কালীগুণীন এবং রাহুর গ্রাস
(পর্ব-১)
‘সুন্দরবন’ নামটুকুর মধ্যেই যেন প্রকৃতিঠাকরুন তার নয়টি রসের মিশেল দিয়ে রেখেচে। বাতাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লবণাক্ত জলের গুঁড়ো। ভয়ংকর আঁধারে ঘেরা মহাবন, পুকুর, বিল, নদী, নালা পেরিয়ে ভয়াল গর্জনকারী উপসাগর, কুমির, কামঠ, সাপ, ডোরাকাটা, কী নেই সেথায়?
তা এই রাওঘড়া গ্রামটিও তেমনই এক আবাদ। রায়দিঘির মহাজঙ্গলে সাগরের গা ছুঁয়ে দাড়িয়ে রয়েচে এই জনপদ। তা বলে রাওঘড়াকে তোমরা যেন নেহাতই ফ্যালনা কোনও গ্রাম ভেবে বোসো না। এ গাঁয়ের উত্তুরে এখনও সেই পৌরাণিক সাধুদের সাধনক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ বর্তমান। মহাতেজস্বী কপিল মুনির ভূতপূর্ব আশ্রমও ছিল এইখেনেই। এই তো ক-দিন আগেই ইংরেজ জরিপের সায়েবসুবোরা কী সব মাপটাপ নিতে এসে মাটি খুঁড়ে একটা আস্ত প্রাসাদেরই ধ্বংস হয়ে-যাওয়া ভগ্নাবশেষ খুঁজে পেল। শহর থেকে মোটরগাড়ি চেপে সায়েবরা এসে ফোটোগ্রাফ তুলে নিয়ে গেল, হইচই হল। তাই বলচি, রাওঘড়া কিন্তু বড়ো হেলাফেলার জায়গা নয়।
গ্রামে প্রায় আড়াইশত ঘর প্রজা। তার মধ্যে দুশো ঘরই বামুন, আর বাকি ঘরগুলিতে বদ্যি, পরামানিক, দু-তিন ঘর ক্যাওড়া প্রজা বসবাস করেন। গাঁখানা ঐতিহ্যময় হলে কী হয়, গাঁয়ের বাসিন্দাগুলি বড়ো পাজি। নিজেদের মধ্যে কেবল কিছু না হোক ঝগড়া, বিবাদ আর কুটিলতার মধ্যে দিয়ে দিন কাটায়। দিনকতক আগেই হরিহর নিয়োগীর বউ জঙ্গলে কাঠকুটো কুড়ুতে গিয়ে পথ হারায়। সারারাত্তির আঁধারে জঙ্গলে কানার মতো ঘুরে ঘুরে সকালের আলো ফুটলে পর দিক চিনে বাড়ি ফেরে। সেদিনই দ্বিপ্রহরে গাঁয়ে সভা বসল। হরিহরের বউ একরাত্তির একলা বাড়ির বাইরে কাটানোর অপরাধে হয় অর্থদণ্ড, নতুবা বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হল। তো, হরিহর কান্নাকাটি করে অর্থদণ্ডই মেনে নিল।
আবার এই কিছুদিন আগেই লক্ষ্মীপূজার হপ্তা দেড়েক পরে একদিন গাঁয়ের সম্পন্ন গৃহস্থ সুরেন বাঁড়ুজ্জে ঘরে ছিল না। তার বউ সরমাকে দুপুর ইস্তক টেলিগেরাপ আপিসের পেয়াদা এসে খবর দেয় যে তার ভাই মোহন অতিশয় পীড়িত। খবর জানতে পেরে সরমা স্বামীর উদ্দেশ্যে ভাঙা বাংলায় দুই ছত্র পত্র লিখে নৌকাযোগে বাপের বাড়ি কাশীপুরে রওয়ানা দেয়। সুরেন বউকে বড়ো ভালোবাসত, আর ততখানিই ভরসা করত, কিন্তু গাঁয়ের মাতব্বররা এই অভিনব আস্পদ্দা লক্ষ করে চোখা চোখা বাক্যবাণ প্রয়োগ শুরু করলে। ভাই সুস্থ হবার পরে চার দিনের মাথায় কালীপূজার প্রভাতে যখন সরমা ফিরে এল, তখন পুনরায় সালিশি সভা বসল, এবং অর্থদণ্ড ধার্য হল। এবারে অঙ্কটা বেশ মোটা রকমের। সুরেন গুনে গুনে তিরিশটি টাকা তাদের হাতে তুলে অব্যাহতি পেল।
তো, এভাবেই দিন চলে যাচ্ছিল, এবং হয়তো ভবিষ্যতেও একইভাবে চলত, কিন্তু যা নিয়ে আমাদের এই গল্প, সেই ভয়ংকর বিপদ খুব নিঃশব্দে নিজের জাল বুনে চলেচিল। অলক্ষে থেকে নজর রাখচিল গাঁয়ের অন্ধিসন্ধির উপরে। এবারে সুযোগ পেয়ে ওঁত পেতে থাকা সেই বিভীষিকা একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাওঘড়ার মাটিতে।
***
গাঁয়ের লোকেরা বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ করচিল যে গ্রামের আদাড়েবাদাড়ে, খেতেখামারে এক ধরনের গাছ গজিয়ে উঠেচে। এবার কয়েক দিনের মধ্যেই সেই অদ্ভুত বৃক্ষগুলি আকাশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তার কয়েকদিনের মধ্যে গাছগুলির শাখায় শাখায় একরকম ফুল গজাল। অদ্ভুত সুমিষ্ট ঘ্রাণ সেগুলির। রাত্তিরে যখন সকলে ঘুমিয়ে পড়ত, তখন সেই ফুলগুলি একযোগে আকাশের দিকে মুখ তুলে তিরতির করে কাঁপত আর সেই সময়ে তাদের মধ্যে থেকে এক ধরনের বিজাতীয় শব্দ নির্গত হত। গাঁয়ের লোকেরা মাঝরাতে মাঝে মাঝে একরকম অচেনা গুঞ্জনের শব্দ পেত, কিন্তু সেগুলি কোথা থেকে আসচে, ধরতে পারত না।
গ্রামের এক মাতব্বর যোগী মৈত্র। সেদিন সাঁঝবেলায় যোগী নামখানা ইস্টিশন থেকে ফিরচিল গাঁয়ে, তা রাওঘড়ায় ঢোকার পূব্বেই মতিহারির জঙ্গলে সন্ধ্যা নেমে পড়ে। যোগী একটু জোরে পা চালাল। মাথার উপর শনশন করে গাছের চূড়ায় বাতাস বইচে। সমুদ্রের একটানা গর্জন ভেসে আসচে। সাগরকে বাঁয়ে রেখে হনহনিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ যোগীর মনে কেউ যেন লুকিয়ে তার দিকে চেয়ে রয়েচে। এমনিতে এসব জঙ্গলের পথঘাট গাঁয়ের ছেলেপিলেরাও ভালোই চেনে, কিন্তু যোগী একটু পরেই খেয়াল করল যে, সে একই পথে ঘুরে চলেচে।
কিছুতেই পথ শেষ হচ্চে না। ভয়ে যোগীর গলা শুষ্ক হয়ে এল। হরিহরের বউটা যে সেদিন সারারাত্তির বাড়ি ফিরতে পারেনি, তার কারণটা এবার সে হাড়ে হাড়ে টের পেলে।
