Accessibility Tools

কালীগুণীন ত্রাহিমাম – সৌমিক দে

কালীগুণীন এবং ছিন্নমস্তার পুথি

(এই ঘটনাটি বলা আরম্ভ করবার পূর্ব্বে একখানা কথা কয়ে রাখাটা নিতান্তই প্রয়োজন। এই ভয়ংকর ঘটনাটা আমার জীবনের একটা অন্যতম আশ্চর্য্য ঘটনা, যা আমার পেশা সম্পর্কে অর্জিত সমস্ত পুথিগত বিদ্যাকে হার মানিয়ে দিয়েচিলো! ঘটনার শেষে আমার হাতে কিছু কাগজপত্র এবং অন্যান্য দ্রব্য এসে পড়ে, যেগুলি আমি অসাধু হাতে পড়ার ভয়ে তৎক্ষণাৎ ভস্মীভূত করে ফেলি।)

সিঁড়িতে ওঠার মুখে ধনঞ্জয় আমার হাতে আলতো চাপ দিয়ে বলল, “শশশ, জ্যাঠামশায়!” আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে দেখি, সে প্রাসাদের উপরের দিকে চেয়ে রয়েচে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে আমার নজরও আপনিই ঘুরে গেল সেইদিকে এবং চোখে পড়ল, একজন দীর্ঘদেহী অথচ শীর্ণকায় বৃদ্ধ মহলের উপরের খোলা ছাতের মতো সুপ্রশস্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েচে। তাঁর দুই চক্ষে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি, হাত কাঁপছে মুখে একটা সদাসতর্ক আতঙ্ক আর বিস্ময়ের ছায়া! আমাকে নতুন মানুষ দেখেই হয়তো অবাক হয়েচে, কিন্তু সঙ্গে ধনঞ্জয় থাকায় কিছুটা আশ্বস্তও হয়েচে। আমি বিস্ময়ের এবং সম্ভ্রমের নজরে বৃদ্ধের পানে চেয়ে রইলাম! আমার হাত দুটো আপনিই জোড় হয়ে এল। এই প্রবাদপ্রতিম বৃদ্ধকে সামনে থেকে দেখে আমার শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। এই শিহরণ কেন? সেই কথাই তো আজ তোমাদের বলব।

সংক্রান্তি, ভাদ্র:

প্রসাদপুরের জমিদার বাড়িতে রওয়ানা হবার পূর্ব্বে লটবহর গুছিয়ে, কাগজ-কলম নিয়ে বসেচিলাম। আবশ্যক পত্রাদি লিখে ফেলার পরে খেয়াল করলুম, দোয়াতে সামান্য ম্যাজেন্টা কালি বেঁচে গিয়েচে। একবার কালির বড়ি জলে গুলে ফেলার পর সবটুকু নিঃশেষ না করলে বাকিটুকু অমনিই অপচয় হয়। আমার কষ্টের পয়সার দ্রব্য এভাবে নষ্ট করতে ইচ্ছা হল না। বেগনে রঙের কালি আমার ঝরনা কলমে আবার ভরে, আরেকখানা পোস্টাপিসের ছাপ-দেওয়া কাগজ টেনে নিয়ে লিখলুম – “প্রিয় মুখুজ্জে মশাই ও বউঠান…” বাক্স গুছিয়ে সবেমাত্র দুয়ারে কুলুপ এঁটে পিছনে ঘুরেচি, দেখি ঠিক উপর থেকে একখানা বড়ো কালো মাকড়সা ঝুলচে। তাকে পাশ কাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে ডাকবাক্স অবধি পৌঁছেচি, হঠাৎ নাকের মধ্যে একখানা বড়ো মাছি এসে সেঁধুল। আমি সজোরে একখানা হাঁচি দিয়ে, চিঠিখানা ডাকে ফেলে দিয়ে দেখলাম, ধনঞ্জয় একখানা অশ্বযান থেকে আমাকে ডাকচে। আমি উঠে বসলাম।

***

প্রসাদপুরের জমিদারদের ছোটোছেলে ধনঞ্জয় কবিরাজ আমার থেকে বয়সে সামান্য বড়ো হলেও মিত্রস্থানীয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত আলোচনাসভায় তার সঙ্গে আমার আলাপ এবং সখ্য। তার আমন্ত্রণে তার এই তালুকে বেড়াতে আসার উদ্দেশ্যটি কিন্তু কেবল নিছক আমোদপ্রমোদ নয়। আমি যে কারণে এইখানে আসার জন্য অধীর অপেক্ষায় দিন গুনেচি, সিঁড়িতে ওঠার মুখেই তাঁর দর্শন লাভ করে আমি শিহরিত হয়ে উঠেচি। এই বৃদ্ধই সুবিখ্যাত গণপতি কবিরাজ! এই কবিরাজকে একখানি চলন্ত রহস্য কইলেও কম বলা হয়। এঁকে নিয়ে চিকিৎসক মহলে জল্পনার অন্ত নেই। কেউ কয়, গণপতি কবিরাজ উচাটন বিদ্যে জানেন, মরা বাঁচাতে পারেন। কেউ বলেন, গণপতি কবিরাজ হিমালয়ের কোনও এক রহস্যময় স্থান থেকে অজস্র গুপ্তবিদ্যা শিখে এসেছেন, আবার বহু চিকিৎসক সেসব কথা তামাকুর ধুঁয়ার সঙ্গে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “হুঁ, কবিরাজ বলে কবিরাজ? উনি চিকিৎসাই তো করলেন মশাই মাত্তর কয়েকটা বৎসর, তারপরেই তো মাথার ব্যামোতে একেবারে উন্মাদ হয়ে শয্যাশায়ী। হাঁ, সেই কয়েক বৎসরে কিছু অসাধারণ চিকিৎসা তিনি করেচেন সে কথা ঠিক, কিন্তু ওসব গূঢ়বিদ্যা-টিদ্যা সাফ গুজব।”

বাতাসে তাঁকে নিয়ে শতসহস্ৰ অলীক কথা উড়ে বেড়ালেও তার মধ্যে সামান্য কিছুটা যে সত্য, তা আমি জেনেচি ধনঞ্জয়ের সঙ্গে পরিচিতি ঘটার পরে। গণপতি কবিরাজরা আটপুরুষে চিকিৎসক। ধনঞ্জয় একবার কথায় কথায় হেসে বলেচিল, “জানো ভায়া, ভারতের সবচেয়ে বড়ো বৈদ্য কারা?”

আমি ঘাড় নাড়ায় ধনঞ্জয় বলল, “সবচাইতে ধুরন্ধর চিকিৎসক হিসেবে নকুল, অর্থাৎ বেজিকে মানা হয়। তার কাছে নাকি প্রাণঘাতী গরলেরও ঔষধ মেলে। বেজি নামটাও এসেচে হিন্দি টানে বৈদ্যজি কথাটার থেকেই।”

তো, এই গণপতি যুবা বয়সে এই বিদ্যায় এতখানি দড় ছিল যে, তার সমসাময়িক কবিরাজরাও তার সঙ্গে এই শাস্ত্রে এঁটে উঠতেন না। বংশের ধারা ছিল তার রক্তে, শিরায়। গণপতি মাঝবয়সে বেশ কিছু অসামান্য রোগের ঔষধ আবিষ্কারের পর এক নিতান্তই সাধারণ পাহাড়ি রোগীর চিকিৎসার সময়ে দৈবাৎ গণপতির কানে আসে, পর্ব্বতরাজ হিমালয়ের বুকে কুবেরের পেটের মধ্যে বহু অজানা চিকিৎসাবিদ্যা লুকিয়ে রয়েচে! সেই বিদ্যাকে পাহারা দেন স্বয়ং ভগবান চক্রায়ুধ!

মরণকালে পাহাড়ি রোগীটির প্রলাপ শুনে বাকি কবিরাজরা হেসেচিলেন খুব, কিন্তু গণপতি হাসেনি। পরদিন বিরাট বড়ো ম্যাকলাস্কি সায়েবের ম্যাপ খুলে বসে, কী সব আঁকিবুকি কেটে, বাক্স-তোরঙ্গ গুছিয়ে নিয়ে রওয়ানা দিল গণপতি। বাড়িতে কইল, “ফিরতে বিলম্ব হবে। কুবেরের সন্ধান না করে ফিরচি না।”

গণপতি পাগলের ন্যায় বহুদিন যাবৎ কুবেরের সন্ধান করতে করতে যখন হতোদ্যম হয়ে সেই মৃত্যুপথযাত্রী রোগীটির প্রলাপকে মিছা কথা বলেই ভাবতে বসেচে, হঠাৎ একদিন হিমাচলের এক শিখরে অবস্থিত কিছুরু নামক অখ্যাত গাঁয়ের চায়ের দোকানে বসে গণপতির আলাপ হয় এক বৃদ্ধের সঙ্গে। সেই বৃদ্ধ কথায় কথায় গণপতির সব কথা শুনে হেসে বলেন, “এই কিঞ্জুরু গাঁয়ের পর পাহাড়ের ওই উপরে আর একটাই মাত্তর গাঁ রয়েচে মানুষের বসবাসযোগ্য। সেইটেই শুনেচি এই দেশের সবচাইতে উঁচু বসতি। আমার বাড়ি ওই গাঁয়েই। তারপর আর মানুষ নেই, কেবল বরফের রাজত্ব।”

গণপতি বিষণ্ণ মুখে শুধোল, “বড়ো কুক্ষণে বেরিয়েচি বাড়ি থেকে, বুঝতে পারচি। আমার সন্ধান বিফল হল। তবু এসেচি যখন, তখন একবার আপনার গাঁয়েও পা রাখব। আপনার গাঁয়ের নাম কী?”

বুড়ো পাহাড়ি উচ্চারণে ফোকলা দাঁতে বললে, “কিব্বের।”

গণপতি নামটা শুনে চমকে উঠে দাঁড়াল!

***

বেশ কিছুদিন বৃদ্ধের গৃহে আশ্রয় নিল গণপতি। তার ডায়েরি লিখে দিন কাটচে, হঠাৎ একদিন মাঝরাতে কান্নার রোল উঠল। গণপতি হস্তদন্ত হয়ে বেরুতে যেতেই দেখল, তার আশ্রয়দাতা বৃদ্ধ চোখ মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকচে। কারণ শুধোতে বৃদ্ধ কইল, “দোরজি পান্নার জ্যেষ্ঠছেলেটার বড়ো অসুখ। সে মৃতপ্রায় হয়েছে। এ তল্লাটে ডাক্তারবদ্যি অমিল। ছেলেটা বোধহয় আর বাঁচল না সাহেব।”

“আমি আছি তো।” এই বলে গণপতি তড়িঘড়ি নিজের ব্যাগপত্তর নিয়ে বৃদ্ধের সঙ্গে দোরজির কুঁড়েতে পৌঁছোল। দোরজির পুত্রের নাড়ি পরীক্ষা করে তার মুখ বিষণ্ণ হয়ে উঠল। সে ফেরার পথে বৃদ্ধকে বললে, “নিউমোনিয়া ব্যাধি একেবারে চরম আক্রোশে আক্রমণ করেচে ছেলেটির শ্বাসযন্ত্রে। মৃতপ্রায়, জড়বৎ পড়ে-থাকা ছেলেটিকে পৃথিবীর কোনও ঔষধ আর ভালো করতে পারবে না। এক্ষেত্রে আমি অসহায়! বর্ত্তমান চিকিৎসাবিদ্যাও ততোধিক অসহায়! আমি একেবারে এলেবেলে ডাক্তার নই, তবে একে বাঁচানো শিবের অসাধ্য। ছেলেটির সৎকার্য্যের ব্যবস্থা করো কাল। আজ রাতেই শ্বাস উঠবে।”

পরদিন ঘুম ভেঙেই গণপতির গতকালের কথা মনে পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল। বেলা সামান্য বাড়তে একখানা কমফর্টার গায়ে চাপিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখল, গতকালের সেই মৃতকল্প ছেলেটির বাপ দোরজি পান্না একখানা কয়লার শীতনিয়ন্ত্রক উনুন হাতে হাটের দিকে যাচ্চে। গণপতি ইতস্তত করে শুধোল, “দোরজি, কোথায় চললে?”

দোরজি হিন্দি টানে কইল, “সাবজি, হামি বাজার যাচ্চে।”

গণপতি হতভম্ব হয়ে কইল, “বাজার? তা-ও আজকে? কেন?”

দোরজি প্রসন্ন কণ্ঠে বললে, “আমাদের জন্য নয় সাবজি, বড়োছেলেটার জন্য কিছু ভালো খাবার আনতে যাচ্চি। সুস্থ হলেও তার শরীরটা এখনও দুৰ্ব্বল কিনা, তাই কাউকে চিনতে পারচে না।”

গণপতি পাগলের মতো চিৎকার করে বলল, “তুমি কি শোকে পাগল হয়ে গেলে, দোরজি? ওই ছেলে কখনও ভালো হয়? পৃথিবীতে এমন কোনও ওষুধ নেই, যা দিয়ে…”

আমার কথা শেষ হবার পূর্ব্বেই আমার আশ্রয়দাতা বৃদ্ধের তৃপ্ত কণ্ঠস্বর কানে এল,

“দোরজি মিছে কথা বলচেনা ডাক্তারবাবু। আমরা মিথ্যা বলিনে। ছেলেটা সত্যিই জীবন ফিরে পেত না, কিন্তু তার পরমায়ু ছিল। ছিল বলেই এই এতদিন পর আজ ভোরেই পাহাড়ের বুড়াবাবা গাঁয়ে এসে হাজির হলেন। তিনি এলে আর রোগের সাধ্যি কী শরীরে টিকে থাকে? লোকে বলে, এই হিমালয় পাহাড়টাই নাকি ওই বুড়ার ধরে আমাদের রক্ষা করে। হাঁ ডাক্তারবাবু, এমন কি হয় সত্যি?”

গণপতি হতভম্ব হয়ে কইল, “বুড়া? কে বুড়া? ডাক্তার নাকি?”

আশপাশের লোকজন কপালে হাত ঠেকিয়ে ভক্তিভরে উত্তরে বললে, “বাবা চক্কা।”

গণপতির শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল! সে ফিশফিশ করে বলে উঠল, “বাবা চক্কা? আচাৰ্য্য চক্রাধ নয় তো?”

***

দোরজির কুটিরে প্রবেশ করে গণপতির চোখ ঠিকরে এল! গতকালের সেই মৃতপ্রায়, মুমূর্ষু ছেলেটি বিছানায় উঠে বসে চা পান করচে আর মস্তিষ্কের বিকৃতির কারণে ফ্যালফ্যাল করে চারদিকে বোকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলেচে। গণপতি ঘাড় ঘুরিয়ে চকিতে বাইরে তাকিয়ে দেখলে, গাঁয়ের লোকজন গণপতির কথা মেনে একখানা বাঁশের মৃতদেহ বহনকারী খাটিয়া আর ধুনার মৃৎপাত্র কুটিরের বাইরে পেতে রেখেছে, অথচ যার জন্য এই আয়োজন, সে বাঁশের বিছানায় বসে কাঠের পাত্রে চা পান করচে! গণপতি অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠল, “এ যে অবিশ্বাস্য!”

“কোনটা অবিশ্বাস্য, বাছা?”

গম্ভীর কণ্ঠ শুনে চমকে পিছনে ফিরে গণপতি দেখল, একজন দীর্ঘদেহী বৃদ্ধ ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে হাতে ধরা কাঠের খলনুড়িতে কী যেন পিষছে। বৃদ্ধের চেহারা দেখে তার বয়স অনুমান করা অসম্ভব। বুক অবধি শ্বেত শ্মশ্রু-গুল্ফের জটা, পরিধানে ধূসর রঙের স্থূল আলখাল্লা, ললাটে রক্তবর্ণ টিকা, গলে নীল বীজের মালা আর মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি! গণপতি বিস্ময়ের সুরে বলল, “আপনি এই ছেলেটিকে সুস্থ করলেন কী উপায়ে? এর যে নাড়ি ছেড়ে যাবার উপক্রম হয়েচিল! আর দ্বিতীয় প্রশ্ন হল…”

যুদ্ধের হাতের ইশারায় গণপতির কথা থেমে গেল। বৃদ্ধ খলনুড়িতে মনোযোগ দিয়েই কথা কইল, “দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর আগে দিই। হাঁ, আমি বাঙালি, তবে বহু বহুকাল ধরে পর্ব্বতবাসী। আর অপর প্রশ্নের উত্তরে বলি, তুমি আচার্য্য বিবস্বানের নাম শুনেচ?”

গণপতি ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললে, “কে?”

“আচার্য্য বিবস্বানের পুথি পড়েচ?”

“আজ্ঞা না! তিনি কি কবিরাজ?”

বৃদ্ধ এইবার হেসে ফেলে বলল, “আকাশের সূর্য্যের কথা বলচি।”

“দেবতা সূৰ্য্য? তিনি আচার্য্য কেন হবেন?”

“হবেন বইকি। অশ্বিনীগণের ন্যায় চিকিৎসক দু-দুজন পুত্রের পিতা নিজেও যে অসাধারণ চিকিৎসক হবেন, তাতে আর আশ্চর্য্য কী?”

গণপতি ঢোঁক গিলে কইল, “তাঁর পুথি? সূর্য্যের নিজের লেখা পুথি? আপনি পড়েচেন?”

বৃদ্ধ চুপ করে থেকে খলের মিশ্রণটুকু ছেলেটির মাথার ব্রহ্মতালুতে লেপে দেওয়ামাত্র ছেলেটি চনমনে হয়ে উঠে দাঁড়াল। তার স্তিমিত চক্ষুদ্বয় রোগের আলস্য ঝেড়ে ফেলে উৎসাহী হয়ে উঠল। ছেলেটি বলে উঠল, “এ কী! আমি ঘরে এলাম কখন? বাবা কোথা?”

বৃদ্ধ আড়চোখে গণপতির দিকে চেয়ে বললে, “এইটে কী মিশ্রণ জানো?” গণপতি হতবাক হয়ে মাথা নাড়ল দেখে বৃদ্ধ বলল, “ঘরে সাপের গন্ধ পাচ্চ?”

গণপতি সভয়ে চারদিকে চোখ ফিরিয়ে বললে, “সাপের গন্ধ? না তো!”

বৃদ্ধ একখানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কইল, “মনে রেখো, সাপের গন্ধে পাগল সারে, ঘোড়ার ঘ্রাণে আয়ু বাড়ে। তোমাকে নিয়ে অনেক পরিশ্রম করতে হবে আমাকে, সব নতুন করে শেখাতে হবে। বড়ো জ্বালা হল এ।”

গণপতির চোখ-মুখ হাসিতে ভরে উঠল। যে মহান চিকিৎসকের সন্ধানে তার গৃহত্যাগ, সেই সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি কবিরাজ চক্রাযুধ তাঁকে শিষ্য স্বীকার করেচেন! তার বিদ্যের ভার নিয়েচেন। গণপতি সাষ্টাঙ্গে শুয়ে পড়ল শুরুর পায়ের কাছে।

পাহাড়ের খাড়াই পথ ধরে দুজন রওয়ানা হল। যাত্রাপথে একদিন ভোরে জঙ্গলের ভিতরে তারা দেখল, একটি বছর পনেরোর মেয়ে মাথায় কলশি নিয়ে কী সব শেকড়বাকড় খুঁজে বেড়াচ্চে। তার হাতে ধরা কয়েকটি লতাপাতা আর মাথায় ছোটো কলশি। চক্ৰায়ুধের দেখা পেয়ে মেয়েটি কলশি নামিয়ে প্রণাম করল। চক্রায়ুধ শুধোল, “হাঁ রে বাছা, জঙ্গলে জঙ্গলে কী খুঁজে বেড়াচ্ছিস?”

