Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/27
অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৪ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

ম্যামথের খোঁজে – ৯

পাহাড়ের গোলকধাঁধা শেষ হল এক সময়। সুদীপ্তরা একটা উন্মুক্ত স্থানে উপস্থিত হল। জায়গাটার চারপাশে পাহাড় ঘেরা। নানা দিক থেকে রাস্তা এসে মিশেছে সেখানে। জায়গাটার মাঝখানে ছোট্ট একটা হ্রদ। চাঁদের আলো ঝিলিক দিচ্ছে তার জলে। আর হ্রদের পাড়ে স্তূপীকৃত হয়ে পড়ে আছে হাতির দাঁত আর কঙ্কাল।—হাতিদের গেরস্থান-কবরখানা!

বৃদ্ধা সুদীপ্তদের নিয়ে উপস্থিত হলেন হ্রদের ধারে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা হাতির দাঁতগুলো চাঁদের আলোতে দুধের ফেনার মতো সাদা লাগছে। হ্রদের ধারে পড়ে থাকা দুটো হাতির দাঁতের ওপর মুখোমুখি বসলেন সেই বৃদ্ধা আর সুদীপ্তরা। চারপাশে স্তূপীকৃত হাতির দাঁত আর হাড়গোড়ের দিকে বিস্মিতভাবে তাকাতে তাকাতে সুদীপ্ত বলল ‘তাহলে হাতিতের গ্রেভইয়ার্ড সত্যিই আছে! এটাই সেই গেরস্থান।’

বৃদ্ধা হেসে জবাব দিলেন “হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ দুটোই বলা যায়।”

হেরম্যান বললেন ‘আসলে এ জায়গাটা হাতিদের বিশ্রামের জায়গা। তোমরা যেদিক থেকে এলে সেখান থেকে হাতিরা, বিশেষত বৃদ্ধ হাতিরা এখানে আসে, এখানে হ্রদের মিষ্টি জল পান করে কিছুদিন বিশ্রাম নেয় তারপর পাহাড়ের ওপাশে চলে যায় যেখানে আছে এক বিশাল চারণভূমি। শেষ জীবনে হাতিদের যেখানে খাবারের কোনো অভাব হয় না। আসলে এই পাহাড়ের বুক চিরেই তাদের যাত্রাপথ।

সুদীপ্ত বলল ‘তবে এখানে এত হাতির হাড়গোড় কেন?’

বেশ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বৃদ্ধা বললেন ‘এখানে যে সব হাড়গোড় পড়ে আছে তার সাথে এক ভয়ঙ্কর করুণ ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এক ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছিল এখানে। প্রায় সত্তরটা হাতিকে এক সাথে মেরে ফেলা হয়েছিল এখানে। পড়ে থাকা কঙ্কালগুলো অধিকাংশই তাদের।

হেরম্যান বিস্মিতভাবে বললেন ‘কেন? কী ভাবে?’

বৃদ্ধা আবারও বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন ‘আমার দিনতো প্রায় শেষ হয়ে এল, আজ তোমাদের সে কথা বলাই যায়। বহু দিন আগে, তা অন্তত পঞ্চাশবছর আগে এখানে এক তরুণী নৃতত্ত্ববিদের নেতৃত্বে পা রেখেছিল কয়েকজন লোক। এক সময় এ অঞ্চল ছিল ম্যামথের আবাসস্থল আর তার সাথে সাথে আদিম গুহাবাসী মানুষের বাসভূমি। প্রথম দফার অভিযানে এখান থেকে ম্যামথের কিছু ফসিল সংগ্রহ করে সভ্য পৃথিবীতে নিয়ে যায় তারা। হেরম্যান বলে উঠলেন ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি সেই ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদের কথা পড়েছি। তাঁর নাম ছিল ব্রিটনি। কিন্তু দ্বিতীয়বার অভিযানে এসে তিনি সিংহের কবলে মারা যান।’

বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন ‘ওরা ফিরে গিয়ে তাই বলে ছিল বুঝি। ব্যাপারটা আমার জানা ছিল না। আমিই তো সেই ব্রিটনি।’ বৃদ্ধার কথা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল হেরম্যান আর সুদীপ্ত।

