কালীগুণীন এবং বাঘামুড়ার আতঙ্ক
(পর্ব-১)
সুন্দরবন… কতশত কবির কল্পনা ডালপালা মেলেচে যুগে যুগে এই অদ্ভুত, রহস্যময় ভূখণ্ডকে নিয়ে। কত লেখক, কত ভাবুক, দার্শনিক, ভ্রমকরা ছুটে ছুটে এসেচে এই ভয়াল অথচ লীলাময়ী বনাকীর্ণ বাদাভূমিকে জানতে, চিনতে তাঁরা কেউই নিরাশ হননি। সুন্দরবন তাঁদের বিলক্ষণ ধরা দিয়েচে। কিন্তু আসলে তা প্রজাপতি দর্শনের ন্যায় কুহকের মতো। এই রংবেরঙের প্রাণী প্রজাপতিকে দর্শনমাত্রেই আমরা মোহিত হই, তুষ্ট হই, কিন্তু তার জগৎমোহন রূপে রূপান্তরিত হবার পূর্ব্বেকার কদাকার ও ভয়ংকর রূপের কথা মনেই পড়ে না। ঠিক তেমনিভাবেই এই আদিম মহাবন নিজের সৌন্দর্য আর মধুটুকুই বহিরাগতদের তুলে দিয়ে তাঁদের সন্তুষ্টচিত্তে বিদেয় করে। জঙ্গলের অভ্যন্তরীণ ভয়ংকর মৃত্যুময় ভূমির কথা জানতে দেয় না। প্রতিটি দিনে ঘটে-চলা কুহকময়, ইন্দ্রিয়াতীত রহস্য, যা কিনা সভ্যসমাজে কল্পনাটুকুও অবধি করা যায় না, তাকে নিজের বুকে সযত্নে লালিত করে, লুকিয়ে রেখে উদয়।
প্রাণঘাতী ডাঁশ, বিষধর সর্প, কর্মঠ, কুমির আর ভয়ংকর সুন্দর ডোরাকাটাদের কথা প্রতিটি মানুষমাত্রেই জানেন। শুধু যেটা জানা যায় না তা হল এর বাইরের কিছু হাড়-কাঁপানো গোপন ‘ভয়ের’ কথা, যে আতঙ্ককে জানে কেবল ওই মহাবনে বসবাসকারী মধুমৌলি, মোমাচিতি, কাঠুরিয়া আর জেলেদের পরিবাররা।
মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য হিসেবে দেখে আসা এই অসীম সাহসী শক্তিশালী মানুষগুলো, যারা কিনা কেউটে, বাঘ অথবা কোনও প্রাণীকেই মোটেই ডরায় না, তারা অবধি যে জিনিসটির আভাস পাওয়ামাত্র ঘরের দুয়ারে আগল তুলে দিয়ে আতঙ্কে কাঁপতে থাকে, তার নাম ‘বাঘামুড়া’। বলাই বাহুল্য, এটি কোনও দেহধারী প্রাণী নয়, বরং বাঘের দাঁতের নীচে অপঘাতে জীবন-হারানো এক অতি ভয়াবহ, হিংস্র, কুটিল অপচ্ছায়া।
সাধারণত আমরা ভূতযোনি, প্রেতযোনি বলতে বুঝি এমন এক অতিপ্রাকৃত সত্তার কথা, যে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে জীবিত প্রাণীদের ছলেবলে প্রাণনাশ করে। এই ব্যাপারে আবছা আভাসও কারও কারও হয়তো একটু-আধটু জানা রয়েচে, কিন্তু তা না-জানারই শামিল। তোমরা প্রত্যেকেই জানো যে, সোঁদরবনের জঙ্গলে যারা বাঘের হাতে মরে, তারা প্রেতাত্মা হয়ে মানুষকে পথ ভুলিয়ে বাঘের মুখে নিয়ে গিয়ে ফ্যালে। কিন্তু এই বাঘামুড়া যে আসলে ঠিক কতখানি ভয়ংকর বস্তু, আর কতখানি তার হিংস্রতা, সেই কথাই আজ তোমাদের বলতে চলেচি।
সাবধানে মন দিয়ে শোনো।
সোঁদরবনের আদি বনের বুক বিদীর্ণ করে যে সকল ছড়ানো-ছিটোনো গাঁ রয়েচে, সেগুলির কোনওটিরই পরিসর তেমন বড়ো নয়। এক-একটা গাঁয়ে আন্দাজি বিশ-বাইশ ঘর আবাদি। কোনওটা মধুমৌলিদের গাঁ, কোনওটা বা মোম সংগ্রহকারী মোমাচিতিদের আবাদ, একটা ধরো শুধুই জেলেপাড়া, এইরকম আর কী। তা এখন যেখানটা তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছ, সেইটে হল বেনাচিতিগঞ্জ। একত্রে সাত-সাতটি গ্রাম মিলিয়ে তৈরি হয়েচে বেনাচিতি নামের এই বড়ো মাপের গঞ্জ। হোগলামারি, মধুভাটি, বোলতা, হিজলপোঁতা, বিবিধান, বিধবাপল্লি আর কাঁকড়াঝোরা—এই সাতটি মাঝারি দ্বীপ। একটি থেকে অন্যটিতে যেতে হলে বাঁশের সাঁকো, ডোঙা অথবা নৌকাযোগে যেতে হয়।
বেনাচিতির গ্রাম সর্দ্দারের নাম লখাই দিণ্ডা। বাড়ি বোলতা দ্বীপে। জাতে ডোঙারি, অর্থাৎ নৌকা তৈরি করা আর বেচা যাঁদের জাতব্যাবসা। এই লখাই সর্দ্দারের বাড়িতে আমি আতিথ্য গ্রহণ করেচিলাম, যখন আমাদের আপিস থেকে সরকারি নলকূপ বসাবার কাজ হচ্চিল। সাঁঝের বেলায় লখাইয়ের উঠোনে বসে মুড়ি-বেগুনি খেতে খেতে দেখলুম, একটা খোড়ো-চালের মন্দিরে গাঁয়ের বউ-মেয়েরা কোনও একটি ঠাকুরের আরতি করচে। আগ্রহবশে এগিয়ে গিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখলুম আমার চেনাপরিচিত কোনও ঠাকুর-দেবতা নন। হয়তো কোনও স্থানীয় দেবতা হবেন, যা কিনা সুন্দরবন অঞ্চলে শয়ে শয়ে হামেশাই দেখা যায়।
মন্দিরের ভিতরে রয়েচে চুনাপাথরে নির্মিত এক বৃদ্ধের মূর্তি। লম্বা গড়ন। পরনে শ্বেতশুভ্র পোশাক। স্মিতহাস্যে সে চেয়ে রয়েচে সবার দিকে। তাঁর দুই পা নতজানু হয়ে জোড়হস্তে বসে রয়েচেন এক ডাকাবুকো পুরুষ, মাথায় মুসলমানি টুপি, আর এক শীর্ণকায় বয়স্থ নামাবলি পরিহিত ব্রাহ্মণ।
বিশেষ কিছু অদ্ভুত দৃশ্য না হলেও আমার একটু চমক লেগেচিল বইকি। রাত্তিরে শয়ন করার সময়ে তামুক সেবা করতে করতে আমি লখাইকে শুধোলুম, “আচ্ছা সর্দ্দার, তোমার দেউড়ির বাইরপানে যে একখানা মন্দিরমতো দেখলুম, ওখানা কোন ঠাকুরের বিগ্রহ?”
লখাই উত্তর দিলে, “আজ্ঞা কত্তা, ওখানা বলা হয় কালী মন্দির।”
“বলো কী হে!” খুব একচোট হেসে নিলুম। “ওই নাকি মা কালীর মন্দির? তবে কালী মায়ের বিগ্রহ কোথা?”
লখাই ক্ষুণ্ণ হয়ে জবাব দিল, “আজ্ঞা কত্তা, ওখানা যে কালী মায়ের মূর্তি, সে কথা তো একবারের তরেও কইনি। আমি কয়েচি? মন্দিরকে আমরা অনেক পুরুষ ধরেই কালী মন্দির কয়ে আসছি, আর মন্দিরের ওই বিগ্রহও বহু যুগ ধরে পূজা পেয়ে আসচে। বহুকাল থেকেই এই নামে ডাকা হয়ে আসচে। কারণটা আমি কইতে পারিনে, তবে ছেলেকালে আমি অনেকবার একটা গল্প শুনেচিলাম। এখনও গায়ে কাঁটা দেয় সে গল্প মনে পড়লে!”