মেয়েটি হেসে বললে, “চক্কা বাবা, তুমিই তো বলেচিলে যে তোমার এক কলশি ছাগলের দুধের ঘি দরকার? সেই ঘি এই কলশে করে সংগ্রহ করে বেড়াচ্চি, আর রান্নার জন্য চাট্টি লতাপাতা।”

চক্রায়ুধ মেয়েটির মাথায় হাত রেখে আশীর্ব্বাদ করে চলতে চলতে গণপতিকে বলল, “বুঝলে বাছা, বড়ো শান্ত আর দুঃখী মেয়ে। বড়ো পরিশ্রমী। কিন্তু হাজার খুঁজেও এর বিবাহ হচ্চে না। এই বয়সে এইদিকে কেউ কুমারী থাকে না। এর কুমারী নাম ঘোচানোর জন্য ভাবচি, গাছের সঙ্গে এর বিবাহ দেব। নিয়মরক্ষা তো হবে।”

এরপর চক্রাধের সঙ্গে গণপতি রওনা দিল বনজঙ্গল ভেদ করে। বিভিন্ন জঙ্গুলে গাঁয়ের লোকজন চলার পথে চক্রায়ুধকে দেখে হাতজোড় করে প্রণাম করল। একদিন বনে চলার সময়ে গণপতি হঠাৎ দেখল, গাছের মাথায় অজস্র পাখি উড়চে। চক্রাধের পানে চেয়ে গণপতি শুধোল, “পাখিগুলি ওভাবে উড়চে কেন আচার্য্য?”

চক্রায়ুধ চোখ কুঁচকে বলল, “মনে হয়, মহারাজ বুক্কা নিজে আমার আসার খবর পেয়ে এইদিকেই আসচেন।”

গণপতি খুশি মুখে শুধোল, “মহারাজ বুক্কা? কোথাকার মহারাজ উনি?”

“এই কিব্বের গাঁ আর পাহাড়ের।” এই বলে আচার্য্য একটা ঝোপের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে বলল, “উনি এই পাহাড়ের রক্ষাকর্তা। আসুন মহারাজ।” আর পরক্ষণেই গণপতির হাসিমুখ শুকিয়ে গিয়ে ভয়ংকর চমকে উঠে একলাফে একখানা নীচু গাছে উঠে পড়ল! জঙ্গল ভেদ করে একখানা প্রকাণ্ড সাদা বাঘ আচার্য্যর সামনে এসে দাঁড়াল। বিরাট মাথা তুলে একবার গণপতিকে দেখে নিয়ে চক্রাযুধের পায়ের কাছে বসে পড়ল। চক্রাধ তাকে পরম স্নেহভরে আদর করতে করতে বলল, “এই দেখুন মহারাজ, গাছের উপরের উনি আমার শিষ্য হতে চলেচেন। আজ হতে উনিও আপনার প্রজা।”

গণপতি গাছ থেকে হাতজোড় করে প্রণাম করলে পর বুক্কা হাঁ করে “আউউ” জাতীয় একটা রাজকীয় আওয়াজ করল, তারপর ধীরে ধীরে জঙ্গলে ফিরে গেল।

চক্রায়ুধ সন্তুষ্ট স্বরে বললে, “বুক্কা তোমাকে প্রজা হিসেবে মানতে স্বীকৃত হয়েছে।”

এইভাবে বহু পথ পার করে চক্রাধের আশ্রমে প্রবেশ করে গণপতি বিহ্বল হয়ে পড়ল! কী চমৎকার আশ্রম! আশ্রমের গা ঘেঁষে উত্তুরে উঠে গিয়েচে হিমালয়ের অজস্র চুড়ো, আর দক্ষিণে খাড়াই জঙ্গুলে খাদ। আশ্রম জুড়ে গোটা দশ ক্ষুদ্র কুটির, পাহাড়ি পাতায় ছাওয়া, উঠোনে অজস্র বেতের খাঁচা, তাতে চিকিৎসা প্রয়োগের জন্য পোষা রয়েচে পাহাড়ি বৃহৎ মোরগ, রংদার নীলকণ্ঠ পাখি, ইঁদুর, পাহাড়ি ঘুরাল ছাগল আর মেষ। পাহাড়ের ঢালে অজস্র চেনা-অচেনা ভেষজের চাষের বাগান।

পবিত্র ঘটির জল মাথায় ঢেলে গণপতির আশ্রম অভিষেক সম্পন্ন হল। বাকি দু-চারজন শিষ্য হাসিমুখে গণপতির সঙ্গে নমস্কার বিনিময় করল, কিন্তু একজন শিষ্যের মুখ রাগে আঁধার হয়ে রইল।

***

ছয় বৎসর অতিবাহিত হয়েচে। গণপতির মুখে এখন সাধুর প্রজ্ঞা, শুরুর অনুকরণে বিলম্বিত শ্মশ্রু, কপালে টিকা। এই ছয় বৎসরে কত যে অদ্ভুত চিকিৎসাবিদ্যা সে গুরুর কাছে শিখেচে, তার ইয়ত্তা নেই। সে বাকি শিষ্যদের সঙ্গে তার গুরুদেবের সঙ্গে রোজ প্রভাতে উঠে গুরুদেবের আশ্রমে পোষা পাখি আর পশুদের দানা দেয়, আর তারপর চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক সুর্যদেবতাকে প্রণাম করে আর বলে, “হে পরম প্রাজ্ঞ চিকিৎসক, আপনার বিদ্যার তিলার্দ্ধ আমাকে প্রদান করুন।”

একদিন একটা পাহাড়ি গাঁয়ে গুরুদেবের সঙ্গে গণপতির যাবার কথা। চক্রায়ুধ সবেমাত্র বলেচেন, “গণপতি, তৈরি হও, আমাদের এখুনি বেরুতে হবে,” হঠাৎ ঝড়ের মতো এসে উপস্থিত হল চক্রাধের আরেক শিষ্য দুন্দুভি। এসে গণপতির পানে চোখ পাকিয়ে কইল, “বটে রে হতভাগা? আমি যেই জড়িবুটির সন্ধানে গিয়েচি, অমনি তুই গুরুদেবকে ফুসলিয়ে চিকিৎসা শিখতে চলেচিস?”

এই বলে দুন্দুভি চক্রাধকে লক্ষ করে বলল, “আপনি এই কারণেই বুঝি আমাকে আপনার গোপন বিদ্যা দান করচেন না এখনও?”

গণপতি শিহরিত হয়ে নিজের মনে মনে বললে, “গোপন বিদ্যা?”

চক্রায়ুধ বিচলিত হয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে অস্বস্তিভরে কইল, “কোন গোপন বিদ্যা? কীসের কথা বলচ?”

দুন্দুভি বলল, “আপনার কাছে একখানা গোপন চিকিৎসাশাস্ত্রের গোপন চাবিকাঠি রয়েচে তা আমি জানি। সে বিদ্যা আপনার সঙ্গেই বিনষ্ট হোক তা-ই কি আপনার ইচ্ছা? বিদ্যা তো ছিনিয়ে নেওয়া চলে না, তাই সে বিদ্যা আমাকে দয়া করে দিন করুন গুরুদেব।”

গণপতি আরক্ত হয়ে বলে উঠল, “নিজের ভাষা সম্পর্কে সচেতন হও দুন্দুভি। আচার্য্যের প্রতি কুবাক্য প্রয়োগ করতে লজ্জা হওয়া দরকার।”

“তবে রে ধূর্ত্ত শৃগাল, তুই দুন্দুভিকে ভাষাজ্ঞান শিখাবি আজ?” এই বলে চকিতে চক্রাযুধের নিকটে গিয়ে চক্ষু ঘূর্ণিত করে বললে, “গুরুদেব, এই কি আপনার উচিত ধর্ম্ম? আমি এই নরকের কীটের চেয়ে কোন অংশে ন্যূন যে আপনি ওকে অধিক স্নেহ করেন, অধিক যোগ্য মনে করেন?”

চক্রায়ুধ বিষণ্ণতার সুরে কইল, “জ্ঞান অর্জ্জনের স্পৃহা এবং ক্ষমতা তোমার নিঃসন্দেহে তীক্ষ্ণ বাছা, কিন্তু তোমার ধৈর্য্য এবং স্থৈর্য্য বড়ো ক্ষীণ। সেই কারণেই তুমি গণপতির থেকে পিছিয়ে।”

দুন্দুভি শয়তানের হাসি হেসে বলল, “বেশ, তবে আমাদের যোগ্যতার পরীক্ষা নিন না কেন? যে পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হবে, সে-ই হবে আপনার সুযোগ্য শিষ্য। শিষ্যদের পরীক্ষা নেওয়া সদ্গুরুর কর্তব্যও বটে।”

চক্রায়ুধ আকাশ-ছোঁয়া পর্বতশৃঙ্গের দিকে করুণ চোখে চেয়ে ধীরে ধীরে বলল, “তুমি আমার হিসেবে গণপতির চেয়ে অনেক বেশি প্রতিভাবান ছাত্র, দুন্দুভি। তোমার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং অনুশীলনের প্রতি আমার কখনও সন্দেহ নেই, বাছা। সেইজন্যই তোমার চাইতে আমি গণপতিকে অধিক অনুশীলন করাই, কারণ ও আমার দুর্ব্বল ছাত্র।

“বেশ। আজ চিকিৎসা করতে আমি একাই যাব। কাল তোমাদের একখানা পরীক্ষা আমি নেব। যে সফল হবে, সে আমার সঙ্গে বসে প্রত্যহ সুরাপানের এবং দুই চান্দ্রমাস পর আমার সঞ্চিত গুপ্তবিদ্যালাভের অধিকারী হবে। আমি নিজ হস্তে তার ললাটে কেতকীর টিকা দিয়ে সম্মান জানাব।” এই কথা বলে চক্রায়ুধ চলে গেল।

গণপতি শুরুর গমনপথের দিকে চেয়ে কুটিরে প্রবেশ করল। সে আর দুন্দুভি একই কুটিরে বাস করে। গণপতি কুটিরে ঢুকে দুন্দুভির পানে তাকিয়ে বলল, “গুরুদেব আমার চাইতে তোমাকে শ্রেয় মনে করেন জানি, কিন্তু আমার নিজের বিদ্যা এবং গুরুর আশীর্ব্বাদে পূর্ণ আস্থা রয়েচে, দুন্দুভি। আমি আশ্রমিক হবার পূর্ব্বেও কিন্তু চিকিৎসা ব্যবসায়েই ব্রতী ছিলাম। গুরুর সঙ্গে বসে সুরাপানের সম্মাননীয় রীতি পাহাড়ে প্রচলিত শুনেচি। সুরাতে আমার লালসা নেই, তবে কাল আমার বিদ্যেবুদ্ধি দিয়েই জয়ী হয়ে তোমার কুবাক্যের শোধ নেব। নিজের যোগ্যতা আমি প্রমাণ করব।”

দুন্দুভি উত্তর না দিয়ে ব্যঙ্গের হাসি হাসল শুধু।

***

পরদিন ভোরে চক্রাধ ফিরে এল আশ্রমে। সঙ্গে দুজন পাহাড়ি মানুষের কাঁধে দুখানি মৃতদেহ। চক্রায়ুধ কইল, “এই দুই হতভাগা পাহাড়ি মজুর ছিল। হাতুড়ি দ্বারা পাথর ভাঙার সময়ে গতকাল এদের ঠিক পিছনে একখানা বিরাট দৈত্যাকার পাথরের চাঁই ভেঙে পড়ে। আতঙ্কে এদের হাতুড়ি ছিটকে যায় এবং তৎক্ষণাৎ প্রচণ্ড ভয় ও যন্ত্রণায় মারা পড়ে। আমি চাই, তোমরা এদের ছিটকে-যাওয়া হাতুড়িখানা এদের শরীর হাতড়ে উদ্ধার করো। যে বের করতে পারবে, সে-ই আমার শ্রেয় শিষ্য হবে।” এই বলে গুরুদেব দুখানি ভিন্ন কুটিরে মৃতদেহ দুটি রাখার নির্দ্দেশ দিলে। রাত হলে পর গুরুর আদেশে গণপতি আর দুন্দুভি দুখানি মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করার অনুমতি পেল। চক্রায়ুধ বলল, “তোমাদের সময় শেষ হবে সকালে মোরগ ডাকার সঙ্গে সঙ্গে। বিজয়ীঃ ভবঃ।”

দুই শিষ্য দুখানি কুটিরে প্রবেশ করল।

***

দুন্দুভি মনে মনে ভাবলে, “গুরুদেব এদের মৃত্যুর কারণ ফলাও করে বলে আমাদের চিন্তাকে দিগ্‌ভ্রান্ত করতে চেয়েচেন। এই মজুরদের হাতুড়িগুলো গুরুদেব এদের শরীরেই ভরে দিয়েচেন। যে সবচাইতে দ্রুত সেখানা খুঁজে বের করতে পারবে, তারই জিত।”

দুন্দুভি প্রবল উৎসাহে মৃতদেহে অস্ত্রচালনা আরম্ভ করল।

গণপতি নিজের কুটিরে মৃতদেহের পানে চেয়ে চুপ করে বসে রয়েচে। ভাবচে, “গুরুদেব মৃতদেহে লোহার হাতুড়ি খোঁজার মতো স্থূল কার্য্য তাদের কখনও দেবেন না। তবে কি তাঁর কথার মধ্যে কোনও হেঁয়ালি রয়েচে? কী তার অর্থ? পাথর ভেঙে পড়ে আতঙ্কে মারা পড়া মানুষের সঙ্গে হাতুড়ি ছিটকে যাবার কী সম্পর্ক?”

ভাবতে ভাবতে প্রায় ভোররাত হয়ে এল। আকাশে যৎসামান্য আলো ফুটচে। গণপতি মাটিতে বসে পড়ল কুটিরের বাইরে এসে। গণপতি যখন চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে রয়েচে, হঠাৎ একখানা রাতচরা পাখি ভীষণ খ্যা খ্যা কর্কশ শব্দে মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। গণপতি বেখেয়ালি মনে সেই ভীষণ রুক্ষ শব্দ শুনে হঠাৎ চমকে উঠে কান চাপা দিল। পাখিরা উড়ে চলে গেল।

গণপতির চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল, ঠোঁটে হাসির আভা দেখা দিল। সে দৌড়ে কুটিরে এসে ছুরি তুলে নিয়ে মৃতদেহের কানে ছুরি চালাল।

কর্ত্তব্য শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই আশ্রমের মোরগ দিনের ঘোষণা করল। আকাশের আঁধার আলোয় ভরে উঠল। গণপতি পাহাড়ের কিনারে গিয়ে সূর্য্যের উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে কুটিরে ফেরার মুখে দেখল, চক্রায়ুধ আর বাকি কতিপয় শিষ্য হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রয়েচে। গণপতি গুরুদেবকে প্রণাম করে বললে, “আমি হাতুড়ির রহস্য ভেদ করেচি, গুরুদেব।”

চক্রায়ুধ হাত তুলে আশীর্ব্বাদ করতে যাচ্চে, এমন সময়ে দুন্দুভি হাসিমুখে এসে গুরুকে প্রণাম করে বলল, “আপনার আশিসে আমি সফল হয়েছি, গুরুদেব।”

চক্রায়ুধ প্রথমে সদলবলে দুন্দুভির কুটিরে প্রবেশ করল। মৃতদেহ কাপড়ে আচ্ছাদিত, চাদরের কানের কাছে লাল ছোপ। পাশের একখানা বাটিতে একটা ব্যাঙাচির আকৃতির ক্ষুদ্র হাড় রাখা রয়েচে। দুন্দুভি তা তুলে চক্রায়ুধের সুমুখে ধরে বললে, “এই সেই হাতুড়ি হাড়, গুরুদেব, যা মানুষের শ্রবণযন্ত্রের একেবারে ভিতরে থাকে, মানুষকে শুনতে সাহায্য করে। পাথর ভাঙার প্রচণ্ড শব্দে এদের এই হাতুড়ি হাড় স্থানচ্যুত হয়ে পড়েছিল।”

চক্রায়ুধ বিস্মিত হয়ে বললে, “অসাধারণ! অতি চমৎকার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েচ তুমি আজ, বাছা। এবার গণপতির কুটিরে চলো।”

গণপতির কুটিরে প্রবেশ করে দেখা গেল, তাকে দেওয়া মৃতদেহটা ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েচে। চক্রায়ুধ হতবুদ্ধি হয়ে বললে, “এ কী, বাছা! তুমি মূলসূত্রটির নাগাল না পেয়ে মৃতদেহের চারপাশে এমন নৃশংসভাবে অস্ত্রাঘাত করেচ? তুমি তো চিকিৎসক হবার উপযুক্তই নও।”

গণপতি হতাশামিশ্রিত কণ্ঠে চিৎকার করে বলে উঠল, “অসম্ভব! গুরুদেব, এই তঞ্চক আমার মৃতদেহ চুরি করেচে আমার অনুপস্থিতিতে। আমি সূৰ্য্যপ্রণাম করতে বাইরে গিয়েচিলাম, তখনই…”

দুন্দুভি চোখ পাকিয়ে তেড়ে এসে বলল, “তবে রে মিথ্যাবাদী? আমাকে চোর বলিস? তুইই বরং আমার সফলতাকে চুরি করতে চাইচিস। বেইমান প্রবঞ্চক।”

চক্রায়ুধ অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে গণপতির উদ্দেশে কইল, “যা পারোনি তা পারোনি, কিন্তু এমন মিথ্যা দোষারোপ কেন করচ দুন্দুভির প্রতি? তোমার আচরণে তোমাকে শিষ্য বলে পরিচয় দিতে আমার লজ্জাবোধ হচ্চে, বাছা। নিজের কুটিরে যাও। আমার আদেশ।”

গণপতি বাক্যব্যয় না করে মনের দুঃখে কুটিরে ফিরে গেল। দুন্দুভি তখন দাঁড়িয়ে হাসচে।

সন্ধ্যায় বাকি শিষ্যদের সঙ্গে আহার করতে বসে গণপতি দেখল, দুন্দুভি তদ্‌গত চিত্তে চক্রাধের পদপ্রান্তে বসে একত্রে কাষ্ঠপাত্রে সোমরস পান করচে। তার কপালে কেতকীর সুগন্ধি টিকা। গুরুদেব প্রসন্ন মনে দুন্দুভির মাথায় হাত রেখে বলচে, “তুমি আমার সেরা শিষ্য। আমি আমার সমস্ত গোপন বিদ্যা তোমাকে দান করব। তুমি হবে আমার যোগ্য উত্তরসূরি।”

গণপতি চোখের জল মুছতে মুছতে কুটিরে ফিরে এসে শুয়ে পড়ল। বেশ কিছু সময় পর দুন্দুভি নেশাগ্রস্ত হয়ে কুটিরে প্রবেশ করে গণপতিকে একবার পদাঘাত করে শুয়ে পড়ল। ঘুমের ভান করে পড়ে-থাকা গণপতির চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

***

কিছুক্ষণের মধ্যেই দুন্দুভির নাসিকাগজ্জন আরম্ভ হলে পর গণপতি নিঃশব্দে উঠে পড়ল। ছয় বৎসর পূর্ব্বে আনা লোহার তোরঙ্গের মধ্যে নিজের স্বল্প সামগ্রী ভরে নিয়ে করুণ চোখে কুটির ত্যাগ করল গণপতি। কয়েক পা চলতে চলতে হঠাৎ সামনে তাকিয়ে বিস্মিত, হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল গণপতি তার পথ আটকে দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে চক্রায়ুধ। তার মুখে রহস্যের হাসি।

“আশ্রম ছেড়ে চললে বাছা?”

