Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/27
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

প্রেত লামার মন্দির – ৬

দরজায় টোকা দেবার শব্দে দীপাঞ্জনদের যখন ঘুম ভাঙল তখন বিকাল সাড়ে চারটে বাজে। দরজা খুলল দীপাঞ্জন। অ্যান দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি হেসে বললেন, ‘বিকাল হয়ে গেছে। আজ আকাশ খুব পরিষ্কার। ভালো সানসেট দেখতে পাবেন। বাড়ির সামনে চেয়ার পাতা আছে। ওখানে বসে সানসেট দেখতে পারেন। আপনাদের বন্ধুকেও বললাম। উনিও ওখানে যাবেন। আমি ওখানে চা করে নিয়ে যাচ্ছি।’

দীপাঞ্জন বলল ‘হ্যাঁ, ওখানে যাচ্ছি আমরা।’

ভদ্রমহিলা চলে যাবার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বাড়ির সামনের লনটাতে বেরিয়ে এল দীপাঞ্জনরা। একটা প্লাস্টিকের চেয়ারের পাশে কয়েকটা চেয়ার রাখা আছে সেখানে, সম্ভবত অ্যানই সাজিয়ে রেখেছেন। এগিয়ে গিয়ে দুটো চেয়ারে বসল দীপাঞ্জনরা। চারদিকের পরিবেশ সত্যিই খুব সুন্দর। দূরে মেঘমুক্ত নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আছে সার সার কিরীটশোভিত তুষার ধবল পর্বতমালা। দিন শেষের আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে তার ওপর। সোনালি রং ধারণ করতে শুরু করেছে পর্বতশৃঙ্গগুলো। সামনের পাহাড়ের ঢাল থেকে ভেসে আসছে পাখির ডাক।

দীপাঞ্জনরা চেয়ারে বসার পরই বাড়ি থেকে লনে নেমে এলেন অবনীবাবু। দীপাঞ্জনদের কাছে এসে বাঁ-হাত দিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসতে গিয়েই তিনি ‘উঃ’ বলে আর্তনাদ করে উঠলেন। জুয়ান বলে উঠলেন “কি হল?’

অবনী জোয়ারদার তার বাঁ-হাতটা দেখালেন। ব্যান্ডেজ জড়ানো আছে তার হাতের তালুতে। এরপর তিনি ডান হাত দিয়ে চেয়ারটা টেনে দীপাঞ্জনদের মুখোমুখি বসে বললেন, ‘আর বলবেন না। মাপামাপির কাজ এখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, হঠাৎই একটা টিনের খোঁচায় হাতের তালুর অনেকটা কেটে গেল!’

দীপাঞ্জন বলল ‘টিটেনাস নিয়েছেন?’

অবনীবাবু বললেন ‘এক মাস আগেই নিয়েছি। তবুও একবার কাল সকালে লোলেগাঁও বাজারে ওষুধের দোকানে গিয়ে দেখিয়ে নেব। বড্ড টনটন করছে হাতটা। দেখলেন না, হালকা চেয়ারটা তুলতে গিয়েই কেমন উঃ করে উঠলাম!’

এর পর তিনি বললেন ‘আমাদের ল্যান্ড লেডি কিন্তু খুব স্নেহশীলা মহিলা। খাবার দিতে এসে ঘরে ঢুকে তিনি ব্যাপারটা দেখে ব্যন্ডেজ এনে নিজেই ব্যান্ডেজ করে দিলেন।

অবনীবাবু তাঁর নাম নিতে না নিতেই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলেন অ্যান। বাঁ-হাঁতে লাঠি ধরা আর ডান-হাতে চায়ের কাপ সাজানো ট্রে।

তিনি ট্রে-টা টেবিলে নামিয়ে রাখার পর অবনীবাবু তাকে বললেন, ‘কাজ না থাকলে আপনিও বসুন না। সবাই মিলে একটু গল্প করা যাবে।”

তার কথা শুনে ‘আচ্ছা’ বলে একটা চেয়ারে বসলেন মিসেস অ্যান। জুয়ান তাকে বললেন, ‘আপনাদের এ জায়গাটা সত্যিই খুব সুন্দর।’

অ্যান বললেন, ‘হ্যাঁ, সে জন্যই তো আমি একলা এখানে রয়ে গেলাম। কলকাতায় আর ফিরে গেলাম না।’

অ্যানের সম্বন্ধে অবনীবাবুর তেমন কিছু জানা নেই। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি এখানেই জন্মেছিলেন? নাকি কলকাতা থেকে কারও সাথে এসেছিলেন?’

মেরী অ্যান জবাব দিলেন ‘স্বামীর সাথে। তবে তিনি আজ আর নেই।’

অবনীবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘তিনি কোথায় এখন?”

