তেজকাৎলিপোকার পিরামিড – ৬
৬
পাথুরে ঘরে ফিরে আসার পর সারাটা দিন আমরা ঘরের মধ্যেই কাটিয়ে দিলাম। কমোলোল-র দেখা সারাদিনের মধ্যে আর পেলাম না আমরা। নিজেদের মধ্যে কিছু কথাবার্তা হলেও কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল ভেতরে ভেতরে। বাইরে সন্ধ্যা নামার পর যেন সেটা আরও বাড়তে লাগল। আমার যেন মনে হতে লাগল বাইরে আমাদের অজান্তে যেন কীসের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে! কিন্তু আমার মনে কেন অস্বস্তি হচ্ছে তার সঠিক ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। প্রফেসর জুয়ানকে আপাতদৃষ্টিতে শান্ত মনে হলেও তার ভেতরেও যে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে তা বুঝতে পারলাম। রাত আটটা নাগাদ খাবার খেয়ে নিয়ে মিস্টার কমোলোল-র প্রতীক্ষা করতে লাগলাম আমরা। সময় কাটাবার জন্য প্রফেসর অ্যাজটেকে সভ্যতার নানা ইতিহাস আমাকে বলতে লাগলেন।
তখন প্রায় মাঝরাতই হবে। মিস্টার কমোলোল এসে হাজির হলেন আমাদের ঘরে। তাঁর সঙ্গে মশালধারী তিনজন লোক। লোকগুলো আর কমোলোল-র পরনে পুরোদস্তুর অ্যাজটেক সাজ। কমোলোল-র দেহ সাদা পালকের পোশাকে আবৃত। মাথায় বিশাল পালকের সাজ, গলায় রংবেরঙের পাথরের মালা। কোমরবন্ধ আর ডানহাতের বাজুবন্ধ মশালের আলোতে ঝকমক করছে। সেগুলো যে খাঁটি সোনার তা বুঝতে অসুবিধা হল না। মশালের আলোতে তার হাতে আঁকা উলকিটাও আমার নজর এড়াল না। দ্বিমুখী সর্প আমাদের বিস্মিতভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কমোলোল হেসে বললেন, “কী দেখছেন? আজকের দিনে আমাকে এ পোশাকই পরতে হয়।”
এরপর তিনি বললেন, “সারাদিন কাজের চাপে আর আসতে পারিনি। নিন এবার চলুন। অনুষ্ঠান ওদিকে শুরু হতে চলেছে। আপনারা তো অতিথি। তাই আপনাদের জন্য প্রতীক্ষা করছে সবাই। এক দুর্লভ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে চলেছেন আপনারা।”
প্রফেসর জুয়ান আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “শেন, চলো তাহলে যাওয়া যাক।” ঘর ছেড়ে বেরিয়ে কমোলোল আর তার সঙ্গীদের সঙ্গে পিরামিড চত্বরের দিকে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। দূর থেকেই দেখতে পেলাম অসংখ্য মশালের আলো জ্বলছে চত্বরে। আমরা সেখানে পৌঁছতেই দেখলাম অসংখ্য মানুষ সমবেত হয়েছে সেখানে। অন্তত পাঁচশো মানুষ হবে। লাল মানুষ সব। অদ্ভুত তাদের সাজপোশাক। ঢেউ খেলানো সুরে উচ্চগ্রামে তারা কী যেন গাইছে! দুর্বোধ্য তাদের ভাষা! এত লোক সমাগম দেখে জুয়ান জানতে চাইলেন, “এত লোক কি এখানেই থাকে?”
