কালীগুণীন আর রাক্ষসের চাবিকাঠি
১. কাঁচাখেগো
গাড়োয়ান চলতে চলতে ভয়ে ভয়ে মাঝেমধ্যে পিছনে ফিরে গাড়ির ছাউনির ভিতরে রক্তাক্ত মৃতদেহটার উপরে দৃষ্টি ফেলচে। গাঁয়ের লোকেরা হ্যারিকেন, হ্যাজাক আর অন্যান্য আগুনের বাতি নিয়ে গ্রামের পথ ধরে চলেছে জমিদারবাড়ির দিকে। শুধু পুরুষেরাই নয়, অসংখ্য মেয়েমানুষও। সবার মন ভীষণ বিষাদে আর ক্ষোভে স্তব্ধ হয়ে রয়েচে। পিছনে পিছনে চলেচে সেই গোরুর গাড়ি। লোকজন অতি নীচুস্বরে নিজেদের মধ্যে আশঙ্কায় কথাবার্তা কইচে, আমাদের তো কোনো দোষ নাই নিধুখুড়ো। জমিদার মশায় বয়স্ক বিচক্ষণ মানুষ। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের অসহায় অবস্থাটা বুঝবেন। কতখানি আতঙ্কে আর জ্বালায় জ্বলে তবেই আমরা…
কিন্তু গাঁয়ের নব্বই ভাগ মেয়ে-পুরুষই আজ মরিয়া। তারা বলচে, রাখো বিচক্ষণতা। সব জানা আছে। জমিদার মশায় মেনে নেন ভালো কথা, আর যদি একতিল বেয়াদবি দেখি, তবে বাঁশের ঘা মেরে বাপ-ছেলে দুটোকেই কঙ্কা নদীর চড়ায় পুঁতে ফেলব। দারোগার সাত পুরুষেও খোঁজ পাবে না। অনেক সহ্য করেচি অত্যাচার।
এইসব কথাবার্তা কিন্তু থেমে গিয়ে অখণ্ড নীরবতা নেমে এল জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে ঢুকেই। সামনেই বৃদ্ধ জমিদার চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রয়েচেন। এতগুলো মানুষকে একসঙ্গে প্রবেশ করতে দেখে হতভম্ব হয়ে শুধাল, “এ কী! কী হয়েচে আজ? আবার কার মেয়ে গেল?”
এই তালুকে আজ মাস ছয়েক ধরে হপ্তায় হপ্তায় কিশোরী থেকে যুবতী নিখোঁজ হয়ে যাচ্চে। কিছুদিন পর তার ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ পাওয়া যাচ্চে নদীর চড়ায়, শ্মশানের ঝোপে অথবা মাঝপথেই। এতগুলো প্রজাকে এই ভরসন্ধ্যায় আসতে দেখে বৃদ্ধ জমিদার সেই আশঙ্কাতেই দিশেহারা হয়ে পড়ল। গাঁয়ের পুরোহিত জটিল ঠাকুর ধীরে ধীরে মুখ খুলে কইল, “আজ মেয়ে নয় বড়োকর্তা, আজ গিয়েচে ছেলে।”
“ছেলে? সে কী! কোন গাঁয়ের?”
“এই গাঁয়েরই। আপনার ছেলে, বড়োকর্তা। এতদিন আমরা ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি যে কত বড়ো একটা শয়তানকে আমরা জমিদারপুত্র হিসেবে সম্ভ্রম করে এসেচি। আগে টের পেলে এতগুলো মেয়ের জীবন রক্ষা পেত। তার মধ্যে আমার পরিবারের মেয়েও ছিল, জমিদার মশায়। আজ হাতেনাতে ধরতে পেরে আমরা সেই বিষঝাড়কে কচুকাটা করতে সময় নিইনি। আপনিই বলেচিলেন, সেই দুর্বৃত্তদের সন্ধান পেলে মৃত্যুদণ্ড দেবেন। আমরা সেই কথাই রেখেচি আমাদের হাতে ছোটোকর্তা মারা পড়েছে। এই, কেউ গাড়ি থেকে নামিয়ে আন—”
তিনজন যুবা মিলে একটি সুপুরুষ যুবকের রক্তাক্ত মৃতদেহ নামিয়ে এনে শুয়ে দিল উঠোনে। বৃদ্ধ জমিদার পুরোহিতের কথা শুনে এবং এই অভাবিত আকস্মিকতায় পাথর হয়ে পড়েচিলেন। ছেলের মৃতদেহের দিকে বহুক্ষণ তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “মারা পড়েনি, মারা পড়েনি, বধ হয়েচে। তোমরা ভুল করেচো ঠাকুর। আমি গাঁয়ের জমিদার। এই দণ্ড আমার উচিত ছিল নিজের হাতেই দেওয়া। চৌকি থেকে লাল-পাগড়ি এসে ধরলে আমাকে একলা ফাটকে পুরত। আমার আর কেউ রইল না তো ঠাকুর। আমার এখন মহল যা, ফাটক তা-ই। এই হত্যার দায় আমিই ঘাড়ে নেব। কুলাঙ্গার, কুলভস্ম কোথাকার।”
বৃদ্ধের কথাগুলো হাহাকারের মতো শোনাল। জটিল ঠাকুর কুণ্ঠিত হয়ে কইল, “মাপ করবেন কর্তা, আমরা আপনাকে ভুল চিনেচিলাম। নিতান্তই নিরুপায় হয়েই আজ আমাদের এই…”
বৃদ্ধের হাত দেখানোতে কথা থেমে গেল। তিনি শরীরের সবটুকু জোর যেন একত্র করে বললেন, “তবে আমার এই সাত পুরুষের গাঁয়ের মাটিতে যেন এই নরকের কীটের দাহকার্য না হয়, জটিল ঠাকুর। নদীর চড়ায় গিয়ে দাহ করো যদি মন চায়…” গলার কাছে দলা পাকিয়ে-আসা কান্নাটা চেপে বুড়ো জমিদারমহলে ঢুকে গেলেন। দ্বারবান ফটক বন্ধ করল।
লোকজন অনেকেই ফিরে এসে বসে রইল চণ্ডীমণ্ডপের বাইরে। জনা দশেক ছেলে মৃতদেহকে গোরুর গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে গেল কঙ্কা নদীর তীরে দাহ করার জন্য, আর কয়েক দণ্ড পরেই তারা ভগ্নদূত হয়ে ফিরে এল। জানা গেল, তারা মৃতদেহ রেখে কাঠ কাটা, চিতা সাজানোর কাজ করে, তারপর মৃতদেহ আনতে গিয়ে দ্যাখে মৃতদেহ নাই! দেহ ছুঁয়ে বসে ছিল যে জগাই, সে মাথা-ফাটা অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে! খুব ওজনদার কিছু দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়েচে। ছোটোকর্তার মৃতদেহ বহু খুঁজেও মিলল না।
তখন প্রবীণেরা মিলে ঠিক করল, জমিদার মশায়কে এই শোকের মধ্যে এই খবরটা দেওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। তাঁকে বলা হবে যে দাহ হয়ে গিয়েচে। এমনও হতে পারে যে, যে প্রহরায় ছিল, তার মাথায় গাছের ডাল ভেঙে পড়েচিলো, আর মৃতদেহকে কোনো পশুতে টেনে নিয়ে গিয়ে থাকবে। পরদিন সেই খবর শোনার পর বৃদ্ধ চোখ মুছে, মহলের দায়ভার নায়েবকে বুঝিয়ে দিয়ে গাঁ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল চৌকিতে ধরা দেবার জন্য। পাশের গাঁয়ে জুড়িগাড়ি ছেড়ে পায়ে হেঁটে কিছুটা গিয়ে কসাই নরহরিকে ডেকে বৃদ্ধ শীতল কণ্ঠে কইল, “এনেচিস তো?”
“হ্যাঁ কর্তা, আপনার আদেশমতো তখুনি তখুনি বেরিয়ে পড়ে, ছোকরাগুলোকে ফাঁকি দিয়ে ছোটোকর্তার লাশখানা মন্দিরের ভিতরের ঝোপে ঢাকাঢুকি দিয়ে লুকিয়ে রেখে এসেচি। শেয়াল-কুকুরে সন্ধান পাবে না।”
“বেশ। কারুকে কখনও প্রকাশ করবিনে। এই তোর পুরস্কার—”এই বলে একটা মখমলের থলি নরহরির হাতে তুলে দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন জমিদার। নরহরি পিছন থেকে ডেকে শুধাল, “খুব দুঃখের ঘটনা এটা, কর্তা। কিন্তু আপনি গাঁয়ের মাটিতে দাহ করতে নিষেধ করেচিলেন শুনলাম। কেন?”
বৃদ্ধ হিসহিসিয়ে বললেন, “অতি শোকেও বুদ্ধিভ্রষ্ট হতে নেই, নরহরি। তাতে প্রতিশোধের সুযোগ চলে যায়। গাঁয়ে দাহ করলে গ্রামসুদ্ধ ছোটোলোকগুলো দল বেঁধে যেত মজা দেখতে। তাতে তোরা আর কয়জন? আনতে পারতি তোদের ছোটোবাবুর মৃতদেহ ছিনিয়ে? ওরা সবাই বঁটি, লাঠি নিয়ে এসেচিলো। নদীর চড়ার আঘাটায় বেশি লোক যাবে না, আমি জানতুম।” এইটুকু বলে হিংস্র চোখ-মুখে হনহন করে হেঁটে সদর ইস্টিশানের কাছে গিয়ে একটা দুই আনি বের করে রেল কর্মচারীকে দিয়ে শান্তস্বরে কইল, “একটা কলকাতার টিকিট করে দাও। ফাস্টো ক্লাস।”
গণরোষে প্রাণহানির ভয়ে তাঁকে নিজের একমাত্র সন্তানের খুনিদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাতে হয়েচে। চোরের মা যেন পোয়ের লাগিয়া ফুকারি কাঁদিতে নারে। সত্যরঞ্জন জমিদারের ছেলে। গাঁয়ের প্রজাদের উপরে তার জন্মগত অধিকার রয়েচে বই-কি। দু-চারটে মেয়েমানুষকে তুলে আনা জমিদারি প্রথায় কিছু নতুন নয়। বৃদ্ধ নিজের পুত্রের কুকীর্তি সবই জানতেন। আজ সেই পুত্রের অপঘাতের পর একবুক প্রতিহিংসার জ্বালা আর কুটিলতা নিয়ে তালুকের সর্বনাশের আয়োজন করতে এক কাঁচাখেগোর আবাহনের সন্ধানে চললেন নরপিশাচ বৃদ্ধ জমিদার।
* * * * *
২. (পূর্বকথন)
শ্রীলঙ্কা প্রদেশ থেকে যাত্রীবাহী মোজাম্বিক আই জাহাজটা যখন ভারতের দক্ষিণ-পুবের বন্দরটায় ভিড়বার জন্য এগিয়ে আসচে, তখন বন্দরে বহু লোকজনের ভিড়। কেউ এসেচে নিজের লোককে অভ্যর্থনা জানাতে, কেউ কেউ বন্দরের ব্যবসায়ী, কেউ বা জাহাজ কোম্পানির কর্মচারী। সাগর যেখানে আকাশে গিয়ে ঠেকেচে, সেই রেখায় যখন ধোঁয়ার চিহ্ন দেখা গেল, তখন বন্দরটা হঠাৎই কর্মচঞ্চলতার ফলে সরগরম হয়ে উঠল। পোড়খাওয়া জাহাজি পিটার চুরুট মুখে সেই কর্মব্যস্ত বন্দরের রেলিং-এ হেলান দিয়ে নির্লিপ্ত মুখে সাগরের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখচে, পাশ থেকে তার বন্ধুস্থানীয় নব্য জাহাজি বেঙ্কটেশ কইল, “বিকেলেই তো তোমার জাহাজ ছাড়বে, নয় কি? আবার কবে দেখা হয়, দেখা যাক। এই জাহাজটা ঠিকঠাক ভিড়তে এখনও ঘণ্টা দুয়েক। ততক্ষণে পিছনের পানীয়ের দোকানে গিয়ে বরং…”
পিটার বোধহয় সে কথার স্রোতে কর্ণপাত না-করেই বন্দরি ইংরেজিতে আপন মনে কইল, “বহু বছর পূর্বে আমি ঠিক এইরকম একটা জাহাজ ভিড়তে দেখেছিলাম, জানো?”
বেঙ্কটেশ জাহাজিদের সময়ে-অসময়ে এই স্মৃতিচারণের অভ্যাস বিলক্ষণ জানে। সে কী একটা হেসে বলতে গিয়েও থমকে গিয়ে কইল, “বহু বছর আগে? তুমি তো রোজই জাহাজ ভিড়তে দ্যাখো ডাঙায় থাকলে। এইরকম জাহাজ বলতে?”— এই বলে নিজেই মুখ ঘুরিয়ে এইবার ধোঁয়ারাশির দিকে তাকাল। সেটা বেশ কিছুটা নিকটবর্তী হয়েছে।
পিটার সামান্য উদ্বেগের স্বরে বললে, “তখন আমার বয়স অনেক কম। আমার গুরুর সঙ্গে তখন জাহাজ চালানোটা মোটামুটি রকমের শিখেছি, সেই সময়ে পানামা বন্দরের শসা পাহাড়ে আমাদের বস্তি ছিল। একদিন কাকভোরে ডলফিনের ল্যাজের মতো বলবোয়া পোর্টের বামুসা কর্নেটের দিগন্তে একখানা জাহাজ দেখা গেল। সেই জাহাজ ছিল হ্যামিলটন ডি-র কার্গো জাহাজ। তাতে পানামা থেকে তামাক গিয়ে বিদেশি মদের পিপে আসে। আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ আমার গুরু চমকে উঠে কইলেন, ‘হায় ঈশ্বর! কী সর্বনাশ! এখনই বন্দর ছেড়ে পালাও পিটার। ভয়ানক কিছু ঘটবে। সবাইকে খুবলে খাবে ওরা। আমি আগেও দেখেছি এই জিনিস। শয়তান ভর করেছে ওই জাহাজে…’ আমি ভয় পেয়ে শুধালাম, শয়তান? সে কী! কেমন করে বুঝলেন এতদূর থেকে? জাহাজ আবার শয়তান হবে কেমন করে?”
তার উত্তরে আমাকে তিনি কিছু লক্ষণ দেখালেন, যা দেখার পর আমি আর একদণ্ড থাকিনি ওই তল্লাটে। দুঃখের বিষয়, এই লক্ষণ বোঝার বা বিশ্বাস করার মতো জ্ঞান বন্দরের কর্তাদের নেই। থাকলে এখুনি ওটাকে আট নট দূরেই হলদে পতাকা উঁচিয়ে কোয়ারান্টাইন করা দরকার ছিল। একটু থেমে পিটার আবার বলল, জাহাজ শয়তান হয় না ইয়াং ম্যান, জাহাজটা নিজের পেটের মধ্যে বয়ে নিয়ে আসছে এমন কিছু, যা শয়তানের শামিল!
বেঙ্কটেশ হতবাক হয়ে কইল, “কী কী লক্ষণের কথা বললেন?”
পিটার উত্তর না দিয়ে ভীত পায়ে আরও অনেকখানি এগিয়ে-আসা জাহাজটার দিকে চেয়েই আহতকে উঠে হনহন করে হাঁটা দিতে দিতে বলল, “চোখ থাকলে দেখতেই পাবে।”
বেঙ্কটেশ বেশ কিছুক্ষণ পিটারের চলে যাওয়া পথটার দিকে তাকিয়ে থেকে মুখ ঘোরাল জাহাজের দিকে, আর নিজের চোখটা ছোটো করে, তীক্ষ্ণ করে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ চোখটা বড়ো হয়ে গেল আর মুখ থেকে অস্পষ্টভাবে নির্গত হল, “ওহ্ জেসাস!”
বন্দরের অনেকের চোখেই পড়েছিল অস্বাভাবিক বিষয়টা! এমনিতে মানোয়ারি, পাটোয়ারি বা যাত্রী জাহাজ থেকে ফেলা উচ্ছিষ্টের লোভে কিছু পাখি, হাঙর প্রভৃতি জাহাজের সঙ্গে সঙ্গে চলে, কিন্তু এ কী! গোটা জাহাজের আকাশটা যেন হিংস্র সামুদ্রিক পাখিতে পাখিতে অন্ধকার করে ফেলেছে! এ ওড়া শুধু ওড়া নয়, তারা যেন ভীষণ রাগে আক্রমণ করছে জাহাজটাকে! জাহাজের মধ্যে কিছু একটা এমন বিষয় রয়েছে, যা মনুষ্যেতর প্রাণীগুলোর আতঙ্কের কারণ!
জাহাজ থেকে পাঠানো দৃশ্যমান সংকেতবার্তায় পরিষ্কার যে জাহাজের নাবিক এবং কর্মচারীরাও এই ঘটনায় ভীত। তারা এমনটা কখনও দেখেনি। জাহাজটা এতটাই কাছে এসে গিয়েছে যে এখন আর বন্দরে ভেড়ানো স্থগিত করা অসম্ভব। মন্ত্রমুগ্ধের মতো এক বন্দর মানুষ তাকিয়ে রয়েছে সেইদিকে। চমৎকৃত বেঙ্কটেশের মাথায় হঠাৎ করে ধাক্কা মারল পিটারের কথাটা। ওরা খুবলে খাবে! যন্ত্রের মতোই বেঙ্কট একটা লোহার ছাউনির ভিতরে আত্মগোপন করল।
জাহাজটা বন্দরের সরু খালে ঢোকামাত্রই পাখিগুলো সহস্রগুণ হিংস্র এবং মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বন্দর জুড়ে দাঁড়িয়ে-থাকা জনতার উপরে। মুহূর্তের মধ্যে মৌমাছির আপাত শান্ত মধুজালে ঢেলা পড়ার মতো আতঙ্কে হইহই পড়ে গেল। সে এক নারকীয় দৃশ্য! কারও কান, কারও চোখ খোয়া গেছে হিংস্র চঞ্চুর ঠোকরে, কেউ প্রাণে মারা পড়ে রক্তাক্ত হয়ে ছড়িয়ে রয়েচে, কেউ পাখিদের হাত থেকে বাঁচার জন্য রেলিং টপকে ঝাঁপ দিয়ে জলের বদলে শক্ত শানে আছড়ে পড়চে! কোনো কোনো উচ্চপদাধিকারী নিজেদের পিস্তল বের করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে চলেচে!
বেঙ্কটেশ কাঁপতে কাঁপতে গলার ক্রুশটাকে আঁকড়ে ধরে ইষ্টনাম জপতে থাকল। পিটার এই জাহাজকে শয়তানের জাহাজ কেন বলল? মোজাম্বিক ইন্ডিয়া প্রতিমাসেই দুইবার করে ভারত-শ্রীলঙ্কা যাতায়াত করে, আজ বারো-চৌদ্দ বৎসর ধরেই। তবে গোলমালটা নিশ্চিত জাহাজে নয়, জাহাজের ভিতরে। বেঙ্কটেশের মনে কু ডাকতে থাকল। কে যেন আসছে, কী যেন বয়ে নিয়ে আসছে মোজাম্বিক নিজের পেটে করে, যা ভীষণ অশুভ, ভীষণ অপয়া!
বহু সময় পর সেই তাণ্ডব থেমে গিয়েচে। পোর্টের হাসপাতাল থেকে মোটরগাড়ি এসে আহত আর মৃতদের তুলে নিয়ে গিয়েচে। কাপ্তেন উত্তেজিত হয়ে লোকজনকে বোঝানোর চেষ্টা করচে যে শ্রীলঙ্কা থেকে যাত্রার সময় থেকেই এই অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে চলেচে। সেই কলহ আর বাক্যস্রোতের ফাঁকেই কিছু কিছু করে যাত্রী নেমে আসচেন। এদের মধ্যে তত আতঙ্ক নেই। প্রথমত, তাণ্ডবের সময়ে এঁরা ছিলেন জাহাজের ভিতরে, আর এঁরা নামার আগেই সব মৃতদেহ সরে গিয়েচে, ফলে গোলমাল একটা আছে বুঝতে পারলেও ভীত তত হয়নি। এই পিপীলিকার ন্যায় যাত্রীদের সঙ্গে নেমে এল পাশ্চাত্য পোশাক পরিহিত হরিহর মহাপাত্র এবং সঙ্গে তার পুরোনো কর্মচারী সন্ন্যাসী। হরিহর বৃদ্ধ, সন্ন্যাসীর বয়স বছর তিরিশের হবে। হরিহর ভারতের মাটিতে নেমে একটা তৃপ্তির শ্বাস ফেলে কইল, “চল রে সন্ন্যাসী, ওইদিকে অপেক্ষা করি। মালপত্র খালাসের ঘরে গিয়ে বসি।”
(৩) (সিঁদুরে মেঘ)
শুল্কের টিকিট-বসানো মালপত্র নিয়ে দুইজন কুলি চাপিয়ে দিল বন্দরের অনতিদূরে একটা গোরুর গাড়িতে। তিনখানি কাঠের বাক্স। একখানা পরিণত মানুষ-প্রমাণ দীর্ঘ, একখানা অপেক্ষাকৃত কম দৈর্ঘ্যের, আর তৃতীয়টি আড়ে বহরে দেড় হাত। অপর একটি গোযানে বসল সভৃত্য হরিহর মহাপাত্র। বন্দর থেকে রেলগাড়ির ইস্টিশান অবধি আড়াই মাইল পথের অধিকাংশই দুইপাশে ঘন বৃক্ষাচ্ছাদিত। তায় বিকেলের আভায় সেই পথ কিছু আলো-আঁধারি হয়ে রয়েচে। আগে চলেচে মালপত্র-বোঝাই গাড়ি, পিছনে যাত্রীরা। আকাশ নিঃসন্দেহে পরিষ্কারই ছিল কিছু পূর্বেও, কিন্তু গাড়োয়ানরা বিস্মিত হয়ে দেখলে, গাছগুলোর উপর দিয়ে আকাশে ভীষণ ঘন মেঘ এসে বিকেলের আভাটুকুকেও যেন ঢাকাচাপা দিয়ে দিতে চাইচে!
গাড়োয়ান আরও হতভম্ব হয়ে খেয়াল করল, তারা যে পথ ধরে এগিয়ে চলেচে, সেই আশপাশের গাছপালা থেকে ঝটপট শব্দ করে সদ্য ঘরে ফেরা পাখিরা চেঁচামেচি করে গোলাকারে উড়ে চলেচে গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে!
