Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৩২

পর্ব ৩২

স্বাগতকে আলিঙ্গন করতে গিয়েও সেই নারী লোকগুলোকে দেখে ফিরে দাঁড়াল তাদের দিকে। আর তারপরই সে খসিয়ে ফেলল তার অবগুণ্ঠন আর বস্ত্র। স্বাগত দেখল যে তার হাত স্পর্শ করেছিল, মানুষের স্বরে কথা বলছিল সে মানবী নয়, বিরাটাকৃতির একটা বাঁদরি! যে বাঁদরিটা একলা ঘুরে বেড়ায় মন্দিরে। বাঁদরিটাকে দেখে অট্টহাস্য করে উঠে সেই কৃষ্ণকায় ব্যক্তি বলল, ‘বাঁদরি সেজে আমার চোখকে ধোঁকা দিবি ভেবেছিল? উগ্রদেবের চোখকে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। এবার আমার প্রতিশোধ নেওয়ার পালা, দেখি ধরণীন্দ্রবর্মন কীভাবে রক্ষা করে তোদের?’

এ কথা বলার পর সে তার সঙ্গীদের উদ্দেশে বলল, ‘হত্যা, হত্যা কর ওদের। তারপর আমরা বিষ্ণুলোকে প্রবেশ করব।’

উগ্রদেবের নির্দেশ পেয়ে লোকগুলো অস্ত্র হাতে এগিয়ে আসতে লাগল তাদের দিকে। বাঁদরিটা কিন্তু পালাল না। সে যেন স্বাগতর শরীরটাকে আড়াল করে দাঁড়াবার চেষ্টা করতে লাগল। এগিয়ে আসছে লোকগুলো।

আর এরপরই ঘুম ভেঙে গেল স্বাগতর। ঘেমে উঠেছে সে। জানলা দিয়ে সকালের আলো প্রবেশ করছে ঘরের মধ্যে। স্বাগত বিছানায় উঠে বসল। স্বপ্নর রেশ কাটতে বেশ কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল স্বাগতর। সে বুঝতে পারল গতকাল খানের যুবতীর মুখে শোনা কাহিনি আর মন্দিরের নানান কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। আর সেগুলোই তার ঘুমের মধ্যে এই অদ্ভূত স্বপ্নের জন্ম দিয়েছে। ঠিক যেমন আগেও একদিন সে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিল, খামের যুবতীর সঙ্গে ছুটতে ছুটতে কুমির ভরা পরিখায় পড়ে গেছে সে! খামের যুবতীর কাহিনি আর মন্দিরের ঘটনাগুলোই হানা দিচ্ছে তার স্বপ্নে।

কিছুক্ষণের মধ্যে তৈরি হয়ে স্বাগত চত্বরের বাইরে বেরিয়ে এল। অন্য চারজনও ঘর থেকে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রফেসরকে সিয়েমরিপ নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা টুকটুকও এসে দাঁড়িয়েছে। স্বাগত অন্য চারজনের কাছে গিয়ে দাঁড়াবার পর প্রীতম জানতে চাইল, ‘তোমরা কোথাও যাচ্ছ নাকি?’

স্বাগত জবাব দিল, ‘আমি নই, প্রফেসর সিয়েমরিপ যাবেন।’

এই পরিস্থিতির মধ্যেও বিক্রমের মজা করার স্বভাব যায়নি। সে বলল, ‘ব্যাঙের রেস খেলতে নাকি?’ স্বাগত কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই রামমূর্তি ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁকে দেখে কথা থামিয়ে দিল সবাই। তিনি বললেন, ‘আমি বিকালের আগেই ফিরে আসব। চিন্তার কারণ নেই। কোনও প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গে ফোনে জানাবে। পুলিস বা সরকারি লোক ছাড়া অন্য কেউ এলে তাকে মন্দিরের ভিতর ঢুকতে দেবে না।

স্বাগত বলল, ‘যদি নারেঙ আসে? এলে হয়তো সেই আসবে।’

প্রশ্ন শুনে একটু ভেবে নিয়ে রামমূর্তি বললেন, “সে যদি একান্তই ভিতরে ঢুকতে চায় তবে তোমরা ছেলেরা একসঙ্গে ওর সঙ্গে যাবে। দেখবে ও কী করে?’—এ কথা বলে তিনি চত্বর ছেড়ে গাড়ির দিকে এগলেন। তারপর রওনা হয়ে গেলেন সিরেমরিপের উদ্দেশে।

তিনি চলে যাবার পর সুরভী জানতে চাইল, ‘আমাদের এখন করণীয় কী?’

