Accessibility Tools

বইয়ের নাম - লেখক
আতঙ্ক সমগ্ৰ – কৌশিক মজুমদার
আতঙ্ক সমগ্ৰ – কৌশিক মজুমদার
0/26
আতঙ্ক সমগ্ৰ – কৌশিক মজুমদার

একানড়ে – কৌশিক মজুমদার

একানড়ে

ওই বুঝি বাবা এল…

প্রতিদিন ঠিক এমনটাই হয়। কাঁকর বিছানো পথে বাবার পায়ের আওয়াজ তিন্নি শুনতে পায় না কোনও দিনই। কিন্তু পোকো পায়। সারাদিন সোফার পাশে মুখ গুঁজে ঘুমানো কুকুরটা যেন বিদ্যুতের এক ঝটকায় সটান উঠে বসে। মুখ উঁচু করে বাতাসে কীসের গন্ধ শুঁকতে শুরু করে। আর তারপরেই পড়ি কি মরি করে ছুটে যায় বন্ধ দরজার দিকে। আঁচড়াতে থাকে বারবার। ততক্ষণে তিন্নিও শুনতে পায় বাবার পায়ের জুতোর মচমচ শব্দ।

তিন্নিদের বাড়িটা যেখানে, তার আশেপাশে আর একটাও বাড়ি নেই। বড়ো বড়ো গাছের ফাঁক দিয়ে প্রায় সারাদিন বৃষ্টি ঝরে পড়ে। বাতাসে শনশনে জোলো ঠান্ডা। তবে ঘরের ভিতরটা সদ্য কেনা লেপের ওমের মতো গরম। বাড়ি জুড়ে ম-ম করছে ঘরে বেক করা কেকের গন্ধ। আজ তিন্নির জন্মদিন। তিন্নি চকোলেট কেক খেতে ভালোবাসে। ও জানে বাবা অফিস থেকে ফেরার সময় ওর জন্য কিছু একটা নিয়েই ফিরবে।

কলিং বেল বাজতেই মা প্রায় দৌড়ে এসে দরজা খুলে দিল। বাবা ঢুকতেই পোকো বাবার বুকে দুই পায়ে লাফিয়ে উঠল। দরজা দিয়ে তিন্নি দেখতে পেল বৃষ্টি কমেছে অনেকটাই। সামনের লনের সাদা দোলনাটা এলোমেলো বাতাসে দোল খাচ্ছে। দূরে সবজে পাহাড় এখন ধীরে ধীরে কালচে বরন ধারণ করছে।

বাবা দরজা বন্ধ করে দিল।

তিন্নির বুকের কাছে হলদে ন্যাকড়ার ফালি জড়ানো একটা রবারের মেয়ে পুতুল। এটা তিন্নিকে কে কবে দিয়েছিল তিন্নির মনে নেই। পুতুলের ডান চোখ উপড়ানো, বাঁ হাতটা কাঁধের থেকে নেই, যেখানে চুল থাকার কথা, সেই মাথাভরা পেনের হিজিবিজি আর এদিক ওদিক ঝুলছে দুই-একটা সোনালি চিকচিকে সুতো। তিন্নি যেখানেই যাক, একে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া চাই-ই চাই। তিন্নি ওর নাম দিয়েছে সোনামণি।

বাবার হাতে লম্বাটে একটা বাক্স। গোলাপি ফুল ফুল। তাতে টকটকে রক্তলাল রঙের রিবন বাঁধা। তিন্নি জানে বাবা এবার ঠিক কী করবে।

.

“তিন্নি, তোমার বাবা কী করেন?” সুচেতা জিজ্ঞেস করল।

“বললাম তো চাকরি করে।”

“সে তো বুঝলাম। কিন্তু কোথায়?”

“তা তো জানি না… হ্যাঁ, মনে পড়েছে। অফিসে।”

“অফিসে। ঠিক। সে তো তুমি আগেও বলেছ। কিন্তু কোন অফিসে?”

“জানি না।”

“তোমাদের বাড়ি কোথায় ছিল?”

“পাহাড়ে।”

“কোন পাহাড়? বাড়ির নাম কী?”

“নাম জানি না। সেই পাহাড়ে সারাবছর বৃষ্টি পড়ে। বাবা বলে পরিদের কান্না।”

“তুমি পরিদের দেখেছ?”

তিন্নি উত্তর দেয় না। এরা বারবার এক প্রশ্ন করে ওকে বিরক্ত করে। সে দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে সোনামণিকে কোলে তুলে নেয়।

.