গাড়োয়ান একবার গোরু থামিয়ে স্থানীয় ভাষায় পিছনের গাড়োয়ানকে সভয়ে শুধাল, “গাড়িতে কী আছে রে আমার পিছনে? পাখিগুলো এইভাবে উড়ে চলেচে কেন? আমার বারবার মনে হচ্চে, কী যেন একটা খারাপ জিনিস নিয়ে চলেচি আমি।”
পিছনের গাড়োয়ান সাহস দিয়ে কইল, “সেটা আমিও দেখচি, কিন্তু ওসব কিছু নয়। তুই হাঁকা। পাখিগুলো হঠাৎ মেঘ দেখে ভয় পেয়েচে হয়তো।”
তাতে প্রথম গাড়োয়ান অসন্তোষ প্রকাশ করে বললে, “তবে তোর গাড়ির উপরে পাখি নেই কেন? আমার কেমন যেন লাগচে।”
দুই গাড়োয়ানের মন যতই সন্দিগ্ধ হোক, সাহেবি পোশাক পরিহিত বৃদ্ধ হরিহর যখন বলিষ্ঠ কণ্ঠে ‘কেয়া হুয়া রে’ বলে হাঁক দিল, তখন তড়িঘড়ি গাড়ির চাকা গড়াল ইস্টিশানের পানে।
ইস্টিশানে পৌঁছে গাড়োয়ান দুইজন লম্বা কাঠের পাটাতনের তৈরি নাতিউচ্চ প্ল্যাটফর্মে বাক্সগুলো রেখে পয়সা নিয়ে সেলাম দিয়ে হাঁপ ছেড়ে রওয়ানা দিল গাড়ি নিয়ে।
একখানা রেলগাড়ি অনাথের মতো দাঁড়িয়ে রয়েচে লাইন জুড়ে। হরিহর একবার শেষ সন্ধ্যার আকাশের মেঘের দিকে তাকিয়ে একটা শ্বাস ফেলল। হরিহর বিলক্ষণ পয়সাওয়ালা লোক। তারা মণিতট তালুকের জমিদার। হরিহরের একমাত্র পুত্র শিবরঞ্জন বিদেশে কিছু বছর বাস করে কারিগরি আর ভাস্কর্য শিক্ষায় সফলতা অর্জন করে দেশে ফিরেচে কলকাতার ইউনাইটেড মেশিনারিজ ফার্মের মোটা অঙ্কের চাকুরি পেয়ে। হরিহর নিজের বার্ষিক আয়ের একটা সিংহভাগ খরচ করেন শুধুমাত্র দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়িয়ে। নিছক ঘোরা নয়, হরিহর নিজে ইতিহাসের সুপণ্ডিত এবং পর্যবেক্ষক। নানান রহস্যের টান তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় এ দেশ-ও দেশ।
হরিহর একবার বাক্সগুলোর দিকে চেয়ে আরেকটা শ্বাস ফেলল। বহুদিন ধরে রামায়ণের বহু নষ্ট সূত্র পুনরুদ্ধার করতে করতে অবশেষে হরিহর আনুমানিক সন্ধান পায় রাক্ষসরাজ রাবণের প্রাসাদের। ঠিক সন্ধান বলা চলে না। আজ অবধি দশাননের প্রাসাদের একটা পাথরও খুঁজে পাওয়া যায়নি প্রমাণ হিসেবে, কিন্তু হরিহর আবিষ্কার করেছিল আনুমানিক জায়গাটুকু। এখন সেখানে শুধুই একটা মরা টিলা। কিন্তু… সেই টিলাই যে সহস্র সহস্র বছর আগেকার সেই রাক্ষস প্রাসাদ, তার একটা প্রমাণ হরিহর হঠাৎ পেয়ে যায় ওই টিলার নীচে, একটা অভগ্ন ধাতব কক্ষে। পুরাণের এক অসামান্য এবং অতি ভয়ংকর আধিদৈবী নিদর্শন! এখন সেইটেই বাক্সবন্দি হয়ে চলেচে হরিহরের সঙ্গে। সঙ্গে যে বিপুল অঙ্কের অর্থ হরিহর নিয়ে বেরিয়েচিলো, তা প্রায় পুরোটাই খরচ হয়ে গিয়েচে শ্রীলঙ্কার রাজকর্মচারীদের উৎকোচ দিতে দিতে, কিন্তু তারা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে তাদের দেশের কী ভয়ংকর অপবিদ্যাকে তারা হরিহরের হাতে তুলে দিয়েচে। এখন শুধু মণিতটে ফিরে হাতেকলমে প্রয়োগের অপেক্ষা। এই বিদ্যাকে পরীক্ষা করে না-দেখলে তার স্বস্তি নাই।
হরিহর শয়তান নয়, পাতক নয়। সে এই ঢিপিতে পাওয়া সংকেতসূত্রকে পরম শুভঙ্কর ভেবে নিয়েই মাটির অন্ধকার থেকে টেনে তুলেছিল, কিন্তু তার শেষ পরিণতি যে কতখানি নরখাদক হয়ে দেখা দিল, সেই কথাই তো আজ তোমাদের এলব।
হরিহরের চিন্তার জাল একটা ঘড়ঘড় ঘড়াম শব্দে চৌচির হয়ে গেল। সুবিশাল তারামার্কা কানাডা ইঞ্জিন এসে রেলগাড়িতে জুড়ে গিয়ে তার পথপ্রদর্শকের দায়ভার তুলে নিয়েচে। বাংলায় যাওয়ার রেলের গাড়ির জন্য প্রথম ঘণ্টা পড়তেই সন্ন্যাসী ছোটো বাক্সটা নিয়ে দোরের সামনে যেতেই রেলের প্রহরী হাত বাড়িয়ে আটকাল। হরিহর গম্ভীরস্বরে তাকে “হেই, হিয়ার” বলে নিজের বুকপকেটে হাত ছোঁয়াতেই এদিক-সেদিক দেখে প্রহরী এসে হাত পাতল। নিঃসংকোচে উৎকোচ গ্রহণ করে সন্ন্যাসীর দিকে তাকিয়ে ইতিবাচক হাত নাড়ার আগেই বুদ্ধিমান সন্ন্যাসী বাক্সগুলো তুলে নিয়েচে গাড়িতে। পরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঘণ্টা পড়তেই রেলের গাড়ি ধক ধক ধক করে চলতে আরম্ভ করল। কর্মচারী এসে বাতি ধরিয়ে দিয়ে গেল কক্ষে কক্ষে। সন্ন্যাসী কোম্পানির রাখা মাটির জালা গড়িয়ে জলপান করে বাইরের নিকষ আকাশের দিকে চেয়ে রইল।
আকাশ মাঝে মাঝে বিদ্যুতে ঝলসে উঠচে। সেই চমকানো আলোর ঝলকানিতে মেঘের দিকে তাকিয়ে সন্ন্যাসীর মনে হল, মেঘগুলো যেন ভয়ংকর আকৃতির কতকগুলি রাক্ষস, আর সেই ঝলকানির মধ্যে মনে হল, বহুসংখ্যক হিংস্র পাখির দল যেন হঠাৎ করে থমকে রয়েচে কোনো কারণে। কেউ যেন তাদের আদেশ দিয়েচে আর না-এগোনোর
*****
(৪) (সর্বনাশের হাতছানি
গতকাল হরিহর এবং সন্ন্যাসী মণিতটের প্রাসাদে ফিরেচে। হরিহর পুত্রের কুশলমঙ্গল জেনে নিজের মহলে ঢুকে সবচেয়ে ছোটো বাক্সটা টেনে আনল। সন্ন্যাসী শাবল দিয়ে চাড় দিয়ে ঢাকাটা তুলে ফেলল। ভিতরে একখানা চাকার মতো গোলাকার বস্তু রয়েচে। নিখুঁত গোলাকৃতি নয়, সিন্দুকের যেমন ষড়ভুজ ধরনের গোল হাতলের চারপাশে ছয়খানা ধাতব কাঁটার মতো থাকে, তারই কিছুটা বড়ো সংস্করণ। জিনিসটার ব্যাস দেড় হাত মতো হবে। ঠিক ধাতুও নয়, পাথরও নয়, এক অজানা কোনো দ্রব্যের তৈরি সেই বৃত্তাকার কাঁটাওয়ালা চক্রের গায়ে অজস্র অজানা লেখাজোখা, ছবি এবং চিহ্ন। বাক্সের একপাশে একখানা নতুন খাতা। এইটে হরিহরের জিনিস। শ্রীলঙ্কার টিলাতে নানান বস্তু খুঁড়ে এবং খুঁজে খুঁজে সে নিজের খাতাতে সব নথিবদ্ধ করে, অবশেষে এই চাকার সঙ্গেই বাক্সে ভরে নিয়ে এসেচে।
হরিহর পরবর্তী দুই দিন নিমগ্ন হয়ে রইল নিজের মোটা খাতাখানি নিয়ে দ্বিতীয় দিন শুধু সদরের উকিল এসে সমস্ত সম্পত্তি হরিহরের অবর্তমানে তার পুত্র শিবরঞ্জনকে হস্তান্তরের মর্মে একখানা উইল করিয়ে নিয়ে গেল। গাঁয়ের পিওন সনাতন আর পণ্ডিত কেশব সাক্ষী হিসেবে সহি করে গেল। সনাতন আর কেশবের থেকেও বিস্মিত হয়েচিলো তার পুত্র, কিন্তু তার খামখেয়ালি বাপের মুখে চিন্তার লেশমাত্র নেই।
বাড়ি ফেরার চতুর্থ দিন হরিহর নীচুস্বরে কইল, সন্ন্যাসী, আমি নকশাটা একরকম মনে মনে এঁকে নিয়েচি দুই দিনে। কিছু উপকরণ দরকার, সেগুলো পেয়ে যাব। তুই আমাকে দুই ঘটি পশুরক্ত, শ্বেতবেড়েলা-শ্বেতচন্দন- অনন্তমূলের গোছা আর তিনখানা জীবিত পায়রা জোগাড় করে দিবি কালই। প্রয়োগবিধিতে নরমাংস আর নররক্তেরও বিধান ছিল, কিন্তু সেসব আমার দ্বারা সম্ভব নয়।
সন্ন্যাসী অত্যন্ত প্রভুভক্ত হলেও সে হরিহরের ঠিক চাকর নয়। সে-ও এককালে খুব বড়ো বংশের সন্তান ছিল। সন্ন্যাসী বেশ কিছু দূর পড়াশোনা করেচে। তাকে শহর কলকাতায় খুব দারিদ্র্যের মধ্যে নিশ্চিত অনাহারের থেকে উদ্ধার করে আনে হরিহর। সন্ন্যাসী বললে, “সেসব জোগাড় হয়ে যাবে কর্তাবাবা, কিন্তু আপনার কোনো অনিষ্ট হবে না তো?”
“ঠিক বলতে পারিনে রে। যা পরীক্ষা করতে চলেচি, তা তুইও জানিস কিন্তু… ঠিক বলতে পারিনে। তবে যদি সফল হই, তবে তোকেও সঙ্গে নিয়ে যাব সন্ন্যাসী।”
“এমন সুখ যদি কপালে থাকে, “তবে আর কী চাই? তবে একটা মন্দিরের মধ্যে নকশাটা স্থাপন করতে হবে। এখন তো রাতারাতি সেসব সম্ভব নয়, আমাদের পূবের পোড়া মন্দিরটাতেই পরীক্ষা সারব। ওইটেতে তো এখন বহুকাল আর পুজো-টুজো হয় না। শুধু কিছুটা বদলাতে হবে।”
পরদিন সন্ন্যাসী সব জোগাড় করে আনল। সন্ধ্যার মুখে বনবাদাড় হয়ে-যাওয়া নির্জন ভাঙা মন্দিরে গিয়ে দাঁড়াল দুইজনে। মন্দিরের ছাদ কিছুটা ভেঙে আকাশ বেরিয়ে পড়েছে। একটা সময়ে মন্দিরের বেশ জৌলুস ছিল সন্দেহ নাই। এককোণে পুরোনো কলঙ্ক-ধরা মানুষ সমান পিলসুজের উপরে বিরাট প্রদীপ, অবশিষ্ট ছাদ থেকে ঝুলে রয়েচে ধুলা-পড়া ঘণ্টা, দোরের যে একখানা কপাট অবশিষ্ট আছে, তাতে সূক্ষ্ম কারুকাজ। মন্দিরের দেওয়ালে দেওয়ালে পাথরে দক্ষ শিল্পীর খোদাই করা দৃষ্টিনন্দন চিত্রাদি। দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ, শ্রীকৃষ্ণর অর্জুনকে উপদেশদান, কংসবধ, রাবণের সভায় রজ্জুবদ্ধ হনুমান, যশোদার মোক্ষদর্শন ইত্যাদি দিয়ে কারুকার্যখচিত এককালের শোভাময় দেউল এখন পোড়ো হয়ে অনাদরে পড়ে রয়েচে। পূজার দিন বজ্রপাতে ভক্তদের মৃত্যুর পরে হরিহরের পূর্বপুরুষেরা এই মন্দিরের দেবীকে মণিতটের ঈশানকোণে সরিয়ে নিয়ে যান নদীর পাড়ের নতুন মন্দিরে। সেই বহুকালের শূন্য বেদিতে একতাল কাদা রাখল হরিহর। পাশে একখানা বাটিতে হলুদ-গোলা জল, আলতা, রক্ত, শেকড়বাকড়। কাঁচা হাতে কাদামাটি দিয়ে মূর্তি তৈরি শেষ হলে পর সেই মুখের পানে চেয়ে সন্ন্যাসীর প্রাণ উড়ে গেল! এত ভয়ংকর কোনো মূর্তি হতে পারে? কী পৈশাচিক তার চোখ, কী ভয়ংকর হিংস্র দাঁত, লকলকে জিভ থেকে গড়িয়ে পড়চে কাঁচা পশুরক্ত। সন্ন্যাসীকে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখে হরিহর অস্বস্তির সুরে কইল, “কী করব বল? এইরকমই গঠনপ্রণালী দেওয়া ছিল যে। মূর্তি যেমনই হোক, উদ্দেশ্যটা তো সৎ, এই আমার খাতা দেখ।”
সন্ন্যাসী সেদিকে না চেয়ে বিরস মুখে কইলে, “দেখে কাজ নাই, আপনি বাকি কাজগুলো সেরে চলুন বাড়ি যাই। যেভাবে বাদলা করে এসেচে…”
সেই ভয়ালদর্শন মূর্তির সামনে খাতা পড়ে পড়ে পাথরের উপরে পাথর দিয়ে গাঁয়ের জোরে একখানা জটিল রাশিচক্রের মতো ছক কাটল হরিহর। তাতে ওই তিন রকমের রাস্তর শেকড়, কিছুটা কাঁচা রক্ত, এক খিলি পান, দুটো সুপারি রেখে হরিহর আদেশের সুরেই বলল, “পরীক্ষার সময়কাল আসন্ন। তুই বাদাড়ের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা কর। যদি সব ঠিকঠাক হয়, তোকেও এই সৌভাগ্যের অংশীদার করে নেব।”
সন্ন্যাসী আগে থেকেই এই শর্ত জানত। সে বনের বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। হরিহর মন্দিরের বাইরের উঠানে গিয়ে দাঁড়াল। সেখান থেকে আরও এক খাবলা মাটি তুলে কচুপাতায় রাখল। মন্দিরের উঠানে এককালে বহু প্রজার ভোগ রান্নার জন্য প্রায় ছয়-সাত ফুট ব্যাসের একখানা প্রকাগু পেতলের কড়াই চুন-সুরকি দিয়ে মাটির সঙ্গে গাঁথা ছিল। তিনজন মানুষ মিলে সমস্ত রাঁধা ভোগ এই বিশাল ভোগপাত্রে রেখে বিরাট বেড়ি দিয়ে তুলে তুলে প্রজাদের বিতরণ করত। সেই বহুদিনের অব্যবহৃত পবিত্র কড়াইয়ের উপর ঝুঁকে পড়ে হরিহর কিছুটা রক্তের ধারা ফেলল তার মধ্যে। তারপর একটা ছোটো পোড়ামাটির বিকটদর্শন মূর্তি তাতে ছুড়ে ফেলে কিছুটা মাটিচাপা দিয়ে দিল।
ভিতরে এসে হরিহর সেই চৌকো নকশার চারটি বাহুতে কুড়িখানা করে পেতলের প্রদীপ রাখল, আর নকশার বাইরে চার কোনায় চারটি। প্রতিটি প্রদীপে ভর্তি কর্পূর রেখে আগুন দিয়ে উত্তেজিত কাঁপা হাতে ষড়চক্র চাকতি তুলে নিয়ে ফিসফিস করে কইল, “হে মহান দ্বারপাল… আপনি দয়া করে পথ উন্মুক্ত করুন। নাগপাশের দ্বারা বন্ধ দ্বারের জন্য এই গরুড় মন্ত্রের চাবিকাঠি আমি স্থাপন করলাম…” এই বলে নকশার মর্মস্থলে চাকতিটি রেখে দিল।
হঠাৎ গোটা মণিতট ভূমিকম্পে থরথর করে কেঁপে উঠল! ষড়ভুজ চাকতিটি যেন সিন্দুকের চাবি ঘোরানোর মতোই নিজে থেকে কিছুটা ঘুরে গেল। বহু বহু দূরের আকাশ থেকে একটা অতি ক্ষীণ দুয়ারের গুরুভার শিকল খোলার ঝনঝন শব্দ এল হরিহরের কানে। সঙ্গে অতি ক্ষীণ ষাঁড়ের গর্জন। হরিহর এক লহমা হতবুদ্ধি হয়ে পাগলের মতো নিজের খাতাটা খুলে একটা পাতায় চোখ বুলিয়ে চমকে উঠে আর্তনাদ করে বলল, “গজশ্রুতে অমরালব্ধে, বৃষভে চ নারকাঃ!”
পলকের মধ্যে হরিহর একলাফে নকশার উপরে দাঁড়িয়ে টান দিয়ে চাকতিটা হাতে তুলে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে কিছুটা দৌড়েই দেখে সন্ন্যাসীও নিষেধাজ্ঞা নস্যাৎ করে বিপদের আশঙ্কায় এদিকেই ছুটে আসচে। বৃদ্ধ হরিহর চাকতিটা তার হাতে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটতে ছুটতে কইল, সর্বনাশ হতে বসেচিলো সন্ন্যাসী! গোটা পৃথিবীর ধ্বংসযজ্ঞ করতে বসেচিলাম আমি আর-একটু হলেই! সব হিসাব উলটে গেছে আমার। উফফ, কী ভয়ংকর! এই এলাকা ছেড়ে পালা। আমি চক্র উঠিয়ে নিয়ে এসেচি। পুরোপুরি সর্বনাশ হয়তো ঘটতে পারেনি এখনও।
দুইজনে মরণপণ ছুটে যখন মণিতটের প্রাসাদের উঠানে এসে পড়েছে, তখন বৃদ্ধ হরিহর বেদম হয়ে বসে হাঁপাতে লাগল। সন্ন্যাসী নিজের কর্তাবাবাকে পিতৃজ্ঞানেই ভালোবাসত। সে সম্পর্ক ভুলে হরিহরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকল। হরিহর ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে বলল, “এ কী হল, সন্ন্যাসী? এ কী হল? কী ভাবলাম আর কী হল? সব বৃথা। পরম সৌভাগ্য পেতে গিয়ে এত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে আমি তবে পরম অশুভ এক সংকেত নিয়ে ফিরলাম? আমার এত ভুল হল হিসেবে? অবশ্য বাকি দুইখানা বাক্সের ভিতরে যে জিনিসগুলো রয়েচে, তাদের থাকার কারণটাও এইবার বুঝলাম। আর তা ছাড়া…”
“তা ছাড়া কী বাবা?”
হরিহর চমকে উঠে লক্ষ করল, তাদের ঠিক সুমুখে দ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েচে তার পুত্র শিবরঞ্জন। হরিহর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কইল, “বউমা, অখিল, ভিতরবাড়ির এরা…”
“সবাই শুয়ে পড়েচে বাবা। আপনি আমাকে কি লুকাতে চাইচেন? সন্ন্যাসী, তুই অন্তত বল?”
হরিহর বিষণ্ণ কণ্ঠে কইল, “আমিই বলচি। তার আগে একটা কথা বলি। এই সর্বনাশা চক্র এই মণিতটের ত্রিসীমানায় রাখা চলবে না। খুব সুরক্ষিত স্থান ছাড়া রাখা চলবে না। সন্ন্যাসী, কলকাতায় তোর সাধনা ঔষধের পাশে সেই পোড়ো বসতবাড়ি আছে না? আমি যত লাগে টাকা দিচ্চি, তুই ওই বাড়িটা সারিয়ে নে। বাবা শিবু, তোমার অমত নাই তো? অনেকগুলো টাকা।”
শিবরঞ্জন শান্তস্বরে বললে, “টাকা আমার নয়, আপনার। সন্ন্যাসীও কিছু পরের জন নয়, ওকে আমরা সবাইই স্নেহ করি। আপনার যেমন মনে হয় করুন, কিন্তু কী হয়েচে, একটু খুলে বলুন।”
“বলচি বাপ, কিন্তু তার আগে বিলম্ব না করে সন্ন্যাসীকে রওয়ানা করে দিই। গাড়োয়ানকে চৌঘুড়ি জুততে বল। সন্ন্যাসী, মন দিয়ে শোন। তোকে হাজার দশেক টাকা আমি দিচ্চি, তা দিয়ে বাড়িটা মেরামত করে যা বাঁচে, তুলে রাখিস। আর বাড়ির ভিতরে কোনো অতি গোপন স্থানে এই সর্বনাশা চাকাটাকে লুকিয়ে রাখবি। যতদিন না বাড়ি পুরোপুরি মেরামত হয়ে রাজমিস্ত্রি বিদেয় হচ্চে, ততদিন বাড়ি ফেলে বেরোবিনে। মনে থাকবে? যা, বেরিয়ে পড়।”
গাড়োয়ান ঘুম-চোখে জল দিয়ে আস্তাবলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমানো ঘোড়াগুলোকে জুতল গাড়ির সঙ্গে আর সন্ন্যাসীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ছড়ছড় শব্দে। গাড়ি যখন মিলিয়ে গিয়েচে, হঠাৎ হরিহর চিৎকার করে উঠল, “এই যাঃ! বাকি দুটোকে তো নিয়ে গেল না? আমারও মতিভ্রম! আমারই ভুল! হায় হায় হায়।”
শিবরঞ্জন যথেষ্ট শান্ত মেজাজের পুরুষ, “কিন্তু নিজের বাপের এই অসংলগ্ন কথাবার্তা সে অনেকক্ষণ ধরেই শুনে আসচে। এইবার ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, আহ্ বাবা! সেই তখন থেকে রহস্য, ঢাকা, সর্বনাশ আর নানান কথা শুনেই চলেচি, কিন্তু খুলে না বললে আমার পক্ষে….”
“বলচি। তেষ্টা পেয়েচে। ভিতরে চলো।”
একটু সুস্থ হয়ে হরিহর নিজের সমস্ত ঘটনা নিজের পুত্রকে একে একে বলে গেল। রামায়ণের একখানা প্রায় চোখ এড়িয়ে-যাওয়া শ্লোককে বিশ্লেষণ করে এক অভূতপূর্ব রহস্যের সন্ধান পাওয়া, সেই রহস্যের পিছনে ধাওয়া করে শ্রীলঙ্কা পৌঁছানো, রাবণের আনুমানিক স্বর্ণপুরীর অবস্থান বের করে সেখান থেকে সেই বিষম রহস্যের নিদর্শন এই বস্তুগুলিকে মণিতটে নিয়ে আসা, পোড়া মন্দিরে তার প্রয়োগে এবং নিজের এতদিনের কাঙ্ক্ষিত পরীক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত ফল পাওয়া অবধি বলে গিয়ে হরিহর হাঁপাতে শুরু করল। শিবরঞ্জন স্থাণুর ন্যায় হাঁ করে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে জড়িত স্বরে কইল, “এ কী করেছেন আপনি বাবা! ঠিক সময়ে টের পেয়ে এই নকশা থেকে চক্রটাকে বিচ্ছিন্ন না করে দিলে এতক্ষণে পুরো পরগণা হয়তো ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ত! কিন্তু আপনার বিদ্যা এবং পাণ্ডিত্য অসামান্য বলেই আপনি আগাম বিপদ টের পেয়ে সর্বনাশকে থামাতে পেরেচেন, কিন্তু ভবিষ্যতে যদি কোনো শয়তান অথবা মূর্খের হাতে এই জিনিসটা পড়ে, তবে কী হবে, ভেবে দেখেচেন একবারটি?”
হরিহর তিক্ত কণ্ঠে বললে, ভেবেচি শিবু। ভেবেচি বলেই ওই রাক্ষসের চাবিকাঠিকে ত্রিসীমানা থেকে দূর করে শহর কলকাতায় পাঠিয়ে দিলাম সন্ন্যাসীর হাতে। সে করিতকর্মা এবং চতুর। আমি জানি, সে এই মারণ বস্তুকে অতি গোপনে রক্ষা করবে। তবে শোনো বাবা, এই দুইটি বাক্স তুমি ভেঙে ফেলো খুব সন্তর্পণে। কারও ঘুম যেন না ভাঙে। সন্ন্যাসী এগুলোর বিষয়ে জানে। এভাবে বাক্সবন্দি থাকলে কারও না কারও চোখে সন্দেহের উদ্রেক করবে। তুমি যেখানে হোক এই জিনিসগুলো লুকিয়ে ফেলো চোখের আড়ালে। মনে রেখো, বিশ্বসংসারে কোনো কিছুই পুরোপুরি অমর, অক্ষয়, অজর হতে পারে না। জন্মের লগ্নেই সে তার মরণের চাবিকাঠিও নিয়েই আসে। সন্ন্যাসীর কাছে আহ্বানের চাবি রয়েচে। তোমার কাছে মারণকাঠি রেখে দিলাম। একে খণ্ড খণ্ড করে ফেলে অতি যত্নে রক্ষা করো।”
ভীষণ শারীরিক ও মানসিক অবসাদের ফলে বৃদ্ধ ধীরে ধীরে নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়ল। বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শিবরঞ্জন ভ্রূ কুঁচকে ভাবতে থাকল, এই ভয়ানক মারণকাঠিকে এত বড়ো প্রাসাদের ঠিক কোন জায়গায় লুকিয়ে রাখা যায়। ঘোড়ার গাড়িকে বিদায় দিয়ে দোয়ানিয়া নদীর রাতের শেষ নৌকাতে যেতে যেতে সন্ন্যাসীও গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে একই কথা ভাবতে থাকল।
(৫) (চাবিকাঠি আর মারণকাঠি)
ঠিক আড়াই মাস কেটেচে। সন্ন্যাসী নিজের প্রভুর দেওয়া অর্থের কিছুটা ব্যয় করে এই কয় মাসে নিজেদের এককালের সুসঙ্গতির নিদর্শন এই পোড়োবাড়িটাকে মেরামত করিয়ে, কলি ফিরিয়ে একরকম চলনসই করেচে। চারপাশ-ঘেরা এই বিরাট বাড়িটার ভিতরবাড়ির মাঝখানে যে মাঝারি বাগানটা ছিল, সেটা সংস্কার করেচে, গৃহদেবতার মন্দির সারিয়েচে। এতদিন তার কর্তার পাঠানো টাকায় তার স্ত্রী অলকা পুত্রেদেরকে নিয়ে অতি সাধারণভাবে ছিল তার ভাইয়ের সংসারে। এখন সন্ন্যাসী তাদেরকেও নিয়ে এসেচে এই বাড়িতে। ভিতরবাড়ির বাগানের অর্জুন গাছটার নীচে বিকেলে সন্ন্যাসী আর অলকা বহু বছর পর বসে বসে কথা কইচে। অলকা অভিমানের স্বরে বললে, “এইবার না হয় ছেলেদের মুখের দিকে চেয়ে ওই কাজ ছেড়েই দিলে। কলকাতা শহরে কতরকম কাজ করে বউ-বাচ্চা পালন করচে সবাই, তুমিও কি চাইলে বড়োবাজার বা কলুটোলায় কাজ পাবে না? আমি তিন সত্যি করচি, তুমি ঠিক পারবে।”
“তা হয় না বোকা। হলে করতুম না? কর্তাবাবা অনাহারের মুখে আশ্রয় দিয়েচেন, তিনি নিজে না চাইলে কাজ ছাড়তে পারিনে। এইবারটি আমাকে মণিতটে যেতেই হবে একবার। তখন না হয় ছোটোদাদাবাবুকে দিয়ে একবার কথাটা পেড়ে…”
অলকা ভীষণ অভিমানে কেঁদে ফেলল। “পুরুষমানুষ এমনিই বটে! বিয়ের পর ছেলেদের নিয়ে ভাইয়ের সংসারে বোঝা হওয়ার চাইতে গলায় দড়ি-কলসী বেঁধে সবসুদ্ধ মরণ ভালো।”—সন্ধ্যার একেবারে মুখে অলক্ষুণে কথাটা বলে ফেলেই অলকা একবার কপালে হাত ঠেকাল, তারপর ভিতরবাগান থেকে উঠে গিয়ে পশ্চিমের ছোট্ট একটা কক্ষে ঢুকে দারুণ অভিমানে দোরে আগল দিয়ে অকারণেই নিজের মাত্র ছয় বছর বয়সী ছেলের উদ্দেশে চিৎকার করে বলল, “হারু, আমি আজ খাব না।”
সন্ন্যাসী একটা শ্বাস ফেলে নিজের মনে মনেই কইল, “এইবার সত্যিই কথা বলে দেখতে হবে কর্তার সঙ্গে। আর বিদেশ-বিভুঁইয়ে ঘুরে বেড়াতে মন চায় না।”
ঠিক আড়াই মাস পর সমস্ত কাজ গুছিয়ে নিয়ে সন্ন্যাসী গুটিগুটি রওয়ানা হল মণিতটে।
সন্ন্যাসী কলকাতায় রওয়ানা দেওয়ার ওই পাঁচ দিন কি ছয় দিনের মাথায় সকালের একটু পরে দুইজন মৌলি প্রজা ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল যে, বড়োকর্তাকে সাপে কেটেচে ওদিকের বনে, পোড়া মন্দিরের থানে। তারা মৌ সংগ্রহ করতে যাবার পথে দেখেই দৌড়ে এসেচে। যদিও অত সকালে হরিহর ওই পরিত্যক্ত পোড়া মন্দিরে কী করচিলো তা-ই নিয়ে একটু খটকা অনেকেরই লেগেচিলো, কিন্তু হরিহর যে কীসের টানে অত ভোরে সেখানে গিয়েচিলো তা কিছুটা অনুমান করতে পারল শিবরঞ্জন। সে লোকজন নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গিয়ে দেখল, তার বাপের প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গিয়েছে তীব্র বিষের দংশনে। শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে জড়িয়ে ধরল শিবরঞ্জন। সন্ন্যাসী চলে যাবার পর থেকেই কোনোরকম অস্বাভাবিক উৎপাত না-হওয়া সত্ত্বেও হরিহরের আচরণে সামান্য তফাত দেখা দিয়েচিলো। সমস্ত জানালা বন্ধ করে সারাদিন ঘরে বসে থাকত, কান পেতে মাঝে মাঝে ফিসফিস করে কইত, “শিকলটা ঝনঝন করচে না? একটা আওয়াজ পেলুম যেন?” আবার বাড়ির গোরুগুলো ডেকে উঠলেও চমকে উঠে বলত, “বউমা, ষাঁড়ের আওয়াজ পাচ্চো? শিগগির আগল দাও দোরে।”
.
