Accessibility Tools

গ্রীকদের চোখে ভারতবর্ষ – নির্বেদ রায়

ষ্ট্র্যাবো – নির্বেদ রায়

ষ্ট্র্যাবো

ষ্ট্র্যাবো

ষ্ট্র্যাবো ছিলেন এশিয়াটিক গ্রীক। পনটাসের ত্রমাসিয়া অঞ্চলে তাঁর জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৬৪ সালে। কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত নাইসা-তে পড়াশোনা করেছেন। তারপর রোমে যান খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ সালে। ঘুরেছেন বিস্তৃত অঞ্চলে, অর্জন করেছেন প্রচুর অভিজ্ঞতা—ইতালির বড় অংশ, কৃষ্ণসাগর, এশিয়া মাইনরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, মিশর, ইথিওপিয়া আর গ্রীস। আলেকজান্দ্রিয়ায় দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন, পড়াশোনা করেছেন জ্যোতির্বিদ্যা, ইতিহাস আর গণিত সম্পর্কে। গভীর অধ্যয়ন করেছেন শুধু নয়, লিখেছেন ইতিহাস; কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল সেই লেখা হারিয়ে গেছে। যা পাওয়া গেছে সেটা তাঁর ভৌগৌলিক রচনা—সতেরো খণ্ডে। এই কথা খেয়াল করা দরকার যে ষ্ট্র্যাবো ভূগোলের আগে ইতিহাসের রচয়িতা,আর তাঁর ভূগোলের উপর লেখা আসলে ভূগোল-দর্শন, খ্রিস্টান যুগের একদম সূচনায় যে পৃথিবী ষ্ট্র্যাবোর জানা ছিল, তার সমস্ত তথ্য এখানে সন্নিবেশিত হয়েছে। বড় কাজ, এবং তাঁর আগের ও সমকালের যত কাজকর্ম তার তুলনামূলক আলোচনাও বটে, ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম দুটো খণ্ডে, সেই সময়ের যে পৃথিবী মানুষের কাছে জানা ছিল তার ভূমিকা; তৃতীয় আর চতুর্থ খণ্ডে ইটালি আর সিসিলি; সপ্তম খণ্ডে উত্তর আর পূর্ব ইয়োরোপ; আট থেকে দশ খণ্ড পর্যন্ত গ্রীক অঞ্চলসমূহ; এগারো থেকে চোদ্দো খণ্ডে এশিয়া মাইনরসহ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল; পনেরো খণ্ডে ভারত আর ইরান; ষোলো নম্বর খণ্ডে আসিরিয়া, ব্যাবিলন, সিরিয়া।

পনেরো নম্বর খণ্ড, যেখানে ভারত সম্পর্কে আলোচনা আছে, আমরা সেই অংশ তুলে ধরেছি এবং অনুবাদ করেছি।

ভূগোলের গাণিতিক ব্যাখ্যাকার ইরেসটোথেনিসের উপর ভিত্তি করে এগোলেও দেশের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে অন্যান্য পণ্ডিতদের সাহায্য নিয়েছেন ষ্ট্র্যাবো।

ষ্ট্র্যাবো ছিলেন ‘স্কুইন্ট’ বা তির্যক দৃষ্টি সম্পন্ন, প্রচলিত কথায় ‘ট্যারা’। কিন্তু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে তাঁর তির্যক দৃষ্টিতে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সমস্ত বিবরণের তুলনামূলক বিচার ও বিশ্লেষণ করেছেন।

ষ্ট্র্যাবো অসাধারণ প্রতিভাশালী মানুষ। ষাট বা একষট্টি বছর বয়সে তিনি মারা যান, ২৫ খ্রিষ্টাব্দে।

ষ্ট্র্যাবো

ভূগোল; পনেরো নম্বর গ্রন্থ; ভারত সম্পর্কে

১. এশিয়ার আর যে অংশ বাকি থেকে গেল, সেটা টরাস বা বৃষপর্বতের আওতার মধ্যে পড়ে না, তার বাইরের অংশ, শুধু সিলিসিয়া, প্যামফাইলিয়া আর লাইসিয়া বাদ দিয়ে। আমি বলতে চাইছি ভারত থেকে যে ভূভাগ নীলনদ পর্যন্ত বিস্তৃত, টরাস পর্বত আর দক্ষিণে যে সমুদ্র বাইরের দিকে প্রসারিত তার মাঝখান দিয়ে। এশিয়ার পরে লিবিয়া, কিন্তু সে সম্পর্কে পরে আলোচনা করব—এখন আমি ভারতের বিবরণ দিয়েই শুরু করছি। কারণ পুবের দিকে এটাই সবথেকে বড় দেশ, আর প্রথমেই পড়ে।

