মায়া সভ্যতার ইতিহাস
মায়া সভ্যতার উৎপত্তির ইতিহাস খুবই অস্পষ্ট এবং প্রায় অজানা। তবে পণ্ডিতরা এ বিষয়ে একমত যে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বহু শতাব্দী আগেই মায়ারা নতুন পাথর যুগের সভ্যতা আয়ত্ত করেছিলো। মায়া বিশেষজ্ঞদের মতে, খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে মায়ারা কৃষি কাজ, মাটির পাত্র নির্মাণ প্রভৃতি আয়ত্ত করেছিলো। মায়া সভ্যতার মোটামুটি ইতিহাস জানা যায় ৩১৭ খ্রীষ্টাব্দের পর থেকে। এ সময়ের পরবর্তী ইতিহাসকে দুটো অংশে ভাগ করা চলে : মায়া সভ্যতার প্রথম স্তর (৩১৭-৯৮৭ খ্রীঃ) এবং মায়া সভ্যতার শেষ স্তর (৯৮৭- ১৬৯৭ খ্রীঃ)।
৩১৭ খ্রীষ্টাব্দের দিকে মায়া সভ্যতার প্রথম সূত্রপাত ঘটেছিলো সম্ভবত বর্তমান গুয়াতেমালার অন্তর্গত পিটেন অঞ্চলের নিম্নভূমিতে। মায়ারা যখন এখানে প্রথম আসে তখন এ অঞ্চলে এত গভীর বন ছিলো যে মায়া কৃষকদের বারবার গাছ কেটে আর গাছ পুড়িয়ে বন পরিষ্কার করতে হয়েছিলো। এভাবে কঠোর পরিশ্রম করে মায়ারা এ অঞ্চলে বন কেটে বসতি স্থাপন করে ও জমি আবাদ করে। মায়ারা ভুট্টা, শিম, লাউ, মিষ্টি আলু, টমাটো, কাসাভা প্রভৃতির চাষ করতো।
মায়া সভ্যতার প্রথম স্তরে টিকল, কোপান, পালেদ্ধ প্রভৃতি শহরকে কেন্দ্ৰ করে মায়া সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো। এ আমলের মায়া সভ্যতার কেন্দ্রগুলো প্রধানত গুয়াতেমালাতেই অবস্থিত ছিলো। পালে শহরটি অবশ্য ছিলো মেক্সিকোতে। আর কোপান শহরটি ছিলো বর্তমান হণ্ডুরাস দেশে। তবে তখন এ পাশাপাশি দেশগুলো একই অঞ্চলের অন্তর্গত বলে গণ্য হতো।
প্রথম পর্যায়ের মায়া সভ্যতায় সভ্যতা-সংস্কৃতির গভীর উৎকর্ষের প্রকাশ ঘটালেও, ৯৮৭ খ্রীষ্টাব্দের দিকে এ সভ্যতার অবনতি ঘটে। কোনো অজানা কারণে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা সবগুলো শহরকে অকস্মাৎ পরিত্যাগ করে। কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে, দীর্ঘকাল এক স্থানে চাষ করার ফলে জমি ক্রমশ নিষ্ফলা হয়ে পড়েছিলো, তখন বাধ্য হয়ে মায়ারা অনেক দূরে নতুন ও অনাবাদী জমিতে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেছিলো। এরপর মায়া সভ্যতার কেন্দ্রভূমি স্থানান্তরিত হয় আরও উত্তরের ইউকাতান উপদ্বীপে। এভাবে দশম শতাব্দীতে গুয়াতেমালা অঞ্চলে গড়ে ওঠা মায়া সভ্যতার প্রথম পর্যায়ের অবসান ঘটে।
মায়া সভ্যতার দ্বিতীয় বা শেষ পর্যায়ে বর্তমান মেক্সিকোর পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ইউকাতান উপদ্বীপে নতুনভাবে মায়া সভ্যতার পুনর্জন্ম ঘটে। ইউকাতান উপদ্বীপটি ছিলো গুয়াতেমালা থেকে উত্তর দিকে। মায়া সভ্যতার প্রথম পর্যায়ে এ অঞ্চল মায়া সভ্যতার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো কিন্তু তখন এখানে মায়া সভ্যতার কোনো উন্নত প্রকাশ ঘটেনি।
