Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/27
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

ম্যামথের খোঁজে – ৩

পাখির ডাকে ভোরের আলো ফুটলো সোয়াহিলি গ্রামে। পর্ণ কুটির ছেড়ে দৈনন্দিন কাজের জন্য বাইরে বেরোতে শুরু করল মানুষজন। কেউ পশু চরানোর কাজে, কেউ ছোটখাট প্রাণীর শিকার করতে, কেউ বা কাঠ বা জল সংগ্রহর কাজে। গাড়ি থেকে সুদীপ্তরাও বাইরে বেরিয়ে এলো। চারদিকে মনোরম পরিবেশ। হেরম্যান দূরে ঘাস জমির দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন ‘ওই দ্যাখো।’

সুদীপ্ত দেখতে পেল গ্রামের খুব কাছেই ঘাস বনে চরে বেড়াচ্ছে একদল অ্যান্টিলোপ। হরিণের সাথে এদের পার্থক্য হল হরিণের মতো অ্যান্টিলোপের শিং শাখাপ্রশাখা যুক্ত হয় না। অ্যান্টিলোপের দীর্ঘ শিং-এ কোনো শাখা হয় না। ভোরের নতুন সূর্যের আলোতে ঝলমল করছে তাদের পিঠ। অপূর্ব দৃশ্য! আর এর পরই সুদীপ্তদের সামনে এসে হাজির হল বৃদ্ধ গাইড লুমানি।

লুমানির সাথে সুপ্রভাত বিনিময়ের পর হেরম্যান বললেন ‘তুমি কি ভাবলে বলো?’ লুমানি বলল ‘ভেবে দেখলাম আমি আপনাদের সঙ্গে যাব। এমনিতেই আমি যথেষ্ট বুড়ো হয়েছি। আর কদিন পরই মরণের ডাক চলে আসবে। তার আগে ভাগ্য ফেরাবার শেষ একটা চেষ্টা করে দেখি। যদি সেই কবরখানা থেকে কিছু দাঁত নিয়েও ফিরে আসতে পারি তবে বাকি কটা দিন ভালোভাবে বাঁচতে পারব। তবে একটা কথা। আমার পারিশ্রমিক হাজার ডলার কিন্তু আমাকে অগ্রিম দিতে হবে। ঘরে রেখে যাব। যদি আমি আর না ফিরি তবে সেটা আমার বিধবার কাজে লাগবে।”

হেরম্যান বললেন ‘ধন্যবাদ তোমাকে। পুরো টাকাটাই আমি অগ্রিম দেব।’

লুমানি বলল ‘তবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে। দু-দিন আগেই রওনা হয়ে গেছে প্রাণীটা। হয়তো সে আজই ঘাসবন পেরিয়ে ফাঁকা জমিতে পড়বে। সে জমিটা পেরোতে তার দিন তিনেক সময় লাগবে। তারপর বাঁশবন পেরিয়ে সেই পাহাড়ের শুরু। ঘাসবনের শেষ মাথা পর্যন্ত গাড়িতেই যাব আমরা। আশা করি কাল দুপুরের মধ্যেই আমরা ঘাস বনের শেষ মাথায় পৌঁছে যাব। তারপর গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না। উন্মুক্ত প্রান্তরে গাড়ি চোখে পড়ে যাবে হাতিগুলোর। তাছাড়া তেলের গন্ধও তারা পাবে।’

সুদীপ্ত বলল ‘জঙ্গলে বা ফাঁকা প্রান্তরে দীর্ঘ দিন হাঁটার অভ্যাসও আমাদের আছে। অসুবিধা হবে না আমাদের।’

হেরম্যান টাকা বার করে ধরিয়ে দিলেন লুমানির হাতে। টাকা নিয়ে চলে গেল লুমানি।

কিছু সময়ের মধ্যেই তৈরি হয়ে নিল সুদীপ্তরা। লুমানিও এবার এসে পড়ল। তার পরনে মাসাইদের চিরপরিচিত একটা লাল কাপড় কাঁধ থেকে হাঁটু পর্যন্ত কোনাকুনি ভাবে জড়ানো। বুকের এক প্রান্ত উন্মুক্ত। সেদিকে গলা থেকে সুতো দিয়ে বাঁধা এক গোছা সিংহর লোম ঝুলছে। মাথায় একটা কাঠের মুখোশ টুপির মতো করে পরা। হাতে দীর্ঘ ফলাযুক্ত একটা বর্শা আর মাকুর প্রাকৃতির লম্বাটে ধরনের বুক সমান উঁচু চামড়ার ঢাল। এছাড়া তার সাথে একটা থলেও আছে। ঢাল, থলে আর বর্শাটা গাড়ির ছাউনির ভিতর রেখে লুমানি হেসে বলল ‘আপনারা যদি সাধারণ টুরিষ্ট হতেন তবে সঙ্গে নেবার জন্য এত জিনিস লাগত না। সাধারণ টুরিস্টরা তো বন দেখে সন্ধ্যার আগে আবার গ্রামে ফিরে আসে।’