ইষ্টনাম জপ করে সে আবার নতুন উদ্যমে এগোতে যাবে, সহসা সাগরের শব্দ, বাতাসের শনশনানিকে ছাপিয়ে কানে এল আরেকটি আওয়াজ। কেউ যেন খুব চাপাকণ্ঠে খিলখিল করে হেসে চলেচে। আতঙ্কে কাঠ হয়ে গিয়ে যোগী শব্দের উৎস খুঁজতে চোখ মেলল মাথার উপরে। বিশালাকার ঝাউ গাছটার একদম মগডালে কী যেন একটা কাপড়ের মতো লটকে রয়েচে। বাতাসে সেটা নড়চে। যোগী ভালো করে তাকিয়ে রইল সেইদিকে, আর আচমকা বুঝতে পারল সেই জিনিসটা মোটেই জড়বস্তু নয়। গাছের মগডাল থেকে বেয়ে বেয়ে সেটা নেমে আসচে নীচের দিকে। কিছুক্ষণ বিস্ময়ে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে থাকার পর যোগী লক্ষ করল, মূর্তিটা অনেকটাই নীচে নেমে এসেচে, আর তার মধ্যে একটা মানুষের মুখের মতো আকার দেখা যাচ্চে।
হঠাৎ আকাশ-বাতাস ধ্বনিত করে সেই সব ক-টি অদ্ভুত গাছ যেন একসঙ্গে খিলখিল করে হেসে উঠল। তাদের একটানা কর্ণবিদারী, অসহ্য গুনগুন গুঞ্জনে বধির হবার উপক্রম হল। যোগী আড়ষ্টতা কাটিয়ে হুড়মুড়িয়ে দৌড় দিল, আর সেই মূর্তি গাছের মাঝখান থেকেই প্রচণ্ড বেগে লাফ দিয়ে তার ঘাড়ে এসে পড়ল। গাছগুলোর কান-ফাটানো শব্দ তখন চরম সীমায় পৌঁছেচে। সেই ভয়াল প্রেত নিজের সুতীক্ষ্ণ দাঁতের পাটি বসিয়ে দিল যোগীর গলায়। যোগীর দশাসই শরীরটা ছটফট করতে করতে নিস্তেজ হয়ে এলিয়ে পড়ল, আর কোনও এক মায়াবলে সব কটি রাক্ষুসে গাছ একসঙ্গে গুঞ্জন থামিয়ে নৈঃশব্দ্যে ডুবে গেল। নিস্তব্ধ মহাবনের মিশকালো আঁধারে তখন শুধু সাগরের শোঁ শোঁ, বাতাসের ধ্বনি আর কাঁচা মাংস ছিঁড়ে খাবার শব্দ।
***
ভোরের আলো ফোটামাত্র ভয়ানক হইচই শুরু হয়ে গেল। মৌলিদের দল বাড়ি ফেরার পথে খুব ভোরে আবিষ্কার করে যোগী মৈত্রর মৃতদেহ। ঘাড়টা ভগ্ন। শরীর রক্তশূন্য। পেটের কাছে কিছুটা মাংস নেই। চোখ আতঙ্কে ঠিকরে বেরুতে চাইচে। রক্তের অভাবে শুকিয়ে কাঠ হয়ে-যাওয়া শরীরটা দেখে নানান জল্পনা আরম্ভ হল।
গোঁসাইঠাকুর কইলেন, “এ নিশ্চয়ই বড়োমিয়াঁর কাজ। না হলে এমন দেহবল আর কার রয়েচে?”
দেবেন চাটুজ্জে কইলেন, “শোনো কথা গোঁসাইয়ের, বাঘে ধরলে কখনও ওইটুকুন মাংস খেয়ে ফেলে যায় নাকি?”
সীতাপতি ভটচাজ হল এ তল্লাটের গাঁওবুড়া। তাঁর ভাণ্ডারে অসংখ্য অভিজ্ঞতা। সে মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে কইল, “না হে ঠাকুরেরা, এ কোনও জন্তুর কম্ম নয়। দেখছ না ঘাড়টা মটকে উলটোপানে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েচে! আর বলি, জন্তটা কি আকাশ থেকে উড়ে এসেচে? দেহের আশপাশেও মৌলিরা কোনও পায়ের ছাপ দেখতে পায়নি। যোগী মরার আগে এমন কিছু দেখেচিল, যা সে আগে কখনও দেখেনি। ওর দৃষ্টি আমি যেন পড়তে পারচি। এভাবে ঘাড় মটকে কারা হত্যা করে, জানো তোমরা? শোনোনি কখনও?” আর কইবার বিশেষ আবশ্যকতা ছিল না।
সোঁদরবনের প্রজারা বাঘের গতিপ্রকৃতি যতখানি জানে, মানুষদের মতিগতি যতটা চেনে, না-মানুষদের হালচালও ততটাই বোঝে। গোটা গাঁয়ে মুহূর্তের মধ্যে ভয়ানক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।
মেয়েমানুষরা সবাই ঘরে ঢুকে দোর দিল, কিন্তু পুরুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়। তারা অতি সতর্কভাবে কাজকর্ম করতে লাগল। কিন্তু সেই হিংস্র প্রেতটি চতুরতায় ছিল এই মানুষগুলির চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। তার প্রমাণ রাওঘড়া গ্রাম পেল ঠিক আড়াই দিন পরে। অতি মর্মান্তিকভাবে।
খগেন মাইতি জাতে জেলে নয় বটে, কিন্তু তার মাছ ধরার হাত ছিল খলিফা। আধমনি-একমনি রুই-কাতলা হেলায়-ফেলায় ধরে ফেলত। তা সেদিন খগেন দুপুরের দিকে মাছ ধরতে গেল হেঁতালদিঘিতে। লালপুলের নায়েবের বাড়িতে আজ রাত্তিরে ছেলের ইস্কুল পাস দেওয়া উপলক্ষ্যে ভোজ। পনেরো সের পাকা কাতলার বরাত রয়েচে। খয়রা দ্বীপটা যে জায়গাটিতে শেষ হচ্চে, তার পাশে সাগরপারের ঘন ঝাউজঙ্গলের মধ্যে হেঁতালদিঘি। খগেন যখন মাছ ধরতে বসল, তখন সূর্য মাথার উপরে আগুন ঝরাচ্চে, কেবল হেমন্তের শেষ বলে ততখানি তাপ লাগচে না এই রক্ষা। গোটা তিনেক মাছ সবে ধরা হয়েচে, আর একখানি হলেই হয়, কিন্তু শেষের মাছটা বড্ড খেলাচ্চে। টোপ খেয়ে তিনবার পালিয়েচে, ফাতনাও নড়েচে, কিন্তু টোপের মধ্যে থাকা বড়শি গেলেনি। যারা মাছ ধরতে ভালোবাসে, তারাই বুঝবে এই নেশা কী নেশা। কতখানি এর আসক্তি। অসম্ভব রোখ চেপে গেল খগেনের। : চোখ-মুখ খিঁচিয়ে সে পরপর নতুন নতুন টোপ দিয়ে ছিপ ফেলতে লাগল, কিন্তু যে-কে-সেই। এইভাবে অনন্তবার চেষ্টা করতে করতে একবার ছিপ আটকাল। তড়িঘড়ি এক হ্যাঁচকা টান দেওয়ামাত্র পাড়ে এসে পড়ল একটা আধমনি পাকা রুই। সাফল্যের আবেগে খগেন স্ফূর্তিতে উপরদিকে মাথা তুলে আনন্দের চিৎকার করে উঠল, আর সভয়ে আবিষ্কার করল, সূর্য বহু আগে অস্ত গিয়েচে।
একটা ভয় খগেনকে চেপে ধরল। এ কী করেচে সে! এই বিপদের সময়ে এই রাত্তিরে সে জঙ্গলে একা? দিঘির ওপারে একটা একটা করে বেশ ক-টা নক্ষত্র ফুটে উঠেচে। তারাগুলির দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে খগেন সময়টা আন্দাজ করার চেষ্টা করতে লাগল, আর সামান্য সময়ের মধ্যেই তার মনে হল, যেগুলির দিকে তাকিয়ে সে সময় বোঝার চেষ্টা করচে, সেগুলি আর যা-ই হোক, নক্ষত্র নয়!
