মেগাস্থিনিস – নির্বেদ রায়

মেগাস্থিনিস
গ্রীস দেশের মানুষ, এক্ষেত্রে প্রাচীন গ্রীস-কে যদি আমরা ধরে নিই, তাহলে ভারত সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল সামান্য, আর সেই সামান্য ধারণাটুকু ভুল আর বিভ্রান্তিতে ভরা। এখানে প্রাচীন গ্রীস বলতে আমরা হোমারের কথা উল্লেখ করতে পারি; যাঁর সৃষ্ট দুটি মহাকাব্য সমস্ত পশ্চিম-দুনিয়া জুড়ে প্রভাব ফেলেছে— ‘দি ইলিয়াড’ এবং ‘দি ওডিসি’। হোমারের জন্মসময় নির্দিষ্ট করে বলা যায় না, কিন্তু ১২০০ থেকে ৮০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে এশিয়া মাইনরের কোনো তীরবর্তী অঞ্চলে তিনি জন্মেছিলেন।
হোমার সম্পর্কে বিশিষ্ট পণ্ডিতদের আলোচনা আছে, কিন্তু সে আলোচনায় না গেলেও, বোধহয় একটা কথা বলা যাবে যে, সেই সময়ে গ্রীস সারা পৃথিবীর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে উন্নত জনপদ; জ্ঞান, পাণ্ডিত্য, বুদ্ধি, দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান সব কিছুতে সে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু পূর্বের পৃথিবী তখনও তার কাছে অজানা জগৎ। তার সভ্যতার ইতিহাসের সে প্রায় কিছুই জানে না। শোনা কথা বাতাসে ভেসে আসে— সে কথায় ভারত আর ইথিওপীয়া সব মিলেমিশে একাকার। অথচ ভারতের মালপত্র তখন গ্রীসে আসছে— আসছে টিন, হাতির দাঁত, হয়তো আরও কিছু!
কিন্তু তা হলেও ভারতবর্ষ তখনও পশ্চিমের কাছে রূপকথা আর আশ্চর্য গল্পের দেশ, অদ্ভুত তার মানুষ-জন, বিচিত্র তার জীবজন্তু, তার নদ-নদী, তার রোদ-বৃষ্টি সবকিছু।
প্রথম যে ইতিহাসের খোঁজ পাই হেকাটিউস-এর বিবরণে, ইনি হেকাটিউস অফ মাইলটোস, সময় খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৯ থেকে ৪৮৬, এঁর বর্ণনায় এসেছে পারস্যের সাম্রাজ্য ও তার সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ। আর সেই বিবরণ বিস্তারিত হয়েছে হেরোডটাস আর টিসিয়াসের লেখায়। এদের লেখা থেকে সমস্ত রূপকথা যে মুছে গেছে এমন নয়, কিন্তু বাস্তবের ভারত আস্তে আস্তে রূপ নিয়েছে। কিন্তু এরা দুজনও ভারতে আসেননি, হেরোডটাসকে ‘ইতিহাসের জনক’ বলে অভিহিত করা হয়, কিন্তু তাঁর লেখা সেদিনের পৃথিবীকে নিয়ে, এই সবটা তাঁর পক্ষে চোখে দেখা সম্ভব হয়নি, বণিক আর পরিব্রাজকদের মুখে শুনে শুনে বেশ খানিকটা লেখা হয়েছিল, ফলে সত্য আর গল্প মিলেমিশে তৈরি হয়েছিল তাঁর পৃথিবী, তবে ইতিহাসের গতি-প্রকৃতির আশ্বাস আর বাঁধন তার মধ্যে নির্দিষ্টভাবেই উপস্থিত ছিল। কিছু সমালোচক তাঁকে থুসিডিডিসের ‘পেলোপনেসীয়ান ওয়ার’ এর সঙ্গে তুলনা করেন বটে, কিন্তু সে সব কিছু মেনে নিলেও হেরোডটাস তাঁর উপস্থিতিতে উজ্জ্বল। থুসিডিডিসের জন্ম, খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ সাল, এথেন্সে, ‘বৈজ্ঞানিক ইতিহাসের জনক’ বলে ভবিষ্যতের পণ্ডিতদের ধারণা তাঁর সম্পর্কে। কিন্তু ভারতের ইতিহাস তিনি লেখেননি।
টিসিয়াস, আর্টাজেরসেস নিমনের সভায় চিকিৎসকের কাজ করতেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল তাঁর নিজের লেখা বিবরণ পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া গেছে সে সমস্ত পরবর্তী সময়ে ‘ফোটিয়াস’ বা অন্য লেখকের লেখা। তার মধ্যে ‘ভারত’ যেমন আছে, তেমন আছে ‘রূপকথা’।
এবার হেরোডটাস আর টিসিয়াস ছাড়া আরও কিছু লেখক বা ঐতিহাসিক ভারত সম্পর্কে লিখেছেন, কিন্তু তার কিছুই প্রায় পাওয়া যায় না।
এরপর আসে আলেকজান্ডারের পৃথিবী জয়ের সময়। ভারত সম্পর্কে আরও পরিষ্কার লেখাপত্র আসতে শুরু করে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। যার মধ্যে অবশ্যই মেগাস্থিনিস উল্লেখযোগ্য।
মেগাস্থনিস প্রায় দু’হাজার তিনশো বছর আগে পশ্চিম এশিয়ার অধিপতি নিকেটর সেলেউকাস-এর দূত হিসাবে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সভায় আসেন। চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী পাটলিপুত্র বা পাটনায় কিছুদিন থাকার পর তিনি ভারতের বেশ কিছু জায়গা ঘুরে দেখেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতার বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন ‘ইণ্ডিকা’ বলে গ্রন্থটিতে। মূল বইিট আর পাওয়া যায় না, সেটি হারিয়ে গেছে। কিন্তু মেগাস্থিনিসের বইটিকে পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়েছে কারণ, তাঁর পরবর্তী ও কাছাকাছি সময়ের লেখকরা বিশেষ করে আরিয়ান, ষ্ট্র্যাবো, প্লিনি, ডায়োডোরাস সাইকালাস নিজেদের লেখায় মেগাস্থিনিসের বহু উদ্ধৃতি এবং বিবরণ ব্যবহার করেছেন, আর সেই সমস্ত অংশ একত্র করে ১৮৪৬ সালে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউজেন আলেকজান্ডার সোয়ানবেক এবং ১৮৮২ সালে কলকাতায় অধ্যাপক জন ওয়াটসন ম্যাক্রিনডল যথাক্রমে গ্রিক সংকলন ও তার ইংরেজি অনুবাদও করেন। পণ্ডিতদের মতে মেগাস্থিনিসের জন্ম আনুমানিক ৩৫০ খ্রিঃ পূঃ এবং মারা যান ২৯০ খ্রিঃ পূর্বাব্দে। জন্মেছিলেন এশিয়া মাইনরে; আরোকোসিয়ার ক্ষত্রপ সিবাইয়ারাটয়াসের রাজসভায় তিনি কূটনীতিজ্ঞ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। সেলেউকাসের নির্দেশে সেখান থেকে তিনি মৌর্য রাজসভায় যান।
পাঁচ নদীর প্রদেশ ‘পেন্টাপটেমিয়া’ বা পাঞ্জাব দিয়ে তিনি ভারতে আসেন। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে ‘মেগাস্থিনিসের ভারত বিবরণ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
অধ্যাপক সোয়ানবেক যে মোটামুটি ৬০টির কিছু বেশি খণ্ডিত অংশ যোগ করে মেগাস্থিনিসের বিবরণ তুলে ধরেছেন, তার মধ্যে ডায়োডোরাস, আরিয়ান, স্ট্র্যাবো, প্লিনি, ঈলিয়ান তো আছেনই, আছেন আরও অনেক লেখক ও ঐতিহাসিক।
আমরা মেগাস্থিনিসের বিবরণকে, এই নাম আর খণ্ডিত অংশগুলো থেকে একটু সরল করার চেষ্টা করেছি মাত্র, কিন্তু গবেষকদের সুবিধার জন্য মূল লেখার শেষে fragments আর লেখার বিষয় নিয়ে একটি তালিকা দেওয়া হলো, যেটি লেখার পরে যুক্ত করা হয়েছে।
মেগাস্থিনিসের ভারত বিবরণ
চতুর্ভুজ আকারের ভারতবর্ষের পূর্ব আর দক্ষিণ দিক ঘিরে আছে মহাসমুদ্র। উত্তরে হিমদ পর্বত ভারতকে আলাদা করে রেখেছে স্কাইথিয়া থেকে। স্কাইথিয়া দেশে শকজাতি বাস করে। চতুর্থ অর্থাৎ পশ্চিমদিকে বয়ে যাচ্ছে সিন্ধুনদ। একমাত্র নীলনদ ছাড়া বাকি সব নদীর থেকে বড় এই সিন্ধুনদ। শোনা যায়, পূর্ব থেকে পশ্চিমে ভারতবর্ষের বিস্তার ২৮০০০ ষ্ট্যাডিয়া, আর উত্তর থেকে দক্ষিণে ৩২০০০ ষ্ট্যাডিয়া। এত বড় এই দেশের আয়তন যে মনে হয় গোটা উত্তর গ্রীষ্মমণ্ডল যেন এদেশের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এইজন্য ভারতের দূর প্রদেশগুলোয় ‘শঙ্কু’-র ছায়া পড়ে না, রাতের আকাশেও সপ্তর্ষিমণ্ডল দেখা যায় না। শুনেছি, এই সব অঞ্চলে নাকি দক্ষিণদিকে ছায়া পড়ে।
ভারতবর্ষের অনেক বিরাট পর্বত আছে— সবরকম ফলের গাছে সেগুলো পরিপূর্ণ; অনেক বিস্তীর্ণ ও উর্বর সমতলভূমিও রয়েছে; প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভিন্ন ভিন্ন হলেও অসংখ্য নদ-নদী এদের ভাগে ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। সমতলভূমির এই জলধারাতে বেশির ভাগটাই সিক্ত, তাই বছরে দু’বার শস্য উৎপন্ন হয়। এই দেশে সবধরনের জীবজন্তু ও পশুপাখি বাস করে। বিচিত্র তাদের আকার, বিভিন্ন তাদের শক্তি। এছাড়া বিশাল আকারের অসংখ্য হাতি ভারতে আছে, যাদের প্রচুর খাদ্য জোটে বলে লিবিয়ার হাতিদের চেয়ে বলশালী হয়। ভারতীয়রা অনেক হাতি ধরে এবং যুদ্ধের জন্য তাদের শিক্ষিত করে তোলে; জয়লাভের পক্ষে এই হাতিগুলো তাদের যথেষ্ট সাহায্য করে।
খাবার প্রচুর বলে এখানকার আদিবাসিরা বেশ হৃষ্টপুষ্ট আর দীর্ঘদেহের অধিকারী। তারা সবচেয়ে সুস্বাদু জল পান করে ও বিশুদ্ধ বায়ু গ্রহণ করে। তারা সেইজন্যে শিল্পকর্মে নিপুণ। ভারতে যেমন সব ধরনের কৃষিপণ্য ও শস্য জন্মায়, ঠিক তেমনই এর গর্ভে সমস্ত খনিজ ধাতু পাওয়া যায়। প্রচুর সোনা আর রুপো, কিছু তামা এবং লোহা, এমনকি কাঁসা, টিন ও অন্যান্য ধাতুও এই সব খনিতে পাওয়া যায়। এই সমস্ত ধাতু গয়না, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও যুদ্ধের অস্ত্র বা অন্য সামগ্রী তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়।
ভারতবর্ষে যব ইত্যাদি শস্য ছাড়াও তিল বা জোয়ার জাতীয় শস্য প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়। নদী থেকে নিয়ে বিভিন্ন খাল আর জলপথে এরা পুষ্ট হয়। এছাড়া ওই জলধারায় বিভিন্ন প্রকারের ডাল, ধান, ওষধির গাছ (Bosporon) ছাড়া মানুষের জীবনধারণের উপযুক্ত নানা ধরনের শাকসবজি উৎপন্ন হয়। এগুলি সব নিজের থেকে জন্মায় ও বেড়ে ওঠে। জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় খাদ্যবস্তুও কম উৎপন্ন হয় না। শোনা যায়, এই কারণে ভারতবর্ষে কখনো দুর্ভিক্ষ বা অন্নের অভাব মানুষ বোধ করে না। কারণ, এদেশে বছরে দু’বার বর্ষা আসে। শীতকালে বৃষ্টি হলে অন্যান্য দেশের মতো গম রোপণ করা হয়। কর্কটক্রান্তির পর অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি শুরু হওয়ার পরে ধান, জোয়ার, তিল বা বস্পরন চাষ শুরু হয়। ভারতীয়রা বছরে দু’বার শস্য সংগ্রহ করে। প্রথমবার যথেষ্ট না হলে, দ্বিতীয়বার সেই খামতি পুষিয়ে যায়, কম পড়ে না। এছাড়া স্বাভাবিক নিয়মে যে ফল আর স্বাদু মূল সমস্ত উৎপন্ন হয় সেগুলো তাদের কাজে লাগে। ফলে ভারতের সমস্ত সমতলভূমি নদীর জল আর বৃষ্টিপাতে ভিজে থাকে, তাই অত্যন্ত উর্বর। প্রতিবছর ঠিক একই সময় গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি শুরু হয়, আবার গ্রীষ্মের প্রবল উত্তাপে ওই সময় জলাভূমিতে জন্মানো মূল আর দীর্ঘ নলগুলো পরিপুষ্ট হয়ে, খাওয়ার উপযুক্ত হয়। ভারতবাসীদের মধ্যে কতগুলো বিশেষ প্রথা চালু আছে, যার জন্য দুর্ভিক্ষ হতে পারে না। যেমন অন্যান্য জাতির নিয়ম হল যুদ্ধের সময় শস্যক্ষেত্র নষ্ট করে তারা মরুভূমিতে পরিণত করে। কিন্তু ভারতবর্ষে কৃষকরা পবিত্র এবং তাদের সবসময় রক্ষা করা হয়। যখন আশেপাশের এলাকায় যুদ্ধ চলে তখনও এরা বিপদে পড়েছে বলে মনে করে না। কারণ দু-পক্ষের যোদ্ধারা নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে লিপ্ত হলেও, কৃষকদের গায়ে কেউ হাত তোলে না, কারণ তারা সমাজের হিতে নিযুক্ত। তারা অক্ষত থাকে। আর বড় কথা হল, ভারতবর্ষের লোকেরা কখনো শত্রুর শস্য বা শস্যক্ষেত্র আগুন লাগিয়ে নষ্ট করে না। তাদের গাছগুলোকে কেটে ফেলে না।
