তেজকাৎলিপোকার পিরামিড – ২
২
গলির মধ্যে একটা ছোট্ট হোটেলে ঘরভাড়া নিয়েছি আমরা, নাম—’মনতেজুমা’। জুয়ান বলেছেন ‘মনতেজুমা’ নাকি এক অ্যাজটেক সম্রাটের নাম। এ নামের অর্থ বড়ো অদ্ভুত ‘যে দেবতা ভ্রূকুটি করেন’। যাইহোক মনতেজুমাতে নিজেদের ঘরে ফিরে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের খাবার চলে এল। ‘সালভাতোর কোয়েসাদিল্লা।’—চিজে মোড়া রুটি, ‘আগুয়ামিল’–হনি ওয়াটার আর চিকেন রোস্ট। খিদের কারণে বেশ তৃপ্তি সহকারে সেগুলোর সদ্ব্যবহার করলাম আমরা।
খাবার পর জুয়ান খাটে শুয়ে পড়ে বললেন, “দাঁড়াও, বাইরে যাবার আগে মিনিট দশেক গড়িয়ে নিই। বাইরে বেরোবার পর একেবারে সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরব।’ এই বলে তিনি সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে লাগলেন, আর আমি একটা চেয়ারে বসে মন দিলাম টুরিস্ট গাইডবুকে।
একটু পরে প্রফেসর বললেন, “কাগজের মোড়কটার মধ্যে কী থাকতে পারে বলো তো?”
মোড়কটা খাটের ওপরই রাখা আছে। আমি বইয়ের পাতায় চোখ রেখে বললাম, “কোনো গৃহস্থালির মামুলি জিনিস বা ওই জাতীয় কোনো কিছু হবে।”
বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই এরপর মৃদু খসখস শব্দ শুনে আমি বুঝতে পারলাম জুয়ান সম্ভবত মোড়কটা নিয়ে দেখছেন। কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা, তারপরই বেশ জোরে জুয়ানের গলায় একটা বিস্ময়সূচক শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি জুয়ান খাটের ওপর উঠে বসে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছেন তাঁর হাতে ধরা একটা পাথরের ছুরির দিকে। মোড়কের মধ্যেই ছিল জিনিসটা।
আমি আগ্রহী হয়ে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই প্রফেসর বিস্মিত হয়ে বললেন, “এই দুর্মূল্য জিনিস ছেলেটা কোথায় পেল। এটা কী তুমি জান?’ তাঁর হাত থেকে ছুরিটা হাতে নিয়ে দেখলাম আমি। এক ফুট মতো লম্বা তীক্ষ্ণ একটা পাথরের ছুরি। ফলার দু-পাশে সাপের ছবি খোদাই করা আছে। তবে জিনিসটা যে প্রাচীন তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আমি ছুরিটা ভালো করে দেখার পর জুয়ানের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়লাম। তিনি ছুরিটা হাতে নিয়ে বিস্মিত স্বরে বললেন, “এটা দুর্মূল্য অ্যান্টিক—ফ্লিন্ট পাথরের ছুরি। হুবহু এরকম একটা ছুরি আমি স্পেনের ন্যাশনাল মিউজিয়ামে দেখেছি। তুমি হয়তো জান যে অ্যাজটেকদের সময় দেবতার উদ্দেশে নরবলি দেওয়া স্বাভাবিক ও আবশ্যিক ব্যাপার ছিল। প্রতি বছর কয়েক লক্ষ লোককে বলি দেওয়া হত। পিরামিড মন্দিরগুলো সব সময় বলির রক্তে পিচ্ছিল থাকত। এই ফ্লিন্ট পাথরের ছুরি দিয়ে পিরামিডের মাথায় দাঁড়িয়ে নীচে দাঁড়ানো হাজার জনতার সামনে বলি দেওয়া হত। হতভাগ্য বন্দিকে বেদিতে প্রথমে শুইয়ে এই ছুরি দিয়ে তার পেট চিরে অ্যাজটেক পুরোহিত তার মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ছিঁড়ে আনতেন তখনও কম্পমান হৃৎপিণ্ড। সেই হৃৎপিণ্ড পুড়িয়ে নিবেদন করা হত বিগ্রহ সামনে, আর মৃতদেহটাকে ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলা হত নীচে অপেক্ষারত জনতার উদ্দেশে। মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত সেই দেহ। বলির পবিত্র মাংস ভক্ষণের জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে যেত অ্যাজটেকদের মধ্যে। এ ছুরির গায়েও কত মানুষের অদৃশ্য রক্ত লেগে আছে কে জানে! এছাড়া এ ছুরি দিয়ে বলিপ্রদত্ত মেয়েদের চামড়া ছাড়িয়ে সে চামড়া গায়ে পরত অ্যাজটেক পুরোহিতরা। এরকম অনেক বীভৎস কাণ্ড করা হত এই ছুরি দিয়ে!”