ভালো করে ঠাহর করে খগেনের হৃদ্যন্ত্র ধড়াস করে উঠল! নক্ষত্র নয়, ওইগুলি কারও একজোড়া চোখ। যার চোখ, সে বাতাসে ভর করে এগিয়ে আসচে হু হু করে। একবুক বাতাস টেনে নিয়ে খগেন এলোপাথাড়ি দৌড় দিল জঙ্গলের পথ দিয়ে, আর শুনতে পেল অচিন গাছগুলির ফুলে ফুলে, শাখে শাখে যেন দক্ষযজ্ঞ বেধে গিয়েচে। কান বধির করে দেওয়া একটা কলরব চলচে, যেন তারা নিজেদের মধ্যে খগেনের নিধনের সময় স্থির করচে। খগেনের পা ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেচে, কিন্তু কেবল মনের জোরে পা চালিয়ে যেতে লাগল। আচমকা মাথার উপরের গাছগুলির চূড়ায় কী যেন একটা হুটোপুটি করে উঠল, আর মুহূর্তের মধ্যে প্রলয়ংকর ঝড় উঠল বনের মধ্যে।
সাগরপারে যাঁরা থাকেন, কেবল তাঁরাই জানেন ঝাউবনের ঝড় কী ভয়াবহ হতে পারে। গাছগুলি যেন ঝড়ের দাপটে মড়মড় করে ভাঙচে আর বালুমিশ্রিত লোনা বাতাস ঘুরপাক খেয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস স্তব্ধ করার জোগাড় করেচে। খগেনের সামনে একটা বিশাল বৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত হয়ে ভূমিশয্যা নিল, আর তাতে ধাক্কা খেয়ে খগেন চিতিয়ে পড়ল শুকনো পাতার উপর। গুরুজনরা বলেন, ভয় পেলে কক্ষনো পিছনে তাকাতে নেই। পিছনে তাকালে ‘ভয়’টা সামনের দিকে চলে আসে। তা, সেই আপ্তবাক্য বিস্মৃত হয়ে কম্পিত দেহে খগেন মুণ্ডু ঘোরাল নিজের পিছনদিকে। কেউ নেই!
কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে সে যেইমাত্র আবার সামনের দিকে মুখ ফিরিয়েচে, সঙ্গে সঙ্গে একটা বুকফাটা চিৎকার বেরিয়ে এল তার মর্মস্থল থেকে। গাছগুলি অবোধ্য ভাষায় খিলখিল করে উঠল।
***
পরদিবসে সুরেন, দিবাকর, চাটুজ্জে, গোঁসাই এবং গ্রামের বাকি মাথারা সমস্ত বিবাদ ভুলে এক সভা বসাল। আশু মরণ হতে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে হবে। বুভুক্ষু কোনও প্রেতাত্মার করাল থাবার থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হবে। খগেনের ঘাড় মটকানো, রক্তহীন দেহটা সকালেই পাওয়া গিয়েচিল, এবং এ যে কুমির, ময়াল অথবা বড়োমিয়াঁর কাজ নয় তা সোঁদরবনের অভিজ্ঞ প্রজারা সহজেই বুঝতে পেরেচে। তবে এ কে?
গোঁসাই কইল, “শোনো ভায়া, অশরীরীর সঙ্গে লড়াই দেওয়া মনিষ্যির কাজ নয়। এর জন্য ঝাড়ফুঁকের আবশ্যক। আমাদের কোনও ওঝার খোঁজ করতে হবে।”
দিবাকর, চাটুজ্জে এবং বাকিরা কথাটা একযোগে সমর্থন করল। দিবাকর পণ্ডিত বললে, “সঠিক কথা কয়েছ ঠাকুর। কিন্তু ভালো ওঝা পাই কোথা?” চাটুজ্জে একসময়ে শহর কলকাতায় কিছু দিবস থেকেচে। সে কইল, “কলকেতা শহরের নেবুতলার ইস্টিশন থেকে একখানা গাড়ি রয়েচে জিলা বীরভূমে যাবার। সেখানায় চেপে নামতে হয় মাড়গ্রাম ইস্টিশনে। সেইখেনে রয়েচে দেবী মায়ের শক্তিপীঠ তারাপীঠ। সেইখেনে শ্মশানে অসংখ্য বাঘা বাঘা ওঝা রয়েচেন। সেখান থেকে কাউকে ডাকলেই চলে।”
তা-ই স্থির রইল। ঠিক হল, পরদিন চাটুজ্জে আর দিবাকর যাবে মাড়গ্রামে, আর ফিরবে তার পরের দিন। হয়তো তা-ই হত, কিন্তু সেই রাতেই বেঘোরে প্রাপ্ত হারাল দেবেন্দ্র চাটুজ্জে।
পরদিন সকাল সকাল বেরুতে হবে বলে একটু তাড়াতাড়িই বিছানা নিয়েচিল চাটুজ্জে। রাত আন্দাজ দ্বিতীয় প্রহর নাগাদ তার একটু ‘বাইরে’ যাবার প্রয়োজন পড়ল। কাজের লোক বিশু চিমনিওয়ালা লন্ঠন নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। কাজ সেরে দু-জনে যখন বাড়ির উঠানে পা রেখেচে, হঠাৎ কানে এল, পুবদিকের ইঁদারার থেকে বুড়বুড়ি ওঠার শব্দ আসচে। অবাক হয়ে কিছু সময় চেয়ে থাকার পরে চাটুজ্জে কয়েক পা এগিয়ে ইঁদারায় উকি দিল।
টলটলে জল ছাড়া কিছুই চোখে পড়ার মতো নেই। বিশু ভয়ার্ত কণ্ঠে কইল, “ও কী ও? শুনেচেন কৰ্ত্তাবাবা?”
