প্রেত লামার মন্দির – ২
২
পাইন বনটা বেশ লম্বা। অন্তত মাইলখানেক হবে। যেটা অতিক্রম করতেই গ্রামটা নজরে পড়ল দীপাঞ্জনদের। গ্রাম বলতে পাহাড়ের ঢালে বেশ কিছুটা তফাতে তফাতে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু ঘর-বাড়ি। দুটো-তিনটে কামরা নিয়ে বাড়িগুলো তৈরি। জায়গাটাতে পৌঁছে, রাস্তায় গাড়ি রেখে সুব্বা ঢাল বেয়ে একটা বাড়িতে গেল। তারপর ফিরে এসে বলল ‘এখানে মেরী-অ্যান বলে এক বৃদ্ধা থাকেন। তিনি মাঝে মাঝে ঘর ভাড়া দেন। ওটাই ও গ্রামের সব থেকে বড় বাড়ি। রাস্তার ডান দিকে ওই একটা বাড়িই আছে।’
আবার গাড়ি নিয়ে এগোল দীপাঞ্জনরা। একটা বাঁক ঘুরতেই তারা দেখতে পেয়ে গেল বাড়িটা। পাহাড়ের ঢালের একটু ওপর দিকে মাথায় ঢালু ছাদঅলা কাঠের বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থেকে তিনজনই এবার নামল। ঢাল বেয়ে বেয়ে উপরে উঠে বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সত্যিই এ বাড়িটা বেশ বড়। মাথার ওপরে ফায়ার প্লেসের চিমনিও আছে। দূর থেকে বাড়িটা দেখে কাঠের মনে হলেও বাড়িটা আসলে কাঠ আর পাথরের তৈরি। তবে দেখেই মনে হয় বাড়িটা বেশ পুরনো। সুব্বা সদর দরজাতে কয়েকবার কড়া নাড়তেই দরজা খুলে গেল। বাইরে বেরিয়ে এলেন এক বৃদ্ধা। হাতে একটা লাঠি। পরনে গাউন। মাথায় একটা টুপিও আছে। তার আড়াল থেকে বেরিয়ে আছে সাদা চুলের গুচ্ছ। দেখেই বোঝা যায় ভদ্রমহিলা ইউরোপীয়ান বংশোদ্ভুত।
লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে তিনি জানতে চাইলেন ‘কি চাই?’
দীপাঞ্জন জবাব দিল, ‘আমরা হোম স্টের জন্য এসেছি। আপনি কি ঘর ভাড়া দেন?’ ভদ্রমহিলা প্রথমে এ প্রশ্নর জবাব না দিয়ে দীপাঞ্জনদের পরিচয় জানতে চাইলেন।’ পরিচয় দিল দীপাঞ্জনরা। তিনি তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ, দিই। বাজার করে আনলে রান্নাও করে দিই। ইচ্ছা হলে থাকতে পারেন। আসুন ঘর দেখবেন।’
বৃদ্ধার সাথে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করল দীপাঞ্জনরা। লাঠি ঠুক ঠুক করতে করতে তিনি দীপাঞ্জনদের একটা ঘরে নিয়ে এলেন। কাঠের মেঝেঅলা বেশ ছিমছাম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘর। দু-জনের শোবার মতো একটা খাটে শাদা বিছানা পাতা আছে। একটা জানলাও আছে ঘরে। বাড়ির পিছনটা দেখা যাচ্ছে সেখানে। পাইন বনের একটা শিরা এসে শেষ হয়েছে বাড়ির পিছনের ঢালের নীচে। বাড়ি থেকে একটা শুড়িপথ ঢাল পেয়ে নীচে নেমে মিশেছে সেই পাইন বনের গায়ে।
ঘরটা বেশ পছন্দ হয়ে গেল দীপাঞ্জনদের। সে জানতে চাইল ‘কত ভাড়া?’
বৃদ্ধা বললেন ‘হাজার টাকা প্রতিদিন। আর তার সাথে রান্নার খরচ আলাদা।’
সঙ্গে ড্রাইভার আছে। দীপাঞ্জন বলল ‘আর একটা ঘর হবে?’
