ম্যামথের খোঁজে – ২
২
লুমানির গল্প শোনার পর সুদীপ্তরা বুঝতে পারল যে কাগজে যা লেখা হয়েছে, অর্থাৎ সেই পোর্তুগিজ ফোটোগ্রাফারকে লুমানি যা বলেছিল সে কথাই তখন সে সুদীপ্তদের সামনে বলল কবরখানার সে রাতের ঘটনার একটু বিস্তৃত বিবরণ দিয়ে। হেরম্যান একটু চুপ করে থেকে পকেট থেকে একটা ছবি বের করে সেটা লুমানির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন—‘দেখ তো, তুমি যে কবরখানার প্রেত রক্ষীদের দেখেছিলে তার সাথে এই হাতির মিল আছে কিনা?’
ম্যামথের ছবিটা নিয়ে কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর লুমানি নিশ্চিত ভাবে বলল ‘হ্যাঁ, বাওয়ানা। ঠিক এমনই দেখতে ছিল তাদের। এমনই কাস্তের ফলার মতো বাঁকানো দাঁত, সারা গায়ে এমনই ঝালরের মতো বড় বড় লোম! এ ছবি কে তুলল? সেখানে কি আর কেউ গেছিল?’
হেরম্যান হেসে জবাব দিলেন “হাতিদের সেই গোরস্থানে কেউ কোনোদিন গেছিল কিনা জানা নেই। এটা ক্যামেরায় তোলা ছবির মতো দেখতে হলেও আসলে এটা আঁকা ছবি। এই হাতির নাম ‘ম্যামথ।’ এঁকে তুমি হাতিতের পূর্বপুরুষ বলতে পারো।’
ছবিটার দিকে তাকিয়ে লুমানি বিড়বিড় করে বলল, ‘কিন্তু আমি যে ওদের দেখেছি’ বাওয়ানা।’
সুদীপ্ত জানতে চাইল ‘গ্রামে ফিরে এসে সে সময় তুমি গল্পটা কাউকে করনি? তোমার কোনোদিন ইচ্ছা হয়নি আবার সেই কবরখানায় যেতে। সেখানে তো রাজঐশ্বর্য রয়েছে তোমার জন্য?’
লুমানি বলল, ‘গ্রামে ফিরে এসে প্রথমে আমি খবরটা জানাই সে সময় গ্রামের মাথা জাদুকর পুরোহিত সেলামিকে। সে আমাকে গ্রামের অন্য লোকদের ব্যাপারটা জানাতে বারণ করে। কাজেই আমি গ্রামের লোকদের বলি যে তাদের দুজনকে সিম্বা অর্থাৎ সিংহ টেনে নিয়ে গেছে। কথাটা কেউ অবিশ্বাস করেনি। কারণ এ তল্লাটে ব্যাপারটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। এমনকী কুঁড়ের ভিতর থেকেও মানুষ তুলে নিয়ে যেত সিংহ। যাদুকর সেলামি আমাকে বলেছিল যে, সে আমার শরীরে মন্ত্র করে দেবে। তাতে প্রেত হাতিরা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তারপর আমরা দু-জন সেখানে যাব। জাদুকরের জাদু লাঠি আমাদের পথ চিনিয়ে পাহাড়ের ভিতরের সেই কবরখানায় নিয়ে যাবে। পাহাড়টা পর্যন্ত তো এমনিই যাওয়া যায়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই দুজন সাদা চামড়ার শিকারি এল গ্রামে। সেলামি নিজেও গাইডের কাজ করত। শিকারিদের সিংহ শিকার করাতে নিয়ে যাচ্ছে বলে জাদুকর সেই যে গ্রাম ছাড়ল আর কোনোদিন গ্রামে ফিরল না। আমার ধারণা সে শিকারিদের হাতিদের কবরখানার গল্প করেছিল। তারপর তাদের বন্দুকের ওপর ভরসা করে সেই কবরখানায় গিয়ে কোনোভাবে মারা পড়ে। কারণ কিছুদিনের মধ্যে আমি একজনের কাছে গল্প শুনেছিলাম যে, সে শিকারিদের সাথে ঘাস জমি পেরিয়ে জাদুকরকে পাহাড়ের দিকে ফাঁকা জমির দিকে যেতে দেখেছিল। সিংহ শিকারের জন্য ওদিকে যাবার প্রয়োজন হয় না।