চাটুজ্জের কানে এল, পাশের দীনে নাপতের বাড়ির মুরগিগুলো যেন খাঁচা ভেঙে পালানোর জন্য ছটফট করচে। তাদের মধ্যে একটা আতঙ্কের হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েচে। বিশু কাঁপতে কাঁপতে বললে, “আমার ব্যাপার বড়ো সুবিধার ঠেকচে না কৰ্ত্তা। এই বেলা ঘরে সেঁধিয়ে আগল দিই, চলেন।”
চাটুজ্জে বিশুর কথায় সায় দিয়ে উত্তর করলেন, “ঠিক বলেচিস বিশে, আমারও যেন গা-টা ভারী হয়ে আসচে। অলুক্ষুনে গাছগুলোর থেকেও কী সব যেন আওয়াজ আসচে। মনে হচ্চে যেন আশেপাশেই …”
চাটুজ্জের কথা সমাপ্ত হবার পূর্ব্বেই কুয়ো থেকে উঠে এল একটা বিশাল কৃষ্ণবর্ণ রাক্ষুসে হাত। বাঁকানো নখরগুলি বিধিয়ে দিল চাটুজ্জের পিঠে। বিশু ভয়ংকর আর্ত চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেল, আর চাটুজ্জের নিস্তেজ দেহটাকে নিয়ে হাতটা তলিয়ে গেল কুয়োর গহিনে।
পরদিন নেবুতলা যাওয়া হল না। কুয়ো থেকে উদ্ধার করা চাটুজ্জের মৃতদেহ সৎকার করে বিকালে সকলে বিমর্ষ চিত্তে গৃহে ফিরল, আর সেদিন রাত্তিরেই বাড়ির মাটির দেওয়াল খুঁড়ে দিবাকরকে তুলে নিয়ে গেল সেই অজ্ঞাত আততায়ী। দিবাকরের দেহ আর পাওয়া গেল না। তারাপীঠের শ্মশান হতে ওঝা আনার পরিকল্পনা আর কেউ মুখেও আনে না। এ কথা গাঁয়ের ছয় বৎসরের শিশুটাও বুঝলে যে, ওই পিশাচ এই গ্রামে চলা প্রতিটি পদক্ষেপের সংবাদ রাখে। সে বড়ো ধূর্ত, সে বড়ো কুটিল। তার দয়ার উপর নিজেকে ছেঁড়ে দেওয়া ব্যতীত গত্যন্তর নেই আর। প্রজারা অস্বাভাবিকরকম নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ল, কিন্তু সুরেনের বক্ষে শেল বিধল। একপ্রকার মানুষ থাকে, যারা মৃত্যুকে সুমুখে দেখেও মাথা নোয়ায় না। তাদের শিরদাঁড়া বড়ো অনমনীয়। তাদের জীবন অপেক্ষা সম্ভ্রম অধিক মূল্যবান। সুরেন সেই দলেই পড়ে। সে রাত্তিরের আঁধারে গ্রাম থেকে বেরুবার উপায় খুঁজতে লাগল।
সুরেন কথাটি নিজের মধ্যেই গুপ্ত রেখেচিল, কিন্তু নিজের বউ সরমার থেকে আড়াল করতে পারল না। স্বামীর পরিকল্পনা জেনে সরমা আছাড় খেয়ে পড়ে মাথা কুটতে লাগল। কইল, “ওগো, তোমাকে অতি বড়ো দিব্যি রইল, তুমি এসবের মধ্যে নিজেকে জড়াতে পারবে না। গাঁয়ের অন্য কেউ যাক-না কেন। সকলে ভয়ে ঘরে বসে থাকবে, আর আমার কপাল পুড়বে বুঝি? এই তোমার দেওয়া শাঁখা-সিন্দুরের দিব্যি, তুমি যেতে পারবে না।”
সুরেন বিরক্ত হয়ে চাপা গলায় ধমকে বললে, “আঃ সুরো, এত জোরে এসব বলিসনে হতভাগি। কাপুরুষ স্বামীর সধবা হওয়ার চেয়ে বীরপুরুষের বেওয়া হওয়া বেশি সম্মানের। এভাবে কি তুই আমাকে বাঁচাতে পারবি, বোকা? একে একে সকলকে মারতে মারতে আমাকেও একদিন সে মারবে। তার চাইতে একটা চেষ্টা করা ভালো।” সরমার কান্নাকাটি, হাতে-পায়ে পড়াতে ফল দিল না।
সন্ধ্যা গাঢ়তর হবার পর ক্যাম্বিসের ব্যাগ নিয়ে সুরেন বেরিয়ে পড়ল। সরমা শুষ্ক চক্ষে চলার পথে চেয়ে রইল।
***
অতি নিঃসাড়ে বটতলা অবধি এসে চাপল ভরতের গো-গাড়িতে। ভরতকে অনেক পয়সার প্রলোভন দেখিয়ে, বাবা-বাছা করে রাজি করিয়েচে সুরেন। সে মীরখালি ইস্টিশন অবধি পৌঁছে দেবে তাকে। নিশুতি আঁধারে ডুবে-থাকা পুথ দিয়ে কপ কপ শব্দ করে চলতে শুরু করল গোচক্রযান।
জিলা সুন্দরবনের পথে রাত্তিরে গাড়ি চালাবার কিছু অলিখিত নিয়ম রয়েচে। যেমন, চলবার সময়ে মাঝপথে কোনও যাত্রী সওয়ার হতে চাইবেও না, আর গাড়োয়ান তাকে তুলবেও না। চলার পথে বাঁয়ে শেয়াল ডাকলে গাড়ি কিছু সময় দাঁড়িয়ে যাবে, ইত্যাদি। এসব পথে তোমরা যদি গোরুর গাড়িতে চেপে কখনও যাও, তবে একটা ভারী অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পাবে। মিশকালো নিশ্ছিদ্র আঁধারে যখন নিজের হাত-পা অবধি দেখা যায় না, তখনও গাড়োয়ানরা বেশ সুন্দরভাবে আঁকবাঁক কাটিয়ে গাড়ি চালায়। এই রহস্যের উত্তর তোমরা রাস্তার দিকে তাকালে কিন্তু পাবে না, পাবে আকাশের দিকে চাইলে।
দু-পাশে বিশালাকার সব বৃক্ষ পথের শ্রেণি রচনা করেচে, এবং মাথার দিকে চাইলে দেখবে, গাছের চূড়ার শেষ প্রান্তে সরু পথের মতোই আঁকাবাঁকা আকাশ দেখা যাচ্চে। গাড়োয়ান সেই আঁকাবাঁকা আকাশ দেখেই গাড়ি চালায় এবং নিখুঁতভাবে পথের হদিস পায়। যা-ই হোক, হাজারটা অকাজের কথা এসে পড়ছে মাঝখানে।
তা, ভরত গাড়োয়ান সুরেনকে নিয়ে চলতে থাকল এ বাঁক-ও বাঁক ঘুরে। রাওঘড়া হতে যে চওড়া রাস্তাটা খয়রামারি অবধি চলে গিয়েচে, সেই পথটার কাছাকাছি এসে গোরুগুলো থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
দুজনে একটু সময় অবাক হয়ে রইল। গাছগুলির মাথায় মাথায় কীসের যেন ফিশফাশ গুঞ্জন। ভরত গোরুগুলিকে পাঁচনের খোঁচা দিতেই তারা ডেকে উঠল।
ভরত গোরুগুলিকে বেশ ভালোভাবেই তাড়না করচিল, কিন্তু এইবারে তাদের ডাক শুনে ভরতের মুখ শুকিয়ে গেল।
“কী হয়েচে কী ভরত? ব্যাপারখানা কী?” সুরেন জিজ্ঞেস করল।
“কর্তা… ব্যাপার বড়ো ভালো ঠেকচে না। গোরুর এ ডাক মোটে ভালো ডাক নয়। ভুলা আর বুধো কিছু একটা কারণে খুব ভয় পাচ্চে। কিন্তু আমাদের চোখে তো কিছুই…”
ভরতের কথা অর্ধপথেই মিলিয়ে গেল। দু-জনেই সামনের দিকে চেয়ে হত্উম্ব হয়ে দেখল, বহু দূরের পথ থেকে এক বিশালাকার সাদা মূর্তি ছুটে আসচে এইদিকে, আর সে মূর্তি যত নিকটে আসচে, অপয়া গাছগুলির কোলাহল শতগুণ বৃদ্ধি পাচ্চে। দু-জনে হাত-পা নড়াবার ক্ষমতাও বুঝি হারিয়ে ফেলেচিল, কিন্তু গোরু দুটো তা হারায়নি। তারা প্রাণপণে উলটোদিকে ঘুরে দুড়দাড় করে দৌড়োতে শুরু করল। ভরত আর সুরেন আতঙ্কে কাঠ হয়ে বসে রইল গাড়িতে, আর সেই করালদর্শন পিশাচ পিছনে পিছনে দৌড়ে তাড়া করে আসতে থাকল। বাঁকের মুখ ঘোরবার সময় ঘটে গেল অঘটনটা।
