Accessibility Tools

কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

বজ্রসিন্দুক রহস্য

কালীপদ বাসুদেবকে সান্ত্বনা দিয়ে আমাকে আর কানাইকে নিয়ে দুইতলার কক্ষে উঠে এলো। বাসুদেব, বলরাম আর ইন্দ্রও আমাদের পাশের ঘরটায় শোবার জন্য ঢুকবে, হঠাৎ কালীপদ বললে, “বড়ো রায়মশায়, মাপ করবেন, আর একটা সামান্য কথা জানার জন্য বিরক্ত করলুম।”

বাসুদেব তাড়াতাড়ি বললো, “আমাকে এসব বলে কুণ্ঠিত করবেন না মুখুজ্জেমশায়, বলুন না কী জানতে চান?”

“বলচি, হয়তো খুবই তুচ্ছ ব্যাপার, কিন্তু আপনি যে বললেন পিসিমা নাকি মন্দিরে ঠাকুরের ঘরটায় ইঁদুর উৎপাত করে বলে ঘুমাতে পারেন না, তো উনি কী করে ঠাকুরঘরের শব্দ শোবার ঘরে বসে পেলেন?” বাসুদেব ক্লিষ্ট হেসে কইলো, “আপনি বোধহয় তখন ভালো করে লক্ষ্য করেননি ঠাকুর, পিসিমার ঘরটা তো মন্দিরেরই একেবারে গায়ে।”

কালীপদ পূর্ণদৃষ্টিতে চেয়ে কইলো, “ভালো করে লক্ষ্য করাই আমার কাজ বড়ো রায়মশাই। তা আমি করেচি। পাশের ঠাকুরঘরে কেন, যদি ওঁর নিজের ঘরেও ইঁদুর তাণ্ডব করে তবুও ওঁর পক্ষে টের পাওয়া বোধকরি সম্ভব নয়। কারণ দুইটি। এক, ইঁদুরেরা কখনোই উচ্চগ্রামে চেঁচামেচি করে না। দুই, আপনার পিসিমা জোরালো শব্দ ছাড়া কানে শোনেন না।”

বাসুদেব এক মুহূর্ত কথাটার যাথার্থ্য যাচাই করে বিস্মিত হয়ে বললে, “তাই তো! তবে পিসিমা কি মিছে কথা বললো যে রাতে ইঁদুরের কুটুর কুটুর শব্দ পায়? তখন ঝি-টাও পাশেই ছিল। তাকে ডাকবো?”

“নাহ, তাকে ডাকা নিষ্প্রয়োজন। পিসিমা মিথ্যা বলেননি বোধহয়। শব্দ তিনি কিছু একটা পেতেন প্রতি রাতেই, কিন্তু সে শব্দ মোটামুটি জোরালো, যা দরজা- দেওয়াল পার করে কানে কম শোনা বৃদ্ধার কানে ইঁদুরের মতো হয়ে পৌঁছেচে। সে শব্দ কীসের? একবার গর্ভগৃহে যাওয়া যায়? না না সকালে নয়, এমন কি আর রাত হলো… এখনই চলুন না? ভয় নেই, বাঁধন দেওয়া রয়েচে তো।”

আমরা চলেচিলাম ঘুমোতে। তার বদলে এখন দাঁড়িয়ে রয়েচি গর্ভগৃহের শূন্য বেদীর সামনে আর এই দাঁড়ানোই আমাদের টেনে দাঁড় করিয়েচে এক মহা আশ্চর্য্য রহস্যের মুখোমুখি! এই ক-দিনের গতানুগতিক হত্যাকাণ্ডের রহস্য যে এক মুহূর্তের মধ্যে এমন নাটকীয় বাঁক নেবে তা বোধহয় কালীপদও অনুমান করতে পারেনি! গর্ভগৃহে ঢোকার সময়ে ফটকের উপরের দেওয়ালে দু-খানা ক্ষত চোখে পড়লো। আমি আলোটা তুলে ভালো করে দেখে বললাম, “গুলির ক্ষত। দেওয়ালে কেউ দু-খানা গুলি করেছে।”

কালীপদ সেদিকে চেয়ে বললো, “দুইটি নয়, তিনখানা। এগুলি নিশ্চয়ই ওই দারোগাটার ছোঁড়া গুলি। দাগগুলো কাছাকাছি নয়, অনেকটা দূরে দূরে সামঞ্জস্যহীন ভাবে রয়েচে! দারোগা যেন চোখ বন্ধ করে এলোপাতাড়ি ডাঁয়ে বাঁয়ে গুলি ছুঁড়েচে কারুর উদ্দেশে! পিশাচের চোখের ছলনার ধারণাটা যে আমার ভ্রান্তি নয়, এটাও তার একটা প্রমাণ ডাক্তার! শিবনাথ দারোগা যে ধরনের মানুষ ছিল বলে শুনচি, সেই ধরনের লোকরা নির্দয় হয়, নরাধম হয়, কিন্তু বোকা হয় না। সে নিশ্চয়ই পিশাচের চাউনি দেখেই তার সম্মোহনের বিষয়টা কোনোভাবে অনুমান করে নিজের চোখ বন্ধ করে রেখেচিল। এই যে, যেখানে পুলিশ খড়িমাটি দিয়ে দাগিয়ে দিয়ে গিয়েচে দারোগার মৃতদেহের পড়ে থাকার জায়গাটা, এইটে কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে নামার জায়গা নয় মোটেও। সে বোধহয় চোখ বন্ধ করেই গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে এসেচিল আর পড়ে গিয়েই এলোমেলো গুলি চালিয়ে বসে। কিন্তু সে চিৎকার করে ফৌজ ডাকলো না কেন তা আমার বোধগম্য হচ্চে না।”

