ওল্ড র্যামন – ১১
এগারো
আকাশে চাঁদের আলো নেই এ মুহূর্তে। খুদে অগ্নিকুণ্ডটা তার সামান্য সামর্থ্য নিয়ে সাধ্যমতন লড়ে চলেছে অন্ধকারের সঙ্গে। পা বাঁকা করে ওটার কাছে বসা বুড়ো র্যামন, হাঁটু দু’হাতে জড়িয়ে ধরে তাতে চিবুক রেখেছে। কম্পমান ছোট ছোট অগ্নিশিখার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে কিছু একটা যেন আবিষ্কারের চেষ্টায় মশগুল। বাঁয়ে খানিকটা দূরত্ব রেখে বুদ্ধের ভঙ্গিতে বসে ছেলেটি, হাঁটুতে কনুইয়ের ভর দিয়েছে দেহ সামনে হেলিয়ে, সে-ও তাকিয়ে আছে অগ্নিকুণ্ডের দিকে।
‘এইটাই স্বাভাবিক,’ বলল বুড়ো র্যামন। ‘কুকুর মারা গেলে মনিরের ঘুম হারাম হয়ে যায় সেই রাতে।
শ্লথ, নিরুত্তাপ মুহূর্তগুলো কাটতে চাইছে না। অস্পষ্ট একটা মূর্তি এ সময় নীরবে আগুনের ওপাশ থেকে সন্তর্পণে উঠে দাঁড়াল।
‘হ্যাঁ, বলল বুড়ো র্যামন। ‘হ্যাঁ, পেদ্রো। আমাদের সঙ্গে এখন তোর কিছুটা সময় কাটানো দরকার।’
বুড়ো বাদামী কুকুরটা এগোল বুড়ো র্যামনের উদ্দেশে, মাঝপথে ছেলেটির পাশে থেমে মৃদু গুঁতো দিল নাক দিয়ে ওর দেহে। ‘আই,’ বলে উঠল বুড়ো র্যামন। ‘পেদ্রো সব বোঝে।’
ছেলেটি আচমকা বুড়ো কুকুরটাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মারমুখো হয়ে উঠল।
‘যা ভাগ! ভীতু কোথাকার!’
বুড়ো বাদামীটা স্বাভাবিক ভাবে বুড়ো র্যামনের কাছে সরে এসে শুয়ে পড়ল তার পাশে। খানিকটা সিধে হয়ে বুড়ো র্যামন সোজাসুজি ছেলেটির চোখে চাইল।
‘এর মানে কি?’
‘ও স্যাঞ্চোকে একা নেকড়ের মুখে ফেলে পালিয়ে চলে এসেছে আমাদের কাছে!’
শিখাগুলোর দিকে আবারও চোখ রাখল বুড়ো র্যামন।
‘হ্যাঁ। ও তাই করেছে। আর সেই কারণেই একটা ভেড়াও হারাতে হয় নাই আমাদের…সাহস দেখানো খুব ভাল কথা। কিন্তু সেইটাই সব না। বুদ্ধিরও দরকার আছে। আর পেদ্রো জানে… তোমার মনে রাখা উচিত ভাল শিপ ডগের একমাত্র চিন্তাই হচ্ছে ভেড়াদের ভাল-মন্দ। নেকড়ের সঙ্গে পেরে ওঠে না কোন কুকুরই। কয়োট হলে, হ্যাঁ। জঙ্গলের বিরাট বড় নেকড়ে, না। নেকড়ে শুধু বড়ই না, তার গতি আর হিংস্রতাও বেশি। বন্য জীবনের বল তার গায়ে। ওর চোয়াল হচ্ছে মারাত্মক এক ফাঁদ আর দাঁতগুলি আমার ছোরাটার মতন শত্রুকে চিরে ফালাফালা করে দেয়। চোখের নিমেষে তিন তিনটা ভাল জাতের কুকুরকে খতম করে দিতে দেখেছি একটা নেকড়েকে। আর তাই নেকড়ে হানা দিলে, ভাল শিপ ডগ সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে আসে মানুষ আর তার বন্দুককে জাগাতে। এর ফলে ভেড়ার পালকে বিপদমুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যায়। আর পেদ্রো জানে…’