বৃদ্ধা বললেন ‘হ্যাঁ, দ্বিতীয় বারই সেই ঘটনাটা ঘটল। জনা সাতেকের দল নিয়ে আমি ম্যামথের খোঁজে উপস্থিত হলাম এ জায়গাতে। আমরা দেখতে পেলাম বিশাল সেই হাতির দল সমবেত হয়েছে এই হ্রদের ধারে। আমাদের সাথে দুজন শিকারিও ছিল। বন্য জন্তুদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সঙ্গে আনা হয়েছিল তাদের, শিকার করার জন্য নয়। কিন্তু এতগুলো দাঁতালকে দেখে লোভ পেয়ে বসল তাদের। এই বদ্ধ জায়গাতে হাতিগুলোকে মারা খুব সহজ। সেই শিকারি দুজন প্ররোচিত করল আমার সঙ্গীদের। লোভের বশবর্তী হয়ে তারাও তাদের সঙ্গ দিল। আমার কথা কেউ শুনল না। বীভৎস সেই দিনটা। পাহাড়ের মাথা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটছে আর আর্তনাদ করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে বিশালাকার নিরীহ প্রাণীগুলো। তাদের আর্তনাদ আজও অনেকসময় আমি ঘুমের মধ্যে শুনে আতঙ্কে জেগে উঠি! সারা দিন ধরে চলল সেই হত্যালীলা। দুটো অল্পবয়সি হাতি শুধু তারই মাঝে ছুটে গিয়ে লুকিয়ে পড়েছিল পাহাড়ের গোলকধাঁধায়। তারা ছাড়া আর কেউই বাঁচল না। হাতিগুলোকে মারার পর আলোচনায় বসল তারা। এতগুলো হাতির দাঁত তাদের কজনের পক্ষে নিয়ে যাওরা সম্ভব নয়। তাছাড়া সেদিন রাত থেকেই বর্ষা নেমেছিল। আকাশও যেন কেঁদে উঠেছিল এই নিদারুণ ঘটনায়। তারা ঠিক করল যে সময়ের মধ্যে এ জায়গা ত্যাগ করে চলে যাবে তারা। তারপর আবার ফিরে আসবে দাঁতগুলো সংগ্রহ করার জন্য। তবে তারা সিদ্ধান্ত নিল সভ্য পৃথিবীতে আমাকে ফিরিয়ে নেওয়া যাবেনা। তাহলে তাদের বিপদ ঘটবে। কারণ, কিছুতেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে পারছিলাম না আমি। তাই যাবার সময় আমাকে তারা হাত-পা বেঁধে ফেলে গেল পাহাড়ের পাদদেশের বাঁশবনে। তারপর আমাকে উদ্ধার করে বাঁদরের দল। ঘটনাচক্রে তার কদিন আগেই একটা আহত বাঁদরকে শুশ্রূষা করেছিলাম আমি।’—কথাগুলো বলে থামলেন ব্রিটনি।

সুদীপ্ত ব্যাগ্রভাবে বলে উঠল ‘তারপর? তারপর?’

বৃদ্ধা বললেন ‘মাস ছয়েক বাদে সেই লোকগুলো এখানে ফিরে এল ঠিকই। কিন্তু হাতির দাঁত তারা নিয়ে যেতে পারেনি। পাপ কাউকে ছাড়ে না। হাতির দাঁতের ভাগ নিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ে অধিকাংশই তারা সাবাড় হয়ে গেল। বাকিরা কিছু মরল এই বাঁদরদের হাতে, আর কিছু মরলো খিদে তৃষ্ণায় এই পাহাড়ি গোলোকধাঁধায় ঘুরে। আর আমি এখানেই রয়ে গেলাম বাঁদরগুলোর সাথে।’—এই বলে থেমে গেলেন বৃদ্ধা ব্রিটনি।

সুদীপ্ত বলল ‘আপনি সভ্য সমাজে ফিরে গেলেন না কেন?’