গোরু দুটো প্রাণভয়ে দৌড়োবার ফলে দিক হারিয়ে একটা প্রকাণ্ড গর্তে গিয়ে পা মুড়ে পড়ে গেল। সুরেন ছিটকে পড়ল গাড়ি থেকে, আর কোনওরকমে উঠেই এলোমেলোভাবে ছুটতে শুরু করল। একটা পায়ে ভীষণ আঘাত লেগেচে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নিজের দেহটাকে টানতে টানতে পালাতে থাকল সুরেন আর অনুভব করল, জঙ্গলে ভয়ানক তুফান উঠেচে। মড়মড় করে গাছপালা ভেঙে পড়ছে, আর গোটা বন জুড়ে গাছে গাছে পৈশাচিক উল্লাসে কোলাহল করচে কারা।
শ্বেতবর্ণ পিশাচটা যখন মাত্র তিন-চার রজ্জু তফাতে রয়েচে, জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে সুরেনের চোখে পড়ল আবছা আবছা আলো। হাঁচোড়পাঁচোড় করে বনবাদাড়ের পাতা সরিয়ে সুরেন দেখলে, বিশ-বাইশজনের একখানা দল একটি চতুর্দোলাকে নিয়ে ছুটে চলেচে। পালকির ভিতর থেকে একটি নারীকণ্ঠের আর্ত চিৎকার ভেসে আসচে। লোকগুলির চেহারা দশাসই। হাতে বল্লম, সড়কি আর মশাল। সম্ভবত কোনও ডাকাতের দল পালকি সমেত কোনও মেয়েমানুষকে লুঠ করে পালাচ্চে, যা কিনা আকছারই হয়ে থাকে।
হোক ডাকাত, হোক বদমায়েশ, তবুও জীবিত মানুষই তো। সুরেন আশায় বুক বেঁধে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মানসে চিৎকার করতে গিয়ে ঠাহর করল, তার গলা থেকে আওয়াজ বেরুচ্চে না। কোন মায়াবী নিজের মায়াবলে তার কণ্ঠ রুদ্ধ করে রেখেচে। কম্পিত দেহে পিছন ফিরে দেখল, সেই বিভীষিকাময় অবয়ব একখানা বিশাল গাছকে উপড়ে হাতে তুলেচে। সেই প্রকাণ্ড গাছের শুঁড়িখানা মাথার উপর তুলে হিংস্র আক্রোশে ছুড়ে মারল সুরেনের দিকে। মানসিক শ্রান্তি আর উত্তেজনার চরম সীমায় পৌঁছে সুরেন নিঃসাড়ে জ্ঞান হারাল।
(পর্ব-২)
কতক্ষণ সময় কেটেছে খেয়াল নেই, একসময় লুপ্ত চেতনা ফিরে পেয়ে সুরেন খেয়াল করল তার একটি পা আষ্টেপৃষ্ঠে দড়ি দিয়ে বাঁধন দেওয়া। সুমুখে দাঁড়িয়ে রয়েচে চারজন বলিষ্ঠ পুরুষ। তিনজনের হাতে ছুঁচোলো ভগ্ন, আর অপরজনের কপালে রক্তসিন্দুরের তিলক, মুখ ভাবলেশহীন, গলায় টকটকে লাল পুঁতির মালা। এই লোকটি বোধ করি এদের দলপতি। সে সুরেনের পানে চেয়ে গম্ভীর স্বরে কইল, “কে তুই? এই জঙ্গলে মরতে এসেচিলি কেন?”
হোক এরা দস্যু, কিন্তু অনতিবিলম্বের ওই ভয়ংকর মৃত্যু থেকে মুক্তি পেয়ে সুরেনের মনে কিঞ্চিৎ বলসঞ্চার হয়েছিল। সে ক্লিষ্ট কণ্ঠে কইল, “আমি সুরেন। সুরেন্দ্রনাথ বাঁড়ুজ্জে। ব্রাহ্মণ। রাওঘড়া তালুকের প্রজা। আপনারা?”
ভরাট স্বরে প্রত্যুত্তর এল, “ব্রাহ্মণ। নাম কালীপদ মুখুজ্জে। নিবাস রায়দিঘড়া।”
“তুই বোধ করি আমাদের দস্যু ঠাউরেচিস, নয়? আমি রায়দিঘড়ার জমিদার। আমার কন্যা সন্তানসম্ভবা। সন্ধ্যায় তার প্রসববেদনা উঠেচিল। গাঁয়ের কোবরেজ অত্যন্ত পীড়িত, তাই যাচ্চিলাম কোবরেজপাড়ায় নিশি কোবরেজের বাড়ি। এইখেনে এসে হঠাৎ শুনি হাওয়া নেই, বাতাস নেই, অথচ গাছের মাথায় এক জায়গায় ঝড় হচ্চে। মড়মড়িয়ে গাছপালা উপড়োচ্চে। আমি তো ভয়েই মরি। তারপর একটু সাহস করে এই কানাইকে নিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখি, একটা প্রেত না পিশাচ হাতে একখানা গাছের গুঁড়ি মুগুরের মতো তুলে তোকে মারতে যাচ্চে। তা, আমাদের দু-জনকে একসঙ্গে দেখে বোধহয় ভয়টয় পেয়ে পালিয়েচে। তখন তোকে টেনে নিয়ে এলুম আর কী। মেয়েকে পাইকদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলুম, আর আমি অপেক্ষা করে গেলাম তোর হুঁশ আসার জন্য। তারপর দেখি, তোর পা-টা মচকে গিয়েচে। খুঁজেপেতে হাড়-জোড়া লতা এনে পা-টা বেঁধে দিলুম।”
সুরেন হতবাক হয়ে তাকিয়ে শুধোলা, “সে পালিয়েচে? মাত্তর দুজনকে দেখে? যে একাই এমন কয়েকশত মানুষের অধিক শক্তি ধরে, সে আপনাদের দেখে পালাল? আমি আপনাকে চিনতে পেরেচি, ঠাকুরমশায়…”
সুরেন আবেগে ফুঁপিয়ে উঠে সটান শুয়ে পড়ল কালীগুণীনের পায়ের কাছে।
“আরে হতভাগা, করিস কী? সর বলচি। পা ছুঁবিনে খবর্দ্দার। ছুঁলি বুঝি?”
সুরেন নতজানু হয়ে বসে আর্দ্রকণ্ঠে মিনতি করে বলল, “আমাদের উদ্ধার করুন ঠাকুর। গাঁ আমাদের ছারখার হয়ে গেল এই শয়তানের জন্য। রোজ একটা করে মানুষ মরচে। আপনি পারবেন। আমার মন বলচে। রক্ষা করুন। অসহায়কে ফিরিয়ে দেবেন না মহাশয়।”
কালী কুণ্ঠিত মুখে সহচরের দিকে তাকিয়ে কইল, “এ তো মহা আতান্তরে পড়া গেল, কানাই। কী করি বল দেখি। মেয়েটার এদিকে এই অবস্থা, তার মধ্যে…”
কানাইয়ের জবাব দেবার আবশ্যকতা ছিল না। সে জানত, কালীপদ সুরেনকে ফেরাবে না। কখনও সে কাউকে ফেরাতে পারেনি। নিজের মেয়ের বিবাহের দিন মণ্ডপে উপস্থিত না থেকে সে নেকড়েমারির কানাওয়ালাকে জন করে গ্রামের লোকেদের বাঁচিয়ে দিয়েচিল। নিজের উদ্যোগে সারারাত্তির পাে হেঁটে হাসপাতালের ভূতকে মারতে পৌঁছে গিয়েচিল। শানিয়াড়ির ভয়ংকর প্রেতের সামনে স্বেচ্ছায় বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েচিল। বোলতা গ্রামের অতি ভয়ানক বাঘামুড়ার মোকাবিলা করেচে অতি কূটবুদ্ধির সঙ্গে। এমনকি পুরুলিয়া পলাশবাড়ির নরখাদক আপাইকেও মুক্তি দিয়েচিল সুচতুরভাবে। কানাই সব জানে।
কালীপদর গুরুর নিৰ্দ্দেশ ছিল, কক্ষনো কোনও অসহায়কে, আতকে ফেরানো চলবে না, এবং নিছক নামের জন্য বিদ্যা ব্যবহার করা চলবে না। ফেরা চেহারাটি বলিষ্ঠ হলে কী হয়, কালীপদর হৃদয়টি শিশুদের মতোই আবেগপ্রবণ, অথচ প্রয়োজনের কালে সেটিই হয়ে ওঠে বজ্রকঠিন। অতঃপর বাকি দু-জন লেঠেলকে কোবরেজপাড়ায় রওয়ানা করে দিয়ে কালীপদ আর কানাই সর্দ্দার সুরেনের সঙ্গে হাঁটা দিল রাওঘড়ার উদ্দেশে।
ঊষালগ্নের ঠিক মুখে তারা এসে দাঁড়াল সুরেনের গৃহের সামনে। একটা-দুটো পাখি ডাকচে, হেমন্তের শিশির গাছের থেকে টুপটাপ ঝরে পড়চে পুকুরের জলে, দূর আকাশের প্রান্ত দিয়ে একঝাঁক সাদা বকের সারি উড়ে গেল অজানার উদ্দেশে। কে বলবে যে এই স্নেহ মাখা মধুর প্রকৃতির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েচে অন্য এক কালো অপচ্ছায়া! প্রকৃতির গোপন মারণশক্তি। এই কোমল রূপের সঙ্গে ওই সংহারমূর্তি যে কোনওভাবেই মেলে না!
