Accessibility Tools

ওল্ড র‍্যামন – জ্যাক শেফার

ওল্ড র‍্যামন – ৫

পাঁচ

রুক্ষ, নির্জন প্রান্তরটা সামনে বিছিয়ে পড়ে রয়েছে, দেখতে সমতল, হলেও অগভীর, বালুময় কতগুলো অ্যারোয়োর কারণে জায়গায় জায়গায় বিযুক্ত, এখানে সেখানে নাছোড়বান্দার মতন জটলা পাকিয়ে জন্মেছে কিছু খাট ক্রিয়োসট ঝোপ- মরুভূমির শুষ্কতাকে থোড়াই পরোয়া করে। দূরে কোথাও অকস্মাৎ একটা ধূলিঝড় উঠেই আবার মিলিয়ে গেল। ভেড়ার পালটা মধ্যাহ্নের প্রখর সূর্যতাপ সয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নিচ্ছে, ছোট ছোট দলে বিভক্ত প্রাণীগুলোর মাথা ঢলে পড়েছে পেটের কাছে। নিথর দাঁড়িয়ে থাকা গর্দভটার লীড রোপ দোল খাচ্ছে বাতাসে, চোখ বুজে জানোয়ারটা ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছে। এতে অভ্যস্ত সে, জানে, এটাই জীবন। মাটিতে চারটে খুঁটি গেড়ে, একটা ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে ছাদ তৈরি করেছে বুড়ো র‍্যামন আর ছেলেটি; তারই সামান্য ছায়ায় কুকুর দুটোকে নিয়ে বসে আছে তারা গুটিসুটি মেরে।

শুকনো ঠোঁট চাটল ছেলেটি। এই প্রচণ্ড গরমেও যেন একটুখানি শিউরে উঠল ও।

‘সূর্য যে এমন শত্রুতা করবে ভাবতেও পারিনি। আমার ভয় করছে।’

ছেলেটির দিকে চাইল বুড়ো র‍্যামন। স্বাভাবিকের চাইতে একটু বিস্ফারিত দেখাচ্ছে কিশোরের চোখ, ভয়ের আভাস পড়ে নেয়া যায়। বুড়ো র‍্যামন মাটিতে দুম করে এক কিল বসাল।

‘ছোঃ এ তো কিছুই না। এক দিন এক রাত মাত্র, তারপরই তো আমরা পাহাড়ের ঠাণ্ডা ছায়ায় পৌঁছে যাচ্ছি। ভয় করে তখন দিনের পর দিন যখন এগিয়ে চলেছি ধু-ধু মরুর বুকে, পানি নাই, ছায়া নাই, পাগল হতে বেশি বাকি থাকে না ভেড়া আর মানুষের। আমি জানি তখন কেমন লাগে। আমি ছিলাম তোমার দাদার সাথে, বড় একটা দল নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় যাচ্ছিল সে।’

ছেলেটির চোখে আতঙ্কের বদলে এখন আগ্রহের ছাপ। বেমালুম ভুলে গেছে তীব্র দাবদাহের জ্বালা।