“আমি নিরুপায়, গুরুদেব। অপদস্থ হয়ে, বোঝা হয়ে আমি আপনাকে ভারাক্রান্ত করতে চাইনে।”

“তুমি আমার সবচাইতে মূল্যবান শিষ্য, গণপতি।”

“আপনি জানেন না গুরুদেব, আজ সত্যিই শয়তান দুন্দুভি আমার মৃতদেহ চুরি করে মিথ্যা জয়ী হয়েছে।”

চক্রায়ুধ হেসে বললে, “আমি তোমাদের গুরুদেব আর আমি জানব না? আমার স্পষ্ট স্মরণ রয়েচে যে, আমি কাকে কোন মৃতদেহ দিয়েচিলাম। আমি ইচ্ছাপূর্ব্বক শয়তান দুন্দুভিকে বিজয়ী ঘোষণা করেছি, কারণ আমি চাই, সে সুরাপানের প্রভাবে গভীর নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়ুক। কেতকীর উগ্রগন্ধী টিকা তার কপালে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কেন এঁকেচি, তার কারণও যথাসময়ে টের পাবে। দুর্বৃত্ত দুন্দুভি বহুদিন ধরে আমার গুপ্তবিদ্যার প্রতীক্ষায় ওঁত পেতে রয়েচে। সে সম্ভবত কোনও এক দুর্বৃত্ত চক্রের গুপ্তচর, সম্ভবত সে নিজে একজন তন্ত্রসিদ্ধ! আমার শিষ্য সেজে এত বৎসর ধরে পড়ে রয়েচে ভেক ধরে। আমি বলপূর্ব্বক তাকে বিতাড়িত বা বধ করতে গেলে প্রভূত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, বাছা। তার দলবল রয়েচে পাশের পাহাড়ে, আর আমার আশ্রম শিষ্যে পরিপূর্ণ। তাই….”

“কিন্তু দুন্দুভিকে নেশাগ্রস্ত, অচৈতন্য করে কী লাভ হবে, গুরুদেব?”

“লাভ? লাভ এই যে, আমি সেই অবসরে আমার সুযোগ্য উত্তরসূরিকে আমার যাবতীয় অর্জিত বিদ্যা শিখিয়ে দিয়ে তারপর সমস্ত পুথি পুড়িয়ে ছাই করে দেব।”

গণপতি সচকিত হয়ে কাঁপা গলায় বলল, “পুথি? কোন পুথি?”

চক্রায়ুধ নিজের দুই হাত বুকের কাছে জোড়হস্ত করে পরম ভক্তিভরে বলল, “ছিন্নমস্তার পুথি।” গণপতি বিস্ফারিত নেত্রে চেয়ে রইল।

***

প্রতিরাতে দুন্দুভি নেশা করে নিদ্রা যাবার পর আরম্ভ হত গণপতির গুপ্তবিদ্যাচর্চ্চা। বেশ কিছুদিন বিদ্যাভ্যাসের পর যখন পুঁথি প্রায় গণপতির কণ্ঠস্থ হয়ে পড়েচে, তখন একদিন নিশুত রাতে চক্রায়ুধ বললে, “ছিন্নমস্তার রহস্য এখন তোমার কাছে আর রহস্য নেই, গণপতি। তবে খুব সাবধান! এই ভয়ংকর সর্বনাশা বিদ্যা মন্দ লোকের হাতে পড়লে সৃষ্টি রসাতলে যাবে। পুরো পুথিটা আপাদমস্তক কেউ জানলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু শেষের যে মূল রসায়নটি আমি তোমাকে বলব, তার সন্ধান যেন কেউ না পায়। আর হ্যাঁ, খুব সতর্ক থাকবে, মিশেল অথবা প্রয়োগের প্রমাদ ঘটলে কিন্তু এই পুথির রচয়িতা, অর্থাৎ স্বয়ং সূর্য্যের শাপে তার প্রাণ নষ্ট হবে।”

গণপতি করজোড়ে বললে, “কোনও ভয় নেই, গুরুদেব। আমা হতে এই ভয়ংকর বিদ্যার সন্ধান কেউ পাবে না, কিন্তু গুরুদেব, এই শেষ রসায়নটির কার্যকারিতা কী?”

চক্রায়ুধ রহস্যময় হাসি হেসে বললে, “কার্যকারিতা? ধরে নাও, এই রসায়নের জোরে দুই মেরুপ্রদেশের যাবতীয় তন্ত্ররাশি একজোট হয়ে জুড়ে যায়। মেরুপ্রদেশের তন্ত্ররাশির অর্থ বুঝেচ তো?”

গণপতি চোখ দুটি ছোট, সতর্ক করে ভ্রূ কুঞ্চিত করে সবিস্ময়ে বলল, “হ্যাঁ আচাৰ্য্য। কী আশ্চর্য্য! এ যে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবিশ্বাস্য! আপনি কি তবে এই অসম্ভব, অকল্পনীয় রহস্য আবিষ্কার করে ফেলেচেন? এ যে একপ্রকার অসম্ভব!”

চক্রায়ুধ নিজের ঠোঁটে আঙুল রেখে গণপতিকে চুপ করিয়ে, একখানা অর্দ্ধসমাপ্ত পুথি হাতে তুলে কইল, “এখন যে পুথিখানা আমি লিখে চলেচি, এইটেও এক আশ্চর্য্য রহস্য। এই পরীক্ষা সম্পূর্ণ হলেও চিকিৎসার একটা

নতুন দিক খুলে যাবে, গণপতি। এইখানা সমাপ্ত হলে এখানাও আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব।”

“এইটে কীসের পুথি, সাচার্য্য?”

“এর নাম দিয়েচি রক্তলেখার পুথি।”

“রক্তলেখা? এর অর্থ? কার রক্ত দিয়ে লেখা?”

“কারও নয়। এইটে হল কৃত্রিম উপায়ে রক্ত তৈরির বিদ্যা। মানুষ আজ অবধি ভেবে এসেচে যে, রক্ত জিনিসটা ভগবান ব্যতীত কেউ তৈরি করতে পারে না, কিন্তু আমি একশো ভাগ সফল হয়েচি এর প্রয়োগে। খুব শীঘ্রই চিকিৎসার জগতে একটা নতুন দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে পড়বে। যা হোক, তোমাকে ছিন্নমস্তার সূত্রের অধ্যয়ন করিয়েছি বটে, এইবার তবে মূল রসায়নের চাবিকাঠিটা দিয়ে যাই।”

হঠাৎ বাইরে পাখির খাঁচা থেকে মোরগ আর নীলকণ্ঠ পাখিগুলি যেন ভয় পেয়ে ডেকে উঠল। চক্রায়ুধ হঠাৎ অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে উঠে নাক তুলে কী যেন শুঁকে, ভ্রূ কুঁচকে দ্রুত কণ্ঠে বলে উঠল, “সময় নেই। বড়ো বিপদ, বাছা। কেতকীর গন্ধ পাচ্চ? হেঁয়ালিটা একবারই বলব, খুব মন দিয়ে শোনো….

মোরগ ভুলিল ডাকা
নীলকণ্ঠ মেলে পাখা
জাগিলা উভয়ে ভোররাতে,
অস্ত্রাঘাতে ছিন্ন করি
পূরিবে তপ্ত হাঁড়ি
দুই মেরু জোড়ে সেই ক্বাথে।”

এই বলে আচাৰ্য্য চক্রায়ুধ তড়িৎ বেগে গণপতির কানে কানে কী যেন বলল। গণপতির চোখ বিস্ময়ে ঠিকরে উঠল, আর তৎক্ষণাৎ কুটিরের পলকা দুয়ার দুন্দুভির এক পদাঘাতে ভেঙে পড়ল। তার মুখ হিংস্র, সঙ্গে কয়েকজন শস্ত্রপাণি যমদূতের ন্যায় শয়তান। আচার্য্য চিৎকার করে বলল, “পালাও গণপতি। ধরা দিয়ো না। যতদূর হয় পালাও।” গণপতি দরমার দেওয়ালের দিকে পিচিয়ে গেল। দুন্দুভি একজনের থেকে বল্লম নিয়ে গণপতিকে তাড়া করতেই আচার্য্য দুই হাতে তার পা চেপে ধরে বললে, “পালাও বাছা।”

গণপতি দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সজোরে দরমার বেড়া ভেঙে বাইরে ছিটকে পড়ল। কয়েকজন লোক তাড়া করতেই গণপতি আঁধারে দিকশূন্য হয়ে ছুটতে থাকল।

বহু আঁকাবাঁকা পথ ঘুরে ঘুরে ছুটে বেড়ানোর পর, একেবারে খাদের কিনারে পৌঁছে গিয়ে গণপতির পালাবার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ল। দু-পাশে পাথরের চাঁই আর ঘন বন। শয়তানের দল হেসে উঠে তার দিকে সুচাগ্র বল্লম তাক করচে দেখে গণপতি ‘হা ঈশ্বর’ বলে চোখ বুজল। একটু সময় পরেও সে বল্লমে বিদ্ধ হল না দেখে চোখ খুলতেই চমকে উঠল! শয়তানগুলো আতঙ্কিত চোখে গণপতির ঠিক পিছনে কী যেন দেখছে! তারপরেই তারা বাপ রে-মা রে বলে ছুটতে শুরু করল, আর গণপতির মাথার উপর দিয়ে একটা সাদা দাগের ন্যায় তাদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল একটা দৈত্যাকার সাদা বাঘ। গণপতি হাতজোড় করে কাঁপতে কাঁপতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। বাঘটি চোখের পলকে শয়তানের দলকে দাঁতে-নখে ছিন্নভিন্ন করে চক্রাধের আশ্রমের দিকে দৌড়োতে যাবে এমন সময়ে গণপতির পায়ের তলায় পাথরের চাঁইটা খসে গেল।

গণপতি গাছ ভেঙে, পাথর বেয়ে, জঙ্গলে ফালাফালা হয়ে তার শরীরটা নীচে গড়াতে গড়াতে একসময় এসে পড়ল নীচের জঙ্গলে। বুক্কা ছুটে এসে তার পরনের পোশাক কামড়ে ধরে তাকে ঝুলিয়ে নিয়ে চলল, আর একটু পর পাহাড়ি রাস্তার মোড়ে তাকে নামিয়ে রেখে নিজে লাফিয়ে পড়ল পাহাড়ের ঝোপে ঘেরা আরেকটি নালাপথে। সকালে কয়েকজন পাহাড়ি কাঠুরে গণপতিকে দেখতে পেয়ে গাধায় চাপিয়ে নিয়ে যায় গ্রামে।

***

নিষ্ঠুর দুন্দুভি গুরুকে পদাঘাতে শায়িত করে বল্লমখানা তার কণ্ঠে ঠেকিয়ে কইল, “শয়তান বৃদ্ধ, আমার এতদিনের অভীষ্ট বিদ্যা তুমি দান করচিলে? নরকের কীটটাকে? আমি আড়ালে থেকে কিছু কথা শুনেচি। এখন বলো, মোরগ আর নীলকণ্ঠ পাখি কোন কাজে লাগে? তাদের থেকে কী রসায়ন প্রস্তুত হয়? শয়তানটার কানে কানে কী রহস্য তাকে বললে তুমি?”

আচার্য্য নিরুত্তর দেখে গলায় ফলাটা আরেকটু চেপে রক্ত বের করে দাঁত খিঁচিয়ে দুন্দুভি কইল, “তোমার শিষ্য এতক্ষণে তার সমস্ত বিদ্যা সমেত মৃতদেহে পরিণত হয়েচে, মূর্খ বৃদ্ধ। নিজের জীবন বাঁচাতে চাইলে শীঘ্র শীঘ্র বলো, মোরগ আর নীলকণ্ঠ পাখি দিয়ে কী রসায়ন তৈরি হয়? ছিন্নমস্তার পুথির রহস্য কী?” এই বলে পুথিখানা কুড়িয়ে নিয়ে আবার গুরুর গলায় অস্ত্র ধরে দুন্দুভি বলল, “তোমার এই পুথি পড়েই আমি রহস্য ভেদ করে ফেলব, আর…”

কথা সমাপ্ত হবার আগেই এক ভয়াবহ গৰ্জ্জনে বেড়া ভেঙে দুন্দুভির পিছন থেকে তার ঘাড়ে এসে পড়ল ডোরাকাটা বুক্কা। সেই ভীষণ আঘাতে দুন্দুভির বল্লম আচার্য্যের বক্ষে ফলা সমেত গেঁথে গেল। দুন্দুভি ছিটকে পড়ে গেল। বাঘটা দুন্দুভিকে আক্রমণ করতে গিয়েও, আচার্য্যর এই অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে তার পাশে গিয়ে বসল। তখন সূর্য্য সবে উঁকি মারচেন। আচার্য্য জানালা দিয়ে সূর্য্যের উদ্দেশে হাত তুলে শেষ প্রণাম জানিয়ে ঢলে পড়ল। তার অর্দ্ধসমাপ্ত আবিষ্কার ‘রক্তলেখার পুথি’ তারই রক্তের ধারায় চিরকালের মতো বিনষ্ট হয়ে গেল। বুক্কা তার পাশে বসে তখন পরম স্নেহভরে তাকে চেটে চলেচে। বাঘের চোখের কোল জলে ভেসে যাচ্চে!

কাঠুরেদের গাঁ থেকে আত্মগোপন করে বহু মাস পর অর্দ্ধ উন্মাদের ন্যায় গণপতি ফিরে আসে প্রসাদপুরের মহলে। তাকে দেখে চিনতে পেরে তার পুত্র, পরিজনরা তাকে প্রাসাদে নিয়ে যায়। গণপতি সে সময়ে মাঝে মাঝেই ভুল প্রলাপ বকত। কখনও ভাইদের শুধোত, “তোরা কেউ সাপের গন্ধ পাচ্ছিস?”

কখনও ভ্রাতৃবধূদের বলত, “বউমা, দরজা-জানালা সব বন্ধ করে রেখো। শয়তানটা যেন আমার খোঁজ না পায়। ও ঠিক আসবে!”

***

এই অবধি বলে মহলের বারান্দায় বসে চা পান করতে করতে ধনঞ্জয় আমাকে কইল, “এরপর জ্যাঠামশায় পড়ার ঘরে নিজেকে বন্দি করে ফেলেন। প্রথমদিকে ইট-পাথর দিয়ে দেওয়ালের সুরকিতে অসংলগ্ন নানান উদ্ভট ছড়া লিখতেন, তারপর দিনরাত ইতিহাস, পুরাণ, কাব্য—এসব নিয়ে মেঝেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। হাবিজাবি কী সব লিখতেন, আবার ছিঁড়েও ফেলতেন।

“এরপর আস্তে আস্তে তাঁর মাথাটা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেল। আমাদের আর সবসময় চিনতে পারেন না। জঙ্গল থেকে নানান ভেষজ আর জংলি গাছপালা এনে পিছনের বাগানে রোপণ করেন, আবার পরিচর্যার অভাবে বহু গাছ মরেও যায়। কালকে তোমাকে জ্যাঠামশায়ের ওই পড়ার ঘরখানা দেখাব ডাক্তার। এখন মধ্যাহ্নভোজের সময় হল।”

রাজকীয় আহার করতে করতে কথা হচ্চে। ধনঞ্জয় একটু ইতস্তত করে বলল, “ঠিক এই সময়টাতে তোমাকে প্রসাদপুর নিয়ে আসাটা উচিত হল কি না, সেই দোটানায় পড়েছি, ডাক্তার।”

“মানে? কী হয়েচে?”

“আমি বেশ ক-দিন প্রসাদপুর আসিনি, তাই কথাটা চিঠিপত্তরে কিছু কিছু শুনলেও গা করিনি তেমন। তেমনি কিছু নয় বটে, পাগলের পাগলামি বা দুষ্ট লোকের রসিকতা হতেও পারে। গত মাসে একখানা চিঠি কেউ বাহির মহলের দোরে ফেলে রেখে যায়। তাতে রক্তজাতীয় কালচে দাগে বড়ো অক্ষরে লেখা রয়েচে—তোর দুর্ভাগ্য যে, তোর গুপ্ত পুথির রহস্য আমি এত বছরে অবশেষে সাড়ে পনেরো আনা ভেদ করে ফেলেচি। এইবার আমি আসচি শেষ চাবিকাঠির সন্ধানে। আমি তোকে খুঁজে পেয়েচি এত বছর পর গোটা পৃথিবীর আঁধার একজোট হয়েও তোকে তখন লুকোতে পারবে না আমার চোখ থেকে। তৈরি থাক।

দুন্দুভি আহারের পর ধনঞ্জয় আর আমি সুগন্ধি তাম্বুল চর্ব্বণ করতে করতে দাঁড়িয়ে রয়েচি বাইরের লোহার ফটকের সামনে কষ্টিপাথরের তৈরি গণেশমূৰ্ত্তি বসানো ক্ষুদ্র মন্দিরের সামনে। ধনঞ্জয় বলতে থাকল, “আমরা প্রথমে জ্যাঠামশায়কে অপ্রয়োজনীয় ভেবে চিঠিটা দেখাইনি। উনি মহলের আনাচকানাচে সব সময়ই ঘুরে বেড়ান, তো সেইরকম ঘুরতে ঘুরতেই টেবিলে রাখা চিঠিখানা দেখামাত্র জ্যাঠামশায় উম্মাদ হয়ে ওঠেন। চিৎকার করে পাগলের মতো দরজা-জানালা বন্ধ করতে করতে বলতে থাকেন, ‘ও আসচে। সবাইকে মেরে ফেলবে! ও আসচে।’…”

আমি কিঞ্চিৎ ভেবে প্রশ্ন করলাম, “তোমার জ্যাঠামশায়ের তো কিছুটা বায়ুবিকার রয়েচে বলেচ, তো চিঠিখানা দেখে এই পাগলামি তো সেই উন্মাদ মনের কল্পনাও হতে পারে, নয় কি?”

“না ডাক্তার, তা বোধহয় নয়। জ্যাঠামশায় আশ্রমের আশ্রমিক হয়ে থাকাকালীন একখানা খাতা দেখেচি, ডাক্তার। তাতে জ্যাঠামশায়ের প্রতিপক্ষ একজন শিষ্যর কথা লেখা রয়েচে। নাম নেই বটে, তবে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সেই শিষ্য পদে পদে জ্যাঠামশায়ের অনিষ্ট কামনা করত। তাই….”

