Accessibility Tools

কালীগুণীন ত্রাহিমাম – সৌমিক দে

কালীগুণীন এবং বাঘের থাবা

বৃদ্ধ নায়েব হরিশ্চন্দ্র রায় দীর্ঘ চিঠিখানা আদ্যোপান্ত পাঠ করে, চশমাটা খুলে রেখে, ললাটে ভাঁজ ফেলে বসে রইল। মুনশি দীনদয়াল অত্যন্ত চিন্তিতভাবে বললে, “ব্যাপার কী, রায়মশাই? খবর সব কুশল তো বেশ?”

পত্রখানা এসেচে ইন্দ্রগড় তালুক থেকে। পত্র লিখেচে বর্ত্তমান জমিদার সুরেন্দ্রনাথ রায়। এই সুরেন্দ্রনাথের অধীনেই ইন্দ্রগড় এস্টেটে হরিশ্চন্দ্র এবং দীনদয়াল কর্ম করে এবং জমিদারির কারবার দেখভালের সূত্রেই গুটিকতক অধীনস্থ কর্মচারীকে সঙ্গে নিয়ে নায়েব এবং মুনশি এসেচে এই বেহার প্রদেশে মাসখানেকের জন্য। নায়েবমশায়কে বহুবার বহু কাজে এই প্রদেশে আসতে হয়, কিন্তু এইবার কিছু অধিক কাজ থাকায় দীনদয়ালকেও সঙ্গে আনতে হয়েচে। প্রশ্ন শুনে হরিশ্চন্দ্র মুখ না তুলেই বিমর্ষ কণ্ঠে উত্তর দিল, “খবর মঙ্গল নয়, দয়াল। খবর মঙ্গল নয়। সে রাক্ষস আবার জুটেচে।”

দীনদয়াল এস্টেটের তিনপুরুষের অতি বিশ্বস্ত কর্মচারী। সে উঠে দাঁড়িয়ে শুষ্ক স্বরে শুধোল, “কেন রহস্য করচেন রায়মশাই? আমার যে হাত-পা কাঁপচে। তালুকে অমঙ্গল কিছু ঘটেচে নাকি? কোন রাক্ষসের কথা বলচেন?”

বৃদ্ধ নায়েব শরীরের সবটুকু শক্তি সঞ্চয় করে ফিশফিশ করে কইল, “আমাদের এখুনি একবার বেরুতে হবে, দয়াল। দেখি কী উপায় হয়। ইন্দ্ৰগড় তালুকে আবার বাঘের থাবা হানা দিয়েচে।”

ভীষণ ভয়ে দীনদয়ালের সহসা বাক্যস্ফুরণ হল না। তার দুই চক্ষে বিষম আতঙ্ক একবার দেখা দিয়েই অন্তর্হিত হল। কিছু সময় স্থিরনেত্রে চেয়ে থেকে বৃদ্ধের হাত ধরে কইল, “চলুন কৰ্ত্তা। গাড়িতে ঘোড়া জোতাই রয়েচে, তাদের খাওয়াও হয়ে গিয়েচে। এই বেলা বেরুলে আঁধার বিলম্ব রয়েচে, কিন্তু… কিন্তু যাবেন কোথা?”

নায়েব হরিশ্চন্দ্র একটি বেতের ডোঙাতে কিছু ফল আর সবজি নজরানা নিয়ে গাড়িতে বসে এক মুহূৰ্ত্ত মৌন থেকে, মুখ তুলে হাঁক দিল, “চালাও সাতশিমুলিয়া। বাংলার ফটক পেরিয়ে পলাশবাড়ির জঙ্গলের ভিতরের রাস্তা ধরো। আলো সঙ্গে রাখো, আঁধার নামলে ক্ষতি নেই, কিন্তু রাতের মধ্যে পৌঁচোতে হবে। লোকে কয়, সদ্গুরুর নাকি পরীক্ষা নিতে নেই। অনেক নাম শুনেচি তাঁর, আজ যদি বিপদভঞ্জন করতে পারেন তো তিনিই পারেন। সাতশিমুলিয়ার তল্লাটে ঢুকলে পর গাঁয়ের কোনও গৃহস্থের বাড়িতে শুধিয়ে নিয়ো হংসী তান্ত্রিকের আশ্রম কোথা।”

“জি মালেক।”

কোচম্যান ঘোড়ার বলগা ধরে চাবুক হাঁকাল। গাড়ি ধুলো উড়িয়ে বাণের গতিতে ছুটতে শুরু করল।

***

রাত্তির বোধ করি তখন প্রথম প্রহর হয়েছে, অঘোরী হংসী তান্ত্রিক তার দুই শিষ্য কালীপদ এবং ভুবনকে নিয়ে আশ্রমের বিরাট চাতালে বসে রয়েচে। সুমুখে একখানা টাটকা মৃতদেহ পড়ে রয়েচে, দুই শিষ্য মিলে একবার করে মস্তর আওড়াচ্ছে আর মড়ার আড়ষ্ট ওষ্ঠাধর একটু একটু কেঁপে উঠচে। সামনে অনেকখানি তফাতে তফাতে পাঁচখানা কুণ্ডে আগুন জ্বলচে। তার মধ্যে হাতের মুষ্টি হতে কিছুটা ধুনো ছুড়ে দিয়ে হংসী বজ্রগম্ভীর স্বরে কইল, “মড়ার দেহে গোপন দ্বার/ আত্মা করে ভিতর-বার / কুম্ভ সামাল, কুহক ছাড়/ জাগবে বেতাল, খবরদার!”

শুরুর চিৎকার শোনামাত্র কালীপদ আর ভুবন সামনে রাখা দুখানি ছাইয়ের কলশি বিদ্যুৎবেগে দূরে সরিয়ে নিয়ে অপর হাতে রাখা একখানা করে মরা শালিখ পাখিকে ছুড়ে দিল একটা কুণ্ডের আগুনের মধ্যে। মুহূর্ত্তের মধ্যে ঝোড়ো হাওয়া বইতে আরম্ভ করল, আগুনের শিখাগুলি লাফিয়ে উচ্চ হয়ে উঠল, বহু দূরের থেকে একটা চাপা শব্দ যেন উড়ে আসচে মনে হল।

বেতালের জাগরণ এবং আগমন যখন প্রায় প্রস্তুত, হঠাৎ হংসী তান্ত্রিক যেন নিদ্রোখিতের ন্যায় জেগে উঠে বিষম জোরে একটা মন্তর পড়তেই দপ করে সমস্ত আগুন নিবে গেল। এতক্ষণ তীব্র অনলশিখায় উদ্দীপ্ত হয়ে থাকা আশ্রম চত্বর যেন এক মুহূর্ত্তে আঁধারে ডুবে গেল। কালীপদ আঁধারে বিস্মিত হয়ে গুরুর পানে চাইতেই হংসী একটা পিদিমে আগুন জ্বালতে জ্বালতে বললে, “না না না। বড়ো প্রমাদ হত। আজ গাঁ-ভর আমি বলে এসেচি যেন রাত্তিরে কেউ এদিকপানে পা না রাখে, সে কথা এদিগড়ে কেউ অশ্রদ্ধা করবে না, কিন্তু আমি হঠাৎ ঘোড়ার গন্ধ পাচ্চি কেন বলো দেখি?”

কালীপদ বিস্মিত হয়ে কইল, “আজ্ঞা, ঘোড়া গুরুদেব? কোথা?” ধুনো-মাখা হাতটা নিজের রক্তাম্বরে মুছতে মুছতে হংসী জবাব দিল, “সে ছাই আমি কি জানি? তবে গন্ধ পেলুম। একটি নয়, অনেকগুলি ঘোড়ার ঘ্রাণ। সঙ্গে মানুষের গন্ধ। একটা দুইটা তিনটা।”

কালীপদ একটু থেমে বললে, “গুরুদেব, বেতাল জাগরণ মন্তর তো জেনেচি, কিন্তু এই যে বেতালের জাগার পরে প্রশমন বা নিবারণের মন্তর তো শিখিনি।”

“শেখাব, হতভাগা, শেখাতেই হবে। মন্তরই শক্তি, আবার মন্তরই দুর্ব্বলতার রূপ নেয়। ভূতপ্রেত, অপশক্তিরা ভীষণ ভীষণ চতুর এবং কুটিল হয়। চালাকি দ্বারা বা ঠকিয়ে তাদের থেকে পার পাওয়া যায় না। তখন মন্তর দরকার হয়। বেতাল বড়ো ভয়ানক অপশক্তি রে। তাকে জাগালে, তাকে ঘুম পাড়ানোর মন্তরও শিখে রাখতে হয়। আজই শেখাতুম, কিন্তু… নাহ্, আজ অসম্ভব।”

ভুবন কিছু সময় নিশ্চুপ থেকে মৌনতা ভাঙতে যাচ্চে, এমন সময় ঘড়ঘড় শব্দে একখানা চৌঘুড়ি এসে দাঁড়াল আশ্রমের সামনের নিকষ অন্ধকারে। গাড়ির নীচের ঝুলন্ত বাতির থেকে সামান্য আলো পড়ে পথটা আলো হয়ে রয়েচে। গাড়ি থেকে একজন বৃদ্ধ অবতরণ করে, বোধ করি, এইদিকে প্রদীপের আলো দেখতে পেয়ে সামান্য ইতস্তত পদক্ষেপে ফটক পেরিয়ে ভিতরে এসে দাঁড়াল। তার পরনে একটা মূল্যবান মেরজাই, তাতে ফুলকারির বাহার তোলা, স্কন্ধে সোনালি জরিদার পাট্টা, মাথায় দেওয়ানি পাগড়ি, পায়ে বার্নিশ করা জুতো, হাতে ছড়ি।

প্রথম দর্শনেই ঠাহর হয় যে সে একজন রীতিমতো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। হংসী নীচু স্বরে বললে, “এ আবার কোন জমিদার বুঝি?”

কালীপদ সরু চক্ষে চেয়ে ততধিক নীচু গলায় কইল, “উহুঁ, এ পোশাক দেওয়ান অথবা নায়েবের। নায়েবরা সচরাচর চৌঘুড়ি চাপে না, কিন্তু ইনি যখন এই গাড়ি নিয়ে এসেচেন, তখন নিশ্চয়ই এইদিকে কোনও এস্টেটের কর্মেই এসেচেন।”

হংসী অযথা বাক্যান্তর করলে না। কালীপদর পক্ষে পোশাক দেখে পদমর্যাদা আঁচ করা তত কঠিন নয় বটে। সে বাল্যকাল হতে জমিদারির এই পরিবেশেই বড়ো হয়েচে। হংসী তান্ত্রিকের সঙ্গে কালীপদর পরিচয় কোথায় কবে হয়েচিল, সে কথা আরেকদিন বলব’খন। হংসী সে সময়ে কালীপদকে দেখেই বুঝেচিল যে এই ছেলের তন্ত্রসাধনার পথ অতি প্রশস্ত। সাধারণত অমাবস্যায় এবং তদুপরি কোনও গ্রহণে দীক্ষা নিলে তান্ত্রিকের সাধনা সুগম হয়, কিন্তু কোনও কালো বিদ্যায় কালীপদকে দীক্ষিত করতে হংসীর মন সায় দেয়নি। কালীর জন্ম বৃহস্পতিবার, আষাঢ়ের ভরা পূর্ণিমার রাতে এবং এমন একটা অদ্ভুত নক্ষত্রযোগে, যার ফলে হংসী সবসময় বলত, “ওরে হতভাগা, ভবানী তো তোকে নিজের কাজে নিয়োগ করেই রেখেচে, শুধু তন্ত্র জিনিসটে হল নেহাত গুরুমুখি বিদ্যে, তাই একজন গুরুর দিশারি পেলে তুই অন্যান্য সাধকের চাইতে অনেক, অনেক কম সময়েই সব শিখেওয়াবি, আমি শেখাব। সেই শুরু। মাত্র চৌদ্দ বৎসর বয়সেই গুরুকুলের নিয়ম ভেঙে কালীপদকে নিয়ে চলে আসে হংসী। একাদিক্রমে সাতটি বৎসর কঠোর অধ্যবসায়ে পার হলে পর মাত্র কুড়ি বছরের কালীপদ হয়ে ওঠে হংসীর যোগ্য শিষ্য। একাধারে তন্ত্রে পরম বিশারদ, অপর পক্ষে প্রাচীন ঋষির ন্যায় স্থিতধী এবং শানিত বুদ্ধি।”

বৃদ্ধ নায়েব কিছুটা হতবুদ্ধির মতোই হংসীর সুমুখে এসে শুধোল, “বাবা, অনধিকার প্রবেশ করলাম না তো?”

হংসী তান্ত্রিক মৃদু হেসে কইল, “না। তা সম্ভব নয়। আপনি যখন আশ্রমের ভিতর প্রবেশ করতে বাধা পাননি, তখন বুঝবেন যে, আমি প্রবেশের অনুমতি তখনই দিয়ে দিয়েচি। নচেৎ… সে কথা থাক, আপনি কি কোনও বিশেষ…”

নায়েবমশায় নীচু হয়ে বসে হংসীর সামনে কিছু ফল আর সবজি রেখে উৎসুক হয়ে চেয়ে রইল। তান্ত্রিক কিছুক্ষণ ভেবে ফলগুলো গ্রহণ করলে পর নায়েব আরামের নিশ্বাস ফেলল।

“আজ একটা বিশেষ তিথি, তাই আমি আমার শিষ্যদ্বয়কে নিয়ে একটি উপচারে বসেচিলাম, কিন্তু আপনাকে দেখে বুঝেছি, আপনি বড়ো বালাই নিয়ে এসেচেন, তাই… তা ছাড়া আর্তকে কখনও ধর্মত ফেরাতে নেই। খুলে বলুন সব কথা।”

নায়েব সবেমাত্র মুখ খুলতে যাবে, এমন সময়ে বাইরে থেকে ঘোড়ার কলরব আর একটা ভয়ার্ত চিৎকার শুনে সেইদিকে মুখ ফিরিয়ে হরিশ্চন্দ্রর রক্ত জল হয়ে এল। মুনশি দীনদয়াল ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর তার ঠিক সামনে বিরাট কালো অন্ধকারের ন্যায় দুই-তিনখানা ভয়াল যমদূতের মতো মূর্ত্তি তার পথরোধ করে রেখেচে। তাদের চক্ষে খুনির দৃষ্টি, নরসংহারে তাদের অপার সুখ, তাদের পিশাচ-হাতের আগায় বাঁকানো ক্ষুরধার নখের সারি মানুষের কণ্ঠনালি ছিঁড়ে ফেলার মানসে উদ্‌গ্রীব হয়ে রয়েচে। হংসী সেদিকে তাকিয়ে বিরক্তির সুরে কইল, “আহ্। এরা শত্রুর নয়, হতভাগার দল। আসতে দে ওকে।” বলামাত্র সব ভোঁ-ভাঁ। কেউ কোত্থাও নেই। দীনদয়াল কাঁপতে কাঁপতে ভিতরে প্রবেশ করল। হরিশ্চন্দ্র ধরা গলায় বললে, “আপনি যথার্থই বলেচেন, আগুনার অনুমতি ভিন্ন প্রবেশের উপায় নেই। যা-ই হোক, প্রথমে নিজের পরিচয় দিই, ঠাকুর। আমার নাম শ্রীহরিশ্চন্দ্র রায়। জেতে কায়েত, গণ নর। আমি দখিন বাঙ্গালার ইন্দ্রগড় এস্টেটের নায়েব ইনি দীনদয়াল দাস, ইন্দ্রগড়ের মুনশি।”

উত্তরে হংসী তান্ত্রিক হাত জোড় করে অভিবাদন করল দেখে দীনদয়াল কিঞ্চিৎ সংকুচিত হয়ে গিয়ে নিজেও হাত জোড় করল।

কিছুটা নিজের চাক্ষুষ দর্শন এবং কিছুটা আজকে সকালের প্রাপ্ত পত্রের মর্ম থেকে সন্ধি করে ঘটনাটা বলতে আরম্ভ করল হরিশ্চন্দ্র। আমি পরবর্তীতে মুখুজ্জে মশাইয়ের নিজ মুখ থেকে পুরো ঘটনাটা যেভাবে শুনেচি, বুঝেছি, তোমাদেরকেও তেমনই বলচি।

 ***

ইন্দ্রগড় এস্টেটটি সুবা বাঙ্গালার দক্ষিণ-পুবে অবস্থান করছে। ভূখণ্ড হিসেবে এর অবস্থিতি বেশ মনোরম। দখিনে এগুলে আধা ঘণ্টার মধ্যে সুন্দরবনের খাঁড়ি, বাঁয়ে হেমনগরগঞ্জ, পূবে জিলা ঈশ্বরীপুর (বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত), আর চতুষ্পার্শ্বে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নদী দিয়ে ঘেরা। জমিদারদের প্রাসাদের ছাতে দাঁড়ালে এখনও দুই দেশের ভূপ্রকৃতি একত্রে চাক্ষুষ করা যায়। এই এস্টেটের জমিদার শ্রীসুরেন্দ্রনাথ রায়। তিনি জমিদারির ছোটো তরফ, কিন্তু বৎসর ছয়েক হল বড়োভাই দেবেন্দ্রর মৃত্যুর পর তিনিই অবিভক্ত এস্টেটের সর্বেসর্বা।

বহু বৎসর পূর্ব্বে রায় পরিবারের পুত্র দিগিন্দ্রনাথ রায় হাওয়া বদলাতে বেড়াতে গিয়েচিল ভারতের উত্তর-পুবের পাহাড়ে। দিগিন্দ্রনাথ ছিল সেকালের নামজাদা শিকারি। একবার পাহাড়ের জঙ্গলে তাকে হিংস্র শ্বাপদ আক্রমণ করলে পর একটি বালিকা তার জীবন রক্ষা করে। এই বালিকা ছিল উত্তর পাহাড়ের দুর্ধর্ষ শিকারি জাতি পেটারি সম্প্রদায়ভুক্ত। দিগিন্দ্রনাথ পেটারির দলপতিকে নজরানা দিয়ে, সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে বিবাহ করেন গিরিবালাকে। একটিমাত্র কাঠের বাক্স নিয়ে গিরিবালা এসে উঠল ইন্দ্ৰগড়ে। ক্রমে সে বাংলার মাটি জলকে আপন করে নিল। এই দিগিন্দ্রনাথ হল দেবেন্দ্র আর সুরেন্দ্রর বাপ।

