কুড়ি – ঘুমের ঘোর
রাস্তার কোণে ডিক ফোলি একটা ভাড়া-করা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। আমি ওকে বললাম ডিনা’র বাড়ির কাছে আমাকে নামাতে। ওর বসার ঘরের সোফায় নিজের শরীরটা স্রেফ ছেড়ে দিলাম।
‘কাজ থেকে এলেন বুঝি?’ আমার ক্লান্তিটা ডিনা’র নজর এড়ায়নি।
‘একটা শান্তি বৈঠক করে এলাম। সব ঠিকঠাক চললে অন্তত ডজনখানেক লাশ পড়বে এবার।’
ফোন বাজল। ডিনা ফোনটা ধরে আমাকে ডেকে দিল। ওপাশে রেনো-র গলা পেলাম।
‘আমার মনে হল, আপনি হয়তো খবরটা এখনও পাননি। নুনান খুন হয়েছে। সবে গাড়ি থেকে নিজের বাড়ির সামনে নেমেছিল। তখনই কেউ ওকে ঝাঁঝরা করে দেয়। খান ত্রিশেক গুলি লেগেছিল বোধ হয়।’
আমি ওকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোনটা রাখলাম। ডিনা-র চোখগুলো থেকে প্রশ্ন উপচে পড়ছিল। আমি সংক্ষেপে বললাম, ‘পয়জনভিলের পুলিশ চিফের পদটা খালি হয়েছে। আপনার বাড়িতে জিন আছে, না শেষ?’
ডিনা-র উত্তেজিত প্রশ্নমালার উত্তর দিলাম না। কিচেনে গিয়ে একটা বরফ ভাঙার শিক দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ফ্রিজ থেকে বরফ বের করলাম। তারপর জিন, সোডা, লেবু এসব জোগাড় করে আমি গুছিয়ে বসলাম। ডিনা এতক্ষণে বোধ হয় আমার আচরণে কিছু অস্বাভাবিকত্ব খেয়াল করল। ও জানতে চাইল, ‘আপনাকে এরকম বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন? আপনার কি কিছু হয়েছে?’
আমি হাতের গ্লাসটা টেবিলে রাখলাম। মাথাটা নীচু রেখেই কথাগুলো বলতে শুরু করলাম।
‘আর পারছি না! এখান থেকে ঝটপট কেটে পড়তে না পারলে আমারও এখানকার লোকেদের মতো অবস্থা হবে। এই শহরে আমি পা দেওয়ার পর থেকে এখনও অবধি ক-টা খুন হয়েছে, তার তালিকাটা শুনবেন? ডোনাল্ড উইলসন, ইকি বুশ, সেডার হিলে ওই এক পুলিশ ডিটেকটিভ আর চারটে মজদুর, জেরি, লিউ ইয়ার্ড, ডাচ জেক, সিলভার অ্যারো-তে ব্ল্যাকি হোয়ালেন আর পাট কলিংস, আমার গুলি খেয়ে মরা পুলিশ অফিসার নিক, হুইস্পারের গুলিতে যে সোনালি-চুলো ছেলেটা এখানে মরল, এলিহু-র বাড়িতে ঢুকে ইয়াকিমা শর্টি, এখন নুনান। মানে এক সপ্তাহের কম সময়ে ষোলোজন!’