‘জানুকগে, আমার কি।’ ভেঙে গেল ছেলেটির কণ্ঠ, অন্যদিকে মুখ ফেরাল সে। ‘কাপুরুষের বাচ্চা! জানে শুধু কিভাবে নিজের গা বাঁচাতে হয় সেটা! কিভাবে পালাতে হয় সেটা! বাহু আর হাঁটুর মধ্যে ডুবে গেল ওর মাথা
আগুনে চেয়ে রইল বুড়ো র্যামন। কথা বলল মোলায়েম স্বরে।
‘পেদ্রো। আমার পেদ্রোসিটো। শোন রে, এইখানে একজন মনে করছে তুই নাকি খালি নিজের গা বাঁচাস। বিপদের সামনে থেকে পালিয়ে যাস। ওর কাছে যা,ওকে তোর ওইপাশটা ধরে দেখতে দে।’
বাদামী কুকুরটা উঠে ছেলেটির কাছে গেলে বুড়ো র্যামন কথা বলে উঠল তীক্ষ্ণ স্বরে।
‘তোমার হাতটা বাড়াও। ওর গায়ের পাশে পশমের নিচে হাত দিয়ে দেখো।’
ছেলেটি ধীরে ধীরে খাড়া হয়ে বসে একটা হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করল কুকুরটাকে। আস্তে আস্তে ওর আঙুলগুলো নেমে দেবে যাচ্ছে কর্কশ অমসৃণ ঘন পশমে, চামড়ায় শক্ত হয়ে থাকা কয়েকটা দীর্ঘ শুকনো ক্ষতের স্পর্শ পেল। আরেকটু সিধে হয়ে হাতটা টেনে সরিয়ে নিল কিশোর এবং বুড়ো বাদামী কুকুরটা শরীর এলিয়ে দিল ওর পাশে।
‘নেকড়ে?’ বলল ছেলেটি।
‘না,’ বলল বুড়ো র্যামন। ‘নেকড়ে না। ভাল্লুক। মস্ত বড় এক গ্রিজলী ভাল্লুক।
তড়াক করে সোজা হয়ে বসল ছেলেটি।
‘বলো না।’
‘বলব। তুমি তখন অনেক ছোট, মায়ের সঙ্গে শহরে গেছিলে। ছয় বছর আগের কথা বলছি। হয়তো সাত বছরও হতে পারে। পিছন দিকে গুনে দেখতে হবে কিন্তু তার কোন দরকার নাই। আমরা, মানে আমি আর পেদ্রো আমার চাচাতো ভাই পাবলোর মেয়ের শাদী খেতে গেছিলাম। ফিরছিলাম পাহাড়ী পথে কারণ সেইটা ছিল শর্টকাট। আমার সঙ্গে রাইফেল আর
পিছন পিছন পেদ্রো। খুব তাড়াতাড়ি হাঁটছিলাম আমরা কারণ আমার মনিব, মানে তোমার বাবা, অনেক ভেড়া নিয়ে অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্যে। খুব উঁচু ট্রেইল ছিল ওইটা, রাস্তাও এমন খারাপ কি আর বলব, বড় বড় পাথরের মধ্য দিয়ে গেছে। হঠাৎ করে, কিভাবে জানি না, পাথরের ফাঁক-ফোকরে একটা বাঁক নিতে দেখি দাঁড়িয়ে আছে সে, ইয়াবড় এক ভাল্লুক,
খুব বে হলে বিশ ফিট দূরে। ওইটা এতটাই চমকে গেছে আমাদের দেখে যে মাথায় তখন লড়াইয়ের নেশা, খুনের নেশা চেপে বসেছে, সে কী ভয়ঙ্কর গর্জন ছাড়ল আর ইয়া ইয়া দাঁত বের করে তেড়ে আসল আমার দিকে। আর আমি, আমি, র্যামন, একজন বুড়ামানুষ আর জিন্দেগীতে এইসব কমও তো দেখি নাই, সে-ও ঘাবড়ে গিয়ে পিছু হটল আর একটা পাথরে পা বেধে পড়ে গেল আর তার রাইফেলটা ছিটকে চলে গেল হাত থেকে…
বুড়ো র্যামন বিরতি নিয়ে বাদামী কুকুরটাকে দেখছে। কুকুরটার মাথা খাড়া হয়ে রয়েছে ওর দিকে, অনুচ্চ চাপা শব্দ বেরোচ্ছে গলার ভেতর থেকে।
‘দেখো দেখো। ওর সম্পর্কে কথা বলছি ঠিকই বুঝতে পেরেছে। আর ভাল্লুকটার কথা। আর ওর ঠিকই মনে আছে।
ছেলেটিও চাইল কুকুরটার দিকে।
‘তারপর? তারপর কি হলো?’