এরপর একটু থেমে থাকার পর লুমানি বলল সেখানে যাবার ইচ্ছা অবশ্যই ছিল। কিন্তু কীভাবে যেতাম? আমার কাছে তো জাদু লাঠি নেই যে পাহাড়ের গোলোক ধাঁধায় সে আমাকে পথ দেখাবে। আর সব হাতি সেখানে যায় না যে তাদের পিছন ধরলাম। বুড়ো হবার আগেই তারা নানা কারণে মারা যায়। রোগে ভুগে, নিজেদের মধ্যে বা অন্য প্রাণীদের সাথে লড়াইতে অথবা শিকারির গুলিতে। তাছাড়া কেবল মাত্র বৃদ্ধ দাঁতাল পুরুষ হাতিরাই বার্ধক্যর কারণে মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে বুঝতে পারলে সেখানে যায়। তাছাড়া খুব কম হাতিই হয়তো চেনে সে পথ।”
সুদীপ্ত জানতে চাইল ‘সব হাতি চেনে না কেন?
লুমানি বলল, ‘বৃদ্ধ হাতি যখন সে পথে যাত্রা করে তখন তার সঙ্গে দুজন যুবক হাতিকে আস্কারি হিসাবে সঙ্গে নিয়ে যায়। পথ চিনে ফিরে আসে তারা। আবার তারা যখন বুড়ো হয় তখন দুজন যুবক হাতিকে সঙ্গী করে। এই ভাবে চলতে থাকে ব্যাপারটা। কিন্তু একটা হাতির সেখানে দুবার যাবার মধ্যে অন্তত চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের ব্যবধান থাকে। আর তার মধ্যে অনেক সময়ই তারা মারা যায়। তাই যে হাতি কবরখানার দিকে যাচ্ছে সে হাতি মেলা খুবই কঠিন। তাছাড়া আমাদের এখানের মানুষরাও বেশি দিন বাঁচে না পশুর আক্রমণে বা রোগে মারা যায়। আমার দুই ছেলেরই তো কেউ চল্লিশ পার করতে পারল না। আমি শুধু এই সত্তর বছর বেঁচে আছি। আমার গ্রামে এখন আমি সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি।’
হেরম্যান এবার বললেন ‘কিন্তু এবার তো তোমার সামনে যে জায়গাতে যাবার একটা শেষ সুযোগ এসেছে তাই না?’ কথাটা শুনেই লুমানি চমকে উঠে বলল ‘তার মানে?’
হেরম্যান মৃদু হেসে বললেন, ‘যে হাতিটা তুমি ফোটোগ্রাফার সাহেবকে দেখিয়েছিলে, যে হাতিটা দেখে তুমি তাকে পুরনো দিনের গল্পটা তাকে বলেছিলে সে হাতিটাতো ওদিকেই যাচ্ছে তাই না।’
লুমানি এবার জবাব দিল ‘হ্যাঁ।’
সুদীপ্ত এবার প্রশ্ন করল তুমি কি করে বুঝলে ও সেখানে যাবে?’
লুমানি বলল ওকে আমি পঞ্চাশ বছর ধরে চিনি। দূর থেকে কত টুরিস্টকে দেখিয়েছি। অমন দাঁত এ অঞ্চলে কোনো হাতির নেই। বুড়ো হয়েছে ও। দুটো যুবক দাঁতাল কে সঙ্গী হিসাবে সে নির্বাচন করেছে তার শেষ যাত্রার জন্য। তাছাড়া সে যে ওখানে যাচ্ছে তা আমি জানিই।’ শেষ শব্দটা বেশ জোর দিয়ে বলল লুমানি।
সুদীপ্ত বলল ‘তুমি এতটা নিশ্চিত হচ্ছ কীভাবে?”