‘আপনি এভাবে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছেন কেন?’ ভ্রূ কুঁচকে বলল ডিনা।
‘না ভেবে উপায় আছে?’ আমি হেসে বললাম, ‘গুলি তো বেরিয়ে গেছে বন্দুক থেকে। আর প্রথম গুলিটা আমিই করেছি। না করে উপায় ছিল না, নইলে এলিহু উইলসন আর ওর বন্ধুদের এই আড্ডা টসকানো যেত না। নুনানই আমাকে ওই বৈঠকে নিয়ে গেছিল। কিন্তু সেখানে যখন আমি নুনানের কীর্তিকলাপ সবার সামনে তুলে ধরলাম, তখন আমি বুঝতে পারছিলাম, ওর মেয়াদ খুব বেশি হলে আর এক দিন। ওর পার্টনার রেনো কিন্তু নির্বিকার ছিল। অর্থাৎ নেক্সট রাউন্ড হবে রেনো আর হুইস্পারের মধ্যে, আর ওদের দু-জনের সঙ্গে লড়বে পিট দ্য ফিন। তখন এই সংখ্যাটা কোথায় যাবে, বুঝতে পারছেন?’
‘কিন্তু আপনি তো বললেন,’ বাচ্চা ছেলেকে বোঝানোর মতো করে বলল ডিনা, ‘যে এটা না করে আপনার উপায় ছিল না। তাহলে এই নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন কেন?’
‘কারণ কুড়ি বছর ধরে এই কাজ করতে গিয়ে আমি অনেক খুনখারাপি দেখেছি, অল্পবিস্তর করেওছি। কিন্তু এই প্রথম আমি অন্যদের মধ্যে খুনোখুনি বাধিয়ে বেশ আনন্দ পাচ্ছি। এটা আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলছে। এই শহরে এসে মাত্র ক-দিনেই এই অবস্থা হয়েছে আমার। এরপর…!’
‘আপনি বাড়িয়ে বলছেন।’ খুব নরম করে বলল ডিনা, ‘এই খুনোখুনি আপনার জন্য নয়। এই লোকগুলোই এরকম। ওদের যা হওয়ার ছিল, তাই হচ্ছে। এবার নিজের গ্লাসটা খালি করুন।’
আমি আদেশ পালন করলাম। আরও বরফ আর জিন নিয়ে ফিরে আসার পর ও ভ্রূ কুঁচকে আমার হাতের দিকে দেখাল। তাকিয়ে দেখলাম, বরফ ভাঙার ছুঁচোলো শিকটা আমার হাতে ধরা রয়েছে।
‘ওটা দিয়ে কী হবে?’ ডিনা জানতে চাইল।
‘দেখুন! নিজের অজান্তেই আমি এটাকে অস্ত্র ভেবে হাতে তুলে নিয়েছি। আর শুধু এই শিকটা নয়। আমার মাথায় এখন কী ঘুরছে জানেন? লাইটার দেখলেই মনে হচ্ছে, তাতে তেলের বদলে নাইট্রোগ্লিসারিন ভরে এদের কাউকে উপহার দিই। আপনার বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে একটা তামার তার চকচক করছিল। ওটা দেখেও মনে হল, কারো গলায় পেঁচিয়ে দুটো দিক ধরে টানলে…!’
‘চুপ করুন!’
‘এবার বুঝতে পারছেন তো, আমি কেন দুশ্চিন্তা করছি?’
‘এটাই বুঝতে পারছি যে আপনার নার্ভের বারোটা বেজে গেছে। আপনি ক-দিনের জন্য একটু বিশ্রাম নিন বরং। এখানে নয়, দূরে কোথাও। চলুন না, আমি আর আপনি সল্ট লেক থেকে ঘুরে আসি।’
‘অসম্ভব। শহরটা ডিনামাইটের স্তূপ হয়ে আছে। কিন্তু সময় আর জায়গা বুঝে দেশলাই সাপ্লাইয়ের কাজটা আমি এখানে না থাকলে কে করবে?’
‘কেন এত ভাবছেন?’ অধৈর্য হয়ে উঠল ডিনা, ‘এগুলো ছেড়েছুড়ে অন্য কোথাও চলুন। আমার এসব ভালো লাগছে না। আপনার অবস্থা তো মনে হচ্ছে আমার চেয়েও খারাপ।’
‘আপনার এসব ভালো লাগছে না?’ আমি থেমে থেমে বললাম, ‘কেন? আপনার তো এতে সক্রিয়ভাবে যোগ দেওয়া উচিত। নইলে এলিহু-র দশ হাজার ডলারের ভাগ পাবেন কীভাবে?’
