না। ওই মুহূর্তে সামান্য বেচালের পরিণাম মারাত্মক হত। তাই আমি সততার পরাকাষ্ঠা সেজে কথা বলে চললাম।

‘আমার লোকেরা ঝুঁকি নিয়েই কাজ করে, তাই তাদের নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না।’ গম্ভীর গলায় বলল ফিন, ‘তবে গুদামের লোকসান মেটানোর জন্য আমায় হাজার পঁচিশেক দিলেই হবে।’

‘ঠিক আছে পিট।’ নুনান নীচু গলায় বলল, ‘ঠিক আছে। আমি টাকাটা দিয়ে দেব।’

আমি এবার নুনানের দিকে তাকালাম। জানতাম, ও আমার দিকে চোখ তুলতে পারবে না। সেই মুহূর্তে ও শুধু ওই নেকড়ের পালের মধ্য থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছিল। কিন্তু সেটা পাওয়া যে কী কঠিন তা আমরা সবাই জানতাম।

‘আপনার ব্যাঙ্কে ডাকাতি হওয়ার পেছনে আসল গপ্পোটা আমি বললে সেটা সহ্য করতে পারবেন তো?’ আমি এলিহু উইলসনকে ধরলাম এবার। থ্যালার আমার হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল, ‘কে কী সহ্য করতে পারবে, সেটা সবাই শোনার পরেই বোঝা যাবে। আপনি বলুন।’

আমি সেটাই চাইছিলাম।

‘নুনান আপনাকে ফাঁসাতে চেয়েছিলেন।’ আমি হুইস্পারের দিকে মুখ তুলে শান্ত গলায় বললাম, ‘কিন্তু ইয়ার্ড বা উইলসন, বা এঁদের দু-জনের কাছ থেকেই ওঁর কাছে আদেশ এসেছিল। আপনার গায়ে হাত লাগাতে বারণ করা হয়েছিল নুনানকে। তখন নুনান ভাবেন, যদি ব্যাঙ্ক লুটের দায় আপনার ওপর চাপে, তাহলে আপনার হয়ে কেউ কিছু বলবে না। ব্যাঙ্ক এলিহু-র। লুটপাট ইয়ার্ডের অনুমতি ছাড়া এই শহরে হয় না। নুনান জানতেন না, আপনি কোথায় আছেন। কিন্তু এই দু-জন আপনার ওপর চটলে আপনার অবস্থান নুনানের কাছে পৌঁছে যেত।

রেনো ইয়ার্ডের লোক হলেও এই প্ল্যানে রাজি ছিলেন। উনি এমনিতেও ইয়ার্ডকে ছেড়ে নিজের মতো করে কিছু করার কথা ভাবছিলেন, তাই না?’

‘আপনার গল্প, আপনিই বলুন।’ নির্বিকার মুখে বলল রেনো।

‘অতঃপর নুনান ব্যাপারটা সুন্দরভাবে সাজালেন। সবাইকে বলা হল, আপনি সেডার হিলে লুকিয়ে আছেন। যে ক-জন ডিটেকটিভ ওঁর আস্থাভাজন, তাদের সব্বাইকে নিয়ে ওখানে হানা দিলেন নুনান। এমনকী ট্র্যাফিক পুলিশদের পর্যন্ত শামিল করা হয়েছিল ওই অভিযানে। এর ফলে কী হল? রেনোর সামনে রাস্তা একেবারে সাফ হয়ে গেল। ম্যাকগ্র আর অন্য কিছু পুলিশ আগে থেকেই এই পরিকল্পনা জানত। তারা রেনো আর ওর দলবলকে জেল থেকে কিছুক্ষণের জন্য বেরিয়ে নির্বিঘ্নে লুটপাট করে আবার জেলে ফিরে আসতে দিল। এর ফলে ওদের অ্যালিবাই রইল পাক্কা।

