শেক্সপিয়রের এ মিডসামার নাইট’স ড্রিম অভিনয়
এন্ট্রান্স পাস করার সঙ্গে সঙ্গে শান্তিনিকেতনে আমার শিক্ষাজীবন সাঙ্গ হবার কথা ছিল। কেননা, সেখানে কলেজের পাঠদান তখনও শুরু হয়নি। কিন্তু কলেজে পড়ার জন্য বাবা আমাকে কোলকাতা পাঠাতে চাননি। আমাকে শান্তিনিকেতনেই থাকতে হল। এখানে ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে অর্ধশত পার হয়ে গিয়েছে। আমার ওপর ওদের মনিটরিং-এর ভার পড়ল। পাশাপাশি শিক্ষকদের কাছ থেকে যতটা পারি জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করলাম। বিধুশেখর ভট্টাচার্য বেনারস থেকে সবে এসেছেন। সংস্কৃত ও পালির জন্য তিনিই ছিলেন সে যুগের সেরা শিক্ষক। তাঁর পড়ানোর ধরন থেকে মনেই হতো না যে সংস্কৃত ভাষার সে দিন আর নেই। পাণিনির ব্যাকরণ কিংবা কালিদাস, ভর্তৃহরি প্রমুখের ধ্রুপদী সাহিত্য পড়িয়েই তিনি ক্ষান্ত দিতেন না; চাইতেন যেন আমরা সংস্কৃতে কথাবার্তাও বলি।
এমনি আরেকজন শিক্ষক ছিলেন মোহিতচন্দ্র সেন। আমার সৌভাগ্য যে তাঁর নিকট ইংরেজি পড়ার সুযোগ পেয়েছি। শেক্সপিয়রের এ মিডসামার নাইট’স ড্রিম পড়ানো শেষ হলে তিনি শান্তিনিকেতনে নাটকটির অভিনয় করাতে চাইলেন। ইংরেজি ভাষার, বিশেষত শেক্সপিয়রের নাটকে অভিনয় করার মত যোগ্যতা বা অভিনয় কুশলতা কি আর আমাদের ছিল? তবু আমরা তদ্দণ্ডেই রাজি হয়ে গেলাম। প্রস্তুতি সারতে উঠেপড়ে লাগলাম। অভিনয় করা থেকে কেউই রেহাই পেলেন না। শিক্ষকরাও না। অঙ্ক করাতেন জগদানন্দ রায়। তাঁকে দেয়া হল ওয়াল-এর চরিত্র। এ চরিত্রে কথা বলার ব্যাপার নেই বললেই চলে। সব মিলিয়ে হয়ত কয়েক লাইন হবে। তাতেও তিনি গুলিয়ে ফেললেন। অভিনয়ের সময় ঠিকঠাক মঞ্চে উঠলেন বটে, তারপর ‘In this same interlude it doth befall that I, one Snout by name, present a Wall’ পর্যন্ত বলে থেমে গেলেন। বাকিটুকু আর মনে নেই। এর দিকে তাকাচ্ছেন, ওর দিকে তাকাচ্ছেন, কেউ যদি পরের অংশটুকু ধরিয়ে দেয়। কিন্তু না, কেউ তাঁকে সাহায্য করতে পারল না। এইভাবে কিছুক্ষণ কেটে যাবার পর বাকিটুকু তাঁর নিজেরই মনে পড়ল। ‘And thus have I Wall my part discharged so’ বলে তিনি দৌড়ে নেমে গেলেন। পুরো হল হাসিতে ফেটে পড়ল। মঞ্চে তাঁর প্রথম আগমন যতই দুর্ভাগ্যজনক হোক না কেন বাবা কিন্তু তাঁকে রেহাই দিলেন না। তাঁর হাতে পড়ে তিনি ক্রমে দারুণ অভিনেতা হয়ে গেলেন। পরে বাবার নাটকগুলো যখন কোলকাতায় অভিনীত হয়, কুশলী অভিনেতা হিসেবে তিনি নাম করেন। বিশেষ করে শারদোৎসব নাটকে কৃপণ ব্যবসায়ী লক্ষেশ্বর-এর ভূমিকায় তাঁর অভিনয় ছিল নিখুঁত। মনে হয়েছিল যেন তাঁর অভিনয়ের জন্যই ওই চরিত্রের সৃষ্টি।