জুয়ানের কথা শুনে আমি শিহরিত হয়ে ছুরিটার দিকে তাকিয়ে বললাম, “এসব ঘটনা কি সত্যিই? নাকি গল্পকথা?”
জুয়ান চটপট ছুরিটা কাগজে মুড়তে মুড়তে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “না, গল্পকথা নয়, ঐতিহাসিক সত্যি। চলো যেতে যেতে বলছি। এটা ফিরিয়ে দেওয়া দরকার। জিনিসটা হয়তো অন্য কারওর। কোনোভাবে বাচ্চাটার হাতে এসে পড়েছে।”
হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে চত্বরের দিকে এগোতে এগোতে তিনি বললেন, “অ্যাজটেকদের এই জঘন্যতম ও ঘৃণ্য ব্যাপারটা একদম সত্যি ছিল। মেক্সিকো বিজয়ী কর্তেজ ১৫২০ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের সম্রাটদের উদ্দেশে পাঠানো প্রথম পত্রেই এ বিষয়ে তাঁকে অবগত করেছিলেন। এরপর তাঁর প্রতি চিঠিতে নরবলির ঘটনা স্থান পেয়েছে। তার অভিযানের সঙ্গী ঐতিহাসিক বার্নাল দিয়াজ ইনকাটান অঞ্চলে প্রথম অভিযান থেকে তৃতীয় অভিযানে তেনোকতিতলান অর্থাৎ মেক্সিকো নগরী পৌঁছনোর পথে প্রত্যেক ছোট-বড় গ্রাম-শহর-নগরে অসংখ্য নরমুণ্ড ও সদ্য বলি দেওয়া দেহ দেখতে পেয়েছিলেন। ঐতিহাসিক দুরান ও সাহাস্তনের মতে ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দে যখন বিখ্যাত তেনোকতিতলান পিরামিড নির্মাণ করা হয় তখন চার দিনে আশি হাজার নরবলি দেওয়া হয়। ‘The Enigma of Aztec Sacrifice’ নামের বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা মাইকেল হার্নারের মতে, পঞ্চদশ শতাব্দীতে প্রতি বছর অ্যাজটেকরা আড়াই লাখ নরবলি দিত। প্রতি পরিবার থেকে এজন্য একজন সদস্যকে নিয়ে যাওয়া হত। এমনকী এক অ্যাজটেক সম্রাট নিজের মেয়েকেও বলি দিয়েছিলেন। এমনই ছিল ধর্মীয় কুসংস্কার ও দেবতার প্রতি অ্যাজটেকদের ভয়। তারা মনে করত যে, দেবদেবীরা মানবের প্রাণসঞ্চার করেছেন, অতএব, তাদের রক্ততৃষ্ণা মেটাতে না পারলে ফসল ফলবে না, ধ্বংস হবে মানব জাতি….”