বাবা ফিক করে একটু হাসে। এক হাতে সেই বাক্সটা নিয়ে দুই হাত ছড়িয়ে সুর করে গানের মতো বলতে থাকে-

“কোথায় আমার চাঁদমণি
মিষ্টি হাসি মুখখানি
লাফিয়ে কোলে আয় দেখি মা
গাল ভরে দিই…”

এটুকু শুনেই তিন্নি আর থাকতে পারে না। দৌড়ে গিয়ে একলাফে চড়ে বসে বাবার কোলে। বাবাও তখন “হাজার চুমা” বলে তার দুই গাল চুমোতে ভরিয়ে দিয়ে বাক্সটা তিন্নির হাতে তুলে দেয়। তিন্নি বাক্সটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মা পাশ থেকে “খুলে দ্যাখো, বাবা তোমার জন্য কী এনেছে” বলে নিজেই রিবন খুলে দেয়। বাক্সের ভিতরে নীল মখমলের বিছানায় শুয়ে আছে অপূর্ব সুন্দর একটা পুতুল। বড়ো বড়ো বাদামি চোখ, সোনালি চুলের ঢল নেমেছে কাঁধ ছাড়িয়ে কোমর পর্যন্ত, ঠোঁটদুটো আপেলের মতো রাঙা। তিন্নি হাতে নিতেই পুতুলের পেটটা কেমন গুড়গুড় করে ওঠে আর ভিতর থেকে ভেসে আসে খিলখিল হাসির আওয়াজ। এত সুন্দর পুতুল তিন্নি আগে কোনও দিন দেখেনি।

“চলো এবার কেক কাটা যাক”, বলল মা।

টেবিলের চারদিক বেলুন দিয়ে সাজানো। এক কোণে বিরাট একটা কেক। উপরে মোমবাতি। তিন্নি এখন গুনতে শিখেছে। সে গুনতে থাকে- এক… দুই… তিন… চার… পাঁচ। বাবা কোলে করে তাকে টেবিলের উপরে উঠিয়ে দেন।

“সোনামণি? সোনামণি কোথায়? সোনামণিও কেক কাটবে আমার সঙ্গে।”

মা দৌড়ে গিয়ে কোচের উপর থেকে সোনামণিকে নিয়ে আসে। কেক কাটার সময় বাবা মা দুজনেই তালি দিয়ে গান করে, “হ্যাপি বার্থডে টু ইউ”। মা ভাত মেখে গরাস পাকিয়ে খাইয়ে দেয় তিন্নিকে। “এত বড়ো হয়েছিস তিন্নি মা, এবার নিজের হাতে খেতে শেখ।”

রাত হয়েছে। বৃষ্টি বাড়ছে বাইরে। সঙ্গে হাওয়ার আওয়াজ। মা হাত ধরে দোতলার শোবার ঘরে তিন্নিকে শুইয়ে দিয়ে বললে, “এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘুমিয়ে পড়ো দেখি। আমি আর বাবা একটু বাদেই আসছি।”

তিন্নি শুয়ে পড়ে। ঘুমায় না। চারিদিকের এই ভিজে ভিজে আবহাওয়ায় কাঠের দেওয়ালে জলের অদ্ভুত একটা ছাপ তৈরি হয়েছে কিছুদিন হল। আচমকা দেখলে মনে হয় একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। দুটো হাত অস্বাভাবিক লম্বা। সেই তুলনায় পা দুটো ছোটো। বাঁকা। তিন্নি ওদিক থেকে চোখ সরাতে পারে না। তিন্নি জানে এবার কী হবে। একানড়ের আসার সময় হয়ে গেছে।

.

“তুমি তোমার বাবা-মাকে একানড়ের কথা বলেছ তিন্নি?”

“নাহ।”

“কেন বলোনি?”

“বললে বাবা মা ভয় পাবে। হয়তো আমাকে নিয়ে অন্য ঘরে ঘুমাবে। আর সেটা হলে, সেটা হলে…”

তিন্নি চুপ করে যায়। হাতের কাপড় জড়ানো সোনামণির ন্যাকড়ার ফালি ক্রমাগত খুলতে আর জড়াতে থাকে। অচেনা একটা গানের সুর গুনগুন করে।

সুচেতা আবার প্রশ্নটা করে, “সেটা হলে কী হবে তিন্নি? বলো… আমাকে বলো… ভয় নেই। কিচ্ছু হবে না।”

তিন্নি উত্তর দেয় না। তারপর হঠাৎ মাথা তুলে বলে, “সেটা হলে একানড়ে আমার বাবা মাকে গলা টিপে মেরে গপ করে খেয়ে নেবে!”

“কে বলেছে তোমায়?”

“একানড়ে বলেছে।”

“একানড়ে কবে এল তোমাদের বাড়িতে? মনে আছে?”

“আসেনি তো! একানড়ে আমাদের বাড়িতে আসেনি। ও আগে থেকেই ছিল।”

“কবে থেকে?”