স্বাগত বলল, “করণীয় তো তেমন কিছু নেই। কথাবার্তা বলে বা ঘুমিয়ে সময় কাটাতে হবে। ইচ্ছা করলে জঙ্গলে হেঁটে আসতে পার। আমি এখানেই আছি।”

সেটাই ঠিক হল। তারা চারজন এগল একটু ঘুরে আসার জন্য। তারা চলে যাবার পর স্বাগত এগল তোরণের দিকে সেখানে গিয়ে বসবার জন্য। পাথুরে চত্বরটার যেখানে যেখানে ফাটল বা গর্ত আছে সেখানে গত রাতের বৃষ্টির জল জমে আছে। চত্বরটাও এখনও ভিজে আছে। তোরণের সামনে গিয়ে ভিতরে উঁকি দিল সে। প্রাঙ্গণের ভিতরেও জল জমেছে। তার সঙ্গে প্রাঙ্গণের ভিতর কয়েকটা বড় ব্যাঙও চোখে পড়ল। জমা জলে ছপ ছপ করছে তারা। ওরাও ভূত নয় তো? ব্যাঙ ভূত! কথাটা ভেবে মনে মনে হাসল স্বাগত। তোরণের গায়েই একটা পাথরের খণ্ডর উপর বসল স্বাগত। একলা বসে সে নানা কথা ভাবতে লাগল। কখনও খামের যুবতী আর তার গল্পর কথা। কখনও ফঙের মৃত্যুর কথা, কখনও বা কুমিরের কথা। এই মন্দিরে গুপ্তধন লুকানো আছে কি না স্বাগতর জানা নেই, তবে রহস্যময় কিছু যে আছে তা স্বাগতর মন বলছে। মন্দিরে কাজ করতে আসা মজুরের ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়া থেকে শুরু। তারপর প্রীতমের কুমির দেখা, সর্বশেষে ফঙের মৃত্যু স্বাগতর মনের এই সন্দেহে ক্রমশ দৃঢ় করে তুলছে। একসময় হেরুম এসে উপস্থিত হল সেখানে। স্বাগতকে একলা বসে থাকতে দেখে সে তার কাছে এসে জানতে চাইল, ‘অন্যরা কোথায়? সবাই কি মন্দিরের ভিতরে গেছে?’

স্বাগত জবাব দিল, ‘প্রফেসর শহরে গেছেন আর অন্যরা আশপাশে হাঁটতে গেছে। আজও কাজ হবে না। তবে কাজ নিশ্চয়ই আবার শুরু হবে।’

হেরুম বলল, ‘ফঙের মারা যাওয়ার খবরটা সব জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। সবাই তাই নিয়েই আলোচনা করছে। বলছে ভূতেই তাকে খুন করেছে।’

—‘আর কিছু শুনলে ফঙ সম্পর্কে?’ জানতে চাইল স্বাগত।

হেরুম বলল, ‘একজন লোক বলছিল, পরশু দিন অর্থাৎ যে রাতে ফঙ মারা যায় সেদিন নাকি লোকটা তাকে সিয়েমরিপে দেখেছে একজনের সঙ্গে কথা বলতে।’

—‘কার সঙ্গে? নারেঙ খাম নামের যে লোকের সঙ্গে সে এখানে এসেছিল তার সঙ্গে?’

হেরুম বলল, ‘না, সে লোককে আপনি চিনবেন না। তার নাম হোয়াঙ। সিয়েমরিপে ব্যাঙের দৌড়ের জুয়া খেলা হয়। হোয়াং নামের চীনা লোকটা সেটা চালায়। এখানে জঙ্গলে বড় বড় ব্যাঙ পাওয়া যায়। শুনলাম ফঙ নাকি ব্যাঙ ধরে ওই হোয়াং-কে বিক্রি করত। হয়তো সে কারণেই ফঙের কাছে গিয়েছিল। যার থেকে খবরটা পেলাম সে একজন মজুর। সে জুয়া খেলতে যায় হোয়াং-এর আড্ডাতে।’

এ তথ্যটা শুনে একটু অবাক হল স্বাগত। সে প্রশ্ন করল, ‘ওই হোয়াঙ নামের লোকটা কেমন লোক?’

হেরুম জবাব দিল, ‘বুঝতেই পারছেন যে জুয়ার আড্ডা চালায় সে কেমন লোক হতে পারে?’

স্বাগত এরপর তাকে বলল, “ঠিক আছে, তুমি রান্নার ব্যবস্থা কর।”

হেরুম তার কাজে চলে যাওয়ার পর স্বাগত মনে মনে ভাবতে লাগল হোয়াঙের মতো লোকের সঙ্গে প্রফেসর রামমূর্তির কীসের যোগাযোগ?

সময় এগিয়ে চলল। ঘণ্টা খানেক বাদে সুরভীরা চারজন ফিরে এল। বিক্রম স্বাগতকে বলল, “জঙ্গলের রাস্তায় কত রকমের বড় বড় ব্যাঙ ঘুরে বেড়াচ্ছে তার হিসেব নেই। ওদের দেখেই আমার ব্যাঙের রেসের কথা মনে পড়ে গেল।”

স্বাগত বলল, ‘একটু আগে হেরুমের মুখে শুনলাম, এখান থেকে নাকি ব্যাঙ ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ওই রেসের জন্য।’

বেলা দশটা বাজে। বেশ চড়া রোদ উঠেছে উন্মুক্ত চত্বরের মাথার ওপর। স্বাগতর কিছু করার নেই। ঘরের ভিতরে ঢুকলে এখন গুমোট গরম লাগবে। ঘুম হবে না। স্বাগতর মনে হল সেও একবার জঙ্গলের ভিতর ঘুরে আসে। সেখানে ছায়া আছে, বাতাসও ঠান্ডা। সে তাই বিক্রমকে বলল, “তোমরা এবার এখানে থাক, আমি একটু জঙ্গল থেকে ঘুরে আসি।” পুরনো মন্দির চত্বর থেকে বেরিয়ে পড়ল স্বাগত। বনপথ ধরল সে। স্থানে স্থানে কাঁচা রাস্তায় জল জমে আছে। বিক্রমের কথাই ঠিক। অজস্র ব্যাঙ ঘুরে বেড়াচ্ছে রাস্তায়। সবুজ, হলুদ, কালো, নানান আকৃতির ব্যাঙ। ভাঙা স্তম্ভ, প্রাকার, শ্যাওলা ধরা গুঁড়ির আড়াল থেকে তাদের ডাকও শোনা যাচ্ছে। নিজের মনেই রাস্তার একপাশ ধরে ধীরে ধীরে হাঁটছিল স্বাগত। হঠাৎ একটা টুকটুকের হর্ন কানে এল তার। তারপর গাড়িটা এসে দাঁড়িয়ে পড়ল তার পাশে। ড্রাইভারকে চিনতে পারল স্বাগত। সেই তাদেরকে সিয়েমরিপ নিয়ে গিয়েছিল। সে তাকে চিনতে পেরেই দাঁড়িয়েছে। দু’জন শ্বেতাঙ্গ সওয়ারিও আছে তার গাড়িতে। সে হেসে স্বাগতকে বলল, ‘বিষ্ণুমন্দির গেলে উঠে পড়ুন। আমি এই দু’জনকে ওখানে ছাড়তে যাচ্ছি। ভাড়া লাগবে না স্যর।’

ভাড়া দিতে হবে না বলে নয়, স্বাগত কেন জানি অগ্রাহ্য করতে পারল না তার প্রস্তাব। শ্বেতাঙ্গ দু’জন পিছনের আসনে বসে আছে। তারা যাতে বিরক্ত না হয় সে জন্য ড্রাইভারের পাশের আসনেই উঠে বসল সে। তাকে নিয়ে ভেজা রাস্তা ধরে জলে ভরা রাস্তাগুলোকে বাঁচিয়ে হেলতে দুলতে চলল টুকটুক। কিছুক্ষণের মধ্যেই ড্রাইভারের তাকে তুলে নেওয়ার আগ্রহর কারণ বুঝতে পারল স্বাগত। সে তাকে প্রথমে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যর আপনাদের ওই মন্দিরে থাকতে কোনও অসুবিধা হয় না? রাতে তাদের দেখেছেন কখনও?’

