Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী
0/59
রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

সাতাশ – রেডম্যান হাউস

আমরা রাস্তা ধরে ধীরেসুস্থে এগোচ্ছিলাম। তখন মোটামুটি আলো ফুটেছে। দু-পাশের বাড়িগুলো ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছিল। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর একটা ময়লা লাল রঙের বাড়ি দেখলাম। ধুলো আর আগাছায় ভরা একটা জমির মাঝে দাঁড়িয়ে ছিল বাড়িটা। অযত্ন আর অবহেলার ছাপ ওটার সর্বাঙ্গে লেগে ছিল। মনে হল, লুকিয়ে থাকার আড্ডা হিসেবে এটা আদর্শ জায়গা বটে।

‘সামনের রাস্তার কোণে গাড়িটা দাঁড় করাও।’ আমি মিকিকে বললাম, ‘ওই বাড়িটাই মনে হচ্ছে আমাদের লক্ষ্য। তুমি গাড়িতেই থাকো। আমি জায়গাটা দেখি।’

দুটো ব্লক হাঁটলাম, যাতে পেছন দিক দিয়ে বাড়িটার কাছে যাওয়া যায়। যথাসম্ভব নিঃশব্দে, কিন্তু চোর বলে মনে না হয় এমনভাবে ফাঁকা জায়গাটা পেরোলাম। দরজাটার কাছে এসে হাতল ঘোরালাম। দরজা খুলল না। একটা জানলার কাছে গিয়ে ভেতরটা দেখলাম। অন্ধকার আর ময়লা কাচের জন্য কিচ্ছু চোখে পড়ল না। ওই জানলাটাও খোলা গেল না।

আমি দেওয়াল বরাবর এগোতে লাগলাম। একের পর এক জানলা শুধু বন্ধ না, একেবারে জ্যাম হয়ে আছে। উত্তরদিকের একটা জানলা কিছুটা উঠে গেল আমার চাপে। ওপাশে দেখলাম, কেউ ভেতর থেকে পেরেক দিয়ে তক্তা ঠুকে জানলাটা বন্ধ করে দিয়েছে। মনে হল, বিশাল আওয়াজ না তুলে ওগুলো নড়ানো যাবে না। নিজের পোড়া কপালকে গালাগাল দিতে গিয়ে বোর্ডটায় চাপ দিলাম।

বোর্ডটা নড়ে উঠল।

আমি লড়ে গেলাম। একটু একটু করে বোর্ডটা সরে গেল, বিনা ঝুটঝামেলায়। জানলার ফ্রেম থেকে বেরিয়ে থাকা পেরেকের ঝকঝকে মাথাগুলো দেখতে পেলাম ওই অল্প আলোতেও। তবে অন্ধকার ছাড়া ভেতরে আর কিছু দেখলাম না।

জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকলাম। এক পা হেঁটে আগে জানলা থেকে নিজেকে দূরে সরালাম। তারপর তক্তাটা যথাসাধ্য ঠেকিয়ে রাখলাম, যাতে আমার ঢোকার ব্যাপারটা চট করে বোঝা না যায়। এক মিনিট দম বন্ধ করে থেকেও বাড়িটায় আর কোনো শব্দ শুনতে পেলাম না। বন্দুকটা হাতে ধরেই আমি ইঞ্চি-বাই-ইঞ্চি এগোলাম। পায়ের নীচে মেঝে, আর বাড়ানো হাতের নাগালে ফাঁকা জায়গা ছাড়া কিচ্ছু পাচ্ছিলাম না। অবশেষে আমার হাত একটা রুক্ষ দেওয়ালে লাগল। দেওয়ালটা ধরে ধরে এগোলাম, যতক্ষণ না একটা জানলা পাই।

পেলাম। সেটাতে কান পেতে ভেতরে কোনো শব্দ পেলাম না। হাতড়ে দরজার হাতলটা আবিষ্কার করলাম। হাতল ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকলাম।

‘সাঁই!’ করে একটা আওয়াজ হল। সেটা শোনামাত্র আমি একসঙ্গে চারটে কাজ করলাম।

হাতলটা ছাড়লাম। লাফালাম। বা-হাতে একটা শক্ত কিছুর সঙ্গে সাংঘাতিক জোরে ধাক্কা খেয়ে সেটা প্রায় অসাড় করে ফেললাম। ডান হাত দিয়ে ট্রিগার টিপলাম।

উজ্জ্বল আলো আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিল। কিন্তু আমি কিছু দেখতে পেলাম না। সেটাই হয়, তবে অনেক সময় চোখের ভুল হয়ে মনে হয় যেন অনেক কিছু দেখে ফেলেছি। আর কী করা যেতে পারে সেটা মাথায় না আসায় আমি আরেকবার গুলি চালালাম। তারপর আরেকবার।

‘রক্ষে করো, বাপধন।’ একটা বুড়ো, কাহিল গলায় বলে উঠল অন্ধকারে, ‘আর না!’

