ম্যামথের খোঁজে – ১
১
এটাই এ তল্লাটে মানুষের শেষ বসতি। তারপর যত দূর চোখ যায় দিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমি। উন্মুক্ত প্রান্তর। যা গিয়ে মিশেছে মাউন্ট কিনিয়ার বুকে। যে পাহাড়ের জন্য এদেশেরও নামকরণ হয়েছে ‘কিনিয়া’। গ্রাম বলতে তৃণভূমির মাঝখানে ধানের মরাইয়ের মতো দেখতে গোটাদশেক পাতার কুঁড়েঘর সম্মিলিত একটা জায়গা। তার চারপাশ অনুচ্চ কাঠের বেড়া দিয়ে ঘেরা। জনসংখ্যা নারী-পুরুষ-শিশু মিলিয়ে খুব বেশি হলে পঞ্চাশ জন হবে। মাসাই উপজাতিদের গ্রাম ‘টেম্বো’। এ গ্রামের নাম ‘টেম্বো’ হবার পিছনে এক বিশেষ কারণ আছে। সোয়াহিলি ভাষায় ‘টেম্বো’ শব্দের অর্থ ‘হাতি’। কিনিয়াতে যারা হাতির সন্ধানে আসেন তা তারা পর্যটক বা শিকারি যাই হন না কেন তাদের ঠিকানা হয় এই গ্রাম। এ গ্রামের পর যে বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত ভূখণ্ড রয়েছে সেখানে ঘুরে বেড়ায় মহামাতঙ্গর দল। যুথবদ্ধ অবস্থায় অথবা একাকী তারা বিচরণ করে মাউন্ট কিনিয়ার পাদদেশের এই অঞ্চলে। হাতি কিনিয়ার অন্যত্রও দেখা যায়, এ দেশে তো আর হাতির অভাব নেই। কিন্তু এ তল্লাটে যে বুশ এলিফ্যান্ট’-এর দেখা মেলে তারা সত্যি মহাকায়, আর তেমনই তাদের দন্ত বাহার! যার আকর্ষণে তথাকথিত সভ্য পৃথিবীর মানুষ পৃথিবীর এই প্রান্তসীমায় ছুটে আসে।
হেরম্যান আর সুদীপ্ত পালা করে তাদের ল্যান্ড রোভার গাড়িটা চালিয়ে এনেছে। দীর্ঘ যাত্রাপথের শেষে ত্রিপলের ছাউনি দেওয়া তাদের ধুলো মাখা গাড়িটা যখন গ্রামের ভিতর প্রবেশ করল তখন সূর্যদেব তার শেষ আলো ছড়াচ্ছেন সাভানা তৃণভূমি ঘেরা গ্রামের ওপর। সুদীপ্তরা গাড়ি থেকে নামতেই একদল মাসাই এসে ঘিরে দাঁড়াল তাদের। দীর্ঘকায়, মেদহীন, পেশিবহুল চেহারা তাদের। কটিদেশে লজ্জা নিবারণের জন্য লাল বস্ত্রখণ্ড। কারও কারও বাহুতে ধূসর বর্ণের লোমের গোছা বাঁধা। সিংহর লোম। শুধুমাত্র একটা বর্শা সম্বল করে সিংহ শিকার করতে পারে এই মাসাই জনগোষ্ঠীর লোকেরা।
মাসাইদের ভিড়ের মধ্যে থেকে একটা লোক বেরিয়ে এসে সুদীপ্ত আর হেরম্যানের মুখোমুখি দাঁড়াল। বৃদ্ধই বলা যেতে পারে লোকটাকে। তার ডান বাহুতে শুঁড় সমেত একটা হাতির মাথার উলকি আঁকা, হাত আর পায়ের গোছে সিংহর লোম বাঁধা। গলায় ঝুলছে বেশ কয়েকটা পাথরের মালা। সুদীপ্তদের ভালো করে দেখে নিয়ে লোকটা তাদের প্রশ্ন করল ‘তোমরা কি হাতি শিকার করতে এসেছ?’ গাইড লাগবে? লোকটা ইংরেজি জানে। ইংরেজিতে প্রশ্ন করল সে।