ধনঞ্জয় একটু থামলে পর আমরা ফিরে এসে বিরাট খোলা থামওয়ালা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সামনে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ বন আর ঘাসের ঢিপি। ভারী মনোলোভা দৃশ্য।

ধনঞ্জয় বলল, “জ্যাঠামশায়ের পাগলামি শাস্ত রাখতে কিছু কিছু জানালা-দরজা এঁটে রাখা হয়েচে। দেখলাম, উনি এখন ওপাশের বইঘরে হত্যে দিয়ে সারা দিনমান পড়ে রয়েচেন। না খাওয়া, না ঘুম, কেবল থেকে থেকে অসংলগ্ন কথাবার্তা আর প্রলাপ বকচেন।”

আমি দূরের বনের দিকে চেয়ে কইলাম, “জ্যাঠামশায়ের বইঘরটা একবার দেখা যায়? মানে, উনি আবার…”

ধনঞ্জয় মুখ নীচু করে উত্তর দিলে, “তার সমস্যা নেই, জ্যাঠামশায় হিংস্র, উন্মত্ত পাগল নন, বিকারগ্রস্ত মাত্র। তাই… বেশ, চলো।”

আমি ধনঞ্জয়ের সঙ্গে এসে প্রবেশ করলাম গণপতি কবিরাজের বইঘরে। বিরাট প্রশস্ত হলঘর বলা চলে। মোটা মোটা থাম ঘরের মাঝেও, উপরে কড়িবরগা, দেওয়াল জুড়ে সারি সারি কেতাব। কিছু ঠাকুর-দেবতার বিরাট ছবি। মাঝখানে বিরাট টেবিল, ঘরের মধ্যস্থলে বিরাট টেবিলে কিছু কাগজপত্তর, কলম, ম্যাজেন্টা কালির বোতল, ঘরের একপাশে কাঠের পর্দ্দা দ্বারা বিভক্ত করে গণপতির পুরোনো চিকিৎসাঘর। সেখানে বিশাল চৌপাই, থরে থরে ছুরি কাঁচি অস্ত্র। গণপতি সর্ব্বহারা দৃষ্টি নিবদ্ধ করে করুণভাবে চেয়ে রয়েচে আমাদের পানে। তার সামনে কিছু ছেঁড়া কাগজপত্র, কিছু বইপত্র ছড়িয়ে রয়েচে। আমি বইগুলি দেখচি, এমন সময়ে ধনঞ্জয় নিঃশব্দে আমার চিবুকটা আলতো করে ধরে একদিকে ঘুরিয়ে দিল, আর আমার চোখে যা পড়ল, তাতে আামার চোখে অদ্ভুত বিস্ময় খেলে গেল!

একপাশের বিস্তৃত ফাঁকা দেওয়াল জুড়ে পাগলের মতো সুরকি বা লাল পাথর দিয়ে আঁচড় কেটে এলোমেলোভাবে কিছু ছড়ার মতো জিনিস লেখা রয়েচে। আমি অপার বিস্ময়ে একখানা ছড়ার সামনে এসে দাঁড়ালাম। দেওয়ালে আঁচড় কেটে লেখা রয়েচে—

মাথে চলে ঘৃত নিয়া
মেয়ের হয় না বিয়া
সে মেয়েরে অস্ত্রের কোপ।

ছাঁচে গড়া কন্দ রে
করিলা সম্বন্ধ রে
ইন্দ্ৰ পায় না বুঝি লোপ।

ধনঞ্জয় বিমর্ষ হয়ে বললে, “জ্যাঠামশায়ের আশ্রমে থাকাকালীন কিছু কিছু ঘটনা সম্ভবত ঘটেচিল, যেগুলো তাঁর অবচেতন মনে থেকে গিয়েছিল।

সেইগুলিই মনে হয়, উনি বিকারগ্রস্ত অবস্থায় লিখে গিয়েচেন পরপর। আরও আছে। ওই দ্যাখো।”

আমি গিয়ে দাঁড়ালাম দেওয়ালের দ্বিতীয় অংশের সামনে। তাতে লেখা—

সাপের গন্ধে পাগল সারে
ঘোড়ার ঘ্রাণে আয়ু বাড়ে
সাপের গন্ধ মিলিবে যেই
পুচ্ছখানি ধরিবে সেই
খলনুড়িতে পিষিবে তারে
বিভক্ত কর খণ্ড চারে
নারীর কোলে রইবে তেল
সাপের সঙ্গে হইবে মেল
পৃথ্বী ধরে যতেক জল
মিশ্রণেতে পাইবে ফল
রুপার অঙ্গ রইবে যেথা
বান্ধি প্রয়োগ করিবে সেথা
সতী শোকে মহেশ যা
প্রয়োগমাত্র সারিবে তা।

তৃতীয় স্থানে লেখা আছে—

পক্ষী দিলা চক্ষে ধুলা
আনিল রতন মায়ের কুলা

সেই রতনের দোসর যেই
ছন্দে বাঁধা পড়িলা এই
মেরুপ্রদেশের তন্ত্র দ্বারা
রাহু-কেতু রইবে জোড়া
প্রয়োগ কিংবা মিশেল ভুলে
সূর্য্যদেবের চক্ষু খুলে
মরিনু আমি যেই বিপাকে
ঘটিবে তা ফের সূর্যালোকে।

আমি চোখ ফিরিয়ে দেখলাম, গণপতি কবিরাজ খরদৃষ্টি নিয়ে আমাদের দেখচে! আমি বললাম, “ধনঞ্জয়, কবিরাজমশায়ের পুথিপত্তরের সংগ্রহ দেখচি কলকাতার যে-কোনও গ্রন্থাগারকে লজ্জা দেবে। আমরা যদি এভাবে শুধুমাত্র হেঁয়ালিগুলো দেখেই ফিরে যাই, তবে ওঁর মনে অসোয়াস্তি রইবে। তার চাইতে বরং কিছুক্ষণ এ ঘরে থেকে টুকিটাকি বইপত্তর ঘাঁটাঘাঁটি করি। তাতে উনি কিছুটা সহজ হবেন হয়তো।”

ধনঞ্জয় দু-পাশে হাত নেড়ে, কাঁধ উঁচিয়ে বলল, “অগত্যা।”

বেশির ভাগ বইই কবিরাজি এবং চিকিৎসা বিষয়ক। বহু সংখ্যক ইংরেজি কেতাবও আছে। বইয়ের সারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ বইয়ের ফাঁক দিয়ে পিছনের দেওয়ালে আবছা কিছু লেখা রয়েচে মনে হল। গণপতি আমাদের দিকে পিছন করে বসে রয়েচে। আমরা চার হাতে অনেকগুলি বই মাটিতে ফেলার পর আমাদের চক্ষুস্থির হয়ে গেল। বইয়ের আড়ালেও একখানা ছড়া অতি গোপনভাবে লেখা হয়েচে—

মরার পরেও বাঁচবে প্রাণে
মরার নামের উচাটনে
সাবধানেতে মরার পরে
শয়ন দেবে মুণ্ড ছেড়ে
মিলবে পুথি ত্রিকালজয়ী
ষড়াংশ তার রক্তক্ষয়ী
রাক্ষস আর হয় না বধ
ছত্রে ছত্রে মহৌষধ।

আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, “এ কী! এর মানে কী? মরার পরেও বাঁচবে মানে? হা ঈশ্বর! এ কোন মহৌষধের কথা লিখেচেন উনি? অমৃত-টমৃত নাকি আবার?”

ধনঞ্জয় শুষ্ক মুখে কইল, “অমৃত বলে কিছু হয় না, ডাক্তার! প্রাণী অমর হয় না। কিন্তু কোন গোপন রহস্যের কথা লিখেচেন জ্যাঠামশায়? মৃতের মুণ্ড কাটলে পুথি মিলবে? রাক্ষস কে?.. নাহ্, এ হেঁয়ালির সমাধান করা আমাদের সাধ্যি নয়।”

আমি মুখ তুলে কইলাম, “এ হেঁয়ালির উত্তর যদি কখনও ভেদ করা সম্ভব হয় তাহলে হয়তো মাত্র দুজনই পারেন। একজন গণপতি আচার্য্য স্বয়ং, এবং অপরজন…”

ধনঞ্জয় উৎসুক হয়ে আমার কাঁধ ধরে বললে, “অপরজন কে ডাক্তার?”

আমি উত্তর না দিয়ে চোখ তুলে দেওয়ালে টাঙানো কালী ঠাকুরের তৈলচিত্রের জোড়া পাদপদ্মের পানে চেয়ে রইলাম।

***

হলদে রঙের বিরাট তিনমহলা দোতলা প্রাসাদোপম বাড়ি, ফটকে জোড়া দাঁতাল হাতির মুখ। ফটকের সামনে শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা রয়েচে—’মুখুজ্জে বাড়ি, রায়দীঘড়া’।

বেলা আন্দাজ মাঝদুপুর। সূর্য্য যথারীতি মাঝ-আকাশে। ঝকঝকে দিন। কালী গুনিন ছাতের প্রাচীরে হাত রেখে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন লক্ষ করচে।

দূরের আকাশে একখানা ক্ষুদ্র চড়াই পাখি মহা আতঙ্কিত হয়ে উড়ে চলেছে, আর তার পিছনে একখানা হিংস্র বাজপাখি নখ বাগিয়ে তাকে ছুইছুই অবস্থায় তাড়া করে চলেচে। কিছু সময়ে এই দৃশ্য দেখার পর কালীপদ নিজের ডান হাতের তালুটা মুখের সামনে এনে একটা ফুঁ দিল। বাজপাখিটা যখন চড়াইটাকে ছুঁতে যাবে, হঠাৎ একটা দমকা বাতাস এসে তাকে অনেক দূর উড়িয়ে নিয়ে গেল। বাজপাখি চমকে উঠে পরিত্রাহি উড়ে পালাল। চড়াইটা এমন সাক্ষাৎ মৃত্যুর থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে রক্ষা পেয়ে দিগবিদিক ভুলে ছাতের প্রাচীরে এসে নামল দেখে কালীপদর মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে প্রসন্ন মুখে পিছনে ঘুরতেই দেখল, মন্দাকিনী দাঁড়িয়ে রয়েচে হাসিমুখে। মন্দাকিনী কালীপদর স্ত্রী। বর্ত্তমান বয়স আন্দাজ চল্লিশ। একটা-দুটো চুল ফিকে হলেও অদ্ভুত সুন্দর রূপের অধিকারিণী। ঠোঁটের ঠিক উপরে ডান পাশে একখানা ক্ষুদ্র তিল, সিঁথিতে গাঢ় সিন্দুর, হাতে, গলায় গহনা। পরনে লালপেড়ে ঘিয়ে গরদ আর লাল বক্ষাবরণী।

মন্দা একটু হেসে বলল, “বটঠাকুর ঠিকই বলেচেন দেখচি।”

“কী বললেন দাদা?”

“বটঠাকুর বললেন, বুঝলে বউমা, ঘরে যখনই একটা অনুষ্ঠান বা যজ্ঞি থাকবে, তখনই তোমার স্বামীটি গা বাঁচিয়ে বাগানে বা ছাতে গিয়ে বসে থাকবে। তারপর যেইটে বললেন, সেইটে আমি কইতে পারিনে।” বলেই ফিক করে হেসে ফেলল।

“বটে? দাদা বললে এ কথা?”

“বললেই তো। দিদিও তো বললেন, ঘরে জামাই আসচে আর শ্বশুর ছাতে উঠে দিনমানে নক্ষত্র গুনচে। গিয়ে ডেকে নিয়ে আয় বোন আমার গুণধর ঠাকুরপোকে।”

“ওহ, তাহলে এই দাঁড়াল যে আমি একটি নিষ্কর্ম্মা অথচ গুণধর, তা-ই তো?”

“গুণধর না হোক, গুনিন তো বটে।”

“বুঝলাম। যতসব কুচক্রী শত্রুপক্ষের দূতী হয়ে এসেচ তুমি।”

“মিছে কথা। আমি এসেচি ডাক্তার ঠাকুরপোর পত্র শোনাতে।” এ কথায় কালীপদর মুখ সহসা উজ্জ্বল হয়ে উঠল হাসিতে, “অ্যাঁ, হতভাগাটা চিঠি লিখেচে? দাও দেখি।”

“দিচ্চি, কিন্তু একটা শর্ত রয়েচে। ডাক্তার ঠাকুরপো যে শহুরে কালিতে চিঠি লিখেছে, সেইরকম কালি আর এইরকম রঙিন লেফাফা এনে দিতে হবে। কতদিন বাড়িতে চিঠি লিখিনে।”

কালীপদ স্ত্রী-র কাঁধে হাত রেখে বললে, “বাপের বাড়ি যেতে ইচ্ছা করচে?”

মন্দা লজ্জা সহকারে কইল, “তা একটু করে বইকি, বিশেষ এই পূজা আসার সময়টাতে। বটঠাকুরকে যাবার কথা কইতে লজ্জা লাগে।”

“আহা, বউদিদিও তো অনুমতি দিতে পারেন যাবার। একবার বলেই দ্যাখো।”

মন্দা একটু কষ্টের হাসি হেসে কইল, “তা-ই কি আর হয়? পূজায় মেয়ে-জামাই আসচে, আমার গেলেই হল যেন? তুমি চিঠি পড়ে শিগগির ফেরত দাও। সৃষ্টির কাজ ফেলে এসেচি।”

কালীপদ লাল রঙের লেফাফা থেকে চিঠি বের করে চিঠির দিকে তাকিয়ে পড়তে শুরু করল, “প্রিয় মুখুজ্জে মশাই ও বউঠান….।”

আদ্যোপান্ত পাঠ করে, তারপর কালীপদ কইল, “হতভাগা বাউন্ডুলেটা মানুষ হল না। কতবার কয়েচি তাকে যে সংক্রান্তির দিনে যাত্রা করতে নেই, · আর এই ছেলে সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্ম্মাপূজার দিন বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে।”

চিঠিটা আপাদমস্তক পড়াকালীন মন্দাকিনী ছাতের দড়িতে মেলা কাপড়চোপড়গুলি ঠিকঠাক করে দিল। পত্রপাঠান্তে চিঠি ফেরত দিয়ে কালীপদ বলল, “বুঝলুম। তোমার এইরকম কালি আর কাগজ চাই? কাগজ এনে দেব’খন, কিন্তু কালি তো বাড়িতেই বেশ রয়েচে।”

মন্দা অবাক হয়ে কইল, “অবাক মানুষ বটে তুমি। ঘরের সেই স্বদেশি কালি তো কালো রঙের! আমার এইরকম বেগনি ম্যাজেন্টা কালি চাই। দেশিই এনো। তুমি এইবার সদরে গেলে….”

কালীপদ বিস্মিত, ভ্রূ কুঞ্চিত হয়ে স্ত্রী-কে হাত দেখিয়ে থামিয়ে কইল, “কী বলচ মন্দা? এই চিঠিতে বেগনি কালি কোথা? চিঠি তো কালো কালিতে লেখা!” কালীপদ চিঠি নিয়ে আবার দেখল। কালো কালিই বটে!

মন্দা অবাক হয়ে নিজের মুখে হাত ঠেকিয়ে বলল, “তুমি রহস্য করচ না তো? আমাকে ভয় দেখিয়ো না যেন। দিব্যি বলচি, আমি তো এই পরিষ্কার দেখচি বেগনি কালি।”

কালীপদর মুখ গম্ভীর দেখে মন্দা শঙ্কিত মুখে শুধোল, “হ্যাঁ গো, ব্যাপার কী? চিন্তার কথা কিছু? অমন চুপ করে থেকো না!”

“শুধু চিন্তার কথা নয়, মন্দা, ব্যাপার বড়ো ভয়ানক। হতভাগা নিশ্চয়ই কোনও মারাত্মক বিপদে পড়তে চলেচে।”

মন্দা কাঁদোকাঁদো মুখে কইল, “কী বলচ তুমি? কী বিপদ?”

কালীপদ শুষ্ক মুখে বলল,

“সংক্রান্তির ঘোর প্রমাদ,
ধূর্ত্ত শমন রচেন ফাঁদ
পথিক যদি যাত্রা করে,
পথেই জেনো মক্ষী ধরে
রঙিন বর্ণ কৃষ্ণ হয়,
মাথার পরে মৃত্যুভয়।”

কালীপদর হাতে ডাক্তারের লেখা চিঠিটা। কালীপদ সেইটা হাতে ধরে একটা ফুঁ দেওয়ামাত্র তাতে আগুন ধরে গেল! মন্দা আঁচল চাপা দিয়ে কেঁদে ফেলে কইল,

“দোহাই তোমার, আমরা দুই বউ মিলে মেয়ে-জামাইদের সামলে নেব। তুমি ঠাকুরপোর কোনও বিপদ হতে দিয়ো না। মুখে ঠাকুরপো বলে ডাকি, কিন্তু আমার মন জানে, তাকে আমি একদিনের তরেও নিজের সন্তান ভিন্ন দেখিনি। আমার সন্তান যেন আমার কাছে ফিরে আসে। তোমাকে আমার মাথার দিব্যি রইল।”

কালীপদ স্ত্রী-র মাথায় আশীর্ব্বাদের ভঙ্গিতে হাত রেখে দৃঢ়মুখে কইল, “মা ভবানী সঙ্গে রয়, নিবৃত্ত হয় মৃত্যুভয়।”

স্বামী-স্ত্রী দুজন দুজনের চোখের পানে চেয়ে রইল। মন্দাকিনীর মুখে করুণ একচিলতে ভরসার হাসি ফুটে উঠল। কালীপদর মুখে স্থিরপ্রত্যয়।

***

প্রকাণ্ড দেওয়ালঘড়িতে রাত যখন ঠিক অষ্টম প্রহর ঘোষণা করছে একজন বয়স্ক পরিচারক এসে ধনঞ্জয়কে হাতজোড় করে বলল, “জলছড়া দেওয়া হয়ে গিয়েচে আজ্ঞা।”

ধনঞ্জয় কইল, “হাঁ, খাবার বাড়তে বলো। আমরা যাচ্চি।”

খাবার খেতে বসে দেখি সে এক রাজকীয় আয়োজন। ডাল, গন্ধরাজনেবু, ভাজাভুজি, মাছমাংসের হরেক পদ আর পায়েস। যখন তৃপ্তি সহকারে খাচ্চি, হঠাৎ চোখে পড়ল, একটা ভারী পর্দ্দার আড়ালে উকি মারচে গণপতি কবিরাজ। আমি আড়চোখে দুই-একবার দেখলুম। হাত-মুখ ধুয়ে আমি কইলাম, “তোমাদের এত বড়ো বাড়ির ছাতখানাও নিশ্চয়ই বিশাল। কলকাতায় তো এসব কল্পনাও করা বৃথা। খাবার পর একটু হাঁটাহাঁটি আমার অভ্যাস।”

ধনঞ্জয় কইল, “তার আর সমস্যা কী? চলো।”

একখানা হ্যারিকেন হাতে নিয়ে ছাতের সিঁড়ি দিয়ে ওঠার মুখে দেখি, গণপতি তখনও আমাদের দিকে চেয়ে রয়েচে। ধনঞ্জয় শুধোল, “কিছু কইবেন জ্যাঠামশায়?”

গণপতি পিছন ঘুরে চলে যেতে যেতে ক্ষীণকণ্ঠে কইল,

“পরম মান্য করি
অতি বলবান,
গান্ধার রাজার সনে
সদা যুযুধান।
রণের শেষেতে যদি
বেদনাই সার,
জোয়ান মরদই তবে
শেষ উপচার।”

এই বলে গণপতি আঁধারের কোনায় হারিয়ে গেল।

ধনঞ্জয় অবাক হয়ে বলল, “মাথাটা আরও খারাপ হয়েচে। গান্ধার নরেশ তো মহারাজা সুবল বা তার পুত্র শকুনি। হঠাৎ এই কথা কেন?”