তিন্নি চুপ করে থাকে। ও জানে না। একানড়ে ওকে বলেছে ও নাকি এই বাড়ির শুরুর থেকেই আছে। ওর মা বাবা এই বাড়িতে আসার পর থেকেই।

“আচ্ছা, এটা বলো, এই একানড়ে কি দিনের বেলায় আসে কখনও?”

“না। একানড়ে আলো ভালোবাসে না। ও দিনের বেলায় লুকিয়ে থাকে।”

“কোথায়?”

“দেওয়ালের ভিতর।”

.

দেওয়ালের সেই ছাপটা নড়েচড়ে ওঠে। একানড়ে খাটের পাশের চেয়ারটায় এসে বসে। একানড়ের চুলগুলো লম্বা, খরখরে। গালে লম্বালম্বি একটা কাটা দাগ। গায়ে এলোমেলো নোংরা জামা। একানড়ে ঘরে এলেই ঘর জুড়ে একটা ঝিমঝিমে গন্ধে তিন্নির মাথা ধরে যায়। একানড়ে দুই হাত সামনে তুলে ধরে। প্রতিটা হাতে ছটা করে আঙুল। তাতে লম্বা লম্বা নখ। একানড়ের আঙুলগুলো কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো অদ্ভুতভাবে নাড়তে থাকে তিন্নির সামনে।

“গান গাও কেটি, গান গাও”

তিন্নি জানে এবার ওকে গান গাইতেই হবে। নইলে একানড়ে সোজা নেমে যাবে একতলায়। ডাইনিং রুমে। সেখানে মা বাবা খাওয়াদাওয়া করছে। একনড়ে তাদের ঘাড় মটকে গিলে খাবে।

তিন্নি খানিক চুপ থেকে গান ধরে—

“একানড়ে/ কানে করে/ তেঁতুল পাড়ে/ চড়ে চড়ে
এক হাতে তার নুনের ভাঁড়, আর এক হাতে ছুরি…”

.

“তোমার কী মনে হয় সুচেতা? তিন্নি সত্যি কথা বলছে?”

“প্রশ্নই ওঠে না স্যার। ছয় মাস হল ও আমাদের হোমে এসেছে। এই ছয় মাস একজনও ওর খোঁজ করেনি। পুলিশ ওর বর্ণনা শুনে দেশের সব হিল স্টেশনের পুলিশদের কাছে ওর ছবি, তথ্য পাঠিয়েছে। টিভিতে নানা চ্যানেলে বহুবার ওর ছবি দেওয়া হয়েছে। পেপারে নিরুদ্দেশ সম্পর্কিত ঘোষণা কলামে একাধিকবার ছবি সহ বিজ্ঞাপন দিয়েছি। কোনও লাভ নেই।”

“নতুন কিছুই বলছে না, তাই না?”

“না স্যার। স্কুলের কথা না, অন্য কোনও আত্মীয়র কথা না, বন্ধুর কথা না। শুধু বাবা, মা, কুকুর, পুতুল, আর…” এইটুকু বলে চুপ করে রইল সুচেতা। কী যেন বলতে গিয়েও ঢোঁক গিলে নিল।

“আর সেই একানড়ে… তাই তো? দ্যাট ইজ দ্য মোস্ট ইন্টারেস্টিং পার্ট”, বলে একটা সিগারেট ধরালেন ইনস্পেক্টর সুখরঞ্জন তালুকদার।

“ঠিক এই জায়গাতেই যত সমস্যা। তুমি বলছ মেয়েটার কল্পনাশক্তি তুখোড়। সে সবকিছু বানিয়ে বলে। যদি তাই হয়, তবে প্রায় দশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া লোকের এত নিখুঁত বর্ণনা সে দেয় কেমন করে?”

“আমিও তো সেটাই ভাবছি স্যার। কিন্তু তিন্নি যেমন মেয়ে, কার্শিয়াং-এর এই ছোটো হোমে ওকে বেশিদিন রাখা আমাদের পক্ষেও সম্ভব না। বোঝেনই তো। খরচাপাতির একটা ব্যাপার আছে। আপনিই বা কতদিন এভাবে চালাবেন? সরকারি কোনও হোমে যদি…”

“সে তো দেওয়াই যায় সুচেতা, কিন্তু তাহলে তিন্নি আমার হাতের বাইরে চলে যাবে। আমি আর কোনও দিন সেই কেসের সমাধান করতে পারব না।”

“আপনি এখনও আশা রাখেন স্যার?”