ভূস্বামী হলেও এই পরিবারটি কিঞ্চিৎ অন্যরকম। বিলাসব্যসন অথবা পরের উপর হুকুমদারি করে এদের জীবন কাটে না। সুরেন্দ্রনাথ অত্যন্ত ভদ্রলোক এবং মার্জিত। নিজে একজন উঁচুমানের কবি এবং সুকণ্ঠের অধিকারী। তার প্রয়াত বড়োভাই শ্রীদেবেন্দ্রনাথ রায় শৈল্পিক গুণে ছিল আরও উচ্চে। তার যেমন ছিল ছবি আঁকার হাত, তেমন ছিল তার ভাস্কর্য। মাটি, পাথর, কাঠ এমনকি আলুতে মূৰ্ত্তি গড়তেও তার জুড়ি মেলা দায়। একখানা কক্ষ শুধুমাত্র তার তৈরি মাটির এবং পাথরের ছোটোবড়ো ভাস্কর্যে পরিপূর্ণ। ছবিতে সে ব্যবহার করত তেলরং, কিন্তু সেই রংও তৈরি করত নিজে। ঘরোয়া ভেষজ পদ্ধতিতে ঘাস, খড়, রাঙামাটি, হাতির দাঁত অথবা নীলের বীজ থেকে, ফলে তার ছবির ঔজ্জ্বল্যের কাচে অন্যান্য ছবি ঘেঁষতে পারত না। তার সৃষ্ট সেসব ছবি বহু মূল্য দিয়ে করদ রাজ্যের আমিররা অথবা ইংরেজ সাহেবরা ক্রয় করে নিয়ে যেত। ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং পুরাণে ছিল তার অগাধ পাণ্ডিত্য। জমিদারমহলের সম্মুখভাগে নীচতলায় দুখানি প্রকাণ্ড কক্ষকে দেবেন্দ্র নিজের শিল্পকক্ষে পরিণত করে দিনরাত সেসব চর্চা করত।

এই পরিবারে দুই ভাই, তাদের স্ত্রী-সন্তান, বৃদ্ধা মা এবং বহু পরিচারক ব্যতীত আরেকজন অন্নদাস ছিল। বিশ্বম্ভর। বিশ্বম্ভর কামার। যতদিন ইস্তক সে রায় পরিবারে প্রতিপালিত হয়েছিল, তখন তার বয়স ছিল আন্দাম পঁয়ত্রিশ। ছেলেটি প্রথম জীবনে দুর্ধর্ষ দস্যু ছিল। একবার একটা ডাকাতির মামলায় দণ্ড হবার পর কীভাবে যেন দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। দেবেন্দ্র মাঝেমধ্যে ভারতবর্ষের আনাচকানাচ ঘুরে বেড়াত নানান সামগ্রী এবং গবেষণার কাজে। বলবান বিশ্বম্ভরকে নানান পন্থায় আইনের খপ্পর হতে মুক্ত করে নিজের সহচর হিসেবে রেখে দিল সে। স্নেহশীল দেবেন্দ্রর সংস্পর্শ লাভ করে এই ছেলেটির চরিত্র সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ হয়ে পড়ে। দেবেন্দ্রনাথ একদিন কইল, “বুঝলি বিশে, তোকে আমি ছবি আঁকা আর মূর্ত্তি গড়া শিখিয়ে দোব’খন। আগের জীবনের সমস্ত কথা তুই ভুলে যাবি।”

উত্তরে বিশ্বম্ভর হাতজোড় করে কয়েচিল, “এই হুকুমটুকু মাপ করতে হচ্চে, কর্তা। আমি লাঠি আর সড়কি ছাড়ব না, তবে তা আপনার কাজেই লাগবে বটে। আজ থেকে আমি এই রায় পরিবারের লেঠেল হলেম। কারও সাধ্য নেই আপনাদের দিকে চোখ তোলে।”

সেই কথাই বহাল রইল। বিশ্বম্ভর অক্ষরে অক্ষরে নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করে গিয়েচে। সে থাকতে রায় পরিবারের পানে কেউ চোখ তুলে চাইতে পারেনি। কিন্তু দুর্যোগ নামল, যখন বিশ্বম্ভর আর রইল না। সে মরেচে কি না কেউ খবর পেল না, তবে সেই কালরাত্তিরে তার সঙ্গে ভয়ানক কিছু একটা নিশ্চয়ই হয়েছিল। যা-ই হোক, বলতে যখন বসেচি, তখন ধীরে ধীরে সব কথাই বলচি।

বিশ্বম্ভর গায়েগতরে বলবান ছিল বটে, কিন্তু বুদ্ধিশুদ্ধি তত অধিক তার ছিল না। খুব করে বুঝিয়ে না দিলে কোনও সূক্ষ্ম কথা তার পালোয়ানি মস্তিষ্কে লব্ধপ্রবেশ হত না। অধিকাংশ বলশালীর মস্তিষ্ক স্থূল হয় এ কথা সত্য। দেবেন্দ্র তাকে বহুবার বহুভাবে বাজিয়ে দেখে অবশেষে তুষ্ট হয়ে নিজের সঙ্গে রেখে দেয়। তার একটি শক্তিশালী অথচ কম মেধার মানুষের প্রয়োজন রয়েচে। দেবেন্দ্র বহু সময়ে বনেবাদাড়ে ঘুরে ঘুরে নানানরকম প্রাচীন জিনিস সন্ধান করে বেড়ায়। এক্ষেত্রে তাকে রক্ষা করার মতো একটি রক্ষীও রইল অথচ কোনও ঔৎসুক্য বা প্রশ্নের মুখেও পড়তে হল না। দেবেন্দ্রর হিসেবে ভুল হয়নি। বিভিন্ন বনবাদাড়ে, আঘাটায় বহুবার বিশ্বম্ভর নিজের প্রাণ বাজি রেখে তাকে রক্ষাও করেছে।

তো একদিন পুণ্যতোয়া গোদাবরীর দুই তীরে এইরকমই একটা সন্ধান সেরে দেবেন্দ্রনাথ বিশুকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এল। সঙ্গে আনল গোদাবরীর দুই পাড়ের অসংখ্য আদিম জনজাতির থেকে সংগ্রহ করা অজস্র প্রাচীন জিনিসপত্তর, গাছগাছালি আর তাদের গোষ্ঠীতে পুরুষানুক্রমে চিরপ্রবহমান কিছু তথ্য। বাড়িতে ফিরে বিশুর কাজ শেষ হল। সে বহাল হল দ্বাররক্ষী হিসেবে, আর টুকমেধা দেবেন্দ্রনাথ মশগুল হয়ে পড়ল নানান পরীক্ষানিরীক্ষায়। দাদার খামখেয়ালি আচরণের কথা সুরেন্দ্রনাথসহ বাড়ির সকলেই অল্পবিস্তর জানত, তাই কেউই তত বিচলিত হল না। একদিন হঠাৎ নায়েব হরিশ্চন্দ্রকে ডেকে দেবেন্দ্র কইল, “নায়েবমশায়, আমার একটা বিশেষ শিল্পকর্মের জন্য কিছু জিনিসের আবশ্যকতা রয়েচে, সেগুলি আপনাকে সংগ্রহ করে দিতে হচ্চে।”

“আজ্ঞা করুন বড়োকর্তা।”

“আপনি শহর বা দূর গাঁয়ের কোনও স্থান থেকে আমাকে… এই ধরুন-না কেন, গোটা পাঁচেক পাথরের জন্তুর মূর্ত্তি জোগাড় করে দিতে হবে। আমি নিজেই গড়তে পারতুম, কিন্তু এ ক-দিন আমার অধিক সময় নেই।”

নায়েব একটু চিন্তা করে ওষোল, “আজ্ঞে, কীসের মূর্ত্তি চাই?”

“বেড়ালের মূর্ত্তি। পাঁচটি কম করে। নিষ পাথরের হওয়া চাই। তিনটি দিনের মধ্যে মধ্যেই আমার চাই, তার জন্য যত টাকাকড়ি খরচ হয় হোক, আপনি আমার থেকে খরচের হুকুম পাঞ্জা সই করে নিয়ে যাবেন।”

নায়েব কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলেও বড়োকর্তার খেয়াল তার অজানা নয়, সে সরকার এবং গোমস্তাকে পাঠিয়ে দ্বিতীয় দিনেই অধিক মূল্যে শ্বেতপাথরের তৈরি পাঁচটি মূর্ত্তি সংগ্রহ করে এনে দিলে।

দেবেন্দ্রর আচরণে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য যে এসেচে, এইটা প্রায় প্রতিটি মানুষই নজর করেচে। মানুষটা হঠাৎ বড্ড খিটখিটে হয়ে পড়েছে। সেই দিন দেবেন্দ্রর দশ বৎসরের পুত্র নরেন খেলার ছলে একটা পাথরের বিড়ালের মুখে তার বাপের একটা লাল রঙের শিশি আর তুলি দখল করে, তা দিয়ে আঁকিবুকি কেটেচিল বলে দেবেন্দ্র তাকে সজোরে চপেটাঘাত করল। ফলস্বরূপ বালক কাঁদতে কাঁদতে উঠোনে পা ছড়িয়ে বসল। দেবেন্দ্র অধিক বয়সে পুত্রলাভের পর ইতিপূর্ব্বে কখনও তার ছেলেকে আঘাত করেনি, বরং বহু ক্ষেত্রেই সে বাপের প্রশ্রয় পেয়ে এসেচে, ফলে এই ব্যাপারটা সকলেই লক্ষ করল। দেবেন্দ্রনাথের মাতা ছেলেকে ডেকে কইল, “শোনো দেবু, তুমি নরেনের বাপ মানেই এই নয় যে, তুমি তাকে অন্যায় প্রহার করবে। তার দোষ, সে ছেলেমানুষি করেচে, কিন্তু সে-ও তো বাবা, বয়সেরই সঙ্গে মানানসই। সেইটে না বুঝলে চলবে কেন?”

দেবেন্দ্র অত্যন্ত লজ্জিত এবং বিমর্ষ হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে পর ঘটনাটা “মোটামুটি মিটে গেল। এমনিভাবে প্রায় দুই মাস আন্দাজ অতিবাহিত হয়েছে, হঠাৎ একদিন রাত্তিরে বিশুকে তলব করল দেবেন্দ্র। বিশু মানবচরিত্র বিশেষজ্ঞ না হলেও সে তার পরিমিত বুদ্ধি দিয়েই কর্তার চক্ষের দিকে তাকিয়ে বুঝল, সেই চোখ একটা চাপা উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করচে। ঘরে তেপায়ার উপরে রাখা রয়েচে নানাবিধ জিনিসপত্তর।

“এইখানে বোস বিশু।” বিশ্বন্তর কর্তার সামনে উপবেশন করার কথায় ইতস্তত করতে লাগল।

দেবেন্দ্র তার চোখে অভয়ের দৃষ্টিতে চেয়ে বললে, “বোস এখানে।”

বিশ্বম্ভর মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় বসে পড়ল সম্মুখে রাখা একখানা বেত্রনির্মিত কেদারায়। তার সামনে একটা পাত্রে রাখা রয়েচে হরেক আকৃতির ছুঁচ। একখানা ছুঁচ বোতলে রাখা আরক দ্বারা সিক্ত করে দেবেন্দ্র চাপাকণ্ঠে বললে, “শোন বিশু, ক-টা দিন খুব সতর্ক রইবি। খবর এসেচে, দখিনের মহিষকাটির জঙ্গলে নাকি বেশ কিছু দস্যু ধরনের মানুষ এসে লুকিয়ে রয়েচে। তাদের উদ্দেশ্য ঠিক কী তা জানিনে, কিন্তু আমি যে জিনিসটে আবিষ্কার করে ফেলেচি, সেইটা পাওয়াই তাদের উদ্দেশ্য বলে আমার মন বলচে। এই জিনিস তাদের হাতে পড়লে সর্ব্বনাশ হয়ে যাবে। তারা হয়তো ছিনিয়ে নিতে আসবে এই জিনিসটা।”

বিশ্বম্ভর তাকিয়ে দেখলে, দেবেন্দ্রর হাতে ধরা রয়েচে একখানা পেটমোটা কাচের বোতল। তার ভিতরে ফিকে নীলচে রঙের এক অদ্ভুত তরল।

“হাতটা এগিয়ে দে বিশু। তোকে একটা পরীক্ষা করব। কিছুমাত্র যাতনা হবে না, শরীরটে কেবল একটু শিউরে উঠবে। আমাকে ভরসা কর।”

বিশু ব্যাপার না হৃদয়ঙ্গম করলেও কাঁপা গলায় শুধোল, “ওখানা কীসের তরল, কৰ্ত্তা?”

“ওষুধ। একটা ওষুধ। এ ওষুধ লাগালে পরে শরীরে কোনও রোগ রয় না। শরীরে দুনো বল আসে। ডান হাতটা দে।”

বিশ্বম্ভর চিত্রার্পিতের ন্যায় নিজের হাত এগিয়ে দিল। তার সামান্য বুদ্ধিতেও সে বুঝল যে, কৰ্ত্তা ওই তরলের গুণ সম্বন্ধে কিছু একটা লুকিয়ে যাচ্চে। দেবেন্দ্র নিজের রসায়নে ছুঁচ ডুবিয়ে তার হাতে ফুটিয়ে দিলে। একবিন্দু রক্ত বেরুনোমাত্র বিশুর দেহটায় যেন আগুনের ন্যায় তপ্ত হয়ে শিহরন জাগল। হাতের আরও দুই-এক স্থানে ঔষধ বিদ্ধ করে দেবেন্দ্র কইল, “এখন তোর পাহারায় যা। পরপর তিন-চার দিন আমাকে এসে এসে বলে যাবি কেমন থাকিস। কোনও উপসর্গ দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ কইবি হতভাগা। আর হ্যাঁ, খুব সতর্ক থাকবি। তোর সড়কিই ভরসা। মনে থাকে যেন। যা এখন।” হতভম্ব বিশু লাঠি হাতে সেলাম ঠুকে দেউড়িতে চলে গেল।

সুরেন্দ্র অবাক হয়ে শুধোল, “বিশুর আবার কীসের উপসর্গ, দাদা?”

দেবেন্দ্র প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে কইল, “ওর হাতে একটা ওষুধ দিয়েচি।”

***

তিনটে দিন কেটে গিয়েচে। দেবেন্দ্র অধীর হয়ে দিনে দশবার করে বিশুর শরীরে কোনও অসোয়াস্তি হয়েছে কি না তা শুধোয়, কিন্তু বিশু অকপটে জানায় যে সামান্য শারীরিক বলবৃদ্ধি ব্যাতীত অপর কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। দেবেন্দ্র হতাশ হয়ে চিৎকার করে ওঠে, “ভুল, ভুল, নিশ্চয়ই কিছু একটা ভুল হয়েচে হিসেবে।” হতাশায়, ক্ষোভে উন্মত্ত হয়ে সে বিশুকে ডেকে বললে, “আমার হিসেবে কিছু ভুল ছিল হয়তো। যা হোক, তোকে এর জন্য ভুগতে হবে না। আমি ওই আরকের বিরোধী আরেকখানা আরক বানিয়েচি। কালকে আসিস ঘরে। ওইটি একবার দিতে হবে তোকে।” বিশু ভাবলে, কর্তার পাগলামি দেখা দিয়েচে নির্ঘাত। সে ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।

পঞ্চম রাত্রিতে দেবেন্দ্র নিজের একতলার কক্ষে বসে ছবি আঁকচে। বাইরের দেউড়িতে বৃদ্ধ দ্বারবান ভবাণীপ্রসাদ বসে নিদ্রা গিয়েচে। বিশুর আজ দিনের বেলায় প্রহরা ছিল। সে-ও নিজের ছোট্ট ঘরে ঘুমুচ্চে। দেবেন্দ্র ছবি আঁকতে আঁকতে হঠাৎ চমকে উঠল। কোথাও থেকে একটা তীব্র বুনো গন্ধ নাকে আসচে না? দেবেন্দ্র উঠে দাঁড়াল। পা টিপে টিপে দুয়ারের সামনে এসে বাইরের দিকে চোখ রাখতেই দেবেন্দ্র ভীষণ চমকে উঠল। ওটা কী!

একটা যেন বিকটদর্শন প্রকাণ্ড আকারের ছায়া উঠোনের দিক থেকে ঝড়ের বেগে খোলা ফটক দিয়ে বাইরে ছুটে বেরিয়ে গেল! ছায়ামূর্ত্তিটা কোনও কারণে যেন উঠোন অবধি ঢুকে এসেচিল, কিন্তু দেবেন্দ্রর উপস্থিতি টের পেয়েই সে পালিয়ে গিয়েচে। নিরস্ত্র দেবেন্দ্রর আবির্ভাবে সে ছুটে পালিয়েচে অথচ নিদ্রারত সশস্ত্র দ্বারপালের থাকা সত্ত্বেও সে বিন্দুমাত্র ডরায়নি। কিন্তু জন্তুটা বাড়িতে ঢুকেচিল কেন?

‘ভোর হতেই এর উত্তর পাওয়া গেল বড় মর্মান্তিকভাবে। বিশুর ঘরের দ্বার হাটের মতো উন্মুক্ত, বিছানার চাদর ছড়িয়ে রয়েচে মেঝেতে, খাটের পাশে চাপ চাপ রক্ত এখনও জমাট বাঁধেনি এবং খাটিয়া জনশূন্য। বিশুর সন্ধান নেই। বাইরে এসে চোখে পড়ল, ঘরের পিছনে খিড়কির দিকে যে খোঁয়াড় ছিল, সেইখানে দুখানা ছাগল ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে রয়েচে। ছাগল দুটোকে খাওয়া হয়নি, কেবল হত্যা করা হয়েছে। সকাল হতেই গাঁয়ে হইচই আরম্ভ হয়ে গেল। সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য বহু খবর কানে এল। দখিনের মহিষকাটির গভীর জঙ্গলে নাকি অসংখ্য মুশকো জোয়ান লোক ঘাঁটি নিয়েচে। ডাকাতের মতো তাদের চেহারা। খুব গোপনে তারা জঙ্গলে মশাল জ্বালে। গাঁয়ের কিছু লোক সাহস করে কিছু দূর গিয়ে ব্যাপার দেখে পালিয়ে এসেচে।

গোলমালের আশঙ্কায় জমিদারকেও জানায়নি। এরা কারা? বিশ্বম্ভরের মতো লেঠেল ঘরে থাকলে আক্রমণ করতে বেগ পেতে হবে, তাই কি বিশুকে আগে লোপাট করে দেওয়া হল?