—‘তুমি কাদের কথা বলছ?’ জানতে চাইল স্বাগত।’

ড্রাইভার বলল, ‘ওই যারা পুরনো মন্দিরগুলোতে থাকে। সন্ধ্যা নামার পর যারা জেগে ওঠে।’

স্বাগত বুঝতে পারল খামের ড্রাইভার তাকে কী বলতে চাইছে। সে জবাব দিল, ‘না, অমন কিছু আমরা কেউ কোনও দিন দেখিনি। ওসব কিছু আছে বলেও আমার মনে হয় না।’

লোকটা চাপা স্বরে বলল, “ওসব কিছু নেই! তবে গাইড ফঙকে কে মারল স্যর? সবাই তো বলছে তারাই মেরেছে গাইড ফঙকে?”

এ কথার জবাবে একটু চুপ করে থেকে স্বাগত জবাব দিল, “সে মারা গেছে ঠিকই, তবে সে কীভাবে মারা গেছে তা আমরা জানি না।”

ড্রাইভার বলল, ‘শুনলাম তার ঘাড়টা নাকি একদম ভেঙে গিয়েছিল! মাথাটা উল্টো দিকে ঘুরে গেছিল! তারা ছাড়া কাদের হাতে এত শক্তি আছে যে ঘাড় ভেঙে দেবে?”

স্বাগত লোকটার কথা শুনে বুঝতে পারল, ফঙের মৃত্যুর খবরটা নানাভাবে পল্লবিত হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।’ স্বাগত কোনও জবাব দিল না লোকটার কথায়।

ড্রাইভার সম্ভবত বুঝতে পারল, স্বাগতর এ প্রসঙ্গে আলোচনা করার ইচ্ছা নেই। সে আর কথা না বলে একটু বিমর্ষভাবে গাড়ি চালাতে লাগল।

স্বাগত পৌঁছে গেল বিষ্ণুলোকের সামনে। কিন্তু, সেখানে উপস্থিত হয়েই সে বুঝতে পারল নেহাতই মনের খেয়ালে সে এত দূর চলে এসেছে। যদিও একশোবার দেখলেও এই মন্দির দেখার সাধ মেটে না, কিন্তু স্বাগতর মনে হল প্রফেসর নেই। মন্দিরের ভিতর একবার ঢুকলে সে বিষ্ণুলোকের অপূর্ব ভাস্কর্যগুলো দেখতে দেখতে হয়তো সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। নিজেদের মন্দির ছেড়ে বেশি সময় তার বাইরে থাকা উচিত হবে না। টুকটুক থেকে নামার পর এ কথা ভেবে নিয়ে সে ড্রাইভারকে বলতে যাচ্ছিল, ‘চল আমি এখন ফিরব।’ কিন্তু তার আগেই সে দেখতে পেল একজনকে। কিছুটা তফাত দিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন, স্বাগতকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে তিনি দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তার হাতে মাটির তৈরি একটা কলস বা ঘড়া। তার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হওয়াতে স্বাগত ড্রাইভারকে কিছু না বলে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল তাঁর সামনে। স্বাগত হাত জোড় করে নমস্কার করল তাঁকে। তিনিও মাথাটা একটু ঝোঁকালেন। তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘এখানে কাজে এসেছেন?’

স্বাগত জবাব দিল, ‘না, কাজে নয়। জঙ্গলের পথে হাঁটছিলাম। টুকটুকটা এদিকে আসছিল। ড্রাইভার পরিচিত। সে আমাকে উঠতে বলল, আমি এদিকে চলে এলাম।’

এ কথা বলে স্বাগত প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি মন্দিরে যাচ্ছেন?’

স্বাগতর প্রশ্ন শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী তার হাতের কলসটা তুলে ধরে দেখালেন। কলসটার মুখ মাটির সরা দিয়ে ঢাকা দেওয়া। সেটা দেখেই স্বাগতর শূদ্র ব্রাহ্মণদের ঘড়া হাতে মূর্তিগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। যে মূর্তি আছে তাদের মন্দিরে আর এই বিষ্ণুলোকের মাথার ওপরের সেই কক্ষে। স্বাগত জানতে চাইল, ‘কী আছে ওই কলসের মধ্যে?’

বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব আবারও কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বললেন, “এটা ফঙের অস্থিকলস।’ সিয়েমরিপে কাল রাতেই ফঙের দাহকার্য সম্পন্ন হয়েছে। এই অস্থিকলস নিয়ে সেখান থেকে আজই আমি ফিরেছি। মৃতর অঙ্গার, অস্থি বিষ্ণুলোকের পরিখার জলে বিসর্জন দেওয়া এখানকার প্রাচীন প্রথা। সে কাজই আমি করতে এসেছি।” ‘—এ কথা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আর কোনও কথা না বলে সন্ন্যাসী হাঁটতে শুরু করলেন। স্বাগত বুঝতে পারল ফঙ লোকটা যেমন লোকই ছিল না কেন তার মৃত্যুতে ব্যথিত হয়েছেন সন্ন্যাসী। স্বাগত এবার পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেল টুকটুকটা সওয়ারি নামিয়ে চলে গেছে। এবার তাকে ফেরার জন্য অন্য টুকটুক ধরতে হবে। কিন্তু তারপরই তার মনে একটা ইচ্ছা জাগল সম্ভবত সন্ন্যাসীর হাতে ওই মাটির ঘড়াটা দেখার কারণে। তার মনে হল, সে যখন বিষ্ণুলোকের সামনে এসেই পড়েছে তবে একবার মন্দিরের সেই রহস্যময় ঘরটা চট করে দেখে আসা যাক, যেখানে ঘড়া হাতে মূর্তিগুলো আছে। এ কথা ভেবে নিয়ে সে এগল মন্দিরের দিকে।

বিষ্ণুলোকের প্রধান তোরণ অতিক্রম করতে গিয়ে একটা জিনিস দেখে হঠাৎই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল স্বাগত। দড়ি দিয়ে একটা ব্যানার টাঙানো হয়েছে তোরণের গায়ে। তাতে রয়েছে ফঙের একটা ছবি আর কম্বোডিয়ান ভাষাতে লেখা কিছু কথা। সে ভাষা পড়তে না পারলেও স্বাগত অনুমান করল ফঙ এ মন্দিরে গাইডের কাজ করত বলে তার সহকর্মীরা ওই ব্যানার টাঙিয়ে ফঙের মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করছে। স্বাগতর মনে হল, ফঙ যেন ছবির ভিতর থেকে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে! কয়েক মুহূর্ত ব্যানারটার দিকে তাকিয়ে নিজের আইডেন্টিটি কার্ড দেখিয়ে বিষ্ণুলোকে প্রবেশ করল স্বাগত। সে কোথাও থামল না। প্রাকারের ভিতর ঘাসে ছাওয়া জমি, পদ্ম ফুটে থাকা জলাশয় অতিক্রম করে সোজা প্রবেশ করল মন্দিরে। ট্যুরিস্টদের ভিড় আজ তেমন একটা নেই। হয়তো বা দু’দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে বলেই। পথ খুঁজে নিয়ে সে উঠে গেল মন্দিরের উপরিভাগের অলিন্দে। সেই অলিন্দ এবং কক্ষগুলো একই রকম নির্জন। শেষ পর্যন্ত সে পৌঁছে গেল কক্ষে। আজ কিন্তু বাদুড়ের দল তাকে দেখে উড়ল না। তবে কি এই কক্ষে নিয়মিত ভাবে মানুষের যাওয়া-আসা হয়েছে। যে কারণে মানুষ দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে তারা? ভয় কেটে গেছে? এমনই মনে হল স্বাগতর। স্বাগত মূর্তিগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মুণ্ডিত মস্তক ব্রাহ্মণের দল রক্ষী পরিবৃত হয়ে এগিয়ে চলেছে। অগ্রবর্তী মূর্তিটি অঙ্গুলি দিয়ে যেদিকে পথ নির্দেশ করছে সেদিক থেকে একসময় নীচে নামার সিঁড়ি ছিল, এখন কেবলই উন্মুক্ত গহ্বর। স্বাগতর মনে প্রশ্ন এল ওই ভাণ্ডধারী লোকগুলোর পরবর্তী ছবি কি খোদিত আছে ওই মন্দিরে? নাকি ওই মন্দিরে ভাণ্ডগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেটাই জানানো হয়েছে এই পাষাণ চিত্রে? ‘কী আছে ওই ভাণ্ডগুলোতে? চিতাভস্ম নিশ্চয়ই নয়? ভাণ্ডগুলোর মধ্যে নিশ্চয়ই মূল্যবান কিছু জিনিস রক্ষিত আছে যেজন্য প্রহরীর ব্যবস্থা।’ ‘—এ কথাই মনে মনে ভাবল স্বাগত। এরপর সে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল দেওয়ালের গায়ে উন্মুক্ত ফোকরের সামনে। তাদের মন্দিরের মাথার ওপর লাল পতাকাটা তাকে মন্দিরটা চিনিয়ে দিল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মাঝে মাঝে সিঁথির মতো রাস্তা দেখা যাচ্ছে। খামের যুবতী গতকাল তার কাহিনিতে বলেছিল ওই প্রাচীন পথের কথা, একই সঙ্গে তাকে নিষেধও করেছে ওই পথে মন্দিরে প্রবেশ করতে। স্বাগত ভাবল খামের যুবতী যাই বলুক সে একবার মন্দিরটাকে বেড় দিয়ে ওই পথের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করবে। দেখবে সত্যিই সেখান দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করা যায় কি না?’

