Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
সর্বংসহ কালীগুণীন – সৌমিক দে

কালীগুণীন ও ধ্বংসের পুঁথি

(১) শ্বাপদ

ধরহরা ইস্টেশানে যখন রেলগাড়িটা থামলো, তখন সাঁঝ নামতে চলেচে। বেহার প্রদেশের এই এলাকায় আমি পূর্বে কখনও আসিনি, তাই রুক্ষসূক্ষ একটা জায়গা কল্পনা করে রেখেচিলাম, কিন্তু ইস্টিশানের বাইরে পা রেখে একেবারে সামনেই দুখানি জোড়া মালভূমির পাহাড়ের মতো দেখে মনটা জুড়িয়ে গেল হঠাৎই। সাঁঝের ঘোষণা করে অজস্র পাখপাখালি উড়ে চলেচে দুটো পাহাড়ের মাথা জুড়ে। হালকা হালকা শীতল বাতাস বয়ে চলেচে।

এলাকাটার অদূরেই সবেগে গঙ্গা নদী বয়ে চলেচে। একসময়ে এই সমগ্র এলাকাটাই মানগড় নামে পরিচিত ছিল, কিন্তু এর থেকেই মুঙ্গের নামটা এসেচে কিনা তা আমার জানা নেই। পাহাড়ের কোল ধরে কিছু গো-যান, ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। কয়েকখানা দোকান মিটমিটে তেলের বাতি জ্বেলে দিয়েচে। সব মিলিয়ে একটা ভারী চমৎকার পরিবেশ। আমরা যে একটা অতি গুরুতর কাজের উদ্দেশ্যে এইখানেতে এসেচি,তা মনেই হয় না।

একটা যুৎসই টাঙা গাড়ি দেখে আমরা চারজন এসে দাঁড়ালাম সেটার সামনে। গাড়োয়ান আশান্বিত হয়ে বাঙলায় টেনে টেনে বললে, “কোথা যাবেন বাবুরা?”

ইন্দ্ৰ শুধালো, “জগৎশেঠের কেল্লা চেনো?”

গাড়োয়ান হেসে বললে, “মুঙ্গের কিল্লা না চিনবো বাবু? গাড়োয়ান আছি না ঠাট্টা? আইয়ে বাবু। বৈঠিয়ে। কোন সাহিবের ঘরে যাবেন?”

“সাহেব টাহেব নয়, তুমি ব্রজবাবুর বাড়ি চেনো? মাস্টার ব্রজবাবু?” গাড়োয়ান পুরোদমে গাড়ি হাঁকিয়ে দিয়েচিলো, এইবার ইন্দ্রর কথায় গাড়ি একটু ধীর করে স্থির স্বরে বললে, “ইস্কুল মাস্টার বিরজু বাবু? তাঁর বাড়ি যাবেন?”

ইন্দ্র আশান্বিত হয়ে কইলো, “হাঁ হাঁ, তার বাড়ি…”

“বিরজু মাস্টারের বাড়ি তো কিল্লার দিকে নয় বাবু। তাঁর বাড়ি বড়িয়ারপুরের মুখে।”

“হাঁ বাপু, তা হবে হয়তো। তাই চলো।”

গাড়োয়ান একবার মুখ ঘুরিয়ে আমাদের চারজনকে ভালো করে দেখে নিয়ে চুপচাপ গাড়ি হাঁকাতেই কালীপদ ধীর কণ্ঠে কইলো, “কী দেখলে গাড়োয়ান আমাদের?”

“না বাবু, ঠিকঠাক বসেচেন কিনা সবাই তাই দেখলাম। পথ বড় উঁচানীচা আছে…”

কালীপদ একটু থেমে কইলো, “দেখো গাড়োয়ান, আমি জলাজঙ্গলের গাঁয়ে মানুষ। এই চাহনির মানে বুঝি। পথে কি ডাকাইতের ভয় আছে? সঙ্গে মেয়েমানুষ আছে কিনা এই ভর সন্ধ্যায়, তাই দেখে নিলে, তাই না?”

গাড়োয়ান অস্বস্তিতে পড়ে আধো বাঙলায় বলল, “ঠিক মেয়েমানুষ নয় বাবু, কোনো বাচ্চা সঙ্গে ছিল কিনা তাই একবার দেখলাম…” একটু থেমে আবার সে কইলো, “বাচ্চা থাকলে আমি নিয়ে যেতাম না মালিক, পুরো বড়িয়ারপুর, ঋষিকুন্ড, সীতাকুণ্ড, নদীঘাট অবধি এক অদ্ভুত উপদ্রব আরম্ভ হয়েচে মাস দুয়েক ধরে। সেসব কথায় এই ভরা সন্ধ্যায় কাজ নাই হুজৌর। মাস্টারের থেকে জেনে নেবেন।”

গাড়োয়ানের কথাগুলোর মধ্যে ভয় দেখানো বা আতঙ্ক সৃষ্টির তিলমাত্র আভাস ছিল না, কিন্তু আমার মনটা হঠাৎই বিষিয়ে উঠল। মুঙ্গেরে পা রেখেই মনে যে অদ্ভুত সুন্দর ভাবাবেগ এসে আবিষ্ট করেচিলো, তা এক মুহূর্তে উবে গিয়ে মনটা তিক্ত হয়ে উঠল। চমৎকার নদীর বাতাস, ঘরে ফেরা পাখিদের কলরব পেরিয়ে বহু দূরে কোথাও যেন একটা কুটিল দানব ওৎ পেতে রয়েচে আমাদের উদ্দেশে, এইটা ভেবে বিষণ্ণ হয়ে পড়লাম। কালীপদ বোধকরি আমার মনোভাব টের পেয়েচিলো। সে আমার কাঁধে নিজের বলিষ্ঠ হাত রেখে আলতো চাপ দিল।

যাবার পথেই ঝুপ করে সাঁঝ নেমে গেল। গোটা মুঙ্গের জুড়ে যে এত মন্দির রয়েচে, তা আগে জানা ছিল না! মন্দিরগুলির ভিতরে আলো জ্বলচে। কিছু মন্দিরে শিবলিঙ্গ স্থাপিত, কয়েকটিতে দুর্গা, চণ্ডী, বজ্রাঙ্গবলী, আবার কয়েকটি অচেনা লৌকিক দেবতারও দেখা মিললো। তবে সেসব কথা পরে, তার চেয়েও একটা জিনিস আমাকে ভীষণ বিস্মিত করল!

আমাদের গাড়ির ছড়ছড় শব্দ শুনে একেকটি মন্দিরের কপাট খুলে কিছু সেবায়েত, পুরোহিত উঁকি দিচ্চে, আবার কপাট বন্ধ করে দিচ্চে। পথে বেশ কিছু মানুষ দল বেঁধে খোল, করতাল, কাঁসি নিয়ে মন্দিরে গিয়ে ঢুকচে। এমনও হতে পারে যে, এই এলাকায় সব মন্দিরে রাতে লোকজন নামকীর্তন করে। আমার বিস্ময়ের ভাবটা হ্রস্ব হতে না হতেই কালীপদ সেই ভস্মে পুনরায় অগ্নি ছুঁইয়ে দিলে! কালীপদ ভ্রু কুঁচকে শুধালো, “গাড়োয়ান, তুমি কিন্তু সবটা খুলে বলোনি এখনো। এই লোকজন দলে দলে মন্দিরের ভিতরে চলেচে কেন এই ভর সন্ধ্যায়?”

গাড়োয়ান কাষ্ঠ হাসি হেসে বললে, “কি বোলেন বাবু, সানঝে মন্দির উন্দিরে পূজা হবে না? আরতি হবে না?”

কালীপদ স্থির নজরে গাড়োয়ানকে পিছন থেকে লক্ষ্য করে আমাদের নীচু স্বরে বললে, “সন্ধ্যা আরতি সম্পর্কে আমি একেবারে অজ্ঞ নই, আর নই বলেই আমার চোখে তা বিসদৃশ ঠেকচে। সন্ধ্যারতির সময়ে মন্দিরের কপাট বন্ধ থাকচে, আবার সেই কপাট খুলে উৎসুক হয়ে সবাই উকি দিচ্চে, উপরন্তু শিবদুর্গার শয়ন দিয়ে দেবার পরও সেই মন্দিরে লোকজন রয়ে গিয়েচে, যা নিতান্তই রীতিবিরুদ্ধ। মা বাপের শয়নকালে তাঁদের শয়নকক্ষে সন্তানের প্রবেশ অনুমতিসাপেক্ষ। ডাক্তার, গোলমাল রয়েচে। শিশুদের সঙ্গে এসবের কী যোগ, তা গাড়োয়ান খুলে বলচে না, কিন্তু শুধু এটুকু নয়, আরও ভয়ানক জিনিস কিন্তু আমার চোখে পড়ল। আসার পথে যে দুইখানা পুকুরের পাশ দিয়ে এলাম, সেগুলোর ঘাটে ঘাটে মেটে কলসী, বাঁশের মাথায় সম্ভবত লাল কাপড় আর কাঠের চৌখুপি চোখে পড়ল! এই ঘাটগুলোতে হপ্তাখানেকের মধ্যে অন্ততঃ গোটা আষ্টেক পুষ্করা, মৃতদোষ কাটানো এবং অপমৃত্যুর সৎকার্য্য হয়েচে! এত সংখ্যক পুষ্করার অর্থ কিন্তু একটাই, এই তল্লাটে মৃত্যুর মড়ক লেগেচে, এবং সেগুলো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। আমরা যতটুকু ভাবচি ডাক্তার, তার থেকেও অনেক আরও অনেক বড় কিছু ঘাপটি মেরে রয়েচে এর আড়ালে!”

আমি কালীপদর দিকে একটু সরে বসলাম। আমাদের বড়িয়ারপুরের সীমান্তে নামিয়ে দিয়ে আঙুল উঁচিয়ে একখানা বড় দুইতলা বাড়ি দেখিয়ে দিয়ে গাড়োয়ান কইলো, “ঐ বিরজু মাস্টারের বাড়ি বাবু, ওই আলো জ্বলচে…”

আমরা গাড়োয়ানকে দুইটি টাকা দিয়ে বিদায় দিয়ে পা বাড়ালাম ইন্দ্রর বংশলতিকার দ্বিতীয় পরিবারটির উদ্দ্যেশে।

বাড়িটার উঠোনে পা রেখে আবার মনটা ভালো হয়ে গেল। প্ৰকাণ্ড তকতকে নিকোনো উঠানের তিনদিক জুড়ে বিরাট বাড়ি। ডাঁয়ে ও বাঁয়ের অংশ একতলা। সুমুখের অংশটা দুইতলা। সব ঘরে তিলের তেলের কুপির উজ্জ্বল আলো জ্বলচে, বাঁয়ের একটা অংশে প্রাচীরের গায়ে বড় গোহাল, তাতে সাঁজালের ধুঁয়া দেওয়া হয়েচে। তুলসী তলে আরাত্রিকার বাতি জ্বলচে, বাড়ির বাইরে উঠানের চার কোণায় চারখানা শিশের লণ্ঠন ঝুলচে, তাতে পুরো আঙিনা আলো হয়ে রয়েছে। একদিকে বড়সড় একটা ধানের গোলা। উঠানের দিকের জানালাগুলো একেবারে দাওয়া থেকেই শুরু হয়েছে। হাত তিনেক লম্বা একেকটা জানালা। সব মিলিয়ে পরিচ্ছন্নতা এবং প্রাচুর্যের রুচিসম্মত মেলবন্ধন।

কালীপদর মুখ দেখে বুঝলাম সে তুষ্ট হয়েচে। কালীপদ ফিসফিস করে বলল, “আপদের সন্ধানে যে বাড়িতে ঠাঁই নেবো, সেই বাড়িতেই যদি আপদ ওৎ পেতে থাকে, তবে বড় সমস্যা হয়, কিন্তু এ বাড়িও শ্রীকৃষ্ণের অনুগ্রহকণায় ধন্য বোধকরি …”

ইন্দ্ৰ এগিয়ে গিয়ে, ‘কেউ আছেন…’ বলে হাঁক দিতে ঝনাৎ করে কপাট খুলে একজন বৃদ্ধ উঁকি দিলে, তারপর হুঁকা হাতে বাইরে বেরিয়ে বললে, “আপনারা…”

কালীপদ এগিয়ে হাতজোড় করে কইলো, “ব্রাহ্মণ, নাম কালীপদ মুখুজ্জে, নিবাস রায়দীঘড়া, বঙ্গাল…”

বৃদ্ধ দুয়ারে হুঁকো রেখে তড়িঘড়ি উঠোনে নেমে এসে বিনীত ভাবে কইলো, “আসুন আসুন, দয়া করে এই দাওয়ায় বসুন। অ বৌমা, অ খোকা…”

এই বলে বৃদ্ধ একবার ভিতরে গিয়েই বেরিয়ে আসলো। ইন্দ্র এগিয়ে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করল। একজন বধূ আর একজন স্থূলা মেয়েমানুষ তাড়াতাড়ি ঘটিতে করে পা ধোয়ার জল আর একখানা চিত্রবিচিত্র শতরঞ্জি এনে পেতে দিয়ে আমাদের গড় করতে এলে পর কালীপদ বলে উঠল,

“আরে রে পা ছুঁও না মা, এমনিই আশীর্বাদ করচি।” আমরা হাত পা মুখ সেই হিমশীতল জলে ধুয়ে আরাম করে দাওয়ার আলোতে বসতেই একটি ছেলে এসে মাঝারি বাটিতে রাঙা ভেটুকের মুড়ি, লঙ্কা আর ঝাঁঝালো সর্ষের তেল মাখা এনে হাতে দিলে। বৃদ্ধ সামনে এসে বসলো। … বৃদ্ধ মুখের পানে চাইতেই কালীপদ একমুঠো মুড়ি মুখে দিয়ে কইলো, “আপনি তো বেশ বুঝেচেন আমরা কোথা থেকে এসেচি, এবং এই ছেলেটিই বা কে, তাইনা মাস্টারমশাই?”

বৃদ্ধ মলিন হেসে বললে, “হাঁ ঠাকুর, ওর বাপ সম্পর্কে আমার ভাই হয়। আমার থেকে অনেকটাই ছোট যদিও, কিন্তু ওই তরফের সঙ্গে ওর বাপের সঙ্গেই পালাপার্বণে আমার চিঠি চালাচালি চলে মাত্র। কিন্তু আপনি কেমন ভাবে এইটে বুঝলেন যে আমি আপনাদের চিনতে পেরেচি?”

কালীপদ হেসে কইলো, “আপনাদের পরিবারের মধ্যে গো-বামুনে এতটা ভক্তি দেখলাম, তাতে আমি যখন বললাম আমরা ব্রাহ্মণ, তখন আপনার এটাই ভাবা উচিত ছিল যে আমরা সকলেই বামুন। কানাইয়ের চেহারা দেখে না হয় বুঝলেন, কিন্তু এই ইন্দ্রনাথ যে অব্রাহ্মণ তা আপনি জানেন বলেই তার প্রণাম স্বীকার করেচেন। অর্থাৎ আপনি সকলের পরিচয়ই অনুমান করতে পেরেচেন, আর তা একমাত্র টরেটক্কার অধিক মূল্যের ‘তারবার্তা’ ছাড়া সম্ভব নয়।”

বৃদ্ধ তৃপ্ত হয়ে কইলো, “হাঁ, ইন্দ্রর বাপ আমাকে তার করেচে। আজ সকালেই তারের কাগজ হাতে পেয়েচি। আমি অপেক্ষা করচিলাম। সঙ্গে কোনো ছোট বাচ্চা নেই বলে আমি আর পালটা তার করে নিষেধ করিনি….” আমি চমকে উঠলাম! আমাদের দৃষ্টি পড়ে নিয়ে বৃদ্ধ কইলো, “তোমরা কেন এসেচো তা আমি জানিনে, তবে ঘুরতে যে আসোনি তা বয়সের অনুপাতে বোঝার ক্ষমতা আমার হয়েচে। হরিহরের মৃত্যুর খবর একটা টেলিগ্রামে পেয়েচিলাম, তাও বোধহয় গত মাঘ নাগাদ হবে। তারপর এই জরুরি টেলিগ্রামে তোমাদের আসার খবর এত পয়সা খরচ করে জানানোর অর্থ আর কী হতে পারে? তবে বড় খারাপ সময়ে এসেচো বাছারা। এই তল্লাটে খারাপ অভিশাপ নেমেচে আজ কয়েক মাস হল…”

কালীপদ পূর্ণ দৃষ্টিতে বৃদ্ধের মুখের পানে চেয়ে বললে, “অভিশাপের স্বরূপ আমি জানিনে, তবে গাড়োয়ানের কথায় বুঝেচি সেইটের সঙ্গে ছোট বাচ্চাদের কোনো সম্পর্ক রয়েচে। একটু বিশদে বলবেন কি?”

বৃদ্ধ মাস্টার বিমর্ষ মুখে কইলো, “কীভাবে কী বলবো তা বুঝতে পারচি নে। তোমরা শহুরে মানুষ, তোমরা হয়তো ভূতপ্রেত, অলৌকিক জিনিস মানবেই না….”

কালীপদর ঠোঁটে একচিলতে হাসির রেখা দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। বৃদ্ধ বলে চলল, “আজ ধরো দুই মাস হল একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে চলেচে গাঁয়ে। ফি রাত্তিরে ছোট ছোট বাচ্চা, মোটামুটি বারো তোরো চৌদ্দ বৎসরের মধ্যে যারা, তারা হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যাচ্চে! একটু চোখের আড়াল হল তো সর্বনাশ। সাঁঝ পেরিয়ে একটু রাত নামলেই এই উপদ্রব আরম্ভ হচ্চে। এই দুই মাসে আশপাশের সাত আটটা গাঁ আর পাহাড় মিলিয়ে সংখ্যাটা একশত ছুঁইছুঁই! ভাবতে পারো?.

“সরকারি কর্তারা পেয়াদা, দারোগা সঙ্গে নিয়ে কত চেষ্টা করলে একটা মাস ধরে, কিন্তু কোনো সূত্রই পাওয়া গেল না! এতগুলো বাচ্চার উধাও হওয়া কম কথা তো নয়? বেশিরভাগই পাহাড়ি ছেলেপুলে। পাহাড়ের সরলসিধা আদিবাসীরা পুলিশকে বড় আতঙ্কের বস্তু মনে করে, যদিও তার কারণও রয়েচে যথেষ্ট, তাই তারা বুকফাটা কান্না কাঁদলেও তাদের গাঁওবুড়ারা দারোগার কাছে নালিশ করতে যায় না….”

কালীপদ চিন্তিত কণ্ঠে শুধালো, “কিন্তু এটুকুই কি সব ঘোষমশায়? যে বালক অথবা শিশুরা অপহৃত হল, তাদের কাউকে কি…”

হঠাৎ বাইরের আকাশ বাতাস জুড়ে ভয়ানক ঢাক, ঢোল, কাঁসি, খঞ্জনীর সমবেত শব্দে কালীপদ চমকে উঠে মাস্টারের মুখের পানে চাইতেই বৃদ্ধ নিজের আঙুল ভয়ে ভয়ে কপালে আর বুকে ঠেকিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে বললে, “এখন ভিতরে চলো ঠাকুর, তোমাদের কক্ষ প্রস্তুত। বাকি কথা পরে হবে আহারের সময়ে….” এই বলে বৃদ্ধ কতকটা যেন তাড়াহুড়ো করেই ভিতরে ঢুকে কাকে যেন কইলো, “খোকা, হরেন আর নারাণ…”

বৃদ্ধের ছোট ছেলে নীচু, উদ্বিগ্ন স্বরে কইলো, “রাধা তাদের নিয়ে কপাট দিয়েচে, চিন্তা নেই বাবা।”

‘চিন্তা নাই” শব্দটা উচ্চারণের সময়ে বৃদ্ধের কনিষ্ঠ পুত্র গোপীর কণ্ঠে যে কতকটা চিন্তা ছড়িয়ে পড়ল, তা আমরা বেশ টের পেলাম। আরও অবাক হয়ে দেখলাম, বাড়ির দুইজন বয়স্থা ঝি দাওয়ায় বেরিয়ে যে কক্ষে রাধা নাম্নী বধুটি বাড়ির দুইটি বালককে নিয়ে কপাট এঁটেচে, সেই জানালার বাইরে বসেই কাঁসর বাজানো আরম্ভ করলে!

আমাদের থাকতে দেওয়া হল দুইতলার দুইটি বড় ঘরের মধ্যে একটিতে। বড় বড় দুইখানা পালঙ্ককে একসঙ্গে জুড়ে এক প্রকাণ্ড শয্যা রচনা করা হয়েচে। কানাই আর ইন্দ্র একখানায় গিয়ে বসলো। আমি আরেকদিকে কালীপদর পাশে বসে উদগ্রীব হয়ে শুধালাম, “এসব কি হচ্চে দাদা? আমি যে কিছুই বুঝতে পারচি নে?”

ইন্দ্র অসোয়াস্তির সুরে কইলো, “গোটা এলাকা জুড়ে সব মন্দিরে ভীষণ শব্দে বাদ্য বেজে চলেচে, ঘরের মধ্যে একনাগাড়ে কাঁসি বাজচে, এসব তো কিছুই বুঝতে পারচি না ঠাকুরমশায়?”

কক্ষের অজস্র জানালার মধ্যে দুইটি খোলা ছিল। প্রায় এক মানুষ সমান জানালা থেকে ভদ্রাসনের পিছনের বড় পাহাড়টাকে চাঁদের আলোয় ভারী চমৎকার ভাবে দেখা যায়। হঠাৎ সেই পাহাড়ের উপর থেকে হাজারে হাজারে আদিবাসীদের ঠোঁটে আঙুল নাড়িয়ে তীব্র আহাহাবাবাহাহা ধরণের ভয়ানক শব্দের ক্ষীণ অনুরণনের সঙ্গে গুম গুমম করে একটা আবছা শব্দ আসতে শুরু করল। কালীপদ উঠে জানালার গরাদ ধরে ললাটে ভাঁজ ফেলে ধীরে ধীরে বললে, “শুধু মন্দিরগুলোতেই নয়, ওই শোনো ইন্দ্ৰ, আদিবাসীদের ডেরাগুলোতেও দামামা বাজছে!”

ইন্দ্ৰ ভয় পেয়ে কইলো, “এসব নিশ্চয়ই কোনো ভয়ঙ্কর অপদেবতাকে দূর করার কৌশল?”

কালীপদ জানালার দিকে মুখ রেখেই মাথা নেড়ে বললে, “মনে তো হচ্চে না। খোল করতাল বা দামামায় ভূত বিতাড়িত হয় এমন কথা কখনো শুনিনি। এই ভয়ঙ্কর শব্দের দুটো অর্থ হয়। এক, গোটা এলাকার আকাশে বাতাসে একজোট হবার সঙ্কেত ছড়িয়ে দেওয়া, আর…”

আমি চোখের পলক না ফেলে কইলাম, “আর?”

“আর দ্বিতীয় অর্থ, কোনো অবাঞ্ছিত, অশুভ শব্দ বা ডাককে চাপা দেওয়া, যাতে তা কানে না পৌঁছায়। কিন্তু… প্রশ্ন হল বিপদটা ঠিক কীভাবে নেমে আসে?”

বাইরে চাঁদের আলো থাকলেও বাইরের পাহাড়, জঙ্গল আর আকাশ যেন ভয়ানক অন্ধকার বলে বোধ হল! কালীপদ কি একটা যেন বলতে যাচ্চে, এমন সময়ে দোর ঠেলে গোপীনাথ এসে ঢুকলো। হাতে একখানা রেকাবীতে পেতলের ঘটির একঘটি গোরুর দুধের চা, বড়ি ভাজা আর একখণ্ড করে মোরব্বা। আমি একটা মোরব্বা তুলে নিলাম। গোপী কালীপদর অনুমতি নিয়ে পালঙ্কের একপাশে এসে বসলো। কিছুটা জোরে জোরে কথাবার্তা কইতে হচ্চে বাইরের জোরালো আওয়াজে। হঠাৎ আমাদের চমকে দিয়ে বাইরে থেকে একটা হিংস্র শ্বাপদের মতো হুঙ্কার ভেসে এল! হুঙ্কার ঠিক নয়, গর্জন তর্জনও নয়, যেন কোনো ক্ষুব্ধ, আহত বাঘ আড়াল থেকে শিকারকে লক্ষ্য করে গরগর শব্দ করচে! বাঘের গর্জনের চাইতে এই লাফিয়ে পড়ার আগের গরগর শব্দটাই শিকারীর বুকে বেশি কাঁপন ধরায়। আমি চমকে উঠে দাঁড়িয়ে হঠাৎ গোপীর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার মুখ যেন সাদা হয়ে গিয়েচে! বাইরে ঝি-দের কাঁসির শব্দ হঠাৎ অনেক বেড়ে গেল। গোটা সাত গাঁয়ের মানুষগুলো যেন একইসঙ্গে এই আবছা কুটিল আওয়াজ শুনতে পেয়ে হঠাৎই সমবেত বাদ্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিল প্রাণের দায়ে। কানে তালা লেগে গেল প্রায়।

কালীপদও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে। এমনকি অকুতোভয় কানাইও হতভম্ব হয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে রয়েচে সড়কিটা শক্ত করে ধরে। বেশ কিছুক্ষণ আমরা মন্ত্রাবিষ্টের মতো হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর সেই ভীষণ হিংস্র গরগর শব্দ একটা কানফাটানো হুঙ্কার হয়ে আমাদের প্রায় বধির করে দিয়ে হঠাৎই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। গোপী লম্বা লম্বা দুই পা ফেলে কপাটের কাছে গিয়ে উৎকর্ণ হয়ে নীচের কথাবার্তা শুনে কপালে হাত ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কার কোল খালি হল কে জানে! মাধব মাধব…”

গোপী নীচে নেমে গেল। কালীপদর মুখ থমথমে আর ভ্রু যুগল কুঞ্চিত হয়ে রইলো।

(২) চতুর চূড়ামণির সঙ্কেত

বেশ কিছুটা সময়ের মধ্যে ঘরে কেউ প্রবেশ করল না। আমরা বসে কথাবার্তা কইচি, এমন সময়ে দুটো ছোট্ট ছোট্ট মুন্ড উঁকি দিল দোরের থেকে। মুহূর্তের মধ্যে কালীপদর মুখের থমথমে ভাবটা কেটে গিয়ে প্রসন্ন হয়ে উঠল। সে হাসিমুখে হাতছানি দিয়ে বালক দুটিকে ডাকতেই দুইজন কিছুটা ভয় আর কিছুটা বিস্ময় নিয়ে ইতিউতি চাইতে চাইতে কালীপদ সামনে এসে দাঁড়ালো। কালীপদ সস্নেহে নাম শুধাতেই বড়টি বললে, “আমার নাম শ্রীযুক্ত হরেন্দ্রনাথ ঘোষ। এ আমার ভাই শ্রীযুক্ত নরেন্দ্রনাথ ঘোষ। আমার বাবা শ্রীযুক্ত…”

কালীপদ হো হো করে হেসে ফেলে বলল, “জানি। শ্রীযুক্ত গোপীনাথ ঘোষ, তাই তো?”

