Accessibility Tools

ঠাকুরমার ঝুলি – দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

কলাবতী রাজকন্যা

এক যে, রাজা। রাজার সাত রানি।-বড়োরানি, মেজোরানি, সেজোরানি, ন-রানি, কনেরানি, দুয়োরানি আর ছোটোরানি।

রাজার মস্ত বড়ো রাজ্য; প্রকাণ্ড রাজবাড়ি। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, ভাণ্ডারে মানিক, কুঠরিভরা মোহর, রাজার সব ছিল। এ ছাড়া-মন্ত্রী, অমাত্য, সিপাই, লশকরে-রাজপুরী গমগম করিত।

কিন্তু রাজার মনে সুখ ছিল না। সাত রানি, এক রানিরও সন্তান হইল না। রাজা, রাজ্যের সকলে, মনের দুঃখে দিন কাটেন।

একদিন রানিরা নদীর ঘাটে স্নান করিতে গিয়াছেন-এমন সময়, এক সন্ন্যাসী যে, বড়োরানির হাতে একটি গাছের শিকড় দিয়া বলিলেন,—’এইটি বাটিয়া সাত রানিতে খাইয়ো, সোনার চাঁদ ছেলে হইবে।’

রানিরা, মনের আনন্দে তাড়াতাড়ি স্নান করিয়া আসিয়া, কাপড়চোপড় ছাড়িয়া, গা-মাথা শুকাইয়া, সকলে পাকশালে গেলেন। আজ বড়োরানি ভাত রাঁধিবেন, মেজোরানি তরকারি কাটিবেন, সেজোরানি ব্যঞ্জন রাঁধিবেন, ন-রানি জল তুলিবেন, কনেরানি জোগান দিবেন, দুয়োরানি বাটনা বাটিবেন, আর ছোটোরানি মাছ কুটিবেন। পাঁচ রানি পাকশালে রহিলেন; ন-রানি কুয়োর পাড়ে গেলেন, ছোটোরানি পাঁশগাদার পাশে মাছ কুটিতে বসিলেন।

সন্ন্যাসীর শিকড়টি বড়োরানির কাছে। বড়োরানি দুয়োরানিকে ডাকিয়া বললেন,—’বোন, তুই বাটনা বাটিবি, শিকড়টি আগে বাটিয়া দে না, সকলে একটু একটু খাই।’

দুয়োরানি শিকড় বাটিতে বাটিতে কতকটুকু নিজে খাইয়া ফেলিলেন। তাহার পর, রুপার থালে সোনার বাটি দিয়া ঢাকিয়া, বড়োরানির কাছে দিলেন। বড়োরানি ঢাকনা খুলিতেই আর কতকটা খাইয়া মেজেরানির হাতে দিলেন। মেজোরানি খানিকটা খাইয়া, সেজোরানিকে দিলেন। সেজোরানি কিছু খাইয়া, কনেরানিকে দিলেন। কনেরানি বাকিটুকু খাইয়া ফেলিলেন। ন-রানি আসিয়া দেখেন, বাটিতে একটু তলানি পড়িয়া আছে। তিনি তাহাই খাইলেন। ছোটোরানির জন্য আর কিছুই রহিল না।

মাছ কোটা হইলে, ছোটোরানি উঠিলেন। পথে ন-রানির সঙ্গে দেখা হইল। ন-রানি বলিলেন,—’ও অভাগি! তুই তো শিকড়বাটা খাইলি না?-যা, যা, শিগগির যা।’ ছোটোরানি আকুলি-ব্যাকুলি করিয়া ছুটিয়া আসিলেন; আসিয়া দেখিলেন, শিকড়বাটা একটুকুও নেই। দেখিয়া, ছোটোরানি আছাড় খাইয়া মাটিতে পড়িলেন।

তখন পাঁচ রানিরা এর দোষ ও দেয়; ওর দোষ এ দেয়। এইরকম করিয়া সকলে মিলিয়া গোলমাল করিতে লাগিলেন।

ছোটোরানির হাতের মাছ আঙিনায় গড়াগড়ি গেল, চোখের জলে আঙিনা ভাসিল।

একটু পরে ন-রানি আসিলেন। তিনি বলিলেন,— ‘ওমা! ওর জন্য কি তোরা কিছুই রাখিস নাই? কেমন লো তোরা! চল বোন ছোটোরানি, শিল-নোড়াতে যদি একাধটুকু লাগিয়া থাকে, তাই তোকে, ধুইয়া খাওয়াই। ঈশ্বর করেন তো, উহাতেই তোর সোনার চাঁদ ছেলে হইবে।’

অন্য রানিরা বলিলেন,—’তা-ই তো তা-ই তো, শিল-নোড়ায় আছে, তা-ই ধুইয়া দেও।’ মনে মনে বলিলেন,—’শিল-ধোয়া জল খাইলে-সোনার চাঁদ না তো, বানর চাঁদ ছেলে হইবে।’

ছোটোরানি কাঁদিয়া-কাটিয়া শিল-ধোয়া জলটুকুই খাইলেন। তার পর, ন-রানিতে ছোটোরানিতে ভাগাভাগি করিয়া জল আনিতে গেলেন। আর রানিরা নানাকথা বলাবলি করিতে লাগিলেন।

দশ মাস দশ দিন যায়, পাঁচ রানির পাঁচ ছেলে হইল। এক-এক ছেলে যেন সোনার চাঁদ! ন-রানি আর ছোটোরানির কী হইল? বড়োরানিদের কথাই সত্য; ন-রানির পেটে এক পেঁচা আর ছোটোরানির পেটে এক বানর হইল।

বড়োরানিদের ঘরের সামনে ঢোল-ডগর বাজিয়া উঠিল। ন-রানি আর ছোটোরানির ঘরে কান্নাকাটি পড়িয়া গেল।

রাজা আর রাজ্যের সকলে আসিয়া, পাঁচ রানিকে জয়ডঙ্কা দিয়া ঘরে তুলিলেন। ন-রানি, ছোটোরানিকে কেহ জিজ্ঞাসাও করিল না।