ল্যান্ড রোভারের সামনে এরপর তারা তিনজন উঠে বসল। বড় খাঁজ কাটা চাকাঅলা এই গাড়ি জঙ্গল ভ্রমণের উপযোগী। স্টিয়ারিং-এ বসল সুদীপ্ত। সে যখন গাড়ির এক্সিল চালু করল তখন আর একটা ল্যান্ডরোভার গাড়ি প্রবেশ করল গ্রামের মধ্যে। লুমানি বলল ‘নতুন টুরিস্ট এল মনে হয়। চলুন এবার আমরা যাত্রা শুরু করি।’

টেম্বো গ্রাম থেকে সুদীপ্তরা বেরিয়ে পড়ল। লুমানির নির্দেশ মতো প্রথমে ঘাসবনের দিকে সাধারণ টুরিস্টদের যাত্রাপথই ধরল তারা। ঘাস বনের ভিতর দিয়ে গাড়ির চাকার দাগ চলে গেছে। কিছুটা চলার পর রাস্তার পাশে প্রথমে এক ঝাঁক স্প্রিংবাক হরিণ চোখে পড়ল তাদের। তারপর ক্রমশ চোখে পড়তে লাগল নানা ধরনের হরিণ, অ্যান্টিলোপ। হেরম্যান বললেন ‘কাল রাতে সিংহর ডাক কানে এসেছিল।’ লুমানি বলল ‘সিংহ তো এখানে সর্বত্রই আছে। তবে তাদের বিশেষ পছন্দের জায়গা হল গাছে ছাওয়া প্রকাণ্ড উন্মুক্ত জমি। সেখানেই পরিবার নিয়ে থাকে তারা। এমনিতে পুরুষ সিংহ খুব অলস প্রাণী। শিকার ধরা আর তা খাবার জন্য ঘণ্টা খানেক সময় ছাড়া বাকি সময়টা তারা গড়াগাড়ি দিয়ে হাই তুলে ঘুমিয়ে কাটায়। তাদের শিকার করার মতো প্রাণীর তো অভাব নেই এখানে, যে জন্য তাদের শিকার ধরার জন্য বেশি পরিশ্রমও করতে হয় না। বরং পাহাড়ি অঞ্চলের কেশরহীন সিংহরা অনেক বেশি ধূর্ত, পরিশ্রমী।”

সুদীপ্ত জানতে চাইল “কেশরহীন সিংহ মানে কি ‘পুমা?’ কিন্তু সে তো লাটিন আমেরিকার প্ৰাণী।”

হেরম্যান বললেন ‘না পুমা নয়, এ হল আফ্রিকার কেশরহীন সিংহ। সাভোর যে বিখ্যাত নরখাদক সিংহর কথা সারা পৃথিবী জেনেছিল তা কিন্তু কেশরহীন সিংহই ছিল।”

এগোতে লাগল সুদীপ্তরা। এক সময় দূর থেকে বিরাট একটা হাতির পাল দেখতে পেল তারা। ঘাসবন হলেও মাঝে মাঝে দূরে দূরে দু-একটা বড় বড় গাছও আছে। তেমনই এক গাছ থেকে ডাল ভেঙে খাচ্ছে তারা। বিশাল বিশাল সব প্রাণী। আর তেমনই বিরাট বিরাট হাত পাখার মতো তাদের কান। দাঁতও সেই অনুপাতে বড়। হেরম্যান বললেন “এদের বলে ‘বুশ এলিফ্যান্ট’। আফ্রিকায় দু-ধরনের হাতি আছে। ঘাসবন বা উন্মুক্ত জমিতে চরে বেড়ানো এই বুশ এলিফ্যান্ট আর গভীর জঙ্গলে থাকা ‘জাঙ্গল এলিফ্যান্ট।’ তবে বুশ এলিফ্যান্টরা আকারে অনেক বড় হয়। দশ থেকে তেরো ফিট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে এরা। ওজন ধরে নাও কম-বেশি দু-হাজার কেজি। আর তাদের দাঁতও সেই অনুপাতে লম্বা হয়। ওজন হয় একশ থেকে কখনও কখনও দুশো পাউন্ডেরও বেশি। এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় যে হাতির দাঁত পাওয়া গেছে তা দৈর্ঘ্যে একশো আটত্রিশ ইঞ্চি অর্থাৎ এগারো ফিটেরও বেশি, আর তার ওজন ছিল দুশ চোদ্দো পাউন্ড!’

