হলাহল বিষভাণ্ড – ৪
।। ৪ ।।
ঘটনাটা ঘটল একদিন পরেই। অফিশিয়াল কাজে আগরতলা শহরে গিয়েছিল রামানুজ। অফিস-লেন স্থিত কোর্টে কিছু কাজ ছিল। সেই কাজ করতে বেলা দেড়টা বাজল। দাসবাবুকে ডেকে রামানুজ বলল, “দাসবাবু, খিদে পেয়ে গেছে।”
দাসবাবু এক্সপার্ট মানুষ। বললেন, “কী খাবেন?”
রামানুজ মাথা চুলকে বলল, “বাঙালি খাওয়া-দাওয়া হলে মন্দ হয় না।”
দাসবাবু উৎফুল্ল হয়ে বললেন, “চলুন তবে শংকর হোটেল।”
রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “এটাও এখানকার বিখ্যাত নাকি?”
দাসবাবু গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন, “বিখ্যাত বলে বিখ্যাত। ইলিশটা খেয়েই বলুন-না।”
রামানুজ বলল, “নালে ঝোলে গড়িয়ে পড়ার আগে চলুন আপনার শংকর হোটেলে।”
কোর্ট থেকে বেরিয়ে অফিস-লেন ধরে প্যারাডাইজ চৌমুহনী, তারপর পোস্ট অফিস চৌমুহনী। তারপর ডানদিকে নেতাজি চৌমুহনী। সেখানেই পরপর শংকর হোটেল, আদি শঙ্কর হোটেল ইত্যাদি। দাসবাবু আদি শংকরে উঠতে উঠতে বললেন, “সবগুলোর মধ্যে ভালো মাছ আর রেসিপি আছে এই আদি শংকরের কাছে। আজকের দিনেও বয়স্ক মালিক নিজে গিয়ে দেখেশুনে ইলিশ কিনে আনে।”
রামানুজ তারিফ করল, “বাব্বা! সব খবর আছে আপনার কাছে।” দাসবাবু দাঁত বের করে হাসেন। বাসমতি চালের সরু ভাতের সঙ্গে ইলিশ ভাপা। ইয়া মোটা সাইজের গাবদা এক পিস ইলিশ। ডিমওয়ালা ইলিশ রামানুজের পছন্দ। দাসবাবু নিলেন ডিম ছাড়া। খেতে খেতে বললেন, “ইলিশে ডিম থাকলে স্বাদ হয় না।”
রামানুজ বলল, “এজন্যে হিন্দিতে একটা কথা আছে। বাঁদর নাকি আদার স্বাদ জানে না।”
দাসবাবু হেসে ফেললেন, “স্যার আপনিও-না!”
দারুণ খাওয়া-দাওয়া হল। রীতিমতো হাত থেকে ইলিশের ভুরভুরে গন্ধ ছাড়ছিল। খাওয়া-দাওয়ার পর বিল মিটিয়ে ওরা ফেরার পথ ধরল। গ্রামের কাছে এসে কী মনে হলে রামানুজ বলল, “চলুন গ্রামে যাই। অজিতদা, আশ্রমের দিকে চলুন।”
ড্রাইভার অজিত গাড়ি গ্রামে ঢুকিয়ে দিলেন। সোজা আশ্রমের কাছে গিয়ে থামল গাড়ি।
“আপনারা অপেক্ষা করুন। আমি ভেতরে যাচ্ছি। ঘণ্টাখানেক লাগবে।”
“আপনি আসুন স্যার। আমরা আছি।”, দাসবাবু বললেন।
রামানুজ ভেতরে ঢুকে গেল। আশ্রমের ভেতরে দুপুরের এই সময়টায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি বিরাজ করে। সকালের শিক্ষাপর্ব শেষ করে এই সময়টায় সকলে বিশ্রাম নেন। গুরুদেব এই সময় থাকেন দক্ষিণের দিকের ধ্যানকক্ষে। তিনি সেখানেই বিশ্রাম নেন। রামানুজকে সকলেই চেনেন। কেউ তাকে আটকায় না। সে সোজা দক্ষিণের ধ্যানকক্ষের দিকে হাঁটতে থাকে। যাবার পথে হঠাৎ দেখা হল কর্কটের সঙ্গে। তিনি হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যেন যাচ্ছেন। রামানুজকে দেখতে পেয়েই জিজ্ঞেস করলেন, “গুরুদেব কোথায়?”