সুরেনের ডাক শুনে সারারাত দুশ্চিন্তায় জর্জরিত সরমা ধড়মড় করে বেরিয়ে এসেই সুরেনের বুকে মাথা রেখে ডুকরে উঠল। সুরেন বিব্রত কণ্ঠে জিব কেটে কইলা, “আরে ছি ছি, মর কানা কোথাকার।”
সরমাও হঠাৎ কালীপদদের দিকে লক্ষ্য করে আধ হাত ঘোমটা টেনে, জিহ্বা দংশন করে দৌড়ে ঘরে গিয়ে ঢুকল। কালী মুচকি হাসল। কানাইও।
সূর্য ঠিকমতো উঠতে-না উঠতেই গোটা গাঁয়ে চাউর হয়ে গেল, সুরেন এক তান্ত্রিককে নিয়ে এসেচে। মাতব্বররা একে একে জড়ো হল বাঁড়ুজ্জেবাড়িতে। তাদের সকলকে নিয়ে কালীপদ বেরুল গ্রামটা ঘুরে দেখতে। ঋষিদের সেই আশ্রম, কপিলাশ্রম ঘোরার পরে সকলে উপস্থিত হল খুঁড়ে বের করা সেই রাজপ্রাসাদের সামনে। কালী অনেকক্ষণ অপলক চেয়ে রইল সেদিকে।
কৃষ্ণবর্ণ পাথরে তৈরি দেওয়াল, দুই মানুষ উঁচু নিশ্ছিদ্র প্রাচীর, সব কিছুই অতি নিখুঁত। এই প্রাসাদের কোনও চূড়া নেই। দেখা শেষ হলে আস্তে আস্তে কালীপদ সকলকে নিয়ে ফিরতে থাকল এবং মতিহারির বনের নিকটে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। মাথা উঁচু করে গাছপালাগুলি দেখে নিয়ে আবার চলতে শুরু করল আর সমস্ত পথ বিড়বিড় করতে থাকল, “আশ্চর্য তো। অতি আশ্চর্য!”
দ্বিপ্রহরে বাইরের দাওয়ায় সুরেন, কানাই আর কালী বসেচিল আহার করতে। দেউড়ির বাইরে গোটা তিনেক নেড়িকুকুর আর একটি শাবক তাদের ভুক্তাবশেষের দিকে চেয়ে ল্যাজ নাড়ছিল।
খাওয়া শেষে বাইরে আচমন করার সময়ে কালীপদ গোটাকতক মাছের কাঁটা এনে তাদের ইতিউতি ছুড়ে ছুড়ে দিতে লাগল। দেখাদেখি কানাইও। কুকুরগুলি নিবিষ্টচিত্তে সেগুলো ভক্ষণ করতে লাগল।
একসময়ে কাঁটা শেষ হয়ে গেলে পর কুকুরগুলি আরও কিছু পাবার আশায় ল্যাজ নেড়ে নিরাশ হয়ে চলে গেল। কালী ভিতরবাড়িতে ফিরতে উদ্যত হয়েছিল, আচমকা কী একটা মনে পড়ায় বিদ্যুতের মতো পিছন ঘুরে দাওয়া থেকে নেমে এসে তাকিয়ে রইল ভুক্তাবশেষগুলির দিকে। তখনও কিছু কিছু মাছের কাঁটা পড়ে রয়েছে। সেগুলির দিকে তাকিয়ে কালীপদ ভ্রু কুঞ্চিত করে অস্ফুট স্বরে কইল, “তা-ই তো কানাই। এ যে বড়ো বিপদে পড়লাম রে।”
***
একখানা সুপুরি মুখে দিয়ে কালীপদ গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেল। বড়ো ভয়ংকর বিপদ নেমেচে রাওঘড়া তালুকে। যে অদ্ভুত গাছগুলি গজিয়ে উঠেচে গ্রাম জুড়ে, এর নাম রাহুমুখী গাছ।
প্রকৃতির অভিশাপ এই শয়তান গাছগুলো দিনের বেলায় ঘুমোয় আর সারারাত্তির মহাকাশের অচিনপুরে অবস্থিত দৈত্যলোকে দৈত্যপতি রাহুর পাে মুখ করে জেগে তাকিয়ে থাকে। অদ্ভুত সুরে তাকে মর্ত্যলোকের খবর পাঠায়। পুরাকালে দেবাসুরের অমৃতভাগের সময়ে রাহু দেবতা সেজে পঙ্ক্তিতে বসে পড়ে। চতুর শ্রীবিষ্ণু সেই ছলনা বুঝে ফেলে সুদর্শন দ্বারা রাহুর মস্তকচ্ছেদ করেন। সে সময়ে রাহুর কয়েক বিন্দু রক্ত এসে পড়ে এই অরণ্যের ভূমিতে। সেই রক্তবিন্দু থেকে জেগে ওঠে এক দ্বিতীয় রাহু। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর ধ্বংসসাধনে মেতে ওঠে সেই ভয়ানক পিশাচ। কিন্তু যে অরণ্যে বাঘা বাঘা সাধক রইতেন, একটা পিশাচের সাধ্যি কী সেখানে খাপ খোলে। সেই সাধকরা মন্ত্রবলে বন্দি করেন পিশাচকে এবং এক নিশ্ছিদ্র কারাগার নির্মাণ করে তাতে অনন্তকালের জন্য সমাহিত করে সেই প্রাসাদকে ভূমির নীচে পাঠিয়ে দেন, আর এই এলাকার নামকরণ করেন ‘রাহুগড়’, যার অপভ্রংশ রাওঘড়া হয়ে দাঁড়িয়েচে।
সেই কারাগারই এখন মাটি খুঁড়ে বেরিয়ে পড়েচে, যাকে মানুষ প্রাসাদ ভেবেচে, আর সেই বন্দি শয়তান মুক্তি পেয়েচে। তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে, বিন্দুতে বিন্দুতে রয়েচে স্বয়ং রাহুর শক্তি, হিংস্রতা আর কুটিল শয়তানি।
এই ধরনের মহাশক্তির থেকে জন্ম নেওয়া অপচ্ছায়াগুলিকে নিবারণ করার জন্য কালীপদর শুরু হংসী তান্ত্রিক এক গূঢ় বিদ্যে শিখিয়েছিলেন। তার নাম বজ্রকবচ। একে আত্মঘাতী কবচও বলা হয়। তবে এই পদ্ধতিখানায় এমনই একটা প্যাঁচ রয়েছে, যার ফলে এই বিদ্যাটি বিদ্যা হয়েই থেকে যায়। প্ৰয়োগ করা সম্ভবপর হয় না।
এই বজ্রকবচখানা সেই পিশাচের গলায় একটিবার পরিয়ে দিতে পারলেই তার বিনাশ হবে, কিন্তু… তার সঙ্গে এক অসম্ভবরকম শর্তও রয়েচে।
কখনও জোরপূর্ব্বক এই কবচ আততায়ীর গলায় পরানো যাবে না। কখনও যদি সেই শয়তান স্বেচ্ছায় এই কবচ নিজের হাতেই নিজের গলায় ধারণ করে, তবেই একমাত্তর সেই পিশাচের বধ সম্ভব, যা কিনা সম্পূর্ণভাবে অসম্ভব।
কোনও চতুর শত্রু কখনোই কোনও অবস্থাতেই আরেকজনের দেওয়া কবচ-তাবিজ নিজের গলায় কেন পরবে?