ভারতে অনেক বড় বড় নদী আছে যেখানে ছোট-বড় সব নৌকা আর জলযান যাতায়াত করে। দেশের উত্তরে যেসব পর্বতামালা আছে, সেখান থেকে উৎপন্ন হয়ে নদীগুলো সমতলে এসে প্রবাহিত হয়। এই নদী বেশ কয়েকটা একসঙ্গে মিলেমিশে গঙ্গায় এসে পড়েছে। এই গঙ্গানদী, তার উৎপত্তিস্থলে ৩০ স্ট্র্যাডিয়া চওড়া, উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে মহাসমুদ্রে এসে পড়েছে। এই গঙ্গানদী গাঙ্গেয় জাতির (Gangaridai) দেশের পূর্বসীমা দিয়ে বয়ে গেছে। গাঙ্গেয়দের অনেক শিক্ষিত আর বিশালকায় হাতি আছে, যারা যুদ্ধে পারদর্শী। এজন্য এই দেশ কখনো কোনো বিদেশি শক্তির কাছে পরাজিত হয় না। কারণ, অন্যান্য সমস্ত জাতি এই অগণিত হাতির বাহিনীর কথা শুনলে ভয় পায়। যেমন, ম্যাসিডনবাসী সেকেন্দার শাহ (Alexander) সমগ্র এশিয়া জয় করে এসে কেবল গাঙ্গেয়দের সঙ্গে যুদ্ধ করতে রাজি হননি। কারণ তিনি ভারতে অন্যান্য জাতিদের পরাজিত করে গঙ্গার পাড়ে পৌঁছে জানতে পারেন যে, গাঙ্গেয়দের যুদ্ধে নিপুণ চার হাজার রণহস্তী নদীর অপর পাড়ে অপেক্ষা করছে। এই কথা শুনেই তিনি তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার পরিকল্পনা বাতিল করেন।
গঙ্গার সমতুল্য সিন্ধুনদ উত্তরদিক থেকেই উৎপন্ন হয়ে মহাসমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। সিন্ধু ভারতের পশ্চিম সীমা। অনেকটা পথ সমতলভূমি দিয়ে বয়ে যাওয়ার ফলে নৌ-চলাচলের উপযোগী অনেকগুলো উপনদী এসে সিন্ধুতে মিশেছে। তার মধ্যে হাইপানিস, হাইডাস্পীস আর এ্যাকেসিনেস বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। এই সব নদীগুলি ছাড়াও আরও বিভিন্ন প্রকারের নদী আর বহু উপনদী সিন্ধুতে এসে মিলিত হয়েছে। ফলে গোটা দেশ জুড়ে এই সমস্ত নদীর জলে সিক্ত থাকার ফলে সবরকমের শস্য আর শাক-সবজি প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়।
ভারতবর্ষ এমন সুজলা-সুফলা আর নদ-নদীতে পরিপূর্ণ কেন? সে দেশের পণ্ডিত আর বিজ্ঞানীরা তার কারণ হিসাবে বলেছেন যে ভারতবর্ষের চারদিকে যে শক, বাহ্লীক আর আর্যজাতির দেশগুলো ঘিরে আছে, সেগুলো তুলনায় উঁচু ভূভাগ; ফলে প্রাকৃতিক নিয়মেই উঁচু অংশ থেকে নিচের দিকে জলধারা এসে গোটা ভারতকে ভিজিয়ে তোলে আর নদ-নদীও সৃষ্টি হয়।
ভারতে একটা নদীর ভারি অদ্ভুত বিশেষত্ব আছে। নদীটির নাম শিল, আসলে শিল নামের ঝরনা থেকেই এই নদীর জন্ম। আশ্চর্যের বিষয়, এই নদীতে কিছু ফেললে সেটা ডুবে যায়, কোনো কিছুই ভেসে থাকে না।
ভারতবর্ষ পুরো দেশ আকারে বিশাল। এদেশে বহু জাতি বসবাস করে। তাদের মধ্যে কোনো জাতি বাইরে থেকে আসেনি, প্রথম থেকে তারা এদেশেই বসবাস করছে। ভারতবর্ষই তাদের উৎপত্তি ও জন্মস্থান। ভারতীয়রা কখনো বিদেশের কোনো অংশ উপনিবেশ হিসাবে অঙ্গীভূত করেনি, তারা বিদেশে কোনো উপনিবেশ স্থাপনও করেনি। প্রবাদ আছে যে প্রাচীনতর কালে এই দেশের অধিবাসীরা মাটিতে নিজে থেকে জন্মানো ফল খেয়ে আর বন্য জন্তুর চামড়া পরে প্রাচীন গ্রীকদের মতো জীবননির্বাহ করত। পরে ক্রমে ক্রমে গ্রীসের মতো এদেশেও অন্যান্য শিল্প আর জীবন নির্বাহের জিনিসপত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রয়োজনেই মানুষকে এই সমস্ত আবিষ্কার করতে শিখিয়েছে। মানুষের দুটো হাত তার প্রধান ভরসা, উপরন্তু তার জ্ঞান আর প্রখর বুদ্ধি আছে।
ভারতের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতরা যে কথা বলেছেন, তার সারমর্ম হল, বহু প্রাচীনকালে ভারতীয়রা গ্রামে বাস করত; সেই সময় ডায়োনীসস পশ্চিম থেকে প্রচুর সৈন্য নিয়ে এদেশে এসে উপস্থিত হন। তখন তাকে প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় নগর-ব্যবস্থা এদেশে ছিল না। ফলে তিনি সমস্ত ভারতবর্ষ দলে-পিষে যান। কিন্তু সেই সময় প্রচণ্ড গ্রীষ্মকাল এসে যায়। সেনাদলের মধ্যে প্রবল মহামারী শুরু হয়। দলে দলে সেনা আক্রান্ত হতে শুরু করে। তখন এই প্রতিভাধর সেনানায়ক ডায়োনীসস মাটি থেকে উপরে পর্বতের উপর সেনাশিবির স্থাপন করেন। সমতলভূমি থেকে উপরে এসে শীতল বায়ু আর ঝরনার নির্মল জল পান করে তারা খুব তাড়াতাড়ি রোগমুক্ত হয়। পর্বতের যে অংশে ডায়োনীসস সৈন্যদের রোগমুক্তি ঘটিয়ে সুস্থ করে তোলেন সেই জায়গা মীরস বা ‘মেরু’ নামে পরিচিত হয়। সেই কারণেই গ্রিকদের মধ্যে প্রচলিত প্রবাদ হল, যে দেব ডায়োনীসস জানু বা ‘মীরস’ থেকে উদ্ভূত হয়েছেন। এর পরে তিনি গাছ আর লতাপাতা রোপণে মনোনিবেশ করেন আর ভারতীয়দের জন্য সুরা ও জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য বস্তু উৎপন্ন ও তৈরি করার শিক্ষাদান করেন। গ্রামগুলিকে চলাচলের পক্ষে সুগম করে তোলার জন্য স্থানান্তরিত করেন আর বড় বড় নগর গড়ে তোলেন। সাধারণের মধ্যে দেবতার পূজা করতে শেখান। শাসনতন্ত্র আর বিচারালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এইভাবে বহু প্রথা চালু করা, বহু বিষয় প্রতিষ্ঠা করা ও শিক্ষা দেওয়ার কারণে তিনি দেবতার সম্মান লাভ করেন। তাঁর উপর কার্যত দেবত্ব আরোপিত হয়।
তাঁর সম্পর্কে আরও জনশ্রুতি আছে যে তিনি যুদ্ধযাত্রার সময় অনেক স্ত্রীলোক সঙ্গে নিয়ে যেতেন এবং জয়ঢাক ও করতাল বাজিয়ে যুদ্ধযাত্রা করতেন। তখনও শিঙা আবিষ্কৃত হয়নি। ভারতে তিনি দীর্ঘ বাহান্ন বছর রাজত্ব করেন ও বৃদ্ধ বয়সে মারা যান। তারপর তাঁর পুত্র ও ছেলেমেয়েরা রাজত্বলাভ করে এবং বংশানুক্রমে বহুদিন ধরে রাজত্ব চালান। শেষ পর্যন্ত অনেক বংশের আবির্ভাব ও সমাপ্তি হওয়ার পর ডায়োনীসসের বংশের হাত থেকে রাজদণ্ড হস্তান্তরিত হয়, তখন এই রাজ্যে সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
ভারতের পার্বত্য প্রদেশে যারা বসবাস করে তাদের মধ্যে ডায়োনীসস সম্পর্কে এই ধরনের প্রবাদ প্রচলিত অঅছে। তারা আরও বলে যে, হীরাক্লীস (হারকিউলিস) ভারতবের্ষই জন্মগ্রহণ করেন। গ্রীসে যেমন হীরাক্লিসের হাতে গদা আর পরনে সিংহচর্ম দেখা যায়, ভারতেও তাই দেখতে পাওয়া যায়। তিনি দৈহিক ক্ষমতা আর বীরত্বে সমস্ত মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন, জল ও স্থল থেকে তাঁর কৃপায় সব হিংস্র জন্তু নির্মূল হয়। তিনি বহু রমণীর পাণিগ্রহণ করেন এবং বহু পুত্রের জনক হন, যদিও মাত্র একটি কন্যা লাভ করেন। পুত্ররা সাবালক ও উপযুক্ত হয়ে উঠলে তিনি গোটা ভারতবর্ষ বিভিন্ন ভাগে সমান অংশে ভাগ করে তাদের প্রত্যেককে রাজত্ব প্রদান করেন। কন্যাকেও একটি রাজ্যের অধীশ্বরী করে যান। তিনি অনেক নগর প্রতিষ্ঠা করেন, তার মধ্যে পাটলিপুত্র বা ‘Polibothra’ সবচেয়ে বিখ্যাত আর বড় নগর। এই নগরে তিনি ঐশ্বর্যপূর্ণ অট্টালিকা নির্মাণ করেন এবং ওই সৌধমালায় বহু মানুষকে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। চারিদিকে বড় বড় পরিখা খনন করে নগরটির সুরক্ষার বন্দোবস্ত করেন। ওই সমস্ত পরিখা সবসময় নদীর জলে পরিপূর্ণ থাকত। এই সমস্ত কাজের জন্য হীরাক্লিস মারা যাওয়ার পর অমরত্ব লাভ করেন। তাঁর বংশধররা বহুপুরুষ এখানে রাজত্ব করেন। অনেক কীর্তি স্থাপন করেন। কিন্তু কখনো ভারতের বাইরে যুদ্ধযাত্রা করেননি বা দেশের বাইরে উপনিবেশ স্থাপন করেননি। শেষ পর্যন্ত বহুযুগ বাদে দেশে সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও আলেকজান্ডার বা ‘সেকেন্দার শাহ’ যখন ভারত আক্রমণ করেন, তখনও কোনো কোনো রাজ্যে বা নগরে রাজতন্ত্র প্রচলিত ছিল।
ভারতীয়দের মধ্যে যে সমস্ত বিধি চালু আছে, তার মধ্যে প্রাচীন ঋষিদের চালু করা একটা প্রথা উল্লেখ করার মতো। আর সবচেয়ে প্রশংসার যোগ্য। সেটি হল এদেশে কেউ কখনো ক্রীতদাস বলে গণ্য হবে না। এদের এটা বিধান। সকলেই স্বাধীন, সুতরাং সকলে স্বাধীনতার সম্মান আর অধিকার সমানভাবে পাওয়ার যোগ্য। যে ব্যবস্থায় কেউ অন্যের প্রতি যথেচ্ছ ব্যবহার করবে না। অথবা অন্যের পদলেহন করতে বাধ্য থাকবে না; যদিও ধনসম্পদের বৈচিত্র্য ও বণ্টনের ভিন্নতা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ নেই। এটি শ্রেষ্ঠ প্রথা।
ভারতীয়রা সাতটি জাতিতে বিভক্ত। পণ্ডিত ও জ্ঞানীরা (philosopher, sophists) প্রথম। অন্য জাতিদের তুলনায় তারা সংখ্যায় কম, কিন্তু মানমর্যাদায় সর্বশ্রেষ্ঠ । কোনো রাজকীয় নির্দেশ এদের পালন করতে হয় না। রাজকীয় কাজও করে না। ফলে এরা কারো প্রভু বা ভৃত্য নয়। কিন্তু প্রত্যেক মানুষকে জীবিতকালে যে সমস্ত যজ্ঞ ও ক্রিয়াকলাপ সম্পাদন করতে হয় সে সমস্ত আধ্যাত্মিক কাজকর্ম ও পরলোকগত ব্যক্তিদের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান এই পণ্ডিতরাই (পুরোহিত) সম্পন্ন করে থাকেন; পরলোক সম্বন্ধেও তাঁদের জ্ঞান সবচেয়ে বেশি। এই সব অনুষ্ঠান সম্পাদন করার জন্য তাঁরা প্রচুর সম্মান ও বহুমূল্য সম্মান-দক্ষিণাও লাভ করেন। এছাড়া জনসাধারণের অনেক উপকার এঁরা করে থাকেন।
যেমন, বর্ষাকালের শুরুতে একটি বড় সভা ডেকে সকলে উপস্থিত হয়। সেখানে সুবিশাল জনমণ্ডলীকে তাঁরা অনাবৃষ্টি, বর্ষার হেরফের, বাতাসের চলাচল ও ভালোমন্দ, রোগব্যাধি এবং সাধারণের প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় গণনা করে বলে দেন। ফলে আগে থেকে এ ব্যাপারে অবহিত হয়ে রাজা ও প্রজারা সেইমতো ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন প্রয়োজনীয় প্রতিকারের জন্য। পণ্ডিতদের মধ্যে যার ভবিষ্যৎ গণনায় ভুল হয়, তাকে কোনো দণ্ড বা শাস্তি পেতে হয় না, কিন্তু তিনি জনসাধারণের কাছে নিন্দিত হন এবং পরবর্তী সময়ে তিনি মৌনব্রত অবলম্বন করে থাকেন।
দ্বিতীয় জাতি কৃষক। অন্যান্য জাতির তুলনায় সংখ্যায় এরা সবচেয়ে বেশি। যুদ্ধ অথবা অন্য কোনো রাজকাজ এদের করতে হয় না, ফলে পুরো সময় এরা কৃষিকাজেই নিয়োগ করে থাকে। এমনকি যুদ্ধের সময় শত্রুসৈন্য কৃষকদের ক্ষেতে কাজ করতে দেখলে পাশ দিয়ে চলে যায়, কিন্তু তাদের কোনো ক্ষতি করে না। সাধারণের হিতসাধন করে বলে এই জাতি সমস্ত অনিষ্ট থেকে সুরক্ষিত থাকে। ফলে শস্যক্ষেত্রের কোনো ক্ষতি না হওয়ার কারণে তারা প্রচুর ফসল এবং মানুষের সুখকর জীবনধারণের জন্য যা প্রয়োজন তার অপর্যাপ্ত ফলন ফলিয়ে থাকে। কৃষকরা তাদের স্ত্রী-পুত্র নিয়ে গ্রামে থাকে, নগরে আসে না। সমস্ত ভারত রাজার সম্পত্তি, প্রজারা তার ভূমির মালিক নয়। ফলে কৃষকরা রাজাকে কর দেওয়া ছাড়াও উৎপন্ন দ্রব্যের চার ভাগের এক ভাগ রাজকোষে দিয়ে থাকে।
তিন নম্বর জাতি গোপালক আর মেষপালকের দল। যে রাখালরা কখনো গ্রামে বা শহরে বাস করে না, সমস্ত জীবন শিবিরে থাকে, ঘুরে বেড়ায়, পশুপাখি শিকার করে অথবা জ্যান্ত অবস্থায় ধরে এরা দেশকে বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত রাখে। ভারতবর্ষে সবরকম বন্য পশুপাখি আছে। পাখি কৃষকদের বীজ খেয়ে ফেলে। ব্যাধরা এই পাখি শিকার করে কৃষকদের বড় ঝামেলা ও ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায়। তবে, এর জন্য প্রচুর পরিশ্রম লাগে।
শিল্পীরা হল চতুর্থ জাতি। এদের কেউ কেউ অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করে, অন্যরা কৃষক বা অন্য পেশার লোকদের জন্য যন্ত্রপাতি বা তার অংশবিশেষ তৈরি করে। এরা কর দেয় না, উল্টে রাজকোষ থেকে ভরণপোষণের অর্থ ও খরচখরচা পেয়ে থাকে।