বালকরা এই গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় পরম বিস্ময় নিয়ে আমাদের দিকে চাইলো। বড়টি আদুরে গলায় বললে, “আচ্ছা দাদু, গোরু কি চোখ দিয়ে একতারা বাজাতে পারে? আচ্ছা, গোরুর ন্যাজ মুচড়ালে কি ওরা দৌড়ায় খুব? আচ্ছা, ছাগল কি বৃষ্টিকে ভয় পায়? ওরা কি কাঁটালপাতা সবচেয়ে ভালো খায়?”

কালীপদ সহ আমরা সবাই হেসে উঠলাম এই অসম্ভব জেরায়। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে হাসতে হাসতে বললাম, “এসব কে শিখিয়েচে বলো তো?”

বালক নির্দ্বিধায় বললে, “দাদাই…”

কালীপদ মুচকি হেসে নীচু গলায় কইলো, “মাস্টারের বয়স হলেও শিশুসুলভ মনোবৃত্তি আছে এখনও”

বড়টি কালীপদ সুর নকল করে বলে উঠল, “আচে এখনও।” আমি হেসে উঠলাম।

গোটা এলাকাটায় কাঁসর, ঘণ্টা, খোল এমনকি দামামা জাতীয় আওয়াজটা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে একটা অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য নেমে এসেচে ঝুপ করে। পিছনের ঝোপে তারস্বরে ঝিঁঝিঁ ডেকে চলেচে। কালীপদ কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে গেলাসটা মুখের কাছে তুলেচে, এমন সময়ে গোপী কক্ষে প্রবেশ করে হাসিমুখে কইলো, “বাবা জানতে চাইলেন আপনারা রাতে কী আহার করবেন? আপনাদের আমিষ চলে তো ঠাকুর? মাছটাছ আবার এদিগড়ে তেমন ভালো…”

“ওসব পরে হবে, তোমার বাবাকে একবার এই ঘরে আসতে বলো গোপীনাথ…” কালীপদ গম্ভীর স্বরে বললে। গোপী একটু ইতস্তত করে নীচে নেমে যাবার সময়ে হাঁক দিয়ে কইলো, “চল তোরা, দাদুর কাছে গিয়ে বস নীচে।”

বালকদুটি কানাইয়ের পাকা রঙের সড়কিটার গায়ে পরম আগ্রহে হাত বুলাচ্চিলো। কানাই সড়কির ফলার দিকটা হাত দিয়ে চেপে রেখে বাকিটা উন্মুক্ত করে দিয়েচে তাদের। ছোটদের লাঠিখেলায় আগ্রহ দেখলে সে ভয়ানক খুশি হয়ে ওঠে। বাপের চোখের ইশারায় তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও নীচে নেমে যাবার সময়ে কালীপদর পানে চেয়ে একচিলতে হেসে গেল।

ব্রজ মাস্টার অনুসন্ধিৎসু মুখে ঘরে ঢুকে একবার আমাদের মুখগুলোর উপর চোখ বুলিয়ে পালঙ্কে এসে বসলো। বালকরা খুব আশা নিয়ে বাইরে থেকে শুধালো, “আমরা আসবো দাদু?”

বৃদ্ধ সস্নেহে কইলো, “এখন না দাদুভাই, কথা বলচি আমরা, নীচে মায়ের কাছে গিয়ে বোসো একটু লক্ষ্মী…”

বাচ্চাটিও অনুরূপ সুরে কইলো, “বোসো একটু লক্কিটি”

বৃদ্ধ অসন্তুষ্ট হয়ে বললে, “ছিঃ দাদু, কতবার বলেচি বড়দের মুখের কথার নকল করবে না?”

বাচ্চাদুটি নেমে গেল। তারপর বৃদ্ধ আমাদের দিকে চেয়ে হাস্য করে বলল, “এই বড়টার এক বদভ্যাস। বড়দের মুখের কথার নকল বুলি করে। কতবার ধমক দিয়েচি, কে শোনে বুড়ার কথা…”

আমরা একটু হাসলাম। বোধকরি নিয়তিও সেই সময়ে হেসেচিলো, কারণ বালকের এই বদভ্যাসই যে গোটা পরগণাকে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবে, তা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি সে সময়ে।

বৃদ্ধ আবার বলল, “গোপীকে পাঠিয়েচিলাম রাতের আহারের কথা বলতে। আপনারা অতিথি, জিজ্ঞেস করা আমার কর্তব্য বৈকি, নাহলে পাঁঠার কালিয়া, ঘিয়ের লুচি আর নটক্ষীরে করা দুধ তো ঘরেই….”

কালীপদ কিছুটা উষ্ণ হয়ে গলা তুলে কইলো, “আমরা এখানে খাবারের লোভে আসিনি মাস্টারমশাই। আমি রায়দীঘড়ার জমিদার বংশের সন্তান, আমার ঘরে খাবারের অভাব ঘটেনি। এ পসারওয়ালা ডাক্তার, এই ছেলেটির পরিবার বড় কারবারী, কানাই আমার সন্তানতুল্য, এদের কারোরই খাদ্যাভাব নেই। তাই কাজের কথা বারংবার বাপ ছেলে মিলে এভাবে এড়িয়ে এড়িয়ে গিয়ে খাবারের লোভ দেখানোটা আপনার বোকামি হচ্চে।”

বৃদ্ধ সহ আমরা কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলাম। তারপর মাস্টার একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বললে, “বেশ, বলো ঠাকুর, কী বলবে?”

কালীপদ মনে মনে বোধকরি একটু ধাতস্থ হয়ে পরবর্তী কথাগুলো সাজিয়ে নিয়ে মুখ খুললো, “দেখুন মাস্টারমশাই, আমার মুখের কথায় দুঃখ পাবেন না, আমরা সত্যিই এখানে একটা বিশেষ জরুরী উদ্দেশ্যে এসেচি।”

বৃদ্ধ বিষাদের হাসি হেসে আত্মগত ভাবে বললে, “সে আমি অনুমানে বুঝেচি ঠাকুর। এটুকু অভিজ্ঞতা আমার বয়স আমাকে দান করেচে। বলো, কী বলবে….”

“সহজ এবং সংক্ষিপ্ত করে বলচি। এই ইন্দ্রর পরিবারের উপরে একটা অভিশাপ ছিল, বহু নরহত্যা এবং ধ্বংসের পর কোনোক্রমে সেই ভয়ঙ্কর শাপের শাপান্ত ঘটেচে। কিন্তু পুরোপুরি নয়….

বৃদ্ধ কইলো, “তাতে আমার এখানে কী সম্পর্ক বাঁধচে ঠাকুর?”

“বাঁধচে। বজ্রপাত দেখেচেন তো? বজ্র যখন কোনো উঁচু একবগ্গা গাছের উপরে পড়ে, তখন পরদিন দেখা যার তার আশপাশের গাছগুলোরও পাতা শুকিয়ে গিয়েচে। কেন জানেন? কারণ, বজ্র কখনো সরলরেখায় পড়ে না। মূল রেখার পাশাপাশি অজস্র নখের মতো সরু সরু ধারা ছড়িয়ে থাকে, যার প্রত্যেকটিই ঐ মূল শিখাটির মতোই প্রাণঘাতী। ইন্দ্রর পরিবারের ঘটনায় যে পরপর নৃশংস নরহত্যাগুলি হয়েচিলো, তার জন্য এরা প্রত্যক্ষভাবে দায়ী না হলেও সূত্রটা কিন্তু ওই বাড়িরই ছিল….. বৃদ্ধ ঢোঁক গিলে বললে, “কী বলতে চাইচো ঠাকুর?”

“যা বলচি, ভণিতা না করেই তো বলচি। আপনার তল্লাটের এই উপর্যুপরি শিশু অপহরণ এবং এই জান্তব গর্জনের রহস্যময় সূত্র কিন্তু আমার মন বলচে এই বাড়িতেই প্রোথিত রয়েছে, কারণ… কারণ আপনার পরিবারও শ্রীকৃষ্ণের স্নেহধন্য…

মাস্টার পূর্ণ দৃষ্টিতে কালীপদর দিকে চেয়ে চোখটা নামিয়ে বললে, “সে কথা ঠিক। ঠিকই বলেচো। আমার ঠাকুরদা সেইসব সূত্র, সঙ্কেতকে পুনরুদ্ধার করে নিজের মতো করে লিখে গিয়েচিলেন, কিন্তু বাছা, সেই সংক্রান্ত যা কিছু তথ্য, সূত্র, দ্রব্যাদি, সবই আমাদের পুরনো বাড়িতে ছিল। গঙ্গার ভাঙনে সে সবই জলতলে তলিয়ে গিয়েচে। এই বাড়ি আমার তৈরি নতুন বাড়ি। এখানে কিছুই পাবে না যে!”

আমার বুকটা একেবারে দমে গেল। কত বছর আগে স্রোতা গঙ্গায় তলিয়ে যাওয়া সূত্র আজ কীভাবে উদ্ধার করি?

কালীপদ একটু ভেবে নিয়ে মাথাটা তুলে কইলো, “দেখুন মাস্টারমশাই, আপনি ভুল ভাবচেন। আমরা এখানে এসেচি যদি কোনো আপদ মাথাচাড়া দিয়ে থাকে তবে তার সুরাহা করার চেষ্টা করতে। আপনাকে বা আপনার পরিবারকে সবার চোখে শত্রু করে দিতে নয়।”

বৃদ্ধ ভ্রুকুটি তুলে বললে, “তার মানে?”

কালী হেসে বলল, “তার মানে, আমিও কিন্তু একটা বনেদি পাকাবাড়িতে থাকি। আমার বাড়িও যথেষ্ট প্রাচীন এবং তার রক্ষণাবেক্ষণ আমাদেরই করাতে হয় নিয়মিত….”

বৃদ্ধ অপ্রস্তুত হয়ে মৌন হয়ে রয়েচে দেখে কালীপদ আবার বলল, “আপনার এই ভদ্রাসন যথেষ্টই প্রাচীন। উপরের এই জানালাগুলো মানুষপ্রমাণ, কিন্তু নীচেরগুলি দাওয়ার থেকে আরম্ভ হয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির দেখলাম। এর একটাই কারণ হয়, বাড়িটা দীর্ঘদিন ধরে বসে চলেচে আর আপনাদের বচ্ছর বচ্ছর দাওয়াটাকে উঁচু করে বাঁধিয়ে যেতে হয়েচে, ফলে জানালাগুলো একেবারে দাওয়ার ভূমি ছুঁয়ে গিয়েচে। ফলে, আমার ধারণা যে আপনার ঠাকুরদার সব সঙ্কেত, সব সূত্র এই বাড়িতেই এখনও রয়েচে। এই বাড়ী নতুন একেবারেই নয়?”

বৃদ্ধ অবসন্ন ভাবে শ্বাস ফেলে কইলো, “হাঁ, ঠিকই ধরেচো। কিন্তু সেসব কী কাজে আসবে জানি নে। স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নাকি আমাদের পূর্বপুরুষ জলধর এবং জলবিম্ব ঘোষকে দেখা দিয়ে একখানা পুঁথি আর একখানা দৈব মালা গচ্ছিত রেখেচিলেন। অনুমানে বুঝচি, মালাখানি নিয়ে ইতিমধ্যেই কোনো হাঙ্গাম উপস্থিত হয়েচে। আমরা হলাম জলবিম্ব ঘোষের বংশধর। আমাদের কাছে ছিল সেই পুঁথি।

সেই পুঁথি আজ আর আছে কিনা জানি না, তবে আমার ঠাকুরদা তাঁর বাকি পূর্বপুরুষের ন্যায় ওই পুঁথির সারটুকু নিজের ভাষার হেঁয়ালিতে লিখে গিয়েচেন। ভগবানের সেইরকমই আদেশ ছিল। একবার ভাবতে পারেন ঠাকুর, ঠিক কতখানি দূরদর্শী এবং চতুরচূড়ামণি হলে তবেই এই নির্দেশ দেওয়া সম্ভব? হাজার হাজার বছরে যে কোনো ভাষাই অপভ্রংশে পতিত হয়, ফলে আজকের রহস্য হাজার বছর পর পাঠোদ্ধার করা বড় কঠিন। তাই দুই তিন পুরুষ পরপর সঙ্কেতগুলিকে যুগোপযোগী ভাষায় নবীকরণ করার এই অসাধারণ নির্দেশ।

তবে হ্যাঁ, আমি তাঁর থেকে ছেলেবেলায় একটা কথা শুনেচিলাম, এখনও স্মরণ রয়েচে। সেই জলবিম্ব ঘোষ নাকি সপরিবারে সরতে সরতে ঠেলে এসে উঠেচিলেন এই মানগড়ে। তিনি শ্রীকৃষ্ণের নকশা করা এক অভূতপূর্ব মন্দির প্রতিষ্ঠা করে কিছু একটা লুকিয়ে রেখেচিলেন তাতে, কিন্তু কালের প্রভাবে গঙ্গা কিছুটা দিক পরিবর্তন করায় সেই মন্দির আজ হারিয়ে গিয়েছে, কিন্তু… আমার ঠাকুরদার ঠাকুরদা শ্রী লক্ষ্মীকান্ত ঘোষ সেই একই পদ্ধতিতে দ্বিতীয় একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে সেই চমৎকারী বস্তুটি লুকিয়ে রাখেন কৌশলে। সেই জিনিসটি কী, তা আমার জানা নেই ঠাকুর, কিন্তু লক্ষ্মীকান্ত ঘোষ অবধিই এই বিষয়ে মাথা ঘামানো হতো। তারপর আর কেউ উৎসাহী হননি। আমার ঠাকুরদা কেবল কয়েকটি জরাজীর্ণ হেঁয়ালিকে নিজের মতো করে লিখে গিয়েচেন। আর কোনো সূত্র নেই।

আর কিছুটা মাথা ঘামাতো আমার মামাতো ভাই রাধানাথ। সে একসময় জয়পুরের একটা মানমন্দিরে চাকুরী করতো। আমাদের গৃহেই প্রতিপালিত। আমাদের গৃহে পালিত হয়ে সে আদেশ ভেঙে থেটার করতো বলে আমার বাবামশাই বড় অসন্তুষ্ট ছিলেন তার প্রতি, কিন্তু সে থেটার ছাড়েনি। কিন্তু তার থেকেও আর কিছু জানার আশা নেই ঠাকুর। সে থেটার করতে করতেই আগের মাসে মারা গিয়েছে…’

বৃদ্ধ গেলাস উঁচু করে একটু জল গলায় ঢেলে বসে রইলো। কালীপদ একটু বিরাম নিয়ে শুধালো, “আচ্ছা, যে বালকগুলি অপহৃত হয় বা হারিয়ে যায়, তারা বোধহয় নির্মমভাবে জীবন হারায়, তাই না? আসার পথে অজস্র পুষ্করার সরা দেখলাম….”

“হাঁ। তাইই বটে। কোনো না কোনো সূত্রে হয়তো আমার পরিবার এর সঙ্গে জড়িত, এই ভেবে রাতে আমার নিদ্রা হয় না ঠাকুর …” এই বলে খুঁট দিয়ে চোখের কোল মুছে আবার বলল, “প্রতিটি অপহরণের পরের দিনই তাদের ছিন্নভিন্ন, ভয়ঙ্কর মৃতদেহ এই সাত আটটা গাঁয়ের পথেঘাটে ছড়ানো পাওয়া যায়। যে বাচ্চাগুলিকে যেইদিন পাওয়া যায় না, তাদের সবাইকেই পরদিনই পাওয়া যায় ভয়ানক এলোমেলো লাশ হিসেবে।

বড় ভয়ানক নৃশংস দৃশ্য ঠাকুর। মাধব মাধব। তাদের বুক পেট যেন কোনো হিংস্র শ্বাপদ খুবলে খেয়েচে! পেটের নাড়িভুঁড়ি এমনকি কলজেটা অবধি খেয়ে ফেলে সেই কাঁচাখেগো অপদেবতা, তারপর তাদের লাশগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যায় পথেঘাটে। কোন বাপ মা তার সন্তানকে এই অবস্থায়…

কত বাপ মায়ে আত্মহত্যা করেচে এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে, কতজন উন্মাদ হয়ে গিয়েচে! আদিবাসীরা খুব শারিরীক ও মানসিক কষ্টসহিষ্ণু হয় ঠাকুর, কিন্তু তাঁরাও পাগল হয়ে উঠেচে পরপর এই নরমেধে। এর কি প্রতিকার নেই? কোন এক নিষ্ঠুর শ্বাপদ এসে দুই মাস ধরে একে একে বাচ্চাগুলোর শরীর ছিঁড়ে খুবলে খাবে? আমার ঘরেও তো দুটো বাচ্চা রয়েছে…”

এই বলে এইবার সশব্দে কেঁদে উঠল ব্রজ মাস্টার। আমার মুখে সান্ত্বনার বাক্য যোগালো না। কালীপদও বিষণ্ণ হয়ে মাথা নীচু করে রইলো। সে শিশুদের বড় ভালোবাসে। কালভৈরবের মতো কঠিন এবং দুর্জয় সাহসী এই স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষটাকে আমি বাচ্চাদের সামনে খিলখিল করে হেসে খুনসুটি করতে দেখেচি বহুবার। আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম চুপ করে।

কালীপদ একটু পর বলল, “হাঁ ঠাকুর, ভালো কথা, এই যে দুইমাস দুইমাস বলচেন এই হত্যালীলার, তো এই আতঙ্ক আরম্ভ হবার আগে কি বিশেষ কিছু ঘটেচিলো? মানে, এমন কিছু, যার ফলে এই উপদ্রব আরম্ভ হয়েছে বলে বলা যায়?”

বৃদ্ধ মাথা নেড়ে কইলো, “কই না! এমন কিছু ঘটলে আমি শুনতুম ঠিক!”

“বেশ, কিছু স্মরণ হলে জানাবেন। আর ওই আপনার ঠাকুরদার কি সব জিনিসপত্র আছে বললেন, সেখানা দেখতে হবে একবার।”

“জিনিস বলতে একখানা বহু পুরনো বাঁধাই খাতা। তাতেই একটা রহস্যময় হেঁয়ালি লিখেচিলেন তিনি। আমার সিন্দুকেই রয়েচে। আমার ছেলেরাও এটার কথা জানে না। ছোটটা ঘোর কারবারী, আর বড়টি জরিপ বিভাগের কর্তা। মুঙ্গেরেই কাজ চলচে তার, কাল বাড়ি আসবে, কথা বলো তার সঙ্গে। বড় বুদ্ধিমান ছেলে। এই ডাক্তারবাবুর থেকে কিছু ছোট হবে। বিয়ে থা করেনি। ছোটটাও ভালো, তবে কারবার ছাড়া উপরি বুদ্ধি কম। এরা কেউই পুরনো বংশমর্যাদা বা কুলগৌরব নিয়ে আগ্রহী নয় ঠাকুর। আমার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো আমাদের পরিবারের অতীত গৌরব ভস্মীভূত হবে” বৃদ্ধ চুপ করে তারপর বলল, “কিন্তু এখন আহার করে নাও। শব্দ পেলুম। নীচে জলছড়া দিয়ে ঠাঁই করেচেন মেয়েরা। আহারান্তে আমি সেই চতুর চূড়ামণির দুর্বোধ্য সঙ্কেতের খাতাটি এনে দেখাবো তোমাদের…”

(৩) লক্ষ্মীকান্তের খাতা

আহারে পরিপাটি করে বসিয়ে মাস্টারমশাই নিজেও বসে কইলো, “আমাদের ব্যাঞ্জনে লবণ দেওয়া আছে ঠাকুর। তোমাদের জন্য নূতন ভাঁড়ে লবণ এনে রাখা আছে, ব্যাঞ্জনে মাখিয়ে নাও। আহাহা, ওইটে আমাদের ঘরের ঘি, এঁটে পুরো ভাতে আগে মেখে নাও। বড় চমৎকার ঘ্রাণ।”

খাওয়া যা হল তা নেহাৎ কম নয়। কালীপদ আহারে বসেও মাঝে মাঝে কী যেন চিন্তা করে চলেচে। আমরা এসেচি পর থেকেই আকাশে মেঘ হয়ে রয়েচে। মাঝে মাঝে কিছুটা পরিষ্কার হয়, আবার মেঘ। এখন রসুইয়ের মুখে খোলা, প্রশস্ত জলছড়া দেওয়া দাওয়ায় বসে খেতে খেতে জোলো বাতাস গায়ে এসে লাগচে। উঠানের একেবারে কোণায়, গৃহপ্রাচীরের গায়ে ঘটি নিয়ে কুলিকুচি করে উপরে উঠে এলাম।

কিছুক্ষণ পর ব্রজ মাস্টার একখানা জীর্ণ খাতা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকে কপাট এঁটে দিয়ে পালঙ্কে এসে বসলো। কালীপদ জানালা ধরে দাঁড়িয়ে একখানা লবঙ্গ চিবুচ্চে, এইবার পালঙ্কে এসে বসে কইলো, “তারার আবছা আলোতে পাহাড়গুলো ভারী চমৎকার দেখায়। মনে হয় না এত সুন্দর একটা পরিবেশে এতটুকু কোনো মৃত্যু অপেক্ষা করচে।”

বৃদ্ধ বাতির চাকা ঘুরিয়ে আলোর শিখাটা অনেকখানি উসকে দিতেই গোটা ঘরটা অনেকখানি আলো হয়ে উঠল। সেই আলোতে খাতাটা খুলে কালীপদর দিকে এগিয়ে দিয়ে কইলো, “এই সেই খাতা। তবে এই একখানা ছড়ার মতো জিনিস ছাড়া আর কিছুই লেখা নেই এতে। দেখো, যদি কোনো কাজে আসে।”

কালীপদ খাতাটা নিয়ে শুধালো, “আচ্ছা সে দেখচি, কিন্তু একটা কথা, আপনার ঠাকুরদার বাবা না কে, ওই লক্ষ্মীনাথ ঘোষ, তিনি পূর্বপুরুষের রীতি মেনে, শ্রীকৃষ্ণের বলে যাওয়া কৌশলে যে হুবহু মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেচিলেন, সেইটে কোথায় আছে?”

“লক্ষ্মীনাথ নয়, লক্ষ্মীকান্ত ঘোষ। না, ওনার তৈরি সেই মন্দিরের হদিস আমি কখনো শুনিনি পরিবারের কারোর কাছে…’

আমি মাঝখানে বললাম, “আচ্ছা, আমরা সবকটি মন্দির একবার করে দেখতে পারি তো? খুব পুরনো যদি কোন শতবর্ষী মন্দির থেকে থাকে তবে…”

বৃদ্ধ ক্লিষ্ট হেসে বললে, “গোটা মুঙ্গের জুড়ে কম করে তিন শতাধিক মন্দির রয়েচে। তার মধ্যে অধিকাংশই শতবর্ষী। কোথায় খুঁজে বের করবে বাছা? শুধু কেল্লার দিকের জোড়া পাহাড়দুটোর নীচের পরিধি ধরেই কম করে একশো বহু প্রাচীন মন্দির আছে। তা বাদে, ওইদিকে ধরহরা, এদিকে ভাগলপুরের পথে, ওইদিকে ঋষিপাহাড়েও কিছু মন্দির আছে ভগ্নপ্রায়। কোথায় খুঁজে পাবো? চেষ্টা কি আমিই করিনি ভাবচো বাছা?”

কালীপদ বিড়বিড় করে বললে, “মজা নেহাৎ মন্দ নয়। তিনশো মন্দিরের মধ্যে একটা মন্দির, তাও সূত্রহীন। এদিকে সেই মন্দিরে আদৌ কি রেখেচিলেন কেশব, তাও অজানা। আবার সেই পুঁথিও নাই এত হাজার বৎসরে। আছে শুধু কী? না, লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের লেখা একখানা ছড়া!”

“আহা ঠাকুর, ঘুলিয়ে ফেলচো কেন? লক্ষ্মীকান্ত ঘোষ হলেন আমার ঠাকুরদার ঠাকুরদা, তিনি মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা, আর হেঁয়ালিটা লিখেচেন আমার ঠাকুরদা। এদিগড়ে সবাই তাঁকে জনান্তি ঠাকুর নামে চিনতো”

কালীপদ এই ঠাকুরদার কুলপত্রিকার ঝঞ্ঝাটে না গিয়ে খাতাটা খুলে ধরল সামনে। পরিষ্কার, গোটা গোটা অক্ষরে চমৎকার হাতের ছাঁদে লেখা একখানা দুর্বোধ্যপ্রায় রহস্যময় ছড়া;

শতেক হৃদয়ে আছয়ে লুকায়ে
পরম সৃষ্টিকারী,
শতেক ধারায় জাগিবে নিমেষে
গন্ডামুন্ডধারী।
অশ্ব থামিয়ে কৈলো বরণ
অতন্দ্র নিদ্ৰাকে,
গোপন শলা করল বুড়া
ভীমরতিরই ফাঁকে।
গঙ্গা ফিরেন উৎসমুখে
দুঃখ হইলে ত্রাণ,
নারীপুরুষ একই নামে
হইলা সম্প্রদান।
একনজরেই বিদ্ধ ঋষি
কামের শরাঘাতে,
চক্ষু মুদে হাসেন দেবী
নিজের ছলনাতে

ছড়াখানা আমি, কালীপদ আর ইন্দ্রনাথ, তিনজনেই ঝুঁকে পড়ে পড়চিলাম, এইবার পুরোটা পড়ে কালীপদ বিষম আতান্তরে পড়ে গেল। ইন্দ্রর দিকে অস্বস্তির সঙ্গে আড়চোখে তাকাতেই বুদ্ধিমান ছোকরা একচিলতে হেসে দূরে কানাইয়ের পাশে গিয়ে বসলো। কালীপদ অসন্তোষের সঙ্গে নীচু স্বরে বলল, “এ কী মাস্টারমশাই? এ কেমন ভাষা! কেমন যেন…..

