বাইশ – সুলুকসন্ধান
আমি সোজা পুলিশের সদর দফতরে হানা দিলাম। চিফের ডেস্কে বসে ম্যাকগ্র ভ্রূকুটিকুটিল চোখে আমাকে মাপল। দেখলাম ওর মুখের চামড়ায় ভাঁজগুলো আরও গভীর হয়ে গেছে।
‘আপনি ডিনা ব্র্যান্ডকে শেষ কখন দেখেছিলেন?’ ম্যাকগ্র সোজা কাজের কথায় এল।
‘কাল রাত দশটা চল্লিশ নাগাদ।’ আমি বললাম, ‘কেন?’
‘কোথায়?’
‘ওর বাড়িতে।’
‘ওখানে কতক্ষণ ছিলেন?’
‘দশ মিনিট, পনেরোও হতে পারে।’
‘কেন?’
‘কেন মানে?’
‘তার থেকে বেশিক্ষণ থাকেননি কেন?’
‘তাতে…’ ও আমাকে বসতে না বললেও একটা চেয়ার টেনে নিয়ে গুছিয়ে বসলাম, ‘আপনার কী?’
আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দম নিয়ে নিল ম্যাকগ্র। তারপর চিৎকার করে বলল, ‘খুন!’
আমি হেসে বললাম, ‘আপনি কি নুনানের খুনে ওর হাত দেখছেন?’
ম্যাকগ্র আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। পোড়খাওয়া পুলিশেরা শরীরের ভাষা পড়তে পারে। তাই সিগারেট খেতে ইচ্ছে হলেও আমি খাচ্ছিলাম না। বরং গ্যাঁট হয়ে বসে আমি সরল মুখে ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।
বেশ কিছুক্ষণ আমার চোখ-মুখে খানাতল্লাশি করেও যখন কিছু পাওয়া গেল না, তখন ম্যাকগ্র জানতে চাইল, ‘কেন নয়?’
আমি বুঝলাম, প্রথম রাউন্ডে জিতে গেছি। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ওকে একটা দিলাম, নিজেও একটা ধরিয়ে বললাম, ‘আমার ধারণা, খুনটা হুইস্পার করেছে।’
‘হুইস্পার ওখানে ছিল?’ ম্যাকগ্র’র গলা শুনে বুঝলাম, মাছ টোপ গিলেছে।
‘কোথায়?’
‘ব্র্যান্ডের বাড়িতে?’
‘না।’ আমি ভ্রূ কুঁচকে বললাম, ‘কিন্তু ও সেখানে থাকবেই-বা কেন? ও নির্ঘাত তখন নুনানকে…’
‘নিকুচি করেছে নুনানের!’ গর্জে উঠল ম্যাকগ্র, ‘আপনি সব কথায় নুনানকে টানছেন কেন?’
আমি ম্যাকগ্রর দিকে এমন করে তাকালাম যেন শতাব্দীর সবচেয়ে অর্থহীন কথাটা ও বলে ফেলেছে। বাধ্য হয়ে ম্যাকগ্র বলল, ‘ডিনা ব্র্যান্ড কাল রাতে খুন হয়েছে।’
‘তাই নাকি?’ আমি জানতে চাইলাম।
‘এবার তাহলে আমার প্রশ্নের উত্তরগুলো দেবেন?’
‘অবশ্যই। আমি উইলসনের ওখানে ছিলাম। নুনান আর … বাকিরাও ওখানে ছিল। ওখান থেকে বেরিয়ে সাড়ে দশটা নাগাদ আমি ডিনা-র বাড়ি যাই। আমি ট্যানারের হোটেলে চলে যাচ্ছি, এই কথাটা ওকে জানানো দরকার ছিল। আমি ওর বাড়িতে দশ বা পনেরো মিনিট মতো ছিলাম, যতটা সময়ে একবার গ্লাস খালি করা যায়। তখন ওখানে আর কেউ ছিল না। অন্তত আমি আর কাউকে দেখিনি ওখানে।
কিন্তু ও কখন খুন হল? কীভাবেই-বা হল খুনটা?’