মেঘ না চাইতেই জল। এমনিতেই অচেনা জায়গায় এই সাত তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেও ঘুম আসত না। তার মধ্যে আবার গল্পের গন্ধ পেয়ে যারপরনাই উৎসুক হয়ে লখাইকে কইলাম, “বলো বলো সৰ্দ্দার, আমিও শুনতে চাই সেই ঘটনা। বিষয়বস্তু তেমন সরেস বুঝলে কলকেতায় ফিরে সে গল্প ছাপা বইতে ছাপব’খন। তোমার নামও রইবে তাতে বিলক্ষণ।”
লখাই একটু ইতস্তত করচে লক্ষ করে হেসে কইলাম, “কোনও অসুবিধা নেই, তুমি আমার সামনেই ওটা খেতে পারো।”
লখাই আশ্বস্ত হয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে, কেরোসিনের টেমির আগুনটা সামান্য উসকে দিয়ে মৃদুকণ্ঠে বলতে শুরু করল আর আমি হাঁ করে, বিস্মিত হয়ে শুনতে থাকলাম সেই ভয়ংকর অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা-
লখাইয়ের যে বাড়িটায় আমরা এখন বসে রয়েছি, আজ থেকে অনেক বৎসর পূর্ব্বে এ বাড়ির কর্তা ছিলেন দশরথ দিণ্ডা, লখাইয়ের পিতা। এক হিসেবে তিনিই গোড়াপত্তন করেন এই গঞ্জের। যা-ই হোক, সেইকালে এই এলাকার অভিভাবকই বলো, সর্দ্দারই বলো আর দণ্ডমুণ্ডের কর্তাই বলো, সব চিলেন এই দশরথ সদ্দার।
তা, সেই সময়ে হঠাৎ করে এই পরগনায় ডাকাতের উপদ্রব গেল খুব বেড়ে। নেহাতই পাবড়া-লাঠি ছুড়ে মানুষ মারাই নয়, বরং বড়ো বড়ো নৌকা অবধি লুঠপাট হতে আরম্ভ করল। ইংরেজ বাহাদুরের কর্মচারীরা বার তিনেক চোখ রাঙিয়ে যাবার পরে গাঁয়ের লোকেরা একজোট হয়ে দল তৈরি করে নজর রাখতে শুরু করল, কিন্তু বহুদিন যাবৎ কোনও সুরতসন্ধান পাওয়া গেল না। অবশেষে দৈবই উপায় করলেন।
একদিন কেমন করে যেন আগুন লেগে গেল নীলাম্বর মাঝির বাড়িতে। সে সময় গৃহকর্তা শহরে কী যেন কাজে গিয়েচিলেন। পাড়াপড়শিরা পেতলের ঘড়া ঘড়া জল ঢেলে সে ভয়ানক অনলচক্র নিবিয়ে আনল এবং পুড়ে ভেঙে পড়া কেরোসিন কাঠের দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল, ঘরের ভিতরে মাটির তাকে রাখা রয়েচে তিন-চারখানি পুঁটুলি। সেগুলির দগ্ধ ছিদ্র হতে কী যেন চকচক করচে। লোকজন দুয়ার ভেঙে ঢুকে সেগুলি নেড়েচেড়ে দেখল, ভিতরে রয়েচে চকচকে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের ছাপ মারা মোহর, কিছু পোড়া নম্বরি নোট, আর অসংখ্য সোনা-রুপোর গহনা।
সেগুলি এনে ফেলা হল দশরথের সদরে। সব শুনে দশরথ সর্দ্দার চোয়াল কঠিন করে কইলেন, “তার মানে, ইংরেজ বাহাদুর ব্যাপারটা আগেই আঁচ করেচিলেন যে, এই লুঠেরাদের একটি আমাদের গাঁয়েই রয়েচে। এখন যদি আমরা এই গহনাপত্র ম্যাজেস্টারি কুঠিতে জমা করতে যাই, তবে এ গাঁগুলিতে পুলিশের আনাগোনা আর অত্যাচার শুরু হবে। কোথাও কোনও চুরি-ছিনতাই হলেই আমার প্রজাদের হেনস্থা করা হবে। তার চেয়ে এই ডাকাতির পাপের ধন আমরা নষ্ট করে ফেলি গোপনে, আর নীলাম্বর আজ রাত্তিরে বোলতায় ফিরচে। তাকে গাঁ-উখড়ার দণ্ড দেওয়া হবে। তোমরা সজাগ থেকো।
সেই রাত্রেই সর্দ্দার দশরথ, বৃদ্ধ পুরোহিত ফটিক ঠাকুর আর বিবিরথান ঘাটের পাটনি করিমুদ্দিন মিলে একটা সরু ডোঙাতে চেপে সেই পুঁটুলি ভরতি গয়নাগাটি সংগোপনে বিসর্জন দিয়ে এল মাতলা নদীর খরস্রোত প্রবাহের মধ্যে, এবং আরেকটি দল রাত্তির আন্দাজ ন-টা নাগাদ সদরঘাটের থেকে পাকড়াও করে নিয়ে এল ছদ্মবেশী ডাকাত নীলাম্বর মাঝিকে। দশরথ সর্দ্দার ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে সৰ্ব্বসমক্ষে তাকে একশো ঘা বেত্রাঘাত করে গাঁ-উখড়ার দণ্ড জারি করল।
এই গাঁ-উখড়া দণ্ড হল অভিযুক্তদের নির্জন দ্বীপে নির্বাসিত করা। আর কোনওদিন তারা পূর্ব্বের বাসস্থানে প্রত্যাবর্তন করতে পারত না। ঠিক হল, পরদিবসেই নীলাম্বরকে সাগরপারের বাদা-জলার শেষ দ্বীপ লোনাঝাড়ের জঙ্গলে ছেড়ে আসা হবে। তা, সেই নিয়ে নীলাম্বরের বিশেষ ভয় ছিল না। তার ডাকাতির আরও কিছু সম্পত্তি আত্মীয়দের গৃহে গচ্ছিত রয়েচিল। সেসব নিয়ে কলকাতা শহরে বেচলেও বহু অর্থ হাতে আসবে, কিন্তু বিপদ এল অপরদিক থেকে। সেই রাত্তিরেই গাঁয়ের সকলে শুনতে পেল আবছা আবছা বাঘের হিংস্র গর্জন। সাগরপারের দিকে বাঘ বেরিয়েচে। কথায় বলে, সুন্দরবনের ডোরাকাটাদের গর্জনে শক্তিমান পুরুষেরও হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। সেটি নেহাতই কথার কথা নয়। বাস্তবিক যাঁরা এই হিংস্র, বজ্রনাদী ‘আউউউম, আউউউম’ শব্দ নিজের কানে শুনেচেন, তাঁরা জানেন, এ সময়ে বড়ো বড়ো গাছপালাও তিরতির করে কাঁপতে থাকে। এই ডাক শুনে নীলাম্বর প্রমাদ গুনল আর দশরথের পায়ে আছাড় খেয়ে পড়ল।
পরের দিন করিমুদ্দিনের নৌকাতে চেপে নীলাম্বর, গণেশ শবর, ফটিক ঠাকুর, বিশে মাঝি, আর দু-একজন লোক রওয়ানা দিল চর-লোনাঝাড়ের দিকে। বিচারে দোষীর কসুর মাপ হয়নি।
নীলাম্বর কাঁপা-কাঁপা পায়ে চরের মাটিতে নেমে ভয়ে ইতিউতি চাইতে চাইতে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকল। তাকে বাকিরা প্রবোধ দিয়ে বলল যে, সে যেন বিকেল ইস্তক কোনও বড়ো গাছে চড়ে বসে রয় এবং বিকেলের মুখে যখন এইদিক দিয়ে কোনও পাটোয়ারি বা মানোয়ারি নৌকা যাবে, তখন যেন তাতে চেপে দূর গাঁয়ে চলে যায়।
এরা যখন নৌকা চালিয়ে ফিরতে শুরু করেচে, আর নীলাম্বর সহজেই চড়া যায় এমন একটি গাছের সন্ধান চালাচ্চে, ঠিক সেই সময়ই ঘটে গেল অঘটনটা। সাগরের ঢেউ যে ডাঙাটুকুর উপরে আছড়ে পড়ছে, তার সামনের অন্ধকার ঝোপটার থেকে ভেসে এল একটা চাপা গরগর জান্তব শব্দ, আর পরমুহূর্তেই আকাশ বিদীর্ণ করা গর্জন করে নীলাম্বরের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল সুন্দরবনের হ্রাস, একটা বিরাট আকারের ডোরাকাটা বাঘ।
নৌকার আরোহীরা চকিতের মধ্যে দেখল, নীলাম্বর আর বাঘের মধ্যে ঝটাপটি বেধে গিয়েচে। আকুল আর্তনাদ আর আক্রোশ-মাখা হুংকার চলতে চলতেই গণেশ শবর একটা কাজ করে বসল। নৌকার খোলার মধ্যে রাখা নিজের বেত্রদণ্ডের ধনুক আর আগায় লোহার ছুঁচোলো ফলা-বসানো তিরকাঠি বের করে, নাসিকাগ্রভাগ অবধি ছিলা টেনে, পরপর দুইটি তির নিক্ষেপ করল তাদের দিকে। অভ্যস্ত হাতের নিখুঁত নিশানায় ছোড়া একখানি শর বিদ্ধ করল বাঘের কণ্ঠনালি, আর দ্বিতীয় বাণটি গিয়ে বিঁধল তার পাঁজরায়। বাঘ মরণযাতনায় কাতরাতে কাতরাতে গিয়ে সেঁধুল বনের ভিতরে। এরা শীঘ্র শীঘ্র পাড়ে নেমে দেখতে পেল, সেই প্রমাণ আকৃতির ব্যাঘ্র মরে পড়ে রয়েচে একটি হোগলা ঝোপের নিকটে, আর নীলাম্বরের ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত মৃতদেহটা মুণ্ডহীন অবস্থায় নিথর হয়ে গিয়েচে ততক্ষণে।
নৌকার আরোহীরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে স্থির করলে যে, নীলাম্বরের মৃতদেহ তো বটেই, এমনকি বাঘের মৃতদেহও কোনও অপরাপর নৌযাত্রীর নজরে এলে তা নিয়ে হুলস্থুল কাণ্ড পড়ে যাবে। অগত্যা দুই দেহকেই নৌকায় চাপিয়ে অতি সাবধানে নিয়ে আসা হল বেনাচিতির বোলতা গাঁয়ে।
গাঁয়ের লোকেরা অবশ্য ডাকাতের এই মর্মান্তিক পরিণতিতে খুশিই হল। খবরটা সকলেই পেয়েচিলেন। সন্ধ্যায় জঙ্গলের অভ্যন্তরে যখন জোড়া লাশ জ্বালাবার তোড়জোড় চলচে, সে সময়ে বাকি পড়শিদের সঙ্গে উপস্থিত হল গাঁয়ের সর্ব্বাপেক্ষা বয়োবৃদ্ধ দুই প্রজা হরিনাথ আর কেশব। সবাই যখন ইতস্তত হইচই করে চলেচে, সে সময়ে ভিড় এড়িয়ে সুমুখে এসে পৌঁছোল দুই বৃদ্ধ, আর লাশের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, “এ কী সব্বনাশ করেচিস তোরা? এ লাশের মুণ্ডু কোথা?”