মৃদু চুপ করে থেকে লুমানি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল ‘বলছি তো আমি জানি।’
হেরম্যান এবার সরাসরি প্রস্তাবটা রাখলেন লুমানির কাছে। তিনি বললেন ‘দেখো লুমানি। এ সুযোগ হয়তো আমার তোমার জীবনে এই শেষ বার আসছে। তোমাকে নিয়ে ওই হাতিটাকে অনুসরণ করে আমরা ওই কবরখানায় যেতে চাই। যাবে আমাদের নিয়ে?’ কথাটা শুনেই লুমানি তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বিস্মিত ভাবে বলল ‘আপনারা ওখানে হাতির দাঁত আনতে যাবেন?’
হেরম্যান বললেন ‘তুমি বসো লুমানি। শান্তভাবে আমার কথা শোনো।’
বিস্ময় ভরা মুখ নিয়ে লুমানি টুলে বসে পড়ল।
একটু চুপ করে থেকে হেরম্যান বললেন ‘দ্যাখো লুমানি। ওই হাতির দাঁতের ব্যাপারে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। আমরা বিদেশি। টুরিস্ট হিসাবে এ দেশে এসেছি। সরকারি নিয়ম অনুসারে আমরা ওই দাঁত এ দেশের বাইরে নিয়ে যেতে পারব না, আবার, এখানে কাউকে বিক্রি করেও টাকা নিয়ে যেতে পারব না। শিকারের পারমিট থাকলে হয়তো হাতি মেরেছি বলে দুটো দাঁতের মালিক হওয়া যেত। কিন্তু সে পারমিটও আমাদের নেই। কাজেই বুঝতেই পারছ যে ও দাঁত পেলেও দাঁত আমাদের কোনো কাজে আসবে না। তাছাড়া ওভাবে বড়লোক হতেও আমরা চাই না। বরং স্থানীয় মানুষ হিসাবে দাঁতগুলো পেলে তুমি রাজা হয়ে যাবে। সরকারকে কর দিয়ে দাঁতগুলো বিক্রি করতে পারবে।
লুমানি বলে উঠল, ‘তবে কেন বিপদ মাথায় নিয়ে ওখানে যেতে চাচ্ছেন আপনারা? কি লাভ আপনাদের?’
হেরম্যান হেসে জবাব দিলেন ‘লাভ একটা নিশ্চয়ই আছে। আমরা হলাম ক্রিপ্টোজ্যুলজিস্ট। এ শব্দটা তোমার শোনার কথা নয়। এ শব্দের মানে হল আমরা পৃথিবীর নানা জায়গায় গল্প কথার অথবা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রাণীদের খুঁজে বেড়াই। এর আগেও বেশ কয়েকবার আমরা তোমাদের এ মহাদেশে এসেছি নানা প্রাণীর খোঁজে। কখনও বুরুন্ডিতে ‘সবুজ মানুষের’ খোঁজে, কখনও ইজিপ্টে ‘সিংহ মানুষ’ খুঁজতে, কখনও তোমাদের প্রতিবেশী দেশ সুদানে সিং-অলা ঘোড়া বা ‘ইউনিকর্ন’ দেখতে, আবার কখনও বা মাদাগাস্কারের জঙ্গলে ‘রাক্ষুসে গাছের খোঁজে। ওই কবরখানায় যাওয়ার পিছনে আমাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে তুমি যাদের প্রেত হাতি বলছ তাদের দেখতে যাওয়া। বহু হাজার বছর আগে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলে মানুষের ধারণা। তোমার কথা যদি সত্যি হয় তবে সেখানে গেলে তাদের দেখতে পাব সেটাই আমাদের লাভ। পৃথিবীকে আমরা জানাব যে তারা এখনও টিকে আছে পৃথিবীর বুকে তাতেই আমাদের আনন্দ। আমার ধারণা তুমি যে দ্বাররক্ষীদের দেখেছিলে তারা আসলে সেই ম্যামথ।”
এরপর হেরম্যান বললেন ‘তুমি যদি আমাদের সাথে নিয়ে হাতিটাকে অনুসরণ কর তবে আমরা সেই কবরখানায় পৌঁছতে পারি বা না পারি। তোমার যা ন্যায্য পারিশ্রমিক তা দেব।’
বাইরে সূর্য ডুবে গেছে। আঁধার নামছে মাসাই গ্রামে। ঘরের ভিতরটাও অস্পষ্ট হয়ে আসছে। অস্পষ্ট হয়ে আসছে বৃদ্ধ গাইড লুমানির মুখ। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল ‘হ্যাঁ, মফলম ধীরগতিতে রওনা হয়েছে ওদিকে।
হেরম্যান বললেন ‘মফলম আবার কে?’
