Accessibility Tools

ওল্ড র‍্যামন – জ্যাক শেফার

ওল্ড র‍্যামন – ৩

তিন

মধ্যসকালের উষ্ণতায় সামনে এগিয়ে চলেছে ভেড়ার পাল। মাঝেমধ্যে কোন কোনটা ডাল-পাতা খাওয়ার জন্যে পিছিয়ে পড়েছে, তারপর আবার সবেগে ছুটে পার হয়ে গেছে অন্যদের। দলের দু’পাশে তাল মিলিয়ে ছুটছে কুকুর দুটো, নিতম্বের ওপর বসে জিরিয়ে নিচ্ছে একটু আধটু জিভ বের করে, তারপর আবার দৌড় দৌড়।

পেছন পেছন হাঁটছে বুড়ো র‍্যামন। দীর্ঘ, ধীর পদক্ষেপের সঙ্গে ছন্দময় ভঙ্গিতে দুলছে তার লাঠিটা। মালবাহী গর্দভটাকে তাড়িয়ে নিয়ে পাশেপাশে চলেছে কিশোর।

‘আমার মনে হচ্ছে, বলল ছেলেটি, ‘ভেড়ার দেখাশোনা করার অর্থ রোদে পুড়ে মরা।’

‘তাই তো,’ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল বুড়ো। ‘যাত্রার সময় ব্যাপারটা তো এইরকমই। কিন্তু পাহাড়ে পৌঁছালে দেখবে বড় বড় গাছের ছায়ায় সারা দিনমান বসে থাকতে পারছ। র‍্যামন বসে বসে দেখবে ভেড়ারা কিভাবে গায়ে মাংস লাগায় কিভাবে ভাল পশম জন্মায় আর ভাববে জীবনের পুরানো বহু বছরের কথা। আর মনে হয় একটা ছোট ছেলেকে একটা কুকুরের সঙ্গে ছেলেমানুষী খেলা খেলতে দেখবে…’

ভেড়ার পাল বয়ে চলেছে স্রোতের মত। জমি এখন ক্রমান্বয়ে ঢালু হয়ে লালচে উইলো ঝোপের জটলার আর গুটি কয়েক প্রকাণ্ড কটনউডের আবছা বাঁকা সারিতে মিশেছে।

‘ছোট নদীটা এখন পার হতে হবে,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘আর আমাদের এখন যত্নও নিতে হবে। পানির সামনে ভেড়াদের সমস্ত গাধামি বের হয়ে পড়ে। এক দল ভেড়ার কথা জানি যারা তেষ্টায় পাগল হয়ে গেলেও একটা ডোবার পানি খেতে চায় নাই, আশপাশের অনেক মাইলের মধ্যে ওইটাই ছিল একমাত্র ডোবা, পানিও ছিল ভাল, কিন্তু অচেনা একদল ভেড়ার গায়ের গন্ধ পেয়ে ওরা আর ওই পানি খেতে রাজি হয় নাই। আবার আরেকটা ডোবায় হয়তো সেই অচেনা দলের গন্ধ ঠিকই আছে কিন্তু সেইটা ওরা খেয়ালই করল না। এমন এমন অনেক দলের কথা শুনেছি যাদের অনেকগুলা ভেড়া মারা পড়েছে কারণ পচা পানি দেখে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে খাওয়ার জন্যে চেষ্টা করেও ঠেকানো যায় নাই। পানি পার হওয়ার সময়- আই, কেউ কিছু বলতে পারে না। দল হয়তো আপসে পার হয়ে গেল যেন পানি কিছুই না, একটু পানির ছিটা লাগল হয়তো গায়ে। আবার এমনও হতে পারে রুখে দাঁড়িয়ে ঝামেলা শুরু করল। নদী পেরনোর জন্যে ক্রসিঙটা ভাল, বেশি চওড়া না, স্রোতে বেশি টানও নাই, ঠাঁইও পাওয়া যাবে। কিন্তু কেউ বলতে পারে না…’

