Accessibility Tools

ওল্ড র‍্যামন – জ্যাক শেফার

ওল্ড র‍্যামন – ৬

ছয়

বিকেলের তির্যক সূর্যচ্ছটা গায়ে মেখে অবিরাম এগিয়ে চলেছে ভেড়ার পালটি। একটা জমাটবাঁধা পিণ্ডের মতন দেখাচ্ছে ওটাকে। গতিবিচ্যুতি নেই-ই বলতে গেলে দলটার মধ্যে। গুটি কয়েক ভেড়া কেবল সামান্যসংখ্যক ক্রিয়োসট ঝোপের কালো, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মোমতুল্য পাতায় থেমে পড়ে নাক ঘষছে, পরখ করছে ঝোপের নিচে জমি, যদি দেখা মেলে টিকে যাওয়া কোন ঘাসের শেকড়ের। মস্ত বিশাল এই প্রান্তরে ভেড়ার পাল, ওটার দু’পাশে দুটো, কুকুর, বুড়ো র‍্যামন, ছেলেটি এবং মালবাহী গর্দভটা ছাড়া আর সব কিছু যেন নিষ্প্রাণ, চারদিক যেন থম ধরে আছে। কোন

ভেড়ার মুখে টু শটি নেই, কেবল আকস্মিক কাশির বা ধুলোয় ফুঁ দেয়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, আর শোনা যাচ্ছে বালুময় জমিতে অসংখ্য খুদে খুদে খুরের মর্মরধ্বনি।

হঠাৎ নতুন একটা স্পন্দন বয়ে গেল দলটার মধ্যে। সামনের ভেড়াগুলো থেমে পড়ছে এবং অন্যগুলো পেছন থেকে এসে জড়ো হচ্ছে, সবাই মিলে ছোট্ট একটা জায়গাকে কেন্দ্র করে একটা চক্র তৈরি করছে। ভেতরদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে পড়েছে ওরা, মাথা সামান্য বাড়ানো, অদ্ভুত তীক্ষ্ণ একটা শব্দ করছে প্রাণীগুলো

শুকনো ঠোঁট চাটল কিশোর।

‘ও কি?’

‘সাপ,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘র‍্যাটলস্নেক। অন্য কিছু হলে ভেড়াগুলি ওইরকম শব্দ করত না। বুদ্ধগুলা ওইটাকে পাশ কাটিয়ে যাবে না। তারা ওইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে দিনমান গাধার মতন ভাবতে থাকবে। আমার পিছন পিছন আসো, দেখতে পাবে।’

দলটার মধ্যে দৃঢ় পায়ে প্রবেশ করল বুড়ো র‍্যামন, জায়গা করে নিয়ে সামনে এগোল। কিশোর লীড রোপ ফেলে দিয়ে তাকে অনুসরণ করল। ফাঁকা স্থানটার কিনারে পৌঁছতে দেখল, মধ্যখানে ইয়া মোটা দেহ কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে রয়েছে বিষধর সাপটা। ছোট ভোঁতা মাথাটা তুলে কুণ্ডলী থেকে লেজ বের করে র‍্যাটলগুলো বোঁ বোঁ করে ঘুরাচ্ছে, ভেড়াদের তীক্ষ্ণ ধ্বনির কারণে অবশ্য শব্দটা কানে আসে না।

বুড়ো র‍্যামন ছেলেটিকে পেছনে থাকতে ইশারা করে নিজে সামনে পা বাড়াল, গেঁটে লাঠিটা তৈরি রয়েছে হাতে। কিন্তু কালো কুকুরটা এমুহূর্তে পেছন থেকে ছুটে এসে ছেলেটিকে এবং বুড়ো র‍্যামনকে অতিক্রম করে, উত্তেজিতভাবে গর্জাতে গর্জাতে তেড়ে গেল সাপটার উদ্দেশে। বুড়ো র‍্যামন এক লাফে আগে বেড়ে দু’হাতের মিলিত শক্তিতে প্রচণ্ড এক বাড়ি মারল কুকুরটার দেহের একপাশে। কেঁউ কেঁউ করতে করতে পিছিয়ে এসে ছেলেটির গা ঘেঁষে দাঁড়াল ওটা। বুড়ো র‍্যামন লাঠি বাগিয়ে সতর্কতার সঙ্গে সামনে এগোল। সাপটা অকস্মাৎ মাথার কাছে লাঠির ডগায় ছোবল মেরে বসল, শরীর খানিকটা ছেড়ে দিয়েছে, গুটাতে যাবে ফের তার আগেই বুড়ো র‍্যামনের মোক্ষম এক বাড়ি পড়ল ওটার মাথার ঠিক পেছনে। ভাঙা ঘাড় নিয়ে মাটিতে পাক খেতে লাগল র‍্যাটলস্নেকটা।