যোদ্ধারা পঞ্চম জাতি। সংখ্যায় দ্বিতীয় স্থানে। এরা যুদ্ধের জন্য সুশিক্ষিত ও সুসজ্জিত, কিন্তু শান্তির সময়ে এরা কেবল অলস জীবনযাত্রা নির্বাহ করে, আর আমোদ-প্রমোদে দিন কাটায়। যোদ্ধা তথা সৈন্যদল, যুদ্ধের ঘোড়া আর যুদ্ধে ব্যবহৃত হাতির ব্যয় রাজকোষ থেকে দেওয়া হয়।
ষষ্ঠ জাতি অমাত্য বা মহামাত্র। এদের কাজ দেশের সমস্ত বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখভাল করে রাজার কাছে, অথবা যেখানে রাজা নেই সেখানে শাসনকর্তাদের কাছে পেশ করা।
সাত নম্বর মন্ত্রী। মন্ত্রণাসভায় মিলিত হয়ে এঁরা রাজ্যের বিভিন্ন বিষয়ে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এঁরা সংখ্যায় অন্য সমস্ত জাতির থেকে কম, কিন্তু বংশমর্যাদা ও জ্ঞানে সবথেকে সম্মানের পাত্র। কারণ, এদের মধ্যে থেকে রাজমন্ত্রী, কোষাধ্যক্ষ আর বিবাদ-মীমাংসার জন্য বিচারক নিযুক্ত করা হয়; সাধারণত সেনাপতি আর শাসনকর্তারা এই জাতেরই অন্তর্ভুক্ত।
ভারতের অধিকাসীরা মোটামুটি এই সাতটি জাতিতে বিভক্ত। এক জাতির লোক অন্য জাতিতে বিয়ে করতে পারে না, একে অন্যের পেশাও গ্রহণ করতে পারে না। যেমন যোদ্ধা কৃষিকাজ করতে পারে না, অথবা শিল্পী ব্রাহ্মণের মতো জ্ঞানচর্চা করতে পারে না।
ভারতে অসংখ্য হাতি আছে। তারা বিশালাকায় আকৃতির ও প্রচণ্ড বলশালী। তারা ঘোড়া বা অন্য চতুষ্পদ জন্তুর মতো সন্তানের জন্ম দেয়— এ বিষয়ে যে সমস্ত বিশেষত্বর কথা শোনা যায় সেসব গুজবমাত্র। একটি স্ত্রী হাতি কমপক্ষে ষোলো থেকে বড়জোড় আঠারো মাস গর্ভধারণ করে। ঘোটকীর মতো হস্তিনীও সাধারণত একটি সন্তানের জন্ম দেয় এবং তাকে ছয় বছর স্তন্যদান করে। বেশিরভাগ হাতি দীর্ঘ আয়ুবিশিষ্ট মানুষের মতো দীর্ঘকাল ধরে বেঁচে থাকে, কিন্তু যেসব হাতির পরমায়ু খুব বেশি তারা দুশো বছর পর্যন্ত বাঁচে।
বিদেশিদের প্রতি ভারতীয়রা যত্নবান ও সহৃদয়। বিদেশ থেকে আসা মানুষদের জন্য তারা কর্মচারী নিয়োগ করে। সবসময় তারা তাদের খেয়াল রাখে আর দেখে যেন কখনো তাদের উপর কোনো অত্যাচার হয় না। কোনো বিদেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা চিকিৎসক পাঠিয়ে ও অন্যান্যভাবে তার সেবার ব্যবস্থা করে—সে মারা গেলে তার দেহ মাটিতে সমাধিস্থ করে সব বিষয়-সম্পত্তি তার আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যে সব বিবাদে বিদেশিরা জড়িয়ে যান বা জড়িত থাকেন, বিচারকরা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ন্যায়বিচার করে তার মীমাংসা করে থাকেন, যাতে তাদের সঙ্গে কেউ অন্যায় করলে সেই অপরাধী উচিত দণ্ড পায়।
আরিয়ান
ভারতবর্ষের সীমা
যে দেশ সিন্ধুর পূর্বদিকে অবস্থিত আমরা তাকে ভারতবর্ষ, আর তার অধিবাসীদের ভারতীয় বলে অভিহিত করছি। ভারতবর্ষের উত্তর সীমা টরাস পর্বত, কিন্তু এই দেশে তো টরাস নামে তাকে কেউ ডাকে না। এই পর্বতশ্রেণি পাম্পিলিয়া, লাইকিয়া আর কিলকিয়া দেশের সমুদ্র থেকে শুরু হয়ে সমগ্র এশিয়াকে ভাগ করে পূর্ব মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে আছে। বিভিন্ন দেশে এই পর্বতমালা আলাদা আলাদা নামে পরিচিত। এক দেশে এর নাম পারপামিসস (Paropamisos) অন্য দেশে হিমদ অর্থাৎ হিমালয় (Hemodos); অন্যকোনো দেশে এটা হিমায়স (Hemaos) নামে পরিচিত; বোধ করি আরও বিভিন্ন নাম আছে। যেসব ম্যাসিডনের সৈন্য (মাকেদনীয়) আলেকজান্ডারের (সেকেন্দর) সঙ্গে দিগ্বজয়ে বেরিয়েছিল তারা একে ‘ককেসাস’ নামে জানত। এটা স্কাইথিয়া দেশীয় ককেশাস নয়, আলাদা। সেইজন্য কথিত আছে যে আলেকজান্ডার ককেশাস পেরিয়ে অন্য দিকে গিয়ে পৌঁছেছিলেন। ভারতের পশ্চিম সীমা বরাবর সিন্ধু নদ। সিন্ধু নদ দু’দিকে সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। নদীর দুটো মুখ সমুদ্রে গিয়ে পড়তে ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ডানিয়ূব নদীর পাঁচটা মুখের মতো প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাছাকাছি নয়, বরং নীল নদের মুখগুলোর মতো যা মিশর (Egypt)-এর মতো ব-দ্বীপ সৃষ্টি করেছে। সিন্ধুর ব-দ্বীপও ঈজিপ্টের থেকে ছোট নয়। ভারতীয় ভাষায় একে ‘পট্টল’ বলে। ভারতবর্ষের দক্ষিণ আর দক্ষিণ-পশ্চিমে এই মহাসাগর দেশের পূর্ব সীমাকে চিহ্নিত করেছে।
ষ্ট্র্যাবো
ভারতবর্ষের উর্বরতা
ভারতবর্ষে বছরে দু-বার ফল আর শস্য উৎপন্ন হয়। একথা বলে মেগাস্থিনিস ওই দেশের উর্বরতার কথা বলতে চেয়েছেন। এরাটস্থেনিসও তাই বলেছেন। তিনি লিখেছেন, ভারতে শীত আর গ্রীষ্ম দুই ঋতুতেই শস্যের ফলন হয়, আর দুই ঋতুতেই বৃষ্টি হয়। এমন বছর দেখা যায় না, যখন শীত আর গ্রীষ্ম দুই সময়ই বৃষ্টি হচ্ছে না, ফলে প্রতি বছরই প্রচুর শস্য উৎপন্ন হয়, কারণ জমি কখনো অনুর্বর থাকে না। তাছাড়া, গাছে গাছে প্রচুর ফল জন্মায়। আর তরুলতার মূল, বিশেষ করে সুদীর্ঘ নলজাতীয় উদ্ভিদের মূলগুলো এমনিতেই সুমিষ্ট, সিদ্ধ করলেও মিষ্টি থাকে, কারণ বৃষ্টির জল বা নদীর জল, থেকে যে রস তারা গ্রহণ করে, তা সূর্যের কিরণে উত্তপ্ত হয়। এরাটস্থেনিস এখানে একটি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেছেন। অন্যান্য জাতের মধ্যে যাকে ফল বা রসের ‘পরিপক্কতা’ বলা হয়, ভারতে তাকে ‘পাক’ বা রন্ধন বলে। কারণ, আগুনে সিদ্ধ করলে যেমন (রস) সুমিষ্ট হয়, এক্ষেত্রেও সেরকমই হয়। তিনি আরও বলেন যে, সঠিক ও উপযুক্ত কারণেই গাছের ডালগুলো নমনীয় এবং ওই ডাল দিয়ে চাকা তৈরি হয়। এবং ওই কারণে একজাতের গাছে পশম জন্মায়।
এরাটস্থেনিস থেকে উদ্ধৃত করে স্ট্র্যাবো বলেছেন— ‘ভারতবর্ষে অসংখ্য নদ-নদী থেকে ক্রমাগত সূর্য তাপে বাষ্প উঠে যায় আর সারা বছর ধরে বাতাস প্রবাহিত হয়। এই বৃষ্টির সময় শণ, তিসি, চীনা জোয়ার, তিল, ধান, বস্পরন প্রভৃতি শস্য উৎপন্ন হয়। শীতকালে গোধূম, যব, ডাল আর আমাদের অজানা-অচেনা অনেকরকমের ফল ও শস্য জন্মায়।
ষ্ট্র্যাবো
ভারতবর্ষের কয়েকটি বন্য জন্তু
মেগাস্থিনিস বলেন যে, পূর্ব দেশে সবচেয়ে বড় বাঘ দেখতে পাওয়া যায়, যারা সিংহের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ আকৃতির। আর এতটাই বলশালী যে একটি পালিত বাঘকে যখন চারজন লোক নিয়ে আসছিল তখন বাঘটা তার পেছনের পা দিয়ে একটা অশ্বতর (খচ্চর)-কে ধরে তাকে নিজের কবলে টেনে আনে। বানরগুলো প্রকাণ্ড, বড় কুকুরের চেয়েও বড়। তাদের সর্বাঙ্গ সাদা, শুধু মুখ ছাড়া। মুখ কালো রঙের। অন্য ধরনের বানরও দেখা যায়। তাদের লেজ দু’হাতের বেশি লম্বা। এরা হিংস্র নয়, সহজে পোষ মানে। এরা কাউকে আক্রমণ করে না, আর চুরিও করে না। এ দেশের খনি থেকে এক ধরনের পাথর পাওয়া যায়, যার রং ধুনোর মতো আর সেগুলো ডুমুর ফল বা মধুর থেকেও মিষ্ট।
কোনো কোনো জায়গায় দু’হাত লম্বা সাপ দেখা যায়, বাদুড়ের মতো এই সাপদের পাতলা চামড়ার পাখা আছে। রাতের বেলা এরা উড়ে বেড়ায়, আর তখন ফোঁটা ফোঁটা মূত্রত্যাগ করে। ওই মূত্র কোনো অসাবধানী মানুষের গায়ে পড়লে দুর্গন্ধযুক্ত ঘা তৈরি হয়। এদেশে খুব বড় পাখনাওয়ালা বিছেও পাওয়া যায়। এখানে আবলুস কাঠও পাওয়া যায়। ভারতে খুব বলবান আর সাহসী কুকুর আছে। একবার তারা কাউকে কামড়ে ধরলে যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের নাকের মধ্যে জল ঢালা না হবে, ততক্ষণ ছাড়বে না। তারা এমন উগ্রভাবে কামড় বসায় যে তাদের চোখ বিকৃত হয়ে যায়, এমনকি চোখ ফেটে বেরিয়ে পড়ে। একবার একটা কুকুর একটা সিংহ আর একটা ষাঁড়কে এমনভাবে কামড়ে ধরেছিল যে ষাঁড়টার মুখ থেকে কুকুরটাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আগেই সেটার মৃত্যু হয়।
এলিয়ান
কয়েকটি ভারতীয় বন্যজন্তুর বিবরণ
শোনা যায় ভারতবর্ষের কোনো কোনো প্রদেশে, এখানে আমি মূলত অভ্যন্তরের প্রদেশ বা অঞ্চলগুলোর কথা বলছি, বেশ দূরারোহ পর্বতমালা আছে, যেগুলো বন্যজন্তুদের বাসস্থান। সেখানে আমাদের দেশের যে সমস্ত জন্তু আছে তাদেরও দেখা মেলে, কিন্তু তারা বন্য। শুনতে পাই যে, এখানকার ভেড়া অবধি বন্য। তাছাড়া এসব অঞ্চলে কুকুর, ছাগল ও ষাঁড় স্বচ্ছন্দে ও স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করে, তারা রাখাল বা মেষপালকদের শাসন কাকে বলে জানে না। সংখ্যায় এরা প্রচুর, গণনার বাইরে। এ কেবল ওই দেশ সম্পর্কে লেখকদের বক্তব্য নয়, ওদেশের পণ্ডিতরাও একথা বলেন। ব্রাহ্মণরাও পণ্ডিত বলে গণ্য এবং তারাও এ ব্যাপারে একমত। লোকে বলে যে ভারতবর্ষে এক ধরনের একশৃঙ্গ জন্ত আছে যারা পূর্ণবয়স্ক ঘোড়ার আকারের, তাদের ‘কোর্তাজন (Kortazon) বলে। জন্তুটার শিখা আর কোমল রোম আছে পীতরঙের। অত্যন্ত দ্রুতগামী। হাতির পায়ের মতো সন্ধিবিহীন গঠন, ভারি চমৎকার। লেজ শুয়োরের মতো। এই জন্তুর দুই ভ্রূ-এর মাঝখানে শিং আছে। সোজা, সরল শিং নয়, পাকানো শিং কুন্ডলিত আর কালো রঙের। আমি শুনেছি যে এদের স্বর খুব কর্কশ আর তীব্র। শিং খুব তীক্ষ্ন। অন্য জন্তুরা কাছাকাছি আসলে শান্ত ব্যবহার করে, কিন্তু নিজের জাতের জন্তুদের সঙ্গে প্রবল বিবাদ করতে অভ্যস্ত। শিং-এর সঙ্গে শিং ঘষে পুরুষ জন্তুরা শুধু যে নিজেরা যুদ্ধ করে তা নয়, স্ত্রী জন্তুদের সঙ্গেও যুদ্ধ করতে চায়। যতক্ষণ না প্রতিপক্ষ পরাজিত হয়, ততক্ষণ এরা যুদ্ধে বিরত হয় না। এদের শরীরের সব অংশই সুগঠিত আর অত্যন্ত বলশালী, কিন্তু শিং-এর শক্তি অপরাজেয়। এরা নির্জনতা পছন্দ করে আর একা ঘোরাফেরা করতে ভালোবাসে। মিলনের সময় এরা স্ত্রী-জন্তুর সঙ্গে একত্রে আহার-বিহার করা পছন্দ করে এবং শান্ত ব্যবহার করে, কিন্তু স্ত্রী কোর্তাজন গর্ভবতী হলে পুরুষটি আবার নির্জন একাকীত্বে ফিরে যায় ও স্বজাতির প্রতি হিংস্র স্বভাবের হয়ে ওঠে। শোনা যায় যে, এদের শাবকগুলি প্রাচ্য দেশের রাজাদের কাছে শৈশবে ধরে আনা হয় আর উৎসব-আয়োজন করে পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে নিয়োজিত করা হয়। কিন্তু পূর্ণবয়স্ক কোর্তাজন ধরা হয়েছে বলে কেউ মনে করতে পারে না।
এও শোনা যায় যে ভারতের ভিতরের অংশে প্রদেশগুলোর প্রান্তসীমায় পর্বতের সংলগ্ন গভীর খাত আছে। খাতগুলো জঙ্গলে সমাকীর্ণ— ভারতীয়রা ওই অঞ্চলকে করূদ (Karuda) বলে। এই খাতগুলোয় ছাগমানুষ (সেটর, Satyr, মানুষ ও ছাগলের সংমিশ্রণ, বনদেবতা (গ্রীক) আকারের একপ্রকার জন্তু বাস করে। এদের শরীর কর্কশ লোমে ঢাকা, আর কটিদেশ থেকে ঘোড়ার মতো লেজ বেরিয়ে থাকে। বিশেষ উত্যক্ত না হলে এরা লতাগুল্ম পরিবৃত স্থানে বাস করে, বুনো ফুল আহার করে প্রাণধারণ করে। কিন্তু শিকারীর চিৎকার অথবা কুকুরের আওয়াজ শুনলে তারা তীব্রগতিতে উপরে উঠে যায়, এরা পাহাড়ে উঠতে খুবই অভ্যস্ত। উপর থেকে পাথর গড়িয়ে দিয়ে শত্রুর সঙ্গে প্রাণপণ যুদ্ধ করে বহু হতাহত করে। এদের ধরা খুব কঠিন। শোনা যায় যে অনেক দিনের চেষ্টায় কয়েকটা জন্তু বহুকষ্টে ধরা হয়েছিল, তারা হয় গর্ভবতী ছিল, নয় অসুস্থ এবং সেই কারণে তাদের গতি শ্লথ হয়ে পড়ার জন্য তাদের ধরা সম্ভব হয়।
ষ্ট্র্যাবো
পাটলিপুত্র নগর
