Accessibility Tools

ওল্ড র‍্যামন – জ্যাক শেফার

ওল্ড র‍্যামন – ৭

সাত

প্রকাণ্ড প্রান্তরটির ওপর বাতাস গরম আর ভারী হয়ে ঝুলে আছে। চলমান ভেড়ার পালটির ওপর যেন সারাদিনের ঘনবদ্ধ উত্তাপ তার ওজন ছেড়ে দিয়েছে। পশ্চিম দিগন্তে দিবাকর ঢলে পড়লেও শুকনো বালিতে এতটুকু কমতি নেই তার চোখ রাঙানির। বাতাস কেমন গুমোট, নিথর হয়ে আছে। খুদে খুদে খুরের আঘাতে ধুলো উঠে ঝুলে থাকছে দলটিকে ঘিরে, তারপর দল এগিয়ে গেলে পেছনে মিশে যাচ্ছে নিষ্কম্প বাতাসে। ধুলো মাড়িয়ে ঠিকই নির্ভীক ভঙ্গিতে এগিয়ে চলেছে বুড়ো র‍্যামন, লাঠিটা একটু বেশি ব্যবহার করতে হচ্ছে তাকে এই যা, দলচ্যুতদের পেছনে লেগেই আছে আঠার মতন।

এক পাশে, ধুলোর আড়ালে, মালবাহী গর্দভটাকে লীড করে কষ্ট সয়ে হেঁটে চলেছে কিশোর। প্রতিটি কষ্টকর পদক্ষেপে আরেকটু নুয়ে পড়ছে তার দেহ, এই দুর্গমযাত্রার কি কোন শেষ নেই, ভাবছে ওর ক্লান্ত মনটা।

বুড়ো র‍্যামন ধুলোর এপাশে, ছেলেটির পাশে সরে এল। সে থেমে পড়তে ছেলেটিও থামল। সূর্যের তেরছা বিভা থেকে বাঁচতে হ্যাটের কিনারটা টেনে নিচু করে দিল বুড়ো র‍্যামন, তীব্র উত্তাপে কম্পমান সুদূর দিগন্তের চারদিকে নজর বুলিয়ে নিল।

‘আমি ঠিকই টের পাচ্ছি,’ বলল ও। ‘কিন্তু বিকালের সেই বাতাস কই যাতে মানুষ আর জানোয়ারগুলোর প্রাণ একটু জুড়াবে? নাই। হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি আমি। লুকিয়ে আছে ওরা। চুরি করে গায়ে বল জড়ো করছে যাতে হঠাৎ করে আমাদের চমকে দিতে পারে।’

শুকনো ঠোঁটে জিভ ঠেকাল কিশোর।

‘বুঝলাম না।’

‘চরো,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘ধূলিঝড়।’ দিগন্ত আরেকবার জরিপ করে নিল। ‘আই, দেখছ?’ সুদূর দক্ষিণে ম্লান হয়ে আসছে দিগ্‌বলয়। আকাশ আর মাটি মিলেমিশে ঝাপসা বাদামী রঙে পরিণত হচ্ছে, তির্যক সূর্যকিরণ থেকে আলোকচ্ছটা ধার করে রঙটা আবার রঙিন ঝিলিক ছড়াচ্ছে। দূর থেকে দৃশ্যটা অপরূপ, মোহনীয় দেখালেও এর মধ্যে একটা অশুভ ইঙ্গিত রয়েছে।

বুড়ো র‍্যামন গর্দভটার কাছে গিয়ে, ওটার পিঠে দেহের ভার চাপাতে হেলান দিল। পাগুলো সামান্য ছড়িয়ে চাপের প্রতিকূলে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করল গাধাটা। ছেলেটি হতবুদ্ধির মতন দেখল বুড়ো র‍্যামন আচমকা হামাগুড়ির ভঙ্গিতে চেপে বসেছে জানোয়ারটার পিঠে, এবং দু’পাশ থেকে পরস্পরকে ব্যালান্স করল বেঁধে রাখা প্যাক দুটো। দৃঢ়ভাবে পা এঁটে রাখল গাধাটা, ঈষৎ নড়ে উঠলেও মুহূর্তে সামলে নিল নিজেকে। সন্তর্পণে তাল সামলে উঠে দাঁড়াল বুড়ো র‍্যামন। যতদূর দৃষ্টি যায় চোখ বুলিয়ে নিল চারধারে। তারপর এক লাফে নেমে পড়ল গাধার পিঠ থেকে, ভারমুক্ত হয়ে শরীর কাঁপতে লাগল জানোয়ারটার।