কিছুদিন পর, ন-রানি চিড়িয়াখানার বাঁদি আর ছোটোরানি ঘুঁটেকুড়ানি দাসী হইয়া দুঃখে কষ্টে দিন কাটাইতে লাগিলেন।

ক্রমে ক্রমে রাজার ছেলেরা বড়ো হইয়া উঠিল; পেঁচা আর বানরও বড়ো হইল। পাঁচ রাজপুত্রের নাম হইল-হিরারাজপুত্র, মানিকরাজপুত্র, মোতিরাজপুত্র, শঙ্খরাজপুত্র আর কাঞ্চনরাজপুত্র।

পেঁচার নাম হইল ভূতুম

আর

বানরের নাম হইল বুদ্ধু।

পাঁচ রাজপুত্র পাঁচটি পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়িয়া বেড়ায়। তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে কত সিপাই লশকর পাহারা থাকে। ভূতুম আর বুদ্ধু দুইজনে তাহাদের মায়েদের কুঁড়েঘরের পাশে একটা ছোটো বকুল গাছের ডালে বসিয়া খেলা করে।

পাঁচ রাজপুত্রেরা বেড়াইতে বাহির হইয়া আজ ইহাকে মারে, কাল উহাকে মারে, আজ ইহার গর্দান নেয়, কাল উহার গর্দান নেয়; রাজ্যের লোক তিত-বিরক্ত হইয়া উঠিল।

ভূতুম আর বুদ্ধু, দুইজনে খেলাধুলা করিয়া, যার-যার মায়ের সঙ্গে যায়। বুদ্ধু মায়ের ঘুঁটে কুড়াইয়া দেয়, ভূতুম চিড়িয়াখানার পাখির ছানাগুলিকে আহার খাওয়াইয়া দেয়। আর, দুই-একদিন পর পর দুইজনে রাজবাড়ির দক্ষিণ দিকে বনের মধ্যে বেড়াইতে যায়।

ভূতুমের মা চিড়িয়াখানার বাঁদি, বুদ্ধুর মা ঘুঁটেকুড়ানি দাসী। কোনোদিন খাইতে পায়, কোনোদিন পায় না। বুদ্ধু দুই মায়ের জন্য বনজঙ্গল হইতে কত রকমের ফল আনে। ভূতুম ঠোঁটে করিয়া দুই মায়ের পান খাইবার সুপারি আনে। এইরকম করিয়া ভূতুম, ভূতুমের মা, বুদ্ধু, বুদ্ধুর মা’র দিন যায়।

একদিন পাঁচ রাজপুত্র পক্ষীরাজ ঘোড়া ছুটাইয়া চিড়িয়াখানা দেখিতে আসিলেন। আসিতে, পথে দেখিলেন, একটি পেঁচা আর একটি বানর বকুল গাছে বসিয়া আছে। দেখিয়াই তাঁহারা সিপাই লশকরকে হুকুম দিলেন,—’ওই পেঁচা আর বানরটিকে ধর, আমরা উহাদিগে পুষিব।’ অমনি সিপাই-লশকরেরা বকুল গাছে জাল ফেলিল। ভূতুম আর বুদ্ধু জাল ছিঁড়িতে পারিল না। তাহারা ধরা পড়িয়া, খাঁচায় বদ্ধ হইয়া রাজপুত্রদের সঙ্গে রাজপুরীতে আসিল।

চিড়িয়াখানা পরিষ্কার করিয়া ভূতুমের মা আসিয়া দেখেন, ভূতুম নাই! ঘুঁটে ছড়াইয়া বুদ্ধুর মা আসিয়া দেখেন, বুদ্ধু নাই! ভূতুমের মা হাতের ঝাঁটা মাটিতে ফেলিয়া বসিয়া পড়িলেন; বুদ্ধুর মা গোবরের ঝাঁটা ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া আছাড় খাইয়া পড়িলেন।

রাজপুরীতে আসিয়া ভূতুম আর বুদ্ধু অবাক!-মস্ত মস্ত দালান; হাতি, ঘোড়া, সিপাই, লশকর কত কী!

দেখিয়া তাহারা ভাবিল,—’বাঃ! তবে আমরা বকুল গাছে থাকি কেন? মায়েরাই বা কুঁড়েয় থাকে কেন?’ ভাবিয়া তাহারা বলিল,—’ও ভাই রাজপুত্র, আমাদিগে আনিয়াছ তো, মাদিগেও আনো।’

রাজপুত্রেরা দেখিলেন-বাঃ! ইহারা তো মানুষের মতো কথা কয়! তখন বলিলেন,—’বেশ বেশ, তোদের মায়েরা কোথায় বল; আনিয়া চিড়িয়াখানায় রাখিব।’

ভূতুম বলিল,—’চিড়িয়াখানার বাঁদি আমার মা।’

বুদ্ধু বলিল,—’ঘুটেকুড়ানি দাসী আমার মা!’

শুনিয়া রাজপুত্রেরা হাসিয়া উঠিলেন-

 ‘মানুষের পেটে আবার পেঁচা হয়!’

 ‘মানুষের পেটে আবার বানর হয়!’

ছোটোরানি আর ন-রানির কথা, রাজপুত্রেরা কিনা জানিতেন না, একজন সিপাই ছিল, সে বলিল,—’হইবে না কেন? আমাদের দুই রানি ছিলেন, তাঁহাদের পেটে পেঁচা আর বানর হইয়াছিল। রাজা সেইজন্য তাঁহাদিগে খেদাইয়া দেন। ইহারাই সেই পেঁচা আর বানরপুত্র।’

শুনিয়া রাজপুত্রেরা ‘ছি, ছি!’ করিয়া উঠিলেন। তখনই খাঁচার উপর লাথি মারিয়া, রাজপুত্রেরা সিপাই-লশকরকে বলিলেন,—’এই দুইটাকে খেদাইয়া দাও।’ বলিয়া রাজার ছেলেরা পক্ষীরাজে চড়িয়া বেড়াইতে চলিয়া গেলেন।

