Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/27
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

তেজকাৎলিপোকার পিরামিড – ৪

সকালবেলা আমি আর জুয়ান দাঁড়িয়ে ছিলাম তেজকাৎলিপোকার পিরামিড থেকে কিছুটা দূরে বিশাল এক স্তম্ভের গায়ে খোদিত ক্যালেন্ডারের সামনে। গতকাল আমরা এখানে পৌঁছবার কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য ডুবে ছিল বলে নগরী দেখতে আর বেরোনো হয়নি আমাদের, তাই আজ সাতসকালেই বেরিয়েছি। এখানে কোথায় কী দেখার আছে তা মোটামুটি আমাদের বলে দিয়েছেন কমোলোল। তবে তেজকাৎলিপোকার মন্দিরে কমোলোল-র সঙ্গে রাতে ছাড়া প্রবেশ করা যাবে না। আমি আর প্রফেসর জুয়ান গতকাল রাত কাটিয়েছি একটা ছোট পিরামিড সংলগ্ন প্রাচীন পাথুরে কক্ষে। মিস্টার কমোলোৎল সেই জায়গায় ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তিনি আর তাঁর সঙ্গীরা অন্যত্র কোথাও ছিলেন।

এ প্রাচীন নগরী সত্যি বড় অদ্ভুত। আধুনিক সভ্যতার কোনো চিহ্ন এখানে এসে আমাদের চোখে পড়েনি। যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই শুধু প্রাচীন পিরামিড মন্দির, স্তম্ভ, মিনার আর প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ আর তার গায়ে খোদিত আছে অ্যাজটেক শিল্পকলার অদ্ভুত সব নিদর্শন। শত শত বছরের রোদ বৃষ্টি-ঝড়কে উপেক্ষা করে আজও তারা টিকে আছে। এখানকার মানুষজনের পোশাকও প্রাচীন অ্যাজটেকদের প্রথা অনুযায়ী। মাথায় তাদের দীর্ঘ পালকের রংবেরঙের সাজ, পালক বা চামড়ার পোশাক-পাদুকা, কানে, গলায় বাহুতে রঙিন পাথরের গহনা, পুরুষদের কারো কারো আবার নাক ফুটো করে তাতে নলাকৃতি কাঠের টুকরো গোঁজা, মুখে, বাহুতে অদ্ভুত সব উলকি। নগরীর স্থাপত্য, পরিবেশ, লোকজনের পোশাক এসব মিলিয়ে সময় যেন এখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। কাল এখানে আসার পরই লক্ষ করেছি এই প্রাচীন অ্যাজেটেক গোষ্ঠী বেশ সম্মান করে কমোলোলকে। কাল আমরা এখানে আসার পর একদল মানুষ জমা হয়েছিল আমাদের ঘিরে। তারা প্রত্যেকেই মাথা ঝোঁকাচ্ছিল কমোলোল-র প্রতি। আর আমাদের অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখছিল। সম্ভবত সভ্য জগতের আধুনিক মানুষ সচরাচর এখানে আসে না। তেমন কোনো লোক আমাদের চোখে পড়েনি। টুরিস্ট তো নয়ই।

আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম তার আশেপাশে কোনো লোকজন নেই। সকালের সূর্যের আলো ছড়িয়ে আছে চারপাশে অ্যাজটেক যোদ্ধার আদলে খোচিত পাথুরে স্তম্ভগুলোর গায়ে আর বিশালাকৃতি ক্যালেন্ডারের ওপর। দু-মিটার ব্যাসের গোলাকৃতি ক্যালেন্ডারের গায়ে নানা ধরনের অলংকার আর চিহ্ন খোদিত আছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে তার পাঠোদ্ধার করা কঠিন। প্রফেসর জুয়ান উৎসাহ নিয়ে বেশ অনেকক্ষণ ধরে সেটা খুঁটিয়ে দেখার পর বললেন, “সম্ভবত এ ক্যালেন্ডার পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্যালেন্ডারের একটি। যদিও আমার পক্ষে এর সব কিছু বলা সম্ভব নয়, তবু এ ব্যাপারে তোমাকে একটা ধারণা দিই। অ্যাজটেকদের ৩৬০ দিনের বছরের নাম ছিল ভোনালপোহুয়াল্লি। ২০ দিনে ছিল মাস, ১৮ মাসে ছিল বছর। প্রথম মাস হল অ্যালকাকুয়ালতো, ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ই মার্চ। আর শেষ মাস হল ইজকাল্লি, ২০ জানুয়ারি থেকে ৮ই ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ৩৬৫ দিনে যে সৌর বৎসর তাদের তা জানা ছিল। তাই সৌর বৎসরের হিসাব ঠিক রাখার জন্য বছরের শেষ পাঁচটা দিনকে তারা বলত শূন্য দিবস বা মোনতেমি। প্রত্যেক মাসেই অ্যাজটেকরা ভিন্ন ভিন্ন দেবদেবীর উপাসনা করত। কিন্তু শূন্য দিবস’ অর্থাৎ ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি ছিল ১৮টি ধর্মমাসের বাইরে। ওই পাঁচ দিন ধর্মাচার নিষিদ্ধ ছিল। ওই ক্যালেন্ডারে বিভিন্ন ধর্মমাস অনুযায়ী কর্তব্য সম্পাদনের নির্দেশ দেওয়া আছে।”

আমি তার কথা শুনে বললাম, “আজই তো ৮ই ফেব্রুয়ারি, এ ক্যালেন্ডারের শেষ দিন!”

