বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৩৩
পর্ব ৩৩
বেলা প্রায় বারোটা বাজে। চত্বরে বেশ রোদ। স্বাগত তার ঘরে গিয়ে ঢুকল।
বেশ কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজায় টোকা পড়ল। স্বাগত দরজা খুলতেই বিক্রম হাতে করে তাড়ির বোতল নিয়ে ঢুকে পড়ল। তার মুখ থেকে তাড়ির গন্ধ বেরচ্ছে। স্বাগতর দিকে বোতলটা বাড়িয়ে সে বলল, ‘নাও, তোমার জন্য কিনে রেখেছি।’
স্বাগত বলল, ‘না, আজ আর খাব না। রোজ খেলে অ্যাডিকশন হয়ে যাবে। তাছাড়া রোজ ও পানীয় পান করাটা প্রফেসর পছন্দ নাও করতে পারেন।’
বিক্রম বলল, ‘তাহলে আমিই খেয়ে নেই। গরম হয়ে গেলে খেতে ভালো লাগবে না।’
এই বলে সে বোতলের ছিপি খুলে তালের রসটা ঢকঢক করে ঢেলে নিল।
এরপর সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তার চোখমুখ দেখে স্বাগত অনুমান করল বিক্রমের নেশা চড়তে শুরু করেছে। এরপর একসময় সে বলল, ‘প্রফেসর সিয়েমরিপে ঠিক কী করতে গেছে বল তো? উনি তো সব কথা তোমাকে বলে যান।’
স্বাগত বলল, “ওই তো, তোমাদের যা বললাম, সেটাই আমাকে বলেছেন। উনি ব্যক্তিগত কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে গেছেন।”
স্বাগতর কথা শুনে বিক্রম বলল, ‘কই যাবার সময় ওনার হাতে থলে বা ব্যাগ দেখলাম না তো? আমার ধারণা তিনি জুয়ার আড্ডায় গেছেন। হোয়াং নামের চীনাটা তো খুঁজছিল প্রফেসরকে।’
`স্বাগত, বলল, ‘হতে পারে। তবে প্রফেসরের মতো লোক ওখানে জুয়া খেলতে যাবেন বলে মনে হয় না। হয়তো অন্য কোনও কারণে প্রফেসরের সঙ্গে ওর যোগাযোগ।’
স্বাগতর কথা শুনে বিক্রমের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে যেন স্বাগতর শেষ কথাটা ঠিক বিশ্বাস করল না। তারপর সে স্বাগতকে বলল, ‘তোমাকে দু’দিন ধরে একটা কথা বলব ভাবছি, কিন্তু ভরসা করে ঠিক বলে উঠতে পারছি। না।’
স্বাগত বলল, ‘তুমি নির্দ্বিধায় আমাকে কথাটা বলতে পার।’
বিক্রম বলল, ‘হ্যাঁ। বলছি। তুমি কিন্তু কথাটা কাউকে বল না। প্রফেসরের একটা অন্য রোগ আছে।’
স্বাগত জানতে চাইল, ‘কী রোগ?’