‘আলো জ্বালান।’ আমি সংক্ষেপে বললাম।

মেঝের কাছাকাছি একটা দেশলাই জ্বলে উঠল। নিভু নিভু আলোয় একটা বেঁকেচুরে যাওয়া মুখ, আর তারপর পুরো শরীরটা দেখতে পেলাম। বুঝলাম পার্কের বেঞ্চে, রাস্তার পাশের ঝোপে, এমনকী গর্তয় আশ্রয় নিয়ে যারা জীবন কাটায়, সেই প্রজাতির একজনের সঙ্গে মোলাকাত হয়েছে। লোকটা পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসে ছিল। ওর গায়ে কোথাও গুলি লেগেছে বলে মনে হয়নি। ওর হাতের কাছে একটা টেবিলের ভাঙা পায়া পড়ে ছিল।

‘উঠে দাঁড়ান। একটা বড়ো আলোর ব্যবস্থা করুন।’ আমি কেটে কেটে বললাম, ‘সেটা না হওয়া অবধি একটা-না-একটা দেশলাই জ্বালাতে থাকুন।’

লোকটা উঠল। আমার কথামতো কাজ করল। একটা তিনঠেঙে টেবিলের ওপর একটা মোমবাতি একটু পরেই জ্বলে উঠে ঘরটাকে মোটামুটি আলোকিত করল।

আমার হয়তো লোকটাকে কবজায় আনা উচিত ছিল, কিন্তু বাঁ-হাতে তখনও সাড় আসেনি। বন্দুকটা ওর দিকে তাক করেই জানতে চাইলাম, লোকটা এখানে কী করছে। ব্যাখ্যা দিতে অবশ্য বেশি সময় লাগাল না লোকটা। ওকে দু-দিন আগে ইয়েটস নামের কেউ এই বাড়ির পাহারাদার হিসেবে লাগিয়েছে। পাহারা দেওয়ার জিনিস ওই ঘরেই মজুত ছিল। বড়ো বড়ো ক্রেটে ঘরের অর্ধেকটা ভরতি ছিল। সেগুলোর ভেতরে নকল লেবেল লাগানো মদের বোতল থরে থরে সাজানো আছে দেখলাম।

লোকটাকে বন্দুকের আগায় রেখে সারা বাড়ি ঘুরলাম। লাশ-টাশ কিছু পেলাম না। যতক্ষণে আমরা ওই ঘরে ফিরে এলাম ততক্ষণে বাঁ-হাতে সাড় ফিরেছে। একটা দু-নম্বরি মদের বোতলই পকেটে ভরলাম। লোকটাকে বললাম, ‘একটা সৎ পরামর্শ দিই। এখান থেকে কেটে পড়ুন। পিট দ্য ফিন তার লোকেদের পুলিশে ঢোকানোয় যেসব জায়গা খালি হয়েছিল, তারই একটায় আপনি আছেন এখন। পিট খুন হয়েছে। ওর লোকেরা এখন কে কী করবে, কেউই জানে না। এই সময় এমন কাজে থাকা ঠিক না।’

জানলার তক্তা সরিয়ে বেরিয়ে আসতে আসতে দেখলাম, লোকটা লুব্ধ দৃষ্টিতে ক্রেটগুলোর দিকে তাকিয়ে বোতলের সংখ্যা গোনার চেষ্টা করছে।

‘তারপর?’ আমি গাড়ির কাছে পৌঁছোলে মিকি জানতে চাইল। আমি কোনো কথা না বলে ওই নকল মদের বোতলটাই খুলে, নিজে এক ঢোঁক খেয়ে ওকে দিলাম। ও এক চুমুক মেরে আবার বলল, ‘তারপর?’

