ওল্ড র্যামন – ৪
চার
পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে সূর্য, পর্বতমালার চূড়াগুলোকে রক্ত রঙে রাঙিয়ে। প্রকাণ্ড প্রান্তরটা ভেসে যাচ্ছে ওটার তেরছা আলোয়, ছায়ারা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। একটা নিচু পাহাড়ের পাদদেশে ডোবায় জমে থাকা জল পান করছে পালের শেষ দলটা। বুড়ো র্যামন লাঠিতে ভর দিয়ে লক্ষ্য করছে ওদের। এবার আগে বেড়ে তাড়া লাগাল একটু দূরে জড়ো হওয়া দলের বাদবাকিদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্যে। ডোবার কাছে প্যাকগুলোর বাঁধন খুলে ছোট করে একটা আগুন জ্বেলেছে ছেলেটি, গর্দভটাকে খোঁটায় বেঁধেছে।
‘ওরা এখন একটু চরে বেড়াবে,’ ওর কাছে এসে বলল বুড়ো র্যামন। ‘তারপর শিগগিরই শুয়ে পড়বে। বেশি দূর ছড়াতে পারবে না, পেদ্রো ওদের ধরে রাখবে।’ কিশোরের ঝুঁকে পড়া পিঠে নজর ওর। ‘আর তোমার স্যাঞ্চো।’
ছেলেটি বুড়োর দিকে ঝট করে মুখ তুলে চাইল, চোখে কৃতজ্ঞ দৃষ্টি।
‘স্যাঞ্চো আজ লক্ষ্মী হয়ে ছিল। কিন্তু আমরা আজ বিকেল থেকেই তাড়াহুড়ো করছি। কেন?’
‘যাতে সময় মত এই ডোবার কাছে পৌঁছতে পারি,’ বলল বুড়ো। ‘আলো থাকতে থাকতে কিছু কাজ করতে চাই আমি।’ প্যাকগুলোর কাছে গিয়ে ওগুলোকে একত্রে বেঁধে রাখা একটা দড়ি খুলে নিল। ফিরে এল আগুনের পাশে। ‘আজকে পথে কোন নতুন কিছু চোখে পড়ে নাই তোমার?’
‘আমরা তাড়াহুড়ো করছিলাম। ব্যস, এইটুকুই তো।’
‘মারিয়াকে খেয়াল করো নাই? পেটের পাশটা কেমন মোচড়াচ্ছিল আর কামড়াতে চেষ্টা করছিল? ঝোপে কিভাবে গা ঘষছিল দেখো নাই? পাথরে কেমন করে আঁচড় কাটতে চাইছিল?’
দলের কাছে চলে গেল বুড়ো র্যামন। ক’মুহূর্ত পরে মারিয়াকে নিয়ে এল গলায় রশি পরিয়ে। সে হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে, দু’হাতে ওটার পা জড়িয়ে ধরে টেনে তুলতে এক পাশে ধপাস করে পড়ে গেল ভেড়াটা, আপত্তিসূচক শব্দ করে। এবার ত্বরিত হাতে ওটার পাগুলো কষে দড়িতে বেঁধে ফেলল বুড়ো র্যামন। খানিক যুঝে শেষমেশ নীরবে, ফ্যালফেলে দৃষ্টি মেলে ভেড়ার মতন পড়ে রইল ওটা, নট নড়ন চড়ন নট কিচ্ছু।
‘আই,’ বলল বুড়ো র্যামন। ‘এদিকে এসে দেখে যাও।’
‘ছেলেটি গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল বুড়োর পাশে, উঁকি মারল মারিয়ার পশমে। বুড়ো র্যামনের আঙুল যেখানে পশম আলাদা করে রেখেছে, তার কাছে ছোট কালো একটা গা ঘিনঘিনে দাগ দেখতে পাওয়া গেল। আরে, দাগ তো না, বহু পেয়ে কি যেন একটা হামাগুড়ি দিয়ে দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে যাচ্ছে।
‘হ্যাঁ, বলল বুড়ো র্যামন। ‘এঁটেল পোকা। ভেড়ার গায়ে হয়। ওইটা বেশি বাড়তে পারে নাই। নিশ্চয় আশেপাশে ধাড়ি একটা আছে যেইটা এইগুলার জন্ম দিয়েছে। অন্য ভেড়ার গায়ে ছড়ানোর আগেই ধ্বংস করতে হবে এইগুলাকে।’
‘ছেলেটি বসে বসে লক্ষ্য করল বুড়ো র্যামন মুখের এক ধারে সরিয়ে দিল পাইপটা এবং ফাঁপা নলটা গুঁজল আরেক পাশে। পাইপে গভীর টান দিয়ে, আঙুলে ফাঁক করে ধরা পশমে ঝুঁকে, ধোঁয়া দিল নলের ভেতর দিয়ে। তারপর দ্রুত পশমটুকু চেপে দিয়ে একটা হাত বিছিয়ে দিল ওটার ওপর। মুহূর্ত খানেক অপেক্ষার পর, এক ইঞ্চি দূরে আরেকটি জায়গা খুলে, একই কায়দায় ধোঁয়া দিল সেখানেও। এবার মাথা তুলে দাঁতে ধরা পাইপ আর নলের ফাঁক দিয়ে কথা বলল।
‘তামাকের ধূমে পোকা মরে। প্রায় সারা শরীরেই এভাবে ধূম দিতে হবে আমাকে। তুমি বরং রান্না-বান্নার দিকটা দেখো…’