দশম শতকে গুয়াতেমালা অঞ্চলের মায়া অধিবাসীরা কোনো অজ্ঞাত কারণে ইউকাতান অঞ্চলে চলে যায়। তখন সেখানে মায়া সভ্যতার দ্বিতীয় পর্যায়ের উদয় ঘটে। এ পর্যায়ে ইউকাতান অঞ্চলে চিচেন ইটজা, মায়াপান, উক্সমাল প্রভৃতি নগরকে কেন্দ্র করে মায়া সভ্যতার বিকাশ ঘটে। দ্বিতীয় পর্যায়ের মায়া সভ্যতা ৯৮৭ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৬৯৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিলো। তবে এ পর্যায়ের মায়া সভ্যতার বিকাশের ইতিহাস নিরবচ্ছিন্ন অগ্রগতির ইতিহাস নয়। ইউকাতান অঞ্চলের মায়া নগরগুলোর মধ্যে বহু শত বছর ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলেছিলো। পনেরো শতক থেকে ইউকাতান অঞ্চলের মায়া সভ্যতায় অবক্ষয় ও পতনের লক্ষণ ফুটে উঠতে থাকে। এক পর্যায়ে মায়াদের অভ্যন্তরীণ কলহ ও যুদ্ধের পরিণতিতে মায়াপান শহরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মায়া সভ্যতা ১৬৯৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিলো।
কর্টেজের নেতৃত্বে স্পেনীয় সৈন্যরা যখন ১৫১৯ খ্রীষ্টাব্দে মেক্সিকোর আজটেক সাম্রাজ্যকে আক্রমণ করে তখন স্পেনীয়রা মায়াদের রাজ্য সম্পর্কে কোনো খোঁজ খবর পায় নি। ১৫২১ খ্রীষ্টাব্দে স্পেনীয়রা আজটেকদের পরাজিত করে মেক্সিকোর অধিপতি হয়। এরপর স্পেনীয়রা মধ্য মেক্সিকো থেকে দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে মায়াদের রাজ্য আক্রমণ করে। আবার পানামার অন্য একদল স্পেনীয় সৈন্যও মায়াদের রাজ্য আক্রমণ করতে এগিয়ে যায়। স্পেনীয়রা মায়াদের রাজ্য প্রথম আক্রমণ করে ১৫৫৯ খ্রীষ্টাব্দে। মায়াদের সাথে স্পেনীয়দের লড়াই দীর্ঘদিন ধরে চলেছিলো। অনেক শহরের মায়ারাই দুর্গম অরণ্যে আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৬৯৭ খ্রীষ্টাব্দে স্পেনীয়রা মায়াদের রাজ্য পুরোপুরি দখল করতে সক্ষম হয়। এভাবে ১৬৯৭ খ্রীষ্টাব্দে মায়া সভ্যতা চিরকালের মতো ধ্বংস হয়ে যায়।
.
মায়া শিল্পকলা
স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে মায়ারা পরম উৎকর্ষের পরিচয় দিয়েছে। মায়াদের মন্দির, প্রাসাদ, পিরামিড প্রভৃতি নির্মিত হতো এক একটা চত্বরকে ঘিরে। মায়ারা যে পিরামিড তৈরি করতো তা মিশরের যেসব পিরামিডের সাথে আমরা পরিচিত তার থেকে অন্য রকম ছিলো। মায়াদের পিরামিড ছিলো ধাপ-পিরামিড। প্রথমে মাটি বা পাথর ফেলে ফেলে উঁচু চৌকোনা ঢিবি বা পাহাড় তৈরি করা হতো। তাতে চারপাশ দিয়ে ধাপ কেটে কেটে ঢিবিটাকে ক্রমশ উপরের দিকে ছোট করে আনা হতো। তখন দেখলে মনে হতো যে একটা মাথা কাটা পিরামিডের উপর তার চেয়ে ছোট আরেকটা মাথা কাটা পিরামিড বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার উপর আরেকটা, তার উপর আরেকটা। এভাবে একটা ধাপ-পিরামিড তৈরি করা হতো যার উপর ভাগে থাকতো একটা চৌকোনা সমতল