‘ওই তো দশা তখন। পড়ে আছি মাটিতে রাইফেলটা নাগালের বাইরে আর ভাল্লুকটা গায়ের কাছে। আর আমার পিছনে ট্রেইল থেকে দমকা হাওয়ার মতন, খেপা ষাঁড়ের মতন, উড়ে আসল আমার পেদ্রো। ঝাঁটার কাঠির মতন গায়ের প্রতিটা পশম খাড়া হয়ে আছে আর সে-ও গর্জাচ্ছে হিংস্রভাবে আর সোজা ভাল্লুকটার ওপর গিয়ে পড়ল। আমি তখন কোনরকমে উঠে হামাগুড়ি দিয়ে রাইফেলটার দিকে যেতে লাগলাম, দেখতে পেলাম পেদ্রো কামড়ে ধরে আছে জন্তুটার গলার কাছে আর ভাল্লুকটা পিছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে মাথাটাকে আছড়াচ্ছে আর বাতাসে চাবুকের মতন ঝাঁকাচ্ছে পেদ্রোকে আর তারপর ওইটার প্রকাণ্ড একটা থাবা পেদ্রোর শরীরের একপাশে আঁচড় মারতে আলগা হয়ে গেল পেদ্রো তখন ওকে অনেক দূরে ছুঁড়ে মারল জানোয়ারটা। কিন্তু ওইটুকুই যথেষ্ট ছিল। আমার হাতে ততক্ষণে রাইফেল। নিশানা ভুল হলো না, ছোরা ব্যবহার করার দরকার পড়ল না। পেদ্রোর কাছে যখন দৌড়ে গেলাম ও তখন উঠে দাঁড়াতে পারছে না। জখম থেকে আঁতুড়ি বেরিয়ে এসেছে অনেকখানি। কিন্তু তখনও সমানে গর্জাচ্ছে, চোয়াল কট-কট করছে আর মাটিতে শরীর ছেঁচড়ে যেতে চেষ্টা করছে ভাল্লুকটার কাছে। আর আমি ওর চোখের দিকে তাকাতে, চোখ মুদে মরা লাশের মতন পড়ে রইল…’
ছেলেটি আবারও হাত বাড়িয়ে, আলতোভাবে কুকুরটার দেহের পাশে, কুঞ্চিত অমসৃণ পশমের ভেতরটা অনুভব করল।
‘তারপর?’
‘তারপর সাধ্যমতন ওর সেবা করলাম। ব্যান্ডেজ বানালাম শার্ট দিয়ে। রাইফেলে একটা দড়ি বেঁধে পিঠে ঝুলিয়ে ওকে বয়ে নিয়ে চললাম। একটুক্ষণ জোরে পা চালিয়ে তারপর ছুটতে লাগলাম আর আমি বুড়ামানুষ কাঁদতে কাঁদতে দৌড়াচ্ছি তারপর নিজেদের তাঁবুতে পৌঁছানোর পর পড়ে গেলাম আর কিছু জানি না। আর তারপর চেতনা আসতে দেখি তোমার বাবা, আমার মনিব, ডাক্তার এনেছে আর সে জানাল যে পেদ্রো এযাত্রা বেঁচে যাবে। আর পেদ্রো বেঁচে গেল…
বুড়ো র্যামন ছোট্ট অগ্নিকুণ্ডটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে, ছেলেটিও একটি হাত বাদামী কুকুরটার গায়ে রেখে সোজা হয়ে বসে তাকিয়ে রয়েছে আগুনটার দিকে। দীর্ঘ কয়েকটি ধীর মুহূর্ত কাটলে পর মুখ খুলল ছেলেটি।
‘তুমি কি মনে করো স্যাঞ্চো জানত, পেদ্রো আমাদের জাগাবে, তাই সে রয়ে গিয়েছিল নেকড়েটার সঙ্গে লড়তে?’