মেগাস্থিনিস বলেন যে, গঙ্গা গড়পড়তা একেশো স্ট্যাডিয়া চওড়া আর সবচেয়ে কম গভীরতা একশো ফুট।
গঙ্গা ও আর একটি নদীর সঙ্গমে পাটলিপুত্র (Palibothra) অবস্থিত। এই নগরের দৈর্ঘ্য আশি স্ট্যাডিয়া আর বিস্তার পনেরো স্ট্যাডিয়া। আকার সমান্তরাল আয়তাকার ক্ষেত্রের মতো। চারদিক কাঠের পাঁচিল দেওয়া, প্রাচীরের মধ্যে জায়গায় জায়গায় তীর ছোঁড়ার জন্য ফুটো করা আছে। নগর কাঠের পাঁচিলে ঘেরা, তার সামনে বড় পরিখা রয়েছে। নগর রক্ষা করার জন্য আর দূষিত জল নগর থেকে ওই পরিখাতে এসে পড়ে। পাটলিপুত্র নগর যে রাজ্যে অবস্থিত তারা জাতি হিসাবে ভারতবর্ষে সবচেয়ে বিখ্যাত— Prasioi বা প্রাচ্য। রাজাকে নিজের বংশের নাম ছাড়াও পাটলিপুত্রের নাম গ্রহণ করতে হয়। যেমন চন্দ্রগুপ্তকে এই নাম গ্রহণ করতে হয়েছিল। মেগাস্থিনিসকে তাঁর কাছেই দূত হিসাবে পাঠানো হয়েছিল।
(পার্থিয়দের মধ্যেও এইরকম প্রথা আছে। তাদের সবার নামই আরসকাই (Arsakai), যদিও প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা নাম আছে; যেমন অরোডেস (Orodes) ফ্রাটেস (Phraates), অথবা অন্য কিছু।
এরপর নিম্নবর্ণিত জায়গা—
সকলেই বলেন যে, হাইপানিসের পরে গোটা দেশটা খুবই উর্বর; কিন্তু এ ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। অজ্ঞতা আর দূরত্বের কারণে এই অঞ্চল সম্বন্ধে সমস্ত বর্ণনা বাড়িয়ে এবং বানিয়ে বলা, বড় বেশি মাত্রায়। যেমন, সোনা খুঁড়ে তুলে আনে প্রকাণ্ড পিঁপড়ে, বিচিত্র আকারের অদ্ভুত শক্তিবিশিষ্ট মানুষ আর জন্তুর বিবরণ। দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায়— শোনা যায় সীর (Seres) জাতের মানুষরা এতটাই দীর্ঘজীবী হয় যে তারা দুশো বছরের বেশি বাঁচে। আরও শোনা যায় যে, এই অঞ্চলে অভিজাত মানুষরা একটি রাষ্ট্র-কাঠামো তৈরি করেছেন, যার সদস্যসংখ্যা পাঁচশো। সদস্যদের প্রত্যেক রাজাকে এক একটি হাতি উপহার দেন।
এছাড়া মেগাস্থিনিস বলেন যে, প্রাচ্য দেশে সবচেয়ে বড় বাঘ দেখতে পাওয়া যায়…ইত্যাদি।
আরিয়ান
পাটলিপুত্র—ভারতবাসীদের আচার-ব্যবহার
বলা হয় যে, ভারতীয়রা তাদের আত্মীয়স্বজন মারা গেলে স্মৃতির উদ্দেশ্যে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা ফলক তৈরি করে না। তাদের ধারণা, মৃত ব্যক্তির কীর্তি যে সব গানে বা শোকগাথায় গাওয়া হয়ে থাকে তা ওই মৃত মানুষটির স্মৃতিরক্ষার পক্ষে যথেষ্ট।
ভারতে নগরের সংখ্যা এতটাই যে সঠিকভাবে গোনা যায় না। কিন্তু যে সব নগর, সমুদ্রের উপকূলে অথবা নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে সেগুলো কাঠের তৈরি, কারণ ইটের তৈরি হলে কম দিন টেঁকে। বৃষ্টিপাত বেশি, নদীকূল প্লাবিত হয়ে চারদিক ভাসিয়ে দেয়, সেখান ইটের কাঠামোর আয়ু বেশিদিন হয় না। কিন্তু যেসব নগর উঁচুজমির উপর বা পাহাড়ের বুকে তৈরি করা সেগুলোর কাঠামো ইট আর কাদামাটির তৈরি।
ভারতবর্ষে পাটলিপুত্র নগর সর্বশ্রেষ্ঠ। পূর্ব রাজ্যে এই নগর হিরণ্যবাহ নদ আর গঙ্গার সঙ্গমে অবস্থিত। গঙ্গা ভারতের নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রধান, হিরণ্যবাহ বোধ করি তৃতীয় স্থানে আছে, তবুও অন্য দেশের সবচেয়ে বড় নদীগুলোর থেকেও বড়। যদিও যেখানে হিরণ্যবাহ গঙ্গায় গিয়ে মিশেছে সেখানে এটা অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ ও ক্ষুদ্র।
মেগাস্থিনিস আরও বলেন যে, এই নগরের যে ভাগে লোকজনের বসতি তার দৈর্ঘ্য যেখানে সবচেয়ে বেশি তা হল আশি স্ট্যাডিয়া, আর চওড়া পনেরো স্ট্যাডিয়া। এই নগর চতুর্দিকে পরিখাবেষ্টিত। পরিখার চওড়া ছশো ফুট আর ত্রিশ হাত গভীর। নগর-প্রাচীরের পাঁচশো সত্তর বুরুজ আর চৌষট্টি দরজা। তিনি ভারতবাসী সম্পর্কে বলেছেন যে, এরা সবাই স্বাধীন, কেউ কারো ক্রীতদাস নয়।
(স্পার্টা আর ভারতবর্ষের মধ্যে এই ব্যাপারে ঐক্য আছে, কিন্তু স্পার্টাবাসীরা হীলটদের ক্রীতদাস হিসাবে ব্যবহার করে এবং তারা যাবতীয় দাসবৃত্তি করে। ভারতবর্ষের অন্যান্য দেশীয় কোনো দাস নেই। আর ভারতবাসীর দাস হওয়া তো দূরের কথা।)
স্ট্র্যাবো
ভারতবাসীদের আচার-ব্যবহার
ভারতবাসী সকলেই মিতাহারী। বিশেষ করে শিবিরে থাকার সময়। তারা প্রচুর ভিড় পছন্দ করে না, এজন্য তাদের জীবন সংযত, সুশৃঙ্খল। চুরি তাদের মধ্যে বিরল। মেগাস্থিনিস লিখেছেন, যারা চন্দ্রগুপ্তের শিবিরে বাস করছিলেন (চার লক্ষ লোক সেখানে থাকত) তারা বলেন যে, ওই শিবিরে কোনোদিন ত্রিশ মুদ্রার (Drachma) চেয়ে বেশি দামের জিনিস চুরি যায়নি। ভারতে লেখার প্রচলন নেই, তাতেই এই মাত্র চুরি হয়। ভারতবাসী লিখতে জানে না, সব কাজই সুতরাং তাদের স্মৃতির উপর নির্ভর করে হয়। তারা সরল আর মিতাচারী বলে এ সত্ত্বেও সুখে দিন কাটায়। যজ্ঞের সময় ছাড়া কখনো মদ্যপান করে না। আর তারা যে মদ পান করে তা যব থেকে তৈরি হয় না, অন্ন বা ভাত থেকে প্রস্তুত হয়।
এদের প্রধান খাদ্য অন্নব্যঞ্জন। এদের বিধি, নিয়ম আর একে অন্যকে অঙ্গীকার করা, এ সবকিছুই সরল ও সাদাসিধে। প্রমাণ হল, তারা কখনো অভিযোগ নিয়ে রাজদ্বারে যায় না। তারা যা গচ্ছিত বা আবদ্ধ রাখে সে সম্পর্কে কোনো অভিযোগ করতে হয় না; সাক্ষী বা মোহরের প্রয়োজন হয় না— পরস্পরকে বিশ্বাস করেই তারা এসব গচ্ছিত রাখে। এদের বাড়ি বা ঘর সচরাচর অরক্ষিতই থাকে। এই সমস্ত সংযম এবং বুদ্ধিসঙ্গত। কিন্তু অন্য কয়েকটি বিষয় মেনে নেওয়া যায় না। যেমন, তারা জীবনভোর একা একাই খেতে বসে। দিনে অথবা রাতে এমন কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই যখন সকলে একসঙ্গে মিলিত হয়ে খেতে বসতে পারে। যখন যার ইচ্ছা তখন সে খেতে বসে। সামাজিক আর রাষ্ট্রীয় জীবনের পক্ষে এর বিপরীত নিয়মই শ্রেষ্ঠ।
শরীর ঘষে ঘষে (দলাই-মলাই করে) ব্যায়াম করা ভারতবাসীদের বিশেষ প্রিয়। এই পদ্ধতির নানা রূপ আছে, তার মধ্যে হাতির দাঁত ঘষে ঘষে চামড়া মসৃণ করার প্রণালী সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো। ভারতীয়দের সমাধির জায়গাটি সাজানো আর মৃতদেহের উপর যে মাটি দেওয়া হয় তা খুব উঁচু হয় না। অন্যান্য বিষয়ে ভারতীয়রা খুব আড়ম্বর করতে অভ্যস্ত নয়, কিন্তু গয়না বা অলংকার পরতে ভালোবাসে। এরা সোনা আর দামি পাথরের অলংকার ব্যবহার করে আর নকল ফুলের সজ্জায় সুসজ্জিত মসলিনের কাপড় পরতে ভালোবাসে। সঙ্গে ছাতা বয়ে নিয়ে ছত্রধর তাদের অনুগমন করে। ভারতীয়রা সৌন্দর্যের সম্মান করে আর সুন্দর হওয়ার জন্য নানা উপায়কে আশ্রয় করে। এরা সত্য আর ধর্মকে সমতুল্য হিসাবে আদর করে। এজন্য জ্ঞানে শ্রেষ্ঠ না হলে তারা বৃদ্ধদের বিশেষ অধিকার দেয় না। তারা বহুবিবাহ করে থাকে আর জোয়ালসহ দুটি বলদের বিনিময়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে মেয়েকে গ্রহণ করে। স্ত্রীদের মধ্যে কেউ বাড়ির গৃহস্থালীতে সাহায্যের জন্য, আবার কেউ সুখ আর সন্তান প্রসবের আশায় বিয়ে করে। স্ত্রীরা সতী হতে রাজি না হলে বহুগামিনী বা ব্যাভিচারিণী হয়। কেউ মাথায় মালা পরে যজ্ঞ সম্পাদন করে না, বলিদানও করে না। বলির পশু তারা খড়েগ ছেদন করে না, শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, কারণ তাহলে পশুটির অঙ্গছেদন না করে তাকে পূর্ণ দেহ শুদ্ধ দেবতার কাছে উৎসর্গ করা যায়।
মিথ্যা কথা বললে অপরাধীর হাত-পা কেটে ফেলা রীতি। যে অন্যের অঙ্গ হানি করে, তার সেই অঙ্গ ছেদন করা হয় না, তার হাতও কেটে ফেলা হয়। যদি কেউ কোনো শিল্পীর হাত বা চোখ নষ্ট করে দেয়, তাহলে অপরাধীর প্রাণদণ্ড হয়। বর্তমান লেখক বলেন যে, কোনো ভারতবাসী ক্রীতদাস রাখে না। (অনীসিক্রিটস বলেন, মুষিকানোস (Mousikanos) যে প্রদেশের রাজা সেখানেই কেবল এই প্রথা চালু আছে…ইত্যাদি।)
রাজার মহিলা দেহরক্ষী থাকে। এদের পিতা-মাতার কাছ থেকে কিনে আনা হয়। অন্য সৈন্য আর পুরুষ দেহরক্ষী দরজার বাইরে থাকে। যে স্ত্রী রাজাকে মাতাল অবস্থায় হত্যা করে, তারা রাজার যে উত্তরাধিকারী তার স্ত্রী হয়ে যায়। পুত্রই পিতার উত্তরাধিকারী হয়। রাজা দিনের বেলা ঘুমোন না, রাতের বেলাতেও ষড়যন্ত্রকারীদের ভয়ে প্রতি দণ্ডে শয্যা পরিবর্তন করেন।
রাজা যে কেবল যুদ্ধের সময় প্রাসাদ থেকে বের হন তা নয়, বিচারের প্রয়োজনেও তাঁকে রাজপ্রাসাদ থেকে বেরোতে হয়। তখন সারাদিন বিচারালয়ে থেকে তাঁকে বিচারের কাজ করতে হয়। এমনকি দেহ-পরিচর্যার সময়েও তিনি বিচারের কাজ চালিয়ে থাকেন, বন্ধ করেন না। দণ্ড দিয়ে তার শরীর ঘর্ষণ করা দেহ-পরিচর্যার নিয়ম। চারজন পরিচারক তাঁর শরীর ওইভাবে ঘষে চলে, আর তিনি তার মধ্যেই বাদানুবাদ শুনে থাকেন। এছাড়া যজ্ঞ সম্পাদনের কাজ করতেও তিনি প্রাসাদের বাইরে আসেন। আর প্রচুর জাঁকজমকের সঙ্গে শিকারের অভিযানে তিনি রাজপ্রাসাদ থেকে বের হন। তখন তিনি রমণী পরিবেষ্টিত হয়ে গমন করেন, তারপর তাকে বেষ্টন করে গোলাকারে বর্শাধারীরা সঙ্গে থাকে। দড়ি দিয়ে পথ চিনে এগোতে হয়, পুরুষ বা রমণীরাও সেই দড়ি বা রজ্জুর মধ্যে ঢুকলে সে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়। কাঁসর আর দুন্দুভি বাজিয়ে আগে লোকজন যায়। রাজা চারদিক ঘেরা জায়গা থেকে মঞ্চের উপর থেকে তীর ছুঁড়ে থাকেন। তাঁর নিকটে দু-তিনজন সশস্ত্র স্ত্রীলোক দাঁড়িয়ে থাকে। খোলা জায়গায় রাজা হাতির পিঠে বসে শিকার করেন। স্ত্রীলোকদের মধ্যে কেউ হাতির পিঠে, কেউ ঘোড়ার উপর বসে যুদ্ধযাত্রার মতো সশস্ত্র হয়ে থাকে।
(আমাদের প্রথাগুলোর তুলনায় এ সমস্ত প্রথা খুবই অদ্ভুত, তবে নিম্নলিখিতগুলো আরও অদ্ভুত।)
মেগাস্থিনিস বলেন যে, ককেসাসবাসীরা প্রকাশ্যে সঙ্গমে লিপ্ত হয় আর আত্মীয়স্বজনের দেহ ভক্ষণ করে থাকে। এক ধরনের বানর আছে তারা পাথর ছুঁড়ে থাকে।
এলিয়ান
ভারতীয়রা সুদের পরিবর্তে ধার দেয় না। ধারকর্জ করতেও জানে না। অন্যের অপকার করা বা অপকার সহ্য করা তাদের নিয়ম নয়। এজন্য তারা কখনো লিখিত অঙ্গীকারপত্র করে না। সাক্ষীরও দরকার হয় না।
নিকলাস
ভারতীয়দের মধ্যে কেউ যদি অপরকে ঋণ দেওয়া অর্থ বা অনেক্যর কাছে গচ্ছিত রাখা দ্রব্য ফেরত না পায় তাহলে তার কোনো প্রতিকার নেই, কেবলমাত্র অপরকে বিশ্বাস করার জন্য নিজেকে ধিক্কার দেওয়া ছাড়া।
যদি কেউ কোনো শিল্পীর হাত বা চোখ নষ্ট করে, তাহলে তার প্রাণদণ্ড হয়। কেউ যদি গুরুতর অপরাধ করে তাহলে রাজা সেই মানুষটির চুল কেটে ফেলার আদেশ দেন— সবথেকে কঠিন শাস্তি সেটা।
আথীনেয়স
ভারতবাসীর খাওয়া-দাওয়ার নিয়ম
মেগাস্থিনিস ‘ভারত বিবরণের’ দ্বিতীয় ভাগে বলেন যে, ভারতীয়রা যখন আহার করে তখন তাদের সামনে তিন-পাওয়ালা একটা টেবিল থাকে, যার উপরে সোনার পাত্র রাখা থাকে। পাত্রে যবের মতো সিদ্ধ ভাত রেখে তার সঙ্গে ভারতীয় পদ্ধতিতে তৈরি বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার মেশানো হয়।
স্ট্র্যাবো
অবাস্তব জাতিদের কথা