ভূমি। এ সমতল স্থানটার উপর একটা মন্দির তৈরি করা হতো। মন্দিরে ওঠার জন্য পিরামিডের গায়ে একটা সিঁড়ি নির্মাণ করা হতো। সমস্ত পিরামিডটিকে পাথরের ইটের আস্তরণ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হতো। এভাবে ধাপ-পিরামিড তৈরি করা হতো। মায়াদের ধাপ- পিরামিডের মাথায় থাকতো একটা মন্দির। এ ধাপ-পিরামিডগুলোর সাথে প্রাচীন ব্যবিলনিয়ার ডিগেগুরাট-মন্দিরের মিল আছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে প্রাচীন মিশরেও প্রথম দিকে ধাপ-পিরামিড তৈরি করা হতো। প্রাচীন মিশরে শেষ পর্যায়ে জ্যামিতিক আকৃতির মসৃণ ও শীর্ষবিন্দুবিশিষ্ট পিরামিড তৈরি করা হতো। তবে মিশরে প্রথম পর্যায়ে নির্মিত ধাপ-পিরামিডের উপর অবশ্য কোনো মন্দির নির্মিত হতো না।
মায়া আমলের ভাস্কর ও স্থপতিরা সাধারণত কাঠ ও পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করতেন। মায়ারা কোনো রকম ধাতুর হাতিয়ার ব্যবহার করতো না বলেই পণ্ডিতরা মনে করেন, কারণ মায়াদের কোনো শহরেই কোনো রকম ধাতুর হাতিয়ারের সন্ধান পাওয়া যায় নি। মায়াদের রাজ্যে চুনাপাথর প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেতো। চুনাপাথর পুরিয়ে মায়ারা চুন তৈরি করতো; এ চুনের সাথে পাথরের কুচি মিশিয়ে এক ধরনের সুরকি বা মশলা তৈরি করতো। পাথরের নুড়ির সাথে এ মশলা মিশিয়ে তা দিয়ে মায়ারা মজবুত দালান কোঠা তৈরি করতো। এসব দালান কোঠার দেওয়ালে তারা অবশ্য পাথরের ইটের আস্তরণ দিতো। মায়ারা দোতলা ও তিনতলা দালান তৈরি করতে পারতো।
মায়াদের ভাস্কর্য প্রধানত তাদের স্থাপত্যকে অবলম্বন করেই গড়ে উঠছিলো I মন্দির ও পিরামিডের গায়ে ও ধাপগুলোকে অলংকৃত করার জন্য নানা রকম মূর্তি ও ছবি খোদাই করা হতো। মায়াদের পিরামিড, প্রাসাদ প্রভৃতির অলংকরণের জন্য মায়ারা দেবদেবীর মূর্তি বা দেবদেবীর সাথে সম্পর্কিত জীবজন্তু ও প্রাণীর মূর্তি নির্মাণ ও খোদাই করতো। ব্যাঙ, সাপ, জাগুয়ার এবং পাখি ছিলো দেবদেবতার সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রাণী। চিচেন ইটজা প্রভৃতি নগরে এসকল প্রাণী ও দেবদেবীর মূর্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। মায়ারা সুন্দর ছবি আঁকতে পারতো। তবে মায়াদের আঁকা কোনো দেওয়াল চিত্রের সন্ধান পাওয়া যায় নি। তবে মায়ারা মূর্তি ও দেয়ালের গায়ে সুন্দরভাবে রঙের প্রলেপ দিতে পারতো। মায়াদের বই বা পাণ্ডুলিপিতে অবশ্য ছবি থাকতো।
মায়ারা চারকোণা পাথরের স্তম্ভ ও ফলকের উপরে নানা রকম বিবরণ ও সন- তারিখ খোদাই করে রাখতো। এসকল শিলালিপি ও পাথরের স্তম্ভ ৩ ফুট থেকে ২৭ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতো।
মায়ারা সুন্দর ডিজাইনের কাপড় বুনতে পারতো, জেড পাথরের মূর্তি তৈরি করতো, মাটির চিত্রিত পাত্র তৈরি করতো এবং সোনা ও রূপার সুন্দর অলংকার তৈরি করতে পারতো।
.