লোকটার এ প্রশ্ন করার পিছনে বিশেষ কারণ আছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বর্তমানে শিকার নিষিদ্ধ হলেও কিনিয়াতে কিন্তু মাঝে মাঝে হাতি শিকারের পারমিট দেওয়া হচ্ছে। গত কুড়ি বছরে হাতির সংখ্যা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে কিনিয়াতে। খাদ্য অন্বেষণে মাঝে মাঝেই তারা হানা দেয় লোকালয়ে, বিশেষত জঙ্গল অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে। তার ফলে মানুষের জীবনহানিও হয় মাঝেসাঝে। সেই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্যই এই সিদ্ধান্ত। তাছাড়া শিকারিদের হাতি শিকারের অনুমতিপত্র দেবার বিনিময় মোটা অংশের টাকাও জমা পড়ে রাজকোষে।
বৃদ্ধ মাসাইয়ের প্রশ্নর জবাবে হেরম্যান বললেন ‘না, আমরা শিকার করতে আসিনি। আমরা এসেছি ‘লুমানি’ নামে একজনের খোঁজে। যার কথা ‘কিনিয়া টাইমস্’ নামের খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে। অবশ্য কাগজে লেখা হয়েছে যে লুমানিও একজন গাইড।’
হেরম্যানের কথা শুনে বৃদ্ধর চোখে-মুখে বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল। সে বলে উঠল ‘আমিই তো লুমানি। তিরিশ বছর গাইডের কাজ করছি এ তল্লাটে। আমার কথা কাগজে লেখা হয়েছে বাওয়ানা?’
সুদীপ্ত বলল ‘হ্যাঁ, লেখা হয়েছে। কিছুদিন আগে সানবার্তো নামের এক পোর্তুগিজ ভদ্রলোক এসেছিলেন এখানে হাতির ছবি তুলতে। তাঁকে তুমি একটা হাতি দেখিয়ে একটা গল্প বলেছিলে। সেটাই তিনি লিখেছেন খবরের কাগজে।’
লুমানি নামের বৃদ্ধ মাসাই যেন আরও বিস্মিত হল কথাগুলো শুনে। সে বলল, ‘লোকটা কাগজে লিখে দিয়েছে সে কথাগুলো!’
হেরম্যান বললেন, ‘হ্যাঁ, আর সে ব্যাপারেই একান্তে কিছু কথা বলতে চাই তোমার সাথে।’
লুমানি বলল ‘ঠিক আছে আসুন।’
সুদীপ্তদের চারপাশের জটলাটা এবার ভেঙে গেল। পাতার ছাউনি ঘেরা তার কুঁড়ের দিকে সুদীপ্তদের নিয়ে এগোল লুমানি। সুদীপ্ত খেয়াল করল হেরম্যানের ঠোটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছে। খবরের কাগজের ইন্টারনেট সংস্করণে প্রকাশিত একটা খবরকে কেন্দ্র করে অর্ধেক পৃথিবী অতিক্রম করে আফ্রিকা মহাদেশের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে যার খোঁজে আসা, তার সাথে যে এত তাড়াতাড়ি সাক্ষাৎ হয়ে যাবে তা সম্ভবত হেরম্যান ভাবেননি।
কুঁড়েতে প্রবেশ করল তারা তিনজন। ভিতরে একটা মাচা মতো জায়গার ওপর খড়ের বিছানা আর সামান্য কিছু জিনিসপত্র। ঘরের কোণে দাঁড় করানো আছে তালপাতার মতো ফলাওয়ালা মাসাইদের প্রিয় হাতিয়ার, ফলার গলাতে লাল কাপড়ের টুকরো বাঁধা একটা বর্শা, আর দেওয়ালের গা থেকে ঝুলছে একটা বন্দুক।
খড়ের বিছানাতে সুদীপ্তদের বসতে বলে, তারা সেখানে বসার পর একটা কাঠের টুল টেনে এনে তাদের মুখোমুখি বসল মাসাই গাইড লুমানি।
লুমানির দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর হেরম্যান তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন ‘আচ্ছা তুমি কি কোনোদিন সত্যিই হাতিদের গ্রেভইয়ার্ড-কবরখানায় গেছিলে? সেই ফোটোগ্রাফারকে তুমি এ গল্প করেছিলে?’