ইতিবাচক মাথা নেড়ে কইলো, “সে কথা ঠিক ঠাকুর, আমারও বৃদ্ধ তাইই মনে হয়েচে, কিন্তু ঠাকুরদার লেখার কিছু উদ্দেশ্য তো থাকবেই?

তিনি যখন এই ধরণের চটুল বাক্য লিখেচেন, তখন এইরকম কোনো ঘটনা নিশ্চয়ই জড়িত রয়েচে। ঠাকুরদা বলতেন, এই হেঁয়ালিটা নাকি ঐ মন্দির সংক্রান্ত, কিন্তু মন্দিরই খুঁজে পাওয়া অসম্ভব, তো হেঁয়ালি….”

কালীপদ ভ্রু কুঁচকে কইলো, “মানে যদি থাকেই তবে তা ধরতে পারা তো চাই? এর কী মাথামুন্ড হচ্চে তবে? প্রথম দুটো ভাগ তো শ্রীকৃষ্ণের উদ্দ্যেশ্যে লেখা মনে হচ্চে! উনিই সকলের হৃদয়েশ্বর। কিন্তু গন্ডামুন্ডধারীটি কে? সে জেগে উঠবে কীভাবে?”

আমি বললুম, “আচ্ছা দাদা, যে হিংস্র কাঁচাখেগো অপদেবতাটি জেগে উঠেচে পক্ষ চারেক আগে, তারই নাম ঐ

গন্ডামুন্ড নয় তো?” কালীপদ একটু সন্দেহের সঙ্গে বললে, “হতেই পারে। খুবই সম্ভব। কিন্তু সেই গন্ডামুন্ডধারীকে কেউ একজন নিজের ঘোড়া থামিয়ে কোথাও একটা ঘুম পাড়িয়ে রেখে গিয়েচিলেন। কে সেই অমিত শক্তিমান ঘোড়সওয়ার যে এমন রাক্ষসকে নিদ্রিত করতে পারেন? স্বয়ং কেশব নন কি?” তো তারপর আরেকবার ঐ পালঙ্কটা দেখে নিয়ে কইলো, “কোনো এক বুড়ার ভীমরতি জেগেচিলো সে ভালো কথা, কিন্তু সেই ফাঁকে আবার কার সঙ্গে গুপ্ত শলাপরামর্শ সারলো সে? আর সেই বুড়া বয়সে চিত্তবৈকল্য হওয়া বুদ্ধই বা কে? জলবিম্ব বা জলধর নন তো?” এইটে বলেই বৃদ্ধের পানে চেয়ে কালীপদ লজ্জিত হল।

বৃদ্ধ নিরাসক্ত ভঙ্গিতে কইলো, “হবেও বা। কেউই দোষগুণের অতীত নয়। কিন্তু বাকিটুকুও যে একরকম অসম্ভব ঠাকুর? আমি আগেও অনেকবার ভেবেচি বৈকি। প্রথমতঃ, যে মা গঙ্গা পৃথিবীর কলুষ হরণ করতে পৃথিবীর বুকে অবতীর্ণ হয়েচিলেন, তিনি দাক্ষিণাত্যের দিকেই চিরদিন বয়ে গিয়েচেন, কখোনোই উৎসমুখে ফিরে গিয়েচেন বলে শুনিনি। তাই এইটি পুরোপুরি অবাস্তব। আর দ্বিতীয়তঃ, কোনো বিবাহে বর এবং কনে, দুইজনকেই একটিই মাত্র নামে সম্প্রদান করা যায় না। দুজনেরই নামের প্রয়োজন হয়। তাই এটিও ঘোর অসম্ভব কথা…

কালীপদ বিরস মুখে সায় জানিয়ে বলল, “দুটোই ঠিক কথা বলেচেন। দুটোই আমি কখনো শুনিনি। আর শেষেরটুকু তো…”

কালীপদ মুখ বন্ধ করল। বৃদ্ধও কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হয়ে কথার মোড় ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “কাল আমার বড়টি বাড়ি আসচে। কথাবার্তা কইবেন’খন। আজ তবে শুয়ে পড়ুন আপনারা দয়া করে। সারাদিন রেলগাড়ির ধকল গিয়েচে। কাল কথা হবে। খাতাখানা রেখেই গেলুম। বাতিটা কমিয়ে দিই তবে?”

সারাদিন সত্যিই এতখানি পথের রেলগাড়ির পরিশ্রম এবং রেলের গদির কুখ্যাত ছারপোকার কামড় খেতে খেতে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে এসেচিলো। এখন প্রশস্ত পালঙ্কের কোমল শয্যায় শুয়েই নিদ্রায় তলিয়ে যেতে যেতে ভাবলাম, নিজের ঘোড়া থামিয়ে এভাবেই কেউ হাজার হাজার বছর আগে অতন্দ্র নিদ্রাকে বরণ করে নিয়েচিলো। কে সে?

(৪) ঋষি কুন্ডের দানব

সকাল সকাল প্রাতঃরাশ সেরে মাস্টারের বাড়ির গো-যানে চেপে রওয়ানা হলাম বড়িয়ারপুরের বাইরে অবস্থিত ঋষিকুন্ড নামের একটা বিরাট পাহাড়ের দিকে। বৃদ্ধের বড় ছেলের ডাক নাম রিদয়। সে জরিপের কিছু একটা জরুরী কাজে আটকে পড়েচে ঋষিকুন্ডেই, বাড়ি আসতে পারেনি। তার বাপ লোক মারফৎ তাকে খবর পাঠিয়ে দিয়েচে খুব ভোরেই। এখন আমরা চলেচি সশরীরে তার কর্মস্থলে।

ভারী মনোরম পরিবেশ। আকাশ যদিও মেঘাচ্ছন্ন, বাতাসে ভিজে হাওয়া বইচে, কিন্তু পথঘাট একেবারে ঝকঝক করচে। মধ্যে মধ্যে পথের দুপাশে ছোট বড় টিলা। পাখি ডাকচে, লোকজন মাথায় সওদা নিয়ে চলেচে। ঋষিকুন্ড পাহাড়টা অন্যান্য পাহাড়গুলির চেয়ে অনেকটাই বড় এবং প্রশস্ত। পাহাড়ি পথে গোরুর গাড়ি ওঠার পূর্বে নীচের একটা ঝোপড়া থেকে চাপা মেয়েলি কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। আমরা সবাই শুনেচি সেই শব্দ। গাড়োয়ান বেজার গলায় বললে, “কাল যে চারটে বাচ্চা হারিয়ে গিয়েচে, তাদের আজ কেল্লাঘাটা আর কষ্টহারিণী ঘাটের কাছে ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পাওয়া গিয়েচে। তার মধ্যে একটি ছেলে এই বসতির…’

কালীপদ থমথমে মুখে বসে রইলো। আমরা একটা জলকুন্ডের সামনে এসে গাড়ি থেকে অবতরণ করলাম। একটি নয়, দুইপাশে দুইখানা জলের কুন্ড। এই শীতল পরিবেশে জল থেকে ধুঁয়া বেরুচ্চে ধীরে ধীরে। গাড়োয়ান কইলো, এই দুইটি গরম জলের কুন্ড ঠাকুর। এতে সবসময় গরম জল থাকে। অনেকেই স্নান করে এখানে শীতে, বর্ষায়। এখন খোঁড়াখুঁড়ি চলচে বলে বাইরের উটকো লোকের আসা নিষিদ্ধ হয়েচে। তাছাড়া ভয়টাও তো আছেই….”

কতকগুলো ক্যাম্প পড়েচে কুম্ভের চারপাশে। একজন সৌম্যদর্শন মাঝবয়সী লোক বেরিয়ে এসে আমাদের দেখতে পেয়ে হাসিমুখে এগিয়ে এল। ইন্দ্র তাকে প্রণাম করতেই সে হো হো করে হেসে উঠে কইলো, “তুমিই ইন্দ্ৰনাথ ঘোষ? দেখো কাণ্ডটা। একই বংশের লোক হয়ে, একই দেশের পাশাপাশি সুবায় থেকেও আমরা কেউ কাউকে চিনি নে… এই বলে সে আমাদের সঙ্গে করমর্দন করল। তার বলিষ্ঠ হাতের চাপে আমি আর ইন্দ্র মুখ কুঁচকালুম। কালীপদর মুখে তেমন অভিব্যক্তি দেখলুম না।

লোকটি হেসে কইলো, “বাঙ্গালার জলভাতে শরীরে বল দেয় না ঠাকুর। এই দেশের ডালরুটি অনেক বলবৰ্দ্ধক….”

কালীপদ একচিলতে হেসে কইলো, “এর সঙ্গে করমর্দন করলে না? এও বাঙ্গলারই ছেলে…

লোকটি হেসে কানাইয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে লাফিয়ে উঠে কইলো, “বাপসস, ঘাট হয়েচে ঠাকুরমশাই। এটা মানুষ, না লৌহভীম? আমার কথা ফিরিয়ে নিলুম…” এই বলে হোঃ হোঃ করে হেসে উঠল। তার এই অনাবিল হাসিই বলে দেয় লোকটি একেবারেই দাম্ভিক বা দর্পধারী নয়, মজা করতে ভালোবাসে মাত্র। কালীপদ সহ আমরা খোলা আকাশের নীচে কুন্ডের পাশের প্রাচীরে এসে বসলাম। পিছন থেকে জলের উষ্ণ বাম্প এসে আরাম দিচ্চে। কালীপদ বলল, “এই ধরনের গন্ধক মিশ্রিত উষ্ণ প্রস্রবণের জল শুনেচি ঘা অথবা চামড়ার রোগের পক্ষে খুব ভালো ওষুধ?”

আমি সম্মতি জানাতে রিদয় ঘোষ কইলো, “ভালো মন্দ জানিনে, তবে বাইরেটা এমন উষ্ণ জল হলে কি হয়, ভিতরটা একেবারে হিমের মতো ঠান্ডা…”

কালী অবাক হয়ে কইলো, “পাহাড়ের ভিতরেও আবার জরিপের কাজ হয় নাকি?”

রিদয় বিস্মিত হয়ে কইলো, “জরিপ? জরিপ কেন হবে?”

আমি এইবার অবাক হয়ে শুধালাম, “আপনি জরিপ বিভাগে রয়েচেন না?”

“কে বলে? বাবা নিশ্চয়ই?” এই বলে আরেকপ্রস্থ হেসে বললে, “বাবার যেমন কথা। সংস্কৃতের পন্ডিত ছিলেন। বাবা যা দেখেন সবই নিজের মতো করে সাজিয়ে নেন। জরিপের কাজে খোঁড়াখুঁড়ি কেন করতে যাবো বলুন দিকি? আমি পুরাতত্ত্ব বিভাগের একটা শাখার প্রধান। খুড়োর ওভাবে মৃত্যুর পর বাবা মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েচেন কিছুটা, তাই আনমনা হয়ে বলে ফেলেচেন…”

“তোমার খুড়া? রাধাকান্ত?”

“রাধানাথ। হাঁ, সেই। কেন বাবা বলেননি?”

“বলেচেন মারা গিয়েচেন, কিন্তু কিভাবে তা বলেননি…”

এড়িয়ে গিয়েচেন হয়তো ঠাকুর, দোষ নেবেন না। বড় ভয়ানক ঘটনা। আমার খুড়ো থিয়েটার, যাত্রা নিয়ে মেতে থাকতেন। ধরহরার বৈজয়ন্তী থিয়েটারে টুকিটাকি অভিনয় করতেন। মুখ্য চরিত্র পেতেন না তাঁর আপনভোলা স্বভাবের জন্য। আগের মাসে একটা ইতিহাসধর্মী নাটকে খুড়ো হয়েচিলেন এক প্রহরী। গল্পটা শুনলাম, একজন গুপ্ত ঘাতক রাজাকে হত্যা করতে মহলে ঢুকেই মুখোমুখি হবে রাজার বহুদিনের প্রহরীর সঙ্গে। ঘাতক ছোরা বের করে প্রহরীকে হত্যা করে রাজার কক্ষে প্রবেশ করবে।

সব নাকি ঠিকঠাকই চলচিলো। ঘাতক হয়েচিলেন ঐ বৈজয়ন্তীরই মালিক এবং অধিকারী রমেনবাবু। রমেন্দ্রনাথ মালিক। ভারী পয়সাওয়ালা লোক এবং অতি সজ্জন। দারুণ অভিনেতাও। থিয়েটারের যে ছোকরাটি প্রয়োজনমতো জিনিসপত্র জোগান দেয়, সেই ছেলেটি দৃশ্যের আগে রমেনবাবুর হাতে এনে দিল নকল স্প্রিং আঁটা ছোরা। দেখতে আসলের মতোই। আলতো চাপ দিলে ফলাটা বাঁটের ভিতরে ঢুকে যায়।

তো, রমেনবাবু ছোরা মারার দৃশ্যে খুড়োকে ছোরা মারলেন এবং খুড়ো পড়ে গেলেন, সঙ্গে সঙ্গে রমেনবাবুও ভীষণ আতঙ্কে চীৎকার করে উঠলেন! গতিক বুঝে মঞ্চের আলোটালো সব জ্বালিয়ে দেওয়া হতেই সবাই চমকে উঠে দেখল, মঞ্চ রক্তে মাখামাখি। খুড়োর বুকে গেঁথে রয়েচে একটা আসল ছোরা। রমেন বাবু হতভম্বের মতো একবার ছোরাটা আর একবার নিজের হাতের দিকে দেখতে দেখতে অচৈতন্য হয়ে ঢলে পড়লেন। পুলিশ এসে তদন্ত করে বের করল, যে ছোকরা নটবর প্রসাদ নকলের বদলে আসল ছোরা ধরিয়ে দিয়েচিলো সে ঐ সময় থেকে বেপাত্তা। নটবরের ব্যবহার্য জিনিসপত্র সমেত সে গা ঢাকা দিয়েচে। পুলিশ রমেনবাবুকে যথেষ্ট চিনতো। আমরাও চিনি। লোকটা নিজের সমস্ত সম্পত্তি এই অভিনয়কে ভালোবেসে বিলিয়ে দিয়ে এখন ঋণগ্রস্ত, কিন্তু কোনোক্রমে বৈজয়ন্তীকে টিকিয়ে রেখেচেন। সেই অভিনয়ই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। কেমন যেন কুঁকড়ে গেছে মানুষটা। শুধু বিড়বিড় করছে, আমি শেষে মানুষ খুন করলাম? আমার হাতেই তো হল খুনটা? তোমরা তো সবাই দেখেচো আমাকে খুন করতে?

থিয়েটার এই একমাসে আর খোলেনি। তো, যাই হোক, যা বলচিলাম, কিছু প্রাচীন সূত্রে এই পাহাড়ের একটা তথ্য পেয়ে ভারত সরকার অনুসন্ধানের আদেশ দিয়েচিলেন, কিন্তু… বোধহয় এখানে তেমন কিছুই নাই। কদিনের মধ্যে সব গুটিয়ে নেওয়া হবে….”

আশপাশের তাঁবুগুলির কোনোটা মজুত ঘর, কোনোটা কুলিদের জন্য, কর্মীদের জন্য। সেদিকে চোখ বুলিয়ে কালীপদ বলল, “আচ্ছা একবার পাহাড়ের উপর থেকে গ্রামগুলো দেখা যায়?”

“কী মুশকিল, বাধাটা দিচ্চে কে? চলুন চলুন…”

আমরা পদব্রজে পাহাড়ের ধাপ কাটা পথে ধীরে ধীরে চড়তে আরম্ভ করলাম।

সোজা পথে উঠলে তাড়াতাড়ি হয়, কিন্তু পরিশ্রম অনেক অধিক, তাই পাহাড়ের গায়ের পাকদন্ডী পায়ে চলা ধাপ পথে উঠতে আরম্ভ করলাম। পাক খেয়ে পাহাড়ের পিছনের দিকে একটা জায়গায় এসে রিদয় ঘোষ বলল, “এই জায়গাটা একটু ধীরে পা ফেলে চলুন। নীচে একটা বড় গুহা রয়েচে, তাতে কাঁপুনি হলে পাথর খসে পড়বে গুহামুখ থেকে…”

আমরা আবার অর্ধচন্দ্রাকৃতি পাক দিয়ে পাহাড়ের সামনের দিক থেকে চূড়ায় পৌঁছালাম। নীচের তাঁবু, গোরুর গাড়িটা এমনকি ঝুপড়িগুলো অবধি খেলনার মতো মনে হচ্চে। চূড়ায় একটা আট দশ ফুট ব্যাসের গর্ত, তার মুখটা ঘিরে তিনপায়া লোহার গাছ খাটানো, তাতে শিকল এবং মাটি মাখা আঙ্গটা ঝুলচে। রিদয় বলল, “এইখানেই খোঁড়াখুঁড়ি আরম্ভ হয়েচিলো, কিন্তু অনেকখানি গভীরে খুঁড়েও কিছুই হদিশ না মেলায় কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”

কালীপদ হতাশ হয়ে শ্বাস ফেলে বললে, “তবে আর লাভ কী বাছা? কোথাও কোনো সূত্র পেলাম না যথাযথ। তবে কোন দিক থেকে এই সমস্যার সমাধান করি বলতে পারো?”

রিদয় ঘোষ ব্যাথিত হয়ে কইলো, “আমি আপনাদের আসার উদ্দেশ্য শুনেচি রহিমচাচার মুখে। বাবা তাকে পাঠিয়েচিলেন সকালে আমার কাছে। কিন্তু আর কি কোনো উপায় নেই ঠাকুরমশাই আপনাকে সাহায্য করার? আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবো। এই তল্লাটে আমার পরিচিতি এবং প্রতিপত্তি একেবারে নগণ্য নয়। যতটুকু সম্ভব করতে পারি আমি। নিঃস্বার্থ হয়তো নয়, কারণ আমার ঘরেও ভাইয়ের দুটো বাচ্চা রয়েচে ঠাকুর।”

কালীপদ তার পিঠে হাত রেখে কইলো, “দেখি একটু গাঁ গুলো ঘুরে ঘুরে, কিছু পথ পাই কিনা। তুমি ঘরে ফিরচো রাতে?”

“হাঁ ঠাকুর, রাতে যাবো। কয়েকদিন ক্যাম্পেই কাটলো…

আমরা নীচে নেমে এলাম। চূড়ার উপরে একখানা ছোট্ট ধূসর পাথর দেখে আমার ভারী পছন্দ হয়েচিলো স্মারক হিসেবে, কিন্তু হাজার টানাটানি করেও ঐটুকু পাথরকে তুলতে পারলুম না দেখে রিদয় হেসে ফেলে বলল, “ও কী করচেন ডাক্তারবাবু? আলগা পাথরের কথা আলাদা, কিন্তু পাহাড়ে বসে থাকা অতি ক্ষুদ্র পাথরও হাজার হাজার বছরে বজ্র আঁটুনিতে গেঁথে যায় পাহাড়ের সঙ্গে। তাকে তোলা সহজ নয়। এই পাহাড়ের যা যেমন আছে, তা তেমনই স্থির। পাহাড়ি পাথুরে ভূমি কাটা এতই সহজ হলে সরকারের হাজার হাজার টাকা সাশ্রয় হতো…”

আমি লজ্জিত হয়ে কথান্তরে গিয়ে শুধালাম, “আচ্ছা রিদয়বাবু, এই যে এত বিরাট পাহাড়, কিন্তু বৃষ্টি হলে তো পাহাড়ে কখনো জল জমে শুনিনি। সবই নীচে সমতলের দিকে ধাবিত হয়। তো এই প্রকাণ্ড পাহাড়ের জলরাশি যদি বন্যার ঢলের মতো একসঙ্গে নীচের জমিতে ধেয়ে যায়, তাহলে নীচের বাড়িঘর, ঝুপড়িগুলো টিকে থাকে কী করে?”

রিদয় মুখে একটু কৌতুক সৃষ্টি করে উত্তর দিল, “আপনার কথা ঠিক। এই পাহাড়প্রমাণ জলরাশি সগর্জনে নীচের দিকেই ছুটে যায়, কিন্তু আপনি যেমন ভাবচেন, তেমন এলোমেলোভাবে নয়। পুরো জলরাশিটা হাজার হাজার বছরের পুরনো কয়েকটি নির্দিষ্ট নালা বেয়ে পাহাড় থেকে নিষ্কাশিত হয়ে যায়, ফলে বিপর্যয়ের আশঙ্কা নাই…

কালীপদ বোধকরি আমার এই প্রসঙ্গান্তরে যাবার কৌশলটা ধরে ফেলেচিলো, তাই রিদয়ের কথা শেষ হতেই আমার দিকে তাকিয়ে আড়চোখে মুচকি হাসলো, এবং বলাইবাহুল্য সেটা আমার মনঃপূত হল না। আমার মন চঞ্চল হয়ে ছিল এই ভেবে যে, কোনো দিক থেকেই তিলমাত্র সূত্র পাওয়া যাচ্চে না, যা দিয়ে ঐ রহস্যময় ছড়ার পথ ধরে কোনো দিকে এগোনো চলে, কিন্তু তখনও আমরা ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি যে, এতক্ষণ ধরে যা যা দেখলাম, যা যা ঘটেচে, তার মধ্যেই কতবড় একটা সূত্র আমরা হেলায় ফেলে চলে এলাম!

কালীপদর দিকে চেয়ে দেখলুম সে অনবরত কি যেন হিসাব কষে চলেচে মনে মনে। আমার দিকে চোখ পড়ায় বিড়বিড় করে কইলো, “সবই দেখলাম ডাক্তার, কিন্তু তার মধ্যেই কি যেন একটা বিসদৃশ ঘটেচে! ধরতে পারচি না।”

আমরা ঢালু পথটুকু হেঁটে গোরুর গাড়ি অবধি পৌঁছে গাড়িতে উঠলাম। কালীপদ গাড়িতে উঠেই আবার কী মনে করে নেমে পড়ল। আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই সে বলল, “আরেকবার চলো তো, রিদয় ঘোষের থেকে আরও কিছু জানার আছে।”

আমরা তড়িঘড়ি গাড়ি থেকে নেমে এসে আবার ঢাল ভেঙে ক্যাম্পে পৌঁছাতে রিদয় বিস্মিত হয়ে কইলো, “বলুন ঠাকুর!”

কালীপদ একটা পাথরের উপরে বসলো। দেখাদেখি আমরাও। কালীপদ সোজাসুজি রিদয়ের দিকে চেয়ে বললে, “তুমি কিছু কথা গোপন করেচো বাছা। সবটুকু বলোনি।”

আমি ভিতরে ভিতরে উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। রিদয় ভ্রু কুঁচকে কইলো, “গোপন করেচি? কী বলুন তো?”

“পাহাড়ের পিছনের গুহাটা তো পুরনো নয়, তাইনা? সদ্য সদ্য তৈরি হয়েচে? পাহাড়ের একটা ছোট্ট পাথরকে যদি তোলা না যায়, তবে হাজার হাজার বছরের পুরোনো গুহার উপর দিয়ে হাঁটতে গেলে কাঁপুনিতে পাথর খসে পড়বে কেন গুহার থেকে? এত সহস্র বছরে তো সেগুলোও বজ্ৰ আঁটুনিতে গেঁথে থাকার কথা?”

রিদয় বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে বললে, “আপনি সত্যিই তীক্ষ্ণ মানুষ ঠাকুর! তারপর বলুন, আমি শেষে উত্তর দিচ্চি।”

আমি দেখলাম কয়েকজন কুলি এসে আমাদের পিছনে দাঁড়িয়েচে। কালীপদ আবার বলল, “আরেকটা কথা, তোমরা যে চূড়ার থেকে কিছুই পাওনি সে কথা ভুল। তাহলে লোহার গাছ লাগিয়ে শিকল-আঙ্গটা দিয়ে কী তুলেচো তলা থেকে? কিছু তোলার না থাকলে ঐটে কেউ বসায় না। আঙ্গটায় পাথুরে মাটিও লেগে রয়েচে দেখলাম?”