প্রফেসরের কথা শুনতে শুনতে পৌঁছে গেলাম পিরামিড চত্বরে। বেলা পড়তে শুরু করেছে। লোকজন কমছে। চত্বরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা টুরিস্ট বাসগুলো একে একে পাড়ি জমাচ্ছে অন্যত্র। আমরা খুঁজতে শুরু করলাম ছেলেটাকে। পিরামিড ও তার আশেপাশে অনেকক্ষণ ধরে খোঁজার পরও যখন তাকে পাওয়া গেল না তখন জুয়ান বললেন, “আমরা বরং সেই বেঞ্চটাতে গিয়ে বসি। ছেলেটা এখানে এলে ওখানে নিশ্চয়ই খুঁজবে আমাদের।” আমরা এগোলাম সেদিকে। অনেকক্ষণ ধরে আমরা বসে আছি পাথরের বেঞ্চে। দিনান্তের সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে প্রাচীন পিরামিডের মাথায়। অনেক দূর দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা খণ্ডহর স্মারকগুলোর গায়ে। পিরামিডের ছায়া এসে স্পর্শ করেছে আমাদের পা। পিরামিডের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এমন কত সূর্যাস্ত-সূর্যোদয় প্রত্যক্ষ করেছে এই পিরামিড। দেখেছে কত সাম্রাজ্যের ভাঙাগড়া। দেখেছে পরাক্রান্ত অ্যাজটেকদের সম্রাটদের, আবার দেখেছে স্পেনীয়ার্ডদের ক্ষুরধার তরবারির নীচে ধুলোতে গড়াগড়ি যাচ্ছে মর্ত্যের ভগবান অ্যাজটেক সম্রাটের কাটা মুণ্ডু। কত জন্ম, কত মৃত্যু। মহাকালের প্রহরী এই পিরামিডের তুলনায় আমাদের মানবজীবন সত্যিই কত ক্ষুদ্র, কত অসহায়…।
“ছেলেটা কি আর আসবে না? এটা নিয়ে কী করা যায় বলো তো? এই জায়গা দেখা তো আমাদের শেষ। কাল তো অন্য কোনো দিকে বেরিয়ে পড়ব আমরা।”
প্রফেসরের কথায় চিন্তাজাল ছিন্ন হল আমার। আমি বললাম, “পুলিশ বা কোনো মিউজিয়ামে এটা জমা দিয়ে দিলে হয় না? তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তা হয়। তবে তা হলে বাচ্চাটার ভুলে এই অমূল্য জিনিসটা প্রকৃত মালিকের হাতছাড়া হয়ে যাবে। সে আর এটা ফেরত পাবে না।”
তিনি এরপর আরও কী বলতে গিয়ে সামনে তাকিয়ে হঠাৎ চুপ করে গেলেন। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি ইউরোপীয় পোশাক পড়া দীর্ঘদেহী এক ভদ্রলোক লম্বা লম্বা পা ফেলে আমাদের একদম কাছে এগিয়ে আসছেন। তিনি কাছে এসে দাঁড়াতেই তার দিকে তাকাতে বুঝতে পারলাম মেসো-আমেরিকান রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে তার ধমনীতে। টিকালো নাক, লম্বা কানের গঠন, বেশ একটা ধারালো ভাব আছে চোখেমুখে। শক্ত গড়ন, বয়স মনে হয় পঞ্চাশ হবে। তবে যে জিনিসটা আমার তার চেহারাতে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করল, তা হল তার কালো পোশাকের বাঁ হাতের হাতাটা। ভদ্রলোকের বাঁ হাতটা বোধহয় কবজির কাছ থেকে নেই।
ভদ্রলোক আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে স্মিত হেসে বললেন, “আপনারা তো টুরিস্ট। অনেকক্ষণ ধরে বসে আছেন দেখছি। কারওর জন্য প্রতীক্ষা করছেন? আমি কি আপনাদের কোনো সাহায্য করতে পারি?”