মাথা কাত করে কিশোরকে দীর্ঘ একটি মুহূর্ত লক্ষ করল বুড়ো র্যামন।
‘হতে পারে,’ ধীরে ধীরে বলল। ‘হ্যাঁ, হতে পারে…’ শরীর একটুখানি তুলল সে। ‘পেদ্রো। সময় হলো রে।’ চোখের পলকে কুকুরটা উঠে ছুট লাগাল রাতের অন্ধকারে।
ধিকিধিকি জ্বলছে আগুনের আভা, লোকটি এবং ছেলেটি চেয়ে রয়েছে নিভন্ত অঙ্গারের দিকে।
‘হ্যাঁ,’ বলল ছেলেটি। ‘মনে হয় এটাই হবে। মনে হয় পেদ্রো ছিল স্যাঞ্চোর বই আর স্যাঞ্চো ওকে লক্ষ করে করে শেখার চেষ্টা করত আর স্যাঞ্চো—’
‘চুপ করবে!’ শুকনো মাটিতে হঠাৎ দুম করে এক কিল মেরে বসল বুড়ো র্যামন। ‘র্যামন এখন ভাবছে। এই এলাকার দক্ষিণ দিক সম্বন্ধে সে যা জানে তাই নিয়ে ভাবছে…’
আগুন ক্ষীণতর হলো। সিধে হয়ে বসল বুড়ো র্যামন।
‘হ্যাঁ,’ বলল। ‘হ্যাঁ। এটা করা সম্ভব। আর ভেড়াদের কোন ক্ষতি না করে। উপত্যকার ওপর দিকে যে খাঁজটা আছে, যেইখান থেকে সূর্য ওঠে আমরা রওনা হব সেইখান দিয়ে। প্রতিদিনই পানি মিলবে পথে, সঙ্গে তাজা ঘাস। ‘আস্তেধীরে যাব আমরা যাতে ভেড়ারা পেট পুরে খেতে পারে। আর ‘পাঁচ দিনের মাথায় সাদা পর্বতের উপত্যকায় পৌঁছাব আমরা যেখানে আমার মামাতো ভাই ভিনসেন্টের ছোট্ট একটা. খামার আছে। দুই বছর আগে পেদ্রোর সঙ্গে মিলিয়েছিলাম ওর ক্লো নামের কুকুরটাকে। মনে হয় পেদ্রো আর বাবা হতে পারবে না কারণ সে তার মনিবের মতনই বুড়া হয়ে গেছে। তবে আমি শুনেছি ছানাগুলি নাকি সুন্দর বেড়ে উঠেছে। একটা নাকি ঠিক জোয়ান্তিকালের পেদ্রোর মতন। পেদ্রোর বাচ্চাদের মধ্য থেকে একটাকে বেছে নেয়ার দাবি আছে আমার…
ছেলেটি পিঠ সোজা করে বসে বুড়ো র্যামনের দিকে চেয়ে রয়েছে, অপেক্ষমাণ।
‘হ্যাঁ,’ বলল বুড়ো র্যামন। ‘হ্যাঁ। আমার মনিবের ছেলের জন্যে, আমার কুকুরের ছেলে। ব্যাপারটা ন্যায্য।’
‘ওহ…র্যামন…’ আর বেশি কিছু বলার চেষ্টা করল না ছেলেটি, বুড়ো র্যামনের মত তারও চোখ নিভন্ত আগুনে। এবার ঘাড় ফেরাল। ‘ওর কি কোন নাম আছে?’
‘নাম?’ বলল বুড়ো র্যামন। ‘আমি জানব কি করে? আমার মামাতো ভাই ভিনসেন্ট কিছু একটা নামে নিশ্চয় ডাকে ওকে। নাম দিয়ে কাম কি? মনিব নাম দেয়ার আগে কুকুরের কোন সত্যিকারের নাম থাকে না। কিন্তু আমি যদি এই মরা আগুনের পাশে বসা বাচ্চা ছেলেটা হতাম, তাহলে নিশ্চয় জানা থাকত ওইটার কি নাম রাখব…’
অলস মুহূর্তগুলো গড়িয়ে চলল এবং ওরা দু’জন চেয়ে চেয়ে দেখল নিভে গেল আগুন।
‘হ্যাঁ, বলল ছেলেটি। ‘জানি আমি। ওকে আমি স্যাঞ্চো বলে ডাকব।’
***