‘রেডম্যান হাউস খুঁজতে হবে।’ আমি বললাম, ‘চলো।’

‘সত্যি!’ মুখ বেঁকাল মিকি, ‘মাঝেমধ্যে মনে হয়, সবাইকে সব কথা বলতে বলতে তোমার মুখটাই না ক্ষয়ে যায়।’

আরও তিনটে ব্লক পেরোনোর পর আমরা একটা বাড়ির গায়ে ‘রেডম্যান অ্যান্ড কোম্পানি’ লেখা একটা রংচটা সাইনবোর্ড দেখলাম। বাড়িটা সরু, লম্বা, করোগেটেড লোহার ছাদওয়ালা।

‘গাড়িটা কোথাও রাখা যাক।’ আমি বললাম, ‘এবার তুমিও আমার সঙ্গে থেকো। একা-একা গতবারের অভিযানটা ঠিক উপভোগ্য হয়নি।’

একটা গলিতে গাড়িটা রেখে, সেই পথেই এদিক-ওদিক ঘুরে গুদামটার পেছনে এলাম। রাস্তায় কিছু লোক থাকলেও তখনও এলাকার কলকারখানা চালু হওয়ার মতো সময় হয়নি। তাই আমাদের লক্ষ করার মতো কেউ ছিল না।

গুদামের পেছনে গিয়ে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার দেখলাম। পেছনের দরজাটা বন্ধ ছিল। কিন্তু তালার কাছে ফ্রেম আর দরজা, দুটোতেই প্রচুর আঁচড়ের দাগ দেখলাম। কেউ ওটা জোর করে খুলেছিল।

মিকি দরজাটা ঠেলল। ওটা খুলে গেল। সাবধানে, এক-একবারের ঠেলায় ইঞ্চি ছয়েক করে দরজার পাল্লাটা পিছিয়ে দিলাম আমরা। ফাঁকটা মোটামুটি বড়ো হতেই আমরা ঢুকে পড়লাম। একটা গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম দূর থেকে। গলাটা পুরুষের, আর তাতে একটা ঝগড়ুটে ভাব আছে, এটুকুই শুধু বোঝা যাচ্ছিল।

দরজার গায়ের ক্ষতচিহ্নটা দেখিয়ে মিকি ফিসফিস করল, ‘পুলিশ নয়।’

আমি জুতোর রবার হিলে ভর দিয়ে এগোলাম। মিকি প্রায় আমার কাঁধে নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে পিছু নিল। টেড রাইট বলেছিল, হুইস্পারের আড্ডাটা ছিল দোতলার পেছনদিকের একটা ঘরে। মনে হল, এই আওয়াজটাও ওখান থেকেই আসছে।

‘ফ্ল্যাশলাইট?’ আমি নীচু গলায় কথাটা বলে হাত বাড়ালাম। মিকি আমার হাতে একটা আলো গুঁজে দিল। বাঁ-হাতে আলোটা, আর ডান হাতে বন্দুকটা ধরে এগোতে থাকলাম। দরজার ফাঁক দিয়ে আসা আলোয় বাড়ির ভেতরটা মোটামুটি দেখতে পাচ্ছিলাম আমরা। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেটা একটা করিডোর। তার অন্যপ্রান্তে জমাট অন্ধকার দেখলাম। এক ঝলক আলো বুঝিয়ে দিল, সেখানে একটা দরজা আছে। পেছনের দরজাটা বন্ধ করে আমরা নিঃশব্দে দরজাটার কাছে পৌঁছোলাম। ওটা খুলতেই ওপরে ওঠার সিঁড়ি পাওয়া গেল।

আমরা এত সন্তর্পণে উঠছিলাম যে মনে হচ্ছিল, একটু অসতর্ক হলে সিঁড়িটাই ভেঙে পড়তে পারে।

গম্ভীর গলাটা থেমে গেছিল। অন্য কারো আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম না, হয়তো খুব আস্তে কথা হচ্ছিল বলে। কিন্তু মনে হল, কিছু একটা ঘটছে।

ঠিক ন-টা ধাপ পেরিয়েছি তখন আমরা। একটা খুব স্পষ্ট গলা আমাদের মাথার ঠিক ওপরে বলে উঠল, ‘আলবাত। মেয়েটাকে আমিই মেরেছি।’

উত্তর এল বন্দুকের আওয়াজে। একই কথা চারবার বলা হল সেই ভাষায়। লোহার ছাদের নীচে সেই আওয়াজ শুনে মনে হল, কানের গোড়ায় ষোলো ইঞ্চির রাইফেল ফায়ার করেছে কেউ।

প্রথম গলাটা বলে উঠল, ‘বেশ।’

ততক্ষণে আমি আর মিকি বাকি ক-টা সিঁড়ি পেরিয়েছি, একটা দরজা খুলেছি, আর রেনো স্টার্কি-র দুটো হাত হুইস্পারের গলা থেকে সরানোর চেষ্টা করছি। কাজটা কঠিন ছিল, কিছুক্ষণের মধ্যে অর্থহীনই হয়ে গেল। হুইস্পারের শরীরে আর প্রাণ ছিল না।

রেনো আমাকে চিনতে পেরে হাত সরিয়ে নিল। ওর মুখটা নির্বিকার ছিল। চোখজোড়াও ছিল একইরকম, ভোঁতা।

জুয়াড়ির লাশটা মিকি বয়ে নিয়ে গেল ঘরের একমাত্র খাটিয়ার কাছে। তারপর ও হুইস্পারকে শুইয়ে রাখল সেখানে। ঘরের দুটো জানলা দিয়ে আসা আলোয় আমি খাটের তলায় ড্যান রল্্ফের লাশটাও দেখতে পেলাম। খাট আর আমাদের মাঝামাঝি জায়গায় একটা কোল্ট অটোমেটিক পড়ে ছিল।

রেনো কাঁধজোড়া কুঁচকে ঈষৎ টলছিল।

‘চোট লেগেছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘চারটে দানা ঢুকিয়েছে।’ শান্ত গলায়, নিজের পেট চেপে ধরে বলল রেনো।

‘ডাক্তার ডাকো!’ আমি মিকিকে বললাম। মিকি ছুটল। আমি রেনোকে একটা চেয়ারে কোনোক্রমে বসিয়ে দিলাম।

‘ডাক্তার এলেও লাভ হবে না।’ অল্প অল্প হাঁফাচ্ছিল রেনো, ‘আপনি কি জানতেন যে হুইস্পার মরেনি?’

‘না। আমাকে টেড রাইট যা বলেছিল, আমি আপনাকে সেটাই বলেছিলাম।’

‘টেড খুঁটিয়ে না দেখেই বেরিয়ে গেছিল।’ রেনো বলল, ‘আমার একটা আশঙ্কা হয়েছিল, তাই দেখতে এসেছিলাম নিজের চোখে। তারপর… সুন্দরভাবে ওর ফাঁদে পড়লাম।’

‘হুইস্পারের কি কিছুই হয়নি?’

‘হয়েছিল। মরে যাওয়ার মতোই চোট লেগেছিল। কিন্তু কী মনের জোর ভাবুন! নিজেই নিজের ব্যান্ডেজ বেঁধেছে। তারপর অপেক্ষা করেছে, কখন আমি, বা পিট, বা অন্য কেউ ওকে ‘দেখতে’ আসি! তবে…’ রেনোর মুখে হাসি ফুটে উঠল, যেটা আমি তার আগে কখনো দেখিনি, ‘এখন ও এক্কেবারে মরে গেছে।’

রেনো-র গলার স্বর ভারী হয়ে যাচ্ছিল। ওর চেয়ারের নীচে লাল রঙের তরল জমে উঠছিল। আমি ওকে ছুঁতেও ভয় পাচ্ছিলাম। স্রেফ গায়ের জোরে পেটটা চেপে ধরে সামনে ঝুঁকে ছিল বলেই হয়তো রেনো তখনও কথা বলতে পারছিল। টপ টপ করে ঝরে পড়া রক্তের দিকে চেয়ে রেনো জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কী করে নিশ্চিত হলেন যে আপনি মেয়েটাকে মারেননি?’

‘নিশ্চিত আমি হয়েছি সবে কিছুক্ষণ হল।’ আমি সত্যি কথাটাই বললাম, ‘তবে আমার হিসেব বলছিল, খুনটা আপনিই করেছেন।’

‘হিসেব?’

‘হ্যাঁ। স্বপ্নের হিসেব। সেই রাতে মদ, আফিং, স্নায়ুর চাপ, এইসব মিশে গিয়ে আমি স্বপ্নে অনেক কিছু দেখি। আমার মনে হয়েছিল, ওগুলো ঠিক স্বপ্ন ছিল না। বরং আমার আশেপাশে যা ঘটছে আমি সেগুলোই স্বপ্নের উদ্ভট যুক্তির আলোয় দেখছিলাম।

আমার যখন ঘুম ভেঙেছিল তখন ঘরের আলো নেভানো ছিল। আমি ডিনাকে খুন করে, আলো নিভিয়ে, তারপর আবার ওই শিকের হাতলটা ধরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বা অজ্ঞান হয়েছিলাম– এটা আমার বিশ্বাস হয়নি। তবে খুনটা অনেকেই করে থাকতে পারত। কিন্তু তাদের মধ্যে শুধু আপনি জানতেন, আমি ওই রাতে ওখানে ছিলাম। তাও আপনি এককথায় আমার অ্যালিবাইয়ের বন্দোবস্ত করে দেন। ওটাই আমাকে ভাবাতে শুরু করে।

ডন আমাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছিল হেলেন অ্যালবারি-র কথার ভিত্তিতে। পুলিশ যখন ওই একই কথা শোনে, তারা হুইস্পার, রল্্ফ, আমাকে আর আপনাকে একসূত্রে গেঁথে ফেলে। আবার ডন যেখানে খুন হয়েছিল সেখান থেকে অর্ধেক ব্লক আগেই আমি হ্যাংক ও’মারা আর আপনার আরেকজন লোককে দেখেছিলাম। তখনই আমার মনে হয়, ডন আপনাকে ব্ল্যাকমেল করতে গেছিল। কিন্তু কী দিয়ে? তাহলে কি হেলেন অ্যালবারি আমার সম্বন্ধে অন্যদের যা বলেছে, সেটা আপনার সম্বন্ধেও বলা হয়েছে? হুইস্পার আর রলফকে আমি হিসেবে রাখিনি। কিন্তু তাহলে কি সেই রাতে আমার মতো আপনাকেও ওই বাড়িতে ঢুকতে আর বেরোতে দেখেছিল হেলেন অ্যালবারি? আমি ডিনাকে খুন করিনি। তাহলে বাকি থাকেন শুধু আপনি।

কিন্তু কেন আপনি ওকে মারলেন, সেটা আমি এখনও বুঝিনি।’

‘ওর দোষ।’ নিজের ভেতর থেকে কথাগুলো তুলে আনল রেনো, ‘আমি এক বিন্দুও মিথ্যে বলছি না। ও সেই রাতে আমাকে ফোন করল। ডিনা বলল, হুইস্পার ওর সঙ্গে দেখা করতে আসছে। যদি আমি আগেভাগে ওখানে পৌঁছে যাই, তাহলে আমিই হুইস্পারকে খালাস করে দিতে পারব। কথাটা আমার পছন্দ হল। আমি বাইরে ওত পেতে রইলাম।’

রেনো চুপ করে গেল। বুঝতে পারছিলাম, যন্ত্রণা ওকে থামিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি এও জানতাম, ও নিজেকে বেশিক্ষণ থামিয়ে রাখতে পারবে না। রেনো স্টার্কি নিজের মতো করেই বাঁচবে, কথা বলবে… মরবে।

‘আমি অপেক্ষা করতে-করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম।’ আবার বলতে শুরু করল ও, ‘শেষে ওর দরজায় ধাক্কালাম। ও দরজা খুলে আমাকে ভেতরে আসতে বলল। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, বাড়িতে আর কে আছে। ও বলল, আর কেউ নেই। আমার চিন্তা হচ্ছিল। ওর যা স্বভাব, আমার মনে হচ্ছিল হুইস্পারের বদলে এটা আমার জন্যই পাতা ফাঁদ নয় তো?’

মিকি ভেতরে ঢুকে বলল, ও অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছে। রেনো সেই সময়টুকু দম নিল, তারপর আবার বলতে শুরু করল।

‘পরে আমি জেনেছিলাম, হুইস্পার নাকি সত্যিই এসেছিল ওর বাড়িতে, তবে আমি আসার আগে। আপনি তখন বেহুঁশ। তাই ও ভয়ে হুইস্পারকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি। ডিনা আমাকে ঢুকতে দিয়েছিল, কারণ হুইস্পার ফিরে এলে ওর হাত থেকে বাঁচার জন্য ওর নিরাপত্তা দরকার ছিল। আমি তখন এসব কিছুই জানতাম না। আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল ওর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে। ভাবলাম, ওকে চড়-থাপ্পড় মেরে ওর কাছ থেকে আসল ব্যাপারটা জানি। সেটা করার পরেই ও ওই বরফ ভাঙার শিকটা তুলে চিৎকার করে আমাকে শাসাতে লাগল। ওর চিৎকারের পরেই আমি ভেতরের ঘর থেকে পায়ের শব্দ পেলাম। আমার মনে হল, আমি ফাঁদে পড়েছি!’