“অবশ্যই। আশাই তো সবকিছু! এই দুনিয়াই আশাই একমাত্র ভালো জিনিস। আর ভালো জিনিস মরিতে মরিতেও মরে না।” ম্লান হাসলেন সুখরঞ্জন।

“ব্যাপারটা একটু খুলে বলা যাবে স্যার? আসলে যখন ঘটনাগুলো ঘটেছিল তখনও আমি এই হোমে আসিনি।”

“বলার খুব বেশি কিছু নেই। তুমি জ্যাক দ্য রিপারের নাম শুনেছ তো? সেই উনিশ শতকে লন্ডনের রাস্তায় একের পর এক পতিতাদের খুন করত সে। গোটা লন্ডন পুলিশ হয়রান। আজ অবধি সেই কেসের সমাধান হয়নি। এও অনেকটা সেইরকম। বছর দশেক আগে এই কার্শিয়াং-এই ডাওহিলের দিকে রাস্তার পাশে এক নেপালি যুবতির মৃতদেহ পাওয়া যায়। গলা টিপে কেউ খুন করেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার একটাই, গলায় দশের বদলে বারোটা আঙুলের ছাপ

পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজেও কোনও ক্লু পায়নি। দিন পনেরো বাদে ঠিক একইভাবে ভুটিয়া বস্তিতে একটা মেয়ে খুন হল। তার কিছুদিন বাদে আরও একটা।

যখন আমরা প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছি, একদিন একটা টিপ পেলাম তিব্বতি এক বুড়ির থেকে। কার্শিয়াং থেকে দার্জিলিং যাবার রাস্তায় তার একটা ছোটো খাবারের দোকান আছে। সেখানে আকাশ নরবু নামে এক কর্মচারী কয়েকমাস হল রাঁধুনি হিসেবে এসেছে। কথা বেশি বলে না। কিন্তু কারও হুকুম তামিলও করে না। বেশি কিছু বললে ঠান্ডা চোখে এমনভাবে তাকায় যে বুড়ির অন্তরাত্মা শুকিয়ে যায়। গালে একটা কাটা দাগ। দেখলে মনে হয় ছুরির আঘাত হবে।

যাই হোক, সেই বুড়ির থেকে টিপ পেয়ে একদিন মাঝরাতে আমি ফোর্স নিয়ে হামলা করলাম। নরবু বুড়ির রান্নাঘরেই রাত কাটাত। আমরা ঘরের চারিদিক ঘিরে ধরতেই কোন গোপন পথে সে পালাতে গেল। আমার হাবিলদার লোবসাং দেখে ফেলেছিল। আমরা পিছু ধাওয়া করলাম। বারবার থামতে বললেও নরবু থামছিল না। পাহাড়ের গা বেয়ে টিকটিকির মতো সে এঁকেবেঁকে ক্রমাগত দূরত্ব বাড়াতে লাগল। এদিকে জমাট কুয়াশা নেমে আসছে। এরপর আর দেরি করলে নরবুকে ধরা যাবে না।

আমি বাধ্য হয়ে গুলি চালালাম। নরবু মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। কাছে গিয়ে দেখি এক গুলিতেই সাবাড়। বুড়ি যেমনটা বলেছিল, হাতে বারোটা আঙুল। প্রতি আঙুলে লম্বা নখ। গালে কাটা দাগ। অনেক চেষ্টা করেও নরবুর চেনাশোনা কাউকে খুঁজে বার করতে পারিনি। লাশের দাবিদারও কেউ ছিল না। আমরাই পুড়িয়ে ফেলি। আসল সমস্যা শুরু হয় তার পর থেকে…”

“কীরকম?”

“একদিন সেই তিব্বতি বুড়ি দৌড়াতে দৌড়াতে আমাদের কাছে এসে হাজির। সে নাকি বাজার যাবার সময় নরবুকে দেখেছে। নরবু স্থির, ঠান্ডা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমরা বুড়িকে বোঝালাম, সে ভুল দেখছে। এমনটা হতেই পারে না। বুড়ি মানতে নারাজ। কোনওক্রমে বুঝিয়েসুজিয়ে তাকে বাড়ি পাঠালাম। না পাঠালেই ভালো হত হয়তো। পরদিন খবর পেলাম বুড়িকে তার নিজের বিছানাতেই কে যেন গলা টিপে খুন করে গেছে। গলায় ছয় ছয় বারোটা আঙুলের দাগ।”

“বলেন কী?” প্রায় আর্তনাদ করে উঠল সুচেতা। “কিন্তু নরবুকে তো…”

“আমি সেই খবরও নিলাম। পোড়ানোর সময় আমি ছিলাম না। শুনলাম যখন বডি আধপোড়া হয়েছে, তখন নাকি তুমুল বৃষ্টি নামে। পুলিশরা ডোমের হাতে বাকিটা ছেড়ে পুলিশ স্টেশনে চলে আসে।”

“কিন্তু তাতে কী দাঁড়ায়? মরা মানুষ তো জ্যান্ত হয়ে উঠবে না?”

“ঠিক। এতদিন আমিও তাই ভাবতাম। তারপর তিন্নি এল।”

.

গান গাইতে গাইতে তিন্নির দুচোখ ঘুমে ঢলে এল। যখন তাকাল, চমকে দেখল ঘরের সব আলো কে যেন এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিয়েছে। গোটা ঘর অন্ধকার। বিরাট একটা হলঘরে লোহার ছোট্ট বেডে শুয়ে আছে সে। চারিদিকে গার্ড রেলিং দেওয়া। জানলা দিয়ে ফ্যাকাশে চাঁদের আলো ঢুকছে ঘরে। শক্ত সরু বালিশের একপাশে মুখ থুবড়ে সোনামণি উলটে পড়ে আছে। চোখ একটু সয়ে যেতে না যেতে তিন্নি বুঝতে পারল, এই ঘরে সে একা না। পাশাপাশি অনেকগুলো লোহার খাট একের পর এক রাখা। আর প্রতিটাতেই কারা যেন সব শুয়ে আছে। সাদা চাদর জড়ানো। কেউ ঘুমিয়ে বিড়বিড় করছে। কেউ বা কেঁদে উঠছে ঘুমের মধ্যেই। এরা কারা? তিন্নি এখানে চলে এল কীভাবে? ভয়ে তিন্নির সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। তিন্নি আবার সেই ভয়ানক স্বপ্নটা দেখছে।

.

“একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করো সুচেতা, ঘুম স্টেশনের স্টেশনমাস্টার যখন তিন্নিকে খুঁজে পেল, তিন্নি তখন আপন মনে স্টেশনের বেঞ্চে বসে পুতুল নিয়ে খেলছে। কে তাকে ওখানে রেখে গেল, কেনই বা রেখে গেল, কিছুই আমরা জানি না। তিন্নি যা গল্প বলে তাতে মনে হয় তার বাবা এই পাহাড়েই রীতিমতো ওয়ে টু ডু ফ্যামিলির মানুষ। তিন্নির পোশাক দেখেও সে কথা মনে হয়। আর যদি তাই হয়, এতদিনের এত চেষ্টার পরেও কেন কেউ তার খোঁজ নিচ্ছে না? স্বচেয়ে বড়ো কথা, আকাশ নরবুর ব্যাপারে সে অসম্ভব অ্যাকুরেট। একমাত্র পুলিশের পক্ষে যা জানা সম্ভব, তা ওই পাঁচ বছরের বাচ্চা জানল কীভাবে?”

“সেই একানড়ের গল্পটা। তাই তো স্যার?”

“একদম। আর নামের মিলটাও দ্যাখো। আকাশ নরবু। একানড়ে। হাতের বারোটা আঙুল। গালে কাটা দাগ। লম্বা চুল। নেপালি…

“নেপালি, সেটা কীভাবে বোঝা গেল?”

“আমি বারবার তিন্নির বয়ান রেকর্ডে চালিয়ে শুনেছি। মোটামুটি একই কথা। তবে একবার তিন্নি বলেছে একানড়ে তাকে কেটি বলে ডাকে। নেপালিতে কেটি মানে ছোটো মেয়ে।”

“কিন্তু কাকতালীয়ও তো…”

“একটা দুটো ঘটনা কাকতালীয় হয় সুচেতা। এতগুলো নয়। সব অসম্ভবকে সরিয়ে রাখলে একটা সম্ভাবনাই পড়ে থাকে। আর সেটা বড়ো ভয়ানক।

“কী সেটা?”

“আকাশ নরবু আবার ফিরে এসেছে।”

.

দরজা খুলে একফালি আলো ঢুকল ঘরে। তিন্নি চেনে একে। বারবার ঘুরে ঘুরে এসে নানারকম প্রশ্ন করে। উত্তর না দিতে চাইলেও প্রশ্ন করেই যায়।

“তুমি এখনও ঘুমাওনি তিন্নি?” ফিসফিস করে বলল মেয়েটা।

“আমার ঘুম পাচ্ছে না।”

“আচ্ছা, তবে আমার সঙ্গে অফিস ঘরে চলো”

তিন্নি যায় না। চুপ করে বসে থাকে।

“ওখানে তোমার জন্য নতুন একটা পুতুল রাখা আছে। তুমি খেলবে ওর সঙ্গে? আরও আছে। অনেক অনেক চকোলেট।”

তিন্নি চকোলেট খেতে ভালোবাসে। বিছানায় বসেই সে দুহাত বাড়িয়ে দিল। মেয়েটা প্রায় কোলে করেই তাকে নিয়ে অফিস ঘরে গেল। সেখানে উজ্জ্বল হলুদ আলো জ্বলছে। টেবিলের মাঝে সত্যিই একটা খুব সুন্দর মেয়ে পুতুল রাখা। মেয়েটা তিন্নিকে খানিক সেসব নিয়ে খেলতে দিল। তারপর তিন্নির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “তিন্নি, তুমি একানড়েকে দেখলে চিনতে পারবে?”