মায়াদের রাষ্ট্র ও সমাজ
মায়াদের সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো অনেকগুলো স্বতন্ত্র ও স্বাধীন নগর-রাষ্ট্রকে ভিত্তি করে। এক একটা নগর-রাষ্ট্রে ২৫,০০০ বা তার চেয়ে বেশি সংখ্যক লোক থাকতো। মায়াদের সমাজে সামাজিক শ্রেণীবিভাগ বিদ্যমান ছিলো। সবচেয়ে উঁচু শ্রেণীতে ছিলো অভিজাত ও পুরোহিত শ্রেণীর স্থান। তাঁদের নীচে ছিলো কৃষক, কারিগর ও ব্যবসায়ীদের স্থান। এদের নীচে ছিলো দরিদ্র ও সম্পত্তিহীন স্বাধীন মানুষের স্থান। সমাজের সবচেয়ে নীচে ছিলো দাস শ্রেণীর স্থান। মায়াদের রাজ্যের সবচেয়ে কঠোর পরিশ্রমের কাজ দাসদেরই করতে হতো।
মায়াদের প্রত্যেক নগর-রাষ্ট্রে একজন করে শাসক বা রাজা থাকতেন। সামাজিক, ধর্মীয় ও যুদ্ধের ব্যাপারে রাজাই ছিলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী নগর-রাষ্ট্রের অধীনস্থ গ্রাম ও ছোট ছোট নগরের জন্য গ্রাম-প্রধান বা নগর-প্রধান প্রভৃতিকে নিয়োগ করতেন ঐ নগর-রাষ্ট্রের রাজা। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাজা একটা পরামর্শ সভা বা উপদেষ্টা-পরিষদ গঠন করতেন। গ্রাম-প্রধানগণ, পুরোহিতগণ ও বিশিষ্ট পরামর্শদাতারা এ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হতেন। রাষ্ট্রের শাসন-কাজ পরিচালনার জন্য রাজা নানা পর্যায়ে শাসক ও প্রশাসক নিয়োগ করতেন। রাজার আত্মীয়স্বজনদের মধ্য থেকেই এ সকল শাসক-প্রশাসকদের নির্বাচন করা হতো। রাজা ও বিভিন্ন পর্যায়ের শাসক-প্রশাসকদের নিয়েই রাজ্যের অভিজাত শ্রেণী গঠিত হয়। রাজা মারা গেলে বা সিংহাসন ত্যাগ করলে তাঁর ছেলে রাজা হতেন। পুরোহিতদের মধ্যেও কাজের গুরুত্ব অনুসারে শ্রেণী বিভাগের প্রচলন ছিলো। সমাজে পুরোহিতদের স্থান ছিলো অভিজাত শ্রেণীর সমান স্তরে বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদেরও উপরে।
.
মায়া অর্থনীতি
কৃষিকাজ ছিলো মায়া অর্থনীতির ভিত্তি। মায়ারা বন পুড়িয়ে আর গাছ কেটে বন পরিষ্কার করতো, তারপর সে জমিতে চাষাবাদ করতো। মায়ারা লাঙল বা এজাতীয় কোনো চাষের যন্ত্র ব্যবহার করতো না। তারা প্রধানত কাঠের শাবল দিয়ে মাটিতে গর্ত করে তাতে বীজ রোপণ করতো। তবে মায়ারা পানি সেচের কৌশল জানতো। মায়ারা ভুট্টা, লাউ, সিম, মিষ্টি আলু, টমাটো, কাসাভা, মরিচ, নানা রকম ফল প্রভৃতির চাষ করতো। এবং মৌচাক থেকে মধু ও মোম সংগ্রহ করতো। মায়ারা টার্কি নামক এক জাতীয় মুর্গী পুষতো ও তার মাংস খেতো।
মায়াদের সমাজে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিলো। বড় বড় শহরগুলোতে নির্দিষ্ট দিন অন্তর হাট বা মেলা বসতো। ব্যবসায়ীরা হাঁটা পথেও মালপত্র নিয়ে আসতো, জলপথেও আনতো। নদীপথে যাওয়ার সময়ে বণিকরা বড় বড় নৌকায় মাল ভর্তি করে নিয়ে যেতো। মায়া কারিগররা পাথরের অস্ত্র, কাঠ, হাড়, পাথরের জিনিসপত্র ও পালকের টুপি প্রভৃতি তৈরি করতো। মায়ারা টাকা কড়ি বা ধাতুর মুদ্রা ব্যবহার করতো না। তারা কোকো ফলের দানাকে মুদ্রা বা টাকা হিসাবে ব্যবহার করতো।