লুমানি বলল, “আমাদের সোয়াহিলি শব্দে ‘মফলম’ শব্দের মানে হল ‘রাজা।’ ওই বুড়ো হাতিটাকে তার বিশাল কলেবরের জন্য আমরা ‘মফলম টেম্বো’ বলে ডাকি। অর্থাৎ, কিং-এলিফ্যান্ট-রাজা হাতি। যেমন তোমাদের আমরা ‘বাওয়ানা’ বলি। যার অর্থ হল ‘মালিক’ বা ‘প্রভু’। মফলম টেম্বোকে সবাই চেনে।”
এ কথা বলার পর ‘আরও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে। লুমানি এক সময় বলল আমাকে আজকের রাতটা ভাবতে সময় দিন বাওয়ানারা।’
হেরম্যান উঠে দাঁড়িয়ে বললেন ‘হ্যাঁ, ভাবো। কাল সকালে তোমার বক্তব্য জানার অপেক্ষা করব আমরা। নইলে অন্য গাইডের শরণাপন্ন হতে হবে আমাদের মফলম টেম্বো বললে অন্য গাইডরাও নিশ্চই তাকে চিনবে। তাদের মাধ্যমেই হাতিটাকে অনুসরণ করব আমরা। যদি হাতিদের কবরখানার খোঁজ পাওয়া যায় তবে সেই অতুলনীয় সম্পদের অধিকারী হবে সেই গাইডই।”
লুমানি বলল ঠিক আছে এবার বাইরে যাওয়া যাক। সান্ধ্য প্রার্থনা শুরু হবে এবার। আমি কালই ভোরেই আমার মতামত জানিয়ে দেব।”
কুঁড়ের বাইরে বেরিয়ে এল সবাই। কুঁড়েগুলোর মাঝখানে যে বৃত্তাকার জায়গা আছে তার যে পাশে ঝোপঝাড়ের জঙ্গল সে পাশে অগ্নিকুণ্ড জ্বালাবার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সম্ভবত ওদিক থেকে যাতে কোনো হিংস্র জানোয়ার গ্রামে প্রবেশ না করে সে জন্যই এই ব্যবস্থা। লুমানি সে জায়গা দেখিয়ে বলল ওখানেই প্রার্থনা সঙ্গীত হবে। এই বলে সে এগোল সেদিকে।
সুদীপ্তরা প্রথমে গাড়ির দিকে এগোল। হেরম্যান প্রথমে গাড়িতে উঠে সেটাকে ফাঁকা জমির অন্য দিকের বেড়া ঘেঁষে দাঁড় করাল। তারপর গাড়ি থেকে নেমে সুদীপ্তকে নিয়ে উঠল গাড়ির পিছনের দিকে ক্যানভাসের ছাউনি দেওয়া অংশটাতে। ওখানেই তাদের দু-জনের যাবতীয় জিনিসপত্র আছে, এবং এখানেই রাত্রিবাস করবে তারা। একটা পেট্রোম্যাক্স বাতি জ্বালিয়ে নিয়ে তারা নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বার করতে শুরু করল- রাতের খাবার ও বিছানাপত্র। সে কাজ করতে করতে সুদীপ্ত, হেরম্যানকে জিজ্ঞেস করল ‘আপনার কি মনে হয় যে হাতিদের অমন কবরখানা সত্যিই আছে?’