লুমানি নামের লোকটা জবাব দিল ‘হ্যাঁ, আসলে ওই বুড়ো দাঁতাল হাতিটা দেখে আমি ওই পুরনো কথাটা মুখ ফসকে সাহেবকে বলে ফেলেছিলাম। আমি জানতাম না কথাগুলো কাগজে ছাপা হয়ে যাবে! হয়তো খবরটা পড়ে লোকে আমাকে মিথ্যাবাদী বা পাগল ভাবতে পারে।
হেরম্যান বললেন ‘আমরা কিন্তু তেমন ভাবছি না। তোমার সাথে দেখা করার জন্য অনেক দুর থেকে আমরা এসেছি। সাহেবকে তুমি যাদের কথা বলেছ, কবরখানার দ্বাররক্ষী সেই প্রেত টিম্বো দুটোকে তুমি নিজের চোখে দেখেছিলে তাই না? যদিও সাহেব তোমার বক্তব্য কাগজে লিখেছে তবুও তোমার মুখ থেকে আমি ঘটনাটা একবার শুনতে চাই।’
কথাটা শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল বৃদ্ধ গাইড। যেন স্মৃতির অতলে ডুব দিল সে। তারপর বলতে শুরু করল—’সেও প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা হবে। কিন্তু এখনও আমার সব কথা মনে আছে। সেবার একটা বুড়ো দাঁতালের পিছু নিয়েছিলাম এ গ্রামের তিনজন লোক। হাতিটার চলাফেরা দেখে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম তার আয়ু শেষ হয়ে এসেছে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল যে হাতিটা মারা গেলে ওর বিশাল দাঁত দুটোকে সংগ্রহ করা। সে লোভেই আমরা ওর পিছু ধাওয়া করেছিলাম। খুব ধীর গতিতে এগোচ্ছিল সে। তার দু-পাশে ছিল দুটো আস্কারি হাতি। অর্থাৎ দাঁতাল বুড়ো হাতিকে অন্য যে দুটো দাঁতাল পাহারা দিয়ে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল। ওরা দিনের বেলা এগোত, রাতে বিশ্রাম নিত। টানা সাতদিন ওদের অনুসরণ করলাম। তখনও আমরা জানতাম না আসলে ও একটা নির্দিষ্ট জায়গাতে যাচ্ছে। সপ্তম দিন সকালে হাতি তিনটে পাহাড়ি পথে প্রবেশ করল। আমরাও অনুসরণ করলাম তাদের। দু-পাশে নেড়া পাহাড়ের খাড়া দেওয়াল, নানা গোলোক ধাঁধা তার মধ্যে। হাতি তিনটে এবার যেন অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে চলতে লাগল। সেই পাহাড়ের গোলোক ধাঁধায় ঢোকার পর একবার আমাদের মনে হয়েছিল আমরা ফিরে আসি। কিন্তু তারপরই আমরা ভাবলাম যে এতদূর কষ্ট করে যখন এসেছি তখন দেখাই যাক না এগোতে থাকলাম আমরা। বিকাল নাগাদ থামল হাতি তিনটে। আমরা ধারণা করলাম এদিনের মতো বিশ্রামের জন্য থেমেছে তারা। আপাতত আমাদের এখন কাজ নেই। তাই জায়গাটা ভালো করে দেখার জন্য পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বেশ একটা উঁচু জায়গায় আমরা উঠলাম। আর তখনই আমরা দেখতে পেলাম সেই দৃশ্য। বেশ কিছুটা তফাতে ছোট একটা জলাশয়। আর তার চারপাশে পড়ে আছে অজস্র হাতির কঙ্কাল! হাতিদের কবরখানা! চারপাশ থেকে নানা গিরিপথ গিয়ে মিশেছে সে জায়গাতে। তবে আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম সেখান থেকে সরাসরি যাবার কোনো পথ ছিল না সে জায়গাতে। এবার আমরা বুঝতে পারলাম যে বুড়ো