শিবরঞ্জনের স্ত্রী তার শ্বশুরকে যথেষ্ট ভক্তিশ্রদ্ধা করত। সে করুণ মুখে বলত, আপনি এমন কেন করচেন বাবা? কেউ আসেনি, কেউ ডাকেনি। আপনি খাবারটা খেয়ে নিন।
এরই দিন ছয়েকের মাথায় হরিহরের মাথায় যে কী ভূত চাপল, সেই গৃহবন্দি মানুষটা হঠাৎ একেবারে কাকভোরে হাজির হল পোড়াতলায় আর কপাল, বিষধর সাপকাটিতে জীবন হারাল। শিবরঞ্জন পিতার মৃত্যুতে খুব বড়ো আঘাত পেল। তিনটে দিনে অশৌচ সমাপনের পরেও বেশ কিছুদিন সে প্রায় নির্বাক হয়ে ঘরেই থাকত আর খেরো খাতায় কী সব যেন লিখে যেত। মাস দেড়েক কেটে যাবার পর শিবরঞ্জন একদিন গাঁয়ের দুইজন ব্রাহ্মণ আর পড়াশোনা-জানা বিচক্ষণ মানুষ হিসেবে বন্ধু এবং পোস্টমাস্টার গোপালকে ডেকে কইল, “আমার বাবা কতখানি উদারচেতা আর প্রজা দরদী মানুষ ছিলেন তা আপনারা বিলক্ষণ জানেন। শুধু তাঁর মাথায় চাপত ইতিহাস আর ভ্রমণের নেশা। বাবা কিছু একটা খুঁজে পেয়েচিলেন বিভুঁই থেকে, যেটাকে পোড়া মন্দিরে স্থাপন করতে গিয়েই হয়তো তাঁর জীবন গেল। মন্দিরের দেবী এখন মণিতটের ঈশানে নদীর ধারের মন্দিরে স্থাপিত রয়েচেন। এক্ষণে আমি ওই পোড়া মন্দিরকেও আর অনাথ থাকতে না-দেওয়ার পক্ষপাতী। কোনো অশুভ শক্তি যাতে ওই মন্দিরকে আশ্রয় না করতে পারে, সেই কারণে আমি খুব শীঘ্রই মহাদেবকে স্থাপন করতে চাই। মূর্তি আমি নিজেই গড়ব। আমি শিখেছি। কিন্তু সেই মূর্তি হবে আমার বাবার আদলে, যা যেমন-তেমন কোনো কারিগর হয়তো করতে পারবে না…”
এই অবধি বলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে শিবরঞ্জন কইল, “হয়তো এই মৃত মানুষের আদলে বিগ্রহ গড়ার বাসনা শাস্ত্রবিরুদ্ধ মনে হবে, কিন্তু কোথাও তো স্পষ্ট করে বাধাও নাই। আপনাদের দুইজনকে আমি দশগুণ দক্ষিণা দেব, কিন্তু প্রতিষ্ঠা আপনাদের করতেই হবে।”
গাঁয়ের দুই দরিদ্র ব্রাহ্মণ অঢেল অর্থের লোভে রাজি হয়ে গেল, কিন্তু বাপের মুখের আদলে মহাদেবের মূর্তি গড়ে প্রতিষ্ঠার বাসনার পিছনে শিবরঞ্জনের পিতৃভক্তি ছাড়াও যে আরেকটা বিরাট উদ্দেশ্য লুকিয়ে রয়েচে, তার আঁচ ওই দরিদ্র ব্রাহ্মণেরা ঘুণাক্ষরেও পেল না। তবে আমি একটা কথা আজ এই বয়সে এসে ভাবি, সেই অত বছর আগে শিবরঞ্জন যদি ওই কাজটা না করতেন, তবে হয়তো আজ তোমাদের এই ঘটনা শোনাবার জন্য আমি জীবিত থাকতুম না। সেই কথা ধীরে ধীরে বলচি।
যা-ই হোক, তো এই শিবমূর্তি আরও দুই হপ্তার মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেল। পোড়া মন্দিরের বিশেষ সংস্কার হল না। মহাকালীর পরিত্যক্ত বেদিতে মহাকালকে অভিষিক্ত করা হল। কিছু আগাছা পরিষ্কার করে গাঁয়ের লোকজনকে প্রসাদ বিতরণ করা হল। সামান্যভাবে নিত্যপূজার একটা বন্দোবস্ত করা হল। গাঁয়ের প্রজারা শিবরঞ্জনের হাতে গড়া পিতৃমুখী মহাদেবের বিগ্রহ দেখে অভিভূত হয়ে চোখ মুছে কইল, “ছোটোকর্তার এলেম আছে।” হপ্তাখানেক শিবরঞ্জন গিয়ে মন্দিরে নীরব হয়ে ভগবানের মুখের পানে চেয়ে বসে থাকত। একদিন মন্দির থেকে মহলে ফেরার সময়ে গাঁয়ের বটতলার কাছে এসে শিবরঞ্জন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আছাড় খেয়ে পড়ে। বটতলার লোকজন হুঁকো-টিকে ফেলে ছুটে এসে তাকে বহুবিধ পরিচর্যার চেষ্টা করে। পথচলতি খবর পেয়ে দৌড়ে আসে শিবরঞ্জনের বন্ধু পোস্টমাস্টার। তাকে দেখতে পেয়ে গোঁ গোঁ করে শিবরঞ্জন বললে, “মরণ বাণ… মরণ বাণ… তিন খণ্ড…”- এইটুকু বলেই তার চোখ উলটে যায়। প্রজারা তাকে চেতনা ফেরানোর চেষ্টা করতে থাকলেও ততক্ষণে শিবরঞ্জনের বিলাপ বিকার উপস্থিত হয়েচে। সে অস্ফুটস্বরে হাতজোড় করে বিড়বিড় করতে থাকল, “সখী কে বা শুনাইল শ্যামনাম, কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো, আকুল করিল মোর প্রাণ।
“ সদরঘাটে নেবার পথেই ঈশ্বরের নাম করতে করতে বিকারগ্রস্ত শিবরঞ্জনের মৃত্যু ঘটে। লোকজনের মধ্যে গুঞ্জন আরম্ভ হয় মরণবাণের কথা নিয়ে। কেউ তেমন কিছু আঁচ করতে না পারলেও লোকমুখে দ্বিতীয়বার পোড়া মন্দিরের দুর্নাম রটে যায়। ধীরে ধীরে লোকজনের যাতায়াত বন্ধ হয়ে মন্দির নিজের কলঙ্ক লুকাতেই যেন আগাছার আড়ালে নিজেকে ঢেকে নেয়।
এক সপ্তাহ পর হাসিমুখে হাজির হয় সন্ন্যাসী এবং ঘাটে পা দেওয়ামাত্রই পরপর এই দুই দুর্ঘটনার সংবাদ শ্রবণ করে পাষাণ হয়ে যায়। বহু সময় ধরে শূন্য চোখে নদীর ধারে বসে থেকে বিকেলের মুখে নিজেকে কোনোমতে টেনে হাজির করে মণিতটের মহলে। শিবরঞ্জনের বিধবার সঙ্গে কাঁদতে কাঁদতে কথাবার্তা বলার পরে সন্ন্যাসী ধরা গলায় বলে, “গিন্নিমা, আমার কলকাতার সেই পুরোনো বাড়ির কথা তো আপনি শুনেচেন আগেও। কর্তাবাবার দেওয়া অর্থে আমি সেই বাড়ি পুনঃসংস্কার করিয়েচি। কর্তাবাবার একখানা জিনিস আমার কাছে রয়েচে।”—এই বলে বিধবার হাতে হরিহরের বেঁচে যাওয়া পাঁচ হাজার টাকার থলি তুলে দিয়ে, তার ছোট্ট ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সেইদিনই মণিতট ত্যাগ করে এবং আর কখনও সেখানে সন্ন্যাসী ফিরে যায়নি।
এই ছোটো ছেলেটিই অখিলরঞ্জন মহাপাত্র, যে শয়তান বৃদ্ধ আজ পুত্রশোকে অধীর হয়ে মণিতটের সর্বনাশসাধনের মানস করে কলকাতায় রওয়ানা হয়েচে নিজের কুটিল উদ্দেশ্য নিয়ে। নিজের ঠাকুরদা হরিহরের বহু লুকানো খাতায় সে বিস্তারিত পড়েচে রাক্ষসের চাবিকাঠি প্রয়োগের ভয়ংকর আবাহন পদ্ধতি, আর সেই অশুভ আবাহনকে সহস্রগুণ নরঘাতী করে তোলার জন্য দরকার তার নিজের মৃত পুত্রের রক্ত এবং মাংস।
(৬) (স্বখাত সলিল)
একটি দিন অতিবাহিত হলে পর দ্বিতীয় রাত্রে মণিতটে আত্মগোপন করে প্রবেশ করল অখিলরঞ্জন। অনেকটা দূরে পথের উপর নরহরি কসাই দাঁড়িয়ে রইল দুই মহিষের ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে। পোড়া মন্দিরে সন্তর্পণে নিজের ঝোলা রেখে ঝোপের থেকে নিয়ে এল ছেলের সামান্য বিকার-ধরা শরীরটা। তাতে অজস্র পিঁপড়ে ধরে রয়েচে। অখিলরঞ্জন সস্নেহে সেগুলি পরিষ্কার করে ছেলের মৃতদেহের ঠোঁটের উপরে রাখল একখণ্ড হাড় আর একখানা আকাশমরিচ। বুকে স্থাপন করল শ্বেতবেড়েলা আর শ্বেতচন্দনের শেকড়। পদপ্রান্তে অনন্তমূলের গোছা। একটা তেলের বাতি ধরিয়ে আলো করে দেবমূর্তির সামনের মেঝেতে হাতড়ে হাতড়ে দীর্ঘদিনের ধুলাবালি সরিয়ে পাষণ্ডটার ঠোঁটে একচিলতে খল হাসি ফুটে উঠল।
এই সেই প্রায় অস্পষ্ট নকশা! যে নকশা তার পিতামহ হরিহর মহাপাত্রের হাতে খোদাই করা। অখিল থলির থেকে অনেকখানি কর্পূর বের করে ঠাকুরদার সেই খাতা অনুসরণ করে নকশার চারটি বাহুতে কুড়িখানা করে প্রদীপ জ্বেলে ছকের বাইরে আরও চারখানি দীপ জ্বালিয়ে, একখানা ঝকঝকে ছুরি বের করে প্রথমে কেঁদে ফেলল, তারপর মৃতদেহের শরীরে সেই শানিত অস্ত্রচালনা করে, একখানা মাটির শরায় কিছুটা রক্তমাংস তুলে উপস্থিত হল বাইরের সেই মাটিতে গাঁথা প্রকাণ্ড ভোগপাত্রের কাছে। তাতে মন্ত্র পড়ে সেই মাটির সরা ছুড়ে ফেলে দিয়ে ভিতরে এসে ঝোলার থেকে বের করল সন্ন্যাসীর গৃহ থেকে চুরি করে-আনা সর্বনাশা চাকতি। সেই রাক্ষসের প্রাণঘাতী চাবিকাঠি নকশার উপরে স্থাপন করামাত্রই শুকনো আকাশে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল। খুব কাছাকাছি বনের মধ্যে যেন বাজ পড়ল। গোটা গা তিরতির করে কেঁপে উঠল। বহু দূরের কোনো অচিন লোক থেকে যেন গুরুভার শিকল ছড়িয়ে পড়ার শব্দ আর ক্ষীণভাবে খ্যাপা ষাঁড়ের গর্জনের মতো কিছু একটা ভেসে এল।
সে আর এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে ছুটতে আরম্ভ করল বনের পথ ধরে, যেদিক থেকে তারা লুকিয়ে ঢুকেচে। আকাশ থেকে একটা আগুনে গোলার মতো কী যেন মন্দিরের উপরে এসে পড়ল, আর পোড়া মন্দিরের ভিতর থেকে ভেসে এল ভীষণ ক্রুদ্ধ কোনো হিংস্র পশুর গরগর শব্দ! গো-গাড়ির গাড়োয়ানের জায়গায় নরহরি বসে রয়েচে। অখিল ছুটে গাড়িতে উঠতে গিয়ে হঠাৎ যেন আতঙ্কে স্থাণু হয়ে গেল। গাড়িতে বসা অবস্থায় দুর্ধর্ষ নরহরি কসাই এবং দুখানা মহিষ বজ্রপাতে ঝলসে গিয়েচে! নরহরির মৃতদেহটা হাঁ করে বসেই রয়েচে! এ কী ভয়ানক বিপদ! বৃদ্ধ অখিল পড়ি-মরি গাড়ির থেকে নেমে প্রাণভয়ে এলোমেলোভাবে দৌড়াল বনের পথ ধরে। আবার একবার বিদ্যুৎ ঝলসে উঠতেই সেই আলোতে এক পলকের জন্য অখিল দেখল, সামনে পথের উপর বিকট চেহারার কী যেন একটা দাঁড়িয়ে রয়েচে! তার চোখের জায়গায় দুখানা আগুনের ভাটির মতো বিন্দু ধকধক করে জ্বলচে! মাথার চুলগুলি লক্ষ বিষধর নাগের মতো উড়চে! হঠাৎ এক ছোঁ-তে বৃদ্ধের শরীরটা মাটি ছেড়ে উঠে গেল শূন্যে, আর কিছুক্ষণ পর তার ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ এসে পড়ল আধপোড়া গাড়িটার উপরে। দূরে বনের ভিতরে আবার সেই ক্রুদ্ধ পশুর গর্জন শোনা গেল। সেই শব্দে গাঁয়ের অনেকেই নিদ্রা ভেঙে উঠে বসল। পরদিন এ নিয়ে কিছুটা কানাকানি হয়ে দৈনিক কাজকর্মের মধ্যে অধিক বিস্তার লাভ করতে না-পেরে থিতিয়ে গেল।
(৭) (পুষ্করা)
সেইদিন গাঁয়ে নবীন দিন্ডা আর রতন দিল্ডা, দুই বৈমাত্রেয় ভাইতে একচোট হাতাহাতি হয়ে গেল। বৃদ্ধ ভূষণ গতকাল মধ্যরাত্তিরে মারা যাবার পর সকালে দাহকার্যের সময়ে ভূষণের প্রথম পক্ষের ছেলে নবীন এবং দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে রতনের মধ্যে বাপের মুখাগ্নি করা নিয়ে হাতাহাতি হয়ে গেল। এই অধিকারের বিষয়টুকু বুঝতে গেলে গাঁয়ের কিছু সামাজিক বিষয় সম্পর্কে একটু জানা আবশ্যক। গাঁয়ে জমিজমা ভাগের বিষয়ে যে পুত্র মুখাগ্নি করে তাকে মোড়ল সভায় একটু খাতিরের নজরে দেখা হত সেকালে। তো, শেষে দুই ভায়ে মিলেই যুগপৎ মুখাগ্নি করে গৃহে ফেরার পর পুরোহিত তিথি-ক্ষণ বিচার করে কইল, “মৃত ভূষণ দিভা মৃত্যুকালে চতুষ্পাদ দোষ পেয়েচে। আজ রাতের মধ্যেই পুষ্করা সম্পন্ন করে দোষ কাটাতে হবে।”
এই পুষ্করা এমন ভয়ংকর এবং অপয়া একটা বিধি, যার সম্বন্ধে কিছু লিখতে আমার কলম সরে না, তবুও এটুকু না বললে তোমরা বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারবে না, তাই রেখেঢেকে বলচি। মৃত্যুর সময়ে চার ধরনের দোষপ্রাপ্তি হতে পারে। একপাদ, দ্বিপাদ, ত্রিপাদ এবং চতুষ্পাদ। এইবার, একপাদ দোষকে মৃত ব্যক্তির প্রেত সঙ্গে করেই নিয়ে যায়, কিন্তু বাকি দোষগুলো এই ভয়ংকর পুষ্করা বিধির মাধ্যমে খণ্ডন না করলে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা।
সূর্য পাটে বসলে পর মৃতের শ্রাদ্ধাধিকারী পরিজন ঢাকি, পুরোহিত, লোকজন সমেত একখানা পুষ্করিণীতে উপস্থিত হয়। লোকচক্ষুর অন্তরালে একটা বিধি সম্পন্ন করে, একখানা বৃহৎ আকারের জীয়ন্ত শোল মাছকে ধারালো অস্ত্রাঘাতে দুই খণ্ড করে পুকুরের দিকে পিছন ঘুরে মাথার উপর দিয়ে জলের গভীরে ছুড়ে দিতে হয়, আর মাছটা জলে ঝুপুস করে পড়ামাত্রই ঢাকি পাগলের মতো ঢাক বাজাতে আরম্ভ করে আর গোটা দলটা আর একবারও পিছনপানে না চেয়ে চিৎকার করে পুষ্করা পুষ্করা বলতে বলতে প্রাণপণে দৌড়াতে আরম্ভ করে। সেই চিৎকার কানে যাওয়ামাত্রই গৃহস্থরা প্রাণভয়ে নিজেদের বাড়ির দুয়ার ও জানালা এঁটে, কান চাপা দিয়ে বসে থাকে।
এই দলটাও সেইরকম প্রস্তুতি নিয়েই এসেচিলো। নবীন নিজের হাতে একখানা ঝকঝকে দা দিয়ে অত বড়ো মাছটাকে এক কোপে কেটে ফেলে পিছনে পুকুরে ছুড়ে দিল। এই অবধি সবটাই খুব সাবলীলভাবে মিটল, কিন্তু সবার মন কু গেয়ে উঠল এইবারের ঘটনা খেয়াল করে! মাছটা সজোরে ছুড়ে ফেলা হয়েচে এ কথা সত্য, কিন্তু সেটা ঝপাং করে জলে গিয়ে পড়ল না। জলে পড়ার আগেই কেউ যেন শুনেই গিলে নিল রক্তাক্ত মাছটাকে! গোটা দলটার মধ্যে এইরকম একটা অভাবনীয় ঘটনায় চাঞ্চল্য দেখা দিলেও কেউই পুষ্করার অমোঘ বিধান ভেঙে পিছনে তাকাতে সাহস করল না, কিন্তু এর পরমুহূর্তের ঘটনা সবার সাহসের বাঁধ চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল! নিস্তব্ধ রাত্তিরে পরিষ্কার শোনা গেল, জলের তলা থেকে কী যেন একটা জলের উপরে উঠে এল আর তার বলবান চোয়ালের অস্পষ্ট শব্দটা যে কাঁচা মাছটাকেই চিবানোর শব্দ, তা বুঝতে কারও সমস্যা রইল না! গোটা দলটা ভীষণ আতঙ্কে পুষ্করা পুষ্করা বলে পরিত্রাহি চিৎকার করতে করতে পড়ি-মরি দৌড়াতে আরম্ভ করল, আর ভয়ানক ভীত হয়ে অনুভব করল, খুব ভারী কিছু একটা যেন তাদের পিছনে পিছনে ছুটে আসচে! পুকুর থেকে গাঁয়ের মূল পথটা অবধি এসেই গোটা দলটা যে যার মতো চোখ যায়, কেউ আলপথ ধরে, কেউ ধানিজমির নাড়া ভেঙেই এলোপাতাড়ি ছুটতে আরম্ভ করল। নবীন শ্বাস রুদ্ধ করে বাড়ির দেউড়িতে ঢুকে অচৈতন্য হয়ে পড়ে গেল।
ভোরবেলা নবীনের যখন জ্ঞান ফেরে, তখন তাকে ঘিরে উঠোনে অনেক মানুষের ভিড়। তাদের মধ্যে গতকালের কিছু লোকও রয়েচে। নবীনের বিমাতা বুক চাপড়ে চিৎকার করতে করতে বললে, এই শয়তান আমার রতনকে মেরেচে।” সে রতনকে দুই চোখেই বঁটি পেড়ে কাটত।
ক্রমে ক্রমে নবীন জানতে পারল, রতনের ধারালো কিছুতে ফালাফালা করা মৃতদেহটা আধখাওয়া অবস্থায় মনসার দেউলের বাটে ঝোপের মধ্যে পাওয়া গিয়েচে! গাঁয়ের কিছু লোক সন্দেহ প্রকাশ করে কইল, “এ নির্ঘাত নবনের কাজ। আকচাআকচি তো বাপ মরতেই দেখেচি আমরা পাঁচজন লোক। নিশ্চয়ই রতনকে মেরে রেখে এসেচে, তারপর শেয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খেয়েচে।”
কেউ বলল, “এখুনি থানায় খপর দাও। করদিন আগে ছোটোকর্তা, আর আজ নবনে, গাঁয়ের বাস এবার উঠাতে হচ্চে। হ্যা রে নবীন, তোর হাতের সেই মাছ কাটার দাউলিখানা কোথায় লুকিয়ে এসেচিস?”
সমাধান হল না। যোগ্য প্রমাণের অভাবে এবং কিছু হিতাকাঙ্ক্ষীর গ্রামবাসীর সাক্ষ্যতে নবীনকে দারোগাবাবু শাসিয়ে গেলেও সদরে চালান করলেন না। আরও কয়েকটা দিন নবীনকে মোটামুটি খুনিয়ার তকমা নিয়ে থাকতে হল গৃহবন্দি হয়ে, কিন্তু দিনকয়েক পরেই গাঁয়ের আদা-হলুদ ব্রতের দিন জল কুড়ানোর সময়ে অলকা দাসীর নৃশংস হত্যার পরেই নবীন সকলের চোখে বেকসুর খালাস পেয়ে গেল, কিন্তু আতঙ্ক আরও শতগুণ হয়ে চেপে বসল মণিতটের বুকে। সেই বিশ্রী ঘটনাটা একটু বিলম্বে বলচি।
(৮) (পঞ্চমুণ্ডীর সংকেত)
ফোনটা কানে দিতেই আমার মনটা ভালো হয়ে গেল। আজ কয়দিন ধরেই মুখুজ্জে মশায়ের কথা বারবার মনে পড়চিলো আমার। ফোনের বাক্যালাপ হল নিম্নরূপ:
“তোমাদের কথাই কয়দিন ধরে ভেবে চলেচি দাদা। ভাবচিলাম, বেশ কয়দিন হয়ে গেল দেখা হয় না…”
“না না, সত্যি বলচি। আমি তো একদিন যাব বলেও স্থির করলাম…”
‘সে আমি বুঝতেই পেরেচি তোমাকে টেলিফোন করতে শুনে। তুমি এখন আলিপুরের সদরে রয়েচো। এলে কবে?…”
“বেশ, বেশ, ছোটো কাজ যখন তাহলে আজকের মধ্যেই মিটিয়ে নিয়ে রাত্তির ইস্তক চলে এসো নেবুতলা। কানাই গাড়ি ডেকে আনবে’খন।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, রাত হলে ক্ষতি কী? এ তো শহর! কাল দুপুরে একটা নেমন্তন্ন রয়েচে বেলগেছেতে। আমার বন্ধু না হলেও বন্ধুস্থানীয় এবং রোগীও বটে। মস্ত বড়ো বাড়ি। খুব ভালো লাগবে তোমাদের….
(ওপাশ থেকে কালীপদকে নিশ্চুপ হয়ে থাকতে দেখেই আমি তার মুখভঙ্গিটা অনুমান করে লজ্জায় জিভ কেটে কইলাম) “ওই, মানে তোমাদের মহলের মতোই। না, না, অনাহূত কেন? আমার সঙ্গে তোমরা গেলে খুব খুশিই হবে তারা। আমি চিনি তাদের বিলক্ষণ। মধ্যাহ্নভোজন সেরে গল্পগাছা করে নেবুতলা ফিরব’খন।
কালীপদ একটু হেসে সম্মতি জানাল, আর রাতে গুচ্ছখানেক দপ্তরি দেওয়ানি কাগজপত্তর হাতে নিয়ে কানাইয়ের সঙ্গে এসে উপস্থিত হল কালীপদ। রাতটুকু কানাই আর আমি মিলে ভাতে ভাত ফুটিয়ে নিয়ে তিনজনে মিলে খেয়ে নিলুম। পরদিন আমার রোগী তথা বন্ধুলোক বীরেন্দ্রর পাঠানো মোটরগাড়িতে চেপে উপস্থিত হলাম বেলগাছিয়ায় তাদের মস্ত বাড়িতে। কানাই তার লাঠিগাছ নিয়ে মোটরে উঠতে গিয়ে কালীপদর নির্নিমেষ দৃষ্টি লক্ষ করে তড়িঘড়ি সেখানা রেখে এল আমার বাড়ির দোরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি আমাদের এনে নামাল বীরেন্দ্রর বাড়ির ফটকে। আমার রোগী পরিবার হিসেবে এদের আমি বিলক্ষণ চিনি। বীরেন্দ্রর বাপ হারাধন তার পৈতৃক কাঠের আড়তকে আরও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলে রীতিমতো জাঁকিয়ে ব্যাবসা করে আজ এত পয়সার মুখ দেখেচে। হারাধনের গত হবার পর এখন বীরেন্দ্র যোগ্য পুত্ৰ হিসেবে সে ব্যাবসা দক্ষ হাতে চালিয়ে যাচ্চে।
দ্বিপ্রহরে গুরুভোজনের পর ছাতের ছাউনি-দেওয়া পরিসরে শীতলপাটিতে বসে বসে টুকিটাকি গল্প চলচে, এমন সময়ে আমার মুখে কালীপদর কিছু কথা শুনে বীরেন্দ্র বিস্মিত হয়ে কইল, “সে কী ঠাকুরমশায়! আপনি তো রীতিমতো রহস্যসন্ধানী দেখচি! আমার কত পুণ্য যে আপনার মতো মানুষ আমার অতিথি হলেন।”
কালীপদ অস্বস্তিতে আমার পানে কটমট করে চেয়ে বীরেন্দ্রকে বললে, “না না, তেমন কিছু নয়। ডাক্তার সব কিছুই একটু বাড়িয়ে কয়।”
বীরেন্দ্র একফাঁকে সবার অনুমতি উঠে নীচে গেল, আর ফিরে এল একটা কাগজ হাতে নিয়ে। সেখানা কালীপদর হাতে দিয়ে কইল, “রহস্যের যোগ্য কি না জানিনে ঠাকুর, তবে একটা হেঁয়ালি কিন্তু আমার পরিবারেও রয়েচে। এই একখানা ছড়া। আমার ঠাকুরদার লেখা। আমি সেইটে তুলে রেখেচি কাগজে। তিনি কিছু কিছু বিষয়ে পণ্ডিত ছিলেন বলেই আমার ধারণা, তাই এই ছড়াখানার মাথামুণ্ডু না পেলেও আমি রক্ষা করচি এখনও। একবার যদি দেখেন।”
কালীপদ আতান্তরে পড়ে মনের বিরক্তি মনেই গুপ্ত রেখে সৌজন্যবশে কাগজটা মেলে ধরলে পর আমিও উঁকি দিয়ে পড়তে শুরু করলাম—
পঞ্চমুণ্ডী রয়েচে পাতা, শ্যামরায়ের হাটে
আসনখানা ভদ্র অতি, গঙ্গাপাড়ের ঘাটে
সেইখানেতে দুয়ার দিল বন্ধু ভীষণ রাগে
চাবিকাঠির হদিস মেলে তারই পিছনবাগে
অর্জুনেরই পায়ের কাছে মেঘ ঘনাল কালো
দুই ডুবেতে পানকৌড়ি দুখানা মাছ পেল।
আমি পরপর দুইবার পড়ে কিঞ্চিৎ শিহরিত হলাম বই-কি। বীরেন্দ্রর ঠাকুরদা যে এমন একটা রহস্য রেখে গিয়েচেন তা এই প্রথম জানলুম। কালীপদ মনে মনে ছড়াটা আওড়ে শুধাল, “তোমার ঠাকুরদা কি তান্ত্রিক ছিলেন? মানে, পঞ্চমুণ্ডীর আসনের কথা রয়েচে তো, তাই…”
বীরেন্দ্র চোখ কপালে তুলে বলল, “না না, একেবারেই না। আমার ঠাকুরদাদা প্রথম জীবনে ভবঘুরে ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি সফল কারবারি হয়ে ওঠেন। ওসব তন্ত্রমন্ত্র উঞ্ছবৃত্তির মতো…”
এইটুকু বলেই বীরেন্দ্র হাতজোড় করে কইল, “মাপ করবেন ঠাকুর, আমি ঠিক সেই কথা বলতে চাইনি।” কালীপদ একটু হেসে কাগজখানা ফিরিয়ে দিয়ে বললে, “কাগজখানায় ছড়ার নীচে সন্ন্যাসী লেখাটা দেখলাম। তবে কি উনি….”
“আজ্ঞে, তা-ও নয়। ওটা ওঁর নাম।”
“আচ্ছা, বেশ। যদি কিছু উদ্ধার করতে পারি তো জানাব নিশ্চয়ই।”
সন্ধ্যার মুখে বাড়ি ফিরে এলাম। কালীপদর সঙ্গে বৈঠকে বসে কথাবার্তা কইচি, এমন সময়ে এক অতি দরিদ্র মহিলা তার ধুঁকতে-থাকা স্বামীকে সঙ্গে করে এনে কেঁদে পড়ল, “আমার লোকটারে ভালো করে দেন ডাক্তারবাবু। ওর পেটে বড়ো বেদনা।”
আমি বললাম, “ওষুধ দিলেই ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু তার জন্য ভিজিট লাগে। টাকা এনেচো?”
মহিলা একটু বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থেকে কানের শেষ সম্বল দুইখানা মাকড়ি খুলে আমার টেবিলে রাখতে আমি সেগুলো তুলে রেখে কয়েক দাগ ঔষধ দিয়ে তাদের বিদেয় করলাম। লোকটি দেখলাম, হাত দিয়ে নিজের চোখের কোণটা মুছল। তারা চলে যেতে কালীপদ আমাকে ভর্ৎসনার সুরে যা যা বলল, তা সব উড়িয়ে দিয়ে আমি হেসে বললুম, “দুর দুর, তুমিও যেমন দাদা। লোকটা পাঁড়মাতাল। ঘরের সব বেচে মদ খেয়ে আসে। বউয়ের গয়নাও একটা একটা করে বেচে দিয়েচে। এখন পড়েচে লিভারের বেদনায়। স্বামীকে দেখিয়ে দেখিয়ে মালতী এই নিয়ে তিনবার আমার কাছে গয়না জমা দিয়ে ওষুধ নিয়ে গিয়েচে। যা হোক, এই তিনটে তো মেয়েটার রইল। না হলে এগুলোও যাবে। এখন লোকটা খুব ধীরে ধীরে শুধরাচ্চে। পুরোপুরি শুধরানোর আগে ওগুলো ফেরত নেবে না ওর বউ। তেমনই কথা হয়েচে। দিব্যি আছেন পঞ্চানন, পার্বতীরই জ্বালাতন।”
কালীপদর মুখে আবার ঔজ্জ্বল্য ফিরে এল। সে আমার তারিফেই কী যেন একটা বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গিয়ে কইল, “তোমার বন্ধুর বাড়ি কাল সকালে একবার নিয়ে চলো তো ডাক্তার! একটা সুতো পেয়েচি। দেখি, ছড়ায় কোন চাবিকাঠি না কীসের কথা বলেচে, সেইটের কোনো সূত্র পাই কি না। আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম, কাল সকালেই চলো তবে।”
সকাল সকাল কারও বাড়িতে আক্রমণ করাটা নিতান্তই অসংগত বিচার করে পরদিন দুপুরের আহারান্তে আমরা গিয়ে হাজির হলাম বীরেন্দ্রর বাড়িতে। সে আমাদের দেখে উৎসাহিত হয়ে শুধাল, “তবে কি কিছু বুঝতে পেরেচেন ঠাকুর?”
কালীপদ একটু দ্বিধা নিয়ে পালটা প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, তোমাদের কি শ্যামবাজারের কাছাকাছি কোনো বসতবাড়ি ছিল কখনও?”
বীরেন্দ্র একটু বিস্মিত হয়ে বললে, “এখনও আছে, তবে এখন আর বসতবাড়ি নেই। আমরা উঠে এসেচি এই বাড়িতেই। ওই বাড়িতে এখন একজন দ্বারবান আর দুইজন ভৃত্য থাকে। ঠিক শ্যামবাজারে নয় বটে, বাগবাজারে গঙ্গার পাড়েই সেই বাড়ি।”
কালীপদ বিড়বিড় করে বললে, “তা-ই হবার কথা। আগে শ্যামবাজারের বিস্তৃতি আরও বেশি ছিল। গৃহদেবতা শ্যামরায়ের নামেই শুনেচি এই স্থানের নামকরণ। এই একটা জায়গাই রয়েচে কলকাতায়, যেখানে পঞ্চমুণ্ডীর আসন পেতে রেখেচেন ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট।”
আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, “মানে, পাঁচমাথার মোড়?”
“হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। পাঁচটা মুণ্ড বা মাথা। সেখান থেকে কিছুটা দূরে গঙ্গার পাড়ে এদের ভদ্র আসন, অর্থাৎ ভদ্রাসন ছিল। সেই বাড়িটায় একবার যাওয়া যায় বীরেন্দ্র?”
“আলবত যায়, ঠাকুরমশায়। এখুনি চলুন। হেই লখিয়া, গাড়ি নিয়ে বারান্দায় লাগাও।”
আমরা মিনিট দশেকের মধ্যেই বাগবাজার ঘাটে সন্ন্যাসীর সেই বাড়িখানায় এসে নামলাম। তখনও ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি যে এই বাড়ির সূত্র ধরে কী ভয়ংকর একটা ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে চলেচি আমরা! দ্বারবান সেলাম দেবার সঙ্গে সঙ্গেই ভৃত্য দুইজন এসে দাঁড়িয়েছে দেখে বীরেন্দ্র কইল, “এঁরা বাড়িটা ঘুরে দেখবেন।
ভৃত্য দুইজন হয়তো বা ভেবে থাকবে যে আমরা এই বাড়িখানা কিনতে এসেচি এবং তাদের ভবিষ্যতের মনিব আমরাই, ফলে তারা খুব খাতির করতে থাকল আমাদের। ভিতরে যে ঘরখানাকে বীরেন্দ্র নিজের ঠাকুরদার শয়নকক্ষ বলে পরিচয় দিল, সেই ঘরে ঢুকে দেখি বীরেন্দ্রর সেই কাগুজে হেঁয়ালি ছড়াটাই একপাশের দেওয়ালে শক্ত কিছু দিয়ে লেখা রয়েচে। তাতে ধুলা জমেচে। বীরেন্দ্র কইল, আমি ঠাকুরদার লেখা এইটে দেখেই তুলে রেখেচিলাম কাগজে
আমি বললাম, “কিন্তু দাদা, বীরেন্দ্রর ঠাকুরদা যাকে বধূ বলেচেন, অর্থাৎ বীরেন্দ্রর ঠাকুরমা কবে কোথায় রাগে দুয়ার দিয়েচেন তা এত বছর পরে আমরা জানব কেমন করে?”
কালীপদর মুখে কোনো একটা স্মৃতি থেকেই হয়তো একচিলতে হাসি খেলে গেল। সে কইল, “এইটা তোমরা পারবে না। আমি পারব। সেসব মিষ্টি প্রথা আজকাল উঠেই গিয়েচে। আগে বড়ো বড়ো মহলে একখানা করে গোঁসাঘর থাকত। ঘরটা এমন হত যেন সেই ঘরে যাবতীয় কষ্টের উপকরণ মজুত থাকে। জানালা হবে ক্ষুদ্র, দেওয়াল হবে অপরিষ্কার, আসবাবশূন্য সেই ঘরের আকারও হবে ক্ষুদ্র। তবেই তো বধুর কষ্টের কথা অনুভব করে তার মানভঞ্জন করতে আসবে তার… থাক সে কথা, যতসব বাজে বকাও আমাকে। চলো ওইদিকটে দেখি।”
একটা এইরকম গোঁসাঘর কিন্তু সত্যিই পাওয়া গেল। হয়তো কখনও সন্ন্যাসীর স্ত্রী এই ঘরে অনাহারে মান করে থেকেচে। আমি আর বীরেন্দ্র সেই ঘরের পিছনে এসে বাইরের দেওয়ালে এসে আঁতিপাঁতি করে খুঁজচি দেখে কালীপদ বিস্মিত হয়ে কইল,
“ও কী! ওইখানে কী করচো?”
বীরেন্দ্র হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, “কেন ঠাকুর, গোসাঘরের পিছনবাগেই তো দেখার কথা বলা রয়েচে?”
“উঁহুঁ, তোমার ঠাকুরদাকে যেটুকু চিনেচি, তিনি অত্যন্ত ধুরন্ধর পুরুষ ছিলেন। পিছনবাগ বলতে তিনি ওই বাগানটার কথা বলেচেন হয়তো।”—আমরা পিছনে তাকিয়ে বাগানটার দিকে চোখ রাখলাম। কালীপদ একটা বড়োসড়ো পুরোনো অর্জুন গাছের নীচে যুগ যুগ ধরে বংশবৃদ্ধি করা কালমেঘের ঝোপের দিকে তাকাতেই বীরেন্দ্র আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “অর্জুনের পায়ের তলায় কালো মেঘ! কালমেঘের ঝোপ!”
কালীপদ তার উৎসাহ এক ফুঁয়ে নিবিয়ে দিয়ে কইল, “কিন্তু ঝোপে আগেই কোপ পড়েচে বাছা—”
কিছুক্ষণ ঘুরে দেখেই দেখা গেল শুধু কোপই নয়, ঝোপের ভিতরে বেশ কিছুটা জায়গায় মাটি খোঁড়া রয়েচে। এলোমেলো নয়, বরং মাটির তলা থেকে সুচতুরভাবে কোনো একটা গোলাকার জিনিস তুলে নেওয়া হয়েচে! জেরার চোটে চাকর দুইজন কাঁচুমাচু হয়ে জানালে, দিনকতক আগে খুব সকালে একজন টকটকে রক্তাম্বর পরিহিত কাপালিক ধরনের বাবা এসে বললে, এই বাড়িতে নাকি দানো আছে। সে দানোকে তাড়িয়ে দেবে। আমরাও পয়সাকড়ি লাগবে না শুনে বাধা দিইনি। সে আমাদের বললে, “তোদের গণ্ডি দিয়ে দিচ্চি, তার ভিতরে থাক। বাইরে বেরোলেই বিপদ। আমি দানোকে ধরে আনব।”
এই বাড়িতে চুরি করার মতো কিছুই নাই, তাই আমরাও ভয়ে ভয়ে রাজি হয়ে গেলাম। বাবাজি গোটা বাড়িটা ঘুরে ঘুরে কিছুক্ষণ পর এসে বললে, “দানোকে এই ঝোলায় বন্দি করে নিয়ে গেলাম রে বেটা। নিশ্চিন্তে থাক… এই বলে সে চলে গেল।
বীরেন্দ্র ভস্মকারী নজরে তিনজন কর্মচারীর পানে চেয়ে অসহায়ভাবে মুখ ফিরিয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললে, “কোন দানোকে ওই কাপালিক ধরে নিয়ে গিয়েচে তা তো বুঝতেই পারচি, কিন্তু আমরা আর সেই জিনিস চোখে দেখতে পেলাম না ঠাকুরমশায়!”
কালীপদও এদের কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণে বিরক্ত হয়ে কইলে, “সে কখনও কাপালিক নয়। কাপালিক কখনও এমনভাবে সেধে সেধে দানো ধরতে আসে না। আর পোশাকের বহর শুনেও মনে হচ্চে, ছদ্মবেশ ধরার জন্য সদ্য কেনা হয়েচিলো। সে সম্ভবত তোমার ঠাকুরদার লুকিয়ে-যাওয়া চাবিকাঠি নিয়ে চলে গিয়েচে, এবং আমার মন বলচে, সেই চাবিকাঠি কখনও শুভকর কিছুর চাবি নয়।”
“কিন্তু ঠাকুরমশায়, আর কি তার সন্ধান পাবার কোনোই উপায় নাই? “ কালীপদ বিরস স্বরে কইল, “দেখা যাক, পানকৌড়ির দ্বিতীয় মাছটা কী সন্ধান দেয়। এই হতভাগার দল, ওই গোলমতো খাড়া জায়গাটাকেই আরও গভীর করে খোঁড়া।”
চাকর দুইজন ভীত হয়ে ঝপাঝপ মাটি সরাতে সরাতে একটা একহাত পরিমাণ চৌকোনা শ্বেতপাথরের টুকরো তুলে নিয়ে এল। কালীপদ মাটি সরাতেই তাতে খোদাই করা একটাই লেখা চোখে পড়ল, ‘পাষাণের দেবীমূর্তিতে করিয়ো সন্ধান।’ তারপর কিছুক্ষণ ঘরদোর খোঁজাখুঁজি করে পাথরখানা নিয়ে বীরেন্দ্রর মোটরে বসলাম। বীরেন্দ্র আমাদের নেবুতলা নামিয়ে দিয়ে আসবে। আমরা গঙ্গার পাড়ের পথ ধরে কুমারটুলি ভেদ করে গাড়ি হাঁকিয়ে চলেচি, ঠিক কুমারটুলির সামনে আসতেই কালীপদ সারি সারি মাটির মূর্তির দিকে চেয়ে বীরেন্দ্রকে শুধাল, “আচ্ছা বীরেন্দ্র, তোমার ঠাকুরদার কি সুন্দরবনের কোনো এলাকায় যাতায়াত ছিল?”
বীরেন্দ্র ভ্রূ কুঁচকে কইল, “হ্যাঁ, ঠাকুরদার মুখে মাঝে মাঝে মণিতট নামের একটা গাঁয়ের কথা শোনা যেত, কিন্তু অত বড়ো সুন্দরবনে সেই ছোট্ট গাঁ কোথায়, তা খুঁজে বের করা বোধহয় আজ আর…”
কালীপদ বীরেন্দ্রর কথার খেই ধরেই গম্ভীরস্বরে বললে, “পুরোপুরি অসম্ভব নয়। তোমার ঠাকুরদা এলাকাটার নামটাও বলে গিয়েচেন। গ্রামটা না চিনলেও তালুকটা আমি চিনতে পেরেচি। সুন্দরবনের পাথরপ্রতিমা তালুক। মানুষটা ঠিক কীসের প্রকোপ ঠেকাতে কীসের চাবিকাঠি এত গোপনে লুকিয়ে রেখেচিলেন তা না জানলে হয়তো ভুল করব। বিশেষ, সেই গ্রাম আমার জন্মভূমিরই বহু দূরের একটা অংশবিশেষ।”
আমি কালীপদর কায়দায় হাতের আঙুলগুলো মটকালাম। কালীপদ অপলক দৃষ্টিতে আমার অঙ্গভঙ্গির দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ফেলল।
(৯) (ছোঁ)
রতন দিন্ডার নৃশংস হত্যার পর দিন চার-পাঁচ অতিবাহিত হয়েচে। গাঁয়ের অধিকাংশ গৃহেই রতনের ভাই নবীনকে নিয়ে সমালোচনা আর কুৎসার কথা আলোচনা হয়, কিন্তু ভূষণের পরিবারের হাতে অনেক টাকা, তাই এসব কুৎসা তেমনভাবে নবীনের মুখোমুখি কেউই করে না। ভূষণের দ্বিতীয় পক্ষ রোজ জলগ্রহণ করার আগে নবীনের মৃত্যুকামনা করে।
তো, সেইদিন গাঁয়ে মেয়েদের কী একটা ব্রতের উদ্যাপন ছিল। সেই আদা-হলুদ অথবা আদুরি-আসন ব্রতোপলক্ষ্যে গাঁয়ের আট দশজন মেয়ে-বউ তামার ঘড়ায় জল ভরতে গিয়েচে গাঁয়ের শীতলা পুকুরে। অলকা দাসী ছিল এই ব্রতের এয়ো। চার বছর ধরে এই ব্রত চলে, তারপর চতুর্থ বছরে আজ উদ্যাপন। মেয়েরা অলকা দাসীর আঁচলে ভরে দিয়েচে ফুল, ধান, ধনের বীজ, পাঁচখানা আদা-হলুদের খণ্ড ইত্যাদি। তখন ভোরের আলো ভালো করে ফোটেনি। মেয়েরা বড়ো ঘড়ায় জল ভরতে ভরতে জলের গব গব গব শব্দ পার করেও শুনতে পেল, এই গাছ থেকে ওই গাছে খুব ভারী কী একটা যেন ঝাঁপিয়ে ওদিকে চলে গেল! সেই গাছের সদ্য জাগা পাখিরা আতঙ্কে কলরব করে উঠল! পুকুরের মাছগুলো খলবল করে উঠল।
অলকা দাসী হাঁ করে একবার শীতলা পুকুরের চারদিক ঘেরা গাছপালার পানে চাইল। আলো তখনও তেমন দৃশ্যমান হয়নি, কিন্তু শেষে বেঁটে আম গাছটার মাথা পেরিয়ে আরও উঁচু দুখানা ডালের মতো কী যেন উঁচিয়ে রয়েচে! অলকা আবার নীচু হয়ে জল ভরতে যেতেই আড়চক্ষে মনে হল, সেটা নড়েচড়ে উঠল! অলকা শুষ্কস্বরে পাড়ের মেয়েদের কইল, আম গাছের পিছনে ওটা কী লো সই? ওই যে শিড়িঙ্গে মতো!
মণিমালা কাঁপা কণ্ঠে বললে, আম নয়, ওটা বকুল। গাছের উপর দুখানা মগডাল! ডাল তো নয় যেন… যেন একখানা শিঙেল গাই!—মণির কথা শেষ হবার আগেই পুকুরের ওপাশ থেকে একটা ভয়ংকর হিংস্র গর্জন ভেসে এল। মেয়েরা পরিত্রাহি আর্তনাদ করে যে যার মতো ছুটতে আরম্ভ করল। অলকা দাসী ঘাট থেকে উঠতে গিয়ে সামান্য পিছিয়ে পড়েচিলো, কিন্তু সবেগে ছুটে প্রায় এদের সমানে চলে এসেচে। পিছনে পিছনে কোনো একটা গুরুভার জন্তু যেন ধাওয়া করেচে তাদের। মণিমালা অত ভীতির মধ্যেও একবার পিছনে ঘুরে তার সইকে দেখতে গেল, আর চকিতের মধ্যে তার চোখের সামনে থেকে অলকাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গেল গাছের ওপাশ থেকে এগিয়ে-আসা একটা নখরযুক্ত থাবা! অলকার মরণাহত চিৎকার ভেসে এল অনেক দূর থেকে, কিন্তু তার সইরা কেউই প্রাণভয়ে দাঁড়াল না।
বেলার দিকে অলকা দাসীর ছিন্নভিন্ন, অর্ধভুক্ত মৃতদেহটা একটা কাঁটাল গাছের মাথার একটা ডালের থেকে ঝুলে থাকতে দেখা গেল। মৃতদেহের বেশবাসের বিচ্ছিন্ন অবস্থার কারণে দফাদার না-আসা অবধি কোনো পুরুষমানুষ সেইদিকে ঘেঁষল না। এই কয়দিন নবীনকে শাপশাপান্ত করা বিমাতাও কান্না ভুলে শুধাল, “তবে কি নবীন নয়? তাহলে মোহন দাসের বউটাকে মারল কে?”
(১০) (সিঙেদের ঘাট)
বিমল বাউড়ি চালের ব্যবসায়ী এবং সংগতিপূর্ণ কৃষক। গাঁয়ের জীবনযাত্রা শহরের তুলনায় বেশ কিছুটা পরিশ্রমসাধ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণও বটে। এই পরপর দুইখানা পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পরেও কিন্তু বাড়িতে আগল দিয়ে বসে না থেকে বিমল বাউড়িকে তার তিন কৃষাণের সঙ্গে পোড়াতলার জঙ্গল পেরিয়ে সিঙেদের ঘাটের দিকে রওয়ানা হতে হয়েচিলো বস্তা বস্তা চাল নৌকা ভিড়লেই শহরে নিয়ে যাবার উদ্দেশে। পোড়াতলার মন্দিরটার পাশ দিয়ে সহজে কেউ এখন আর চলাচল করে না, কিন্তু বিমল ধরল সেই পথটাই এবং অপরাহ্ণের আলোতে তাদের চকিতে মনে হল, বন চিরে নদীর দিকে চলে-যাওয়া পথটার উপরে অনেকটা দূরে কী যেন একটা একলাফে পথটুকু পার হয়ে ওপাশের ঝোপে মিলিয়ে গেল!