বিক্রম বলল, ‘ফঙ যে রাতে মারা গেল, তার আগের রাতে হঠাৎই আমার ঘুম ভেঙে গেল। তখন রাত একটা বাজে। ঘুম ভাঙার পর আমার জল তেষ্টা পেল। খাট থেকে নেমে জল খেয়ে আমি শোওয়ার আগে জানলাটা একটু
তোরণের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একজন মহিলা! তার পরনে স্থানীয় খামের মেয়েদের মতো পোশাক৷ তবে তার মুখ ঢাকা ছিল। তোরণ থেকে বেরিয়েই সে অতি দ্রুত পায়ে উড়ে যাবার ভঙ্গিতে চত্বরটা অতিক্রম করে জঙ্গলের ভিতর চলে গেল।
ফাঁক করেছিলাম। তোরণের দিকে তাকাতেই দেখি প্রফেসর তোরণের ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে তারপর নিজের ঘরে ঢুকে দরজা দিয়ে দিলেন! আমি বেশ অবাক হলাম ব্যাপারটাতে। এত রাতে তিনি মন্দিরের ভিতর ঢুকেছিলেন কেন? বিশেষত যখন মন্দিরের ভিতরে কুমির থাকার সম্ভবনা আছে? আমি বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম প্রফেসর ঘর থেকে আবার বাইরে আসেন কি না তা দেখার জন্য। আর এরপরই আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখলাম। তোরণের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একজন মহিলা! তার পরনে স্থানীয় খামের মেয়েদের মতো পোশাক। তবে তার মুখ ঢাকা ছিল। তোরণ থেকে বেরিয়েই সে অতি দ্রুত পায়ে উড়ে যাবার ভঙ্গিতে চত্বরটা অতিক্রম করে জঙ্গলের ভিতর চলে গেল। এ দেশে ব্যাপারটা সহজলভ্য। তুমি খেয়াল করে দেখেছ কি না জানি না, সিয়েমরিপের রাস্তায় অনেক মেয়েরাই ঠোঁটে রং মেখে দাঁড়িয়ে থাকে। কাজেই আমি কী বলতে চাইছি তা তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ?’ কথা শেষ করে চোখ মটকাল বিক্রম।
স্বাগত তার কথা শুনে বলল, ‘সেদিন সিয়েমরিপ থেকে যে হুইস্কির বোতল কিনেছিলে তা কি ওই রাতেই শেষ করে দিয়েছিলে?’
বিক্রম বলল, ‘আমি আধ বোতল পান করেছিলাম ঠিকই। কিন্তু বিশ্বাস কর আমি ভুল দেখিনি। সত্যি প্রফেসর মন্দির থেকে বেরবার পর একটা মেয়ে বেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল!’
স্বাগত বলল, “কিন্তু ভূতের ভয়ে রাতে তো স্থানীয় মানুষরা এ তল্লাটের ছায়া মাড়ায় না। তার ওপর একজন মহিলা!”
বিক্রম বলল, ‘পেট বড় বালাই। যে কারণে অন্য মজুররা কাজ করতে না এলেও হেরুম এখানে কাজ করতে আসে। তেমনই হয়তো মেয়েটার পয়সার দরকার তাই সে আসে।’ ‘—এ কথা বলে বিক্রম খাট ছেড়ে উঠে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। স্বাগত ভাবতে লাগল বিক্রম যা বলে গেল সে কথাগুলো কি ঠিক? নাকি নেশার ঘোরে সে ভুল দেখেছে? অথবা নেশার ঘোরে ভুল বকে গেল?
এসব কথা ভাবতে ভাবতে একসময় তার খেয়াল হল, অনেক বেলা হয়েছে। রান্না নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ হয়েছে। এবার খেয়ে আসা দরকার। স্বাগত বাইরে বেরিয়ে দেখল ভাড়ার ঘরের কাছে ইতিমধ্যেই একটা ছায়াতে খাবারের প্লেট হাতে খেতে শুরু করেছে প্রীতম, সুরভী আর নাতাশা। স্বাগত সেদিকে এগতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় চত্বরে উঠে এল একজন। নারেঙ খাম! তার পোশাক দেখে অবাক হয়ে গেল স্বাগত। নারেঙের পরনে উজ্জ্বল হলুদ রঙের একটা স্যুট! সে চত্বরের মাঝে এসে দাঁড়াল। স্বাগতও তার সামনে যেতেই সে বলল, ‘প্রফেসর কই?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘তিনি সিয়েমরিপে গেছেন মার্কেটিং করতে।’
এ কথা বলে স্বাগত জানতে চাইল, ‘আপনি কোথায় গেছিলেন?’