ভূতুম আর বুদ্ধু জানিল, তাহারাও রাজার ছেলে! ভূতুমের মা বাঁদি নয়, বুদ্ধুর মা দাসী নয়। তখন বুদ্ধু বলিল,—’দাদা, চল আমরা বাবার কাছে যাইব।’

ভূতুম বলিল,—’চল।’

সোনার খাটে গা, রুপার খাটে পা রাখিয়া রাজপুরীর মধ্যে, পাঁচ রানিতে বসিয়া সিঁথিপাটি করিতেছিলেন। এক দাসী আসিয়া খবর দিল, নদীর ঘাটে যে শুকপঙ্খি নৌকা আসিয়াছে, তাহার রুপার বইঠা, হিরার হাল। নায়ের মধ্যে মেঘবরন চুল কুঁচবরন কন্যা বসিয়া সোনার শুকের সঙ্গে কথা কহিতেছে।

অমনি নদীর ঘাটে পাহারা বসিল; রানিরা উঠেন-কি-পড়েন, কে আগে কে পাছে, শুকপঙ্খি নায়ে কুঁচবরন কন্যা দেখিতে চলিলেন।

তখন শুকপঙ্খি নায়ে পাল উড়িয়াছে; শুকপঙ্খি তরতর করিয়া ছুটিয়াছে।

রানিরা বলিলেন,—

 ‘কুঁচবরন কন্যা মেঘবরন চুল।
 নিয়া যাও কন্যা মোতির ফুল।’

নৌকা হইতে কুঁচবরন কন্যা বলিলেন,—

 ‘মোতির ফুল মোতির ফুল সে বড়ো দূর,
 তোমার পুত্র পাঠাইয়ো কলাবতীর পুর।
 হাটের সওদা ঢোল-ডগরে, গাছের পাতে ফল।
 তিন বুড়ির রাজ্য ছেড়ে রাঙা নদীর জল।’

বলিতে, বলিতে, শুকপঙ্খি নৌকা অনেক দূর চলিয়া গেল। রানিরা সকলে বলিলেন,—

 ‘কোন দেশের রাজকন্যা কোন দেশে ঘর?
 সোনার চাঁদ ছেলে আমার তো-মার বর।’

 তখন শুকপঙ্খি আরও অনেক দূর চলিয়া গিয়াছে; কুঁচবরন কন্যা উত্তর করিলেন,—

  ‘কলাবতী রাজকন্যা মেঘবরন কেশ,
 তোমার পুত্র পাঠাইয়ো কলাবতীর দেশ।
 আনতে পারে মোতির ফুল ঢো-ল-ডগর
 সেই পুত্রের বাঁদি হয়ে আসব তোমার ঘর।’

শুকপঙ্খি আর দেখা গেল না। রানিরা অমনি ছেলেদের কাছে খবর পাঠাইলেন। ছেলেরা পক্ষীরাজ ছুটাইয়া বাড়িতে আসিল।

রাজা সকল কথা শুনিয়া ময়ূরপঙ্খি সাজাইতে হুকুম দিলেন। হুকুম দিয়া, রাজা, রাজসভায় দরবার করিতে গেলেন।

মস্ত দরবার করিয়া রাজা রাজসভায় বসিয়াছেন। ভূতুম আর বুদ্ধু গিয়া সেইখানে উপস্থিত হইল। দুয়ারি জিজ্ঞাসা করিল,—’তোমরা কে?’

 বুদ্ধু বলিল,—’বানররাজপুত্র।’

 ভূতুম বলিল,—’পেঁচারাজপুত্র।’

দুয়ারি দুয়ার ছাড়িয়া দিল।

তখন বুদ্ধু একলাফে গিয়া রাজার কোলে বসিল। ভূতুম উড়িয়া গিয়া রাজার কাঁধে বসিল। রাজা চমকিয়া উঠিলেন; রাজসভায় সকলে ‘হাঁ! হাঁ!!’ করিয়া উঠিল।

 বুদ্ধু ডাকিল,—’বাবা!’

 ভূতুম ডাকিল,—’বাবা!’

রাজসভায় সকলে চুপ। রাজার চোখ দিয়া টস টস করিয়া জল গড়াইয়া গেল। রাজা ভূতুমের গালে চুমা খাইলেন, বুদ্ধুকে দুই হাত দিয়া বুকে তুলিয়া লইলেন।

তখনি রাজসভা ভাঙিয়া দিয়া বুদ্ধু আর ভূতুমকে লইয়া রাজা উঠিলেন।

এদিকে তো সাজ সাজ পড়িয়া গিয়াছে। পাঁচ নিশান উড়াইয়া পাঁচখানা ময়ূরপঙ্খি আসিয়া, ঘাটে লাগিল। রাজপুত্রেরা তাহাতে উঠিলেন। রানিরা হুলুধ্বনি দিয়া পাঁচ রাজপুত্রকে কলাবতী রাজকন্যার দেশে পাঠাইলেন।

সেই সময়ে ভূতুম আর বুদ্ধুকে লইয়া, রাজা যে, নদীর ঘাটে আসিলেন।

বুদ্ধু বলিল,—’বাবা, ও কী যায়?’

রাজা বলিলেন,—’ময়ূরপঙ্খি।’

বুদ্ধু বলিল,—’বাবা, আমরা ময়ূরপঙ্খিতে যাইব; আমাদিকে ময়ূরপঙ্খি দাও।’

ভূতুম বলিল,—’বাবা, ময়ূরপঙ্খি দাও।’

রানিরা সকলে কিল কিল করিয়া উঠিলেন-

‘কে লো, কে লো, বাঁদির ছানা নাকি লো?’

‘কে লো, কে লো, ঘুঁটেকুড়ানির ছা নাকি লো?’

‘ও মা, ও মা, ছি! ছি!’

রানিরা ভূতুমের গালে ঠোনা মারিয়া ফেলিয়া দিলেন, বুদ্ধুর গালে চড় মারিয়া ফেলিয়া দিলেন। রাজা আর কথা কহিতে পারিলেন না; চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন।

রানিরা রাগে গরগর করিতে করিতে রাজাকে লইয়া রাজপুরীতে চলিয়া গেলেন।

 বুদ্ধু বলিল,—’দাদা?’