দৃশ্যটার স্থায়িত্বকাল এতটাই কম যে বিমলের বোধ হল, সে আলো-আঁধারিতে ভুল দেখেচে। তাড়াতাড়ি পা না চালালেও নয়। আর-একটু পরেই শেষ বিকেলের নৌকোটা গাঁয়ের কিছু টুকিটাকি যাত্রীকে নামিয়ে দিয়েই ফের চলে যাবে। কৃষাণরা বোধহয় মাথায় বস্তা থাকার কারণে কিছু দেখতে পায়নি। বিমল তাদের তাড়াতাড়ি চলতে বলল। আনুমানিক যেখানে বিমল সেই ছায়াটাকে পথ পেরোতে দেখেচিলো, সেই জায়গাটাতে এসে হঠাৎই বিমল বাউড়ির গোটা গা যেন ভারী হয়ে গেল! খুব ভয়ংকর কিছু আশপাশে লুকিয়ে থাকলে যেমন হয়, তেমনটা। কৃষাণরাও কিছু একটা টের পেয়ে আনচান করচে। হঠাৎ ঝোপঝাড় ভেদ করে একটা স্থূল, কৃষ্ণবর্ণ থাবা চক্ষের পলকে একজন কৃষাণকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গেল। সে বেচারা শেষ চিৎকারটা যখন করতে সুযোগ পেল, তখন সেটাই তার শেষ গলার স্বর ছিল। চকিতের মধ্যে সেই ক্ষিপ্র আক্রমণের দৃশ্য চোখে পড়তেই বাকি কৃষাণেরা বুকফাটা আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে দৌড়াতে আরম্ভ করল! আততায়ী যখন অদেখা, তখন আতঙ্ক হয় শতগুণ অধিক।
বিমল ভীষণ ভয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে মাঝেমধ্যেই শুনতে পেল একেকজন কৃষাণের মৃত্যুকালীন শেষ দমফাটা চিৎকার! বিমল শ্বাস রুদ্ধ করে ছুটে শেষ ঝোপটা পেরোতেই দেখল, বিকেলের নৌকাটা ঘাটে ভিড়বে ভিড়বে করচে, কিন্তু হয়তো মাঝি পোড়াতলার বনের আর্তনাদগুলো কানে আসাতেই পুরোপুরি পাড়ে ভিড়তে দ্বিধা করচে। পিছনে কী একটা যেন ভারী প্রাণী তেড়ে আসচে ঝোপঝাড় ভেদ করে। বিমল ভীষণ জোরে ছুটে এসে জলে ঝাঁপিয়ে নৌকার গলুইটা ধরে কোনোমতে নিজেকে পাটাতনের উপরে তুলে দিয়ে হাতের আঙুল দিয়ে মাঝিকে অনতিদূরের বনটা দেখাল।
মাঝি ভীষণ চমকে উঠে টের পেল, গাছের মাথায় পাখিগুলো ভীষণভাবে আর্তনাদ করে চলেচে এবং গাছপালা ভেদ করে কেউ যেন বুভুক্ষুর মতো ধেয়ে আসচে সিংদের ঘাটের দিকেই। মাঝি প্রাণভয়ে লগি ঠেলে নৌকাটাকে হাতকয়েক দূরে নেওয়ামাত্র একটা বিকট কালো থাবা এসে গোটা নৌকাটাকে শিশুর খেলনার মতো আঁকড়ে ধরল! তার কাস্তের মতো নখগুলো ছইয়ের খড় ভেদ করে ভিতরে ঢুকে এল! মাঝি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে পাটাতনের ফাঁকে শরীরটা গুটিশুটি মেরে নেমে পড়ল আর বিমল মৃতপ্রায় হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে রইল পাটাতনের উপরেই। মাঝি নিজের গলার পাঁচ দরিয়ার পিরের কবচটা বের করে উঁচিয়ে ধরল অন্ধের যষ্টির মতো, আর সঙ্গে সঙ্গে নৌকাটাকে কিছুক্ষণ ঝড়ের মতো টানাটানি করার পর আচমকা সেই থাবা ফিরে গেল ঝোপের ভিতরে। বিমল এই সাক্ষাৎ দানবের হাত থেকে আপাত রক্ষা পেয়ে বিহ্বলের মতো কোনোমতে মাঝিকে কইল, হা ঈশ্বর! তোমার কবচের জোর আছে মাঝি! না হলে এমন দুর্ধর্ষ রাক্ষস এভাবে ফিরে গেল শিকার না নিয়ে? আমার কৃষাণরা ওই বনের মধ্যে…
“হয়তো ফিরে গিয়েচে শতগুণ শক্তিবৃদ্ধি করে ফিরে আসার জন্য…” অচেনা কণ্ঠ শুনে বিমল ছইয়ের ভিতরে মুখ বাড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে শুধাল, “আজ্ঞা আপনারা!”
“ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দীঘড়া। এনারা আমার সঙ্গে এসেচেন। এই ঘাটে নামলেই মণিতট গ্রাম তো?”
“আজ্ঞা হাঁ ঠাকুর। মণিতটে কার বরাবর যাবেন?”
কালীপদ সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে বললে, “তা এখনও ঠিক করিনি বটে। কেন, তোমাদের গাঁয়ে কি ব্রাহ্মণ আর তার সাথীদের আশ্রয় দেওয়ার রীতি নেই বাছা?”
জিভ কেটে বিমল কইল, “ছি ছি ছি ঠাকুরমশায়, ও পাপের কথা কইবেন না। কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হয় আপনি বড়ো যেমন-তেমন মানুষ নন! আপনি আমার গৃহেই অতিথি হবেন, এ আমি মাথা খুঁড়ে বলে রাখচি। কিন্তু ঠাকুরমশায়, আমাদের গাঁয়ে এই কিছুদিন ধরে ভয়ানক …”
“সেসব গাঁয়ে গিয়ে শুনব, বাছা। তবে এই প্রেত নিজেকে বনের আড়ালে রাখলেও তার যা ক্ষমতা, দেখলাম, তাতে আর দিন তিনেকের মধ্যেই সে এত শক্তি বৃদ্ধি করে ফেলবে যে তাকে আটকানো আমার সাধ্যি হবে না, এ আমি হলফ করে বলতে পারি।”
আমরা নৌকা থেকে সিঙেদের ঘাটে নেমে খুব সতর্ক দৃষ্টি মেলে আধো অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে বনের পথে চলতে চলতে গ্রামের কাছাকাছি চলে আসার পথে কালীপদ ভ্রূ কুঁচকে দূরের দিকে আঙুল দেখিয়ে কইল, “ওইটে কি বনের মধ্যে?”
“আজ্ঞা, ওইটে পোড়া মন্দির। ওখানকার দেবী এখন ঈশানের নদীর পাড়ের দেউলে থাকেন। এখানে জমিদারের বাপ শিবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেচিলেন এককালে, এখন তা আগাছায় ভরে গিয়েচে। আপনারা চাইলে নিয়ে এসে দেখাব’খন ঠাকুর।”
বিমল ভালোই বুঝেচে যে আজ অন্তত কালীপদ থাকতে নতুন কোনো উপদ্রব বা অনিষ্ট হবার কথা নয়। আমি, কালীপদ, কানাই আর বীরেন্দ্র রাতে বিমলের গৃহে আশ্রয় নিলাম। বীরেন্দ্র অত্যন্ত বিহ্বল হয়ে বললে, “ডাক্তার, এই গাঁয়েই আমার ঠাকুরদা নিজের জীবনের অনেকখানি সময় কাটিয়েচেন বলে শুনেচি বাবার মুখে। এই আজ যা ভয়ংকর ঘটনা দেখলাম, তার সঙ্গে কি ওঁর কোনো যোগসূত্র ছিল? আমার কিন্তু একটা ভারী চমক বোধ হচ্চে।”
কালীপদ চোখের মণি তুলে নামিয়ে নিল। আমি বেশ বুঝলাম, আসন্ন বিপদের কথার চিন্তার মধ্যে এসব তরল কথাবার্তা তার একাগ্র চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটাচ্চে। আমি মুখ বন্ধ করলাম।
সেই রাতের পর আরও তিনটি বিপদসংকুল সূর্যোদয় আমরা মণিতটে বসে দেখেচি ইতিমধ্যে। এর মধ্যে নূতন কোনো নরহত্যা হয়নি। হয়তো কালীপদর কথাই সত্য। সেই নরঘাতক রক্তলোলুপ পিশাচ কোনো না কোনো উপায়ে বীরেন্দ্রর ঠাকুরদার লুকিয়ে-যাওয়া চাবিকাঠির দ্বারা জীবজগতে এসে উপস্থিত হয়েচে! কী জানি! এখনও তার আসল পরিচয় আমাদের অধরা।
এই আড়াই দিন কালীপদ অক্লান্তভাবে ঘুরে ঘুরে বহু গ্রামবাসীর সঙ্গে কথাবার্তা বলেচে। এই একটা বিষয় আমি কালীপদর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আবিষ্কার করেচি যে, যাদের কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে একেবারেই তুচ্ছ অথবা বেমানান মনে হয়, তাদের মধ্যে কারও কারও থেকেই মাত্র একটা অসংলগ্ন কথার ভিতরেই রহস্যভেদের চাবি লুকিয়ে থাকে। এমনটা বহুবার দেখেচি আমি। আমি এখন রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতিটাই কাজে লাগিয়ে সুফল পাই। যা-ই হোক, আজ সকালে আমরা গিয়েচিলাম মহাপাত্র জমিদারদের সদ্য পরিত্যক্ত মহলে। কিছু ভৃত্য এখনও ইতিউতি রয়েচে, কিন্তু তাদের অবস্থা প্রভুহীন, দিশাহীন। আমাদের সঙ্গে গাঁয়ের কিছু লোক থাকাতে তারা আমাদের বাধা দেয়নি, কিন্তু ছায়ার মতো পিছুপিছু ঘুরেচে। দেওয়ালে দেওয়ালে বিরাট বিরাট তৈলচিত্র বিভিন্ন সময়ের জমিদারদের। হরিহরের চিত্রের সামনে এসে কালীপদ চেয়ে রইল কিছুক্ষণ।
অবশেষে কালীপদ একখানা উঁচু কুলুঙ্গি থেকে দুইখানা লাল খেরো খাতার ধুলা ঝেড়ে সামান্য চোখ বুলিয়েই তার ললাটে ভাঁজ পড়ল। দুই-একটি পাতা উলটেই সে দ্বিধাগ্রস্ত, চিন্তিত কণ্ঠে ফিসফিস করে কইল, “আশ্চর্য! কী আশ্চর্য! এ কী!”
আমি একবার হাতে নিয়ে দেখলাম, একখানা খাতায় দিনপঞ্জি লেখার ধরনে একরাশ কী সব লেখা রয়েচে, আর অপর খাতাটি বোধহয় বাজার সরকারের রোজকার হাটবাজারের হিসেবপত্তর। দুটি প্রায় একই রকম দেখতে। কালীপদ প্রথমে বাজারদরের খাতাখানা রেখে দিতে গিয়েও কী যেন মনে করে দুখানাই হাতে নিয়ে বললে, “এই দু-খানা খাতা আমি নিয়ে যাচ্চি। তোরা কেউ কোনো জিনিসে হাত দিবিনে। যা যেমন রয়েচে, তেমনি থাকে যেন।”
একটি অল্পল্পবয়সি ভৃত্য বিরস স্বরে শুধাল, “জিনিস নিয়ে চলে যাচ্চেন, আমাদের আদেশ দিচ্চেন, আপনি কে বটে?”
কালীপদ মুহূর্তে উত্তর দিল, “আমি রায়দীঘড়ার জমিদার। ছোটো তরফ। তোদের এই মহল নিয়ে ভাবনাচিন্তা রয়েচে। আয়পত্র কেমন বলতে পারিস?”
আমি হাসি চেপে দেখলাম, ওই এক ঔষধেই দারুণ কাজ হল। বিগলিত হয়ে ভৃত্যের দল তৎক্ষণাৎ সম্মতি দিল।
ফেরার পথে বাম হাতে একটা গাছে ঘেরা চমৎকার দিঘি দেখে আমরা সেটার ঘাটে গিয়ে বসলাম। আমি বসতে গিয়েই নীচে একটা কাঁটার মতো কিছু অনুভব করে উঃ বলে লাফিয়ে উঠে যেইটে পেলাম, তাতে আমার চিত্ত অকারণেই সন্দিগ্ধ এবং প্রফুল্ল, যুগপৎ হয়ে উঠল। একখানা কানের মাকড়ি আর একটা নাকছাবি। খাঁটি সোনার। কালীপদ ইতিউতি চাইতেই কানাই কইল, “ওই যে কর্তাবাবা, অপর জোড়াটা।”
দুই ধাপ নীচ থেকে মাকড়ির অপর জোড়টা পাওয়া গেল। কালীপদ শুধাল, “এ কী বিমল? ছি ছি ছি, তুমি বলবে তো এটা মেয়ে-বউদের নাইবার ঘাট। তাহলে আমরা কক্ষনো…”
বিমল আশ্বস্ত করে কইল, “না ঠাকুরমশায়, এইটে দশকর্ম ঘাট। কোনো চিন্তা নাই। এইখানেই কিছুদিন আগে একটা ঘটনা ঘটেচে….”
কালীপদর অপলক দৃষ্টির পানে চেয়ে বিমল কইল, “বলচি ঠাকুর। আসলে কথাটা এমনই খারাপ কথা যে আমি ডাক্তারকে আলাদা করে কইতে পারি।”
আমি পড়লুম আতান্তরে! যে কথা বিমল বলতে পারচে না, সে কথা আমিই বা দাদাকে বলি কেমন করে। বিমল ধীরে ধীরে ঘটনাটা বলল। গাঁয়ের জীবনরাম দাসের বাড়ি এই ঘাটটায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় ওই পুবদিকে। জীবনের বড়োছেলের বিবাহ হয় এক বছর আগে। বউটি লক্ষ্মীমন্ত। তো সেদিন জীবনের ছোটোছেলে পবন রাতে লুকিয়ে তামুক খেতে আসে এই ঘাটেই। রোজই আসে। পবনকে দেখলে বুঝবেন ডাক্তারবাবু, নিজের গাঁয়ের ছেলে বলে বলচি না, এমন সুপুরুষ আর রূপবান ছেলে শহরেও মেলে না। তো পবন কাঁচি-সিগারেটের তলানিতে চলে এসেচে, এমন সময়ে পিছনে রিনরিনে শব্দ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে চমকে উঠে বলল, “বউদি! তুমি! মাইরি বলচি, আমি কখনও তামাক খাইনে, আজ হঠাৎ ইচ্ছে হল…”
বউদি মণিমালা এক-গা গহনা এবং দামি শাড়ি পরে এই রাত্তিরে উঠে এসেচে দেখে পবন হাঁ হয়ে রইল। মণিমালা মিষ্টি হেসে পবনের কাঁধে হাত রেখে কইল, “ভয় নাই। আমি কারুকে কিচ্ছুটি বলব না। যদি আমার সব কথা শুনে চলো।’
বিমল একটু গলাখাঁকারি দিয়ে বললে, “পবন ঘাড় কাত করতেই মণিমালা নাকি তার ঠাকুরপোর কাঁধে হাত রেখে এমন নোংরা ইঙ্গিত করে খলখল করে হেসে উঠল, যে হাসি পবন তার মাতৃসমা বউদিদির থেকে স্বপ্নেও আশা করেনি! তার চটুল, অশালীন কিছু আচরণে পবন হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। মণিমালা লাস্যময়ী নয়নে চোখের মণি তুলে দেবরের দুই গাল নিজের উত্তপ্ত হাতের তালু দিয়ে চেপে ধরে মুখের কাছে মুখ এগিয়ে দিল আর পরমুহূর্তেই অমন শান্ত ছেলেটা ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে তার বউদির গাঢ় বাহুবন্ধন ছাড়িয়ে তাকে এক ঠেলা দিয়ে ‘মর রাক্ষসী বেহায়া কোথাকার’ বলেই ঘাটের থেকে দুই পা বাড়িয়েচে এই এইদিকটায়, অমনি ভয়ংকর একটা গর্জন শুনে চমকে উঠে পবন দেখে ঘাটের ঠিক এই জায়গাটায় একটা ভয়ংকর মূর্তি দাঁড়িয়ে ফুঁসচে! সেই সঙ্গে একটা বিকট পচা গন্ধে বিষিয়ে উঠেচে বাতাস। রাক্ষসীর পূর্বের সৌন্দর্য কোথায় উবে গিয়ে অতি ভয়ংকর এক মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে সামনে! পবন আতঙ্কে চিৎকার করে দশ লাফে বাড়িতে ঢুকেই দ্যাখে, একটু আগে পুকুরঘাটের গর্জন শুনে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রয়েচে তার পরিবারের সবাই। বউদিও! সেই বিভীষিকা জীবনের দেউড়ি অবধি তাড়া করে বাতাসে মিলিয়ে যায়। এরপর পবনের জ্বরবিকার আরম্ভ হয়। সে এখন শয্যাশায়ী। রোজ তার বেদনা বাড়ছে। বড়োবউমা ভোর হতেই বাইরে বেরিয়ে দ্যাখে, শয়তানটা তার যে শাড়ি-গয়না আত্মসাৎ করে ছদ্মবেশ ধরেচিলো, তার অন্তর্ধানের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলিও পড়ে রয়েচে বাড়ির সামনে। কেবল এই দুটির খোঁজ মেলেনি, কারণ ভয়ে এই ঘাটে কেউ আসেনি এর মধ্যে।
কালীপদ আনমনে সেগুলো বিমলের হাতে তুলে দিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ছদ্মবেশী সেই শয়তান বা শয়তানি পবনের বাড়ির সামনে গিয়ে পুরোপুরি অদৃশ্য হল, ফলে সমস্ত শাড়ি-গয়না সেখানেই পড়ে রইল। এই অবধি ঠিক আছে। কিন্তু সে মোহময়ী থেকে আসল রূপ ধরেচিলো এই ঘাটেই এবং তখনই এই গয়না দুটো পড়ে রইল এখানেই। কেন? কীসের জন্য? পবনের সঙ্গে কি তার হাতাহাতি হয়েচিলো?
আমরা ঘাটের থেকে উঠে রওয়ানা দিলাম।
এইবার গতকালের একটা কথা বলি। গতকাল কালীপদ আমাদের সঙ্গে নিয়ে দ্বিপ্রহরে পোড়াতলার মন্দির দেখতে গিয়েচিলো। তার আগে গাঁয়ের একটা চালাক-চতুর ছোকরাকে একটা খোঁজ নেবার জন্য চিঠি দিয়ে সদর চৌকিতে পাঠাল কালীপদ। আমরা পোড়াতলার বাইরে গোযান ছেড়ে পদব্রজে চললাম। বনে ঢোকার মুখে সজোরে কীসের যেন ঘ্রাণ নিয়ে সে একবার আমার মুখের পানে চেয়ে সবার অলক্ষে নিজের চোখের পাতা বন্ধ করে মাথাটাকে একদিকে হেলাতেই আমার প্রাণ উড়ে গেল! ভাগ্যে সেই বিষয়টা বাকি কেউ খেয়াল করেনি! খুব ভয়াবহ কিছু এই বনের ভিতরেই হয় ঘুমিয়ে রয়েচে, নয়তো দিনের আলোয় সুপ্ত হয়ে রয়েচে!
আমরা পোড়া দেউলের ভিটেতে এসে দাঁড়ালাম। মন্দিরের ইতিহাস আমরা মোটামুটি জেনে গিয়েচি গাঁয়ের রায়তদের মুখে। তারা এই মুহূর্তে করমুক্ত প্রজা, তাই আতঙ্কের মধ্যেও একটা খুশি তাদের রয়েচেই। মন্দিরটি যে কারিগরেরা গড়েচেন, তাদের হাতের তারিফ করতে হয়। পঞ্চরত্ন ধাঁচের মাঝারি মন্দির, কিন্তু তার কারুকার্য অসামান্য। দেউলের বাইরের প্রশস্ত জমিতে আগাছা ভরে গিয়েচে। কাঠের ভারী দুয়ার ফটকে ঘুণ ধরেচে পুরোদমে। বাইরে একটা ছোট্ট ছাউনির নীচে একটা প্রায় চার হাত ব্যাসের ভোগের কড়াই বিলিতি মাটি দিয়ে ভূমির সঙ্গে গাঁথা। তার ধূলিমলিন হাতলে বহুদিনের অব্যবহারে আগাছা উঠেচে। কড়াইয়ের নীচে আগুন দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল এককালে, এখন লতাপাতায় ঢাকা পড়েছে। উঠানের মাঝখানে একটা হাড়িকাঠ। কালীপদ একবার ভোগের কড়াইয়ের সামনে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখল, কড়াইয়ের নীচে কালোমতো কিছু জমাট হয়ে রয়েচে, তাতে কিছু মাছি ইতস্তত উড়চে। সেই জমাট জিনিসটার মধ্যে একটা পোড়ামাটির ক্ষুদ্র পুতুল। কালীপদ চিন্তিত মুখে সেগুলো দেখে সরে এল।
প্রথমে ঘুরে ঘুরে বাইরেটা দেখতে দেখতে একটা জায়গায় একটা ঝোপের নীচে আগাছা কিছুটা এলোমেলো দেখে কালীপদ সন্তর্পণে সেই ঝোপটা উত্তমরূপে দেখে নিয়ে, আগাছা ফাঁকা করে করে মাটিটা নিরীক্ষা করে বিড়বিড় করে বলল, “এই ঝোপে কুকুর-শৃগালের পক্ষে লোভনীয় হতে পারে এমন কিছু ছিল ডাক্তার। তারা এখানে রীতিমতো ঘোরাফেরা করেচে দলে দলে। কিছু ছাপ বিনষ্ট হয়েচে অপেক্ষাকৃত ভারী পায়ের আঘাতে। এখানে যা ঘটচে তা খুব স্বাভাবিক নয়। তুমি বুঝবে না হয়তো, কিন্তু আমি টের পাচ্চি। খুব খারাপ এবং নিম্নস্তরের তন্ত্রক্রিয়া ঘটেচে এইখানে। এমন কোনো প্ৰক্ৰিয়া, যা জীবনীশক্তির বিপ্রতীপ। আমার শরীর কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে পড়চে এখানে ঢুকে। আসার পথেও দেখলাম, বেশ কিছু গাছ বজ্রপাতে ঝলসে রয়েচে এলোমেলো ভাবে। আমার সন্দেহ হয়…
তারপর আমার কানের কাছে মুখটা নিয়ে কইল, “এখানে শয়তান জাগানো হয়েচে।”
আমরা ঢুকলাম মন্দিরের ভিতরে। একসময়ে ভারী যত্নে গড়া হয়েচিলো আজকের এই পরিত্যক্ত মন্দির। ছাতের দিকে কিছু অংশ পরবর্তীতে মেরামত করা হয়েচে। দেউলের প্রাচীরে প্রাচীরে পৌরাণিক চিত্রকলা পাথরের গায়ে খোদাই করা। দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ, শ্রীকৃষ্ণের মাটি খাওয়া, হনুমানকে সভায় বেঁধে এনে ল্যাজে আগুন দেওয়া, বকাসুর বধ, বিশ্বরূপ দর্শন ইত্যাদি। সেসব ধূলিধূসর হয়ে, অতীতের ভাস্কর্যের নিদর্শন বুকে ধরে ঘুমিয়ে রয়েচে। শিবমূর্তির সামনে একটা সুক্ষ্ম নকশা, তার চার বাহুতে কুড়িটা করে প্রদীপ আর নকশার বাইরে চার কোনায় চারটি। নকশার মাঝে একটা ছটা বিকিরণকারী সূর্যের ন্যায় গোল চাকার মতো বস্তু। তার চারদিকে গোটাকতক বাহুর মতো বেরিয়েচে। কালীপদ নীচু হয়ে একটু দেখে শ্বাস ফেলে কইল, কী বিধি করা হয়েচে, ঠিক বুঝতে পারচিনে, কিন্তু প্রদীপগুলিতে সলতের দাগ নেই, অথচ সেগুলো পুড়েচে। হয়তো কর্পূর বা তেমন কিছু জ্বালানো হয়েচে এতে। প্রদীপকে প্রদীপ নয়, যেন অগ্নিকুণ্ডের ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েচে! কাকে দিশা দেখিয়েচে এই কুণ্ড?
নিরীক্ষা শেষে কালীপদ যখন কী একটা বলতে যাচ্চে, হঠাৎ বনের ভিতরে অজস্র পাখপাখালি কলরব করে উঠে আমার শিরায় কাঁপন ধরিয়ে দিল! কালীপদ আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে চিৎকার করে বলল, “শীঘ্র পা চালাও, বনের বাইরে যেতে হবে।”
আমরা ধড়মড় করে আধা দৌড়ে কিছুক্ষণ পর পোড়া বনের বাইরে পৌঁছে দেখলাম, বনের মাথায় মাথায় পাখিগুলো তখনও উড়চে, কিন্তু তাদের আতঙ্ক কিছু কম। কালীপদ অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্তভাবে বললে, “শয়তানি নিজের শক্তি সহস্রগুণ বৃদ্ধি করে চলেচে। কয়েকদিনের মধ্যেই অমানিশি। তার ক্ষমতার প্রকাশ হয়তো সে তখনই করবে। আমি টের পাচ্চি ডাক্তার, এই দুর্দমনীয় রাক্ষুসে সত্তাকে দমন করা আমার মতো কয়েকশত তান্ত্রিকেরও শক্তির অতীত।”
কালীপদর কথা শুনে কানাই বাদে আমাদের সবার কণ্ঠ শুকিয়ে গেল। বীরেন্দ্রর মুখে-চোখে তখন আগ বাড়িয়ে আমাদের সঙ্গে চলে আসার জন্য হতাশা প্রকাশ পাচ্চে।
কালীপদ বিমলের মুখের দিকে চেয়ে কইল, “বিগ্রহের এমন নিখুঁত, নিটোল মুখ! দেখে মনে হয় বুঝি কোনো মানুষ!”
বিমল কইল, “আজ্ঞা, শুনেচি এই মূর্তির মুখ নাকি জমিদার শিবরঞ্জন তাঁর পিতা হরিহরের আদলে গড়েচিলেন।”
“বটে। পিতৃভক্ত পুত্র।”
বিমলের সঙ্গে আরও দুইজন বয়স্থ গ্রামবাসী ছিল। তারা কইল, “হাঁ ঠাকুর, সেই জমিদার সত্যই পিতৃভক্ত ছিলেন।”
কালীপদ বিরস স্বরে বললে, “হ্যাঁ, ভক্তির থেকেও তার কিছু একটা বিষয়ে খুব তাড়াহুড়ো ছিল মন্দিরটা স্থাপন করার। সেইটে কী কারণ তা ধরতে পারচিনে।”
বীরেন্দ্র শুধাল, “আপনি তো জমিদার শিবরঞ্জনকে চিনতেন না ঠাকুরমশায়, তবে এই কথা কেমন করে বলচেন?”