নারেঙ বলল, ‘বিশেষ কোথাও নয়। এখানেই বিভিন্ন পুরনো স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম যেমন দেখি। মনোমতো নতুন গাইড এখনও পাইনি। তাই একাই ঘুরছিলাম। ফিরে যাবার সময় মনে হল, একবার আপনাদের খবর নিয়ে যাই, তাই এলাম। নতুন কোনও সমস্যা হয়নি তো?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘না, নতুন করে কোনও কিছু ঘটেনি।’ নারেঙ এরপর তাকাল ভাড়ার ঘরে দিকে। নাতাশাদের খেতে দেখে বলল, ‘সরি। আমি আপনাদের খাওয়ার সময় এসে বিরক্ত করলাম। এবার আমি যাই।’
স্বাগত বলল, ‘আচ্ছা।’
নারেঙ পিছু ফিরতে গিয়েও আবার দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর জানতে চাইল, ‘পুলিস আর যোগাযোগ করেছিল আপনাদের সঙ্গে? পোস্টমর্টেম রিপোর্টে কী প্রকাশ হল জানিয়েছে কিছু?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘না, পুলিসের সঙ্গে আর কথা হয়নি।’ তার জবাব শুনে নারেঙ এগল চত্বর থেকে।
নারেঙের পোশাক দেখে স্বাগত মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেল, সে তাকেই দেখেছে। তবে কি নারেঙ এ মন্দিরে এসেছিল পিছনের পথ দিয়ে। স্বাগত ভাবল সে একবার মন্দিরের পিছনের রাস্তাটায় যাবে। দেখার চেষ্টা করবে সেখান দিয়ে মন্দিরের ভিতরে ঢোকা যায় কি না? এরপরই তার মনে পড়ল খামের যুবতী তাকে নিষেধ করেছে ওই জায়গায় যেতে। কিন্তু স্বাগতর মনে হল, দিনের বেলাতে ওখানে গেলে কী আর হবে? সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, খাওয়া সেরে সবাই ঘরে শুতে চলে গেলে সে ওদিকটায় যাবে। স্বাগত এরপর সুরভীদের কাছে গিয়ে খাওয়া সেরে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল।
ঠিক দুটো নাগাদ ঘর থেকে বাইরে বেরল সে। চড়া রোদ, নির্জন চত্বর। যে যার ঘরে ঢুকে পড়েছে। প্রফেসরের ঘরও তালাবন্ধ। চত্বর ছেড়ে নেমে বনপথে ঢুকল সে। দেখতে দেখতে চলল মন্দিরের পিছন দিকে যাবার কোনও রাস্তা এদিক থেকে আছে কি না। কিছুটা চলার পর গাছপালার ফাঁক দিয়ে একটা ফাঁকা জমি দেখল সে। খুব সামান্য ঝোপজঙ্গল সেদিকে। স্বাগত অনুমান করল ওই জায়গাটা অতিক্রম করলে পিছনের রাস্তাতে হয়তো পৌঁছে যাওয়া যেতে পারে। সে দিকেই এগল সে। বেশখানিকটা এগবার পর প্রাচীন স্থাপত্যের কিছু ভগ্নস্তূপ চোখে চড়ল। বেশ কয়েকটা পাথুরে দেওয়াল, আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে থাকা স্তম্ভ ইত্যাদি। একসময় সে জায়গায় বেশ কয়েকটা ঘর বা বাড়ি ছিল। হয়তো বা মন্দিরের কাজে নিয়োজিত লোকেরা থাকত এ জায়গায়। প্রাচীন ধ্বংসস্তূপটা অতিক্রম করতেই কিছু দূরে ঝোপঝাড়ের আড়ালে একটা রাস্তার মতো অংশ চোখে পড়ল। ওটাই হয়তো সেই রাস্তা যা মন্দিরের পিছনে গিয়ে মিলেছে। স্বাগত উৎসাহ ভরে এগল সেদিকে। কিন্তু একটু এগিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল তাকে। তার সামনেই একটা লম্বা নালার মতো গর্ত। অন্তত হাত দশেক চওড়া হবে সেটা। বর্ষার জল জমা হয়ে আছে তাতে। গভীরতা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ভালো করে খেয়াল করে স্বাগত বুঝতে পারল এটা জঙ্গলের