এক সময় তৃণভূমির মধ্যে গাড়ির চাকার দাগ শেষ হয়ে গেল। সূর্য ঠিক তখন মাথার ওপর। লুমানি বলল ‘সাধারণ টুরিস্টরা এ জায়গা পর্যন্ত আসে। নইলে গ্রামে ফিরতে অন্ধকার নেমে যায়। কিন্তু প্রকৃত সাভানা তৃণভূমি এরপর থেকেই, দেখতে পাবেন সেখানে কত ধরনের জানোয়ার আছে।’

সত্যিই এরপর বড় ঘাসের জঙ্গল শেষ হয়ে সাভানা তৃণভূমির উন্মুক্ত প্রান্তর চোখে পড়ল সুদীপ্তদের। লুমানির নির্দেশ মতো গাড়ি চালাতে লাগল সুদীপ্ত। তারা যত সাভানা তৃণভূমির গভীরে প্রবেশ করল ততই লুমানির কথা সত্যি প্রমাণিত হতে লাগল। ঝাঁকে ঝাঁকে হরিণ—অ্যান্টিলোপ তো আছেই তার সাথে কোথাও কোথাও চোখে পড়তে লাগল চিতার দল। কিছুটা তফাত থেকে একটা সিংহ পরিবারও দেখতে পেল তারা। মাঝ দুপুরে একটা ছোট জলা পড়ল পথে। লুমানির নির্দেশে সেখানে গাড়ি থামিয়ে সবাই মিলে গাড়ি থেকে নামল। জলার পাড়ে কাদামাটিতে থালার মতো গোলগোল চিহ্ন জেগে আছে। লুমানি সে জায়গা পরীক্ষা করে বলল ‘আমরা ঠিক পথেই এগোচ্ছি। এই গোল গোল দাগগুলো সেই রাজা হাতি আর তার সঙ্গীদের পদচিহ্ন। দেখে মনে হচ্ছে আজ সকালেই তারা এ জায়গা অতিক্রম করেছে। মন্থর গতিতে তারা চলছে। হয়তো বা দিনের শেষে তাদের দেখা মিললেও মিলে যেতে পারে।’

জলাটাকে বেড় দিয়ে আবার রওনা হল গাড়ি। লুমানি এরপর বলল হাতিগুলোকে যদি অনুসরণ করার ব্যাপার না থাকত তবে গাড়িতে কাল সন্ধ্যার মধ্যেই পাহাড়ের পাদদেশের বাঁশবনে পৌঁছে যেতাম। তারপর অবশ্য গাড়িতে যাওয়া সম্ভব নয়।’

সুদীপ্ত জানতে চাইল, ‘রাজা হাতিটার দেহরক্ষীরা কেমন দেখতে?’

লুমানি জবাব দিল “তারা দুজনেই পুরুষ দাঁতাল। উচ্চতা দশ ফুটের কাছাকাছি হবে। দাঁতের দৈর্ঘ্য অন্তত ছয় ফুটের কাছাকাছি। দেখলেই বুঝতে পারবেন।”

আবার থামা হল এক জায়গাতে। সেখানে হাতির টাটকা মল পাওয়া গেল। লুমানি ঠিক পথেই নিয়ে যাচ্ছে তাদের। সময় যত এগোতে লাগল তত তারা পেরিয়ে যেতে লাগল সাভানা তৃণভূমি। আর তার সাথে সাথে সূর্যও পশ্চিমে হেলে পড়তে লাগল। এক সময় শেষ হয়ে এল সাভানা। সুদীপ্তদের চোখের সামনে ভেসে এল দিগন্ত বিস্তৃত ফাঁকা জমি। ঘাসের কোনো চিহ্ন নেই সেখানে, শুধু সূর্যের তাপে ফেটে যাওয়া মাটি আর ধুলো। গাড়ি থেকে নামল সকলে। সেই জমির দিকে তাকিয়ে লুমানি বলল ‘এখানেই কোথাও আছে ওরা। আমরা এখানেই রাত্রিবাস করব, পরদিন মাঠে নামব।’

হেরম্যানের কাছে একটা শক্তিশালী ফিল্ডগ্লাস বা দুরবিন আছে। সেটা চোখে লাগিয়ে শূন্য জমিটার দিকে দেখতে দেখতে থেমে গিয়ে দুরবিনটা লুমানির হাতে তুলে দিয়ে বললেন ‘দেখতো ওরা কিনা?’

লুমানি দুরবিনটা মাঠের দিকে তাকিয়ে উৎফুল্লভাবে বলল ‘হ্যাঁ, বাওয়ানা ওরাই হবে। এদিকে অন্য কোনো হাতি আসে না। সুদীপ্তও এরপর দূরবিনটা চোখে লাগিয়ে দেখতে পেল মাইলখানেক দূরে মাঠের মধ্যে কটা কালো বিন্দু যেন নড়ছে

সুদীপ্তরা এরপর রাত্রিবাসের শুরু করল। শুকনো ঘাস জোগাড় করে এনে সূর্য ডোবার সময় একটা অগ্নিকুণ্ড জ্বালানো হল। পরদিন থেকে শুরু হবে তাদের আসল অভিযান। তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল তারা। অন্ধকার নামার পর থেকেই তাদের পিছনের সাভানা তৃণ ভূমি থেকে ভেসে আসতে লাগল নানা ধরনের বন্যপ্রাণীর ডাক। আফ্রিকার অরণ্য প্রদেশের নৈশ সংগীত। আর সেই সংগীত শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ল তারা।