Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৩

পর্ব ০৩

বেলা শেষ হয়ে গেছে। বিদায়ী সূর্যের অস্তরাগ ছড়িয়ে পড়ছে হাজার বছরের প্রাচীন নগরী আঙ্করভাটের প্রাচীন মন্দিরগুলোর ওপর। স্বাগত বসেছিল ঠিক সেই জায়গাতে যেখানে আগের দিন এসে বসেছিল সে। গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে আঙ্করভাটের বিষ্ণুমন্দিরের শীর্ষদেশ। অস্তাচলগামী সূর্যের আলোতে রাঙা হয়ে আছে তার মাথার ওপরের আকাশটা। স্বাগতর কিছুটা তফাতে ঝোপঝাড় লতাগুল্মর মাঝে দাঁড়িয়ে আছে সেই নারীমূর্তি। অস্তরাগের আলো তাকেও ছুঁয়ে আছে। মুর্তিটাকে যেন মৃদু বিষণ্ণ মনে হয়। বেশ খানিকক্ষণ ও স্থানে বসে আছে স্বাগত। এবার তাকে উঠতে হবে। ফিরে যেতে হবে সেই ভাঙা মন্দিরের বাসস্থানের কাছে। মন্দিরের বাইরের অংশটা আজ প্রফেসর রামমূর্তির সঙ্গে ঘুরে দেখেছে সে। মন্দিরের মাথার ওপর নানা স্থানে যে গাছ জন্মেছে তার শিকড়গুলো আষ্টেপৃষ্ঠে আবৃত করে রেখেছে মন্দিরটাকে। অবশ্য সে সব শিকড়ের শিকল ইতিমধ্যেই স্থানীয় মজুরদের দিয়ে কেটে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশের একটা পথ তৈরি করে ফেলেছেন। রামমূর্তি। আর যে চারজনের আসার কথা তাদের কাজে যোগদানের জন্য তারা ফিরে এলেই পূর্ণ উদ্যমে কাজ শুরু হবে ওই মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করার জন্য।

সূর্য ডুবে গেলেই এখানে ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে। স্বাগত তাই উঠে দাঁড়াল ফেরার জন্য। ঠিক সেই সময় আগের দিনের মতোই সে দেখতে পেল সেই নারীকে। কখন যেন সে নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে। আজ যে আরও কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। মাত্র হাত সাতেকের ব্যবধানে। রমণীর শরীর থেকে আসা অদ্ভুত সুন্দর গন্ধও যেন এসে লাগল স্বাগতর নাকে। ঘি চন্দন ধুপের মিশ্রিত একটা গন্ধ। যে গন্ধ নিত্য পুজো হয় এমন মন্দিরে গেলে পাওয়া যায়। সেও তাকিয়ে আছে অস্ত রবির রশ্মি আভায় জেগে থাকা মন্দির শীর্ষের দিবে। মেয়েটার সঙ্গে এর আগের দিন সামান্য কিছু কথাবার্তা হয়ে ছিল স্বাগতর। তার সঙ্গে আলাপ জমাবার জন্য স্বাগত তার উদ্দেশে বলল, ‘আকাশটা কী সুন্দর লাল দেখাচ্ছে তাই না?’ মেয়েটা সেই রক্তিম আকাশের দিকে চোখ রেখেই মৃদু স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ। তবে রক্তের রংও এমন লাল হয়।’ স্বাগত বলল, ‘কী সুন্দর দৃশ্য! কিন্তু হঠাৎ রক্তর কথা বলছ কেন তুমি! অন্য কোনও কারণ আছে কি?’

মেয়েটা এবার ফিরে তাকাল স্বাগতর দিকে। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ, আছে।’

স্বাগত জানতে চাইল, ‘কী কারণ?’

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে নারী বলল, ‘সে অনেক পুরনো কথা। হাজার বছরের আগের কথা। শুনবে তুমি?’