 ভূতুম বলিল,—’ভাই?’

বুদ্ধু,—’চল আমরা ছুতোরবাড়ি যাই, ময়ূরপঙ্খি গড়াইব; রাজপুত্রেরা যেখানে গেল, সেইখানে যাইব।’

ভূতুম বলিল,—’চল।’

দিন নাই, রাত্রি নাই, কাঁদিয়া-কাটিয়া ভূতুমের মা, বুদ্ধুর মায়ের দিন যায়। তাঁহারাও শুনিলেন, রাজপুত্রেরা ময়ূরপঙ্খি করিয়া কলাবতী রাজকন্যার দেশে চলিয়াছেন। শুনিয়া, দুইজনে, দুইজনের গলা ধরিয়া আরও কাঁদিতে লাগিলেন।

কাঁদিয়া-কাটিয়া দুই বোনে শেষে নদীর ধারে আসিলেন। তাহার পরে, দুইজনে দুইখানা সুপারির ডোঙায়, দুই কড়া কড়ি, ধান দূর্বা আর আগা-গলুইয়ে পাছা-গলুইয়ে সিন্দুরের ফোঁটা দিয়ে ভাসাইয়া দিলেন।

বুদ্ধুর মা বলিলেন,—

‘বুদ্ধু আমার বাপ!
কী করেছি পাপ?
কোন পাপে ছেড়ে গেলি, দিয়ে মনস্তাপ?
শুকপঙ্খি নায়ের পাছে ময়ূরপঙ্খি যায়,
আমার বাছা থাকলে যেতিস মায়ের এই নায়।
পৃথিবীর যেখানে যে আছ ভগবান,—
আমার বাছার তরে দিলাম এই দূর্বা ধান।’

ভূতুমের মা বলিলেন,—

‘ভূতুম আমার বাপ!
কী করেছি পাপ?
কোন পাপে ছেড়ে গেলি, দিয়ে মনস্তাপ?
শুকপঙ্খি নায়ের পাছে ময়ূরপঙ্খি যায়,
আমার বাছা থাকলে যেতিস মায়ের এই নায়।
পৃথিবীর যেখানে যে আছ ভগবান,—
আমার বাছার তরে দিলাম এই দূর্বা ধান।’

সুপারির ডোঙা ভাসাইয়া দিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে ভূতুমের মা, বুদ্ধুর মা কুঁড়েতে ফিরিলেন।

ছুতোরের বাড়ি যাইতে যাইতে পথে ভূতুম আর বুদ্ধু দেখিল, দুইখানি সুপারির ডোঙা ভাসিয়া যাইতেছে।

বুদ্ধু বলিল,—’দাদা, এই তো আমাদের না’; এই নায়ে উঠো।’

ভূতুম বলিল,—’উঠো।’

তখন, বুদ্ধু আর ভূতুম দুইজনে দুই নায়ে উঠিয়া বসিল। দুই ভাইয়ের দুই ময়ূরপঙ্খি যে পাশাপাশি ভাসিয়া চলিল।

লোকজন দেখিয়া বলে,—’ও মা! এ আবার কী?’

বুদ্ধু বলে, ভূতুম বলে,—’আমরা বুদ্ধু আর ভূতুম।’

বুদ্ধু ভূতুম যায়।

১০

আর, রাজপুত্রেরা? রাজপুত্রদের ময়ূরপঙ্খি যাইতে যাইতে তিন বুড়ির রাজ্যে গিয়া পৌঁছিল। অমনি তিন বুড়ির তিন বুড়া পাইক আসিয়া নৌকা আটকাইল। নৌকা আটকাইয়া তাহারা মাঝি-মাল্লা সিপাই-লশকর সবসুদ্ধ পাঁচ রাজপুত্রকে থলের মধ্যে পুরিয়া তিন বুড়ির কাছে নিয়া গেল।

তাহাদিগে দিয়া তিন বুড়ি তিন সন্ধ্যা জল খাইয়া, নাক ডাকাইয়া ঘুমাইয়া পড়িল!

অনেক রাত্রে, তিন বুড়ির পেটের মধ্য হইতে রাজপুত্রেরা বলাবলি করিতে লাগিল,—

‘ভাই, জন্মের মতো বুড়িদের পেটে রহিলাম। আর মাদিগে দেখিব না, আর বাবাকে দেখিব না।’

এমন সময় কাহারা আসিয়া আস্তে আস্তে ডাকিল,—’দাদা! দাদা!’

রাজপুত্রেরা চুপিচুপি উত্তর করিল,—’কে ভাই, কে ভাই? আমরা যে বুড়ির পেটে!’

বাহির হইতে উত্তর হইল,—’আমার লেজ ধরো’; ‘আমার পুচ্ছ ধরো।’

রাজপুত্রেরা লেজ ধরিয়া, পুচ্ছ ধরিয়া, বুড়িদের নাকের ছিদ্র দিয়া বাহির হইয়া আসিল। আসিয়া দেখে, বুদ্ধু আর ভূতুম!

বুদ্ধু বলিল,—’চুপ, চুপ! শিগগির তরোয়াল দিয়ে বুড়িদের গলা কাটিয়া ফেলো।’

রাজপুত্রেরা তাহাই করিলেন। রাজপুত্র, মাল্লা-মাঝি সকলে বাহির হইয়া আসিল। আসিয়া, সকলে তাড়াতাড়ি গিয়া ময়ূরপঙ্খিতে পাল তুলিয়া দিল।

বুদ্ধু আর ভূতুমকে কেহ জিজ্ঞাসাও করিল না।

১১

ময়ূরপঙ্খি সারারাত ছুটিয়া ছুটিয়া ভোরে রাঙা নদীর জলে গিয়া পড়িল। রাঙা নদীর চারিদিকে কূল নাই, কিনারা নাই, কেবল রাঙা জল। মাঝিরা দিক হারাইল; পাঁচ ময়ূরপঙ্খি ঘুরিতে ঘুরিতে সমুদ্রে গিয়া পড়িল। রাজপুত্র মাল্লা-মাঝি সকলে হাহাকার করিয়া উঠিল।

সাত দিন সাত রাত্রি ধরিয়া ময়ূরপঙ্খিগুলি সমুদ্রের মধ্যে আছাড়িপিছাড়ি করিল। শেষে, নৌকা আর থাকে না; সব যায় যায়! রাজপুত্রেরা বলিলেন,—’হায় ভাই, বুদ্ধু ভাই থাকিলে আজি এখন রক্ষা করিত!’ ‘হায় ভাই, ভূতুম ভাই থাকিলে এখন রক্ষা করিত!’

‘কী ভাই, কী ভাই!

কী চাই, কী চাই?’

বলিয়া বুদ্ধু আর ভূতুম তাহাদের সুপারির ডোঙা ময়ূরপঙ্খি গলুইয়ের সঙ্গে বাঁধিয়া থুইয়া, রাজপুত্রদের কাছে আসিল। আর, মাঝিদিগে বলিল, ‘উত্তর দিকে পাল তুলিয়া দে।’

দেখিতে দেখিতে ময়ূরপঙ্খি সমুদ্র ছাড়াইয়া এক নদীতে আসিয়া পড়িল। নদীর জল যেন টলটল ছলছল করিতেছে। দুই পাড়ে আম-কাঁঠালের হাজার গাছ। রাজপুত্রেরা সকলে পেট ভরিয়া আম, কাঁঠাল খাইয়া, সুস্থির হইলেন।

তখন রাজপুত্রেরা বলিলেন,—’ময়ূরপঙ্খিতে বানর আর পেঁচা কেন রে? এ দুইটাকে জলে ফেলিয়া দে।’ মাঝিরা বুদ্ধু আর ভূতুমকে জলে ফেলিয়া দিল; তাহাদের সুপারির ডোঙা খুলিয়া ফেলিল। নদীর জলে ময়ূরপঙ্খি আবার চলিতে লাগিল।

চলিতে চলিতে একজায়গায় আসিয়া পাঁচটি ময়ূরপঙ্খিই রাজপুত্র, মাল্লা, মাঝি সব লইয়া, ভুস করিয়া ডুবিয়া গেল। আর তাহাদের কোনো চিহ্ন-ই রহিল না।

কতক্ষণ পর, বুদ্ধু আর ভূতুমের ডোঙা যে, সেইখানে আসিল। বুদ্ধু বলিল,— ‘দাদা!’

ভূতুম বলিল,—’কী?’

বুদ্ধু,—’আমার মন যেন কেমন কেমন করে, এইখানে কী যেন হইয়াছে। এসো তো, ডুব দিয়া, দেখি।’

ভূতুম বলিল,—’হোক গে!’ ওরা মরিয়া গেলেই বাঁচি। আমি ডুব-টুব দিতে পারিব না।’

বুদ্ধু বলিল,—’ছি, ছি, অমন কথা বলিয়ো না। তা, তুমি থাকো; এই আমার কোমরে সুতা বাঁধিলাম, যতদিন সুতাতে টান না দিব, ততদিন যেন তুলিয়ো না।’

ভূতুম বলিল,—’আচ্ছা, তা পারি।’

তখন বুদ্ধু নদীর জলে ডুব দিল; ভূতুম সুতা ধরিয়া রহিল।

১২

যাইতে যাইতে বুদ্ধু পাতালপুরীতে গিয়া দেখিল, এক মস্ত সুড়ঙ্গ। বুদ্ধু সুড়ঙ্গ দিয়া নামিল।

সুড়ঙ্গ পার হইয়া বুদ্ধু দেখিল, এক যে-রাজপুরী!-যেন ইন্দ্রপুরীর মতো!

কিন্তু সে রাজ্যে মানুষ নাই, জন নাই, কেবল এক এক-শো বচ্ছুরে বুড়ি বসিয়া একটি ছোটো কাঁথা সেলাই করিতেছে। বুড়ি বুদ্ধুকে দেখিয়াই হাতের কাঁথা বুদ্ধুর গায়ে ছুড়িয়া মারিল। অমনি হাজার হাজার সিপাই আসিয়া বুদ্ধুকে বাঁধিয়া-ছাঁদিয়া রাজপুরীর মধ্যে লইয়া গেল।

নিয়া গিয়া, সিপাইরা, এক অন্ধ কুঠরির মধ্যে, বুদ্ধুকে বন্ধ করিয়া রাখিয়া দিল। অমনি কুঠরির মধ্যে-‘বুদ্ধু ভাই, বুদ্ধু ভাই, আয় ভাই, আয় ভাই।’ বলিয়া অনেক লোক বুদ্ধুকে ঘিরিয়া ধরিল। বুদ্ধু দেখিল, রাজপুত্র আর মাল্লা-মাঝিরা!

বুদ্ধু বলিল,—’বটে! তা, আচ্ছা!’

পরদিন বুদ্ধু দাঁত-মুখ সিটকাইয়া মরিয়া রহিল! এক দাসী রাজপুত্রদিগে নিত্য কিনা খাবার দিয়া যাইত! সে আসিয়া দেখে, কুঠরির মধ্যে একটা বানর মরিয়া পড়িয়া আছে। সে যাইবার সময় মরা বানরটাকে ফেলিয়া দিয়া গেল।

আর কী?-তখন বুদ্ধু আস্তে আস্তে চোখ মিটিমিটি করিয়া উঠে। না, তো, এদিক-ওদিক চাহিয়া বুদ্ধু, উঠিল। উঠিয়াই বুদ্ধু দেখিল প্রকাণ্ড রাজপুরীর তে-তলায় মেঘবরন চুল কুঁচবরন কন্যা সোনার শুকের সঙ্গে কথা কহিতেছে।

বুদ্ধু গাছের ডালে ডালে, দালানের ছাদে ছাদে গিয়া, কুঁচবরন কন্যার পিছনে দাঁড়াইল। তখন কুঁচবরন কন্যা বলিতেছিলেন,—

 ‘সোনার পাখি, ও রে শুক, মিছাই গেল

 রুপার বইঠা হিরার হাল-কেউ না এল!’