রামানুজ বলল, “আমি এইমাত্র এলাম। ধ্যানকক্ষে থাকা উচিত। ওইদিকেই যাচ্ছিলাম।”
কর্কট বললেন, “তাড়াতাড়ি আমাকে নিয়ে চলো। এখানকার সব কক্ষ আমি চিনি না। আমার আবিষ্কার ট্র্যাভেলর আর অবশিষ্ট নেই। নাহলে সেটা দিয়েই আমি উক্ত স্থানে পৌঁছে যেতাম।”
“বেশ চলুন। কিন্তু কী হয়েছে? আপনাকে চঞ্চল লাগছে!”
“ভারি সংকট আসতে চলেছে।”
হাত নেড়ে পাগলের মতো বলতে থাকেন কর্কট। রামানুজ আবার জিজ্ঞেস করে, “কীরকম সংকট?”
“সেটা বুঝতে পারছি না। কিন্তু আবার একটা অনর্থ ঘটতে চলেছে।” রামানুজ আর দেরি না-করে দৌড় লাগাল। পেছন পেছন কর্কট। তাঁদের দৌড়াতে দেখে আশেপাশের বেশ কয়েকজন যাদের মধ্যে বিবস্বানও ছিল একই দিকে ছুটল। সবাই বুঝতে পারছিল যে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। ধ্যানকক্ষের সামনে পৌঁছে রামানুজ প্রথমেই দরজা খোলার চেষ্টা করল। কিন্তু দরজা ভেতর থেকে আটকানো রয়েছে। রামানুজ চিৎকার করল,
“গুরুদেব! গুরুদেব!”
বাকিরাও ততক্ষণে পৌঁছে গেছে। সমস্বরে সকলে চিৎকার করতে থাকল। ধ্যানকক্ষের ভেতর থেকে গুরুদেবের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। আশ্রমবাসীরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল, “অন্যদিন তো গুরুদেব দরজা বন্ধ করে ধ্যান বা বিশ্রাম করেন না।”
রামানুজ সবাইকে বলল, “কক্ষের দরজা ভেঙে ফেলা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই।
কর্কট অধৈর্য হয়ে বললেন, “ভাঙন। এক্ষুনি ভাঙন।”
পুরোনো দিনের কাঠের দরজা। ভাঙুন বললেই হিন্দি বা দক্ষিণের টিভি সিরিয়ালের মতো লাথি দিয়ে ভেঙে ফেলা যায় না। রীতিমতো পাঁচজন লোক মিলে যার মধ্যে রামানুজ আর বিবস্বানও ছিল ধাক্কাধাক্কি করে ভাঙলেন এই দরজা। আর দরজা খুলতেই এক আলোক জ্যোতিতে চোখমুখ ধাঁধিয়ে গেল। চোখ সয়ে এলে সকলে দেখলেন এক ভয়াবহ দৃশ্য। গুরুদেবকে আষ্টেপৃষ্টে দড়ির মতো জড়িয়ে আছে একটা সাপ। সেই সাপের বাঁধন নিয়ন্ত্রণ করছে কালো ধুতি, কালো জামা পরা একটা লোক।
কর্কট আর বিবস্বানের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “বৃশ্চিক?”