বুড়ো র‍্যামন থেমে ভর দিল লাঠিতে।

‘সময় হয়েছে। তোমার কুকুরটাকে ডাকো।’

কিশোর মুখে দু’আঙুল পুরে শিস দিলে একলাফে ঘুরে ছুটতে ছুটতে চলে এল কালো কুকুরটা।

‘শাবাশ,’ বলল -বুড়ো র‍্যামন। ‘কিন্তু ওকে তোমার শিসটা সম্পর্কে অনেক কিছু শেখাতে হবে। একটা হচ্ছে কুকুরের দেখার জন্যে, তার কাছে কি চাওয়া হচ্ছে দেখতে। দুই নম্বর হচ্ছে কাছে আসার জন্যে…এখন গাধাটাকে ঝোপে বেঁধে এখানে সবুর করো। দেখতে পাবে র‍্যামন আর তার পেদ্রো কিভাবে ভেড়াদের নদী পার করায়।

হনহন করে সামনে পা বাড়াল বুড়ো র‍্যামন, লম্বা পদক্ষেপের সঙ্গে দোলাচ্ছে লাঠিটা দেহভারসাম্য বজায় রাখতে, হাঁটার ফাঁকে মুখে আঙুল পুরে শিস বাজাল। বাদামী কুকুরটা থমকে গিয়ে করে পিছু চাইল। বুড়ো র‍্যামন ডান হাতটা সামনে ঝটকা মেরে ঝাড়ু দেয়ার ভঙ্গি করল চারদিকে, তারপর হাতটা ফিরিয়ে আনল বুকের কাছে। এবার বাদামী কুকুরটা দৌড়ে চলে গেল ভেড়ার পালের একেবারে সামনে, ছোট্ট নদীটা এখন আর মাত্র পঞ্চাশ ফিট দূরে ঢালের কিনারায়। অগ্রবর্তী ভেড়াগুলোকে থামিয়ে, সামনে-পিছে ছোটাছুটি করে দলছুটদের জড়ো করল ওদের পিছে। বুড়ো র‍্যামন গট গটিয়ে দলের সামনে গিয়ে লাঠির খোঁচা মেরে ছ’টা ভেড়াকে তাড়িয়ে নিয়ে চলল পানির উদ্দেশে। বাকি দল এখন প্রায় ঠাসবুনানির মত গায়ে গা ঘেঁষে- তারা গভীর মনোযোগী দর্শক। সামনেরগুলো নিথর দাঁড়িয়ে, পেছনে ঠেলাঠেলি সত্ত্বেও আঠা মারা যেন পায়ে, চেয়ে চেয়ে দেখছে কী ঘটে সামনে।

বাদামী কুকুরটার নির্বোধ ভেড়াদের কাণ্ডকারখানা উপভোগ করার সময় নেই, ছুটে এল বুড়ো র‍্যামনের সাহায্যে। ছ’টা ভেড়া এখন নদীর কিনারায় পৌঁছে গেছে, ছোট ছোট নুড়ি-পাথরের ওপর দিয়ে সশব্দে বয়ে চলা অগভীর, খরস্রোতা পানির গন্ধ নিচ্ছে ওরা নাক-মুখ নামিয়ে। পিছে ঝটকা মেরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল জানোয়ারগুলো।

‘আই,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘আজকে কপালে খারাপি আছে।’

পানির কিনারা থেকে ছুটে পালানোর চেষ্টা করল একটা ভেড়া, সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ খেলে গেল যেন বাদামী কুকুরটার দেহে, ফের ফিরিয়ে আনল ওটাকে জায়গা মত। দলের বাদবাকি সদস্যরা একদৃষ্টে দেখছে। আস্তে আস্তে, অথচ দৃঢ়তার সঙ্গে বুড়ো র‍্যামন আর বাদামী কুকুরটা বাধ্য করল ভেড়া ছ’টাকে পানিমুখো হতে। সহসা বুড়ো র‍্যামন ডান হাত তুলে একটা ভেড়াকে নির্দেশ করল, জুয়ানিটা, এবং পলকে তার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরটা লাফিয়ে গিয়ে পড়ল প্রাণীটার ওপরে। ওর গায়ের ধাক্কায় বেচারি ছিটকে পড়ল পানিতে। এক মুহূর্ত হাবুডুবু খেয়ে পায়ের নিচে মাটি নাগাল পেল ওটা, এগোল সামনে। বুড়ো র‍্যামন আরেকটার দিকে ইঙ্গিত করতে সেটাও পানিতে গিয়ে পড়তে বাধ্য হলো। এবার আর কিছু করতে হলো না। বাকিগুলো হুড়োহুড়ি করে আগে বাড়ল।