রাজকন্যার খোঁপায় মোতির ফুল ছিল, বুদ্ধু আস্তে-মোতির ফুলটি উঠাইয়া লইল।

তখন শুক বলিল,—

 ‘কুঁচবরন কন্যা মেঘবরন চুল

 কী হইল কন্যা, মোতির ফুল?’

রাজকন্যা খোঁপায় হাত দিয়া দেখিলেন, ফুল নাই।

শুক বলিল,—

 ‘কলাবতী রাজকন্যা, চিন্ত নাকো আর,
 মাথা তুলে চেয়ে দেখো, বর তোমার!’

কলাবতী, চমকিয়া পিছন ফিরিয়া দেখেন,—বানর! কলাবতীর মাথা হেঁট হইল। হাতের কাঁকন ছুড়িয়া ফেলিয়া, মেঘবরন চুলের বেণী এলাইয়া দিয়া, কলাবতী রাজকন্যা মাটিতে লুটাইয়া পড়িলেন।

কিন্তু, রাজকন্যা কী করবেন? যখন পণ করিয়াছিলেন যে, তিন বুড়ির রাজ্য পার হইয়া, রাঙা নদীর জল পাড়ি দিয়া, কাঁথা-বুড়ির, আর অন্ধ কুঠরির হাত এড়াইয়া তাঁহার পুরীতে আসিয়া যে মোতির ফুল নিতে পারিবে, সেই তাঁহার স্বামী হইবে। তখন রাজকন্যা আর কী করেন?-উঠিয়া বানরের গলায় মালা দিলেন।

তখন বুদ্ধু হাসিয়া বলিল,—’রাজকন্যা, এখন তুমি কার?’

রাজকন্যা বলিলেন,—’আগে ছিলাম বাপের-মায়ের, তার পরে ছিলাম আমার; এখন তোমার।’

বুদ্ধু বলিল,—’তবে আমার দাদাদিগে ছাড়িয়া দাও, আর তুমি আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে চলো। মাদের বড়ো কষ্ট, তুমি গেলে তাঁহাদের কষ্ট থাকিবে না।’

রাজকন্যা বলিলেন,—’এখন তুমি যাহা বলিবে, তাহাই করিব। তা চলো;-কিন্তু তুমি আমাকে এমনি নিতে পারিবে না,—আমি এই কৌটার মধ্যে থাকি, তুমি কৌটায় করিয়া আমাকে লইয়া চলো।’

বুদ্ধু বলিল,—’আচ্ছা।’

রাজকন্যা কৌটার ভিতর উঠিলেন।

অমনি শুকপাখি তাড়াতাড়ি গিয়া ঢোল-ডগরে ঘা দিল। দেখিতে দেখিতে রাজপুরীর মধ্যে এক প্রকাণ্ড হাট-বাজার বসিয়া গেল। রাজকন্যার কৌটা দোকানির কৌটার সঙ্গে মিশিয়া গেল।

বুদ্ধু দেখিল, এ তো বেশ। সে ঢোল-ডগর লইয়া বাজাইতে আরম্ভ করিয়া দিল। ঢোল-ডগরের ডাহিনে ঘা দিলে হাট-বাজার বসে, বাঁয়ে ঘা দিলে হাট-বাজার ভাঙিয়া যায়। বুদ্ধু চোখ বুজিয়া বসিয়া বসিয়া বাজাইতে লাগিল। দোকানিরা দোকান উঠাইতে-নামাইতে উঠাইতে-নামাইতে একেবারে হয়রান হইয়া গেল, আর পারে না। তখন সকলে বলিল,—’রাখুন, রাখুন রাজকন্যার কৌটা নেন; আমরা আর হাট করিতে চাহি না।’

বুদ্ধু ঢোল-ডগরের বাঁয়ে ঘা মারিল, হাট ভাঙিয়া গেল। কেবল রাজকন্যার কৌটাটি পড়িয়া রহিল।

বুদ্ধু এবার আর কিন্তু ঢোলটি ছাড়িল না। ঢোলটি কাঁধে করিয়া কৌটার কাছে গিয়া ডাকিল,—

 ‘রাজকন্যা রাজকন্যা, ঘুমে আছ কি?

 বরে নিতে ঢোল-ডগর নিয়ে এসেছি।’

রাজকন্যা কৌটা হইতে বাহির হইয়া বলিলেন,—’আমার বড়ো ক্ষুধা পাইয়াছে, গাছের পাতার ফল আনিয়া দাও, খাইব।’

বুদ্ধু বলিল,—’আচ্ছা।’

রাজকন্যা কৌটায় উঠিলেন। বুদ্ধু ঢোল কাঁধে কৌটা হাতে গাছের পাতার ফল আনিতে চলিল।

সেখানে গিয়া বুদ্ধু দেখিল, গাছের পাতায় পাতায় কতরকম ফল ধরিয়া রহিয়াছে। দেখিয়া বুদ্ধুরও লোভ হইল! কিন্তু, ও বাবা! এক যে অজগর-গাছের গোড়ায় সোঁ সোঁ করিয়া ফোঁসাইতেছে!

বুদ্ধু তখন আস্তে আস্তে গাছের চারিদিকে ঘুরিয়া আসিয়া, এক দৌড় দিল। তাহার কোমরের সুতায় জড়াইয়া, অজগর কাটিয়া দুইখান হইয়া গেল। তখন বুদ্ধু গাছে উঠিয়া, পাতার ফল পাড়িয়া, রাজকন্যাকে ডাকিল।

রাজকন্যা বলিলেন,—’আর না, সব হইয়াছে। . . . এখন চলো, তোমার বাড়ি যাইব!’