জুয়ানের কোটের ভিতরে মোড়কটা রাখা। আসল ব্যাপারটা চেপে গিয়ে তিনি বললেন, “আমাদের পিরামিড দেখা হয়ে গেছে। চত্বরের ওপাশে কাছেই আমাদের হোটেল। তাই এখানে বসে গল্প করছি। তা আপনার পরিচয়টা?”
আগন্তুক তাঁর বুকপকেট থেকে একটা আইকার্ড বের করে জুয়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আমার নাম কমোলোল। স্থানীয় মনতেজুমা কলেজের ইতিহাস বিভাগে আমন্ত্রিত অধ্যাপক রূপে প্রাচীন অ্যাজটেক ধর্মচেতনা বিষয়ে পাঠদান করি। তা ছাড়া প্রতিবন্ধীদের নিয়ে আমার একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আছে। এখানে বহু দেশ থেকে পর্যটক আসে তো, তাদের কোনো অসুবিধা হলে বিনা পারিশ্রমিকে আমরা তাদের সাহায্য করি।”
জুয়ান তাঁর আইকার্ডটা দেখে আর তাঁর পরিচয় জেনে উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন করে বললেন, “আপনি ইতিহাস চর্চা করেন জেনে ভালো লাগল। আমিও ওই কাজ করি।” আমিও করমর্দন করলাম আগন্তুকের সঙ্গে।
মিস্টার কমোলোল এবার বললেন, ‘আপনাদের পরিচয়টা? কোথা থেকে আসছেন?” বেশ বিনম্রস্বরে কথাগুলো বললেন ভদ্রলোক।
জুয়ান জবাব দিলেন, “আমি প্রফেসর জুয়ান-স্পেনের গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক। আর আমার সঙ্গী শেন হল ইন্ডিয়ান। ও ইকলোজি নিয়ে কাজ করে। আমরা মেক্সিকো সিটিতে ইউনেস্কোর একটা প্রোগ্রাম অ্যাটেন্ড করতে এসেছিলাম, তারপর দুজনে বেড়াতে বেরিয়ে পড়েছি। ঝাঁ চকচকে মেক্সিকো সিটিতে আমাদের আগ্রহ নেই। প্রাচীন দ্রষ্টব্যগুলো দেখতে চাই। পরিচিত হতে চাই স্থানীয় লোকসংস্কৃতির সঙ্গে।”
“এখন পর্যন্ত কী কী দেখলেন?” প্রশ্ন করলেন ভদ্রলোক।
প্রফেসর বললেন, “খুব বেশি কিছু নয়। কাল তেনোকতিতলান পিরামিড দেখে মেক্সিকো সিটি থেকে আজই তিওতিহুকানে এসে পৌঁছেছি। আপনি নিশ্চয়ই এ তল্লাটের অনেক কিছু জানেন। এরপর কোথায় যাওয়া যায় বলুন তো? কয়েকটা দিন হাতে সময় আছে আমাদের।” কমোলোল বললেন, “একটা চালু প্রবাদ আছে, আপনারা হয়তো জানেন, মেক্সিকো ভূমিতে জনসংখ্যার চেয়ে অ্যাজটেক মন্দিরের সংখ্যা বেশি। তবে একটা জায়গার কথা বলতে পারি আপনাদের। এখান থেকে চারশো কিলোমিটার দূরে তেজকাৎলিপোকার পিরামিড আছে। ও জায়গাতে যারা বাস করে, খাঁটি অ্যাজটেক রক্ত তাদের দেহে। জীবনযাত্রাও প্রাচীন। এই মন্দিরের চত্বরে যারা সাজপোশাক পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের মতো মেকি তারা নয়। ও জায়গা ঘুরে আসতে পারলে আপনাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হতে পারে।”
তেজকাৎলিপোকার কথা শুনে একটু চমকে উঠলাম আমি। মনে হয় জুয়ানও চমকালেন। বাচ্চা ছেলেটা বলেছিল ওইখানেই ওর বাড়ি। জুয়ান শুনে উৎসাহিত হয়ে বললেন, “জায়গাতে কীভাবে যেতে হয় বলুন তো?”
