Accessibility Tools

ওল্ড র‍্যামন – জ্যাক শেফার

ওল্ড র‍্যামন – ৯

নয়

গর্দভটা মুখভর্তি তরতাজা ঘাস পরম আনন্দে চিবোচ্ছে, মরা সাপের মত পাশে মাটিতে পড়ে রয়েছে লীড রোপ, মাল খালাসের জন্যে ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করছে জানোয়ারটা।

ক’ফিট দূরে বুড়ো র‍্যামন এক হাতে তার লাঠিতে ভর দিয়ে, অপর হাতটা দিয়ে চোখ ঢেকে রক্ষা পেতে চাইছে ডুবন্ত সূর্যের টকটকে আগুন থেকে। পায়ের কাছে শুয়ে ওর বাদামী কুকুরটা। সবুজ পাহাড়সারির ছোট্ট ঝর্নাটায় ভেড়াদের পানি পানের তদারকি করছে তারা দুটিতে মিলে। ছেলেটি এবং তার কালো কুকুরটি দাঁড়িয়ে আছে কাছে।

শেষ ভেড়াটা পানি পান শেষে দলের সঙ্গে যোগ দিতে ঘুরে রওনা হলো। ছেলেটি এক হাতে ঝাড়ু দেয়ার ভঙ্গি করতে, কালো কুকুরটা সোৎসাহে সামনে তেড়ে গিয়ে. সহসা নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে গতি শ্লথ করল। পালের একপাশে ওটা অবস্থান নিলে আরেক ধারে সরে এল ছেলেটি। দু’দিক থেকে একসঙ্গে মৃদু চাপ অনুভব করে দলটা ধীরে ধীরে সরে গেল পানির কাছ থেকে, আরও জমাটবদ্ধ হলো জানোয়ারগুলো এবং ছেলেটি আর তার কুকুর দলটার সামনে গিয়ে গতি স্তব্ধ করে দিল ওটার। ছেলেটি আগু-পিছু করে ধরে রাখল ঝাঁকটাকে আর কুকুরটা চক্কর মেরে মেরে দলছুটগুলোকে টেনে আনতে লাগল। এখানে সেখানে সামনের পা গুঁজে বসে রয়েছে কয়েকটা ভেড়া এবং ওদের দেখাদেখি আরও অনেকগুলো, শেষ অবধি পাঁচটা বাদে বাকি সবকটা বিছানা নিল। কিন্তু এই পাঁচটা বিক্ষিপ্তভাবে যার যার জায়গায় দাঁড়িয়েই রইল। কোমরে দু’হাত রেখে ওগুলোর দিকে একে একে চাইল ছেলেটি, অসহিষ্ণুতার সঙ্গে মাথা নাড়ল।

বুড়ো র‍্যামন এসময় মুখে দু’আঙুল ভরে শিস বাজাল। ছেলেটি ঘুরে চাইল ওর দিকে। হাতছানি দিয়ে ওকে কাছে ডাকল বুড়ো। ছেলেটি ওর উদ্দেশে একটুক্ষণ চেয়ে থেকে হঠাৎ ছুট লাগাল আর কালো কুকুরটাও পাল্লা টানল তার সঙ্গে। ওর পিছু পিছু, তারপর এগিয়ে, এবং তারপর চারপাশে ছোটাছুটি করে হুলস্থুল কাণ্ড বাধাল ওটা। ছেলেটি মওকা মতন এক ল্যাঙ মারতে দু’জন মিলে গড়িয়ে পড়ল মাটিতে, চলল কোস্তাকুস্তি, হা-হা হাসির আর ঘেউ ঘেউয়ের শব্দে দায় হলো কান পাতা। কিছুক্ষণ পর মাটি থেকে উঠে পড়ে বুড়ো র‍্যামনের, বাদামী কুকুরটার আর গর্দভটার কাছে চলে এল ওরা।

‘সোজা, হাঁফাতে হাঁফাতে বলল ছেলেটি; ‘আস্তে করে একবার ঠেলা দিলেই বোকা ভেড়াগুলো মনে করে আমরা যা চাই ওরাও তাই চায়। কিন্তু গর্দভের গর্দভ যেগুলো তারা তো শুতে রাজি না।’

‘না।’ বলল বুড়ো র‍্যামন। ‘গোটা দল শুয়ে পড়ার পর কিছু থাকে যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। একটা সময় পর্যন্ত তারা দেখার পর একটা অংশ শুয়ে পড়ে তখন অন্যরা দাঁড়িয়ে থাকে। আমি যা শুনেছি এইটা নাকি ওরা বহুত পুরানো স্মৃতি থেকে করে, মানুষ আর কুকুর যখন ওদের দেখাশোনা করত না তখন থেকেই। কিন্তু কথাটা সত্য কিনা জানা নাই আমার। সত্যও যদি হয় তাহলে বিপদের সময় কি. করতে হবে সেই স্মৃতি মনে নাই কেন ওদের? কিন্তু তুমি যদি গত কয়দিন একটু মন দিয়ে দেখতে তাহলে জানতে পারতে কয়েকটা থাকে যেগুলা দাঁড়িয়ে থাকবেই কিছু সময়।’