কাহিনীর বর্ণনায় এসে তিনি বলেছেন যে, ভারতে পাঁচ বিঘত, এমনকি তিন বিঘত লম্বা মানুষ আছে। এদের মধ্যে কারো নাক নেই, কেবল মুখের ওপর দুটো ফুটো আছে, তাই দিয়ে তারা নিঃশ্বাস নেয়। তিন বিঘত মাপের মানুষের সঙ্গে সারসরা ঝগড়া-লড়াই করে, এগুলো রাজহাঁসের মতো বড়। এরা সারসদের ডিমগুলো সংগ্রহ করে নষ্ট করে, কারণ সারস পাখিরা কেবল এদের দেশেই ডিম পাড়ে, অন্য কোথাও সারসের ডিম বা শাবক দেখা যায় না। এখানে সারস প্রায়ই আহত হয় আর সূক্ষ্ম ধাতুর ফলা দেহের কোথাও বিদ্ধ হওয়া অবস্থায় পালায়। কর্ণ প্রস্বরণ (কান এত বড়ো যে তার মধ্যে শুয়ে থাকা যায় (Enoktokoitai) বুনো মানুষ আর অন্যান্য দানবীয় প্রাণীদের বৃত্তান্তও সে রকম। বন্য মানুষদের চন্দ্রগুপ্তের কাছে আনতে পারা যায়নি। কারণ, তারা অন্নজল ত্যাগ করে আত্মহত্যা করে। এদের পায়ের গোড়ালি সামনের দিকে, পায়ের পাতা আর আঙুলগুলো পেছনের দিকে। কয়েকটা মানুষ আনা হয়েছিল, যাদের মুখ বলতে কিছু নেই। তারা শান্ত ছিল। এরা গঙ্গার উৎপত্তিস্থলে বাস করে। এরা পোড়া মাংসের গন্ধ আর ফুল ও ফলের গন্ধ শুঁকেই বেঁচে থাকে। কারণ তাদের মুখ নেই, বদলে নিশ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করার জন্য শ্বাসরন্ধ্র আছে। দুর্গন্ধ বস্তু থেকে তাদের খুব কষ্ট হয়, এজন্য তাদের পক্ষে প্রাণরক্ষা করা কঠিন, বিশেষ করে শিবিরে।
অন্যান্য অলৌকিক প্রসঙ্গও পণ্ডিতরা তাঁকে বলেছিলেন— যেমন এক পদ (Okupodus) জাতি, যারা ঘোড়ার চেয়েও দ্রুতগতিবিশিষ্ট। তাঁরা বিশালকর্ণ (Enoktokoitai) -দের কথাও বলেছেন। এদের কান, পা পর্যন্ত বিস্তৃত থাকার জন্য এরা তার মধ্যে শুয়ে পড়তে পারে। এরা এতটা শক্তিশালী যে গাছ উৎপাটন করতে পারে কি ধনুকের গুণ ছিঁড়ে ফেলতে পারে। অন্য এক জাতি আছে নাম একাক্ষ (Monommatoi)। তাদের কান কুকুরের কানের মতো এবং একটাই চোখ কপালের ঠিক মাঝখানে থাকে। তাদের রোমশ বুক আর খাড়া চুল। অন্য এক জাতির নাক নেই, তারা সর্বভুক, কাঁচা মাংস খায়, অল্পদিন বাঁচে, বার্ধক্যে পৌঁছবার আগেই মৃত্যু হয়। তাদের মুখের উপরের অংশ (ওষ্ঠ), (অধরের চেয়ে) বেশি প্রসারিত। উত্তর কুরু বা Hyperborean যারা হাজার বছর বাঁচে তাদের সম্বন্ধে সিমোনিডস, পিণ্ডার ও অন্যান্য উপাখ্যান-লেখকদের মতো এঁরাও একই বর্ণনা দিয়েছেন। টিমাগেনীস বলেন, (এই দেশে) তামার গুঁড়ো বৃষ্টি হয়, (লোকে) তা সংগ্রহ করে। এই বর্ণনা কিন্তু কাল্পনিক। মেগাস্থিনিস বলেন, অনেক নদীতে সোনার গুঁড়ো বা রেণু প্রবাহিত হয় এবং এর এক ভাগ রাজাকে দিতে হয়। এটি বেশি বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ, কারণ ইবীরিয়া দেশেও এই প্রকার দেখা যায়।
আরিয়ান
ভারতবর্ষের সাতটি জাতি
সমগ্র ভারতবাসী প্রায় সাতটি জাতিতে বিভক্ত। তাদের মধ্যে ব্রাহ্মণ (Sophistai = পণ্ডিতজন) সংখ্যায় অন্য সমস্ত জাতির থেকে কম হলেও মানমর্যাদায় সবার উপরে। এদের কোনো দৈহিক পরিশ্রম করতে হয় না; অথবা শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করে রাজকোষে জমা দিতে হয় না। রাজ্যের মঙ্গলকামনায় দেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ সম্পাদন করা ছাড়া অন্য কোনো কাজ এদের অবশ্যকর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। যদি কোনো মানুষ তার নিজস্ব ইষ্টসিদ্ধির জন্য যজ্ঞ করতে চায়, তাহলে তার এই যজ্ঞ ব্রাহ্মণদের দিয়েই সম্পন্ন করতে হয়। নচেৎ তা দেবতাদের প্রীতিপ্রদ হয় না। ভারতবাসীদের মধ্যে এরাই কেবল ভবিষ্যৎ গণনা করতে পারে। বছরের বিভিন্ন ঋতু ও রাজ্যের কোনো বিপদ সমাগত কিনা সে বিষয়ে এরা বর্ণনা করে থাকেন, কিন্তু কোনো ব্যক্তির ভাগ্যগণনা করতে সাধারণত রাজি হন না। কারণ, ক্ষুদ্র ব্যাপারে ভবিষ্যৎ গণনার সম্পর্ক কম অথবা এই কারণে শ্রম করা তারা অগৌরবের কাজ মনে করে। যদি কেউ গণনায় তিনবার ভুল করেন, তাহলে তাঁকে কোনো দণ্ড দেওয়া হয় না বটে, কিন্তু তিনি সারা জীবন মৌনব্রত অবলম্বন করে থাকেন। যিনি এই ব্রত গ্রহণ করেন তাকে কথা বলাবার সাধ্য জগতে কোনো মানুষেরই নেই। (এই পণ্ডিতরা উলঙ্গ হয়ে ঘোরাফেরা করে। শীতকালে রোদের সংস্পর্শে আসার উদ্দেশ্যে খোলা বাতাসে ঘুরে বেড়ায়, বাস করে। গরমকালে তাপ প্রখর হয়ে উঠলে তারা মাঠে আর নীচু জমিতে বড় বড় গাছের ছায়ার আশ্রয় নেয়।
নেয়ার্খস বলেন যে, এইসব গাছের ছায়া পাঁচশো ফুট বিস্তৃত, আর সেখানে দশ হাজার মানুষের আশ্রয়ের উপযুক্ত জায়গা আছে। এই বৃক্ষগুলো এমন প্রকাণ্ড। এই মানুষেরা প্রতি ঋতুর ফল আর গাছের ছাল খেয়ে জীবনধারণ করে। এই ত্বক বা ছাল খেজুর ফলের চেয়ে কম সুস্বাদু বা পুষ্টিকর নয়।)
দ্বিতীয় জাতি কৃষকরা। সংখ্যায় ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তারা যুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে না, বা যুদ্ধের প্রয়োজনে কোনো কাজে ব্যস্ত থাকে না। এদের একমাত্র কাজ জমি চাষ করা। রাজাকে বা তার পরিবর্তে স্বরাট শাসককে কর দিয়ে থাকে। ভারতবাসীরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধের সময় কখনো কৃষকদের অত্যাচার করা, বা তার জমি নষ্ট করার চেষ্টা করে না, তারা পরস্পরের সঙ্গে প্রাণপণ যুদ্ধ করে, পরস্পরের প্রাণ যায় পর্যন্ত, কিন্তু অদূরে কৃষকরা নিশ্চিন্তে নিজের কাজে ব্যস্ত থাকে, শস্য সংগ্রহ, গাছ ছাঁটা বা শস্য কাটার কাজে।
ভারতীয়দের তৃতীয় জাতি রাখাল— গোপালক বা মেষপালক। গ্রাম বা নগরে এরা বাস করে না; এরা যাযাবর, পাহাড়ের উপর থাকে। এরা গরু বা ভেড়া কর হিসাবে প্রদান করে। পাখি আর বন্য পশুর খোঁজে সারা দেশময় ঘুরে বেড়ায়।
চতুর্থ শ্রেণী শিল্পী ও পণ্যজীবী। এরা রাজার অধীনে কাজ করে। রাজভৃত্য। এরা পরিশ্রম দিয়ে যা উপার্জন করে, তার উপর কর দিতে হয়। কিন্তু এদের মধ্যে যারা যুদ্ধের জন্য অস্ত্র তৈরি করে তাদের কর দিতে হয় না, বরং তারা রাজকোষ থেকে বেতন পায়। যারা নৌকা নির্মাণ করে অথবা নদীতে নৌকা চালানোর কাজে ব্যাপৃত তাদের ক্ষেত্রে এই একই নিয়ম।
পঞ্চম জাতি যোদ্ধা। ভারতে এদের সংখ্যা ঠিক কৃষকদের পরে, দ্বিতীয় স্থানে এরা যতটা সম্ভব স্বাধীনতা, সুখ আর বিলাসে জীবনযাপন করে। এদের কেবল যুদ্ধ আর সেই সম্পর্কিত কাজ করতে হয়। এদের জন্য অন্য লোক অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করে, অন্য লোকজন এদের ঘোড়া জোগাড় করে, এদের সেবা করে, ঘোড়ার পরিচর্যা করে, রথ সাজায় আর চালানোর ব্যবস্থা করে। সৈন্যরা যুদ্ধের সময় যুদ্ধ করে আর সন্ধি স্থাপন হলে বিলাসব্যসনে ডুবে থাকে। রাজকোষ থেকে প্রচুর বেতন পাওয়ার জন্য এরা স্বচ্ছন্দে নিজের ও অন্যের ভরণপোষণ চালাতে সক্ষম।
পর্যবেক্ষক (Episcopoi) হল ষষ্ঠ জাতির ব্যক্তি। গ্রামে ও নগরে কখন কী হচ্ছে তার খোঁজ নেওয়া এদের কাজ, আর সেই অনুসন্ধানের ফল তারা রাজার কাছে অথবা যেখানে রাজার বদলে স্বাধীন স্বতন্ত্র শাসনকর্তা আছে তাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া। কখনো মিথ্যা কোনো খবর এরা পাঠায় না, বস্তুত মিথ্যা খবর আদান-প্রদানের নিয়ম ভারতীয়দের মধ্যে নেই।
সপ্তম জাতি সচিবগণ। এরা রাজা অথবা স্বতন্ত্র শাসনকর্তাদের রাজকার্যে পরামর্শ দিয়ে থাকে। এরা সংখ্যায় অল্প, কিন্তু জ্ঞানে ও নৈতিকতায় শ্রেষ্ঠ। মণ্ডলপ্রধান (Nomarchai) অধস্তন শাসনকর্তা, কোষাধ্যক্ষ, সেনাপতি, পোতাধ্যক্ষ, কর্মাধ্যক্ষ (Tamiai) আর কৃষি পরিদর্শক নিয়োগ করেন এই সচিবরাই।
এক জাতির সঙ্গে অন্য জাতির বিয়ে বিধিসম্মত নয়। যেমন, কৃষক, শিল্পীদের বা শিল্পী কৃষকদের বিয়ে করতে পারে না। কারো পক্ষে আবার দুই ব্যবসা একসঙ্গে চালানো বা এক পেশা থেকে অন্য পেশা অবলম্বন করাও নিয়ম নয়। অর্থাৎ, রাখাল কৃষক হতে পারে না, বা শিল্পী রাখাল হতে পারে না। কেবলমাত্র জ্ঞানী সকল জাতির লোক হতে পারে, কারণ জ্ঞানীদের জীবনযাত্রার পদ্ধতি সহজ নয়, বরং সবচেয়ে কঠিন।
স্ট্র্যাবো
ভারতীয়দের সাতটি জাতি
মেগাস্থিনিস বলেন যে, ভারতীয়রা সাত জাতিতে বিভক্ত। পণ্ডিতরা (Philosophoi) মানমর্যাদায় শ্রেষ্ঠ। কিন্তু তারা সংখ্যায় সবচেয়ে কম। যজ্ঞ অথবা অন্য কোনো অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে চাইলে মানুষ এঁদের সাহায্য গ্রহণ করে। রাজাও প্রকাশ্য সভায় এঁদের ‘মহাসমিতি’ নামে অভিহিত করে আহ্বান করেন। সেই উপলক্ষে সমস্ত পণ্ডিতরা নববর্ষের প্রারম্ভে রাজপ্রাসাদের দ্বারদেশে রাজার সামনে এসে হাজির হন। তখন যদি কেউ সাধারণের মঙ্গলের জন্য, অথবা শস্য, পশু বা রাজ্যের উন্নতির জন্য কিছু লিখে থাকেন বা পর্যবেক্ষণ করে থাকলে সেগুলো প্রকাশ্যে বলেন। যদি কারও গণনা তিনবার মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়, তবে তাঁকে সারাজীবন মৌন থাকতে হয়, এটাই রীতি। কিন্তু যাঁরা ভালো উপদেশ দিয়ে থাকেন তাঁদের কর আর শুল্ক থেকে ছাড় দেওয়া হয়।
কৃষকরা হল দ্বিতীয় জাতি। সবচেয়ে নিরীহ আর সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। এদের যুদ্ধ করতে হয় না, এরা নির্ভয়ে নিজের কাজ করে। কখনো নগরে যায় না— সেখানকার ঝগড়া-বিবাদে অংশগ্রহণ করে না, অন্য কোনো কারণেও যায় না। সুতরাং প্রায়ই দেখা যায় যে, একই জায়গায় সৈন্যরা জীবনপণ করে যুদ্ধ করতে ব্যস্ত, আর তার ঠিক পাশেই কৃষকরা শান্তিতে মাটি খুঁড়ছে বা চাষে ব্যস্ত আছে, সৈন্যরাই তাদের রক্ষক। সমস্ত জমিই রাজার সম্পত্তি। কৃষকরা চাষ করে শস্যের চার ভাগের এক ভাগ পেয়ে থাকে।
পশুপালক আর ব্যাধ হল তৃতীয় জাতি। এরা কেবল শিকার, পশুপালন, ভারবাহী পশু কেনা ও তার ব্যবসা করতে পারে। এরা দেশকে বন্যজন্তু ও যে সমস্ত পাখি শস্যের বীজ খেয়ে যায়, তাদের থেকে মুক্ত রাখে, এবং তার কারণে রাজার কাছ থেকে শস্য পেয়ে থাকে। এরা যাযাবর, শিবিরে থাকে ও সেখানেই জীবনযাপন করে।
শিল্পী, বণিক বা পণ্যজীবি আর শারীরিক পরিশ্রমে নিযুক্ত লোকজন এই চতুর্থ শ্রেণীভুক্ত। এদের মধ্যে কেউ কেউ কর দেয়, রাজ্যের জন্য নির্দিষ্ট কাজ করে থাকে। কিন্তু এদের মধ্যে যারা অস্ত্রশস্ত্র ও নৌকা র্নিমাণ করে তারা রাজকোষ থেকে মাইনে পায়, আহার্যও পেয়ে থাকে। কারণ এরা কেবলমাত্র রাজার জন্য শ্রম করে। সেনাপতি সৈন্যদের অস্ত্রশস্ত্র প্রদান করে, আর পোতাধ্যক্ষ উপযুক্ত অর্থের বিনিময়ে যাত্রী ও পণ্যবহনের জন্য নৌকার জোগান দেয়।
পঞ্চম জাতি যোদ্ধারা। এরা যুদ্ধ ছাড়া অন্য সময়ে অলস জীবনযাপন করে, মদ্যপান করে। রাজকোষ থেকে এদের ভরণপোষণ চলে, তাই যুদ্ধে যেতে এরা সবসময় প্রস্তুত। নিজেদের শরীর ছাড়া আর কিছু সেক্ষেত্রে এদের নিয়ে যেতে হয় না।
পর্যবেক্ষকরা ষষ্ঠ জাতি। রাজ্যের সমস্ত ঘটনার খোঁজখবর নিয়ে এরা গোপনে রাজাকে জানায়। এদের কেউ শিবিরে, আবার কেউ নগরে কাজের প্রয়োজনমতো বাস করে, কার্যসিদ্ধির জন্য নগর বা শিবিরের বারাঙ্গনাদের সাহায্য গ্রহণ করে। সবচেয়ে দক্ষ আর বিশ্বাসী লোকেরা এই কাজে নিযুক্ত থাকে।
রাজার সচিব আর মন্ত্রীর সপ্তম জাতিভুক্ত। রাজ্যের সর্বোচ্চ পদগুলি, ন্যায়াধিকরণ বা বিচারব্যবস্থা এবং দেশশাসনের কাজকর্মসমূহ—সবটাই এঁদের হাতে।