কমোলোল বললেন, “স্থানীয় মানুষ কিছু আছে ঠিকই। কিন্তু অধিকাংশই দূর দূর থেকে সমবেত হয়েছে এই উৎসব উপলক্ষে। তাদের প্রত্যেকের ধমনীতেই খাঁটি অ্যাজটেক রক্ত বহমান। ঠিক যেমন আমার ধমনীতেও।” এই বলে একটা দুর্বোধ্য হাসি হাসলেন তিনি।
আমরা মন্দির চত্বরে উপস্থিত হতেই কোলাহল থেমে গেল। গান থামিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে দু-সারে ভাগ হয়ে পিরামিডের দিকে যাবার জন্য পথ করে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা। পিরামিডের মাথায় বেশ বড় একটা চাঁদ উঠেছে। তার আলো পিরামিডের ওপর পড়ে কেমন যেন একটা অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। পিরামিডের সোপানশ্রেণির স্থানে স্থানে কয়েকটা মশাল গোঁজা থাকলেও একদম মাথায় কোনো আলো চোখে পড়ল না নীচ থেকে। সারিবদ্ধ জনতার মধ্যে দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম পিরামিডের দিকে।
আমরা এসে দাঁড়ালাম পিরামিডের নীচে। আমদের সামনে পিরামিডের গা বেয়ে চওড়া সোপানশ্রেণি উঠে গেছে ওপর দিকে। তিনটে থাক আছে পিরামিডের গায়ে। প্রত্যেক থাকে একটা রেলিং ঘেরা বারান্দা।
সিঁড়িতে ওঠার আগে কমোলোল কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, “আপনারা যেখানে যাচ্ছেন সেটা আমাদের একান্ত পবিত্র স্থান। ওখানে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয় তা আপনাদের জানা নেই। আশা করি পবিত্র মন্দিরে পৌঁছে আমার অনুরোধ আপনারা মেনে চলবেন। বিশ্বাসের অমর্যাদা করবেন না।”
তাঁর কথা শুনে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন প্রফেসর। কমোলোল এরপর সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলেন, আর তার পিছন পিছন আমরা
ক্রমশই আমরা ওপরে উঠে চলেছি। একসময় পিরামিডের প্রথম দুটো ধাপের বারান্দা অতিক্রম করে গেলাম আমরা। আমি একবার নীচের দিকে তাকালাম। সমবেত জনতা যেন অধীর আগ্রহে তাকিয়ে দেখছে আমাদের। এরপর পিরামিডের ওপর থেকে একটা শব্দ যেন কানে আসতে লাগল। ওপরে যত উঠতে লাগলাম শব্দটা তত বাড়তে লাগল। একঘেয়ে সুরে সমবেত মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ সেই শব্দ। শুনতে শুনতে কমেলোল-র পিছন পিছন আমরা অবশেষে পৌঁছে গেলাম পিরামিডের মাথায়। চাঁদের আলোতে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে তেজকাৎলিপোকার মন্দির। থাম পরিবেষ্টিত কালো পাথরের তৈরি মন্দিরের বিশাল দরজাটা বন্ধ। আর সেই দরজার সামনে আলো আঁধারিতে দাঁড়িয়ে একদল আবছা মূর্তি মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছে, আর মাঝে মাঝে নাচের ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাচ্ছে। আমরা সেখানে পৌঁছবার পর আমাদের একটা থামের কাছে দাঁড় করিয়ে রেখে কমোলোল এগিয়ে গেলেন সেই সব ছায়ামূর্তির দিকে। তাদের মন্ত্রোচ্চারণ এবার থেমে গেল। তবে কমোলোলকে ঘিরে ধরে তারা কয়েক মুহূর্ত বাদেই আবার অদ্ভুত ছন্দে নাচতে লাগল, আর এবার গম্ভীর স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ করতে লাগলেন কমোলোল। যারা নাচছে তাদের একজনের হাতে একটা ধুনুচি মতো আছে। নাচের তালে একটা ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে চারপাশের পরিবেশকে আরও যেন ভৌতিক করে তুলেছে। তবে সেই ধোঁয়ার মধ্যে কেমন যেন এক মাদকতাময় গন্ধ আছে যা ক্রমশ অবশ করে দিচ্ছে আমাদের দেহ-মনকে। আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে সম্মোহিত হয়ে যেন দেখতে লাগলাম সেই নৃত্য।
বেশ অনেকক্ষণ ধরে চলার পর একসময় থেমে গেল সেই নৃত্য। কমোলোল আর অন্যরা পিরামিডের কিনারে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে সমবেতভাবে কী যেন বলে উঠল। সেই শব্দ মনে হয় কানে গেল নীচে উপস্থিত জনতার। সমবেত স্বরে তারা হর্ষধ্বনি করে উঠল। এরপর কমোলোল-র এক সঙ্গী একটা পাত্র হাতে নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এসে সেই পাত্র থেকে একটা তরল পদার্থ নিয়ে তার টিকা পরিয়ে দিল আমাদের ললাটে। পাত্রটা যখন আমার সামনে লোকটা আনল তখন একটা তীব্র আঁশটে গন্ধ অনুভব করলাম আমি। সম্ভবত রক্তটিকা পরানো হল আমাদের। এ কাজ সম্পন্ন করে লোকগুলো মন্দিরের দরজার কাছে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর মন্দিরের দরজার পাল্লাটা টেনে একটু ফাঁক করল। একটা শব্দ উঠল তাতে। তা শুনে মনে হল অনেকদিন পর সেটা আবার খোলা হল। পাল্লা খোলার পর লোকগুলো আর কিন্তু সেখানে দাঁড়াল না। কমোলোল আর আমাদের দুজনকে ওপরে রেখে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে লাগল।