আমরা ছাতের কোঠরিতে এসে উঠলাম। আমি হ্যারিকেনখানা উচিয়ে ধরলাম, ধনঞ্জয় দোরের কুলুপে চাবি ঘোরাল। তারপর একটানে এক পাল্লার ভারী দরজা টেনে খুলে ফেলল। আমি প্রথম হ্যারিকেন হাতে ছাতে পা রাখলাম। হ্যারিকেনের আবছা আলোয় সেই বিরাট পাথরের রেলিং-দেওয়া আঁধার ছাতের অন্ধকার দূর হল না বটে, কিন্তু হঠাৎ একটা জিনিস চোখে পড়ে আমি চমকে উঠলাম!

হ্যারিকেনের অস্পষ্ট আলোতে মনে হল, দু-তিনখানা বড়ো বড়ো চেহারার বনমানুষের মতো অবয়ব হুড়মুড় করে ছাতের থেকে লাফ দিয়ে গা-লাগোয়া গাছগুলোতে গিয়ে পড়ল! আমি আঁতকে উঠে ধনঞ্জয়ের দিকে তাকাতে সে ভ্রূ কুঞ্চিত করে কইল, “গোদা হনুমান মনে হচ্চে! ঠিক ঠাহর পেলাম না।”

আমরা রেলিং-এর ধারে গিয়ে ঝুঁকে দেখলাম, সেই বড়ো বড়ো গাছের কয়েকখানা স্থূল শাখা ভেঙে ঝুলচে! আমি বললাম, “হনুমানের ওজন কতটুকু হয়, ধনঞ্জয়? এইরকম মোটা ডাল কি তাদের আঘাতে ভেঙে যেতে পারে?”

ধনঞ্জয়ের কপাল বেয়ে স্বেদবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।

সে বলল, “ডাক্তার, আমি কখনও একাধিক গোদা হনুমানকে একসঙ্গে ঘুরতে দেখিনি। তুমি দেখেছ?”

আমি আড়চোখে ডালগুলোর দিকে চেয়ে কইলাম, “কখনও না।”

আমরা আর বিলম্ব না করে দোর এঁটে নেমে এলাম।

নেমে এসে আমি হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে কইলাম, “ধনঞ্জয়, তোমার ভাণ্ডারে জোয়ানের আরক রয়েচে?”

ধনঞ্জয় কইল, “হ্যাঁ, রয়েচে। পেটটা হঠাৎ বড্ড বেদনা করছে, ডাক্তার।”

আমি একটু তার দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমারও করচে। তোমার জ্যাঠামশায় একজন ধুরন্ধর চিকিৎসাবিদ হে ধনঞ্জয়। আমার-তোমার চাইতে শতগুণ অধিক। মগজের বিকৃতি ঘটেও তিনি চিকিৎসাবিদ্যার সারটুকু ভোলেননি।”

ধনঞ্জয়, “মানে?”

আমি, “মানে, উনি আমাদের খাবার উপাদান দেখেই আমাদের এই পেটের অবশ্যম্ভাবী বেদনার কথা বুঝে গিয়েচিলেন। তাই সতর্ক করে ছড়াখানা কয়েচিলেন। ‘পরম মান্য’ অর্থাৎ পরমান্ন এবং ‘গান্ধার রাজ’ বলতে গন্ধরাজনেবু। পায়েসের মতো গুরুপাক ভোজনদ্রব্যের সঙ্গে নেবুর মতো অল্প উপাদানের চিরকাল খটামটি লেগে থাকে, তার ফল এই পেটের বেদনা। ‘জোয়ান’ অর্থাৎ যোয়ানের আরক পান করলে এই বেদনা প্রশমিত হবে। হায়, এই ছড়াখানার মতো যদি বাকিগুলিও আঁচ করতে পারতুম। অনেক ভেবেও কূল পেলাম না সেসব।”

 ***

রাতে আমি আর ধনঞ্জয় একই কক্ষে শয়ন করেচিলাম। মাঝরাত নাগাদ কীসের যেন দড়াম শব্দে ঘুমটা ছুটে গেল। ঘরের বাতি খুব কমানো ছিল। বড়ো চোখ মেলে তাকিয়ে শুনলাম বাইরে যেন কিছু লোকের চাপা, ভয়াৰ্ত্ত কোলাহল। বাঁচাও, রক্ষা করো ধরনের। আমি ধনঞ্জয়কে ধাক্কা দিয়ে তুলে কইলাম, “তাড়াতাড়ি ওঠো। ও কাদের কোলাহল?”

ধনঞ্জয় চমকে জেগে উঠে আওয়াজ শুনে কইল, “তা-ই তো! কী সৰ্ব্বনাশ! ডাকাত পড়ল নাকি? প্রসাদপুরে ডাকাত?”

আমি তাড়াতাড়ি হ্যারিকেনের মৃদু সলতেটা চাবি ঘুরিয়ে উসকে দিয়ে নামতে যেতেই আতঙ্কে কাঠ হয়ে গেলাম! আলো বাড়তেই চোখে পড়ল, ঘরের এককোণে একখানা ভয়ংকর জীব ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে! তার চেহারা ঝুঁকে-পড়া বনমানুষের মতো, হাতে ঝকঝকে নখ, কিন্তু মাথাটা বড়ো বড়ো ঘাড় অবধি চুল থাকা সত্ত্বেও যেন মানুষের মতোই অবিকল! দেহের সঙ্গে বেমানান। একপাশে ভারী দরজাটা ভেঙে পড়ে রয়েচে। হঠাৎ ঘরে আরও একখানা ওইরকম জীব এসে ঢুকল! এর চেহারা আরও ভয়াবহ, আর আকারে দ্বিগুণ। জীব দুটো আমাদের মুখের উপর তাদের নখযুক্ত থাবা রাখল।

আমাদের ইন্দুরের ন্যায় ছুড়ে ফেলা হল নীচের একখানা বড়ো ঘরে। সেইখানে তৃতীয় একটা জীব পাহারা দিচ্চে। এই ঘরে জমিদার বাড়ির প্রতিটি মানুষকে এনে ফেলা হয়েছে। তারা মেঝেতে বসে কাঁপতে কাঁপতে ইষ্ট স্মরণ করছে, কেউ কাঁদচে। আমাকে দেখে বুড়ো পরিচারক কেঁদে উঠে বলল,

“আমাদের বাঁচান ডাক্তারবাবু।”

আমাদের মেঝেতে বসিয়ে দিয়ে ওই জীবেদের সেই সর্দ্দার, আর তার দুজন সঙ্গী মিলে তিনজোড়া ভয়ানক চক্ষু দিয়ে দেখতে থাকল। অবশেষে সর্দ্দার গোছের জন্তুটা ঘড়ঘড়ে গলায় বাকি দুই শয়তানের উদ্দেশে মুখ খুলল, “সেই শয়তান কোথায়?”

দুই শয়তান জবাব দিল, “গোটা প্রাসাদ চালুনির মতো করে খুঁজেচি আমরা। আর একটিও মানুষ অবশিষ্ট নেই। সবাইকে এই ঘরে এনে ফেলা হয়েচে।”

“না না না,” সর্দ্দার বনমানুষটা চিৎকার করে বলল, “যাকে খুঁজতে এসেচি, তার ছবি প্রভু আমাকে দেখিয়েচেন। সেই শয়তান বৃদ্ধ এইখানে অনুপস্থিত। চারদিকে খুঁজে দেখ তোরা, নচেৎ সৰ্ব্বনাশ।”

শয়তান দুটো ঝড়ের বেগে খুঁজতে বেরোল। সদারটা সবার দিকে চেয়ে অবশেষে আমার আর ধনঞ্জয়ের দিকে চোখ ফিরিয়ে কইল, “তোরা দুজন চিকিৎসা ব্যবসায়ী, তা-ই না? ওই শয়তান বৃদ্ধের মতো চিকিৎসক এই ত্রিভুবনে নেই। এই কথা আমার প্রভু আমাকে বলেচেন। আমার গুরুও একজন অসামান্য কবিরাজ, কিন্তু একখানা গুপ্তবিদ্যারচর্চ্চা তিনি বিগত বহুকাল ধরে করে আসচেন, কিন্তু শেষ মুখে এসে বারে বারে বিফল হয়েচেন। সেই শেষ কুলুপের চাবিকাঠি তোদের সেই শয়তান বৃদ্ধ অন্যায়ভাবে চুরি করে গা-ঢাকা দিয়েচে আজ বৎসরের পর বৎসর ধরে। অবশেষে তার সন্ধান আমরা পেয়েচি, কিন্তু সেই পাগল বুড়া আবার আত্মগোপন করেচে।”

ধনঞ্জয়ের কাতর স্বর শোনা গেল, “দোহাই আপনাদের, উনি যথার্থই মানসিক বিকারগ্রস্ত। ওঁর পূর্ব্বাপর কোনও বিদ্যা, কোনও চিকিৎসাই আর স্মরণ নেই। আপনার প্রভু কে বা কারা তা আমি জানিনে, তবে তাঁর থেকে আপনার প্রভুর আর কিছুই পাবার নেই। সত্যি বলচি।”

শয়তান দুটো নিজের বুকে হাত রেখে কইল, “এ প্রাসাদে আর কেউ নেই, সদার। সে তবে নিশ্চয়ই পালিয়ে গিয়েচে।”

হঠাৎ বাইরে থেকে মোরগের ডাক শোনা গেল। সদার জন্তুটা চমকে বাইরে তাকিয়ে গবাক্ষ দিয়ে দেখল, আকাশ ফিকে হয়ে এসেচে! সে হঠাৎ ভীষণ তাড়াহুড়ো করে কইল, “হতভাগা অপদার্থের দল, ভোরের আলো ফুটতে চলেচে। এখুনি বুড়াটাকে খুঁজে বের করে আমাদের প্রভুর কাছে পৌঁছে দিতেই হবে, নচেৎ ঘোর বিপদ।”

হঠাৎ বাইরে কিছু একটা পড়ার ঝনঝন শব্দ হল। একটা জন্তু চিৎকার করে জানালা দিয়ে আঙুল দেখিয়ে কইল, “ওই, ওই দ্যাখো সর্দ্দার।”

আমরা চমকে তাকিয়ে দেখি, বাইরের আধো অন্ধকারের মধ্যে গণপতি কবিরাজ ফটক খুলে খুটখুট করে পিছনের বনের দিকে দৌড়ে পালাচ্চে। তার বাহুমূলের প্রকোষ্ঠে চেপে ধরা আছে লাল শালুতে মোড়া পুথির মতো কিছু একটা। একটা জন্তু পলকের মধ্যে ছুটে বেরিয়ে গেল তাকে ধরতে।

সর্দ্দার কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে আমাদের দিকে চেয়ে কইল, “এতদিনে প্রভুর মনের বাসনা পূর্ণ হবে। এই শয়তান বৃদ্ধ যে চাবিকাঠি নিয়ে পালিয়ে এসেচিল, তা আজ আবার ফেরত যাবে তার যোগ্য অধিকারীর হাতে।”

বাইরে বনের দিকে একটা কান ফাটানো আর্তনাদ শোনা গেল। সদারের কদাকার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে কইল, “আমাদের কাজ সমাপ্ত। তোরা এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে থেকে যাবি, তা হতে পারে না। এইবার তোদের সব ক-টাকে গলা ছিঁড়ে এইখানেই ফেলে রেখে যাব। খোদ জমিদার বাড়িতেই একঘর ভর্তি ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ। কেমন মজার কথা হবে, তা-ই না?”

ঘরের সকলে ভয়ে কেঁদে উঠল। আমি কেবলমাত্র না কেঁদে কঠোর মুখে তাকিয়ে আছি দেখে সদার দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “তুই কাঁদচিস না যে? তোর বুঝি মরণের ভয় নেই? তবে তোকেই না হয় আগে মারব।” সর্দ্দার নখ বাগিয়ে সামনে এগিয়ে এল, আর এইবার বাকিদের উদ্দেশে কইল, “তোরা শোন, এই ডাক্তারটাকে হত্যা করতে দিলে আমি তোদের সবাইকে মুক্তি দেব। তোরা রাজি তো?”

সকলেই নিষ্ঠুরের মতো চুপ করে রইল!

আমি হতবুদ্ধি হয়ে তাদের সকলের পানে করুণ দৃষ্টিতে চাইলাম। সৰ্দ্দার কুটিল হেসে কইল, “দেখেচিস ডাক্তার? তুই এ বাড়ির বিশেষ অতিথি, এত খাতির করে ডেকে এনেচে, অথচ তোকে বলি দিতে কারও প্রাণে বাধল না। এরেই কয় মৃত্যুভয়। মরণ শিয়রে এসে দাঁড়ালে সবাই তাকে পরিত্যাগ করে। তখন বন্ধু, বাপ, মা, ভাই, খুড়া, স্ত্রী, কেউ কখনও এগিয়ে আসে না।”

“কিন্তু দাদা আসে।”

আচমকা এই জলদগম্ভীর নিনাদ শুনে জন্তুটা সমেত আমরা সকলেই চমকে উঠে দোরের দিকে চাইলাম! প্রকাণ্ড দোরখানা খোলাই ছিল। সর্দ্দার জন্তুটা চমকে তাকিয়ে দেখল, এখন সেই দোরটুকু জুড়ে বুকের কাছে দুই বলিষ্ঠ হাত পরস্পর বদ্ধ করে দাঁড়িয়ে রয়েচে এক দীর্ঘদেহী মূর্ত্তি! পরনে ধবধবে শ্বেতবর্ণ কামিজ আর ধুতি। তার চিবুক কঠিন আর চক্ষু দুটি যেন জ্বলচে! তার ঋজু দেহের পিছন থেকে উঁকি দিচ্চে গণপতি কবিরাজ। সদার বিস্মিত হয়ে বাইরে নিজের সঙ্গীকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করল, “চাক… চাক… কোথায় তুই?… চাক!”

কালীপদ নিজের একখানা হাত বাড়িয়ে একগোছা পশুর লোম দেখিয়ে কইল, “তোর চাণুকের মৃত্যুর আগে এইটুকুই শুধু অনেক কষ্টে বাঁচাতে পেরেচি। বাকিটা….”

সদার গৰ্জ্জন করে উঠল, “তুই? এ অসম্ভব! তুই সামান্য মানুষ হয়ে চাণুকের মতো দানবকে কী প্রকারে হত্যা করতে পারিস? বেশ।”

সদারের উগ্র ইশারায় দ্বিতীয় জন্তুটা গরগর শব্দ করে বিরাট একটা লাফ দিল কালীপদর উপর। তার নখরযুক্ত থাবা যখন কালীপদর মাথা স্পর্শ করতে যাচ্চে, কালীপদ নিজের ডান হাতখানার তজ্জনী তুলে ধরল তার দিকে। আঙুলের মাথা থেকে যেন একটা নীলাভ তীব্র বিদ্যুৎশিখা ছুটে বেরুল, আর শূন্যপথেই দ্বিতীয় জন্তুটা পুড়ে ছাই হয়ে গিয়ে একমুঠো ভস্ম জমা হল শানের মেঝেতে। কালীপদ সর্দ্দারের পানে চেয়ে কইল, “ঠিক এই প্রকারে।”

সর্দ্দার হতভম্ব হয়ে হিসহিস করে কইল, “কে তুই?”

“ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া।”

বাইরে আবার মোরগ ডেকে উঠল। সেই শব্দ শুনে জন্তুটা মুখ বিকৃত করে যেন কেঁপে উঠে কালীপদকে পলকের মধ্যে এড়িয়ে গিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল খোলা দরজা দিয়ে!

কালীপদ আমার সুমুখে এসে কইল, “ওঠো ডাক্তার। বোকা ছেলে, সংক্রান্তিতে কেউ যাত্রা করে?”

ধনঞ্জয় কেঁদে ফেলে হাতজোড় করে আমাকে কইল, “আমাদের ক্ষমা করো ডাক্তার, চোখের সামনে সাক্ষাৎ শমনকে দেখে, আমরা তোমার বিপদ শুনেও প্রতিবাদ করতে পারিনি। অতিথির কাছে কলঙ্কিত করেচি নিজেদের।”

কালীপদ হেসে বললে, “না বাছা, তাতে দোষ নেই। মৃত্যুকালে মানুষের মস্তিষ্কের সাময়িক বিকৃতি ঘটে। যেমন এখন ঘটেচে ওই শেষ শয়তানটার।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “কিন্তু দাদা, ওই শয়তান তো পালিয়ে গিয়েচে।’

কালীপদ কইল, “দুর! পালানোর পথ খোলা রাখলুম কখন যে পালাবে?” আমরা কালীপদর পিছুপিছু বাইরে এসে আঁতকে উঠলাম! দানবটা জমিদার বাড়ির সদর দ্বার দিয়ে পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করচে। দোর উন্মুক্ত, কিন্তু রাক্ষসটা কোনও একটা অদৃশ্য প্রাচীরে বাধা পেয়ে পাগলের মতো তা হাতড়ে হাতড়ে ফাঁকফোকর খোঁজার চেষ্টা করচে। সে নিষ্ফল আক্রোশে গৰ্জ্জন করে উঠে একবার আমাদের দিকে দৌড়ে আসার চেষ্টা করামাত্র কালীপদ হাত তুলে তজ্জনী দ্বারা বাতাসে কাটাকুটি কাটল। একটা উজ্জ্বল আলোর চিহ্ন ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল বাতাসে আর শয়তানটা আবার যেন অদেখা কাচের দেওয়ালে এসে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল! আবার উঠে দাঁড়িয়ে ফুঁসতে শুরু করল। কালীপদ এইবার হাতের তালুটা মুখের কাছে এনে বিড়বিড় করে মন্তর পড়ে সবেমাত্র তা দানবটার দিকে ছুড়তে যাবে, হঠাৎ সেই জন্তুটা মরণাহতের ন্যায় আর্দ্র চিৎকার করে উঠল। আমরা সভয়ে তাকিয়ে দেখলাম, কোনও এক অদেখা শক্তি যেন শয়তানটার মুণ্ডুটাকে ধড়ের থেকে বিচ্যুত করে ফেলে দিল। দেহহীন মুণ্ডুটা ভীষণভাবে তাকিয়ে চোখের পাতা বন্ধ করল! ধনঞ্জয় হতভম্ব হয়ে কইল, “মহাশয়, আপনার তো অসাধারণ… কালী হাত নেড়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল, “ভারী আশ্চর্য তো! আমি কিছুই করিনি। আমি শয়তানটাকে বধ করতে উদ্যত হয়েচিলাম ঠিকই, কিন্তু তার আগেই বাইরের কেউ তাকে মুণ্ডু ছিঁড়ে বধ করেচে!”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “কিন্তু কে বধ করলে তাকে?”

কালীপদ, “তা তো বলতে পারিনে, ডাক্তার… কিন্তু… যে বধ করল, সে অনেক আগেই বধ করল না কেন?”

ধনঞ্জয় হাতজোড় করে কইল, “আপনি নিশ্চয়ই দেয়ালা করছেন, ঠাকুরমশায়। রাক্ষসটাকে বাইরে কে আর কে বধ করবে? বাইরে তো কেউই নেই!”