এরপর কি জমিদার গৃহে আরও কোনও হামলা হতে পারে? এই ধরনের কথাবার্তা গাঁয়ের বাতাসে ভাসতে থাকল।

বুড়ো দারোয়ান কাঁপতে কাঁপতে মধুসূদন স্মরণ করে ভগবানকে ধন্যবাদ জানাল তার জীবনরক্ষার জন্য, বাড়ির পুরুষরা সকলেই বিশুকে সন্ধান করতে বেরুল, শুধুমাত্র দেবেন্দ্র শূন্যচক্ষে দাওয়ায় বসে রইল। তার মন জানে, বিশুকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তার একাগ্র সাধনার ফলাফল আর হাতে হাতে পরীক্ষা করা হল না। বিশুর কক্ষে রক্ত দেখার পর কিন্তু কারও মনেই তাকে জীবন্ত পাবার আর আশা ছিল না, তবুও বিকাল অবধি চতুৰ্দ্দিকে তল্লাশি করেও যখন সত্যিই কিছু পাওয়া গেল না, তখন গাঁয়ের পুরোহিত নগেন ভটচায্যি উঠোনের উৎসুক জনতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে বললে, “আমরা বাছা ছুঁড়তে তো কিছু বাকি রাখলেম না, কিন্তু কোথাও কোনও চিহ্ন অবধি নেই। সন্ধানে কোনও ফল দর্শাবে না তা কিন্তু বলতে নেই, আমি আগেই জানতুম। কেমন রে কেষ্টা, বল-না তা-ই, বলিনি আমি? ওসব কোনও পশুটণ্ডর কাজ নয়। ভয়ংকর কোনও প্রেতাত্মা ঢুকে পড়েচে তালুকে। একে জব্দ করার জন্য পূজা, যজ্ঞ করতে হবে। সেই সঙ্গে…”

দেবেন্দ্র সরকার মশায়ের দিকে চেয়ে কইল, “সরকার, মহলের চিলের ঘরে যে হাতি বাঁধার লোহাবেড়ি ছিল, সেগুলো আচে কি?”

ভট্টচায্যি কথা কইতে কইতে আচমকা এমন অসংলগ্ন কথা শুনে নিৰ্ব্বাক হয়ে গেল। মনে মনে কিছু ক্ষুণ্ণও হল। তার মানে এতক্ষণ দেবেন্দ্র কিছুই শোনেনি তার কথা। কিন্তু সরাসরি তো কর্ত্তাকে কিছু বলাও চলে না। সরকার মশায় হতভম্ব হয়ে বললে, “আজ্ঞা কৰ্ত্তা? লোহাবেড়ি?”

“হাঁ বাপু, তা-ই।”

“তা… আজ্ঞে কিছু আচে বইকি তোশাখানার ঘরে। এখন তো আর হাতি,… “ঘরে যত বল্লম আর সড়কি রয়েচে, সব ক-টা শান দিয়ে রাখুন। লোহাবেড়িগুলো উঠোনে পেতে মেরামত করুন, কিছু মশালের ব্যবস্থা করা চাই। আর হ্যাঁ, একখানা শক্তপোক্ত বড়ো খাঁচা বানাতে হবে। বেশ কিছু লোকজন নিয়ে আমি কালকে বেরুব।”

গাঁয়ের প্রজারা বিস্মিত হয়ে হাতজোড় করে বললে, “কর্তা কি মহিষকাটির বনে ঘাঁটি নেওয়া ডাকাতের মতো লোকগুলোরে ধরতে চাইচেন?”

দেবেন্দ্র তিক্ত স্বরে বলল, “মানুষ নয়, বাঘ ধরতে হবে।”

এইবার কেবল প্রজারাই নয়, ছোটো তরফ সুরেন্দ্রনাথ অবধি চমকে উঠে অবাক হয়ে বললে, “বাঘ? ইন্দ্রগড়ে বাঘ? রাতে বাঘ ঢুকেচিল? বিশুকে বাঘে নিয়েচে? কিন্তু আপনি বা ভবা বুড়ো তো বললেন….”

“আমি কিছুই বলচি না, সুরো। আমি শুধু বাঘবন্দির আয়োজনটুকু করে রাখতে চাই। আমার মন বলচে, গায়ে শিগগিরই বাঘ পড়বে।” – বিশু তার কর্তাকে পাগল ভেবেচিল ঠিকই, কিন্তু সুরেন্দ্রনাথ ভাবল না। সে তার দাদাকে বর্ণে-গন্ধে চেনে। দাদার মতো এমন অগাধ পাণ্ডিত্য খুব কম লোকেরই রয়। সে দেবেন্দ্রর ক্লিষ্ট মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে, তারপর জবাব দিল, “বেশ। তা-ই হবে। এখন সাঁঝ নেমে গেল, তাই। আমি কাল সকালেই জটাখালি আর নয়নগ্রামের লেঠেলদের খবর পাঠাচ্চি। তারা কাল বেলাবেলি এসে পড়বে’খন।”

দেবেন্দ্র একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে দুবার চাপড়ে স্নেহপূর্ণ সমর্থন জানিয়ে ঘরে প্রবেশ করল।

***

রাত হয়েচে। দেবেন্দ্র নীচতলার ঘরে বসে ছবি আঁকচে। তার মন বিষণ্ণ, কিন্তু অভ্যাসবশে হাত চলচে। সুরেন্দ্রনাথ বিলক্ষণ জানে যে, দাদা গভীর রাত্তির অবধি এই ঘরেই কাটায় একলা, তাই দাদার বকাঝকা সত্ত্বেও সে চারজন লেঠেলকে জোগাড় করে রাতে প্রহরায় রেখেচে ফটকে। তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠচে ছবির মাধুরী, যে বিখ্যাত মাধুরীতে ব্রিটিশ সাহেবরাও মুগ্ধ। আজ দেবেন্দ্রর চিত্ত উদ্ভ্রান্ত, হাত বিচলিত। তার মাথায় চলতে থাকা শিকারের পরিকল্পনা হাতের শিরা বেয়ে কাগজে সঞ্চালিত হয়ে চলেচে। ঘন জঙ্গলে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসচে একটা দীর্ঘদেহী ছায়ামূর্তি, তার হাতে ধনুক, পিঠে তৃণীর, যোদ্ধৃবেশ। বৃক্ষের শাখায় শাখায় পাখি বসে রয়েচে, আর গলায় তিরবিদ্ধ হয়ে মরে রয়েচে একখানা ছোটো হরিণশাবক। ছবিতে অনেকখানি রং করার পর দেবেন্দ্র লক্ষ করল, তার সবুজ রঙের পাত্রটি শূন্য। কিছুদিন পূর্ব্বেই রংটা শেষ হয়ে গিয়েচিল, কিন্তু এই তালেগোলে আর স্মরণ ছিল না।

ছবিটা আজকেই শেষ করতে হবে। ফস্টর সাহেব একখানা ভারতীয় ছবি চেয়েচিল ইংল্যান্ডে নিয়ে যাবে বলে। কালকে সেই ছবি দেবার কথা। দেবেন্দ্র একটা ঘাস কাটার ধারালো হাঁসুয়া আর শিশবাতি নিয়ে দোরে এসে দাঁড়াল। রঙের জন্য ঘাস যে কেউই কেটে দিতে পারে, কিন্তু তার এই বিখ্যাত ঝকঝকে রং তৈরির প্রণালীটি সে কাউকে দেখাতে চায় না। ঘর থেকে উঠোনে নেমে হাত পঞ্চাশ দূরে ডানদিকের প্রাচীরের নীচে কিছুটা জায়গায় সে নিজেই কিছু ঘাসের চাষ করেচে। তা থেকেই রং তৈরি হয়। দেবেন্দ্ৰ নীচু হয়ে একহাত পরিমাণ লম্বা ঘাসগুলিকে মুঠিতে ধরে কিছু কিছু করে কাটতে শুরু করল। এই ঘাস সিদ্ধ করে, নানান রসায়ন মিশ্রিত করে তৈরি হবে কাঁচা সবুজ তেলরং।

ঘাস পরিমাণমতো কাটা হলে পর দেবেন্দ্র যখন সবে উঠতে যাচ্চে, হঠাৎ কিছুটা দূরেই একটা চাপা হুটোপুটি আর আবছা ভয়ার্ত চিৎকার কানে এল। হাতের ঘাসগুলিকে ফেলে দিয়ে দ্রুতপদে ফটকের দিকে একটু এগোতেই দেবেন্দ্রর শরীর হিম হয়ে এল। সে নিজের বাম হাত দিয়ে চোখ ঢাকল। বাইরে তিন-চারটি জোয়ান মানুষের মৃতদেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে রয়েচে। এরা সুরেন্দ্রর নিয়োগ করা লাঠিয়াল। কোনও এক প্রচণ্ড বলশালী রাক্ষস যেন চোখের পলকে এত দ্রুত চারজনকে হত্যা করেচে যে, হতভাগ্যের দল সাহায্যার্থে তত বেশি আর্তনাদ অবধি করতে পারেনি। নরম পায়ে মাটিতে বসে পড়ে, লণ্ঠনটা রেখে আস্তে আস্তে চোখের থেকে হাত সরাতেই দেবেন্দ্র ভয়ে চমকে উঠে টের পেল, পিছনের দিক থেকে তার কাঁধের উপর এসে পড়েচে একখানা গুরুভার থাবা। আড়চক্ষে বোঝা যায়, সেই থাবার রং হলুদ-কালো ডোরা, তার আগায় বাঁকানো নখের সারি, বুনো দমবন্ধ করা গন্ধে শ্বাস নেওয়া দায়। বিপদ যখন শিয়রে এসে উপস্থিত হয়, তখন জৈবিক তাড়নাতেই প্রাণীর শরীরে বলসঞ্চার _ঘটে। ইষ্ট স্মরণ করে, মনে বেপরোয়া সাহস এনে পিছনে ঘুরতেই সজোরে মরণথাবা এসে পড়ল দেবেন্দ্রর বুকে। ধারালো নখ-চামড়া ভেদ করে ঢুকে পড়ল পাঁজরের কোলে। মরণাহত দেবেন্দ্র আকুল আর্তনাদ করে উঠে অবশিষ্ট শক্তি সঞ্চয় করে হাতে ধরা ঘাস কাটার হাঁসুয়াটা শরীরের সর্ব্বশক্তি দিয়ে বসিয়ে দিল বাঘের বিঁধে থাকা থাবার বাহুমূলে।

মানুষের মরণ চিৎকারের সঙ্গে বাঘের যন্ত্রণার আকাশ-ফাটানো গর্জনে প্রতিটি মানুষ হুড়মুড় করে নিদ্রা ভেঙে উঠে পড়ল। সুরেন্দ্রনাথ আর তার স্ত্রী হস্তদন্ত হয়ে দোতলার অলিন্দে এসে দেখ উঠোনে কেউ নেই! প্রাঙ্গণের থেকে ফটক অবধি টাটকা রক্তের ধারা বয়ে চলেচে আর ঠিক মধ্যস্থলে পড়ে রয়েচে একটা হাঁসুয়া, যেটা তার দাদার ঘরে থাকত! একটু চোখ ঘোরাতেই শিহরিত হয়ে সুরেন লক্ষ করল, ফটকের সুমুখে চারখানা ছিঁড়ে-ফেলা মৃতদেহ পড়ে রয়েচে। ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য নয়, কেবল হত্যার উদ্দেশ্যেই হত্যা করা। রায় বাড়ির প্রত্যেকেই সাহস করে কেউ সড়কি, কেউ বল্লম হাতে নীচে নেমে এল। দেবেন্দ্রর ঘরের দুয়োর খোলা, ঘর জনশূন্য। সকলেই প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে যখন বড়োকর্তাকে খুঁজে চলেচে, হঠাৎ দেবেন্দ্র সুরেন্দ্রর বৃদ্ধা মা গিরিবালা চিৎকার করে উঠল, “ওই, ওই যে আমার খোকা ওই ঘরে রয়েচে।”

সকলে তাকিয়ে দেখলে, দেবেন্দ্রর দ্বিতীয় শিল্পকক্ষ, যেখানে সে হরেক মূৰ্ত্তি তৈরি করে, সেই ঘরের দরজা খোলা। ভিতর থেকে শিশবাতির আলো খাবি খাচ্চে। সকলে পড়িমরি করে ছুটে ঘরে ঢুকেই আঁতকে উঠল। ঘরের মেঝে উষ্ণ রক্তে ভেসে যাচ্চে, ঘরে ছড়ানো-ছিটোনো রয়েচে দেবেন্দ্রর অসামান্য শিল্পকলার নমুনা, তার স্বহস্তনির্মিত অজস্র মূর্ত্তি, বিগ্রহ, মাটির তৈরি কালীমূৰ্ত্তি, তার চারপাশে পাথরের তৈরি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেবদেবীর প্রতিমা, আরও অসংখ্য শিল্পকর্ম। কটিদেশে বাঘছাল পরিহিত উগ্রচণ্ডা কালীমূর্ত্তির সুমুখে কাদামাটির স্তূপ, রঙের কৌটো, বুরুশ প্রভৃতি, আর মূর্ত্তির ঠিক পায়ের নিকটে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েচে মৃতপ্রায় দেবেন্দ্র। তার বুকের কোল বেয়ে ফিনকি দিয়ে তখনও শোণিতধারা বেরিয়ে আসচে, চোখে ঘোলাটে, অর্থশূন্য দৃষ্টি।

বৃদ্ধা গিরিবালা ডুকরে উঠে ছেলের বুকে আছড়ে পড়ল। কয়েকজন লোক দৌড়ে আরও আলো নিয়ে হাজির হল। গিরিবালা বুকের উপর পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকল, “দেবু… খোকা আমার… সোনা আমার … চোখ খোল বাপ আমার… এই তো আমি, তোর মা। কিচ্ছুটি হবে না তোর, খোকা। একটিবার চোখ খুলে তাকা, দেখ, কত লোক এসেচে। চোখ খোল খোকা। “ শুধু মানুষ নয়, চরাচরের প্রতিটি জীবের একমাত্র স্নেহস্থল তার মা। মায়ের স্পর্শ, মায়ের আঘ্রাণ সন্তান মৃত্যুর মুখে এসেও চিনতে পারে। মুমূর্ষু দেবেন্দ্র বিহু কষ্টে চোখের পাতা খুলে অন্ধের মতো বলে উঠল, “মা, আমি গো… মা… আমি গো… বাঘে সবাইকে খেয়ে ফেলবে…।”

তার পরমুহূর্ত্তেই দেবেন্দ্রর আহত শরীরটা একবার ভীষণভাবে কেঁপে উঠেই নিশ্চল হয়ে গেল। গিরিবালা চৈতন্য হারিয়ে ঢলে পড়ল। অসামান্য প্রতিভার অধিকারী একজন কৃতী পুরুষ তার ভয়ংকর মৃত্যুর দোরগোড়ায় এসে নিজের বুকচেরা অন্তিম মাতৃসম্বোধনের দ্বারা বুকের উপর পড়ে-থাকা জন্মদাত্রী আর শিয়রের নিকটে দাঁড়িয়ে-থাকা মহামায়া জগদ্ধাত্রীকে ভূষিত করে শেষনিশ্বাস পরিত্যাগ করল। সুরেন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার দাদার ছবির ঘরে ঢুকে খেয়াল করল, ঘরের একদম শেষ প্রান্তে একটা তেপায়ার উপর একটা তুলোট কাগজ পাথর চাপা দেওয়া রয়েচে। সামনে এগিয়ে গিয়ে সুরেন দেখল, রং দিয়ে সেই কাগজে দাদা একটা ছড়া লিখে রেখেচে। দাদার খামখেয়ালি স্বভাবের কথা কারও অবিদিত নয়। সুরেন কাগজটা তুলে পড়ে দেখল, তাতে লেখা রয়েচে—

‘মরিচ থাকে লংকাতে
রয়েচে সবাই শঙ্কাতে
বিঁধল যদি বেবাক যম
সোনার ছেলে ছাড়ল দম
কুড়ি মানুষ, এক ওজন,
বুঝবে কথা কোন সুজন?
বেহাত হলে সেই শ্বাপদ
ঘুচবে জেনো এই বিপদ
হাতে হাতে মিলবে ফল
গোড়ায় যদি ঢালবে জল।’

***

তিনটি দিন কেটেচে। দেবেন্দ্রর ফেলে যাওয়া ছবি, কাগজপত্তর, রঙের সরঞ্জামগুলো অস্তিম স্মৃতি হিসেবে তুলে রেখেচে সুরেনের স্ত্রী। গিরিবালা সেই যে শয্যা নিয়েচে, এখনও সেঁসুস্থ হয়নি। সুরেন্দ্রর মনে ক্রোধ, আতঙ্ক এবং কান্না একত্রে সহবাস করচে। বাড়ির তো বটেই, ইন্দ্রগড়ের এমন একটিও রায়ত নেই, যে বড়োকর্তাকে শ্রদ্ধা করত না। প্রত্যেকের মনে বিষাদের ছায়া পাথরের মতো চেপে বসেচে। স্নেহশীল পিতৃসম দাদার মুখাগ্নি করতে গিয়ে সুরেন অচেতন হয়ে পড়েছিল। তবুও জীবন একরকম না একরকমভাবে চলতেই থাকে। রায় পরিবারের ছন্দহীন রোজনামচাও চলতে থাকল। তৃতীয় দিন খোঁয়াড়ের পিছনে দেখা গেল, পাঁচখানা বিড়ালের মৃতদেহ পোঁতা রয়েচে। তাদের মধ্যে একটির মুণ্ডুতে সম্ভবত সিন্দুর লেপন করা। একজন পরিচারক বললে, সে বড়োকর্তাকে ওইখানে উবু হয়ে বসে কিছু পুঁততে দেখেচে। চতুর্থ দিনে আরেকটা ঘটনা ঘটল।

অপঘাতে মৃত দেবেন্দ্রনাথের পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম গতকাল খুব সামান্য আয়োজনে সম্পন্ন হয়ে গিয়েচে। সেই রাত্তিরে আন্দাজ আটটা নাগাদ সকলের রাতের আহার সম্পন্ন হলে পর, মা-কে চাট্টি সাবু খাইয়ে, সুরেন্দ্র নিজের শয়নকক্ষে এসে আসন পেতে ভ্রাতুষ্পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে সস্ত্রীক আহার করতে বসল। বাড়ির ঝি-চাকররাও কাজকর্ম সেরে যে যার ঘরে ঢুকে দোর দিলে। এই ক-দিন প্রাণহানির আশঙ্কায় দ্বারবানকে বাইরে প্রহরা দিতে নিষেধ করা হয়েচে। তখন হয়তো মধ্যরাত্রি হবে, হঠাৎ ফটকের দরজা ভাঙার প্রবল শব্দ এবং বুকের রক্ত-জল-করা গালবাদ্যের নিনাদে গোটা গাঁয়ের ঘুম ভেঙে গেল। গ্রামের লোক বুঝতে পারলে যে, রায় বাড়িতে ডাকাত পড়েচে, কিন্তু ও কী! ডাকাতের হা-রে-রে-রে-রে গালবাদ্যকে ছাপিয়ে আরও একটা ভীষণ গর্জন আসচে না?

বাঘের আওয়াজ। ভয়ানক ক্রুদ্ধ একটা বাঘের ডাক। অসুস্থ বৃদ্ধা সেই ডাক শুনে ফুঁসে উঠে টলমল শরীরে বাইরে বেরিয়ে আসার উপক্রম করেচিল, শুকো ঝিয়ের ঘুম ভেঙে যাওয়াতে সে বৃদ্ধাকে আটকে দেয়। নীচের ঘরের কোনও একটা দরজা ভাঙার মড়মড় শব্দ শুনে সুরেন্দ্রনাথ ঘরে রাখা বল্লমটা শুক্ত করে ধরে বন্ধ শয়নকক্ষের দোর খুলে দোতলার অলিন্দে বেরিয়ে এল। ডাকাতের দল দোতলার দোর ভাঙাাত্র একজনকে অন্তত বিধবে সে।

মেয়েদের এবং চাকরবাকরদের নিয়ে গিরিবালার কক্ষের একটা গোপন দ্বার দিয়ে সকলে বেরিয়ে পড়ল বাড়ির পিছনের ঝোপঝাড়ে ঘেরা জমিতে। কিন্তু কী অসম্ভব কথা। ডাকাতদলের সঙ্গে বাঘ এসেচে নাকি! পোষা বাঘ? এরা কারা? কেমন ডাকাত! বাঘকে দিয়ে নরহত্যা করিয়ে তারপর ডাকাতি করে? এই বল্লম দিয়ে বাঘকে কাবু করা যাবে?

আরও একটা দরজা ভাঙল নীচে। তারপর উপরের প্রতিটা ঘরের। ডাকাতরা যেন প্রতিটা আঙুল পরিমাণ স্থানও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করচে। কী খুঁজচে তারা? চূড়ান্ত উত্তেজনার মধ্যে নানান আশঙ্কার কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ সুরেন্দ্রনাথ বিস্মিত হয়ে বুঝতে পারলে যে, ডাকাতের দল এবং বাঘ চলে যাচ্ছে। অনেক দূরে মিলিয়ে যাচ্চে তার ক্রুদ্ধ গরগর শব্দ। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, গৃহকে অর্ধচন্দ্রাকার পরিবেষ্টন করে তারা ফিরে এল বাড়ির অন্দরে। পুরো বাড়িখানা যেন খণ্ডযুদ্ধ করে সন্ধান করেচে তারা। কী খুঁজচে ডাকাতের দল?

বাইরে উঠোনে বহু মানুষের নাগরা-পরা পায়ের ছাপ। সেই সঙ্গে একটা বাঘের পদচিহ্ন। সরকার মশায় লক্ষ করে কহল, “দেখুন দেখুন ছোটোকা, বাঘের পায়ের ছাপ তিনটে করে।”

সেইদিকে চেয়ে সকলেই সরকারের কথা স্বীকার করলে। বাঘটির সত্যিই যেন তিনটে পা। সামনের ডান পায়ের অস্তিত্ব পাওয়া গেল না থাবার চিহ্নে। একজন চাকর সাহস করে গাচের আবডালে থেকে উঁকি দিয়েচিল, সে জানাল, ডাকাতদের মধ্যে একজন মুশকো লোক হাতে একখানা কাচের না কীসের বোতল নিয়ে বেরিয়ে গেল। কয়েকজন ডাকাত আবার পিছনে ছাগলের খোঁয়াড়ের পাশের আস্তাকুঁড়ে বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কী যেন তল্লাশি করচিল।

ঘরের ভিতরে ঢুকে চোখে পড়ল, গোটা ঘর তছনছ করে গিয়েচে তস্কররা। দেওয়ালের ছবি, মানচিত্র সব ভূলুণ্ঠিত, চৌপায়ার উপরের সমস্ত ছবি আঁকার সরঞ্জাম মাটিতে গড়াচ্চে, কেদারা-তক্তা সব উলটে পড়ে রয়েচে। একখানা কাচের বোতল ভরতি তরল ভেঙে ছড়িয়ে রয়েচে। দ্বিতীয় ঘরে ঢুকে দেখা গেল আরও এক অদ্ভুত দৃশ্য। মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাথরের তৈরি এক-দেড় হাত প্রমাণ বিষ্ণু, কাৰ্ত্তিক, দুর্গা, লক্ষ্মী প্রভৃতি নানান দেবদেবীর মূৰ্ত্তি সব অগোছালোভাবে পড়ে রয়েচে, আর যে কালীমূর্ত্তির পায়ের কাচে দেবেন্দ্র শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেচিল, সেই মূর্ত্তির চারখানা হাত কেউ যেন নির্মমভাবে অস্ত্রাঘাতে ভেঙে চুরমার করে গিয়েচে। এমন ভীষণ অনাচারে সকলে শিউরে উঠল। নায়েব হরিশ্চন্দ্র মাথা নেড়ে কইল, “বড়ো আশ্চর্য কথা। ডাকাতরা যত নৃশংসই হোক, ভবানীর বিগ্রহকে তারা ডরিয়ে চলে। তাদের দ্বারা এমন কাজ কীভাবে সম্ভব? বড়োকর্তা কি ঠাকুরের হাতের মধ্যে কিছু নুকিয়ে রেখেচিলেন, যার সন্ধানে এই আক্রমণ? কী সেই জিনিস? কাচের বোতলে যদি কিছু থেকেও থাকে, তবে সেখানা তো তারা পেয়েই গিয়েচে। বিগ্রহের হাত ভাঙার কী দরকার হল?”

এরপর প্রায় মাসাধিককাল যাবৎ আশপাশের দশখানা গাঁয়ের বড়োলোকদের বাড়ি থেকে এইরকমই অদ্ভুত ডাকাতির খবর আসতে থাকল। ডাকাতরা সঙ্গে বাঘ নিয়ে আসায় কেউ বাধা দিতে পারেনি প্রাণভয়ে। ডাকাতরা বাড়ির সর্ব্বস্ব লুঠে নিয়ে গিয়েচে। গভর্নমেন্ট সাহেবরা এসে তদন্ত করেও কোনও সূত্র বের করতে পারল না। হঠাৎ করে কিন্তু একদিন বাঘের এবং ডাকাতের উপদ্রব আশ্চর্যজনকভাবে বন্ধ হয়ে গেল। বনে আশ্রয় নেওয়া সেই ডাকাতের দল অথবা সেই নরসংহারক ব্যাঘ্রের উপদ্রব আর দেখা গেল না।

***

ছয়টি বৎসর মধ্যে অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েচে। রায় বাড়ির হত্যাকাণ্ডের কথা প্রজাদের মধ্যে আর আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। গিরিবালাও ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে গিয়েচে। ওই ভয়ংকর স্মৃতির কথা হয়তো বা সকলেই ভুলে যেত, কিন্তু বিধির ইচ্ছে বোধহয় তা ছিল না। হপ্তা দুয়েক পূর্ব্বে ইন্দ্রগড়ের একেবারে দখিন-পুবের নদীপাড়ের জঙ্গলে এসে ঠাঁই নিল এক সাধু। বিরাট চেহারা, লম্বা শ্মশ্রু-গুল্ফের জট, ক্ষুরধার দৃষ্টি, পরনে রক্তবাস, মজবুত দু’খানি পা এবং একখানা হাত।

হ্যাঁ, একটাই হাত। কিন্তু অপর হাতখানি একনজর চাইলেই মনে হয় সেই হাতে যেন অসুরের শক্তি। সাধু প্রথমে আশ্রয় নিয়েচিল দক্ষিণের সেই মহিষকাটির বনে, কিন্তু পরে এই নদীর পাড়ে এসে ডেরা ফ্যালে। হঠাৎ দেখলে সাধু বলে মনে হয় না। যেন কোনও সৈনিক বা কুস্তিগির। গাঁয়ের অনেকেই সাধুর আগমনের খবর পেয়ে চাল-ডাল-ঘৃত দিয়ে সিধে দিয়ে গিয়েচে।

সংবাদ পেয়ে সুরেন্দ্রনাথ তার পরিবারকে নিয়ে এসে শাকসবজির সিধে চড়িয়ে গেল সাধুর থানে। প্রণাম করে ফেরার সময়ে সুরেনের স্ত্রী কুণ্ঠার স্বরে বললে, “যা-ই বলো তা-ই বলো, আমার কিন্তু বড়ো ভক্তি এল না বাবাকে দর্শন করে। হাসিটাও কেমন যেন রহস্যের। সাধুসজ্জনের চলনবলন হবে পবিত্তির, জলের মতো।”

সুরেন্দ্র একটু হেসে কইল, “হরেক সাধু হরেক বিভূতি। সব সাধুসন্নেসি কি আর এক হয়? ইনি হয়তো এমনই।”

উত্তরটা কিন্তু স্ত্রী-র মনের মতো হল না।

“সে তুমি যা-ই বলো, সাধু তো ঢের দেখেচি জীবনে। তাদের চোখ হয় মায়ায় ভরা। দেখলেই মন জুড়িয়ে আসে। কিন্তু এর চোখ তো তেমন নয়! ঠিক যেন, ঠিক যেন…।”

দেবেন্দ্রর ষোলো বৎসরের পুত্র আপন মনে বললে, “ঠিক যেন বাঘের মতো।”

কথাটা শুনে সকলেই চমকে উঠল।

***

রাত তখন মধ্য। ইন্দ্রগড়ের সাধুর নাম লোকে দিয়েচে হাতকাটা সাধু। সেই সাধু যজ্ঞের কুণ্ডের সামনে বসে আগুনে আহুতি দিয়ে কাউকে যেন ডাকচে। আয়…. আয়…. আয়… বলে একমুঠো ধুলোর মতো গুঁড়ো ছুড়ে দিল আগুনে। অনলশিখা লাফিয়ে উঠে আবার স্তিমিত হয়ে এল। আরক্ত, ক্রুদ্ধ চোখে হাতকাটা সাধু দাঁত কিড়মিড় করে চিৎকার করে উঠল, “বটে? এত সাহস তোদের? আমার ডাক অমান্য করিস? আসবিনে, তা-ই না? তবে এই নে “ সামনের তাম্রপাত্র হতে একখানা সুতো-প্যাঁচানো হাড়ের খণ্ড তুলে আগুনের শিখায় আঘাত করতেই যজ্ঞকুণ্ড থেকে মাথা তুলে দাঁড়াল সাতটি বিকটদর্শন দীর্ঘ নারীমূর্তি। তাদের চোখে অসন্তোষের চাহনি, দেহের ভঙ্গিতে চপলতা এবং ক্রোধ যুগপৎ প্রকট হচ্চে, এই অদ্ভুত নারীমূর্তিদের পানে একটিবার চেয়ে দেখলে চোখ ফেরাতে মন চায় না। মায়ের স্নেহ, প্রিয়ার প্রেম, সখার সখ্য কিংবা ক্রীড়াসঙ্গীর চপলতা যেন ফুটে বেরুচ্চে তাদের দেহের থেকে।

এঁরা হলেন চৌষট্টি যোগিনীর মধ্যে ভয়ংকর সাতজন যোগিনী। মহামায়ার বর্ণনায় মন্তরের মধ্যে যে উচ্চারণ করা হয়, “নমঃ দক্ষযজ্ঞঃ বিনাশিন্যৈ, মহাঘোরায়ৈঃ, যোগিনী কোটি পরিবৃতায়ৈঃ, ভদ্রকাল্যৈঃ ভগবত্যৈঃ দুর্গায়ৈ নমঃ” এই যোগিনীরা স্বয়ং শ্রীদুর্গাকে ঘিরে রাখেন। একাধারে পরমা প্রকৃতি, অপর পক্ষে মহাঘোরী, ভয়াল রূপের অধিকারিণী। এঁদের নাম ভালুকা, অঘোরা, জ্বালামুখী, বায়ুবেগা, বিকটাননা, নারসিংহী এবং কালরাত্রি। হাতকাটা সাধু ছয় বৎসর পূর্ব্বে দেবেন্দ্রর অতর্কিত, অভাবিত আঘাতে নিজের হাত খুইয়েচিল। সে তার ডাকাতের দলকে নিয়ে তছনছ করে ফেলেচিল জমিদারের ঘর। যে দুইটি বস্তুর সন্ধানে সে আক্রমণ করেচে, তার একটি পরম দ্রব্য তার করতলগত হয়েচিল তখনই, কিন্তু অপর একটি বস্তু তার চাই। চাইই চাই, নচেৎ সব পরিকল্পনা তার ভেস্তে যাবে। এই ছয়টি বৎসর সে সাক্ষাৎ নীল পৰ্ব্বত কামাখ্যা থেকে অসংখ্য তন্ত্র শিখে এসেচে। আজ সে বিরাট শক্তির অধিকারী। দেবেন্দ্র অদ্ভুত এক রসায়ন আবিষ্কার করেচিল। ভীষণ আশ্চর্য তার দ্রব্যগুণ। সেই আরক ছিনিয়ে নিয়ে এসেচে সে, কিন্তু… অপর জিনিসটি তার চাই।

যোগিনীর আবির্ভাব লক্ষ করে সাধু বুকে হাত ছোঁয়াল। তার পূর্ব্বের সেই উদগ্র ভাব সম্পূর্ণ তিরোহিত। গম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করল, ওঁ সিংহস্থঃ শশিশেখরাঃ মরকতপ্রেক্ষাঃ, চতুঃভিভুজৈঃ শঙ্খং চক্রং ধনুঃ শরায়ঞ্চ, দধত্রৈস্ত্রিভিঃ শোভিতা, অমুক্তাঙ্গদ হার কঙ্কণা, কাঞ্চনকঙ্কণন রণন নুপুরাঃ, শ্রীদুর্গা দুর্গতিহারিণী ভবতুভরত্নঃ উল্লাসৎ কুণ্ডলাঃ।

দেবীর বন্দনা শ্রবণ করে যোগিনীগণ প্রসন্ন হলেন। সাধু বাম হাত আবার বুকে ছুঁয়ে কইল, “হে যোগিনীগণ, আপনাদের আহ্বান করার ধৃষ্টতা মাপ করুন। আমি যে জিনিসের সন্ধানে লিপ্ত রয়েচি, তা আপনাদের অজ্ঞাত নয়। যোগিনীর অজানা কিছু নেই। শুধু এইটুকু জানতে চাই, আমার অভীষ্ট বস্তু কি এখনও রায় বাড়িতেই রয়েচে? থাকলে কোথায় রয়েচে? যদি থাকে, তবে আমি ঠিক তাকে খুঁজে নেব। দয়া করে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।”

যোগিনীগণ পরস্পরের মুখ চেয়ে একসঙ্গে চক্ষু মুদ্রিত করলে। বেশ কিছু সময় এভাবে থাকার পর যখন তারা চোখ উন্মীলিত করল, তখন সাধু অবাক হয়ে দেখল, তাদের ওষ্ঠাধরে একচিলতে যেন হাসি লেগে রয়েচে। সাধু শুধোল, “হে যোগিনীঃ, হে মহামায়া কাৰ্য্যসাধিকেঃ, আমার অভীষ্ট কি তবে গৃহেই রয়েচে?”

সাত ভয়ংকরী একযোগে কথা বললে, “আচে। যে শক্তির সন্ধানে তুই ঘুরে মরছিস, তা ওই ভদ্রাসনেই লুকোনো আচে। কিন্তু কোন সে এমন স্থান জানি না, আমরা তাকে চোখে দেখতে পাচ্চি না। কোনও একটা কালো ছায়া এসে বারংবার দৃষ্টিপথ রোধ করচে। আমরা সপ্তযোগিনী একত্রে প্রচেষ্টা করেও তার অবস্থান দেখতে পাইনি, এমনই তার তেজ। ত্রিভুবনের, বিশ্বসংসারের কোনও কিছু আমাদের অজানা নয়, কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে ওই বস্তুর মধ্যে এমন ভয়াবহ তেজ জন্ম নিয়েচে, যা তার অবস্থিতিকে আড়াল করে চলেচে।”

হাতকাটা সাধু ক্ষোভে নিজের ওষ্ঠ দংশন করে চাপাস্বরে শুধোল, “আমি কি সেই বস্তু হাতে পাব? আমি কি সেই শক্তি করায়ত্ত করতে পারব?”

সাত যোগিনী এইবার অট্টহাসি হেসে উঠল। রমণীর হাসি নয়। কোনও ভয়ংকর প্রেতযোনি যেন প্রবল আকুলতায় হেসে চলেচে। সেই হাসি শুনে যে-কোনও মানুষ মূর্ছা যায়, কিন্তু এই ক-বছরে সাধু অনেকরকম দেখেচে শুনেচে, তাই সে বিচলিত হলেও প্রকাশ করলে না। পাশের কটাহ থেকে শীতল দুগ্ধ আঁগুনে ঢেলে দেওয়ামাত্র যোগিনীরা বিলীন হয়ে গেল। সাধুর মন উৎফুল্ল। যদি রায় বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে কিছু থেকে থাকে, তবে তা হাসিল করা তত কঠিন হবে না। কিন্তু তাকে দেখা গেল না কেন? কী এমন আড়ালে রয়েচে সে? আচমকা লুঠপাট করে ঢুকতে গেলে হয়তো বিপদ হতে পারে। দেবেন্দ্র রায় শত্রুর হলেও অনেক বিদ্যায় বিদ্বান। সে হতভাগা হয়তো এমন কিছু কারসাজি করে রেখেচে, যাতে তাকে দখল করতে আসা লোকটার ক্ষতি হতে পারে। সাবধানে এগোতে হবে। সবার প্রথমে দরকার জমিদার বাড়ি সম্পূর্ণ খালি করে দেওয়া। শূন্যগৃহে সে যখন ইচ্ছা সন্ধান করতে পারবে। রায় পরিবারের সব ক-টি মানুষকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিলে কেমন হয়?

