Accessibility Tools

ঠাকুরমার ঝুলি – দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার

ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী

এক যে ছিল ব্রাহ্মণী, আর তার যে ছিল পতি,—ব্রাহ্মণীটি বুদ্ধির ঘড়া, ব্রাহ্মণ বোকা অতি! কাজেই সংসারের যত কাজ ব্রাহ্মণীরই হত করতে, ব্রাহ্মণ শুধু খেতেন বসে, ব্রাহ্মণীর হত মরতে। ব্রাহ্মণীটি যে,—রণচণ্ডী!-নথের ঝাঁকিতে নাক ছিঁড়ে।-মাথার চুলে তৈল নাই, গা-গতরে খৈল নাই, ‘নিত্য ভিক্ষা তনু রক্ষা’, তার উপর আবার বামুনের চাটাল চাটাল কথা। জ্বালাতন-পালাতন বামনি ধান ঝাড়ে, তার তুষ ফেলে, কি, ধান ফেলে!

এমন সময় ব্রাহ্মণ গিয়া বলিল,—’বামনি, আজ বুঝি পিটে করবি না?’

কুলো মুলো ফেলিয়া খ্যাংরা নিয়া ব্রাহ্মণী গর্জে উঠিল,—’হ্যাঁ, পিটে করতেই বসেছি! চাল বাড়ন্ত হাঁড়ি খট খট-এক কড়ার মুরোদ নাই, পিটা-খেকোর পুত পিটা খাবে!-বেরো আমার বাড়ি থেকে!’

গর্জনে উঠান কাঁপে, গাছ থরথর পক্ষী উড়ে;-ব্রাহ্মণ ভাবলেন,—

 ‘কী? ব্রাহ্মণী, তার গালি সইব এত আমি?

 তা হবে না!’

 তখনি রাগে হলেন বনগামী!

বনে বনে ঘোরেন, এমন সময় এক সন্ন্যাসীর সঙ্গে ব্রাহ্মণের দেখা। সকল কথা শুনিয়া, সন্ন্যাসী, ব্রাহ্মণকে আপন আশ্রমে নিয়া গেলেন।

আশ্রমে গিয়া ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসীর কাছে লেখাপড়া শিখেন।

 কান নড়বড় বুড়ো বামুন
 মুনির কাছে পড়েন কেমন?
এ বেলা পড়েন,—’ক-চ-প-অ-অ-অ!’
ও বেলা পড়েন,—’খ-চ-ফ-অ-অ-অ!’
দিনে পড়েন,—’হগড়ং ডগড়ং বগ বগ বগড়ম।’
রাতে পড়েন,—’চং, ছং, খঁরঁরঁঅম-ঘড়-ড় ঘড়ম!’ নাকের ডাকে গলার ডাকে নিশি ভোর!

এইরকম করিয়া ব্রাহ্মণ খুব অনেক বিদ্যা শিখিয়া ফেলিলেন।

শিখিয়া-শুখিয়া ব্রাহ্মণ-

 মনে মনে, ভাবিলেন-আমি হনু একজন!
 বিদ্যেয় এখন ছড়াছড়ি যাবে যশ ধন!
 তখন-বামনির সে বিষমুখ দেখতে না আর হবে,—
হাঃ! হাঃ!
 তখন আমি কোথায় রব, আর বামনি কোথা রবে!
ভারি স্ফূর্তি।-কীসের আবার সন্ন্যাসীর কাছে বলা-টলা!-
 খুঙ্গি পুঁথি লাঠি চাটি বাঁধিয়া পুঁটুলি
 ‘জয় জগদম্বা!’ বামুন, দেশে গেলেন চলি।

ভাদ্দুরে রোদ, তাল পাকে, মাটি পাথর ফাটে,—সন্ধ্যা বেলায় ব্রাহ্মণ আপন গাঁয়ের সীমায় আসিলেন।-‘ঠিক তো!-রাজার বাড়ি তো যাবই তো, তা মরিল কি রইল, বামনিটাকে একবার দেখে গেলেও-হয়।’

একটু রাত হইয়াছে, তখন ব্রাহ্মণ, বাড়ির আঙিনায় উঠিয়াছেন।

 ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ বামুন, শুনতে পেলেন কানে,—
 ‘বামনি ভাজেন তালের বড়া, বুঝি অনুমানে!’

ব্রাহ্মণ চুপ করিয়া কানাচে কান পাতিয়া রহিলেন।

 ‘ক-টা হল ছ্যাঁক?-মনে মনে ল্যাখ।
 চার, পাঁচ, সাত, আট-এক কুড়ি এক।’

তখন আর ‘ছ্যাঁক’ নাই;-ব্রাহ্মণী হাত-পা ধুইয়া যেই বাহিরে আসিলেন,

 ব্রাহ্মণ ডাকিলা উচ্চে,—’ব্রাহ্মণী আছ বাড়ি?
 এবার আমি শিখে এলাম বিদ্যে ভারী ভারী!’

চমকিয়া ব্রাহ্মণী ছুটিয়া আসিয়া দেখেন-সারা অঙ্গে তিলক ফোঁটা ব্রাহ্মণ আসিয়া হাজির! ব্যস্তে স্বস্তে ব্রাহ্মণী বলিলেন,—’এতদিন কোথায় ছিলে?’

ব্রাহ্মণ বলিলেন,—’ব্রাহ্মণী! আমি খুব ভারী ভারী বিদ্যা শিখিয়া আসিয়াছি, তাই তোকে বলিয়া যাইতে আসিয়াছি!’

ব্রাহ্মণী বলিলেন,—’দূর পাগল!’

ব্রাহ্মণ বলিলেন,—

‘জানিসনে তাই বলছিস অমন, নইলে এতক্ষণ
এককুড়ি এক বড়া সাজিয়ে দিতিস নেমন্তন।’

‘অ্যাঁ? তুমি কী করে জানিলে?’

ব্রাহ্মণ বলিলেন,—’বামনি!-

 ওই তো বিদ্যের মা জননী! বল্লেম আমি গণে;-
 যেখানে যে ভাজুক বড়া সবি আমার মনে!’

শুনিয়া ব্রাহ্মণী অবাক!-‘আহা, আহা, সত্যি কি, সত্যি কি?’

ব্রাহ্মণী মনের আনন্দে-

 ছুটে গিয়ে যত পাড়ার লোকের কাছে কয়,—
 ‘বামুন এল বিদ্যে শিখে, যেমন বিদ্যে নয়।’

পাড়ার লোকে আশ্চর্য!-আসিয়া দেখে,—

 মেলাই পুঁথি খুলে বামুন ঘন টিকি নাড়ে
 হং লং বং চং লম্বা বচন ঝাড়ে-
সেসব কি যে-সে বোঝে? সকলের চমক লাগিয়া গেল।
 দেখতে দেখতে সারা গাঁয়ে রাষ্ট্র হল যে,
 চমৎকার বিদ্যে বামুন শিখে এসেছে।

খুব জাঁকে দিন যায়। এর হাত গণেন, ওর চুরি গণেন, দেশে দেশে ব্রাহ্মণের বিদ্যার নামে জয় জয় উঠিল।

একদিন, মতি ধোপার গাধা হারাইয়াছে।-মতি ব্রাহ্মণের দুয়ারে আসিয়া ধরনা দিল-

 ‘বলে দাও দেবতা আমার উপায় হবে কী গো-
 সবে ধন হারিয়েছি খোঁড়া গাধাটি গো।’

ব্রাহ্মণ বলিলেন,—

 ‘চুপ থাক-এখন আমি চণ্ডীপুজো করে
 তবে এসে বলব বসে থাকগে ওই দোরে।’

না খাইয়া না দাইয়া মতি দুয়ারে পড়িয়া রহিল।

ব্রাহ্মণ ঘরে গিয়া বলেন,—’বামনি এখন কী করি?-দাও তো দেখি ছাতাটা।’

ছাতা নিয়া ব্রাহ্মণ ঝাঁ ঝাঁ রৌদ্রে সারা মাঠ ঘুরিয়াও গাধা পাইলেন না। তখন-

 হাঁপাতে হাঁপাতে এসে, ক্ষুণ্ণ অতি মন,
 বলিলেন,—’ওরে মতে! বলি তোরে শোন-
 আজ গাধাটা পাবি নাকো, যা,
 চণ্ডী রেগেছেন বড়ো কী জানি কী করে;
 কাল এসে গাধা তুই নিয়ে যাস ঘরে।’