‘এর মধ্যে টাকাপয়সার কথা তুলছেন কেন? খুনখারাপি আমিও ভালোবাসি না।’
‘অদ্ভুত!’
‘মানে?’
‘আপনার এক বয়ফ্রেন্ড ডোনাল্ড উইলসনকে খুন করে এই পুরো ব্যাপারটা শুরু করল। আপনার আরেক বয়ফ্রেন্ড বিল কুইন্ট আপনাকে মারার হুমকি দিয়েছিল। হুইস্পার আপনাকে এখন কী চোখে দেখছে সেটা নাই-বা বললাম। আমার তো আশঙ্কা হচ্ছে, আপনার কাছাকাছি এলেই পুরুষদের মধ্যে একটা খুনখারাপির ভাব জাগে। কোন্দিন দেখবেন ড্যান রল্্ফ আপনাকে মেরে…’
‘ব্যস ব্যস!’ উঠে দাঁড়াল ডিনা, ‘নিজের মাথাটা তো খারাপ করেইছেন, এবার কি আমার মাথাটাও খাবেন?’
খালি গ্লাস নিয়ে চলে গেল ডিনা। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবতে বসলাম, আমার ঠিক কী হচ্ছে। সর্বত্র আমি রক্ত আর মৃত্যু দেখছি। কেন? স্নায়ু আর চাপ নিতে পারছে না? নাকি আমি সাইকিক হয়ে যাচ্ছি?
‘এখান থেকে যেতে না পারলে আপনার একটাই করণীয়।’ ভরা গ্লাস আমার দিকে বাড়িয়ে বলল ডিনা, ‘জমিয়ে নেশা করে একটা ঘুম দিন। আমি আপনার গ্লাসে ডাবল ডোজ দিয়েছি।’
‘ওতে কিস্সু হবে না। ইন ফ্যাক্ট আপনার কাছে বসে থাকলেই আমার কিছু হবে না। কারণ আপনাকে দেখলেই আমার সবগুলো খুনের কথা মনে পড়বে। নেশাও কেটে যাবে তক্ষুনি! আপনি কি সত্যিই খুনখারাপি অপছন্দ করেন? মনে তো হয় না।’
ডিনা-র ফ্যাকাশে মুখ দেখে বুঝলাম, নিজের কষ্টটা এভাবে ওর ওপর না ওগরালেই পারতাম। দুঃখপ্রকাশ করলাম। অন্তত ওটুকু যে আমি খোলা মনেই করলাম সেটা বুঝে ডিনা আবার উঠল। একটু পর আর একটা গ্লাস নিয়ে ও আমার মুখের সামনে ধরল। গ্লাসটা থেকে আমি একটা চেনা গন্ধ পেলাম। ওর দিকে কৌতূহলী হয়ে তাকালাম।
‘ড্যানের আফিং।’ খরখরে গলায় বলল ডিনা, ‘এটা লক্ষ্মী ছেলের মতো খেয়ে ফেলুন। তারপর ঘুমোন।’
ভেবেছিলাম কিছু হবে না। তবে ওটা আর জিন পাঞ্চ করে খেয়ে পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হল। কিছুক্ষণের জন্য মনে হল, পৃথিবী সবুজ, আকাশের রং নীল, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক স্রেফ প্রেম, প্রীতি, বিশ্বাস– এইসব দিয়ে গড়া। কথাবার্তাও বেশ ভালো দিকে গড়াল। তারপর…
তলিয়ে যাওয়ার আগে আমার এটুকুই মনে ছিল যে ডিনা’র কাঁধে ভর দিয়ে আমি বসার ঘরের সোফায় লম্বা হচ্ছি। তারপর অন্ধকার।
