Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৫

পর্ব ০৫

সুরভীর কথা শুনে নাতাশা কিছুটা অপ্রস্তুতভাবে বলল, ‘আমি ব্যাপারটা এমন হবে ঠিক বুঝতে পারিনি। ওর পোশাক দেখে মনে হল গরিব মানুষ। তাই ওকে টাকাটা দিতে চেয়েছিলাম।’

এ প্রসঙ্গে এরপর আর কেউ কিছু বলল না। বিশালাকৃতির তোরণের নীচ দিয়ে এগিয়ে তারা প্রবেশ করল ভিতরে। সামনে একটা বিশাল মাঠ। তার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল আকৃতির আঙ্করভাটের বিখ্যাত বিষ্ণু মন্দির। তার মাথায় শৃঙ্গ বা টাওয়ারগুলো যেন আকাশকে স্পর্শ করতে চাইছে। একটা ছোট জলাশয়ও আছে মন্দিরের সামনে। আর মাঠের নানান স্থানে দাঁড়িয়ে আছে তালগাছ। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে মন্দিরের প্রবেশ মুখে ট্যুরিস্টদের ভিড়। মাঠেরও এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তারা। কেউ সবুজ মাঠে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। কেউ আবার ছবি তুলছে। অধিকাংশই শ্বেতাঙ্গ পর্যটক। পাথর বাঁধানো একটা রাস্তা সোজা এগিয়েছে হাজার বছরের প্রাচীন মন্দিরের দিকে। যা পৃথিবীর সর্ব বৃহৎ ধর্মীয় স্থাপত্য বলে পরিচিত। চর্মচক্ষে না দেখলে স্বাগতরা ধারণাই করতে পারত না এ মন্দির কতটা বিশাল হতে পারে। রামমূর্তি বললেন, ‘হয়তো তোমরা বইতে এ মন্দির সম্পর্কে পড়েছ বা ইন্টারনেটে তথ্য অনুসন্ধান করেছ তবুও প্রবেশের আগে এই মন্দির সম্পর্কে কিছু তথ্য তোমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।’

যে পথ ধরে তারা মন্দিরের দিকে এগতে শুরু করল সে পথের দু’পাশে শেষ নাগের দেহ দিয়ে অনুচ্চ রেলিং নির্মাণ করা আছে। রামমূর্তি হাঁটতে হাঁটতে বলতে শুরু করলেন—‘আঙ্করের এই বিষ্ণু মন্দির দশম শতাব্দীতে নির্মাণ করিয়েছিলেন খামের রাজ দ্বিতীয় সূর্যবর্মন। কিন্তু আমরা বর্তমানে মন্দিরের যে কাঠামো দেখছি তা তিনি তাঁর জীবদ্দশায় সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা সপ্তম সূর্যবর্মন মন্দির নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করেন। অনুমান করা হয় নবম শতকে নির্মিত বরবদুরের বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির দেখে সূর্যবর্মনেরও তেমন এক বিশাল স্থাপত্য নির্মাণের পরিকল্পনা মাথায় আসে। তারই ফলশ্রুতি এই মন্দির। মজার ব্যাপার হল বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে এই মন্দিরকে বিষ্ণুলোক বলে উল্লেখ করা হলেও এর প্রকৃত নাম ঠিক কী ছিল তা আজও জানা যায়নি। ভগবান বিষ্ণুকে এ মন্দির উৎসর্গ করার কারণেই এ মন্দিরকে বিষ্ণুলোক বলে ডাকা হয়। কোনও কোনও প্রাচীন বইতে ‘বরাহ লোক’ নামেও এর উল্লেখ আছে। কারণ, বরাহ হল বিষ্ণুর অবতার।’