বুড়ো র‍্যামন নদীতে নামলে পানি পাক খেতে লাগল ওর হাঁটুর কাছে। ভেড়াগুলোকে সে তাড়া দিলে জুয়ানিটা এগোতে শুরু করল ওপাশের নিচু ঢালের উদ্দেশে। ওপারে পৌঁছে গেল জুয়ানিটা, গা থেকে টপটপ করে ঝরছে পানি, ইতোমধ্যেই খাবার খুঁজতে লেগে গেছে। ওকে অনুসরণ করে চলে আসছে অন্যগুলো।

বুড়ো র‍্যামন এবার এপারে ফিরে এল। বাদামী কুকুরটা তার আগেই বাকি দলের উদ্দেশে ছুট লাগিয়েছে, সামনেরগুলোর পাশে পাশে দোল খেয়ে আগে বাড়তে বলছে। তাগাদা দেয়ার বিশেষ দরকার হলো না। দলের ছ’টাকে ওপারে দেখে এগুলোও প্রায় খেপে উঠল নদী পেরোতে। সামনের সারির ভেড়াগুলো এমনভাবে পা রাখল প্রথমবার পানিতে যেন কাজটা পানির মতন সহজ, অন্যগুলো পিছু নিল ওদের। বুড়ো র‍্যামন আর তার বাদামী কুকুর দু’পাশ থেকে চেপে এক সারে চলতে বাধ্য করল প্রাণীগুলোকে।

পেছনে ঢালে দাঁড়িয়ে কিশোর লক্ষ্য করছে ঘটনাটা, তার পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে শুয়ে শিহরিত হচ্ছে কালো কুকুরটা।

‘আমরা এখানেই থাকি,’ বলল ছেলেটি। ‘এখানেই থাকতে বলে গেছে।’ সিধে দাঁড়িয়ে ভেড়ার পালটিকে দেখছে সে, তিনশো ভেড়ার দলটি এককাট্টা হয়ে ভেসে চলেছে নদী পথে, একযোগে ওদের তত্ত্বাবধান করছে এক বুড়ো আর তার এক বুড়ো বাদামী কুকুর, নীরবে গভীর একাগ্রতায়- বহু বছরের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান কাজে লাগাচ্ছে পরম নিশ্চয়তার সঙ্গে।

পেছন দিকে পড়ে রয়েছে বেশ কিছু দলছুট, সব দলেই যেমন কিছু আলসে, জড়গতি সদস্য থাকে। চিরদিন পেছনের সারিতেই থেকে যায় এরা। কিশোর এবার দেখতে পেল বুড়ো র‍্যামন ওর উদ্দেশে হাতছানি দিয়ে ভেড়ারূপী গাধাগুলোকে সামনে নিয়ে যেতে বলছে।

‘এবার আমাদের পালা, স্যাঞ্চো,’ উৎসাহের সঙ্গে বলে কুঁড়েগুলোর উদ্দেশে ছুট লাগাল বালক, আর কালো কুকুরটা কাজ দেখানোর সুযোগ পেয়ে পরম আগ্রহে লাফাতে লাফাতে চলল। তার ঠেলা-গুঁতো খেয়ে কোন্ ভেড়ার সাধ্য তখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখে!

কিন্তু কালো কুকুরটার মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ, উদ্বেগ আর উত্তেজনা হিতে বিপরীত হয়ে দেখা দিল। তার গগণবিদারী ঘেউ ঘেউ আর গুঁতোগুঁতির ঠেলায় হাবা-গোবা দলছুটগুলো তেড়ে গেল, ওপারে উঠতে অপেক্ষমাণ সঙ্গীদের দিকে। আর তাই দেখে ওগুলো ভয়ে দিগ্বিদিক্ ছুটতে শুরু করল, মরিয়ার মত একটা গিয়ে আরেকটার ঘাড়ে চড়াও হলো। পায়ের নিচে ঠাঁই হারিয়ে সেগুলোর তখন ত্রাহি অবস্থা!

‘আই!’ গর্জে উঠল বুড়ো র‍্যামন। কাটাকুটি ভরা ডাকাতে চেহারাটায় রক্ত উঠে এসেছে। ক্রোধে কাঁপছে গলা। ‘শিগগির ওই গাধাটাকে থামাও!’

ছেলেটি দৌড়ে গিয়ে দু’হাতে আচ্ছামত আঁকড়ে ধরল কালো কুকুরটার ঘাড়ের কাছে ঘন লোম। মুখ তুলে চাইতে বুড়ো র‍্যামনকে ব্যস্তসমস্ত হয়ে, লাঠি বাগিয়ে লাফ-ঝাঁপ করতে দেখল ও, এতটুকু ক্লান্তি নেই তার প্রাচীন দু’পায়ে। বুড়ো বাদামীটা বিদ্যুতের মত ঝলসে যাচ্ছে এদিক-সেদিক- সর্বত্র। দুই বুড়ো মিলে ছত্রখান ভেড়াগুলোকে দিক নির্দেশ দিচ্ছে, জড়ো করে নিয়ে যাচ্ছে ক্রসিঙের দিকে।

‘হায় খোদা!’ চেঁচিয়ে উঠল বুড়ো র‍্যামন। দুটো ভেড়া পরস্পর জড়ামড়ি করে নাকানি চোবানি খেতে খেতে স্রোতে ভেসে চলেছে ভাটির দিকে, ডোবায় গিয়ে ঝপাৎ করে পড়ল। এখানে বিপদগ্রস্ত ভেড়ার মত নীরবে যুঝতে লাগল পানির সঙ্গে, সামনের দু’পা নিচে মাটির ঠাঁই পেতে কোনমতে মাথা তুলতে পারছে, কিন্তু গায়ের পশম পানিতে জবজবে হয়ে যাওয়ায় ভারের চোটে আবার ডুবেও যাচ্ছে।

বুড়ো র‍্যামন তার লাঠি ফেলে হ্যাট ছুঁড়ে মেরে ডোবার দিকে দৌড়ে গেল। লম্বা লম্বা কদমে প্রবেশ করল ভেতরে। পানি তার কোমর ছাপিয়ে কাঁধে উঠে গেল। একটা ভেড়াকে উদ্ধার করে জোরে ধাক্কা দিল ওপারের উদ্দেশে। এবার ফিরল দ্বিতীয়টার দিকে। ওটার নাকটা দেখা যাচ্ছে কেবল তাও আবার ডোবে ডোবে। বুড়ো পানিতে ডুব দিয়ে যখন উঠল তখন তার ডান কাঁধে দেখা গেল অসহায় জানোয়ারটাকে। তীরের উদ্দেশে টলতে টলতে এগোল বুড়ো। কাঁধে অসাড় পড়ে থাকা ভেড়াটাকে নিয়ে পানির গভীরতা যেখানে সবচেয়ে কম সেখানে এসে উঠল সে। শুকনো মাটিতে ওটাকে তুলে দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পেছন পেছন এগোল। হাঁটুর ওপর থাকা অবস্থায় ভেড়াটাকে উল্টে দিল বুড়ো, যাতে ঢালের নিচে থাকে ওটার মাথা। চোখ বোজা ওটার, পানি চুইয়ে চুইয়ে বেরোচ্ছে মুখ থেকে। র‍্যামন অভিজ্ঞ হাতে শুশ্রূষা করে চলল ওটাকে। আরও পানি বেরিয়ে এল ওটার মুখ দিয়ে, খুলে গেছে চোখ। দুর্বলভাবে মাটিতে আঘাত করছে মাথা, মৃদু লাথি ঝাড়ছে পা, আচমকা টলমল করে উঠে কাত হয়ে স্খলিতচরণে খানিক দূর সরে গেল ভেড়াটা।

উঠে দাঁড়াল বুড়ো র‍্যামন। হাঁসফাঁস করছে। সারা শরীর থেকে পানি ঝরে বুটের কাছে মাটি কাদাটে করে দিয়েছে। পালটির দিকে তাকাল সে। নদীর ক্রমবর্ধমান চড়াই আর ওপারের সমতলে চরছে ওরা, আবারও একটা দলের আকৃতি পেয়েছে। ডোবা থেকে উদ্ধার করা ভেড়া দুটোও ওদের সঙ্গে মিশেছে এবং দলটির সামনে সতর্ক পাহারা দিচ্ছে একটা বুড়ো, বাদামী কুকুর। বুড়ো র‍্যামন ওপাশে ঘাড় ফেরাল। পনেরো ফুট তফাতে স্থির দাঁড়িয়ে কিশোরটি। নদীর পানিতে পা ভেজা। এক হাতে ধরে রয়েছে গর্দভটার লীড রোপ আর অন্যহাতে বুড়ো র‍্যামনের হ্যাট আর লাঠি। পায়ের কাছে জবুথুবু হয়ে পড়ে আছে কালো কুকুরটা, খানিকটা কুঁকড়ে রয়েছে যেন লজ্জায়।

‘আই!’ শ্বাসের ফাঁকে চেঁচাল বুড়ো র‍্যামন। ‘আমি একটা বুদ্ধু – তা নাহলে ওই রামছাগলটাকে সঙ্গে আনি!’

‘আমরা দুঃখিত,’ বলল ছেলেটি। একটু সিধে হলো। ‘কিন্তু ও-ও তো আমার মত। শিখছে।’

‘শিখছে!’ বলে উঠল বুড়ো র‍্যামন। ‘সবাই চাইলেই শিখতে পারে না, বুঝলে?’

ছেলেটির চোখ তার পায়ের কাছে মাটিতে। কাঁধ ঝুলে পড়েছে যেন কিছুটা, ভঙ্গিটা কাঁচুমাচু। মাটি খুঁড়ছে সে পা দিয়ে, তাকাচ্ছে না। ‘আমি ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব,’ বলল। ‘যে পথে এসেছি সে পথে ফিরে যেতে পারব। একটু খাবার দিয়ে দিয়ো শুধু। আমরা থাকলে তোমার কাজে শুধু বাগড়াই দেব।

বুড়ো র‍্যামন নিথর দাঁড়িয়ে, শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্যে বুকের ওঠানামা ছাড়া শরীরের আর কোন কম্পন নেই। মাথা ফিরিয়ে নদীর ভাটিতে চোখ রাখল বুড়ো র‍্যামন, নদী যেখানে দূরে প্রকাণ্ড জমিটায় প্রবাহিত হয়ে আরও সুদূরে একটা নিচু রিজে বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়েছে। পানির শেষ ফোঁটাগুলো ঝরে গেছে তার গা থেকে, মুখমণ্ডল থেকে জলকণা শুষে নিয়েছে সূর্যের উষ্ণতা, এখনও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মস্ত প্রান্তরটির দিকে চেয়ে রয়েছে সে।

‘আই,’ নরম গলায় বলল এবার ও। ‘বুড়ো হয়েছি তো, ছোটবেলার কথা বারবার ভুলে যাই।’

লম্বা লম্বা পদক্ষেপে ছেলেটির কাছে এসে থামল বুড়ো র‍্যামন। হ্যাটটা নিয়ে কাত করে পরল মাথায়। লাঠিটা নিয়ে মাটিতে গেঁথে ভর দিল শরীরের।

‘বাগড়া দেয়ার ব্যাপারে বোকার মতন আর কোন কথা বলব না আমরা, কেমন? পানিতে একটু নামলে কি হয়? গোসলটা তো হয়ে গেল। লোকে বলে না, রাখাল কখনও ইচ্ছা করে গোসল করে না যদি না তার ভেড়া পানিতে পড়ে যায়? আমার মনে হয় র‍্যামন এই সুযোগে খুব মজা করে গোসল সেরে নিয়েছে।’ ভেড়ার পালের উদ্দেশে ফিরে শিস বাজাল ও মুখে দু’আঙুল পুরে, একবার, দু’বার, এবং বাদামী কুকুরটা পালটাকে এক পাক খেয়ে ওর দিকে ছুটে এল। বুড়ো এবার ছেলেটির দিকে ফিরে, লাঠি দিয়ে নদী থেকে উঠে যাওয়া লম্বা, নিচু ঢালটাকে কোনাকুনি নির্দেশ করল।

‘দক্ষিণ পশ্চিমে যে মেসাটা উঠে গেছে দেখতে পাচ্ছ?’

‘পাচ্ছি,’ বলল ছেলেটি।

‘আমরা ওইদিকেই যাচ্ছি। সোজা ওইটার দিকে গিয়ে তারপর ঘুরে বাম দিকে।।’

বাদামী কুকুরটা নিতম্বের ওপর বসে বুড়ো র‍্যামনকে দেখছে।

‘পেদ্রো,’ বলল বুড়ো, দেখাল ছেলেটিকে। ‘ও কিছু সময়ের জন্যে তোর মনিব হবে। ও যা বলে তাই করবি তুই।’

ছেলেটি ঝট করে খাড়া হয়ে একদৃষ্টে চেয়ে রইল বুড়ো র‍্যামনের মুখের দিকে।

‘কিন্তু- কিন্তু আমি তো কিছুই বুঝি না।’

বুড়ো র‍্যামন লীড রোপটা নেয়ার জন্যে হাত বাড়াল।

‘আমার নীতি হচ্ছে করে শেখা। যেমনটা বলেছি তুমি ভেড়ার পালটার দায়িত্ব নেবে। তুমি আমার পেদ্রো আর তোমার স্যাঞ্চো। দলটাকে তুমি সঠিক রাস্তায় আস্তে আস্তে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। আমি এখানে বসে বসে জুতা থেকে পানি ফেলব আর হয়তো একটুক্ষণ জিরাব। তারপর আসব তোমাদের পিছন পিছন।’

কিশোর সিধে হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে। বুড়ো বাদামী কুকুরটা চেয়ে আছে ওর দিকে দেখতে পেল। আর বুড়ো র‍্যামন লাঠিটা বাড়িয়ে ধরেছে। ওটা নির্ল ও। যথেষ্ট লম্বা নয় বলে লাঠির আগার গোলাকৃতি হাতলে ভর দিয়ে বুড়োর ভঙ্গিতে দাঁড়াতে পারল না কিশোর; তবে নিচের দিকটা চেপে ধরে ঠেস দিল। বাদামী কুকুরটার উদ্দেশে চেয়ে মাথা নাড়ল ও, এবং ওটা ছুটে গেল পালের দিকে। কালো কুকুরটা পিছু নিল ওটার দেখাদেখি, তবে ওটাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল না। ছেলেটি রওনা হলো এবার, ধীরে ছন্দোবদ্ধ কদম ফেলছে আর দোলাচ্ছে লাঠিটা।

বুড়ো র‍্যামন গর্দভটার লীড রোপ কব্জিতে পেঁচিয়ে বসে পড়ল নদীর ঢালে, ব্যস্ত হলো পুরানো বুটটা খুলতে।

‘আই,’ মৃদু কণ্ঠে বলল ও। ‘আমি একটা আস্ত বুদ্ধু। কিছুতেই মনে থাকে না…’