আবার এমন কোনও উপায় নেই, যাতে এই অবাস্তব শর্তটিকে কাটিয়ে ওঠা যায়।
আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে কালীপদ মগ্ন হয়ে পড়েচিল, সংবিৎ ফিরল চার-পাঁচজনের ডাকাডাকিতে।
কয়েকজন গ্রামবাসী সুরেনকে ডেকে চলেচে। হাঁক শুনে সুরেন বাইরে এসে শুধোল,
“আপনারা? কী হয়েচে, গোলককাকা?”
গোলক চাটুজ্জে আর বাকিরা আড়চোখে কালীকে দেখে নিয়ে কইল, “বিচারসভা বসাতে হবে সুরেন। মঙ্গলের বড়োমেয়েটা কাল থেকে বাড়ি নেই জল আনতে বেরিয়ে আর ফেরেনি। বেঁচে রয়েচে কি মরেচে জানিনে, তবে মঙ্গলের গোটা কুড়ি টাকা দণ্ড হওয়া দরকার। কী বলো হে? তবে বসাই সভা?”
সুরেন দাঁতে দাঁত পিষে নিম্নস্বরে একটা শব্দ উচ্চারণ করে লোকগুলিকে দেউড়ি থেকে সোজা বের করে দিল। তারা শাপশাপান্ত করতে করতে ফিরে গেল।
সুরেন একটা দুর্বাক্য উচ্চারণ করে বিমর্ষ স্বরে কালীকে কইল, “দেখেচেন ঠাকুর! এদের আচরণটা দেখেচেন একটিবার? গোটা গাঁ শ্মশান হয়ে যাবার জোগাড় হয়েচে, আর এই হতভাগা জানোয়ারগুলোর এখনও কার বউ ঘরে ফিরল না, কার মেয়ে-ঝি বাইরে রইল, এই নিয়ে পড়ে রয়েচে। এরা কোনওদিনও আর বদলাবে না। কথায় সেই যে বলে না— স্বভাব যায় না মলে…”
কালীপদ এতক্ষণ ধরে নিজের চিন্তাতেই মগ্ন ছিল। সুরেনের সব কথা শোনেওনি, কিন্তু শেষ কথাটা কানে যেতেই একলাফে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“তা-ই তো সুরেন, তা-ই তো! ঠিক ঠিক, বটেই তো!”
কালীপদর উত্তেজিত চিৎকার শুনে সরমা, কানাই সকলে দৌড়ে এল। তাদের দিকে চেয়ে কালী কইল, “এক্ষনি গাঁয়ে খবর প্রচার করো, আজ রাত্তিরে দ্বিতীয় ঘড়িতে গাঁয়ের সব কজন পুরুষমানুষকে দূর্গাদালানের মাঠে উপস্থিত থাকতে বলবে। মেয়েছেলেদের আসার দরকার নেই, কারণ পিশাচটার আক্রোশটা পুরুষদের উপরেই প্রবল। আমি পিশাচটাকে কোনওভাবেই জব্দ করতে পারব না বাছা, কিন্তু গ্রামবাসীদের রক্ষা তো করতে পারি। আমি এখন থেকে রাত প্রথম ঘড়ি অবধি কণ্টকমাদুলি তৈরি করব। আর তৈরি করব সুধা-ভোগ। আমার সমস্ত তন্ত্রবিদ্যা ঢেলে দেব আজ। এই মাদুলি যার গলায় থাকবে আর এই সুধা-ভোগ প্রসাদ যে একবার খাবে, তার উপর তন্ত্রমন্ত্র, অপশক্তির কোনও প্রভাব পড়বে না। মৃত্যুভয় থাকবে না তার। যতক্ষণ এই কণ্টকমাদুলি গলায় রইবে, ততক্ষণ সেই ব্যক্তি এক হিসেবে অমর হয়ে থাকবে। দেখি, এবারে সেই শয়তান কী করে লোক মারে! তবে হ্যাঁ, খুব সাবধান। এই কথাটি যেন পাঁচকান না হয়, না হলে শয়তানও কিন্তু খবর পেয়ে যাবে।”
এরপর কানাইকে ডেকে গোপনে কিছু কথা বুঝিয়ে দিয়ে সুরেনের সঙ্গে পাঠিয়ে দিল সব পুরুষমানুষকে খবর দেবার জন্য, আর নিজে বসল অমর থাকার মাদুলি তৈরি করতে। সরমা কালীর আদেশমতো বিশাল একধামা বাতাসা এনে দিয়েচিল। কালী নানান উপচারে মন্ত্রোচ্চারণ করে তাতে বেলপাতা দিয়ে তন্ত্রশক্তি সিঞ্চন করতে লাগল।
***
যথাসময়ে গাঁ ভেঙে সকল পুরুষ এসে হাজির হল দুর্গাদালানের সামনে। কালী তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবার আদেশ দিল। কানাইয়ের হাতে সুধা-ভোগের ধামা, আর কালীর হাতে একখানি পুঁটুলি। তার মধ্যে সেই আশ্চর্য অমরকণ্টক মাদুলি। কালী পরপর একেকজনের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্চে। সেই ব্যক্তি হাত বাড়াচ্চে, আর কানাই তার হাতে মন্ত্রপূত প্রসাদ তুলে দিচ্চে। প্রসাদ মুখে দিলে কালী অতি ক্ষিপ্রবেগে একেকটি মাদুলি তুলে তার গলায় পরিয়ে দিচ্চে। তার সতর্ক চোখ ঘুরচে চতুর্দিকে।
দালানের পাশেই জঙ্গলের সীমান্ত। যখন কালীপদ প্রসাদ বিলি আর মাদুলি পরাবার প্রক্রিয়া শুরু করেচে, তখন সেই সীমান্তে একখানা রাহুমুখী গাছের নীচে মার্জারের ন্যায় লঘুপদে এসে দাঁড়াল একটা মূর্তি। সরমা। সুরেনের স্ত্রী। অর্থাৎ সুরেনের স্ত্রীরূপী পিশাচ। মাথায় শিরবন্ধ আর পিরান পরে পুরুষ সেজে এসেচে সে। সুরেনের ঘরে থেকে সে কালীপদর সমস্তরকম সতর্কতা সত্ত্বেও ছদ্মবেশে সব হালহকিকত জেনে নিয়েচে। কালীপদ অতি গোপনে অমর থাকার মাদুলি তৈরি করেচে। মহাপ্রসাদ বানিয়েচে। আজ শুনিনের উপরে টেক্কা দেবে সে। খিলখিল করে হেসে উঠে সে চোখ তুলে তাকাল উলটোদিকের একটা আম গাছের দিকে, আর সেই গাছের একটা বড়ো ডাল হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল।
আচমকা গাছ ভাঙার শব্দে প্রতিটি মানুষ সেদিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল, আর সেই মুহূর্তের অবসরে পিশাচট্টা পুরুষদের সারির ভিতরে সন্তর্পণে সেঁধিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ লক্ষ করল না।
ডাল ভাঙার শব্দে লোকজন কথাবার্তা শুরু করেচিল, কিন্তু কালীগুণীনের চাপা ধমক খেয়ে সবাই চুপ হয়ে গেল। কালী হিসহিসিয়ে বলল, “তোমরা এত কথা কোয়ো না। ডালটা হয়তো এমনিই ভেঙেছে। শয়তানটা টের পেলে আর রক্ষা থাকবে না। এই মাদুলি তার হাতে পড়লে সব্বনাশ উপস্থিত হবে বাবা সকল। মাদুলির গুণে সে-ও অবধ্য হয়ে পড়বে প্রায়।”
কালী ক্ষিপ্রহস্তে একের পর এক লোককে প্রসাদ খাইয়ে মাদুলি পরাতে পরাতে এসে পৌঁছোল ছদ্মবেশী পিশাচের কাচে। কানাই একমুষ্টি প্রসাদ হাতে তুলল। কালী বলল, “হাত বাড়াও বাছা, প্রসাদ নাও।”
ছদ্মবেশী সরমা হাত বাড়িয়ে মন্ত্র-পড়া প্রসাদটুকু নিয়ে বিনা বাক্যব্যয়ে পুরোটা খেয়ে নিলো। কালী থালা থেকে একখানা অমরকণ্টক মাদুলি তুলে নিয়ে ছদ্মবেশীর গলায় পরাতে যাবে, এমন সময়ে সুরেন কইল, “দাঁড়ান ঠাকুরমশায়।”
কালী অবাক হয়ে বলল, “এ কী সুরেন! ব্যাপার কী?”