স্বাগতকে এবার ফিরে যেতে হবে। সে তাই কিছুক্ষণ জঙ্গলের ভিতর রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে এসব কথা ভেবে নিয়ে সে জায়গা থেকে সরে আসতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় তার একটা জিনিস চোখে পড়ল। ওই প্রাচীন রাস্তাটার যে অংশটা স্বাগতদের মন্দির থেকে বিষ্ণুলোকের কাছাকাছি এসে আত্মপ্রকাশ করেছে সে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে একজন লোক। তাকে দেখে মনে হচ্ছে। সে ওই রাস্তা ধরে স্বাগতদের মন্দিরের দিক থেকেই ফিরছে। লোকটা কে? সে কি স্বাগতদের মন্দিরেই গেছিল? ও পথে এখনও কি তবে লোক চলাচল করে? স্বাগত পকেট থেকে তার মোবাইল ফোন বার করে ক্যামেরাটা যথাসম্ভব জুম করে লোকটাকে দেখার চেষ্টা করল। লোকটার পরনে হলুদ রঙের পোশাক। মাথায় একটা টুপিও আছে। সবুজ অরণ্য পথে লোকটার ওই উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের পোশাকটাই প্রথমে লোকটার প্রতি স্বাগতর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তবে এত ওপর আর দূর থেকে লোকটার মুখ স্বাগতর পক্ষে বোঝা সম্ভব হল না। সেই লোকটা বিষ্ণুলোকের কাছাকাছি এসে গাছের আড়ালে মিলিয়ে গেল। স্বাগত এরপর আর তাকে দেখার জন্য দাঁড়াল না। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে তাকে। সে সেই ঘর ত্যাগ করে দ্রুত নীচে নেমে কিছুক্ষণের মধ্যেই বিষ্ণুলোক ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে বেরিয়ে সে একবার সেই হলুদ পোশাক পরা লোকটার খোঁজে চারপাশে তাকাল ঠিকই, কিন্তু তাকে দেখতে পেল না। একটা টুকটুক ধরে সে রওনা হল নিজেদের মন্দিরে ফেরার জন্য। টুকটুকটা মন্দিরের কাছাকাছি জঙ্গলের ভিতর রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল। স্বাগত ড্রাইভারকে বলল, ‘আর একটু চল, ওই যে গাছের আড়ালে পুরনো মন্দিরটা আছে আমি ওখানে যাব।’

ড্রাইভার বলল, ‘না, স্যর। আমি এই রাস্তা ছেড়ে ওই মন্দিরের কাছে যাব না। আপনি জানেন না ওই মন্দিরে দু-দিন আগেই এক গাইড মারা গেছে? ভূতে তাকে মেরে ফেলেছে!’

টুকটুক ড্রাইভারের কথা শুনে স্বাগত বুঝতে পারল তাদের মন্দিরকে কেন্দ্র করে জনমানসে আতঙ্ক ভালোই ছড়িয়েছে! ড্রাইভারের ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে অগত্যা স্বাগত হেঁটেই মন্দির চত্বরে পৌঁছল। সুরভী, নাতাশা আর বিক্রম ঘরে ঢুকে গেছে। প্রীতম আর হেরুম ভাড়ার ঘরের কাছেই রান্নার জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। স্বাগত তাদের কাছে গিয়ে জানতে চাইল, ‘কেউ এসেছিল?’

প্রীতম জবাব দিল, ‘না, কেউ আসেনি।’ তারপর বলল, ‘ও হ্যাঁ, একজন এসেছিল। সাইকেল নিয়ে ওই তালের রস বিক্রেতা। বিক্রম তার থেকে দুটো বোতল কিনে ঘরে ঢুকেছে।’