ভিতরে ঢুকে কানাইও আমাদের মতোই জোড়া গোখরোর ছাপওলা বিরাট শূন্যবিগ্রহের বেদিটা নেড়েচেড়ে দেখচিলো, হঠাৎ তার শালগাছের মতো হাতের চাপ লেগে একটা জায়গায় একটু চিড় ধরার মতো ফাঁক দেখা যেতেই নিজের সড়কির ফলাটা বের করে চাড় দিতেই বেদীর ভিতর থেকে একটা যান্ত্রিক ঘট ঘট ঘটাং শব্দের সঙ্গে বেদীর উপরিপৃষ্ঠটা হাঁ হয়ে খুলে গেল আর পলকের মধ্যে এতক্ষণের ঠাকুরের বেদী আমাদের সামনে হয়ে গেল একটা ডালা খোলা তোরঙ্গ! তোরঙ্গের ডালার ভিতরে ক্ষুদ্র ধাতব পাতে লেখা রয়েচে ‘বজ্র-সিন্দুক’ আর সেই তোরঙ্গ অথবা সিন্দুকের ভিতরে দুইটি হারিকেনের আলোতে আমরা কী দেখলাম জানো? সেই কথাই এইবার বলচি শোনো।

বিষয়টা উপলব্ধি করতে গেলে আগে তোমাদের মানসচক্ষে মনে করতে হবে যে তোমাদের সামনে একটা ডালা খোলা বিরাট তোরঙ্গ পড়ে রয়েছে। এইবার আলোটা বাঁ হাতে ধরে একটু উঁকি দিয়ে দেখলেই দেখতে পাবে, তোরঙ্গের ভিতরে নীচের দিকের প্রায় দেড় মানুষ লম্বা পেতলের পাতটা এবং চারপাশের চারটে পুরু পেতলের দেওয়াল জুড়ে রয়েচে অজস্র জটিল কলকবজা আর যন্ত্রপাতি, আর ডালাটার ভিতরদিকে আছে একটা ধাতব ঘড়ির মতো খাঁজকাটা নকশা! কোনো মানুষকে ওই সিন্দুকের ভিতরে শুইয়ে দিয়ে ডালা বন্ধ করে দিলে মানুষটার পিঠের নীচে আর তার চারপাশের চারটে দেওয়াল জুড়ে থাকবে শুধুই কলকবজাগুলো, আর উপর দিকে থাকবে নকশাটা।

বিস্ময়ে আমরা আক্ষরিকভাবেই হতবাক হয়ে গিয়েচিলাম। কানাই ডালাটা আবার বন্ধ করার পর ডালার উপরে দেখলাম একফুট আন্দাজ ব্যাসের একটা বৃত্ত। প্রথমে এটাকে বিগ্রহ তুলে নেবার ফলে তৈরি হওয়া দাগ ভেবেচিলাম কিন্তু এখন মনে হলো ডালার নীচের ঘড়ির মতো নকশাটার ঠিক উপরেই একই মাপের একটা বৃত্ত কখনোই সমাপতন হতে পারে না! কালীপদ খুঁটিয়ে দেখে বললো, “এই বৃত্তটার সঙ্গে ভিতরের কলকবজার নিশ্চিত কোনো যোগাযোগ রয়েচে ইন্দ্ৰ! কানাই, এই চাকতিটায় তোর সড়কি দিয়ে চাপ দিয়ে দেখ তো?”

কানাই বলশালী হাতে বহু চেষ্টা করাতেও কিছু হলো না! চাকতি অনড় রয়ে গেল। কালীপদ আক্ষেপের স্বরে বললো, “আমার মনে হয় বলপ্রয়োগে ফল হবে না। সিন্দুকের ভেতরের ঐ পাঁচদিকের পাঁচখানা যন্ত্র ফের কার্যকর করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট চাবি জাতীয় কিছু প্রয়োজন মনে হয়। রাধামাধবের যে বিগ্রহটা ঠিক এই চাকতির উপর মাপে মাপে বসানো ছিল, হতে পারে ঐ বিগ্রহের নীচের অংশটাই কোনো চাবির কায়দায় খাঁজ কাটা ছিল হয়তো? হা ভগবান! এখন আর তা বোঝার কোনো উপায় নেই! ধুরন্ধর শয়তানটা আবারও আমাদের টেক্কা দিয়েচে। সে চাবিকাঠির রহস্যটাই বিলুপ্ত করে দিয়েচে বিগ্রহটা লোপাট করে। আমার কী মনে হয় জানো ডাক্তার, এই সিন্দুকের ভিতরে কলকবজার ফাঁদেই ওই রাক্ষসটাকে আটকে রাখা হয়েচিল যুগ যুগ ধরে। মুক্তি পাবার পর এই সিন্দুকটার আতঙ্কেই সে এই বাড়ির আশপাশে ঘেঁষেনি।