কালীপদ একটা শ্বাস ফেলে বললে, “মৃতের বাৎসরিক ক্রিয়া কেন করা হয়, জানো বীরেন্দ্র? যে তিথিতে কেউ মারা গিয়েচেন, পরের বছর গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান ওই মৃত্যুকালের মতোই হুবহু যখন ঘুরে আসে, সেই সময়টাতেই বাৎসরিক ক্রিয়া করতে হয়। তার মধ্যিখানের অংশটা মৃত এবং জীবিত জগতের মধ্যে একটা সরু সুতোর বাঁধন থাকে। বাসৎরিকের সময়ে সেই শেষ যোগসূত্রটা ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এই সময়কালে কোনো শুভকাজ, এমনকি দেবদর্শনে যাওয়াও নিষিদ্ধ। কিন্তু পিতার মৃত্যুর দুই মাসের মধ্যে মধ্যেই শুনলাম, শিবরঞ্জন ওই মন্দিরে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেচিলেন। এইটে কি তাড়াহুড়োরই একটা নিদর্শন নয়?”
আমাদের চুপ করে থাকতে দেখে কালীপদ বললে, “ওই মন্দিরে কিছু একটা রয়েচে, ডাক্তার। আমার মন বলচে। কিছু একটা রয়েচে, যা আমি ধরেও ধরতে পারচি না।”
(১১) (মারণকাঠি)
১৫৭
খেরো খাতা দুটো এনে কালীপদ সন্ধ্যায় তেলের বাতি জ্বেলে তক্তপোশে পড়তে বসেচে। এখন পাড়াগাঁয়ের আন্দাজে বেশ রাতই হয়ে গিয়েচে। কালীপদ একবার কইল, “এই খাতা দুটোয় কারও হাত পড়েনি বহু বছরে, বুঝলে? জমিদার অখিলরঞ্জন লোকটাকে আমার ঘোরতর সন্দেহ হয়, বুঝলে ডাক্তার? সদরঘাটের ছেলেটিকে খবর নিতে পাঠিয়েচিলাম আমার পরিচয় লিখে, সে খবর নিয়ে এসেচে যে অখিলরঞ্জন মহাপাত্র নামের কেউ তার পুত্রের হত্যা স্বীকার করে ধরা দেয়নি মণিতট থেকে। তবে ভালোমানুষ সেজে জমিদার অখিলরঞ্জন যে ধরা দিতে গৃহত্যাগী হল, সে গেল কোথায়?”
বীরেন্দ্র বাইরে বিমলের সঙ্গে বসে জল ফিরিয়ে হুঁকো খাচ্চে। আমি নীচুস্বরে শুধালাম, “কোথায়?”
“আমার অনুমান হল, এই অখিলরঞ্জনই কাপালিক বেশে বীরেন্দ্রর গৃহে গিয়ে সর্বনাশা চাবিকাঠিটা চুরি করে এনেচে এই গাঁয়ে। মন্দিরের নকশার উপরে রাখা সিন্দুকের হাতলের মতো চাকতিটা এবং বীরেন্দ্রর গৃহে মাটির তলা থেকে চুরি করা জিনিসটার বেড় মোটামুটি একই। এই খাতা দুটো ছাড়াও আরও কোনো লিখিত অংশ ছিল ওই শয়তান-জাগানিয়া বিধির এবং সেটাই অখিলরঞ্জন সাধন করেচে পুত্রহত্যার শোধ নিতে। ওই অংশটা পেয়েচে বলেই এই খাতাটার খোঁজ আর তার দরকার হয়নি।”
আমি উৎসুক হয়ে কইলাম, “এই খাতাতে কী লেখা আছে?”
কালীপদ কটমট করে তাকিয়ে বলল, “সেটা পুরোটা না পড়েই আধাআধি বলব কেমন করে? তবে বেশ কিছু পাতা পড়ে যেটুকু অনুমান করচি, এই খাতাতে কোনো একটা বিদ্যায় দ্বিতীয় ভাগটা লেখা রয়েচে।”
“দ্বিতীয় ভাগ বলতে?”
কালীপদ শ্বাস ফেলে কইল, “তুমি বীরেন্দ্র, কানাইদের সঙ্গে গল্প করো গিয়ে।” আমি বিরক্ত হয়ে উঠে আসতে যাচ্চি, হঠাৎ এই শয়নকক্ষের ওপাশের খিড়কি দুয়ারটার বাইরে থেকে যৎকিঞ্চিৎ ধুঁয়ো আসতে দেখে চমকে উঠলাম। কালীপদ কিন্তু নির্বিকার! সে হাত-পা ছাড়িয়ে খাতাটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। আমি অবাক হয়ে কিছু বলতে যাব, তার আগেই খিড়কির দোরে টোকা পড়াতে আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। কালীপদ নিস্পৃহ স্বরে বললে, “দোরটা খুলে দাও, ভয় নাই।” আমি কাঁপা হাতে দোর খুলতেই একজন খুব বৃদ্ধা হাতে খড়ের গোছায় ধোঁয়া নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে ঘর জুড়ে সেই ধোঁয়া ছড়িয়ে দিতে দিতে একটু হেসে কইল, “গোহালে সাঁজালের ধোঁয়া দিতে এসেচিলাম। ভাবলাম, ঘরেও ঘুরিয়ে দিই। একটু কষ্ট হবে তোমাদের, জানি বাবা। শহরের ছেলেপিলে তো তোমরা। কিন্তু এ না দিলে মানুষ, গোরু কেউই ঘুমুতে পারে না এ দিগড়ে। ওদিকে বোধহয় বউমা ভাত বাড়ছে, তোমরা অন্নসেবা করে আসো গিয়ে।”
আমি এই বয়সে এসে দাঁড়িয়ে বুড়ির মুখে শহরের ছেলেপিলে শুনেই হতবাক হয়ে গিয়েচি! কালীপদ বিছানা ছেড়ে উঠে খাতাখানার একটা পাতায় হাতপাখার ডাঁটি দিয়ে মার্কা দিয়ে তক্তপোশের এককোণে সযত্নে রেখে বৃদ্ধাকে শুধাল, “মা ঠাকরুন, আপনি তো অনেক বয়স্কা। অনেক দেখেচেন, শুনেচেন। এখনকার মতো বিপদ এর আগে কখনও হয়েচে তালুকে?”
বৃদ্ধা মাথা নেড়ে কইল, “কখনও না বাছা। আমার জন্মের আগে হলেও আমি শুনতে পেতুম নিশ্চয়ই। এমন সৃষ্টিছাড়া বিপদ কখনও আসেনি।”
কালীপদ একটা শ্বাস ফেলে আমাকে নিয়ে আহারার্থে বাইর-বাড়িতে এল।
আহারে বসে আড়চোখে দেখলাম, কালীপদ ধীরে ধীরে খাবার চর্বণ করচে আর কী যেন ভাবচে। আমি সেসব আর জিজ্ঞেস না করে আহারে মন দিলাম। আহার্য অতিরিক্ত না হলেও নেহাত মন্দ নয়, তবে আমাকে আর মুখুজ্জে মশাইকে আলাদা করে লবণ মিশিয়ে খেতে হচ্চে। এসব গাঁয়ের দিকে এখনও বামুনের রান্না করে দিলেও অব্রাহ্মণ গৃহস্থ তাতে লবণ দেয় না। পাকা রুইয়ের মুড়ো, পেটির তেল-ঝাল অথবা কাঁটাচচ্চড়ির মতো আঁশ খাবারে যদি দোষ না থাকে, তবে বেচারা লবণ কী অপরাধ করল?
বিমল আহারান্তে আমাদের শয়নকক্ষে নুতন শয্যা পাতিয়ে দিল। বীরেন্দ্র সুখী মানুষ। সে শুয়েই নিদ্রাকর্ষণের ফলে অচেতন হয়ে পড়ল। কানাই জেগে বসে রইল। আমি কালীপদর পাশে আলোর পরিধির একধারে গিয়ে চুপ করে বসতে গিয়ে হঠাৎ বলে উঠলাম, “আচ্ছা, তক্তপোশের উপর খাতাখানা রেখে গেলে যে? সেখানা কোথায়? বিমল শয্যা পাতার সময়েও তো দেখলুম না?”
কালীপদ যা লক্ষ করার তা আমার আগেই করেচে হয়তো। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরস এবং কঠিন স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “সে খাতা চুরি গিয়েচে ডাক্তার। আর পাওয়া যাবে না। সেই শয়তানিই বৃদ্ধার ভেক ধরে আমাদের ঘরে ঢুকেচিলো। তারপর আমাদের আহারে পাঠিয়ে সে খাতাটা নিয়ে গিয়ে এতক্ষণে বিনষ্ট করে ফেলেচে। সে শুধু হিংস্র আর নরঘাতকই নয়, ভেক অথবা ছলেও পুরোদস্তুর সিদ্ধহস্ত!”
আমি সটান উঠে দাঁড়িয়ে ক্রোধে কাঁপা গলায় বললাম, “কী সর্বনাশ! কী সর্বনাশ! এতখানি ছল! এত ধূর্ততা? তার অর্থ, ওই সর্বনাশী আমাদের সমস্ত কাজকর্ম লক্ষ রেখেচিলো! এখন ওই নরখাকি তার মরণের শেষ দিশাকে ধ্বংস করে, বনের ভিতরে বসে তৃপ্তির হাসি হাসচে? এ হার যে অসহ্য।”
কালীপদ শীতল কণ্ঠে কইল, “তৃপ্তির হাসিই সে হাসবে, ডাক্তার, কারণ সে বাংলা পড়তে জানে না হয়তো। যদি জানত, তবে ওই খাতাতে লেখা বাজারদর পড়তে পারত নিশ্চয়ই।”
আমি কথাটা হৃদয়ঙ্গম করে লাফিয়ে উঠে কইলাম, “মানে? ওই খাতাটা… তবে আসল খাতাটা…!”
“আমার কাছেই লুকানো আছে। আমি শহরের ছেলেপিলে নই, ডাক্তার। আমি পাড়াগাঁয়েই বড়ো হয়েচি। এই রাতে কেউ কখনও ঘরে গোহালে সাঁজালের ধোঁয়া দেয় না। দেওয়ার নিয়মই নাই। সে হয়তো খড়ের আঁটি এনেচে শুধুমাত্র, যাতে তার গাঁয়ের উগ্র আঁশটে গন্ধ না পাই, সেইজন্য। যে গন্ধের কথা গাঁয়ের আক্রান্তরা বারে বারে বলেচে। আমি তোমাকে দোর খুলতে বলেই খাতাটা বদলে ফেলেচিলাম। সে হয়তো আমাদের অনুপস্থিতিতেও খাতাখানা চুরি করতে পারত, কিন্তু আহারের সময় উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়াতে আমি যখন নড়চি না, তখন তার প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত হয়ে আমাকে সরানোর দরকার হয়ে পড়ল।”
আমি বেশ টের পেলাম, আমাদের টক্কর এমন এক অপজীবের সঙ্গে হতে চলেচে, যে নির্মম এবং ভেকধারী। কালীপদ যতক্ষণ খাতার পাতা উলটে উলটে আলোয় ধরে পড়চিলো, আমি ততক্ষণ কথা বলার সুযোগ না পেয়ে তার মুখের পানে নজর রাখচিলাম। হলফ করে বলতে পারি, আমি আজ অবধি এত দ্রুত কারও মুখের এইরকম অভিব্যক্তি বদলাতে দেখিনি! বিস্ময়, উচ্ছ্বাস, হতাশা, চমক, উত্তেজনা পরপর খেলে গেল কালীপদ মুখের প্রতিটি রেখা বেয়ে!
হঠাৎ ছটফট করে উঠে পড়ে কালীপদ পায়চারি শুরু করল ঘর জুড়ে। এইবার একজন ডাক্তারের নজরে তার ঘনঘন শ্বাস ফেলা দেখে টের পেলাম, তার মনের ভিতরে কি মাত্রাছাড়া ঝড় উঠেচে! কী এমন রয়েচে খাতার পাতায় পাতায়? আমি একবার কুণ্ঠিতভাবে ডাকলাম, “দাদা—”
পরের বার অপেক্ষাকৃত জোরে ডাকতেই কালীপদর থেকে যে বিরক্তিটুকুর আশঙ্কা করচিলাম, তার বদলে সে যেন চমকে ওঠার মতো করে আমার দিকে চেয়ে ঘোর লাগার মতো ফিসফিস করে যেন মুখস্থ বলার মতো করে বলল,
“কনক রচিত বাণ ভুবন প্ৰকাশে
বাণের মুখেতে অগ্নি রহে গুপ্ত বেশে
পশুপতি বৈসেন বাণ-মধ্যস্থানে
চালনা করেন উনপঞ্চাশ পবনে
ধরাধর গোড়াতে বিরাজে নিরন্তর
অলক্ষেতে যম রহে বাণের উপর…”
আমি উঠে দাঁড়ালাম। কালীপদর কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললাম, কী সব বলচো বলো দেখি খাতা পড়ার পর থেকে?
এইবার কালীপদর উত্তর শুনে অনেকখানি নিশ্চিন্ত হয়ে বুঝলাম, সে সুস্থিরই আছে। সে বিহ্বল ভাবটা কাটিয়ে ঢোক গিলে বললে, “খাতায় কোথা ডাক্তার? যা বললাম, সেইটে রামায়ণের অংশ। এইটেই আমার মাথায় এল প্রথম খাতাটা পড়ার পর।”
“কেন, এইটাই কেন মনে পড়ল?”
“কারণ ওইটুকু অংশ ছিল রাবণের মৃত্যুবাণের বর্ণনা। জমিদার শিবরঞ্জন এই অতি ভয়ংকর এবং অত্যাশ্চর্য আখ্যান লিখে গিয়েচেন এই খাতা জুড়ে। শিবরঞ্জনের বাপ হরিহর নাকি একজন ভবঘুরে ধরনের মানুষ ছিলেন। সঙ্গে ইতিহাসের সুপণ্ডিত। উনি বিভিন্ন চোখের আড়ালে থাকা পুথিপত্র আর নিদর্শন ঘেঁটে ঘেঁটে সন্ধান পান রাক্ষসরাজ রাবণের শেষ ভয়ানক মৃত্যুকালীন ইচ্ছার।”
আমি চৌপাইয়ের কোনায় বসে পড়ে শুকনো গলায় গবাক্ষ দিয়ে বাইরের মিশকালো অন্ধকারের দিকে একবার তাকিয়ে শুধালাম, “রাবণের শেষ ভয়ানক ইচ্ছে? কোন ইচ্ছে দাদা?”
বাইরের বাঁশবনে হুয়া আ হুয়া আ হুয়া করে শিয়ালের ডাক আমার শরীরে শিহরন তুলচে! একটা রাতচরা পাখি চালার উপর দিয়ে তীক্ষ্ণস্বরে আওয়াজ করতে করতে উড়ে গেল… কে আসে ওই… কে আসে ওই…! আচ্ছা, রাক্ষসী কি এতক্ষণে কালীপদর পালটা ছল ধরতে পেরেচে? কালীপদ চকিতে গবাক্ষের দিকে একবার চেয়ে বলল, “রামের মৃত্যুবাণ বুকে বেঁধার পর রামচন্দ্র যখন মহাশয়নে শায়িত রাবণের কাছে রাজনীতির শিক্ষা যাচ্ঞা করলেন, তখন রাবণ কইল, ‘শোনো রাম, যখনই কোনো খারাপ কাজের কথা মনে আসবে, তখন তা যতদূর সম্ভব বিলম্বে করার চেষ্টা করবে। শূর্পণখা যখন তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এল, তখন দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে আমি তোমার স্ত্রী-কে হরণ করতে উড়ে গেলাম। যদি সময় নিয়ে ভাবতাম, তবে আমারই ভগিনীর অপকর্ম আমার চোখে ঠিকই ধরা পড়ে যেত।’
দ্বিতীয় শিক্ষা, যখনই কোনো ভালো কাজ মাথায় আসবে, তৎক্ষণাৎ তা সাধন করবে। একদিন আকাশপথে ফেরার সময়ে নরকের পাপীদের লাঞ্ছিত হতে দেখে আমি ভারী মনোবেদনা অনুভব করলাম। দেখলাম—
অন্ধকারে চৌরাশিটা নরকের কুণ্ড-
তাহাতে ডুবায় ধরে পাতকীর মুণ্ড-
ঠিক করলাম, পৃথিবী থেকে স্বর্গ অবধি একটা সোপান তৈরি করে দেব। সেই একই পথ বেয়ে নরকের লাঞ্ছিত পাপীরাও স্বর্গে গিয়ে পবিত্র হয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে গোটা সাগরকে ক্ষীরের সাগরে রূপান্তরিত করে দেব, কিন্তু কালের ভরসায় ফেলে রেখে আজ তোমার বাণে জীবন হারালাম।’
আমি আর কানাই বাতির স্বল্প আলোকে নির্নিমেষ দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে আছি দেখে কালীপদ আবার বলল, “রাবণ কিন্তু সেইদিন অর্ধেক সত্য বলেচিলো, ডাক্তার! পৃথিবী থেকে নরক হয়ে স্বর্গে যাবার সিঁড়ির সূত্র সে সত্য সত্যই তৈরি করে ফেলেচিলো! বর্ষীয়ান এবং অভিজ্ঞ রাবণ সেই সময়ে রামকে মন্ত্রগুপ্তিতে অপরিণত ভেবেই হয়তো সবটুকু বলে যায়নি। কী জানি?
চৌরাশিটা নরকের কুণ্ডের কথাটা একটা ছলমাত্র। আসলে ওটা একটা বিধি। পোড়া মন্দিরের সেই প্রেতিনীর আহ্বানেও কিন্তু চুরাশিটা কর্পূরের প্রদীপই ব্যবহার হয়েচে দেখেচি। এটা নেহা কাকতালীয় হতে পারে না, আমার মন বলচে।
সেই অতি মারাত্মক সূত্রই এসে পড়ে হরিহরের হাতে, তবে বিচ্ছিন্নভাবে। সেই সূত্রে পৃথিবী থেকে নরকের একটা ভয়াবহ দুয়ার অবধি সেতুসংযোগ হয় মাত্র এক পলকের জন্য। সেই সেতুর দ্বারাই কোনো ভীষণ কুটিল রাক্ষসীকে নামিয়ে আনা হয়েচে এই গাঁয়ে! দশাননের অলৌকিক কাহিনি বাদ দিয়ে যদি শুধু একজন যন্ত্রকুশলী হিসেবে দেখা হয়, তবে হয়তো রাবণ নিজেও এই নরকের জীবের পৃথিবীতে নেমে আসার ভয়ংকর আশঙ্কাটা অনুভব করেচিলেন তাঁর যুগে। সেই ভীতি অনুভব করেচিলেন দেবতারাও। সেই কারণেই সেই বিশেষ মন্তরের টানে ওই সেতু দিয়ে ঠিক কে নেমে আসতে পারে অনুমান করে, তার জন্য একখানা অমোঘ, একঘাতী মৃত্যুর উপায়ও সৃষ্টি করে গিয়েচিলেন তাঁরা।”
আমি কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে থেকে সবাক হলাম, “কিন্তু এইটা কি আদৌ সম্ভব যে, কোনো একজনকে মারার জন্য গোটা বিশ্বচরাচরে ওই একখানা অস্ত্রই সৃষ্টি করা যাবে? আর কোনো অস্ত্রেই তাকে বধ করা যাবে না?”
কালীপদ একটু বিলম্বে কইল, “হ্যাঁ, সম্ভব। রাবণের নিজের মৃত্যুর জন্যও একটাই মৃত্যুবাণ তোলা ছিল।”
আমি লাফিয়ে উঠে উত্তেজনায় চিৎকার করে বললাম, “সে কী! তবে তো আমাদের আবার খুঁজে দেখতে হবে। কোথায় থাকতে পারে সেটা? অস্ত্র যদি ওই একটাই হয়ে থাকে, তবে আমাদের সেখানা খুঁজে যে বের করতেই হবে!”
কালীপদর চোখে ভর্ৎসনার দৃষ্টি দেখে খেয়াল করলাম, আমার চিৎকারে ঘুম ভেঙে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়েচে বীরেন্দ্র। আমি লজ্জিত হয়ে নীচুস্বরে কইলাম, “মানে বলতে চাইচি…”
“দ্যাখো ডাক্তার, সেই অমোঘ অস্ত্রের আকৃতি ঠিক কেমন আমরা জানিনে, সেটা ঠিক কী ধরনের অস্ত্র তা-ও জানিনে, ফলে বিরাট জমিদারমহল কিংবা অত বড়ো মন্দিরটার আঁতিপাঁতি খুঁজে দেখতে হবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। নদীর পাড়ের দেবী মন্দিরেও একবার যেতে হবে। শিবরঞ্জন লিখে গিয়েচে যে, ওই প্রাণঘাতী অস্ত্রকে তিনটি খণ্ডে বিভক্ত করে চোখের আড়ালে লুকিয়ে রেখেচে সে। সঙ্গে বিধান রয়েচে যে, এই ভয়ংকর অপজীবের ঠিক সেই অঙ্গে অস্ত্রাঘাত করতে হবে, যে অঙ্গ তার নাই। কিন্তু এ কেমন কথা? যে অঙ্গ অনুপস্থিত, তাতে অস্ত্রাঘাত কেমন করে সম্ভব!”
সেই অপজীব এমন কেউ হবে, ডাক্তার, যার ছলকে স্বয়ং দশানন অবধি ডরিয়ে চলতেন! তবে সেই মারণাস্ত্র সন্ধানের একটা সংকেত রেখে গিয়েচে শিবরঞ্জন। এই ছোট্ট হেঁয়ালিটা :-
“মহাপাত্র বসেন ধ্যানে
হাতটি রেখে বামে,
আসলেতে যুঁটো সে যে
হাতটি কেবল নামে।
সেই হাতেতে পড়ল বাঁধা
বাঁধাকপির খণ্ড,
ঈশানপ্রান্তে অষ্টরম্ভা
সঙ্গে মারণদণ্ড।
যুগ বদলায় যুগের তালে
নিত্য হাঁটি হাঁটি,
এই সুত্রেই খুঁজে পাবে
মহা মারণকাঠি”
“আচ্ছা ডাক্তার, তুমি ধ্যান করা বলতে কী বোঝো?”
এইরকম প্রশ্নে সামান্য বিচলিত হয়ে বললুম, “ধ্যান করা? ওই তো, মানে ধ্যানে বসা।”
“এইটা কোনো জবাব হল কি?”
“আচ্ছা বলচি, ধ্যান করা মানে প্রশান্ত, নির্বাক, অটল, অনড় একটা অবস্থান, যেখানে মন একটা বিন্দুতে স্থির থাকে।”
কালীপদ একটু ভেবে বলল, “ঠিকই বলেচো। ধ্যানস্থ অবস্থা বলতে এইরকমই বোঝায়। আমি এটা শুধানোর কারণটা বুঝতে পারচো কি?”
“হ্যাঁ দাদা, পারচি। মহাপাত্র বসেন ধ্যানে বলতে নিশ্চয়ই হরিহর মহাপাত্রর আদলে তৈরি ধ্যানস্থ শিবমূর্তির কথা বলতে চেয়েচেন উনি?”
“ঠিক! সঠিক বলেচো। আমারও তা-ই মনে হচ্চে। কিন্তু মহাদেব ঘুঁটো কেন হবেন? ওঁর মূর্তিতে তো দুইদিকে দুটি হাতই আছে! হাত শুধুমাত্র বামে রেখে তো বসেননি উনি? কালই একবার মহলে যেতে হবে, কানাই। সেই সঙ্গে পোড়া মন্দির এবং গাঁয়ের ঈশানকোণে স্থাপিত দেবীর মন্দিরেও যেতে হবে। বিশেষ, ছড়ায় যখন ঈশানকোণের উল্লেখ রয়েচে। তৈরি থাকিস কানাই। বড়ো ভয়ানক বিপদ একেবারে সামনেই! যেভাবেই হোক, ওই নরক থেকে ছিটকে বেরিয়ে-পড়া মহারাক্ষুসে সত্তাকে নিধন করার ওই একমাত্র অস্ত্র খুঁজে বের করতেই হবে, না হলে মণিতট ছাড়িয়ে গাঁয়ের পর গাঁ শ্মশান বানিয়ে ছাড়বে ওই দানবী।”
আমার মনে তখন শতবার একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্চে যে, কোন এমন মহা মারণাস্ত্রকে শিবরঞ্জন লুকিয়ে রেখে গিয়েচে, যাকে তিন খণ্ডে বিভক্ত করলেও গুণ অক্ষুণ্ণ থাকে? যদি তিনটি টুকরোতে সেইটা লুকিয়েই রাখা থাকে, তবে টুকরোগুলোর আকৃতি ঠিক কেমন হতে পারে?
(১২) (হিসেবে দারুণ ভুল )
ভোরে আমরা দাওয়ায় বসে আখের গুড় আর ছোলা খাচ্চি। ভিতরে ভিতরে সকলেই উত্তেজিত হয়ে রয়েচিলো, কিন্তু যতক্ষণ না বিমলের ঠিক করা গোযান না আসচে, ততক্ষণ পায়ে হেঁটে এতগুলো স্থান ঘোরা সম্ভব নয়। ভোরবেলায় বীরেন্দ্রর হঠাৎ ধুম জ্বর এসেচে। তাকে আমি প্রাথমিক চিকিৎসা করে শয্যাগ্রহণের নিদান দিলাম
বিমলের ঘরে একটি বালক বিমলের বড়দাদার ঘরের নাতি। সে আমাদের অনেকক্ষণ ধরেই রসুইয়ের বাতার ওপাশ থেকে লুকিয়ে দেখচে। কালীপদ হেসে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতেই বালক মহা আপ্যায়িত হয়ে একেবারে সামনে এসে বসল। কালীপদ নরম গলায় শুধাল, “তুমি অমন লুকিয়ে ছিলে কেন দাদুভাই? আমার কাছে আসতে নাই বুঝি?”