বুড়ো র‍্যামন তার জীর্ণ পোশাকের কোত্থেকে যেন একটা মলিন ব্যান্ডানা বের করে ছেলেটির হাতে দিল।

‘নাকে মুখে ভাল মতন বেঁধে নাও। টাইট করে।’ লাঠি ফেলে ছোরা খাপমুক্ত করল বুড়ো র‍্যামন, তারপর ছিন্নভিন্ন শার্টটার একটা প্রান্ত টান মেরে খুলে ফেলল বেল্ট থেকে এবং ছোরার এক পোঁচে কেটে নিল অংশটুকু। পরমুহূর্তে ছোরাটা ফিরে গেল খাপে, আর শার্টের টুকরোটা মাথায় বাঁধা পড়ে ঢেকে দিল মুখ আর নাক। কাপড়ের আড়াল থেকে রুদ্ধ কণ্ঠস্বর শোনা গেল ওর।

‘কাছে কাছে থেকো! আমাকে আর পালটাকে হারিয়ে ফেলো না কিন্তু!’ ছোঁ মেরে লাঠিটা তুলে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ভেড়ার দলটার উদ্দেশে ছুট দিল। ছোটার ফাঁকে কাপড়টা একটুখানি সরিয়ে মুখে দু’আঙুল পুরে তীক্ষ্ণ শিস দিল।

‘এহ, পেদ্রো! বুদ্ধি তো তোর কম না! সবই দেখতে পাচ্ছিস! ওঁদের ফিরিয়ে আন, পেদ্রো আমার! ফেরা! শিগগিরি!

অনুসরণরত কিশোরটি দেখতে পেল বুড়ো র‍্যামন এক হাতের ঝাপ্টায় পশ্চিম থেকে উত্তর-পশ্চিমে ইঙ্গিত করতেই, উজ্জ্বল সূর্যালোকে বিজলীর মত ঝলসে গেল বাদামী কুকুরটা। এখন আর মৃদুভাবে নয় বরঞ্চ খেপাটে ভঙ্গিতে আগুয়ান ভেড়াগুলোকে পশ্চিম এবং উত্তর পশ্চিম কোণে মুখ ফেরাতে বাধ্য করল ওটা। মাথা খানিকটা সিধে হয়ে গেল ছেলেটির, কালো কুকুরটিকে বুঝদারের মত সাহায্যের জন্যে ছুটে যেতে দেখে। দলটি দ্রুত এগোছে সংগঠিত হয়ে; প্রকাণ্ড প্রান্তরটিতে যেন একটা লম্বা বাঁক নিয়ে বয়ে চলেছে ভেড়ার স্রোত। বুড়ো র‍্যামনের শিস, চেঁচামেচি আর ইশারা-ইঙ্গিত এবার বাদামী কুকুরটাকে পাঠিয়ে দিল দলের ওপাশে, বাঁকটা সোজা করতে, উত্তর-পশ্চিমে ক্ষিপ্রগতিতে এখন প্রবহমান ভেড়ার ঝাঁকটি। দু’পাশ থেকে সমান তালে দৌড়চ্ছে কুকুর দুটো, দলটাকে দীর্ঘ একটি সারিতে ধরে রাখছে। ধীর গতিসম্পন্ন ভেড়াগুলোকে এদিক-ওদিক লাঠি নেড়ে পেছন থেকে তাড়িয়ে নিচ্ছে বুড়ো র‍্যামন। আর লীড রোপ ঝাঁকি মেরে রীতিমত ছুটছে ছেলেটি, কখনও বা একটুক্ষণের জন্যে গতি কমিয়ে দম উদ্ধার করে ফের ছুট লাগাচ্ছে।

সহসা সূর্যের অগ্নিদৃষ্টি ম্লান হয়ে মিলিয়ে গেল। মাথার ওপরে প্রকাণ্ড সব ধুলোটে রঙের মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে। দিনের আলো অদ্ভুত এক বাদামী রং ধরে মরে এল, এবং দমকা হাওয়ার প্রথম ধাক্কাটা পাক খেয়ে, রাজ্যের ধুলো উড়িয়ে সবেগে ওদের পাশ কাটাল। দৌড়চ্ছে ছেলেটি, শক্ত করে ধরে আছে রশি, বাতাসের সর্বত্র ধুলোর তাণ্ডব বলে ক্ষণে ক্ষণে চোখের পাতা ফেলতে হচ্ছে, সামনে বুড়ো র‍্যামনের অপসৃয়মাণ দেহে দৃষ্টিনিবদ্ধ ওর। স্পষ্ট করে কিছু দেখতে না পেলেও অনুমান করল একটু বুঝি ঢালু হয়ে গেছে জমি এবং খানিকটা হয়তো বা বাঁক নিয়েছে ওরা। পায়ের নিচে মাটি এখন আগের চাইতে ঘন, আলগা, অনেকটা অ্যারোয়োর বেডের মতন।