নাহ্। তাহলে চিরকালের মতো তার কাঙ্ক্ষিত দ্রব্য হারিয়ে যেতে পারে। হাতকাটা সাধুর কুটিল চিত্তে রায় বাড়িকে প্রাণীশূন্য করানোর মতলবই স্থির রইল। অতি গভীর রাতে জমিদার গৃহের উঠোনে প্রবেশ করে একেবারে বামে প্রাচীরের গায়ে একটা স্থানে শুকনো মরা ঘাসের জঙ্গল হয়ে রয়েচে। সেই মৃত তৃণগুচ্চের ফাঁকে একখানা হলুদগাছের চারা পুঁতে দিল সাধু। উঠোনের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে চিমটা দিয়ে মাটি খুঁড়ে পুঁতে দিল একটা সুতো এবং শাঁখা-নোয়া-বাঁধা মানুষের হাড়। বাইরে বেরিয়ে ঝুলি থেকে বের করল একটা মরা হাঁড়িচাচা পাখি। কিছুক্ষণ মন্তর পড়ে সেটার গায়ে ফুৎকার দেওয়ামাত্র পাখিটা ঘোলাটে মৃত চক্ষু মেলে চাইল। পাখিটার কানে কানে কী সব বলে, তাকে উড়িয়ে দেওয়ামাত্র সেই মৃত কাঠ হয়ে-যাওয়া পাখি উড়ে গিয়ে বসল রায় বাড়ির বাইরে হাত পঁচিশ দূরের একটা ছাতিম গাছে, এবং তার ছোটো দেহ মিলিয়ে গেল পাতার আড়ালে। পরিতৃপ্ত মুখে সাধু বাইরে চলে গেল। বাইরে এসে নিজের চিমটা দিয়ে গোটা বাড়িটার চৌহদ্দি জুড়ে মাটি খুঁড়ে একটা বলয় বাঁধন তৈরি করলে। এই বাঁধন তার এই গৃহে প্রবেশের পথ প্রশস্ত করতে সহায়ক। যদিও এর আগেও সে বিনা বাধায় এ বাড়িতে আক্রমণ করেচে, কিন্তু যোগিনীর কথায় তার মনে কিঞ্চিৎ ধন্দ উপস্থিত হয়েচে। সত্যিই যদি কোনও তেজোময় শক্তি এই বাড়িকে রক্ষা করতে চায়, তবে এই গণ্ডি তার প্রভাব প্রশমিত করবে।

পরদিন পুরো গণ্ডিটা দৃশ্যমান না হলেও ফটকের সামনে মাটি খোঁড়া দেখে চাকররা তা বুজিয়ে দিয়েচিল, কিন্তু পরের দিন প্রভাতেই আবার কে গণ্ডি কেটে গেল। একদিন দেখা গেল মূল ফটকের অত ভারী লোহার দ্বারখানা অদৃশ্য। দুই-তিন দিন পরে, তখন খাওয়াদাওয়া সদ্য সমাপ্ত হয়েচে, বাড়ির চাকর চিনিবাস এঁটোকাঁটা নিয়ে বাইরে ফেলতে বেরিয়েচে, হঠাৎ ভীষণ বাঘের গর্জনে গোটা তল্লাট কেঁপে উঠল। সেই সঙ্গে চিনিবাসের মরণ আর্তনাদ। তাকে মুখে করে নিয়ে বাঘ চলে গেল। পরদিনই চিনিবাসের আঁচড়ানো-কামড়ানো মৃতদেহ পাওয়া গেল নদীর পাড়ে। শুধু তা-ই নয়, দিনের বেলায় বাঘের পাত্তা থাকে না বটে, কিন্তু আঁধার হলেই কোথা হতে একটা বাঘ এসে বাড়ির চতুর্দ্দিকে ঘুরে ঘুরে ডাকতে থাকে। কখনও দোতলার উপরে অবধি উঠে এসে দুয়ার আঁচড়ায়। বাঘের ডাক শুনে শুনে বাড়ির এবং আশপাশের লোকের পাগল হয়ে ওঠার উপক্রম হল। বাড়িতে মালখানায় দুখানা বন্দুক রয়েচে, তার কার্যকারিতা পরীক্ষার মুখাপেক্ষী, কিন্তু সেই ঘরের চাবি থাকে নায়েবমশায়ের কাছে। তিনি বর্তমানে ইন্দ্রগড়ে উপস্থিত নেই।

বেশ কয়েকদিন বাঘের ডাক বন্ধ রইল। উপদ্রব কমেচে ভেবে যেই কেউ বাইরে বেরুল, অমনি তার আর্তনাদ জানিয়ে দেয় যে ঘরে বাঘ পড়েছে। এইভাবে প্রাণহানি এবং নিরাপত্তাহীনতার দোলাচলে বহু দিন বহু রাত বিনিদ্র যাপন করার পর সুরেন্দ্রনাথ সত্যিই ঠিক করলে যে, এই বাড়ি ছেড়ে দিয়ে কলকাতা চলে যাবে। সেখানে বাঘ ঘেঁষতে পারবে না। কেবল বৃদ্ধা গিরিবালা এই কথা শুনে নিশ্চুপ হয়ে রইল। সুরেন্দ্রনাথ মায়ের মনের অবস্থা যে বুঝল না তা নয়, কিন্তু আর গত্যন্তর কি আছে?

আরও প্রায় দুই হপ্তা অতিবাহিত হয়েছে। রায় বাড়ির মানুষরা এখন দিনে ঘুমোয়, রাতে জাগে। কাজকর্ম, বিষয়-আশয় সব পাটে উঠতে বসেছে। এইরকম এক ভোররাত্তিরের কথা। আকাশে কৃষ্ণ ত্রয়োদশীর ক্ষীণ চাঁদ ডুবে এসেচে। ভোরের ঠিক আগের নিকষ আঁধারে ডুবে রয়েচে চরাচর। অনেক রাত অবধি জাগার পর বাঘের উপস্থিতি নেই বুঝে সকলে নিদ্রা গিয়েচে, এমন সময়ে বাঘ এসে দাঁড়াল বাড়ির উঠোনে। গোটা বাড়িটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে মিশে রয়েচে। শুধু বাঘের ভয়ে সদরের সামনে আর একতলা-দোতলায় কয়েকখানা বড়ো তেলের বাতি জ্বলছে। তাতে প্রাঙ্গণে কিছু আলো পড়লেও আনাচকানাচে অন্ধকার ঘাপটি মেরে লুকিয়ে রয়েচে। সেই তিনপেয়ে বাঘ উঠোনের থেকে দেউড়িতে উঠে এসে দাঁড়াল। গর্জন করলে ভয় দেখানো ছাড়া অপর কোনও লাভ নেই। বাঘ দোতলায় সুরেন্দ্রর ঘরের সামনে এসে চারদিকে তাকিয়ে অবিকল দ্বারপাল ভবানীর কণ্ঠে ডেকে উঠল, “বাবু… বড়ো ‘বিপদ, বাবু… দোর খুলুন।”

সুরেন্দ্র নিদ্রাতুরভাবে সে ডাক আবছা শুনতে পেল।

***

বৃদ্ধা গিরিবালা রাতে নিদ্রা যায়নি। তার স্বামীর গড়া এত সাধের ভদ্রাসন এইবার শেষে ত্যাগ করে চলে যেতে হবে? এই বয়সে ভিটের টান কাটিয়ে, স্বামী, বড়োখোকার টান কাটিয়ে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে? একটা অসহায় ক্ষোভে বৃদ্ধার চক্ষু থেকে অঝোরে তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকল। নিজের অক্ষমতা নিয়ে বুড়ি যখন হাহাকার করচে, এমন সময়ে খুব আবছাভাবে যেন বুড়ো ভবানীর গলা শোনা গেল। ভবানী অত্যন্ত সতর্ক গলায় ছোটোখোকার দোরে দাঁড়িয়ে ডাকচে। বৃদ্ধা শয্যা ছেড়ে উঠে বসলে। আড়চক্ষু মেলে দেখল, তার প্রহরায় নিযুক্ত থাকা শুকো ঝি অঘোরে ঘুমুচ্চে। ভবানীর কি কোনও বিপদ হয়েচে? কিন্তু সেই সঙ্গে একটা বুনো গন্ধ আসচে না? বুড়ি অলিন্দের দিকের জানালার খড়খড়ি একটু ফাঁক করে চোখ রাখল।

আকাশে ফিকে আলো ধরেচে, আর সেই আবছা আলোতে একটা বিরাট বাঘ সুরেনের দ্বারের সামনে তিন পায়ে ভর দিয়ে চাপা সুরে অবিকল ভবানীর গলায় তাকে ডাকচে। তার উদ্দেশ্য বুঝতে বুড়ির বাকি রইল না। খড়খড়ি ফেলে একবার নিদ্রামগ্ন ঝিয়ের দিকে নজর করে, বৃদ্ধা এসে দাঁড়াল ঘরের বহু প্রাচীন কাঠের আলমারির কাচে। অতি সন্তর্পণে পান্না খুলে বের করে আনল একটা চিটচিটে শতজীর্ণ কাপড়ের থলি। সেই থলি, যেটা মাত্র সম্বল করে বালিকা গিরিবালা গাঁ ছেড়েচিলি।

থলিতে দ্রুতগতিতে হাত বাড়িয়ে বের করে আনল একটা অদ্ভুত ধাতুর তৈরি দণ্ড। দৈর্ঘ্যে বড়োজোর একহাত পরিমাণ, তার দুইদিকে পেতলের হাতল, গায়ে তিন-চারটি ধাতুর সরু সুতো। সেই সঙ্গে কয়েকখানা ছুঁচোলো ধাতুনির্মিত অঙ্গুলিপ্রমাণ বস্তু। এই অস্ত্রের নাম ডুন্ডুরি। পেটারি জাতির শিকারের মূল সহায়। এসব যেন বহু যুগ আগের কথা। যেন আগের জন্ম। গিরিবালা দুর্ধর্ষ শিকারি উপজাতি পেটারির মেয়ে। শিকার তার জীবনে নেহাত নতুন নয়। খোকার বাপকেও বাঘের হাত থেকে বাঁচিয়েচিল সেইবার পাহাড়ে। আজ খোকাকে বাঁচাতে হবে। হাতে সময় নেই।

গিরিবালা ডান হাতে শক্তভাবে ডুন্ডুরির হাতল ধরে খুব আস্তে দোর খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ফিকে আলো রয়েচে বটে, কিন্তু সুরেন্দ্রর ঘরের দুয়ারের সামনেটা আলো-আঁধারি। তাতে উজ্জ্বল হলুদ রঙের দেহটা আবছায়ার মতো বোঝা যাচ্চে। গিরিবালা বাম হাতের সরু ধাতব বস্তুটা ডুন্ডুরির প্রথম সুতোয় রেখে শীর্ণ অশক্ত হাতে টান দিল। এত বৎসরেও অস্ত্র তার ধর্ম ভোলেনি। ডুন্ডুরির কোমরের কাছটা ঝুঁকে এল অস্ত্রধারীর দিকে। কী প্রচণ্ড টান তার। দুর্ব্বল চোখে বাঘের দেহটা ঠাহর করে নিশানা করল পেটারি দলপতির মেয়ে গিরি। তার শরীরে যেন পূর্ব্বের সেই বল ফিরে এসেচে। ধাতুর শস্ত্রক্ষেপণের ঠিক আগের মুহুর্ত্তে হঠাৎ দোরের কাছে শুকো ঝিয়ের ভয়ার্ত গলা পাওয়া গেল, “এ কী করচেন মা!”

পলকের মধ্যে গিরিবালা তার হস্তধৃত মারণাস্ত্র নিক্ষেপ করল। ঝিয়ের স্বরে চমকে উঠে হিংস্র ব্যাঘ্র চকিতে ঘুরে তাকিয়েচিল। ব্যাপার বুঝে সে ভীষণ জোরে গর্জন করে লাফিয়ে উঠল। প্রাণঘাতী অস্ত্র বাঘের কণ্ঠনালির দুই আঙুল নীচ দিয়ে বিদ্যুৎবেগে ছুটে গিয়ে দরজার পাশের চুনসুরকির দেওয়ালে গিয়ে সবেগে গেঁথে গেল। বাঘ গিরিবালার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে এগিয়ে আসতে শুরু করল। বৃদ্ধা গিরিবালা স্থিরদৃষ্টিতে তার চোখে চোখ রেখে ডুন্ডুরির নীচের হাতলে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বের করে আনল একটা আধ হাত পরিমাণ ছোরা। বাঁ হাতে অস্ত্রের বাকি অংশ ছুড়ে ফেলে দিয়ে ছোরাটা বাগিয়ে ধরে আক্রমণের প্রতীক্ষা করচে সে। আজ তার খোকার খুনি তার সামনে। নিজের জীবনে বিশেষ কিছু আর বাকি নেই তার।

প্রবল গর্জনে সুরেন্দ্রর ঘুম ছুটে গিয়েচিল। জানালা দিয়ে মায়ের এই অবস্থা দেখে দরজা খুলে সড়কি হাতে বেরিয়ে এল সে। বাঘ একবার সেইদিকে ঘুরে তাকানোমাত্র গিরিবালা আরও দুই পা এগিয়ে গেল বাঘের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে আবার গর্জন করে সেই নরখাদক অগ্রসর হল বুড়ির দিকে। যখন তফাত আর মাত্র হাত দশেক, বাঘ দুই পা পিচিয়ে নিল শরীরটা, ভয়ানক বেগে লাফ দেবার জন্য। এই তীব্র ধাক্কা বৃদ্ধা তার দুর্ব্বল দেহে কিছুতেই রুখতে পারবে না, ফলে ছোরা চালানোর সময় সে কিছুতেই পাবে না। সুরেন্দ্র আর উপায় নেই দেখে সড়কির ফলা বাগিয়ে দৌড়ে এল বাঘের দিকে আর কুটিল শয়তান প্রচণ্ড গতিতে লাফ দিল গিরির গলা লক্ষ্য করে, কিন্তু গলা পর্যন্ত পৌঁচোনোর আগেই যেন বিদ্যুতের তীব্র আঘাতে দোতলার থেকে একেবারে একতলার উঠোনে এসে আছড়ে পড়ল বাঘ। ভীষণ বেদনায় তার বাঘের রূপ তিরোহিত হয়ে হাতকাটা সাধুর আসল রূপ ফিরে এসেচে। বাইরে তার আঁকা মাটির গণ্ডিতে হঠাৎ আগুন লেগে গিয়েচে, সেই আগুন পারিজাতের মাল্যের ন্যায় গোটা বসতবাড়ির চারদিকে ব্যাপ্ত হয়েচে। ফটকের কাছে কিছু লোকজনকে দেখা যাচ্চে। কে একজন ফটকের মুখে মাটিতে বসে রয়েচে। সাধু একটুও বিলম্ব না করে এক হাতেই প্রাচীর লঙ্ঘন করে ওপারে পালিয়ে গেল। গিরিবালা কাঁপা গলায় চিৎকার করে উঠল, “কে দাঁড়ায় ফটকে? কে ও?”

“আমি গিন্নি মা। হরি নায়েব।”

“নায়েবমশায়? ফটকে বসে কে?”

শান্ত স্বরে জবাব এল – “ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দিঘড়া গাঁ।”

***

নায়েবের মুখে সমস্ত কথা শুনে হংসী তান্ত্রিক কয়েচিল, “আমার পক্ষে এখন আশ্রম ত্যাগ করা সম্ভবপর নয়, কিন্তু তোমাদের এই বিপদে বিমুখ থাকলেও যে পাপ হয়। তাই আমি কালীপদকে তোমাদের সঙ্গে পাঠাব। ও আমার শিষ্য। শিক্ষা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি বটে, তবে কিছুটা তো শিখেচেই। দেখা যাক, কতদূর কী করতে পারে।”

নায়েব কিন্তু এই ব্যবস্থায় তত সন্তুষ্ট হল না। সে বললে, “কিন্তু এ তো নিতান্তই অল্পবয়সি গো ঠাকুর। এর দ্বারা…”

হংসী মৃদু হেসে প্রত্যুত্তরে বললে, “বিশ্বামিত্র মুনির সঙ্গে রাক্ষস মারতে কিন্তু মহাবীর দশরথ যাননি। গিয়েচিলেন বালক রামচন্দ্র। বিশ্বামিত্র কিন্তু তাঁর বয়স দেখে শক্তি বিচার করেননি। আপনি একে নিয়ে যান। আমার মন বলচে, ও ঠিক পারবে। ওর বুদ্ধি বড়ো ধীর, মেধা বড়ো তীক্ষ্ণ। হলে ওর দ্বারাই হবে।”

ভুবন ও গুরুদেবের বাক্যকে সমর্থন করল একবাক্যে। অতঃপর দ্বিধাবিভক্ত চিত্তেই নায়েব হরিশ্চন্দ্র কালীপদকে নিয়ে রওয়ানা দিল দীর্ঘ পথের উদ্দেশে। গাড়িতে ওঠার মুখে কালীপদ যখন গুরুর সুমুখে হাতজোড় করে দাঁড়াল, হংসী প্রশান্ত মুখে হেসে বললে, “শোন হতভাগা, যখন দেখবি মন্ত্র, তন্ত্র, বুদ্ধি, বিদ্যা, জ্ঞান, মন কিছুতেই কিছু উপায় বেরুচ্চে না, তখন অসন্দিগ্ধচিত্তে ভবানীর পায়ে নিজেকে সমর্পণ করে দিবি। সব জ্ঞানবুদ্ধি শেষমেশ ওই রাক্কুসির পায়ে গিয়েই মিলিয়ে যায়…” এই বলে হোঃ হোঃ করে হেসে উঠে, নায়েবের ভেট-দেওয়া ফলগুলি গাড়িতে তুলে দিল। গাড়োয়ান ঘোড়াকে চাবুক হাঁকাল।

গাড়ি পথিমধ্যে কেবল কয়েকবার নিজেদের এবং ঘোড়ার খাওয়ার জন্য থেমেচে। একদিন বাদ দিয়ে পরদিবসে ঠিক ব্রাহ্মমুহূর্ত্তে গাড়ি প্রবেশ করল ইন্দ্রগড়ের সীমানায়। গাড়ি যখন জমিদার গৃহ হতে আর মাত্র কয়েক রশি তফাতে রয়েচে, হঠাৎ গাড়ির সামনে দিয়ে একখানা সাপ পথ কেটে গেল, আর ঘোড়াগুলি একসঙ্গে থমকে দাঁড়াল। হাজার চাবুকেও আর নড়ে না, কেবল গলার মধ্যে একটা অদ্ভুত শব্দ শুরু করল। দীনদয়াল বিরক্ত হয়ে শুধোল, “তোমার ঘোড়ার আবার হল কী?”

গাড়োয়ান জবাব দিলে, “আজ্ঞা, ঘোড়ার ঘ্রাণ খুব আঁট। নিশ্চয়ই সাপটাকে লক্ষ করেচে অথবা গন্ধ পেয়েচে তারা। তাই…”

দীনদয়াল অবাক হয়ে বললে, “সাপ? কোথা?”

“আজ্ঞে, এখুনি পথ কাটল। আপনারা ভিতর থেকে ঠাহর পাননি।”

কালীপদ একলাফে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। নায়েব হাঁ হাঁ করে কইল, “ঠাকুর, এখনও কিছু পথ বিলম্ব রয়েচে। হাঁটবেন কেন? সাপ চলে গেলেই ঘোড়ারা ঠিক চলবে।”

কালী নিজের পোঁটলাটা কাঁধে ফেলে উত্তর করল, “শিগগির নেমে পড়ুন নায়েবমশায়। যত শীঘ্র সম্ভব পা চালান। ঘোড়ারা সাপের গন্ধে দাঁড়ায়নি।”

“মানে? তবে কীসের জন্য…”

কালীপদ উত্তেজিত অথচ চাপাস্বরে বললে, “আমি সোঁদরবনের ছেলে। গন্ধ চিনি। সম্ভবত কাছেপিঠে বাঘ পড়েছে।”

নায়েব, মুনশি, মায় গাড়োয়ান অবধি পড়িমরি করে পা চালিয়ে রায় বাড়ির সামনে পৌঁছোনোর একটু আগেই বাঘের ভয়াল গর্জন রাতের নৈঃশব্দ্য চুরমার করে দিল। সকলে দৌড়োতে আরম্ভ করল। ছুটতে ছুটতেই কালীপদ চকিতে একবার থমকে গিয়ে উপরের দিকে কী যেন দেখল, তারপরেই আবার দৌড়োতে শুরু করল। ফটকে পৌঁছেই এক ভয়ংকর দৃশ্য চোখে পড়ল। দোতলায় আবছা আলোতে গিন্নি মা কী একটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, দক্ষিণের ঘরের দুয়ারে লাঠি না কী হাতে দাঁড়িয়ে আছে ছোটোকৰ্ত্তা, আর তাদের মধ্যে… তাদের ঠিক মাঝখানে কিছু একটা রয়েচে, যার উচ্চতা কিছুটা কম, তাকে অলিন্দের প্রাচীরের জন্য দেখা যাচ্চে না। কালীপদ ফটকে পা রেখেই চমকে উঠে বললে, “এঃ, এ যে বাঁধন কাটা রয়েছে।”

নায়েব আশ্চর্য হয়ে শুধোল, “তা-ই তো, ও কীসের গণ্ডি?”