ভদ্রলোক বললেন, “ওটা মরুভূমি অঞ্চল। সাধারণত টুরিস্ট গাড়ি বা অন্য কোনো গাড়ি ওদিকে যায় না। তবে আপনারা আগ্রহী হলে একটা ব্যবস্থা করতে পারি।” এরপর একটু ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, “আমি আমার সোসাইটির সদস্যদের নিয়ে কাল একটা গাড়িতে রওনা দেব। পরশু একটা ধর্মীয় উৎসবে যোগ দিতে। তার পরের দিন আবার এখানে ফিরে আসব। আপনার চাইলে দুজনের জায়গা হয়ে যাবে গাড়িতে। অবশ্য আপনারা যদি আমার মতো একজন অপরিচিত প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে যেতে রাজি হন।”
এই বলে তিনি নম্রভাবে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন আমাদের দিকে।
জুয়ান একটু লজ্জিতভাবে বললেন, “না, না, এভাবে বলছেন কেন? এ তো একটা বিরাট সুযোগ। তবে একটু ভাবতে চাই আমরা। আমরা মনতেজুমাতে উঠেছি। আপনার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করা যায় বলুন তো?”
কমোলোল বললেন, “কাল ভোরেই রওনা দেব আমরা। আমি না হয় রাত ন-টা নাগাদ আপনাদের হোটেলে গিয়ে সিদ্ধান্ত জেনে আসব। আগ্রহী পর্যটক দেখলে আমার ভালো লাগে তাই প্রস্তাবটা দিলাম। ঠকবেন না আপনারা। টোলটেক সভ্যতারও নিদর্শন আছে সেখানে, আর আছে পাথরে খোদিত প্রাচীনতম এক অ্যাজটেক ক্যালেন্ডার ও সূর্য ঘড়ি। ওখানকার জীবনযাত্রা ওই ক্যালেন্ডার মেনে চলে।”
এরপর ভদ্রলোকের কথামতোই ঠিক হল যে রাতে আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেব। আমাদের সঙ্গে করমর্দন করে বিদায় নিলেন ভদ্রলোক চত্বরের মধ্যে দিয়ে তিনি বড়রাস্তার দিকে এগোলেন। চত্বর প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। আলো জ্বলে উঠেছে রাস্তায়।
তিনি চলে যাবার পর জুয়ান বললেন, ‘ওর প্রস্তাবটা লোভনীয়। তবে মুশকিলটা তো হল এই ছুরিটা নিয়ে। কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। চলো আপাতত হোটেলে ফেরা যাক।” এই বলে তিনি ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন।
মাত্র কয়েক পা এগিয়েছি আমরা। এরপর হঠাৎই আমাদের চমকে দিয়ে একটা থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সেই বাচ্চাটা। প্রফেসর তাকে দেখে উল্লসিত হয়ে বললেন, “আমাদের কাছে জিনিসটা রেখে কোথায় গেছিলে তুমি? আমরা তোমাকে কত খুঁজেছি জান?”
ছেলেটা তার কথা শুনে শুধু পেসোগুলো তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “ওটা আমাকে ফেরত দাও।”
জুয়ান মোড়কটা কোটের ভিতর থেকে বার করলেন ঠিকই, কিন্তু সেটা ছেলেটার হাতে না দিয়ে প্রশ্ন করলেন, “এটা তুমি কোথায় পেলে? তোমার সঙ্গে আর কে আছে?”