ম্যাকগ্র জানাল, ও সেদিন সকালে দু-জন ডিটেকটিভকে ডিনার সঙ্গে কথা বলার জন্য পাঠিয়েছিল। ও চাইছিল, যদি কোনোভাবে ডিনার কথার ভিত্তিতে হুইস্পারকে নুনানের খুনের জন্য ধরা যায়। শেপ আর ভ্যানামান নামের সেই দু-জন সকাল সাড়ে ন-টায় ডিনা-র বাড়ি পৌঁছোয়। কলিং বেল বাজালেও কেউ এসে দরজা খোলেনি। সদর দরজা খোলা ছিল। ওরা বাড়িতে ঢুকে দেখে, মেয়েটা খাওয়ার ঘরের মেঝেতে চিত হয়ে পড়ে আছে। মৃত। বুকে একটা ধারালো জিনিস ঢুকে যাওয়ার ক্ষত ছিল।
ডাক্তার দেহ পরীক্ষা করে জানায়, ডিনা রাত তিনটে নাগাদ খুন হয়েছে। অস্ত্র হিসেবে একটা সরু, গোল মুখের কিন্তু ধারালো, ইঞ্চি ছয়েক লম্বা কিছু ব্যবহার করা হয়েছিল। বাড়ির প্রতিটি আসবাব লণ্ডভণ্ড করা হয়েছে। মেয়েটির হ্যান্ডব্যাগে টাকাপয়সা কিচ্ছু পাওয়া যায়নি। ওর ড্রেসিং টেবিলে রাখা গয়নার বাক্সটা ফাঁকা ছিল। মেয়েটার হাতের আঙুলে দুটো হিরের আংটি ছিল।
পুলিশ এখনও খুনের অস্ত্রটা খুঁজে পায়নি। হাতের ছাপ পাওয়া যায়নি। কিচেনে রাখা গ্লাস থেকে মনে হয়েছে, মেয়েটি এক বা একাধিক লোকের সঙ্গে সেই রাতে ড্রিঙ্ক করেছিল।
‘সরু, গোল মুখের কিন্তু ধারালো, ইঞ্চি ছয়েক লম্বা কিছু…’ আমি বিবরণটা আরেকবার আওড়ালাম, ‘শুনে বরফ ভাঙার শিকটার কথা মনে পড়ছে।’
ম্যাকগ্র ফোন করে দুই ডিটেকটিভকে ডেকে পাঠাল। আমার সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর আমি ওদের শিকটার কথা বললাম। দু-জনেই জোর গলায় বলল, ওটা বাড়িতে পাওয়া যায়নি।
‘কাল রাতে ওটা ছিল?’ ম্যাকগ্র জানতে চাইছিল।
‘আমার সামনেই ওটা দিয়ে ডিনা বরফ ভেঙে গ্লাসে দিয়েছিল।’ আমি বললাম।
ম্যাকগ্র ওদের শিকটা নতুন করে খুঁজতে বলে বিদায় করল। তারপর আমাকে বলল, ‘আপনি মেয়েটাকে চিনতেন। আপনার কী মনে হয়? খুনটা কে করেছে?’
‘এখনও কিছু মাথায় আসছে না।’ আমি প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলাম, ‘একটু ভাবতে হবে। আপনার কী মনে হয়?’
‘আমার আবার কী মনে হবে?’ গজগজ করল ম্যাকগ্র। ওর আর কোনো প্রশ্ন নেই দেখে আমি বেরিয়ে এলাম। মনে হল, ও ঠিক করেই ফেলেছে যে এই খুনটাও হুইস্পার করেছে। সেই ভেবে পয়জনভিলের পুলিশ হুইস্পারকে ধরলে সেটা ন্যায়বিচার হবে না হয়তো। তবে নুনানকে যে হুইস্পারই খুন করিয়েছে এটা নিয়ে কারো মনে কোনো সংশয় নেই। খুন একটাই হোক বা দুটো, ফাঁসি হুইস্পারের একবারই হবে।
ম্যাকগ্র-র ঘর থেকে বেরিয়ে এসে করিডোর পার হতে গিয়ে প্রচুর লোক দেখলাম। তাদের মধ্যে অনেকেই একেবারে কমবয়সি, বাচ্চাই বলা চলে। বেশ ক’জনকে দেখে বিদেশি মনে হল। তবে সব্বাইকে দেখেই একেবারে পোড়খাওয়া লোক মনে হল। রাস্তায় বেরোনোর মুখে আমার সঙ্গে ডোনার নামে এক ডিটেকটিভের দেখা হল। ডোনার আমার সঙ্গে সেডার হিল অভিযানে ছিল বলেই ওর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল।
‘কী খবর?’ আমি জানতে চাইলাম, ‘এরা কারা?’