হাতিটা কেন এখানে এসেছে! তার গন্তব্য ওই গোরোস্থান। হাতিটাকে অনুসরণ করলেই ওখানে পৌঁছানো যাবে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম আমরা। এবার আমরা বড়লোক হয়ে যাব! পাহাড় থেকে নেমে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম পরদিন ভোরে হাতিটা কখন সে দিকে যাত্রা শুরু করে তার জন্য। সূর্য ডুবে গেল, তারপর চাঁদও উঠতে শুরু করল এক সময়। পূর্ণিমার গোল চাঁদ। কিন্তু তখনই আবার আমাদের অবাক করে দিয়ে পাহাড়ের সরু রাস্তার গোলোক ধাঁধায় এগোতে শুরু করল হাতি তিনটে। পূর্ণিমা হলেও আকাশে মেঘ ছিল। মেঘ আর পাহাড়ের দেওয়াল মাঝে মাঝে ঢেকে দিচ্ছিল চাঁদকে। অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল অতবড় প্রাণীগুলো। এক সময় চলতে চলতে আমাদের অনুমান হল, আমরা যেন সেই কবরখানার কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। আর এরপরই কিছুক্ষণের জন্যে মেঘ চাঁদকে ঢেকে দিল। হাতিগুলো আমাদের চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার চাঁদ মুখ তুলতে লাগল। সেই আলোতে আমরা দেখলাম হাতি তিনটে একটা বিশাল তোরণের মতো জায়গার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে…।’ হেরম্যান লোকটার কথার মাঝেই এবার বিস্মিত ভাবে বলে উঠলেন ‘তোরণ?’
বৃদ্ধ মাসাই লুমানি বলল ‘হ্যাঁ, কবরখানার দরজা। মাথায় তার ছাদ আছে। তার নীচ দিয়ে হাতি গলে যেতে পারে। যুবকহাতি দুটো এবার শুঁড় বুলিয়ে দিতে লাগল বুড়ো হাতিটার গায়ে। যেন অন্তিমক্ষণে বুড়ো হাতিটাকে বিদায় আলিঙ্গন করছে তারা! তোরণের ভিতরে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। জমাট বাঁধা অন্ধকার তার ভিতরে। আর এরপরই বেশ কয়েক মুহূর্তর জন্য মেঘ সরে গেল। আর তারপরই আমরা দেখতে পেলাম অদ্ভুত সেই দৃশ্য। তোরনের ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে দু-পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দুটো হাতি। ঝালরের মতো বড় বড় লোম তাদের গায়ে। বিশাল দাঁতগুলো কাস্তের ফলার মতো আকাশের দিকে ওঠানো। হাতি অনেক দেখেছি আমরা। কিন্তু অমন দাঁত আর লোমঅলা হাতি কোনোদিন দেখিনি। যুবক হাতি দুটো তাদের দেখে বুড়ো হাতিটার দু-পাশ থেকে পিছনে সরে এল। যেন তারা কবরখানার প্রহরী সেই প্রেতহাতি দুটোর হাতে বুড়ো হাতিটাকে তুলে দিল। হ্যাঁ, ওরা প্রেত হাতি। কারণ এমনি হাতি অমন হয় না! প্রেত হাতি দুটো এরপর বুড়ো হাতিটাকে নিয়ে গোরস্তানের তোরণের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল। তোরণ আর তার গায়ের দেওয়াল অন্ধকারে ঢেকে গেল।’
সুদীপ্ত বলল ‘তোমরা তিনজন ওই প্রেত হাতি দুটোকে ঠিক দেখেছিলে।’
লুমানি বলল ‘হ্যাঁ, চাঁদের আলোতে আমরা স্পষ্ট দেখেছিলাম তাদেরকে। সে দৃশ্য এত বছর পরও স্পষ্ট মনে আছে।’
হেরম্যান বললেন ‘তারপর?’