রিদয় হেসে উঠে পাথর ছেড়ে এগিয়ে এসে কালীপদর হাতদুটো ধরে কইলো, “আপনি সত্যিই অসামান্য নজরবান ঠাকুরমশায়! আপনার সব কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। কিন্তু একটা বিশেষ কারণে আমি উপযাচক হয়ে এসব কথা বলতে চাইনি, কারণ যা আমরা মাটি খুঁড়ে পেয়েচিলাম, তা খোয়া গিয়েচে। সরকারি খাতায় আমি সেটির কথা নথিভুক্ত করিনি, নচেৎ সবাইকে নিয়ে টানাটানি পড়বে। তবুও হয়তো আপনাকে আমি ভরসা করে সবই বলতাম, কিন্তু আপনি যে কাজে এসেচেন তার সঙ্গে যে আমার এক্সকাভেশনের তিলমাত্র যোগসূত্র আছে তাই তো আমার মাথায় আসেনি। আমারই ভুল। বসুন, একটু চা করতে বলি। সব বলচি।”

পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা কুলিদের চা আনতে বলায় তারা তাড়াতাড়ি আদেশ পালন করতে চলে গেল তাদের তাঁবুতে। রিদষ ঘোষ একটু চুপ করে কথাগুলো সাজিয়ে নিয়ে মুখ খুললো—

“আমাদের এই এক্সকাভেশন সাইটের কাজ আরম্ভ হয়েচে ঠিক সাড়ে তিন মাস আগে। এসব কথা অত্যন্ত গোপনীয় বলেই আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করিনি আমি। মাস ছয়েক আগে কোনো একটা পর্যটকের দল ওই চূড়াটায় ঘুরতে আসে। তাদের মধ্যে একজন সরকারি অবসরপ্রাপ্ত অফিসার ছিলেন। তিনিও পুরাতত্ত্ব বিভাগেই কাজ করতেন একসময়ে। তাঁর মনে ঠিক কী দেখে কী মনে হয়েচিল আমি বলতে পারবো না, তবে তাঁর কথাতেই এই এক্সকাভেশনে রাজী হয় ভারত সরকার।

তো, আমরা মোটামুটি তিন পক্ষকালব্যাপী যন্ত্রের মাধ্যমে পাথর পরীক্ষা, মাটি পরীক্ষা, বাহ্যিক এবং আভ্যন্তরীন তাপমাত্রার তারতম্য পরীক্ষা করে ঠিক চূড়ার কাছাকাছি যন্ত্রে একটা আভাস পাই, যা ওই পাথরের অনেকখানি নীচে কিছু একটা অদ্ভুত জিনিস থাকার সঙ্কেত দেয়, যা পাথর, মাটি বা খনিজ পদার্থের বাইরের কিছু! ওই যেখানে গর্তটা দেখলেন, ওই জায়গাটাতে আমরা খুব সাবধানে খনন আরম্ভ করি।

আপনারা সমতলের খনন হয়তো দেখেচেন। সেক্ষেত্রে চওড়া থেকে ধীরে ধীরে সিঁড়ির মতো ধাপ কেটে কেটে ক্রমশ সরু হয়ে প্রকাণ্ড চওড়া গর্ত খোঁড়া হয়। ধাপের মাঝে মাঝে বল্লার বেড়া দেওয়া হয় ধ্বস প্রতিরোধ করতে। কিন্তু পাহাড়ের খনন সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা কয়েক ফুট খুঁড়ি, তারপর বিভিন্ন যন্ত্র নামিয়ে দিয়ে বিষাক্ত কিছু রয়েচে কিনা, বা তাপমাত্ৰা পরীক্ষা করি। তো, মোটামুটি পঁয়ত্রিশ হাত গভীর গর্ত ততদিনে হয়ে গিয়েচে। গর্তের দেওয়ালে জালের বেড়া দেওয়া হয়েচে, হঠাৎই আমাদের বিশেষ তাপমাত্রা মাপক যন্ত্রে একটা অদ্ভুত শৈত্য ধরা পড়ল! বাইরের থেকে ভিতরের ঐ স্তরের তাপমাত্রায় আকাশ পাতাল ফারাক! তাপমাত্ৰা তো নয়, যেন হিমাঙ্কের অনেক অনেক নীচে নেমে গিয়েচে যন্ত্রের সূচক! অথচ চূড়ার উপরে তার তিলমাত্র আভাস নাই!

আমরা ভীষণ চমকে উঠলাম ঠাকুরমশায়। প্রথমতঃ, যে পাহাড়ের ভিতরে এইরকম হিমাঙ্ক চলচে, তার ছিটেফোঁটাও আভাস তো ওই চূড়াতেও আসার কথা? আর দ্বিতীয়তঃ, এই পাহাড়ের মধ্যে থেকেই বেরোনো প্রস্রবণের জল তবে এমন উষ্ণ হয় কেমন করে? এত বৈপরীত্য? আমরা সতর্ক হয়ে আর কোনো কুলীকে গর্তে না নামিয়ে তার বদলে যন্ত্রের সাহায্য নিলাম, কিন্তু বোঝেন তো ঠাকুর, দেশ স্বাধীন হয়েচে মাত্র ষোলো বৎসর। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের সরকারের হাতে ততো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এখনও আসেনি। আমরা বিশেষ মারফতে সেনাবাহিনীর থেকে দুখানি হিমাঙ্কের উপযোগী পোশাক আনিয়ে দুইজন কুলীকে যন্ত্রসহ নামালাম ওই ফোকরে।

তারা ত্রিশ পঁয়ত্রিশ ফুট নীচে নেমে কিছু একটা অদ্ভুত জিনিসের সন্ধান পেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাতে স্ক্রু-এঁটে ডিসেন্ডারের ফলাটা আটকে দিয়ে উপরে ওঠার জন্য দড়ি ধরে টান দেয়। আমরা যথাসম্ভব দ্রুত শিকল উপরে উঠিয়ে আনি, কিন্তু আগের থেকে ওজন বহু গুরুভার বলে মনে হয়! এরপর দুটো জিনিস পরপর দেখে ভীষণ চমকে ওঠে কুলিরাও!

প্রথমেই ওঠে একেবারে অচৈতন্য হয়ে পড়া মৃতপ্রায় দুইজন কুলী। তাদের পোশাকে বরফ নেই বটে, কিন্তু তারা যে ভয়ানক শৈত্যে জমে কাঠ হয়ে গিয়েচে তা বুঝতে বাকি রইল না! তাদের গাল, চোখের কোল আর ঠোঁট একেবারে জমাট হয়ে পড়েচে অতি ভয়ঙ্কর ঠান্ডার কামড়ে! তাদের সরিয়ে নিয়ে শিকল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কপিকলের চাকা ঘোরাতেই একটা অতি আশ্চর্য বস্তু উঠে এল শিকলের সঙ্গে! তার গায়ের শক্ত বেড়ে বিরাট ইস্তুপ এঁটে দিয়েচিলো আমাদের ওই দুই কুলী

একটা চার, সাড়ে চার হাত বেড়ের সাদা পাথর। কিছুটা ডিমের মতো দেখতে, কিন্তু পুরোপুরি তাও নয়। গায়ের থেকে যেন শ্বেত চ্ছটা ঠিকরে বেরুচ্চে! না জানি কত যুগযুগান্ত ধরে পাথুরে আবরণের তলায় থেকেও তার শরীর অকলঙ্ক, নিষ্কলুষ। দেখতে একটু অদ্ভুত হলেও বিশেষ কিছু অস্বাভাবিক দিক কারুরই চোখে পড়ল না। কিন্তু মাকড়সার ফাঁদ আর কবেই বা শিকারের চোখে ধরা পড়েচে বলুন? তার অস্তিত্ব বোঝা যায় আটকা পড়ার পরপরই। আমাদের কুলীদের দায়িত্বে থাকা একজন জুনিয়র এঞ্জিনীয়র এগিয়ে গিয়ে পাথরটাকে ছুঁয়ে দেখা মাত্র সে একটু সময় অনড় হয়ে থেমে থাকলো, তারপর ওই হাত উঁচানো অবস্থাতেই কাঠের পুতুলের মতো ধপ্ করে আছড়ে পড়ল।

সবাই ছুটে গিয়ে তাকে পরীক্ষা করেই টের পেলাম, একেবারে চোখের পলকে যেন তার শরীরের ভিতরের সব কলকবজা একসঙ্গে তাদের ক্রিয়া বন্ধ করে দিয়েচে। হতভাগ্য মরার আগে কষ্টটাও পায়নি এই যা। সাইটে সবসময়ই ডাক্তার থাকেন। তিনি ভালো করে পরীক্ষা করে বললেন, “কী আশ্চর্য! একেবারে চোখের পলকে জমাট বেঁধে গিয়েচে গোটা শরীরটা! এমন তো কখনো দেখিনি।”

আমি কিছুক্ষণ বিহ্বল হয়ে থেকে তাপমাত্রা মাপক লম্বা দন্ডটা ভয়ে ভয়ে ঠেকালাম পাথরটার গায়ে আর… আর চোখের পলকে সেটার সূচক একেবারে নীচের ঘরে ছুটে এসে কাঁপতে থাকলো! বোধকরি আরও অনেক নীচের দাগে নেমে আসার বাসনা ছিল তার, কিন্তু ঐ যন্ত্রে তার নীচের ঘর আর নাই!

অসুস্থ কুলী দুইজন ধীরে ধীরে সেবাযত্নে জ্ঞান ফিরে পেলো। তাদের গায়ের মিলিটারি পোশাক তাদেরকে রক্ষা করেচে, আর তারা সরাসরি পাথরটাকে ছোঁয়নি, যেটুকু ঠেকা লেগেচে ঐ ইস্তুপের মাধ্যমে, তাই এদের অবস্থা অবিনাশের মতো হয়নি। আমরা দুইদিনের মাথায় বহু কষ্ট স্বীকার করে ভারী ভারী শেকল খাটিয়ে ওই পাথরটাকে নামিয়ে আনলাম এই, এই সামনের জমিটাতে। হ্যাঁ, ওইখানটাতেই রাখা হয়েচিলো নামিয়ে। তারপর সেটাকে যন্ত্রদানব দিয়ে একটা পুলিশি ট্রাকে তুলে, তাদেরই তত্ত্বাবধানে পাঠিয়ে দেওয়া হয় মুঙ্গের ব্যারাকে। একটা জিনিস দেখবেন?” এই বলে রিদয় উঠে পাথরের ওপাশে গেল। লোকদুটি চা আর হাঁসের ডিম সিদ্ধ নিয়ে এসে আমাদের সামনের পাথরে রাখল। রিদয় ফিরে এল একটু হাসিমুখে, কিন্তু তার হাতে ওটা কী!

রিদয়ের হাতের জিনিসটাকে দেখে কালীপদ অবধি ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়ালো! তার দুই হাতে ধরা একটা ফণা তোলা গোখুরো সাপ! ভীষণ জিঘাংসায় সেই হিংস্র মরণদূত ছোবল তুলে রয়েচে, কিন্তু নড়াচড়া করচে না! রিদয় সামনে এসে কইলো, “ওই পাথরটা ছুঁলে মৃত্যু ঠিক কত দ্রুত নেমে আসে তার চাক্ষুষ প্রমাণ দেখুন ঠাকুর। ওই সাদা পাথরটাকে এই জমিতে রাখার বিষয়টা বোধকরি সাপটার মনঃপূত হয়নি, তাই ভীষণ রাগে ছোবল মেরেচিলো তার গায়ে। ঠিক ওই অবস্থাতেই জমে কাঠ হয়ে গিয়েচিলো সাপটা। আমরা এটাকে ফেলে দিয়েচিলাম ওপাশের ঝোপে, কিন্তু কিছুদিন পর দেখি তার শরীরে এতটুকু পচন ধরেনি। আজও অবিকৃত। এর কী ব্যাখ্যা হয় আমার জানা নেই ঠাকুর…”

কালীপদ অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে সাপটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। তারপর নীচে রেখে সেটার থেকে সরে এসে বলল, “আচ্ছা, যে কুলী দুইজন জমে গিয়েচিলো, তারা এখন কেমন আছে?”

রিদয় একটু হেসে বলল, “ততোটাই সুস্থ আছে, যতটুকু হলে সাইটে অতিথি সৎকার করা যায়…

কালীপদ ঘাড় ঘুরিয়ে চা দিয়ে যাওয়া লোকদুটির দিকে চেয়ে বললে, “তোমরাই বাছা?”

তারা বললে, “হাঁ ঠাকুরমশায়, আপনাদের আশীর্বাদে জীবনটা রক্ষা পেয়েচে কোনোগতিকে….”

কালীপদ নিঃশ্বাস ফেলে কইলো, “তবে পুলিশি প্রহরায় থাকা পাথরটা কি তোমার সঙ্গে থাকলে একবার দেখা যেতে পারে?”

“নিশ্চয়ই সম্ভব হতো ঠাকুর, কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলচি, সেই পাথর খোয়া গিয়েচে।”

আমি লাফিয়ে উঠে বললাম, “সেকি। পুলিশের ব্যারাক থেকে চুরি?”

“হাঁ ডাক্তারবাবু। তারাও আমার মতোই চেপে গিয়েচে ত্রুটি ঢাকার জন্য, নাহলে বড় হাঙ্গাম হতো।”

কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে আছে দেখে রিদয় কইলো, “খাতায় কালীপদ কলমে রেজিস্টারীতে আমরা কিছু পাইওনি, কিছু হারাইওনি, ফলে জবাবদিহির চিন্তা নাই, কিন্তু… একটা অন্যরকম সমস্যা হয়েচে ঠাকুর।”

আমি মনে মনে অনুমান করচিলাম রিদয়ের সমস্যাটা ঠিক কী ধরনের? হয়তো সেই হারিয়ে যাওয়া পাথর বা মণিটা কোনো চোরাচালানের দলের হাতে পড়েচে বা ঐ জাতীয় কিছু, কিন্তু রিদয় এমন একটা বিসদৃশ এবং সম্পূর্ণ অন্যরকম কথা বলল যে আমি ভয়ানক চমকে উঠলাম! কালীপদ কথা না বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রিদয়ের দিকে তাকাতেই সে অস্বস্তির সঙ্গে কইলো, “আচ্ছা ঠাকুরমশায়, আপনি তুষারমানবে বিশ্বাস করেন?” কালীপদ চমক ভেঙে কইলো, “তুষার দানব? সে আবার কী?” রিদয় শ্বাস ফেলে বলল, “দানবই বটে। ভুল করেও ঠিকই বলেচেন। একরকম বিশেষ বিশ্বাস হিমালয়ের পাহাড়দেশে রয়েছে যে, সমগ্র পর্ব্বতের প্রহরী হিসেবে নাকি তুষারের এলাকায় কিছু দানবাকৃতির জীব থাকে, যারা সহজে মানুষকে দেখা দেয় না। কিন্তু সেসব তো আমাদের সভ্যজগৎ স্বীকার করে না?”

“একেবারেই করে না তাই বা বলি কেমন করে বাছা? শাস্ত্রপ্রণেতা মুনি-ঋষিরা তো অজ্ঞ ছিলেন না? তাঁরা শুক্রাচার্যের বর্ণনায় বলেচেন, ‘হিমকুন্দ মৃণালাভং দৈত্যানাং পরমং গুরু’। এবারে, সত্য মিথ্যা আমার জানা নেই। কিন্তু হঠাৎ এই জীবের প্রসঙ্গের অবতারণা কেন?”

“কারণ আছে ঠাকুর। মণিটা পাহাড় থেকে সরিয়ে নেবার পরের রাতে একটা ঘটনা ঘটেচিলো। সেইটা বলি আগে। তখন রাত বেশ গভীর হয়েচে। আমাদের ক্যাম্পের বাইরের আগুন কমে এসেচে। তখন যদিও গরম ছিল আবহাওয়া, কিন্তু এইসব এলাকায় বিছা আর সাপ আছে অজস্র, তাদের তফাৎ রাখার জন্যই অগ্নিকুণ্ড জ্বালতে হয়। তো, সেই সময়ে হঠাৎ মাটি কেঁপে উঠল! আমি প্রথম টের পাইনি, কিন্তু আবার ক্যাম্পখাটটা সজোরে দুলে উঠতেই লাফিয়ে উঠে সবে দুলুনিটাকে মনের ভুল বলে ভাবতে যাচ্চি, তখনই চোখ পড়ল একেবারে জ্যোতি কমিয়ে ঝুলিয়ে রাখা বাইরের পেট্রোম্যাক্সটার দিকে। সেটা এদিক ওদিক দুলে চলেচে।

আবার হুড়মুড় করে মাটিটা কেঁপে উঠতেই আমি ধড়মড় করে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে দেখলাম কুলিরাও বেরিয়ে এসেচে। হঠাৎ পাহাড়ের ওই পিছনের দিকটা থেকে যেন হড়হড় ঘড়ঘড় করে পাথর পড়ার শব্দ এবং সেই সঙ্গে আরেকটা কম্পনের অভিঘাত এল। কুলিরা চীৎকার করে কইলো, ‘পাহাড়ে ধ্বস নেমেচে সাহেব, এখুনি দূরে চলুন।

আমরা আলো ফোটার সময় অবধি সামনের ওই যে, ওই যেখানে আপনাদের গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে, ওইখানে অপেক্ষা করেচিলাম। তবে আলো ফোটার ঠিক একটু আগেই হঠাৎ করে পাহাড়ের ওদিককার জঙ্গলের সমস্ত পাখি, বাঁদর, এমনকি শিয়াল গুলো অবধি একসঙ্গে ভীষণ চীৎকার করে উঠল! পাখির ঝাঁক আতঙ্কে যেন আকাশে ঘুরপাক আরম্ভ করল। আমি ভাবলাম, তবে কি আবারও ধ্বস নামলো? কৈ, শব্দ পেলাম না তো?

আলো হতেই আমরা পাহাড়ের ওদিকটায় যেতেই একটা অতি অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল! পাহাড়ের নীচে একটা বিরাট সুড়ঙ্গের সৃষ্টি হয়েচে রাতে! এটা কালও ছিল না! ওদিকের জমিতে পাহাড় থেকে অনেকটা দূরে এবং কাছে অজস্র বিরাট বিরাট পাথুরে চাঁই পড়ে রয়েচে ইতস্তত! কিন্তু গোল, কিছু চৌকোণা, কিছু এবড়োখেবড়ো। ওগুলোও আগে ছিল না আমি হলপ করে বলতে পারি। একজন কুলী ভীত স্বরে বললে, “এসব ভালো কথা নয় সাহেব! অপ লক্ষণ….”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “ইডিয়ট। কীসের অপ লক্ষণ? ধ্বস নেমে গুহার চাপা পড়া মুখটা খুলে গিয়েচে। এইটুকুই ঘটনা…”

কুলীদের অতি বৃদ্ধ সর্দার নিশ্চুপ ছিল। সে এইবার মুখ খুললো, “সাহেব, ভরত বোধহয় ভুল কিছু বলেনি। এই পাহাড়ের থেকে কোনো অপদেবতা মুক্ত হয়েচে এই গাঁয়ে ঐ গুহার মাধ্যমে…”

আমি অসহ্য হয়ে কইলাম, “আমি তোমাদের বিশ্বাসকে একবিন্দু বিশ্বাস করিনে সর্দার। যতোসব গাঁজাখোরি আর…”

সর্দার মাথা নেড়ে বললে, “কিন্তু সাহেব, কোন ধ্বস এতটা জোর হয় যে গুহার বিরাট বিরাট অমন পাথরগুলোকে ওই অতদূর ঠেলে নিয়ে যাবে? না না, ভিতর থেকে কোনো দানব অপদেবতা এভাবে পাথরগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে গুহামুখটা উন্মুক্ত করেছে…”

আমি মরীয়া হয়ে বললাম, “কী আশ্চর্য কথা বলচো বলো তো সর্দার? ধ্বস নেমে পাথরগুলোকে ঠেলে দিয়েচে, ওগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে ওখানে গিয়ে থেমেচে, এইটুকু তো ঘটনা। সেটা না মেনে যতসব আজগুবি…”

সর্দার আমাকে থামিয়ে দিয়ে কইলো, “আমি তোমার মতো পড়াশোনা করিনি সাহেব। গোল পাথর গড়ানো নিয়ে আমার কোনো কথা নেই, কিন্তু গুরুভার চৌকোনা অতগুলো পাথরও কি করে গড়িয়ে গেল সাহেব?”

এর উত্তর আমার কাছে ছিল না। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন গ্রামবাসী ক্যাম্পে এসে যা শোনালো তাতে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম! তারা আলো ফোটার সময়ে ক্ষেতে চলেচিলো, হঠাৎ এই পাহাড়ের গা ঘেঁষে তারা একটা বিকট মূর্তি দেখতে পায়! আলো আঁধারের মধ্যে খুব ভালো করে বুঝতে না পারলেও সেই ঝাপসা দানবটার উচ্চতা অন্ততঃ হাত চল্লিশেক হবেই, তা তারা হলপ করে বলেচে। দানবের মতো অবয়বটার গোটা শরীর ধপধপে সাদা, যেন বরফ দিয়ে আগাগোড়া লেপে দেওয়া হয়েচে! মূলতঃ সেই রঙের জন্যই তারা ওই কাকভোরে তাকে দেখতে পেয়েচিলো।

আমরা সেই কথাকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিতে না দিতেই আবার ইস্টিশনের পিছনের গ্রাম বড়মারি থেকে কিছু কৃষাণ জানালো, তারা সাঁঝের মুখে ক্ষেতের একদম শেষপ্রান্তে জঙ্গলের গা ঘেঁষে একটা পিলে চমকে ওঠা দৃশ্য দেখেচে। একটা রাক্ষুসে আকৃতির অবয়ব, যার গোটা শরীর ধূসর ধরণের রঙের এবং উচ্চতা আনুমানিক একটা দুইতলা বাড়ির একটু বেশি, সেই মূর্তিটা হঠাৎ জঙ্গলের একেবারে সামনের সারির ছোট ঝোপগুলোর উপর থেকে মাথা তুলে এদিকে ওদিকে দেখেই আবার বনে লুকিয়ে পড়ল! এইভাবে বিভিন্ন গাঁয়ের লোকেরা সেইরকম মূর্তি দেখেচে, তবে শেষ দেখেচে কষ্টহারিণী ঘাটের পিছনের গ্রাম কয়লাঘাটার প্রজারা। কেল্লাঘাটার অপভ্রংশ কয়লাঘাটা, তারা যে মূর্তিটা দেখেচে সেটা অনেকটাই যেন নিরাভরণ, বস্ত্রহীন একটা দশাসই পুরুষের মূর্তির মতো, কিন্তু তার দুই চোখে নীলচে আলোর মতো আভা, উচ্চতায় একটা বকুল গাছের সমান। আমরা বুঝতে পারচি নে যে আদৌ এইসব কথা গ্রহণযোগ্য কিনা, কারণ লোকের মুখে মুখে অতিরঞ্জিত হয়ে কোনো কাহিনি ছড়িয়ে পড়াটা গাঁয়ে খুবই সাধারণ ঘটনা…”

কালীপদ একটু ভেবে নিয়ে বললে, “অতিরঞ্জিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু এক্ষেত্রে তো নিরঞ্জন ঘটেচে বাছা। যদি অতিরঞ্জিতই করতো তারা, তবে চল্লিশ হাতটা একশো হাত হয়ে উঠতো, গায়ের রঙ সাদা থেকে হয়ে উঠতো আগুনরঙা। কিন্তু এখানে উচ্চতা কমেচে দিনে দিনে, রঙও নিরঞ্জিত হয়ে মানুষের মতো হয়ে উঠেচে। তাই… কিছু তো সত্য আছেই হে। আমার কেন যেন মনে হচ্চে এই সব ঘটনাগুলো একে অপরের সঙ্গে অলক্ষ্যে সম্পর্কিত। আচ্ছা, তোমার ঐ দুইজন কুলীকে আরেকবার ডাকো তো, কিন্তু জিজ্ঞেস করার রয়েছে…”

রিদয় ঘোষের হাঁকে আবার সেই দু-জন এসে আমাদের সামনে দাঁড়ালো। এর মধ্যে একটি কুলী পায়ের সমস্যায় সামান্য বেঁকে দাঁড়ায় দেখেচি। কালীপদ তাদের চোখের দিকে চেয়ে শুধালো, “আচ্ছা, একটা কথা একটু স্মরণ করে বলো তো, তোমরা যখন ওই সাদা পাথর বা গোলাকার প্রকাণ্ড মণির মতো জিনিসটা তুলে আনলে, তখন সেইটে কি এমনিই পাথরের তলায় পোঁতা ছিল?”

তারা বললে, “যখন উত্তোলন হয় তখন আমরা সুস্থ হইনি, তবে যখন নেমেচিলাম তখন দেখেচি ওই অলুক্ষণে পাথরটার নীচের দিকে কয়েকটা চাঁই পাথরের সঙ্গে চারখানা মার্বেল পাথরের বিরাট পাটার মতো জিনিস উঁকি দিচ্চিলো। ওই বিরাট বিরাট মার্বেলের উঁচোনো পাটাগুলোর মাঝখানে যেন শয়তান পাথরটা বসানো ছিল। কিন্তু হুজুর, আমরা রাজপুতানায় মার্বেলের পাহাড়ে কাজ করেচি, এইসব পাহাড়ে অমন মার্বেল থাকা অসম্ভব। তার উপর, এই চারখানা পাটা ছিল কিছুটা সমতল আর ঘষামাজা ধরণের, কিন্তু আসল শ্বেতপাথর কখনো ওইভাবে পাওয়া যায় না। পাথরটার একদিকে তিনখানা পাটা আর একদিকে একখানা বড় পাটা ছিল…”

কালীপদ বিস্মিত হয়ে বলল, “আশ্চর্যের পর আশ্চর্য সব তথ্য আসচে দেখচি! কিছুই তো বুঝতে পারচি নে!”

ইন্দ্র একটু উৎসাহিত হয়ে বলল, “আচ্ছা ঠাকুর, ওই মণিটা কোনো প্রকাণ্ড আঙ্গটির মণি নয় তো? আঙ্গটির পাথর যেমন একগন্ডা পাতি দিয়ে আটকানো থাকে, এইটেও তেমনি চারখানা শ্বেতপাথরের পাটার আঙটা দিয়ে বসানো ছিল হয়তো?”

কালীপদ মাথা নেড়ে কইলো, “তা কেমন করে হয়? আঙ্গটির আঙটা চারদিকে সমান ভাবে পাথরটাকে ধরে রাখে। এখানে তো একদিকে তিনটে, একদিকে একটা ছিল? এইরকম ভাবে কোনো অঙ্গুরী তৈরি হয় কখনো? মনে হয় না। আচ্ছা রিদয়, তোমরা…

কথা শেষ হবার আগেই রিদয় বলে উঠল, “আমরা পাথর তোলার পরেও সত্যিই ওইরকমই গোটা চারেক সাদাটে উঁচানো পাথর দেখেচিলাম অনেক নীচে, কিন্তু গুহাটা তৈরি হবার পর আর সেগুলো দেখিনি। হয়তো কম্পনের ফলে তলিয়ে গিয়েচে অতলে?”