বেলা দশটা বেজে গেছে। মাথার ওপর রোদ বেশ চড়া হতে শুরু করেছে। এবার সকলেরই বেশ গরমবোধ হচ্ছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছে নিয়ে রামমূর্তি এরপর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘এবার আসি মন্দিরের গঠনশৈলীর প্রসঙ্গে। দুই ধরনের গঠন আছে এই মন্দিরের। একটা অংশ হচ্ছে গ্যালারি ধরনের যা বাইরে থেকেই কিছুটা দেখতে পাচ্ছ। স্তম্ভ যুক্ত গ্যালারি। আর অন্যটি হল মাউন্ট টেম্পল অর্থাৎ শৃঙ্গ যুক্ত মন্দির। মেরু পর্বতের আদলে নির্মিত যে মন্দিরের শীর্ষ দেশগুলো বহু দূর থেকেই চোখে পড়ে। মন্দিরের উচ্চতা পঁয়ষট্টি মিটার। পাঁচ একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই মন্দির। এ মন্দিরের ওপর দিয়ে চামেদের আক্রমণ সহ বেশ কিছু ঝড় বয়ে গেলেও মন্দিরের মূল কাঠামো মোটামুটি অক্ষতই আছে। এর পিছনে দুটো কারণ আছে। প্রথম কারণ হল প্রায় তিরিশ ফুট উঁচু ভিত্তি বেদির ওপর মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। আর দ্বিতীয় কারণ হল মন্দিরকে ঘিরে থাকা পরিখা। যে কারণে মন্দির নগরীর অন্য মন্দিরগুলোর মতো জঙ্গল একে গ্রাস করে নিতে পারেনি। ধর্ম বিশ্বাসীরা বলেন স্বয়ং বিষ্ণুর আবাসস্থল বলে বনদেবী তাকে স্পর্শ করার সাহস দেখাননি।’

তারা যত এগতে লাগল চারপাশে ট্যুরিস্টদের ভিড় তত বাড়তে লাগল। প্রফেসর রামমূর্তির কথা শুনতে শুনতে একসময় তারা পৌঁছে গেল মন্দিরের সামনে পুকুরের মতো জলাশয়ের সামনে। পদ্মফুল ফুটে আছে জলাশয়ে। মন্দিরকে পিছনে রেখে অনেকে ছবি তুলছে সেই জলাশয়ের পাড়ে দাঁড়িয়ে। রামমূর্তি বললেন সূর্যোদয়ের সময় বহু মানুষ এখানে আসে ছবি তুলতে। এখন এই জলাশয়ে পুরো মন্দিরের প্রতিবিম্ব ধরা পড়ে। সে ছবিও তুলতে আসেন দেশ-বিদেশের ফোটোগ্রাফাররা। অপূর্ব সেই দৃশ্য!’

সুরভী বলল, ‘আমি সেই ছবি ইন্টারনেটে দেখেছি। সত্যিই অপূর্ব ছবি।’

স্বাগতও দেখেছে সেই ছবি। তবে বেলা বাড়ার কারণে জলাশয়ের বুকে মন্দিরের ছবি আর তেমনভাবে ধরা দিচ্ছে না, শুধু মন্দিরের একটা আবছা প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে। স্বাগতরা সেখানে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকটা গ্রুপ ছবি তুলল। তারপর এগল সেই পুষ্করিণীকে বেড় দিয়ে মন্দিরের ওপরে ওঠার জন্য।

একসময় নিশ্চয়ই পাথরের সোপান শ্রেণি ছিল ওপরে ওঠার জন্য। বর্তমানে তা অবলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণে কাঠের সিঁড়ি বানানো হয়েছে। তা দিয়েই ওপরে উঠে এল সকলে। মন্দিরে ভিতরে ঢোকার আগে রামমূর্তি বললেন, ‘আজকে আমি যথাসম্ভব মন্দিরের ভিতরের উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলো তোমাদের দেখাবার চেষ্টা করব। মন্দিরের ভিতরের দেওয়াল, স্তম্ভ আর অলিন্দগুলো কীভাবে পাথরের ব্লক সাজিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে তা ভালো করে দেখা বোঝার চেষ্টা করবে। পরবর্তীকালে ব্যাপারটা তোমাদের কাজে লাগবে। আর দেওয়াল গাত্রে যে সব মূর্তি আছে তা দেখে তোমরা সে সময়ের মানুষদের দেহের গঠন, পোশাক, জীবনযাত্রা সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারবে। প্রয়োজন মনে করলে সে সবের ছবিও তুলে রাখবে। আমরা যে মন্দিরের কাজ করব সেখানে যদি কোনও জীর্ণ বা খণ্ড খণ্ড মূর্তির অংশ পাওয়া যায় তখন তাকে জোড়া দিয়ে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে মূর্তির ছবিগুলো কাজে লাগবে। কারণ, এই মন্দির নগরীর সব মূর্তি প্রায় একই গঠনশৈলীতে নির্মিত।’