গণেশরা বিস্মিত হয়ে উত্তর করলে, “মুণ্ডু তো বাঘেই ছিঁড়ে নিয়েছে, কত্তা। আমরা আর খুঁজে পাইনি।”
“বলিস কী রে হারামজাদা! নীলে মরার কতটুকু সময়ের মধ্যে তোরা বাঘকে মেরেচিস?”
“প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হবে।”
উত্তর শুনে দুই বৃদ্ধই মাথায় হাত দিয়ে ভূমিতে বসে পড়ল।
দশরথ উদবিগ্ন কণ্ঠে বলল, “কেন বাবাঠাকুরেরা? হঠাৎ এ প্রশ্ন?”
“হায় হায় হায়, এ কোন মহা সব্বনাশ উপস্থিত হল, সদ্দার। বাঘে যখন কোনও লাশের মুণ্ডু ছিঁড়ে ফ্যালে, তখন সেই মুণ্ডুহীন মৃতদেহের সামনেই ওই ঘাতক বাঘকে বধ করার ফল কী হয় তা জানো সদার? জানো না? আমরা অনেক কিছু দেখেচি-শুনেচি। আমরা বেশ জানি। হা ঈশ্বর।”
দশরথ শুধু নয়, উপস্থিত প্রত্যেকটি গ্রামবাসীই ব্যাপার বুঝে ভীষণ ভাবে কেঁপে উঠল। তারাও বাপ-ঠাকুরদার নিকট বাঘাড়ার ভয়ংকর গল্প শুনেচে বটে, কিন্তু এতখানি তারা তলিয়ে দেখেনি এত সময়। সন্ধ্যা হতে না হতেই যে যার গৃহে প্রবেশ করে আগল এঁটে দিল। উপর্যুপরি ছয়টি দিন পার হবার পরে যখন মানুষের মনে বেশ কিছুটা সাহস আর ভরসা ফিরে এসেচে, তখনই হঠাৎ সাত দিনের দিন প্রথম নৃশংস হত্যাকাণ্ডটা ঘটে গেল।
করিমুদ্দিন ছিল গাঁয়ের পাটনি, কিন্তু তার বেটা রফিক মৌলিদের সঙ্গে মিলে মধু সংগ্রহ করে বেচত। তা সেদিন রফিক বাকি আট-দশজন মধুমৌলির সঙ্গে গিয়েচিল পিরখোলার জঙ্গলে মৌ খুঁজতে। দলের দলপতি হাতিম সকলকে নিয়ে খাঁড়ির কিনার বরাবর এগুতে থাকল। চোখ তাদের গাছের মাথায় মাথায় মৌচাকের পানে। একটা সরেস খলশে ফুলের চাকের ঘ্রাণ পেলেই কাজে নামবে তারা। সকল ফুলের চাইতে খলসে ফুলের মধুর চাহিদা আর আছাদ দুইই অধিক।
তোমাদের গল্প বলার শুরুতে যে কয়েচিলাম, সোঁদরবনের ছত্রে ছত্রে চাপা রহস্য লুকিয়ে থাকে, তা কিন্তু মিছে কথা নয়। এই বনে অনেক কিছু লক্ষ করে, মেনে চলতে হয়। যেমন ধরো, তুমি বনের পথ দিয়ে পথ চলছ, হঠাৎ বলা নেই-কওয়া নেই, একখানা শুকনো গাছের ডাল তোমার সামনে এসে পড়ল, কিংবা ধরো, পথ চলতে চলতে অকারণেই তোমার মাথাটা একটু চক্কর খেয়ে উঠল—এইসব ক্ষেত্রে তোমরা কিন্তু পথ চলতেই থাকবে, অথচ সোঁদরবনের আদি বাসিন্দারা কিন্তু আর এক-পা-ও এগুবে না।
তা, এই মৌলিদের মধ্যেও একটি সংস্কার রয়েচে যে, কোনও কোনও বাঘের আত্মা নাকি শিকারকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে মানুষের মতো কণ্ঠ করে ইনিয়েবিনিয়ে ডাকতে থাকে। সে ডাকে সাড়া দিলেই সব্বনাশ উপস্থিত হয়। তাই এরা অথবা কাঠুরিয়ারা জঙ্গলে কখনোই নিজেদের মধ্যে কথা কয় না, বরং ‘কু’ দিয়ে ইশারায় কথা বলে।
সারা দিনমান টুকিটাকি মধু আহরণ করার পরে সূর্যদেব যখন সাগরের কিনারায় শয্যা পাতবার আয়োজন করচেন, সে সময়ে দলটা বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করতে লাগল। লবণাক্ত কালো মাটির পাড় দিয়ে হেঁটে আসতে আসতে যখন মোটামুটি নৌকা থেকে আর হাত তিরিশের দূরত্ব বাকি রয়েছে, সেই সময়ে রফিকের কানে এল কিছু মানুষের কোলাহল। সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
এই জলাজংলার মধ্যে এত মানুষ কোলাহল করচে কেন? রফিক কান খাড়া করে বুঝতে পারল, বেশ বড়ো একদল মৌলি ওদিকে কোথাও খলশে মধুর সন্ধান পেয়েচে। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি আর আক্ষেপ করছে যে, সন্ধ্যা নেমে যাবার জন্য অর্ধেক মধুও সংগ্রহ করা গেল না।
রফিকের মনটা আনন্দে নেচে উঠল। খলশে মধু! খুব কম করে ধরলেও এক পালি মধুর মূল্য অন্তত এক-দেড় টাকা! আজ আর মধু নেবার সময় নেই, কিন্তু লুকিয়ে জায়গাটা চিনে আসতে পারলে কাল বাকিদের নিয়ে এসে সবটা লুটে নেওয়া যাবে।
রফিক লোভে পড়ে এক-পা এক পা করে জঙ্গলের ভিতরে এগুতে থাকল। বিশাল বিশাল গাছপালার চূড়ায় তখন অন্ধকার জমাট বাঁধা শুরু হয়েচে। কিছুটা এগিয়ে ঝোপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে তার নজরে এল, কমসে কম বিশ-বাইশজনের একটি দল মাঠে জটলা করে কথা কইচে।
এইদিকে রফিকের দলটি নৌকাতে উঠেই সভয়ে আবিষ্কার করলে যে, গুনতিতে একজন কম পড়েছে। তারা ‘কু’ দেবার নিয়ম ভেঙে রফিকের নাম ধরে চিৎকার করে হাঁকডাক শুরু করল, আর রফিক আন্দাজি যে জায়গায় থাকতে পারে, সেসব দিকে দল বেঁধে খোঁজ শুরু করল।
রফিক তখন নিবিষ্টচিত্তে ঝোপের পরপারে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎই কানে _এল নিজের দলের লোকজনের হাঁকডাক। সে বিরক্ত হয়ে তাদের আওয়াজ করতে মানা করার জন্য দুই পা এগিয়ে যেই বাঁকটার কাছে ঘুরতে যাবে, এমন সময়ে তার কানে এল পাশের হোগলা ঝোপে খসখস শব্দ। গাঁয়ের ছেলে সে। বনেবাদাড়ে মানুষ। জঙ্গলের আঁতিপাঁতি সব শব্দের মানে তার মুখস্থ।
সে পরিষ্কার বুঝলে যে, ওই ঝোপে কোনও বড়ো মাপের জানোয়ার ঘাপটি মেরে রয়েচে। রফিক খুব আস্তে আস্তে পিছু হটতে শুরু করল। উদ্দেশ্য, অপর পক্ষের মধুমৌলিদের কাছাকাছি পৌঁছোনো। হোক তারা বিপক্ষের লোক, কিন্তু এত মানুষের সাড়া পেলে অন্তত কোনও হিংস্র পশু কাছে আসবে না। বেশ কয়েক পা ঝোপের দিকে নজর রেখে পিছিয়ে গিয়ে সে চোখ ফেরাল পিছনের দিকে, আর হতভম্ব হয়ে দেখলে, যে একটুক্ষণ পূর্ব্বেও যেখানে কমসে কম বিশজন মানুষ ছিল, সেই এলাকা এখন ধু ধু শূন্য। একটা জনপ্রাণী নেই।
তবে কি মনের ভুল? অসম্ভব। সে স্বচক্ষে এত সময় যাবৎ এদের চলাফেরা দেখেচে। আবার তাদের ফিরতে হলেও তার সামনে দিয়েই ফিরতে হবে। অপর কোনওরূপ পথ নেই। তবে কোন মায়াবীর মায়াবলে সব শূন্য হয়ে গেল? আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার চোখে পড়ল, দূরের রাস্তা দিয়ে তার দলের মৌলিরা তাকে খুঁজে চলেচে। আনন্দে দিশেহারা হয়ে রফিক চিৎকার করে উঠল, “সদাআআআরর…” হাতিম সর্দ্দার আর তার দলবল চকিতে পিছন ঘুরে দেখল, রফিক প্রাণপণে ছুটে আসচে তাদের দিকে, কিন্তু কয়েক পা এগুতে-না এগুতেই পাশের ঝোপের থেকে লাফিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল এক বিকটাকৃতি ভয়াল মূর্তি। সেই আবছা ধোঁয়াশার মতো মূর্তি আদতে মনুষ্যমূর্তিই বটে, কিন্তু এ কী!