 দেবীর রাগের কথায় মতি
 ভয়ে ভয়ে চলে গেল।
 তখন সূয্যি ডুবে গেছে,
 তারপর রাত্রি হয়ে এল।

 ব্রাহ্মণের চিন্তা বড়ো,—’বুঝি এইবার
 হায় হায় ভেঙে যায় সব ভুরিভাড়।’

রাত্রি হইল; বসিয়া বসিয়া মাথে হাত ব্রাহ্মণ ভাবিতে লাগিলেন,—

 ‘যত বিদ্যা খুঙ্গি পুঁথি এইবার ফাঁক
 জগদম্বা! কী করিলে!-বিষম বিপাক!’

ভাবিয়া ভাবিয়া ব্রাহ্মণ ঘুমাইয়া পড়িলেন।

অনেক রাত্রে, বার আঙিনার কোণে কীসের শব্দ! ব্রাহ্মণ ধড়ফড় করিয়া জাগিয়া উঠিলেন,—

 ‘বামনি বামনি শুনছ,—ওটা হল কীসের শব্দ?’

ব্রাহ্মণী,—

 ‘হাঁ হাঁ-বুঝি চোর এসেছে-করতে হবে জব্দ।’

ব্রাহ্মণটি আবার চোরের নামে ভয় খেতেন; কাঁদো-কাঁদো সুরে বলিলেন,— ‘বামনি, তবে আমি নুকুই!’

ব্রাহ্মণী বলিলেন,—’তাই তো! এতই বড়ো পণ্ডিত?-এত পণ্ডিতি ঢলাইয়া কাজ নাই, আমি আলো ধরছি, চোর ধরবে চলো।

 পরের চোর গণে নিত্য বেড়ান বাড়ি বাড়ি,
 আপন ঘরে সেঁধোলে চোর, করেন তড়বড়ি।’

কী করেন বামুন, ‘জারে লোহা কোঁকড়’, ডরে ভয়ে কেন্নটি, ঘরে থাকলে রাবণে মারে, বাইরে গেলে রামে মারে,—দশ আঙুলে পৈতা জড়াইয়া ‘দুর্গা,—দুর্গা, -জগদম্বা’ জপিতে জপিতে ব্রাহ্মণ চোর ধরিতে গেলেন।

‘ওই যে চোর, ধরো না!’ ধাক্কা দিয়া বামনি বামুনকে ঠেলিয়া দিল!-

 ‘গ্যাঁ-গ্যাঁ-গ্যাঁ-ঘ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ।’

‘ওমা!-ও আবার কী!’

প্রদীপ নিয়া গিয়া ব্রাহ্মণী দেখেন-

 ওমা-এটা তো চোর নয় গো মা-
 উবড়ো থুবড়ো পড়ে আছে মস্ত গাধাটা!
বামুনে-গাধায় ঝড়-কম্পন, কুকুর-কুণ্ডলী!
 হুমড়ি খেয়ে যখন বামুন উপড়ে পড়ল আসি,
 গলায়-দড়া খোঁড়া গাধার লেগে গেছে ফাঁসি।
গাধার গলায় ঘড়ঘড়, বামুন করেন ধড়ফড়-
 চোখ উলটে পড়ে, বামুন হয়েছে হাঁ;-
 বামনি উঠলেন চেঁচিয়ে-‘হায়! কী হল গো মা!’

পাড়ার লোক ছুটিয়া আসে,—’কী, কী, কী হয়েছে,—ভয় নাই!’

ব্রাহ্মণী বলিলেন,—’না না, কিছু না এই গাধাটা দেখছিলেম।’

 -তাড়াতাড়ি ব্রাহ্মণী গাধা নিয়া খুঁটিতে বাঁধিলেন, বামুনকে নিয়া বিছানায় শোয়াইলেন,—তেল, জল, ফুঁ-বাতাস,—সকলে আসিয়া বলে, ‘কী, কী হইয়াছে কী?’

ব্রাহ্মণী বলিলেন,—

 ‘এমন কিছু না,—ঠাকুর বসেছিলেন জপে,
 গণে এনে মতির গাধা এই শুয়েছেন তবে।
 হারানো গাধা গণে আনা শক্ত কম তো নয়?-
 তাই একটু অস্থির আছেন জ্যোতিষ মহাশয়।’

কী আশ্চর্য! মন্ত্রের জোরে হারানো গাধা আসিয়া উপস্থিত!