২. কিন্তু এই দেশের বিবরণ আমাদের একটু প্রশ্রয়ের সঙ্গে শুনতে হবে, খুব পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করলে হবে না কারণ, এই দেশ আমাদের থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থিত, শুধু তাই নয়, আমাদের অধিকাংশ মানুষ দেশটাকে চোখে পর্যন্ত দেখেনি। আর যারা দেখেছে, তারাও একটা অংশ মাত্র দেখেছে, যা বলে তাও বেশির ভাগ শোনাকথার উপর ভিত্তি করে, এমনকি যতটুকু দেখেছে তাও সেনাদলের সঙ্গে দ্রুত অঞ্চলটি পরিক্রমার মধ্যে দিয়ে। ফলে তারা একই বস্তুর বিভিন্ন বিবরণ দিয়ে থাকে, যদিও তাদের প্রত্যেকের বিবরণ শুনলে মনে হয়, তারা খুব সন্তর্পণে তথ্যভিজ্ঞ মহল থেকে ঐ বর্ণনা পরীক্ষা করে নিয়ে বলছে। এদের মধ্যে অনেকে আবার একসঙ্গে পথ চলেছে, একত্রে রাত কাটিয়েছে, আলেকজাণ্ডারকে এশিয়া জয়ের জন্য যারা তাঁর সঙ্গ দিয়েছে, যুদ্ধ করেছে, তাদের কথা বলছি—তাঁদের বর্ণনায় প্রায়ই এই অসঙ্গতি পাওয়া যায়। তাহলে যারা প্রত্যক্ষ করেছে তাদের বর্ণনায় এরকম বিপরীত মন্তব্য বা অসঙ্গতি থাকলে, যারা দেশটাকে দেখেনি, শুধুমাত্র কারো মুখের বর্ণনা শুনে বলছে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা থাকবে সেটা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে।

৩. তার উপর, যে সমস্ত লোক এই অঞ্চল সম্পর্কে লিখেছে, আর এখন যারা সেখানে জাহাজে করে যায়—এই দু’তরফের মধ্যে অনেক ফারাক; ফলে এখনকার লোকজনের সঙ্গে অতীতের বিবরণ মিলছে না, আর কোনোটাতেই ঠিকঠাক খবর আসছে না। তথ্যও প্রায়শই ভুল। যেমন এ্যাপোলোডোরাস, যিনি পার্থিয় ইতিহাস লিখেছেন, গ্রীকদের জন্য ব্যাকট্রিয়রা যখন সিরিয় রাজাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, তারা সেলুউকাস নিকেটরের বংশধর ছিল, আর তারা শক্তিশালী হয়ে উঠে ভারত আক্রমণ করে। নতুন কোনো তথ্য তারা দেননি, যে সংবাদ এতদিন ধরে জানা ছিল তাই বলেছেন, বরং অন্যদের সঙ্গে মতান্তর হয়েছে, যখন বলেছেন যে ভারতে ব্যাকট্রিয়ানদের অধিক ভূ-ভাগ ছিল ম্যাসিডনীয়দের তুলনায়। তিনি ইউক্রেটিডাস বলে এক রাজার কথা বলেছেন যার অধীনে এক হাজার শহর ছিল, কিন্তু অন্য লেখকদের মতে শহরের মোট সংখ্যা ছিল মাত্র সাত, ঐ রাজার অধীনে। ম্যাসিডনীয়রা তাদের মতে নয়টি রাজ্য জয় করেছিল, যে রাজ্যগুলো ছিল হাইডাসপেস বা ঝিলম আর হাইপানিস বা বিপাসার মাঝে। অধিকার করেছিল পাঁচশ শহর যেগুলোর মধ্যে কোনোটাই ‘কোস মেরোপিস’ (ঈজিয়ান সাগরের একটি দ্বীপ)-এর থেকে ছোট আকারের নয়; আলেকজাণ্ডার এই ‘দেশ’ জয় করার পর রাজা পুরু-কে দিয়ে যান।

৪. যে সব বণিক মিশর থেকে নীলনদ ধরে এসে আরব উপসাগর হয়ে ভারতে বাণিজ্য করতে আসে, তাদের মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক গঙ্গা পর্যন্ত পাড়ি দেয়, আর তারা সে সমস্ত অঞ্চল সম্পর্কে বিবরণ দেওয়ার মতো শিক্ষাদীক্ষার অধিকারীও নয়। ভারতে একমাত্র রাজা পাণ্ডিয়ান, কারো কারো মতে রাজা পুরু, সম্রাট অগাস্টাস সীজারকে উপহার ও উপঢৌকন পাঠাতো। রাজদূতের সঙ্গে এক একজন তার্কিক যেতো, যাদের মধ্যে একজন অ্যাথেন্সে গিয়ে নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন, যেমন আলেকজাণ্ডারের সামনে ‘কালানস’ নামে একজন ভারতীয় যোগী করেছিল।

৫. এই সমস্ত কাহিনী সরিয়ে রেখে, যদি আমরা আলেকজাণ্ডারের অভিযানের ঠিক আগের গল্পগুলোকে আশ্রয় করি, তাহলে দেখবো সেগুলো আরও অস্পষ্ট। কিন্তু যুক্তি খুঁজলে দেখা যাবে যে, আলেকজাণ্ডার স্বয়ং এই কথাগুলোয় বিশ্বাস করতেন, কারণ তার অসাধারণ সৌভাগ্য—তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্তত নিয়েরকোস তাই বলেছেন যে, আধুনিক বালুচিস্থান বা গেড্রোসিয়া অঞ্চল দিয়ে সেনা পরিচালনা করে ঢুকবেন ভারতে কারণ তিনি শুনেছিলেন যে সেমিরামি এবং সাইরাস এই পথে ভারত আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু দুজনেই ব্যর্থ হন। সেমিরামিরা কুড়িজন আর সাইরাস মাত্র সাতজন লোক নিয়ে পালিয়ে বাঁচে শেষ পর্যন্ত, আলেকজাণ্ডার এই গল্পে বিশ্বাস করে তাঁর অপরাজেয় সৈন্যদল নিয়ে ওই পথ দিয়ে এগোতে চেয়েছিলেন।

