বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ২
পর্ব ০২
“কম্বোডিয়াতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের বাহন বাইক রিকশ—টুকটুক। তার সামনের অংশটা
মোটর বাইকের, আর পিছনের অংশটা আমাদের টোটো রিকশ মতো ছাদ ঢাকা, কিন্তু চারপাশ উন্মুক্ত। অনায়াসে ভালোভাবে চারপাশের যাত্রাপথ দেখা যায়। চারজন সওয়ারি আরামে বসতে পারে সেখানে। রাজধানী নমপেন থেকে শুরু করে মন্দির নগরী আঙ্করভাট সংলগ্ন সিয়েমরিপ। সর্বত্রই এই বাহনের দেখা মেলে। পর্যটকদের জন্যও স্বল্প খরচে ভ্রমণের জন্য এই যান বেশ উপযোগী। এয়ারপোর্ট লাগোয়া হোটেল থেকে এমনই এক বাহনে চড়ে বসেছিল সুরভী ও আরও তিনজন। অর্থাৎ নাতাশা, বিক্রম আর প্রীতম। গতকাল মধ্যরাতে দিল্লি থেকে তারা প্রথমে পৌঁছেছিল ব্যাংকক। সেখান থেকে ফ্লাইট ধরে তারা কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে এসে নেমেছে বেলা দশটায়। রাত দশটায় তারা আবার একটা গাড়িতে রওনা হবে সিয়েমরিপ অর্থাৎ আঙ্করভাটের উদ্দেশে। প্রফেসর রামমূর্তি তাদের জন্য তেমনই ব্যবস্থা করে রেখেছেন। কাজেই হাতে একটা বেলা চারপাশের দ্রষ্টব্য দেখার সময় আছে। তাই হোটেলে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে মধ্যাহ্নভোজ সেরে বেরিয়ে পড়েছে তারা। তাদের গন্তব্য শহরের লাগোয়া ‘কিলিং ফিল্ড’ নামের এক জায়গা। কম্বোডিয়া বলতে লোকের শুধু আঙ্করভাটের কথাই মনে আসে। নমপেনের এই কিলিং ফিল্ড নামের জায়গাটার কথা আগে কোনওদিন শোনেনি সুরভী, নাতাশা বা বিক্রম। প্রীতমই কোনও একটা ইউটিউব চ্যানেলে দেখেছে ওই স্মারকস্থল সম্পর্কে। জায়গাটা নাকি খুব রোমহর্ষক, গায়ে কাঁটা দেওয়া। সত্তর-আশির দশকে এই কম্বোডিয়ার শাসন ক্ষমতা দখল করেছিলেন খামের রুজ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জেনারেল পলপট। সে সময় এ দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষকে হত্যা করেন তিনি। ওই কিলিং ফিল্ড বা বধ্যভূমিতে নাকি স্মারক নির্মাণ করা আছে নিহত মানুষদের স্মরণে। প্রীতমের পরামর্শ মতো সেটাই দেখতে চলেছে তারা। কারণ, প্রত্যেকেই তারা ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহী। তাদের পড়াশোনার বিষয় আর্কিওলজি। যার অন্যতম অংশই তো হল ইতিহাস।
নমপেন রাজধানী শহর হলেও খুব একটা বড় শহর নয়। বড়বড় সরকারি ইমারত কিছু আছে ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ বাড়ি-ঘরই সাধারণ মানের। রাস্তায় চারচাকার গাড়ি বাস ইত্যাদির তুলনায় বাইক রিকশ বা দ্বিচক্র যানের সংখ্যাই বেশি। তবে রাস্তা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও সাজানো গোছানো। রাস্তার মোড়ে আইল্যান্ডগুলোতে শোভা পাচ্ছে বুদ্ধমূর্তি বা প্রাচীন কোনও মন্দিরের স্মারকের অংশ। কোথাও কোথাও সরকারি ভবন বা হোটেলের মাথায় উড়ছে কম্বোডিয়ার জাতীয় পতাকা। আঙ্করভাটের বিষ্ণু মন্দিরের ছবি আঁকা আছে তাতে। রাস্তার পাশে ফুটপাতের গায়ে সারসার দোকান পাট। অধিকাংশই ফল আর খাবারের দোকান। সেখানে কোথাও বিক্রি হচ্ছে ড্রাগন ফল, আবার কোথাও অনেকটা কাঁঠালের মতো দেখতে অচেনা স্থানীয় কোনও ফল৷ কোনও দোকানে আবার ঝুলিয়ে রাখা আছে লাল বর্ণের রোস্ট করা