লুমানি বলল ‘ঘটনাটা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছিলাম আমরা। কিন্তু যখন আমাদের হুঁশ ফিরল তখন আমরা দেখলাম বুড়ো দাঁতালটাকে কবরখানার প্রেতরক্ষীদের হাতে তুলে দিয়ে যুবক দাঁতাল দুটো এবার ফেরার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আর তখনই আমরা আমাদের বিপদটা বুঝতে পারলাম। সংকীর্ণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা। আমাদের দু-পাশে খাড়া পাথরের দেওয়াল। হাতিদুটো কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ওপর এসে পড়বে! তারা যদি আমাদের ওপর ক্রুদ্ধ নাও হয়, তবুও রাস্তাটা এত সংকীর্ণ যে আমাদের পায়ের তলায় না ফেলে তাদের এগোবার উপায় নেই। আমাদের সামনে তখন বাঁচার দুটো পথ। এক, আমরা যে পথে এসেছ সে পথ ধরে হাতিদের আগে আগে ছুটতে থাকা। আর দ্বিতীয় পথ হল হাতিদুটোকে পিছু ফিরিয়ে কবরখানার তোরণের ভিতর ঢুকিয়ে দেওয়া। আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম দ্বিতীয় কাজটাই করতে হবে। তোরণটার ঠিক সামনের জায়গাটা প্রশস্ত। কিন্তু হাতি দুটো একবার যদি গলিপথে ঢোকে তখন তারা আর পিছনে ফিরতে পারবে না। তাছাড়া হাতি দুটোকে যদি আমরা তোরণের ভিতরে প্রবেশ করাতে পারি তবে ভোরের আলো ফুটলে আমরাও কবরখানায় প্রবেশ করতে পারব। কারণ দিনের বেলায় সমস্ত প্রেতদের সাথে সাথে প্রেত হাতিরাও নিশ্চয়ই অদৃশ্য হয়ে যাবে। দিনের আলোতে যথাসম্ভব হাতির দাঁত সংগ্রহ করে বাইরে বেরিয়ে আসব আমরা। আমাদের চোখে তখন জেগে আছে সেই দৃশ্য-রাশি রাশি হাতির দাঁত ছড়িয়ে আছে।
কিন্তু হাতি দুটাকে তোরণের ভিতর খেদিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের সম্বল বলতে তিনটে বর্শা। কিন্তু তোমরা হয়তো জানো যে হাতে বর্শা থাকলে মাসাইরা যমের মুখোমুখি হতেও ভয় পাই না। এই বর্শা আমাদের হাতে বিদ্যুতের চেয়েও জোরে ছুটে সিংহর বুক ফুঁড়ে দেয়। সেই বর্শা তিনটে উঁচিয়ে ধরেই চাতালের দিকে এগোলাম আমরা তিনজন। এগোতে গিয়েও আমাদের দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হাতি দুটো। কয়েকমুহূর্ত দৃষ্টি বিনিময় হল উভায়পক্ষের মধ্যে। তারপর প্রবল বেগে হাতি দুটো কান ঝাপটাতে শুরু করল। আক্রমণের পূর্বাভাস। আর দেরি করা সম্ভব নয়। আমাদের একজন প্রথমে একটা হাতিকে লক্ষ করে বর্শা ছুঁড়ল। সেটা গিয়ে বিধল তার একটা পায়ের ওপরে। হাতিটা যেন তা ভ্রূক্ষেপই করল না। শুঁড় দিয়ে বর্শাটাকে গায়ের থেকে টেনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ছুটে এসে শুঁড় দিয়ে ধরে ফেলল তার