আঘাত হানল ঝড়, দমকা বাতাস ধেয়ে এল ঢাল বেয়ে। ওপরে তার তীক্ষ্ণ আর্তনাদ, এবং ওটার নিচে ঝড়ো বাতাসের দ্রুত লয়ে ড্রাম পেটানোর ভোঁতা অথচ ভারী শব্দ। চারদিক মুছে গেছে উড়ন্ত ধুলো আর বালিতে। বাতাসের প্রতিকূলে হেলান দিয়ে কেবল দাঁড়াতে পারছে ছেলেটি, শ্বাস নিতে হচ্ছে তাকে মুখ ফিরিয়ে। সুচের মতন খোঁচা দিচ্ছে বালিকণা কাপড় ভেদ করে, যেভাবেই হোক ফাঁক-ফোকর খুঁজেপেতে ঢুকে পড়ে আঁচড় বসাচ্ছে চামড়ায়। বাতাসের ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে পড়ার দশা হলো ওর। বুড়ো র‍্যামনের ঝাপসা শরীরটা একবার চোখে পড়ল কি পড়ল না, তারপর হারিয়ে গেল সেটা। আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না ও। অজানার উদ্দেশে টলতে টলতে এগোল বেচারা। ঠাণ্ডা বাতাস কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে হাড়-মাংস, কে বলবে একটু আগেও গরমে সেদ্ধ হচ্ছিল ওরা! হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে একপাশে হেলে পড়ল ছেলেটি, সে আর গাধাটা ছাড়া এখন আশপাশে আর কেউ নেই, উড়ন্ত ধূলিকণা আর হিমশীতল দমকা বাতাস গোটা দুনিয়া থেকে আলাদা করে দিয়েছে ওদেরকে। হাঁটুর ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল ও, উঠে দাঁড়াবার চেষ্টাও করল না। বাতাসের দিকে পিঠ দিয়ে কুঁজো হয়ে বসল ছেলেটি, দু’হাতে মাথা ঢেকে রেখেছে। দড়িতে গর্দভটার ঝাঁকুনি অনুভব করে, আরও শক্ত হাতে ওটা চেপে রেখে মাটিতে দেহ প্রায় সাঁটিয়ে দিল ও।

বাতাস তারস্বরে চেঁচাচ্ছে মাথার ওপর, ড্রাম পেটাচ্ছে। আর বালিকণা চিরে ফালাফালা করে দিচ্ছে ওকে। বাতাস আর ধুলো-বালি যেন যুক্তি করেছে গা থেকে কাপড় ছিঁড়ে কুটিকুটি না করে থামবে না। কাঁধ কেঁপে কেঁপে উঠছে ছেলেটির, শুধু যে ঠাণ্ডা বাতাসের কারণে তা-ই নয়, শ্বাস নিতে ফোঁপাচ্ছে বলেও।

আবছাভাবে কারও গলা শোনা গেল কি? বহু দূর থেকে যেন ভেসে আসছে কণ্ঠস্বরটা এবং ভাল করে শুনতে পাওয়ার আগেই মিলিয়ে যাচ্ছে। পেছনের বাঁ দিক থেকে আসছে ওটা। বাঁ বাহু সামান্য তুলে ওটার নিচ দিয়ে উঁকি মারল ছেলেটি। অস্পষ্ট একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে ওর দিকে। কাছে এলে দেখা গেল বুড়ো র‍্যামন, ঝড়ো বাতাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত এক দীর্ঘদেহী ঋজু সৈনিকের মত লাগছে তাকে। প্রাচীন অতিকায় হ্যাটটা কান পর্যন্ত টেনে নামিয়েছে সে, শার্টের টুকরোয় সারা মুখ ঢাকা, বালিকণা ভর্তি ঘন ভ্রূর নিচে জ্বলজ্বল করছে শুধু মান্ধাতা আমলের একজোড়া চোখ। ছেলেটির পাশে গুটিসুটি মেরে বসল ও। ওর সগর্জন রুদ্ধ কণ্ঠস্বর উড়ে যাচ্ছে বাতাসে।

‘আই, ভোঁদড়ের মতন মাটি খুঁড়ছ কেন? বাতাস সামান্য একটু ভড়কি দিচ্ছে খালি! এত ভয় পেলে চলে?’

বুড়ো রশিটা নিয়ে টানতে লাগল গর্দভটাকে, নিরীহ জানোয়ারটা একপেশে ভঙ্গিতে বাতাসের দিকে পেছন দিয়ে কাছে চলে এল ওর।

‘শোনো, ছেলে। গাধার কাছে এই ঝড় কিছুই না। তার চোখ আছে নাক আছে শক্ত চামড়া আছে। তুমি ওই পাশের প্যাকরোপগুলো ধরে মাথা নিচু করে এইটার সাথে সাথে যাবে। বাতাসের ঝাপ্টা ও-ই সামলাবে। তাছাড়া চলেও এসেছি প্রায়।

বুড়ো র‍্যামন উঠে এক টানে ছেলেটিকে দাঁড় করিয়ে গর্দভটার ওপাশে ঠেলে দিল। বাতাসের বিপরীতে ঝোঁক দিয়ে পা চালাল কিশোর এবং রশিতে টান পড়তে গাধাটা চরকির মতন ঘুরল অনুসরণ করতে, ওটা আধো হাঁটিয়ে আধো হিঁচড়ে নিয়ে চলল চোখ বুজে, নত মুখে দড়ি আঁকড়ে ধরে থাকা কিশোরটিকে।

ছেলেটি হঠাৎ অনুভব করল বাতাসের তেজ কমে গেছে। আগের চাইতে গর্জন আর দাপাদাপি অবশ্য বেশি এ মুহূর্তে। কিন্তু গাধার গায়ের আড়ালে থাকায় আগের মত আর চাবুক কষিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেয়ার চেষ্টা করছে না। চোখ মেলে মাথা একটুখানি তুলল ও। ঘূর্ণায়মান ধুলো-বালিতে বাতাস পরিপূর্ণ, কিন্তু দমকা হাওয়ার নিষ্ঠুর উত্থান-পতন আর নাগাল পাচ্ছে না ওর। মাথার ওপর দিয়ে ধেয়ে চলে যাচ্ছে। টের পাচ্ছে ও অ্যারোয়োটি গভীরতা পেয়েছে এবং দু’পাশে এখন এক মানুষ সমান চড়াই।

গর্দভটা এ সময় থেমে পড়তে ছেলেটি সিধে হয়ে চারদিকে চাইল। বিদঘুটে বিবর্ণ গোধূলির আলোয় কয়েকটা ভেড়া চোখে পড়ল ওর। জড়াজড়ি করে একটা চড়াইয়ের নিচে দাঁড়িয়ে, এবং ওদের ওপাশে ধুলোটে অস্পষ্টতায় চড়াই বেয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্যগুলো।

‘সব এখানেই আছে।’ গর্দভটার পাশ থেকে বলল বুড়ো র‍্যামন। কষে বাঁধা দড়ির নিচ থেকে একটা ব্ল্যাঙ্কেট টেনে বের করছে। ‘পেদ্রো ওদেরকে ওপরে ধরে রাখবে। আর হ্যাঁ, স্যাঞ্চোও। আমরা এখানে নিচে থেকে লক্ষ রাখব যাতে ঝড়ের মধ্যে একটাও ঘোরাফেরা করতে না পারে।’

ও গাধাটার পশ্চাদ্দেশে একটা চাপড় মারতে ওটা ছুটল ভেড়াগুলোর কাছে। বুড়ো র‍্যামন এবার ছেলেটার কাঁধ জানি দোস্তের মত এক হাতে জড়িয়ে বাতাসের উজানে যে চড়াইটা রয়েছে সেদিকে নিয়ে গেল। মস্ত মস্ত কিছু পাথর আর ঝুল-পাথর এখানে একটা ছোটখাট গুহা মত সৃষ্টি করেছে। নিজে বসে ছেলেটিকে টেনে পাশে বসাল বুড়ো র‍্যামন, ব্ল্যাঙ্কেটটা জড়িয়ে দিল দু’জনেরই গায়ে-মাথায়। শার্টের ফালিটা মুখ থেকে নামিয়ে গলায় ঝুলাল ও, থুথু ফেলল এক পাশে।

‘ঠিক সময় মত পৌঁছতে পেরেছি,’ বলল। ‘আসল ঝড় শুরু হবে এখন।

ছেলেটি চকিতে ওকে দেখে নিল, হতভম্ব। ব্ল্যাঙ্কেটের ভেতর আরেকটু কুঁকড়ে গেল ও। কানের ওপর এঁটে বসে আছে ওর ছোট্ট হ্যাটটা, মুখ ঢাকা ব্যান্ডানার ফাঁক দিয়ে আয়ত চোখজোড়া চেয়ে রয়েছে, ঘন ঘন চোখের পাতা পড়ছে। কান পেতে ওপরে বাতাসের তীক্ষ্ণ চিৎকার আর নিচে ধড়ফড়ানির শব্দ শুনছে ও। পায়ের নিচের মাটি যেন কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে প্রবল ঝড়, সে সঙ্গে বাড়ছে অন্ধকার। অচেনা অদ্ভুত, এমন অনুজ্জ্বলতা কোনদিন দেখেনি ও। শিউরে উঠে বুড়ো র‍্যামনের গায়ে গা ঘেঁষে বসল। মাথার ওপরে বাতাস তো নয় যেন শত সহস্র দৈত্য-দানো হাউ-মাউ-খাঁউ করে চারদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে ওদেরকে।

কাঁপুনিটা টের পেল বুড়ো র‍্যামন।

‘আরে কিছু না— বাতাস,’ সান্ত্বনার সুরে বলল। ‘এখানে আমাদের কোন ভয় নাই। আর আমার মনে হচ্ছে ও আমাদের ক্ষতি চায়ও না। আমরা একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছি বলে ও মনে মনে খুশিই হয়েছে। এই বাতাসটা বেশি মেজাজি না। বাতাস কখনও রাগ করে না। এইটা একটু বড় আর শক্তিশালী এই যা। বেশির ভাগ সময় তো ওরা খুবই ভদ্র ব্যবহার করে। অনেক দিন পরপর আমাদেরকে একটু দেখাতে চায় যে দেখো আমি কত বড় আর কত শক্তি আমার গায়ে। বুঝলে না, ওই একটু বড়াই দেখানো আর কি। দুনিয়াটাকে ঝাড়-পৌঁছ করে পরিষ্কার করে দিতে চায়…আমার ধারণা আমাদের সঙ্গে এখন কথা কইছে ওইটা। আর ওর কথা বলার তো মুখ’ নাই একটু শব্দ-টব্দ করে কথা বলে আর কি। ও বলছে আজকের দিনে আমরা জোর্নাডা সেকা পাড়ি দেব ঠিক করায় ও খুব দুঃখিত কারণ এই দিনটাতে ও নিজের গায়ের বল দুনিয়াকে দেখাবে বলে ঠিক করে রেখেছিল।’

ছেলেটি নিশ্চুপ। কোন কথা তার কানে গেছে মনে হলো না। কাঁপুনি এখনও কমেনি ওর, শরীর চেপে বসে রয়েছে। বুড়ো র‍্যামন মাথার ওপর থেকে ব্ল্যাঙ্কেট সরিয়ে প্রাচীন হ্যাটটা মোচড় মেরে কান থেকে সরাল। তারপর মাথা থেকে ওটা খুলে নিয়ে আবারও বসাল কোনাকুনি করে। ওটার ওপর চড়াল এবার ব্ল্যাঙ্কেটটা।

‘তুমি যখন ছোট ছিলে,’ বলল, ‘তখন কি তোমাকে বাফেলো বুলের কাহানীটা বলেছিলাম?’

ছেলেটি রা করল না। অল্প একটু মাথা নাড়ল কেবল।

‘বহু বছর আগের কথা,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘আমি যখন যুবক * গোলগাল ছোট আর খুব জোরে ছুটতে পারি। একদিন হলো কি পাহাড়’ দেখতে পেলাম, মোচার মতন, আমার এই হ্যাটের চাঁদির মতন। কি, শুনছ? পাহাড়টা কেমন ছিল বুঝতে পেরেছ?’

ছেলেটি তার হ্যাট সামান্য তুলে দিল ভাল করে শোনার জন্যে। চোখের কোণে বুড়ো র‍্যামনকে দেখে নিয়ে বলল, ‘তোমার হ্যাটের মতন।’

‘শাব্বাশ। এইটা খুব জরুরী। মাথায় হঠাৎ কি আসল ভাবলাম পাহাড়টায় চড়ব। যেই ভাবা সেই কাজ। ওইটার চূড়ায় বহুক্ষণ বসে থাকলাম আর খালি মনে হতে লাগল আমি একটা ছোট পাহাড়ের রাজা। নামতে শুরু করে অর্ধেকটা আসার পর পাহাড়ের এক পাশে একটা বাফেলো বুলকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলাম। ইয়াব্বড়। দু’হাত প্রসারিত করে দেখাল ও। ‘আহ্, তুমি যদি দেখতে। ওইটা ছিল সমস্ত বাফেলো বুলের দাদা।’

সোজাসুজি ওর দিকে চাইল ছেলেটি।

‘কোথায় ছিল সেটা? এ অঞ্চলে তো কোন মহিষ নেই।’

‘যেইখানে থাকার সেইখানে ‘ গাছ

গজ করে বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘সেইটা কোন জরুরী ব্যাপার না। মনটা চাইল ওইটার সঙ্গে একটু মশকরা করি। গোল দেখে বড় একটা পাথর তুলে নিয়ে, ওইটার দিকে গড়িয়ে দিয়ে লুকিয়ে পড়লাম একটা চাঁইয়ের আড়ালে। গুম-গুমা-গুম- গুম ছুটল পাথরটা আর সোজা গিয়ে ইয়া ইয়া দুই শিঙের মধ্যখানে বাড়ি মারল। আর যায় কোথায়, লাফিয়ে উঠল দানোটা, ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে থাবা মারতে লাগল মাটিতে, নাক দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে, মুখ দিয়ে আগুন–’

‘ধ্যেত,’ বলে উঠল ছেলেটি। ‘মহিষের মুখ দিয়ে কখনও আগুন বেরোয় নাকি??

‘হোহ্, গল্পটা বলছে কে, আমি না তুমি? গল্পটার মালিক কে? আমি বলছি মুখ দিয়ে আগুন বের হচ্ছিল, নাক দিয়ে অনেক ধোঁয়া আর হলকা। রাগে ফুঁসছিল বলে আগুন ছাড়ছিল। সামনের সমস্ত ঘাস পুড়ে কালো হয়ে গেছিল। বাতাসে নাক টানতে আমার গন্ধ পেল তারপর দেখে ফেলল। পাথরে পুরাটা ঢাকা পড়ে নাই আমার শরীর। আমার দিকে বিকট গর্জন ছেড়ে আগুনের হলকা ছুটিয়ে শিঙ নেড়ে তেড়ে আসল।’

বুড়ো র‍্যামন বিরক্তি নিয়ে খুক করে একপাশে থুথু ফেলল।

‘তারপর কি হলো?’ ছেলেটির প্রশ্ন।

‘তারপর একটা কথা মনে পড়ে গেল আমার। মানুষ তো মহিষের মতন জোরে দৌড়াতে পারে না। পাহাড়ের ওপর-নিচে দৌড়ানো সম্ভব না। কিন্তু পাহাড়ের ঢালে চক্কর মারা অন্য জিনিস। ভারী ওজন নিচের দিকে টানে মহিষের শরীর, তাই তেরছা হয়ে দৌড়াতে হয় ওকে আর বারবার পিছনটা টেনে তুলতে হয়। আমি করলাম কি পাহাড়টার ঢাল ঘিরে পাক খেতে লাগলাম আর মহিষটা আমাকে ধরতেই পারল না। বারবার হড়কে পড়ে যায় ওইটা, আবার একটুখানি করে উঠে আসে। আই, ভীষণ রাগা রেগেছিল ও। ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে তাড়া লাগাচ্ছে আর আগুন ছাড়ছে মুখ দিয়ে আর একটু পরেই পাহাড়টার চারদিকে একটা পোড়া কালো আঙটি হয়ে গেল আর নাক দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে ওইটার আর আমরা খুব জোরে চক্কর দিচ্ছি সেই কারণেও ধোঁয়া বের হচ্ছে। পরদিন লোকের মুখে শুনলাম, যারা দূর থেকে দেখেছিল ঘটনাটা, ওরা ভেবেছিল ওইটা বোধহয় একটা আগ্নেয়গিরি। তখনও ঘুর পাক খাচ্ছি আমরা আর ও আমাকে ধরতে পারছে না। তারপর দেখি কি আমাকে ধরে ফেলছে প্রায় আর আগের মতন পড়েও যাচ্ছে না।

আমরা পাহাড়টার বাম দিকেই প্রত্যেকবার ঘুরছিলাম। পাহাড়ের ঢালে ওইভাবে দৌড়ানোর ফলে ওর বাম পায়ের চাইতে ডান পাগুলা বেশি ফেলতে হচ্ছিল আর সেইজন্য ওইগুলা অন্য দুই পায়ের চাইতে বড় হয়ে গেল। ওর তখন আর তেরছা হয়ে না ছুটলেও চলছিল। আমাকে পেয়ে বসছিল একটু একটু করে আর পিঠে আগুনের ছ্যাকাও টের পাচ্ছিলাম…’

একগাদা কথা বলে একটুক্ষণ চুপ করল বুড়ো র‍্যামন। গুছিয়ে গল্পটা বলতে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে ওকে। গলার কাছ থেকে শার্টের টুকরোটা নাকে তুলে ওটায় তীব্র ফুঁ দিতে লাগল।

‘থামলে কেন?’ বলল ছেলেটি। ‘কি করলে তারপর?’

‘ও, খুব সোজা,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ঘুরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এক দৌড়ে নেমে গেলাম। আর মহিষটা সোজা আমার পিছে তেড়ে আসতে পারল না। ওর ডান পাগুলি বেশি লম্বা হয়ে গেছিল কিনা। সোজা দৌড়াতে গিয়ে দেখে খালি বাম দিকে ঘুরে যাচ্ছে। কিন্তু তাই কি আর মানে! ছুটছে তো ছুটছেই, শেষে ঘুরপাক খেতে খেতে মাথা ঘুরে পড়ে গেল।’

ছেলেটি এখন আর কাঁপছে না। ব্ল্যাঙ্কেটের ভেতর খাড়া হয়ে বসে আছে।

‘গল্পটা আমি বিশ্বাস করি না,’ বলল, ‘একটা অক্ষরও না।’

‘এহ?’ উচ্চারণ করল বুড়ো র‍্যামন। ‘কেউ তোমার কাছে জানতে চেয়েছে তুমি বিশ্বাস করো কি করো না?…তবে বাইরে উঁকি মারলে কিন্তু দেখতে পাবে চরো থেমে যাচ্ছে।’

অ্যারোয়োতে আলো এখন আগের চাইতে তেজবান, বাতাস থেকে বিশোধনের পর খসে পড়ছে ধুলো আর বালিকণা। দৈত্য-দানবের দল এখন আর ভয় দেখাচ্ছে না মাথার ওপর। লম্বা শ্বাসের ফাঁকে গুনগুন করে গান গাইছে এ মুহূর্তে বাতাস, উত্তপ্ত গোটা দিন কাটানোর পর শেষ বিকেলের মৃদুমন্দ বাতাসের পরিচিত শব্দ কানে আসছে কিশোরের। ভেড়ার ঝাঁক নড়তে চড়তে লেগেছে, গা ঝাড়ছে।

‘আই,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘কিছুক্ষণ পর্যন্ত আস্তে আস্তে যাবে ওরা। পশম ভরে গেছে ওদের বালিতে। তবে একবার রওনা হয়ে। পড়লে আর সমস্যা হবে না, ঝরে যাবে।’ মাটিতে হাতের চাপ দিয়ে উঠে পড়ল ও, তীরের পাশে একটা ঢালু মত জায়গার চূড়ায় উঠতে লাগল হাঁচড়ে পাঁচড়ে। ওখানে উঠে দাঁড়িয়ে অ্যারোয়োটি দেখে নিয়ে শিস বাজাল, হাতছানি দিল। অ্যারোয়ো থেকে নামতে শুরু করল ভেড়ার পাল, পেছনেরগুলোকে

রইল না, নেমে যাচ্ছে ওরা দেখে সামনেরগুলোও বসে

খোলা উন্মুক্ত প্রান্তরে। কিনারে দাঁড়িয়ে ওদের লক্ষ করল বুড়ো র‍্যামন। বাদামী কুকুরটার তাগাদা খেয়ে ওর নিচে দিয়ে পরিচালিত হলো শেষ ভেড়া ক’টাও। এবার তীর থেকে টলমল পায়ে নেমে এল ও।

‘তিনটা লাপাত্তা, বলল ও। আর ওই স্যাঞ্চোটা কই?’

অ্যারোয়োর ওপর দিকে এসময়ে ঘেউঘেউ শোনা গেল এবং পরক্ষণে দেখা গেল ভূতগ্রস্তের মতন ছুটছে তিনটে ভেড়া, আর সে কি কর্তব্যনিষ্ঠের মত ওদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে আসছে কালো কুকুরটা! ছেলেটি তাই দেখে লাফিয়ে উঠে, কম্বল ছেঁচড়ে ছুটে গেল বুড়ো র‍্যামনের দিকে।.

‘দেখেছ?