সে মানুষের মতোই সামান্য ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রয়েচে কিন্তু! কিন্তু তার মুণ্ডুর স্থানে বসানো রয়েচে এক ভয়ংকর বাঘের মুখ। এ যে মুখোশ নয় তা আর বলে দিতে হয় না। ঝকঝকে মারণ-দাঁতের পাটি বেয়ে লালা ঝরছে। জন্তুটার হাতের আগায় লম্বা লম্বা বাঁকানো বাঘনখ। পায়ের পাতাও তদ্রূপ। সে বিকট গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রফিকের উপরে।
এ যদি সত্য সত্যই বাঘ অথবা কোনওরূপ জীবিত জন্তু হত, তবে হাতিমের দলবল বিনি লড়াইয়ে পিছু হঠত না। কিন্তু এটা কী? বাঘামুড়া!
হাতিম অস্ফুটস্বরে এইটা উচ্চারণ করামাত্র দলের লোকেরা পাগলের ন্যায় জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে মরিয়া হয়ে হাঁচোড় পাঁচোড় করে এসে উঠল নৌকাতে, আর উন্মাদের মতো নৌকা বেয়ে পালাতে পালাতে তিরের দিকে তাকিয়ে দেখল, রফিকের ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহাবশেষ পড়ে রয়েচে মাটির টিলার উপরে জঙ্গলের অনেক ভিতর থেকে সহসা আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে এক তীক্ষ্ণ হুংকার ভেসে এল-”আউউউউমম্”। সে হুংকার বাতাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে গেল, “রক্ষা নেই। আর রক্ষা নেই।”
গাঁয়ে এ কথা চাউর হওয়ামাত্র ভীষণ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। এই একটি জিনিসকেই এ তল্লাটের লোকেরা সাক্ষাৎ যমের মতো ভয় পায়। করিমুদ্দিন তার জোয়ান পুত্রকে হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে উঠল। রান্না-খাওয়া বন্ধ করে সারাদিন শুধু বুক চাপড়ে আল্লাহ্ এর নাম নিয়ে কেঁদে চলে। গ্রামের লোকজন দ্বিপ্রহরে এসে কিছু কিছু খাবারদাবার দিয়ে যায় বটে, কিন্তু রাত্তির হলে ঘর থেকে আর সচরাচর বেরুতে দেখা যায় না।
সেদিন ফটিক ঠাকুরের বড়োছেলে নারান বিকেলে করিমুদ্দিনের বাড়ি চাট্টিখানি খাবার নিয়ে গিয়ে দেখলে, করিমুদ্দিন গভীর জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে বিলাপ বকচে। নারান নীচু কণ্ঠে ডাকল, “কাকা! করিমকাকা!”
“কে? কে ও? রুকু?”
“কাকা, আমি নারান।”
“নারান এসেছ বাপ? আমার রুকুকে দেখেছ, কোথা গিয়েচে সে? কতই খুঁজে বেড়াচ্চি চৌপরভর, কোথা যে গেল! হা আল্লাহ্!”
নারান কিন্তু রফিককে বড়ো ভালোবাসত। নারান ছোটো থেকেই শাস্ত্র, রামায়ণ, মহাভারতের অন্ধভক্ত। এ সকল ধর্মগ্রন্থ তার কণ্ঠস্থ। সে মাঝেমধ্যেই দুপুরে বা সন্ধ্যায় গাঁয়ের শিশু আর বালকদের কাছে রামায়ণ-মহাভারতের নানান গল্প শোনাত। রফিক মুসলমান হয়েও এসব কাহিনি শুনতে ভীষণ ভালোবাসত। মাঝে মাঝেই সেই দলে এসে বসে থাকত। আজ সেই পুত্রকেই হারানো এই অসহায় পিতার দুর্ভাগ্যে তার চক্ষে অশ্রু ভরে এল। নারান গামছা ভিজিয়ে জলপটি দিয়ে, তাকে দুটি খাবার খাইয়ে, শূন্য অন্নপাত্র নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য বাড়ির বাইরে পা দিয়েই প্রমাদ টের পেলে।
এই তালেগোলে অনেকখানি সময় ব্যয় হয়েছে। সূর্য অস্ত গিয়েচেন। এইবার বাড়ি না গেলেই নয়। সে দাওয়াতে এসে নামল। পিছনে রোগশয্যায় শায়িত করিম অনেক কষ্টে মাথা তুলে চিৎকার করে তাকে বেরুতে নিষেধ করার চেষ্টা করল, কিন্তু সে উচ্চস্বর অবধি নারানের কানে পৌঁছুল না। যে বাতাস করিমের সতর্কবার্তা বহন করে নিয়ে আসচিল, সে সহসা কাউকে দেখে যেন দিক পরিবর্তন করলে। কোনও কুহকের মায়ায় দুইজনার মাঝখানে এক অদৃশ্য প্রাচীর সৃষ্টি হল। একটু ইতস্তত করে ইষ্টনাম স্মরণ করে আঁকাবাঁকা মেটে পথে বাড়ির দিকে পা বাড়াল ফটিক ঠাকুরের ছেলে।
পথের দুই পার্শ্বের সব ক-টি গৃহই নিঝুম। হয়তো এখনই সকলে ঘুমিয়ে পড়েনি, কিন্তু সাড়াশব্দও তেমন একটা নেই। চলতে চলতে একটা সময়ে নারানের হঠাৎই মনে হল, তার পিছনে পিছনে কেউ যেন তাকে লক্ষ করতে করতে এগুচ্চে। ঠিক অকাট্য যুক্তি নয় বটে, তবে কোনও একটা অনুভূতি যেন তাকে সতর্ক করে দিল যে, পিছনে ভীষণ বিপদ দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েই সে বাঁশের সাঁকোটা পার হয়ে বিবির থান গাঁয়ের সীমান্তে চলে এল। এইবার শুরু হচ্চে তার নিজের গাঁ বোলতা। চলতে চলতে মহাদেব দাসের গোহালের পাশ দিয়ে যাবার সময় চমকে গেল নারান। গোয়ালের গোরুবাছুরগুলো হাম্বা হাম্বা করে ভয়ে চ্যাঁচামেচি শুরু করেচে। দড়ি ছিঁড়তে চাইচে। গোরুবাছুরের ডাকে আশৈশব পরিচিত নারান এইবার বুঝতে পারল, গোরুগুলির এই ডাক স্বাভাবিক ডাক নয়। তারা অতি ভয়ানক কোনও একটা কিছুকে দেখেচে বা গন্ধ পেয়েচে বা বুঝতে পেরেছে।
ভয়ে তার সর্ব্বশরীর কাঁটা দিয়ে ঘর্মাক্ত হয়ে উঠল। গা পাষাণের ন্যায় গুরুভার বোধ হল। সে অতি কষ্টে ভয়ে ভয়ে পিছনদিকে ঘাড় ঘোরাল আর প্রচণ্ড ত্রাসে তীব্র একটা চিৎকার করে উঠল।
তার পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েচে ধোঁয়ার মতো এক সাদাটে শরীর। তার গায়ে লটকানো একটি ছেঁড়াখোঁড়া সাদা ফতুয়া। মাথার স্থানে এক ভয়ালদর্শন বাঘের হিংস্র মুখ। সে মুখ নারানের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে ঠোঁট চেটে চলেচে। নারান যখন বুঝতে পারল যে তার আর রক্ষা নেই, তখন তার শিথিল শরীরে পুনরায় বল ফিরে এল। সে ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই অশরীরীর উপরে। বাঘাড়া যদি দেহধারী হত, তবে নারানের মতো সবল ছেলে অন্তত কিছুক্ষণ হলেও লড়াই দিয়ে যেতে পারত, কিন্তু তা হবার নয়। প্রেতাত্মার দেহ বাতাসের মতো ফুঁড়ে সে আছড়ে পড়ল পথের উপরে। মাটি থেকে উঠতে যাবার মুহূর্তে তার ঘাড়ে এক প্রকাণ্ড শক্তিশালী থাবা এসে নখ বিধিয়ে দিল, আর এক টানে ফালাফালা করে ফেলল কোমর অবধি। তীব্র জিঘাংসায় আকাশের দিকে মুখ তুলে গগনবিদারী “আউউউউমম্” জান্তব গর্জন করে বাতাসে মিলিয়ে গেল সেই ঘাতক।
সেই অপয়া হুংকার শুনে প্রায় জনা কুড়ি গ্রামবাসী রাত্তিরেই ঘরে বসে কেঁপে উঠেচিল। ফটিক ঠাকুরের ছেলে না-ফেরায় তখন তখনই সন্ধান করতে চেয়েচিলেন, কিন্তু পড়শিরা তাঁকে নিবৃত্ত করল। কইল, “আপনার ছেলেটি তো নিতান্তই ছেলেমানুষ নয়, ঠাকুর, যে এই বিপদের মধ্যে সাঁঝের পরে একলা পথ চলবে। দেখো গে হয়তো করিম মিয়াঁর বাড়ি রয়েই গিয়েচে দেরি দেখে। সকালে নিজেই আসবে’খন।”
ফটিক ঠাকুর সেই ভরসাতেই প্রবোধ দিয়েচিল মনকে, কিন্তু ওই অপয়া, অশরীরী নিনাদ শোনার পরে তার প্রাণ উড়ে গিয়েচিল। সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই লোকজন নিয়ে রওয়ানা দিয়ে ঠিক দাসবাড়ির পিছনে গিয়ে সকলে একেবারে আঁতকে উঠলে।
গোহালের সুমুখে পড়ে রয়েচে নারানের আধখাওয়া দেহটা। উপরটুকু। ঘাড় হতে কটিদেশ অবধি ফালাফালা। নীচের অংশটি কে যেন পরিতৃপ্তির সঙ্গে বসে বসে খেয়েচে। পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েচে কালকের কয়েকটি এঁটো বাসনকোশন। বৃদ্ধ ফটিক ঠাকুর আচ্ছন্নের মতো একমাত্র সন্তানের দেহের উপরে আছড়ে পড়ে জ্ঞান হারাল।
সেই দিনেই বেনাচিতির ছেলে-বুড়ো সমস্ত প্রজা মিলে আকুল হয়ে হতো দিল সর্দ্দার দশরথের বাড়িতে। দশরথ বিষণ্ণ মুখে কইল, “দ্যাখো বাবা সকল, আমার গঞ্জে এই যা উপদ্রব শুরু হয়েছে, এ হল আমাদের সুন্দরবন দেশের সবচাইতে ভয়ংকর ভয়। আমাদের বাপ-পিতেমো গল্পগাথায়, লোককথায় এই ভয়ের উল্লেখ বারংবার করে গিয়েচেন। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী, তার ব্যাপারে আমিও তোমাদের মতোই অজ্ঞ। কিছুই বুঝতে পারচি না। সদর উকিলের হাটে আমার ভাই বিনোদথাকে। তাকে তোমরা চেনো। আমি এখুনি গোপীগঞ্জের পোস্টাপিসের থেকে তাঁকে টেলিগেরাপের তার পাঠাচ্চি। সে কী বলে, একবার দেখি। কিছু না কিছু উপায় সে নিশ্চয়ই বের করবে। তোমরা ভরসা হারিয়ো না।”
.