বৃদ্ধা জবাব দিলেন ‘সভ্য সমাজের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে গেছিল বলে। আমি দেখেছিলাম অর্থের লোভে মুহূর্তে কেমন বদলে যেতে পারে মানুষ! যেমন বদলে গেল তোমাদের সঙ্গী মাসাই গাইড। তাছাড়া ততদিনে আমার প্রাণরক্ষাকারী বাঁদরগুলোর সাথে আমার সখ্যতা গড়ে উঠেছে। সভ্য পৃথিবীতে আমার আত্মীয়-স্বজন বলতে আমার কেউ ছিল না। বাঁদরগুলোই হয়ে উঠল আমার মা-বাবা-ভাই-বোন। তাই এখানেই রয়ে গেলাম আমি। বছরের পর বছর কেটে গেল। এক এক করে বছর ঘুরতে ঘুরতে প্রায় পঞ্চাশ বছর কাটতে চলেছে। এই পঞ্চাশ বছরে আরও কয়েকজন লোক অবশ্য এসেছিল এখানে। কিন্তু তারা কেউই বেঁচে ফেরেনি।”—এই বলে থামলেন বৃদ্ধা।

হেরম্যান বললেন ‘আপনি চাইলে আমাদের সাথে সভ্য পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারেন।

স্মিত হেসে বৃদ্ধা বললেন ‘না, যাব না। যে কটা দিন বাঁচি এখানেই থাকব। তাছাড়া আমি গেলে বাঁদরগুলো হয়তো অসহায় হয়ে পড়বে। লোভী মানুষের তো অভাব নেই। আবারও হয়তো কেউ হাতির দাঁতের লোভে হানা দেবে এখানে।

হেরম্যান বললেন “বাঁদরগুলোকে কিন্তু খুব ভালো ট্রেনিং দিয়েছেন আপনি। ওরাই তো আমাদের বাঁধন খুলে হাতির পিঠে চাপিয়ে আপনার কাছে পৌঁছে দিল।’

বৃদ্ধা বললেন হ্যাঁ, ওরা বুদ্ধিমান। ওই শিকারি আর তার সঙ্গীকে ওরাই ধরে এনেছি। আর হাতিরা তো এমনিই বুদ্ধিমান প্রাণী। হাতিগুলোর সাথে ওদের দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক

এরপর হেরম্যান হঠাৎ লেকের একটা অংশর দিকে তাকিয়ে বললেন ‘আরে আমাদের সেই হাতিটা না?’ কিছুটা দূরে লেকের একপাশে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল দাঁতাল। হ্রদের ধারে যে বড়বড় ঘাস জন্মেছে সেগুলো শুঁড়ে তুলে খাচ্ছে প্রাণীটা।

বৃদ্ধা বললেন ‘হ্যাঁ, ওটা তোমাদের সেই হাতিটাই। শেষ পর্যন্ত ও পৌঁছে গেছে এখানে। হয়তো কটা দিন এ জায়গাতে ও বিশ্রাম নেবে। তারপর পাহাড়ের ভিতর দিয়ে চলে যাবে ওপাশের চারণভূমিতে। বাকি জীবনটা সে ওখানেই কাটাবে। চন্দ্রালোকে হ্রদের ধারে বসে ভোরের আলো ফোটার জন্য সুদীপ্তরা অপেক্ষা করতে লাগল।

পুব আকাশে শুকতারা ফুটে উঠল এক সময়। তারপর আকাশের বুকে ধীরে ধীরে রঙ ধরতে লাগল। সেই বাঁদরগুলো ধীরে ধীরে আসতে শুরু করল জায়গাটাতে। হয়তো বা বৃদ্ধাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্যই। আর ঠিক যখন পাহাড়গুলোর মাথার আড়াল থেকে সূর্যদেব উঁকি দিলেন, ভোরের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়ল হ্রদের জলে ঠিক সেই সময় ম্যামথ দুটোও হাজির হল সেখানে। সুদীপ্তদের কিছুটা তফাতে এসে তারা দাঁড়াল বিস্মিতভাবে তাদের দেখে উঠে দাঁড়াল হেরম্যান আর সুদীপ্ত। তাদের যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না গত রাতে এই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর পিঠেই সওয়ার হয়েছিল তারা!