খবরটা লিউ ইয়ার্ডের কাছে পৌঁছেছিল। ব্যাপারটা যে ওঁর পছন্দ হয়নি, একথা বলাই বাহুল্য। গতরাতে উনি ‘‘ডাচ’’ জেক ওয়াল-এর নেতৃত্বে নিজের কিছু লোককে সিলভার অ্যারো-তে পাঠান রেনোকে ‘‘শিক্ষা’’ দিতে। ওঁর কপাল খারাপ, রেনো বেঁচে যান। শহরে ফেরার পর রেনোর সামনে একটাই রাস্তা ছিল। ভোররাত থেকেই রেনো লিউ ইয়ার্ডের বাড়ির সামনে তৈরি হয়েই ছিলেন। ইয়ার্ড বেরোন, গুলি খান, আর তার ফলেই এই বৈঠকে আমরা দেখছি, যে চেয়ারটায় ইয়ার্ডের বসার কথা সেটায় রেনো বসে আছেন।’

ঘরে কেউ নড়ছিল না। মনে হচ্ছিল, যে নড়বে সে-ই নিজেকে নিশানায় ফেলবে। ওই মুহূর্তে কেউ কারো বন্ধু ছিল না।

‘আপনি বোধ হয় কিছুটা বাদ দিলেন।’ থ্যালার ফিসফিস করল, ‘তাই না?’

‘আপনি জেরির কথা বলছেন?’ আমি মধ্যমণির ভূমিকা পালন করে চললাম, ‘বলতেই যাচ্ছিলাম। জেরি আপনারই সঙ্গে জেল থেকে পালিয়েছিল কি না, সে-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। তবে পরে ও ধরা পড়েছিল। ওকে কোনোভাবে বাধ্য করা হয়েছিল ওই ডাকাতির সময় যেতে, আর গাড়িতে বসে থাকতে। জেরিকে মারাটা জরুরি ছিল। সবাই জানত, ও আপনার নিজের লোক। ওকে গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়ার পর পেছন থেকে গুলি করা হয়। ব্যাঙ্কের ওই বুড়ো নির্ঘাত চোখ বন্ধ করে ট্রিগার টিপেছিল। কিন্তু যারা ওই ডাকাতি দেখেছে তারাই বলেছে, গাড়ি থেকেও গুলি চলেছিল। সেজন্যই ওর লাশটা ব্যাঙ্কের দিকে মুখ করে, আর গাড়ির দিকে পিঠ দিয়ে পড়েছিল।’

‘তাই?’ থ্যালার রেনোর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল।

‘তো?’ থ্যালারের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল রেনো।

থ্যালার উঠে দাঁড়াল। ‘আমাকে বাদ দিন।’ বলে ও দরজার দিকে এগোল।

এবার পিট দ্য ফিন উঠে দাঁড়াল। ‘হুইস্পার!’ টেবিলে ভর দিয়ে, গুরুগম্ভীর গলায় বলল ফিন। থ্যালার থেমে গেলে ও একইভাবে বলে চলল, ‘তোমাদের সব্বাইকে বলছি কথাগুলো। খুব মন দিয়ে শোনো। তোমাদের ঘটে কিস্সু নেই, নইলে এভাবে শহরটাকে রণক্ষেত্র বানাতে না। এখনও বলছি, লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকো। নইলে আমি তোমাদের সহবত শেখাতে বাধ্য হব।

আমার কাছে এমন একদল তরতাজা জোয়ান আছে যারা জানে, বন্দুকের কোন দিকটা টিপলে কোন দিক দিয়ে গুলি বেরোয়। যদি প্রয়োজন হয়, আমি তোমাদের সব্বার বিরুদ্ধে তাদের লেলিয়ে দেব। তখন তোমরা বুঝবে গোলাবারুদ নিয়ে খেললে কেমন লাগে। তোমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে চাও? আমি তোমাদের যথেষ্ট সুযোগ দেব। শুধু ভেবে নিও, তারপর কী হবে।’

পিট দ্য ফিন বসে পড়ল। থ্যালার গম্ভীর মুখে কিছু একটা ভাবল, তারপর বেরিয়ে গেল। ও বেরিয়ে যাওয়ায় বাকিরা সবাই অধৈর্য হয়ে পড়ল। বুঝতে পারছিলাম, সবাই নিজের নিজের বাহিনী মোতায়েন না করা অবধি ভরসা পাচ্ছে না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলিহু উইলসন আর আমি ছাড়া ওই ঘরে কেউ রইল না।

আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর এলিহু মুখ খুলল।

‘পুলিশ চিফ হওয়ার ইচ্ছে আছে?’