ছেলেটি দ্রুত চোখ ফিরিয়ে পায়ের কাছে শুয়ে থাকা কালো কুকুরটার দিকে চাইল এবং নিচু হয়ে ওটার মাথা চুলকে দিল।

‘ওই স্যাঞ্চোটা কিন্তু শিখছে,’ বলল বুড়ো র‍্যামন।

ঝট করে মুখ তুলল ছেলেটি।

‘ও-ও কি একদিন তোমার পেদ্রোর মতন কাজের হবে বলছ?’ লাঠিতে ভর দিল বুড়ো র‍্যামন। ..

‘আগামী কালের কথা কেউ আগে থেকে বলে দিতে পারে? আমার জিন্দেগীতে অনেক কুকুরই তো দেখলাম। কোনটার এই গুণ কোনটার ওই গুণ। কিন্তু এতগুলা বছরের মধ্যে পেদ্রো কিন্তু একটাই। ওর দাদার বাপের কথা তো তোমাকে বলেছি, মোজেভের ওপারে ভেড়ার পালকে পানি খাওয়াতে নিয়ে গেছিল। পেদ্রো তার মতন। তার চেয়েও ভাল। ও হচ্ছে আমার পেদ্রো। তাকিয়ে থাকো ও একটা জিনিস দেখাবে।’ চোখ নামিয়ে বুড়ো বাদামী কুকুরটার দিকে চাইল বুড়ো র‍্যামন। ‘পেদ্রো, আজকে যাত্রার সময় মনে হচ্ছিল মারিয়া বোধহয় খোঁড়াচ্ছে। মারিয়া। ওকে নিয়ে আয় দেখি আমার কাছে।’

বাদামী কুকুরটা উঠে ছুটে গেল দলটার দিকে এবং সেই সঙ্গে নির্দিষ্ট ভেড়িটাকে খুঁজতে লাগল। এবার রাস্তা করে নিয়ে সোজা গিয়ে গুঁতো দিল ওটার পাঁজরে এবং জানোয়ারটাকে দাঁড়াতে বাধ্য করে তাড়িয়ে আনল খোলা জায়গায়। ওখানে এসে ভেড়িটা ছোটাছুটি করে গোত্তা খেতে লাগল ফিরে যাওয়ার জন্যে, আর বাদামী কুকুরটা বিদ্যুৎ ঝলকের মত লাফ-ঝাঁপ দিয়ে, ওটাকে দৌড়ে আসতে বাধ্য করল বুড়ো র‍্যামনের কাছে।

‘ধরে থাক ওকে, বলল বুড়ো র‍্যামন।

বাদামী কুকুরটা এক লাফে ভেড়িটার গায়ে থাবা তুলে, ঘাড়ের কাছে ঘন লোম কামড়ে ধরল, নিজেকে মিশিয়ে দিল ওটার দেহের সঙ্গে। বুড়ো র‍্যামন তার লাঠি ফেলে এগিয়ে এসে ভেড়িটার গায়ে দু’হাত বুলাতে লাগল। মুহূর্ত পরে একটা হাতকে সামান্য সরে গিয়ে বাদামী কুকুরটার মাথার আর ঘাড়ের কাছে কুঞ্চিত অমসৃণ পশমে খেলা করতে দেখা গেল। ‘এহ, পেদ্রো? তুই আগে বলতে পারতিস আমাকে, এহ? আমার ভুল হয়েছিল। গির্জার ঘণ্টার মতনই সুস্থ আছে ও। ভাল। যা, ওকে নিয়ে যা।’

বাদামী কুকুরটা ভেড়িটাকে মুক্তি দিয়ে গুঁতো মারল ওটার গোড়ালিতে আর পাঁই পাঁই ছুটল জানোয়ারটা; ভেড়াদের নিরাপদ আশ্রয় থেকে অযথা ধরে আনায় মহাখাপ্পা কুকুরটার ওপর। ওটার পিছু পিছু তাড়া দিয়ে চলল পেদ্রো।

লাঠিটা তুলে নিল বুড়ো র‍্যামন।

‘আলো মরে আসছে। জলদি ক্যাম্প করতে হবে। ছোট তাঁবুটা ব্যবহার করব কারণ এই উপত্যকায় কয়েকটা দিন থাকব আমরা…