কালীপদ উদাসভাবে বলল, “কিম্বা… কিম্বা গুহা থেকে যে দানব বের হয়েচে, তার সঙ্গেই ওগুলো গিয়েচে?”

রিদয় অবাক হয়ে মুখের দিকে চেয়ে কথাটার মর্মোদ্ধারের চেষ্টা করতে লাগল। আমরা উঠে পড়লাম। আমি ওই হেলে দাঁড়িয়ে থাকা কুলীটিকে বললাম, “তুমি এইদিকে এসো তো…”

কুলীটি তটস্থ হয়ে এসে দাঁড়াতে আমি নীচু হয়ে তার পায়ের বুড়ো আঙুলে হাত দিতেই সে ‘হায় রাম’ বলে জিভ কেটে লাফিয়ে উঠতেই আমি ধমক দিয়ে বললাম, “চোপ। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি ডাক্তার…”

উঠে দাঁড়িয়ে তার দুই কান পরীক্ষা করে বললাম, “রিদয় বাবু, এর পায়ে সমস্যা নাই, প্রচণ্ড ঠান্ডায় শরীরটা জমাট বেঁধে যাবার সময়ে কানের তরল শুকিয়ে এলোমেলো হয়ে গিয়েচে। তাই এ এইভাবে বেঁকে থাকছে…

রিদয় অবাক হয়ে বলল, “কান? কানের জন্য হচ্চে?”

“হাঁ, কান। আমাদের কান শুধুমাত্র আমাদের শ্রবণযন্ত্র নয় রিদয়বাবু, কানের সবচেয়ে বড় কাজ তার ভিতরের যন্ত্রপাতির মাধ্যমে আমাদের ভারসাম্য বোধ মাথায় পৌঁছে দেওয়া। আমরা সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সঙ্গে বেঁকে দাঁড়ানোর তফাৎটাও টের পাই এই কানের জন্যই। সেটা এই লোকটি টের পাচ্চে না বলেই বোধ হয়। আপনাদের কোম্পানির ডাক্তারকে দিয়ে একবার পরীক্ষা করিয়ে নেবেন শিগগিরই।”

আমরা এসে গরুর গাড়িতে যখন উঠলাম তখন বেলা চড়ে গিয়েচে বেশ। কালীপদ কইলো, “আজ আমরা ইস্টিশানের কাছে কোনো একটা ভাতের হোটেলে খেয়ে নেবোখন। পরবাসে দোষ নাই।”

ইন্দ্ৰ বাকি কথাটা অনুমান করে কইলো, “তবে কি আমরা অন্য কোথাও যাবো এখন?”

“হাঁ। ওই যে মাস্টারমশায়ের ঐ মামাতো ভাই রাধানাথের সেই বৈজয়ন্তী থিয়েটারটা একটু বাইরে থেকে দেখতে যাবো।”

আমি মনে মনে অবাক হলাম। রাধানাথের ওই হত্যাকেও কি একই সূত্রে গাঁথা হচ্চে নাকি? কিন্তু কালীপদর জটিল মস্তিষ্ক ঠিক কোন খাতে প্রবাহিত হচ্চে বুঝতে না পেরে কোনো প্রশ্ন করলাম না।

আমরা কিছু খাওয়াদাওয়া সেরে গিয়ে থামলাম বৈজয়ন্তী থিয়েটারের ফটকে। এক অতি বৃদ্ধ দ্বারবান ফ্যাকাশে সবজে উর্দি গায়ে চড়িয়ে ইটের পাঁজায় বসে রয়েচে, আমাদের দেখে একখানা কাঁচা পেয়ারা ডালের দন্ডে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।

কালীপদ কোনো ভণিতা না করেই তাকে শুধালো, “আমরা রাধানাথের সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করতে এসেচি। আপনি চিনতেন তাঁকে?”

বৃদ্ধের মুখে একটা বিষণ্ণ ছায়া এসে পড়ল।

“আপনারা পুলিশের লোক নন তা অনুমানে বুঝচি। রাধার পরিবারের লোকও নন, আমি তাদের চিনি। হাঁ, শুধু চিনতাম নয়, ও আমার থেকে অনেক ছোট হলেও বড় বন্ধুত্ব ছিল আমাদের। দ্বারবান তো, থেটারের লোকেরা তেমন মেশেনা আমার সঙ্গে, কিন্তু রাধা ছিল অন্যরকম। ও আমাকে যে কতখানি ভালোবাসে… মানে, বাসতো।” এই কথাটা বলেই বৃদ্ধের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।

কালীপদ সান্ত্বনার সঙ্গে কইলো, “আপনাদের যে নটবর নামের ছেলেটি পালিয়ে গিয়েচে, সে কেমন ছেলে?”

বৃদ্ধ ফুঁসে উঠে বললে, “মহা পাজী ছেলে, আমার সঙ্গে বড় ঝগড়া হতো তার। নেশাভাঙ করে রাজ্যির বখাটে ছেলেপিলে নিয়ে ভিতরে ঢুকতে চাইতো রাতবেরাতে। দিতুম না ফটক খুলতে। তাই নিয়ে ঝগড়া। অধিকারী মশায় একদিন তাকে ডেকে খুব ধমক দিল। রাধা বড় নরম মানুষ ছিল, সে অবধি ক্ষিপ্ত হয়ে দু-চার কথা শুনয়ে দিলে নটবরকে। তারই এমন ভয়ঙ্কর বদলা নিলো হারামজাদা। অধিকারী মশায় একেবারে ভেঙে পড়েচেন ভিতরে ভিতরে। এই খুনের জন্য তিনি নিজেকেই দায়ী করেচেন নিজের বিচারে। আমি কি আর তাঁকে প্রবোধ দেবার যুগ্যি? কিন্তু তাও আমি তাকে অনেক শান্ত করার চেষ্টা করেচি, তবুও তাঁর এক বাক্যি এই যে আমার বুদ্ধির দোষেই রাধা মরেচে। ছোরাটা হাতে নিয়ে আমার ভারী ভারী বোধ হয়েচিলো, তবুও আমি একবার পরখ করে দেখলাম না কেন? কেন সেটাকে ভালো করে একবার দেখলাম না? কেন শুরুতেই নটবরকে দূর করে দিলাম না? এইসব বলে চলেচেন দিনরাত।

জানেন বাবু, মাসদেড়েক আগে অধিকারীমশায়ের একমাত্র ছেলের ভয়ানক পীতজ্বর অসুখ হয়েচিল। তাঁর ভাই হরেনবাবু কলকাতার নামকরা ডাক্তার। তাঁর কাছে ছেলেকে পাঠিয়ে দিয়েও নিজে থেটার বন্ধ রাখেননি। সেই শক্ত মানুষটা আজ ভেঙে পড়েচে। থেটার আর রইবে না ঠাকুর।” কালীপদ আমার দিকে ঘুরে শুধালো, “হরেন মালিক কিসের ডাক্তার বলো তো ভায়া? নামটা চেনা চেনা ঠেকচে।”

আমি চিন্তা করে বললাম, “আমার মনে পড়চে না তো? কখনো শুনিনি হয়তো।”

কালীপদ বিদ্রুপের সুরে কইলো, “তোমার কি করে চেনা লাগবে বলো? তোমার তো ডাক্তারি ছাড়া সবদিকেই আগ্রহ। আমার সঙ্গে ঘুরে বেড়ালে আর চিকিৎসা জগতে মিশবে কখন? এত বড় নামকরা একটা ডাক্তারকে চিনতে গেলে নিজেকেও ধন্বন্তরী হতে হয়…

কালীপদ হয়তো কথাগুলো আমার প্রাকটিসের পক্ষে ভালোর জন্যই বলল, কিন্তু আমি মনে আঘাত পেলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, এইবার থেকে চিকিৎসাতেই মন দেবো শুধু।

কালীপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর স্বরে কইলো, “আচ্ছা এই প্রসঙ্গ বলতে যদি আপনার কষ্ট হয় তবে থাকুক। রাধানাথের সম্পর্কে কিছু বলুন।”

“কী জানতে চান বলুন। কত কিছুই তো বলার আছে। সে ছিল আপনভোলা, খামখেয়ালী ছেলে। নিজের ভাবনার জগতে ডুবে থাকতো। মনে যা আসতো তাই শোনাতো আমাকে। আমিও মজা পেতুম। বড় নিরীহ মানুষ আর বড় সুন্দর কথা বলতে পারতো। ওইভাবে মারা যাবার আগের দিনও হেসে, চোখ টিপে আমাকে বললে, “ওই কথাটা কারুকে বলো না কিন্তু, লোকে সময় হলে জানবে।”

কালীপদ অকৃত্রিম বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, “কোন কথা?”

দ্বারবান একটু হেসে বললে, “সে তার খামখেয়ালী প্রলাপবাবু। ওইরকম

“সে তার খামখেয় মনগড়া কথা সে হামেশাই বানাতো।”

“কথাটা কী?”

“অত মনেও নাই, কি একটা যেন বলেচিলো, ‘গরুর দ্বিতীয় চোখের একতারাটা নাগালের মধ্যে চলে আসবে শিগগিরই…’ এইধরনেরই কিছু একটা…?”

কথাটা শুনেই কালীপদ চমকে উঠে অস্ফুট কণ্ঠে বলল, “সেকি! এই কথাটা রাধানাথের বলা? গোপীর ছেলেরা তো বলেচিলো… আরে তাই তো ডাক্তার, একটা জিনিস তো খেয়াল করিনি। বাচ্চারা বলেচিলো এই কথাটা তাদের দাদাই শিখিয়েচে। কিন্তু মাস্টারমশাইকে তারা দাদু বলেই ডাকে দেখলাম। তাহলে রাধানাথই তাদের দাদাই ছিল। কিন্তু….. ছোট শিশুদের ভোলানো কথাটা সে এনাকে কেন বলতে গেল? এতটা নির্বোধ কি সে সত্যিই ছিল? নাকি এর কোনো অর্থ রয়েচে?”

আমরা ফিরে এলাম বিকেলের মুখে। বাড়িতে ঢোকার মুখে দেখি দুইজন কনস্টেবল কি যেন কথা কইচে রিদয় আর মাস্টারের সঙ্গে। আমরা ঢুকতে রিদয় কইলো, “আপনাদের আজ সকালে যে নটবরের কথা বললাম, এঁরা বলচেন আজ দুপুরে নাকি নটবরের পচা গলা মৃতদেহ উদ্ধার হয়েচে রাঙ্গা পাহাড়ের একটা পাথরের আড়ালে। সে লাশ বহুদিনের পুরনো এবং পচা এ তো মহা রহস্য আরম্ভ হল ঠাকুর? এইবার তো পুলিশ আমাদের বাড়িতেও হাঙ্গাম করবে।”

কনস্টেবল দুইজন জিভ কেটে বললে, “রাম রাম সাহিব, এ কথা বলবেন না। আপনারা গাঁওয়ের নামচিন আছেন। সরকারি সাহিব আছেন। বড়াবাবু সেরেফ বললেন, খবরটা আপনাকে একবার এত্তেলা করে দিতে।”

“বেশ করেচো। শুনে নিয়েচি…”

“আরও একটা বাৎ আছে হুজৌর। লাশের বিলকুল পাশে একঠো ভারী ডান্ডা মিলেছে!” তারপর গলা অনেকটা নামিয়ে কনস্টেবল কইলো, “থেটারের দুই তিনজন আদমি সেই ডান্ডা পহচেনে নিয়েছে। ওই ডান্ডা থেটারের চৌকিদারের ছিল। লেকিন সে বুড়া, দুবলা মানুষ, সে নটবরকে খুন করবে কৈসে হুজৌর?”

রিদয় ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দাওয়ায় বসে পড়ে কইলো, “বৌমা, এক ঘটি জল দিয়ে যাও।” গোপীর স্ত্রী তাড়াতাড়ি জল দিয়ে যেতে সেই জল চোখেমুখে ছিটিয়ে মুখ তুলে কনস্টেবল দ্বয়ের দিকে চাইতেই তারা কইলো, “আজ তবে আমরা যাই মালিক…” এই বলে চলে গেল। রিদয় ক্লান্ত চোখ তুলে কালীপদকে বলল, “আর যে পারা যাচ্চে না ঠাকুর! ঘণ্টায় ঘণ্টায় গন্ডা গন্ডা রহস্য আসতে থাকলে যে উন্মাদ হয়ে পড়চি? এই কনস্টেবলদের মুখে দারোগা অনুরোধ করিয়েচেন কাল যদি সময় করে একবার নটবরের লাশটা দেখে আসি। আচ্ছা আমরা তো তাকে চিনিনে। তবে দেখেচি বার দুয়েক খুড়োর থিয়েটারে। একবার যাবেন নাকি কাল?”

কালীপদ কী একটা বলতে গিয়ে থেমে গিয়ে বলে উঠল, “তাই তো!”

“কী হল ঠাকুর?”

কালীপদ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “গন্ডা মানে চারটে….” আমি কইলাম, “তাই তো হবার কথা! হঠাৎ কী হল?”

“হেঁয়ালিতে যে গন্ডামুন্ডধারীর খোঁজ আমরা করচিলাম, সেই অর্থটা হল চার মুন্ড ধারী। চতুরানন…”

আমি চকিত হয়ে বললাম, “মানে ব্রহ্মা? প্রজাপতি ব্রহ্মা? সে কিছু একটা ঘটলে জেগে উঠবে?”

“তাই তো মনে হচ্চে ভায়া। একটা সূত্র অন্ততঃ জোড়া লাগাতে পারলাম। এই শুরুটার খুব দরকার বাকিটার জন্য।”

তখনও ছাই ঘুণাক্ষরেও বুঝতেই পারিনি যে চারটে মুন্ড শুধু ব্রহ্মারই থাকে না, বরং তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর কিছু নিজের চারখানা হিংস্র মুখ নিয়ে আমাদের জন্য তীব্র জিঘাংসায় অপেক্ষা করে রয়েছে!

(৫) একতারা

রাত সাড়ে আটটা নাগাদ আমাদের দুইতলার কক্ষে এসে বসেচি। আবার সেই কাঁসর ঘণ্টা, খোল করতাল এর পর্ব সমাপ্ত হয়েচে দানবীয় গর্জনের সঙ্গে। কালীপদ নিষ্ফল আক্রোশে শয্যার চাদরখানা কয়েকবার আঁকড়ে ধরেচে, কিন্তু আজ রাতের আক্রমণ আটকানো যায়নি। কখনো রোখা যাবে কিনা তাও জানি নে। কোথাকার এবং কয়টি নিষ্পাপ শিশু আজ মায়ের কোলছাড়া হল জানা নেই। কাল তাদের ছিন্নভিন্ন শব দেখে চিহ্নিত করা যাবে। নরক যদি একেই না বলে তবে নরক কোনটা?

নীচের থেকে নৈশাহারের ডাক এল। কালীপদ শুধু নয়, আমাদের কারোরই আহারে রুচি নাই আর, কিন্তু গৃহস্থঘরে অনাহারে থাকতে নেই, তাই আমরা অবতরণ করে দাওয়ায় এসে বিমর্ষ মুখে বসলাম। গোপীর ছেলেদুটি একটু আগে মায়ের সঙ্গে ঘরের মধ্যে ভয়ে ভয়ে বন্দী হয়ে ছিল। এখন বিপদ আজকের মতো উৎরে যাওয়াতে তারা সবকিছু নিজেদের সারল্যে ভুলে গিয়ে টিনের তলোয়ার নিয়ে নিজেদের মধ্যে মহা যুদ্ধ আরম্ভ করেচে। কী আশ্চর্য আমাদের মনের গতিপ্রকৃতি! কয়েকজন অচেনার উপর দিয়ে আজকের মতো বিপদটা কেটে যাবার পরপরই নিজেরা পরম নিশ্চিন্ত বোধ করি। কাল আমাদের ঘরে বিপদ নামলে অপরাপর ঘরগুলিও একই ভাবে নিরাপদ বোধ করবে সেই দিনটুকুর মতো! এইজন্যই বোধহয় কিছুসংখ্যক বণিকের দল মিলে সমুদ্রগুপ্তের সসাগরা ভারতবর্ষকে পদানত করার স্পর্ধা দেখিয়েচিলো!

মাস্টারের হাঁকে সম্বিৎ ফিরল, “অ্যাই, অ্যাই হতভাগা, লেগে যাবে তো তোর ভাইয়ের! বৌমা, ওদের তরোয়ালগুলো কেড়ে নাও দিকি চট করে! রক্তারক্তি বাধাবে দুটোয়….

বড়টি অনুযোগ করে বলল, “না দাদু, এটা তো টিনের তলোয়াল! আমি আস্তে আস্তে লড়াই করচি। নাহলে তো ভেঙে যাবে? ভাইয়ের একটুও লাগবে না।”

কালীপদ হেসে ফেলল এবার। আমারও মন থেকে একটা বোঝা নামলো যেন।

আহারের পর শয়নকক্ষে উঠে এসে বসলাম। রিদয়ও এসে কথাবার্তা বলচে টুকিটাকি। রিদয় আবেগের কণ্ঠে বলল, “আমাদের খুড়োমশাইকে আপনারা দেখেননি, হয়তো সব শুনে তাঁকে পাগল বলে ধরে নিয়েচেন, কিন্তু ঠাকুর, তাঁর মতো বিচক্ষণ এবং রসিক মজলিশি মানুষ আমি খুব কমই দেখেচি। আমাদের সঙ্গে ছিল তার ভীষণ মনের মিল। খুড়োর ঘরটার দিকে চাইলে মনটা খাঁ খাঁ করে এখন। বাড়িতে মন ভুলিয়ে রাখার মতো রয়েচে শুধু বাচ্চাদুটো। আমার ভাইটা বড় সংসারী, বড় আত্মকেন্দ্রিক। বাবার এইরকম মানুষই বেশি পছন্দ হয়তো, কিন্তু বাচ্চাদুটো আমার জীবন। পরপর ঘটতে থাকা আতঙ্কের মধ্যে ওদের যেন কিছু না হয় ঠাকুরমশাই, আমি তবে আর একটা দিনও বাঁচবো না…”

কালীপদ বোধকরি কথাগুলো শুনতে শুনতে বাচ্চা দুটোর কথাই ভাবচিল, এইবার হঠাৎ সোজা হয়ে বসে চোখ অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বিস্ফারিত করে চাপা গলায় বলে উঠল, “হা ঈশ্বর! তাই তো!” রিদয় উদভ্রান্তের মতো বলল, “কী হল ঠাকুর? কী বলচেন?”

“বলবো পরে, আগে তোমার ভাইপোদের টিনের তলোয়ারদুটো আমাকে এনে দাও তো!”

রিদয় একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে ধীরে ধীরে নীচে নেমে একটা তলোয়ার নিয়ে উপরে এসে অবাক মুখে পালঙ্কে রাখতে গেলে পর কালীপদ বলল, “আমাকে দিতে হবে না, তুমি এই কাঠের টেবিলটার গায়ে তলোয়ারটা বসাও দেখি?”

“কী অদ্ভুত! খেলনা তরোবারি দিয়ে কী করে গাঁথবো? বেঁকে দুমড়ে যাবে যে?”

“বেশ, অন্ততঃ গাঁথার ভান করো?”

অনিচ্ছা সত্তেও রিদয় টিনের তলোয়ার নিয়ে সজোরে কোপ মারার মতো অভিনয় করে টেবিলের ওপর ফলাটা আলতো করে নামালো। কালীপদর ঠোঁটে একেবারে ক্ষীণ একটা হাসির আভা পরিস্ফুট হয়েই অন্তর্হিত হল। সে গম্ভীর স্বরে বললে, “কালই দারোগার সঙ্গে কথা বলতে হবে রিদয়। একজনকে মিথ্যা খুনের মামলায় আমি জেরবার হতে দেবো না।”

শোবার সময়ে কানাই গিয়ে আমার কথামতো কয়েকখানা জানালা খুলে দিল। বাইরে থেকে ফুরফুরে শীতল বাতাস এসে ঘরে ঢুকচে। আমরা শুয়ে পড়লাম। কালীপদর মুখে বাইরের বাতাস ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আমি জানালা দিয়ে চুঁইয়ে পড়া নক্ষত্রের খুব ক্ষীণ আলোতে দেখলাম, কালীপদর ললাটে ভ্রু দুটো কুঞ্চিত হয়ে উঠল।

সকালে নটবরের মৃতদেহটা দেখতে গিয়ে দারোগার সঙ্গে পরিচয় হল। আরেকটা ঘরে খুনের অস্ত্র রাখা ছিল। ডান্ডাটাকে দেখিয়ে দারোগা বলল, “এই ডান্ডা দিয়েই মারণ আঘাত করা হয়েচে সম্ভবত, লাশের পাশেই ফেলে দেওয়া হয়েচিল এটাকে।” কানাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “দারোগা সাহেব, এই লাঠি দিয়ে আঘাতের ফলে কিন্তু এই লোকটা মরেনি।”

দারোগার বিনোদবিহারী বিস্মিত হয়ে হাঁকলেন, “কে তুমি? এমন কথা কিসের ভিত্তিতে বলচো, অ্যাঁ?”

কালীপদ উত্তরে কইলো, “ও একজন পাকা, ডাকসাইটে লাঠিয়াল। লাঠি সড়কির আঘাত সম্পর্কে আমার আপনার থেকে ও অনেক বেশি নির্ভুল প্রমাণিত হবে।” দারোগা শুধু মুখে একটা শব্দ করে চুপ করলেন। তারপর একটু নরম হয়ে বললেন, “তবে কিসের আঘাতে মৃত্যু হয়েচে নটবরের?”

“সড়কির আঘাতে সাহেব। সড়কির মাথায় তীক্ষ্ণ ফলা থাকে। এর ঘাড়ের কাছে সেটার খোঁচা লেগেচে মরার সময়ে। আমি দাগ চিনি…”

দারোগা ফাঁপরে পড়ে চিন্তায় ডুবে গেল। আমার মনে চলতে থাকলো হাজারটা চিন্তার স্রোত। শ্বেতপাথরের চারখানা পাটা কেন ছিল পাহাড়ে? নটবরের মৃত্যুর কারণ কী? থিয়েটারের রমেন বাবুকে মিথ্যা জালে জড়াচ্চে কারা? হেঁয়ালিটার উদ্ধার হবে কি আদৌ?

কালীপদ দারোগাকে কইলো, “দারোগা সাহেব, আমরা একবার বৈজয়ন্তী থিয়েটারে যাবো। আপনি কি আমাদের সঙ্গে…?”

দারোগা ভাবনায় পড়ে বলল, “আপনারা কী উদ্দেশ্যে এখানে এসেচেন বুঝতে পারচি না, তবে আমি লোক চিনি। আপনাদের উদ্দেশ্য মন্দ নয় তা বুঝতে পারচি। ঘোষ সাহেবও সঙ্গে রয়েচেন যখন। বেশ, আপনারা গোরুর গাড়ি ফিরিয়ে দিন। আমার চৌকিতে দুটো মোটর আছে। একটায় আপনারা বসুন, একটায় আমি আর দুইজন হাবিলদার যাবো”

থানার বহুব্যবহৃত লজঝড়ে মোটরগাড়ি দুটি এসে দাঁড়িয়েছে বৈজয়ন্তী থিয়েটারের ফটকের সামনে। বৃদ্ধ দ্বারবান পেয়ারার ডালে ভর দিয়ে এসে দাঁড়াতে কালীপদ একচিলতে হেসে শুধালো, “আপনার এই পেয়ারা ডাল তো পুরনো নয়। কিছুদিনের মধ্যেই ভাঙা হয়েচে। তার আগে কী নিয়ে হাঁটতেন?”

বৃদ্ধ পুলিশ দেখে ঢোঁক গিলে বললে, “কী আর বলি মালিক, কয়েকদিন হল আমার পুরোনো লাঠিটা খুঁজে পাচ্চি না, তাই এইটে দিয়েই….”

দারোগা বক্র সুরে বললে, “তোমার এই বয়সেও হাতে পায়ে যথেষ্ট জোর আছে দেখচি। লাঠি কিসে লাগে?”