৬. কিন্তু আমাদের কাছে সাইরাস অথবা সেমিনারিদের ভারত অভিযানের প্রমাণ কোথায়? মেগাস্থিনিসও কার্যত মেনে নিয়েছেন যে ভারত সম্পর্কে আগের প্রচলিত গল্পকথায় বিশ্বাস না রাখতে, কারণ ওই প্রমাণের অভাব। তিনি বলেছেন, ভারতবর্ষ কখনো দেশর বাইরে সৈন্য পাঠায়নি অন্য দেশ অধিকারের জন্য, আবার অন্যদেশের বাহিনীও ভারতে আসেনি কখনো, শুধু হেরাক্লেস, ডাইনোসাস আর বর্তমান সময়ে ম্যাসিডনীয়রা ছাড়া। মিশরীয় সেসোসট্রিস, এবং ইথিওপীয়ার টিয়ারকোন ইউরোপ পর্যন্ত এগিয়েছিলেন, নেবুচাডনেজর যিনি চালডিয়ানদের কাছে খুবই শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন, গ্রীকদের কাছে হেরাক্লসের মতো বা তার বেশি সেনাবাহিনী নিয়ে ‘স্তম্ভ’ না পিলারের (রক অফ জিব্রালটার) কাছে পৌঁছেছিলেন। টিয়ারকোন তাঁর সেনা নিয়ে সেখানেই পৌঁছেছেন, আবার সেসোসাট্রিস তার সেনাদলকে আইবেরিয়া থেকে থ্রেস পর্যন্ত নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে এসেছেন; পনটোসও সে তারা পৌঁছয়, কৃষ্ণসাগরের তীরে। ইভানথাইরসস তার স্কাইথিয় বাহিনী নিয়ে এশিয়া পেরিয়ে মিশরে পৌঁছেছিল, কিন্তু এদের একটাও ভারতে এসে পৌঁছায়নি। এবং সেমিরাসিস তার মনের ইচ্ছা পূর্ণ করার আগেই মারা যায়। পারসিকরা একদল পেশাদার সৈন্য ভারত থেকে নিযুক্ত করে, তাদের নাম হাইড্রাকেস, কিন্তু তারা কখনো ভারতে এই সেনাদের নিয়ে ঢোকেনি, যতক্ষণ না সাইরাস মাসাজেথাই-দের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়েছেন। তখন তারা ভারতের কাছাকাছি এসেছে মাত্র।

৭. হেরাক্লেস আর ডায়োনিসাসের গল্প মেগাস্থিনিস বিশ্বাস করতেন, আরও কেউ কেউ তার সমসময়ের বিশ্বাস করতেন। কিন্তু অন্যান্য লেখকরা যেমন ইরেটোস্থিনিস মনে করেন এটি রূপকথা আর অবাস্তব। গ্রীকদের মধ্যে প্রচলিত নানা রূপকথার মতো। যেমন ইউরিপিডিসের ‘ব্যাখাই’ নাটকে ডায়োনিসাস বলছেন তারুণ্যের দুঃসাহস নিয়ে, ‘আমি লিডিয়ার স্বর্ণময় প্রান্তর ছেড়ে এসেছি, ছেড়ে এসেছি ফ্রাইজিয়ার উৎসারিত অঞ্চল, দেখেছি পারস্যের রৌদ্রবিধৌত সমভূমি, দেখেছি ব্যাকট্রিয়ার প্রাকারবেষ্টিত শহর আর মিডসের শীতার্ত পরিমণ্ডল, আরবের আশীর্বাদধন্য প্রকৃতি—দেখেছি সমগ্র এশিয়া। সফোক্লিসেও দেখেছি জনৈক চরিত্রকে গুণগান করতে, ছন্দোবদ্ধ বন্দনা করতে নাইসা পর্বতের, কারণ নাইসা, ডাইয়োনিসাসের কাছে এক ‘পবিত্র’ পর্বতঃ ‘যখন আমি বিখ্যাত নাইসা পর্বত দেখলাম, ডাইয়োনিসাসের উত্তাল ও মত্ত আচরণে পরিব্যাপ্ত সেবাদাসীর দল নশ্বর ও জাগতিক রূপ নিয়ে ভাস্বর—এখানে যে সব পাখি বাস করে তারা গান করে না।’

তাকে ‘মেরোট্রাফিস’ নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এবং হোমার, লাইকারগাস যিনি ইডোনীয় ছিলেন তার সম্পর্কে বলেছেন, ‘যিনি ডাইয়োনিসাসের যে সব সেবাদাসী ছিল তাদের নাইসা পর্বত ছাড়তে বাধ্য করেন।’ ইত্যাদি…ডাইয়োনিসাস সম্পর্কে এই সমস্ত বলা হয়েছে। কিন্তু হারকিউলিস সম্বন্ধে কেউ কেউ বলেছেন যে তিনি উল্টোপথে গেছেন। কেউ বলেন পশ্চিম দিকের প্রান্তসীমা পর্যন্ত গেছেন, কারো মতে দুই দিকের প্রান্ত পর্যন্ত তাঁর গন্তব্য ছিল।