বালক কইল, “তোমরা বেড়াতে যাবে?”
“বেড়াতে? তা বেড়াতেই বটে… একরকম তা-ই।”
বালক উৎসাহিত হয়ে আবার শুধাল, “কোথায় বেড়াবে দাদু? তেপান্তরের মাঠে?”
কালীপদ হোঃ হোঃ করে হেসে কইল, “তা-ও তো বটে। আজও তিনখানা জায়গাতেই আমাদের যেতে হবে বই-কি।”
বালক রসিকতাটা না বুঝে বললে, “তেপান্তর কোথায় দাদু?”
কালীপদ বালককে কোলে তুলে কইল, “তেপান্তর কোনো জায়গা নয়, দাদু। তিনটে পথ, তিনটে মাঠ, তিনটে নদীর মাথাগুলো কোনো একটা জায়গায় এসে ঠেকলেই সেটা তিনপ্রান্ত বা তেপান্তর হয়।”
বালক আগ্রহে টগবগ করে ফুটে শুধাল, “তাহলে হাটের কাছে যে তেমাথা রাস্তা আছে, সেটাও তেপান্তর?”
“হ্যাঁ দাদুভাই।”
বালক তড়িঘড়ি কোল থেকে নেমে বোধহয় বন্ধুদের এত বড়ো খবরখানা দেবার উদ্দেশেই বিদ্যুদ্বেগে নিষ্ক্রান্ত হল। সঙ্গে সঙ্গেই ক্যাচ ক্যাচ করে গোরুর গাড়ি এসে উপস্থিত হল। আমরা একখানা জলের কুঁজো নিয়ে উঠে পড়লাম গাড়িতে। বড়ো হাট পার করে যখন গাড়ি এগোচ্চে, তখন গাড়োয়ান সহসা গোরুর গতি স্তিমিত করল। বহু লোকজনের গুঞ্জন ভেসে এল।
আমরা গাড়ি থেকে নেমে দেখি, বহু হাটুরে একত্রিত হয়ে খুব উত্তেজিত হয়ে কী যেন আলোচনা করচে। তার মর্মার্থ যখন বুঝলাম, তখন বিলক্ষণ টের পেলাম যে কালীপদ তার শত্রুর প্রকৃতি চিনতে ভুল করেচে। কালীপদর ধারণা ছিল, ওই মহারাক্ষসী প্রাথমিকভাবে কালীপদর মন্তরে সাময়িক বাধা পেলেও এবং কালীপদর ছলে ঠকে গেলেও, বনের মধ্যে নিশ্চুপ আত্মগোপনের মধ্যে দিয়ে সে অপরিমিত এবং কল্পনাতীত পৈশাচিক শক্তি সঞ্চয় করে ঝড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে অমাবস্যার রাতেই, কিন্তু শয়তানি তার শিকার ধরেচে গত রাতেই! হয়তো ঠকে যাবার ক্ষোভে। একজন-দুইজন নয়, গোটা পরিবারের বারোজন! এবং তার শিকার ধরার পদ্ধতি শুনেই তার অকল্পল্পনীয় শক্তির নমুনা পেয়ে, কালীপদর কপালে স্বেদবিন্দু দেখা দিল!
পৈশাচিক আক্রমণই হোক, প্রাণঘাতী মহামারিই হোক অথবা অন্য বাধা, দৈনন্দিন জীবন কিন্তু পুরোপুরি কখনোই রুদ্ধ থাকে না। মোতি কাপালিরও তা-ই হয়েছে… দুঃখিত… হয়েছিল। মোতি গাঁয়ের সম্পন্ন গৃহস্থ। তার তিসি আর সূর্যমুখীর বীজের ফলাও কারবার। তো, এই মোতির মেজোছেলে দিবাকর না দিবানাথ, তার জন্য সম্বন্ধ এসেচিলো ঘোড়াপোঁতার জমিদারির ছোটো তরফ হরগৌরী জানার ছোটো মেয়ের। ইতিপূর্বে মোতির পরিবারের তরফে মেয়ে দেখে আশীর্বাদ ও পাটিপত্রের দিন স্থির করে এসেচিলেন মোতির দাদা প্রমথ কাপালি। এরপরেই গাঁয়ে এই উপদ্রব আরম্ভ হয়, কিন্তু সেই কথা ঘোড়াপোঁতা অবধি পৌঁছোয়নি মোতির দিক থেকে। বিশেষ, এমন একটি মেয়েকে হাতছাড়া করতে চায়নি কাপালি পরিবার।
তো, কোনোরকম সন্দেহ যাতে উদ্রেক না হয়, তার জন্য আজ নির্ধারিত দিনেই আশীর্বাদ সারতে গিয়েচিলো মোতির পুরো পরিবার (মেজোছেলে বাদে)। সমস্ত অনুষ্ঠান-আচারাদি মিটতে মিটতে খুব তাড়াতাড়ি করেও বিকেল গড়িয়ে গেল। কাপালি পরিবার মনে মনে প্রমাদ গুনছে! ভাবী বেহাইয়ের গৃহে আশ্রয় প্রার্থনা করা অসম্ভব। ঘোড়াপোতার যার মাধ্যমে মেয়ের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ, সেই ঘটকের বাড়িতেও আশ্রয় নিলে তা হরগৌরীর কানে অবিলম্বে পৌঁছে যাবে, ফলে ভীতি সত্ত্বেও দুইখানা গোরুর গাড়িতে কাপালি পরিবারের এগারোজন সদস্য উঠে পড়ে গাড়ি হাঁকাল মণিতটের দিকে।
নদীর ধারে এসে যখন মণিতটের বনের পথে গাড়ি দুখানা প্রবেশ করছে, তখন সাঁঝ অনেক আগেই চলে গিয়ে বেশ রাত নেমেচে। বেশ কিছুক্ষণ ঈশ্বরের নাম নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে গাড়ি চলতে চলতে যখন গাঁয়ে ঢোকার পথটা এসে পড়ল, তখন সবাই যেন একটু হাপ ছাড়ল এবং ঠিক তখনই চারটে গোরু একসঙ্গে পা থামিয়ে ভীষণ বেয়াড়াভাবে পরিত্রাহি ডেকে উঠল।
মোতি কাপালি সামনের গাড়িটার ছইয়ের থেকে মুখ বাড়িয়ে ভীষণ চমকে উঠল! এই পথটার শেষ প্রান্তেই গ্রামের হাট। এই রাত্তিরে হাট শূন্য থাকলেও গাঁয়ের সীমান্তে কিছু বাড়িঘর চোখে পড়ার কথা, কিন্তু পথের শেষে এত অন্ধকার কেন? যেন একটা সর্বগ্রাসী গুহা ও পেতে রয়েচে পথের শেষে! গুহার ঠিক উপরে দুখানা আগুনের ভাঁটির মতো বিন্দু ধকধক করে জ্বলচে-নিবচে পিছনের গাড়ির মেয়েছেলেরাও যে বিপদ আঁচ করেচে, তা ওই গাড়ি থেকে কান্নার সমবেত শব্দেই বোঝা যাচ্চে।
মোতি ভীষণ আতঙ্কিত হলেও মেয়েদের প্রবোধ দেবার জন্য নিজের গাড়ি থেকে নেমে পিছনে আসার মুহূর্তেই ভয়ংকর ঝড় উঠল! সেই ভয়ানক বাত্যাঘাতে গোটা এলাকাটা থরথর করে কেঁপে উঠল যেন। সঙ্গে মড়া-পচা একটা ভয়ানক গন্ধ। সরু পথের চওড়ার পুরোটাই প্রায় গোরুর গাড়ি দুটো জুড়ে রেখেচিলো, তাই মোতি পিছনের গাড়িতে আসার জন্য সাবধানে দুইপাশে ডোবাযুক্ত পথটার কিনারা ঘেঁষে আসচিলো। আচমকা এই ঝড়ে আর ভূকম্পনে টাল সামলাতে না পেরে ঝপাং করে হড়কে গিয়ে পড়ল পাশের এঁদো ডোবায়, আর প্রচণ্ড ভয়ে কাঠ হয়ে দেখল, গোরুর গাড়ি দুটো যেন ভয়ানক একটা টানে এগিয়ে চলেচে সামনের দিকে। কে যেন শ্বাস টানে থেকে থেকে, আর গাড়ি দুটো হিড়হিড় করে এগিয়ে যায় সেইদিকে। ভালো করে পুরোটা বুঝতে পারার আগেই গাড়ি দুটো মোতির পুরো পরিবার আর গাড়োয়ান সমেত গুহার ছদ্মবেশে ওঁত পেতে থাকা দানবীর মুখের ভিতরে ঢুকে পড়ল!
মোতির তখন অর্থচৈতন্য দশাতে ডোবার থেকে একটু উঠে এসে পাষাণের মতো স্থির হয়েই দেখল, এতক্ষণ পথের উপরে মাথা রেখে শ্বাস-টানা ভীষণ শরীরটা সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল বনের পথে। তার বিকট দেহ সমেত শৃঙ্গযুক্ত রাক্ষুসে মুণ্ডটা পাশের নারকেল গাছগুলোকে ছাড়িয়ে আরও অনেক উপরে গিয়ে ঠেকেচে। চুলগুলো উড়চে বিষধর সাপের মতো। চতুর্দিকে পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েচে তার বুনো শরীরের। মোতি নিঃসাড়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেল ডোবার পাড়ে। মোতি খুব ভোরে উন্মাদের মতো কাদা-মাখা শরীরে এই হাটে এসে আবার বেহুঁশ হয়ে যায়।
কালীপদ হাটের পথে দাঁড়িয়ে দূরের সুউচ্চ নারকেল গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে দানবীটার ভয়াবহ দেহবলের অনুমান করে নিয়ে মাথাটা নীচু করে অসহায়ের মতো দুইদিকে নাড়ল। আমি একবার ফিরে দেখলাম দুরের সেই জায়গাটা, যেখানে রাক্ষসীটা আনুমানিক ঘাপটি মেরে ছিল! গোরুর গাড়িতে উঠে কালীপদ বহুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইল। দেখলাম, তার চোয়াল কঠিন হয়ে উঠেচে। তার অনুমান ভুল প্রমাণিত হওয়ায় তার এই কদিনের হিসাব হয়তো অনেকখানি ওলট-পালট হয়ে গিয়ে থাকবে, কিন্তু সেই সঙ্গে কিছু একটা আশার আলোও দেখেচে সে।
আগামীকাল রাতটা ভরা অমাবস্যার রাত। কালীপদর এই অনুমানটা যদি অভ্রান্ত হয়, তবে ওই মহাপিশাচীর মৃত্যুবাণ আমাদের আজ অথবা আগামীকাল দিবাভাগের মধ্যেই সন্ধান করে উদ্ধার করতেই হবে। আমরা মহলে এসে নামলাম। মহলের প্রতিটা জিনিস কালীপদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ভ্রূকুটি করে অধৈর্য হয়ে বললে, কিছুতেই হচ্চে না ডাক্তার। শিবরঞ্জনের মতো করে ভাবতে চেষ্টা করচি আমি। তিন খণ্ড অস্ত্রের মধ্যে একটি-দুটি অংশ পেলেও সেটার প্রকৃতি দেখে মূল এবং আসল অংশটা অনুমান করা যেত। এর মধ্যে একটি না পেলে বাকি দুইটির অবস্থা শিবহীন যজ্ঞের ন্যায় নিষ্ফলা। সব কয়টা খণ্ড ভীষণ দরকার। সেই বুঝে তিল তিল করে খোঁজো তোমরাও।
মহলের দেখা শেষ হলে পর আমরা নদী ধরে চললাম আরও উত্তরদিক উজিয়ে। আকাশে এই বিকেলের মুখেই হঠাৎ ভীষণ মেঘ করেচে। বিদ্যুৎও গর্জন করে চলেচে। মণিতটের ঈশানে নদীর পাড়ের দেবী মন্দিরে গিয়েও প্রতিটা কোনা সন্ধানী চক্ষে অনুসন্ধান করল কালীপদ, কিন্তু তার থেকে আশাবাচক কোনো ইঙ্গিত পাওয়া গেল না। কালীপদ দেবীমূর্তি দেখিয়ে কী যেন একটা বলতে যাবে, হঠাৎ গোটা চারেক গোরুর গাড়ি ভীষণ বেগে এসে থামল নদীর ঘাটে।
আমরা বেরিয়ে এসে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবার আগেই দেখলাম, গাঁয়ের তিনটি পরিবার গাড়ি থেকে নেমে ঘাটে বাঁধা নৌকাগুলোর দিকে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে চলেচে! একজন পুরুষ আমাদের দেখে চিৎকার করে বলল, “পাগলের মতো ওখানে কী করচো! পালাও এই গাঁ ছেড়ে। দানো জেগেচে আবার। আর একদণ্ড এখানে নয়। পালাও।”
সেই পলায়মান লোকটির অপসৃত হবার আগে অবধি অসংলগ্ন কথাকে জুড়লে যা মানে দাঁড়ায়, তা অতি ভয়ংকর! কিছুক্ষণ আগে আলো থাকতে থাকতে ছয়জন জেলের একটি দল মাছের বোঝা নিয়ে দ্রুতপায়ে ফিরচিলো গাঁয়ের দিকে। এই দুর্দিনে এই মাছগুলোই তাদের বাঁচার রসদ। চলতে চলতে তাদের মনে হল যে তাদের অতগুলি মাছ হয়তো পচে উঠেচে, কিন্তু একটু পরেই তারা বেশ বুঝলে যে, পচা আঁশটে গন্ধটা আসচে ওইদিকের বন থেকে! জমিদারমহলের পাশে বড়োরাস্তার কাছে এসেই আকাশ ভীষণ অন্ধকার হয়ে আসে হঠাৎ। জেলেরা আবহাওয়ার ওঠা-পড়া আমাদের চেয়ে বিশগুণ ভালো বোঝে। গতিক একেবারেই সুবিধার নয় টের পেয়ে ভীত হয়ে মাছের বোঝা ফেলে ছুটতে আরম্ভ করল তারা, আর চোখের পলকে পথের পাশের বন আর ঝোপ থেকে একটা প্রকাণ্ড খসখসে জিবের মতো কিছু একটা বেরিয়ে এসে অতগুলো মাছের থলি নিঃশেষে তুলে নিল। জেলেরা একবার সভয়ে পিছনে ঘুরে সেই দৃশ্য দেখেই আর্তনাদ করে মহলের দিকে ছুটতে শুরু করতেই দ্বিতীয়বার সেই মৃত্যুর ছোবলের মতো জিব এসে চেটে নিল পুরো জেলেদের দলটাকে।
এই ভয়াবহ নারকীয় দৃশ্য নিজের বাড়ির মেটে জানালা দিয়ে দ্যাখে হরিকৃষ্ণ গোঁসাই। এরপর দানবীটা গাছপালা মড়মড় করে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল বনের ভিতর থেকে। উঁচু উঁচু গাছের চূড়ার মাথা ভেদ করে দেখা গেল তার ঘোর কৃষ্ণবর্ণ জোড়া বৃষভশৃঙ্গ! গোটা মণিতটই প্রায় চারদিকে ঘন বন দিয়ে আবৃত। সেই বনের থেকে কুচকুচে কালো একখানা শাল গাছের থেকেও দীর্ঘ, প্রকাণ্ড বলশালিনী রাক্ষসী ওই ঘন মেঘাচ্ছন্ন আঁধারের মধ্যে বেরিয়ে এল বন থেকে আর তিনটি কি চারটিমাত্র পা ফেলে জমিদারবাড়ির উঠানে এক-পা রেখে গোটা প্রাসাদটার চারদিকে কীসের যেন আঘ্রাণ নিতে থাকল, এবং তারপর ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে বনে ঢুকে পড়ল!
গোঁসাই আর তিলমাত্র দেরি না করে কম্পিত পায়ে ঘনিষ্ঠ দুই পড়শির সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে পালানোর জন্য। এরা আসার কিছু সময়ের ব্যবধানে আরও একটা ঘোড়ার গাড়িতে একটা পরিবার এসে কাঁদতে কাঁদতে নামল নদীর ঘাটে। তাদের কথায় জানা গেল, তাদের পরিবারমহলের কাছে জেলেদের খবর পাবার পরই ভীষণ আতঙ্কে দুইটি গাড়িতে চেপে তীরের বেগে পালিয়ে আসচিলো এই ঘাটের দিকে। পথেই নদীর ধারের পথপার্শ্বের একটা ঘন বনভাগের থেকে একটা কদাকার রাক্ষুসে হাত বেরিয়ে এসে শিশুর খেলনার মতো করে তুলে নিয়ে যায় অত বড়ো গাড়িখানা লোকজনসুদ্ধ!
কালীপদ তিক্ত কণ্ঠে কইল, “আপনারা গাঁয়ের মানুষ, গাঁয়ের মাথা। এই দুর্দিনে সকলকে ফেলে ইন্দুরের ন্যায় পলায়ন করলে মান থাকবে কি?”
লোকটি একটা কটুবাক্য উচ্চারণ করেই জিব কেটে কইল, “অপরাধ নেবেন না বামুনঠাকুর, আগে প্রাণে বাঁচলে তবেই সব। মাথাই যদি না রইল, রাজমুকুট দিয়ে কী হবে, ঠাকুর?”
কালীপদ হতাশায় অস্থির হয়ে কইল, “আমাদের এখান থেকে এখুনি চলে যেতে হবে, ডাক্তার। এখানে এতগুলো নিরীহ গ্রামবাসী এসে জমা হয়েচে, এখন আমরা থাকলে বিষম বিপদ উপস্থিত হবে। আমাদের শুঁকতে শুঁকতেই এগিয়ে আসচে ওই নরকের ভয়ানক অপজীবটা! ঠিক আমাদের এখানে আসার পথগুলো ধরে ধরেই সে আসচে, তবে ধীরে ধীরে। তার তাড়া নেই। নিজের মারণশক্তি, সংহারশক্তি নিয়ে তার কোনো সন্দেহই নাই। আমি জনহীন ওই বনের ভিতরে গিয়ে শেষ আশ্রয় নেব। তাতে আমার উপর তার আক্রমণ হতে হতে অনেক মানুষ পালিয়ে যাবার সময় পাবে। যদিও আমাকে মেরেই এ রাক্ষসী থামবে না। তোমরা চাইলে নৌকা করে এদের সঙ্গে চলে যেতে পারো, কারণ আজ হয়তো আর বাঁচা হবে না, তবে রাক্ষসীকে দেখিয়ে যেতে চাই, মৃত্যুভয়হীনতা ঠিক কেমন হয়।”
আমি অথবা কানাই যে কালীপদকে ছেড়ে কোথাও যাব না, তা বলাই একরকম বাহুল্য, কিন্তু বিমলও আমাদের ছেড়ে যেতে রাজি হল না কিছুতেই! কালীপদ মুখে যা-ই বলুক, তার এতখানি অসহায় মনোভাব পূর্বে কবে দেখেচি, স্মরণ হয় না। কানাইয়ের সঙ্গে কালীপদর সম্পর্কটা যে কেবল প্রভু-ভৃত্যের নয় তা কানাই বুঝিয়ে দিল বিহ্বল কালীপদর দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দেওয়া দেখেই। কালীপদ সংবিৎ ফিরে পেয়ে কানাইয়ের মুখের দিকে চাইতে, কানাই শিশুকে আশ্বাস দেবার মতো করে বলল, “চিন্তা কীসের, কর্তাবাবা? শয়তানি সে যত শক্তিই ধরুক, আদতে শয়তানিই তো। সে কি অমর হতে পারে? আপনিই তো বলেন, এদের বধ করতে ভগবান যুগে যুগে পৃথিবীতে আসেন? তবে সব চিন্তা তাঁর পায়েই ঠেলে দিন না কেন?”
কালীপদ ক্লিষ্ট মুখে একটু হেসে কইল, “আসেন বুঝি কানাই?”
কানাই সরল এবং দৃঢ় বিশ্বাসে জবাব দিল, “আলবত আসেন। কতবার তো এসেচেন? বড়োগিন্নিমাও তো গল্প বলেন।”
কালীপদ একচিলতে হাসি এনে বললে, “বউদিদি যখন বলেন, তখন আসেন বৈকি।”
কালীপদ বনের দিকে সামান্য এগিয়ে হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো দাঁড়িয়ে পড়ে কানাইকে চেপে ধরে বলে উঠল, “তা-ই তো রে কানাই! ঠিক তো! তিনি বারবার আসেন!”
আমি হতবিহ্বল দৃষ্টি মেলে ধরতে কালীপদ আমার মুখের পানে চেয়ে ধীরস্বরে কইল, “সম্ভবামি যুগে যুগে।”
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, “মানে?”
“মানে, বনের ভিতর নয়, আমাদের যত শীঘ্র সম্ভব পৌঁছে যেতে হবে পোড়া শিব মন্দিরে! সেখানেই ওই নরকের মহাপিশাচীর মারণাস্ত্র লুকানো রয়েচে। আমি আঁধারে আলো দেখতে পাচ্চি, ডাক্তার!”
ঘাটে লোকজন মহা হইচই করে নৌযানে উঠচে। আমরা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে আরম্ভ করলাম পোড়াতলার মন্দিরের দিকে। চারপাশে ভয়ানক বিদ্যুৎ ঝলসে উঠচে। মাকড়জীবী যেমন শত্রুকে গণ্ডিবদ্ধ জেনে ধীরে ধীরে শিকার করতে যায়, ওই নরক থেকে আহূত শয়তানিও ধীরপায়ে আমাদের এখনকার এই পথটা দিয়েই আমাদের ঘ্রাণ নিতে নিতে অচিরেই হাজির হবে পোড়া মন্দিরেও। তারপর? আমার মাথায় সেই সঙ্গে ঘুরপাক খাচ্চে একটা প্রশ্ন, এই রাক্ষুসে জীবটা আসলে ঠিক কে? কী তার পরিচয়, স্বয়ং রাবণ যার হিংস্রতাকে ডরিয়ে চলত?
মন্দিরে পৌঁছে উঠানে দাঁড়িয়ে আমি, কালীপদ আর বিমল একপলক শ্বাস নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম। কালীপদ মন্দিরের ভিতরে বিগ্রহকে প্রণাম করে উত্তেজিত অথচ চাপাস্বরে বলল, ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখো ডাক্তার, মন্দিরের ভিতরে কেমনভাবে যুগ বদলে গিয়েচে।
আমরা এদিকে-ওদিকে তাকাচ্চি দেখে কালীপদ কইল, ওদিকে নয়, এই দেওয়ালের চিত্রগুলো দ্যাখো। এর মধ্যে সব কয়টা খোদাই করা চিত্রই মহাভারতের, কিন্তু এই রাবণের সভায় দড়ি-বাঁধা হনুমানের লেজে অগ্নিসংযোগের দৃশ্যটাই একমাত্র রামায়ণের। অর্থাৎ গোটা একটা যুগ বদলে গিয়েচে মাঝে ত্রেতা থেকে দ্বাপর।
বিমল উৎসুক কণ্ঠে শুধাল, তাতে কী হল ঠাকুর?
হল এই যে, বাঁধাকপির সন্ধান পাওয়া গিয়েচে! দেবভাষায় কপি অর্থ হনুমান। তাকে বেঁধে রাখা হয়েচে এই দড়ি দিয়ে…. এই বলতে বলতে কালীপদ এগিয়ে গিয়ে হনুমানের খোদাই চিত্রের শরীরে দড়ির পাকগুলো দেখতে লাগল ধুলো সরিয়ে সরিয়ে। সবচেয়ে নীচের পার্কটি যেন একটু আলাদা! কটিদেশকে বেড় দিয়ে দড়ির দুটি প্রান্ত যেন দেওয়ালের ভিতরে ঢুকে গিয়েচে। কালীপদ কিছুটা গায়ের জোরে টানাটানি করতেই হঠাৎ সপাং করে একটা শব্দের সঙ্গে সে ছিটকে পড়ল মেঝেতে, কিন্তু তার হাতে খুলে এসেচে প্রায় সাত হাত দীর্ঘ একখানা ধাতব রশির মতো জিনিস! ধূলো থাকার জন্য এতক্ষণ তার ঔজ্জ্বল্য বোঝা যায়নি!
কালীপদ ধূলো ঝেড়ে উদ্বিগ্ন মুখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “জমিদার শিবরঞ্জনের অদ্ভুত বুদ্ধির নমুনা, ডাক্তার। তিন খণ্ডের মধ্যে একটি যদি এই অচেনা ধাতুর সাত হাত দড়ি হয়, তবে দ্বিতীয় অংশ হবে প্রায় ছয় হাত দীর্ঘ একখানা বাঁকা দণ্ড, আর তৃতীয়টি হবে সেইরকমই একখানা সরলরৈখিক দণ্ড।”
আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে আবার কইল, “প্রাণপণে সন্ধান করো তোমরা। এই ছিলার জন্য একখানা ধনুকদণ্ড আর একখানা একঘাতী ভয়ানক শক্তিধর বাণ নিশ্চয়ই থাকবে। ধনুঃশরই সে যুগের একমাত্র অস্ত্র, যাকে তিন অংশে ভাগ করা যায়।”
আমরা দুরের বনের দিকে দৃষ্টিপাত করে পাগলের মতো সন্ধান করতে আরম্ভ করলাম। কালীপদ বারবার শিবমূর্তির হাত নাড়িয়ে টেনে দেখে হতাশ হয়ে বললে, “শিবরঞ্জন এই শিবমূর্তিকে ঘুঁটো কেন বলল? এর হাতগুলো ফাঁপাও নয় আর অস্বাভাবিকও নয়। তবে?”