‘আজ্ঞে না। আমি একজন মামুলি হুকুমের চাকর হয়েই বেশ আছি।’

‘আরে এদের চিফ হতে বলছি না।’ বিরক্ত মুখে বলল বুড়ো, ‘যদি এদের বিদায় করে নতুন একদল লোক লাগাই?’

‘তাহলে তারাও কিছুদিনের মধ্যে এদের মতো হয়ে যাবে।’

‘মহা মুশকিল তো!’ বুড়ো খেপে গেল, ‘বাপের বয়সি একজনের কথা শুনতে গেলেও কি গায়ে ফোসকা পড়ে তোমার?’

‘বয়সের আড়ালে নিজেকে লুকোনোর চেষ্টা করবেন না, প্লিজ।’

রাগে বুড়োর কপালে একটা শিরা দপদপিয়ে উঠল। তবে নিজেকে সামলে নিল ও।

‘তোমার মুখটা একেবারে সোনা-বাঁধানো।’ ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল এলিহু, ‘কিন্তু তোমাকে যে কাজটা করতে বলা হয়েছিল, সেটা তুমি ভালোই করছ। এটা মানতেই হবে।’

‘তাতে আপনার কতটুকু অবদান আছে?’

‘তোমার কি একজন ধাইমা দরকার ছিল নাকি এই কাজের জন্য? টাকা দিয়েছি, কাজ করার স্বাধীনতা দিয়েছি। আর কী চাও তুমি?’

‘তুমি মহারাজ, সাধু হলে আজ…!’ আমি চিবিয়ে চিবিয়ে বলি, ‘এই ‘কাজ-টা যাতে আপনি আমাকে দিতে বাধ্য হন, সেজন্য আপনাকে রীতিমতো ব্ল্যাকমেইল করতে হয়েছে। তারপরেও প্রতি পদে আপনি আমাকে আটকাতে চেষ্টা করেছেন। এখন দেখছেন, আপনার কুয়ো থেকে তেলের বদলে রক্ত উঠছে। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করছেন, আমার আর কী চাই?’

‘মহারাজ।’ আমাকে নকল করে বলল এলিহু, ‘বৎস, আমি যদি ওইরকম না হতাম, তাহলে আজও আমাকে একটা মামুলি চাকরি করতে হত কোথাও। পার্সনভিল মাইনিং কর্পোরেশন হত না। ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক হত না। কিন্তু তুমি নিজেও কি মহাত্মা? আজ এখানে তুমি কী করলে, আমি বুঝিনি ভেবেছ?

হ্যাঁ, আমি কয়েকটা ভুল করেছিলাম। তার দাম আমাকে মেটাতে হচ্ছে এখন। আমার কপাল।’

‘আহা রে!’ আমি গলায় সহানুভূতি ফোটালাম, ‘তা, এখন আপনার কী বক্তব্য? আপনি কি আমার পাশে আছেন?’

‘যদি তুমি জেত।’

‘সিরিয়াসলি।’ আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘এই বদমায়েশগুলোর সঙ্গে আপনিও হাজতে গেলে আমার যে কী আনন্দ হবে…!’

‘আমি জানি তোমার আনন্দ হবে।’ চোখ কুঁচকে বলল বুড়ো, ‘কিন্তু আমি তোমাকে নিয়োগ করেছি, অন্তত কাগজ-কলমে। তাতে তো এটাই প্রমাণ হবে যে আমি শহরের ভালো চেয়েছিলাম। ঠিক কি না?’

‘জাহান্নমে যান!’ বলে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।