৮. এইসব গল্প থেকে অনুপ্রাণিত লেখকরা, একদল মানুষকে ‘নাইসিয়’ আখ্যা দেন আর তাদের শহরকে ‘নাইসা’ বলেন, যার প্রতিষ্ঠা করেছেন ডাইয়োনিসাস; শহরের উপরে একটি পর্বত যার নাম ‘মেরুস’, এখানে আইভিলতা জন্মায়; কিন্তু অতিবর্ষণের জন্য ফলগুলো পাকবার আগেই মাটিতে পড়ে যায়, যেমন আঙুরের গুচ্ছগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষ করে হয়। এবং তারা বলে সাইড্রেসি (Sydracae) হল ডাইয়োনিসাসের বংশধর, তাদের দেশের লতাগাছ, আর তাদের আতিশয্যপূর্ণ শোভাযাত্রা দেখলে তাই মনে হয়, কারণ রাজা শুধু বার্ষিক নিয়ম অনুযায়ী তাঁর রাজ্যের বাইরে যেতেন তাই নয়, তিনি সমস্ত শোভাযাত্রার সঙ্গে থাকতেন, শোভাযাত্রায় ঢাকঢোল থাকতো, রং-বেরং পোশাক পরে লোকজন এই শোভাযাত্রায় যেতো। ভারতে এই রীতি বিশেষভাবে চালু আছে অন্যান্য অংশেও। আলেকজাণ্ডার যখন এইয়েমোস (Aomus) অধিকার করেন একবারের চেষ্টায়, তখন দেখেন যে এই পাহাড়ের নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সিন্ধুনদ। যে সব পারিষদবর্গ আলেকজাণ্ডারকে মহিমান্বিত করতে উন্মুখ ছিল, তারা বলল হারকিউলিস তিন-তিনবার এই পাহাড় আক্রমণ করেছিলেন আর তিনবারই জয় করতে ব্যর্থ হন। তারপর সিবাই (Sibae) রা যাদের বংশধর তারা হারকিউলিসকে সাহায্য করে। সেই পূর্বসূরীদের প্রতীক আজও তারা বহন করে, তারা হারকিউলিসের মতো চামড়ার আচ্ছাদন পরিধান করে। তাঁর মতোই মুগুর রাখে অস্ত্র হিসাবে আর তাদের পশু আর অশ্বেতরদের গায়ে ওই মুগুরের ছাপ দিয়ে রাখে। এই গল্পের সঙ্গে আরও একটা রূপকথা জুড়ে তারা এই বক্তব্যকে আরও জুৎসই করেছে। সেটা প্রমিথিউসের কাহিনী। প্রমিথিউস যে পাহাড়ে বন্দী ছিলেন আগুন চুরি করার অপরাধে, ওদের মতে এটাই সেই ককেসাস পর্বত; আর যে গুহাতে তিনি বন্দী ছিলেন সেটা পারোপামিসাদ (Paropamisadae) শহরে এক পবিত্র গুহা আর হারকিউলিস সেই গুহা থেকে প্রমিথিউসকে মুক্ত করেন। গ্রীকদের বিশ্বাস, ককেসাস পাহাড়েই ছিল প্রমিথিউসের কারাগার।

৯. তবে এই গল্পগুলো আলেকজাণ্ডারের যারা পারিষদ এবং স্তাবক তাদের মুখেই শোনা যায়, কিন্তু ঐতিহাসিকরা এই সব কাহিনিতে একমত নন; অনেকে উল্লেখও করেননি। ভাবা কঠিন যে এইসমস্ত কাহিনী, বিশেষ করে এতো রোমাঞ্চকর গল্প তাদের অজানা ছিল। আর যদি তাদের অজানা থাকে তাহলে ঐতিহাসিক হিসাবে তাদের মেনে নেওয়া কঠিন, কিন্তু সেরা ঐতিহাসিকরাই এই শ্রেণীর মধ্যে পড়ছেন। তাহলে? দ্বিতীয় কারণ হলো, যে পথ দিয়ে তারা অর্থাৎ হারকিউলিস আর ডাইয়োনিসাসকে ভারতে আসতে হতো, সে পথের মধ্যবর্তী কোনো জায়গায় তাদের যাতায়াতের কোনো চিহ্ন বা প্রতীক বা আলোচনা ও শুনতে পাওয়া যায় না। আর হারকিউলিসের সাজসজ্জা, যুদ্ধসাজ, এ সব কিছু ট্রয়যুদ্ধের অনেক পরবর্তী সময়ে ‘পেইসেনজার’ বা অন্য কেউ হেরাক্লিয়া (Heracleia)-তে বর্ণনা করেছেন। হারকিউলিসের প্রাচীন মূর্তির সঙ্গে যা মেলে না।

১০. ফলে, এই সব ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতার কাছাকাছি না পৌঁছলে তার উপর আস্থা রাখা যায় না। আমি আমার প্রাথমিক অংশবিশেষে ভূগোলের বিষয় নিয়ে বলতে গিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে বিশ্বাসযোগ্যতার কাছে পৌঁছয় এমন সব স্থান নদ-নদী-পাহাড় বা মানুষ ও তাদের নির্ভর করে গড়ে ওঠা কথাগুলোকে আশ্রয় করতে হয়। আলেকজাণ্ডার যখন ভারত আক্রমণ করেন তখন যে ‘জিওগ্রাফি’ শব্দ ইরেটোসথেনিস ব্যবহার করেন তার তৃতীয় খণ্ডে ভারত সম্পর্কে আলোচনা আছে—আলেকজাণ্ডারের আক্রমণ ও তার বিবরণ যেমন বিশ্বাসযোগ্য তেমনই জানা যায় যে সিন্ধুনদ ছিল ভারত আর ‘পবিত্র ভূমি’ আরিয়ানার মাঝখানের সীমান্ত, তার দুই দিকে দুই দেশ। ভারতের পশ্চিমে আরিয়ানা দীর্ঘ সময় পারসিকদের অধীনে ছিল, পরে ম্যাসিডনীয়দের কাছ থেকে আরিয়ানার অধিকাংশ ভারতীয়দের কাছে আসে। এ সবই ইরেটোসথেনিস বলেছেন। তিনি বিবরণ দিয়েছেন—