তিন্নি আগের মতোই খেলতে লাগল। মুখে কোনও জবাব দিল না। শুধু মৃদু ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।

“তবে শোনো, আমি তোমাকে একজনের ছবি দেখাব। তুমি শুধু বলবে একানড়ে এইরকম দেখতে কি না। ঠিক আছে?”

তিন্নির এবার ভয় ভয় করতে লাগল। মেয়েটা পিছন ফিরে একটা বড়ো ড্রয়ার থেকে কী যেন খুঁজছে। খুঁজে পেয়েছে। এবার হাতে করে একটা চৌকো কাগজের টুকরো হাতে নিয়ে তিন্নির সামনে ধরল। হলুদ আলোতে তিন্নি দেখতে পেল একটা লোকের ছবি। গালে কাটা দাগ, লম্বা চুল, বুকের উপর দুটো হাত রাখা। দুই হাতে মোট বারোটা আঙুল। আঙুলে লম্বা লম্বা নখ। চোখ বন্ধ।

.

লোকটা মরে গেছে।

একদৃষ্টে খানিক ছবির দিকে চেয়ে থেকেই চেপে চোখ বন্ধ করে ফেলল তিন্নি। মেয়েটা বুঝতে পারল কিছু গোলমাল।

“কী হয়েছে তিন্নি? চিনতে পারছ একে? আগে কোনও দিন দেখেছ?”

তিন্নি উত্তর দিল না। শুধু ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “আমি… আমি বাড়ি যাব। আমি কেক খাব… আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো। আজকে আমার জন্মদিন…”

.

জন্মদিনের দিন কত্ত আনন্দ হয়। পোকো সারা বাড়ি জুড়ে লাফালাফি করে। মা ওর জন্য একটা আলাদা কেক বেক করে। রঙিন কাগজের শিকলি দিয়ে গোটা বাড়ি সাজানো হয়। বাবা-মা তাকে কত্ত আদর করে। এই মেয়েটা পচা। এই মেয়েটাকে কেউ ভালোবাসে না। কেউ এর জন্মদিনে গান গায় না। এই মেয়েটা তিন্নির বন্ধু না। কিন্তু… কিন্তু ও তো সব জেনে ফেলেছে! এবার কী হবে?

.

“কী বলছ তিন্নি কেটি? ওই মেয়েটা সব জেনে ফেলেছে?”

“হ্যাঁ।”

“কী করে বুঝলে?”

“ওর কাছে তোমার ছবি আছে। আমি দেখেছি।”

একানড়ে কিছু বলে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। অন্ধকারে শুধু একটা বড়ো জমাট অন্ধকার দেখা যায়। তিন্নি সোনামণির গায়ের ন্যাকড়া জড়ায় আর খোলে।

বেশ খানিক পরে একানড়ে গম্ভীর গলায় বলে উঠল, “তাহলে কী হবে?”

“আমি জানি না। তুমি বলো।”

“ওরা আমাকে তোমার থেকে নিয়ে যাবে। আর তোমাকে তোমার সেই দুষ্টু কাকুটার বাড়ি নিয়ে ফেলে দিয়ে আসবে।”

তিন্নি এবার ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে থাকে। তিন্নি কিছুতেই দুষ্টু কাকুর বাড়ি যাবে না। কাকু ওকে মারে। খিদে পেলেও খেতে দেয় না। একানড়ে বলেছে আর কদিন বাদেই সে ওকে ওর আসল বাবা মায়ের কাছে নিয়ে যাবে। পাহাড়ের উপরে ওদের মস্ত বড়ো একটা সাদা বাড়ি আছে, বাড়িতে পোকো নামের একটা কুকুর আছে, ওর মা খুব ভালো কেক বানায়…

একানড়ে তিন্নির মাথায় হাত বোলায়।

“কেঁদো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“তুমি সব ঠিক করে দেবে?”

“না। তুমি সব ঠিক করে দেবে।”

.

মোবাইলের তীব্র আওয়াজে সুচেতা যখন চমকে উঠল তখন ঘড়িতে রাত আড়াইটে বাজে। হোম থেকে ফোন এসেছে। ফোন ধরতেই ভুটানি আয়া ইয়াংজি প্রায় চিৎকার করে উঠল, “তপাই ছিটো আউনুস ম্যাডাম। ছিটো।”

“কী ভয়ো?”