এ কথা বলে মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করতে করতে রামমূর্তি মজার ছলেই বললেন, ‘আমরা সকলে কিন্তু জীবিত মানুষ হিসাবেই মন্দিরে প্রবেশ করছি, ব্যাপারটা বিশ্বাস না হলে নিজেরা নিজেদের গায়ে চিমটি কেটে দেখতে পার। তবে জানি না, মৃত্যুর পর আমার আত্মা এই বিষ্ণুলোকে স্থান পাবে কি না?’

কথাটা শুনে সুরভী বলল, ‘তবে আমার কিন্তু সত্যিই নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। তবে তার কারণ অন্য। বইতে কত পড়েছি, কত ছবি দেখেছি এই প্রাচীন মন্দিরের। আর সেই মন্দিরেই কি না আমরা এখন প্রবেশ করছি। এ ব্যাপারটা যেন আমার এখনও বিশ্বাস হতে চাইছে না! মনে হচ্ছে যেন স্বপ্ন দেখছি।’

রামমূর্তি বললেন, ‘এ মন্দির একটা স্বপ্নপুরীই বটে। আর কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যাপারটা তোমরা উপলব্ধি করতে পারবে। আমি যখন প্রথম দিন এ মন্দিরে প্রবেশ করেছিলাম সেদিন আমারও তোমাদেরই মতো একই রোমাঞ্চ অনুভব হচ্ছিল। এ মন্দিরের কোনও তুলনা নেই!’

মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করল স্বাগতরা। বাইরে বেশ গরম হলেও মন্দিরের ভিতরটা বেশ ঠান্ডা। মাথার ওপর উঁচু ছাদ। চারপাশে মোটা পাথরের দেওয়াল। প্রাচীনত্বের গন্ধ মাথা চারপাশের পরিবেশ। কত না অজানা কাহিনি লুকিয়ে আছে এইসব নির্বাক স্তম্ভ, দেওয়ালের গায়ে। সব কথা কি আর ইতিহাস বইতে লেখা থাকে, নাকি জানা যায়? রামমূর্তি বললেন সবাই কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করবে। কারণ, একইরকম অনেক উপমন্দির, চত্বর, অলিন্দ আছে এই প্রাচীন মন্দিরে। দেওয়ালগুলো পুরু হওয়াতে মোবাইল ফোনের সংযোগ অনেক সময়ই বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। মন্দিরের গোলকধাঁধায় একবার হারিয়ে গেলে অন্যদের খুঁজে পেতে সময় লাগবে। আমি তোমাদের প্রথমে মন্দিরের গ্যালারি অংশগুলো দেখাব তারপর মূল মন্দিরগুলো। যাদের মাথায় মেরু পর্বতের আদলে শৃঙ্গ আছে।’

History

রামমূর্তিকে অনুসরণ করে তারা গিয়ে উপস্থিত হল মন্দিরের বহিঃঅংশের এক অলিন্দে। বারান্দার মতো জায়গাটার ছাদ সার সার স্তম্ভ দিয়ে ধরা আছে। যেখান থেকে বাইরেটা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। অনুচ্চ রেলিং দিয়ে ঘেরা সেই লম্বা অলিন্দের বিপরীত দিকের দেওয়ালের গায়ে খোদিত আছে নানা দৃশ্য, অলঙ্করণ। রামমূর্তি সেই অলিন্দে প্রবেশ করে তাদের নিয়ে অলিন্দের একদম শেষপ্রান্তে পৌঁছলেন। তারপর বললেন, তোমাদের ছবিগুলো দেখাতে দেখাতে এখানে না এসে, এখান থেকেই আমরা দেওয়ালের গায়ের ছবিগুলো দেখতে দেখতে আবার গ্যালারির বাইরে যাওয়ার জন্য এগব। এর পিছনে বিশেষ একটা কারণ আছে। এই গ্যালারিগুলোতে খোদিত ছবিগুলো অন্য সব মন্দিরের মতো ক্লকওয়াইজ নয়। অ্যান্টি ক্লকওয়াইজ। অর্থাৎ ঘড়ির কাটার বিপরীত দিকে সাজানো। হিন্দু ধর্মে যে অন্ত্যোষ্টি ক্রিয়ার ব্যবস্থা আছে তা এমনই অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজভাবে সম্পন্ন করা হয়। এখানে ছবিগুলো এভাবে সাজানো থাকার কারণেই অনেক গবেষক পণ্ডিত মনে করেন এ মন্দির মানুষের অন্তোষ্টি ক্রিয়ার স্থল হিসাবে ব্যবহার করা হতো। রাজা সূর্যবর্মনের অন্ত্যোষ্টি ক্রিয়া এ মন্দিরেই হয়েছিল। মৃত্যুর পর তাঁকে ‘প্রিয়াহ বিষ্ণুলোক’ উপাধি প্রদান করা হয়। অর্থাৎ “বিষ্ণুলোক প্রিয়।’