বৃদ্ধ বিনয়ের সুরে বলল, “মালিক, কোথায় আর জোর। আগের মতো বল নাই। কোমরে বেদনা, হাঁটুতে বেদনা…”

কালীপদ চোখের ইশারায় দারোগাকে থিয়েটারের পিছনে রমেনবাবুর বাড়িটা দেখালো। দারোগা একজন হাবিলদারকে বৃদ্ধের সঙ্গে রেখে আমাদের নিয়ে উপস্থিত হল বাড়ির ফটকে। দারোগা রামসাগর আগেও এসেচে এই বাড়িতে, সে ভারী কড়ায় আঘাত করতে একজন বলিষ্ঠ অথচ অধুনা শীর্ণ হয়ে পড়া মানুষ এসে কপাট খুলে দিতে রামসাগর হাতজোড় করে কইলো, “এই যে ঠাকুরমশায়, ইনিই রমেনবাবু…

রমেন মালিকের চেহারাটা দেখলে মনে হয় তার উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েচে! মন ভেঙে গেলে বোধহয় এইরকম হয়। আমরা তাঁর বৈঠকে গিয়ে বসলাম। একটি বছর কুড়ির সুদর্শন ছেলে বৈঠকে ঢুকে আমাদের উৎসুক হয়ে দেখতে থাকলো। রমেনবাবু এই প্রথম মুখ খুলে বললেন, “এ আমার ছেলে যোগেন। ভিতরে গিয়ে ঠাকুরকে বলো চা পাঠিয়ে দিতে….” এই বলে আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, “আপনাদের চিনলাম না, মাপ করবেন…”

কালীপদই উত্তর দিলে, “আমার নাম কালীপদ মুখুজ্জে। আমরা এই ঘোষবাবুর গৃহে অতিথি হয়ে এসেচি। এনাকে তো চেনেন? রাধানাথের ভ্রাতুষ্পুত্র…

রাধানাথের নাম শুনেই রমেন বাবু মাথা নীচু করে বললেন, “এই কলঙ্ক আমার আজীবনের সঙ্গী হয়ে গেল মুখুজ্জেমশাই। লোকে আমাকে ভালোবাসে বলেই সামনে কিছু বলচে না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তারা আমাকে খুনী ভাবচেই…”

কালীপদ কইলো, “এখনও ভাবচে না বোধহয়…” তারপর একটু থেমে পূর্ণদৃষ্টিতে চেয়ে বলল, “কিন্তু এইবার ভাববে…”

আমরা চমকে উঠলাম! কালীপদ বলে চলল, “আপনি অতি উঁচুদরের অভিনেতা মানচি, কিন্তু অভিনয় দিয়ে সত্যকে পুরোপুরি চাপা দেওয়া যায় না। আপনি দু দুখানা নরহত্যা করেচেন। এক, রাধানাথ, দুই, নটবর…” রমেন বাবুর ক্ষণিক আগের বিষণ্ণ ভাব তিরোহিত হয়ে গিয়েচে। সে উঠে দাঁড়িয়ে চীৎকার করে উঠল, “আপনার সাহস তো কম নয়! বেরিয়ে যান… এখুনি বেরিয়ে যান বলচি…’

কালীপদ কাউকে কোনো ইশারাও করেনি, আদেশও দেয়নি, হঠাৎ কানাই উঠে দাঁড়িয়ে রমেন বাবুর কালীপদর দিকে উঁচানো তৰ্জ্জনীটাকে নিজের বাঁ হাতের মুঠোয় চেপে ধরে ডান হাতের বিরাশি সিক্কার চড় বসিয়ে দিল রমেনের গালে! রমেনবাবু ভূপতিত কলাগাছের মতো আবার বসে পড়ল বজ্রাহতের মতো! কানাইয়ের চোখে কালীপদর অপমানে তখনও আগুন জ্বলচে। রমেন বসে পড়েও মিনমিন করে বলল, “এসব কী দারোগা সাহেব? বাড়ি বয়ে একি হুজ্জতি আপনার সামনেই?”

কালীপদ ধমক দিয়ে বলল, “দারোগা সাহেবকে বলে লাভ নেই। আপনার ভন্ডামি ধরা পড়ে গিয়েচে। একটা মানুষের বুকে আমূল ছোরা বসাতে গেলে কতখানি জোরে বসাতে হয় জানেন তো? ধরুন, আপনি তো জানতেন না যে ওই ছোরাটা আসল, তাহলে নকল স্প্রিং বসানো ছোরাকে আপনি অমন মানুষমারা জোরে বসাতে গেলেন কেন রাধানাথের বুকে? আলতো করে বসানোর অভিনয় করলেই তো স্প্রিংয়ের ফলাটা দিব্যি ওই আলতো চাপেই ঢুকে যেতো বাঁটের ভিতরে? তা নয়, আপনি বেশ জানতেন ছোরাটা আসল। তাই আপনি প্রাণঘাতী শক্তিতেই বসিয়েচেন রাধানাথের বুকে…

“কিন্তু… কিন্তু নটবরই তো সেখানা ধরিয়ে দিয়ে গিয়েচিলো আমার হাতে নাটক চলাকালীন? সবাই দেখেচে…”

“কেউ দেখেনি। ওটা আপনিই বিভ্রম তৈরী করেচেন সুকৌশলে। নটবর খারাপ ছেলে, আপনি সজ্জন, তাই কারোর সন্দেহ হয়নি। উপরন্তু সে রোজই দৃশ্য অনুযায়ী জিনিসপত্র এগিয়ে দিতো, তাই ঐদিন তাকে না দেখলেও সবার অবচেতনে তার নামটাই এসেচে। নটবরকেও আপনিই সরিয়ে হত্যা করেচেন, আর নজর ঘোরাতে দ্বারবানের বহুল পরিচিত লাঠিটা চুরি করে লাশের পাশে ফেলে এসেচেন। খুনের অস্ত্র কেউ লাশের পাশে ফেলে যায় না…”

রমেন মরীয়া হয়ে চীৎকার করে উঠল, “কিন্তু আমি খুন কেনই বা করতে যাবো দুটো অপদার্থকে? তারা কি এমন গুরুত্বপূর্ণ যে আমার কোনো স্বার্থসিদ্ধি হবে?”

কালীপদ ম্লান হেসে বলল, “সন্তানের মায়া বড় বিষম অধিকারীমশায়। আপনার ছেলেটিকে সম্ভবত কেউ বা কারা অপহরণ করিয়ে আপনাকে বাধ্য করিয়েচে এই কাজটা করতে…’

রমেনবাবু অসহায়ের মতো মুখের দিকে তাকাতেই কালীপদ এইবার যেটা বলল তা শুনে আমার মন থেকে একটা সহস্রভার পাথর সরে গেল। কালীপদ রমেনকে বলল, “অধিকারীমশায়, আপনি আপনার ছেলের উধাও হওয়ার ঘটনা সবার থেকে আড়াল করতেই তার অসুখের বাহানা করে কলকাতায় আপনার ডাক্তার ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দেবার গপ্পো ফেঁদেচিলেন, কিন্তু আমার এই বন্ধুটি হলেন কলকাতার দশজন সেরা ডাক্তারের একজন। হরেন অথবা হরেন্দ্র মালিক নামে কোনো নামকরা ডাক্তার ঐ শহরে নাই। থাকলে ইনি সবার আগে চিনতেন। আমি জানি। হয় আপনার কোনো ভাইই নেই, থাকলেও তিনি ডাক্তার নন, ডাক্তার হলেও নামকরা নন, নামকরা হলেও আপনার ছেলে তার কাছে যায়নি। আপনি পরপর মিছে কথা বলে গিয়েচেন সবাইকে….”

রমেন অধিকারী কেঁদে উঠল হাউহাউ করে।

“আমি নটবরকে খুন করিনি বিশ্বাস করুন। দুইজন লোক আমার ছেলেকে অপহরণ করে আমাকে বাধ্য করে এই মহাপাপ করতে। আমি রাজি হইনি বিশ্বাস করুন ঠাকুরমশায়, কিন্তু শেষটা পারলাম না জেদ রাখতে। আমাকে ফাটকে দিন আপনারা।”

“কান্না থামিয়ে যা প্রশ্ন করচি জবাব দিন। ফাটক তো রইলোই। ওই দুইজনকে কেমন দেখতে ছিল?”

দারোগার ইশারায় হাবিলদারটি খাতা কলম বের করে লিখতে আরম্ভ করল। রমেন ভাঙা স্বরে বলল, “কি করে বোঝাই! ভয়ানক দেখতে দুইটি কাপালিক। তাদের দেখলে বুক শুকিয়ে যায়! কি স্বর, কি নিষ্ঠুর চাহনি। পরণে রক্তবাস। তার থেকেও ভয়ঙ্কর হল তাদের দৈর্ঘ্য! একেকজন এই.. এই কপাটটার সমান উঁচু দারোগা সাহেব! এমন মানুষ আমি কস্মিনকালেও দেখিনি! একেকটা খুনিয়া দানবের মতো আকৃতি প্রকৃতি। তারা আমার ছেলেকে চুরি করে রাধানাথকে মারার কথা বলে।

এমনিতেই দুই মাস ধরে বাচ্চা হারানো আর তাদের লাশ পাওয়া আরম্ভ হয়েচে চারদিকে। তার মধ্যে আমার ছেলেটি বড় হলেও আমার আতঙ্ক উপস্থিত হল! অনেক ভেবে শেষে রাজি হতেই হল। তারা আমার বাড়িতে গভীর রাতে ষড়যন্ত্র করতে তিন চারবার এসেচে। রাধানাথের মতো নিরীহ মানুষের হত্যায় এদের মতো নররাক্ষসের কী লাভ আমি ধরতে পারিনি। তবে একদিন আমি কী একটা কাজে ভিতরের ঘরে যেতেই এই ঘর থেকে তাদের কথা শুনতে পেলাম। কিন্তু তার অর্থ বুঝতে পারলাম না, অথচ ঐ কারণেই তারা রাধাকে খুন করতে চায় বুঝলাম…. দারোগা উদগ্রীব হয়ে বলল, “কী? কী কথা?”

“অদ্ভুত কিছু অর্থহীন কথা! রাধানাথ নাকি ধরে ফেলেচে কিছু একটা! ওর বাড়ি সমেত গোরুর চোখটাই জ্বালিয়ে দেবে ওরা। আবার দ্বিতীয়জন বললে, “দরকার নেই। প্রভুর আদেশ না পেলে হাঙ্গামের দরকার নেই। রাধানাথকে সরিয়ে দিলেই গোরুর চোখ চাপা পড়ে যাবে।”

আমরা একেবারে লাফিয়ে উঠলাম এই কথাটা শুনে! কালীপদ চীৎকার করে উঠল, “আবার গোরুর চোখ? সেকি! এইজন্য খুন করতে হল? কী ভয়ানক।”

দারোগা সব দেখে বুঝে রমেনবাবুর প্রতি দন্ডবিধান করেচিলো কি করেনি, বা করলে কতটুকু করেচিলো, সে বিষয়ে আলোচনা আমি করবো না। আমরা দারোগার মোটরে চেপে রওয়ানা দিলাম ঘোষবাটির দিকে। দারোগা কালীপদর দিকে চেয়ে বলল, “আপনি শুনলাম তান্ত্রিক? আপনি তো ভয়ানক লোক মশাই। এইভাবে শুধুমাত্র বিশ্লেষণ করেই অকুস্থলে যাবার আগেই লোকটাকে ধরে ফেললেন?”

কালীপদ চুপ করে চিন্তা করতে লাগল অন্য সূত্রগুলো নিয়ে। ঘোষবাড়িতে যখন এলাম, তখন সাঁঝের গর্জন চাপা দেওয়া ঝনঝনানি আরম্ভ হয়েছে। দারোগা চীৎকার করে কইলো, “এই রাক্ষুসে শিশুখুনীর যদ্দিন না কিনারা হচ্চে, তদ্দিন আমার শাস্তি নাই ঠাকুরমশায়। হাড় জ্বালাতন হয়ে গেলাম একেবারে।”

কালীপদ একবার গোহালে ঢুকে দেখে এসে চীৎকার করে বলল, “গোরুগুলোর চোখ দেখে এলাম। কিছুই তো নাই সেখানে হে! আচ্ছা ঝঞ্ঝাট তো!…

কালীপদর কথা থামিয়ে একটা বিকট গর্জন ভেসে এল। পরমুহূর্তেই গোটা তালুকের গগনবিদারী বাজনা থেমে গিয়ে নিঝুম নির্জনতা নেমে এল। কালীপদ মাস্টারকে কইলো, “আচ্ছা মাস্টারমশায়, এই যে বাচ্চাগুলো উধাও হয়ে যায়, তারা কীভাবে উধাও হয়?”

“কোনো ঠিক নাই ঠাকুর। আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করে যা জেনেচি, বন্ধ ঘরে সামান্য চোখের আড়াল হলেই শিশু যেন উবে যায়! মা তার ছেলেকে কোলে আঁকড়ে রাখলেও একপলক অন্যদিকে নজর করলেই কোলের বাছা যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়! পরেরদিন তাদের ছেঁড়াখোঁড়া…

“থাক থাক, আর বলতে হবে না। আমি জানি। তাহলে এর সঙ্গে গর্জনের কি সম্পর্ক আর ঢাকঢোল বাজিয়ে শব্দ চাপা দেবারই বা কি সম্পর্ক? শব্দটা কানে গেলেই যে বাচ্চা উধাও হয় তা তো নয়? বরং.. বরং মনে হচ্চে খোয়া যাওয়া বাচ্চাগুলোর প্রাপ্তিস্বীকার হিসেবেই গর্জনটা করে রাক্ষসটা। আচ্ছা, মৃতদেহগুলো ঠিক কিভাবে পাওয়া যায়?”

এইবার দারোগা কইলো, “আমি সবকয়টি মৃতদেহ পরীক্ষা করে দেখেচি, খুনী হয় রাক্ষস, নয়তো উন্মাদ! সবকয়টা মৃতদেহের কলজে ছিঁড়ে নেওয়া হয় প্রতিবারই! এখনও অবধি ঠিকঠাক হিসেবে বিরানব্বইটি লাশ পাওয়া গিয়েচে, শুধু অনুন্নত গ্রামগঞ্জের মানুষ বেশি বলেই লেখালেখি হয়না। তবুও শহরের কিছু সংবাদপত্রে ছাপাও হয়েছে…’

কালীপদ একটু মনের ভিতর হাতড়ে কইলো, “তবে গোরুর চোখ বা একতারাটি যাই হোক, তারা ঘোষবাড়িতেই লুকিয়ে আছে। সেইজন্যই একজন খুনী কাপালিক প্রথমটা ঘোষবাড়িতে আগুন দেবার কথা বলেচিলো।”

আমি একটু তাকালাম কালীপদর পানে। কালীপদর মন তাকে একেবারে ঠিকঠাক সঙ্কেত দিয়েচিলো যে সমস্ত ঘটনা একটাই অদেখা সূতায় গাঁথা রয়েচে এবং সেইজন্যই কালীপদর মন অনুক্ষণ উদগ্রীব হয়েই ছিল প্রতিটি ঘটনাকে ঐ হেঁয়ালির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর। এই কথাটা শুনে কালীপদ বিহ্বলের মতো বলে উঠল, “তাহলে এখনও আরও গোটা আষ্টেক শিশুহত্যা ঘটবে!”

দারোগা চমকে কইলো, “কেন?”

কালীপদ তার উত্তর না দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “শতেক হৃদয়ে আছয়ে লুকায়ে পরম সৃষ্টিকারী।” কথাগুলো ভক্তির নয় ডাক্তার! আমার মন যদি সত্য কথা বলে, তবে এর অর্থ অতি নিষ্ঠুর! গন্ডামুন্ড হলেন চতুর্মুখ ব্রহ্মা, কিন্তু তাঁর সঙ্গে জড়িত অপর কোনো একটা অতি বিভীষিকাময় শক্তিকে জাগিয়ে তোলার জন্য একশোটা কলজের রক্তধারার দরকার হয়! শতেক হৃদয়ের প্রয়োজন হয়! কিন্তু সেই মারণদূতকে জাগাচ্চে কারা? স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ যে শক্তিকে সঙ্কেতে লুকিয়ে রাখেন, তা কখনো সাধারণ হতে পারে না এ আমি নিশ্চিত ডাক্তার! সেই শক্তিরও চারখানা মুন্ড। সে ব্রহ্মার প্রতিভূ!”

আমার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল, “ব্রহ্মাস্ত্র!”

“না ডাক্তার! তার থেকেও সহস্রগুণ ভয়ঙ্কর, বিশ্বচরাচর বিদীর্ণকারী শক্তি। ব্রহ্মশির! ব্রহ্মার চার শির!”

বড় বড় শ্বাস ফেলে একটু ধাতস্থ হয়ে কালীপদ ধরা গলায় বলল, “গোপী, তোমার ছেলেদের একটু ডাকো তো?”

বাচ্চারা পুলিশ দেখে প্রথমটা ভয়ে ঘরে ঢুকতে চায়নি। কালীপদ মুখে হাসি এনে ডাকতেও এল না। কানাই হেসে নিজের সড়কিটা ধরতে দেবার আশ্বাস দিতেই ইতস্ততঃ করে তারা ঘরে এল। কালীপদ তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে শুধালো, “তোমাদের দাদাই ওই গোরুর চোখে একতারার কথাটা কোথায় বলেচিলো দাদুভাই?”

বালকও কৌতুকে বলল, “কোথা বলেচিলো দাদুভাই?”

মাস্টার ধমক দিয়ে উঠল, “বাঁদর কোথাকার, যা জিজ্ঞেস করচেন এই দাদু, তার উত্তর দে হতভাগা।”

বালক কইলো, “দাদাইয়ের ঘরে আমরা খেলতে যেতাম, তখন। জানো দাদু, দাদাইয়ের একটা বন্দুক ছিল। তাই দিয়ে আকাশে পাখি মারতো দিনরাত।”

দারোগাবাবু একটু নড়েচড়ে উঠে বলল, “সেকি! ফায়ার আর্মস আছে এই বাড়িতে? কই, কোনো পারমিট তো আমার থানায়…”

কালীপদ হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “রাতেও পাখি মারতো? কী করে?”

বালক ঠোঁট উল্টে বলল, “আমি জানি না। দেখেচি তো।”

কালীপদ মাস্টারের দিকে তাকাতে সে বললে, “দূর দূর, ওদের যেমন কথা, বন্দুক ফুটালে আমরা কি শব্দও পেতুম না কেউ? হয়তো থেটারের কোনো অভিনয় করচিলো সে। ওই উপরের ঘরটাকে তো ছিষ্টির করে রেখেচে। আমরা কখনো তার ঘরে ঢুকতাম না, সে পছন্দও করতো না, শুধু এই দুটো মিলে মাঝেমধ্যে যেতো। অথচ ঘর আমাদের, বাড়ি আমাদের। বোঝো কাণ্ডটা।”

কালীর সঙ্গে আমরা দুইতলায় উঠে, আমাদের পাশের ঘরটার বন্ধ কপাট খুলে ভিতরে ঢুকতেই একটা গুমোট বাতাস নাকে ধাক্কা দিল। এই ঘরটাতেও আমাদের মতো সারিসারি ছয়খানা জানালা। উত্তুরের দেওয়ালেও চারখানা জানালা। তার কয়েকটাকে খুলে দেওয়া হল। বাইরে থেকে ঝিঝির ডাক ভেসে এল। বড় ঘরখানার মধ্যে টুকিটাকি পুরুষের গৃহস্থালির জিনিস পত্তর, দেওয়াল জুড়ে পাহাড়, নদী, রাঙ্গা কৃষ্ণচূড়া, শিমুলগাছের শৌখিন কিছু চিত্রের সঙ্গে চাদরে ঢাকা একটা বিরাট বড় কি যেন একটা জানলার সামনে দাঁড় করানো রয়েচে! ঠিক যেন একখানা মাঝারি কামান!

দারোগাবাবু চমকে উঠে বললে, “এহ, আমারই ভুল। লোকটা খুন হবার পর এই ঘরটা সার্চ করা দরকার ছিল। সবাই বললে ভালো লোক, সরল লোক, তাই…”

কালীপদ বিরক্ত হয়ে কইলো, “এখনও তাই-ই বলবে লোকে….” এই বলে চাদরখানা সযত্নে সরিয়ে নিয়ে নিজেও অবাক হয়ে বলল, “এই তবে সেই বন্দুক, যা দিয়ে দিনে রাতে আকাশে তাক করতো রাধানাথ!”

জিনিসটা একটা টেলিস্কোপ। সাধারণ নয়, বিরাট বড় নল (প্রায় আট হাত লম্বা) বিশিষ্ট একটা অংশ এসে প্রবেশ করেচে একটা বিরাট আকারের বাক্সে। পুরোটাই পেতলের তৈরি। নলের গায়ে কত যে হাতল, বোতাম আর টানাপুলি, তার গোণাগুনতি নাই!”

“রিদয় বাবু, তোমার এই খুড়া এককালে জয়পুরের মানমন্দিরে কি কাজ করতেন না?”

“হাঁ ঠাকুর….

“সেই কাজ কী কাজ জানিনে, তবে এই অদ্ভুত যন্ত্র হয়তো তাঁরই তিলতিল আবিষ্কার! এতবড় যন্ত্র ঘরে ঢুকালে তোমরা দেখতে। এইটে এখানেই তৈরী হয়েচে। কিন্তু এটা দিয়ে কী দেখতো সে? উঁহুহু হাত দিও না খবরদার! কোনো কলকব্জা নড়াবে না। উনি যন্ত্রের এই অবস্থানেই ঠিক কী দেখেচিলেন তা আমার দেখা দরকার…”

রিদয় উত্তেজিত হয়ে কইলো, “কিন্তু ঠাকুর, ওরা বলচে খুড়ো নাকি বিভিন্ন দিকে বন্দুকের নল ঘুরিয়ে পাখি তাক করতো। তাহলে ঠিকঠাক অবস্থানটা আমরা বুঝবো কী করে?”

কালীপদ আত্ম অনুযোগের কণ্ঠে বললে, “গরুর চোখের কথাটা কোনো বড় মানুষ বললে আমি সাত পাঁচ ভেবে দেখতুম, কিন্তু এই বাচ্চাদের মুখে শুনে আমি আর কোনোদিক খতিয়ে দেখিনি। সেই দোষ আমারই স্থূলবুদ্ধির। এই ঘরেই অজস্র গোরুর চোখ রয়েচে। আমাদের বেছে নিতে হবে দ্বিতীয়টি…”

আমার মুখের দিকে চেয়ে কইলো, “জানালা ডাক্তার, জানালা। জানালাকে ভালো ভাষায় গবাক্ষ বলে, অর্থাৎ গোরুর চোখ…” কালীপদ হাতের ধাক্কায় দ্বিতীয় জানালার খড়খড়ি কপাটদুটো খুলে ফেলল। আমি একটা সম্ভাবনার কথা মনে করে বললাম, “দাদা, শুধু ঠিকঠাক জানালায় ঠিকঠাক মাপজোকের দূরবীক্ষণ বসালেই সঠিক বিষয়টাকে দেখা যাবে না কিন্তু। রাধানাথ জানালা থেকে ঠিক যে দূরত্বে এই অদ্ভুত যন্তরটা বসাতো, সেইখানেই বসাতে হবে। কিন্তু এই বাচ্চারা কি সেই জায়গাটা নিখুঁতভাবে বলতে পারবে?”

কালীপদ আর কানাই ততক্ষণে চাকা বসানো পাটাতন সমেত গুরুভার দূরবীক্ষণটা জানালার কাছে সরিয়ে এনে কইলো, “কাউকে বলতে হবে না। জানালার সামনে চারখানা গোল ছাপ দেখচো? এগুলো এই চাকার দাগ। যন্ত্রটা এইখানেই অধিকাংশ সময়ে বসানো থাকতো বলেই দাগটা পড়েছে।” এই বলে ঠিক সেই দাগের উপরে চাকাগুলো স্থাপন করে কাঁপা হাতে নলটা ধরে একটা চোখ রাখল নলের অক্ষিকোটরে। একটু উশখুশ করে বলল, “কিছুই তো দেখা যাচ্চে না ছাই।”

আমি তাড়াতাড়ি নলের মাথা থেকে ভারী ঢাকনিটা সরিয়ে নিলাম। এর পরের দৃশ্যটা আমার আজও মনে পড়ে! কালীপদর একটা চোখ যন্ত্রে, একটা চোখ বাইরে। বাইরের চোখটা কুঞ্চিত হয়ে বুজে ছিল, কিন্তু একটুক্ষণ দেখার পরে সেই চোখ খুলে গেল! প্রথমে খুললো, তারপর বড় হল, তারপর মহা বিস্ময়ে বিমূঢ়ের মতো বিস্ফারিত হয়ে তাকিয়ে রইলো! কালীপদ যন্ত্রের মতো চোখ সরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ক্লিষ্ট গলায় বলল, “সর্বনাশ বোধহয় হয়েই গিয়েচে ডাক্তার! শেষ রক্ষা হল না! ওই রাক্ষুসে শক্তিকে কেউ প্রয়োগ করে দিয়েচে পৃথিবীর দিকে! সে আসচে!” দারোগা চমকে উঠে বলল, “সে কী কথা? কী অস্ত্র নিয়ে কথা বলচেন বলুন তো? ফায়ার আর্মস? সেটাকে কেউ ট্রিগার করে দিয়েচে পারমিট ছাড়াই?”

কালীপদ ঘোরের মধ্যে তার দিকে চাইলো। আমি ধমক দিয়ে বললাম, “আপনি চুপ করুন দারোগা সাহেব। যা বোঝেন না তা নিয়ে বলেন কেন?”

পরিস্থিতি প্যাঁচালো বুঝে ফাঁপরে পড়ে সে চুপ হয়ে গেল। আমি যন্ত্রে চোখ রেখে চমকে উঠলাম! একটা আলোর বিন্দু। একটাই। ঠিক নক্ষত্র নয়, একেবারে কটকটে লাল রঙের একটা আলোর বিন্দু! তার চারদিকে চারখানা মাথার মতো ধুঁয়ার লেজ ছড়িয়ে রয়েছে! সেগুলির হাবভাব দেখলে বেশ বোঝা যায়, সেইটা একেবারে সোজাসুজি ছুটে আসচে সুদূর মহাকাশের ওপার থেকে, শত শত নক্ষত্রপুঞ্জ পেরিয়ে! আমিও হতবাক হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে বললাম, “তাহলে কী হবে দাদা? অস্ত্রকে অ”টকানোর কোনো উপায় কি নাই? ওই খুনী কাপালিক দুইজন এই তীব্র বিধ্বংসী মারণাস্ত্র কোথায় তৈরী করতে শিখলো?”

কালীপদ আমার প্রশ্নের জবাবে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “কোনো সাধারণ মানুষের সাধ্যি কি চতুঃশির ব্রহ্মশিরের মতো চরাচর ভস্মকারী অস্ত্রকে চালনা করে? তারা হয়তো কারুর আজ্ঞাবহ মাত্র। আসলে আড়ালে থেকে ওই পাহাড় থেকে মুক্ত হওয়া অপদেবতাটিই সবকিছু ঘুঁটি নিক্ষেপ করে চলেচে। কিন্তু তার পরিচয় কী?”