কালীপদ ভ্রূ কুঁচকে আঙুল দেখিয়ে কইল, “একজন ছাড়া।”

আমরা হাঁ করে তাকিয়ে দেখলাম, বাইরের বনের উপর থেকে রক্তবর্ণ সূৰ্য্য উঁকি দিচ্চেন পৃথিবীতে।

***

পরের দিন সকালে আমরা ধনঞ্জয়কে নিয়ে গণপতির ছড়া-লেখা দেওয়াল, বইপত্তর সব ঘুরে ঘুরে কালীপদকে দেখিয়েচি। কালীপদ কিছু কেতাব উলটে-পালটে দেখল। ছড়াগুলি দেখে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। গণপতির ঘোলাটে দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে কইল, “কবিরাজমশায়ের নিষ্কলুষ চোখ দুটিই বলে দিচ্চে যে, মানুষটার সমস্ত স্মৃতি মুছে গিয়ে একাকার হয়ে গিয়েচে। এমতাবস্থায় এঁর থেকে কোনওরূপ সহায়তা পাবার আশা বৃথা। হ্যাঁ, তবে একটা কথা, স্বচ্ছ, পুণ্যতোয়া এবং শান্ত নদীবক্ষের নীচেই যেমন বিকট হিংস্র কুম্ভীর লুকিয়ে থাকে, তেমনি কবিরাজের এই সরল চোখ দুটির গভীরে কোনও একটা নিরেট সত্য ঘাপটি মেরে রয়েছে।”

আমি শুধোলাম, “নিরেট সত্য আর সাধারণ সত্যে তফাত রয়েচে নাকি?”

“আলবত আছে, ডাক্তার। মানুষ ঘরে অশান্তি চায় না, এইটে হল সত্য, আর মানুষ ‘নিজের’ ঘরে অশান্তি চায় না, এইটে হল নিরেট এবং তেতো সত্য।” এইটুকু বলার পর কালীপদ একটু হেসে বলল, “জানো ডাক্তার, এই যে লোকে কথায় কথায় বলে, অমুক লোক স্ত্রৈণ, অমুক পুরুষ বউকে ভীষণ ভয় পায়। আসলে নিরেট সত্যটা হল, বউকে কেউই ভয় করে না, করার কারণও নেই। পুরুষমানুষ ভয় করে পারিবারিক অশান্তিকে। সেই ঝগড়া অথবা অশান্তি এড়ানোর জন্য বহুতর ক্ষেত্রে পুরুষেরা স্ত্রী-র অনেক কথার সহজে প্রতিবাদ করে না, তার মন জোগানোর চেষ্টা করে। সেইটেকেই অনেকে ‘ভয়’ বলে দাগিয়ে দেয়। সবটাই ওই সত্য আর নিরেট সত্যের খেলা।”

আমি হঠাৎ এই প্রসঙ্গ শুনে সন্দেহের চোখে কালীপদর মুখের পানে চেয়ে হেসে ফেললাম।

***

দুপুরের শুরুতে গণপতির ভেষজের বাগান ঘুরে দেখালাম। কালীপদ একখানা গুল্মের থেকে কতকগুলি পাতা ছিঁড়ে নিয়ে শুঁকল। তারপর ধনঞ্জয়কে কইল, “এসব গাছগাছালির মাথামুণ্ডু ছাই কিছুই বুঝচিনে। যে বুঝত, সে উন্মাদ হয়ে বসে রইল।”

ধনঞ্জয় বিব্রত হয়ে বললে, “সত্য কথা, ঠাকুর। এই পাগলামি যদি কোনও উপায়ে দূর করা যেত, তবে চিকিৎসাজগতে বেশ কিছু রহস্য খুলে যেত বলেই আমার অনুমান।”

কালীপদ বিরসভাবে বললে, “উপায় যে একেবারে নেই তা নয়। একখানা তন্ত্রবিধি রয়েচে, যার নাম সহস্র উচাটন বিধি। এর মাধ্যমে যে-কোনও উন্মত্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কের সহস্রার চক্রকে সম্পূর্ণরূপে বশীভূত করে তার অতীতের সব কথা টেনে আনা যায়, কিন্তু এই বিধি প্রয়োগ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।”

ধনঞ্জয়, “কেন? নিষিদ্ধ কেন, ঠাকুর?”

কালীপদ— “কারণ এর প্রয়োগের মাধ্যমে অভীষ্ট সিদ্ধ হয় বটে, কিন্তু সেই হতভাগ্যের স্নায়ু, ধমনিতে যে অস্বাভাবিক চাপের সৃষ্টি হয়, তাতে সেই উন্মাদ ব্যক্তি কয়েকটি দিনের মধ্যেই অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।” আমি— “এ তো বড়ো ভয়ংকর বিধি! দাদা, এই বিধি কি আমাদের উপরেও প্রয়োগ করা সম্ভব?”

কালীপদ— “না। কোনও সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের উপরে সহস্র উচাটন প্রয়োগ করলে ফলের সম্ভাবনা শূন্য। তাতে তোমার কোনও ক্ষতিও হবে না, আবার তোমার মস্তিষ্ক কারও বশীভূতও হবে না। কিন্তু উন্মাদ ব্যক্তি এই রুশীকরণের অমোঘ ফাঁদ এড়াতে পারে না। যাক গে, ওসব কথা আলোচনার কোনও যৌক্তিকতা এই মুহূর্তে নেই।”

ধনঞ্জয় কইল, “যা হোক, আপনারা এই বেলা স্নানাহার সেরে ফেলুন, ঠাকুরমশায়। বেলা বাড়ছে।”

কালীপদ দোরের সামনে দাঁড়িয়ে-থাকা দুজন পরিচারককে বলল, “আমি স্নান করতে যাচ্চি। পারলে একটু নারকেলের তেল আর কাচা ধুতি নিয়ে এসো।”

বৃদ্ধ পরিচারক তৎক্ষণাৎ “এখুনি দিচ্ছি, ঠকুরমশায়” বলে চলে গেল। যেতে যেতে অপর পরিচারকটি বৃদ্ধকে ফিশফিশ করে শুধোল, “এই ঠাকুরমশায়কে দেখলেই বড়ো ভক্তি হয়, তা-ই না, বলো খুড়ো? আমাদের সবার জীবন রক্ষা করেছেন উনি।”

বৃদ্ধও ফিশফিশিয়ে হেসে বলল, “শুনেচি উনি আমাদের বাবুদের মতোই একজন নামকরা জমিদার। আবার একজন খুব ডাকসাইটে গুণীনও। ঠাকুরমশায় থাকতে আর ভয় করিনে রে বাপ।”

***

বিকেলে একসঙ্গে আরামকেদারায় বসে বিরাট বারান্দায় চা পান করচি, হঠাৎ চোখে পড়ল, গণপতি কবিরাজ বারান্দার একদিক দিয়ে কোথায় যেন চলেচে। সে তার গোটা মাথা একখানা লাল রঙের গামছা দিয়ে মুড়ে রেখেচে। গামছার অপর প্রান্ত তার কাঁধ থেকে ঝুলচে। ধনঞ্জয় তড়িঘড়ি উঠে তার সুমুখে গিয়ে রাগের স্বরে শুধোল, “এ কী, জ্যাঠামশায়! আপনি ভৃত্যদের মতো গামছা মাথায় দিয়ে চলেচেন কেন? লোকজন এ পাগলামো দেখলে কী কইবে আপনাকে?”

গণপতি একবার চোখ তুলে তাকাল ধনঞ্জয়ের দিকে। এই প্রথমবারের জন্য দেখলাম, গণপতির দুই চোখ যেন ঝকঝক করচে! সে পালটা চিবিয়ে উত্তর দিলে, “পথ ছাড়।”

ধনঞ্জয় অবাক হয়ে কইল, “কী বললেন?”

আবার ক্রুদ্ধ স্বর এল, “পথ ছাড় আমার!”

কালীপদ তাড়াতাড়ি ধনঞ্জয়কে সরিয়ে আনলে পর গণপতি একবার কালীপদর দিকে তাকিয়ে চলে গেল। ধনঞ্জয় বিস্মিত হয়ে অভিযোগ করার ভঙ্গিতে কইল, “দেখলেন ঠাকুরমশায়, দেখলেন? পাগলামি কতখানি বৃদ্ধি পেয়েচে?”

কালীপদ ধনঞ্জয়কে প্রবোধ দিয়ে বলল, “ওঁর দোষ নয়, ধনঞ্জয়। দুন্দুভির চিঠিখানা নিয়ে অবচেতন মনে তোমার জ্যাঠামশায়ের একটা ভীষণ আতঙ্কের চোরাস্রোত বয়ে চলেচে। উনি হয়তো চাকরদের মতো করে সেজে দুন্দুভির শ্যেনদৃষ্টিকে ফাঁকি দিতে চাইচেন। উন্মাদের মন বোঝা সাধারণ সুস্থ মানুষের কাজ নয় হে।”

“কিন্তু ঠাকুর, এভাবে উত্তরোত্তর উন্মাদনা বৃদ্ধি পেলে আমাদের সমস্যা তৈরি হচ্চে যে। যা কিছু রহস্য, সমাধান, চাবিকাঠি রয়েচে, সেসব ওই শয়তানকে দিয়ে দিলেই আপদ যেত। প্রাণটা তো রক্ষা পেত। কিন্তু ওঁর যা অবস্থা, তাতে ওঁর তিলমাত্র আগের কথা স্মরণ আছে বলেও মনে হয় না। ওহ্, ক্ষোভে আমার নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা হচ্চে, ডাক্তার।”

কালীপদ হেসে কইল, “ছিঁড়ে ফেললেও ক্ষতি নেই। গণপতি কবিরাজের জাদুতে আবার চুল গজাবে।”

আমি বললাম, “এর অর্থ?”

“এর অর্থ, দেওয়ালে লেখা প্রথম হেঁয়ালিটার রহস্য আমি ভেদ করে ফেলেচি। উনি যেসব ছড়া দেওয়ালে লিখে রেখেছেন, এগুলি তাঁর পুরোনো নৈমিত্তিক কোনও ঘটনাবলির কথা নয় হে। সম্ভবত ওইগুলি হল বিভিন্ন রোগের অদ্ভুত চিকিৎসার উপায়।”

কালীপদ আবার বলতে থাকল, “মাথে চলে ঘৃত নিয়া। এখানে ‘মাথে’ অর্থ মাথায় করে নয়। মাথে অর্থাৎ অগ্রভাগে। যে মেয়েদের বিয়ে হয়নি, তাদের আমরা কুমারী বলে থাকি। অর্থাৎ দুয়ে মিলে ঘৃতকুমারী গাছের পাতা বোঝায়। কন্দ বলতে পিঁয়াজ, আদা, রসুন বা ওলজাতীয় আনাজগুলিকেই বোঝায় আর ওসব কখনও ছাঁচ দিয়ে গড়া যায় না। ‘ছাঁচে গড়া কন্দ’ কথাটার অর্থ নিশ্চয়ই ছাঁচি পিঁয়াজ। ঘৃতকুমারীর রসালো পাতাকে টুকরো করে, তার সঙ্গে ছাঁচি পিঁয়াজের রস মিশিয়ে মাখলে ‘ইন্দ্ৰলুপ্ত’, অর্থাৎ টাক দেখা দেয় না।”

আমি আগ্রাসীর মতো উৎসুক হয়ে বলে উঠলাম, “কী আশ্চর্য্য! কী অবিশ্বাস্য! আর দ্বিতীয় ছড়াখানার অর্থ?”

কালীপদ কইল, “বাকিগুলি সম্বন্ধে নিশ্চিত না হয়ে কইব না।”

আমরা চমৎকৃত, বিস্ময়-মাখা মুখে তাকিয়ে রইলাম। কালীপদ কইল, “তোমার জ্যাঠামশায়ের বইঘরের বইগুলো আমি একান্তে একটু ঘেঁটে দেখতে ইচ্ছুক। কিছু না হলেও সময়টুকু তো কাটবে।”

ধনঞ্জয় সম্মতি দিয়ে বললে, “যখন আপনার ইচ্ছা, ঠাকুরমশায়।”

***

আমি আর ধনঞ্জয় বিকেলবেলায় ছাতের আলশেতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা কইচি। কালীপদ অলসভাবে একখানা রামায়ণের পাতা ওলটাচ্চে। আমি বললাম,

“তিনটে দিন কেটে গেল, দাদা, আর কতদিন পরের বাড়ি পড়ে থাকা যায়? ওদিকে বউঠান ভেবে সারা হচ্চে হয়তো।”

ধনঞ্জয় বলল, “ঠাকুরমশায়, জানি, বেখাপ্পা অনুরোধ করচি, কিন্তু আপনি চলে গেলে আমাদের ত্রাসের আর সীমা রইবে না, ঠাকুর।”

কালীপদ দূরে দৃষ্টি মেলে কী যেন ভাবচে। ধনঞ্জয় আবার বলল, “আপনাদের এভাবে উদ্দেশ্যহীন, বিভ্রান্ত অবস্থায় রেখে দিয়ে বিব্রত করতে ভারী অসোয়াস্তি হচ্চে আমার, কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি যে, যদি ওই দুর্দান্ত দুন্দুভি আক্রমণ করে, তবে তাকে প্রতিহত করলে হয়তো আপনিই করতে পারেন। চিঠিতে একটা আক্রমণের আভাস ছিল বটে, কিন্তু দিনক্ষণ তো নেই তাতে, তাই কতদিন আর আপনাদের…”

কালীপদর স্বরে কথায় বাধা পড়ল, “দিন না থাকলেও ক্ষণ আছে, ধনঞ্জয়।”

এইবার আমিই উত্তেজিত হয়ে কইলাম, “ক্ষণ? কোন ক্ষণ?”

কালীপদ কইল, “দুন্দুভি ওই সতর্কবাণীর চিঠিখানা লেখার সময়ে হয়তো নিজের অবচেতন মনে চলতে থাকা ক্ষমতাজনিত অসাবধানতার ফলেই নিজের গুপ্ত আক্রমণের একটা ক্ষীণ হদিস দিয়ে ফেলেচে।”

ধনঞ্জয়ের কপালে ভয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ল। সে এগিয়ে এসে উদগ্রীব হয়ে শুধোল, “ঠা…ঠাকুর মশায়, কবে আক্রমণ করবে ওই রাক্ষস?”

কালীপদ, “চিঠিখানা স্মরণ নেই? যেদিন গোটা পৃথিবী আঁধারে ডুবে যায়! অমাবস্যার রাতে।”

আমি চোখ বিস্ফারিত করে জিজ্ঞাসা করলাম, “অমাবস্যা কবে?”

কালীপদ বিকেলের পড়ন্ত বেলায় আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কইল, “আজ!”

ধনঞ্জয় ক্ষোভে কপালে হাত চাপড়াল!

***

রাতে আহারের পরে লক্ষ করলাম, গণপতি কবিরাজ রাতের আঁধারে বাইরে দৃষ্টি মেলে বিরাট জানালা দিয়ে তাকিয়ে রয়েচে। ঘরের ভিতরে জ্বলা বাতিতে তার ছায়াশরীরটা চোখে পড়চে। আহার সমাপ্ত হলে পর কালীপদ জমিদার বাড়ির সব কজন মানুষকে নীচের প্রকাণ্ড বৈঠকখানায় জড়ো করল। এদের কাউকেই এক মুহূর্ত আগে অবধিও আসন্ন প্রাণঘাতী বিপদের কথা জানানো হয়নি, কিন্তু এইবার সকলেই হতভম্ব হয়ে পরস্পরের মুখের দিকে চাইতে লাগল।

কালীপদ এক বাটি আটা একটা লাল কাপড়ে রেখে, লাল আসনে বসে, সামনে একখানা নারকেল নিয়ে গোটা ঘরের প্রতিটি দরজা-জানালার সামনে দাগের মতো করে গণ্ডি এঁকে, আবার আসনে বসে মন্তর পড়তে থাকল, ওঁ নমোঃ শ্রীগুরবেঃ নমোঃ… ওঁ হ্রী ক্রী রী ভদ্রকালৈঃ নমোঃ… যমদূতায়ঃ, যিক্ষীঃ রক্ষীঃ, কালভৈরবঃ কালপুরুষায়ঃ চঃ… ইথ্যঃ বন্ধনেঃ সর্পছিদ্রম, খগঃছিদ্রম্, মূষিকছিদ্রায়ঃ চঃ… যক্ষঃ রক্ষঃ মানবঃ দানবঃ পিশাচঃ ভেদ্যনাস্তিঃ ইথঃ বন্ধনম্…।”

মন্তর পড়ে সজোরে নারিকেলখানি ফাটিয়ে ফেলে কালীপদ আমাদের কইল, “ওই আটার গণ্ডিতে সজোরে ফুঁ দিয়ে দ্যাখো।”

আমরা প্রাণপণ জোরে ফুঁ দিতেও একতিল আটা স্থানচ্যুত হয়ে উড়ে গেল না দেখে কালীপদ কইল, “বন্ধন সম্পন্ন হয়েচে। একটি প্রাণীও যেন গণ্ডির বাইরে না বেরোয়। ভিতরে থাকলে তোমরা নিরাপদ।”

দেওয়ালঘড়িতে সময়ের কাঁটা এগোতে থাকল। ঘরের সকলের মুখেই একটা ভয়ের পাথর চেপে রয়েচে। আমরা ঘর জুড়ে পায়চারি করে চলেচি, কালীপদ রাত জাগার জন্য সেই রামায়ণখানা আলগোছে পড়ে চলেচে। আমি অজানা আতঙ্কে ঘেমে উঠেচি। কাঁটায় কাঁটায় যখন রাত্তির বারোটার গম্ভীর ঘণ্টা পড়ল, তখন ধনঞ্জয় কালীপদকে কইল, “আচ্ছা ঠাকুরমশায়…”

সঙ্গে সঙ্গে কালীপদ নিজের ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে সশব্দে কইল, “শশশশশশ!”

আমি খুব ক্ষীণকণ্ঠে শুধালাম, “কী? কী হয়েচে, দাদা?”

কালীপদ বইটা রেখে কানের পাতায় হাতের তালু ঠেকিয়ে একটু কী শুনে বলল, “সে আসচে, ডাক্তার।”

গণপতির চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়চে। সে বিড়বিড় করে বললে, “সব আমার জন্য। সব আমার কারণে।”

***

আমরা পরস্পরের মুখ তাকাতাকি করচি, হঠাৎ দেওয়াল ক্যালেন্ডারের পাতাগুলি ঝটপট করে উড়তে শুরু করল। জানালা আর দরজার বন্ধ কপাটগুলি দড়াম দড়াম শব্দে খুলে গেল! বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, পিছনের গাছপালার দল ভীষণ ঝড়ে নুইয়ে পড়েচে! বাইরে প্রলয় ঝড় উঠেছে, সঙ্গে বজ্রবিদ্যুৎ! বাতাসের দাপটে কালীপদর দেওয়া আটার গণ্ডি খুব অল্প অল্প করে স্থানচ্যুত হতে শুরু করল! কালীপদ সেইদিকে তাকিয়ে সবিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল, “হা ঈশ্বর! এ কোন শত্রু? এ যে প্রবল শক্তিধর!”