১১. ভারতবর্ষ, উত্তরে সীমা দিয়ে আছে আরিয়ানা থেকে পূর্ব সমুদ্র, টরাস পর্বতের প্রান্তসীমা, স্থানীয় মানুষ যাকে বলে ‘পারোমপামিসাস’ (Parompamisus), এবং ‘ইমোডাস’ (Emodus) বা কখনো ‘ইমোস’ (Imous) অথবা আরও অন্য কোনো নামে, কিন্তু ম্যাসিডনীয়রা বলে ‘ককেসাস’ (Caucasus); পশ্চিমে ভারতের সীমা নির্দেশ করছে সিন্ধু নদ (Indus); কিন্তু দক্ষিণ আর পূর্বদিকে যে সীমানা, সেই দুটি সীমানা উত্তর আর পশ্চিম সীমানা থেকে অনেক বিস্তৃত, চলে গেছে একেবারে আটলান্টিক সমুদ্র পর্যন্ত, ফলে দেশের আকার হয়েছে ‘রম্বাসের’ (Rhombus) মতো, বৃহত্তর সীমানার মাপ তার উল্টোদিকের সীমানার তুলনায় তিন হাজার ষ্ট্যাডিয়া বেশি, একই মাপে দেশের প্রান্তসীমা পূর্ব আর দক্ষিণ তীর ধরে এগিয়ে গেছে একটি বিন্দু থেকে (Cape) ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে পশ্চিম সীমান্তের বিস্তৃতি ককেশাস পর্বত থেকে দক্ষিণের সমুদ্র পর্যন্ত প্রায় তেরো হাজার ষ্ট্যাডিয়া, আমি এখানে সিন্ধুনদ আর তার শাখানদী ধরে এগোবার কথা বলছি, আর তার উল্টোদিক অর্থাৎ পূর্বদিকের হিসাব করতে গিয়ে যদি কেউ অন্তরীপের জন্য হাজার ষ্ট্যাডিয়া যোগ করে, তাহলে দাঁড়াবে ষোলা হাজার ষ্ট্যাডিয়া। দেশের সবচেয়ে বেশি আর কম প্রস্থ হল, তাহলে এই দুটো মাপ। দৈর্ঘ্যের ক্ষেত্রে অবশ্য পূর্ব থেকে পশ্চিমে এই মাপ, পলিবোথরা পর্যন্ত বেশ জোর দিয়ে বলা যায়—কারণ এই মাপের পরিষ্কার হিসাব আছে, একটা রাজপথ পলিবোথরা অবধি চলে গেছে, সোজা দশ হাজার ষ্ট্যাডিয়া। তবে পলিবোথরার পরে যে অংশটুকু বাকি থাকে, তার জন্য একটু আন্দাজ করতে হবে। ধরো, সমুদ্র থেকে গঙ্গা বরাবর পলিবোথরা পর্যন্ত হবে প্রায় ছয় হাজার ষ্ট্যাডিয়া। তাহলে দেশের নূন্যতম দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ষোলো হাজার ষ্ট্যাডিয়া। এই দৈর্ঘ্যের মাপ সকলেই মেনে নিয়েছে, প্রতিদিনের যাত্রাপথের দূরত্ব হিসাব করে ইরেটোসথেনিস এই দৈর্ঘ্যকে মেনে নিয়েছেন, মেগাস্থিনিসও এই হিসাব মানেন, তবে পেট্রোক্লেস এক হাজার ষ্ট্যাডিয়া কম বলে হিসাব করেছেন। এখন এই দৈর্ঘ্যের সাথে যোগ করতে হবে প্রায় তিন হাজার ষ্ট্যাডিয়া, কারণ পূর্বের দিকে যে অন্তরীপ আছে তার শেষপ্রান্ত দেশের ভূখণ্ড থেকে ওই তিন হাজার ষ্ট্যাডিয়াই হয়। পূর্বদিকে সমুদ্রের উপর এই দ্বীপ বা অন্তরীপ অবস্থিত। সিন্ধুনদের নির্গমনপথ থেকে সুদূর অন্তরীপ পর্যন্ত এই বিস্তার। এখানে বাস করে কণিয়াকি (Coniaci)-রা, ওই নামেই তাদের ডাকা হয়।

১২. এখানে আমাদের বুঝতে হবে, ভিন্ন ভিন্ন লেখকরা কত বিভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন, যে সব বর্ণনা প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকে আলাদা।