‘এরা আমাদের স্পেশাল ফোর্স।’ নির্বিকার মুখে বলল ডোনার, ‘পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে শহরে। যা দিনকাল!’
ওকে অভিনন্দন জানিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম। মারি’জ-এ গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই মারি আমার কাছে এল।
‘যদি এর মধ্যে রেনোর সঙ্গে দেখা হয়,’ আমি বললাম, ‘ওকে একটা কথা বলে দেবেন। পিট দ্য ফিন ওর লোকেদের পুলিশে স্পেশাল ফোর্স হিসেবে ঢুকিয়ে দিয়েছে।’
‘দেখা হতে পারে।’ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল মারি।
হোটেলে গিয়ে দেখি মিকি লিনেহান আমার জন্য বসে আছে। ঘরে ঢুকেই ও মুখ খুলল।
‘তোমার ড্যান রল্্ফ কাল মাঝরাতের পর কোনো এক সময়ে হাসপাতাল থেকে কেটে পড়েছে। পুলিশের লোকজন এতে রেগে আগুন হয়ে আছে। ওদের প্ল্যান ছিল আজ ওর ওপর নরম-গরম মালিশের ব্যবস্থা করে ওর কাছ থেকে কিছু খবর বের করা। এখন আর সেসব…
হুইস্পার কোথায় আছে, আমরা জানতে পারিনি। ডিক বিল কুইন্টের খবর নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ডিনা বলে মেয়েটার খুন নিয়ে কী-সব শুনছি? ডিক বলছিল, তুমি নাকি পুলিশেরও আগে ব্যাপারটা জেনেছিলে?’
‘আমি…’ আর কিছু বলার আগেই ফোন বাজল। ওপাশ থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ খুব স্পষ্ট উচ্চারণে আমার নাম বলে শেষে একটা প্রশ্নচিহ্ন গুঁজে দিল।
‘হ্যাঁ।’ বললাম আমি।
‘আমি চার্লস প্রক্টর ডন বলছি।’ গলাটা বলে চলল, ‘আমার ধারণা, আমার সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব দেখা হলে আপনার পক্ষে সেটা ভালো হবে।’
‘তাই নাকি? আপনি কে?’
‘আমি একজন অ্যাটর্নি। আমি ৩১০ গ্রিন স্ট্রিটের রুটলেজ ব্লকে আছি। আমার সঙ্গে দেখা করলে আপনি জানতে পারবেন…’
‘কী জানতে পারব সেটা নিয়ে একটু ধারণা দিলে সুবিধা হত।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘ওসব কথা ফোনে বলা যায় না। আপনি দেখা করলেই বুঝবেন।’
‘ঠিক আছে।’ আমি হাল ছেড়ে দিই, ‘আজ বিকেলে আমি আপনার সঙ্গে দেখা করব, যদি সুযোগ পাই।’
‘অবশ্যই করবেন।’ গলাটা বলল, ‘আপনার জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি।’
ফোন রেখে নিজের চেয়ারে ফেরামাত্র মিকি শুরু করল, ‘তুমি বলতে যাচ্ছিলে, কীভাবে তুমি ডিনার খুনের ব্যাপারটা পুলিশের আগে জেনেছ।’
‘উহুঁ।’ আমি বললাম, ‘আমি বলতে যাচ্ছিলাম, ড্যান রলফের যা অবস্থা তাতে ওকে ধরে ফেলাটা কোনো ব্যাপার না। তুমি হারিকেন স্ট্রিটের আশেপাশে একটু খুঁজে দেখো। যদি ওকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া যায়, তাহলে সেটা তো সৎ নাগরিকের কর্তব্যই হবে। তাই না?’