কালী মুখ না তুলেই বললে, “গণ্ডি নয়, বাঘদণ্ডি…”

বলেই নীচু হয়ে একবার গন্ধ শুঁকে, ফিশফিশ করে কী একটা মন্তর পড়ে নিজের তর্জনীটা দাগের গায়ে ছুঁয়েই লাফ দিয়ে সরে গেল আর পলকের মধ্যে বাড়ির চারদিকে দেওয়া বন্ধনীতে দপ করে আগুন লেগে গেল। সেদিকে বাকিরা অবাক হয়ে তাকানোমাত্র উঠোনে একটা ভারী জিনিস পতনের শব্দ হল। সভয়ে সেদিকে তাকিয়ে চোখে পড়ল, একটা মানুষের মতো ছায়ামূৰ্ত্তি যেন বাঘের ক্ষিপ্রতায় প্রাচীর টপকে ওদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

গাড়োয়ান চলে গেল দাঁড়িয়ে-থাকা জুড়িগাড়িটা আনতে। বয়স্থ নায়েবমশায় এতটা পথ দৌড়ে শ্রান্ত এবং হতবুদ্ধি হয়ে কালীপদর দিকে চাইল। তার হাত দুটো আপনিই জোড় হয়ে এল। হংসী তান্ত্রিক একবর্ণও অসত্য বলেননি। তিনি অপাত্রে বিদ্যা দান করেননি। আশ্চর্য হয়ে হরিশ্চন্দ্র নিজের মনে ভাবলে, যাঁর শিষ্যই এতখানি, তিনি স্বয়ং কতখানি?

***

সকলের মনই নিরানন্দ, তবুও বামুনঠাকুর এসেচে শুনে সুরেন্দ্রর স্ত্রী পেতলের পাত্রে পা ধোয়ার জল আর রেকাবিতে চারটি মিষ্টান্ন নিয়ে কালীপদর সামনে রাখল। কালী সেইদিকে চেয়ে কইল, “এসব পরে হবে মা জননী, তার আগে একটা কাজ রয়েচে। আসার পথে একটা কিছু যেন খেয়াল করলুম। সেইখানে একবার যেতে হচ্চে।”

আট-দশজন পুরুষ মিলে চলতে চলতে একখানা গাছের নীচে এসে স্থির হল। এখান থেকে রায় বাড়ির দূরত্ব বড়োজোর হাত পঁচিশ-ত্রিশ

কালীপদ জলের গেলাসটা হাতে করে নিয়ে এসেচে। সেই জল মাটিতে ঢেলে, কাদা করে একটা কাঠি তুলে সেইখানে কী সব আঁকিবুকি এবং একটা সিংহের মতো মুখ এঁকে মন্ত্রোচ্চারণ করতে শুরু করল,

“ওঁ শ্রী ঔস্মং বীরাং মহাবিষ্ণুং জ্বলন্তসৰ্ব্বতেঃ মুখাঃ।
শ্রী নৃসিংহং ভীষণম্ ভদ্রায়ৈঃ মৃত্যুং, মৃতঞ্চঃ নমোহম্যহম।”

শুধু সঙ্গের লোকেরাই নয়, যাওয়া-আসার পথে ভোরের পথচারীরাও সেইখানে দাঁড়িয়ে পড়ল ব্যাপার দেখতে। মন্ত্রপাঠ শেষ হলে পর কালীপদ উপরের দিকে চেয়ে সজোরে একটা ফুঁ দেওয়ামাত্র গোটা গাছটা একেবারে মড়মড় করে দুলে উঠল। গাছের মাথায় যেন বিশাল ঝড় উঠেচে। কিছু সময় পেরেই হঠাৎ করে ঝড়টা থেমে গেলু আর গাছের নীচে আছড়ে পড়ল একটা হাঁড়িচাচা পাখি। নায়েব সেদিকে এগিয়ে গিয়ে কইল, “এঃ, পাখিটা দেখচি মরে গেল।”

কালীপদ সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, “এই ঝড়ে নয়, পাখি মরেচে সম্ভবত অনেকদিন হল।”

দিনের বেলায় বাঘের আক্রমণের ঘটনা এখনও ঘটেনি, ফলে দিনের জীবনযাত্রা সকলেরই পূর্ব্বের মতোই আছে। অনেক লোক রায় বাড়িতে কালীপদকে হাত দেখাতে এলে পর কালী হেসে কইল, “আমি হাত দেখতে জানিনে মা। যেটুক জানি, সেটুকুও এখনও শিখচি।”

বেলা একটু বাড়লে সামান্য ফলাহার করে কালীপদ গোটা রায় বাড়ির আনাচকানাচ ঘুরে ঘুরে দেখল। দেবেন্দ্রর ঘরগুলো, একতলা, দোতলা, দেওয়ালে গেঁথে-থাকা লক্ষ্যভ্রষ্ট অস্ত্র, গোহাল, খিড়কি প্রভৃতি দেখে দোতলার অলিন্দে অনেকগুলি কেদারা পেতে বসে সকলে কথাবার্তা কইচে। একটা কাঠের চৌপাইতে প্রয়াত বড়োকর্তার আঁকা ছবিগুলো আর ছড়া-লেখা কাগজখানা রাখা রয়েচে। কালীপদ মুখ খুলল, “আপনার দাদার কি কবিতা লেখার অভ্যাস ছিল?”

“ঠাকুরমশায়, আমার দাদা চিলেন বহু গুণে গুণী। তিনি কবিতা লিখতেন, ছবি আঁকতেন, মূৰ্ত্তি গড়তেন, আবার পুরাণশাস্ত্রেও ছিল তাঁর অগাধ জ্ঞান। নানান জায়গা ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন দাদা। হরেকরকম পরীক্ষানিরীক্ষাও করতেন। আমি টুকিটাকি কবিতা লিখি বটে, কিন্তু তাঁর নখের যোগ্য আমি নই। দাদা নিজের রং নিজেই তৈরি করতেন। ঘাসের থেকে সবুজ রং, পশুর দাঁতের থেকে সাদা রং, হাড় পুড়িয়ে কালো রং, তুষের থেকে হলুদ রং, লাক্ষা দিয়ে লাল রং, তা ছাড়াও…”

কালীপদ আগ্রহের বশে মাঝখানে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “তুষের থেকে হলুদ রং তৈরি করতেন কেন? হলুদ থেকে নয়?”

“আজ্ঞা না ঠাকুর। হলুদ থেকে কাঁচা রং হয়, ও রং ছবিতে দিলে কালো হয়ে যায়। দাদার ছবিতে হলুদ লাগত না।”

কালীপদ ভ্রূ কুঁচকে উঠে দাঁড়াল এবং তার দেখাদেখি বাকিরাও। একতলায় নৈমে এসে উঠোনটা পেরিয়ে শুকনো ঘাসের ঝোপের কাছে এসে বলল, “এইখানে ঘাসের ঝোপ আপনার দাদার পোঁতা?”

“হ্যাঁ। তিনিই পুঁতেচিলেন।”

“আর তার মাঝে এই যে… এইটা?” কথা অর্ধসমাপ্ত রেখে কালীপদ একটানে উপড়ে আনল একটা হলুদগাছের চারা। তার শেকড়ে একটা লাল সুতো জড়ানো। কালীপদ একটা নিশ্বাস ফেলে কইল, “ভাগ্যে রঙের কথাটা উঠেচিল। তবে দু-খানা যখন বেরিয়েচে, তখন বিধিমতো আরও একটা জিনিস নিশ্চয়ই বাকি রয়েচে। চলুন তো দেখি…।”

সুরেনের স্ত্রী হেঁশেলে ছিল, কালীপদ পাকশালার দোরে দাঁড়িয়ে বলল, “মা, আমাকে দুইখানি পাতিলেবু, একটু তেল আর ঘরের থেকে এই এতটুকু সিন্দুর এনে দিন।”

জিনিসগুলো হাতে নিয়ে প্রথমেই লেবুগুলিতে তেল-সিন্দুর লেপন করে সেগুলিকে ঠিক সদরের মাঝামাঝি রেখে, উঠোনের চতুষ্পার্শ্বে মন্ত্রপূত জলছড়া দিয়ে, কালীপদ গম্ভীর কণ্ঠে প্রথমে নিজের শরীরবন্ধ উচ্চারণ করল, “ওঁ পরমাত্মা নৈঃ পরম ব্রহ্মৈঃ নমঃ। মম শরীরং ত্রাহিঃ ত্রাহিঃ কুরুঃ স্বাহাঃ।” মন্ত্র পড়ে কিছুটা জল নিজের মাথায় ছিটিয়ে নিয়ে সে আবার মস্তর পড়তে আরম্ভ করল,

“ওঁ ক্ৰী ক্রী হ্রীঁ হ্রীঁ হ্রীং হ্রীং দক্ষিণা কালিকেঃ ক্ৰী ক্রী চামুণ্ডায়ৈঃ নমঃ। জলেঃ জলময়াঃ ত্বং চঃ বহ্নৌঃ বহ্নিময় আত্মকম্, ব্রহ্ম বৈষ্ণবআদি নির্মাণ ইন্দ্রাণাং কারণ কুৰ্ব্বঃ, পাতাল পিশাচং যক্ষং তাল বেতাল পঞ্চকম্ যদাঃ তথাঃ তেজপুঞ্জাঃ গুপ্তপৌরাণেঃ স্থিতং চাক্ষঃ অঞ্জন…।”

মন্ত্রের শেষ শব্দটি উচ্চারণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের নিমিষে লেবু দুটি যেন উন্মাদের ন্যায় লাফিয়ে উঠে গড়াতে শুরু করল। তার পিছনে পিছনে গোটা বাড়ি ভরতি মানুষ। লেবুগুলিতে যেন উন্মত্ত প্রাণের সঞ্চার ঘটেচে, তারা বিভিন্ন দিকে পাক খেতে খেতে বসতবাড়ির এক কোনায় এসে নির্জীব হয়ে থেমে গেল। কালীর উদ্দেশ্য বুঝে সুরেন নিজের হাতে কোদাল এনে খুঁড়তে যেতেই কালীপদ চিৎকার করে বলে উঠল, “খবরদার, সুরেনবাবু। বিপদ হবে।” কিংকৰ্ত্তব্যবিমূঢ় সুরেন্দ্রর হাত থেকে কোদালখানা নিয়ে কালীপদ অতি সন্তর্পণে মাটি খুঁড়তে আরম্ভ করল। তার চোখ রয়েচে পাশের লেবু দুটির পানে। একটু একটু মাটি সরাতে সরাতে হঠাৎ যেইমাত্র লেবু দুটির রং এক পলকে বদলে রক্তবর্ণ ধারণ করল, সঙ্গে সঙ্গে কালীপদ একলাফে পিছিয়ে গেল, আর গর্ভের থেকে দশ হাত উপর অবধি লাফিয়ে উঠল একটা ভয়াবহ আগুনের শিখা। দহনের যোগ্য শিকার না পেয়ে কিছুকাল পরে সেই লকলকে অনলশিখা যেন হতাশ হয়েই পুনরায় পাতাল প্রবেশ করল। কালী কপালের স্বেদবিন্দু মুছে ধীরে ধীরে বলল, “দেখতে পাচ্চিনে বটে, কিন্তু আপনাদের ওই হাতকাটা শয়তান সম্ভবত এই গর্ভের তলায় একটা হাড় পুঁতে রেখেচে। তাতে শাঁখা পলা নোয়া সুতো জড়ানো আছে হয়তো। এরে অকালাস্থি বলে। যা-ই হোক, তার দ্রব্যগুণ শেষ হয়েচে।”

***

দ্বিপ্রহরে আহার সমাপন করে সুরেন্দ্রর কক্ষে এসে বসল। নায়েব, মুনশি এবং অন্য লোকেরা বসল মেঝেয় পাতা পুরু ফরাশের উপর আর সুরেন্দ্র, তার স্ত্রী, গিরিবালা এবং কালীপদ বসল শয্যার উপরে। তাদের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তা চলচে, তখন সুরেন বললে, “ঠাকুর, ওই হাতকাটা শয়তানটাই যে ছয় বৎসর পূর্ব্বের আক্রমণ করা ডাকাত, তা বেশ বুঝতে পেরেচি। সে হয়তো দাদার কোনও দুর্লভ আবিষ্কারের সন্ধান পেয়েই হামলা করেচে, তা-ও একরকম বুঝতে পারচি, তাদের দলের একজনকে একটা বোতলের মতো কিছু হাতে করে বেরিয়ে যেতে দেখা গিয়েচিল, কিন্তু ঠাকুর, সে তন্ত্রমন্ত্র জানলেও নিজেকে বাঘে পরিণত করার অদ্ভুত অবিশ্বাস্য শক্তি কোথা থেকে পেল? এ যে বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে! কখনও এমন শুনিনি!

“আর হলই বা সে বাঘ, সে তো আমাদের মেরে কেটে চলে যেতে পারত ছয় বচ্চর আগে, কিন্তু তা না করে বোতলটা পাবার পরেও চারদিকে তন্নতন্ন করে কী খুঁজচিল? এমনকি আস্তাকুঁড়ে অবধি তারা সন্ধান করেচে! এর তো কোনও কূলকিনারা দেখচি না আমরা তারপরে ধরুন, সে যখন পশুর রূপ নিয়েই আছে, তখনও আমার মা তাকে আমাদের দ্বারপালের কন্ঠ নকল করে ডাকতে শুনেচে। এমন কথা কেউ কখনও দেখেচে? শুনেচে? আমার সন্দেহ হয়, দাদাকেও হয়তো কারও গলা নকল করেই ওই রাতে ঘর থেকে বের করেচিল।”

কালী নিশ্চুপ হয়ে সমস্ত কথা মন দিয়ে শোনার পর ধীরে ধীরে উত্তর করল, “দেখুন সুরেনবাবু, আমি যেটুক বুঝেচি, আপনার দাদা অত্যন্ত সতর্ক এবং তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। মধ্যরাতে কারও ডাক শুনে সে নিশ্চয়ই একেবারে উঠোনে এসে দাঁড়াত না, বরং জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে নিত। আর তা ছাড়া, চেনা মানুষ ডাকলে কেউ হাতে দা নিয়ে নিশ্চয়ই বেরুবে না। আপনি তো উঠোনে কাস্তে না হাঁসুয়া কী একটা পড়ে থাকতে দেখেচিলেন, সে কথা তো স্থির? ওঁর আঁকা শেষ ছবিটিতে দেখলাম, পুরো ছবিটাই রং হয়েচে, কিন্তু গাছপালার গায়ে রং পড়েনি। আমি আন্দাজেই বলছি, হয়তো ওঁর ভাণ্ডারে সবুজ রঙের অভাব দেখা দিয়েচিল, ফলে হয়তো উনি ঘাস কাটতে বেরিয়েচিলেন। এ ছাড়া অপর কোনও কারণ তো আপাতদৃষ্টিতে চোখে পড়ছে না।”

নায়েব বলল, “মাঝে কথা কইচি, ঠাকুরমশায়, মাপ করবেন, কিন্তু বড়োকর্তার হাবভাব দেখে শেষ সময়ে আমরা একটু আঁচ করেচিলাম যে, উনি কিছু একটা উদ্‌বেগে রয়েচেন, অর্থাৎ তিনি কিছু একটা হয়তো বুঝতে পেরেচিলেন, তাই বলচি, তিনি কি কোথাও কোনও আভাস দিয়ে যাননি? তা ছাড়া বাঘের আক্রমণ আরম্ভ হবার আগেই উনি বাঘের শিকারের আয়োজন করচিলেন কেন?”

কালীপদ উত্তর দিল, “বাঘের কথা কেমন করে জানলেন, তা আমিও বুঝচি না, কিন্তু সেই বাঘ যে ভূতপ্রেত নয় তা নিশ্চিত। তাকে পিঞ্জরে আবদ্ধ করা যায়, বল্লম দিয়ে হত্যা করা চলে, অর্থাৎ স্থূল দেহধারী। তা ছাড়া, ওঁর লেখা ছড়াটা যে কেবলমাত্র খেয়ালবশে লেখা তা আমার মনে হচ্চে না। যেরকম কাঁচা কালিতে ওখানা লেখা ছিল, বললেন, তার অর্থ ওটা সদ্য সদ্য লিখেচিলেন উনি। শেষ ক-টা দিন তিনি যেরকম উদ্‌বেগের মধ্যে ছিলেন শুনলাম, তারপর কারও ছড়া লেখার ইচ্ছা থাকার কথা নয়। তাই…. মানেটাও বড্ড হেঁয়ালি করা। মরিচ আর লংকা তো একই বস্তু। কুড়িটি মানুষের হুবহু এক ওজন কি হয়? সোনার ছেলে কে? শ্বাপদ অর্থে বুঝলাম, উনি বাঘ বোঝাতে চেয়েচেন, কিন্তু বাঘটা বেহাত হবে কার কাছ থেকে? গাছের গোড়ায় জল ঢালা! জল অর্থে কি উনি নিজের আবিষ্কৃত কোনও তেজস্ক্রিয় তরলের কথা বলতে চেয়েচেন? প্রশ্ন অসংখ্য। উত্তর নেই। আরও বড়ো প্রশ্ন, এবং এইটাই মূল প্রশ্ন… মরার আগে… দুঃখিত, মারা যাবার আগে উনি ভবানীর বিগ্রহের সামনে গিয়েচিলেন কেন? এইটাই বড়ো কথা, সুরেনবাবু। আমার একটা ব্যাপার সন্দেহ হচ্চে।” সুরেন্দ্রনাথসহ প্রতিটি মানুষ অত্যন্ত উৎসুকভাবে শুধোল, “কী সন্দেহ, ঠাকুর?”