টেসিয়াস বলেছেন, ভারত কোনোমতেই এশিয়ার বাকি অংশের তুলনায় ছোটো নয়। ওনিসিক্রিটাসের মতে এটা বিশ্বের তৃতীয় ভাগ যেখানে জনজাতি বসবাস করে, নিয়েরকাসের মতে পায়ে হেঁটে গেলে শুধু সমতলভূমি পার হতে চার মাস লাগবে, কিন্তু মেগাস্থিনিস আর ডাইমেকাস তাঁদের হিসাব অনুযায়ী অনেক পরিমিত, সহনীয়। তাঁরা দক্ষিণের সমুদ্র থেকে ককেশাস পাহাড় পর্যন্ত কুড়ি হাজার ষ্ট্যাডিয়ার কিছু বেশি ধরেছেন, যদিও ডাইমেকাস বলেছেন যে কোনো কোনা জায়গায় এই মাপ তিরিশ হাজার ষ্ট্যাডিয়া ছাড়িয়ে গেছে, কিন্তু আমি প্রথমেই এদের হিসাব সম্পর্কে উত্তর দিয়েছি, তা হলো, এরা যদি আদপে ভারত সম্পর্কে কিছু বলেন, তাহলে যেন ‘নিশ্চিত’ হয়ে না বলেন; এই ‘নিশ্চিত’ শব্দটাকে বাদ দেন।

১৩. ভারত নদীমাতৃক দেশ, সারা দেশ নদীতে বিধৌত। কোনো কোনো নদী, মূল দুটি প্রধান নদী, গঙ্গা আর সিন্ধুর শাখানদী হিসাবে প্রবাহিত হয়, তাদের সঙ্গে সমুদ্রে এসে পড়ে; আর অন্য নদীসমূহ নিজেরা প্রবাহিত হয়ে সাগরে এসে মিলিত হয়। সমস্ত নদীর জন্ম হয় ওই ককেশাস পর্বত থেকে, তারপর প্রথমে দক্ষিণ দিকে যায়; যদিও তারপরও যে সমস্ত নদী সিন্ধুনদীর দিকে যায় তারাও ওই দক্ষিণেই প্রবাহিত হয়—কিন্তু অন্য নদীরা বাঁক খেয়ে পূর্বদিকে ঘুরে যায় যেমন গঙ্গা; গঙ্গা হলো ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘ নদী, পাহাড়ী অঞ্চল পেরিয়ে এসে সমতলে পৌঁছয় ওই দক্ষিণমুখী যাত্রা করে, তারপর সমতলভূমিতে এসে পূর্বদিকে বাঁক নিয়ে পলিবোথরায় (পাটলিপুত্র) পৌঁছয়। পলিবোথরা খুব বড় নগর। তারপর সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়ে, ক্রমে সমুদ্রে গিয়ে মিলিত হয়। একটা মুখ দিয়েই সাগরের সঙ্গে গঙ্গার সঙ্গম হয়েছে। যদিও সিন্ধুনদ, দক্ষিণ সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে দুটো মুখ দিয়ে, কারণ সমুদ্রে পড়ার মুখে পাটালিন (সিন্ধুপ্রদেশ) নগরকে বেড় দিয়ে গেছে। এই জায়গাটা মিশরের যে ব-দ্বীপ তার অনুরূপ। সমস্ত নদীর থেকে যে বাষ্প গরমকালে উঠে আসে আর শুষ্ক উত্তর-পশ্চিম বায়ু গ্রীষ্মকালে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে যে ‘এট্টিসিয়ান প্রবাহ’ তৈরি করে, ইরেটোসথেনিসের মতে, তার ফলে ভারত গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টিতে জলসিঞ্চিত হয় আর সমতলভূমি ঐ বৃষ্টির ফলে জলাভূমিতে পরিণত হয়। এবার বৃষ্টির মাসগুলো যখন আসে তার ঠিক পরে, তখন শণ আর বাজরা-জনার-ভূট্টার বীজ পোঁতা হয়। এছাড়া তিল, চাল, রোপণ করা হয়। শীতকালে রোপণ করা হয় গম, বার্লি বা যব আর ডাল, এছাড়া আরও খাবার শস্য রোপণ করা হয়। যেগুলো আমরা জানি না বা চিনি না। আমি বলতে পারি যে ইথিওপিয়া আর মিশরে যে সব জীবজন্তু দেখা যায়, প্রায় সেইসব জীবজন্তু পুরোটাই ভারতেও দেখা যায়। এমনকি ভারতের নদীগুলোতেও যে সব জীবজন্তুর দেখা পাওয়া যায়, মিশর বা ইথিওপিয়াতে সেই সব জলের জীব আছে, একমাত্র জলহস্তী ছাড়া। জলহস্তী ভারতে পাওয়া যায় না, যদিও ওনেসিক্রিটাস বলেছেন, ভারতে জলহস্তীও আছে। আর ভারতীয়দের সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয় যে, দক্ষিণ ভারতীয়দের ইথিওপীয়দের মতোই গাত্রবর্ণ হয়, যদিও বাকি চেহারা বা মুখাবয়ব অন্য ভারতীয়দের মতো, বিশেষ করে চুল (বাতাসে আর্দ্রতার জন্য তাদের চুল কোঁকড়ানো না হয়ে সোজা হয়); আর উত্তর ভারতের লোকজন মিশরীয়দের মতো দেখতে।