কালীপদর কথা শুনে বাইরে থেকে কেউ যেন রক্ত-জল-করা হাসি হেসে উঠল।

আটার গণ্ডি দোরের সামনে এক জায়গায় অনেকটা সরে গেল। কালীপদ জানালার দিকে নতুন গণ্ডি দিতে দিতেই আমার হাতে মন্তর-পড়া আটার কাপড়টা দিয়ে কইল,

“ডাক্তার, শীঘ্র করো। ওই বাঁধনের উপরে এই গুঁড়ো ছড়িয়ে দাও। আমি এইদিকটা দেখচি।”

আমি সেই আটার পুঁটলি থেকে আটা নিয়ে দাগ দিচ্ছি চৌকাঠে, হঠাৎই গণপতি—”আমার জন্য এসেচিস তুই? নে আমাকে। আমার পরিবারকে মুক্তি দে আমাকে মেরে।” এই বলে দৌড়ে এল দোরের দিকে! কালীপদ চিৎকার করে কইল, “সামাল ডাক্তার!”

আমি চকিতে উঠে দাঁড়িয়ে গণপতি যখন দোর পেরোতে যাবে, সেই সময়ে তাকে জাপটে ধরলাম। সামান্য ধস্তাধস্তির পর যখন তাকে থামাতে পারলাম, তখন কালীপদ ক্ষোভে দুই হাতে কপালের রগ টিপল আর তার হতাশারুদ্ধ কণ্ঠ শোনা গেল, “এ কী সর্ব্বনাশ করলে ডাক্তার! এ কী করলে!”

আমি হতভম্ব হয়ে নীচের দিকে চেয়ে আতঙ্কে কাঠ হয়ে গেলাম! আমি আর গণপতি গণ্ডির বাইরে এসে পড়েছি! আমি গণপতির হাত টেনে আবার দৌড়ে প্রবেশ করতে যাব, হঠাৎ সভয়ে আবিষ্কার করলাম যে ঘরে ঢোকার পথ রুদ্ধ! একটা অদৃশ্য কাচের দেওয়াল যেন উঠে গিয়েচে দোর জুড়ে! আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, “দাদা…!”

কালীপদ দৌড়ে এসে সেই দেওয়ালে বাধা পেয়ে ছিটকে পড়ে গেল মেঝেতে। সে উঠে দাঁড়িয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে বিড়বিড় করে নিজের তজ্জনী ছোঁয়াল সেই কাচের বেড়ায়। আঙুল থেকে একটা উজ্জ্বল নীলাভ শিখা উৎপন্ন হয়েই নিবে গেল। আমরা দেখলাম, তাতে কাচের দেওয়ালে অতি সামান্য একটু চিড় ধরেচে মাত্র! কালীপদ প্রাচীরখানা ভাঙার উদ্দেশ্যে তাতে সবলে কিল মারতে থাকল। তার চোখের থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। সে ক্ষীণকণ্ঠে কইল, “এ কী করলে ডাক্তার। এ কী বিপদে ফেললাম আমি তোমাকে! হা ভবানী।”

আমি আর গণপতি ভীত হয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, বাইরের ফটকের কাছে তিনখানা ভীষণ যমদূতের মতো ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েচে। দু-পাশের দুটি মূর্ত্তি সেই দিনের ওই রাক্ষসগুলোর মতো আধামানুষ, আর মাঝের মূর্তিটি আকারে একটি দানববিশেষ! কিন্তু সে রাক্ষস নয়, মনুষ্যমূৰ্ত্তি! গণপতি সেদিকে চেয়ে ভয়ের কণ্ঠে বললে, “শয়তান! দুন্দুভি!”

কালীপদ ঘরের একখানা কেদারা তুলে পাগলের মতো দোরে ছুড়ে মারল, কিন্তু কেদারা সেই অদেখা দেওয়ালে বাধা পেয়ে ভেঙে পড়ে গেল। কালীপদ হাতে লাল কাপড়ে সেই মন্তর পড়া নারিকেলখানা নিয়ে তার উপর মন্ত্রের মতো হাত ঘোরাতে ঘোরাতে হতাশায় পাগলের ন্যায় চিৎকার করে উঠল, “আমাকে রুদ্ধ করে রাখে এত ক্ষমতা কার? কে সে?”

দুন্দুভি দোরের সামনে এসে দাঁড়াল। তার দুই সঙ্গী আমাদের দুজনকে সবলে আটকে রেখেচে। দুন্দুভির মাথা কামানো, দাড়ি-গোঁফ শূন্য, কপালে লাল টিকা আর চোখে নরখাদক বাঘের দৃষ্টি! সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠল, “পাতালবন্ধনম্।”

কালীপদর হতবাক, শিথিল হাতের থেকে উপচারগুলি পড়ে গেল। সে বিহ্বল মুখে চেয়ে রইল দুন্দুভির পানে, আর একবারমাত্র ফ্যাকাশে গলায় জিজ্ঞাসার সুরে স্বগতোক্তি করল, “পাতালবন্ধন! এ যে অসম্ভব!”

দুন্দুভি কুটিল হাসি হেসে চোখ দুটি সরু করে কইল, “অসম্ভব নয়, মূর্খ। এ বিদ্যা এখনও সম্পূর্ণ লোপ পায়নি। তোরা এই অতি গুহ্য বিদ্যে জানবি কেমন করে? স্বয়ং পাতালভৈরবী এই বিদ্যার রক্ষয়িত্রী।”

কালীপদ বিহ্বলের ন্যায় অবিশ্বাসের সুরে কইল, “পাতালভৈরবী! অসম্ভব। সে বিদ্যা তো শুনেচি, পৃথিবী থেকে বহুকাল পূর্ব্বেই সম্পূর্ণরূপে লুপ্ত হয়ে গিয়েছে!”

দুন্দুভি তিক্ত বিষবৎ অট্টহাসি হেসে বললে, “লুপ্ত নয়, মূর্খ, সুপ্ত বলতে পারিস। তোরা কেবল এই ভয়ানক তন্ত্রখানার নামটুকুই শুনেচিস, কিন্তু আমি এই বিদ্যা উদ্ধার করে তাকে আয়ত্ত করেচি। একে খণ্ডন করার সাধ্যি তোর নেই বলেই ইন্দুরের ন্যায় পিঞ্জরে বন্দি হয়ে রয়েছিস। ওইখানেই তোর যা জারিজুরি রয়েচে, দেখাতে থাক। আমি যে কাজে এসেচি তা সম্পন্ন করি।”

কালীপদ চেঁচিয়ে উঠল, “তোমার ক্ষমতা, তোমার তন্ত্র আমার থেকে হীন এবং সেইজন্যই তুমি ভীরুর ন্যায় আমাকে বন্দি করলে। বিদ্যের সম্মুখরণে তুমি আমাকে কখনও বিমুখ করতে পারবে না।”

দুন্দুভি দু-দিকে মাথা নেড়ে উত্তর দিলে, “তুই ধূর্ত হতে পারিস, তবে আমার চেয়ে অধিক কখনও নয়। তোর এসব কথা শুনে আমি কখনোই এই বাঁধন খুলে দেব না।”

এই বলে দুন্দুভি আমার দিকে এক-পা এগোতেই কালীপদ মরিয়া হয়ে চিৎকার করে উঠল, “তোমার মারতে হলে আমাকে মারো দুন্দুভি, আমি তোমার যোগ্য প্রতিপক্ষ, কিন্তু ডাক্তার আমার প্রাণাধিক, তার জীবন তুমি আমাকে ভিক্ষা দাও।”

এই কথায় দুন্দুভির চোখ জ্বলে উঠল! সে আবার হেসে বলল, “বটে এ-ও বুঝি চিকিৎসা ব্যবসায়ী? এক বাড়িতে এতগুলি ডাক্তার থাকা মোটে সমীচীন নয়। একটা না হয় কমই পড়ল। গণপতির সঙ্গে এ-ও বাইরে বেরিয়ে আসায় শাপে বর হয়েচে। একে আমার কাজে লাগবে। পাগলকে তো পুরো ভরসা নেই।”

ধনঞ্জয় কেঁদে হাতজোড় করে বলে উঠল, “আমার জ্যাঠামশায়ের সত্যিই পূর্ব্বের সমস্ত বিদ্যা লুপ্ত। তাঁর থেকে আপনি কিছুই জানতে পারবেন না। বিশ্বাস করুন। ওঁকে ছেড়ে দিন।”

দুন্দুভি তার শার্দূল দৃষ্টি ঘুরিয়ে কইল, “ওই যে তখন বললাম, লুপ্ত না সুপ্ত, তা এখনই বেরিয়ে পড়বে।” এই বলে দুন্দুভি নিজের বস্ত্রাবরণ থেকে বের করল একখানা নাতিদীর্ঘ হাড়ের দণ্ড, তার মাথায় শাঁখা, পলা আর লাল সুতো জড়ানো। সেই হাড়খানা নিয়ে দুন্দুভি এগিয়ে এসে জড়বৎ দাঁড়িয়ে-থাকা স্থাণপতির ললাটে ছোঁয়াল। কালীপদ পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, “পাষণ্ড! শয়তান! নরকের কীট? মানুষটা মরে যাবে যে!”

ধনঞ্জয় কাতর হয়ে কালীপদকে ঝাঁকিয়ে আকুলভাবে শুধোল, “এই শয়তান জ্যাঠামশায়ের সঙ্গে কী করছে, মুখুজ্জে মশায়?”

কালীপদ ক্ষোভপূর্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কইল, “নরাধমটা স্বার্থসিদ্ধির জন্য গণপতির সুপ্ত স্মৃতি পুনরুদ্ধার করতে তার প্রতি সহস্র উচাটন প্রয়োগ করছে, যে বিধির কথা তোমাদের আমি বলচিলাম। এরপর গণপতির থেকে রাক্ষসটা সব গুপ্ত কথা জেনে ফেলবে এবং গণপতি অচিরেই মাথার শিরার রক্তচাপের আধিক্যে মারা পড়বে।” এই বলে কালীপদ শান-বাঁধানো মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ল। তার চোখ থেকে দেখলাম, টপটপ করে অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়চে।

হাড়খানা সরিয়ে নেবার পর গণপতির চোখ ধ্যানস্থ হবার মতো প্রশান্ত হয়ে এল। দুন্দুভি সাপের ন্যায় পলকহীন স্থিরদৃষ্টিতে চোখের মণি তুলে গণপতিকে শুধোল, “গুরু?”

গণপতি নেশাগ্রস্ত চোখে কইল, “আচাৰ্য্য চক্রায়ুধ।”

দুন্দুভি — “কুলাশ্ৰম?”

গণপতি— “কিব্বের গাঁ।”

দুন্দুভি— “তোমাকে গুরুদেব কোন পুথির গুপ্তবিদ্যা দান করেচিলেন?”

গণপতি যন্ত্রের মতো বলল, “হ্যাঁ, ছিন্নমস্তার পুথি।”

দুন্দুভি— “সেই বিদ্যা কীসের বিদ্যা, গণপতি?”

গণপতি যেন সুপ্তোত্থিতের ন্যায় জড়বৎ তাকিয়ে রইল। দুন্দুভি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে সজোরে তাকে একখানা চপেটাঘাত করতে গণপতি বলে উঠল, “ এক দেহের মুণ্ড অন্য দেহে জোড়া দেবার বিদ্যা। গুরুদেব কইতেন, এই চিকিৎসাবিজ্ঞানের মাধ্যমেই সম্ভবত গৌরীনন্দনের ধড়ে ঐরাবতের মুণ্ড জোড়া হয়েছিল।”

কালীপদ ভীষণ বিস্ময়ে বসা অবস্থা থেকে লাফিয়ে উঠল। ধনঞ্জয়ের মুখ হাঁ হয়ে রইল, আর আমি কম্পিত শরীরে একখানা দেওয়ালে এলিয়ে দাঁড়ালাম। দুন্দুভি কুটিল মুখে কালীপদকে বলল, “অবাক হোসনে মূর্খের দল। আমার গুরু চক্রায়ুধ সারাজীবনের সাধ্যায় সূর্য্যদেবের পুথি কণ্ঠস্থ করেচিলেন। সূর্য্যের পুথি অর্থ আয়ুর্ব্বেদ শাস্ত্র। স্বয়ং সূর্য্য এই শাস্ত্রের রচয়িতা। আমি তাঁকে হত্যা করে তাঁর পুথি কেড়ে নিয়েচিলাম, সে পুথির রহস্যও ভেদ করেচিলাম, এমনকি হুবহু সেই বিদ্যায় এই নরপশুদেরও তৈরি করেচিলাম, কিন্তু শেষ চাবিকাঠির নাগাল পাইনি বলেই এদের আয়ুষ্কাল একদিনের বেশি হয় না। সকাল হতেই সূর্য্যের আলো পৃথিবীর বুকে পড়লে এইসব জোড়কলম জীব কেন যেন প্রাণ হারায়। এইবার আমি এই শেষ চাবিকাঠির হদিস নিয়ে অমর হব। আমার মাথাকে সচল রাখার বিদ্যা আমি জানি, কিন্তু দেহের জরাকে ঠেকাতে হলে নিত্যনতুন সবল দেহ চাই। আজ আমার নিজের মুণ্ড নতুন, নবীন দেহে প্রবেশ করবে…”

দুন্দুভির কথা শেষ হবার আগেই আমি সন্তর্পণে দেওয়ালের পাশে রাখা একখানা কোদাল তুলে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। চকিতে দুন্দুভির আঙুল আমার দিকে ফিরল আর আমি নিজের চেতনা হারিয়ে তার বশবর্তী হয়ে পড়লাম! আমার চোখ দুটির সামনে আর মণিতে একটা নীলাভ আলো ভেসে উঠল। এর পরের ঘটনাগুলো আমি লোকমুখে শ্রবণ করেচিলাম।

দুন্দুভি হিংস্র মুখে গণপতিকে শুধোল, “গুরুদেব নিজের আশ্রমে মোরগ আর নীলকণ্ঠ পাখি পুষতেন কেন? চাবিকাঠির রসায়নে গুরুদেবের বলা ওই মোরগ আর নীলকণ্ঠ পাখির ওই হেঁয়ালি ছড়ার ভূমিকা কী? শিগগির বল।”

গণপতি ঘোর-লাগা গলায় বিহ্বল মুখে উত্তর দিলে, “মোরগ আর নীলকণ্ঠ পাখির পালক হাঁড়ির মধ্যে অন্তর্দ্ধমে পুড়িয়ে, সেই ভস্মকে ক্বাথের মতো মেখে, কাটা মাথার জোড়ে মাখিয়ে দিলে জোড়কলম সম্পূর্ণ হয়। সেই জোড়া ধড় আর মুণ্ড সুস্থ সবল মানুষের মতোই সুদীর্ঘকাল বেঁচে থাকে।”

দুন্দুভি আবার গণপতির চোখের সামনে হাত ঘুরিয়ে শুধোল, “মেরুতন্ত্র কী, গণপতি?”

গণপতি কইলেন, “মেরুপ্রদেশের আদিবাসীদের এক নিজস্ব তন্ত্রবিধি, যে বিধি গুরুদেব পুনরুদ্ধার করেচিলেন।”

দুন্দুভির ইশারায় তার সঙ্গে আসা দুই শয়তানের একজন একখানা সবল তরুণের মৃতদেহ এনে হাজির হল কাঁধে করে, আর অপরজন কোথাও থেকে ঝড়ের বেগে হাজির হয়ে নিজের হাতের মুঠোয় ধরা একগুচ্ছ রঙিন আর নীলবর্ণ পাখির পালক দেখিয়ে কইল, “এই নিন প্রভু।”

দুন্দুভি হাঃ হাঃ হাঃ করে হেসে উঠে কইল, “কী ডাক্তার? সব বুঝেচ তো? আজকের এই শৌর্য্যের ভাগ আমি তোমাকেই দেব। তুমি আজকে আমার মুণ্ড এই জোয়ান দেহে জোড় দিয়ে আমার আয়ু বৃদ্ধি করবে। করবে তো?”

ডাক্তারের দুই চক্ষে তখন নীল আলো ধকধক করচে। সে বুকে হাত রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে কইল, “পারব প্রভু।”

দুন্দুভি আবার হেসে উঠে কালীপদর দিকে ঘুরে কইল, “মানুষ অমর হয় না। সেই অমরত্বের সমস্ত পথ সৃষ্টিকর্তা রুদ্ধ করে রেখেছেন। কিন্তু আমার মতো কিছু মানুষ অমর না হয়েও অমরত্বের সমতুল হয়ে ওঠার পন্থা খুঁজে নেয়। দেহের পর দেহ বদলে যাবে, কিন্তু আমি জীবিত রইব। আমার নতুন দেহ প্রতিবারই আমার মাথাকে নিজের দেহরসের দ্বারা নবীন করে তুলবে।”

দুন্দুভি পিছন ঘুরে কইল, “চলো তোমরা। দেহবদলের পর তোমাদের সকলকে হত্যা করতে হবে। তোমাদের মৃতদেহগুলো ফেলতে হবে, কত কাজ আমার। চলো চলো।”

ডাক্তার আর গণপতি কইল, “যথা আজ্ঞা, প্রভু।”

সকলে মিলে হাঁটা দিল গণপতির চিকিৎসাঘরের পানে। কালীপদ আর ধনঞ্জয় মরিয়া হয়ে হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে ডাকল, “জ্যাঠামশায়! ডাক্তার!”

সে আকুল ডাক তাদের কানে বিশেষ সাড়া জাগাল না।

***

দুন্দুভি অসহায় একঘর বন্দিকে ফেলে রেখে চলে গেল। কালীপদ দু-হাতে নিজের মুখ ঢেকে বসে পড়ল। ধনঞ্জয় অস্ফুট স্বরে কইল, “ঠাকুর!”

কালীপদ মুখ তুলে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকাতে ধনঞ্জয় আবার বললে, “মুখুজ্জে মশায়, মানুষ কি কখনও অমর হতে পারে? তাহলে পুরাকালের রাক্ষস, দানবরা অমর হয়নি কেন? মহিষরাজ বা দশানন অমর হয়নি কেন? তারা কি বলবুদ্ধিতে এই খুনি দুন্দুভির চাইতে ন্যূন ছিল? উত্তর দিন ঠাকুর।”

কালীপদ কপালের রগ টিপে কইল, “তাদের সঙ্গে এই নরকের কীট দুন্দুভির তফাত রয়েচে, ধনঞ্জয়। তারা স্বদেহে অমর হতে চেয়েচে, কিন্তু এই রাক্ষস দেহ বদলে বদলে দেহান্তরিত হয়ে নিজের দেহ এবং মস্তিষ্কের অমরত্বের পথ খুঁজে নিয়েচে। এর চাইতে বড়ো সর্ব্বনাশ আর কি হয়, ধনঞ্জয়?”

বৃদ্ধ পরিচারক নীচু হয়ে কালীপদর পা ছুঁতে গেল। কালীপদ তৎক্ষণাৎ পা সরিয়ে নিয়ে কইল, “আরে আরে, খবরদার পা ছোঁবেন না। আপনি বয়োবৃদ্ধ।”

বৃদ্ধ করজোড়ে অশ্রুপূর্ণ চক্ষে কইল, “আমি ছোটোবেলায় বাপ-মায়ের কাছে অনেক গল্প শুনেচি, ঠাকুর। রাক্ষসেরা নাকি কখনো চিরঞ্জীব হতে পারে না। তাদের বধ করতে ভগবান কাউকে না কাউকে ভর করেন। চিরদিন বিশ্বাস করে এসেচি, মাথার উপর ভগবান রয়েচেন। সে বিশ্বাস আমার কে টলাবে, বামুনঠাকুর?”