স্বাগতদের এরপর গ্যালারিটা দেখাতে শুরু করলেন তিনি। দেওয়ালের গায়ে প্রথম চিত্র রাজসভার। পরপর ছবিগুলোতে কীভাবে সভার কাজ পরিচালিত হতো তা চিহ্নিত আছে দেওয়ালে। রামমূর্তি ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিতে লাগলেন তাদের। কেউ ছবিও তুলতে লাগল তাদের।

সেই অলিন্দ দেখার পর তারা প্রবেশ করতে লাগল অন্য অলিন্দগুলোতে। যে সব জায়গার দেওয়াল গাত্রে কোথাও খোদিত আছে যুদ্ধর ছবি, শিকার যাত্রার ছবি, কোথাও বা দৈনন্দিন জীবন যাত্রার ছবি। সে সব অলিন্দে আরও কিছু ট্যুরিস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু তারা সবাই নির্বাক, নিস্তব্ধ। সবাই যেন নিশ্চুপভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করছে হাজার বছরের প্রাচীন অতীতকে।

গ্যালারিগুলো দেখার পর রামমূর্তি সকলকে নিয়ে এগলেন স্থাপত্যর ভিতরের অংশে। শৃঙ্গযুক্ত মন্দিরগুলো তাদেরকে দেখাবার জন্য। স্বাগত ঘড়ি দেখল, গ্যালারি দেখতে দেখতেই ইতিমধ্যে ঘণ্টাখানেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে তাদের। মন্দিরের ভিতরের অংশে প্রবেশ করার পর সত্যিই যেন সকলে হতবাক হয়ে গেল। দেওয়াল, স্তম্ভ, খিলান, কার্নিশের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে অসম্ভব সুন্দর মানব মূর্তি, চিত্রিত রয়েছে আশ্চর্য সুন্দর সব অলঙ্করণ। পাথুরে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে মন্দিরগুলোর বিভিন্ন অংশে ওঠা নামা করতে হয়। যে সব মূর্তি আছে তাদের মধ্যে আছে নারীপুরুষের যুগল মূর্তি, আবার কোথাও নৃত্য বা অন্য কোনও ভঙ্গিমাতে স্বাগতদের দিকে চেয়ে আছে কোনও নারী মূর্তি। অলঙ্কার ও প্রাচীন বেশ শোভিত সে সব মূর্তিগুলোর মাথায় রয়েছে অনেকটা টোপরের মতো দেখতে মুকুট। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রাচীন খামের জাতি যা ব্যবহার করত। তবে সে সব মূর্তিগুলোর মধ্যে কোনারক বা খাজুরাহর মূর্তিগুলোর মতো যৌনতার কোনও চিহ্ন নেই। শান্ত সৌন্দর্যের প্রতীক যেন মূর্তিগুলো। স্তম্ভর গায়ে খোদিত মূর্তিগুলো মহাকালের নিয়মে মৃদু ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও তাদের গঠন মোটামুটি অটুটই আছে। রামমূর্তি বললেন, যে সব একক নারী মূর্তি দেখছ সেগুলো হল অপ্সরাদের মূর্তি। এখনও পর্যন্ত প্রায় দু’হাজার অপ্সরার মূর্তি বা ছবি আবিষ্কৃত হয়েছে এখানে। আরও বেশ কিছু ছিল। তা কিছু চামেদের আক্রমণে ধ্বংস হয়। কিছু মূর্তি চুরি যায়, ইউরোপীয়রাও কিছু মূর্তি নিজেদের দেশে নিয়ে যায়। এই বিষ্ণুমন্দিরের সংস্কারের কাজ শুরু হয় বিংশ শতাব্দীতে। মাঝে অবশ্য কমিউনিস্ট খামেরদের শাসনকালে এই মন্দিরের সংস্কার ও দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় নাকি পলপটা বাহিনি মূর্তির বিনিময়ে বিদেশ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করেছিল বলেও শোনা যায়। ভাগ্য ভালো তাদের শাসনকাল বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।’