পর্বতসারির পেছনে ডুব দিয়েছে সূর্য, রক্তিমাভা ছড়িয়ে পড়েছে আকাশের গায়ে। প্রান্তরে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। বুড়ো র্যামন তখনও মারিয়ার গায়ে ধোঁয়া ফুঁকতে ব্যস্ত। ওদিকে ছেলেটি লেগেছে রান্নার আয়োজনে।
বুড়ো র্যামন একটু পরে মারিয়ার রশি খুলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। জানোয়ারটা দু’মুহূর্ত নিথর পড়ে থেকে হঠাৎ টলমল পায়ে উঠে ছুট লাগাল দলের উদ্দেশে। দীর্ঘ পদক্ষেপে ওটাকে অনুসরণ করল বুড়ো র্যামন। খানিক বাদে, ঘনায়মান অন্ধকারে খুদে অগ্নিকুণ্ডটার কাছে ফিরে এল সে, পিছু পিছু এল কুকুর দুটো।
‘ভেড়াগুলা শুয়ে পড়েছে,’ বলল। ‘সারাদিনের মেহনতের পর এখন খুব খুশি। কিন্তু আমাদের তো খিদা লেগেছে। র্যামন আর তার পেদ্রোর আর তোমার স্যাঞ্চোর।’
প্যাকগুলোর কাছে গিয়ে পাইপ, নল আর তামাক রেখে দিল ও। রাইফেলটা নিয়ে ব্রীচে একটা কার্তুজ পুরে, চাইলেই নাগাল পাবে এমন একটা প্যাকের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখল। তারপর ফিরে এল আগুনের পাশে।
বীন আর শুকনো মাংসের তৈরি স্ট্য-তে চামচ নাড়ছে কিশোর। এবার চারটে টিনের থালায় ঢালল খাবার। চাইল মুখ তুলে।
‘গর্ব বোধ করতে পারছি না। খুব বেশি মরিচ দিয়ে ফেলেছি মনে হচ্ছে।’
‘বেশি মরিচ?’ বলল বুড়ো র্যামন। ‘ঝালে কোন দোষ নাই। এইটা তার সন্তানদের জন্যে খোদার একটা মহান দান। অসুস্থতা পুড়িয়ে দেয় এইটা। পিপাসার কারণে মানুষ বেশি পানি খুঁজতে বাধ্য হয়। আর এইটা যেইরকম গলা পরিষ্কার করে আর কোন কিছু সেইরকম পারে না। আমরা অতিরিক্ত ঝালের ব্যাপারে আর কোন কথা তুলব না, কেমন…’
অলস মুহূর্তগুলো কেটে যাচ্ছে। কুকুর দুটো থালা চেটেপুটে সাফ করে এমুহূর্তে দৌড় দিয়েছে ডোবার উদ্দেশে। রাতের নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে ওদের পানি পানের চুকচুক শব্দ। ওরা খানিক পরে ফিরে এসে শুয়ে পড়ল, বাদামী কুকুরটা বুড়ো র্যামনের আর কালোটা ছেলেটির গা ঘেঁষে। আগুনের পাশে বসে তৃপ্তির সঙ্গে আহার সারছে ওরা। বুড়ো র্যামন তার থালা ফর্সা করে পাশে রেখে দিল এবং তৃতীয় কাপ কফি পান শেষে থালার ওপর রাখল। কিশোরও তার খাওয়া শেষে থালা আর কাপ রেখে দিল পাশে। বুড়ো র্যামন হঠাৎ ডান হাতটা বাড়িয়ে থালায় কাপের মৃদু ঠকঠক শব্দ তুলে কিশোরের দিকে চাইল।
আগুনের আলোয় পাল্টা বুড়োর চোখে চোখ ফেলল ছেলেটি। ‘আমি রান্না করেছি।’
মাটিতে একটা কিল মারল বুড়ো র্যামন।
‘আর আমি পোকা মেরেছি। উঠে দাঁড়াল সে। ‘একটা উপায় অবশ্য আছে। টস করা যায়।’ অসংখ্য তালিমারা বেঢপ ট্রাউজারের একটা পকেট হাতড়াতে লাগল ও। খুদে এক টুকরো গোলাকার ধাতু ওটা থেকে বের হতে ঝিকিয়ে উঠল আগুনের আলোয়।
‘আমি হেড নেব,’ বলল বুড়ো র্যামন। মুদ্রাটা শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে লুফে নিল ডান হাতে এবং চাপড় মেরে ধরল বাঁ কব্জির ওপর। উঁকি দিয়ে দেখল। ‘আহ, হেড উঠেছে। এই দেখ।’ কব্জিটা বাড়িয়ে ধরল ও সঙ্গীর দিকে, কিশোর চোখ রাখল মুদ্রাটায়।
এবার ধীরে ধীরে উঠে পড়ে থালা-কাপ-ডিশ জড়ো করতে শুরু করল ও। অস্পষ্ট অন্ধকার সত্ত্বেও ঠাহর করা যাচ্ছে ডোবাটাকে,
ছেলেটি সেদিকে পা বাড়াতে বুড়ো র্যামন গলার ভেতর মৃদু হেসে নরম করে বলল, ‘না, খোদা, এটা করা আমার ঠিক হবে না। আমার চাচাতো ভাই পাবলোর মতন নিজেকে যে খুব বুদ্ধিমান মনে করে তার বেলায় ঠিক আছে। কিন্তু আমার মনিবের ছেলের বেলায়, না। এই যে নিজেই দেখো।’ মুদ্রাটা বাড়িয়ে ধরে আঙুলের ফাঁকে আস্তে আস্তে উল্টে দিল। দু’দিক একই।
বুড়ো র্যামন কয়েনটা পকেটে ফেলে দিয়ে জিনিসপত্রগুলো নিয়ে নিল ছেলেটির কাছ থেকে। ডোবার দিকে চলেছে সে।