হেরম্যান বললেন ‘এটা একটা প্রাচীন মিথ। বিভিন্ন আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর লোককথা বা উপকথাতেও হাতিদের গ্রেভইয়াড বা কবরখানার উল্লেখ আছে। এমনকী অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর বেশ কয়েকজন ইওরোপীয় পর্যটকদের বিবরণেও এমন কবরখানার উল্লেখ আছে। তারা শুনেছিলেন বা দেখেছিলেন এই কবরখানা। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এমন বেশ কিছু জায়গাও আবিষ্কৃত হয়েছে যেখানে এক সাথে বহু হাতির কঙ্কাল পাওয়া গেছে। অবশ্য সে জায়গাগুলো সম্বন্ধে পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা হল এই যে কোনো কারণে যে জায়গাতে হাতির পাল জড়ো হয় এবং খাদ্য বা পানীয়র অভাবে অথবা রোগের প্রকোপে একসাথে সেখানে মৃত্যু হয় তাদের। আর, এ ব্যাপারে আর একটা মত হল যে এক সাথে অনেক হাতিকে শিকারিরা যে জায়গাতে হত্যা করলেও কোনো কারণবশত শেষ পর্যন্ত তারা তুলে নিয়ে যেতে পারেনি। হাতিরা বৃদ্ধ হলে মৃত্যু আসন্ন জেনে নিজেরাই কবরখানায় উপস্থিত হন এ তত্ত্ব তারা মানেন না।”
‘আর ম্যামথের ব্যাপারটা?’
হেরম্যান বললেন ‘দেখো, ম্যামথের আদি পুরুষ পৃথিবীতে এসেছিল চার মিলিয়ন বছর আগে। এবং তাদের শেষ গোত্র বিলুপ্ত হয় সারে চার হাজার বছর আগে। মনে করা হত যে সিলিকাস্থ মাছ বা রাজকাকড়াও কয়েক কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গেছিল। কিন্তু এক কোটি বছরের প্রাচীন প্রাণীদের যদি সন্ধান আজ মিলতে পারে তবে ম্যামথের সন্ধানও অসম্ভব নয়। হয়তো ওই পর্বত কন্দরে চারপাশের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কোনো কারণে আজও কোনোভাবে টিকে আছে ম্যামথরা। হয়তো ওই বদ্ধ জায়গার ভূ-প্রকৃতির তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি বাইরের পৃথিবীর মতো। যেমন পরিবর্তিত হয়নি হিমালয়ের কয়েকটা জায়গা বা সমুদ্রর তলদেশের কিছু জায়গার প্রকৃতি। যে কারণে সেখানে বেশ কিছু কয়েক কোটি বছরের উদ্ভিদ বা প্রাণীর দেখা মেলে। যাদের আমরা জীবন্ত ফসিল বলি।’
সুদীপ্ত বলল ‘লুমানি যদি তাদের সত্যিই দেখে থাকে তারপর পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে। এমন তো হতে পারে তার মধ্যেই মৃত্যু হয়েছে শেষ ম্যামথদের? পৃথিবী থেকে মুছে গেছে তাদের শেষ প্রজাতি?’