অপ্সরাদের মূর্তির দিকে তাকিয়ে স্বাগতর আবারও হঠাৎ মনে পড়ে গেল জঙ্গলের মধ্যে লতাগুল্মর আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া মূর্তির কথা। ওটাও কি কোনও অপ্সরার মূর্তি? রামমূর্তি বললেন, ‘এবার তোমাদের একটা মজার কথা বলি। সূর্যাস্তের আগে এই মন্দির থেকে পর্যটকদের বার করে দেওয়া হয়। সম্পূর্ণ খালি হয়ে যায় এই মন্দির। স্থানীয় লোকদের বিশ্বাস বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামার পরই নাকি নড়েচড়ে ওঠে এই সব অপ্সরার মূর্তিগুলি। তারপর তারা একে একে জীবন্ত হয়ে দেওয়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। তাদের নূপুরের ছমছম শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে এই মন্দির। মহারাজ সূর্যবর্মনের রাজসভা বসে মন্দিরগুলোর মাঝে যে বিশাল চত্বর আছে সেখানে। আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে সেই প্রাঙ্গণ। মহারাজকে নৃত্য পরিবেশন করে অপ্সরারা। তারপর সূর্যোদয়ের প্রাকমুহূর্তে আবার তারা ফিরে আসে যে যার আপন স্থানে।’

কথাটা শুনে বিক্রম বলল, ‘সেই নৃত্য কোনও লোক দেখেছে নাকি?’

রামমূর্তি বললেন, ‘তেমন কোনও লোক আছে কি না জানা নেই। সন্ধ্যা নামার পর এ মন্দিরের কাছে কেউ ঘেঁষে না। এমনকী গার্ডরাও মন্দিরের ভিতরে থাকে না। একমাত্র নাকি মৃত পুণ্যবান বা পূণ্যবতী আত্মা যাঁরা এই মন্দিরে বাস করে তাঁদেরই অপ্সরাদের নৃত্য দেখার অধিকার আছে। কোনও জীবন্ত মানুষ সে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে গেলে তাঁর মৃত্যু নাকি অবশ্যম্ভাবী। খামেদের শাসনকালে একদল অস্ত্রধারী কমিউনিস্ট নাকি প্রচলিত গল্পকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য সূর্য ডোবার পর রয়ে গিয়েছিল এই মন্দিরে। পরদিন নাকি তাদের থেতলানো মৃতদেহগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল মন্দিরের প্রবেশ পথের বাইরে। যেন তাদের মন্দির শীর্ষ থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল বাইরে! একজন ইউরোপীয় পর্যটকের ক্ষেত্রেও নাকি একই ব্যাপার ঘটেছিল। এইসব লোকের মৃত্যুর পিছনে অন্য কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে। কিন্তু এসব ঘটনা এখানকার সাধারণ মানুষের মনে প্রচলিত বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে। ঠিক যেমন তারা মনে করে, যে মানুষদের প্রেতাত্মা কোনও কারণে বিষ্ণুলোকে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে তারা আজও চেষ্টা করে বিষ্ণুলোকে প্রবেশ করার জন্য। হাজার হাজার বছর ধরে তারা প্রতীক্ষা করছে বিষ্ণুলোকে প্রবেশ করার জন্য।’

নাতাশা জানতে চাইল, ‘যে সব প্রেতাত্মারা কোথায় বসবাস করে?’