বৃদ্ধা এবার উঠে দাঁড়ালেন। ম্যামথগুলোর দিকে তাকিয়ে হেরম্যান, সুদীপ্তকে বললেন ‘একটাই আক্ষেপ যে ম্যামথগুলোর ছবি তোলা গেল না।’

কথাটা কানে যেতেই বৃদ্ধা বললেন ‘তোমরা যে কারণে ছবি তুলতে চাচ্ছ তাতে কোনো লাভ হবে না।’

হেরম্যান বললেন ‘মানে?’

সুদীপ্তদের চমকে দিয়ে হেরম্যানকে বৃদ্ধা বললেন ‘ওরা হল সেই দুটো হাতি যারা সেই- হত্যাকাণ্ডের সময় প্রাণে বেঁচে গেছিল। ওরা হাতি হলেও ম্যামথ নয়। ওদের গায়ে যে লোমের আবরণ দেখছ সেটা অনেকটা পোশাকের মতো পরানো হয়েছে। আর ওদের দাঁতগুলোও নকল। ওদের আসল দাঁত ছোট। তার ওপর খাপের মতো ওগুলো পরানো হয়েছে। এই পাহাড়ের অনেক জায়গাতে আদিম মানুষের আঁকা ম্যামথের ছবি আছে। তাদের অনুকরণে ওদের সাজিয়েছি আমি। যাতে সভ্য কোনো মানুষ ওদের দেখে ফেললেও যাতে তার কথা কেউ বিশ্বাস না করে, হাতি মারতে এদিকে না আসে।’

কথাটা শুনে হতাশায় ঝুলে পড়ল হেরম্যানের চোয়াল। তিনি বললেন ‘তবে আমাদের এখানে আসা ব্যর্থ হল!’ মৃদু চুপ করে থেকে বৃদ্ধা মার্টিন বললেন ‘ম্যামথের দেখা না পেলেও পুরোপুরি তোমাদের অভিযান ব্যর্থ হবে না। তোমরাতো অবলুপ্ত প্রাণী খুঁজে বেড়াও তাই না? দাঁড়াও তোমাদের কিছু জিনিস দেখাচ্ছি।’

বৃদ্ধা এবার বাঁদরগুলোর উদ্দেশ্যে অদ্ভুত কিছু শব্দ করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বাঁদর কিছু শুকনো ঘাস এনে মাটিতে রাখল। আর একটা বাঁদর কোথা থেকে যেন দুটো ছোট সাদা পাথর জোগাড় করে আনল। তারপর সুদীপ্তদের অবাক করে দিয়ে পাথর ঘসে আগুন জ্বালিয়ে ফেলল। এতেই শেষ নয়। বৃদ্ধা একটা বাঁদরকে নির্বাচন করে তার হাতে একটা কাঠি তুলে দিলেন। বাঁদরটা সেই কাঠি দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটির ওপর মোটামুটি একটা ম্যামথের অবয়ব এঁকে ফেলল!

বিস্ময় হতবাক হয়ে হেরম্যান কোনো কথা বলতে পারলেন না কিছুক্ষণ। তারপর তিনি বললেন ‘এরা কি তবে মানুষ আর বাঁদরের মধ্যবর্তী পিং-টং-লুয়াং প্রজাতির কোনো বাঁদর, যারা আগুন জ্বালতে জানত, পাথর ঘসে অস্ত্র বানাতে পারত, ছবি আঁকতে জানত? যারা কয়েক লক্ষ বছর আগে পৃথিবী থেকে অবলুপ্ত হয়ে গেছে বলে মনে করা হয়? এদের শেষ একটা প্রজাতি নাকি কয়েক হাজার বছর আগে ইন্দোনেশিয়াতে ছিল বলে কারও কারও ধারণা। সেখানকার রাজা চুলালঙকর্ণর দরবারে তারা বালক ভৃত্য হিসাবে কাজ করত।”

বৃদ্ধা হেসে বললেন ‘হ্যাঁ, এরা তেমনই।

হেরম্যান বললেন ‘এদের ছবি তোলা যাবে?’