একটু চুপ করে থেকে অ্যান বললেন, ‘তিনি নিখোঁজ হয়ে গেছিলেন। শিকারের শখ ছিল তাঁর। কুড়ি বছর আগে এখানে চিতাবাঘের দেখা মিলত। গ্রাম থেকে সুযোগ পেলে মুরগি-ছাগল উঠিয়ে নিয়ে যেত তারা। কখনও বা বাচ্চাদেরও। তেমনই এক চিতা বাঘের সন্ধানে বেরিয়ে ছিলেন আমার স্বামী। কিন্তু আর ফিরলেন না। অনেক খোঁজ করেছিল গ্রামের লোকরা কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি। আমার ধারণা শিকারি শেষ পর্যন্ত চিতাবাঘের শিকারে পরিণত হয়েছিল।’ এই বলে মাথা নিচু করলেন বৃদ্ধা। দিন শেষের আলোতে স্পষ্ট একটা বিষণ্ণতা নেমে এল চারপাশে। তার সাথে নিস্তব্ধতাও।’

কয়েক মুহূর্ত পর অবনীবাবু বললেন ‘আমি দুঃখিত। এ প্রশ্ন করা আমার উচিত হয়নি।’

বৃদ্ধা তাঁর পোশাকের ভিতর থেকে একটা রুমাল বার করে চোখ মুছে বললেন ‘না, না, ঠিক আছে। যা হবার তা হয়েছে।’

এই অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে মুক্ত হবার জন্য দীপাঞ্জন চায়ের কাপগুলো তুলে নিয়ে জুয়ান আর অবনীবাবুর হাতে দিয়ে নিজের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, ‘ভাগ্যিস অ্যান ম্যাডাম আমাদের ঘুম ভাঙালেন। নইলে সূর্যাস্ত দেখা যেত না। মিস্টার জোয়ারদার, সারা দুপুর আপনি কি করলেন? ঘুমাচ্ছিলেন?’

মেরী অ্যান এমনিতেই ইংরাজিতে কথা বলেন। তিনি আর প্রফেসর জুয়ান যাতে ওদের কথা বুঝতে পারেন সেজন্য ইংরাজিতেই কথা বলছিলেন অবনী জোয়ারদার আর দীপাঞ্জন। প্রশ্ন শুনে অবনীবাবু বললেন, ‘নো ঘুমাইনি। যে মাপগুলো মন্দির থেকে তুলে আনলাম তা নিয়ে হিসাব কষতে বসেছিলাম। আমি গিয়ে পরে ছোটঘরগুলোর, দেওয়ালগুলোর মাপ নিয়েছি। কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানেন, মন্দিরের বাইরের দৈর্ঘ্য প্রস্থর সাথে ভিতরের দৈর্ঘ্য প্রস্থর হিসাব কিছুতেই মিলছে না। অথচ ভুল মাপ নিয়েছি বলে মনে হয় না। অদ্ভুত ব্যাপার। কাল আরও একবার মন্দিরে গিয়ে মাপজোক করব। দেখা যাক ভুলটা কোথায়?

এ কথা বলার পর তিনি বললেন, “মন্দির মেপে জঙ্গল থেকে বেরবার পর যখন গ্রামের মধ্যে গাড়ি নিয়ে এখানে এলাম, তখন একদল বৌদ্ধ লামাকে দেখলাম। ভূত তাড়াতে ওরা এসে গেছে মনে হয়। ওরা নিশ্চয়ই মন্দিরেও যাবে। কাল সকাল সকাল গিয়ে মন্দিরের মাপজোক সেরে নিতে হবে।’

দীপাঞ্জন বলল, ‘হ্যাঁ, আমরাও ওদের দেখেছি।’

প্রফেসর জুয়ান এরপর মিসেস অ্যানকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গ্রামের লোকেরা বলছিল যে ওই পোড়া মন্দিরে নাকি কোন এক রাজার গুপ্তধন থাকতে পারে। এ ব্যাপারে আপনি কিছু জানেন?

মুহূর্তখানেক চুপ করে থেকে অ্যান বললেন ‘কেউ কেউ বলে বটে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না। এমন অরক্ষিত জায়গাতে কেউ ধনরত্ন রাখে? আর যদি কিছু থাকত তবে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ এতদিনে তার খোঁজ পেত।’

অ্যান একথা বললেও অবনীবাবু বললেন, ‘আমিও কথাটা শুনেছি। সত্যি কথা বলতে কি, মন্দিরের বাইরের আর ভিতরের দৈর্ঘ্য প্রস্থর হিসাব যখন মিলছে না তখন কোনো গুপ্তকক্ষ থাকা অসম্ভব নয়। হয়তো তার মধ্যে গুপ্তধন লুকানো আছে! কাল ভালো করে মাপজোক করব। গুপ্তধন পেলে বড়লোক হয়ে যাব আমি।’—শেষ কথাগুলো হেসেই বললেন অবনীবাবু। অ্যান তার কথা শুনে হেসে বললেন ‘হ্যাঁ, ভালো করে খুঁজুন। পেলে আমাকে ও কিছু দেবেনখন। আপাতত প্রকৃতির গুপ্তধনের দিকে তাকান। দেখুন পাহাড়ের মাথাগুলোতে কেমন রঙ ধরেছে।