অ্যান বললেন, ‘হ্যাঁ হবে।’
সুব্বা বলল, ‘আমার জন্য ঘরের দরকার নেই। আমি লোলেগাঁও বাজারে ড্রাইভারদের যে ডেরা আছে সেখানে থাকব। ফোন করলেই আধ ঘণ্টার মধ্যে চলে আসব, তাছাড়া, কিছু কিনে আনতে বললে ওখান থেকেই কিনে আনতে পারব।’
সুব্বার কথা শুনে অ্যান বললেন, ‘মুরগি আনলে আনতে পারেন। আমার এখানে রাখার ব্যবস্থা আছে।’
দীপাঞ্জন এরপর সুব্বাকে কিছু টাকা দিয়ে দিল তার খাবার খরচ আর আটা-আলু-সবজি-মুরগি পরদিন সকালে কিনে আনার জন্য। টাকা নিয়ে প্রথমে গাড়িতে গিয়ে দীপাঞ্জনদের ব্যাগপত্র নিয়ে ঘরে পৌঁছে চলে গেল সুব্বা।
ঘরে আর একটা দরজা আছে। অ্যান সেটা খুললেন। এক চিলতে বারান্দা সেখানে। বাড়ির সামনের অংশটা সেখান থেকে দেখা যায়। বৃদ্ধা বললেন, ‘আপনারা এখানে বসুন। আমি চা করে আনছি। আর রাতের খাবারের ব্যবস্থাটা আমি করে দেব। আর হ্যাঁ, রাত আটটায় কিন্তু সদর দরজাতে তালা পড়ে। খোলে সকাল সাতটায়।’
দীপাঞ্জন পকেট থেকে ওয়ালেট বার করে দু-রাতের ভাড়া বাবাদ দু-হাজার টাকা বৃদ্ধার হাতে ধরিয়ে দিল। বৃদ্ধা চলে গেলেন। দীপাঞ্জনরা বারান্দায় বসল। বিকাল হয়ে গেছে। দিন শেষের মায়াবী আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে পাহাড়ের ঢালে। সুন্দর, শান্ত, মায়াবী পরিবেশ চারদিকে। জুয়ান বলল, ‘বাঃ, এমনই একটা জায়গাতে থাকার ইচ্ছা ছিল আমার।’
দীপাঞ্জন বলল, ‘আমারও খুব ভালো লাগছে এ জায়গা।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ট্রেতে করে দু-কাপ চা নিয়ে হাজির হলেন অ্যান। ট্রে থেকে চা তুলে নিয়ে ভদ্রমহিলার সাথে একটু প্রাথমিক পরিচয় সেরে নেবার জন্য দীপাঞ্জন জানতে চাইল, ‘আপনাকে দেখেতো ইওরোপীয়ান বলে মনে হয়। এখানে কত দিন আছেন?’
ভদ্রমহিলা বললেন, ‘পুরোপুরি ইওরোপীয়ান নয়। আসলে অ্যাঙলো ইন্ডিয়ান। আমার ঠাকুর্দা ছিলেন ব্রিটিশ। কালিম্পঙে সিংকোনা গাছের চাষ করতে এসেছিলেন। ডাক্তারি ও জানতেন। তিনিই তখন এ বাড়িটা বানিয়েছিলেন। ঠাকুর্দার মৃত্যুর কিছু আগেই অবশ্য এ বাড়ির পাট চুকে যায়। তিরিশের দশকেই তিনি কলকাতা চলে যান। আমার জন্ম কলকাতার ‘বো ব্যারাকে।’ বাড়িটা কিন্তু পড়েই ছিল। বছর কুড়ি আগে আমরা ঠাকুর্দার ডায়েরি আর কিছু দলিলপত্র থেকে এ বাড়ির অস্তিত্ব জানতে পারি। তারপর এখানে চলে আসি আমি আর আমার স্বামী। আমাদের কোনো সন্তান ছিল না। এ জায়গা আমাদের এত ভালো লেগে গেল যে এখানেই থেকে গেলাম আমরা। আজ অবশ্য আমার স্বামী নেই। বাড়িটাতে একাই থাকি। ঘর ভাড়া দিই, তাতেই চলে যায় কোনোরকমে।’
জুয়ান জানতে চাইলেন, ‘এ জায়গার আশেপাশে দেখার মতো কিছু আছে?”
অ্যান জবাব দিলেন, ‘না, প্রকৃতি ছাড়া দেখার মতো তেমন কিছু নেই।’
এরপর তিনি বললেন, ‘এক সময় এখানে একটা বুদ্ধ মন্দির ছিল। কিন্তু সেটা এখন নেই বললেই চলে।’
দীপাঞ্জন জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় ছিল সেটা?’
বৃদ্ধা জবাব দিলেন ‘বাড়ির পিছনে পাইন বনের মধ্যে। -এরপর লাঠি নিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেলেন।
চা-পান পর্ব মেটার পর জুয়ান বললেন, ‘সূর্য ডুবতে এখনও ঘণ্টাখানেক বাকি আছে। চলো একবার হেঁটে আসা যাক। গাড়ির ঝাঁকুনিতে কোমর ধরে গেছে।’
কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল দীপাঞ্জনরা। বাড়ির সামনের রাস্তার দিকটা মোটামুটি তাদের দেখা। তাই বাড়িটাকে বেড় দিয়ে তারা প্রথমে বাড়িটার পিছন দিকে এসে ঢাল বেয়ে নীচে নামতে শুরু করল। নীচের জমিতে পৌঁছে গেল তারা। একটা পায়ে-চলা পথ এগিয়েছে পাইন বনের দিকে। দীপাঞ্জনরা এগোল সে পথ ধরে। পাইন গাছগুলো যেখানে শুরু হয়েছে সেখানে পৌঁছে একটা জিনিস নজরে পড়ল তাদের। দু-পাশে মাটিতে পড়ে আছে বেশ কটা পাথুরে স্তম্ভ। এক পাশে মাটির ওপরও জেগে আছে তার কিছুটা। তার গায়ে লেখা আছে নানা তিব্বতী হরফ, অলংকরণ! সেগুলো দেখে জুয়ান বললেন, ‘এক সময় এখানে কোনো তোরণ ছিল মনে হয়!’
দীপাঞ্জন বলল, ‘সম্ভবত ল্যান্ড লেডি যে বুদ্ধ মন্দিরের কথা বললেন তার তোরণ। এখানে যখন তোরণটা তখন মন্দিরটা নিশ্চয়ই খুব কাছেই। বনে ঢুকবেন নাকি?”
জুয়ান বললেন, ‘আমার কোনো আপত্তি নেই।’
দীপাঞ্জনরা প্রবেশ করল বনের মধ্যে। কিছুটা এগিয়েই গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরটাকে দেখতে পেল। তারা পৌঁছে গেল জায়গাটাতে। দিন শেষের এক ফালি আলো এসে পড়েছে পাইন বনের ভিতর। আর তার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে নিঃসঙ্গ এক কাঠামো। পাথরের দেওয়াল আর মাথার ওপরে টিনের ছাদটাই, দরজা জানলা কিছু নেই। তবে বেশ বড় কাঠামো। বাইরে থেকে দেখেই মনে হয় বেশ অনেক কটা ঘর আছে ওই গুম্ফা বা মন্দিরের ভিতরে। যে জায়গা দিয়ে মন্দিরে ঢোকার পথ ছিল তার দু-পাশে আজও দাঁড়িয়ে ভয়ঙ্কর দুটো অপদেবতার পাথরের মূর্তি। সম্ভবত তিব্বতী বৌদ্ধদের তন্ত্র চর্চা করা হত এই মন্দিরে। বাইরে থেকে মন্দিরটাকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে জুয়ান বললেন, ‘আমার ধারণা অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল এ মন্দিরে। যে সব জায়গা কাঠের হওয়ার কথা সে সব জায়গাতে কাঠের কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার ওপরের টিনের ছাউনিগুলোও কেমন দুমড়ে মুচড়ে গেছে। অগ্নিকাণ্ড হলে অমন হয়। তাছাড়া বাইরে থেকে ভিতরের দেওয়ালের অংশগুলো যতটুকু চোখে পড়ছে তা সবই কালো কালো।’
দীপাঞ্জন বলল, ‘ল্যান্ড লেডি অ্যানের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে। তিনি নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে বলতে পারবেন।’ জুয়ান বললেন, ‘গুম্ফার ভিতরটা এখন সাপখোপের বাসা বোধ হয়। চলো এবার ফেরা যাক।’
‘হ্যাঁ, চলুন’ বলে পিছু ফিরতে যাচ্ছিল দীপাঞ্জন। ঠিক সেই সময় হঠাৎই জুয়ান ইশারায় কিছু দূরে দীপাঞ্জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন জুয়ান। দীপাঞ্জন সেদিকে তাকিয়ে দেখল পোড়া মন্দিরটার এক পাশে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে একটা লোক। দীপাঞ্জনদের সে খেয়াল করেনি। গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে সে দ্রুত ঢুকে গেল মন্দিরের পিছনের অংশে। জুয়ান বললেন ‘আরে! যে লোকটা আমাদের গাড়িতে উঠেছিল সেই লোকটা না?’
দীপাঞ্জন বলল ‘হ্যাঁ তাইতো মনে হল। লোকটা মনে হয় পালিয়ে এসে এখানে আশ্ৰয় নিল। অথবা এটাই হয়তো ওর আড্ডা। সত্যি কত মানুষকে আজও এই একবিংশ শতাব্দীতে কুসংস্কারের কারণে মরতে হয় বা উপদ্রব সহ্য করতে হয় কে জানে! কাগজ খুললেই মাঝে মাঝে দেখা যায় যে ডাইনি বা ভূত-প্রেত সন্দেহে মানুষকে হেনস্থা করা বা পিটিয়ে মারার ঘটনা।’
জুয়ান বললেন, ‘আলো কমে আসছে। দিনের বেলা হলে একবার বাড়িটার ভিতরে ঢুকে দেখা যেত কিছু আছে কিনা?”
দীপাঞ্জন বলল, ‘আমাদের হাতে তো সময় আছে, তেমন হলে কাল একবার সকালে আসা যেতে পারে।’
সেই জায়গা ছেড়ে এরপর ঘরে ফেরার পথ ধরল দীপাঞ্জনারা।