ভিতর কোনও প্রাকৃতিক নালা নয়, কারণ নালার গায়ে স্থানে স্থানে পাথর উঁকি দিচ্ছে। অর্থাৎ এই ক্ষুদ্রাকৃতি পরিখা বা নালাটা একসময় খনন করে পাথর দিয়ে বাঁধানো হয়েছিল। নালাটা মন্দিরের দিক থেকেই আসছে। হয়তো বা এই নালা দিয়ে মন্দিরে জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছিল, অথবা মন্দিরে জল প্রবেশ করানো হতো। লালাটা লাফিয়ে পেরনো সম্ভব নয়। তবে স্বাগত দেখতে পেল কিছুটা তফাতে এক জায়গায় প্রাচীন স্থাপত্যের ধ্বংসস্তূপ নালাতে খসে পড়ে তার অর্ধেকের বেশি অংশ বুজিয়ে ফেলেছে। স্বাগত সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর সেই পাথরের স্তূপের ওপর উঠে নালার ফাঁকা অংশটা লাফ দিয়ে পেরিয়ে গেল। তারপর একটু এগিয়েই সে পেয়ে গেল কাঙ্ক্ষিত পথ। প্রাচীন পথটার স্থানে স্থানে পাথর উঠে গেছে। পথের দু’পাশে বড় বড় গাছ। চারপাশে নিঝুম পরিবেশ। বিষ্ণুলোকের দিক থেকে রাস্তাটা এসে এগিয়েছে মন্দিরের দিকে। স্বাগত এগল সে পথ ধরে।
সে পৌঁছে গেল মন্দিরের পিছনের অংশে। একটা প্রাকার এদিকেও ছিল, সেটা এখন ধসে পড়েছে। মন্দিরের পিছনের অংশে ভিতরের দেওয়ালের গা ঘেঁষে বেশ কয়েকটা গাছ পরপর দাঁড়িয়ে। শাখা-প্রশাখাসমৃদ্ধ গাছ। যে কারণে মন্দিরের ছাদে উঠলেও মন্দিরের পিছনের অংশর নীচের দিক বা রাস্তাটা দেখা যায় না। পিছনের অংশে কোনও অলিন্দ বা জানলা নেই। কোনও সময় তা থাকলেও হয়তো বা পরে বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভেঙে পড়া প্রাকারের পাথরগুলো টপকে স্বাগত ভিতরে ঢুকে পড়ল। তারপর মন্দিরের দেওয়ালের কাছের গাছগুলোর কাছে এগিয়ে সমান্তরালভাবে হাঁটতে লাগল। আর কিছুটা এগিয়েই মন্দিরের পিছনের দেওয়ালে হঠাৎই একটা ফোকর দেখতে পেল সে। ভালো করে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল কোনও একসময় সেখানে একটা প্রাচীন দরজা ছিল। তার চিহ্ন এখনও টিকে আছে। দেওয়ালের দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুটো ভগ্ন নারী মূর্তি। দরজাটা যেখানে ছিল সে জায়গাটা পরবর্তীতে পাথরের খণ্ড দিয়ে বুজিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কিছু পাথর খসে পড়ে একটা ফোকর সৃষ্টি হয়েছে। কোনও মানুষ চেষ্টা করলে সেই ফোকর বা ফাটল দিয়ে মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করতে পারে। স্বাগত সেই ফোকরের সামনে যেতেই তার সামনে মাটিতে পড়ে থাকা একটা জিনিস দেখতে পেল। লোহার শাবল ধরনের একটা জিনিস। গহ্বরটা ভালো করে দেখার পর সে বুঝতে পারল বন্ধ করে দেওয়া প্রবেশ পথের কয়েকটা পাথর কালের নিয়মে আপনা থেকে খসে পড়লেও সম্ভবত ওই লোহার রডটা দিয়েই আরও কয়েকটা পাথর সম্প্রতি খসিয়ে ফেলা হয়েছে যাতে ফাটল গলে মন্দিরের ভিতর ঢোকা যায় সেজন্য। যে অংশের পাথর খসানো হয়েছে তার গায়ে এখনও শাবলের আঘাতের চিহ্ন জেগে আছে শ্যাওলা ধরা পাথরের গায়ে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বেশ অবাক হয়ে গেল স্বাগত। এ পথেই কি তবে নারেঙ খাম, ফঙ বা অন্য কেউ মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করেছিল?