(পর্ব-২)
দু-দুটি তরতাজা প্রাণকে হারানোর পরে গোটা গঞ্জে শোক এবং শোকের চাইতেও অধিক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। শুধু রাতের বেলাতেই নয়, দিনের বেলায়ও সুযোগ পেলে হানা দিতে থাকল সেই ওঁত পেতে থাকা ভয়ংকর অপদেবতা। মোতির মা, পলাশ ঠাকুর, হিরু বাঁড়ুজ্জে মরল গাঁয়ের চত্বরেই সন্ধ্যারাত্তিরে। দিনদুপুরে মরতে লাগল পেটের দায়ে জঙ্গলে ঢোকা মোমাচিতি আর মৌলিদের দল। এর মাঝেই একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটল গণেশের পরিবারের সঙ্গে। সেই গণেশ শিকারি, যে বাঘটাকে তিরবিদ্ধ করেচিল। সেই গণেশের সঙ্গে ঘটল একটা বিশ্রী কাণ্ড।
সেই রাত্তিরে গণেশ, তার বউ আর বৃদ্ধা মা উত্তুরের ঘরটায় ঘুমুচ্চিল। রাত আন্দাজ আটটা নাগাদ কীসের জন্য যেন গণেশের ঘুম ভেঙে গেল। প্রথমে ঠিক ঠাহর হয়নি, কিন্তু পরে মনে হল, বাইরের দিক থেকে কীসের যেন একটা চাপা আওয়াজ হচ্চে। হাঁস-মুরগিগুলো যেন ঝটপট করচে। এ গাঁয়ে দশরথ দিল্ডার কড়া অনুশাসনে চোরটোরের বালাই নেই। কোন দূর গ্রহে যেন নীলাম্বর মাঝিটা ডাকাতিচক্রে জড়িয়ে পড়েছিল, না হলে এমন ঘটনা আর ঘটেনি। হঠাৎ মচ করে একটা পাটকাঠি ভাঙার শব্দ এল। গণেশ এইবার সোজা হয়ে বসে হাঁক দিলে, “কে ও? কে রয়েছে বাইরে?”
বাইরে থেকে একটু ইতস্তত গলায় উত্তর এল, “আজ্ঞা, আমি নিলু। দিনু মাস্টারের মেয়ে।”
“দিনুর মেয়ে? কী চাস তুই, মা?”
কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে উত্তর এল, “গণেশকাকা, আমার মায়ের কী যেন অসুখ করেছে। ছটফট করচে পাগলের মতো। বলচে, তোর গণেশকাকাকে একটিবার ডাক মা। যদি গ্রামকে বাঁচাতে চাস, তবে তাকে ডাক। আমার কিছু জানাবার রয়েচে সবাইকে। কাকা, আমার মা বোধহয় আর বাঁচবে না, না?” এই বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল।
“বলিস কী রে নিলু! এই যাই মা, একটু দাঁড়া দিকি। চল দেখি, বউদিদি কী কইতে চাচ্চেন!”
এই বলে গণেশ ঠেলা দিয়ে বউকে ডাকলে, “অ্যাই তরু, ওঠ দিকিনি, আমারে একটু বেরুতে হবে।”
তরঙ্গিণী এ কথায় আঁতকে উঠল, “কও কী গা! বেরুতে হবে মানে? এই বেপদের দিনে কুকুর-মেকুর অব্দি পথেঘাটে বেরুচ্চে না, আর সে নাকি বেরুবেন।”
“বেশি কথা কসনে তো। দিনেদার ছোটোমেয়েটা এসেচে। বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েচে। বউদিদির কী অসুখ করেচে। কী যেন বলে যেতে চায় আমারে।”
“বউদিদি? কার বউ? মাস্টারের?”
“হ্যাঁ, সেই।”
“বলি, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে খোয়াব দেখোনি তো? দিনে মাস্টারের বউ আজ সকালের নৌকাতে তার বাপের বাড়ি চলে গেল না? সেই ছিরামপুর না কোন সে গ্রাম। তবে তোমায় তার অসুখের জন্যে ডাকবে কে?”
তা-ই তো! সত্য কথা! সে তো নিজের কানেই শুনেচে আজ এ কথাটা। তবে, বাইরে তাকে ডাকলে কে? তবে কি…!
গণেশ দরমার দেওয়ালে টাঙানো নিজের ধনুক আর দুটো বাছাই-করা তিরকাঠি তুলে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে জানালার কাচে দাঁড়িয়ে রাগে চিৎকার করে বললে, “বাইরে কে সত্য কথা কও। কে বাইরে?” উত্তর এল তৎক্ষণাৎ।
বাইরে থেকে ভীষণ রাগে একটা বাঘ গরগর করে উঠল, আর দরমার বেড়া সশব্দে ভেঙে দুটো বলিষ্ঠ ডোরাকাটা হাত ঢুকে এসে বাঁকানো নখ বিঁধিয়ে দিল গণেশের পাঁজরায়। এক শক্তিশালী ঝটকায় গণেশের অত বড়ো শরীরটাকে তুলে নিয়ে গেল বাইরে। তিরধনুক পড়ে রইল ছিটকে। কানে এল মানুষের আর্ত চিৎকার আর বাঘের হিংস্র হুংকার। তরঙ্গিণী বেহুঁশ হয়ে ঢলে পড়ল বিছানায়।
গণেশের বৃদ্ধা মা সংবিৎ ফিরে পেয়ে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। কাঁপা কাঁপা দুৰ্ব্বল পায়ে দরমার সেই ফোকর দিয়ে এসে দাঁড়াল উঠোনে। চিৎকার করে ছেলের নাম ধরে কাঁদতে কাঁদতে টলোমলো পায়ে ইতিউতি খুঁজতে লাগল ছেলেকে, “ও বাবা গণেশ… কোথা গেলি বাপ আমার? ফিরে আয় বাবা। ও রাক্ষস, ও শয়তান, তুই আমারে নিয়ে যা। আমারে খা। পায়ে পড়ি তোর, আমার ছেলেটারে মারিসনে। ও গণেশশশশ…।”
সহসা বৃদ্ধার চোখে পড়ল, উঠোনের বাইরের দিকে একটা কসাড় ঝোপের নীচে পড়ে রয়েচে তার ছেলে, আর তার পাশে দাঁড়িয়ে সাদাটেমতো কী একটা ঝাপসা মূর্তি। ছানি পড়ে যাওয়া প্রাচীন চোখে ভালো ঠাহর হয় না, তবে বুড়ি দেখলে, সেই মূর্তি নীচু হয়ে তার ছেলের উপরে ঝুঁকে পড়ল। ছেলের বিপদ বুঝে সঙ্গে সঙ্গে মায়ের শরীরে কোথা থেকে সাহস ভর করল। শক্তিতে কুলোবে না জেনেও তার শুধু ভরসা ছিল যে, যদি কোনওগতিকে তাকে খেয়ে গণেশকে ছেড়ে দেয় ওই অপদেবতা। সে কুয়োর পাড়ে রাখা জাল টাঙানোর বাঁশটা নিয়ে তেড়ে গেল তার দিকে। পায়ের আওয়াজ পেয়ে সেই মূর্তি মুখ ঘুরিয়ে নিজের হাতটা তুলে ধরল বৃদ্ধার দিকে, আর সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধার শরীর অচল হয়ে গেল। কোনও এক অদেখা শক্তি যেন বুড়ির হাত চেপে ধরলে। অশ্রু-ভেজা অসহায় গলায় বুড়ি অস্ফুটভাবে বলে উঠল, “কে তুই শয়তান! কে তুই!”
“ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া।”
কালীপদ নিজের হাত নামাল আর সঙ্গে সঙ্গে বুড়ির অসাড় ভাব কেটে গেল। কালীপদ কইল, “তোমাদের এদিগড়ের দশরথ দিন্ডা বলে কেউ রয়েচে? উকিলের হাটের তার ভাই বিনোদবিহারী আমার পরিচিত। তার অনুরোধেই আমি টেলিগ্রাপ পেয়ে শেষের নৌকা ধরে এসেচি।”
ইতিমধ্যে গণেশেরও জ্ঞান ফিরে এসেচিল। তার গায়ের স্থানে স্থানে রক্ত বেরুচ্চে। সে দুর্ব্বলভাবে কইল, “জানিস মা, আমাকে সেই শয়তান ঘর থেকে টেনে বার করে এই অবধি হিঁচড়ে নিয়ে এসেচিল। সে কী ভয়ংকর চেহারা। যে বাঘখানাকে নিজের হাতে মেরেচি, সেই বাঘের মুণ্ডুখানা বসানো রয়েচে নীলাম্বরের দেহে। আমাকে সাপটে ধরে যখন ঘাড়ে দাঁত বসাতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তের এই ঠাকুরমশায় কোথা থেকে এসেই চেপে ধরল বাঘের কাঁধ। পিছনপানে তাকিয়েই সেই শয়তান একলাফে আমাকে ছিটকে ফেলে পালিয়ে গেল।”
এই বলেই গণেশ নীচু হয়ে কালীপদকে প্রণাম করতে গেল।
“আরে আরে হতভাগা, খবৰ্দ্দার পা ছুঁবিনে। আমি পছন্দ করিনে। আমার একটা উপকার কর। বিনোদের দাদার বাড়িটে একটু চিনিয়ে দে আমায়।”
(পর্ব-৩)
দশরথের গৃহে অবস্থান করে পরপর তিনটি দিন কালীপদ গুণীন গ্রামের আঁতিপাঁতি খুঁটিনাটি খবর সংগ্রহ করে বেড়াল, কিন্তু কোনও কিনারা বেরুল না। চতুর্থ দিন দ্বিপ্রহরে সদারের বৈঠকখানায় বসে ছিল কালীগুণীন। তাকে ঘিরে অসহায়, ভীত প্রজারা। কালীপদ বিষণ্ণ মুখে কইল, “বাবারা, আমি তিন দিন যাবৎ অনেক চেষ্টাচরিত্র করলাম, কিন্তু কোনও উপায় খুঁজে পেলাম না। এই প্রেতাত্মা এক অতি ভয়ানক সত্তা। পুরাকালে জরাসন্ধ নামের এক রাজা ছিলেন। তিনি তাঁর দুই মায়ের গর্ভে দুই খণ্ডে জন্মগ্রহণ করেচিলেন। তাঁর বাপ তাঁকে মৃত ভেবে ফেলে দেন। অবশেষে ‘জরা’ নামের এক রাক্ষসী ওই দুই খণ্ডকে কুহক মন্ত্রে জুড়ে প্রাণ দেন মহারাজ জরাসন্ধকে। এই রাজা পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন ভয়ানক অত্যাচারী আর প্রজাপীড়ক। শেষে ভারত যুদ্ধের সময়ে মহারাজ ভীমসেনের সঙ্গে যুদ্ধ বাধে তাঁর। ভীমসেন যখন কিছুতেই জরাসন্ধকে পরাস্ত করতে পারচেন না, তখন সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ চতুর চূড়ামণি শ্রীকৃষ্ণ একটি তৃণকে মাঝখান থেকে ছিঁড়ে ভীমসেনের প্রতি ইশারা করেন, এবং ইশারা বুঝে ভীম জরাসন্ধকে দুই পা ধরে ছিঁড়ে ফেলেন। মৃত্যু হয় অত্যাচারীর।
“এই বাঘামূড়াও হল এক শয়তান মানব আর হিংস্র ব্যাঘ্রের জোড়কলম। প্রকৃতির অজ্ঞাত, দুর্জয় কোনও এক অপশক্তির বলে জন্ম হয়েছে এই ভয়ংকর শক্তির। এর মুণ্ডু আর দেহকে আলাদা করতে পারলেই একমাত্র এর বিনাশ সম্ভব। তবে জরাসন্ধ ছিলেন মানুষমাত্র। তাই ভীমসেন তাঁকে পরাস্ত করতে পেরেচিলেন। কিন্তু এ? এ হল এক মৃত সত্তা। এক কুটিল প্রেতাত্মা। এর সঙ্গে মানুষ লড়বে কেমন করে? এ যে ধরাছোঁয়ার অতীত। স্পর্শই তো করা যায় না তাকে। তবে?
“আমি না হয় সামনাসামনি থাকলে সাময়িকভাবে মন্তরতন্তর পড়ে একে একটু পিছু হঠাতে পারি, কিন্তু সাত-সাতটা গাঁয়ে আমি একলা মানুষ উপস্থিত রইব কেমন করে বলো?”
গাঁয়ের লোকজন বড়ো আশা নিয়ে এসেচিল। এহেন কথা শুনে তারা নিরাশ হয়ে পড়ল। দশরথ কাতর কণ্ঠে বলল, “তবে কি একে জব্দ করার কোনও উপায়ই নেই, ঠাকুরমশায়? এভাবেই আমার তিল তিল করে গড়া গঞ্জ শ্মশান হয়ে উঠবে? শয়তানের নাশ নেই।”
কালীপদ কইল, “শোনো সর্দ্দার, প্রকৃতির নিয়মে কেউ কক্ষনো অমর হয় না। নাশ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এই বাঘামূড়ার প্রাণভোমরাটি ঠিক কোনখানে, আর কী উপায়ে তাকে পাওয়া যায়, সেটি খুঁজে পাওয়া আবশ্যক। মানুষ হয়ে লড়াই করে প্রেতাত্মার সঙ্গে কক্ষনো এঁটে ওঠা সম্ভব নয়। তুমি তাকে স্পর্শ করতে পারবে না, অথচ সে কুহকবলে তোমাকে আঘাত করতে সক্ষম। যাকে ছোঁয়া যায় না, তাকে মারাও যায় না, সর্দ্দার।”
আরও একটা দিন অতিবাহিত হল। গতকাল রাতের দিকে কাঁকড়াঝোরা গাঁয়ের একটা চাষি বাঘামুড়ার হাতে মারা গিয়েচে। চতুর্থ দিবসে দ্বিপ্রহরে কালী গুনিন, ফটিক ঠাকুর আর দশরথের গৃহের একটি বালক গাঁয়ের পথে হাঁটচিল। ধরা গলায় ফটিক তাঁর মৃত পুত্রের কথা শোনাচ্চিলেন কালীপদকে, “জানেন ঠাকুর, আমার ছেলে নারান আর দশটা ছেলের মতো বখাটে ছিল না। সে নিয়মনিষ্ঠ, সৎ ছিল। দু-বেলা ব্যায়াম করত, আবার শাস্ত্রও পড়ত সে। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত তার কণ্ঠস্থ ছিল বলতে পারেন। গাঁয়ের সব বাচ্চাকাচ্চাকে ও-ই তো শাস্তরের সব গল্প শোনাত। কী রে বিষ্টু, বল সত্যি কিনা?”
বিষ্টু নামের বালকটি দশরথের কোন আত্মীয়ের যেন ছেলে। সে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে কইলে, “সত্য কথা, দাদু। আমাদের সে অনেক গল্প শোনাত।”
একটি সদ্যোমৃত তরতাজা যুবকের প্রসঙ্গে কালীপদর চক্ষে জল এল। চোখ মুছে সে বালককে শুধোল, “তা-ই নাকি দাদা! কী কী গল্প শুনেছ তুমি তাঁর কাছে?”
“অনেক গল্প। একটা, দুটো, একশোটা। জটাই পাখির গল্প, রামের, রাবণের গল্প। রাবণের জানো দাদু, দশটা মাথা? তারপর অর্জুনের কথা, ভীমের কথা, কাল যে জরাসন্ধর কথা কইলে, তার কথা, আরও অনেক গল্প।”
ফটিক ঠাকুর গোগ্রাসে মৃত সন্তানের কথা শুনচিল। কইল, “শুনলেন ঠাকুর, শুনলেন? ছেলে আমার কত বিষয়ে পণ্ডিত! এ ছেলে আমার একদিন ঠিক অনেক বড়ো মানুষ হবে।”
মনের ভুলে এ কথা বলেই হু হু করে কেঁদে উঠল। বাপের এই বুকচেরা কান্না সহ্য করতে না পেরে কালীপদ বালকটিকে নিয়ে হনহন করে চোখ মুছতে মুছতে অগ্রসর হল।
উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে ঘুরতে সে এসে পৌঁছোল বোলতা আর হিজলগাঁয়ের সীমান্তে। একটা বটবৃক্ষের শীতল গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে ঘোলাটে দৃষ্টিতে সে চেয়ে রইল জলের দিকে। মনের মধ্যে তাঁর তোলপাড় চলচে। এই নিষ্ঠুর প্রেতাত্মাকে বিনাশ করতেই হবে। প্রকৃতি কাউকেই অমর হতে দেয় না। তন্ত্রমতেও কোনও প্রাণীকে অমর হিসেবে দেখানো নেই। কেবলমাত্র আরশোলা ভয়ংকর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে অবধি মরে না। কিন্তু সে-ও অমর নয়। এর কোনও না কোনও উপায়, কোনও ত্রুটি নিশ্চিতরূপে রয়েচে। সেটি কী! অধরা, অ-ছোঁয়া একটা প্রেতাত্মাকে কী উপায়ে দেহ ও মুণ্ডু আলাদা করা যেতে পারে?