“আপনিই তো কইলেন যে, দেবেন্দ্রবাবুর হাঁসুয়াটা রক্তে মাখা ছিল, কিন্তু কেন? বাড়ির থেকে ফটক অবধি রক্তের ধারাই বা গিয়েচিল কেন! আমার মনে হয়, দেবেন্দ্রনাথ নিজের অন্তিম আঘাতে ওই শয়তানের একটা হাত কেটে নিয়েচিলেন। তাই সাধুবেশী শয়তানটার একটা হাত নেই। কিন্তু কাটা হাত খুঁজে আর লাভ কী? সে তো জোড়া লাগবে না। সেই হিসেবে হাতের সন্ধান করে কোনও লাভ নেই, যদি না… যদি না ওই হাতে কোনও বিশেষ শক্তি লুকোনো থাকে। ঠিক, সুরেনবাবু, ঠিক। শয়তানের কাটা হাত নিশ্চয়ই আপনার দাদা কোথাও লুকিয়ে রেখে দিয়েচেন। হাত ফেরত পেলেই রাক্ষসটা চিরকালের মতো বাঘে পরিণত হবার শক্তি পেয়ে যাবে। দেবেন্দ্রর তৈরি আরকটুকুর গুণে হয়তো এখনও তার রূপ বদলানোর বাধা নেই, কিন্তু এক বোতল আরক আর কতদিন চলে? তাই সে নিজের মূল শক্তি ফেরত চাইচে। ছড়ায় লেখা ‘বেহাত’ কথাটা এইবার বুঝলাম। সেইজন্যই আস্তাকুঁড়ে সন্ধান করার সময় তারা বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে দেখেচিল। শিশি-বোতল বা অন্য বস্তু হলে বল্লমে গাঁথত না। আরও কিছু বুঝেচি, যদিও তা অতি আশ্চর্য এবং অসম্ভব কথা, কিন্তু দেবেন্দ্রবাবু কোনও কারণে মানুষ থেকে বাঘে পরিণত হবার ঔষধ আবিষ্কার করেননি তো? কিন্তু তার জন্য গোদাবরীর পাড়ে যাবার কী প্রয়োজন পড়ল? কী রয়েচে ওখানে?”

গিরিবালা চোখের জল মুছে কালীপদর হাত ধরে কইল, “বলো বাবা, তুমিই বলো।”

“মা ঠাকরুন, আপনার বড়োছেলে হাতটাকে এমন কোনও স্থানে লুকিয়ে রেখেচে, যেখানে সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ডাকাতরা সন্দেহ করেচিল, হয়তো কোনও মূর্ত্তির হাতের মধ্যে দেবেন্দ্র হাতখানি মিশিয়ে রেখেচে, তাই তারা বড়ো কালীমূর্তির চারখানা হাতই ভেঙে ফেলে সন্ধান করেচে, অথচ পাশেই রাখা ছোটো ছোটো যেসব পাথরের দুর্গা, গণেশ, আরও অন্যান্য মূৰ্ত্তি আছে, তাদের ছুঁয়েও দেখেনি, কারণ ওইটুকু বিগ্রহে মানুষের হাত লুকোনো চলে না।”

গিরিবালা আবার ধরা গলায় বললে, “কিন্তু বাছা, ওই খুনে ডাকাতের দল, আমার খোকা যদি কিছু তেমন আবিষ্কার করেই থাকে, তবে সেই খবর পেল কোথা থেকে? এ যে ভারী আশ্চর্য।”

“আশ্চর্য তত নয়, মা ঠাকরুন। ওই ডাকাত বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী সেজে দেবেন্দ্রর সঙ্গেই ঘুরে বেড়াত যে।”

গিরিবালা এবং সুরেন্দ্রনাথ লাফিয়ে উঠে একযোগে বলে উঠল, “কে? বিশু?”

কালীপদ পালঙ্ক থেকে নীচে নেমে দাঁড়িয়ে জবাব দিল, “হ্যাঁ, বিশু। কুড়ি মানুষ এক ওজন। অর্থাৎ যার ওজন কুড়িজনের সমতুল্য। বিশসম ভরা দেবেন্দ্রর সহকারী বিশ্বস্ত বিশ্বম্ভর। সে কখনোই মূর্খ বা বোকা ছিল না। বোকা হওয়ার ভান করেচিল মাত্র। সে হয়তো গোপনে কিছু একটা খবর পেয়েই ভীষণ বুদ্ধি খাটিয়ে দেবেন্দ্রর সঙ্গে অযাচিত আলাপ করে নেয় এবং বোকা-হাবা সেজে তার সঙ্গে লেপটে যায়, আর দেবেন্দ্র তার বিশ্বস্ততায় এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েচিল, যে বেছে বেছে নিজের রসায়নের শক্তি পরীক্ষা করল তারই উপরে। আপনিই বললেন না, আপনার দাদা বিশুর উপরে স্তু কীসের একটা ঔষধ প্রয়োগ করেচে? কিন্তু কীসের পরীক্ষা? কী আবিষ্কার? একবার বাঘ হবার চিরস্থায়ী শক্তি পেয়ে গেলে সে হবে পৃথিবীর সর্ব্বশক্তিমান লুঠেরা। দেবেন্দ্রর কাছে কাজ করার সময়ও তার নিজস্ব ডাকাতের দল ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল মহিষকাটির বনে।”

সুরেনের স্ত্রী রুদ্ধস্বরে কইল, “বটঠাকুর বিশুকে এতখানি স্নেহ করতেন, কিন্তু বিশুর ভিজে বেড়ালটি সেজে থাকা দেখে আমরাও কিছু আঁচ করতে পারিনি।”

“তা-ই তো। আপনার উপমাটা শুনে, মা আরও একটা কথা মনে এল। আপনার ভাশুরঠাকুর বিড়ালের মৃতদেহ পুঁতে রেখেচিলেন না? তার মধ্যে একটি আবার মুণ্ডুতে সিন্দুর মাখা ছিল। ওখানা যে সিন্দুরই ছিল, তা বেশ নিশ্চিত তো?”

সুরেন এবার উত্তর দিল, “তা নিশ্চিত নয়, ঠাকুর, কিন্তু মুণ্ডুতে লাল রঙের কিছু মাখানো ছিল। উনি না করলে এই কাজ আর কে করবে?”

এতক্ষণ ঘরে দেবেন্দ্রর ষোলো বৎসরের পুত্র নরেন্দ্রর উপস্থিতি কেউই গুরুত্ব দেয়নি, কিন্তু এইবার তার নরম গলা শোনা গেল, “ঠাকুরমশায়, আমি একটু একটু মনে করতে পারচি, ওই সময়ে আমি একদিন বাবার পাথরের বেড়ালের মুখে লাল রং দিয়েচিলাম বলে বাবা মেরেচিল আমাকে। কেঁদেচিলাম আমি। বাবার দুর্ঘটনার পরে ওই বেড়ালের মড়াগুলো বেরুনোর পর দেখলাম তাদের একটা বেড়ালের মুখেও হুবহু একরকম রং দেওয়া। ওটা সিন্দুর নয় হয়তো।”

কালীপদ উত্তেজনায় নিজের আঙুল মটকে ধরল।

“নায়েবমশায়, আপনি যেন দেবেন্দ্রর হুকুমে কয়খানা পাথরের বেড়াল এনে দিয়েচেন?”

“আজ্ঞা, পাঁচখানা।”

“আর সত্যিকারের রক্তমাংসের বেড়ালের মৃতদেহ ক-টা পাওয়া গিয়েচিল?”

“আজ্ঞে, তা-ও পাঁচটা।”

“কিমাশ্চর্যম্! উনি কি পাথরের মূর্তিতে প্রাণ দিতেও পেরেচিলেন নাকি? নয়তো নরেন্দ্রর দেওয়া লাল রং সত্যিকারের বেড়ালের মুখে কেমন করে এল? এ তো রহস্যের পর রহস্য দেখেচি। পাথরের নিকষ প্রাণশূন্য মূর্ত্তিতে কখনও কী প্রাণ দেওয়া যায়? অতি প্রাচীন পুরাণ বা মহাকাব্যেও একমাত্র অহল্যার উপাখ্যান ছাড়া এমন ঘটনার কথা শোনা যায় না। আমার অন্তত এই মুহূর্ত্তে স্মরণ হচ্চে না।”

কালীপদর কন্ঠ উদ্‌বেল হয়ে উঠল, “আপনারা হয়তো ভাবতে পারেন যে আমি আসামাত্র কীভাবে তরতর করে সব কথার জবাব পেয়ে যাচ্চি, যা আপনারা ছয় বছর ধরে পাননি, কিন্তু ব্যাপার তা নয়। আপনাদের চক্ষে কারও প্রতি বিশ্বাস, কারও প্রতি স্নেহ, আবেগ মিশে রয়েচে। অলক্ষে ওই ভাবগুলোই আপনাদের চিন্তাকে মোহের পর্দায় জড়িয়ে রাখচে। কিন্তু আমার সে বালাই নেই। আপনাদেরই বলা টুকরো টুকরো সংবাদ আর তথ্য থেকেই আমি এতগুলো সূত্র পেলাম। এতে আমার কৃতিত্ব কিছুমাত্র নেই।

আমি কথায় কথায় এবং আন্দাজে ভর করে বেশ কিছুটা বুঝতে পারলেও সবটুকু বোঝা যাচ্চে না। উনি গোদাবরী নদী থেকে ফিরে ঠিক কীসের আবিষ্কার করলেন? সেই আবিষ্কারে বেড়ালের দরকার কেন?… গোদাবরী….. বাঘ… বেড়াল… নকল গলা…”

কালী নিজের চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে গেল। তাকে দিয়ে আর একটা কথাও বলানো গেল না।

***

বিকেল থেকে সাঁঝবেলা অবধি কালীপদ গম্ভীর হয়ে রইল। কারও সঙ্গে বিশেষ কথাবার্তা কইল না। সুরেন্দ্রনাথ একবার কালীপদকে একা ছাড়তে না চেয়ে দুটো কথাবার্ত্তা কইতে যাচ্চিল, বৃদ্ধ নায়েব জোড়হস্ত হয়ে বললে, “ছোটোকৰ্ত্তা, আমি মানুষ ঘেঁটে বৃদ্ধ হয়েচি। মানুষ চিনি। ওইটুকুনি ছেলে যখন পরমন্তপ হংসী তান্ত্রিকের শিষ্যত্ব লাভ করেচে, তখন ঠাকুরের মধ্যে কিছু গুণ অবশ্যই রয়েচে। তার অনেকখানি তো নিজেই চোখে দেখলুম। কী ভয়ানক ক্ষমতাবান, কী অসামান্য মেধা, ধী, অথচ তৃণবৎ নমনীয়। ওঁকে একটু একলা চিন্তা করতে দিন। তাতেই আখেরে লাভ হবে।” নায়েবের কথার যথার্থ বুঝে সুরেন আর কালীপদর কক্ষে প্রবেশ করল না।

কালী ঘরে বসে বসেই লক্ষ করল, কেউ মুখে কিছু না বললেও যতই আঁধার বাড়ছে, ততই যেন সকলের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য, উদবেগ ছড়িয়ে পড়চে। গৃহের লৌহদ্বারশূন্য ফটকে তেলের বাতি ঝুলিয়ে দিয়ে ভদ্রাসনের সব ক-টি অন্দরের কপাট ঝনাত করে বন্ধ হয়ে গেল।

রাতে বাড়ির পুরুষরা আহারান্তে ছাতে উঠেচিল। সুরেন দখিন-পুবে আঙুল দেখিয়ে কইল, “ওই দেখুন ঠাকুর।”

অঙ্গুলিদ্দিষ্ট দিকে তাকিয়ে মনে হল, দূরে নদীর পাড়ের অনেকখানি স্থান আগুনের আবছা আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে রয়েচে। মুনশি শুষ্ককণ্ঠে কইল, “ওই, ওইদিকেই ওই শয়তান সাধু ডেরা বেঁধেছে।”

কালীপদ তিক্তস্বরে উত্তর দিলে, “শয়তান কখনও সাধু হয় না, দয়ালবাবু। বিশ্বম্ভর এখন মামুলি ডাকাত নয়। তার হাতে যতদিন ওই আরক রয়েছে, ততদিন তার ক্ষমতা অসীম। তদুপরি যদি সত্যিই আপনাদের বড়োকৰ্ত্তা ডাকাতের কাটা হাত এই বাড়িতেই লুকিয়ে রাখেন, তবে সেখানা হাতে পেলেই আর রক্ষা নেই। যদিও ডাকাতরা প্রথমবার গোটা বাড়ির প্রতিটা কোনা চালুনির ন্যায় তল্লাশি করেচে, কিন্তু এত বৎসর বাদে হঠাৎ তার আবার এই ধারণা হলই বা কেন যে, ওই হাত সে এখানেই পাবে? একেবারে নিশ্চিত না হয়ে সে এত পরিশ্রম করত কি? তবে বিশ্বন্তর নিশ্চয়ই তন্ত্রমন্ত্র দ্বারা নির্ভুল খবর পেয়েচে এই বিষয়ে। যোগিনী কিংবা কৃত্তিকা দ্বারা খবর পাওয়া কঠিন কিছু নয়, তবে তারাও সম্ভবত একেবারে সঠিক স্থানটি কোনও কারণে বলতে পারেনি, সুরেনবাবু। আমাদের তন্নতন্ন করে খোঁজা দরকার ওই স্থানটিকে। আপনারা সকলে তল্লাশি করুন। আরেকটা কথা, নদীর দিকের আগুনের আভা দেখে মনে হচ্চে একটি নয়, অনেকগুলি আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়েচে সে। আমার বড্ড দুশ্চিন্তা হচ্চে, বিশ্বন্তর এমন এক সাধনায় বসেচে, যার নিবারণ আমার শিখতে বসেও শেখা হয়নি।”

হরিশ্চন্দ্র কম্পিত কণ্ঠে শুধোল, “কোন সাধনা ঠাকুর?”

কালীপদ একটা হতাশার শ্বাস ফেলে কইল, “বেতাল-জাগানো।”

***

গোপন রহস্য উদ্ঘাটনের একটা মাহাত্ম্য আছে। এই উৎসাহ পঙ্গুকেও গিরি লঙ্ঘন করায়। রায় বাড়ির মেয়ে, পুরুষ, শিশু, পরিচারকের দল, কর্মচারী সকলেই একজোট হয়ে আনাচকানাচে, প্রতি বিঘত স্থান খুঁজতে থাকল, যেখানে একটা মানুষের হাতের পরিমাণ জিনিস লুকোনো যেতে পারে। কালীপদ, সুরেন, নায়েব, মুনশি মিলে মাটির মূর্ত্তির কক্ষ হেঁকে ফেলেও কিছু খোঁজ পেলে না। এক হাত, আধ হাত পরিমাণ ঠাকুর-দেবতার পাথরের মূর্ত্তিগুলো খুঁজে কোনও লাভ নেই, কারণ তাদের বিগ্রহে একটা গোটা হাত লুক্কায়িত রাখা কার্যত অসম্ভব। ভবানীর বিগ্রহের হাতগুলিতে লুকোনো যেতে পারত, কিন্তু সেই কথা ধূর্ত্ত বিশ্বম্ভরও জানত, তাই সেগুলি আগেই ভেঙে দেখে নিয়েচে। তবে কোথায়? কোথায়? শয়তান রাক্ষসটার আগেই খুঁজেপেতে হবে সেটা। নচেৎ… নচেৎ সৰ্ব্বনাশ।

কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা! গোটা বাড়িতে একটা কিছু খুঁজে পাওয়া গেল না। বুড়ো দ্বারপাল ভবানীপ্রসাদ এত বছর ধরে নিজের ভিতরে ভিতরে হীনম্মন্যতায় ভুগেচে। তার নিদ্রা এবং অপদার্থতার কারণেই বড়োকৰ্ত্তাকে বাঘের হাতে মরতে হয়েচে। যদিও বলিষ্ঠ লেঠেলরাও প্রহরায় নিযুক্ত ছিল, কিন্তু সে কেন তৎপর রইল না? সেই ক্ষোভ আজ আবার ফুঁসে উঠেচে বৃদ্ধের দেহে। উপরতলার অলিন্দে, যেখান থেকে বাঘটা নীচে পড়ে গিয়েচিল, সেইখানে প্রাচীরে ঠেস দিয়ে অতন্দ্র দাঁড়িয়ে রয়েচে দুইজন। গিন্নি মা আর ভবানীপ্রসাদ। ভবানীর হাতে দোনলা পুরাতন বন্দুক, গিরিবালার হাতে ডুডুর আর গোলা। বাকি সকলে বাড়ি তল্লাশি করচে।

রাত যখন ভোর হতে যায়, সেই ব্রাহ্মমুহূর্ত্তে সকলে বেদম হয়ে বসে পড়ল খোলা উঠোনে। কোথাও কিচ্ছুটি নেই। সব মিথ্যা। সকলের মুখ বিষাদময়। কালীপদর চক্ষেও হতাশার ছাপ পড়েছে। সব পরিশ্রম নষ্ট হয়ে গেল। দেবেন্দ্ৰ ছড়াটা লেখার পরে বাঘের আক্রমণ হয়েচে, তাই হাত লুকিয়ে রাখার শেষ ঠিকানা সে লিখে যেতে পারেনি। কিংবা… কিংবা হাতটা আদৌ লুকোনো রয়েচে তো?” নানান চিন্তা তাকে অবসন্ন করে তুলল। ক্লিষ্ট মুখ তুলে উপরের দিকে চেয়ে গিরিবালার উদ্দেশে বলল, “আপনারা বৃথা কেন ক্লেশ পাচ্চেন মা ঠাকরুন, আমার মন বলছে, এইবার সে বাঘের রূপে আসবে না। সঙ্গে কোনও ডাকাতের দলও আসবে না, কিন্তু তার সঙ্গে একজন আসবে… নিশ্চয়ই আসবে…. তাকে আপনাদের ওই অস্ত্র দ্বারা বধ করা যায় না, তার ক্ষমতা এক হাজার হাতির চেয়েও অধিক, তাকে একমাত্র প্রশমিত করা যায় পালটা মন্তর দ্বারা, কিন্তু সেই বিধি আমার শেখা অপূর্ণ রয়েচে। আপনারা অযথা কষ্ট করবেন না। নেমে আসুন।”

গিরিবালা রুদ্ধকণ্ঠে কইল, “সেসব আমি জানিনে, বাছা। তবে যে রাক্ষস আমার ছেলেকে খেয়েচে, তাকে আমি বিনে বাধায় এই বাড়িতে ঢুকতে দিচ্চিনে। আমার ক্ষমতায় যা কুলোয় তা-ই দিয়ে আমি তাকে রুখব।”

কালীপদর চক্ষে জল এল – “আপনি তাকে আঘাত করার সুযোগ পাবেন না, মা। সে ভয়ংকর প্রহরী নিয়েই আসচে।”

গিরিবালা তা-ও অনড়। জেদের সুরে সে দৃঢ়ভাবে উত্তর দিলে, “আমি কোথাও যাব না। এইখানেই থাকব। শিকারির মেয়ে আমি। শত্রুরকে সামনে দেখে আয়েশ করে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখতে পারিনে, এই জেনে রেখো।”

কালীপদ অন্যমনস্কভাবে কী একটা বলতে যাচ্চিল, বৃদ্ধার এই কথা শুনেই সে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে বিস্মিতভাবে কইল, “আরে, তা-ই তো! কোমরে হাত!”