বুদ্ধু বলিল,—’না, সব হয় নাই; রাজপুত্রদাদাদিগে আর বুড়ির কাঁথাটি লইতে হইবে।’ রাজকন্যা বলিলেন,—’লও।’

তখন পাঁচ রাজপুত্র, মাল্লা, মাঝি, ময়ূরপঙ্খি, সব লইয়া, ঢোল-ডগর কাঁধে, কৌটা হাতে, মোতির ফুল কানে, বুড়ির কাঁথা গায়ে বুদ্ধু গাছের পাতার ফল খাইতে খাইতে কোমরের সুতায় টান দিল।

ভূতুম বুঝিল, এইবার বুদ্ধু আসিতেছে। সে সুতা টানিয়া তুলিল। পাঁচ রাজপুত্র, সিপাই-লশকর, মাল্লা-মাঝি, ময়ূরপঙ্খি, সব লইয়া বুদ্ধু ভাসিয়া উঠিল।

ভাসিয়া উঠিয়া মাল্লা-মাঝিরা, ‘সার সার’ করিয়া পাল তুলিয়া দিল। বুদ্ধু গিয়া ময়ূরপঙ্খির ছাদে বসিল, পেঁচা গিয়া ময়ূরপঙ্খির মাস্তুলে বসিল।

এবার সকলকে লইয়া ময়ূরপঙ্খি দেশে চলিল।

ছাদের উপর বুদ্ধু চোখ মিটিমিটি করে আর মাঝে মাঝে কৌটা খুলিয়া কাহার সঙ্গে যেন কথা হয়, হালের মাঝি যে, রাজপুত্রদিগে এই খবর দিল।

খবর পাইয়া তাহারা চুপ। . . . রাত্রে সকলে ঘুমাইয়াছে, ভূতুম আর বুদ্ধুও ঘুমাইতেছে; সেই সময়, রাজপুত্রেরা চুপিচুপি আসিয়া কৌটাটি সরাইয়া লইয়া, ঢোল-ডগর শিয়রে, বুড়ির কাঁথা গায়ে বুদ্ধুকে ধাক্কা দিয়া জলে ফেলিয়া দিলেন। ভূতুম, মাস্তুলে ছিল, তার বুকে তির মারিলেন। বুদ্ধু, ভূতুম জলে পড়িয়া ভাসিয়া গেল।

তখন কৌটা খুলিতেই, মেঘবরন চুল কুঁচবরন রাজকন্যা বাহির হইলেন।

রাজপুত্রেরা বলিলেন,—’রাজকন্যা, এখন তুমি কার?’

রাজকন্যা বলিলেন,—’ঢোল-ডগর যার।’

শুনিয়া রাজপুত্রেরা বলিলেন,—’ও! তা বুঝিয়াছি!-রাজকন্যাকে আটক করো।’

কী করিবেন? রাজকন্যা ময়ূরপঙ্খির এক কুঠরির মধ্যে আটক হইয়া রহিলেন।

১৩

রহিলেন-ময়ূরপঙ্খি আসিয়া ঘাটে লাগিল, আর রাজ্যময় সাজ সাজ পড়িয়া গেল। রাজা আসিলেন, রানিরা আসিলেন, রাজ্যের সকলে নদীর ধারে আসিল।-মেঘবরন চুল কুঁচবরন কন্যা লইয়া রাজপুত্রেরা আসিয়াছেন।

রানিরা ধান-দূর্বা দিয়া, পঞ্চদীপ সাজাইয়া, শাঁখ শঙ্খ বাজাইয়া কলাবতী রাজকন্যাকে বরণ করিয়া ঘরে তুলিলেন।

রানিরা বলিলেন,—’রাজকন্যা, তুমি কার?’

রাজকন্যা বলিলেন,—’ঢোল-ডগর যার।’

‘ঢোল-ডগর হিরারাজপুত্রের?’

‘না।’

‘ঢোল-ডগর মানিকরাজপুত্রের?’

‘না।’

‘ঢোল-ডগর মোতিরাজপুত্রের?’

‘না।’

‘ঢোল-ডগর শঙ্খরাজপুত্রের?’

‘না।’

‘ঢোল-ডগর কাঞ্চনরাজপুত্রের?’

‘না।’

রানিরা বলিলেন,—’তবে তোমাকে কাটিয়া ফেলিব।’

রাজকন্যা বলিলেন,—’আমার এক মাস ব্রত, এক মাস পরে যাহা ইচ্ছা করিয়ো।’

তাহাই ঠিক হইল।

১৪

ভূতুমের মা, বুদ্ধুর মা, এতদিন কাঁদিয়া কাঁদিয়া মরো-মরো। শেষে দুইজনে নদীর জলে ডুবিয়া মরিতে গেলেন।

এমন সময় একদিক হইতে বুদ্ধু ডাকিল,—’মা!’

আর একদিক হইতে ভূতুম ডাকিল,—’মা!’

দীন-দুঃখিনী দুই মায়ে ফিরিয়া চাহিয়া দেখেন,—

 বুকের ধন হারামণি বুদ্ধু আসিয়াছে!

 বুকের ধন হারামণি ভূতুম আসিয়াছে!

বুদ্ধুর মা, ভূতুমের মা, পাগলের মতো হইয়া ছুটিয়া গিয়া দুইজনে দুইজনকে বুকে নিলেন। বুদ্ধু ভূতুমের চোখের জলে, তাঁহাদের চোখের জলে, পৃথিবী ভাসিয়া গেল।

বুদ্ধু ভূতুম কুঁড়েয় গেল।

পরদিন, সেই যে ঢোল-ডগর ছিল? চিড়িয়াখানার বাঁদি, ঘুঁটেকুড়ানি দাসীর কুঁড়ের কাছে, মস্ত হাট-বাজার বসিয়া গিয়াছে। দেখিয়া লোক অবাক হইয়া গেল।

তাহার পরদিন, চিড়িয়াখানার বাঁদি, ঘুঁটেকুড়ানি দাসীর কুঁড়ের চারিদিকে গাছের পাতায় পাতায় ফল ধরিয়াছে! দেখিয়া লোকেরা আশ্চর্যান্বিত হইয়া গেল।