“টিন্নি…” বলতেই লাইন গেল কেটে। পাহাড়ে এই এক সমস্যা। টাওয়ার থাকে না। বাড়ি থেকে হোম হাঁটাপথ। রাতের পোশাকের উপরেই একটা গরম জ্যাকেট জড়িয়ে সুচেতা হোমের দিকে ছুটল। আকাশে ঘন মেঘ করেছে। যে-কোনও সময় বৃষ্টি নামতে পারে। হোমে গিয়ে দ্যাখে হুলুস্থুল কাণ্ড। তিন্নি কাটা পাঁঠার মতো চিৎকার করছে আর বিছানায় শুয়ে দাপাচ্ছে। তার চোখ বন্ধ। হোমের বাকি বাচ্চারা ভয়ে সিঁটিয়ে গেছে। আয়া তাদের নিয়ে অন্য ঘরে রেখে এসেছে। তাকে দেখেই হেড নার্স রাজশ্রী দাস দৌড়ে এল।

“রাতে তিন্নিকে ঘুমের ওষুধ দাওনি, রাজশ্রী?”

“দিয়েছি ম্যাডাম। রোজ যেমন দিই।”

“নিজের হাতে খাইয়েছিলে?”

“হ্যাঁ ম্যাডাম। রাতে দুধের সঙ্গে গুলে।”

“তাহলে?”

“ভালো করে দেখুন ম্যাডাম। তিন্নি কিন্তু ঘুমিয়েই আছে।”

এবার সুচেতা খেয়াল করল। তীব্র কোনও দুঃস্বপ্ন দেখলে যেমন হয়, ঘুমের মধ্যেই চিৎকার করছে তিন্নি।

“ওকে ওঠানোর চেষ্টা করোনি?”

“করতে গেলাম, কিন্তু ম্যাডাম, ওর গালের দিকে তাকিয়ে…” ভয়ে রাজশ্রীর গলার আওয়াজ বুজে এল।

তিন্নির ফর্সা ফর্সা গাল দুখানিতে যেন কোনও হিংস্র পশু নখ দিয়ে আঁচড়েছে। বিন্দু বিন্দু রক্ত জমা হয়েছে চেরা দাগগুলোতে। সুচেতা গুনে দেখল। ছটা ছটা করে মোট বারোটা আঁচড়ের দাগ। হে ভগবান!! তিন্নি তাহলে একেবারে মিথ্যে কথা বলছে না!

.

নাকের কাছে স্মেলিং সল্ট ধরতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল তিন্নি। চোখে অবাক বিস্ময়। যেন কিছুই হয়নি। চারিদিকে ভিড় দেখে সেও হতবাক। কেউ কিছু বলার আগেই সুচেতা সবাইকে হাতের ইশারায় ঘর থেকে চলে যেতে বলল। তিন্নির গাল জ্বালা করছে। সে গালে হাত বোলাচ্ছে। তিন্নির গালে যত্ন করে ক্রিম মাখিয়ে দিল সুচেতা। ঘণ্টাখানেক পর হোমের সবাই শুয়ে পড়লে সুচেতা ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করল তিন্নির সঙ্গে।

“স্বপ্ন দেখছিলে?”

“না…”

“তাহলে?”

“ও এসেছিল।”

“কে? একানড়ে?”

মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল তিন্নি।

“তারপর?”

“ও বলল ওকে গল্প শোনাতে। আমি বললাম, আমি তো গল্প জানি না। ও বলল, না বললে আমার বাবা মাকে গিলে খাবে। আমি একটাই গল্প জানি। সেটাই বললাম…”

“কী গল্প?”

“এক ছিল গ, এক ছিল ল আর এক ছিল প। একদিন তিন বন্ধু মিলে বনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। পথে পড়ল এক নদী। গ তো সাঁতার জানে। সে সাঁতরে পার হয়ে গেল। ল সাঁতরাতে পারে না। সে বলল, প ভাই, আমি তোমার পিঠে চেপে ওপারে যাব। হয়ে গেল গল্প।’

“তারপর?”

“গল্প শুনে একানড়ে রেগে গেল। বলল, পচা গল্প। ছাই গল্প। এই না বলে আমার দুই গালে খামচি দিয়ে আমার সোনামণিকে নিয়ে চলে গেল…” এই বলেই তিন্নি চিৎকার করে উঠল, “আমার সোনা… আমার সোনামণি কোথায়?”

“এখানেই কোথাও আছে… পড়ে-টড়ে গেছে হয়তো, দাঁড়াও। খুঁজে দিচ্ছি।”

প্রায় পনেরো মিনিট তন্নতন্ন করে খুঁজেও সুচেতা কোথাও সোনামণিকে দেখতে পেল না। যবে থেকে তিন্নি এই হোমে এসেছে, সোনা আর তিন্নি প্রায় অবিচ্ছেদ্য। এক মুহূর্তের জন্য তিন্নি ওকে চোখের আড়াল করে না। সুতরাং তিন্নি পুতুলটা হারিয়েছে, এ প্রায় অবিশ্বাস্য। কেউ পুতুলটা সরিয়েছে। কিন্তু কে হবে? ওই চোখ ওপড়ানো, হাতভাঙা পুতুল অন্য কোনও বাচ্চা নেবে না নিশ্চিত। একটাই সম্ভাবনা বেঁচে থাকে। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগে একবার করে ঘর মুছে যায় ঝাড়ুদার। হয়তো সে-ই মাটিতে পেয়ে বাতিল জিনিস ভেবে…