‘দেখেছি,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘আমার মনে হয় পেদ্রো ওকে ওইগুলার পিছনে পাঠিয়েছিল। হ্যাঁ, কাজ ভালই দেখিয়েছে।’

বুড়ো র‍্যামন ব্ল্যাঙ্কেটটা ছেলেটির হাত থেকে নিয়ে ঝেড়ে-ঝুড়ে ভাঁজ করতে লাগল, তারপর ফের চালান করে দিল প্যাক রোপের নিচে।

‘কিন্তু তুমি ওদেরকে গোনো কিভাবে?’ ছেলেটির বিস্ময়মাখা প্রশ্ন। ‘এত্তগুলো আর একেকটা এদিক যাচ্ছে ওদিক যাচ্ছে।’

‘এহ, এই কথা?’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘এরও একটা গোমর, আছে। একেক মেষপালকের একেক কায়দা। আমি গুনি পাঁচ ধরে। একবারে পাঁচটা করে ভেড়া দেখে আঙুলে পাঁচ গুনি। সবগুলা আঙুল একবার করে গোনা হয়ে গেলে কত, পঞ্চাশটা হলো না? দুইবার হলে হয় একশো। আমার চাচাতো ভাই পাবলো যে নিজেকে খুব চালাক মনে করে সে ধরে তিনটা করে। তিনের হিসাব খুব ভাল বোঝে ও। অবশ্য অনেকগুলি তিন মিলে কত হয় গুনতে গিয়ে বেচারা খালি মাথা চুলকাতে থাকে। তবে পারে ঠিকই। অনেক সময় নষ্ট হলো আর এখনও যেতে হবে বহু দূর…’

ভেড়ার দল এখন প্রান্তরে জড়ো হয়ে রওনা দিয়েছে। ও-ই উত্তরে ধুলোর মেঘরাশি ঝুলে আছে দেখা যাচ্ছে দিগন্তে, কিন্তু শীতল ঝিরঝিরে বাতাস এখানে প্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছে। তাজা মিষ্টি বাতাস আর অস্তগামী সূর্যের মনোরম আলো হৃদয় কেড়ে নেয়।

‘আহ্, দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে তৃপ্তির সঙ্গে উচ্চারণ করল বুড়ো র্যামন। ‘চরো এক ঝাড়ুতে দুনিয়া সাফ করে দিয়েছে।’

ভেড়ার ঝাঁক এগিয়ে চলেছে, বুড়ো র‍্যামনের পাশে পাশে হাঁটছে কিশোর, আর ওদেরকে অনুসরণ করছে মালবাহী গর্দভটা।

‘তুমি আবার যখন ইস্কুলে যাবে,’ বলল’ বুড়ো র‍্যামন, ‘তখন বন্ধুদের বলতে পারবে ভীষণ এক ঝড়ের মধ্যে পড়েছিলে।

পাশ থেকে বুড়োর দিকে চাইল ছেলেটি।

‘তারমানে সত্যিই ভয়ঙ্কর ছিল ঝড়টা?’

‘হ্যা,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘খুব খারাপ। বেশিক্ষণ থাকে নাই। তবে খুবই খারাপ ঝড় ছিল। আর এখন সামনে আরও কয়েক ঘণ্টার পথ। তুমি কি হয়রান হয়ে গেছ?’

‘হ্যাঁ,’ বলল ছেলেটি। কিন্তু কোন অসুবিধে নেই। পায়ে নতুন করে জোর পাচ্ছি।

ভেড়ার পালের দু’পাশে ছুটছে দুই কুকুর, পাহাড়সারির পেছনে পতন ঘটেছে সূর্যের, পাহাড়ী এলাকার যা বৈশিষ্ট্য, ঝপ করে আঁধার গ্রাস করে নিল গোটা প্রান্তরটাকে।

‘একটু পর আরও অন্ধকার হবে,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘আকাশে চাঁদও নাই। ভয় করবে না তো তোমার?’

‘না, করবে না,’ বলল ছেলেটি। ‘তুমি তো আছ।’

আগুয়ান রাতে প্রবেশ করল ভেড়ার পাল, অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রান্তরে একটা ধূসর চলমান পিণ্ডের মতন দেখাচ্ছে দলটাকে।

‘র‍্যামন,’ বলল ছেলেটি, ‘গল্পটার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না। মহিষটা যখন পাহাড়টাকে ঘিরে দৌড়চ্ছিল তখন ওটার ডান দিকের পা দুটো বড় হয়ে গেল। কিন্তু তোমার ডান পা-টাও কেন লম্বা হয়ে গেল না?’

‘এহ?’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘তো তুমি আমাকে এই কথার ফাঁদে ফেলতে চাও? বলছি শোনো। খুব সহজ ব্যাপার। যতক্ষণ না আমার ডান পা-টা একটুখানি বড় হলো সামনের দিকে খালি ছুটছিলামই আমি তারপর মহিষটার দিকে মুখ ফিরিয়ে পিছন দিকে দৌড়াতে লাগলাম যতক্ষণ না বাম পা-টা ডান পায়ের সমান হলো আর এই বুদ্ধি খাটিয়েই তো পা দুইটাকে সমান রাখতে পারলাম…’