সকলে অবাক!

এত তেল জল বাতাস! মূর্ছা ভাঙতেই ‘চোর! চোর!’ বলে বামুন উঠিয়া বসিল! ব্রাহ্মণী বলিলেন,—

‘চোর কোথায় তোমার মাথা,—

ওই দেখো না মতির গাধা খুঁটিতে বাঁধা।’

ব্রাহ্মণ বলিল,—’গাধা?-কই, কই মতেকে ডাকো!’

তাড়াতাড়ি ব্রাহ্মণী বলেন,—’চুপ করো, চুপ করো-এত রাত্রে মতে! ওগো বাছারা, রাত গেল, তোমরা এখন বাড়ি যাও,—বামুন ঘুমুক।’ সকলে চলে গেল। বামুন জিজ্ঞাসেন,—’তাই তো বামনি, হয়েছিল কী!’

পরদিন মতি আসিয়া দেখে,—গাধা! মতি লম্বা গড়াগড়ি-আঙিনার অর্ধেক ধুলাই, মতি, খাইয়া ফেলিল!

এখন, অমনি বামুনের কাপড় কাচে-তারপর মতি-

এ আশ্চর্য কথা আরও ঘটা ছটা দিয়ে-
রটনা করিল সব গাঁয়ে গাঁয়ে গিয়ে

তখন-

 ব্রাহ্মণের ধন্য ধন্য পল দেশময়।-
 ক্রমে এ কাহিনি রাজ-কর্ণগোচর হয়।

রাজকন্যার লক্ষ টাকার হার পাওয়া যায় না। কত জ্যোতিষ, কত পণ্ডিত আসিয়া হার মানিল। ‘রুই কাতলার আটকাট সবই কেবল মালসাট’- শেষে ডাক বামুনকে।

ঢেঙা ঢেঙা পাইক, এ-ই এ-ই আসাসোঁটা!-বামুন ভাবেন ‘ভালো ভালো ছিলাম বোকা, কপালের না জানি লেখা’-খাঁড়ার তলে ধাড়ি ছাগল, কাঁপিতে কাঁপিতে বামুন রাজসভায় গেলেন।

রাজার হুকুম,—

 ‘হার গণে দিতে পার পাবে পুরস্কার,
 নইলে বামুন শেষকালে বাস কারাগার।’

সিধা পত্র চুলোয় যাক, পূজা অর্চনা মাথায় থাক, ব্রাহ্মণ বলিলেন,— ‘মহারাজ, দু-দিন সময় চাই।’

‘আচ্ছা।’

দিনের মতন দিন গেল, রাত এল,
 এক ঘরে, বামুনের ঠাঁই
 ঘটি ঘটি জল খায় বামুন করে আইঢাই,—
 ‘হায় মাগো জগদম্বা, বিপাকে ফেলিলি,
 ছায়ে পোয়ে সর্বনাশ, প্রাণে ধনে নিলি
 কী করি উপায় মাগো, কী করি উপায়-
 জগদম্বা! এই তোর মনে ছিল হায়!’

রাজবাড়ির জগা মালিনী, জগদম্বা নাম-সেইখান দিয়া যাচ্ছিল,—

খপ করে থামে জগা-ধুকু ধুকু প্রাণ।

আর কথা, আর বার্তা-‘দোহাই ঠাকুর, দোহাই বাবা!-যা বলো বাবা তাই করি-রাজার কাছে যেন আমার নামটি কোরো না!’ জগা ছুটিয়া গিয়া বামুনের দুই পা সাপটিয়া পড়িল।

বামুন চমৎকার!-‘এ আবার কী!-কে তুমি, কে তুমি! আমি কী করেছি- আমাকে কেন?’

‘না বাবা ঠাকুর, তুমি সব জেনেছ, আমি আর এমন কর্ম করব না;- দোহাই বাবা, আমাকে রক্ষা করো, লোভে পড়ে আমি রাজকন্যার হার নিয়েছিলাম।-দোহাই বাবা, পায়ে তোর পড়ি বাবা!’