মায়ারা ধাতুবিদ্যা আয়ত্ত করতে পারেনি। এর অর্থ হলো তারা আকর গলিয়ে ধাতু নিষ্কাশণ করতে পারতো না বা ধাতুকে গলিয়ে ছাঁচে ঢালাই করতে পারতো না। তবে, আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, কোনোক্রমে তামা বা সোনা পেলে তারা তা দিয়ে গয়না বা ছোট ছোট ঘণ্টা তৈরি করতে পারতো। এ রকম সোনা বা তামা পাওয়া যায় পাহাড় ও মৃত আগ্নেয়গিরির গায়ের ভিতরের সোনা বা তামার শিরা থেকে। মায়ারা এ রকম তামা বা সোনার টুকরোকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে নির্দিষ্ট আকৃতির গয়না বা ঘণ্টা প্রভৃতি তৈরি করতে পারতো। মায়ারা অস্ত্র বা পাত্ৰ প্রভৃতি তৈরি করতো পাথর কেটে। মায়াদের অঞ্চলে অসিডিয়ান পাথর পাওয়া যেতো। অবসিডিয়ান হচ্ছে এক ধরনের প্রাকৃতিক কাঁচ। এ পাথরটা যেমন শক্ত, তেমনি ধারালোও হতে পারে। অবসিডিয়ান দিয়ে মায়ারা অস্ত্র এবং নানা ধরনের পাত্র এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি করতো।
.
মায়াদের ধর্ম
মায়ারা সূর্যের পূজা করতো। পিরামিডের মাথায় মায়াদের যে মন্দির থাকতো সেখানে সব সময় একটা পাথরের বেদী থাকতো। এ বেদীর উপরে সূর্য দেবতার উদ্দেশে মানুষকে বলি দেওয়া হতো। সূর্য ছাড়াও মায়ারা আরো অনেক দেবতার পূজা করতো। ধর্ম ছিলো মায়াদের সমগ্র জীবনযাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। মায়াদের ধর্ম চেতনা তাদের সমগ্র সামাজিক ক্রিয়াকলাপকে নিয়ন্ত্রিত করতো। মায়াদের রাষ্ট্রব্যবস্থাও পুরোহিততন্ত্র ও ধর্মতন্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। মায়াদের সমাজে একমাত্র পুরোহিতরাই হায়ারোগ্লিফিক ধরনের অক্ষর লিখতে ও পড়তে পারতো। তাই মন্দিরের বা প্রাসাদের দেওয়ালে ও সামনের অংশে এবং শিলালিপিতে খোদাই করে লেখার কাজটা পুরোহিতরাই করতো। সমগ্র রাষ্ট্রীয় ভবন, পিরামিড, মানমন্দির প্রভৃতি নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব ও অধিকার ছিলো পুরোহিতদের হাতে। তাই মায়াদের সমগ্র জীবনধারার উপর পুরোহিতদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিলো।
মায়াদের রাজ্যে এক ধরনের বল খেলার প্রচলন ছিলো। বল খেলা হতো পাথর দিয়ে বাঁধানো একটা চত্বরে। চত্বরের চারদিক উঁচু দেওয়াল দিয়ে ঘেরা থাকতো। বলটা তৈরী হতো জমাট রবার দিয়ে; এর ব্যাস ছিলো প্রায় ৬ ইঞ্চি। খেলোয়াড়রা হাত দিয়ে বল ধরতে পারতো না, কেবল পশ্চাতদেশ দিয়ে বা কনুই দিয়ে বলটিকে আঘাত করা যেতো। জমাট রবারের বল অবশ্য মাটিতে পড়লে সহজেই লাফিয়ে উঠতো। তবে কখনও যদি বলটা ‘নিষ্প্রাণ’ হয়ে মাটিতে পড়ে যেতো বা পরে থাকতো, তাহলে যাদের দোষে বলটা ‘মরে’ যেতো সে দলের খেলোয়াড়দেরও দেবতার উদ্দেশে বলি দেওয়া হতো। খেলা ঠিকমত পরিচালিত হলেও অবশ্য এ উপলক্ষে এক বা একাধিক মানুষকে বলি দেওয়া হতো।
এ বল খেলা ছিলো মায়াদের সমাজে এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। দেওয়ালের উপরে নির্মিত প্রশস্ত আসনে বসে অভিজাত মায়ারা এ খেলা দেখতেন। সাধারণ নাগরিকরা নীচে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতেন। এ বল খেলা ক্রমশ মেক্সিকো অঞ্চলে ও পরবর্তীকালে আজটেকদের মধ্যে প্রচলিত হয়েছিলো। কোনো কোনো স্থানে দেওয়ালের গায়ে পাথরের গোলাকার চক্র বসানো থাকতো, যার মধ্য দিয়ে বলটাকে ফেললে খেলায় জিত হতো।
.