চিন্তায় ছেদ পড়ল বিষ্টুর আধো-আধো কথায়, “জানো দাদু, আমরা এই খাঁড়িতে ছিপ দিয়ে মাছ ধরি। সে কত্ত মাছ ধরা পড়ে, কী বলব তোমায়।”
এই বিপদের মধ্যেও কালীগুণীনের ঠোঁটে একচিলতে হাসি খেলে গেল। এই নিষ্পাপ শিশু আসন্ন মহাবিপদকে না জেনে ছেলেমানুষি চিন্তাতেই মগ্ন। এই সরলতাকে মলিন করে দিতে তাঁর মন চাইল না। পরগনার সকলের মুখে যেখানে হায় হায় রব, সেখানে এই শিশুর কাছে দুই দণ্ড বসলেও হৃদয়ে শাস্তি মেলে। কালী সস্নেহে তাকে জিজ্ঞেস করলে, “তা-ই দাদুভাই? কী মাছ ধরেছ তোমরা এইখেনে?”
“উহহ্, সে কত মাছ, পুঁটি, খয়ের, চাঁদা, মৌরলা, সব।”
কালী হেসে কইল, “বাব্বা, এত মাছ ধরে ফেলেছ? নিশ্চয়ই তুমি ধরোনি। অন্য কেউ, তা-ই না? মিছে কথা কইছ।”
এইরকম অবিশ্বাস করায় বালক গাল ফুলিয়ে অভিমানে জবাব দিলে, “হ্যাঁ, ছিপ ধরেচিল বোসেদের ছেলেরা, কিন্তু তাতে কী? আসল তো মাছের চার মাখাটাই। সেইটে তো আমিই মেখেচিলুম। তা না হলে মাছ পড়ে?”
কালী বুঝল যে, বিষ্টু বিলক্ষণ চটে গিয়েচে। তাকে ঠান্ডা করার উদ্দেশ্যে মনে মনে হেসে কইল, “ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, তা তো বটেই। মাছের চারটুকুই তো আসল কথা। তা কী দিয়ে বানালে চার?”
বালক এবার উৎসাহ পেয়ে বলল, “পচা মাছ আর ভুসি দিয়ে।”
“এহ্, আবার মিছে কথা। পচা মাছের চারে কি কখনও মাছ ওঠে? কোনওদিনও ওঠে না।”
বিষ্টু অবাক হয়ে কইল, “তুমি দেখচি, কিচ্ছুটি জানো না দাদু। মাছের চারেই তো মাছ ভালো ওঠে। অন্য কিছুতেই ততটা ওঠে না। আমরা তো…”
কালীপদ গাছের শীতল গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে ছিল। শেষ কথাটা শুনে ধনুকের উন্মুক্ত ছিলার ন্যায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
বিষ্টু হঠাৎ তাঁর এই ভাবান্তরে অবাকয়ে কইল, “তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করলে না দাদু?”
কালীগুণীন আনন্দে হাঁপাতে হাঁপাতে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, “করেচি দাদুভাই, আগাপাশতলা বিশ্বাস করেচি। ঠিকই তো। ঠিকই তো। আমার মাথায় আগে কেন আসেনি!” এই বলে বালকের হাত ধরে ব্যস্তসমস্ত হয়ে হাঁটা দিল দশরথের গৃহের উদ্দেশে।
(পর্ব-৪)
মুহূর্তের মধ্যে ঢ্যাঁড়া দিয়ে গোটা গ্রামের প্রজাদের এক করা হল সর্দ্দারের বাড়ির উঠোনে। তাদের উৎসুক চোখের সামনে দাঁড়িয়ে কালীপদ আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল, “শোনো বাবা সকল, আমি এই অপরাজেয় নিষ্ঠুর প্রেতাত্মাকে জব্দ করার একটা পন্থা হয়তো পেলেও পেয়েচি। যদিও তাতে অনেক অনেক অনিশ্চয়তা। বহু অসম্ভাব্যতা। তবুও নিকষ আঁধারে একখানি মিটমিটে প্রদীপও পথ দেখায়।
“আমার একটা কথা একটু জানার আছে। ফটিক ঠাকুরের ছেলে নারান, করিমের পুত্র রফিক, আর বীরেশ্বর পাটনির ছেলে শংকর, যারা কিনা এই শয়তানের হাতে অপঘাতে মারা গিয়েচে, তাদের পরনের এমন কোনও কাপড়চোপড় কি রয়েচে, যেগুলি কোনওভাবেই মৃত্যুর পরে কাচা হয়নি?”
মুহূর্তের মধ্যে তিনদিকে কয়েকজন লোক ছুটে গেল, আর কিয়ৎক্ষণ পরেই তিনটি অপরিষ্কার পোশাক এনে হাজির করল। সেগুলোর দিকে পরিতৃপ্তির দৃষ্টিতে চেয়ে কালী গুনিন কইল, “চমৎকার। এইবারে ফটিক ঠাকুরকে একটা প্রশ্ন করি। বেশ করে ভেবেচিন্তে উত্তর করুন। এর উপরে অনেক কিছু নির্ভর করচে। আপনি যে কইলেন, আপনার ছেলে নারানের রামায়ণ-মহাভারতের সব াটনা একেবারে কণ্ঠস্থ ছিল, সে কথা কি সত্য?”
এইবারে কেবল ফটিকই নয়, গ্রামের সব লোক একবাক্যে হাঁ হাঁ করে সায় দিলে যে এ কথা সত্য।
কালী আশ্বস্ত হয়ে নিশ্বাস ফেলল। তারপর বিষ্টুকে ডেকে কইল, “হ্যাঁ রে বিষ্ণু, আমাকে একখানা বেশ বড়ো মাপের লম্বামতো গাছের পাতা এনে দিতে পারবি দাদা? যে-কোনও গাছের পাতা, তবে নলখাগড়ার হলেই ভালো হয়।”
সব জোগাড়যন্ত্র হলে পর কালীগুণীন কইল, “সদার, আজ সূর্য অস্ত গেলে পর দু-চারজন সাহসী লোক আমার প্রয়োজন। তাদের নিয়ে আমি নদীর পাড়ের মাঠে যাব। আছে এমন কেউ?”
দশরথ বুক চিতিয়ে কইল, “কোনও শালা না যায় তো আমি যাব, ঠাকুর।” করিমুদ্দিনের শরীর দুর্ব্বল হয়ে পড়েছে, কিন্তু তার চক্ষে আগুন ঝরচে। সে আহত শার্দুলের ন্যায় গর্জে উঠে বলল, “আমিও যাব।”
বৃদ্ধ ফটিক ঠাকুর কাতর কণ্ঠে বলল, “আমি বৃদ্ধ বলে বাদ দেবেন না ঠাকুর। আমিও যাব।” একে একে দেখা গেল, গাঁয়ের ছেলে-বুড়ো কেউই ছাড়তে চায় না। সবাই যাবার জেদ ধরল।
তাদের এই সম্মিলিত জেদের কাছে কালী হার মানল।
“বেশ। তবে সবাই নয়। প্রতি ঘর থেকে একজন আজ সাঁঝ হওয়ামাত্র হাজির থেকো নদীপাড়ের বড়ো মাঠে। তবে সাবধান! সূর্য ডোবার আগেই যে যার লুকিয়ে পড়বে ঝোপেঝাড়ে।”
সারা বিকেল কালীপদ কী সব যেন যজ্ঞ করল। আহুতি দিল। বিড়বিড় মন্তর পড়ল। একখানা মাগুর মাছকে জ্যান্ত বলি দিয়ে, তার রক্ত মাখিয়ে দিল যজ্ঞবেদিতে। মাছের দেহটা সিন্দুর মাখিয়ে কাঁচা পুড়িয়ে, তার ছাইপাঁশগুলো ধুলোর মতো পিষে, ভরে নিল পাতার মোড়কে। তারপর একটা পুঁটুলির মধ্যে কী যেন ভরে নিল।
সন্ধ্যার মুখে দুরুদুরু বুকে গঞ্জ উজাড় করে প্রজারা হাজির হল নদীর প্রকাণ্ড মাঠটিতে। যে যার মতো গাছে উঠে অথবা ঝোপের মধ্যে আত্মগোপন করে রইল। কেবল কালীগুণীন, দশরথ, ফটিক ঠাকুর, করিম আর গণেশ রইল আলাদা স্থানে। সূর্য যেন ভয়েই সেদিন তাড়াতাড়ি মুখ লুকোলেন। চতুৰ্দ্দিক কালো, অন্ধকার হয়ে গেল। কালীপদ তার হাতের পুঁটুলি থেকে বের করল দুপুরে সংগ্রহ করা সেই একরাশ পুরাতন কাপড়চোপড়। তার নির্দেশমতো গণেশ এগিয়ে গেল ফাঁকা মাঠের মধ্যভাগে। সেখানে গিয়ে নিজের চারদিকে ইতস্তত ছড়িয়ে দিল ময়লা কাপড়গুলো। এবার অপেক্ষা। নিঃশব্দ, নিঝুম প্রান্তরে অজানা অদেখা আততায়ীর আগমনের প্রতীক্ষা।
আন্দাজি এক ঘড়ি কি দেড় ঘড়ি সময় পার হয়েচে। লুকিয়ে থাকা লোকজন মশা আর ডাঁশের উৎপাতে বিরক্ত হয়ে উঠেচে, ঠিক তখনই সমস্ত দলটা থরথর করে কেঁপে উঠল বীভৎস এক বাঘের হুংকারে। রাতের নির্জনতাকে খানখান করে সে এসেচে। নিজের শিকারির শিকার করতে সে এসেচে। গণেশ যতই সাহসী পুরুষ হোক, চোখের সামনে অমন ভয়ংকর নরবাঘের মূর্তি দ্বিতীয়বার দেখে সে কাঁপতে কাঁপতে চোখ বুজে মাটিতে পড়ে গেল। বাঘাড়া যখন লোলুপ হিংস্র চক্ষে ঠোঁট চাটতে চাটতে তার পড়ে-থাকা নিজের হত্যাকারীর শরীরটার দিকে এগুচ্চে, সেই সময়ে কালীগুণীন ঝোপের থেকে বেরিয়ে এসে গুরুগম্ভীর জলদমন্ত্র স্বরে বলে উঠল,
“ওঁ রাহ্-কেতুনাম্ যদাঃ স্মরণাৎ,
কায়াহীনঞ্চ কায়াং দদেৎ,
মহাশম্ভৈঃ দেহাকোষাণাম্ মুক্তাং,
অপচ্ছায়াং বিনাশার্থ শক্তিং দেহী মেঃ…”
এই বলে হাতের মুঠোয় থাকা একমুষ্টি ছাই-ধুলোয় চক্ষু মুদ্রিত করে সজোরে এক ফুঁ দিল।
সেই ভয়াল প্রেতমূর্তি কালীপদর দিকে খর চক্ষে চেয়ে রয়েচিল। সহসা আকাশের বক্ষ বিদীর্ণ করে পরপারের কোন অজানা লোক থেকে কানফাটানো শব্দে বাজ পড়ল মাঠে ছড়িয়ে-থাকা ময়লা কাপড়গুলির উপরে, আর সেই কাপড়গুলিতে আগুন ধরে গেল।
সাময়িকভাবে চমকে উঠলেও বাঘামূড়া এবারে ধীরভাবে ঘুরে দাঁড়াল কালীগুণীনের দিকে। এক-পা, দুই পা করে এগুতে এগুতে সবে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য যখন তৈরি হচ্চে, সেই সময়ে অনেকগুলি বিকৃত ঘড়ঘড়ে কণ্ঠস্বর কানে এল সবার।
গাঁয়ের লোকজন হতভম্ব হয়ে বিস্মিত চোখে দেখল, ওই আগুন-লাগা কাপড়গুলির ধোঁয়ার কুণ্ডলী থেকে বেরিয়ে আসচে ওরা কারা! নারান! রফিক! শংকর!