এক জাতের লোক অন্য জাতে বিয়ে করতে পারে না, অথবা অপর জাতের ব্যাবসা গ্রহণ করতে পারে না, একমাত্র পণ্ডিতরা ছাড়া কেউ একাধিক কাজে নিযুক্ত হতে পারে না। পণ্ডিতরা ধর্মনিষ্ঠ বলে এই অধিকার পেয়ে থাকে।
স্ট্র্যাবো
শাসনপ্রণালী
ঘোড়া আর হাতির ব্যবহার
শাসনকর্তাদের কেউ কেউ কেনা-বেচার জায়গায়, কেউ নগরে আবার কেউ অস্থায়ী বাসস্থান বা শিবিরে অবস্থান করে। কেউ বা নদীগুলো পর্যবেক্ষণ করে, আবার কেউ মিশর দেশের (Egypt) মতো জমি-পরিমাপ করে। সবাই যেন সমান পরিমাণে জল পায় তার জন্য ছোট ছোট নিকাশি নালা তৈরি করে প্রধান নিকাশি থেকে জলধারা ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং ব্যবস্থার দেখভাল করা হয়। এই নিকাশিগুলো প্রয়োজনমতো বন্ধ করা যায়।
এই শাসনকর্তারা শিকারীদের উপর কর্তৃত্ব করে, তাদের উপযুক্ত পুরস্কার বা শাস্তি প্রদান করে— এছাড়া তারা কর সংগ্রহ করে, আর ভূমি সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ যেমন কাঠুরে, ছুতোর, কামার ও খনি যারা খনন করে তাদের সকলের কাজ পরিদর্শন করে। এরা পথ তৈরি করে ও দশ ষ্ট্যাডিয়া বা এক ক্রোশ অন্তর পথের দূরত্ব আর পথের শাখাপ্রশাখাগুলো চিহ্নিত করার জন্য এক একটা স্তম্ভ স্থাপন করে।
নগরের শাসনকর্তারা ছয় ভাগে বিভক্ত, এক এক দলে পাঁচজন করে লোক থাকে। প্রথম দল শ্রম থেকে উৎপন্ন শিল্পকর্ম পর্যবেক্ষণ করে। দ্বিতীয় দলের কাজ বিদেশ থেকে আসা অতিথিদের দেখাশোনা করা। এরা অতিথিদের বাসগৃহ প্রদান করে ও ভৃত্যদের মারফৎ তারা কীভাবে জীবনযাপন করছে তার উপর তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখে। অতিথিরা নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চাইলে, এই দলের লোক সঙ্গে যায়, কোনো বিদেশির মৃত্যু হলে তার সম্পত্তি তার আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়ে দেয়। অসুস্থ হলে পড়লে এরা অতিথিদের সেবা-শুশ্রূষা করে আর মৃত্যু হলে মাটিতে প্রোথিত করে। তৃতীয় দল কোথায় কীভাবে কার জন্ম বা মৃত্যু তার খোঁজখবর নেয়। শুধু কর ধার্য করার উদ্দেশ্যে নয়, কোনো উঁচু বা নীচু সম্প্রদায়ের জন্ম-মৃত্যু যেন অজ্ঞাত না থাকে তার জন্য। চতুর্থ দল ব্যাবসা-বাণিজ্যের দেখভাল ও খোঁজখবর নেয়। এরা জিনিষের ওজন, মাপ ও পরিমাণ যাতে সঠিক হয় সেদিকে খেয়াল রাখে আর প্রত্যেক ঋতুর শস্য যেন প্রকাশ্যে বিক্রি হয় তার পর্যবেক্ষণ করে, দ্বিগুণ শুল্ক না দিয়ে কেউই একাধিক বস্তুর ব্যবসা করতে পারে না। পঞ্চম দল সূক্ষ্ম বা যন্ত্রে উৎপন্ন শিল্পসামগ্রীর তত্ত্ববধান করে এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা করে এগুলো বিক্রি করে। নতুন ও পুরোনো জিনিস দুটি আলাদা জায়গায় বিক্রি হয়। একসঙ্গে দুটো মিশিয়ে বিক্রি করলে জরিমানা হয়। ষষ্ঠ দল, সেইসব লোক নিয়ে গঠিত যারা বিক্রি করা পণ্যের দাম থেকে দশ ভাগের এক ভাগ শুল্ক হিসাবে সংগ্রহ করে। যে ব্যবসায়ী এই শুল্ক দিতে চায় না বা প্রবঞ্চনা করে তার মৃত্যুদণ্ড হয়। এই সমস্ত দল আলাদা আলাদাভাবে এসব কাজগুলো করে থাকে। আবার একসঙ্গে মিলেমিশে এরা নিজের কাজের বাইরে অন্য কাজও করে থাকে যেমন, রাজ্যের কিছু সাধারণ কাজ যথা রাজকীয় সৌধ বা হর্ম্যগুলো প্রয়োজনমতো দেখাশোনা, পরিচ্ছন্ন ও মেরামতি করে রক্ষা করা, পণ্যদ্রব্যের মূল্য ঠিক করা আর কেনাবেচার জায়গাও ঠিক করা, বন্দর আর দেবমন্দিরগুলোর তত্ত্বাবধান এরাই করে থাকে।
নগরের শাসনকর্তাদের পরে তৃতীয় এক দল রাজপুরুষ আছে যারা সৈন্য সংক্রান্ত যাবতীয় কাজকর্ম দেখাশোনা করে। পাঁচ-পাঁচজন করে এরাও ছয় দলে বিভক্ত। এক দল পোতাধ্যক্ষের সঙ্গে অন্য আরেক দল বলদ-টানা গাড়িগুলির দেখাশোনা যারা করে তাদের সঙ্গে মিলে একসঙ্গে কাজ করে। বলদের (যুগগুলি) গাড়ি, যুদ্ধের অস্ত্র বা অস্ত্রশস্ত্র, সৈন্যদের খাবার-দাবার, গবাদি পশুর জন্য ঘাসপাতা ও যুদ্ধের অন্যান্য উপকরণ বয়ে নিয়ে যায়। এই লোকজনরা ভেরী ও ঘণ্টা বাজানোর ভৃত্যদের জোগান দিয়ে থাকে। ঘোড়ার পরিচারক, যন্ত্রনির্মাতা আর তাদের সহযোগীদেরও সংগ্রহ করে দেয়। ঘণ্টা বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে ঘাস সংগ্রহ করার জন্য এরা সৈন্য পাঠায় আর কাজ যাতে তাড়াতাড়ি নিরাপদে সম্পন্ন হয় তার জন্য পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা করে। তৃতীয় দল পদাতিক সৈন্যের, চতুর্থ দল অশ্বারোহীদের, পঞ্চম দল রথের ও ষষ্ঠ দল হাতিদের তত্ত্বাবধান করে। রাজকীয় অশ্বশালা ও হস্তীশালা আছে, তেমনই রাজকীয় অস্ত্রাগারও আছে, সেখানে প্রত্যেক সৈন্যকে অস্ত্রশস্ত্র ফেরৎ দিতে হয়। ভারতবাসীরা বল্গা ছাড়াই হাতি চালায়। যুদ্ধে যাওয়ার সময় বলদরা রথ টানে, ঘোড়াগুলোকে গলায় দড়ি পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, নয়তো রথ টানার সময় তাদের পায়ে ক্ষত হতে পারে এবং তেজ কমে যেতে পারে। প্রতি রথে সারথির পাশে দুটি করে যোদ্ধা দাঁড়িয়ে থাকে। হাতির পিঠে চারজন থাকে। একজন মাহুত, অন্য তিনজন তীর ছোঁড়ে।
আরিয়ান
সোনা খননকারী পিঁপড়ে
মেগাস্থিনিস বলেছেন যে, পিঁপড়ে সম্পর্কে জনশ্রুতি সম্পূর্ণ সত্য। এই পিঁপড়েরা সোনা খুঁড়ে বার করে। এরা যে সোনার খোঁজ করেই সোনা খুঁজে বার করে তা নয়, আসলে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকার কারণে মাটি খুঁড়তে গিয়ে সঙ্গে সোনা উঠে আসে। যেমন, আমাদের দেশের ছোট ছোট পিঁপড়েগুলো ছোট ছোট গর্ত খুঁড়ে বাস করে। তবে ভারতবর্ষের পিঁপড়েগুলো এক একটা শেয়ালের চেয়েও বড় আকারের, তাই অনেক বড় গর্ত খুঁড়তে হয়। ওই গর্তের জন্য খোঁড়া মাটিতেই সোনার গুঁড়ো মিশে থাকে। ভারতীয়রা ওই মাটি থেকেই সোনা সংগ্রহ করে।
(কিন্তু মেগাস্থিনিস শুধু কিংবদন্তীটুকু বর্ণনা করে গেছেন। আমার (আরিয়ান) এ বিষয়ে জোর দিয়ে লিখবার কিছু নেই, তাই এখানেই পিঁপড়ে সম্পর্কে কাহিনী শেষ করলাম।)
স্ট্র্যাবো
ভারতীয় পণ্ডিতদের সম্পর্কে
পণ্ডিতদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে মেগাস্থিনিস লিখেছেন যে, এঁদের মধ্যে যাঁরা পর্বতে বাস করেন তাঁরা ডায়োনীসসের উপাসক। (যে ডায়োনীসস ভারতবর্ষে এসেছিলেন) তার প্রমাণ বুনো আঙুর, যা কেবল তাঁদের দেশেই জন্মায়— আর আইভি, লরেল, মার্টল আর বক্স-ট্রি আর অন্যান্য চিরহরিৎ গাছপালা। এইসব গাছের কোনোটাই ইউফ্রেটিস নদীর পূর্বদিকে জন্মায় না, কেবল উপবনে অল্পসল্প জন্মে থাকে। সেখানেও এদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত যত্নের প্রয়োজন। ডায়োনীসসের উপাসকদের মতো এই পর্বতবাসীরাও মসলিন কাপড় পরে, মাথায়ে পাগড়ি পরে আর গন্ধদ্রব্য ব্যবহার করে, উজ্জ্বল রঙের ফুলতোলা কাপড়ে দেহসজ্জা করে, আর তারা যখন বাইরে কোথাও যায় তখন তাদের আগে আগে দুন্দুভি আর ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে লোক যায়। কিন্তু যে সমস্ত পণ্ডিত সমতলভূমিতে বাস করে, তারা হীরাক্লিসের পুজো করে।
কিন্তু এই বৃত্তান্ত কাল্পনিক। অনেক লেখক এ বিষয়ে, বিশেষ করে আঙুর ফল আর মদ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, সে ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন; কারণ আর্মেনিয়ার অধিকাংশ, সমগ্র মেসোপটেমিয়া ও নীডিয়া আর পারস্য থেকে আর্মেনিয়া পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চল ইউফ্রেটিসের পূর্বদিকে অবস্থিত। শোনা যায়, এইসব দেশের প্রতিটিতে বিভিন্ন জায়গায় ভালো জাতের আঙুর জন্মায় আর উৎকৃষ্টমানের মদ তৈরি হয়।
মেগাস্থিনিস পণ্ডিতদের অন্যভাবে ভাগ করেছেন। তাঁর মতে, পণ্ডিতরা দু’ভাগে বিভক্ত— এক দল ব্রাহ্মণ, অন্য ভাগ শ্রমণ। ব্রাহ্মণরা সবচেয়ে বেশি সম্মান পেয়ে থাকে, কারণ তাদের ধর্ম বেশি সঙ্গতিপূর্ণ। গর্ভে আসার সময় থেকেই তারা জ্ঞানী মানুষদের সান্নিধ্য এবং যত্ন পাওয়া শুরু করে। এই জ্ঞানী মানুষেরা শিশু গর্ভস্থ হলে তার মায়ের কাছে যায় এবং মা ও শিশুর কল্যাণের জন্য মন্ত্র উচ্চারণ করার মধ্য দিয়ে তাদের সৎ উপদেশ আর পরামর্শ প্রদান করে। যে সব মায়েরা আগ্রহ নিয়ে তাদের ওই পরামর্শ শোনে ও গ্রহণ করে, তাদের সুসন্তান জন্মলাভ করে। এটাই জনগণের বিশ্বাস। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিশু ভিন্ন ভিন্ন গুরু বা পালনকারীর হাতে বেড়ে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা আরও শিক্ষিত এবং নিপুণ থেকে নিপুণতর মানুষদের কাছে লালিত-পালিত ও শিক্ষিত হয়।
পণ্ডিত মানুষরা নগরের ঠিক সামনে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ছোট জায়গায় উপবনে বাস করে। তাদের জীবনযাত্রায় কোনো আড়ম্বর চোখে পড়ে না, তারা তৃণ বা চামড়ার বিছানায় শুয়ে থাকে। তারা মাছ বা মাংস খায় না, ইন্দ্রিয়সম্ভোগ থেকে বিরত থাকে এবং জ্ঞানগর্ভ বিষয়ে আলোচনা, ব্যস্ত থাকা পছন্দ করে। যারা ওই সমস্ত বিষয়ে আলোচনা শুনতে চায় তাদের তা প্রদান করে। সেইসময় শ্রোতার থুতু ফেলা, কথা বলা বা কাশি হওয়া বারণ। এরকম হলে আত্মসংযমের অভাব বলে সেই শ্রোতা সমাজ থেকে বহিষ্কৃত হয়।
এইভাবে সাঁইত্রিশ বছর জীবনযাপন করে তাঁরা প্রত্যেকে নিজের নিজের সম্পত্তির অধিকারী হন ও বাকি জীবন স্বচ্ছন্দে আর শান্তিতে উপভোগ করেন। তখন তাঁর সেরা মসলিন কাপড় পরে থাকেন, আর কানে ও হাতে সোনার গয়না পরেন। তাঁরা মাংস খেয়ে থাকেন বটে, কিন্তু যে জন্তু বা পশু পরিশ্রমের কাজে নিযুক্ত তাদের মাংস খান না। খুব বেশি মশলাযুক্ত স্বাদু খাবার এঁরা গ্রহণ করেন না। অনেক সন্তানলাভের আশায় এঁরা যত ইচ্ছা তত মহিলার পাণিগ্রহণ করেন, কারণ অনেক স্ত্রী থাকলে অনেক ধরনের সুবিধা হয়। যাঁদের ক্রীতদাস নেই, তাঁদের কাছে সন্তান-সন্ততিদের সেবাও প্রয়োজন।
ব্রাহ্মণরা তাদের স্ত্রীদের নিজের জ্ঞান বা দর্শন শিক্ষা দেন না। কারণ, তা হলে যারা দুষ্টা প্রকৃতির তারা অন্য ব্রাহ্মণ অপেক্ষা নীচু জাতের মানুষ যাদের কাছে এই জ্ঞান নিষিদ্ধ, তাদের শিখিয়ে দিতে পারে। অথবা যে পত্নী বুদ্ধিমতী ও ব্যুৎপত্তির অধিকারিণী, সে পতিকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। কারণ, যখন সে বুঝবে যে সুখ-দুঃখ, জীবন-মরণ এ সবই তুচ্ছ, তখন সে কারও অধীনে থাকতে চাইবে না। জ্ঞানী পুরুষ হোক বা রমণী, তার এটাই লক্ষ।
তাঁরা প্রায় সবসময় মৃত্যু সম্পর্কে আলোচনা করেন। এদের বিশ্বাস যে ইহজন্ম যেন গর্ভে থাকা শিশুর বিকাশের সময়। মৃত্যুই জ্ঞানী মানুষের কাছে সত্য ও আনন্দময় জীবেন ‘জন্মগ্রহণ’। সুতরাং তাঁরা মৃত্যুর জন্য অনেক প্রকার সাধনা করেন। তাঁদের মতে, মানুষের ভাগ্যে যাই ঘটুক না কেন, তা ভালোও নয়, মন্দও নয় বলে যা মনে হয়, তা আসলে স্বল্প সময়ের অনুভূতির মতোই অবাস্তব; নাহলে একই বস্তু থেকে কারও সুখ, আবার কারও দুঃখ বোধ হয় কেন? এবং একই বস্তু বিভিন্ন সময়ে একই মানুষের বিপরীতভাব উৎপন্ন করে কেন?