আক্রমণকারীকে। কয়েক মুহূর্তর মধ্যে দলা পাকিয়ে গেল আমার সেই সঙ্গীর দেহ। আমার দ্বিতীয় সঙ্গী এবার কিছুটা এগিয়ে গিয়ে হাতিটাকে বর্শা নিক্ষেপ করল। সেটা গিয়ে বিদ্ধ হল হাতিটার শুঁড়ের মাঝখানে। কিন্তু যে বর্শাটা ছুঁড়েছিল আমার সে সঙ্গীর পা হড়কে গেল। মাটিতে পড়ে গেল সে। আর তাকে হাতিটা সে অবস্থাতেই দাঁত দিয়ে গেঁথে শূন্যে তুলে নিল। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম সবার পিছন দিকে সর্পিল গলিটার কিছুটা ভিতর দিকে। প্রথম হাতিটা তাকে যারা আঘাত করেছে তাদের হত্যা করলেও পরপর দুবার বর্শার আঘাত খেয়ে থমকে দাঁড়াল। মাথা নাড়িয়ে শুঁড় দিয়ে বর্শাটা খসাবার চেষ্টা করতে লাগল। এবার দ্বিতীয় হাতিটা চত্বর থেকে ধেয়ে এলে আমার দিকে। আমাকে পিষে মারার জন্য গলির কিছুটা ঢুকে গেল। আমার সঙ্গে তখন তার হাত দশেকের মতো ব্যবধান। দানবের মতো বিশাল দাঁতালটা শুঁড় বাড়িয়ে আমাকে ধরতে যেতেই আমি বর্শা ছুঁড়লাম। সেটা গিয়ে, বিদ্ধ হল তার একটা কানের, ঠিক নীচে। ও জায়গাটা হাতিদের দেহের সবচেয়ে নরম অংশ। আঘাতটা একটু মোক্ষমই হয়েছিল। হাঁটু মুড়ে গলির মধ্যে বসে পড়ল হাতিটা। পরক্ষণেই অবশ্য উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল হাতিটা, কিন্তু দু-পাশে পাথরের দেওয়ালের মাঝখানের নুড়ি পথের নীচের অংশটা ওপরের অংশর তুলনায় বেশি সরু। সেখানে আটকে গেল হাতিটা। আমি তখনও কিন্তু পালাইনি। কারণ আমার সঙ্গী দুজনের দেহ দুটো তখনও চাতালে পড়ে আছে। হাতিটা যখন বার কয়েক ওঠার চেষ্টা করেও পারল না তখন পিছন থেকে বর্শা বিদ্ধ হাতিটা এসে তার সঙ্গীকে ঠেলে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই সে তাকে ওঠাতে পারল না। আর এর পরই সেই ঘটনা ঘটল। হাতি দুটো হঠাৎ আকাশের দিকে শুঁড় তুলে অদ্ভুত স্বরে ডাকতে শুরু করল। ও ডাক আমরা চিনি। বিপদে পড়লে হাতিরা ওভাবেই সঙ্গীদের ডাকে। আর এরপরই যেন জেগে উঠল চারপাশ। চারদিক থেকে ভেসে আসতে লাগল হাতির ডাক। কবরখানার প্রেত হাতিদের চিৎকার। ঘুম ভেঙে জেগে উঠে চারদিক থেকে কবরখানার প্রেতরক্ষীরা যেন সে জায়গার দিকে ধেয়ে আসতে লাগল শত্রুকে শুঁড়ে তুলে, পায়ে দলে পিষে মারার জন্য। বীভৎস কান ফাটনো সেই চিৎকার। তাদের পায়ের ভারে মাটি কাপতে লাগল। এরপর আমি আর সাহস রাখতে পারলাম না। ছুটতে শুরু করলাম। দুদিন পর মুমূর্ষু অবস্থায় নেহাতই বরাত জোরে সেই পাহাড়ের গোলকধাঁধার বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম আমি। তারপর গ্রামে ফিরে এসেছিলাম।’ —গল্প শেষ করল বৃদ্ধ গাইড লুমানি।