বুড়ো র‍্যামন ত্বরিত লাঠিটা আড়াআড়ি ফেলে দিল ওটার মাথার কাছে, একটা পা লাঠিতে তুলে চাপ দিয়ে, অপর পায়ের গোড়ালি দিয়ে মোচড়রত চ্যাপ্টা মাথাটা অনবরত দাবিয়ে ঢুকিয়ে দিল বালির গভীরে। এবার কোমরে বাঁধা চামড়ার খাপ থেকে ক্ষুরধার ছোরাটা বের করে ঝুঁকে পড়ল। তখনও পাক খেয়ে চলেছে লেজটা,

ওটা থেকে এক পোঁচে র‍্যাটল কেটে আলাদা করে ফেলল বুড়ো। ছোরাটা খাপে পুরে লাঠিটা তুলে নিয়ে এগিয়ে এল ছেলেটার দিকে। বাড়িয়ে ধরল হাতের তালুতে ধরা র‍্যাটল।

ভেড়ারা এখন একেবারে নিশ্চুপ, নীরবে চেয়ে রয়েছে বৃত্তটির কেন্দ্রে। গুমোট নিথরতায় বুড়ো র‍্যামনের দিকে মুখ তুলে চাইল কিশোর। বিবর্ণ দেখাচ্ছে তাকে। মাথা নামিয়ে চোখ রাখল মাটিতে।

‘চাই না আমার, বলল।

র‍্যাটলের খুদে মোচাটা বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর মাঝে ধরে রইল বুড়ো র‍্যামন, পরখ করছে কাছ থেকে।

‘এইখানে কিন্তু পুরাটা আছে, বলল। ‘বাটন-নাবটা পর্যন্ত আছে। চাইলেই কিন্তু এত সুন্দর ঝুমঝুমি সব সময় পাওয়া যায় না। সাপে নিজেই ভেঙে ফেলে। পাথরে বাড়ি না মারলে ভাঙার কথা না তবুও কেন যে ভেঙে যায় আজও জানি না।’

ছেলেটি নীরবে দাঁড়িয়ে, চোখ তার পায়ের কাছে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা কালো কুকুরটার প্রতি। বুড়ো র‍্যামন কি আর করা এমনি ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে মলিন শার্টটির তাপ্পি, মারা পকেটে রেখে দিল র‍্যাটলটা। ঘুরে চাইল ভেড়াগুলোর দিকে, অস্থিরভাবে ছোটাছুটি করছে ওগুলো।

‘ওকে অত জোরে মারার কোন দরকার ছিল না,’ বলল ছেলেটি। ‘ওর খুব লেগেছে।

‘এহ,’ ফিরে চেয়ে বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘কুকুরটার কথা বলছ? আই, মারটা জোরেই পড়েছে। কিন্তু সেইটা ওর ভালর জন্যেই। সাপ কুকুরের চাইতে অনেক বেশি চাল্লু। কুকুর হারিয়ে সাপ মারার কোন মানে আছে?’

ছেলেটি ডান পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁটছে। ‘হয়তো তাই। কিন্তু তাই বলে অত জোরে কেউ মারে?’

‘সব দোষ আমার, না?’ হতাশায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠল বুড়ো র‍্যামন। ‘একটা লোক নিজেই যখন সাপের মত দ্রুত নড়াচড়া করছে তখন বুঝবে কিভাবে কত জোরে মেরেছে? ওর সঙ্গে কথা বলার সময় ছিল তখন? না! ও যাতে বোকার মত কাণ্ডকারখানা না করে সেইটা বুঝিয়ে বলার উপায় ছিল? না! ওই অবস্থায় কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব বাড়িটা কতখানি জোরে মারা উচিত? না! এই রকম দশ হাজার যুক্তি দেখাতে পারব আমি! কি করা উচিত ছিল না ছিল এইসব আমাকে বলতে এসো না। র‍্যামন জীবনে এমন অনেক কাজ করেছে যেইগুলি করা ঠিক হয় নাই! কিন্তু কেউ বলতে পারবে না জীবনে কখনও বিনা কারণে কোন কুকুরের গায়ে হাত তুলেছে সে!’

আগুন ঝরাচ্ছে সূর্য। গুমোট গরমে বিক্ষিপ্তভাবে নড়াচড়া করছে ভেড়াগুলো। বুড়ো র‍্যামন একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে নতমুখে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরটির দিকে। প্রাচীন, প্রকাণ্ড হ্যাটটা খুলে নিয়ে মাথার চারধার মুছে নতুন এক কায়দায় আবার বসাল ওটাকে। দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে ত্যাগ করল ধীরে ধীরে 1.

‘শোনো, আমি ওইটাকে বুঝিয়ে বলব। আর ও সত্যিকারের মানুষ হতে চাইলে বুঝবেও ব্যাপারটা।

গোড়ালির ওপর বসে কালো কুকুরটার মুখের দিকে চাইল বুড়ো র‍্যামন। কিন্তু কুকুরটা আরেকটু নিচু হয়ে, ক’ইঞ্চি পিছু সরে গেল, তাকাবে না বুড়োর দিকে।

‘স্যাঞ্চো,’ ডাকল বুড়ো। নিচু, নরম কণ্ঠস্বরটা যেন গলার একদম ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। এবং কালো কুকুরটা পিছে হটা বাদ দিয়ে ওর দিকে মুখ তুলে চাইল।

‘আই, স্যাঞ্চো, তুই যেমন আনাড়ি তেমন চঞ্চল। কথা সত্যি, আমি তোকে মেরেছি। কিন্তু তুইই বল, রাগের মাথায় মেরেছি? মেরেছি তো তোকে বিষের হাত থেকে বাঁচাতে। র‍্যামন তার সারাটা জিন্দেগী কাটিয়ে দিল কুকুরদের সাথে আর কুকুররা হলো নিঃসন্তান বুড়াটার কাছে তার আপন সন্তানের মতন। মানুষ হয়ে না জন্মালে খোদার কাছে কুকুর করে জন্ম দেয়ার জন্যে দোয়া করত ও। তুই কি মনে করিস খালি খালি তোকে মেরেছে র‍্যামন?’

কালো কুকুরটা এখন একটু একটু করে সামনে বাড়ছে এবং ছেলেটি মোহিত দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখছে। বুড়ো র‍্যামন অনুচ্চ, মোলায়েম কণ্ঠে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে।

‘আই, স্যাঞ্চো। তুই আমাদেরকে, ভেড়াগুলাকে বাঁচাতে চেয়েছিলি, তোর সাহসের প্রশংসা করি আমি। কিন্তু সাপের সঙ্গে কোন জারিজুরি চলে না রে। কাজটা বোকামি হচ্ছিল। সাপ মারবে মানুষে কারণ মানুষের হাতে লাঠি থাকে, তাকে বিষে ক্ষতি করতে পারে না। আমি জানি এর পরেরবার তোর আর এই ভুল হবে না।’

কালো কুকুরটা এমুহূর্তে কাছে এসে মাথা বাড়িয়ে দিয়েছে, বুড়ো র‍্যামনের হাত চেটে দিচ্ছে। বুড়ো র‍্যামন কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে, কি যেন এক জাদু স্পর্শে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে পেল ওটা। লাফিয়ে উঠে বুড়ো র‍্যামনের গায়ে থাবা তুলে দিয়ে তারপর ঘুরেই ছুটে গেল ছেলেটির কাছে।

কিশোর ঝুঁকে দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরে খানিক কুস্তি লড়ল প্রিয় কুকুরটার সঙ্গে।

‘আমার স্যাঞ্চো এখন থেকে সব মনে রাখবে। ও সব শিখে নিয়েছে।

বুড়ো র‍্যামন সিধে দাঁড়িয়ে ভেড়ার পালটার ওপর নজর বুলাচ্ছে। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ঘুরতে দেখা গেল গুটি কয়েককে। বুড়ো বাদামী, কুকুরটা প্রচণ্ড গরমে-হ্যা-হ্যা করছে, আর ছোটাছুটি করে ওগুলোকে জড়ো করে, সঠিক পথে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।

‘পেদ্রোকে শেখাতে হয় নাই,’ সংক্ষেপে বলল বুড়ো র‍্যামন। পাঁই করে ঘুরে কুকুরটাকে সাহায্য করতে এগোল। দলটা ফের সুগঠিত হয়ে থপ থপ করে চলতে লাগল।

ছেলেটি স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে লক্ষ করছে দলটিকে। পায়ের কাছে কালো কুকুরটার উপস্থিতি হঠাৎ টের পেল যেন।

‘স্যাঞ্চো, আমাদেরকে ওদের দরকার নেই। কিন্তু আমরা আমাদের সাধ্যমত করব। যা, দলটার কাছে যা।’

সবেগে সামনে তেড়ে গেল কালো কুকুরটা, থমকে পড়ে পিছু ফিরে একবার চাইল। ছেলেটি হাত নেড়ে এগোতে নির্দেশ দিল, ওটাকে। কিশোর এবার শ্লথ পায়ে পেছন দিকে হেঁটে গিয়ে গর্দভটার লীড রোপ হাতে নিল। দলটাকে ধীর গতিতে অনুসরণ করতে লাগল ও, ওদিকে দলছুটগুলোকে তাড়া দিয়ে লম্বা লম্বা কদমে দলের পেছন পেছন চলছে বুড়ো র‍্যামন।

ধুলো উড়ে যাচ্ছে পেছন দিকে, মন্থর গতিতে চলেছে ছেলেটি। একটু পরে গতি দ্রুততর হলো ওর এবং লীড রোপে ঝাঁকুনির মাত্রা বাড়তে লাগল। খানিক বাদে বুড়ো র‍্যামনের পাশে চলে এল ও। নিঃশব্দে এগিয়ে চলল ওরা, নীরবতা ভাঙছে কেবলমাত্র অকস্মাৎ কাশির আর ভেড়াদের খুরের শব্দে।

‘দেবে না?’ লাজুক লাজুক কণ্ঠে বলল ছেলেটি।

বুড়ো র‍্যামন চাইল না ওর দিকে। শার্টের ছেঁড়া পকেটে বিনাবাক্যে হাত ঢুকিয়ে মোচাকৃতি খুদে র‍্যাটলটা বের করল। ছেলেটির দিকে বাড়িয়ে ধরতে সে নিল ওটা। ছটা আংটি, শিঙের মতন শক্ত, নাড়াচাড়া করলে বোঁ বোঁ শব্দ করে, আগার বাটন-নাবের কাছে সরু হয়ে গেছে ক্রমে ক্রমে।

‘আজকে রোদটা বড্ড বেশি, বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘মোজেভে যেমন ছিল ঠিক তেমন। এর কারণে লোকের মাথা যায় গরম হয়ে আর যা বলা উচিত না তাই বলে বসে…’

এক হাতে লীড রোপ আর অপর হাতের মুঠোয় শক্ত করে ঝুমঝুমিটা ধরে পা চালাচ্ছে কিশোর। মাথা উঁচু তার, চোখে ফাঁকা দৃষ্টি। ওর দাদাও একবার বুড়ো র‍্যামনের সঙ্গে এমনি সফরে বেরিয়েছিল, মনে খেলা করছে ভাবনাটা।