মায়াদের জ্ঞানবিজ্ঞান
মায়াদের ধর্মীয় উৎসব পালনের জন্য এবং কৃষিকাজের প্রয়োজনে জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা এবং সময় নিরূপণের বিষয়ে তারা খুবই মনোযোগী ছিল। তারা চাঁদ, সূর্য ও নক্ষত্রকে পর্যবেক্ষণ করে জোতির্বিদ্যায় খুবই পারদর্শিতা অর্জন করেছিলো। মায়ারা তাদের জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞান প্রয়োগ করে একটা বার্ষিক পঞ্জিকা বা ক্যালেণ্ডার আবিষ্কার করেছিলো। মায়ারা দু রকম বছরের হিসাব রাখতো। একটা ছিলো পবিত্র বছর-এটা ছিলো ২৬০ দিনের। আরেকটা ছিলো সাধারণ হিসাবের বছর—এতে ৩৬০ দিনে বছর গণনা করা হতো এবং তার সাথে ৫টা অপয়া দিন যোগ করা হতো। অর্থাৎ সাধারণ হিসাবের বছর ছিলো ৩৬৫ দিনে। তাই বলা চলে মায়াদের ৩৬৫ দিনের সৌর বছরের হিসাব প্রায় নিখুঁত ছিলো। একটু হিসাব করলেই দেখা যাবে সাধারণ বছরের হিসেবে ৫২ বছরে যতদিন হয়, পবিত্র বছরের হিসেবে ৭৩ বছরে ততদিন হয় (কারণ, ৫২ × ৩৬৫ = ১৮৯৮০ দিন এবং ২৬০ × ৭৩ = ১৮৯৮০ দিন)। তাই মায়াদের গণনায় প্রতি ৫২ বছর অন্তর দুই ধরনের বছরের হিসাবে একই দিনে নববর্ষের শুরু হতো। এ দিনটিকে মায়ারা বিশেষ মর্যাদার সাথে উদযাপন করতো। মায়াদের গণনায় তাই ৫২ বছরের একটা কালচক্র ছিলো।
মায়ারা লেখন পদ্ধতি এবং সংখ্যা লেখার পদ্ধতি জানতো। মায়া সভ্যতার প্রথম পর্যায়ে তারা শুধু পাথরের ফলকে ও মাটির পাত্রে খোদাই করে লিখতো। মায়া সভ্যতার শেষ পর্যায়ে তারা হাতে লেখা বইয়ে তাদের কথা লিখে রাখতো। মায়ারা চিত্রলিপি ও প্রতীকধর্মী লিপিতে লিখতো। প্রাচীন মিশরীয়রা যেমন এক এক রকম ছবি দিয়ে এক এক রকম শব্দ বা কথা বোঝাতো, মায়ারাও তেমনি এক একটি ছবি বা প্রতীক দিয়ে এক এক রকম শব্দ বা শব্দগুচ্ছ বোঝাতো। অবশ্য মিশরীয়দের চিত্রলিপি আর মায়াদের চিত্রলিপি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। মায়াদের লেখা বা চিত্রলিপির অর্থ এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা যায় নি।
স্পেনীয়রা যখন মেক্সিকো এবং গুয়াতেমালা অঞ্চল অধিকার করে তখন মায়া অঞ্চলের নগরগুলোতে অজস্র হাতে লেখা বই ছিলো। মায়া পুরোহিতরা এ সব বই লিখেছিলেন। স্পেনীয় পাদ্রীরা এ সব বইকে ‘শয়তানের কাণ্ড’ আখ্যা দিয়ে পুড়িয়ে ফেলেন। মাত্র তিনটি বা চারটি বই কোনো ক্রমে রক্ষা পেয়েছিলো। এ বইগুলো এখন ড্রেসডেন, প্যারিস এবং মাদ্রিদে আছে, কিন্তু এগুলো কেউ এখন পড়তে পারেন না। প্রথম দিকে ইউকাতান অঞ্চলে কয়েকজন স্পেনীয় পাদ্রী কষ্ট করে মায়া ভাষায় লেখা বই পড়তে শিখেছিলেন। কিন্তু তারপর এ বিদ্যা লোপ পেয়ে গেছে। এখন আর মায়ারা বা ইউরোপীয়রা কেউই সে ভাষা