‘বলো না শুনি,’ আবদার করল ও।

‘বলব,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘আহ্, মরদ ছিল বটে তোমার বাপের বাপ। র‍্যামনের মত রুক্ষ আর মোটা ছিল না সে। হ্যাংলা-পাতলা ছিল, সোজা হয়ে দাঁড়াত, র‍্যামন গায়ের জোরে যা পারত না, সে বুদ্ধির মারপ্যাচে তাই করে ছাড়ত। তার তখন জোয়ান্তি কাল, আমারও জোয়ান্তি কাল, আর আমাদের ধারণা ছিল আমরা দুইজনে পারি না এমন কোন কাজ নাই। আমরা দুইজন, আর ছিল তিনটা কুকুর। যেই সব ইন্ডিয়ানদের এলাকা দিয়ে পার হয়েছিলাম তাদের কয়েকটা ভেড়া উপহার দিয়েছিলাম। সব ঠিকঠাক মতই চলল কয়েক সপ্তাহ, কলোরাডো নদী পার হলাম, গর্ব ধরে না মনে। তারপর গিয়ে পড়লাম মোজেভ মরুভূমিতে। ইশারা-ইঙ্গিতে ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে কথা বলাতে তারা বালিতে একটা ম্যাপ এঁকে দিল, পানি কই কই পাব জেনে নিয়ে আবার চলতে লাগলাম। ভেড়ার পাল তাড়িয়ে নিতে হচ্ছিল কারণ সেইটা ছিল বড় লম্বা সফর। দুই দিন পানি ছাড়া যাত্রার পর প্রথম ডোবাটার কাছে পৌঁছালাম আমরা। পানি কম হলেও চলে গেল। আরও দুই দিন পর পৌঁছালাম দ্বিতীয় ডোবায়, কিন্তু পানি সেখানে এতই কম যে নাই বললেই চলে। ফিরে আসব কিনা আলোচনা করে ফিরব না ঠিক করলাম। আই, আমাদের তখন যৌবনকাল, বুকে যেমন সাহস মাথা ভর্তি তেমন গোবর। গোঁয়ারের মত চলতেই থাকলাম। পরের ডোবাটায় তিন দিন পর পৌঁছে দেখি একটু খালি ভেজা ভেজা ভাব, গর্ত খুঁড়ে পানির জন্যে সবুর করতে হলো। আস্তে, খুবই আস্তে আস্তে গর্তে পানি উঠল। আবারও ফিরে আসার কথা বলাবলি করলাম আমরা। কিন্তু তখন ফিরে আসা আর এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে সমান দূরত্ব। আবার চলছি তো চলছি। পরের স্পটটায় দুই দিন পর পৌঁছে দেখি পানি একেবারেই নাই। কি করি এখন? চলতে লাগলাম সামনে, কোন থামাথামি নাই। কয় দিন ধরে কে জানে। সঙ্গে করে যা পানি নিয়েছিলাম সব শেষ, ভেড়ারা পথে পথে মরছে। নিশিতে পাওঁয়া মানুষের মতন তখন ঘুরে বেড়াচ্ছি আমরা, একটা কুকুর লাপাত্তা হয়ে গেল, আরেকটা মারা পড়ল, কিন্তু আমরা ওটাকে কবর দিতে পর্যন্ত থামলাম না। শেষ দিনে, মানে আর যখন পা চলে না তখন দূরে নিচু পাহাড়ের গায়ে সবুজ রং চোখে পড়ল, এর অর্থ পানি। কিন্তু তখনও অনেক মাইল বাকি, যা মনে হলো তার চাইতে অনেক বেশি দূরে। ভেড়াদের কথা মাথায় থাকল না। পানি ছাড়া আর সব কিছু ভুলে গেলাম। টলতে টলতে যাই, হোঁচট খেয়ে পড়ি, সে আমাকে টেনে তোলে, আমি তাকে টেনে তুলি তারপর শেষ পর্যন্ত- আমার মনে হয়, মানে ওই পাগলামি অবস্থায় কিছু মনে রাখা যদিও সম্ভব না, তোমার দাদাকে পিঠে নিয়ে জানোয়ারের মত হামাগুড়ি দিতে লাগলাম। একসময় পৌঁছেও গেলাম পানির কাছে, ছোট্ট ঝর্ণাটা পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায়, পাহাড় থেকে নেমে ধারাটা মিশে গেছে বালিতে। খোদার মেহেরবানীতে তখনও দিশা হারিয়ে ফেলি নাই আমরা। পাগলের মতন পানি খেতে শুরু করলে পেশীতে খিল ধরে মারা পড়তাম…মাথা ঠাণ্ডা হলে বাদে ভেড়াগুলার কথা মনে পড়ল। একবার ভাবলাম ফিরে গিয়ে যে কয়টাকে পারি বাঁচাই। কিন্তু তার দরকার ছিল না। দলটা আমাদের কাছাকাছিই ঝর্ণাটাকে ঘিরে রেখেছিল। কুকুরটা, যেইটা বেঁচে গেছিল সেইটা নিয়ে এসেছে ওইখানে ওদেরকে।’

এক কিল বসাল বুড়ো র‍্যামন মাটিতে।

‘আহ্, ওইটা ছিল কুকুরদের বাদশা। আমার পেদ্রোর বাপের বাপের বাপ।’

বুড়ো র‍্যামনের ছড়ানো পায়ের কাছে শুয়ে থাকা বাদামী কুকুরটা মনিবের মুখে নিজের নাম শুনে কান খাড়া করল।

‘এই, পেদ্রো,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। তুই তো জানিসই, ঠিক কিনা? ওর রক্তই তো বইছে তোর গায়ে।’

বাদামী কুকুরটার দিকে একবার চেয়েই চোখ সরিয়ে নিল কিশোর। কালো কুকুরটা পায়ের কাছে শুয়ে, চাইল ওটার দিকে, হাত বাড়াল লোমে বিলি কাটতে।

‘তারপর?’ বলল সে।

‘তারপর চলছি তো চলছিই। সিয়েরা নেভাদার উঁচু পাহাড়গুলির উপত্যকায় যে মাইনিং ক্যাম্পগুলা আছে সেইদিকে যেতে লাগলাম, সোনা ওইখানে অনেক থাকলেও মাংসের অভাব ছিল। ভেড়াগুলা শুকনা-পাতলা হলেও ভাল দাম পেলাম। সবই ছিল তোমার দাদার, আমার খালি মজুরি পাওয়ার কথা সাহায্যের জন্যে। কিন্তু টাকা হাতে আসলে দুই ভাগে ভাগ করল সে আর আমাকে এক ভাগ নিতে জোর করে বাধ্য করল। আই, মনটা এ-ও বড় ছিল মানুষটার, তোমার বাপের বাপের। নিজের ভাগটা দিয়ে বাড়ি ফিরে ভেড়া কিনল, বহুতগুলি। ঘোড়া থেকে পড়ে বেচারা যখন মারা গেল তখন তার ব্যবসা রমরমা, অনেক লোক খাটছে…’