হেরম্যান হেসে বললেন তা নিশ্চয়ই হতে পারে। তবে লুমানির বিবরণ মতো যে জায়গাটা বদ্ধ। সেখানে যদি ম্যামথের হাড়গোড়ও পাওয়া যায় তবে বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ধারণাও ভুল প্রমাণিত হবে। আমরা বলতে পারব, এই তো সেদিনও ম্যামথ ছিল। এ অঞ্চলে চল্লিশ বছর আগে ব্রিটনি নামের এক মহিলা জীবাশ্মবিদ ম্যামথের কিছু হাড়গোড় আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার ‘আফ্রিকাতে’ এসে তিনি সিংহর শিকার হন।’ অগ্নিকুণ্ড জ্বলে উঠল। প্রার্থনা সঙ্গীত শুরু হল এরপর। অদ্ভুত তার সুর। হেরম্যান বললেন ‘এই সব আদিবাসীদের যে সব ব্যাপারকে সভ্য পৃথিবীতে মানুষরা নিছক লোকাচার ভাবে তার গভীরে অন্য কারণ লুকিয়ে থাকে। দিনের বেলা না গেয়ে ওরা সূর্য ডোবার পর প্রার্থনা সঙ্গীত গায়। এর কারণ হল মানুষের সংঘবদ্ধ উপস্থিতি বন্য প্রাণীদের জানান দেওয়া। যাতে তারা রাতে গ্রামের কাছে না ঘেঁষে।
দীর্ঘ সময় ধরে মাসাইদের সম্মিলিত সঙ্গীত ধ্বনি চলল। তারপর আচমকাই তা নেমে গেল। রাতের খাবার সেরে নিল সুদীপ্তরা। এরপর যখন তারা শোবার আগে গাড়ির পিছনের অংশের ক্যানভাসের পর্দাটা নামাতে যাবে ঠিক তখনই সেখানে উঁকি দিল একটা মুখ। একজন মাসাই এসে উপস্থিত হয়েছে সেখানে। সে উঁকি দিচ্ছে গাড়ির ভিতরে। তাকে দেখে হেরম্যান জানতে চাইলেন তুমি কি কিছু বলতে এসেছ?’
মাঝবয়সি লোকটা প্রশ্ন করল ‘আপনারা কি এখানে জংলী প্রাণী দেখতে এসেছেন?’
হেরম্যান জবাব দিলেন ‘হ্যাঁ, কিন্তু কেন বলত?’
লোকটা বলল ‘আমার নাম বারকিন। এ গ্রামে থাকি। গাইডের কাজ করি। আপনাদের লুমানির ঘর থেকে বেরোতে দেখলাম। তার সাথে কি চুক্তি হয়ে গেছে?’
হেরম্যান বললেন চুক্তি হয়নি। তবে জঙ্গল দেখাবার ব্যাপারে কিছু কথাবার্তা হয়েছে তার সাথে।’
বারকিন নামের লোকটা বলল ‘ওর সাথে চুক্তি না হয়ে থাকলে আপনারা জঙ্গল দেখাবার ব্যাপারে আমার সাথে চুক্তি করতে পারেন। সিংহ হাতি তো দেখাবই এমন কী দুর্লভ কুডু হরিণও দেখাব। অন্য কোনো গাইড তা দেখাতে পারবে না। আর দেখাব কেশরহীন সিংহ। সেটাও আপনাদের কেউ দেখাবে না।
হেরম্যান বললেন ‘দেখ, লুমানির সাথে কিছু কথা হয়েছে আমাদের। দেখি আগে সে কি বলে?’
বারকিন বলল ‘শুনলাম কাগজে নাকি কি লেখা হয়েছে লুমানির সম্বন্ধে? আর তা দেখেই আপনারা ওর সাথে দেখা করতে এসেছেন? কি লিখেছে কাগজে?’