আস্ত শূকরের দেহ অথবা হাঁসমুরগি। রাস্তাতে লোকজনও আছে। স্থানীয় ছোটখাট চেহারার খামের নারী পুরুষ। অতি সাধারণ পোশাক তাদের পরনে, কারও মাথায় বাঁশের টোকা বা টুপি। দেখে মনে হয় খুব সাধারণ জীবনযাপন করে তারা। কখনও বা চোখে পড়ছে মুণ্ডিত মস্তক, পিঙ্গল বর্ণের পোশাক পরা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বা শ্বেতাঙ্গ ট্যুরিস্টদেরও। একবার একটা ট্রাফিক সিগনালে তাদের বাহন দাঁড়িয়ে পড়তেই বিক্রম রাস্তার পাশে একটা দোকানের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘আর ওই দেখ কী বিক্রি হচ্ছে!’ তার দৃষ্টি অনুসরণ করে অন্যরা তাকাল সেই দোকানের দিকে। মাংসর দোকান। তবে মুরগি বা শূকরের মাংসর দোকান নয়। দোকানের সামনে হুক থেকে ঝুলছে বেশ কয়েকটা কুমির! ক্রেতাও আছে দোকানে। ঝুলন্ত কুমিরের গা থেকে মাংস কেটে বিক্রি করা হচ্ছে সেখানে! দোকানটা সওয়ারিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বুঝতে পেরে চালক তাদের উদ্দেশে বলল, ‘আমাদের দেশে কুমিরের মাংস খুব জনপ্রিয়। নানান জায়গাতে কুমির খামার আছে। মাংস আর চামড়ার জন্য কুমির চাষ করা হয় সেখানে। এখানে একটা বাজার আছে যেখানে রান্না করা কুমিরের মাংস পাওয়া যায়, কুমিরের চামড়ার ব্যাগ, জুতো পাওয়া যায়, আপনারা চাইলে আমি আপনাদের সেখানে নিয়ে যেতে পারি।’
তার কথা শুনে প্রীতম অন্যদের উদ্দেশে বলল, ‘চল, কুমিরের মাংস চেখে দেখবে নাকি? আমার পরিচিত একজন থাইল্যান্ড কুমিরের মাংসর বার্গার খেয়েছিল। তার মুখে শুনেছি কুমিরের মাংস নাকি বেশ সুস্বাদু!’
প্রস্তাবটা শুনেই নাতাশা বলল, ‘ওয়াক! আমি কখনও এসব অখাদ্য-কুখাদ্য খাব না। প্রয়োজন হলে না খেয়ে থাকব তাও ভালো। আমি খাবও না, তোমাদের সঙ্গে ওসব জায়গায় যাবও না।’
এ কথা বলার পর পাছে গাড়ির চালক কুমিরের মাংসের খাবারের দোকানে গাড়ি নিয়ে যায় সেই ভয়ে নাতাশা তাঁকে বলল, ‘আপনি যেখানে আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন, সেখানেই আমাদের নিয়ে চলুন। এখন অন্য কোথাও আমরা যাব না।’
গাড়ি আবার তার নির্দিষ্ট পথে চলতে শুরু করল। তবে বিক্রম বলল, ‘কুমিরের মাংস খাই বা না খাই আমার একটা কুমিরের চামড়ার ওয়ালেট কেনার ইচ্ছা আছে। ব্যাংকক এয়ারপোর্টে একটা দোকানে বিক্রি হচ্ছিল। এমন দাম চাইল যে তা কেনা আমার সাধ্যের বাইরে। এয়ারপোর্টে অবশ্য সব কিছুই দশ-বারো গুণ দাম চায়। এখানে বা সিয়েমরিপে সস্তায় পেলে কিনব।’
সুরভী বলল, ‘তেমন হলে আমিও একটা ব্যাগ কিনব। স্মৃতি হয়ে থাকবে। তাছাড়া ও জিনিস তো আমাদের দেশে পাওয়া যায় না।’
নিজেদের মধ্যে নানান কথা বলতে বলতে, চারপাশে রাস্তার নানান জিনিস দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল তারা। কিলিং ফিল্ড জায়গাটা শহরের বাইরের অংশে। একসময় শহরের বাইরে এসে পড়ল তারা। রাস্তার দু’পাশে চাষের খেত আর তাল গাছের সারি। মাথায় টিনের ছাউনিওলা ঘরবাড়ি। রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা ফাঁকা। কিছুক্ষণ সে পথ ধরে চলার পর তারা পৌঁছে গেল ‘কিলিং ফিল্ডে’। জায়গাটা উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বাইরে থেকে ভিতরের কিছু গাছগাছালির মাথা চোখে