সকলেই নিরুৎসাহিত হয়ে ঝিমিয়ে পড়েচিল, কালীপদর চোখে আলোর ঝিলিক দেখে সকলে একসঙ্গে উৎসাহে উঠে দাঁড়াল। কালীপদ সবাইকে নিয়ে দৌড়ে ঢুকে পড়ল মূৰ্ত্তি তৈরির বিশাল কক্ষে। নায়েব বিস্ময়ের সুরে শুধোল, “কিন্তু ঠাকুর, এই ঘরে তো এই একটাই মাত্র বড়ো প্রতিমা রয়েচে, তার হাতগুলিও ভেঙে ভেঙে পরীক্ষা করেচে শয়তানরা, আর তা ছাড়া এই ঘরের কোনায় কোনায় অবধি আমরা বারবার,,,”

তাঁর কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে কালী প্রশ্ন করল, “নায়েবমশায়, এই বিগ্রহের প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়নি তো?”

“আজ্ঞা না ঠাকুর, প্রাণপিতিষ্ঠে হয়নি….”

কালীপদ সোজা প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে প্রণাম করে, কাঁপা হাতে মূর্ত্তির কটিদেশের থেকে বাঘছালটা সরিয়ে ফেলল আর সকলে চমৎকৃত হয়ে লক্ষ করল কালীমূর্ত্তির কটিদেশকে আবৃত করে সারি সারি মাটির হাতের সারি। কালীপদ উত্তেজিতভাবে কইল, “দেখেচেন সুরেনবাবু, মায়ের কটিদেশে যে হাতের সারি থাকে তা আমরা সকলেই জানি, শুনি, দেখি, কিন্তু কার্যকালে সকলেই তা বিস্মৃত হয়ে পড়েচিলাম। কিন্তু সৌভাগ্যের কথা এই যে, ডাকাতরাও একই ভুলের শিকার হয়েছিল। এই দেখুন….”

সারিবদ্ধ হাতের সারির ঠিক উপরে একখানা মাটির হাত একটু অসংলগ্নভাবে আঁটা রয়েচে, তার গায়ে অসংখ্য ফাটল ধরেচে কোনও কারণে। কালীপদ সেটাকে ধরে একটু টান দিতেই সেটা খুলে এল। সেটাকে মাটিতে আছড়ে ফেলামাত্র মাটির গুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে আর হাতের ভিতর থেকে চোখে পড়ল একটা কালচে হয়ে আসা শুষ্কপ্রায় চামড়ায় আবৃত হাত। মানুষের হাত। কিন্তু এ কী! হাতের গড়ন মানুষের মতো হলেও তার কবজির কাছ থেকে অবিকল একটা বাঘের থাবা!

ফেলে-দেওয়া বাঘছালের ছাপ-তোলা কাপড়টায় হাতটাকে মুড়ে নিয়ে কালীপদ বলল, “ভোরের আলো ফুটে আসচে। আর একদম বিলম্ব নয়। এখুনই তেল জোগাড় করুন। বাইরে বাতি জ্বলচেই, এক্ষুনি এক্ষুনি এই আপদকে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তারপর যা হবে, মোকাবিলা করা যাবে।”

প্রত্যেকে এই কথার সত্যতা উপলব্ধি করে একবাক্যে সায় জানাল। বাইরে ভাঁড়ার থেকে কাঠ এনে স্তূপ করে তাতে তেল ঢালা হল। কালীপদ বাতির থেকে একটা পাতা জ্বেলে কাঠে ছোঁয়াল। আগুন ধিকিধিকি করে জ্বলতে আরম্ভ করলে পর কালীপদ মুখ ফিরিয়ে গিরিবালার পানে চেয়ে একটু ইতস্তত করে বললে, “একটা কথা বলি, মা ঠাকরুন, কথাটা শুনতে আপনার কষ্ট হবে হয়তো…”

 গিরিবালা একটা শ্বাস ফেলে উত্তর দিল, “আর কষ্ট। কষ্ট আমার সয়ে গিয়েছে, বাপ। বলো কী বলবে।”

“আপনার ছেলে কিন্তু মৃত্যুর অনতিপূর্ব্বে মা সম্বোধনে আপনাকে ডাকেনি।”

“সে আমার কপাল, বাছা। হয়তো সে মা ভবানীর পায়ের তলে শুয়ে তাকেই ডেকেচিল। তাতে দুঃখ কী?”

কালীপদ একটু ভেবে আবার বলল, “না। সে মহামায়া ভবানীকেও ডাকেনি।”

এইবার কেবল গিরিবালা নয়, সুরেন অবধি বিস্ময়ের সুরে শুধোল, “সে কী ঠাকুর! তবে দাদা কাকে মা বলে ডেকেছে?”

“ভুল, সুরেনবাবু, ভুল। সে মা বলে কাউকে ডাকেনি। আপনারা তার গলায় যে ‘মা আমি গো’ কথাটা শুনেচেন, সে আসলে বলতে চেয়েচিল মায়ামৃগ এই মায়ামৃগর হারিয়ে-যাওয়া রহস্যই উনি আবিষ্কার করেচেন। যে বিদ্যায় কোনও প্রাণী, মায় নির্জীব বস্তুকেও ইচ্ছামতো পশুতে রূপান্তরিত করা সম্ভব। যে বিদ্যায় বিদ্বান ছিলেন তাড়কাপুত্র মারীচ রাক্ষস। গোদাবরীর তীরে তাঁকে বাণ মেরে হত্যা করেন দশরথপুত্র রামচন্দ্র। সোনার হরিণ। উনিই সোনার ছেলে। মারীচ লঙ্কা দেশের রাজা রাবণের অনুগত ছিলেন। এইবার আমি মরিচ আর লংকার কথাটা বুঝতে পেরেছি। উনি ইঙ্গিত দিয়েচিলেন ঠিকই, কিন্তু নিজেই হয়তো এই বিপদের সূত্রধর হবার কারণে লজ্জায় কাউকে মন খুলে সব বলে যেতে পারেননি। আসলে উনিও জানতেন না যে, আচমকা তার প্রাণ ওভাবে নষ্ট হবে। তবে আর বিলম্ব নয়। আগুন ধরে উঠেচে।”

এই বলে হাতটা নিয়ে আগুনের দিকে এগোল সে। কাপড়ে মোড়া হাতটাকে উন্মুক্ত করে যেইমাত্র আগুনে নিক্ষেপ করতে যাবে, হঠাৎ মনে হল, তার হাত দুটোকে কেউ যেন অদৃশ্য হাতে পেঁচিয়ে ধরল। কালীপদ মনে মনে প্রমাদ গুনল। এই বিপদের কথা ভেবেই তার দুশ্চিন্তা ছিল। ফটকের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল একজন জটাজুটধারী বলিষ্ঠ চেহারার মানুষকে। শান্ত, ধীরপদে সে এসে দাঁড়াল কালীপদর একেবারে সামনে। ভবানীপ্রসাদ বন্দুক তুলতে যাওয়ামাত্র একটা বিরাট কালো ঘূর্ণিঝড় তার দিকে ধেয়ে গিয়ে তাকে দশ হাত দূরে যেন হেলায় ছুড়ে ফেলে দিল। বৃদ্ধ ভবানী যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল।

সাধুর ভেকধারী ডাকাত বিশ্বম্ভর রায় বাড়ির প্রতিটি ইট কাঁপিয়ে অট্টহাস্য করে উঠল। কালীপদর নড়াচড়ার ক্ষমতা বিন্দুমাত্র নেই। তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বিশ্বন্তরের মন্ত্রে ফুঁসে ওঠা বেতাল যেন শত পাকে বেঁধে ফেলেচে। বাকি সকলের দশাও তথৈবচ। কেউ নিজের স্থান ছেড়ে নড়তে পারচে না। জড়পদার্থের ন্যায় দাঁড়িয়ে-থাকা অসহায় কালীপদর হাত থেকে নিজের কাটা হাতটা ছিনিয়ে নিল হাতকাটা শয়তানটা, আর মাথা নীচু করে পরম যত্নভরে নিরীক্ষা করতে শুরু করল নিজের লুপ্ত অঙ্গকে। তারপর যখন সে মুখ তুলল, তার চোখ থেকে আগুন ঠিকরে বেরুচ্চে। কী ভয়ংকর সেই দৃষ্টি! ঠিক যেন বাঘের হিংস্র চোখ। সেই চোখের দৃষ্টি শুরুতেই বলে দিচ্চে, নিজের শক্তি ফিরে পাওয়ামাত্র সে প্রথমেই তা প্রয়োগ করবে সব ক-টি মানুষের উপর। একজনকেও জীবিত ছাড়বে না সে।

বিশ্বম্ভর চোখের মণি তলে সবাইকে একবার দেখে নিয়ে ঝোলার থেকে বের করল একটা পুরাতন কাচের বোতল। তার একেবারে তলার দিকে অতি সামান্য একটু তরল অবশিষ্ট রয়েচে।

নিজের শুষ্ক, কাটা হাতটা ভূমিতে রেখে, তার সন্ধিস্থলে সবটুকু তরল ঢেলে দিল সে, আর তারপর হাতটা তুলে নিজের বাহুমূলে ছোঁয়াল। তার দানবের মতো দেহটা একবার শিউরে উঠল, আর পরমুহূর্ত্তেই কালীপদ সবিস্ময়ে লক্ষ করল, ছয় বৎসর পূর্ব্বের ছিন্ন অঙ্গ নিখুঁত জোড়া লেগে গিয়েচে বিশ্বম্ভরের শরীরে। তার দেহটা ধীরে ধীরে একটা বিকট ব্যাঘ্রের আকার পরিগ্রহ করচে।

বাঘের আকার যখন অর্ধেক সম্পূর্ণ হয়ে এসেচে, তখন বিশ্বম্ভরের ঝোলা থেকে এক মুঠো গুঁড়ো ছুড়ে মারল বাতাসে, আর সঙ্গে সঙ্গে তার আজ্ঞাধীন বেতাল ঝড়ের রূপে বেরিয়ে চলে গেল। তার কাজ সমাপ্ত হয়েচে। বেতালের গমনমাত্র সকলের বাঁধন খুলে গিয়েচিল। কালীপদ দৌড়ে গিয়ে শয়তানের ফেঁলে-দেওয়া শূন্য বোতলটি তুলে নিয়ে হতাশায়, ক্ষোভে চিৎকার করে উঠল। এত করেও ঠেকানো গেল না রাক্ষসটাকে। সে পূর্ণ শক্তি অর্জন করে নিয়েচে ইতিমধ্যেই। বিশুর বদলে এখন উঠোনে দাঁড়িয়ে রয়েচে একটা ভয়ালদর্শন বিকট বাঘ। সে এইদিকে তাকিয়ে ঠোঁট চাটচে।

রাগে, ক্ষোভে অস্থির হয়ে কালীপদ দেবেন্দ্রর ঘরে রাখা চণ্ডীর মূর্ত্তির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললে, “তোর ক্ষুধা মিটেচে, রাক্ষসী? তোর মনের শান্তি হয়েচে তো? তুই নাকি মা দানবদলনী? সব মিছে কথা। তোর সামনে আজ একটা রাক্ষস জন্ম নিয়েচে। তুই ঘুমিয়ে থাক। সবার রক্তে তোর ক্ষুন্নিবৃত্তি হোক তবে। গুরুদেব বলেচেন, যখন সব পথ বন্ধ হয়ে পড়বে, তখন নিজের সব কিছু তোর পায়ে তুলে দিতে। এই নে…. এই নে সৰ্ব্বনাশী…”

এই বলে হাতের শূন্য পাত্রটি তুলে সজোরে নিক্ষেপ করল বিগ্রহের দিকে। মূর্ত্তির পায়ে লেগে কাচের বোতল পাশের ভূমিতে ছিটকে পড়ে সশব্দে চূর্ণ হয়ে গেল। মূর্ত্তি উত্তর দিল না।

কালীপদ হঠাৎ পিঠে প্রচণ্ড বেগে একটা থাবা খেয়ে ছিটকে পড়ল কয়েক হাত দূরে। তার পিঠ থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে। পিছনে এগিয়ে আসচে সাক্ষাৎ যম। এক-পা এক-পা করে। কালীপদ বহু ক্লেশে নিজেকে টেনে নিয়ে গেল কালীমূর্ত্তির সামনে। মায়ের দিকে তাকিয়ে অশ্রুপূর্ণ চক্ষে বলল, “মা। আমার রক্ত চাস মা? এই নে তবে। বাকিদের তুই রক্ষা কর সর্ব্বনাশী… রক্ষা কর।” আবার পিঠে একটা আধমনি থাবার আঘাতে কালীপদ চিতিয়ে পড়ে গেল পাথরের ক্ষুদ্র মূর্ত্তিগুলোর উপরে। তার বুকের উপরে এসে দাঁড়িয়েচে সেই কালান্তক যম। তার মুখের লালা আর উষ্ণ শ্বাস এসে পড়ছে কালীপদর মুখে। কী দম-বন্ধ-করা বীভৎস গন্ধ। বাঘ কালীর মুণ্ডু লক্ষ করে নিজের গহ্বরের ন্যায় বিরাট মুখ হাঁ করল। কালীপদ ইষ্ট স্মরণ করে চক্ষু মুদল। কিন্তু ও কীসের শব্দ!!

দুয়ারের দিক থেকে যেন আরেকটা ভয়াল গরগর শব্দ আসচে না?

কালীপদ খুব ধীরে চোখ খুলেই দেখল, ইতিমধ্যে বাঘটাও সেদিকে ঘুরেচে। তার চার পায়ের ফাঁক দিয়ে তাকাতেই কালীপদর হৃৎপিণ্ড আবার ধড়াস করে উঠল।

দুয়ারের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে রয়েচে একটা ধূসরবর্ণ, পিঙ্গলচক্ষু ভীষণাকৃতি সিংহ! আকারে সে বাঘের তিনগুণ! প্রকারে সে আরও বেশি হিংস্র! বাঘ চোখের পলকে গর্জন করে তার উপরে গিয়ে পড়ল। হতবুদ্ধি কালীপদ বামদিকে তাকিয়ে দেখল, তার ক্রোধের বশে ছুড়ে দেওয়া কাচের বোতল মায়ের পায়ে লেগে আছড়ে পড়েচে একটা ক্ষুদ্রাকার পাথরের দুর্গাপ্রতিমার উপরে। বোতলের গায়ে লেগে থাকা একবিন্দু আরক ছিটকে পড়েচে দেবীর বাহনের উপরে। যে আরকের ক্ষমতায় দেবেন্দ্র পাথরের বিড়ালকে প্রাণ দিয়েচিল, আঙুলপ্রমাণ পাথরের সিংহ সেই একই আরকের অসামান্য মহিমায় এবং অসুরদলনী দেবীর কৃপায় পরিণত হয়েচে মহাকায় পশুরাজে। দেবেন্দ্রর রসায়ন তাকে সিক্ত করে প্রাণের অভিষেক সম্পন্ন করেচে। কান্না-ভেজা চোখে মাতৃমূর্তির কাছে শতবার ক্ষমা চাইল কালীপদ। তার গুরু যথাযথ বলেচিলেন, ভবানীর পায়েই সব বিপদের মুক্তি।

কুটিল বাঘ লাফিয়ে এসে দাঁড়াল সিংহের সামনে এবং প্রবল আক্রোশে কান-ফাটানো গর্জন করে উঠল, কিন্তু সে গর্জনে হিমালয়ের রাজার রাজকীয় কেশরের প্রাস্তভাগও স্থানচ্যুত হল না। বদলে সিংহের এক বিরটি খাবার ছিটকে পড়ল শার্দুলরূপী বিশ্বম্ভর। বাঘ যেদিকেই ছুটে পালাতে চায়, দেখা যায়, সেই ভয়ানক সিংহ ততবারই তার হলুদ চোখের সংহারক, শীতল দৃষ্টি মেলে সেইদিক অবরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। অতি সামান্য সময় এইভাবে আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ চলার পর নরহস্তা দুর্দমনীয় নরবাঘকে মাটিতে ধরাশায়ী করে তার কণ্ঠ ছিঁড়ে ফেলল সেই সিংহ। সেইদিকে তাকিয়ে দেখা গেল, সিংহের মুখে টাটকা রক্ত লেগে রয়েচে, আর উঠোনে পড়ে রয়েছে বিশ্বন্তরের ছিন্নভিন্ন দেহ। ঘাড়টা ভেঙে একদিকে কাত হয়ে রয়েচে, আর ডান হাতটা কাঁধের থেকে ছেঁড়া। মৃত্যু তার শরীর থেকে ছদ্মবেশ মুছে ফেলেচে। একটা বিভীষণ নিনাদে চতুৰ্দ্দিক কাঁপিয়ে তুলে সিংহ বাতাসে মিলিয়ে গেল। সিংহের আবির্ভাবের পিছনে আরকের গুণের সঙ্গে সঙ্গে দেবীর প্রভাব ছিল অত্যন্ত প্রকট, তাই হয়তো তিনিই নিজের বাহনকে ফিরিয়ে নিলেন।

কালীপদ অতি ক্লিষ্ট শরীরে উঠোনে এসে ভগ্ন স্বরে কইল, “এই পাপিষ্ঠের : মৃতদেহ এখুনি দাহ করে ফ্যালো। পুঁড়িয়ে ছাই করে দাও।” বলে মূর্ছিত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।

হপ্তাখানেক রায় বাড়ির আদরযত্ন ও পথ্য পেয়ে কালীপদর ঘা নিরাময় হয়ে এল। আরও দিন দুয়েক সেই বাড়িতে থেকে আতিথ্যগ্রহণের পর কালী ফিরে এল গুরুর আশ্রমে। সব শুনে হংসী তান্ত্রিক হোঃ হোঃ হোঃ করে উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠে কইল, “বলিস কী রে হতভাগা। তোর কিনা পেটে পেটে এত? দুর দুর। আমার সেই দিনের কথা আমি ফিরিয়ে নিলুম। নাহ্, মস্তরতন্তর তোর দ্বারা কতখানি হবে তা ওই রাক্কুসিই জানে, কিন্তু এই… এই আমি বলচি… তোর ভূতপ্রেত ঠকিয়ে এবং তাদের সঙ্গে বুদ্ধির লড়াই লড়েই দিন কাটবে, এ তুই একেবারে মিলিয়ে নিস’খন।”

কালীপদ একটু হেসে গুরুর পায়ের ধুলো মাথায় নিল।