মোচাকৃতি প্রাচীন হ্যাটটা এক হাতে খুলে, অপর হাতে গরম ব্যান্ডটা মাথার যেখানে চেপে বসেছিল তার চারিটা পাশ মুছে নিল বুড়ো র‍্যামন। এবার ভিন্ন কায়দায় ফের মাথায় চড়াল হ্যাটটা।

‘আই, আমার মুখ শুকিয়ে গেছে বকবক করতে করতে।’ চিকন স্ট্র্যাপে কাঁধ থেকে ঝুলছে ক্যান্টিন, ওটাকে কোলের কাছে টেনে এনে ছোট্ট ক্যাপটা খুলল। ছেলেটি অনুকরণ করল ওকে।

‘দুই ঢোক,’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘একবারে এই যথেষ্ট। অল্প অল্প করে অনেকবারে খেলে পানিটা টেকেও বেশি আবার কাজও বেশি দেয়। আর গিলে ফেলার আগে মুখে কিছুক্ষণ ধরে রাখতে হয় প্রতিটা ঢোক।

দু’বার ক্যান্টিনটা মুখের কাছে তুলল ও এবং তার দেখাদেখি ছেলেটিও। বুড়ো র‍্যামন এবার ক্যান্টিনের মুখটা উল্টো করে ওটাকে একটা খুদে কাপে রূপ দিল, এবং সযত্নে পানি ঢালল তাতে।

‘পেদ্রো।’ কাপটা বাড়িয়ে ধরতে বুড়ো বাদামীটা মাথা এগিয়ে দিয়ে সাবধানতার সঙ্গে চুকচুক করে পানিটুকু পান করল। জিভের নিপুণ, অভ্যস্ত টোকায় এক বিন্দু জল পড়তে দিল না মাটিতে।

মন্ত্রমুগ্ধের মতন চেয়ে চেয়ে দেখল অনভিজ্ঞ কিশোর। নিজের ক্যান্টিনের ক্যাপ খুলে আলগোছে পানি ঢালল।

‘স্যাঞ্চো।’ ও কাপটা বাড়িয়ে দিতে ছোকরা কুকুরটা অত্যুৎসাহে ঝাঁপিয়ে এল, ফলে যা হওয়ার তাই হলো। কিশোরের হাতে ওর নাকের গুঁতো লেগে খানিকটা পানি চলকে পড়ল। লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলো ছেলেটি। বুড়ো র‍্যামন তখন বাহ্যত ক্যান্টিনের মুখ এঁটে কাঁধে ঝুলাতে ব্যস্ত। ছেলেটি ত্বরিত আরেকটু পানি তার পাত্রে ঢেলে কুকুরটার মুখের সামনে ধরল।

‘পানি পান করাও একটা কৌশল, বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘শিখতে হয়। পানি প্রচুর আছে। এই মরুভূমিতে তো খালি আজকের দিনটাই…’

শ্লথ গতিতে কাটছে সময়, গরম কমার কোন লক্ষণ নেই। ছেলেটির অবশ্য এসব দিকে মন নেই। নিস্পন্দ বসে দাদার কথা ভাবছে ও। দাদাকে সেভাবে চেনে না সে। রঙিন খড়ি পেন্সিলে আঁকা দাদার একটা ছবি দেখেছে কেবল। আর এখন বুড়ো র‍্যামনের মুখ থেকে যেটুকু যা শুনল। বুড়োর কথাগুলো ওকে দাদা সম্পর্কে ভাবনার নতুন খোরাক জুগিয়েছে। এই গুণ্ডা মার্কা বুড়ো আর ওর দাদা দু’জনেই তখন যুবক ছিল, ছিল দুঃসাহসী এবং বলতে নেই, কিছুটা নির্বোধও…

‘কি করলে তুমি,’ বলল ছেলেটি, ‘তোমার ভাগের টাকাটা দিয়ে?’ দূরের চোখে চেয়ে ছিল বুড়ো র‍্যামন, দৃষ্টি তার প্রচণ্ড উত্তাপে কম্পমান সুদূরে।

‘র‍্যামনের পকেটে টাকার গরম হলে সবসময় যা করে তাই করেছি। খরচ করে ফেলেছি…মদের বোতলে…আর, হ্যাঁ, মেয়েদের পিছেও…আর জুয়ার টেবিলে…’

বুড়ো র‍্যামন আচমকা উঠে পড়ে খুঁটি থেকে ব্ল্যাঙ্কেট নামিয়ে ভাঁজ করতে শুরু করল।

‘ভেড়াদের মর্জির ওপর বসে থাকলে আমাদের চলবে না। গাধাগুলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকবে রোদের মধ্যে। পেদ্রো! ওদেরকে রওনা করা! বাকি দিন ওদেরকে একটানা তাড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে…’