কর্কট চিৎকার করে বললেন, “তোর হাতে সাপই ভালো মানাচ্ছে। তুই নিজেও সাপের থেকে কম কিছু নোস। এবার বুঝতে পারছি কৈটভ কীভাবে আমার গবেষণাগার লুঠ করতে পেরেছিল।”
বৃশ্চিক কিছু বলার আগেই শব্দ হল। বৃশ্চিকের পেছনে সময়চক্রযানের গুহামুখ। সেখান থেকেই কৈটভ বেরিয়ে আসছে। স্বচ্ছ পদার্থের মতো তার শরীর। এপাশ- ওপাশ দেখা যায়। আজকেও সে ট্রান্সপেরোমিটার ব্যবহার করেছে।
“কৈটভের নাম নিলে সে সবাইকে দর্শন দেয়।”
সকলে দেখল যেখানে যেখানে কৈটভ পা ফেলছে সেখানেই একটা সিঁড়ি তৈরি হয়ে যাচ্ছে। খুব সহজেই সে গুরুদেব অবধি পৌঁছে গেল। রামানুজ বন্দুক বের করেছিল কিন্তু সেটার ব্যবহার করল না। ততক্ষণে বৃশ্চিকও ট্রান্সপেরোমিটারের আচ্ছাদন নিয়ে নিয়েছে।
রামানুজ চিৎকার করল, “গুরুদেবকে কিছু করবি না কৈটভ। গুরুদেব…”
কথাটা শেষ করার আগেই একটা তরল ছিটিয়ে দিল কৈটভ। মুহূর্তের মধ্যে সকলে স্থির হয়ে গেল। শুধু সকলের চোখ আর কান কাজ করছিল। কৈটভ বলল, “একটা জরুরি কাজ আছে। তাই গুরুদেবকে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি। ঠিক সময়ে ফিরিয়ে দেব। আশা করছি জীবিতই ফেরাতে পারব যদি তিনি আমার সমস্ত কথার যথাযথ পালন করেন।”
সকলেই কৈটভের কথা শুনছিল। কিন্তু কিছু করার ছিল না। সকলেই পাথর হয়ে গেছে। গুরুদেব নাগপাশে এতই বাজেভাবে জড়িয়ে রয়েছেন যে তাঁর মুখ অবধি জড়ানো আছে সাপের লেজের দ্বারা। মুখের কাছে সাপের মাথাগুলো ফণা তুলে আছে। সবগুলো মাথা একটা করে ছোবল দিলে গুরুদেবকে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করতে হতে পারে। তিনি জানেন কৈটভবধ তাঁর সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়। এটা সঠিক সময় নয় কোনো। সঠিক সময় অবশ্যই উপস্থিত হবে। এখন কোনো হেলদোলের দরকার নেই। তিনি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রইলেন।
কৈটভ সকলের উদ্দেশে শেষবারের মতো বলে, “আমি তোমাদের প্রাণভিক্ষা দেব। তোমরা আমার রাস্তা থেকে সরে যাবে। আর কখনও আমার রাস্তা আগলে তোমরা দাঁড়াবে না।”
কৈটভ আর কথা বাড়ায় না। নাগপাশে জড়ানো গুরুদেবকে নিজের কাঁধে তুলে নেয় সে। তারপর সময়চক্রযানের গুহামুখের দিকে হাঁটতে থাকে। তার প্রতিটা পায়ের অগ্রগতির সঙ্গে সেখানে একটি সিঁড়ির জন্ম হয় আর আগের সিঁড়ি অদৃশ্য হয়ে যায়। কৈটভ গুহামুখে প্রবেশ করে। বৃশ্চিক একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে, “কর্কট, ঠাকুরদা!”
বৃশ্চিক বিচ্ছিরি অঙ্গভঙ্গি করে মুখে। তারপর ফিরে যায় সময়চক্রযানে। কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তাদের সবাইকে নিয়ে অদৃশ্য হয় সময়চক্রযান। আর সময়চক্রযান অদৃশ্য হবার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে পড়ে সকলে। যেন পাথরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এক-আধজন গতিজাড্যের পূর্ব প্রবণতায় মাটিতে পড়ে গেলেন। বিবস্বান স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতেই কর্কটকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি তো জানতেন এই স্থবির অবস্থা থেকে কীভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে হয়। আপনার চোখ তো স্থবির হয়ে যায়নি। আপনার চোখে জল এলেই আপনি সেই জল-এর স্পর্শে বাকি দেহে প্রাণ ফিরে পেতেন। কেন করলেন না? কেন আপনি এতটা বিমুখ হয়ে আছেন? গুরুদেবকেও আজ কৈটভ নিয়ে চলে গেল। আমরা কিছুই করতে পারলাম না। আমরা আর কত দুর্বল হয়ে যাব ঠাকুরদা? আর কত?”
বিবস্বান যেন এই ঘটনায় ভেঙে পড়েছে। রামানুজ মুখে কিছু বলে না। শুধু বিবস্বানকে সামলাবার চেষ্টা করে। আশ্রমবাসীরা গুরুদেবকে নিয়ে কৈটভের এই অন্তর্ধান হওয়ায় বিধ্বস্ত। চারদিকে কান্নার রোল উঠেছে। গুরুদেব সঙ্গে না-থাকা যে কত বড়ো পরাজয় তা সকলেই জানে। এই অসম যুদ্ধে যে আর কখনও জয়ী হওয়া সম্ভব নয় তা একপ্রকার ধরেই নিয়েছে সকলে। কর্কট চারদিকে চোখ ফেরালেন। দুর্ঘটনায় ক্লান্ত ন্যুব্জ আশ্রমবাসী চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সকলেই হা-হুতাশে মত্ত। রামানুজ জনে জনে সবাইকে আগলে রাখার বৃথা চেষ্টা করছে। বিবস্বান এক কোনায় বসে আছে। কর্কট নিজের মৌন ভাঙার এর থেকে অধিক সঠিক সময় আর পাবেন না। কর্কট নিজের পুরোনো মহিমায় হুংকার দিলেন, “কিচ্ছু হবে না গুরুদেবের। কৈটভের কলজেতে এতটা দম নেই যে সে গুরুদেবকে মেরে ফেলতে পারে। গুরুদেব তার পরবর্তী সিন্দুকের চাবি। তাই তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গেছে। ওঁর কোনো অনিষ্ট হবে না। আমি বারবার গুরুদেবকে বলেছি কৈটভ বধের সূচনা করব আমি। আজ থেকে সেই সূচনা পর্ব শুরু হল।”
বিবস্বান যেন প্রাণ ফিরে পেল। ঠাকুর কে এরকম তেজস্বী অবতারে দেখতেই সে অভ্যস্ত। সে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু ঠাকুরদা, আমাদের কাছে তো সময়চক্রযান নেই। টাইম-ট্র্যাকারও নেই। আমরা কীভাবে জানব যে ওরা কোথায় আছে? আর যদি জেনে-ই বা গেলাম সেখানে যাব কীভাবে?”
কর্কট হাত তুলে থামালেন বিবস্বানকে। তারপর বললেন, “মাইন্ড-রিডার যে বৃশ্চিক আবিষ্কার করে ফেলেছে আমি জানতাম। গবেষণাগারে কোনো পদার্থই আমার অনুমতিভিন্ন তৈরি হয়নি। মাইন্ড-রিডারের প্রাথমিক ফর্মুলা আমারই তৈরি। তাই আমার কাছেও মাইন্ড-রিডিং পাওয়ার রয়েছে। যা আমি সযত্নে আমার সঙ্গেই রেখেছিলাম। আমি শুধু অপেক্ষায় ছিলাম কবে বৃশ্চিক বা কৈটভ আমার সামনে আসবে।”
বিবস্বানের মুখ উজ্জ্বল হল। সে জিজ্ঞেস করল, “ওরা কী ভাবছে ঠাকুরদা?”
কর্কট উত্তরে বললেন, “এক বীভৎস উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে ওরা। কৈটভ এই সৃষ্টি ধ্বংস করে দিতে উদ্যত। সে কলিপুরুষ হতে চায়। কলিপুরুষের জন্মের আগেই যদি সে নিজে কলিপুরুষে পরিণত হয় তবে তো এই যুগ সৃষ্টির আগেই নষ্ট হয়ে যাবে। সাত চিরঞ্জীবী অপেক্ষারত রয়েছেন। সময়ের আগে তাঁদের সাহায্য পাওয়া সম্ভব নয়। তাই একবার যদি কৈটভ কলিপুরুষে পরিণত হয়ে যায় তাহলে আর কখনোই তার বিরুদ্ধে লড়াই সম্ভব নয়।”
রামানুজ এতক্ষণে প্রশ্ন করল, “কলিপুরুষ মানে কলি যুগের সেই রাক্ষস যার বিরুদ্ধে কল্কি দেবতা যুদ্ধ করবেন?”
কর্কট মাথা নেড়ে বলে, “হ্যাঁ, সেই ভয়ানক শক্তিশালী রাক্ষস। যাকে স্বয়ং বিষ্ণু একা মারতে পারবেন না। সাত সাতজন পরম বিক্রমশীল চিরঞ্জীবী সাহায্য করলে তবেই তার বধ সম্ভব।”
রামানুজ মাথায় হাত দেয়, “সর্বনাশ! তাহলে আমাদের কী করা উচিত?”
কর্কট উত্তরে বললেন, “ওরা সময়ের যে অংশে যাচ্ছেন আমাদেরও সময়ের ঠিক সেই অংশে যেতে হবে।”
বিবস্বান জিজ্ঞেস করে, “সেই তো ঘুরে ফিরে একই জায়গায় আসছি আমরা। সময়চক্রযান কোথায়? আর তো তরল অবশিষ্ট নেই।”
কর্কট হেসে বলে, “সেই তরল প্রস্তুত করার সময়টাও আর নেই।”
রামানুজের কপালে ভাঁজ পড়ে, “তাহলে? উপায়?”