কালীপদ একটা শ্বাস ফেলে বললে, “তা-ই যেন হয়।”

***

অনেকখানি সময় নিশ্চুপভাবে কেটে চলল। বাইরের দরজা-জানালায় মাঝেমধ্যেই দুন্দুভির সঙ্গী দুটির রাক্ষুসে মুখ উঁকি মেরে যাচ্চে। দানবাকৃতির মানুষ-সমান ঘড়ির কাঁটা অবিরাম চলতে থাকল। কালীপদ শ্রান্তভাবে জানালার বাইরে তাকিয়ে রয়েচে। বাইরের আকাশ ধীরে ধীরে সামান্য ফিকে হয়ে এল বটে, কিন্তু আকাশ জুড়ে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মেঘের চাদর আকাশকে মুড়ে রেখেচে। হঠাৎ দড়াম শব্দে উপরের দরজা খুলে গেল! সকলে হুড়োহুড়ি করে গণ্ডি-বাঁধা ঘরের দরজা-জানালা দিয়ে সাধ্যমতো উঁকি মেরে দেখল, দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল গণপতি কবিরাজ। তার মুখ উদভ্রান্ত! তারপর বাইরে এল ডাক্তার। তার চোখে তখনও নীলাভ জ্যোতি। সম্মোহনের ঘোরে দুজন মিলে কলের পুতুলের ন্যায় নীচে নামতে আরম্ভ করল। তারা নীচে এসে পড়ল, আর তারপরই সবার চাপা উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে দুই সম্মোহিত ব্যক্তির পিছন থেকে উকি মারল দুন্দুভির কুটিল মুখ!

তার মুণ্ড অবিকৃতভাবে জুড়ে গিয়েচে সেই দশাসই, বলিষ্ঠ তরুণের ধড়ে। গলার জোড়ের কাচেসামান্য একটা বলয়ের মতো কালচে দাগ। দুন্দুভি দোরের সামনে এসে ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে কালীপদর দিকে চেয়ে মুখ খুলল, “আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে কী দেখচিস? কার অপেক্ষা করচিস, মূর্খ জীব? সূর্য্যের? তাকিয়ে দেখ, গোটা আকাশ মেঘে ঢেকে ফেলেচে। সূর্য্যোদয় নিজের নিয়মেই হবে, কিন্তু মেঘ না থাকলেও ওই সূর্য্যের আলো আর আমাকে বধ করতে পারবে না। তোদের কবিরাজ আর ডাক্তারকে নিয়ে ভাবনা নেই। ওদের সম্মোহন আমি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ নিবৃত্ত করতে পারবে না। ওরা ওদের ভয়ংকর মরণযন্ত্রণা তিলমাত্র টের পাবে না, কিন্তু তোরা পাবি। ভীষণ যন্ত্রণা দিয়ে মারব তোদের। আচার্য্য চক্রায়ুধের গুপ্ত রসায়নের রহস্যের কথা তোদের উন্মাদ কবিরাজ সবটাই উগরে দিয়েচে। সহস্র উচাটন প্রয়োগ করে পাগলের সুপ্ত বিদ্যা আমি টেনে এনেচি। প্রকারান্তরে তো একেই অমরত্ব বলে, তা-ই না ব্রাহ্মণ?”

কালীপদ উত্তর না দিয়ে দু-পা এগিয়ে ডাক্তারের কাঁধে হাত রেখে তাকে জোরে ঝাঁকিয়ে কইল, “জাগো ডাক্তার। জেগে ওঠো। তোমার দাদা তোমাকে ডাকচে। জাগো।”

দুন্দুভি তাচ্ছিল্যের মুখভঙ্গি করে কইল, “তা-ই নাকি? জেগে উঠবে তোর কথায়?”

দুন্দুভি আরও কী একটা বলতে যাচ্চে, এমন সময়ে তার সঙ্গী শয়তানদ্বয় বিস্মিতভাবে বলে উঠল, “প্রভু! দেখুন!”

দুন্দুভি তাদের দেখানো আঙুল অনুসরণ করে চমকে উঠে দেখল, কালীপদ অবলীলায় তার দেওয়া পাতালবন্ধনের গণ্ডি অতিক্রম করে ডাক্তারের কাছে এসে দাঁড়িয়েচে! এইটে কেউই আগে খেয়াল করেনি। দুন্দুভি চকিত হয়ে অবিশ্বাসের কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, “এ কী! এ কী! আমার এই সর্বনাশা গণ্ডিকে লঙ্ঘন করলি কী প্রকারে তুই?”

কালীপদ তাচ্ছিল্যভরে হাতের তালুর উলটো পিঠ বাতাস তাড়ানোর ভঙ্গিতে নেড়ে কইল, “পাতালভৈরবী আর পাতালবন্ধনের বিদ্যা আমি গুরুর কাছে একেবারে প্রথমদিকেই শিখেচিলাম। তোর কাছে যেটা মহাগুপ্তবিদ্যা, সেইটে আমার গুরুর কাছে এলেবেলে বিদ্যার মধ্যে পড়ে।”

কালীপদ নিজের তর্জ্জনী ডাক্তারের কপালে ঠেকাতেই তার চোখের নীলাভ জ্যোতি দূর হয়ে গেল। ডাক্তার বিমূঢ়ের ন্যায় বলে উঠল, “দাদা!”

কালীপদ হতভম্ব দুন্দুভির দিকে চেয়ে তর্জ্জনী দেখিয়ে বললে, “আমি চাইলে বহু আগেই তোর এই নিকৃষ্ট, ওঁচা বাঁধন কেটে বেরিয়ে আসতে পারতুম, ছলনার আবশ্যকতা হত না, কিন্তু তাতে তোর মাথা জোড়া লাগায় ব্যাঘাত ঘটত। আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হত না। আমি তোকে তন্ত্রশক্তি দ্বারা হয়তো বধ করলেও করতে পারতাম, কিন্তু তোর দেহলক্ষণ বলচেতুই নিজে একজন কাপালিক, তাই তোকে তন্ত্র দ্বারা বধ করলে আমার বিস্তর শক্তি চিরকালের জন্য বিনষ্ট হয়ে যেত। আমি চেয়েচিলাম, তোর মাথা অন্যের ধড়ে জোড়া লাগে লাগুক, কিন্তু যে চাবিকাঠি রসায়নের লোভে তুই এসেচিস, সেইটে যেন কিছুতেই সঠিক না হয়।”

দুন্দুভি হতবাক ভাবটা কাটিয়ে আবার আক্রোশের হাসি হেসে চেঁচিয়ে উঠল, “কিন্তু তাতেও তোর জিত হল না। গণপতির উপরে আমি সহস্র উচাটন প্রয়োগ করেচি, মূর্খ! সহস্ৰ উচাটন! এই সৰ্ব্বনাশা বিধিপ্রয়োগের পর বশীভূত কোনও উন্মাদ ব্যক্তি চাইলেও কিছুতেই মিথ্যা কইতে পারে না।”

কালীপদ হেসে বললে, “যথার্থ কথা, কিন্তু যদি সে পাগল হয়, তবেই এই বিধি তাকে বশীভূত করতে পারে, তা-ই না কবিরাজমশায়?”

গণপতি হেসে উঠে উত্তর দিলে, “আজ্ঞা হাঁ, মুখুজ্জে মশাই।”

দুন্দুভি সভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে উঠোনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়ে কইল, “অসম্ভব! আমি নিজে খোঁজ নিয়েচি। গণপতি একজন বদ্ধ উন্মাদ।” কালীপদ বললে “ছিল। গণপতি সত্যিই উন্মাদ ছিল, কিন্তু চক্রাধের মহৌষধে সতীহারা মহেশের উন্মাদনাও লাঘব হয় আর গণপতি তো মানুষমাত্র। গণপতির লেখা দ্বিতীয় হেঁয়ালিটা স্মরণ আছে ডাক্তার?

“সাপের গন্ধে পাগল সারে, অর্থাৎ সর্পগন্ধা ভেষজ। সেই সাপের পুচ্ছ অর্থাৎ সর্পগন্ধার মূলকে খলনুড়িতে পিষে ‘নারীর কোলের তেল’ অর্থাৎ নারিকেল তেলের সঙ্গে মিশিয়ে, পৃথিবীর জল-স্থলের অনুপাত, অর্থাৎ চার আর এক ভাগ অনুপাতে মিশ্রণ তৈরি করে ‘রুপার অঙ্গ’-এ লেপন করতে হবে।

“রুপার আরেক নাম চাঁদি। ওই মিশ্রণ মাথার চাঁদিতে লেপন করে বেঁধে রাখলে বদ্ধপাগল সুস্থ হয়ে ওঠে। আমি সেই দিন ওই পাতা তুলে এনেচিলাম, মনে পড়ে? তারপর স্নানের সময়ে নারিকেল তেল চেয়ে নিয়ে আমিই গণপতির মাথায় মাখিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে রেখেচিলাম। ধনঞ্জয় এই কাণ্ড দেখে ক্রুদ্ধ হয়েছিল বটে, কিন্তু এটুকু আমি গোপন রেখেচিলাম।

“গণপতি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ বলেই তার উপরে এই নরকের কীট দুন্দুভির প্রয়োগ করা সহস্র উচাটন বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি। গণপতি আমার কথামতো ভুল রসায়নের সন্ধান দিয়েচে এই শয়তানকে।”

দুন্দুভি পাগলের মতো দাঁতব্যাদ্যান করে হিংস্রভাবে চিৎকার করে কইল, “মিথ্যা কথা… মিথ্যা কথা। আমি সেবার নিজের কানে গুরুদেবকে মোরগ আর নীলকণ্ঠের গুপ্তকথা বলতে শুনেচিলাম। শুধু অন্তর্দ্ধমের প্রয়োগবিধির কথাটা জানতাম না বলেই…”

কালীপদ দুন্দুভির দিকে দু-পা এগিয়ে, চোখ দুটি সরু করে, চোয়াল কঠিন করে, চিবিয়ে চিবিয়ে কইল, “তোর দুর্ভাগ্য আর ভাগ্যের পরিহাস এই যে, ওই নাম দুখানি শুধু পাখিরই হয় না, ফুলের নামও হয়। আচার্য্য চক্রায়ুধ নিজের ছড়ার মাধ্যমে ভোরে ফোটা মোরগফুল আর নীলকন্ঠের পাপড়ির কথা বলেচিলেন। সেই ফুলের অন্তর্দ্ধম-রসে কাটা মাথার ‘মেরুতন্ত্র’, অর্থাৎ সংবেদনশীল মেরুদণ্ডী তন্তুগুচ্ছ সঠিকভাবে জুড়ে যায়।

“তোমরা দুই চিকিৎসক তো জানবে নিশ্চয়ই, যে এক দেহের মুণ্ড অপর দেহে জোড়া দেবার মূল বাধা হচ্চে এই মেরুদণ্ডী তত্ত্বর দল। শিরা-উপশিরা জোড়া লাগলেও এই তন্তুর দল অপর দেহে জোড়ে না। সেই জোড়েরই রসায়ন আবিষ্কার করেচিলেন মহাচার্য্য চক্রায়ুধ।

দুন্দুভি কপাল টিপে ধরে ক্ষোভে কইল, “গণপতি না হয় সুস্থ হয়েচে দু-দিন, কিন্তু তুই এত চিকিৎসা বৃত্তান্ত জানলি কী প্রকারে?”

কালীপদ, “রামায়ণ পড়ে। আদিকবির রামায়ণ নয়, গণপতির লেখা রামায়ণ।”

ধনঞ্জয় চমৎকৃত হয়ে শুধোল, “জ্যাঠামশায়ের লেখা? রামায়ণ?”

“হ্যাঁ, বাছা। তোমাদের জ্যাঠামশায় পাগল হবার পূর্ব্বে রামায়ণের ভিতরের পাতার উপর কালি দিয়ে নিজের যাবতীয় বিদ্যা, সংকেত আর সূত্র লিখে রেখেচিলেন সযত্নে। ওঁর বইয়ের পিছনে লুকোনো ছড়াটা সেইদিকেই ইঙ্গিত করে। মরার নামের উচাটন, অর্থাৎ ‘মরা’কে উলটো করলে হয় ‘রাম’। এই ‘রাম’ শব্দটির পরে ‘শয়ন’ দিবে মুণ্ড ছেড়ে। ‘শয়ন’ শব্দের মুণ্ড, মানে ‘শ’ ছেড়ে দিলে পড়ে থাকে ‘য়ণ’, তাকে ওই রামের পরে বসালে হয় ‘রামায়ণ’। রামায়ণের ষড়াংশ, অর্থাৎ ষষ্ঠ কাণ্ড হল সবচাইতে রক্তক্ষয়ী পৰ্ব্ব লঙ্কাকাণ্ড। সেই লঙ্কাকাণ্ডে রাক্ষস রাবণ বধ হবার পূর্ব্বের পাতাগুলিতেই গণপতি যাবতীয় মহৌষধের সূত্র লিখে রেখেচিল। আমি তিন দিন ধরে রামায়ণখানা নিয়ে পড়ে চলেচি। তাতে এই জোড়কলম সম্বন্ধে একখানা সাবধানবাণী লেখা রয়েছে।”

দুন্দুভি শেষ কথাটায় চমকে তাকাতেই কালীপদ দুন্দুভির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,

“প্রয়োগ কিংবা মিশেল ভুলে
সূর্য্যদেবের চক্ষু খুলে
মরিনু আমি যেই বিপাকে
ঘটিবে তা ফের সূর্যালোকে।

“এখানে ‘আমি’, অর্থাৎ গণপতি। ভগবান গণপতির যেভাবে মরণ ইয়েচিল, তোর বিধিতেও সেই মস্তক ছেদন লেখা রয়েচে, পাষণ্ড।”

এই অবধি শুনে দুন্দুভি উঠে দাঁড়িয়ে হিংস্র হয়ে কইল, “শয়তান! কিতব জুয়াচোর! বেশ, প্রয়োগে যতই প্রমাদ ঘটুক, কিন্তু সূৰ্য্যালোক না পড়লে তো আমি মরচিনে। আমি লুকিয়ে থাকব অনন্তকাল সুযোগের অপেক্ষায়। আমি আবার আসব…”

এই বলে দুন্দুভি প্রাণভয়ে দৌড়োতে শুরু করল ফটকের দিকে আর দুই শয়তান একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল কালীপদর উপর। কালীপদ নিজের দুই হাতের আঙুল একত্রে তুলে ধরল, আর তাতে স্পর্শমাত্র দুখানি দেহ ছাই হয়ে ঝরে পড়ল। ততক্ষণে দুন্দুভি ফটকে পৌঁছে গিয়েচে! কালীপদ নিজের গলার রুদ্রাক্ষের মালা খুলে নিয়ে নিজের ডান হাতের কবজিতে দুখানি পাক দিয়ে, তজ্জনী আঙুল তুলে আকাশজোড়া মেঘের দিকে তুলে বিড়বিড় করে কিছু বলল। তার চোখ দুটি যেন জ্বলচে!

হঠাৎ একখানা কড়াৎ শব্দে আমরা থরথরিয়ে কেঁপে উঠলাম। আমি আকাশের দিকে চেয়ে হতবিহ্বল হয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখলাম, আকাশজোড়া কুটিল মেঘের মধ্যে একখানা ফাটল দেখা দিয়েচে! পলায়মান শয়তান দুন্দুভিও সেই ভয়ানক দৃশ্য দেখে কাঁপতে কাঁপতে ফটকের কাছেই দাঁড়িয়ে পড়েছে!

কালীপদ ভীষণ জোরে চিৎকার করে উঠল, “জয় ভবানী…” সহসা সেই ঘোর আঁধার মেঘ যেন জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ল, সেই ফাটলের ওপারে একেবারে তড়িতের ন্যায় একঝলক একখানা বিকট সাদা হাতির মুণ্ড দেখা দিয়েই যেন মিলিয়ে গেল, আর সেই ফাটলের মধ্যে থেকে উকি দিলেন সূর্য্য! তাঁর কিরণ দুন্দুভির শরীরে পড়ামাত্র সেই রাক্ষস আকাশবিদারী মরণনাদ করে উঠল! আমরা তাকিয়ে দেখলাম, সেই ভণ্ড, অমরত্ব-লোভীর ধড় আর মুণ্ড বিচ্যুত হয়ে পড়ে রয়েচে ফটকের সামনে অধিষ্ঠিত পাথরের গণেশের পায়ের কাছে। গজমুণ্ডধারী গণপতি সেইদিকে চেয়ে মিটিমিটি হেসে চলেচেন!

 ***

আমরা গণপতির বইঘরে এসে বসেচি। সকলে গণপতির বইঘরের প্রকাণ্ড টেবিলে বসে চা পান করচি। ধনঞ্জয় কালীপদকে শুধোল, “ঠাকুর, সমস্ত কথাই এখন পরিষ্কার বুঝতে পারচি, কিন্তু একটা কথা… তৃতীয় হেঁয়ালিতে ‘পক্ষী দিল চক্ষে ধুলার’ অর্থ কী?”

কালীপদ হেসে কইল, “আমাকে কেন, বাছা? যে লিখেচে, তাকেই শুধোও না কেন? আমি কেমন করে বলি?”

গণপতি স্নেহের দৃষ্টিতে ধনঞ্জয়ের দিকে চেয়ে বললে, “গরুড় যখন স্বৰ্গ থেকে অমৃত ছিনিয়ে আনতে গিয়েচিলেন, তখন অমৃতের কলসের পাহারাদার দুটি ভয়ংকর সাপকে তিনি একমুঠো ধুলো ছুড়ে অন্ধ করে দেন। ধুলোর কাছেই সাপেরা জব্দ, কারণ সরীসৃপের চোখের পাতা থাকে না। আমি ওই কথাগুলোর মধ্যে দিয়ে প্রকারান্তরে অমরত্বের একটা আভাস প্রকাশ করেচিলাম। মুখুজ্জে মশায় দেয়ালা করচেন, তিনি ঠিকই টের পেয়েচিলেন।”

ধনঞ্জয় কৃতাঞ্জলি হয়ে বললে, “মুখুজ্জে মশায় আমাদের জন্য যা করলেন, তা আমাদের পরিবারে একখানা গৌরবময় লোককথা হয়ে থেকে যাবে। বদলে আমরা কি কিছুই দিতে পারি না?”

কালীপদ হেসে বললে, “চাইলে দেবে?”

গণপতি, ধনঞ্জয় শশব্যস্ত হয়ে উঠে কইল, “ছি ছি, বিলক্ষণ দেব, ঠাকুরমশায়। আজ্ঞা করুন শুধু।”

কালীপদ টেবিল থেকে বেগুনি কালির বোতলটা হাতে তুলে নিলে। তার গায়ে লেখা—‘ম্যাজেন্টা, সুলেখা’। কালীপদ বললে, “এইটে আমি নিলুম, বিশেষ দরকার রয়েচে।”

প্রসাদপুর জমিদার বাড়ির সকলে আমাদের ফটক অবধি এগিয়ে দিলে। আমরা যখন গোযানে উঠচি, তখন বৃদ্ধ পরিচারক এগিয়ে এসে অশ্রুপূর্ণ চোখে হাতজোড় করে কইল, “কেমন, তখন বলেচিলাম না ঠাকুর, ভগবান মানুষের মধ্যে দিয়েই উপস্থিত হন?” কালীপদ হেসে প্রতিনমস্কার করলে বৃদ্ধকে।

***