বৃদ্ধা একটু ইতস্তত করে বলল ‘তোলো। তবে বাইরের পৃথিবীতে খবরটা দিও না। হয়তো তারপর এখানে লোক ছুটে আসবে এদের ধরে নিয়ে যাবার জন্য। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এরা এখানে বেঁচে আছে বংশপরম্পরায়। এদের, এদের মতোই বেঁচে থাকতে দাও।’

হেরম্যান বললেন “আপনি নিশ্চিত থাকুন এ ব্যাপারে।’—এ কথা বলার পর কোমরের পাউচ থেকে ক্যামেরা বার করে সেই অর্ধেক মানবদের কিছু ছবি নিলেন তিনি। তারপর নৃতত্ত্ববিদ ব্রিটনির পিছন পিছন ফেরার পথ ধরল সুদীপ্তরাও। আর তার সাথে সাথে সেই ‘পি টং লুয়াং বাঁদররা আর ছদ্মবেশী ম্যামথ দুটোও।

সুদীপ্তদের প্রথমে নিয়ে আসা হল বাঁদরদের সেই আবাসস্থলে। বন্দুক ফিরিয়ে দেওয়া হল তাদের। এরপর পাহাড়ের গোলোক ধাঁধা থেকে ফেরার পথ ধরল সুদীপ্তরা। তবে চোখ বাঁধা অবস্থায় নয়। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চললেন ব্রিটনি। আর তার সাথে আগের . মতোই চলল বাঁদরের দল আর হাতি দুটো। যে পথে সুদীপ্তরা এখানে এসেছিল সে পথে নয়, অন্য পথে সূর্যাস্তের ঠিক আগে একটা তোরণের মতো জায়গা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল তারা। হয়তো এই তোরণের কথাই তাদের বলেছিল লুমানি। বিদায় বেলায় সেই বৃদ্ধা সুদীপ্তদের উদ্দেশ্যে বললেন ‘ভালো থেকো। আর এ জায়গার কথা গোপন রেখো বাইরের পৃথিবীর থেকে। মানুষের লোভ বড় সাংঘাতিক। শুধু অর্থর লোভ নয়, খ্যাতির লোভও, আবিষ্কারের লোভও এই প্রাণীগুলোর জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ভুলো না এই প্রাণীগুলোও অর্ধেক মানুষ।’

হেরম্যান বললেন ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন এ ব্যাপারে। ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন এদের সবাইকে নিয়ে।’

হেরম্যানের কথা শুনে হাসলেন বৃদ্ধা। তারপর বাঁদরগুলোর উদ্দেশ্যে কি যেন বললেন। বাঁদর বা সেই অর্ধেক মানুষেরা সুদীপ্তদের উদ্দেশ্যে বলে উঠল ‘ওলা-ওলা, ওলা-ওলা!’ বিদায় সম্ভাষণ জানাল তারা সুদীপ্ত হেরম্যানকে। দুটো হাতির একটা হাতি এরপর হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। বৃদ্ধা তার পিঠে উঠে বসতেই হাতিটা উঠে দাঁড়াল। শেষ একবার হাতির পিঠ থেকে সুদীপ্তদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়লেন ব্রিটনি। হাত নাড়ল সুদীপ্ত- হেরম্যানও। বিদায়ী সূর্যের শেষ আলোতে বৃদ্ধাকে নিয়ে ধীরে ধীরে তোরণের মতো জায়গাটার ভিতর দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই ছদ্মবেশী ম্যামথ আর বাঁদরগুলো। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নামার পথ ধরল সুদীপ্ত আর হেরম্যান।

.