রেনো খুব আস্তে, থেমে থেমে কথা বলছিল। তাতেও ওর কথাগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা মিশে যাচ্ছিল। ওর যে কী যন্ত্রণা হচ্ছিল, সেটা আমি আন্দাজ করছিলাম। কিন্তু নিজের পেট চেপে ধরে রেনো ওর অন্তিম জবানবন্দি দিয়েই যাচ্ছিল।

‘আমি ডিনা-র হাত থেকে শিকটা ছিনিয়ে নিয়ে ওর বুকে সেটা গেঁথে দিলাম। ঠিক তখনই আপনি ভেতরের ঘর থেকে, চোখ বন্ধ করে একেবারে ধেয়ে এলেন! আপনি পুরো বেহুঁশ ছিলেন, তবু আপনি ডিনা-র কাছেই এসে পড়েছিলেন। ডিনা আপনার গায়ে ধাক্কা খেল। আপনি পড়ে গেলেন। এদিক-ওদিক কয়েক পাক গড়িয়ে গেলেন। শেষে যখন আপনি স্থির হলেন তখন আপনার হাতটা ওই শিকের হাতলে ধরা। সেই অবস্থাতেই আপনি ঘুমিয়ে পড়লেন। ডিনাও যেন… ঘুমিয়েই পড়ল।

আমি বুঝতে পারলাম, কী করে ফেলেছি। কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না। লাইট নিভিয়ে বেরিয়ে গেলাম। পরে যখন আপনি…’

অ্যাম্বুলেন্স থেকে স্ট্রেচার নিয়ে নামা কয়েকটা লোক ততক্ষণে এসে পড়েছিল ওখানে। ওরাই রেনোকে নিয়ে গেল। ভালোই হল। ওর কথা আমি আর শুনতে পারছিলাম না।

মিকিকে ঘরের কোণে নিয়ে গিয়ে বললাম, ‘এবার যা করার তোমাকে করতে হবে। আমি আপাতত গা ঢাকা দিচ্ছি। হিসেবমতো আমার মাথার ওপর আর খাঁড়া ঝোলার কথা নয়। তবে পয়জনভিলকে কোনো বিশ্বাস নেই। আমি তোমার গাড়িটা কিছুদূরে রেখে স্টেশন অবধি হেঁটে যাব। সেখান থেকে ওগডেন। রুজভেল্ট হোটেলে আমি পি এফ কিং নামে ঘরভাড়া নিয়ে থাকব। তুমি আমাকে জানিয়ো, কখন আবার নিজের নামটা ব্যবহার করা যাবে। যদি হন্ডুরাসে পালাতে হয়, তাহলে সেটাও বোলো।’

ওগডেনের হোটেলে বসে আমি রিপোর্ট বানাতে বসলাম। ষষ্ঠ দিনের মাথায় মিকি এসে খবরাখবর দিল।

রেনো মারা গেছে। আমি আর পুলিশের চোখে সন্দেহভাজন নই। ম্যাকসোয়েন টিম নুনানকে খুনের দায় নিয়েছে। ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক লুটের টাকা প্রায় সবটাই উদ্ধার হয়েছে। সর্বোপরি মার্শাল ল জারি হয়ে পার্সনভিল নাকি ক্রমেই একটি নিষ্কণ্টক গোলাপবাগান হয়ে উঠছে।

আমি আর মিকি সানফ্রানসিস্কো ফিরে গেলাম। গুরুদেব আমার রিপোর্টগুলো মোটামুটি বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিলেন। বিস্তর কথা শুনিয়ে শেষে বললেন, ‘মানলাম, শহরটার যা অবস্থা ছিল সেটা মেনে নেওয়া সহজ নয়। কিন্তু একা, এইভাবে একটা গোটা শহরের বিরুদ্ধে… কেন আপনি এটা করলেন?’

লম্বা মেয়েটার শান্ত, প্রায় ঘুমিয়ে থাকা, মোজার সেলাই খুলে যাওয়া চেহারাটা আমার সামনে এক মুহূর্তের জন্য ভেসে উঠল। ছবিটা মুছে ফেলে বললাম, ‘এটা আমার একটা নীতি বলতে পারেন।’

***

মূল কাহিনি- রেড হারভেস্ট, লেখক- ড্যাশেল হ্যামেট; গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশ- ফেব্রুয়ারি ১৯২৯।

প্রথম প্রকাশ- ‘ব্ল্যাক মাস্ক’ পত্রিকার নভেম্বর ১৯২৭, ডিসেম্বর ১৯২৭, জানুয়ারি ১৯২৮ এবং

ফেব্রুয়ারি ১৯২৮ সংখ্যায়।