Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

একুশ – সতেরো নম্বর খুন

স্বপ্ন দেখছিলাম। দেখছিলাম, আমি বাল্টিমোরের হারলেম পার্কে ফোয়ারার সামনে একটা বেঞ্চে বসে আছি। আমার পাশে এক মহিলা বসে আছেন, তবে তাঁর মুখে একটা পর্দা ছিল। আমি মহিলার সঙ্গেই ওখানে এসেছিলাম। আমি তাঁকে চিনি, বেশ ভালোভাবেই চিনি। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁর নামটা কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না। আবার ওই পর্দার জন্য তাঁকে চিনতেও পারছিলাম না!

আমার মনে হচ্ছিল, যদি আমি ওঁর সঙ্গে কথা বলি তাহলে মহিলার নামটা আমার মনে পড়বে। কিন্তু আমার এত লজ্জা করছিল যে অনেকক্ষণ ভেবেও বলার মতো কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শেষে আমি মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, উনি ক্যারোল টি হ্যারিস নামে কাউকে চেনেন কি না। মহিলা উত্তর দিলেন, কিন্তু ফোয়ারার জলের তোড়ে তাঁর গলা চাপা পড়ে গেল। আমি কিচ্ছু শুনতে পেলাম না।

এডমন্ডসন অ্যাভিনিউ দিয়ে দমকলের গাড়িগুলো সাইরেন বাজিয়ে গেল। মহিলা তাদের পিছু পিছু দৌড়োলেন। সেই সময় মহিলা ‘আগুন! আগুন!’ বলে চেঁচাচ্ছিলেন। গলার আওয়াজ শুনে আমি মহিলাকে চিনতে পারলাম। মহিলার পেছনে আমিও ছুটলাম। কিন্তু আমার দেরি হয়ে গেছিল। রাস্তায় পৌঁছে দমকলের গাড়ি বা মহিলা, কাউকেই দেখতে পেলাম না।

আমি মহিলার সন্ধানে হাঁটতে লাগলাম। আমি কি হাজার বছর ধরে পথ হাঁটছিলাম? জানি না। তবে আমেরিকার বোধ হয় অর্ধেক রাস্তা আমি হেঁটে ফেললাম মহিলার সন্ধানে। জ্যাকসনভিলের ভিক্টোরিয়া স্ট্রিটে আমি মহিলার গলা শুনলাম, কিন্তু তাঁকে দেখতে পেলাম না। আমি আবার হাঁটতে শুরু করলাম। মহিলা কাউকে ডাকছিলেন। আমাকে নয়, অন্য কাউকে। কিন্তু মুশকিল হল, আমি যেদিকে যত দূরেই যাই না কেন, ওই আওয়াজটা একই দূরত্বে থেকে যাচ্ছিল। তারপর সব চুপ হয়ে গেল।

ক্লান্ত আর হতাশ হয়ে আমি নর্থ ক্যারোলিনার হোটেল মাউন্টে গেলাম বিশ্রাম নিতে। হোটেলটা রেল স্টেশনের দিকে মুখ করা। আমি যখন লবিতে বসে ছিলাম তখন দেখলাম, একটা ট্রেন এল। মহিলা তার থেকে নেমে লবিতে এসে আমাকে চুমু খেতে শুরু করলেন। আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল, কারণ আশেপাশে সবাই আমাদের দেখছিল আর হাসছিল।

ওই স্বপ্নটা ওখানেই শেষ হয়ে গেল।

পরের স্বপ্নে দেখলাম, আমি একটা অচেনা শহরে এসে গেছি। একটা লোককে খুঁজছি আমি। এমন একটা লোক, যাকে আমি ঘেন্না করি। আমার পকেটে একটা ছুরি আছে। ওটা দিয়ে লোকটাকে মারব বলে আমি লোকটাকে খুঁজছি। রোববারের সকাল। আশেপাশের সবকটা গির্জায় ঘণ্টা বাজছে। রাস্তায় ভিড়। আমি হেঁটেই চলেছি। হঠাৎ ওই লোকটা, মানে যাকে আমি মারতে চেয়েছি, চিৎকার করে আমায় ডাকল।

ঘুরে দাঁড়াতেই বেঁটে, তামাটে রঙের লোকটাকে দেখতে পেলাম। আমি পকেট থেকে ছুরি বের করে ওর দিকে ছুটে গেলাম। রাস্তায় দারুণ ভিড় ছিল। সেই ভিড়ে যাদের আমি ধাক্কা মেরে সরাচ্ছিলাম তাদের কাঁধ আর মাথাগুলো কি আলাদা ছিল? বোধ হয়। রাস্তা পার হয়ে দেখলাম, লোকটা একটা লম্বা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। ওর পেছন পেছন বোধ হয় মাইলখানেক চড়ার পর লোকটাকে আমি হাতের নাগালে পেলাম। কিন্তু ততক্ষণে লোকটা ছাদের এক ধারে পৌঁছে গেছে। আমি লোকটার চুলের মুঠি ধরার চেষ্টা করলাম, কিন্তু… কিন্তু দেখলাম, ওর মাথাটা একদম ডিমের মতো মসৃণ! মাথাটা এক হাতে চেপে ধরে আমি পকেট থেকে ছুরি বের করলাম। আর তারপরেই বুঝলাম… লোকটার সঙ্গে আমিও ছাদ থেকে নীচে পড়ছি! সেখানে লাখো মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে আমাদের পড়ে যাওয়া দেখছে।

চোখ খুলে বুঝলাম, সকালের রোদ পর্দার মধ্য দিয়ে ঢুকে একটা ম্লান আলোয় ভরিয়ে রেখেছে ঘরটাকে। আমি খাওয়ার ঘরের মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে আছি। আমার বাঁ-হাতটা বালিশ করে শুয়ে ছিলাম এতক্ষণ। আমার ডান হাত লম্বা করে বাড়ানো ছিল। তাতে ডিনা ব্র্যান্ডের বরফ ভাঙার শিকের নীল-সাদা হাতলটা ধরা ছিল। শিকের ছ-ইঞ্চি লম্বা ধারালো মাথাটা ডিনা-র বুকের বাঁদিকে ঢুকে ছিল।

ডিনা চিত হয়ে শুয়ে ছিল। ওর লম্বা, মজবুত পা-জোড়া কিচেনের দিকে টান টান করা ছিল। ওর ডান দিকের মোজায় একটা জায়গায় সেলাই খুলে গেছে, এটা ওই অবস্থাতেও আমার নজর এড়াল না।

আমি খুব সাবধানে, পাছে ডিনা-র ঘুম ভেঙে যায় এইভাবে শিকের হাতলটা ছেড়ে দিলাম। তারপর উঠে দাঁড়ালাম। আমার চোখ জ্বালা করছিল। গলা আর মুখ দুটোই গরম আর ভারী ঠেকছিল। আমি আগে কিচেনে গেলাম। জিনের একটা বোতল খুঁজে বের করলাম। তারপর দম নেওয়ার মতো বাতাসের ঘাটতি না হওয়া অবধি ওটা মুখে উপুড় করে রাখলাম। কিচেনের ঘড়িতে দেখলাম, সকাল সাতটা একচল্লিশ।

জিন আমাকে একটু হলেও কাজ করার মতো অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছিল। আমি খাওয়ার ঘরে ফিরে সবকটা লাইট জ্বালিয়ে ডিনাকে দেখলাম। খুব বেশি রক্ত পড়েনি। শিকটা যেখানে ডিনা’র শরীরে ঢুকেছে, সেখানে ওর নীলরঙা সিল্ক ড্রেসে একটা মেডেলের মাপে লাল দাগ তৈরি হয়েছে, ব্যস। ওর ডান গালে একটা মারের দাগ রয়েছে। আরেকটা দাগ, আঙুলের ছাপ, রয়েছে ওর ডান হাতের কবজিতে। ওর দু-হাতে কিচ্ছু নেই। সাবধানে শরীরটা নড়িয়ে বুঝলাম, ওর নীচেও কিছু নেই।

ঘরটা খুঁটিয়ে দেখেও আগের রাতের তুলনায় তেমন কোনো পরিবর্তন দেখতে পেলাম না। কিচেনেও একই ব্যাপার। পেছনের দরজাটা দেখলাম তালাবন্ধই আছে। সামনের দরজা দেখেও তাতে জোর করে তালা খোলা হয়েছিল এমন কোনো চিহ্ন পেলাম না। বাড়িটা আপাদমস্তক খুঁজে দেখেও আমি সেখানে কিচ্ছু দেখলাম না যা থেকে এই খুনটার ব্যাপারে কিছু বোঝা যায়। ডিনা-র গয়নাগাটি, এমনকী ওর হ্যান্ডব্যাগে চারশো ডলার, কিচ্ছুটি ধরা হয়নি। বাধ্য হয়ে আমি খাওয়ার ঘরে ফিরে এলাম।

আমি সযত্নে শিকের হাতল থেকে নিজের হাতের ছাপ মুছলাম। তারপর গ্লাস, টেবিল, চেয়ার, বোতল, দরজার হাতল থেকে শুরু করে যেখানে আমার হাত লেগে থাকতে পারে এমন সব জায়গা মুছে সাফ করলাম। দেখে নিলাম, আমার জামাকাপড়ে কোথাও রক্তের দাগ লেগেছে কি না। দেখে নিলাম, আমার কিছু রয়ে গেল কি না। তারপর দরজা খুলে, হাতলটা মুছে দরজা বন্ধ করে চলে গেলাম। তারপর কিছুটা দূরে গিয়ে রাস্তায় একটা ওষুধের দোকান থেকে ডিক ফোলিকে ফোন করে আমার হোটেলে আসতে বললাম। ও যতক্ষণে এল ততক্ষণে আমিও ঘরে পৌঁছে গেছি।

‘ডিনা ব্র্যান্ড কাল রাতে বা আজ ভোরে খুন হয়েছে।’ আমি বললাম, ‘বরফ ভাঙার একটা শিক ওর বুকে বিঁধিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ খুনটা সম্বন্ধে এখনও কিছু জানে না। আমি ওর সম্বন্ধে তোমাদের যতটুকু বলেছি তাতে বুঝতেই পারছ, ওকে মারতে চায় এমন লোকের সংখ্যার নেহাত কম ছিল না। এদের মধ্যে তিনজনের সম্বন্ধে একটু খোঁজখবর নিতে হবে— হুইস্পার, ড্যান রল্্ফ, আর বিল কুইন্ট, মানে বিপ্লবী নেতা। এদের মধ্যে রল্্ফ এখনও হাসপাতালে আছে, তবে কোন হাসপাতাল তা জানি না। মিকি এখনও পিট দ্য ফিনের পেছনে লেগে আছে। ওকে ওখান থেকে ছাড়ান দিয়ে তোমার সঙ্গে নাও, যাতে কাল রাতে এই তিনজন কোথায় ছিল সেটা জানা যায়।’

ফোলি আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ও কিছু একটা বলা শুরু করল, তারপর স্রেফ ‘ঠিকাছে!’ বলে বেরিয়ে গেল।

আমি রেনো স্টার্কির সন্ধানে বেরোলাম। ঘণ্টাখানেক খোঁজাখুঁজির পর একটা ফোন নম্বর পাওয়া গেল। সেটায় ফোন করলাম। রেনোই ধরল। আমি বললাম, ওর সঙ্গে দেখা করতে চাই।

‘একা?’ রেনো জানতে চাইল। ইতিবাচক উত্তর পেয়ে ও আমাকে নির্দেশ দিল। সেইমতো শহরের একেবারে শেষ মাথায় গিয়ে একটা ম্যাড়মেড়ে বাড়িতে পৌঁছোলাম। বাড়িটার সামনে দু-জন, আর উলটোদিকের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আরও দু-জন বাহুবলী এলাকা পর্যবেক্ষণ করছিল। আমি বেল বাজানোর পর দরজাও খুলল ওরকমই আরেকজন। সে আমাকে দোতলায় একটা ঘরে নিয়ে গেল। রেনো স্টার্কি সেখানেই বসে ছিল।

আমার এসকর্ট বিদায় হওয়ার পর আমি রেনোকে সোজাসুজি কথাগুলো বললাম।

‘আমার একটা অ্যালিবাই লাগবে। কাল রাতে আমি বেরিয়ে আসার পর ডিনা ব্র্যান্ড খুন হয়েছে। এমনিতে এই খুনের দায় আমার ঘাড়ে চাপার কথা নয়। কিন্তু নুনান মারা যাওয়ার পর এখানকার পুলিশ আমাকে কী চোখে দেখছে, আমি জানি না। তাই আমি কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছি না। দরকার হলে আমি প্রমাণ করতে পারি আমি কাল রাতে কোথায় ছিলাম। কিন্তু যদি আপনিই আমাকে সেই অ্যালিবাইটা জোগাড় করে দেন, তাহলে আমার সুবিধা হয়।’

রেনো ভোঁতা চোখে আমাকে দেখল, তারপর বলল, ‘আমার কাছে এলেন কেন?’

‘আপনি কাল রাতে আমার সঙ্গে যখন কথা বলেছিলেন তখন আমি ডিনা-র বাড়িতে ছিলাম। শুধু আপনিই জানেন, কাল রাতের অন্তত অর্ধেকটা সময় আমি কোথায় ছিলাম। আমি অন্য কোথাও একটা অ্যালিবাই জোগাড় করলেও আপনার সঙ্গে কথা না বললে সেটাও দাঁড়াবে না, তাই না?’

‘আপনি ওকে মারেননি তো?’ রেনো আলগাভাবে জানতে চাইল। আমিও আলগাভাবে ‘না’ বললাম।

রেনো জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি, এমনটা আপনার হঠাৎ মনে হল কেন? কাল উইলসনের ওখানে আপনি তো আমাকেও ফাঁসিয়েছেন।’

‘আমি আপনাকে আদৌ ফাঁসাইনি।’ আমি বললাম, ‘ওখানে যা যা বলা হয়েছে তার বেশিরভাগটাই সবাই জানত। ওটুকু দুয়ে দুয়ে চার হুইস্পার নিজে থেকেই করে নিত। আমি সেটাকে একটু তাড়াতাড়ি করে দিয়েছি শুধু। কিন্তু তাতে আপনার কী আসে যায়? আপনি নিজের খেয়াল ভালোই রাখতে পারেন।’

‘চেষ্টা করি, এই আর কি।’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল রেনো, ‘আচ্ছা বেশ। কাল রাতে আপনি ট্যানার হাউসে ছিলেন। পাহাড়ের রাস্তায় তেইশ মাইল গেলে একটা হোটেল আছে, ওটাই ট্যানার হাউস। রিকার বলে একটা ছেলে মারি-র ওখানে আড্ডা মারে। কাল উইলসনের বাড়ি থেকে বেরোনোর পর আপনাকে ওই ট্যানার হাউসে নিয়ে গেছিল। আবার ও-ই আপনাকে ফেরত এনেছে শহরে। ওখানে আপনি কী করতে গেছিলেন সেটা ভেবে রাখবেন। আর এখানে সই করে দিন, ওখানের রেজিস্টারে সেটা বসাতে হবে।’

আমি রেনোকে ধন্যবাদ জানিয়ে পেন বের করলাম।

‘ধন্যবাদ দিয়ে লাভ নেই।’ রেনো বলল, ‘এখন আমার বন্ধু দরকার। পিট আর হুইস্পারের সঙ্গে আমার বোঝাপড়ায় আপনি আমার বিরুদ্ধে থাকলে চলবে না।’

‘থাকব না।’ আমি কথা দিলাম, ‘পুলিশ চিফ কে হচ্ছে?’

‘ম্যাকগ্র আপাতত কাজটা দেখছে। ওই হবে।’

‘ওর ভূমিকা কী হবে?’

‘ও পিটের হয়ে কাজ করবে। শহরে খুনখারাপি হলে পিটের ব্যাবসা লাটে উঠবে। তাই ও আমাদের দু-জনের বিরুদ্ধেই লোকজন নামাবে। কিন্তু সেই ভেবে বসে থাকলে আমার চলবে না। হুইস্পার আর আমার ব্যাপারটা এবার এসপার-ওসপার করেই ছাড়তে হবে। আপনার কী মনে হয়? ডিনা-কে ও-ই মেরেছে?’

‘মারতেই পারে।’ আমিও ওই কথাটাই ভাবার চেষ্টা করছিলাম, ‘ডিনা ওকে ভালোরকম বিপদে ফেলেছিল। একবার নয়, বেশ কয়েকবার।’

‘আপনি আর ডিনা তো এই ক-দিনেই বেশ…’ রেনো বলল। আমি কথার উত্তর না দিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। রেনো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আপনি রিকারের সঙ্গে দেখা করুন। তাহলে ও আপনার বর্ণনা পুলিশকে দিয়ে লিফট দেওয়ার কথাটা বলতে পারবে।’

একটা কমবয়সি ছেলে ঘরে এল। ‘হ্যাংক ও’মারা।’ রেনো ছেলেটার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিল। আমি ছেলেটা আর রেনোর সঙ্গে করমর্দন করে বেরোলাম। তার আগে জানতে চাইলাম, রেনোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে কীভাবে করব।

‘আপনি পিক মারি-র ওখানে খবর দিয়ে দেবেন।’ রেনো বলল, ‘আমি খবর পেয়ে যাব। আপাতত এখানে আর নয়।’

আমি বেরিয়ে পড়লাম।