বাসুদেব বিহ্বলের মতো বললো, “কী ভয়ঙ্কর! আমরা এতকাল এই বেদীকে বিগ্রহ সমেত পূজা করে এসেচি কিন্তু জানতেও পারিনি যে শয়তান আসলে ভগবানের নীচেই বসে রয়েচে! ওহহহ! কিন্তু ঠাকুর, এত যুগ যে কঠিন বাঁধন খুললো না, সে বাঁধন হঠাৎ মুক্তই বা হলো কী করে? ওই দারোগার কাজ?”

কালীপদ তিক্ত স্বরে বললে, “দারোগার সাধ্য হতো না হয়তো, কিন্তু যুগ যুগ ধরে যে অনিয়ম কখনও হয়নি, আপনার সময়ে সেই বেচাল হওয়াতেই সেই বাঁধন দুর্বল হয়ে গিয়েচিলদ

“আমার সময়ে? কিন্তু আমি তো ভক্তিভরেই….”

“আহহ রায়মশাই, সব কিছু করুন কিন্তু কোনো কিছু থেকে বিজ্ঞানকে বাদ দেবেন না। তাহলে কোনো হিসেবই মিলবে না। ভক্তি শ্রদ্ধা পরের কথা কিন্তু আদতে জিনিসটা তো একটা অতি জটিল কলকবজা গঠিত যন্ত্রই? আর যন্ত্রটা নিজের চালিকাশক্তি কোথা থেকে সংগ্রহ করতো জানি না, হয়তো পিশাচটার হৃদয়ের স্পন্দন থেকে, হয়তো অন্য কোনো উপায়ে, কিন্তু যন্ত্রের কলকবজাকে বহুকাল কর্মক্ষম রাখতে গেলে তাকে মসৃণ রাখতেই হবে। সেইজন্যই বোধহয় যিনি এই সিন্দুক তৈরি করেচিলেন, তিনিই বৎসরে একবার রাধামাধবের তৈলস্নান আর রৌদ্রস্নানের বিধানও দিয়ে গিয়েচিলেন। কোনো গোপন পথে সেই তেল রৌদ্রে আরও তরল হয়ে প্রবিষ্ট হতো কলকবজার দেহে। কিন্তু আপনাদের তো পরপর দুই না তিন বছর কাদের সব অশৌচের জন্য পূজাই হয়নি বললেন, ফলে তেলও পড়েনি স্বভাবতই। তাই কলকবজা ক্ষীণ শব্দে দিনের পর দিন জবাব দিয়ে গিয়েচে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। সেই গোলযোগের যান্ত্রিক শব্দ দিনে কর্ণগোচর না হলেও নিস্তব্ধ রাতে সেই আওয়াজকেই মনে হয় ইঁদুরের শব্দ ভেবে ভুল করতেন আপনার পিসিমা। যা গিয়েচে তা ভেবে আর কী হবে? গতস্য শোচনা নাস্তি। কিন্তু আপনাদের দুই পরিবারেরই মূল শেকড় যেখানে, সেই দেবীগ্রামে যেতে হবে শীঘ্রই। পারলে আগামীকালই। এই রাধামাধবকেও তো আপনাদের প্রপিতামহ ওই দেবীগড় থেকেই এনেচিলেন, না?”

কালীপদর চোখে সহস্র প্রশ্ন খেলা করতে থাকলো। তারপর একটু থেমে বললো, “আপনার স্ত্রী মৃত্যুকালে যদি নিজের ঘাতককে পিশাচ বলে না জেনে থাকে তবে প্রিয় ছেলের হাতে মৃত্যুকালে কতখানি মনের আঘাত আর বেদনা সে সহ্য করেচে তা ভাবতে পারচিনে আমি। এ পাপের ক্ষমা নাই। একে আমি ছাড়বো না ডাক্তার!”, কালীপদর সিক্ত চোখদুটো হ্যারিকেনের আলোতে ঝলসে উঠলো!

কালীপদ এই মহা ধূর্ত পিশাচের সঙ্গে লড়াইতে নামার জন্য প্রস্তুত হলো। সে প্রাথমিক রক্ষাকবচ হিসেবে বাঁধন দিয়ে ভেবেচিল কেউ যদি বাইরে না বেরোয় তবে রাতের মতো নিশ্চিন্ত, কিন্তু তখনও কেউই টের পায়নি যে আজ রাতের শিকার পদ্ধতিটি হবে অভাবনীয় এবং কুটিল ফাঁদ নেমে আসবে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত পথে। মহা ধুরন্ধর পিশাচ মনে মনে বিবেচনা করে এমনই একটা উপায় বেছে নিল, যা ছিল এ যাত্রা কালীপদর মনোবল সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেবার পক্ষে পর্যাপ্ত।