ফোকরের ভিতর উঁকি দিল স্বাগত। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার খেলা করছে ভিতরে। মোবাইল ফোন বার করে টর্চের আলো জ্বালিয়ে সে ফোকরের ভিতর ফেলল। মোবাইল টর্চের আলো জোরালো নয় বলে সেটা ভিতরটাকে সম্পূর্ণ আলোকিত করছে না। তবে স্বাগতর মনে হল ওপাশে একটা ঘরের মতো জায়গা আর তার ভিতর থেকে যেন একটা সুড়ঙ্গ এগিয়েছে মন্দিরের ভিতরের দিকে। ফোনটা ঘুরিয়ে যথাসম্ভব ভালো করে দেখার চেষ্টা করতে লাগল ভিতরটা। হঠাৎই একটা জায়গায় আলো ফেলতে সে জায়গাটা যেন নড়ে উঠল। হ্যাঁ, মানুষের মতো একটা মূর্তি। কে ও? এরপর সেই মূর্তিটা হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসতে লাগল ফোকরের দিকে। সে কি স্বাগতকে আক্রমণ করতে আসছে? স্বাগত সঙ্গে সঙ্গে ফোকরের কাছ থেকে কিছুটা সরে এল যাতে সে আক্রমণ করলে বাইরের আলোতে তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে সে জন্য। হাতের কাছে অনেক পাথরের টুকরো পড়ে আছে। প্রয়োজনে সে পাথর দিয়ে আঘাত হানতে পারবে লোকটাকে। কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই ফোকরের সামনে এসে দাঁড়াল সেই মূর্তি। স্বাগত চিনতে পারল তাকে। না, সে কোনও মানুষ নয়, সেই বিরাট বাঁদরীটা! ফোকরটা ধরে সে স্বাগতর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর আবার ভিতরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তাকে দেখেই স্বাগতর মনে পড়ে গেল তার গত রাতের অদ্ভুত স্বপ্নটার কথা। তবে স্বাগত বুঝতে পারল, একলা ওই ফোকরের ভিতর তার ঢোকা ঠিক হবে না। বাঁদরীটা তাকে আক্রমণ করতে পারে। তাছাড়া অন্য কোনও বিপদও ঘটতে পারে। তার সঙ্গে কোনও হাতিয়ার নেই বা টর্চও নেই। তিনটে বাজতে চলল, প্রফেসরেরও ফেরার সময় হয়ে গেছে। স্বাগত ফেরার আগে একবার ভালো করে দেখল বুজিয়ে দেওয়া দরজার দু’পাশের নারী মূর্তি দুটোর দিকে। প্রাচীন অপ্সরা মূর্তি দুটোর একটার হাত দুটো খসে তার পায়ের নীচে পড়ে আছে। আর অন্য মূর্তিটা মুন্ডুহীন। যে মূর্তিটার মুন্ডুটা এখনও আছে সেটার দিকে তাকিয়ে স্বাগতর মনে হল যে মুন্ডুটা দিয়ে ফঙকে আঘাত করা হয়েছিল বলে পুলিসের সন্দেহ সেই মুন্ডুটা যেন এই অপ্সরার মাথার মতোই দেখতে ছিল। তবে কি একই রকম দুটো মূর্তি বন্ধ করে দেওয়া দরজার দু’পাশে স্থাপিত ছিল? মূর্তি দুটোর গড়ন দেখে তাই মনে হচ্ছে। হুবহু দুটো একই রকম নারী স্থাপন করা হয়েছিল দরজাটার দু’পাশে। যে মূর্তিটা মুন্ডুহীন তার মাথাটা আশপাশে কোথাও স্বাগতর চোখে পড়ল না। সে ভাবল, ‘তবে কি ওই মুন্ডুভাঙা মূর্তির মাথা দিয়েই আততায়ী হত্যা করেছে ফঙকে?’