কর্কট হাসে। হেসে বলে, “উপায় একটা আছে। একজনের সাহায্য চাইতে হবে।”
রামানুজ, বিবস্বান-সহ সকলে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকায়। কর্কট বলে চলে, “এক বিশেষ ব্যক্তির সাহায্য নিতে হবে আমাদের। একমাত্র তার কাছেই আছে সময়চক্রের হদিশ।”
রামানুজ জিজ্ঞেস করে, “কে সে?”
কর্কট এবার ক্রুর হাসি হাসে। তারপর বলে, “আছে একজন। এক শয়তান! কিন্তু যে নিজেকে শিল্পী বলতে ভালোবাসে।”
কথাটা শেষ করেই কর্কট নিজের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন। বাকিরা সকলে দাঁড়িয়ে রইলেন। গুরুদেব ছাড়া এই আশ্রম যেন তুলসীগাছহীন এক তুলসী বেদি। এর আলাদাভাবে আর কোনো মূল্যই রইল না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। চারদিকে কালো অন্ধকার নেমে এল। অন্ধকারের চাদর গায়ে মেখে তাতে তলিয়ে গেল আশ্রম। রামানুজ আর বিবস্বান আশ্রমে পাহারা দিতে লাগল।
* * * * *
নিজের কক্ষের ভেতরে কর্কট বসে আছেন। সামনে রাখা আছে একটা বাক্স। বাক্সে কোনো তালা নেই। কিন্তু বাক্সটি বন্ধ। কর্কট শোকে পাথর হয়ে গেছেন। তাই তাঁর চোখে অশ্রু নেই। কিন্তু এই বাক্স খুলতে হলে অশ্রুর প্রয়োজন। এই বাক্সের চাবি কর্কটের চোখের জল। কর্কট ভাবতে লাগলেন সেইসব মুহূর্ত যে মুহূর্তে কৈটভ তার নাতিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল। টেনে হিঁচড়ে এক পুলিশ অফিসারের লাশকে নিয়ে এসেছিল মেরুদণ্ড উৎপাটিত করে। তাঁর বাল্যবন্ধু গুরুদেবকে সবার চোখের সামনে সর্পবেষ্টিত করে নিয়ে চলে গেল। কর্কটের বুক ভেঙে গেল একটার পর একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে। তার মনে পড়ল মিথ সংঘের বিনাশের কথা। তিলে তিলে গড়ে উঠা মিথ সংঘ এক-বেলারও কম সময়ে সমূলে নষ্ট করে দিয়েছিল কৈটভ। নিজের দুর্বল মুহূর্ত মনে করে কষ্ট বাড়তে লাগলেন ঠিকই। কিন্তু হৃদয় বিদারিত কান্না চোখ বেয়ে নেমে এল না। বুকে জমা মেঘ বুকেতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল, বারিধারা হয়ে নেমে এল না।
কর্কট বুঝতে পারছিলেন তাঁর চোখের সমস্ত জল হয়তো শুকিয়ে গেছে। কিন্তু ফোঁটা জল তো চাই। যে কলিপুরুষের মোকাবিলার কথা ভাবা হচ্ছে সেই স্থান বিপদসংকুল। সেখানে এই বাক্সে রাখা অমূল্য সম্পদের দরকার পড়বে। কর্কট নিজের চোখটাকে এগিয়ে নেন বাক্সের কাছে। নিজের সমগ্র একাগ্রতা ঢেলে দেন নিজের বাঁ চোখে। বার্ধক্যে ঢাকা দুটো কাঁপা হাত এগিয়ে যায় চোখের কাছে। আঙুলগুলো চেপে ধরে চোখটাকে। যে ছিদ্রপথে অশ্রু নিঃসৃত হয় সেখানে নিংড়ে ধরেন আঙুল। আজ পাষাণের চোখেও জল আসতেই হবে। প্রবল শক্তিতে চেপে ধরায় ক্ষণিকেই চোখ লাল হয়ে যায়। যেন চোখে জল না-এলে চোখ সুদ্ধ খুবলে ফেলবেন কর্কট। এক বিন্দু শুধু এক বিন্দু অশ্রুর জন্য প্রাণপাত করছেন বৃদ্ধ কর্কট। এককালের সর্বশক্তিমান শয়তানকেও ঈশ্বর রেয়াত করেন না! সব ছিনিয়ে নিয়েছেন ঈশ্বর কর্কটের থেকে। শেষে চোখের জলটাও ছিনিয়ে নিলেন। কর্কট চিৎকার করে উঠলেন। কিন্তু কাঁদতে পারলেন না।
বাক্স খোলা গেল না।