পড়তে পারেন না। তবে স্পেনীয় অধিকারের প্রথম অবস্থায় অর্থাৎ ষোল সতেরো শতকে মায়া শিলালিপির কতগুলো লেখা মায়া পুরোহিতদের সহায়তায় স্পেনীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিলো। তা থেকে মায়াদের সভ্যতা ও ইতিহাস সম্পর্কে অনেক কিছু জানা গেছে। তবে, মায়াদের ধর্ম, বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসা-বিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ক সব বই-ই ধ্বংস হয়ে গেছে।
মায়ারা এক ধরনের সংখ্যা লেখার পদ্ধতি জানতো। মায়ারা শূন্য সংখ্যার ব্যবহার জানতো। স্থানীক অংক পাতন পদ্ধতির জ্ঞানও তাদের ছিলো। অর্থাৎ আমরা যেমন ১১১ লিখলে ডানদিক থেকে প্রথম ১ দিয়ে ১, দ্বিতীয় ১ দিয়ে ১০ এবং তৃতীয় ১ দিয়ে ১০০ বুঝাই, মায়ারাও অনেকটা এ ধরনের সংখ্যা পাতন পদ্ধতি ব্যবহার করেতো। তবে আমাদের অংক লেখার ভিত্তি যেমন ১০, মায়াদের সংখ্যা লেখার ভিত্তি ছিলো ২০। আবার, আমরা যেমন ডান দিক থেকে শুরু করে বাঁ দিকে একক দশক বলে এগিয়ে যাই, মায়ারা তেমনি নীচে থেকে শুরু করে উপর দিকে এক, কড়ি এভাবে অংক লিখতো। অনেকে মনে করেন যে মায়ারা শূন্য ও স্থানিক পদ্ধতিতে অংক লেখার পদ্ধতি নিজেরাই আবিষ্কার করেছিলো। কিন্তু মায়াদের অনেক আগেই যে ব্যবিলনীয়রা শূন্য ও স্থানিক অংক পাতন পদ্ধতির আবিষ্কার করেছিলো তার প্রমাণ রয়েছে। (ব্যবিলনীয়রা অবশ্য ৬০ ভিত্তিক অংক পাতন পদ্ধতি অনুসরণ করতো।) এটা তাই অসম্ভব নয় যে ব্যবিলনীয় উৎস থেকেই মায়ারা শূন্য ও অংক লেখার পদ্ধতি শিখেছিলো। তবে এ বিষয়ে পণ্ডিতরা এখনও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন নি।
মায়াদের রাজ্যে ছাত্রদের বিদ্যাশিক্ষার জন্য বিদ্যালয় ছিলো। তবে প্রধানত পুরোহিতদের জন্যই এ বিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। এ সব বিদ্যালয়ে কি কি শেখানো হতো তা জানা যায় নি; তবে সেখানে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান বিষয়ে যে বিশেষভাবে শিক্ষা প্রদান করা হতো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ধর্মীয় সংস্থার অন্তর্ভুক্ত মহিলাদের জন্য আলাদা মঠ ছিলো। মায়াদের মধ্যে পরবর্তীকালের আজকেটদের মতো যুদ্ধপ্রবণতা বা রণলিপ্সা ছিলো না। মায়াদের প্রয়াস প্রধানত শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মের দিকেই নিয়োজিত হয়েছিলো। তবে মায়াদের কাছে যুদ্ধ একেবারে অজানা বিষয় ছিলো না। মায়াদের বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও সংঘটিত হয়েছে। তাই মায়াদের সমাজে যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষাদানের ব্যবস্থাও ছিলো।