“তুমি একটু একলা থাকতে পারবে তিন্নি? আমি তোমার সোনাকে খুঁজে নিয়ে আসছি।”

তিন্নি ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল।

একতলায় একেবারে কোণের ঘরটা ঝাড়ুদারের। ওই ঘরে আগে কোনও দিন আসেনি সুচেতা। প্রয়োজন হয়নি। ঘরের দরজা খোলা। তালা নেই। শিকলিটা দেওয়া নেই, এমনকি আলোও নেই। কিংবা ছিল, নষ্ট হয়ে গেছে। তবে বারান্দার আলোতে সবই অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঘরে ঢুকে এদিক ওদিক তাকাতেই অন্য প্রান্তে ময়লা ফেলার বড়ো নীল ড্রামটা দেখতে পেল সুচেতা। থাকলে এখানেই থাকবে। ভিতরটা হাঁটকেপাঁটকে খুঁজল সে। নাহ। সোনামণি কোথাও নেই।

“কিছু খুঁজছেন ম্যাডাম?” অপরিচিত পুরুষ কণ্ঠে চমকে উঠল সুচেতা।

ঘরের দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশালবপু পুরুষ। কিন্তু এ তো দারোয়ান না… আলো পিছনে থাকায় মুখটাও ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না।

“আপ… তুমি কে? কোথায় থাকো?”

“আমি তো এখানেই থাকি ম্যাডাম, এই হোমেই।”

“হোমে কোথায়?”

“দেওয়ালের মধ্যে”, বলতে বলতে লোকটা এগিয়ে আসতে লাগল। লোকটার হাতে কী একটা যেন ধরা। এই আবছা আঁধারেও সুচেতা খেয়াল করল, লোকটার হাতের নখগুলো অস্বাভাবিক লম্বা। লোকটা তখন সুচেতার বেশ কাছে চলে এসেছে। লোকটার গায়ে অদ্ভুত বোঁটকা গন্ধ। কোনও জীবন্ত মানুষের গায়ে এমন গন্ধ হতে পারে, সুচেতার তা ধারণার বাইরে ছিল। এবার তার ভয় ভয় করতে লাগল।

“আচ্ছা আমি আসি”, বলে পা বাড়াতেই লোকটা বলল, “সোনামণিকে নিয়ে যাবেন না ম্যাডাম? তিন্নি কেটি যে কাঁদবে।” বলতে না বলতে আকাশ চৌচির করে বিদ্যুৎ চমকাল। আর তাতেই লোকটাকে স্পষ্ট দেখতে পেল সুচেতা। এই মুখ, এই চুল, এই গালের কাটা দাগ তার চেনা। এই চোখ যা সে বন্ধ দেখেছিল তা এখন খোলা, সেই খোলা চোখ এই অন্ধকারেও দপদপ করে জ্বলছে শিকারি বাঘের মতো।

সুচেতা আর কিছু না ভেবে দরজার দিকে দৌড়াল। মাত্র কয়েক ফুট। কিন্তু এ কী! দরজা জুড়ে নাইটগাউন পরে তিন্নি দাঁড়িয়ে আছে কেন? তিন্নির চোখে রাগ, ঘৃণা, বিদ্বেষ মিশিয়ে অদ্ভুত এক দৃষ্টি। এ দৃষ্টি সুচেতা আগে কোনও দিন দেখেনি। সুচেতা দরজা থেকে আর মাত্র দেড়-দুই পা দূরে।

“তিন্নি….. তিন্নি….. একবারটি শোনো…”

তিন্নি কিচ্ছু না বলে এক ঠেলা দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। সুচেতা দরজার বাইরে থেকে ছিটকিনির শব্দ শুনতে পেল। পিছন থেকে একটা হাত কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো তার গলায় চেপে বসেছে। কিলবিল করছে তার ছটা আঙুল। আলাদা আলাদা ভাবে চাপ দিচ্ছে গলার শিরা উপশিরায়।

এবার একেবারে কানের কাছে মুখ এনে লোকটা বলল, “ম্যাডাম… একটা গান শোনাবেন?”

.

লেখকের জবানি- এখানে কোনও ভূত নেই। শুধু একটা ভয় আছে। তবে ন্যারেটিভ নিয়ে যে এক্সপেরিমেন্ট এখানে করেছি, তেমনটা আর কোনও গল্পে নেই। গল্পটি পূর্বে অপ্রকাশিত।