এ গাঁয়ের তিন ছেলে, যারা বাঘামূড়ার চোয়ালের নীচে প্রাণ হারিয়েচে! ঠিক তারা নয়। তাদের অপভ্রংশ ছায়ামাত্র। ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহাবরণ, কালো কালো রং, হাতের আগায় লম্বা ক্ষুরধার নখ। ঠিক যেন কোনও দৈত্যবিশেষ। তাদের চোখে জ্বলচে প্রতিহিংসার অনল। নারান ঝাঁপিয়ে পড়ল বাঘামুড়ার উপর। নাহ্, এইবারে আর বাতাস কেটে ফসকে গেল না। তার হাত সজোরে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল শয়তানটাকে। একে একে বাকি দুজনও ঝাঁপিয়ে পড়ল। যে বিদেহী আত্মাকে মানুষ মোকাবিলা করতে অক্ষম, তার সঙ্গে জুঝে চলেচে আজ তিনজন যুবক। তারাও বিদেহী। কালীগুণীনের অমোঘ মন্তর তাদের মৃত্যুলোকের ওপার থেকে টেনে এনেচে অপর এক মৃত পাপাত্মাকে বিনষ্ট করার জন্য। যাকে ধরাছোঁয়া যায় না, তাকে ধরতে পারে একমাত্র তারাই, যারা নিজেরাও অধরা। বালক বিষ্ণু সত্য বলেচিল। মাছের চার দিয়েই মাছ ধরা যায়।
এই তিন যুবক নিজের সমগ্র শক্তি দিয়ে লড়ছে ঠিকই, কিন্তু শয়তানটাকে তেমনভাবে ঠিক কাবু করতে পারচে না। একবার তিনজনায় মিলে বাঘামুড়াকে ধরাশায়ী করে, আবার পরমুহূর্তেই সেই দানব ছিটকে ফেলে দেয় তাদের।
করিম আর ফটিক নিজেদের মৃত সন্তানকে চোখের সামনে দেখে কান্না-ভেজা গলায় প্রাণপণে ডাকতে থাকল, কিন্তু তাদের যেন কোনওদিকেই মন নেই। তারা যেন বাপের ডাক শুনতেই পাচ্চে না।
কালীগুণীন দয়ার্দ্র চিত্তে তাদের বলল, “লাভ নেই, বাছারা, ওরা তোমাদের শুনতে পাচ্চে না। আহূত প্রেতাত্মারা দেখতে পায়। শুনতে পায় না।”
হঠাৎ একসময়ে বাঘামুড়া তিন যুবককে ছিটকে অনেকটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিল। তাদের শরীর এলিয়ে এসেচে। কালীগুণীন ধীরপায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল নারানের কাছে। নারান ক্লিষ্ট চোখ মেলে অসহায়ভাবে তাকিয়ে রইল কালীপদর দিকে। কালীগুণীন কামিজের পকেট থেকে বের করল বিষ্টুর তুলে এনে-দেওয়া নলখাগড়ার লম্বা পাতা। নারানের দিকে পাতাখানি তুলে ধরে, দুই হাত দিয়ে লম্বালম্বি চিরে ফেলল পাতাটাকে, আর দুইদিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নারানের দিকে তাকাল।
মারা যাবার পরে মানুষ সব ভুলে যায়। দেহের অনুভূতি ভুলে যায়, আবেগ, ভালোবাসা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা সব বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। শুধু মনে রয়ে যায় যা, তা হল বিদ্যা। নারানের বিস্মৃতির অতল থেকে একটা ঢেউ উঠে এল। পাতা! ছেঁড়া পাতা! কে যেন কবে এমনইভাবে কিছু দেখিয়েচিল? কোথায় যেন শুনেচিলাম!
বাঘামুড়া এই ফাঁকে অবসর পেয়ে তাদের দেহগুলি এড়িয়ে হিংস্রভাবে দৌড়ে আসচিল কালীগুণীনের দিকে। নারানের এলিয়ে-পড়া দেহটা পেরিয়ে দৌড়ে আসার মুহূর্তে নারান হঠাৎ ক্ষিপ্রবেগে তার পা ধরে মারল এক হ্যাঁচকা টান। সে টান সামলাতে না পেরে বিশালাকার দেহ নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সেই মূর্তিমান যম। মনে পড়েচে! সব মনে পড়েচে নারানের! মহাভারত। জরাসন্ধ। ছেঁড়া ঘাস। যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণর দেখানো সেই অমোঘ ইঙ্গিত।
নারানের ইশারায় বাকি দুজনও চড়ে বসল বাঘাড়ার শরীরে এবং সেই নরভুক রাক্ষস কিছু বুঝে ওঠার পূর্ব্বেই নারান নিজের ধারালো নখ ঢুকিয়ে দিল নরবাঘের কণ্ঠনালিতে। গগন বিদীর্ণ করে চিৎকার করে উঠল সেই নিষ্ঠুর প্রেতাত্মা। ছটফট করতে লাগল, কিন্তু তিনজনের শরীরে তখন নাছোড় শক্তি। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর শয়তানটার শরীর যেন এলিয়ে এল। তিন-তিনটি শক্তিশালী মরিয়া মানুষের প্রেতাত্মা তখন নিজেদের অকালমৃত্যুর হিসেব চাইতে একজোট। আরও একটু সময় পর তিনজন উঠে পড়ল রাক্ষসটার শরীর ছেড়ে। গ্রামবাসীরা বিস্মিতভাবে চেয়ে দেখলে যে, মাঠের মাঝে পড়ে রয়েচে নীলাম্বরের মুণ্ডুহীন ধড়, আর তার একটু তফাতে এক ভয়ালদর্শন বাঘের ক্ষতবিক্ষত কাটা মাথা।
কালীপদ আবার বিড়বিড় করে কী যেন মন্ত্র পড়ল, তিনটি সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঢেকে দিল তিনজনকে, আর একটু পরে দেখা গেল মাঠে কেউ কোথাও নেই। কেবল গণেশ একলা অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েচে একপাশে। কালীগুণীন কোমল স্বরে করিম আর ফটিক ঠাকুরকে কইল, “তোমাদের সন্তানরা অপঘাতে মরেচে, বাছা, তাই আজও তাদের মুক্তি হয়নি। আমি কাল হোম করব। তারা প্রেতবন্ধন হতে মুক্তি পাবে।”
কালীপদ দাঁড়িয়ে ছিল নদীর কিনারে। করিমুদ্দিন অশ্রু মুছে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ চোখে তার একপাশে হাঁটু গেড়ে, মাথা নীচু করে বসে পড়ল, আর অপর পার্শ্বে বৃদ্ধ ফটিক ঠাকুর। কালীগুণীন তাদের স্নেহার্দ্র চক্ষে আশীর্ব্বাদ করল।
এরপর কতকাল কেটে গিয়েচে। বেনাচিতির প্রজারা কিন্তু প্রাণদাতা কালী গুনিনকে ভোলেনি। গাঁয়ে মন্দির নির্মাণ করে, চুনাপাথরের মূর্তি গড়ে দিলে তারা। তাঁর একপাশে বৃদ্ধ অসহায় ফটিক ঠাকুর, আর অপর পার্শ্বে কৃতজ্ঞ করিমুদ্দিন। তাদের বিশ্বাস, কালীগুণীন যেখানেই থাকুন, বিপদে পড়লে তিনি ঠিক সাড়া দেবেন।
লখাইয়ের মুখে গল্পটা শোনার পরে আমি পরের দিন শহরে ফেরার সময়ে সেই ‘কালী’ মন্দিরে প্রণাম জানিয়ে এসেচিলাম। মনের গভীর থেকে।