কথা থামিয়ে দীপাঞ্জনরা তাকাল দূরের গিরিশ্রেণির দিকে। সত্যি তাতে রং ধরতে শুরু করেছে। গিরি শিরা, শৃঙ্গগুলো যেন সোনাবরণ ধারণ করেছে! অপূর্ব দৃশ্য! দীপাঞ্জনরা চেয়ে রইল সেদিকে। সময় এগিয়ে চলল। রঙের খেলা শুরু হল পর্বতশৃঙ্গগুলোর মাথায়। সোনালি থেকে প্রথমে গোলাপি বর্ণ ধারণ করল পর্বত শিখরগুলো। লালের ছোপ লাগল তাতে। তারপর সূর্যাস্তের ঠিক আগে কেউ যেন টকটকে লালরং ছড়িয়ে দিল হিমাদ্রি শিখরে। অবর্ণনীয় সুন্দর সেই দৃশ্য। এরপরই অবশ্য সূর্য ডুবে গেল। ফ্যাকাসে হতে শুরু করল সেই লাল রং। হিমেল হাওয়া বয়ে আসতে লাগল পাহাড়ের দিক থেকে, বেশ শীতশীত করতে লাগল দীপাঞ্জনের। পাখির ডাক থেমে গেছে। অন্ধকার নামার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। অ্যান বললেন ‘এবার উঠে পড়ুন সবাই। আপনাদের এ অঞ্চলে থাকার অভ্যাস নেই। ঠান্ডা লেগে যাবে।’ এই বলে তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁকে সাহায্য করার জন্য শূন্য কাপ সমেত ট্রে-টা দীপাঞ্জন তুলে দিল তাঁর হাতে। চেয়ার ছেড়ে সবাই উঠে দাঁড়ালেন তাকে সাহায্য করার জন্য। লন ছেড়ে সদর দরজার দিকে এগোবার সময় দীপাঞ্জন, অবনীবাবুকে প্রশ্ন করল, আপনি এখন কী করবেন?

তিনি জবাব দিলেন, ‘ওই মন্দিরের মাপজোকের হিসাবটা নিয়ে আর একবার বসব। কোনো হিসাব না মিললে আমার মনটা কেমন খচখচ করে। দেখি হিসাব যদি মেলে তবে আপনাদের ঘরে একটু আড্ডা দিতে যাব।’

অ্যান এবার অবনীবাবুর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনি তো বৌদ্ধ মন্দির নিয়ে গবেষণা করছেন, আমার কাছে ঠাকুর্দার আমলের এক অঞ্চলের বৌদ্ধ মন্দির সম্পর্কে একটা পুরনো বই আছে। আমার তো কোনো কাজে লাগে না। আপনাকে দিতে পারি।’ বাড়ির ভিতর পা রাখতে রাখতে অবনীবাবু উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ অবশ্যই দেবেন। ওতে নতুন কোনো মন্দিরের সন্ধান পেতে পারি। খুব উপকার হবে।’

অ্যান বললেন, ‘ঠিক আছে। আপনি নিজের ঘরে আপনার হিসাব নিয়ে বসুন। আপনাদের রান্না বানিয়ে বইটা নিয়ে আমি আপনার ঘরে যাব।’ এরপর বাড়ির ভিতরে ঢুকে অ্যান আর অবনীবাবু যে যার ঘরে চলে গেলেন। দীপাঞ্জনরাও ফিরে এল তাদের নিজেদের ঘরে। তেলের বাতিটা কিছুক্ষণের মধ্যে জ্বালিয়ে নিয়ে গল্প করতে বসল জুয়ান আর দীপাঞ্জন

দীপাঞ্জন আর জুয়ানের ভাঁড়ারে অনেক গল্প আছে। খাটে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে সময় কাটাতে লাগল। অবনীবাবু কিন্তু আর আড্ডা দিতে এলেন না। হয়তো তাঁর হিসাব মেলেনি। রাত ন-টা নাগাদ, খাবার নিয়ে হাজির হলেন গৃহকর্ত্রী অ্যান।

দীপাঞ্জন তাকে জিজ্ঞেস করল ‘অবনীবাবু কী করছেন?’

অ্যান বললেন, ‘তাঁর ঘরে গেছিলাম। তিনি খাতাপত্র নিয়ে ব্যস্ত আছেন।’

দীপাঞ্জনদের এ বাড়িতে আজ নিয়ে দু-রাত ভাড়া দেওয়া আছে। তাই হয়তো খাবার নামিয়ে রেখে চলে যাবার আগে অ্যান জানতে চাইলেন ‘আপনারা এখানে কালও থাকবেন তো?’

জুয়ান বললেন, ‘হ্যাঁ কালকের দিনটা থাকব। পরশু ফিরে যাব।

অ্যান চলে যাবার পর দীপাঞ্জনরা খাওয়া সেরে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। শোবার সময় জুয়ান একবার শুধু বললেন, ‘অবনী জোয়ারদারের হিসাব না মেলার ব্যাপারটা কিন্তু আমাকেও ভাবাচ্ছে।

দীপাঞ্জন জানতে চাইল, ‘কী ভাবাচ্ছে?’

জুয়ান কোনো উত্তর না দিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন।