প্রেত লামার মন্দির – ৩
৩
আবার সেই বাড়িতে–ফিরে এল দীপাঞ্জনরা। অন্ধকার নামল কিছুক্ষণের মধ্যে। অ্যান ঘরের দরজার সামনে একটা হ্যারিকেন রেখে গেছিল। সেটা নিয়ে ঘরে ঢুকে আলোটা জ্বালিয়ে গল্প করতে বসল দীপাঞ্জন আর জুয়ান। কত জায়গার কত স্মৃতি আছে তাদের স্মৃতিতে। ল্যাটিন আমেরিকার নেটিভদের সেই পিরামিড, রোমের প্রাচীন কলোসিয়াম থেকে শুরু করে আরও নানা জায়গার নানা অদ্ভুত স্মৃতি। আর তার সাথে সাথে কত অদ্ভুত মানুষের সাথে তাদের পরিচয় হয়েছিল। টেলিফোনে দীপাঞ্জন আর প্রফেসর জুয়ানের মাঝে মাঝে কথা হলেও বিস্তৃত ভাবে সামনাসামনি বসে স্মৃতি রোমন্থনের সুযোগ হয় না। ফেলে আসা নানা জায়গা, নানা মানুষ নিয়ে আলোচনায় ডুবে গেল তারা।
রাত আটটা নাগাদ ঘরে ঢুকলেন অ্যান। হাতে একটা ট্রেতে হাতরুটি আর ধোঁয়া ওঠা ডিমের কারি। হাতে লাঠি নেই বলে একটু খুঁড়িয়েই ঘরে ঢুকলেন তিনি। দীপাঞ্জন তাড়াতাড়ি খাট থেকে উঠে তার হাত থেকে ট্রে-টা নিয়ে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর বৃদ্ধার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনি এতটা কষ্ট করলেন কেন? আপনি বললে আমি গিয়ে নিয়ে আসতাম।’
বৃদ্ধা হেসে বললেন, ‘লাঠি ছাড়া আমার হাঁটতে অসুবিধা হয় ঠিকই কিন্তু এত এক ঘর থেকে আর এক ঘরে যাওয়া-আসার ব্যাপার। খুব অসুবিধা হয়নি। খেয়ে নিন আপনারা।’
দীপাঞ্জন বলল, ‘আমাদের দুজনেরই এত তাড়াতাড়ি খাবার অভ্যাস নেই। পরে খাব। আপনি যদি একটু বসেন তবে গল্প করা যেতে পারে। যদি অবশ্য আপনার তাড়া না থাকে।
বৃদ্ধা বললেন ‘না, তাড়া তেমন কিছু নেই’। এ কথা বলে তিনি একটা চেয়ারে বসলেন। দীপাঞ্জন খাটের কাছে গিয়ে জুয়ানের পাশে বসল। তারপর ল্যান্ড লেডির উদ্দেশ্যে বলল ‘পাইন বনের মধ্যে ওই বুদ্ধ মন্দিরটাতে গেছিলাম। দেখে মনে হল ওটা পুড়ে গেছিল। তাই কি?”
জুয়ান-দীপাঞ্জন ওখানে গেছিল শুনে যেন একটু বিস্মিত হলেন বৃদ্ধা। তারপর জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, ওই মন্দিরটাকে আগুন লাগানো হয়েছিল। স্থানীয় গ্রামবাসীরা লাগিয়েছিল।’
কথাটা শুনে জুয়ান বিস্মিত ভাবে প্রশ্ন করলেন ‘আগুন লাগানো হয়েছিল কেন?’
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, মন্দিরটার বদনাম আছে। তারা ওই প্রাচীন বুদ্ধ মন্দির থেকে প্রেতাত্মা দূর করতে আগুন লাগিয়েছিল। আমরা যখন এখানে আসি তার মাস ছয় বাদের ঘটনা।’
দীপাঞ্জন জানতে চাইল, ‘তাদের কেন মনে হয়েছিল ওখানে ভূত-প্রেত থাকে?’
বৃদ্ধা একটু চুপ করে থেকে বললেন ‘আসলে এ ভাবনার উৎস আমার জন্মেরও আগের এক ঘটনা। ঠাকুর্দা তখন এই বাড়িতেই থাকতেন। আমি দাদুর ডায়েরি থেকে যা জেনেছি তাতে ওই মঠে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী থাকতেন। বৌদ্ধদের মধ্যে বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী তন্ত্রসাধনা করেন জানেন নিশ্চয়ই? সম্ভবত সে সব সাধনাই করতেন সেখানে। কারোর সাথে তিনি খুব একটা মেলামেশা করতেন না। নিজের মনেই থাকতেন। প্রায় একশো বছর আগের এ জায়গাকে তখন পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন একটা জায়গাই বলা যায়। পাহাড়ি উপজাতিদের শুধু একটা গ্রাম ছিল এখানে। খড়ের আর পাতার ছাউনি দেওয়া বাড়ি ঘর। সভ্যতার সাথে কোনো যোগাযোগই তাদের ছিল না। হঠাৎই একদিন গ্রামের মোড়লের মেয়ে মারা গেল। না, কোনো দুর্ঘটনায় নয়, এমনি ছটফট করতে করতে মারা গেছিল সে। কে যেন সেই সময় রটিয়ে দিল ওই বৌদ্ধই তুকতাক করে মেরে ফেলেছে তাকে। কথাটা বিশ্বাস করল অন্য গ্রামবাসীরা। তারা হানা দিল মন্দিরে। সন্ন্যাসী তখন জপমালা নিয়ে জপ করছিলেন। গ্রামবাসীরা সন্ন্যাসীকে মন্দিরের বাইরে এনে পিটিয়ে মেরে ফেলল। তাকে যখন পাথর দিয়ে থেঁতলে, লাঠি মেরে মারা হচ্ছিল তখন সে নাকি বলেছিল, ‘তোরা আমাকে মারলি। এই মন্দিরের মধ্যে আমি মরার পরও থাকব। এই মন্দিরে ঢুকলে তোরাও মরবি।’ এই বলে একটু থামলেন বৃদ্ধা। জুয়ান জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন যারা এ গ্রামে থাকে তারা কি সেদিনের সেই লোকগুলোর বংশধর, যারা পিটিয়ে মেরেছিল সেই লামাকে?’
অ্যান জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ’।
তারপর তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, ‘সেই তান্ত্রিককে তো মারা হল ঠিকই। কিন্তু তারপর থেকে নাকি মাঝে মাঝেই দেখা যেত এই সন্ন্যাসীকে। মন্দিরের বারান্দায় একটা কাঠের থাম ধরে দাঁড়িয়ে। অন্য হাতে জপমালা। জ্বলন্ত দৃষ্টি। যেন তিনি কাউকে মন্দিরে পা রাখতে দেবেন না। মন্দিরটাকে এড়িয়ে চলতে লাগল গ্রামবাসীরা। তার পর বেশ কবার মন্দিরের ভিতর বা সামনে থেকে গ্রামবাসীর মৃতদেহও মিলেছিল। যাদের বুকে বা গলায় ভয়ঙ্কর ক্ষত চিহ্ন ছিল। ওই লামার প্রেতাত্মাই নাকি রক্তপান করেছিল ওদের। সম্ভবত ওরা সেই মন্দিরে পা রেখেছিল। তবে শেষ ঘটনাটা আমার জানা। আমি আসার কিছু দিনের মধ্যেই তা ঘটেছিল। একজন যুবক হঠাৎ ঘরে ফিরল না। সেই যুবক নাকি ওই মন্দিরের ওদিকে যাওয়া-আসা শুরু করেছিল। গ্রামবাসীরা তাকে খোঁজার জন্য দলবদ্ধ হয়ে পাইন বনে গেল তাকে খুঁজতে। তারপর সাহসে ভর করে মন্দিরের ভিতর ঢুকল। তারা দেখতে পেল একটা ঘরের মধ্যে এক বীভৎস মূর্তি রয়েছে পাথরের তৈরি। আর তার সামনেই পড়ে আছে সেই যুবকের মৃতদেহ। তার বুকে গভীর ক্ষতচিহ্ন। আর পাশেই পড়ে আছে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের একটা জপমালা। গ্রামবাসীরা ধরে নিল যে এটা নিশ্চয়ই সেই সন্ন্যাসীর প্রেতাত্মার কাজ। কারণ যে যুবক মারা গেছে সে নাকি তার এক বন্ধুকে গল্প করেছিল যে সে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর প্রেতাত্মাকে দেখেছে মন্দিরের বাইরের থাম ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে। তার একহাতে ছিল জপমালা। যুবকদের মৃতদেহ মন্দির থেকে বার করে আনার পর গ্রামের লোকেরা সিদ্ধান্ত নিল যে প্রেতাত্মার এই আবাসস্থল ধ্বংস করতে হবে। তাই সেদিন রাতে যুবকের দাহকার্য সম্পন্ন করে ফিরে এসে তারা মন্দিরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। এই হল ওই মন্দির ধ্বংসের ঘটনা।’—একটানা কথা বলে এবার থামলেন বৃদ্ধা।
দীপাঞ্জনের মনে পড়ে গেল তাদের গাড়িতে ওই লোকটার কথা। সে জানতে চাইল, ‘এই প্রেতাত্মার গুজবটা কি আবার সম্প্রতি মাথা চাড়া দিয়েছে।’
প্রশ্নটা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে পালটা প্রশ্ন করলেন, ‘সেটা এরই মধ্যে আপনারা জানলেন কীভাবে?”
দীপাঞ্জন ব্যাপারটা পুরো না ভেঙে বলল ‘আসলে, আমরা যখন এখানে আসছিলাম ‘তখন একদল লোককে রাস্তায় লাঠিসোটা নিয়ে হইচই করতে দেখছিলাম। কাউকে যেন তারা খুঁজছিল। আর এমন কিছুই বলছিল?”
অ্যান বললেন, ‘হ্যাঁ, গুজবটা আবার ছড়িয়েছে। এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে আবার দেখা যাচ্ছে সেখানে।’
জুয়ান বলল, ‘এমনও তো হতে পারে যে লোকটা, নিরীহ। সে সত্যিকারেরই সন্ন্যাসী?’
অ্যান বললেন, ‘মঠটাতো পরিত্যক্ত। কোনো সন্ন্যাসী সেখানে যাবেন কেন?’
জুয়ান এরপর তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, ‘আপনিতো এখানকার দীর্ঘ দিনের বাসিন্দা। আপনি কখনও দেখেছেন সেই সন্ন্যাসীকে?”
প্রশ্নটা শুনে বেশ কয়েক মুহূর্ত সুদীপ্তদের দিকে তাকিয়ে রইলেন বৃদ্ধা। তারপর তাদের অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি সেই লামার প্রেতাত্মাকে কদিন আগে দেখেছি। এবং গ্রামবাসীদের জানিয়েছি!’ – কথাটা বলেই উঠে দাঁড়ালেন বৃদ্ধা। তারপর দীপাঞ্জনদের আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি চলে যাবার পর দীপাঞ্জন বলল, ‘ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত, তাই না? অ্যান নিজেও দাবি করছেন যে প্রেতাত্মাকে তিনি দেখেছেন!’