পড়ছে। গেটের বাইরের চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু ট্যুরিস্ট বাস ও গাড়ি। কয়েকটা দোকানও আছে। স্থানীয় কিছু লোক হাতে নিয়ে ফেরি করছে ডাঁটসহ পদ্মফুল, ধূপকাঠি আর পুস্তিকা। গাড়ি থেকে নেমে চারজন এগল প্রবেশ তোরণের দিকে। তোরণের ভিতর প্রবেশ করেই ডান দিকে টিকিট কাউন্টার। তার গায়ে একটা সাইনবোর্ডে লেখা আছে, ‘এই স্থান কমিউনিস্ট শাসক পলপটের আমলের বধ্যভূমি গুলির মধ্যে অন্যতম। বহু নর-নারী শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এখানে। বেশ কিছু গণ কবরস্থান রয়েছে এখানে— যা খামের রুজ শাসনকালের নির্মমতা নৃশংসতার সাক্ষী। গণ কবরগুলি থেকে সংগৃহীত মানুষদের দেহাংশ সংরক্ষিত আছে স্মৃতিসৌধে। নিরবতা বজায় রেখে সেই সব হতভাগ্য নর-নারীদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করুন। স্মৃতিসৌধ ও গণ কবরস্থানের পবিত্রতা বজায় রাখুন।’
তারা টিকিট কাটার পর তাদের প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হল ইয়ার ফোন সমেত কি প্যাড যুক্ত মোবাইল ফোনের মতো একটা যন্ত্র। কিলিং ফিল্ডের কর্মী যন্ত্রের কার্যকারিতা বুঝিয়ে দিলেন। এই বধ্যভূমির প্রতিটি স্মারক স্থলের গায়ে এক -দুই এমন নম্বর লেখা আছে। ইয়ার ফোন কানে দিয়ে কি প্যাডে স্মারক স্থলের নম্বর টিপলে সে জায়গার ঘটনা ইতিহাস কানে ভেসে উঠবে। অর্থাৎ জিনিসটা হল ‘যান্ত্রিক গাইড’।
ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেওয়ার পর কিলিং ফিল্ডের সেই কর্মী কোন পথ ধরে এগতে হবে তা দেখিয়ে দিল তাদের। পাথরের স্তবক বিছানো পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল তারা। কিছু দূরে সাদা টাওয়ারের মতো একটা স্থাপত্য দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথার ওপরে ছাদটা অনেকটা প্যাগোডা শৈলীতে নির্মিত। চারপাশটা একেবারে নিস্তব্ধ। পথের পাশের জমিগুলো সবুজ গাছের গালিচা বিছানো অনেকটা উঁচু নিচু গল্ফ কোর্সের মতো। তার মধ্যে কোনও কোনও জায়গায় ছড়িয়ে আছে মাথায় খড় বা কাঠের ছাউনি দেওয়া, চারপাশ ঘেরা ছোট ছোট জায়গা। কিছু কিছু গাছও দাঁড়িয়ে আছে নানান জায়গাতে।
চারজন চারপাশে দেখতে দেখতে গিয়ে দাঁড়াল সেই সৌধর সামনে। লম্বাটে আকৃতির দ্বিতল বাড়ির সমান উঁচু স্তম্ভর মতো স্মৃতিসৌধটা দাঁড়িয়ে আছে একটা বেদির ওপরে। শ্বেতপাথরের কয়েক ধাপ সিঁড়ি অতিক্রম করে সৌধর কাচের প্যানেল লাগানো দরজার সামনে। সেই সিঁড়ির একপাশে জলপূর্ণ শ্বেতপাথরের একটা টবে পদ্মফুল দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে গেছে কেউ বা কারা। তার সামনে মাথা নিচু করে হাঁটু মুড়ে নিশ্চল পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে এক তরুণী। তার পোশাক দেখে তাকে স্থানীয় মানুষ বলেই মনে হল তাদের। জুতো খুলে বেদির ওপর উঠে পড়ল তারা। তারপর কাঠের প্যানেল বসানো দরজা ঠেলে স্মারক স্তম্ভর ভিতরে প্রবেশ করতেই চমকে উঠে কিছু সময়ের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল তারা। স্মৃতিস্তম্ভর ভিতর মেঝে থেকে মাথার ওপর দিকে উঠে গেছে সার সার থাক। আর প্রতিটা থাক সাজানো আছে থরে থরে নর করোটি। তাদের শূন্য কোটরগুলো যেন করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আগন্তুকদের দিকে। সুরভী ও অন্য তিনজন কানে ইয়ার ফোন গুঁজে যন্ত্রের এক নম্বর বোতাম টিপল। শুরু হল ইংরেজিতে ধারা বিররণী—‘আপনার যে নর করোটি ও দেহাবশেষগুলো দেখছেন তা উদ্ধার করা হয়েছে এই কিলিং ফিল্ডের গণ কবর থেকে। এই সব নারীপুরুষদের পলপটের ঘাতক বাহিনী সত্তর থেকে আশির দশকের মধ্যবর্তী সময় নৃশংসভাবে হত্যা করে। ওরা কেউ ছিলেন শিক্ষক, কেউ কৃষক, কেউ বা শ্রমিক। খামের রুজ কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে এরা চক্রান্তকারী। এই সন্দেহে তাঁদের হত্যা করা হয়। এদের বয়স চল্লিশ ও তার ঊর্ধে। বিকৃত নৃশংস মনের অধিকারী পলপট মনে করতেন যৌবন উত্তীর্ণ মানুষরা সমাজের পক্ষে বোঝা। তাই তাঁর হত্যালীলার প্রথম লক্ষ্য ছিল চল্লিশ ঊর্ধ মানুষরা। যদিও যুবক বা শিশুরাও রক্ষা পায়নি ঘাতক বাহিনীর কবল থেকে। নানান অজুহাতে নানান বয়সি মানুষকে তিনি নির্মমভাবে হত্যা করেন। তাঁর হত্যালীলার কারণে কম্বোডিয়ার জনসংখ্যা এক তৃতীয়াংশ কমে। কম্বোডিয়াতে আশি ঊর্ধ মানুষ প্রায় দেখতে পাওয়া যায় না বললেই চলে…।’
তারা চারজন চক্রাকারে হাঁটতে লাগল সেই স্মৃতিসৌধের ভিতর। টাওয়ারের মতো শোকেসগুলোর ভিতর সর্বত্রই থাকে থাকে সাজানো রয়েছে নর করোটি, কোথাও হাড়গোড় অথবা নিহত মানুষদের ছিন্ন পোশাক। আর তাদের কানে বেজে চলতে লাগল সে সময়কার নারকীয় ঘটনার বিবরণ। জেনারেল পলপট এক অদ্ভুত নির্দেশ জারি করেছিলেন। তা হল, খামের রুজ পার্টির অনুমতি ছাড়া কেউ চশমা পরতে পারবে না। তিনি মনে করতেন চশমা পরা ব্যক্তিরা হল শিক্ষিত ব্যক্তি। আর শিক্ষিত ব্যক্তি মানেই দেশ ও খামের রুজ কমিউনিস্ট পার্টির শত্রু। তাই বিনা অনুমতিতে চশমা পরার অপরাধে তিনি বহু মানুষকে হত্যা করেন। আর হত্যা করার পদ্ধতিও ছিল খুব নৃশংস ও যন্ত্রণাদায়ক। আপনারা যে নর করোটিগুলো দেখতে পাচ্ছেন, ভালো করে খেয়াল করে দেখুন অনেক করোটির মাথায় ছিদ্র বা ফাটা দাগ আছে। বন্দুকের গুলির খরচ কমাতে মানুষদের হত্যা করার জন্য তাঁর ঘাতক বাহিনী বিভিন্ন নৃশংস পদ্ধতি অবলম্বন করত। বন্দিদের হত্যা করা হতো মাথায় লৌহ দণ্ড দিয়ে আঘাত করে বা লৌহ শলাকা দিয়ে খুলি ফুটো করে। খুলির গায়ে জেগে থাকা ছিদ্র বা ফাটলগুলো সে ঘটনারই প্রমাণ…।’
স্মারক স্তম্ভর ভিতরটা দেখার পর যখন তারা বাইরে বেরিয়ে বেদির নীচে নেমে দাঁড়াল তখন তারা চারজনই বাকরুদ্ধ। সুরভী অস্ফুট স্বরে শুধু বলল, ‘এত নৃশংস যে মানুষ হতে পারে এ জায়গা না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না।’
সে জায়গা ছেড়ে এরপর তারা হাঁটতে শুরু করল চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য স্মারক স্থলগুলো দেখার জন্য। মাথায় ছাউনি দেওয়া ঘেরা জায়গাগুলো আসলে গণ কবরস্থান। সেখান থেকে উত্থিত করা হয়েছে নারী-পুরুষের দেহাবশেষ। প্রত্যেক জায়গাতে কাঠের ফলকে নম্বর লেখা আছে। সেই নম্বরের বোতাম টিপলেই সে জায়গা সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছে যন্ত্র গাইড। কোনও স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একশো জন নারীর কঙ্কাল। মৃত্যুর আগে যাদের ধর্ষণ করা হয়েছিল। আবার কোনও কবরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বলছে, এখানে ঘুমিয়ে ছিল আট থেকে বারো বছর বয়সি কুড়িজন বালক। মাঠে খেলছিল তারা। মাঠের পাশ দিয়ে যাওয়া খামের রুজের সামরিক গাড়ির কনভয় দেখে তারা স্যালুট না করায় তাদেরকে কিলিং ফিল্ডে তুলে আনা হয় … ।