তাহার পরদিন, চিড়িয়াখানার বাঁদি, ঘুঁটে-কুড়ানি দাসীর কুঁড়ে ঘিরিয়া লক্ষ সিপাই পাহারা দিতেছে! দেখিয়া লোক সকল চমকিয়া গেল।

সেই খবর যে, রাজার কাছে গেল।

যাইতেই, সেইদিন কলাবতী রাজকন্যা বলিলেন,—’মহারাজ, আমার ব্রতের দিন শেষ হইয়াছে; আমাকে মারিবেন, কি, কাটিবেন, কাটুন।’ শুনিয়া রাজার চোখ ফুটিল।-রাজা সব বুঝিতে পারিলেন। বুঝিয়া রাজা বলিলেন,—’মা, আমি সব বুঝিয়াছি। কে আমার আছ, ন-রানিকে আর ছোটোরানিকে ঢোল-ডগর বাজাইয়া ঘরে আনো।’

অমনি রাজপুরীর যত ঢাক-ঢোল বাজিয়া উঠিল। কলাবতী রাজকন্যা, নূতন জলে স্নান, নূতন কাপড়ে পরণ, ব্রতের ধান-দূর্বা মাথায় গুঁজিয়া, দুই রানিকে বরণ করিয়া আনিতে আপনি গেলেন।

শুনিয়া, পাঁচ রানি ঘরে গিয়া খিল দিলেন। পাঁচ রাজপুত্র ঘরে গিয়া কবাট দিলেন।

লক্ষ সিপাই লইয়া, ঢোল-ডগর বাজাইয়া ন-রানি ছোটোরানিকে নিয়া কলাবতী রাজকন্যা রাজপুরীতে ফিরিয়া আসিলেন। বুদ্ধু ভূতুম আসিয়া রাজাকে প্রণাম করিল।

পরদিন মহা ধুমধামে মেঘবরন চুল কুঁচবরন কলাবতী রাজকন্যার সঙ্গে বুদ্ধুর বিবাহ হইল। আর এক দেশের রাজকন্যা হিরাবতীর সঙ্গে ভূতুমের বিবাহ হইল।

পাঁচ রানিরা আর খিল খুলিলেন না! পাঁচ রাজপুত্রেরা আর কবাট খুলিলেন না! রাজা পাঁচ রানির আর পাঁচ রাজপুত্রের ঘরের উপরে কাঁটা দিয়া, মাটি দিয়া, বুজাইয়া দিলেন।

ক-দিন যায়। একদিন রাত্রে, বুদ্ধুর ঘরে বুদ্ধু, ভূতুমের ঘরে ভূতুম, কলাবতী রাজকন্যা হিরাবতী রাজকন্যা ঘুমে। খুব রাত্রে হিরাবতী কলাবতী উঠিয়া দেখেন,—একি! হিরাবতীর ঘরে তো সোয়ামি নাই! কলাবতীর ঘরেও তো সোয়ামি নাই!-কী হইল, কী হইল? দেখেন,—বিছানার উপরে এক বানরের ছাল, বিছানার উপরে এক পেঁচার পাখ!

‘অ্যাঁ-দেখ!-তবে তো এঁরা সত্যিকার বানর না, সত্যিকার পেঁচা না।’- দুই বোনে ভাবেন।-নানান খানান ভাবিয়া শেষে উঁকি দিয়া দেখেন-দুই রাজপুত্র ঘোড়ায় চাপিয়া রাজপুরী পাহারা দেয়। রাজপুত্রেরা যে দেবতার পুত্রের মতো সুন্দর!

তখন, দুই বোনে যুক্তি করিয়া তাড়াতাড়ি পেঁচার পাখ, বানরের ছাল প্রদীপের আগুনে পোড়াইয়া ফেলিলেন। পোড়াতেই,—গন্ধ!

গন্ধ পাইয়া দুই রাজপুত্র ঘোড়া ফেলিয়া ছুটিয়া আসিলেন। ছুটিয়া আসিয়া দেবকুমার দুই রাজপুত্র বলেন,—’সর্বনাশ, সর্বনাশ! এ কী করিলে!-সন্ন্যাসীর মন্ত্র ছিল, ছদ্মবেশে থাকিতাম, দেবপুরে যাইতাম আসিতাম, রাজপুরে পাহারা দিতাম,—আর তো সে সব করিতে পারিব না!-এখন, আর তো আমরা বানর পেঁচা হইয়া থাকিতে পারিব না!-কথা যে, প্রকাশ হইল!’

দুই রাজকন্যা ছিলেন থতমত, হাসিয়া বলিলেন,—’তার আর কী? তবে তো ভালোই, তবে তো বেশ হইল। ও মা তবে নাকি পেঁচা?-তবে নাকি বানর?-আমরা কোথায় যাই!-‘

দুই রাজকন্যার ঘরে, আর কি?-সুখের নিশি, সুখের হাট। তার পরদিন ভোরে উঠিয়া সকলে দেখে, দেবতার মতো মূর্তি দুই সোনার চাঁদ রাজপুত্র রাজার দুই পাশে বসিয়া আছে! দেখিয়া সকল লোকে চমৎকার মানিল।

কলাবতী রাজকন্যা বলিলেন,—’উনি বানরের ছাল গায়ে দিয়া থাকিতেন; কাল রাত্রে আমি তাহা পোড়াইয়া ফেলিয়াছি।’

আর এক দেশের রাজকন্যা হিরাবতী বলিলেন,—’উনি পেঁচার পাখ গায়ে দিয়া থাকিতেন, কাল আমি তাহা পোড়াইয়া ফেলিয়াছি।’

শুনিয়া সকলে ধন্য ধন্য করিল।

তারপর?-তারপর-

বুদ্ধুর নাম হইয়াছে-বুধকুমার,

ভূতুমের নাম হইয়াছে-রূপকুমার।

রাজ্যে আনন্দের জয়-জয়কার পড়িয়া গেল।

তাহার পর, ন-রানি, ছোটোরানি, বুধকুমার, রূপকুমার আর কলাবতী রাজকন্যা, হিরাবতী রাজকন্যা লইয়া, রাজা সুখে দিন কাটাইতে লাগিলেন।