প্রফেসর বললেন, “হ্যাঁ, তাই। কাল গাড়িতে এখানে আসার সময় কমোলোল এ কথাটা বলেছিলেন। উৎসবটা বছরের শেষ দিনই হয়।”

“উনি আপনাদের আর কিছু বলেননি?” জুয়ানের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল আমাদের খুব কাছ থেকেই। আর তারপরই কাছেই একটা দেওয়ালের আড়াল থেকে যারা বেরিয়ে এল তাদের দেখে চমকেই উঠলাম দুজনেই। তিওতিহুকান চত্বরের সেই বাচ্চা ছেলেটা আর সেই বৃদ্ধ। সেদিনের মতো ঘাসের টুপিটা আজও ঢেকে রেখেছে বৃদ্ধর মুখ। তাদের যে এভাবে হঠাৎ আবার এখানে এসে দেখতে পাব তা ধারণা ছিল না আমাদের। আমাদের মন থেকে তারা প্রায় মুছেই গেছিল। অবাক হয়ে আমরা তাকিয়ে রইলাম তাদের দিকে। প্রশ্নটা যে বৃদ্ধই করেছেন তা বুঝতে অসুবিধা হল না আমাদের।

প্রফেসর জুয়ান বৃদ্ধের উদ্দেশে বললেন, “আপনারা এখানে কোথায় থাকেন?” বৃদ্ধ সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, “আপনারা তো আজ রাতে তেজকাৎলিপোকা পিরামিড মন্দিরে যাচ্ছেন? এই কালো কাপড়ের ফেট্টিটা সঙ্গে নেবেন।” এই বলে তিনি পোশাকের ভিতর থেকে দুটো কালো কাপড়ের টুকরো বের করে নামিয়ে রাখলেন পাথরের ওপর

জুয়ান তার কথা শুনে বললেন, “আপনি কে? আপনার কথা তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কী বলতে চাইছেন আপনি?”

তিনি জবাব দিলেন, “ওসব বলার সময় এখন নেই। ইজকাল্লির শেষ দিন আজ। আপনাদের পক্ষে দিনটা শুভ নয়। আগাম বিপদ এড়াতে মন্দিরে যাওয়া পর্যন্ত কমোলোল-র কথা মেনে চলবেন। আর এই সাক্ষাতের ঘটনা ওর কাছে গোপন রাখবেন। যথাসময়ে আবার দেখা হবে।” এই বলে আমাদের আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বাচ্চাটাকে নিয়ে তিনি দ্রুত হাঁটতে লাগলেন অন্য দিকে।

বেশ কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর জুয়ান বললেন, “কী বলে গেল লোকটা? ওর কথা যদি সত্যি হয় তাহলে কোনো বিপদ আসছে আমাদের। কিন্তু কী বিপদ? নাকি, লোকটা পাগল বা আমাদের বিদেশি দেখে মজা করার জন্য ভয় দেখিয়ে গেল, কে ওরা?” আমি বললাম, “ব্যাপারটা আমারও মাথায় ঢুকছে না। কালো কাপড়ই বা ওরা রেখে গেল কেন? তবে যাই হোক আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।” এই বলে আমি গিয়ে কালো কাপড় দুটো কুড়িয়ে নিলাম। হাতে নেবার পর বুঝতে পারলাম দুটো কাপড়ের মধ্যেই পাতলা কাঠ জাতীয় কোনো কিছুর আস্তরণ আছে। জিনিসগুলো অনেকটা প্যাডের মতো। জুয়ান বেশ কিছুক্ষণ ধরে সেগুলো দেখার পরও সেগুলো কী কাজে লাগতে পারে বুঝতে পারলেন না। সেগুলো পকেটে রেখে তিনি বললেন, “চলো, এবার অন্য দিকে যাওয়া যাক। আর যতক্ষণ না এ ব্যাপারটা স্পষ্ট হচ্ছে, ততক্ষণ এটা মিস্টার কমোলোল-র থেকে গোপন রাখাই প্রয়োজন। তবে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে।”

আমরা এরপর আবার ঘুরে বেড়াতে শুরু করলাম আশেপাশের ছোট ছোট পিরামিডগুলোতে। তবে কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারছিলাম না বৃদ্ধর কথাগুলো। প্রফেসর জুয়ানের মুখও চিন্তাক্লিষ্ট মনে হল। ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একসময় তিনি তো বলেই ফেললেন, “ওই লোকটাকে দিনের আলোতে দেখে আর ওর কথা শুনে আমার ওকে ইউরোপীয়ান বলেই মনে হল। এই পাণ্ডববর্জিত, অর্ধসভ্য মানুষদের প্রাচীন নগরীতে ও কি করছে?” জুয়ানের কথা শুনে বুঝতে পারলাম আমার মতো ওঁর মাথাতেও একই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।