স্বাগত তারপর ফেরার পথ ধরল। ফিরতে ফিরতে সে ভাবল, মন্দিরে প্রবেশের এ পথের কথা কি সে জানাবে প্রফেসরকে? এ কথা ভাবার পরই তার মনে হল প্রফেসর রামমূর্তি নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন যে এ পথের হদিশ সে কীভাবে পেল? তার উত্তরে খামের যুবতীর কথা তো জানানো যাবে না তাঁকে? স্বাগত সিদ্ধান্ত নিল, এখনই নয়, প্রয়োজন হলে পরে সে এই গুপ্তপথের কথা বলবে প্রফেসরকে। তবে নারেও যদি এ পথেই মন্দিরে প্রবেশ করে থাকে তবে তার গতিবিধি যে সন্দেহজনক তা বলাই বাহুল্য।
স্বাগত যে পথে এদিকে এসেছিল সে পথেই আবার নালা পেরিয়ে, তারপর মন্দিরের সামনে ফিরে এল। কেউ তাদের ঘরের দরজা খোলেনি। প্রফেসরের ঘরের দরজাও তালা বন্ধ। চত্বরের চারপাশে তাকিয়ে নিয়ে সে নিজের ঘরের ভিতর ঢুকল। মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধান। টুকটুক আসার শব্দ কানে এল। তারপর প্রফেসর চত্বরে উঠে এলেন। তাঁকে দেখেই কোনও খবর আছে কি না জানার জন্য আবার দরজা খুলে স্বাগত বাইরে বেরিয়ে এল। প্রফেসর তাঁকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। স্বাগত তার কাছে যেতেই তিনি জানতে চাইলেন, ‘কেউ এসেছিল?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘নারেঙ খাম এসেছিল, কিন্তু মন্দিরের ভিতর ঢোকেনি, বলল, সে আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, ফেরার পথে খোঁজ নিতে এসেছিল।’
‘কী খোঁজখবর নিল নারেঙ?’ জানতে চাইলেন রামমূর্তি।
—‘সে জিজ্ঞেস করে গেল সব ঠিক আছে কি না? আর জিজ্ঞেস করছিল ফঙের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট জানা গেছে কি না? পুলিসের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়েছে কি না? আমি ‘না’ বলে দিয়েছি।’—এ কথা বলে স্বাগত জানতে চাইল ‘সিয়েমরিপে আপনি কোনও খবর পেলেন?”
রামমূর্তি একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘অধিকর্তা কিমের অফিসে গিয়েছিলাম আমি। তিনি বললেন কমিশনার বাকুমের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। পোস্টমর্টেম নাকি বলছে যে ভারী কোনও কিছুর আঘাতেই ফঙের মাথার খুলি ভেঙে মৃত্যু হয়েছে। হয়তো বা ওই অপ্সরার মুন্ডুটা দিয়েই আঘাত করা হয়েছিল তাকে। মুন্ডুর ফরেনসিক পরীক্ষা না করলে সেটা স্পষ্ট হবে না। ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পুলিস ওটা রাজধানী নমপেনে পাঠাবে। সেই রিপোর্ট পেতে কিছুটা দেরি হবে।’
এ কথা বলার পর রামমূর্তি বললেন, ‘তবে কিম জানালেন, মন্দিরে কাজ করতে আমাদের সমস্যা নেই। কাল থেকেই কাজ শুরু করব আমরা। মূল মন্দিরের ভিতরের অংশ জরিপের কাজ। আমি যাই। রোদে ঘুরে ক্লান্ত লাগছে।’- এ কথা বলে তিনি তাঁর ঘরের দিকে এগলেন। স্বাগত একটা জিনিস খেয়াল করল, তিনি কেনাকাটা করতে সিয়েমরিপ যাবেন বললেও ফেরার সময় সঙ্গে কোনও ব্যাগপত্তর নেই। তবে কি তিনি অন্য কোনও কারণে সিয়েমরিপ গিয়েছিলেন? —ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরের দিকে এগল স্বাগত।