১৪. তাপ্রোবেন (শ্রীলঙ্কা) হলো ভারতের দক্ষিণ সীমা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে সমুদ্রপথে সাত দিন জাহাজে গেলে এক বড় দ্বীপ, সেখানে কনিয়াসি-রা বাস করে। এই দ্বীপ ইথিওপীয়ার দিকে মুখ করে প্রায় আট হাজার ষ্ট্যাডিয়া দীর্ঘ, আর এখানে হাতি আছে। ইরেটোসথেনিস এইরকম বর্ণনা দিয়েছেন বটে, কিন্তু আমার বর্ণনায় অন্যান্য লেখকের বিবরণ যোগ হয়েছে—যেখানে যে যতটুকু সঠিক তথ্য দিয়েছেন তার ভিত্তিতে।

১৫. যেমন ওয়ানসিক্রিটাস বলেছেন তাপ্রোবেন সম্বন্ধে, যে স্থানটি পাঁচ হাজার স্ট্যাডিয়া আয়তনে। তবে তার দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ সম্পর্কে কিছুই বলেননি। এছাড়া বলেছেন যে, মূল ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে কুড়ি দিনের নৌপথ, কিন্তু পালতোলা জাহাজে এই পথ পার হওয়া কঠিন; আর জাহাজের প্রকোষ্ঠ বা গহ্বরের খাঁচা; পাঁজরের মতো কাঠের শক্ত গড়ন দিয়ে তৈরি হতে হবে, দুদিকেই। তাপ্রোবেন আর ভারতের মধ্যে আরও দ্বীপ আছে। বলেছেন যে তাপ্রোবেন যদিও সবচেয়ে দক্ষিণে অবস্থিত। এখানে কিছু বিস্ময়কর ও বৃহৎ উভচর প্রাণীর দেখা মেলে। তাদের কাউকে গবাদি পশুর মতো, কাউকে ঘোড়ার মতো, আবার কাউকে অন্যান্য ডাঙার জন্তুদের মতো দেখতে।

১৬. নিয়েরকাস নদীর পলি জমার বিষয়ে বলেছেন, ‘হারমুস, ক্যায়েস্টার, মাইয়েনডার আর কাইকাস নদীর সন্নিহিত অঞ্চল তৈরি হয়েছে পাহাড় থেকে বয়ে আসা পলিমাটি দিয়ে, পলিমাটি খুব উর্বর আর নরম মাটি, নদী এদের বয়ে নিয়ে আসে, জমা করে নদীর চারদিকে, ফলে উর্বর সমতলভূমি কার্যত ‘নদীর সন্তান’ বলা যায়। যে নদীগুলোর কথা বললাম, সেগুলো তুরস্কের নদী, কিন্তু হেরোডেটাস নীলনদ সম্পর্কে বলেছেন যে, নদী ঘিরে যে সমতলভূমি চলে গেছে, তা নীলনদের উপহার বা দান। নিয়েরকাস সঠিক ভাবে বলেছেন যে নীলনদকে ‘ইজিপ্টাস’ নামে ডাকা হয়, এই কারণেই বলেছেন।

১৭. এ্যারিস্টবুলাস বলেন যে পর্বত আর তার সানুদেশে বর্ষা আর তুষারপাত হয়, কিন্তু সমতলে হয় না; সমতল প্লাবিত হয় যখন নদীর জল বেড়ে ওঠে। পর্বতে শীতকালে তুষার পড়ে, তুষারে ঢাকা থাকে, আর বসন্তকালের শুরুতেও বৃষ্টিপাত হয়, ক্রমশঃ বাড়তে থাকে এবং ইটাসিয়ান বায়ু যখন চলাচল করে তখন দিন-রাত বৃষ্টি পড়ে। বৃষ্টি চলতে থাকে যতক্ষণ না স্বাতী নক্ষত্র (Arcturus) দেখা দেয়, ফলে নদীগুলি তুষারপাত আর বৃষ্টির ফলে ফুলে-ফেঁপে ওঠে, সমতলকে জলসিঞ্চন করে। তিনি বলেন যে, তিনি স্বয়ং এবং অন্য সমস্ত লোকজন খেয়াল করেছেন যে, পোরাভোমিসারি (Paropamisadae) থেকে যখন যাত্রা শুরু হয়েছিল, কৃত্তিকা (Pleiades) নক্ষত্রের অবস্থান দেখে, আর যখন পাহাড়ী অঞ্চলে হাইপাসিয়ে এবং অ্যাসাকেনাস-দের বাসস্থলে তারা শীতকাল অতিবাহিত করে বসন্তের শুরুতে সমতলে নামছে, সেখান থেকে তক্ষশিলা নামের বৃহৎ নগরে পৌঁছচ্ছে, এই জায়গাটাই ঝিলাম নদী (Hydaspes) এবং পুরু-র রাজত্ব। সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে আবার শীতকাল ফিরে আসার সময় হয়ে গেছে। এক ফোঁটা জল নেই, সর্বত্র তুষার জমে আছে, প্রথম বৃষ্টির দেখা মিললো তক্ষশিলায় (Taxila) এসে। এর পর ঝিলামের পাড়ে এসে পুরু-কে পরাজিত করলো, তখন তারা হাইপানিস (সম্ভবত বিপাসা) নদী পর্যন্ত এগিয়ে গেছিল পূর্ব দিকে। তারপর আবার ঝিলামের কাছে ফিরে এলো। পুরো পথটায় বৃষ্টি চললো একটানা, বিশেষ করে ইটিসীয় হাওয়ার মরসুমে। কিন্তু যখন আকাশে স্বাতী নক্ষত্র (Arcturus) দেখা যেত তখন বৃষ্টি থেমে যেত। তারপর কয়েকদিন ধরে জাহাজগুলো ঝিলাম নদীতে রেখে সারাই করে, তারা যাত্রার দিন ঠিক করলো, প্লাইয়াডিস বা কৃত্তিকা নক্ষত্র আকাশে দেখা দেওয়ার কয়েকদিন আগে—পুরো শরৎকাল, শীতকাল, বসন্ত ও গ্রীষ্মকাল ধরে সমুদ্র তীর ধরে এগোলো দীর্ঘ দশ মাস ধরে, এসে পৌঁছলো পাটালিনে (সিন্ধু প্রদেশ)—তখন আকাশে কালপুরুষের সঙ্গে লুব্ধক (Dog star) দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সুতরাং দশ মাস ধরে এই সমুদ্রযাত্রা চলেছে, অথচ বৃষ্টি পায়নি তারা কোনো জায়গায়, এমনকি এটিসিয় বায়ু যখন পূর্ণ শক্তিতে বিরাজ করেছে, তখনও; সমতল তখন জলে পরিপূর্ণ কারণ নদী ভরে উঠেছে আর সমুদ্রে তখন জাহাজ চালানো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যখন হাওয়া উল্টো দিকে বইছে, আর স্থলভাগের বায়ুও বইছে না।