স্থানীয় মানুষদের বলা গল্প কাহিনির মধ্যে অনেক সময় এমন কথা লুকিয়ে থাকে যা প্রচলিত ইতিহাস বইতে পাওয়া যায় না। স্বাগত তাই বলল, ‘তুমি বললে আমি শুনব।’ সেই নারী আবারও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কথা বলতে শুরু করল। কিন্তু সে এবার এক অচেনা অদ্ভুত ভাষায় কথা বলতে লাগল। তার শব্দগুলো অনেকটা সংস্কৃত উচ্চারণের মতো শোনালেও তার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারছে না স্বাগত। তাই খানিকক্ষণ মেয়েটার দুর্বোধ্য বাক্য শোনার পর সে তার উদ্দেশে বলল, ‘তুমি কোন ভাষায় কথা বলছ? ও ভাষা আমার জানা নেই।’

স্বাগতর কথা শুনে থেমে গেল মেয়েটা। সে যেন স্বাগতর কথার উত্তর দিতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ই যেন আকাশের রক্তিম আভা মুছে গিয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করল। কথা বলতে গিয়েও থেমে গেল সে। তারপর চারদিকে তাকাতে শুরু করল। একটা চঞ্চল ভাব যেন ফুটে উঠতে লাগল মেয়েটার মুখমণ্ডলে!

স্বাগত এবার তার উদ্দেশে বলল, ‘তুমি কি কিছু বলবে? অন্ধকার নামতে চলেছে দেখছি!’

স্বাগতর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কথাতে সায় দিয়েই যেন ঝুপ করে অন্ধকার নামতে শুরু করল চারপাশে। সেই আবছা আলোতে স্পষ্ট উদ্বেগের চিহ্ন যেন ফুটে উঠল মেয়েটার চোখেমুখে!

সে এরপর স্বাগতর বোধগম্য ভাষায় বলে উঠল, ‘চল আমরা এখান থেকে চলে যাই।’

স্বাগত তার কথা শুনে বিস্মিতভাবে বলল, ‘কেন? কোথায় যাব?’

মেয়েটা তার কথার জবাব না দিয়ে কাছে এসে তার হাতটা চেপে ধরে বলল, ‘আর দেরি কর না। ওরা এসে পড়তে পারে?’

স্বাগত বলল, ‘কারা আসবে?’

মেয়েটা আর তার কথার জবাব না দিয়ে হ্যাঁচকা টান দিল হাতে। আর সেই আকর্ষণেই স্বাগত যেন ছুটতে শুরু করল তার সঙ্গে। সে কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে কিছুই জানা নেই তার। তবুও কোন অদ্ভুত অজানা কারণে স্বাগত সেই যুবতীর সঙ্গে দ্রুত পা মেলাতে লাগল। ঝোপ জঙ্গল ভেঙে দ্রুত ছুটতে লাগল তারা। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশে নেমে আসতে লাগল গাঢ় অন্ধকার। একসময় স্বাগতর যেন মনে হতে লাগল আরও কেউ বা কারা যেন তাদের পিছন পিছন ছুটে আসছে! তাদের পদধ্বনিও যেন শুনতে পাচ্ছে স্বাগত। কিন্তু কারা তারা? সেই নারী এবার তার ছোটার গতি বাড়িয়ে দিল। ছুটতে ছুটতে তারা এসে পড়ল একটা মন্দিরের সামনে। তবে মন্দির ঘিরে পরিখা কাটা। কাঠের সাঁকো অতিক্রম করে মন্দির তোরণের ভিতর প্রবেশ করতে হয়। সাঁকোর পায়ের নীচের তক্তাগুলো দড়ি দিয়ে বাঁধা। তারা উঠতেই কাঁপতে শুরু করল সাঁকোটা। স্বাগত এবার যেন তার সংবিৎ ফিরে পেল। সাঁকোটা ধরে কিছুটা এগবার পরই সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ‘আমি তোমার সঙ্গে কোথায় যাচ্ছি? কেনই বা যাচ্ছি।’