বিমল চূড়ান্ত হতাশার সঙ্গে ক্ষোভের স্বরে বলল, “তাহলে আপনার সন্ধান ভুল পথে এগোচ্চে ঠাকুর। আপনি সর্বজ্ঞ নন। আপনি বলেচিলেন, ওই রাক্ষসী অমাবস্যার রাতে আক্রমণ করবে, কিন্তু সে হামলা করে বসে আছে তার আগেই। আপনার সব হিসাব গরমিল হচ্চে। এমন চললে আমরা সবাইই আর কিছুক্ষণের মধ্যে…”
আমি ভর্ৎসনা করে বিমলকে এই ধৃষ্টতার জবাব দিতে যাব, কালীপদ হঠাৎ যেন সুপ্তোত্থিতের মতো জেগে উঠে বিড়বিড় করে বলল, “ঠিকই তো! আমার মন আমাকে পরিচালনা করচে ভুল পথে। শিবরঞ্জন তো কোথাও বলেনি শিব ঠাকুরের হাতের কথা। সেইটা আমিই ভেবে বসে আছি ধ্যানস্থ মহাপাত্র শুনে। আমারই ভুল।”
আমি অলক্ষে খাবি খেলাম। শিবমূর্তির সঙ্গে হরিহর মহাপাত্রের মিলটুকুর কথা যে আমারই বলা, সেটা বোধহয় কালীপদ হাজারো চিন্তায় বিস্মৃত হয়েচে। কালীপদ নিজের মনেই বলতে শুরু করল, “ধ্যান… ধ্যানস্থ… অটল অনড় অবস্থান… হ্যাঁ, রয়েচে! এখানেই রয়েচে! কী ভীষণ ভুল আমার..!”
কালীপদর পিছুপিছু আমরাও দৌড়ে এলাম বাইরের উঠানে আর সঙ্গে সঙ্গে বহু দূরের বিরাট বিরাট গাছপালার মড়মড় শব্দ ছাপিয়ে কানে এল একটা অপার্থিব, বুক-কাঁপানো গর্জন! আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত একটা শীতল স্রোত যেন গড়িয়ে নেমে এল। কালীপদ সেই আকাশ কালো করে রাখা বিদ্যুৎগর্ভ মেঘের ভিতর দিয়ে আসা অস্পষ্ট আলোয় দূরের বনের দিকে চোখ ফেলে কানাইকে বলল, কানাই, এই ভোগপাত্রের একপাশে কাত হয়ে থাকা বাঁকা হাতলটার আগাছাগুলো সরিয়ে ওটাতে প্রাণপণে টান দে। ওটাই এই ছিলার ধনুদণ্ড ডাক্তার। এই বিরাট ভোগপাত্রই আসলে মহাপাত্র। তাই আমার মনে হয়েচিলো, কী যেন একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার আমি দেখেচি সেইদিন। যে ভোগ রাধার কড়াই জন্মলগ্ন থেকেই মাটিতে গাঁথার জন্য তৈরি, যে প্রকাণ্ড পাত্র কেউ কোনোদিনও বহন করে কোথাও নিয়ে যাবে না, সেই পাত্রে হাতল কোথা থেকে এল? নামেই হাতল, আসলে কড়াইটা ঠুটোই। পাত্রটা বহুকাল আগেই হাতলহীন অবস্থাতেই ছিল, কিন্তু তার মাপে ধনুদণ্ড বসানোর ছলটা শিবরঞ্জনের ধুরন্ধর মাথা থেকে এসেচে পরবর্তীতে।
কানাই সবলে কয়েকবার টান দিতেই সেই পেতলের মতো ধাতুনির্মিত বক্রদণ্ড খুলে এল তার হাতে। সেটা তুলে ধরে পরম হর্ষে চিৎকার করে বলল, “কর্তাবাবা…!” কালীপদ তিলমাত্র সময় ব্যয় না করে কানাইয়ের বলিষ্ঠ হাতে বাঁকিয়ে ধরা ধনুকদণ্ডে দুইপার্শ্বে চারটি করে পাক দিয়ে সেই কৃশ অথচ বজ্রকঠিন রশিখানা পাকে পাকে বেঁধে ফেলে একটা টংকার দেওয়ামাত্র যে গম্ভীর নিনাদ আমার কানে এল, তাতেই বেশ টের পেলাম যে এই পৌরাণিক মারণ অস্ত্র কক্ষনো কোনো সাধারণ অস্ত্র হতেই পারে না। এই পরম অস্ত্র এত সহস্র বসরেও তার মারণধর্ম ভোলেনি এতটুকু! কালীপদ রজ্জুবদ্ধ ধনুক কানাইয়ের হাতে সমর্পণ করে দূরের বনের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল!
আততায়ীর আত্মপ্রকাশের আর বুঝি তিলমাত্র বিলম্ব নাই। মাত্র এক-দেড় মাইল তফাতে বনের আদিম সুদীর্ঘ মহিরুহগুলোর মাথা ছাড়িয়ে একটা ভয়ংকরদর্শন মুণ্ড দেখা দিয়েচে! তার চতুর্দিকে পাগলের মতো উড়ে চলেচে বনের সমস্ত পাখি। তাদের আচ্ছন্ন করা আকাশ ভেদ করে আবছা আবছা যে অতি কদর্য মুখখানি দেখা যাচ্চে, তা যে-কোনো জীবিত প্রাণীর হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ করে দিতে পারে! একটা মানুষের মৃত, পচাগলা মুখকে সহস্র সহস্রগুণ আকার বৃদ্ধি করে যদি পৈশাচিক ষাঁড়ের মুখের আকার দেওয়া হয়, তবে বোধহয় এইরকম হাড়ে কাঁপুনি ধরানো আকৃতি হতে পারে! এই মুখ মৃত জমিদারপুত্রের ছাড়া কারও নয়! সেই মহাদানবীর মাথা থেকে দুইখানা প্রকাণ্ড আকারের বৃষশৃঙ্গ আকাশ ছুঁয়েচে যেন! তার প্রতি শ্বাসে ঝড় বইচে বনে। সে পলকে পলকে এগিয়ে আসচে আমাদের দিকে। কিন্তু এই রূপখানাও হয়তো তার ছদ্মবেশমাত্র! সে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এই ছদ্মরূপটা প্রাণপণে ধরে রেখেচে। আমি ওই ধুঁয়া-ধুলো ভেদ করে যথাসাধ্য খর চক্ষে দেখলাম, আততায়ীর শরীর প্রকাণ্ড বটে, কিন্তু অঙ্গহানি বা বিকৃতি নাই। তবে অস্ত্র খুঁজে পেলেই বা শরীরের কোন অঙ্গে নিক্ষেপ করা হবে?
সেই সময়টুকুর কথা আজও স্মরণ করলে আমার বৃদ্ধ শরীরে কম্পন জাগে। আমরা উন্মাদের ন্যায় নিজের হাত দিয়ে মন্দিরটার প্রতিটি প্রাচীরে প্রাচীরে আঘাত করতে লাগলাম সেই মারণ বাণের সন্ধানে। কালীপদর গোটা দেহ ঘামে ভিজে গিয়েচে। সে পাষাণের মেঝেতে দুই হাতে আঘাত করে করে কিছুর সন্ধান পেতে চাইচে মরিয়া হয়ে। আমি ক্রুদ্ধ হয়ে কইলাম, “যারা গাঁয়ের প্রজা, গাঁয়ের মাথা, তারা পালিয়ে বাঁচতে চাইচে, বলচে কিনা মাথা বাঁচলে তবে মুকুট বামুনঠাকুর, আর তুমি এই বিপদের মধ্যে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় আছ। কেন? কীসের দায় তোমার? আমরা এখনও পালিয়ে যেতে সক্ষম, দাদা।”
কালীপদ ব্যস্ততার মধ্যে ঘাড় না ঘুরিয়েই জবাব দিল, “তাকে দোষ দিইনে, ডাক্তার। সে এই কথা বলেচে বলেই আমি আততায়ীর একটা সম্ভাব্য পরিচয় পেয়েচি হয়তো। আর একটু পরেই জানতে পারব তা সত্য কি না।”
“পরিচয় জানতে পেরেচো? কে এই রাক্ষুসি?”
কালীপদ বিরস মুখে বললে, “যে পুকুরঘাটে গয়না ফেলে গিয়েচিলো, সে। কেন ফেলেচিলো তা-ও আমি হয়তো ধরে ফেলেচি। আর-একটু পরেই তোমরাও চাক্ষুষ করবে।”
গুরুভার পদশব্দ আর পাখিদের আতঙ্কিত কলরবে বেশ বোঝা যাচ্চে যে ওই নরঘাতী অমিত বলশালিনী রাক্ষসী আর কয়েক পা মাত্র দূরেই।
কিছুতেই মৃত্যুবাণ খুঁজে না পেয়ে হঠাৎ কালীপদ উঠে দাঁড়িয়ে ব্যর্থ উত্তেজনায় টলতে টলতে কইল, “তোমরা কেউ মন্দির ছেড়ে বেরোবে না। আমি বাইরে যাচ্চি। রাক্ষসীটা চলে না-যাওয়া অবধি তোমাদের যেন সে দেখতে না পায়। অতি বড়ো দিব্য রইল আমার, মনে রেখো কথাটা- এই বলে আর-একবারও পিছনে না তাকিয়ে সে টলোমলো পায়ে মন্দিরের দ্বারের বাইরে উঠানে গিয়ে দাঁড়াল।
রাক্ষসীটা প্রথমে বনভাগটা পেরোনোর আগে এক পলকের জন্য থমকে দাঁড়াল, তারপর একটা কান-ফাটানো অপার্থিব গর্জনের সঙ্গে একলাফে শেষ গাছগুলো পেরিয়ে এসে সজোরে পা রাখল পোড়া মন্দিরের সামনে। গুম করে একটা শব্দের সঙ্গে আশপাশের ডোবার জল ছলকে উঠল ডাঙায়। তার গোটা শরীরটা দৈর্ঘ্যে দুইখানা শাল গাছের মতো লম্বা। ততোধিক প্রশস্ত। গোটা শরীরটা যেন জগতের সমস্ত ভয়াবহ উপাদান জুড়ে জুড়ে তৈরি করা হয়েচে। সেই নরকের মূর্তির পানে একটিবার চেয়ে দেখলেই আজীবনের মতো প্রচণ্ড আতঙ্ক গেঁথে যায় মনের ভিতরে! কিন্তু… কিন্তু এই সমস্ত ভয়াল রূপের জোড়কলমের পিছনে সে নিজের আরও সহস্রগুণ ভয়াল রূপকে আড়াল করে রেখেচে।
নরখাকিটা ঘাড় নীচু করে পোকামাকড় দেখার মতো একবার নীচে দেখল, আর পরমুহূর্তেই নিজের বিকট লোমশ কদাকার পা চাপিয়ে দিল কালীপদকে পিষ্ট করার উদ্দেশে। সেই পদাঘাতে গোটা এলাকাটা কেঁপে উঠল। আমি আর কানাই মন্দিরের ভিতরে টেনে না আনলে কালীপদ পিষ্ট হয়ে একতাল মাংসপিণ্ডতে পরিণত হত এতক্ষণে। কালীপদর চোখ রাগে, ক্ষোভে, হতাশায় টকটকে রক্তবর্ণ হয়েচে। চিবিয়ে চিবিয়ে সে কইল, “কেন? কেন সরিয়ে আনলে আমাকে তোমরা? বলো, কেন? ব্যর্থতার চেয়ে বড়ো মরণ আর নাই। হেরে গিয়ে প্রাণটুকু টিকিয়ে রাখার চাইতে বিসর্জন দেওয়া অনেক ভালো।”
আমি উত্তর দেবার আগেই কানাই আর বিমল ধাক্কা দিয়ে আমাদের একপাশে সরিয়ে দিতেই চমকে উঠে দেখলাম, আমাদের নাগাল পাবার জন্য সেই খল দানবী নিজের বাঁকানো নখ প্রবেশ করিয়েচে দোরের ফাঁকা দিয়ে। কালীপদকে ফুঁসে উঠতে দেখে তাকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে রেখে আমি অভিমানে রুদ্ধ কণ্ঠে কইলাম, “এমন তো কথা ছিল না দাদা। বাঁচার সময়ে একত্রে, আর মরণের সময়ে তুমি একা? এই কি সঠিক বিচার হল?”
রাক্ষসীটা এইবার নিজের সবচেয়ে কুটিল আর শয়তানি বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে বলিষ্ঠ থাবা দিয়ে পুরোনো মন্দিরটার চূড়া আঁকড়ে ধরে সমুলে ওপড়ানোর চেষ্টা শুরু করল। মেঝে সমেত জীর্ণ দেউলটা কেঁপে কেঁপে উঠচে। আর সামান্য সময়ের মধ্যেই গোটা চালাটা উপড়ে তুলে নেবে নরকের মৃত্যুদূতটা! কালীপদ ধরা গলায় বললে, “এই বিপদে আমি স্বেচ্ছায় এসেচি, কারণ আমার সাধনা, আমার গুরুর আদেশ তা-ই, কিন্তু তোমাদের সেই বাধ্যকতা নাই। আমাকে গিলে এই রাক্ষসীর প্রতিহিংসার ষোলোকলা পূর্ণ হোক।”
প্রাচীণ চুনসুরকির ছাতটা থেকে টুকরো খসে খসে পড়চে। এখুনি উপড়ে চলে যাবে। প্রাচীন দেউলের টিকে থাকার আপ্রাণ বিদ্রোহ বুঝি আর টেকে না! আমি কালীপদকে আরও জড়িয়ে ধরে কান্না-ভেজা গলায় বললাম, “আমি তো তোমার ভাই। অভিন্ন দোসর। আমাদের দুইজনকে গিলেই ষোলোকলা পূর্ণ হোক তবে। আধা আধা।”
কালীপদ এতক্ষণ নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করচিলো। এই কথাটা শুনে তার শরীর পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে গেল দেখে আমি বিস্মিত হয়ে হাতের বাঁধন আলগা করলাম। কালীপদ বিস্ফারিত চক্ষে চেয়ে স্থানকাল বিস্মৃত হয়ে বালকের মতো কইল, “ষোলোকলার আধা আধা? আট কলা? অষ্ট রম্ভা!”
আমি শুষ্কস্বরে শুধালাম, “ছড়ার সেই অষ্টরম্ভা? অষ্টরম্ভা মানে তো ফাঁকি, অর্থাৎ কিছুই নাই।”
“আছে ডাক্তার, আছে! কী আশ্চর্য! অষ্টরম্ভা এই মন্দিরেই তো আছে! ষোলোকলা যদি পূর্ণচন্দ্র হয়, তবে অষ্ট রম্ভা বা কলা মানে… – কালীপদ একদৌড়ে শিবমূর্তির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে ফিসফিস করে কইল, “অপরাধ নিয়ো না প্রভু—আর সেই বিগ্রহের কোলে উঠে দাঁড়িয়ে হাত রাখল শিবের মাথার আধখানা চাঁদে। ছাতের ওদিকের কিছুটা ভেঙে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ চোখে পড়ল। কালীপদ কম্পিত স্বরে বললে, তেপান্তর যদি তিনমাথা হয় ডাক্তার, তবে ঈশানপ্রান্ত মানেও তা-ই। ঈশান মহাদেবেরই এক নাম। তার মাথাতেই…”
হুড়মুড় করে প্রচণ্ড টানে গোটা ছাতটা যেন উপড়ে চলে গেল আরও অনেক উপরে, আর খোলা চার দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে চোখে পড়ল সেই অতি ভয়ংকর সংহারক রাক্ষসীটা তার আগুনের কুণ্ডের মতো জ্বলন্ত চোখ নিয়ে চেয়ে রয়েচে আমাদের দিকে। ছাতের অংশটা রাক্ষসীটা অবলীলায় দূরের বনে ছুড়ে ফেলে দিল আর কালীপদ সেই আধখানা চাঁদ ধরে সর্বশক্তি দিয়ে টান দিতেই বিগ্রহের ফাঁপা মেরুদণ্ড ধরে মাথার উপর দিয়ে উঠে এল একখানা দীর্ঘ ধাতব বাণ! সেই অর্ধচন্দ্রাকৃতি বাণ হাতে নিয়ে কালীপদ কানাইয়ের পানে চাইতেই সে লাফিয়ে এসে ধনুকটা কালীপদর সামনে তুলে ধরল।
রাক্ষসীর ছদ্মবেশ খসে গিয়েচে, কিন্তু এমন অতি ভয়ংকর রূপের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না! একটা অতি প্রকাণ্ড রাক্ষসীর মুণ্ড! শরীর লোমে আচ্ছাদিত। চোখের স্থানে যেন দুইখানা নরকের কুণ্ড জ্বলচে! লম্বা লম্বা তীক্ষ্ণ দাঁত আর নখ, জটা-পড়া ভয়াল কেশরের মতো চুল! কুম্ভের ন্যায় উদর। নাকের স্থানে তরুণাস্থির বদলে দুইখানা গভীর ছিদ্র! সে লোলুপ দৃষ্টিতে নীচের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চাটচে! কালীপদ ধনুকে বাণ জুড়ে শক্তি দিয়ে নিক্ষেপ করল, কিন্তু হা হতোস্মি! সেই বাণ শিশুর নিক্ষেপ করা পাটকাটির ন্যায় নীচের মেঝেতে আছড়ে পড়ল নিষ্প্রাণভাবে!
কালীপদ তাড়াতাড়ি সেটা কুড়িয়ে এনে আবার নিক্ষেপ করতে একই ফল হল। রাক্ষসী অপার্থিব কর্কশ শব্দে হেসে উঠল। আমরা মন্দিরের দেওয়ালে ঘেঁষে ছুটে চলেচি প্রায়। রাক্ষসী কয়েকবার নিজের সুতীক্ষ্ণ নখ ভিতরে প্রবেশ করিয়ে আমাদের গাঁথতে চেয়েচে। বিমল নিষ্ফল আক্রোশে চিৎকার করে উঠল, শিবরঞ্জন হতভাগা হঠাৎ করে মরে না গিয়ে যদি এই বেজন্মা রাক্ষসীর মরণের একটা উপায় বলে যেত, তবে আজ…
কালীপদ ত্বরিতে এইদিকের দেওয়ালের গায়ে ছুটে এসে কানাইকে পালানোর ইঙ্গিত করল। এই আত্মঘাতী আদেশ দেওয়া দেখে আমি চমকে উঠলাম। বিমল হাঁ হাঁ করে বাধা দেবার আগেই অকুতোভয় কানাই প্রভুর আদেশে তীরের বেগে মন্দিরের দুয়ার দিয়ে বাইরে গিয়ে পড়ল। কিন্তু কালীপদ তখনও রাক্ষসীকে চেনেনি। আমাদের দিকে চোখ থাকলেও শয়তানির নজর থেকে কানাই লুকাতে পারল না। আমাদের ছেড়ে হঠাৎ বামদিকে মাথা ঘুরিয়ে সে নিজের বিকট থাবা দিয়ে চেপে ধরল কানাইকে। রাক্ষসী কানাইয়ের দিকে মাথাটা ঘোরাতেই আমার শরীর ঘৃণায় ঘুলিয়ে উঠল। পিশাচিনী রাক্ষসীর মাথার পাশে কানের বদলে শুধুমাত্র একটা বিরাট কদর্য ছিদ্র! তার নাসিকা আর কর্ণহীন মুণ্ডের দিকে চেয়ে আমি ভীষণ আতঙ্কে উন্মাদের মতো বলে উঠলাম, শূর্পণখা! শূর্পণখা!
কালীপদ সেদিকে চেয়েই বিদ্যুৎবেগে ধনুকে বাণ সংযোগ করামাত্রই এইবার আকাশে যেন একসঙ্গে অজস্র বজ্র গর্জন করে উঠল! আমার চোখের বিভ্রম কি না জানি না, তবে আমার মনে হল, বাণের মুখে যেন ধোঁয়া নির্গত হল! কানাইকে মুঠিতে ধরা অতিকায় শূর্পণখা সেই মহাবজ্রের শব্দে চমকে আকাশের পানে চাইল। কালীপদ আকর্ণ ছিলা আকর্ষণ করে বাণ নিক্ষেপ করল। উনপঞ্চাশ পবন এই মহা মারণাস্ত্রকে চালিত করে কি না জানি না, তবে ঝড়ের গতিতে সেই বাণ যেন একটা ধোঁয়ার রেখা রচনা করে গিয়ে মিলিয়ে গেল রাক্ষসীর কানের গহ্বরে! কালীপদ ফিসফিস করে শিবরঞ্জনের মৃত্যুকালে বিকারের ভানে বলা তার শেষ সংকেতের মতো করেই বললে, “সখী কে বা শুনাইল শ্যামনাম…”
সৃষ্টির বুকে প্রলয়ের অভিঘাতের মতো একটা অতি ভয়ংকর মৃত্যুগর্জনে আমরা নিজেদের দুই হাতে কান রুদ্ধ করে ভূমিতে বসে পড়লাম। রাক্ষসী শূর্পণখার যে অঙ্গ বহু সহস্র বছর আগেই বিনষ্ট হয়েচে, সেই অঙ্গেই মরণবাণ তার পূর্ণ অমোঘ শক্তি নিয়ে আঘাত করেচে। সেই মরণাহত রাক্ষুসে আর্তনাদ আমি আজ শহরে বসেও চোখ বন্ধ করে স্পষ্ট মনে করতে পারি। ক্ষণিকের মধ্যেই সেই অতিকায় দানবীর অতখানি দেহটা যেন জলব্ধ তরঙ্গের মতো টুকরো টুকরো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তার বিকট হাতের থাবাখানা সোজা ছিটকে এল মন্দির বরাবর। আমরা তড়িৎবেগে মাটিতে বসে পড়তেই একটা ভোঁতা শব্দে একটু পরে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, রাক্ষসীর সেই শেষ দেহাংশও রাক্ষসীটারই মতো তীব্র প্রতিহিংসায় আমাদের অন্তিম ছোবল দিতে এসেচিলো, কিন্তু প্রলয়ংকর বেগবতী গঙ্গাকে ধারণকারী মহাদেব সেই অভিঘাত নিজের শিরোপরে নিতান্তই হেলায় ধারণ করেচেন।
পরদিন নৌকা পেরিয়ে ওপারে নেমে গোরুর গাড়ি ধরলাম। আমি কইলাম, “একটা প্রশ্ন ছিল, দাদা…”
কালীপদ বিরক্ত হয়ে বললে, “সে আমার জানা রয়েচে। শোনো, পবনকে না-পাবার ক্রোধে ওই কামুক রাক্ষসী যখন পুকুরঘাটে নিজের রূপ ধারণ করল, তখন বাকি অঙ্গভূষণ সব শরীরেই থাকলেও কেবলমাত্র কানের মাকড়ি আর নাকছাবি খুলে পড়ে গিয়েচিলো। অর্থাৎ রাক্ষসীটার আসল রূপে নিশ্চয়ই নাক এবং কানের অস্তিত্বই ছিল না। এই জানতে চাও তো?”
আমি গলাখাঁকারি দিয়ে বললাম, “সে না হয় হল, কিন্তু অঙ্গহীনা রাক্ষসীর তো কানের মতো নাকটাও ছিল না। তবে বুঝলে কী করে যে নাসিকায় নয়, কানেই ওই বাণ নিক্ষেপ করতে হবে?”
“না-বোঝার কিছু নাই, ডাক্তার। শিবরঞ্জন কিন্তু মৃত্যুকালে বিলাপ বকেননি। উনি ওঁর শেষ ইঙ্গিত কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো—এর মাধ্যমেই ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েচিলেন যে বাণ নিক্ষেপ করতে হবে শূর্পণখা রাক্ষসীর একমাত্র দুর্বলতা কানের গহ্বরে। রামায়ণে একটা অংশের পর এই রাক্ষসীর আর তেমন উল্লেখ পাওয়া যায়নি। হয়তো বা দশানন মৃত্যুর পূর্বেই জেনে ফেলেচিলেন যে নিজের স্বামী দানব বিদ্যুৎজিহ্বার রাবণের হাতে মৃত্যুর বদলা নিতেই ছল করে লঙ্কা ধ্বংসের মূল কারিগর এই শূর্পণখাই ছিল। তাই তার মৃত্যুবাণ গোপনে তৈরি করান লঙ্কেশ। এমনও হতে পারে, রাবণের এই নরকের দুয়ার বেয়ে নেমে আসার সংকেতটা শূৰ্পণখা জানত। তাই আহ্বানের সময়ে নরকের সহস্র সহস্র অপজীবকে ফেলে একমাত্র সেই ছিটকে আসতে পেরেচিলো পৃথিবীতে। আসলে যে কী ঘটেচিলো সেই ত্রেতাযুগে, তা তুমিও জানো না, আমিও জানিনে ডাক্তার।”
বিমলসহ বেশ কিছু গাঁয়ের প্রজা এখনও নদীর ওই পার থেকে হাসিমুখে এইদিকে চেয়ে রয়েচে। পবন নামের ছেলেটির এতদিনের জ্বরবিকার সকাল থেকে অনেকটাই কমে গিয়েচে অদ্ভুতভাবে। আমি এই পারে নেমে গোরুর গাড়িতে জুতসই হয়ে বসে ওই পারের দিকে একবার হাত নেড়ে কালীপদকে কইলাম, “আগের বার গোলমাল হল বটে, কিন্তু চলো, তোমাকে এইবার সত্যি সত্যিই আমার পরিচিত একটা খুব ধনী বাড়িতে ভোজ খাওয়াব।”
বীরেন্দ্র চিঁ চিঁ করে শুধাল, “কোথা? কোথা?”
আমার উত্তর দেবার আগে কালীপদ একটা শ্বাস ফেলে মহা বিরক্তি আর ক্ষোভের স্বরে কইল, “কোথা আবার? রায়দীঘড়া।”