 তখন বুঝিল ব্রাহ্মণ, কী করে কী হল-

 ‘জগদম্বা’ নাম নিতে জগা ধরা দিল!

তখন, ব্রাহ্মণের ধড়ে এল প্রাণ,—ধীর সুস্থির মহাপণ্ডিত হইয়া বলিলেন, -‘যা করেছিস, করেছিস, তোর ভয় নাই, হাঁড়ির ভিতর যেন হার থাকে; রাখ নিয়া খিড়কি পুকুরের পাঁকে; তাতে যেন ভুলটি না হয়।’

 দুই চক্ষের জল ছেড়ে, জগা বাঁচে,—তখনি হার নিয়া খিড়কি পুকুরে রাখিয়া আসিল।

পরদিন,—গা-ময় তিলক ছাপা চিতা বাঘের ঠাকুর-জামাই,—তিন নামাবলি গায়ে, তিন নামাবলি গলায়, বড়ো বড়ো রুদ্রাক্ষের মালা, ফুলের ভারে টিকি ঝোলা, খুঙ্গি, পুঁথি, ছাতি, লাঠি, সকল নিয়া ব্রাহ্মণ রাজার সভায় গিয়া উপস্থিত।

 টিকি নাড়ে মন্ত্র পড়ে, ভঙ্গি ছঙ্গি কত
 এ-পুঁথি ও-পুঁথি খোলে পুঁথি শত শত!

গণিয়া গণিয়া আঙুল ক্ষয়,—কত শত খড়ি পাতে, কত শত মাটি আঁকে,—অনেক ক্ষণের পর,—

 ‘শুনো শুনো মহাশয়! পেয়ে গেছি হার,
 নিশ্চয় সে রহিয়াছে পুকুরে তোমার।’

‘খোঁজ খোঁজ!’-পুকুরের জল দই,—কিন্তু হার মিলিল কই?-রাজা বলেন,—

 ‘হা রে হা রে, চতুরালী করেছ বচন,
 না রাখ প্রাণের ভয়, কেমন ব্রাহ্মণ!’

‘দোহাই মহারাজ!’-ভ্যাঁ করে বামুন কাঁদে আর কি,—

‘আমার ভুল নাই,—মহারাজ, তবে সত্যি এ সব জগদম্বার কাজ!’

রাজা বলিলেন,—’ঠিক!-হতে পারে দশার দশা, আচ্ছা, নাহয় আবার খোঁজো!-তা, বামুনকে বাঁধো, যেন না পালায়।’

আবার খোঁজ খোঁজ-

 কাদার তলেতে এক পাওয়া গেল ভাঁড়;
 ভেঙে দেখে, ঝলমল হার মাঝে তার।

পাওয়া গেল, পাওয়া গেল! বামুনের বাঁধ খুলে গেল,

 সিংহাসন ছেড়ে রাজা পড়ে এসে পায়-
 ‘আজ হতে হইলা তুমি পণ্ডিত সভায়।’

আনন্দে ব্রাহ্মণ মূর্ছাই গেল। এবার কিন্তু সে চোর ধরার মূর্ছা নয়।

তা না হোক তা ভালোই,—তার পর? তারপর?

 ধন রত্ন, মণি মোতি, ছড়াছড়ি যায়
 নিত্য গিয়া বসে ব্রাহ্মণ, রাজার সভায়।
 দিকে দিকে হতে আসে পণ্ডিত বড়ো বড়ো,
 আমাদের পণ্ডিতের নামে ভয়ে জড়সড়।
 রাজা দেন পাদ্য অর্ঘ্য রানি দেন পূজা,
 জগা নিত্য জোগায় ফুল,—
 ঠাকুর পূজেন দশভূজা।

তখন-

 ত্রিতল প্রাসাদে সেই আগের ব্রাহ্মণ
 সোনার খাটেতে রন করিয়া শয়ন।

আর-

 তেলে ভাণ্ডার ভেসে যায়, গায়ে ধরে না গয়না,
 ব্রাহ্মণী তো ভারি খুশি,—হেসে ছাড়া কয়-ই না।

এখন-

রোজই বামুন পিটা খায়-
‘আহা লক্ষ্মী অতি।’
শুনে বামনি হেসে কুটিকুটি,—মনের সুখে-
 পতিসেবা করিতে লাগিলা সুখে সতী।