মেয়েটা জবাব না দিয়ে আগের মতোই হাত ধরে তাকে টানার চেষ্টা করতে লাগল। একটা মৃদু ধস্তাধস্তি শুরু হল তাদের দু’জনের মধ্যে। প্রচণ্ড দুলতে লাগল সাঁকোটা। ওদিকে পিছনে অন্ধকারের মধ্যে থেকে কারা যেন ছুটে আসছে সাঁকোর দিকে। আর এরপরই একটা ঘটনা ঘটল। সেই নারী স্বাগতর কব্জি ধরে টানার চেষ্টা করছিল। হঠাৎই তার হাতটা খসে গেল স্বাগতের হাত থেকে। মেয়েটা আর তার শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারল না। প্রথমে সে সাঁকোর দড়ির রেলিং বা টানার ওপর গিয়ে পড়ল। তারপর দড়ির ফাঁক গলে গিয়ে পড়ল জলের মধ্যে। অন্ধকার জল হাতড়ে মেয়েটা সাঁতার কেটে আবার সাঁকোর গায়ে এসে ওপরে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল। স্বাগত এবার হাত বাড়িয়ে দিল জল থেকে তাকে ওপরে টেনে তোলার জন্য। তাদের অনুসরণ করে আসা একদল লোকের কণ্ঠস্বরও যেন এবার কানে আসতে শুরু করল। স্বাগত সেই রমণীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেও সাঁকোটা এত দুলছে যে তারা দু’জনেই কেউ কারও হাত ধরতে পারছে না। আর এরপরই সেই অন্ধকারের মধ্যেও স্বাগত যেন দেখতে পেল গাছের গুঁড়ির মতো কয়েকটা জিনিস যেন এগিয়ে আসছে মেয়েটার দিকে! আর এরপরই যেন স্বাগত চিনতে পারল গাছের গুঁড়ির মতো জিনিসগুলোকে। সে চিৎকার করে উঠল, ‘কুমির, কুমির’ বলে। মেয়েটাও যেন বুঝতে পারল প্রাণীগুলোর উপস্থিতি। সাঁকোর দড়ি ধরে সে ওপরে ওঠার জন্য একটা প্রবল চেষ্টা করল। আর তাতেই কাত হয়ে গেল সাঁকোটা। স্বাগত নিজেও এবার ভারসাম্য রাখতে না পেরে ছিটকে পড়ল জলে! তরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছে স্বাগত যেখানে পড়েছে তার চারপাশে। লেজের ঝাপটা দিতে দিতে জল কেটে তার দিকেও এগিয়ে আসছে কয়েকটা কুমির। অন্ধকারের মধ্যে লোকজনের কথাবার্তাও যেন কানে এল স্বাগতর। বাঁচবার জন্য সে সেই লোকগুলোর উদ্দেশে বলল, ‘বাঁচাও, আমাদের বাঁচাও…।’

—এ পর্যন্ত স্বপ্ন দেখে স্বাগতর ঘুম ভেঙে গেল। বিছানায় উঠে বসল সে। বাইরে ভোরের আলো ফুটে গেছে। জানলার ফাঁক গলে আলোক রেখা ঢুকছে ঘরের ভিতর। ঘুম ভেঙে উঠে বসার পর কয়েক মিনিট ভাবল তার স্বপ্নটা নিয়ে। তারপর সে বুঝতে পারল ওই যুবতীর সঙ্গে একদিন আগে তার সাক্ষাতের ব্যাপারটা আর এখানকার পরিবেশ, সব মিলেমিশে তার মনে এ স্বপ্নের জন্ম নিয়েছিল। স্বপ্নের মধ্যে নানান অদ্ভুত ব্যাপার থাকে যার কোনও উত্তর মেলে না। তাই সে ওই যুবতীর সঙ্গে কেন পালাচ্ছিল তা আর কোনও দিন জানা যাবে না। এ কথা ভেবে মনে মনে হাসল স্বাগত। তবে স্বপ্নটা যে রোমাঞ্চকর তাতে সন্দেহ নেই।