সুরেন ভ্রূ কুঁচকে বলল, “এই মানুষটি কে? চেনা বলে তো মনে হচ্চে না।”
কালী তখনও মাদুলিটা ধরে বিস্মিত হয়ে সুরেনের কথা শুনে চলেচে। চূড়ান্ত সফলতার মুহূর্তে বিঘ্ন ঘটায় পিশাচটা চাপা শব্দে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল।
সুরেন ভয়ার্ত কণ্ঠে কইল, “ঠাকুরমশায়য়য়য়য়… আপনি মাদুলিটা সরিয়ে নিন….”
কালী বিস্ময় কাটিয়ে যতক্ষণে সেইটা সরাতে যাবে, পলকের মধ্যে পিশাচটা এক হ্যাঁচকা টানে সেই অমর থাকার মাদুলি ছিনিয়ে নিয়ে বিদ্যুৎবেগে নিজের গলায় গলিয়ে ভয়ানক শব্দে হেসে উঠল।
***
সেই অট্টহাসির শব্দে উপস্থিত সমস্ত লোকজন পালাতে শুরু করল, আর সামান্য সময়ের মধ্যেই পিশাচের সেই হাসি পরিণত হল বুকফাটা চিৎকারে। ভয়ংকর গর্জন করে ছটফট করতে করতে নিজের পাগড়ি, পোশাক সব খুলে ফেলতেই সবাই হতভম্ব হয়ে দেখল, সেই জায়গায় মরণযন্ত্রণায় আছাড়িপিছাড়ি খাচ্চে সরমা। কালী গুনিনের তৈরি বজ্রকবচ এঁটে বসেচে তার গলায়। ধূর্ত শুনিনের ফাঁদে পা দিয়ে বসেচে সে। ছটফট করতে করতে ধীরে ধীরে ছোটো হতে হতে মাটির মধ্যে মিলিয়ে গেল সেই পিশাচ। সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে গেল রাহুমুখী গাছগুলিও। পরের দিন সকালে বিদায় নেবার সময়ে গোটা গ্রামের মেয়ে-পুরুষ ভেঙে পড়ল ঘটনাটা জানতে।
কালী শান্ত স্বরে বলল, “সুধা-ভোগটোগ স্রেফ ধোঁকা, বাছা। ওসব হয় না। আমি যেদিন কুকুরকে মাছের কাঁটা খাওয়াচ্চিলাম, সেই দিন খেয়াল করলাম, কুকুরগুলি সুরেনের দেউড়ির বাইরে পড়ে-থাকা কাঁটাগুলো চেটেপুটে খেয়েচে, কিন্তু পেটে ক্ষুধা থাকা সত্ত্বেও চৌকাঠের ভিতরে থাকা কাঁটাগুলো খেতে এগিয়ে এল না। তখনই আমার সন্দেহ হয় যে, ওরা এই ঘরে কিছু একটা ভয়ের জিনিস বুঝতে পারে। তখনই আমার সন্দেহ হয় সরমাকে। পরদিন রাত জেগে গাছগুলির সংকেত গুঞ্জন শুনে বুঝতে পারি, সরমা যেবার না জানিয়ে ভাইকে দেখতে গিয়েচিল, সেবার সে কালীপূজার সকালে আদৌ ফেরেনি। ফিরেচিল আগের রাত্তিরে ভূতচতুদ্দশীর সন্ধ্যায়। পথে আসতে গিয়ে পিশাচটার হাতে প্রাণ হারায়, আর তার রূপ নিয়ে সুরেনের ঘরে ঠাঁই নিয়ে ওই ধূর্ত পিশাচ দিনের পর দিন শিকার করতে থাকে নিরীহ প্রজাদের। আর যারা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চেয়েচিল, তাদেরকেও একে একে মারতে থাকে।
“আমি যখন আকাশকুসুম চিন্তা করচি, তখন সুরেনের একটা কথা আমার কানে আসে, ‘স্বভাব যায় না ম-লে।’ তখনই আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। এই পিশাচ তো আদপে রাহুরই অংশ। তারই স্বভাবচরিত্র এর মধ্যেও বিদ্যমান। অমৃতপানের সময়ে যেমন রাহু লুকিয়ে ঢুকে পড়েচিল, আবার যদি অমৃতের মিথ্যা নাটক করা যায়, তবে এ-ও নিশ্চিতরূপে সেই ফাঁদে পা দেবে।
স্বয়ং ভগবানই কাউকে অমর করতে পারেন না, তো আমি কোন ছার। আমি মিছামিছি অমর-করা মাদুলির গল্প তৈরি করলাম। কানাইকে গোপনে বলে দিলুম, সে যেন সকলকে চুপিচুপি জানিয়ে রাখে, আমি যখন প্রসাদের জন্য হাত বাড়াতে বলব, তারা যেন বাঁ হাত বাড়ায়। ওই পিশাচ সেটা জানতে পারেনি।
“প্রসাদ দিতে দিতে যখন দেখলাম, একজন চিরাচরিত নিয়মে ডান হাত বাড়িয়ে দিল, আমি বুঝে গেলাম এই সেই হতভাগা। আমি থালার সাধারণ মাদুলিগুলো না তুলে, এবার বজ্রকবচটা তুলে ধরলাম। ওই যে গাছের ডালটা ভেঙে পড়ল, ওটাও মনে হয় ওরই কীর্তি। যেই সবাই আনমনা হয়েচে, অমনি সারির ভিতর ঢুকে পড়েচে।
“সুরেনকে শেখানোই ছিল। সে ডান হাত বাড়াতে দেখেই তার পরিচয় জানতে চায়। আমিও মাদুলিটা তার সামনে আনমনা হবার ভান করে ধরে রেখে দিলাম। ব্যাস, অমরত্ব পাবার তাড়াহুড়োয় সে নিজেই কেড়ে নিয়ে নিজের মৃত্যুবাণকে গলায় পরে নিল।”
গোরুর গাড়িতে চেপে কালী গুনিন রওয়ানা দেবার সময়ে দিবাকরের চৌদ্দ বৎসরের নাতি এসে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল, “ও দাদু, এই রাহুই নাকি চাঁদ আর সূর্যকে গিলে ফেলে বলে গ্রহণ হয়! সত্যি দাদু?”
কালীপদ হেসে উত্তর দিল, “না, দাদুভাই। সূর্য আর পৃথিবীর মাঝে চাঁদ চলে এলে সূর্যগ্রহণ হয়, আর সূর্যের আলো চাঁদের গায়ে পড়ার মাঝে পৃথিবীতে বাধা পেলে হয় চন্দ্রগ্রহণ। পুরোটাই বিজ্ঞান, দাদুভাই। প্রকৃতিই হলেন সবচাইতে বড়ো তান্ত্রিক।” গোরুর গাড়ি আঁকাবাঁকা পথের প্রান্তে চলতে চলতে মিলিয়ে গেল।