“ওটা তেজকাৎলিপোকা মন্দিরের জিনিস। বাচ্চাটা ভুল করে ওটা দিয়ে গেছিল। ফেরত দেবার জন্য ধন্যবাদ। ও আমার সঙ্গেই এসেছে।” জুয়ানের প্রশ্নের উত্তরে কণ্ঠস্বরটা ভেসে এল আর একটা থামের আড়াল থেকে।
তাকিয়ে দেখি আধো অন্ধকারের মধ্যে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আর একটা মূর্তি। লোকটার পরনে স্থানীয় পোশাক। ঘাসের টুপিটা এমনভাবে মুখের ওপর নামানো যে তার মুখটা প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। লোকটা কিন্তু কথাগুলো স্প্যানিশে বলল না, বলল স্পষ্ট ইংরেজিতে। তার বাচনভঙ্গিতে মনে হল সে ইউরোপীয়। সম্ভবত বার্ধক্যের সীমানায় উপনীত সে। তবে তার পরনে এ পোশাক কেন তা ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমি এবার তার উদ্দেশে বললাম, “এত দামি জিনিস বাচ্চাটার হাতে দিয়েছেন কেন? যদি ওটা ফেরত না পেতেন?”
সে জবাব দিল, “ভুল হয়েছে। আমরাও খুঁজছিলাম আপনাদের। জিনিসটা যে কী তা যে আপনারা দেখেছেন তা বুঝতে পারছি। অন্য কেউ হলে তো জিনিসটা ফেরত দিতে আসত না। ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন। ওটা এবার ওর হাতে দিন। অনেকটা পথ ফিরতে হবে আমাদের।” এরপর এ প্রসঙ্গে আর কথা বলা যায় না। জুয়ান বাচ্চাটার হাতে মোড়কটা তুলে দিতেই বাচ্চাটা পেসোগুলো ফেরত দিয়ে লোকটার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। জুয়ান এবার সেই লোকটাকে প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা, আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি ইউরোপীয় আপনার পরিচয়টা জানতে পারি?” অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করল, “কিছু মনে করবেন না, যার সঙ্গে একটু আগে আপনারা কথা বলছিলেন সে কি আপনাদের পূর্বপরিচিত? ওর হাতটা আপনারা লক্ষ করেছেন?”
লোকটার কথার মানে বুঝতে না পেরে আমরা তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। লোকটা মনে হয় কী একটা কথা আমাদের উদ্দেশে বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বাচ্চা ছেলেটা তাকে যেন কী বলল। আমাদের উদ্দেশে অস্পষ্ট স্বরে একবার যেন বলল, “ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন।” আর তারপরই চোখের পলক ফেলার আগেই তারা দুজন যেন অদৃশ্য হয়ে গেল সার সার স্তম্ভের আলো আঁধারিতে!
জুয়ান মন্তব্য করলেন, “বড় অদ্ভুত তো লোকটা!” আমি হঠাৎ লক্ষ করলাম চত্বরের ওপাশ থেকে আমাদের দিকে আবার ফিরে আসছেন মিস্টার কমোলোল।
আমাদের কাছে এসে দাঁড়ালেন তিনি। কমোলোল মনে হয় দূর থেকে দেখতে পাননি আমাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা আর সেই লোকটাকে। ফিরে এসে তিনি বললেন, “আমার আইকার্ডটা রয়ে গেছে। ওটা নিতে এলাম।”
জুয়ানের হাতে সত্যি তখনও সেটা ধরা। তাঁকে ফেরত দিতে খেয়াল ছিল না। প্রফেসর তার দিকে কার্ডটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আপনাকে আর কষ্ট করে রাতে হোটেলে যেতে হবে না। ভাবছি আমরা আপনার সঙ্গে যাব কাল। তা আমাদের কী শেয়ার করতে হবে বলুন তো?” জুয়ানের কথার পরিপ্রেক্ষিতে ভদ্রলোক খুশি হয়ে আমাদের নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা তাঁর সঙ্গে কীভাবে যাব সে কথা বলতে লাগলেন।