একের পর এক গণ কবরগুলো দেখতে লাগল তারা। আর তার সঙ্গে সঙ্গে শুনে যেতে লাগল কিলিং ফিল্ডের হাড় হিম করা ঘটনার কথা। বেলা দুটো বেজে গেছে। কিলিং ফিল্ডের চারপাশে কেমন যেন অদ্ভুতরকম নিস্তব্ধ। তাদের মতো আরও কিছু বিদেশি পর্যটক ঘুরে বেড়াচ্ছে, ছবি তুলছে এখানে-ওখানে। কিন্তু কারও মুখে কোনও কথা নেই। কবরস্থানের মাঝখানে মাঝে মাঝে কাঠের বেঞ্চ আছে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। কোনও কোনও বেঞ্চে নিশ্চুপভাবে বসে আছে স্থানীয় কোনও মানুষ। অপলক নির্বাক দৃষ্টিতে তারা হয়তো চেয়ে আছে কাছেই কোন গণ কবরের দিকে। হয়তো বা সেখানে চির নিদ্রায় শায়িত ছিল বা আছে তাদের পিতা-মাতা বা কোনও নিকটাত্মীয়। সে সব দেখতে দেখতে একসময় তারা চারজন দুটো ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। সুরভী আর নাতাশা এগল একদিকে, বিক্রম আর প্রীতম ঘুরে বেড়াতে লাগল অন্য দিকে।
সুরভী আর নাতাশা একসময় হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়াল একটা বিশাল গাছের সামনে। সম্ভবত এই কিলিং ফিল্ডের সব থেকে বড় গাছ এটি। গাছের গুঁড়িটা বেশ মোটা। তার গায়ে কেউ বা কারা লাল-নীল নানান সুতো জড়িয়ে রেখেছে। গুড়ির নীচে ছোটখাট খেলনাও সুন্দর করে রাখা আছে। কয়েকটা পুতুল আবার গাছের গুঁড়ির গা থেকেও ঝুলছে। গাছের গুঁড়িটা সুরভী আর নাতাশার দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা দু’জন। তাদের চোখে পড়ল গাছের গুঁড়ির পাশেই একটা কাঠের ফলকে লেখা আছে ‘কিলিং ট্রি’। অর্থাৎ হত্যা গাছ! জায়গাটার নম্বরও লেখা আছে ফলকে। ব্যাপারটা কী? সেটা জানার জন্য তারা দু’জনেই হাতের যন্ত্রর বোতাম টিপল। যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বলতে শুরু করল, ‘আপনারা এখন দাঁড়িয়ে আছেন কিলিং ফিল্ডের সবথেকে নির্মম স্থানে। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন কিলিং ট্রি। এখানে যে সব নারীদের হত্যা করার জন্য নিয়ে আসা হতো তাদের অনেকের সঙ্গেই দুগ্ধ পোষ্য শিশুরা থাকত। মাকে হত্যা করার আগে তাদের কোল থেকে শিশুসন্তানকে কেড়ে নিয়ে মায়ের চোখের সামনেই সেই শিশুকে এই গাছের গুঁড়ির গায়ে আছাড় মেরে হত্যা করে পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করত পলপটের ঘাতক বাহিনী। কয়েকশো নিষ্পাপ শিশুকে এই গাছের গুঁড়িতে এভাবেই হত্যা করা হয়। তাই এই গাছকে বর্তমানে ‘কিলিং ট্রি’ নামে ডাকা হয়। স্থানীয় মানুষরা সেই সব মৃত শিশুদের আত্মার শান্তির কামনায় গাছের গায়ে মন্দিরের পবিত্র সুতো, খেলনা বেঁধে রেখে যায়।
এ পর্যন্ত কথাগুলো শোনার পরই হঠাৎ সুরভীর পাশে দাঁড়ানো নাতাশা নিজের কান থেকে ইয়ার ফোনটা হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলে বলল, “আমি আর এখানকার কিছু দেখতে চাই না, শুনতে চাই না। এ বিভৎসতা আর আমি নিতে পারছি না। শরীরটা কেমন যেন করছে!”
উচ্চ স্বরে বলা নাতাশার কথাগুলো শুনে সুরভীও তার কান থেকে ইয়ার ফোন খুলে ফেলল। সত্যি কথা বলতে কী এ জায়গাতে ঘুরতে ঘুরতে সেও বেশ অস্বস্তি বোধ শুরু করেছে। সত্যিই এত নৃশংস ঘটনার বিবরণ ও তার সাক্ষ্য প্রমাণ দর্শন সাধারণ মানুষের পক্ষে গ্রহণ করা খুব কষ্টসাধ্য। ভাবলেই গা শিউরে ওঠে, মাথা ঝিমঝিম করে। সুরভী আর কথা শুনে কিছু দূরে অন্য একটা গাছের ছাওয়ার একটা বেঞ্চ দেখতে পেয়ে নাতাশাকে বলল, ‘চল তবে আমরা ওখানে গিয়ে বসি। ওদের দু’জনের দেখা শেষ হলে একসঙ্গে বাইরে বেরব।’ নাতাশা বলল, ‘হ্যাঁ, বসি। তবে যত তাড়াতাড়ি এ জায়গা ছেড়ে বাইরে বেরনো যায় তত ভালো।’
সুরভী আর নাতাশা গাছের তলায় সেই বেঞ্চে গিয়ে বসল। দু’জনেই নিশ্চুপ। এ জায়গাটা তাদের মনের মধ্যে এমন অভিঘাত সৃষ্টি করেছে যে এ বিষয় নিয়ে বাক্যালাপ করে নিজের মনকে আর কষ্ট দিতে চায় না তারা। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রীতম এসে উপস্থিত হল তাদের কাছে। সে বলল, ‘তোমাদের বলেছিলাম না এই জায়গাটা রোমাঞ্চকর। ইউটিউবে কিছু ছবি দেখেছিলাম ঠিকই, তবে এখানে এসে চাক্ষুষ না করলে বুঝতে পারতাম না পলপট লোকটা কতটা ভয়ঙ্কর ছিল। তবে দুর্ভাগ্য পলপট নামের লোকটা তাঁর প্রাপ্য শাস্তি এড়িয়ে যেতে পেরেছিল। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি বন্দি হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চলার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়। ফাঁসির দড়ি বা ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়াতে হয়নি তাঁকে।’
নাতাশা বলল, ‘বিক্রম ফিরলেই আমরা রওনা হব কিন্তু।’
প্রীতম বলল, “ওই তো বিক্রম আসছে।”
সুরভী দেখল কিছুটা দূরে একটা ছাউনির দিক থেকে বিক্রম সেদিকেই আসছে। তার হাতে ধরা বয়াম বা জারের মতো কিছু একটা।
তাকে দেখতে পেয়ে সুরভী বেঞ্চ ছেড়ে উঠে পড়ল। নাতাশাও উঠে দাঁড়াল। এবার এই ভয়ঙ্কর জায়গা ত্যাগ করবে তারা। ঠিক এই সময় একটা কণ্ঠস্বর তাদের কানে খুব কাছ থেকে ভেসে এল ‘কোন দেশ থেকে এসেছেন আপনারা?’ তাদের কাছাকাছি এসে উপস্থিত হয়েছে একজন লোক। তার পরনে কালো স্যুট, চোখে সানগ্লাস, ছিপছিপে চেহারা, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। তার শরীরের গঠন আর আকৃতি দেখে তাকে কম্বোডিয়ান বলেই মনে হল সুরভীর। সে জবাব দিল, ‘আমরা ইন্ডিয়া থেকে এসেছি।’
জবাব শুনে লোকটা বলল, ‘ইন্ডিয়া! ভগবান বুদ্ধর দেশ তাই না?’
সুরভী বলল, ‘হ্যাঁ, তা বলতে পারেন। বুদ্ধ তাঁর কর্মজীবন ইন্ডিয়াতেই অতিবাহিত করেন। তাঁর ধর্ম প্রচার করেন।
লোকটা মৃদু হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, শান্তির ধর্ম। ইন্ডিয়া থেকেই এ দেশে বৌদ্ধ ধর্মের আগমন ঘটে। এ দেশের নব্বই শতাংশ মানুষই তো বর্তমানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।’
এ কথা বলার পর লোকটা বলল, ‘যদি আপনাদের দেখা না হয়ে থাকে তবে আপনারা আর একটা জায়গা দেখে আসতে পারেন। জায়গাটা এখান থেকে বেশি দূর নয়। একসময় যেটা ইশকুল ছিল। পলটপ তাকে বন্দি শিবির বা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প বানিয়েছিলেন। বর্তমানে সেটা মিউজিয়াম। সেখানে গেলে বুঝতে পারবেন কী অমানুষিক নির্যাতন করা হতো বন্দিদের ওপর!’ লোকটার কথা শুনে নাতাশা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় বিক্রম এসে উপস্থিত হল সেখানে। তার হাতে একটা কাচের জার। সাদা পপকর্নের মতো দেখতে জিনিসে ভর্তি সেটা। বিক্রম জারটা দেখিয়ে তাদেরকে বলল, ‘এটা তোদের দেখাবার জন্য আনলাম। ওই ছাউনির নীচে টেবিলে রাখা ছিল। আবার সেখানেই রেখে আসব তোমাদের দেখা হয়ে গেলে। এই জারের ভিতরের জিনিসগুলো কী বল তো?
প্রীতম বলল, “কী জিনিস? পপকর্ন?”
বিক্রম জবাব দিল, ‘পপকর্ন নয়, ভালো করে দেখ।’ প্রীতম এরপর কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই সুরভীদের কাছে এসে দাঁড়াল লোকটা বলল, “আমি জানি এগুলো কী। পপকর্ন নয়, মৃত মানুষদের দাঁত। কিলিং ফিল্ডে মানুষদের এনে হত্যা করার আগে তাদের যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য দাঁত উপড়ে নেওয়া হতো। সেগুলোই রাখা আছে ওখানে।”
একথা শুনেই সুরভীরা চমকে উঠে তাকাল কাচের পাত্রটার দিকে। হ্যাঁ, অগুনতি দাঁত রাখা সেই পাত্রর ভিতর। আর এরপরই মুখ দিয়ে একটা শব্দ তুলে নাতাশা হেলে পড়ল সুরভীর কাঁধের ওপর। সুরভী তাকে ধরে না ফেললে সে মাটিতেই পড়ে যেত। সুরভী আর বিক্রম তাকে ধরাধরি করে বেঞ্চের ওপর শুইয়ে দিল। জ্ঞান হারিয়েছে নাতাশা। ব্যাপারটা সে আর সহ্য করতে পারেনি। ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে প্রীতম ঝাপটা দিতে শুরু করল নাতাশার মুখে। আর বিক্রম ছুটল তার হাতের জিনিসটাকে স্বস্থানে রেখে ফিরে আসার জন্য। মিনিট দুই সময়ের মধ্যে ফিরে এল সে। কিন্তু নাতাশার জ্ঞান তখনও ফেরেনি। এখন কী করা যায়? সেই লোকটা এখনও দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে। সে বলল, ‘আপনারা ভয় পাবেন না। একটু অপেক্ষা করুন আমি আসছি। একথা বলে সে দ্রুত এগল অন্য এক দিকে। সুরভীরা চেষ্টা করে যেতে লাগল নাতাশার জ্ঞান ফেরাবার।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকটা ফিরে এল। তার হাতে একটা ছোট শিশি। সে সেই শিশিটার ছিপি খুলে নাতাশার নাকের কাছে ধরতেই কয়েক মুহূর্তর মধ্যে কাশতে কাশতে চোখ মেলল নাতাশা। সে বেঞ্চে উঠে বসার পর লোকটা শিশিটা দেখিয়ে বলল ‘স্মেলিং সল্ট। এখানে এসে অনেকেরই এ ঘটনা ঘটে। তাই টিকিট কাউন্টারে স্মেলিং সল্ট রাখা থাকে।’
নাতাশার ধাতস্থ হতে আরও কয়েক মিনিট সময় লাগল। তারপর উঠে দাঁড়াল সে। সুরভী লোকটার উদ্দেশে সৌজন্যর খাতিরে বলল, ‘সাহায্য করার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়াতে সত্যি ঘাবড়ে গেছিলাম আমরা। কৃতজ্ঞতা জানাই আপনাকে। মাঝবয়সি লোকটা হেসে বলল, ‘কৃতজ্ঞতা জানাবার মতো কোন কাজ আমি করিনি। আসলে আমি এ জায়গাতে আরও দু’দিন এসেছি। তার মধ্যে একদিন আরও একজন লোক কিলিং ট্রি দেখে এমনই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলেন। একজন তখন স্মেলিং সল্ট এনে তাঁর সংজ্ঞা ফেরালেন। তখনই ব্যাপারটা জানলাম। সে অভিজ্ঞতাটাই কাজে লাগালাম।’ বিক্রম তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি এখানেই থাকেন? কম্বোডিয়ার লোক?’ লোকটা জবাব দিল, ‘আমার জন্ম কম্বোডিয়ায় ঠিকই, কিন্তু জন্মের পরই আমি ফ্রান্সে চলে গেছিলাম। সেখানেই বড় হয়েছি, লেখাপড়া করেছি, কর্মজীবন শুরু করেছি। জানেন হয়তো একসময় কিছুকালের জন্য এ দেশটাও ফরাসিদের অধীনে ছিল।’
এ কথা বলার পর একটু থেমে লোকটা হেসে বলল, ‘কিন্তু জন্মভূমির ওপর প্রত্যেক মানুষেরই টান থাকে। আমার বাপ-ঠাকুরদা পূর্বপুরুষা তো এখানেই জন্মেছিলেন। তাই এ দেশটার প্রতি আমারও আকর্ষণ আছে। তাই দেখতে এসেছি এ দেশটা।’ প্রীতম বলল, ‘আপনার নাম কি?’
লোকটা জবাব দিল, ‘নারেঙ খাম।’ নামটা কিন্তু পিতামাতার দেওয়া খামের নাম, ফ্রান্সে থাকলেও আমি অন্য কোন ফরাসী নাম গ্রহণ করিনি।’
এ কথা বলার পর নারেঙ খাম নামের ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, ‘আপনাদের পরের গন্তব্য কোথায়?’
সুরভী বলল, ‘আমরা আসলে এখানে একটা কাজে এসেছি। আমাদের পাঠানো হয়েছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া থেকে আঙ্করভাটের এক মন্দির সংস্কারের কাজে। আমরা আজই এসেছি এখানে। রাতেই সিয়েমরিপের উদ্দেশে রওনা হব। হাতে কিছুটা সময় ছিল বলে এ জায়গা দেখতে এসেছিলাম।’
খাম বললেন, ‘তাহলে হয়তো আপনাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যাবে। আমিও আঙ্করভাট দেখতে সিয়েমরিপ যাব। তাছাড়া আমার ওখানে অন্য একটা কাজও আছে। সিয়েমরিপে বেশ কয়েকটা কুমির খামার আছে। ফ্রান্সে আমার একটা ব্যবসা আছে। ওখানে শৌখিন মানুষের সংখ্যা বেশি তাই কুমিরের চামড়ার জিনিসের চাহিদা প্রচুর। আঙ্কর ভাট দেখার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ওখানের কয়েকটা কুমির খামারেও যাব।’
এ কথা বলার পর লোকটা বলল, ‘আপনাদের নামগুলো যদি বলেন তবে আমি একটু লিখে নেই। নতুন মানুষদের সঙ্গে পরিচয় হলে তাদের নাম লিখে নেওয়া আমার একটা অভ্যাস। তাছাড়া ভাবছি এ দেশ থেকে ফিরে গিয়ে আমি আমার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা বই লিখব। সেখানে আপনাদের সঙ্গে আজকে আমার পরিচয়ের ঘটনাও লিখব। নামগুলোও তখন কাজে আসবে।’— এ কথা বলে পকেট থেকে লাল রঙের একটা নোটবুক আর কলম বার করল লোকটা।
সুরভী বানান করে প্রত্যেকের নাম বলে দিল তাকে। লিখে নিল লোকটা। তারপর সে তাদের থেকে বিদায় নিয়ে হাঁটতে শুরু করল অন্যদিকে। বিকাল হয়ে এসেছে। যদিও হাতে সময় আছে তবুও লোকটার বলে যাওয়া পলপটের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প দেখতে যাওয়া আর উচিত বলে মনে করল না সুরভীরা। কারণ নাতাশা আবার অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাই তারা এগল বাইরে যাওয়ার জন্য। তারা যখন সেই স্মারক সৌধ অতিক্রম করছে তখন বেলাশেষের আলো এসে পড়েছে সেই সৌধর গায়ে। সুরভী দেখল সৌধর ভিতর থেকে সার সার খুলিগুলো বিষণ্ণভাবে চেয়ে আছে তাদের দিকে। যেন তারা বলছে আমাদের মনে রেখ। কমিউনিস্ট পলপটের এই নৃশংসতার কথা জানিও পৃথিবীকে। একদিন আমরাও তোমাদেরই মতো মানুষ ছিলাম।’ নাতাশার মনের আতঙ্কর ভাবটা এখনও কাটেনি। কোনওক্রমে মাথা নিচু করে সে পেরল জায়গাটা। গেটের কাছে পৌঁছে গেল তারা। সেখানে ইয়ার ফোন আর যন্ত্রগুলো জমা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে তারা রওনা হয়ে গেল হোটেলে ফেরার জন্য।