এই লেখকের (স্ট্র্যাবো) মতে, জড় বস্তু বা জড়জগৎ সম্বন্ধে এদের মত বালকের মতো, কারণ এরা যুক্তির থেকে কাজটাই ভালো বোঝেন। যেহেতু এরা যা বিশ্বাস করেন, তার বেশিরভাগটাই উপাখ্যান থেকে নেওয়া। কিন্তু অনেক বিষয়ে এরা আবার গ্রীকদের সঙ্গে একমত। যেমন, গ্রীকদের মতো এরাও বলেন যে, এই জগৎ সৃষ্টি হয়েছে, এটি গোলাকার এবং এটি ধ্বংসশীল। যে দেবতা এটি তৈরি করেছেন এবং একে নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি এর সর্বত্র ছড়িয়ে আছেন। বিশ্বের মূল কয়েকটা ‘ভূত’ এবং জল থেকে এই জগৎ উৎপন্ন হয়েছে। গ্রীক দর্শনের ক্ষিতি, অপ, তেজ ও মরুৎ ছাড়াও আর একটি পঞ্চম ভূত হল ব্যোম বা আকাশ। যা থেকে দ্যুলোক আর তারার দল সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবী এই বিশ্বের মাঝখানে কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। জন্ম, আত্মা ও অন্য বহু বিষয়ে এদের মত গ্রীকদের মতো। প্লেটোর মতো এরাও আত্মার অমরত্ব, প্রেতলোকে পাপ-পুণ্যের বিচার ও অনুরূপ বিষয়ে নিজেদের বিশ্বাসকে রূপক হিসাবে লিখেছেন বা বর্ণনা করেছেন। ব্রাহ্মণদের সম্বন্ধে তিনি এইভাবে বলেছেন।
শ্রমণদের ক্ষেত্রে তার বিবরণ হল, এই শ্রেণীতে যারা সবচেয়ে সম্মানীয় তাঁরা বাণপ্রস্থে থাকেন। এরা বনে বাস করে, পাতা আর বন্য ফল খেয়ে জীবন ধারণ করেন, গাছের বল্কল বা ছাল পরে থাকেন। মদ্যপান ও ইন্দ্রিয়সম্ভোগ ত্যাগ করেন। রাজাদের সঙ্গে এদের কথাবার্তা হয়, রাজারা দূত পাঠিয়ে বিভিন্ন ঘটনার কার্যকারণ সম্বন্ধে এদের মতামত নিয়ে থাকেন এবং এদের মাধ্যমে দেব তার আরাধনা ও আত্মনিবেদন সম্পন্ন করিয়ে থাকেন। এই বনবাসীদের পরে সম্মানে দ্বিতীয় স্থানে আছেন চিকিৎসক বা বৈদ্যরা। এরা মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ। এরাও সহজ জীবনযাপন করেন, কিন্তু মঠে বাস করেন না। এরা ভাত আর যব আহার করেন, প্রয়োজন মতো লোকের কাছে চাইলেই পেয়ে যান, অথবা কারও বাড়িতে অতিথি হয়ে খাদ্যগ্রহণ করেন। এরা ওষুধের সাহায্যে কোনো রমণীকে বহু সন্তানবতী করতে পারেন, আবার সন্তানকে পুরুষ কিংবা স্ত্রী করতে পারেন। সাধারণত এরা ওষুধের বদলে পথ্যের ব্যবস্থা করে রোগীকে ভালো করে তোলেন। আবার ওষুধের মধ্যে মলমের ব্যবহার এদের পছন্দের বিষয়। মলমের প্রলেপ দিয়ে আরোগ্য করে তোলা এরা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। অন্য সমস্ত এরা অপকারী বলে মনে করেন। এই দুই শ্রেণীর মানুষরা শ্রমসাধ্য কাজ করে ও দুঃখ সহ্য করে সহিষুতা অভ্যাস করে থাকে। সুতরাং সমস্ত সময় এরা একই অবস্থায় নিশ্চল হয়ে থাকতে পারে।
এরা ছাড়া গণক, জাদুকর ও প্রেতবিদ্যা এবং প্রেতশাস্ত্র বিশারদদের কথা উল্লেখযোগ্য। তারা গ্রামে ও নগরে ভিক্ষা করে জীবনধারণ করে।
এদের মধ্যে যারা বিদ্যা আর পাণ্ডিত্যে সেরা তারাও প্রেতলোক সম্পর্কে এমন সব কুসংস্কার প্রচার করে যার ফলে মানুষের মধ্যে ধর্মভীরুতা গড়ে ওঠে। স্ত্রীলোকেরা তাদের জ্ঞানচর্চা করে, কিন্তু এই ধর্মভীরুতার কারণে কখনো ইন্দ্রিয়সম্ভোগ করে না।
আরিয়ান
ভারতবাসীরা কখনো অন্য জাতি দ্বারা আক্রান্ত হয়নি বা অন্য জাতিকে আক্রমণ করেনি
মেগাস্থিনিস নিজে বলেছেন যে, ভারতীয়রা অন্য জাতিকে আক্রমণ করে না, আর অন্য জাতিও তাদের আক্রমণ করে না। কারণ মিশরবাসী (Egypt) সেসোস্ট্রিস এশিয়ার অধিকাংশ জয় করে ও সৈন্যসহ ইয়োরোপ পর্যন্ত এগিয়ে তারপর স্বদেশে ফিরে আসেন। শকদের রাজা ইন্দ্রার্থীসস শকদেশ থেকে বেরিয়ে এশিয়ার বহু জাতিকে যুদ্ধে পরাজিত করে দিগ্বজয়ী হিসাবে ঈজিপ্টের সীমান্তে এসে উপস্থিত হন। আসিরিয়ার সম্রাজ্ঞী সোমিরাসিস ভারতবর্ষে যুদ্ধযাত্রার উদ্যোগ করেছিলেন, কিন্তু তার চিন্তা-ভাবনা কাজে রূপ দেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়। সুতরাং, একমাত্র আলেকজান্ডারই ভারত-আক্রমণ করেছিলেন।
ডায়োনীসস ও হারকিউলিস (হীরাক্লিস)
ডায়োনীসসের সম্পর্কে অনেক কাহিনী পাওয়া যায়। তাঁর সম্পর্কে বলা হয় সেকেন্দর শা বা আলেকজান্ডারের আগে নাকি তিনি ভারত আক্রমণ করে ভারতবাসীদের পরাভূত করেন। কিন্তু এ সম্বন্ধে খুব বেশি প্রবাদ বা কাহিনী প্রচলিত নেই। ‘নাইস’ নগর ডায়োনীসসের অভিযানের স্মৃতিচিহ্ন নয়; তবে ‘মীরস’ পর্বত ও সেখানে উৎপন্ন আইভি লতা অন্যতম স্মৃতিচিহ্ন। আর একটি চিহ্ন হল— ভারতীয়রা যখন যুদ্ধে যায় তখন করতাল আর দুন্দুভি বাজিয়ে যায়, আর ডায়োনীসসের ভক্তদের মতো চিত্র-বিচিত্র পোশাক পরে। অন্যদিকে হীরাক্লিসের তেমন কোনো স্মৃতিচিহ্ন পাওয়া যায় না। আলেকজান্ডার যখন আয়োনর্স পাহাড় অধিকার করেন, তখন ম্যাসিডনীয়রা বলেছিল যে, হীরাক্লিস তিন-তিনবার এই শৈল আক্রমণ করেন এবং তিনবারই পরাস্ত হন। আমার মনে হয়, এটা ম্যাসিডনীয়দের গর্বের ও দম্ভের উক্তি এবং মিথ্যা। তারা যেমন ককেসাস বলে পরপামিসসকে বলে থাকে, যদিও ককেসাসের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই—এটাও সেরকম। যেমন, তারা পরপামিসসদের রাজ্যে একটা গুহা দেখিয়ে বলেছিল যে, এটাই প্রমিথিয়ূসের গুহা। যে প্রমিথিয়ূস দেবতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আগুন চুরি করে এনেছিল। আর এই গুহায় তাকে আগুন চুরির জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। এইরকমভাবেই তারা ‘শিব’ নামের ভারতীয় জাতির মধ্যে উপস্থিত হয়ে দেখতে পায় যে তারা চামড়ার পোশাক পড়ে তখন তারা স্থির করে নেয় যে, যারা হীরাক্লিসের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রায় এসেছিল এবং পরে এদেশেই থেকে যায়— ‘শিব’-রা তাদেরই বংশধর। কারণ শিবরা চামড়া পরে, গদা ধারণ করে, আর নিজেদের গোরুর গায়ে গদার চিহ্ন এঁকে রাখে। ম্যাসিডনীয়দের মতে এইসব কিছুই হীরাক্লিসের স্মৃতিচিহ্ন।
আরিয়ান
ভারতবর্ষের অধিবাসীবৃন্দ
মেগাস্থিনিস বলেন যে, ভারতবর্ষের সব জাতি মিলে সংখ্যা একেশো আঠারো (ভারতের জাতিসংখ্যা অনেক, এ ব্যাপারে আমরা মেগাস্থিনিসের সঙ্গে একমত, কিন্তু তিনি কীভাবে নির্দিষ্ট এই সংখ্যাটি বললেন সেটা বোঝা মুশকিল, কারণ তিনি গোটা ভারতের বেশির ভাগটাই দেখেননি, সমস্ত জাতির সঙ্গে আদান-প্রদান বা যাতায়াতও ছিল না।)
ডায়োনীসস
মেগাস্থিনিস বলেছেন যে, প্রাচীনকালে ভারতীয়রা শকদের মতো যাযাবর ছিল। তার চাষবাস করত না। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা শকভূমির এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেত। তারা নগরে বাস করত না, মন্দিরেও দেবতার পূজা-অর্চনা করত না। এইরকম, ভারতবাসীদেরও নগর বা মন্দির ছিল না। তারা যে বুনো পশু মারত, তার চামড়া পরিধান করত আর গাছের বল্কল খেয়ে জীবনধারণ করত। ভারতীয় ভাষায় এই গাছের নাম—তাল। খেজুর গাছের উপরে যেমন ফল জন্মায়, তেমনই এই গাছের মাথায়ও পশমের গোল বলের মতো ফল জন্মায়। যে বন্য পশু তারা ধরতে পারত, তাদের মাংসেও তারা ক্ষুধা নিবৃত্তি করত। ডায়োনীসস ভারতবর্ষে যাওয়ার আগে অন্তত এই ব্যবস্থা চালু ছিল। কিন্তু তিনি ভারতবর্ষে এসে সকলের অধীশ্বর হন, অনেক নগর প্রতিষ্ঠা করেন। নতুন সমস্ত বিধিনিয়ম চালু করেন। গ্রীসের মতো এখানেও ভারতীয়দের মধ্যে মদ্য প্রচলন করেন এবং মাটিতে বীজ বপন করতে শেখান। এবং সেজন্যে স্বয়ং বীজ প্রদান করেন। এর কারণ হল, ধরিত্রী মাতা (Demeter) যখন ট্রিপ্টলেমসকে পৃথিবীতে সর্বত্র বীজ বপন করতে পাঠান তখন তিনি এদেশে আসেননি। অথবা অপর কোনো ডায়োনীসস, ট্রিপ্টলেমসের আগেই ভারতে এসে ভারতীয়দের কর্ষণের জন্য ফলশস্যের বীজ দিয়েছিলেন। ডায়োনীসস সর্বপ্রথম হল-এ বৃষ যোজনা করেন, আর বহু ভারতবাসীকে যাযাবর থেকে কৃষকে পরিণত করেন। তাদের যুদ্ধের উপযোগী অস্ত্রশস্ত্র দান করেন। তারা করতাল ও দুন্দুভি বাজিয়ে ডায়োনীসসের পূজা করে কারণ তিনি তাদের এরকমভাবেই পূজা করতে শিখিয়েছিলেন। তিনি এদের সাটিরিক (Satyric) নৃত্য শিখিয়েছেন। গ্রীকরা যাকে কর্ডাকস বলে। তিনিই ভারতীয়দের দেবতার উদ্দেশ্যে চুল রাখতে, পাগড়ি পরতে আর গন্ধদ্রব্যে দেহ অনুলেপন করতে শিক্ষা দেন। এই কারণে সেকেন্দার শাহের (Alexander) সময়েও দুন্দুভি আর করতাল বাজিয়ে যুদ্ধযাত্রা করত।
কিন্তু ভারতবর্ষে নতুন শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর, তিনি ফেরার সময় সেকেন্দার ও তার সঙ্গী ব্যাক্কাসের পূজায় দক্ষ স্পার্টেম্বাসকে এই দেশের রাজত্বে বরণ করেন। স্পার্টেম্বাসের মৃত্যুর পর তার পুত্র বৌদ্য সিংহাসনে বসেন। পিতা ভারতীয়দের উপর ৫২ আর পুত্র ২০ বছর রাজত্ব করেন। বৌদ্যের পুত্র ক্রদ্যুস (Kradeuas) এরপর সিংহাসনে বসেন, এর পরে বংশধররা উত্তরাধিকারমতো সাধারণভাবে পিতার পর পুত্র এই অনুসারে রাজ্য লাভ করেন। কিন্তু বংশে উত্তরাধিকারীর অভাব হলে ভারতীয়রা গুণ দেখে রাজা নির্বাচন করে।
হার্ক্যুলিস
শোনা যায় যে, হীরাক্লিস প্রকৃতপক্ষে ভারতেই জন্মগ্রহণ করেন। যদিও প্রচলিত জনশ্রুতি হল, যে তিনি অনয দেশ থেকে এদেশে এসেছেন। এই হীরাক্লিসকে সৌরসেনীরা (Sourasenoi) বিশেষভাবে পূজা করে। এরা একটা ভারতীয় জাতি। মথুরা (Methora) ও কৃষ্ণপুর (Kleisobora) নামে এদের দুটো নগর আছে। যমুনা (Jobares) নামে নৌকা চলাচলের উপযুক্ত একটি নদী এদের দেশে প্রবাহিত হয়। কিন্তু মেগাস্থিনিস বলেন যে, এই হীরাক্লিস থীবস দেশের হীরাক্লিসের মতো বস্ত্র পরিধান করে থাকেন, ভারতীয়রাও সেকথা স্বীকার করে। ভারতে এই হীরাক্লিসের বহু পুত্র জন্মায় (থীবস হীরাক্লিসের মতো এই হীরাক্লিসও বহু বিবাহ করেছেন) কিন্তু একটি মাত্র মেয়ে হয়। এই কন্যার নাম দেওয়া হয় পাণ্ড্যা। যে দেশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন ও হীরাক্লিস তাকে যার রাজত্ব দান করেন, সেই নাম অনুযায়ী তার নাম হয় পাণ্ড্য (Pandaia)। তিনি পিতার কাছ থেকে পাঁচশো হাতি, চার হাজার ঘোড়সওয়ার আর এক লক্ষ ত্রিশ হাজার পদাতিক সৈন্য পেয়েছিলেন। কোনো কোনো ভারতীয় লেখক হীরাক্লিস সম্বন্ধে বলে থাকেন যে, তিনি যখন পৃথিবী থেকে সমস্ত হিংস্র জন্তু নির্মূল করার উদ্দেশ্যে স্থলে-জলে সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, তখন সমুদ্রগর্ভ থেকে নারীজাতির জন্য এক ভূষণ খুঁজে পেয়েছিলেন। (আজ পর্যন্ত যে সমস্ত ভারতীয় বণিক আমাদের কাছে পণ্য বিক্রয়ের জন্য আসা-যাওয়া করে তারা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে ওই বস্তু কিনে নিয়ে বিদেশে যায়। প্রাচীনকালে ধনী ও বিলাসী গ্রীকদের মতো এখন অভিজাত রোমানরাও এটি আগ্রহের সঙ্গে কিনে থাকে।) ভারতীয় ভাষায় একে বলে ‘সামুদ্রিক মুক্তা’ (Margarita)। অলংকার হিসাবে পরলে এটি কত সুন্দর দেখায় তা অনুমান করে হীরাক্লিস তাঁর মেয়ের জন্য এই মুক্তা আহরণ করেন।