‘ঠিকাছে।’ মিকি মুখজোড়া একটা হাসি উপহার দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বেরোবার আগে বলল, ‘আমাকে কিছু বলার দরকার নেই। আমি তো স্রেফ হুকুমের চাকর।’
মিকি বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি বিছানায় লম্বা হয়ে একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে চললাম। আমি ভাবছিলাম। কাল রাতে আমার মানসিক অবস্থা, প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, তারপরের ওই স্বপ্নগুলো, শেষে যেভাবে ঘুম ভাঙল… ভাবনাগুলো যেদিকে যাচ্ছিল সেটা বড়োই ভয়ংকর। ভাগ্যিস তখনই বাধা পড়ল।
কেউ একজন আমার দরজায় নক করছিল।
আমি দরজা খুললাম। যে লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল তাকে আমি আগে দেখিনি। কমবয়সি, রোগা, একটু উগ্র সাজপোশাক পরা। লোকটা লাজুক স্বভাবের নয়, কিন্তু মুখ-চোখ দেখে ওকে বিলক্ষণ নার্ভাস লাগল।
‘আমি টেড রাইট।’ লোকটা আমার দিকে যেভাবে হাত বাড়িয়ে দিল তাতে মনে হল, আমার বোধ হয় ওর সঙ্গে করমর্দন করে খুশি হওয়া উচিত, ‘হুইস্পার আমার ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলেছে বোধ হয়।’
আমি ওর হাত ঝাঁকালাম। ওকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করলাম। ঘুরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি হুইস্পারের বন্ধু?’
‘একদম জিগরি দোস্ত।’ লোকটা বলল।
আমি কিছু বললাম না। নার্ভাস একটা হাসি মুখে ফুটিয়ে লোকটা ঘরের এদিক-ওদিক দেখল। তারপর বাথরুমের দরজা খুলে ভেতরটা দেখে নিশ্চিন্ত হল যে ওর কথা আর কেউ শুনছে না। ঠোঁট চাটল, তারপর বলল, ‘আপনি চাইলে আমি হাজার ডলার নিয়ে ওকে নিকেশ করে দেব।’
‘হুইস্পারকে?’
‘হ্যাঁ। আর এর চেয়ে ভালো দর আপনি কোত্থাও পাবেন না।’
‘আমি হঠাৎ ওকে খুন করাতে চাইব কেন?’
‘ও আপনার বান্ধবীকে মেরেছে, তাই না?’
‘তাই নাকি?’
‘বোকা সাজবেন না!’
আমার মাথায় একটা ধারণা জমাট বাঁধতে শুরু করল। একটু সময় নেওয়ার জন্য আমি বললাম, ‘আপনি বসুন। এসব কথা একটু ধীরেসুস্থে হওয়া দরকার।’
‘তার কোনো দরকার নেই।’ লোকটা দাঁড়িয়েই বলল, ‘আপনি হয় ওকে খুন করাতে চান, নইলে চান না।’
‘তাহলে… চাই না।’
লোকটা গলার ভেতরে কী বলল শুনতে পেলাম না। কিন্তু ও দরজা অবধি পৌঁছোনোর আগে আমি ওকে আটকালাম।
‘তাহলে হুইস্পার শেষ?’
লোকটা এক পা পিছিয়ে পিঠের দিকে হাত বাড়াল। আমি ওর চোয়ালে সপাটে এক ঘা দিলাম। লোকটা সোজা ভূমিশয্যা নিল। আমি লোকটার কবজি ধরে ওকে টেনে তুললাম। ওর মুখের কাছে নিজের মুখ নিয়ে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, ‘কেসটা কী, ওস্তাদ? বলে ফেলো ঝটপট। আমার ধৈর্য কম।’
‘আমি আপনার কিচ্ছু করিনি!’
‘সে গল্প পরে হবে। হুইস্পারকে কে মারল?’
‘আমি কিচ্ছু জানি না! সত্যি…’
আমি লোকটার এক হাত ছেড়ে এক গালে থাপ্পড় মারলাম। তারপর অন্য হাত ছেড়ে অন্য গালে। যখন দু-গাল একসঙ্গে চড়ানোর কথা ভাবছি তখন লোকটা প্রায় ডুকরে উঠল।
‘ড্যান রল্্ফ! ও হুইস্পারের একদম কাছে গিয়ে ওকে সেটা দিয়েই মারল, যা দিয়ে হুইস্পার মেয়েটাকে মেরেছিল।’
‘ওটা দিয়েই হুইস্পার মেয়েটাকে মেরেছিল, এটা কী করে বুঝলে?’
‘ড্যান সেটাই বলছিল তো!’
‘আর হুইস্পার কী বলছিল?’
‘কিচ্ছু না। ওকে দেখে মনে হল, ও ভীষণ অবাক হয়েছে। ওকে দেখে হাসিই পাচ্ছিল। পিঠ থেকে ওই শিকটা বেরিয়ে ছিল তো! ড্যানকেও দেখে হাস্যকর লাগছিল। সারা মাথায় ব্যান্ডেজ। গায়েও! সেগুলো সব রক্তে মাখামাখি। তারপরেই হুইস্পার বন্দুক বের করে ড্যানের গায়ে দুটো দানা ভরে দিল। তারপর দু-জনেই পড়ে গেল।’
‘তারপর?’