আমি বললুম, “একে একে সবকটা সূত্রই তো শেষ হয়ে গেল। আর কোনো সূত্র নাই জোড়া লাগিয়ে এগোনোর মতো।”

“হাঁ ডাক্তার। সূত্র নাই, কিন্তু একটা সম্ভাবনা রয়েচে হাতে। হেঁয়ালির অর্থ পেতে হলে ঘোষেদের হারিয়ে যাওয়া কুলমন্দির খুঁজে বের করতেই হবে আমাদের পাতাল থেকেও। ওই মন্দির স্বয়ং দ্বারকাধীশের ছকে তৈরী। তাতে কিছু সমাধান তো থাকবেই? হেঁয়ালির পরের কথাগুলো ভাবতে হবে, “অশ্ব থামিয়ে কৈলো বরণ অতন্দ্র নিদ্রাকে।”

বালক আবার বলে উঠল, “অশশো থামায়ে কইলো কইলো।”

এইবার রিদয় তাকে ধমক দিয়ে নীচে পাঠিয়ে দিয়ে কিছু বলতে যাচ্চে, হঠাৎ কালীপদ, “কী বললে? কী ভয়ঙ্কর। তাই তো? আমার একবারও মনে হয়নি কেন?” বলে সটান হয়ে দাঁড়ালো। আমি কিছু শুধানোর আগেই সে উচ্ছসিত এবং উদ্বিগ্ন হয়ে কইলো, “অশ্ব কেউ থামায়নি ডাক্তার। ওটা ছদ্মরূপ। আসল শব্দটা অশ্বত্থামা। আমাদের পরিণত চিন্তা দিয়ে যা উদ্ধার হয়নি, একটা বাচ্চার সরল চিন্তা সেটাকে ঠিক উদ্ধার করে ফেলেছে!

অশ্বত্থামা পুরাণের এক অতি দুর্দম সত্বা। তাকে কেউ একজন অতন্দ্র নিদ্রাতে আচ্ছন্ন করে রেখেচিলো ওই পাহাড়ের তলে। আমি সব যেন বুঝতে পারচি। বলচি। আমার অনুমান একটু কঠিন বটে, কিন্তু পুরোপুরি মনগড়া কিন্তু নয়। শোনো, ভারত যুদ্ধের শেষে কুটিল অশ্বত্থামা পান্ডবদের নিরীহ পাঁচটি শিশুকে ঘুমের মধ্যে হত্যা করে। সেটা পান্ডবদের বংশনাশ করার জন্য, নাকি ঐ সময়েও তার কলজের দরকার হয়েচিলো, তা জানি নে, তবে সেই পাপে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণ অশ্বত্থামার মাথার শক্তিরূপ মণিটি এবং তার পিতৃপ্রদত্ত অতি ভয়ঙ্কর ব্রহ্মশির মারণাস্ত্রটি কেড়ে নিয়ে, তাকে পূতিগন্ধময় অমরত্বের অভিশাপ দেন। নৃশংস অশ্বত্থামা হীনবীৰ্য্য হয়ে পলায়ন করেন।

আমার ধারণা, সেইদিন থেকেই সে তক্কে থেকেচে নিজের মণি আর অস্ত্র উদ্ধারের জন্য। সেই ব্রহ্মশিরকে বাসুদেব কোথায় রেখেচেন ধরতে না পেরে বরং নিজের অমিত শক্তির আধার মণিটিকেই উদ্ধার করতে মনস্থ করে সে। বাসুদেব নিজের অসামান্য চতুরতা এবং বিদ্যায় সেই মণিকে তীব্র হিমায়িত করে লুকিয়ে রাখেন ঋষিকুন্ড পাহাড়ের চূড়ার কাছে। সেখানে হয়তো কোনো অদৃশ্য বাধাও তৈরী করে রাখেন অশ্বত্থামার জন্য, ফলে মণির সন্ধান পেলেও সরাসরি পাহাড়ের চূড়ায় উঠে মণি হস্তগত করতে পারেনি সেই খল। সে পাহাড়ের নীচের একটা সুড়ঙ্গ দিয়ে প্রবেশ করে কৌশলে ভিতর থেকেই মণিটার দিকে হাত বাড়ায়। মণি যে হিমায়িত রয়েচে তা তার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না, কারণ অসম্ভব চতুর শ্রীকৃষ্ণের বুদ্ধির তিলমাত্রও তার ছিল না, ফলে আঙুল দিয়ে মণিটিকে স্পর্শ করা মাত্রই তার গোটা শরীর অসাড়, হিমশীতল হয়ে জমাট বেঁধে যায়, কিন্তু অমরত্বের জোরে তার মৃত্যু ঘটেনি।

মণি উত্তোলনের সময়ে যে শ্বেতপাথরের চারখানা প্রকাণ্ড পাটা দেখেচিলে, সেগুলো তার আঙুল সমেত নখ। তার আকৃতি সে কিভাবে অতখানি বৃদ্ধি করেচিল আমি জানি না তবে মণিটা নীচে তোমরা নামিয়ে আনার পরপরই তার মরণঘুম ভাঙে। সে বেরিয়ে পড়ে মণিটা হস্তগত করে এখন কোথাও আত্মগোপন করে দুইজন অনুচরকে দিয়ে নরহত্যাগুলি চালনা করচে। মণিই তার শক্তি। ব্রহ্মশির না পেলেও তার ক্ষতি হয়নি, বিলম্ব হয়েচে মাত্র, কারণ তার পিতা ধুরন্ধর অস্ত্রগুরু দ্রোণের থেকে সে ব্রহ্মশির তৈয়ারী শিখে নিয়েচিলো।

সেই মহা প্রলয়ঙ্কর অস্ত্রকে সে মন্ত্রবলে ছুটিয়ে ডেকে আনচে পৃথিবীর পানে! হয়তো তার একশত কলজের আহুতি ভান্ডার পূর্ণ হয়ে গিয়েচে অনেকদিন আগেই। পুলিশ পুরো হিসাব পায়নি। এখন সে শিশুহত্যা করচে হত্যার নেশায়। শিশুহত্যার কুৎসিত নেশা তার তো ছিলই হাজার হাজার বছর আগেও। পাঁচজন পান্ডব পুত্রের সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মশিরের আঘাতে সে উত্তরার গর্ভস্থ শিশুকে অবধি হত্যা করেচিলো! এখন কথা হল, রাধানাথ কোনো উপায়ে বেশ কিছুটা জেনে ফেলেচিলো এবং বাইরে বলে ফেলেচিলো বলেই তাকে হত্যা করানো হয়েছে। রাধানাথের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ছিল আমাদের চাইতে অধিক। কিন্তু সে আর কোনো সঙ্কেতই কি লিখে রেখে যায়নি কোথাও?

মহাকাশের অচিন লোকের বিদ্যুৎপুঞ্জ একত্রিত হয়ে যে ভয়ঙ্কর আঘাতের জন্য ধেয়ে আসচে, তাকে রুখতে গেলে বাসুদেবের পন্থায় তৈরী মন্দিরটা খুঁজে পেতেই হবে ডাক্তার। নাহলে সব ছারখার হয়ে যাবে। কাল অমানিশা। সব অপশক্তির ঠাঁই। আমার মন বলচে কালই ওই রাক্ষুসে প্রহরণ ঝাঁপিয়ে পড়বে এই তল্লাটে। পোড়া কপাল আমার ডাক্তার, রাধানাথ যদি জীবিত থাকতেন তবে তার থেকে অনেক কিছু শিখতে পারতুম।”

ব্রজ মাস্টার ইতিমধ্যেই এসব শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েচিলো, সে ভয়ে ভয়ে মাথা নেড়ে বললে, “সে কথা ঠিক ঠাকুরমশায়। রাধা পাগলাটে ছিল ঠিকই, কথাবার্তার মধ্যে বড় পাঁচঘোচ ছিল, কিন্তু মানুষটা খারাপ ছিল না। তার খাপছাড়া কথা সবাই বুঝতোও না। এই, খুন হবার দিন দুয়েক আগেই বোধহয়, সে হনহন করে বাড়ি থেকে বেরুচ্চে, আমি বললাম, ‘কিরে হতভাগা, খাওয়া, থেটার আর ঘুম, এই এসে দাঁড়িয়েছে তবে?” রাধা একগাল হেসে বলল, ‘এগুলো আলাদা আলাদা নয় দাদা। সব মিলিয়েই তো আমাদের জীবন।’ আমি ক্ষিপ্ত হয়ে বললাম, “হেঁয়ালি করিসনে বলচি, ভালো লাগে না সবসময়ে…’ তার উত্তরে সে উচ্ছ্বসিত হয়ে কইলো, ‘হেঁয়ালি আর আমি কতটুকু জানি দাদা? সব হেঁয়ালির কারখানা হলেন বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর মাথার জটায় যা মারপ্যাঁচ রয়েছে, গোটা পৃথিবীর সব মানুষের বুদ্ধি একত্রিত হলেও তার সমতুল হবে না।’ এখন আপনার কথা শুনে সত্যিই বুঝতে পারচি ঠাকুরমশায়, সে আমাদের বংশের রহস্য উন্মোচন করেই এনেচিলো হয়তো।”

কালীপদ আতান্তরে পড়ে বিড়বিড় করল, “মাথায় মারপ্যাঁচ থাকেই, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের মাথার জটায় বলল কেন সে? মানুষটা যেইরকম, তাতে তার একটা শব্দও না পরখ করে ফেলে দেওয়া চলে না আর। আচ্ছা, মাথার জটা বলতে কী বোঝো তোমরা?”

রিদর কইলো, “বটের আঠা দিয়ে লম্বা চুলগুলো আঠালো করে ঝুঁটি বাঁধা।”

আমি বললুম, “বড় চুলের রাশিকে আঠা ছাড়াও মাথার উপরে বেঁধে রাখাটাও কৃত্রিম জটা হতে পারে।”

অনেকেই অনেক রকম বলল। কালীপদ হতোদ্যম হয়ে কানাইকে বললে, “তুই কিছু বলবিনে কানাই?”

কানাই অপ্রস্তত হয়ে বলল, “আমি কেষ্টঠাকুরের কথা ততো জানিনে কর্তাবাবা। শুধু ছেলেবেলায় মা সুর করে বলতেন,

“গোবৎস্য লয়ে কৃষ্ণ সখাদের সনে
চূড়ো বাঁধি শিখিপুছে, যায় গোচারণে…”

কালীপদ কথাগুলো আলগোছে শুনে একটু খতিয়ে ভেবে হঠাৎ ঘরের চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে কানাইকে বলল, “এইদিকে আয় কানাই, কৃষ্ণের চূড়ো পেয়েচি…” এই বলে কানাই আর তার কর্তাবাবা মিলে দেওয়ালের গা থেকে নামিয়ে আনলো বড় কৃষ্ণচূড়ার বাহারি চিত্রটা। সেটাকে এদিক ওদিক করে দেখে উলটো করে তক্তাপোষে রাখতেই আমার চোখ পড়ল ছবির পিছনের মোটা কাগজে

অজস্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ত্রিশূলের ছবি যোগ করে করে একটা “ওঁ” এর রূপ দেওয়া হয়েচে কলমের কালি দিয়ে! কম করে কয়েকশত ছোট বড় ত্রিশূলের ফলা আঁকা রয়েচে ওঁ এর শরীর জুড়ে। চন্দ্রবিন্দুর বিন্দুটা শুধু লাল রঙা। সেই বিন্দুর উপর দিয়ে বামদিক থেকে ডান দিকে চলে গিয়েচে পরপর অনেকগুলি তীরচিহ্ন। কালীপদ বেশি কিছু ভেবে ওঠার আগেই রিদয় অবাক হয়ে বলে উঠল, “এ জিনিসটা খুড়ো জানলেন কেমন করে! এ তো আমাদের সাইটের হিসাব!”

“সাইটের হিসেব? কীসের হিসেব?”

“দাঁড়ান, আমি একটা খসড়া নিয়ে আসি নীচ থেকে…” এই বলে একটু পরেই একখানা বড় কাগজ গোটানো অবস্থায় নিয়ে তক্তাপোষের উপর পেতে দিল রিদয়। আমি আর কালীপদ দুই মাথা হাত দিয়ে চেপে ধরলাম। গোটা কাগজ জুড়ে ত্রিশূলের ফলায় ছড়াছড়ি। রিদয় কইলো, “এই পুরো কাগজটা ধরুন মুঙ্গের পরগণা। এই ছোট ত্রিশুলের ছবিগুলো হচ্চে বচ্ছর ত্রিশ চল্লিশ এর মধ্যে তৈরী মন্দির। আর এই স্থুল ত্রিশুলগুলো হচ্চে শতবর্ষ বা তার চেয়েও বেশি প্রাচীন মন্দিরের অবস্থান। ত্রিশুল দিয়েই মন্দির চিহ্নিত করা হয় আমাদের। এইবার এই মোটা দাগের মন্দিরগুলোকে কাল্পনিক দাগ দিয়ে জুড়ে দেখুন … কী দেখচেন? একটা ওঁ এর মতো হচ্চে তো?”

আমিও প্রথমবার ফলাগুলো কল্পচক্ষে দেখে এই মিলটা বের করে হেসেচিলাম, কিন্তু এ তো আদৌ হাসির বিষয় নয় দেখচি এখন। আর উপরের ওই তীরচিহ্ন দিয়ে করা রেখাটা হল গঙ্গা নদী।

কালীপদ ফিসফিস করে বলল, “অবিশ্বাস্য মেধা। শুধুমাত্র চোখের অনুপাতে ঘুরে ঘুরে এতটা বের করা মানুষের সাধ্য? শুধু এই কাগজটা যদি মুঙ্গেরের হয়, তবে এইটা হচ্চে ধরো তোমার ঐ ঋষিকুন্ড পাহাড়টা, এইটা দক্ষিণ…. তাহলে শুধু এই একটা জিনিসই ভুল করেচে রাধানাথ। গঙ্গার গতিপথ দক্ষিণ থেকে উত্তুরে দেখানো রয়েছে এখানে।”

রিদয় অবাক হয়ে বলল, “ভুল কেন হবে ঠাকুর? ঠিকই তো আছে।”

কালীপদ বিস্মিত হয়ে তার চোখের দিকে চেয়ে কইলো, “গঙ্গা উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েচে রিদয়, দক্ষিণ থেকে উত্তরে কখনো যায়নি।”

“এইখানে গিয়েচে ঠাকুরমশায়। গঙ্গার গতিপথ এই মুঙ্গেরে এসে ঘোড়ার ক্ষুরের মতো উলটো বাঁক নিয়ে উত্তরের দিকে ফিরে গিয়ে তারপর সোজা পূর্ববাহিনী হয়ে ভাগলপুরের উপর দিয়ে বাঙ্গালার দিকে ধেয়ে গিয়েছে….”

কালীপদ তক্তাপোষ থেকে এক লাফে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চীৎকার করে উঠল, “এ কি সত্যি?”

মাস্টার একটু বোকার মতো হেসে বললে, “সত্যি না তো কী? এই জায়গাই একমাত্র জায়গা যেখানে গঙ্গার গতিপথের দিকেই মুখ করে দাঁড়িয়ে কৈলাসের দিকে মুখ করে শিবকে প্রণাম জানানো যায়।”

আমি অস্ফুট কণ্ঠে শুধালাম, “কোন জায়গায় এটা?”

“আজ্ঞা, মুঙ্গের কেল্লার কাছাকাছি কষ্টহারিণী ঘাটের কাছে গঙ্গা উত্তর বাহিনী হয়েছেন।”

কালীপদ হাতে হাত ঘষে চাপা গলায় বলল, “গঙ্গা ফিরেন উৎসমুখে দুঃখ হইলে ত্রাণ—অর্থাৎ কষ্টহারিণী থেকেই গঙ্গা উৎসের দিকে মুখ ফিরিয়েচেন! এই ওঁ চিহ্নের চন্দ্রবিন্দুর লাল বিন্দুর জায়গাটা দেখো রিদয় এই মন্দিরটাই দেখাতে চেয়েচেন তোমার খুড়ো! এই তোমাদের পূর্বপুরুষের তৈরী করা শ্রীকৃষ্ণের নকশা করা মন্দির। তোমার প্রপিতামহ পুরনো মন্দির ভেঙে যাবার পর সেই একই উপায়ে দ্বিতীয় মন্দির তৈরী করেন। খুবই সম্ভব যে, পুরোনো মন্দিরের কিছু বস্তু তিনি এই মন্দিরেও স্থাপন করেচিলেন! এখানে ভোরের আলো ফুটলেই যেতে হবে বাছা। কাল অমানিশা। সর্বনাশের রাত আর বাকি নাই!

আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে গেল। দারোগা সাহেব বিমর্ষ মুখে বলল, “আমার যন্ত্রণার উপর যন্ত্রণা। একেই ঝামেলার অন্ত নাই, তাতে আরেকখানা গ্রেপ্তারী এসে জুটলো!”

আমি যারপরনাই অবাক হয়ে শুধালাম, “গ্রেপ্তারী? কার?”

“ঐ যে কোন অপরাধীর কথা বলচেন, বিষ্ফোরণ ঘটাতে চাইচে মুঙ্গেরে…”

আমি হতোদ্যম হয়ে একটা শ্বাস ফেললাম। সঙ্গে কালীপদও।

সারা রাতটা কারোর ঘুম আসলো না। কালীপদ আর আমি ছটফট করে বারবার দূরবীক্ষণে চোখ রেখে আশঙ্কায় নিশিযাপন করলাম। আকাশের সে চার রেখাওয়ালা বিন্দুটা আরও অনেক বড় হয়েচে! সে অকল্পনীয় বেগে ধেয়ে আসচে নরাধম অশ্বত্থামার আহ্বানে পৃথিবীর প্রলয়সাধনের জিঘাংসা নিয়ে। রাধানাথের অদ্ভুত কৌশলে গড়া যন্ত্রে তাকে দেখা যাচ্চে, কিন্তু দেশের বাকি মানমন্দির তাকে দেখতে পাচ্চে কিনা সন্দেহ! মাঝরাতের পর থেকে হঠাৎই বাতাসের গতি কিছুটা যেন চঞ্চল হয়ে উঠল। বহুদুরে বৃষ্টি হলে যেমন হঠাৎ হঠাৎ বাতাসের দমক গায়ে এসে লাগে, ঠিক তেমনই।

ভোরের আলো সামান্য ফুটতে না-ফুটতেই দারোগার মোটরে চেপে আমরা রওয়ানা দিলাম কষ্টহারিণী ঘাটের দিকে। গঙ্গার পাড়ে নেমে আমরা সবিস্ময়ে দেখলাম রিদয়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। গঙ্গার গতিপথ এখানে একটা বিরাট গাছপালা ঘেরা চড়াকে মাঝখানে রেখে ঘোড়ার ক্ষুরের মতো ফিরে এসেচে উত্তরের দিকে। কালীপদ রিদয়ের উদ্দ্যেশে বলে, “আচ্ছা, এই এলাকায়…” বলা মাত্রই তার কথাকে থামিয়ে দিয়ে রিদয় ঘোষ বলল, “হাঁ ঠাকুর, এই ঘাটের ওদিকেই একটা বহু জরাজীর্ণ মন্দির রয়েচে। এই এলাকার সবচাইতে প্রাচীন মন্দির। সার্ভের সময়ে দেখেচিলাম এক ঝলক। অগুণতি প্রাচীন ঠাকুর দেবতার বিগ্রহ রয়েচে। বাইরে পুলিশি প্রহরা আছে সরকার থেকে।”

আমরা দ্রুতপদে দুটো গলি পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছি একটা জরাজীর্ণ মন্দিরের সোপানের সামনে। অন্ততঃ এদিকে ওদিকে পঞ্চাশ পঞ্চাশ হাত আড়ে বহরের পাথর বাঁধানো বেশ উঁচু প্রকাণ্ড বেদীর উপরে বেশ প্রশস্ত মন্দির। গায়ের পাথরের কাজ অযত্নে কালো হয়ে গিয়েচে। মন্দিরের উঁচু চূড়ায় চারখানা পাথরের কলস, একখানা চূড়া। মন্দিরের বাইরে দোরের দুইপাশে দুইটি দেবীর মূর্তি দেওয়ালের গায়ে উঁচু করে খোদাই করা। এই মন্দিরে যে চোরের উপদ্রবেই পুলিশি প্রহরা বসেচে তা বেশ টের পেলাম। ডানপাশের মূর্তিটির একখানা চোখ কোনোগতিকে খুবলে নিয়ে গিয়েচে চোরে, ফলে দেবীমূর্তি দেখতে হয়েচে রাক্কুসীর ন্যায়।

দারোগাকে আসতে দেখে প্রহরায় থাকা দুই কর্মচারী উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকলো। দারোগা হাত দেখিয়ে তাদের নিরস্ত করে আমাদের নিয়ে ভিতরে এল। কালীপদ ভিতরে ভিতরে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে রয়েছে তা তাকে দেখেই টের পাচ্চি। যত সময় কাটচে, ততো তার উদ্বেগ বেড়ে চলেচে। এখনও শেষ রহস্যের সমাধান হয়নি, অথচ দানব প্রতিটি মুহূর্তে তার ধ্বংসের প্রক্রিয়া চালিয়ে চলেচে।

মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করে কিছুটা অবাক হয়ে চারদিকে তাকালাম! মন্দিরের থেকে প্রদর্শনশালা বেশি মনে হল! ঢুকে একেবারে মুখোমুখি দেওয়ালের গায়ে একখানা মাঝারি বেদী, কিন্তু তাতে কোনো পরিচিত দেবদেবীর বিগ্রহ বা প্রতিমা নেই! বেদীতে এক বৃদ্ধের পূর্ণাবয়ব মুর্তি। বৃদ্ধ মানুষটি ধ্যানের মুদ্রায় কপালচক্ষু করে বসে রয়েচে। উচ্চতায় প্রায় হাত দশেক, বহরেও সুষম আনুপাতিক, কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টা হল, বৃদ্ধের বুকের বামদিকে একখানা খোদাই করা পাথরের পদ্মফুল যেন তাঁর বুক থেকে ঠেলে বেরিয়ে এসেচে।

অন্যান্য দিকে চোখ ফিরিয়ে আরও অবাক হলাম! তিনদিকের দেওয়ালের গা ঘেঁষে অজস্র পাথরের বিরাট বিরাট মুর্তি বসানো রয়েচে। তাদের সবার চোখের অবস্থান ওই বৃদ্ধের পানেই চেয়ে রয়েচে। বামের প্রাচীরে জনা দশেক বানরসেনা সহ রামচন্দ্র আর লক্ষণ ঠাকুরের বিরাট মুর্তি। ডাঁয়ে বিভিন্ন অপ্সরা পরিবেষ্টিত ইন্দ্র। পিছনে ঘুরে দোরের দিকে তাকালে ডানদিকের দেওয়ালে সশস্ত্র পঞ্চপান্ডব, ধনুঃশর হাতে সস্ত্রীক কন্দৰ্পদেব। বাঁয়ের দেওয়াল অদ্ভুত ভাবে ফাঁকা! সেখানে কোনো মুর্তি-ই নাই!

কালীপদ পিপাসু নয়নে চারদিকের দেওয়াল, মুর্তির রাশি এবং বাকি সবকিছু থেকে কোনো একটা সমাধান পাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেচে, কিন্তু ধরি ধরি করেও তাকে ধরা যাচ্চে না কিছুতেই! রিদয় বেজার হয়ে বললে, “হেঁয়ালিতে যে বুড়া বয়সে ভীমরতির শিকার হওয়া বৃদ্ধের কথা ছিল সেইটে এই বেদীর বুড়াই নয় তো? আসলে…. মানে, বলতে চাইচি… ছড়া অনুযায়ী কামনায় বিদ্ধ হওয়া বৃদ্ধের সঙ্গে এর অনেক সাদৃশ্য আছে কিনা। বুকের থেকে পদ্ম ফুটে উঠেচে…”

কালীপদ সায় দিয়ে বলল, “তাই হওয়াই সবচেয়ে সম্ভব বাছা, কিন্তু এটুকুতে তো সমাধান হচ্চে না কিছুই? এই বৃদ্ধ কে, তা চিনতে পারচিনে ছাই। এইটা বিবাহের যুগ্যি মন্দির বলেও মনে হচ্চে না, অথচ নারীপুরুষ একই নামে সম্প্রদান হবার ইঙ্গিত রয়েচে হেঁয়ালিতে। এ তো মহা জ্বালা! স্বামী স্ত্রীর কখনো একই নাম হতে পারে? লক্ষ্মী, দুর্গা, কমল ধরণের নামগুলো যদিও নারীপুরুষ উভয়েরই হয়, কিন্তু… তারপর ধরো, এই বৃদ্ধ নাচ কার সঙ্গে গোপন শলা করেচিলেন তাই বা খোঁজ পাই কেমন করে বলো?”

দারোগা ঘুরে ঘুরে মুর্তিগুলোকে দেখে বেড়াচ্চে, আমি একটু রেগে গিয়ে তাকে বললাম, “এই যে দারোগা সাহেব, আপনি বলতে পারেন কী কিছু দারোগা হঠাৎ অথৈ জলে পড়ে কইলো, “কী বিষয়ে?”

আমি রাগ চেপে রেখে বললাম, “এই বুড়ো ঋষি কার সঙ্গে গোপন শলা করেচিলো?”

দারোগা একটু ভেবে বললে, “আমি কী করে বলি ডাক্তারবাবু? আমি এঁকে চিনতেই পারিনি এখনও। এ আবার কার সঙ্গে কী বলেচে তা কেমন করে বলি? পুলিশের কাছে শলা মানে দুটো। হয় গোপন মন্ত্রণা, নয়তো বন্দুক সাফ করার লোহার শলা।”

আমি রেগে গিয়ে তাকে দু’কথা শোনাতে যাচ্চি, এমন সময়ে কালীপদ আমাকে প্রায় থামিয়ে দিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “শাবাস বাছা! এই প্রথম তুমি আমার একটা কাজে এলে। সাধু সাধু।”

দারোগা এটাকে প্রশংসা হিসেবে ধরবে, নাকি বক্রোক্তি, তা ধরতে না পেরে দোটানায় পড়ল। কালীপদ উৎসাহে বলে উঠল, “শলা মানে শুধু মন্ত্রণাই নয়, শলাকাও বটে। কোনো একটা শলাকা লুকানো রয়েচে এই জীর্ণ মন্দিরের ভিতরেই। স্বয়ং দ্বারকাধীশ নিজের অসামান্য ধুরন্ধর বুদ্ধিতে সেই শলাকাকে লুকিয়ে রেখে গিয়েচেন।”

রিদয় অসম্ভব উত্তেজনা চেপে রেখে শুধালো, “কিন্তু কোথায় রাখা আছে?”