পরিশিষ্ট : চারদিন পরের ঘটনা। পাহাড়ের ঢালের নীচে সেই বাঁশবন। তারপর সেই রুক্ষ মাটির প্রান্তর পেরিয়ে সকাল নাগাদ সুদীপ্তরা প্রবেশ করেছে সাভানা তৃণভূমিতে। তাদের গাড়িটা যেখানে দাঁড়িয়েছিল। একদিনের মধ্যেই তারা পৌঁছে যাবে সভ্য পৃথিবীতে। গাড়িটার দিকে এগোতে এগোতে কিছুটা দূরে একটা বিশাল হাতি দেখতে পেল তারা। হাতিটা ভোরের আলোতে মহা আনন্দে ঘাস ছিঁড়ে যাচ্ছে আর জোরে জোরে তার বিশাল কুলোর মতো কান নাড়াচ্ছে। দূর থেকেও শোনা যাচ্ছে তার বিশালদুটো কান নাড়ানোর ফটফট্ শব্দ! হেরম্যান যখন গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে উঠতে যাচ্ছেন তখন সুদীপ্ত অনেকটা স্বগোতক্তির স্বরেই বলল ‘কী বিশাল কান হাতিটার!’

কথাটা শুনে গাড়িতে উঠতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে হাতিটার দিকে তাকালেন হেরম্যান। কয়েক মুহূর্তর মধ্যে হেরম্যানের মুখের ভাব কেমন যেন বদলে গেল। সুদীপ্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল ‘আপনার কি হল?”

হেরম্যান বলে উঠলেন ‘কি বোকা আমি! নিজেই নিজের কান মুলতে ইচ্ছা করছে!’

সুদীপ্ত বলল ‘কেন?’

হেরম্যান বললেন ‘ওই কানের জন্য।’

সুদীপ্ত বলল ‘হাতির কানের সাথে আপনার কানের কি সম্পর্ক! আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না।’

হেরম্যান হেসে ফেলে বললেন ‘বৃদ্ধা ব্রিটনি সম্ভবত একটা ব্যাপারে আমাদের সম্ভবত আমাদের ধোঁকা দিয়েছেন। আমাদের তিনি বিশ্বাস করলেও পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি। হয়তো তাদের সংখ্যা মাত্র দুটো বলেই এ ব্যাপারে তিনি কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি তাদের ছবি তুলতে নিরুৎসাহিত করেছেন আমাদের।’

সুদীপ্ত বলল ‘তার মানে?”

হেরম্যান বললেন ‘লক্ষ বছর আগে ম্যামথদের সাথে আজকের এই হস্তিকুলের শুধু গায়ের লোমের আর কাস্তের মতো বাঁকানো দাঁতের পার্থক্যই ছিল না। আর একটা জিনিসেরও পার্থক্য ছিল, তা হল কানের। ম্যামথের কান ছিল খুব ক্ষুদ্রাকৃতির। খেয়াল করে দেখ আমরা যে দুটো হাতিকে দেখেছিলাম তাদের কানও ছিল খুব ক্ষুদ্রাকৃতির। যে ব্রিটনি হাতিদের এত ভালোবাসেন, তিনি আজকের যুগের হাতিদের প্রাগৈতিহাসিক ম্যামথ সাজাবার জন্য গায়ে লোমের আবরণ বা নকল দাঁত লাগাতে পারেন ঠিকই, কিন্তু ম্যামথ সাজাবার জন্য হাতি দুটোর কান কাটার মতো নৃশংস কাজ নিশ্চয়ই করবেন না?’

সুদীপ্ত বলল ‘অর্থাৎ?’

সুদীপ্তকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলেন হেরম্যান। এঞ্জিন চালু করে এগোতে এগোতে তিনি বললেন। অর্থাৎ আমরা যাদের দেখেছি তারা ছদ্মবেশী ম্যামথ নয়, ম্যামথই ছিল!

সাভানা তৃণভূমি পেরিয়ে সভ্য পৃথিবীর দিকে এগিয়ে চলল হেরম্যান, সুদীপ্ত। আর তাদের অনেক পিছনে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন অন্য এক পৃথিবীতে হাতিদের কবরখানায় হারিয়ে গেলেন বৃদ্ধা ব্রিটনি আর তার শেষ ম্যামথরা।