রামমূর্তির হয়ে স্বাগতই জবাব দিল—‘তারা বসবাস করে বিষ্ণুলোকের বাইরে প্রাচীন মন্দিরগুলিতে। রাত নামলে তারাও নাকি জেগে ওঠে। স্থানীয় খামেদের এমনই বিশ্বাস। যে কারণে সূর্যাস্তের আগেই মজুর-শ্রমিকরা মন্দির নগরী ত্যাগ করে চলে যায়।’ জবাব শুনে নাতাশার মুখটা যেন কেমন অদ্ভুতরকম গম্ভীর হয়ে গেল। স্বাগতর তা দেখে মনে হল, এই মেয়েটির সম্ভবত ভূত-প্রেতে বিশ্বাস আছে।

শৃঙ্গযুক্ত মন্দিরগুলি একটার পর একটা দেখতে শুরু করল তারা। এবার প্রতিটা মন্দিরে মাথাতেই জেগে আছে পাথরের তৈরি প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বিষ্ণুদেবের মুখমণ্ডল। কোথাও কোথাও আবার তারা ত্রিমুখী। অর্থাৎ তিনটি মুখমণ্ডল তিন পাশে রচনা করা হয়েছে। প্রতিটি মন্দিরের তিন দিকেই আছে স্তম্ভযুক্ত বারান্দা আর তাদের মধ্যের চত্বরে অবস্থান করছে বিশাল আবৃত চৌকো জলাধার। সিঁড়ি নেমে গেছে তাদের ভিতর। জলাধারগুলো বর্তমানে শুষ্ক হলেও এক সময় ওই জলাধারগুলোর জল নিয়েই মন্দিরের নানা কাজে ব্যবহৃত। দুটো মন্দির দেখার পর একটা মন্দির চত্বরে পাথরের বেদির ওপর ভগবান বুদ্ধর প্রাচীন একটা মূর্তি দেখতে পেল তারা। ভূমিস্পর্শ ভঙ্গিতে বসে আছেন তিনি। এ মন্দির যে পরবর্তী সময় বুদ্ধদেব উপাসনা স্থলে রূপান্তরিত হয়েছিল ওই বুদ্ধমূর্তিই তার প্রমাণ। সময় এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে নানান স্থানে আরও বেশ কিছু নানা ভঙ্গিমার বুদ্ধমূর্তি দেখতে পেল তারা। কোনও কোনও মূর্তির গায়ে শুকনো ফুলের মালা ও রয়েছে। অর্থাৎ পূজা করা হয়েছে তাঁদের। সুরভী একসময় বলল, ‘বুদ্ধ মূর্তি তো দেখলাম। কিন্তু এটা তো বিষ্ণুলোক। বিষ্ণুমূর্তি কোথায়?’

রামমূর্তি বললেন, ‘এই মন্দিরে নিশ্চয়ই বিষ্ণুর একটা প্রাচীন মূর্তি ছিল। কিন্তু আজ আর তার কোনও খোঁজ মেলে না। কিছু বিষ্ণু মূর্তি চামেরা ধ্বংস করেছিল, আর কিছু চুরি হয়ে যায়। এই মন্দিরগুলোর কয়েকটি কক্ষ অলিন্দের প্রবেশ পথ পাথরের দেওয়াল গেঁথে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার ভিতর কোনও মূর্তি থাকলেও থাকতে পারে। তবে মন্দিরের বাইরের অংশে অর্থাৎ গ্যালারির নীচে একটা কক্ষে একটা বড় বিষ্ণুমূর্তি আছে। আজও তার নিত্য পূজা করা হয়।’

সিঁড়ির ধাপ বেয়ে একটা মন্দিরের বেশ খানিকটা ওপরে উঠে ফাঁকা একটা অলিন্দে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসল তারা। রামমূর্তি অবশ্য বসলেন না। তিনি ঘুরে ঘুরে আশপাশের শূন্য কক্ষগুলো দেখতে লাগলেন। জায়গাটাতে বসার পর কথাবার্তা বলতে বলতে বিক্রম বলল, ‘সত্যিই যেন এক আশ্চর্য জগতের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমরা! কোনও মন্দির যে এত বিশাল হতে পারে, ভাস্কর্যগুলো যে এত সুন্দর হতে পারে, তা না দেখলে বুঝতেই পারতাম না। বিশেষত অপ্সরাদের মূর্তিগুলো কী নিখুঁত। তাদের অঙ্গসৌষ্ঠব, ভঙ্গিমা সবই যেন জীবন্ত!

অন্য সবাই সহমত পোষণ করল তার কথায়।