“হেঁয়ালি অনুযায়ী ভীমরতির ফাঁকে। এতক্ষণ খেয়াল করিনি হে। ভীম হলেন মধ্যম পান্ডব। তিনি থাকবেন পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যস্থলে, কিন্তু এখানে ভীমসেন রয়েচেন একেবারে বাম দিকে! ঠিক তার পাশেই রয়েচেন দেবী রতি এবং তার ওদিকে আবার কন্দর্পদেব। বাসুদেবের যুগে ভীমরতি শব্দটা চলিত ছিল কিনা আমার সন্দেহ আছে। হয়তো অন্য কিছু ছিল, কিন্তু তোমার প্রপিতামহ নিজের বুদ্ধিতে অর্থটা একই রেখে ভাষাটা বদলে দিয়েচেন। এই দেখো…”

আমি রুদ্ধশ্বাস হয়ে দেখলাম, কালীপদ এগিয়ে গিয়ে ভীমসেন এবং দেবী রতির মাঝের একচিলতে ফাঁকের দিকে এগিয়ে গেল। পিছনের দেওয়ালে প্রায় নজরের অলক্ষ্য একটা ছোট্ট কুলুঙ্গি রয়েচে। কালীপদ খুব সাবধানে হাত বাড়িয়ে হাতটা যখন ফিরিয়ে আনলো তখন তার হাতে একখানা অদ্ভুত দর্শন শলাকা! চকচকে কোনো ধাতু দিয়ে গড়া, গায়ে আজও কলঙ্ক ধরেনি তেমন। দৈর্ঘ্যে আনুমানিক এক ফুটের সামান্য কম। তার গায়ে বিভিন্ন আকারের নকশা ফুটে রয়েচে।

কালীপদর হাত কাঁপচে আবেগে। চাবিটা যথেষ্ট ভারী তা বোঝাই যাচ্চে। কালীপদ বাম হাতে চোখের কোলটা মুছে একটু নাক টেনে ধরা গলায় বলল, “এটা কিসের চাবি আমি জানি না ডাক্তার, কিন্তু আমাদের পরিস্থিতি হয়েচে কাঁকড়াঝোরার মতোই। চাবি পেয়েচি, তালার সন্ধান নাই। কিন্তু সময় যে আর নাই ডাক্তার। বেলা চড়ে গেল। আর কতক্ষণই বা? শেষে কি ওই নরাধম শয়তানই জিতে যাবে ভায়া? বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ হেরে যাবেন?”

কালীপদর অসহায় কণ্ঠ শুনে আমার চোখে জল এল। আমরা প্রতিটা কোণা কোণা খুঁজেও আর একতিলও সূত্র পেলাম না কিছুতেই। কালীপদ অবসন্ন হয়ে ভগ্নদূতের ন্যায় গিয়ে বসলো দারোগার মোটরে। উপায়ান্তর না থাকলে এখানে বসে থাকাটা কাজের কথা নয়। মোটরে ওঠার আগে যখন মন্দিরের উঁচু ভূমিটার থেকে সিঁড়ি দিয়ে নীচের মাটিতে নামচি, হঠাৎ দূরে গঙ্গার অশ্বক্ষুরের মতো বাঁকের মাঝখানের প্রকাণ্ড বনাচ্ছাদিত চড়াটার উপরে পাখপাখালির দল উড়ে চীৎকার করতে থাকলো।

কালীপদ সেদিকে চেয়ে বিষাদের সুরে বললে, “ওই নিষ্ঠুর খুনীটা যে তার দৈব দানবীয় আকারটা লুকিয়ে রাখার জন্য ওই জনহীন চড়াটার বনেই লুকিয়ে রয়েছে তা অনুমানে আগেই বুঝতে পেরেচি, কিন্তু শেষ জয়ের হাসিটা হয়তো নরপিশাচ অশ্বত্থামাই হাসবে।” এই বলে বিতৃষ্ণার সঙ্গে কোনো উত্তর বা সহানুভুতির আশা না রেখেই সে মোটরে গিয়ে উঠল।

ঘোষবাড়িতে ফিরে এসে ছটফট করে চলেচে কালীপদ উন্মাদের মতো। মধ্যে মধ্যে দূরবীক্ষণে চোখ রাখচে। এখন দিনের আলোতেও ধেয়ে আসা ব্রহ্মশিরের চ্ছটাকে যন্ত্রে বেশ দেখা যাচ্ছে। আর কিছু সময়ের মধ্যেই _ হয়তো সে তার করাল দাঁতের পাটি নিয়ে একটা গোটা তালুককে গিলতে ঢুকে পড়বে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে।

ক্রমে দিনের আলো শেষ করে সূর্য্যদেব অস্তাচলে ঢলে পড়ার তোড়জোড় আরম্ভ করেচেন, এমন সময়ে কালীপদ হঠাৎ পাগলের মতো বলে উঠল, “আমি এভাবে ঘরে বসে গোটা তালুককে ছারখার হয়ে যেতে দিতে পারবো না ডাক্তার। আমি মরলে সবার সঙ্গে ওই জায়গাতেই মরবো। তোমরা ঘরে থাকো। কেউ বেরোবে না বাইরে। আমি একাই যাবো শেষ লড়াই দিতে….” এই বলে পালঙ্ক থেকে ভারী শলাটা তুলে নিয়ে কালীপদ কপাট খুলে বাইরে পা দিতেই আমি আর কানাইও বাইরে এসে দাঁড়ালাম। কালীপদ চীৎকার করে উঠল, “পাগলামি করো না ডাক্তার। ফিরে যা কানাই। এভাবে পাগলের মতো সঙ্গে চলিস না। আমার কথা কানেই যাচ্চে না তোমাদের?”

আমরা উত্তর দেবার প্রয়োজন নেই বুঝে চুপচাপ তাকে অনুসরণ করতে করতে বাইরে অবধি আসতেই দেখি রিদয় এবং দারোগাও পিছনে এসে দাঁড়িয়েচে। কালীপদ চেঁচিয়ে বলল, “আমার কথা কানে যাচ্চে না তোমাদের? যাত্রাপালা হচ্চে এখানে? এত ভীড় কীসের?”

দারোগা কোনো কথা না বলে মোটরের দরজাটা খুলে দিতেই কালীপদর এতক্ষণের ক্রোধ চোখের জল হয়ে গড়িয়ে পড়ল। আমরা মোটরে বসলাম। মোটর চলল কষ্টহারিণী ঘাটের পানে। বাইরের আলো নিভে আসতেই মোটরের জানালা দিয়ে বাইরে চেয়েই আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল! আকাশে একটা উজ্জ্বল লাল বিন্দু দেখা দিয়েচে। খালি চোখেই তাকে বেশ দেখা চলে। বাইরে ঝড়ের মতো বাতাস বইতে আরম্ভ করেচে এক অদেখা বিপর্যয়ের সঙ্কেত নিয়ে। আচমকা ওঠা এই বাতাসে সান্ধ্য পথচারীরা বিভ্রান্ত! এখনও খোল করতালের সমবেত ধ্বনি আরম্ভ হয়নি।

আমাদের গাড়ি প্রায় চলে এসেচে কেল্লার কাছাকাছি। কালীপদ কপালের রগটা চেপে ধরে শুষ্ক স্বরে বহুক্ষণ পর কথা কইলো, “এই প্রথম বোধহয় হেরেই গেলাম ডাক্তার। তোমাদের মৃত্যুটা আমাকে আলাদা করে দেখতে হবেনা, এই যা সুখের কথা। এতদিন ধরে এত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে হেঁয়ালির সবকয়টি ধাপই পার করলাম আমরা, কিন্তু শেষরক্ষা হল না। বুড়ো ঋষির রহস্য আর উদ্ধার হল না এইজন্মে।”

আমরা কেউ কোনো কথা কইলাম না। কানাই মৃত্যু সম্পর্কে ততো চিন্তিত নয়। সে একটু চিন্তিত হয়ে সন্দেহের ভঙ্গিতে শুধালো, “ওই বুড়োর মুর্তিটা কি ঋষির ছিল নাকি কর্তাবাবা?”

“তাই তো মনে হয় রে।”

কানাই তবু বলল, “কী জানি? সাধু ঋষিরা হলেন শুদ্ধ মানুষ। তাদের কখনো জুতা পায়ে দিয়ে ধ্যানে বসতে দেখিনি, শুনিনি…

কালীপদ কপাল থেকে হাত সরিয়ে ধরা গলায় কইলো, “জুতা? জুতা আবার কোথা পেলি?”

“কেন, ওই বুড়ার পায়ে? দেখেননি? তার দুই পায়ে তো জুতার মতো কিছু একটা ছিল দেখলুম যেন?”

কালীপদ হতবাক হয়ে খুব দ্রুতগতিতে কী যেন চিন্তা করে হঠাৎ ভীষণ উত্তেজিত হয়ে চীৎকার করে উঠল, “আরও জোরে চালাও বাছা। আরও জোরে হাঁকাও। বাতাসের পরোয়া করো না। আমি বুড়া ঋষিকে চিনতে পেরেচি! তুই জুতাটা না দেখলে কী যে হতো রে কানাই।”

আমরা ঝড়ের মতো মন্দিরের সিঁড়ি ধরে উঠে এলাম চাতালটায়, আর উঠেই দূরের দিকে তাকিয়ে বুকটা কেঁপে উঠল! ব্রহ্মশিরের ভয়ঙ্কর গতি যেন আরও অনেক বৃদ্ধি পেয়েচে। সে পলকে পলকে বেড়ে চলেচে হুহু করে। নীচের পথচারী আর হাটুরেরাও সেটাকে দেখতে পেয়ে ভয়ে চেঁচামেচি আরম্ভ করে দিয়েচে। কিন্তু তার চেয়েও ভয়ঙ্কর দৃশ্য অপেক্ষা করচিলো আমাদের বাঁ দিকে।

গঙ্গার বক্ষের অতিকায় চড়াটাতে বড় বড় গাছপালা ছাড়িয়ে একটা ভয়ঙ্কর কৃষ্ণবর্ণ অবয়ব যেন উঠে দাঁড়িয়েচে। এই মসীকৃষ্ণ আমানিশিতেও তার আরও ঘোর কুচকুচে রাক্ষুসে চেহারাটা ঠাহর হচ্চে আবছা! তার মাথার কাছে জ্বলজ্বল করচে একটা মণির মতো সাদা আলোর বিন্দু। রিদয় অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “অশ্বত্থামা। অবিশ্বাস্য! এই সেই ঋষিকুন্ডের দানব? পুরাণ কি তবে কাল্পনিক নয় ঠাকুর?”

সেই প্রকাণ্ড বিভীষিকা নিজের ঝাপসা শরীর নিয়ে আকাশের দিকে দুই হাত তুললো। গাঁয়ের লোকেরা ভন্ড নয়, তারা কেউ মিছে কথা বলেনি। এই রাক্ষুসে শয়তান হাজার হাজার বৎসরের ফাঁদের থেকে অযাচিত মুক্তি পেয়ে নিজের মণি ফিরে পেয়েচে। আজ চতুর চূড়ামণি বাসুদেব থাকলে তাকে ফাঁদে ফেলার মতো সহস্র উপায় এক লহমায় সৃজন করতেন হয়তো, কিন্তু আমাদের ভরসা শুধুই সহস্র সহস্র বছর আগে তাঁরই রেখে যাওয়া একটা হেঁয়ালি মাত্র।

কালীপদ একতিল সময় নষ্ট না করে ভিতরে এল আমাদের নিয়ে। আমার এবং দারোগা সাহেবের টর্চবাতির আলোয় বিরাট গর্ভের অন্ধকার কিছুটা দূর হয়েচে। আমার বাতি সোজা গিয়ে পড়ল ধ্যানস্থ ঋষিমুর্তির পায়ের পাতায়। তার দুটো বেরিয়ে থাকা পায়ের পাতায় সত্য সত্যই খড়ম রয়েচে! এটাই ভারী বিসদৃশ! খড়ম পায়ে পরে কেউ ধ্যানমগ্ন হয় না কখনো। কালীপদ একটু শ্বাস নিয়ে নীচু স্বরে বলল, “এই ঋষিই পৃথিবীর প্রথম জুতার আবিষ্কারক। ইনি মনসার স্বামী জরৎকারু ঋষি। একবার ইনি তীর ধনুকের খেলার ছলে মগ্ন ছিলেন। যতবার ইনি বাণ নিক্ষেপ করেন, ততোবারই মনসাকে গিয়ে স্বামীর বাণ কুড়িয়ে আনতে হয়। এইরকম চলার পরে পথের তাপে মনসার গতি স্লথ হয়ে পড়ায় ঋষির চেতনা হয়। তিনি অনেক ভেবে তালপত্রের পাটি দিয়ে প্রথম পাদুকা তৈরী করে স্ত্রীকে উপহার দেন। আর সবচেয়ে মজার কথা কী জানো? পৃথিবীতে এই একমাত্র নারীপুরুষ, যাঁদের দুইজনের নামই এক। মনসার ভালো নামও জরৎকারু। ভালো করে তন্নতন্ন করে খোঁজো তোমরা। এই মন্দিরে কোনো এক জায়গায় দেবী মনসার মুর্তিও লুকিয়ে আছে। থাকতেই হবে। নাহলে হেঁয়ালি মিলবে না।”

আমাদের উদ্দীপনা আসন্ন মরণের মুখে এসে শতগুণ বেড়ে গিয়েচে। আমরা বাতির মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভিতর বাইর মরীয়া হয়ে খুঁজছি, হঠাৎ চারদিকের গাছপালা কেমন যেন আবছা রোদের মতো আলো হয়ে এল। আমি আকাশের দিকে মুখ তুলে পাষাণবৎ হয়ে গেলাম! রক্তবর্ণ বিন্দুটা আর বিন্দু নেই, সে চাঁদের মতো বড় হয়ে ধেয়ে আসচে! চারদিকের গাছপালাগুলো পাগলের মতো নুইয়ে পড়চে তীব্র ঝড়ে। হঠাৎ দূরে ঝপাস করে শব্দ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম! দানবাকৃতির ছায়ামুর্তিটা গঙ্গার জলে একটামাত্র পা ফেলে এইপারে উঠে এসে দাঁড়িয়েচে! লোকজন আর্ত চীৎকার করে ছুটোছুটি করচে প্রাণভয়ে। আমি কানাইয়ের ঠেলায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ঝড়ের আঘাত থেকে রক্ষা পেতে দৌড়ে মন্দিরের ভিতরে ঢুকতে গিয়েই থেমে গেলাম।

আমার হাতের টর্চবাতির সরলরৈখিক আলো আমার অজান্তেই গিয়ে পড়েচে দোরের বাইরের দিকের খোদাই করা সেই চোখ চুরি হয়ে একচক্ষু হয়ে পড়া নারীমুর্তির মুখে। কালীপদ আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে কাছে এসেই অস্ফুটে কী যেন একটা বলে উঠল। আমি বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমরা যাকে চোখ চুরি হয়ে যাওয়া দেবীমূর্তি ভেবেচি, তাঁর চোখ কখোনোই চুরি যায়নি। তাঁর একটি চোখই নাই। এই সেই দেবী মনসার অলক্ষ্য প্রতিমা। রিদয় একবার পিছনের দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে উচ্ছ্বাসে বলে উঠল, “একনজরেই বিদ্ধ ঋষি কথাটা যে কোনো একচক্ষু ঋষিপত্নীর ইঙ্গিত হতে পারে তা আমিও কখনো ভাবিনি ডাক্তারবাবু।” তার কথা শেষ না হতেই কালীপদ এসে দাঁড়ালো মূর্তির একেবারে সামনে। উপরের সেই উদগ্র আগুন পৃথিবীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেচে আর কয়েক মুহূর্ত মধ্যে। কালীপদ সেই শূন্য চোখের গর্তে ধাতুর শলাকারূপী চাবিকাঠিটা ছুঁয়ে আমাদের ভিতরে ঢুকতে ইশারা করল। আমরা প্রবিষ্ট হওয়ামাত্র কালীপদ শলাকাটা চোখের ভিতরে আমূল প্রবেশ করিয়ে দিতেই একটা কানফাটানো ঘড়াং শব্দের সঙ্গে হতবুদ্ধির মতো দেখলাম কামদেবের ধনুর্ধর মূর্তির সহস্র বৎসর প্রাচীন পাথুরে বাণটা কোন অজানা অক্ষয় কলকব্জার টানে বিদ্যুতের বেগে ছুটে গিয়ে লাগল ঋষি জরৎকারুর বুকের পদ্মফুলে। ঋষি কামের শরাঘাতে বিদ্ধ হওয়ামাত্র পদ্মফুলটা যেন চোখের নিমিষে তাঁর বুকের ভিতরে সেঁধিয়ে গেল আর তারপর… গোটা মন্দিরটা ভীষণ একটা আঘাতে যেন থরথরিয়ে কেঁপে উঠল!

আমরা উঠে দাঁড়িয়ে থাকতে পারচি নে এই ভয়ঙ্কর কম্পমান মন্দিরে। কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে এসেই দেখি কালীপদও ছিটকে পড়েচে চাতালে। আমরা প্রায় গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে এলাম মাটিতে। মন্দিরটা যেন ফেটে পড়ার উপক্রম করচে দেখে আমরা পড়িমরি ছুটতে শুরু করলাম পথ ধরে, আর এক পলকেই একটা ভয়ঙ্কর বিষ্ফোরণের সঙ্গে আমরা আবার ছিটকে পড়লাম পথে। আকাশ থেকে সেই মহা মারণাস্ত্র ব্রহ্মশির আগুনের গোলার রূপ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেচে মাটির বুকে, হঠাৎ মন্দিরের চূড়ার চারখানা পাথুরে কলস সশব্দে ফেটে গিয়ে বেরিয়ে পড়ল চারখানা চোখধাঁধানো আগুনের ফলা! কালীপদ কেঁদে ফেলে চীৎকার করে উঠল, “জয় বাসুদেব, জয় দেবকীনন্দন। দেখো ডাক্তার দেখো… অশ্বত্থামার থেকে কেড়ে নেওয়া ব্রহ্মশিরকে কী ভয়ানক চতুরতার সঙ্গে লুকিয়ে রেখেচিলেন তিনি। ব্রহ্মশিরের নিরসনের উপায় একমাত্র আরেকটি পালটি ব্রহ্মশির…”

দানবীয় অপচ্ছায়াটা হঠাৎ মুখ ঘোরালো আমাদের দিকেই! তার দুই চোখ থেকে দুটো আগুনের শিখা বেরিয়ে আসচে যেন। সে বিরাট বিরাট দুটো পা ফেলে মন্দিরের বাইরের চাতালে এসে পড়ল, আর চোখের পলকে একটু কুঁজো হয়ে নিজের কর্কটের ন্যায় প্রকাণ্ড বলিষ্ঠ হাত বাড়িয়ে আমাদের করতলগত করার অভিপ্রায়ে এগিয়ে এল। আমার পা পাথরের মতো নির্জীব, অনড় হয়ে পড়েচে ভীষণ আতঙ্কে। এমন ভয়ঙ্কর আকার এবং স্বভাবের মানুষের কথা আমি কখনো শুনিনি। নাকি অমরত্বের ছলে অভিশাপ পেয়েই তার অবয়বের বিকৃতি ঘটেচে? উত্তর আমার অজানা, কিন্তু সে যে তার পরম শত্রু দ্বারকারাজের প্রতিভূ হিসেবে আমাদের নিশ্চিহ্ন করতেই এগিয়ে এসেচে, তাতে সন্দেহ নাই একটুও!

হঠাৎ আমাদের ভাবনা চিন্তা লুপ্ত করে দিয়ে জরাজীর্ণ মন্দিরটা ভীষণ শব্দে ফেটে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল আর চূড়ার সেই চারখানা কলস জ্বলে উঠল। তার মধ্যস্থল থেকে একটা চোখ অন্ধ করে দেওয়া নীলচে আগুনের শিখা ছুটে গিয়ে পড়ল অশ্বত্থামার মাথার মণিটার উপরে। সেই সঙ্গে আরও দুখানি ক্ষীণকায় উপশিখা লোলুপ জিহ্বার মতো ছুটে গিয়ে পড়ল উলটো দিকের পথের উপরে। কার উপরে তা আঘাত করল কে জানে! পলকের মধ্যে আকাশ থেকে নেমে আসা প্রকাণ্ড অগ্নিপিন্ডটা যেন খামখেয়ালী বালকের এক ফুঁয়ে প্রদীপ নিভে যাবার মতো এক পলকে নিভে গেল। এতক্ষণের জ্বলতে থাকা আগুনে আকাশ এক লহমায় ঘুটঘুটে আঁধারে ডুবে গেল, আর ছায়ামুর্তিটা কান বধির করা আর্তনাদ করে সেই হাজার হাজার বছর ধরে ওৎ পেতে থাকা কালায়ুধের ছোবলে ছিটকে গিয়ে পড়ল গঙ্গার মাঝে। জলতল থেকে কুড়ি হাত ঢেউ ছিটকে এসে ডুবিয়ে দিল কেল্লার পথঘাট। ঝড়টা থেমে গেল এক পলকে। এতক্ষণ ঝড়ের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে যুঝে চলা আমরা ঝড় থামার সঙ্গে সঙ্গে ভারসাম্য হারিয়ে আছড়ে পড়লাম পথে। কালীপদ এতক্ষণের মানসিক চাপের শেষে নিঃসাড়ে চেতনা হারালো।

কিছুটা সময় অতিবাহিত হয়েচে। লোকজন এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে আকস্মিক মুক্তি পেয়ে প্রাণভয়ে ছুটে চলেচে গৃহের আশ্রয়ে। কালীপদ চেতনা লাভ করে উঠে বসলো। দারোগার মোটর গাড়ির হদিশ পাওয়া গেল না। আমরা ধীরে ধীরে হেঁটে ঋষিকুন্ডের পথে ফিরচি, হঠাৎ কানাই নিজের সড়কি দিয়ে দুইটা অচেতন কাপালিকের মতো দেখতে মানুষকে খুঁচিয়ে পরীক্ষা করচে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

ইন্দ্র সভয়ে কইলো, “সর্বনাশ! এরাই বুঝি সেই শয়তানদুটো, যারা বাচ্চাগুলোকে দিনের পর দিন ধরে মায়ের কোল থেকে কোনো যাদুবলে কেড়ে নিয়ে যেতো। এরা যে এখনো জীবিত!”

আমি ঘাড় তুলে দেখলাম, এই দুই শয়তানের ঠিক মাথার উপরে একখানা টেলিগ্রাফের শক্তপোক্ত ধাতব খুঁটি যেন সেই দুই উপশিখার বিষম আঘাতে দ্রবীভূত হয়ে গিয়েচে অর্ধেকটা। এই কারণেই তবে এদের জীবননাশ হয়নি পুরোপুরি! এরা কারা? কোন পৃথিবীর মানুষ? এত সুদীর্ঘ আকার, এমন বলিষ্ঠ গড়ন তো এ যুগের কারুর নয়! একজন কাপালিক হাতে ভর দিয়ে উঠে বসতেই কালীপদ তার বুকে নিজের কঠিন পদাঘাত করে আবার চিতিয়ে ফেলে দিয়ে আমাদের বলল, “আমরা এগিয়ে যাই পথ ধরে। কানাই একটু পরে আসচে।”

আমার মনে একটা সন্দেহ উপস্থিত হল। কিছুদূর এগোতেই পরপর দুটো অর্ধোচ্চারিত মরণ চীৎকার শুনে সন্দেহ দূর হল। কানাই কিছুক্ষণের মধ্যেই তার স্বভাবসুলভ হাসিমুখে সড়কির ফলাটা ভাঁজ করতে করতে আমাদের সঙ্গে এসে মিললো। আরেকটু এগিয়েচি, এমন সময়ে উদ্বিগ্ন মুখে ঘোষবাড়ির গাড়োয়ানকে গোরুর গাড়ি নিয়ে আসতে দেখে স্বস্তি পেলাম। গাড়োয়ান আমাদের দেখে পরম নিশ্চিন্ত হয়ে বললে, “বড়কর্তা পাঠিয়ে দিল আপনাদের আনতে। যা ঝড়খানা গেল চোখের নিমিষে, বাপ রে!” আমরা গো যানে উঠে বসলাম। দারোগার মুখ মোটরগাড়ি হারিয়ে থমথমে। হঠাৎ রাগের স্বরে সে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, ওই শয়তান শিশুহত্যাকারীটা কি মরে গেল? মরে গেলে বহুৎ আচ্ছা, নাহলে আমি তাকে…” তার দাঁতে দাঁত পেষার শব্দে বাকিটা বুঝতে অসুবিধা হল না। কালীপদ আত্মগত সুরে বললে, “বাসুদেব যে দুখানি বিপর্যয়ের আশঙ্কা করে এত চতুরতার সঙ্গে হেঁয়ালি রচনা করে গিয়েচিলেন, সেগুলির প্রশমন হয়েচে, কিন্তু অশ্বত্থামা অমর দারোগা সাহেব, তার মরণ নাই। কিন্তু সে কখন, কোন রূপে ভবিষ্যত প্রজন্মকে দেখা দেবে, তা আমার জানা নেই। হয়তো সে গঙ্গার অতলেই সহস্র বৎসর ধরে অচৈতন্য হয়ে থাকবে। কবে, কখন তার ঘুম ভাঙ্গবে তা আমি বলতে পারি না। পারলে হয়তো আমিও সঙ্কেত রেখে যেতাম।”

রিদয় সে কথা ধামাচাপা দিয়ে বলল, “সহস্র বৎসর দূরের কথা আমাদের এখন ভেবে লাভ নেই ঠাকুর। আমাদের এবং প্রজাদের কাছে এখন এটুকু জানাই ভালো যে, এই মহাযুদ্ধে অশ্বত্থামা হত।”

কালীপদ ক্লিষ্ট এবং খুব চাপা স্বরে কইলো, “ইতি গজ…”