‘তারপর আর কী? আমি দু’জনের বডিই নাড়িয়েচাড়িয়ে দেখলাম। দু’জনেই গেছে!’
‘ওখানে আর কে ছিল?’
‘কেউ না। সত্যি বলছি। হুইস্পার লুকিয়ে ছিল। খুব কম লোক, মানে হুইস্পারের খাস দোস্ত ছাড়া ওর ওই ডেরাটার কথা কেউ জানে না। আমি ওর হয়ে দলের লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলাম। নুনানকে ও নিজে হাতে মেরেছিল। তাই ও অন্তত কয়েকদিনের জন্য সবার নাগালের বাইরে থাকতে চেয়েছিল। ওখানে শুধু আমি ছিলাম।’
‘তাই তুমি, বুদ্ধিমান লোকের মতো, এই সুযোগে হুইস্পারের শত্রুদের কাছ থেকে পয়সা বাগানোর তালে ছিলে?’
‘আমি কিচ্ছু করিনি! তা ছাড়া হুইস্পারের বন্ধুদের পক্ষে এখন এই শহরে থাকাটা নেহাত বিপজ্জনক।’ লোকটা কুঁই কুঁই করল, ‘আমাকে তো পালানোর রসদটুকু জোটাতে হবে, নাকি?’
‘তা, কত কামালে এখন অবধি?’
‘আমি পিটের কাছ থেকে এক-শো পেয়েছি। পিক মারি রেনোর হয়ে দেড়শো দিয়েছে। দু’জনেই বলেছে, কাজ হয়ে যাওয়ার পর আরও দেবে!’ লোকটার গলায় দম্ভ ফুটে উঠল, ‘আমি ম্যাকগ্র’র কাছ থেকেও কিছু বাগাতে পারব। আপনার কাছ থেকেও অন্তত পঞ্চাশ ডলার পাব ভেবেছিলাম।’
‘বাব্বা! এই রেটে লোকজন টাকা ওড়াচ্ছে? তাও আবার এমন একটা ফালতু…’
‘অত ফালতু নয় কিন্তু।’ লোকটার গলাটা আবার স্বাভাবিক হল, ‘আমাকে একটা সুযোগ দিন, স্যার। আপনি এটা দয়া করে কাউকে বলবেন না। আমি আপনাকে পঞ্চাশ ডলার এখনই দিচ্ছি। ম্যাকগ্রর থেকে আমি যা পাব, তার থেকেও আপনাকে ভাগ দেব। আপনি শুধু আমাকে কামিয়ে নেওয়ার সুযোগটা দিন।’
‘হুইস্পার কোথায় আছে, এটা তুমি ছাড়া আর কে জানে?’
‘কেউ না! মানে ড্যান ছাড়া, তবে ও তো…!’
‘কোথায় আছে ওরা?’