হেরম্যান আসল কথাটা এড়িয়ে গিয়ে মৃদু হেসে জবাব দিলেন ‘লিখেছে লুমানি একজন ভালো গাইড।’
বারকিন কথাটা শুনে এবার উষ্মা প্রকাশ করে বলল ‘কাগজে কথাটা ঠিক লেখেনি। এক সময় সে ভালো গাইড ছিল ঠিকই তবে এখন আর নয়। বুড়ো হয়ে গেছে লুমানি। চোখেও কম দেখে। জঙ্গল দেখাবার নাম করে ও শুধু ওরই মতো একটা বুড়ো দাঁতালকে দেখায়। ওর সঙ্গে গেলে পয়সা জলে যাবে আপনাদের। তাছাড়া বাওয়ানাদের বিপদও হতে পারে। জঙ্গলে তো বিপদ ওৎ পেতে থাকে। আপনারা হয়তো বুঝতেই পারবেন না যে ঘাস বনের আড়ালে অপেক্ষা করে আছে ক্ষুধার্ত সিংহ। আর লুমানি হয়তো সেখানেই আপনাদের নিয়ে ফেলল। এভাবে অনেক টুরিস্টের মৃত্যু হয়েছে।’
লোকটাকে এবার ফেরত পাঠানো দরকার। হেরম্যান বললেন ‘তোমার কথা শুনলাম। তুমি এবার যাও। তেমন হলে তোমাকে ডেকে নেব আমরা। আমরা অনেকবার আফ্রিকা এসেছি। জঙ্গলে ঘোরার কিছু অভিজ্ঞতা আমাদেরও আছে।’ হেরম্যানের কথা শুনে বেশ অসন্তুষ্ট ভাবেই রওনা দিল অন্যদিকে।
ক্যাম্বিসের ঝাপটা ফেলে দিয়ে সুদীপ্ত বলল, ‘লোকটা লুমানির প্রতি প্রসন্ন নয় বলেই মনে হয়।’
হেরম্যান বললেন ‘সব পেশাতেই এক ব্যাপার। এদের নিজেদের মধ্যেও খদ্দের ধরার প্রতিযোগিতা চলে। তাই লুমানির থেকে আমাদের ভাঙাতে এসেছিল। দেখা যাক লুমানি কাল সকালে আমাদের কি বলে?
নাইরোবি থেকে সরকারি অনুমতি পত্র সহ দুটো রাইফেল ভাড়া নিয়ে এসেছে সুদীপ্তরা। তবে তা শিকারের জন্য নয়। তারই একটাতে গুলি ভরে মাথার কাছে নিয়ে গাড়ির ভিতর শুয়ে পড়ল তারা।
সারা গ্রাম যেন রাত্রি নামার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল। গ্রামের কোথাও কোনো শব্দ নেই। হেরম্যান আর সুদীপ্ত তাদের আগের আফ্রিকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আলোচনা করতে লাগল। মাদগাস্কারে রাক্ষুসে গাছকে চাক্ষুস করা ছাড়া অন্য ক্ষেত্রগুলোতে তারা তেমন সফলতা লাভ করেনি। যদিও সে অভিযাগুলোতে তাদের অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে প্রচুর। এবারও ‘কিনিয়া টাইমসের ইন্টারনেট সংস্করণে বরটা পড়েই তারা আবারও আফ্রিকা ছুটে এসেছে। গত অভিযানে ভিয়েতনামে প্রাগৈতিহাসিক কচ্ছপের সন্ধান মেলায় সেই সফলতা ও অভিযানের উৎসাহ জুগিয়েছে অনেকাংশে। সে কথা ভেবেই হয়তো হেরম্যান একবার স্বগোতক্তি করলেন ‘কচ্ছপের যদি দাঁত থাকতে পারে তবে ম্যামথের উপস্থিতিও অসম্ভব নয়। সেই প্রাগৈতিহাসিক দাঁতঅলা কচ্ছপের থেকে বয়সের বিচারে ম্যামথ অনেক নবীন।”
নিস্তব্ধ রাতে একসময় বেশ দূর থেকে বার কয়েক একটা প্রাণীর ডাক ভেসে এল। আফ্রিকার জঙ্গলে সুদীপ্তদের বেশ কয়েকবার রাত্রিবাসের অভিজ্ঞতা থাকায় সে ডাক সুদীপ্তদের কাছে পরিচিত। সিংহর ডাক! সুদীপ্ত বলল ‘পশুরাজ সম্ভবত নৈশ বিহারে বেরিয়েছেন।’
নানা কথা বলতে বলতে ঘুম নেমে এল সুদীপ্তদের চোখে।