ঘড়ি দেখল স্বাগত। ছ’টা বাজে। আর এরপরই বাইরে থেকে কিছু মানুষের কণ্ঠস্বর এসে লাগল তার কানে। মজুরের দল সকাল আটটার আগে কাজে যোগ দিতে আসে না। তবে কাদের গলার স্বর শোনা যাচ্ছে? স্বাগত অবশ্য এরপরই ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারল। বিছানা ছেড়ে উঠে জানলা খুলতেই সে দেখতে পেল দু’জন যুবক আর দু’জন যুবতীকে। একটা গাড়ি থেকে মালপত্র নামাচ্ছে তারা। অর্থাৎ স্বাগতর সহকর্মীরা এসে গেছে। তাদের দেখতে পেয়ে স্বাগত কয়েক মিনিটের মধ্যেই তৈরি হয়ে তার ঘর থেকে বাইরে বেড়িয়ে পড়ল। নিজেদের ঘরে প্রবেশের আগে তারা তখন দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরের বহিঃপ্রাঙ্গণে। রামমূর্তি দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে। তিনি তাঁদের উদ্দেশে কী যেন বলছেন মন্দিরটাকে দেখিয়ে। ভোরের সূর্যের আলো খেলা করছে মন্দির তোরণের মাথায়। ফুটে উঠেছে মন্দির তোরণের মাথার ওঙ্কারের ভাস্কর্যগুলো। তা যতই প্রাচীন হোক, ভগ্নপ্রায় হোক এখনও তার শিল্প সুষমা অটুট আছে। রামমূর্তির কথা শুনতে শুনতে সেদিকেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নবাগত চারজন। স্বাগত তাদের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছতেই রামমূর্তি নবাগতদের উদ্দেশে বললেন, ‘এই তো স্বাগত এসে গেছে। তোমরা এবার নিজেদের পরিচয় দিয়ে ফেল।’

তারা চারজন স্বাগতকে ‘হাই, হ্যালো’ সম্বোধন করে নিজেদের পরিচয় দিল। স্বাগত অনুমান করল এইসব যুবকযুবতীদের বয়স আনুমানিক ছাব্বিশ-সাতাশ হবে। তার মধ্যে দু’জনের চেহাড়া বেশ আকর্ষণীয়। নাতাশা নামের মেয়েটিকে চোখ ঝলসানো সুন্দরী বলা চলে। গায়ের রং ফর্সা, মাথায় কুঞ্চিত কেশদাম, টানা টানা চোখ, তবে তার মুখমণ্ডলের কোমলতা দেখে মনে হয় সে নরম স্বভাবা। প্রীতম নামের ছেলেটি ডার্ক-টল-ছিপছিপে বেশ আকর্ষণীয় চেহারার। আর অন্য দু’জন স্বাগতর মতোই সাধারণ চেহারার। প্রাথমিক পরিচর্যা মেটার পর সুরভী নামের মেয়েটি বাংলায় স্বাগতর উদ্দেশে হেসে বলল, ‘আমি কিন্তু বাঙালি।’ স্বাগতও হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, স্যর আমাকে আপনার কথা বলেছেন। ভালোই হল, বাংলাতে কথা বলার লোক পাওয়া গেল।’

প্রফেসর রামমূর্তি এবার নবাগত চারজনের উদ্দেশে বললেন, ‘এখানে সকালে একজন লোক এসে রান্না করে দিয়ে যায় দুপুরের খাবারের জন্য। কিন্তু রাতের রান্নাটা আমাদের নিজেদেরই করে নিতে হবে। সব ব্যবস্থা আমার করা আছে। আশা করি তেমন অসুবিধা কারও হবে না। কোনও সমস্যা হলে আমাকে বলবে।’

এ কথা বলার পর তিনি তাঁর পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বললেন, ‘কাল থেকে তোমাদের নিয়ে ওই মন্দিরে কাজ শুরু করব আমি। আজকে আমি তোমাদের আঙ্করভাটের প্রসিদ্ধ বিষ্ণুমন্দির দেখাতে নিয়ে যাব। একদিনে অবশ্য সে মন্দির ভালো করে দেখা বা বোঝা যায় না। আজ যতটুকু পারা যায় সেটুকু দেখবে। পরে আমাদের কাজের সুযোগ সুবিধা মতো আবারও যাওয়া যাবে সেখানে। চল তোমাদের থাকার জায়গা দেখিয়ে দিচ্ছি। আপাতত তোমরা একটু রেস্ট নিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। মজুরের দল আটটার সময় কাজে আসবে। তাদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে ঠিক ন’টায় ‘বিষ্ণুলোক’ দেখার জন্য যাব আমরা।’

নাতাশা জানতে চাইল, ‘বিষ্ণুলোক’ মানে?’ রামমূর্তি স্যরের হয়ে স্বাগতই জবাবটা দিল। সে বলল, ‘আঙ্করভাটের বিখ্যাত মন্দির অর্থাৎ বিষ্ণু মন্দিরকেই ‘বিষ্ণুলোক’ বলে। স্থানীয় মানুষদের বিশ্বাস ওই মন্দিরে ভগবান বিষ্ণু সত্যিই অবস্থান করতেন বা এখনও করেন। তাই ওই মন্দিরের নাম বিষ্ণুলোক।’

রামমূর্তি এরপর সবাইকে নিয়ে এগলেন অস্থায়ী ঘরগুলোর দিকে। তাদের সঙ্গে হেঁটে এসে স্বাগত ঢুকে পড়ল নিজের ঘরে। যে ঘরের কাছেই দুটো ঘর রামমূর্তি স্যর নির্দিষ্ট করে দিলেন অন্য চারজনের থাকার জন্য। একটা ঘরে দু’জন ছেলে অন্য ঘরে মেয়ে দু’জন থাকবে।

মজুরের দল সকাল আটটাতেই অন্য দিনের মতো চলে এল। সাত-আট জনের একটা দল। স্বাগত জানলা দিয়ে দেখল, রামমূর্তি তাদের মন্দির তোরণের সামনে নিয়ে গিয়ে কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। তোরণটাকে জঙ্গল-লতা-গুল্ম মুক্ত করা হয়েছে। গতকালই মজুররা তোরণ অতিক্রম করে ভিতরে প্রবেশ করে সে জায়গার গাছপালা কাটতে কাটতে মূল মন্দিরের দিকে এগতে শুরু করেছে। স্বাগত গতকাল তোরণের ভিতরে ঢুকে দেখেছে ব্যাপারটা। তোরণ আর মন্দিরের মধ্যবর্তী স্থানে যে চত্বরটা রয়েছে সেখানেই আজ কাজ করবে শ্রমিকরা।

স্বাগতদের বাসস্থানগুলোর সঙ্গে একটা ছোট শৌচালয় আর স্নানের জায়গা আছে। বড় ড্রামে জল রাখা আছে সেখানে। রামমূর্তি বলেছেন, সিয়েমরিপ শহর থেকে জলের গাড়ি এসে এখানে প্রয়োজন মতো জল দিয়ে যায়। সেই জল দিয়েই স্নান সেরে নিল স্বাগত। তারপর তৈরি হয়ে ন’টা বাজার কিছুক্ষণ আগে প্রবেশ তোরণের সামনের পাথুরে চত্বরে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্য চারজনও একে একে নিজেদের ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল।

প্রীতম, স্বাগতকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি তো আগে এসেছ এখানে। আমরা যেখানে যাচ্ছি তুমি কি আগে দেখে এসেছ সেই জায়গা?’

এবং প্রীতমের প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গেই নাতাশা প্রশ্ন করল, ‘ওই মন্দিরের ভিতর মানুষের মাথার খুলি, হাড়গোড় এসব নেই তো?’

প্রীতমের কথার জবাবে স্বাগত বলল, ‘না, যাইনি। রামমূর্তি সার তোমাদের আসার জন্য অপেক্ষা করছিলেন আমাদের সবাইকে একসঙ্গে সেখানে নিয়ে যাবেন বলে।’

এ কথা বলার পর সে নাতাশার উদ্দেশে বলল, ‘আমি জানি না। তবে হাজার বছর আগে এখানে হাড়গোড় থাকলেও তো এত দিনে ধুলো হয়ে মাটিতে মিশে যাওয়ার কথা। কেন, তুমি এ ব্যাপারে কিছু পড়েছ বা শুনেছ নাকি?’

নাতাশা বলল, ‘না, আমি শুনিনি। তবু জিজ্ঞেস করলাম।’

নাতাশার জবাব শুনে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল তার সঙ্গে আগত অন্য তিনজনের মুখেও। এরপর সুরভী বাংলাতে স্বাগতকে জানাল, নাতাশার উদ্বেগের পিছনের কারণ ও আগের দিন কিলিং ফিল্ডে তাদের অভিজ্ঞতার কথা।

স্বাগতর সঙ্গে তারা আরও দু-চার কথা বলার পর মন্দিরের তোরণের বাইরে বেরিয়ে তাদের কাছে এসে দাঁড়ালেন রামমূর্তি। তারপর বললেন, ‘এবার চল। গাড়িতেই যাওয়া যেত। তাতে দশ মিনিটে পৌঁছে যাওয়া যায়। হেঁটে গেলে একটু বেশি সময় লাগবে ঠিকই। কিন্তু পায়ে চলার পথটা তোমাদের চেনা হয়ে যাবে। আর এ জায়গার আশপাশটা তোমাদের দেখা হয়ে যাবে।’

এ কথা বলে সেই অনামা প্রাচীন মন্দির তোরণের সামনের প্রাঙ্গণ ছেড়ে সবাইকে নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হলেন তিনি।

পায়ে চলা পথ। দু’পাশে বড় বড় গাছের ছায়াঘন পরিবেশ। গাছের ডালপালার ফাঁক গলে কোথাও কোথাও ছুরির ফলার মতো সূর্যকিরণ এসে পড়েছে পথের ওপর, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোটখাট স্থাপত্য চিহ্ন বা প্রস্তর খণ্ডর ওপর। যাদের গায়ে আজও জেগে আছে হাজার বছরের প্রাচীন শিল্পের ছোঁয়া। স্বাগত গত দু’দিন এসব জায়গা দেখেছে। অন্য চারজন দেখেনি। কাজেই অন্য চারজনের চোখে বিস্ময়ের ভাব স্বাগতর চাইতে বেশি।

রামমূর্তি বললেন, ‘এমন হতে পারে যে এই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথরের টুকরোগুলো আমরা যে মন্দিরে কাজ করছি তারই অংশ। যদি তা হয়ে থাকে তবে তুলে নিয়ে গিয়ে মন্দিরের নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করতে হবে। তোমরা জান এ ব্যাপারটা অনেকটা জিক-জ্যাক পাজেলের মতো। মন্দিরের ভিতরের জঙ্গল পরিষ্কার হওয়ার পর তার বিভিন্ন অংশের ছবি তুলে কম্পিউটারে তাদের গঠন এঁকে দেখব, কোনও জায়গা থেকে কিছু অপসারিত হয়েছে কি না? জ্যামিতিক অঙ্ক কষলেই ব্যাপারটা ধরা পড়ে যাবে। যদি দেখা যায় সেই সব খণ্ডিত অংশগুলো মন্দিরের মধ্যে নেই, তখন এইসব প্রস্তর খণ্ডগুলো পরীক্ষা করে দেখতে হবে এইসব ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্থাপত্য চিহ্নগুলো মন্দিরের স্থানচ্যুত অংশ কি না?

রামমূর্তির কথা শুনে স্বাগতর হঠাৎ মনে পড়ে গেল সেই ফলকটার কথা। যার গায়ে খোদিত আছে সেই নারীমূর্তির ছবি। ওই নারী মূর্তি কি ওই মন্দিরের অংশ ছিল? স্বাগত রামমূর্তিকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমরা যে মন্দিরে কাজ করব সেটাও কি বিষ্ণুমন্দির ছিল?’

তিনি জবাব দিলেন, ‘সেটা মন্দিরের ভিতরে না ঢুকলে এখনই বলা যাবে না। এ কথা ঠিকই যে ওর প্রবেশ তোরণের মাথায় বিষ্ণুর মুখ আছে। সেটা এখানকার সব তোরণের মাথাতেই রয়েছে কারণ, কয়েক শতক ধরে এখানকার রাজারা বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন। বিষ্ণুর মুখমণ্ডল ছিল তাঁদের প্রতীক। তবে এমনও হতে পারে ওই মন্দিরে অন্য কোনও দেব-দেবী পূজিত হতেন অথবা অন্য কোনও কাজে ওই মন্দির ব্যবহার করা হতো। আমরা যে মন্দিরে কাজ করব আসলে সেটা একটা উপমন্দির। তবে এখানকার সব মন্দিরই কোনও না কোনওভাবে বিষ্ণুলোক অর্থাৎ আঙ্করের সর্ববৃহৎ মন্দিরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। আমার অনুমান ওই উপমন্দির বিষ্ণুলোকের সময়ই নির্মিত।’

রামমূর্তি তাঁর কথা শেষ করতে না করতেই গাছপালার ফাঁক গলে চোখে পড়ল বিষ্ণুলোকের শীর্ষদেশ। তা দেখিয়ে তিনি নবাগত চারজনের উদ্দেশে বললেন, ‘ওই দেখ বিষ্ণুলোক! আঙ্করভাটের সর্বশ্রেষ্ঠ মন্দির।’