‘পোর্টার স্ট্রিটের পুরোনো গুদাম, রেডম্যান হাউসে। পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে দোতলায়। ওই ঘরটায় একটা বিছানা, স্টোভ, কিছু খাবার– এটাই ছিল হুইস্পারের থাকার জায়গা। আপনি পঞ্চাশ ডলার নিয়ে আমাকে যেতে দিন, প্লিজ।’
‘টাকা লাগবে না।’ আমি লোকটার কবজি ছেড়ে দিলাম, ‘তোমাকে ঘণ্টাদুয়েক সময় দিলাম। তারপর আমি মুখ খুলব।’
‘তাতেই হবে স্যার!’ লোকটা দরজা খুলে প্রায় দৌড়োল।
আমি কোট আর টুপি চড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গ্রিন স্ট্রিট খুঁজে সেখানে রুটলেজ ব্লক বের করতে সময় লাগল না। পুরোনো, মলিন একটা বাড়ি। তিনতলায় একটা সুট চার্লস প্রক্টর ডন ভাড়া নিয়েছিলেন। আমি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় গেলাম। সুট মানে দুটো ছোটো ছোটো, নোংরা, প্রায়ান্ধকার ঘর। আমি বাইরের ঘরে বসলাম। একজন ক্লার্ক আমার নাম লেখা কাগজ নিয়ে ভেতরে গেল। আধ মিনিটের মধ্যে আমার ডাক পড়ল।
মিস্টার চার্লস প্রক্টর ডনের বয়স বছর পঞ্চাশ হবে। ভদ্রলোক বেঁটে এবং মোটা। মাংসল মুখ, ভোঁতা নাক, ঝুঁপো গোঁফের আড়ালে পুরু ঠোঁট, একটা অযত্নলালিত দাড়ি, গাঢ় রঙের পোশাক– এসবের চেয়েও বেশি করে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল দুটো জিনিস। এক, ভদ্রলোকের হালকা রঙের চোখের লুব্ধ দৃষ্টি। দুই, উনি আমাকে স্বাগত জানাতে উঠে দাঁড়াননি, বরং আমার সঙ্গে কথা বলার পুরো সময়টা ওঁর ডান হাত ডান দিকের একটা আধখোলা দেরাজে রাখা ছিল।
‘যাক।’ ফোনে যেমন শুনেছিলাম তার চেয়েও বেশি সাজিয়ে-গুছিয়ে বললেন ভদ্রলোক, ‘আমার সঙ্গে দেখা করার মতো সুবুদ্ধি আপনি দেখিয়েছেন দেখে বড়োই খুশি হলাম।’
আমি কিছু বললাম না। তাতেও ভদ্রলোক যেভাবে মাথা নাড়লেন তাতে এটাই মনে হয় যে মুখ বন্ধ রেখে আমি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছি।
‘আপনি জানবেন, আমার পরামর্শ মানাই এই মুহূর্তে আপনার পক্ষে সবচেয়ে জরুরি। কথাটা আমি কোনো অনাবশ্যক দম্ভের বশে বলছি না। বরং বাস্তব পরিস্থিতিকে আমি যেভাবে দেখছি তাতে এটাই আপনার পক্ষে শুধু সবচেয়ে ভালো নয়, বরং একমাত্র রাস্তা।’
ভদ্রলোক এই মর্মে প্রচুর বকলেন। আমি সুযোগ পেয়ে জানতে চাইলাম, ‘এতে খরচাপাতি কীরকম?’
‘ওটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।’ ভদ্রলোক চরম ঔদার্য দেখালেন, ‘তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝলে আপনি হয়তো হাজার ডলারের কম কিছু দিতে চাইবেন না।’
আমি বললাম, ওই পরিমাণ টাকা আমার সঙ্গে নেই। তাতে একই ভঙ্গিতে ভদ্রলোক বললেন, ‘সে তো বটেই। ওটা কোনো ব্যাপার না। কাল সকাল দশটার মধ্যে ওই টাকাটা পেলেই আমার চলবে।’
‘কাল সকাল দশটায়।’ আমিও একমত হলাম, ‘শুধু আমাকে এটুকু বলুন, আমার হঠাৎ একজন ল-ইয়ার নিযুক্ত করার দরকার পড়বে কেন?’
‘এটা পরিহাসের বিষয় নয়।’ নরম গলায় আমাকে শাসালেন ডন। আমি অনেক কষ্টে তাঁকে বোঝালাম, আমি মোটেই ইয়ার্কি মারছি না। তার উত্তরে গম্ভীর গলায় ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনি বোধ হয় নিজের অবস্থাটা নিয়ে তলিয়ে ভাবেননি। অতি সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার ফলে আপনি যে ধরনের আইনি সমস্যায় পড়তে চলেছেন, সেটা আপনি বোঝেননি, এটা পরিষ্কার। আমি গতরাতের কথা বলছি। তবে এখন আর এই নিয়ে আলোচনার অবকাশ নেই। আমাকে জাজ লেফনারের সঙ্গে দেখা করতে হবে। আপনি কাল সকাল দশটায় টাকা নিয়ে আসুন। আমি প্রতিটি খুঁটিনাটি নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করব।’
আমি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেরিয়ে এলাম। হোটেলে নিজের ঘরে ফিরে হুইস্কি গিললাম। মিকি আর ড্যানের রিপোর্টের আশায় বসে রইলাম। হুইস্কির স্বাদ জঘন্য ঠেকল। রিপোর্ট এল না। একরাশ ভাবনায় ডুবে রইলাম। অবশেষে মাঝরাত নাগাদ দু-চোখে ঘুম নামল।