মুক্তা
মেগাস্থনিস বলেন যে, যে সমস্ত শুক্তি বা ঝিনুকে এই মুক্তা পাওয়া যায় সেই ঝিনুক এদেশে জাল দিয়ে ধরা হয়; সেগুলো মৌমাছির মতো দলবদ্ধ হয়ে বাস করে। মৌমাছির মতো এদেরও রাজা বা রানী আছে। যদি কেউ ভাগ্যক্রমে রাজাকে ধরতে পারে তাবে সমস্ত শুক্তির ঝাঁক জালে ধরতে পারে সহজেই। কিন্তু রাজা পালিয়ে গেলে অন্যদের ধরার কোনো সম্ভাবনা নেই। ঝিনুক বা শুক্তিকা ধরার পর যতক্ষণ তাদের ভিতরের মাংস পচে না যায়, ততক্ষণ রেখে দেওয়া হয়। ভারতবর্ষে মুক্তোর দাম সমওজনের বিশুদ্ধ সোনার দামের তিনগুণ। এদেশে খনি থেকে সোনা তুলে আনা হয়।
পাণ্ড্যদেশ
শোনা যায়, হীরাক্লিসের মেয়ে যে প্রদেশে রাজত্ব করতেন সেখানে মহিলারা সাত বছর বয়সে বিয়ের উপযুক্ত হয় এবং পুরুষরা খুব বেশি হলে চল্লিশ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। এ বিষয়ে ভারতীয়দের মধ্যে নিম্নলিখিত প্রবাদ চালু আছে—
হীরক্লিস শেষ বয়সে কন্যাসন্তান লাভ করেন। যখন তিনি বোঝেন যে তাঁর অন্তিমকাল নিকটে অথচ বংশ, মান-মর্যাদায় তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই যার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেওয়া যায়— তখন তিনি সপ্তমবর্ষীয়া কন্যাকে বিবাহযোগ্যা করিয়া অভিগমন করেন, যার ফলে যে জাতির উপর পাণ্ড্য রাজত্ব করতেন তারা সকলে হীরক্লিসের থেকে এই অধিকার পেয়ে থাকে। (এখন আমার মনে হয় যে হীরাক্লিস যখন এই আশ্চর্য কাজ করতে পেরেছেন, তখন ইচ্ছা করলে তিনি অভিগমনের জন্য দীর্ঘজীবন বাঁচতেও পারতেন। তাহলে তাঁর কন্যার বয়সও তখন উপযুক্ত হতো। কিন্তু বাস্তবে বিবাহযোগ্যা মেয়েদের সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমার বোধ হয় যে, পুরুষদের বয়স সম্পর্কে যা কথিত আছে অর্থাৎ যারা খুব দীর্ঘজীবি তারাও চল্লিশ বছর বয়সে মারা যায়— সেটাও যথেষ্ট সঙ্গত। কারণ, যারা এত তাড়াতাড়ি বৃদ্ধ হয়ে যায় এবং বার্ধক্যে পৌঁছেই তাদের মৃত্যু এসে পড়ে, তারা নিশ্চয়ই খুব শীঘ্র যৌবনে পদার্পণ করে, এটাই যুক্তিযুক্ত ও স্বাভাবিক। সুতরাং এদেশে পুরুষদের মধ্যে ত্রিশ বছর বয়সেই বার্ধক্যের প্রথম চিহ্ন দেখা যাবে আর কুড়ি বছর বয়সে যৌবন অতিক্রম করতে আর মাত্র পনেরো বছর বয়সেই তারা পূর্ণ যৌবন লাভ করবে। এই নিয়ম অনুসারেই মেয়েরা সাত বছর বয়সে বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠবে।) কারণ, মেগাস্থিনিস নিজেই লিখেছেন যে এদেশের ফলশস্যও অন্যান্য দেশের থেকে তাড়াতাড়ি পেকে যায়, বিনষ্টও হয়।
মেগাস্থিনিস আরও বলেছেন যে, ব্যাবিলনের সম্রাট নেবুচাডনেজর, হীরাক্লিসের চেয়ে সাহস, বিক্রম আর কাজের বিচারে আরও এগিয়ে ছিলেন। এমনকী তিনি আইবেরিস রাজ্য দখল করে নেন। তিনি তার স্ত্রীর জন্য পাথর দিয়ে পায়ে-চলা রাস্তা তৈরি করেন, আর সেই পাথরের গায়ে ও চারদিকে সবরকম গাছ লাগিয়েছিলেন। দেখলে মনে হতো পাহাড়ের শ্রেণী। কারণ, তাঁর স্ত্রী, যিনি মিডিয়াতে জন্মেছেন ও বড় হয়েছেন, তিনি তাঁর জন্মস্থান ও কর্মের পরিবেশ পছন্দ করতেন। মেগাস্থিনিস তাঁর ইণ্ডিকার চার নম্বর খণ্ডে এইসব প্রসঙ্গের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন যে, নেবুচাডনেজর আইবেরিয়ার বড় অংশ আর লিবিয়া জয় করেছিলেন।
প্রাচীন ঐতিহাসিকদের মধ্যে যাঁরা নেবুচাডনেজর সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, যোশেফস-এর মতে তাঁরা হলেন বেরোসস, মেগাস্থিনিস আর ডায়োক্লেস।
ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস
ভারতীয়দের গণনা অনুযায়ী ডায়োনীসস থেকে চন্দ্রগুপ্ত পর্যন্ত ৬০৪২ বছরে ১৫৩ জন রাজা রাজত্ব করেন। কিন্তু এই কালের মধ্যে তিনবার সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ভারতীয়রা বলে যে ডায়োনীসস, হীরাক্লিসের পনেরো পুরুষ আগে বর্তমান ছিলেন এবং তিনি ছাড়া আর কেউ ভারতবর্ষ আক্রমণ করেনি। এমনকি কাম্বুলীসের পুত্র কাইরাসও নয়। যদিও তিনি শকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন এবং সমগ্র এশিয়ার নৃপতিদের মধ্যে শৌর্যে ও বীর্যে সবচেয়ে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। অবশ্য আলেকজান্ডার ভারতে আগমন করেন আর যে কেউ তাঁর মুখোমুখি হয়, তারা সবাই পরাজিত হয়। আর সৈন্যরা অবাধ্য না হলে তিনি সমগ্র পৃথিবী জয় করতে পারতেন। অন্যদিকে, (ভারতীয়রা বলে) যে ন্যায়বোধ প্রবল বলে ভারতবর্ষের কোনো রাজা অন্য দেশ জয় করবার বাসনা নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করেননি।
আরিয়ান
কালানোস ও মান্দনি সম্পর্কে
আলেকজান্ডার শুধু দিগ্বজয়ের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন না। তিনি যখন তক্ষশিলায় আসেন আর একজন দিগম্বর সাধুর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়, তিনি চেয়েছিলেন যে, ওই সাধু তাঁর শিষ্যদের নিয়ে আলেকজান্ডারের সঙ্গে গ্রীসদেশে যান, কারণ তিনি সাধুদের সঙ্গে কথাবার্তায় সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু দাণ্ডামিস নামে ওই সাধু রাজি হননি; শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর শিষ্যদেরও যেতে নিষেধ করেন। কারণ হিসাবে তিনি বলেন যে, তিনি যে দেবতার পুত্র, সম্রাট আলেকজান্ডারও সেই জিউসেরই সন্তান। আর সম্রাটের কাছে তার চাইবার মতো কিছু নেই। কারণ, তাঁর বর্তমান অবস্থায় তিনি খুবই সন্তুষ্ট। সব শোনার পর সম্রাট আর জোর খাটানোর চেষ্টা করেননি, তিনি বুঝেছিলেন যে এই লোকটি অত্যন্ত স্বাধীনচেতা।
কিন্তু কালানোস নামে মানুষটিকে তিনি সঙ্গে নিয়ে যান। এই মানুষটিও জ্ঞানী মানুষ, যদিও অন্য জ্ঞানী ভারতীয়রা তাঁর সম্পর্কে প্রশংসা করতেন না, কারণ তিনি ঈশ্বরের প্রতি আস্থা না রেখে অন্য প্রভুকে গ্রহণ করেছিলেন বলে। কিন্তু মেগাস্থিনিস তাঁর প্রশংসা করেছেন আত্মসংযমের ব্রত পালনের বিষয়ে।
আলেকজান্ডার সোয়ানবেক ১৮৪৬ সালে যে সমস্ত অংশ বিভিন্ন লেখকের থেকে নিয়ে সংকলিত করেছেন, তার সম্পূর্ণ বিবরণ এইরকমঃ
Introduction বা ভূমিকা (The Fragments of the Indica of Megasthenes)
এপিটোম (Epitome) বা সারমর্ম, মেগাস্থিনিসের Diodorus II, (FRAGMENT ONE & ONE B)
Book I, FRAGMENT II
Arrian, Expedition of Alexander V.6.
2-11
Of the boundaries of India, its General
Character, and its Rivers.
Book Fragment III
of the boundaries of India.
Fragment IV
Of the boundaries and extend of India.
Fragments V, VI, VII, & VIII
Of the size of India
Fragments IX & X
Of the setting of Bear and
shadows in Contrary directly
& setting of Bear
Of the fertility of India
Fragment XI
Fragment XII
Of some Wild Beasts of India
Fragment XIII
Of Indian apes
Notes :
Fragment XIII B
Fragment XIV
Of winged Scorpions and Serpents
Fragment XV
Of the beasts of India and the Reed
Fragment XVB (Note)
Of some beasts of India
Fragment XVI
Of the Boa Constrictor
Fragment XVII
Of the electric eel
Fragment XVIII
Of Taprobane
Fragment XIX
Of Marine Trees
Fragment XX
Of the Indus and the Ganges
Fragment XX
B
Fragments XXI, XXII & XXIII
Of the river Silas
Fragments XXIV
Of the number of Indian
Rivers
Fragments XXV & XXVI
Of the city Pataliputra
Of Pataliputra & manners of the
Indian
Fragments XXVII
Of the menners of the
Indians
B+C+D
Fragments XXVIII
Of the Suppers of the Indians
Fragments XXIX
Of Fabulous Tribes
Fragments XXX
Of Fabulous races
B
Fragments XXXI
Of the race of Men without
mouths
Fragments XXXII & Frag XXXIII
Of the seven castes among the
Indians
Fragments XXXIV
Of the administration of Public
Affairs– Of the use of horses & elephants
Fragments XXXV
Of the use of horses & elephants
Fragments XXXVI
Of Elephants
Fragments XXXVII
Of Elephants
Fragments XXXVII
B
Fragments XXXVIII
Of the diseases of Elephants
Fragments XXXIX
Of Gold-digging Ants
Frag XL
Of Gold-digging Ants
Frag XL
B
Fragments XLI (Of the Indian Philosophers)
Fragments XLII (Of the Indian Philosophers)
B & C
Fragment XLIII (Of the Indian Philosophers)
Fragments XLIV and XLV
Of Kalanos & Mandanis
Frag XLVI
That the Indians have never been
attacked by others, nor had themselves
attacked others
Frag XLVII
Title, same as above
Frag XLVIII
Of Nebukodrosor
Frag XLVIII, XLVIII, XLVIII
&
Frag XLIX
Of Nebukodrosor
Frag L
Of the Indian races Of Dionysos,
Of Herakles– Of Pearls– of the
Pandaian Land– Of the Ancient
History of the Indians
B
Frag. L
Of Pearls
C
Frag L
Of the Ancieut History
of Indians
Frag LI
Of the Pandaian Land
Frag. LII
Of Elephants
Frag LIII
Of a White Elephent
Frag LIV
Of the Brahmans and their
Philosophy
Frag LV
Of Kalanos and Mandanis
Frag LV. B
Frag LVI
List of Indian Races
Frag LVI. B
Fragment LVII
Of Dionysos
Frag LVIII
Of Hercules and Pandaea
Fragment LIX
Of the Beasts of India