১৮. নিয়েরকাসও একই কথা বলেছেন, শুধু গ্রীষ্মকালে বৃষ্টির বিষয়ে এ্যারিষ্টবুলাসের সঙ্গে তিনি ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁর মতে গরমকালে সমতলভূমিতে বৃষ্টি হয়। কিন্তু শীতকালে হয় না। দুই লেখকই অবশ্য নদীতে জল ছাপিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। নিয়েরকাস বলেছেন, তারা যখন চন্দ্রভাগা নদীর (Acesines River) তীরে শিবির ফেলেছিলেন, তখন একসময় নদী ফুলে ফেঁপে উঠল, এবং তাঁরা বাধ্য হলেন শিবির সরিয়ে উঁচু জায়গায় নিয়ে যেতে; এটা ঘটেছিল যখন সূর্য উত্তরায়ণে ছিল। অন্যদিকে অ্যারিস্টবুলাসের বিবরণে আমরা নদী কতটা ফুলে উঠছে তার হিসাব পাচ্ছি। তিনি বলছেন চল্লিশ কিউবিট উচ্চতায় নদী বেড়ে উঠছে; তার মধ্যে কুড়ি কিউবিট বেড়ে উঠছে নদীর সারা বছরের যে অবস্থান তার থেকে, পাড় পর্যন্ত; আর বাকি কুড়ি কিউবিট জলে ভেসে যাচ্ছে আশেপাশে সমতলভূমি। জল উপচে যাচ্ছে নদীর তীরভূমি। তাঁরা একথাও মেনে নিয়েছেন যে সেই সময় উঁচু জায়গায় যে সমস্ত নগর থাকে, তাদের দেখে দ্বীপের মতো মনে হয়, যেমন উদাহরণ হিসাবে ঈজিপ্ট বা মিশর বা ইথিওপীয়ার কথা বলা যায়, আবার এই বন্যার নিরসন হয়, যখন আকাশে স্বাতী নক্ষত্র (Arcturus) দেখা যায়। যখন জমি অর্ধেক শুকিয়েছে আর খানিকটা জল আছে, তখন ওই জমিতে ফসল বোনা শুরু হয়, হাল বা ওই ধরনের কোনো মাটি খোঁড়ার যন্ত্র ব্যবহার করে চাষ করা হয়। ফসল পেকে ওঠে আর প্রচুর ফসল হয়। ধান বা চাল এই চাষ-পর্বের শেষের দিকে বপন করা হয়, মাটিতে বপন করলে প্রায় চার কিউবিট উঁচু হয় গাছটি, অ্যারিষ্টবুলাসের মত অনুযায়ী, সেই ধানগাছে মঞ্জরী হয় এবং তা থেকে বহু ধান পাওয়া যায়। ধান সংগ্রহের সময় কৃত্তিকা (Pleiades) নক্ষত্র দেখা যায় আকাশে। ধান ঝাড়তে হয়, অনেকটা যব বা বার্লির মতো; ধান শুধু ভারতে নয়, ব্যাকট্রিয়ানা, ব্যাবিলন এবং সুসি আর সিরিয়ার নীচের দিকেও জন্মায়। মেজিল্লাস বলেন, ধান বর্ষা আসার আগে রোপণ করা হয়, কিন্তু সেচের ব্যবস্থা বা প্রতিস্থাপনের সময় পুকুর বা জলাশয় থেকে জলের প্রয়োজন হয়। ওয়ানসিক্রিটাসের মতে, বসমোরাম (Bosmohum)-এর দানা গমের দানার চেয়ে ছোট হয় আর তা জন্মায় নদীর ধারে, তার দুপাশেই নদী থাকা দরকার। খামার থেকে বের করার আগে বসমোরাম একটু ভেজে বা ঝলসে নেওয়া হয়, কারণ চাষীরা এ ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ফলে বসমোরামের বীজ বাইরে বেরোয় না।

১৯. এ্যারিষ্টবুলাস ভারত আর মিশর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে তুলনা করেছেন, কারণ এই দেশগুলো একই ধরণের বলে তাঁর মনে হয়েছে। আবার বিপরীত ধরণেরও বটে। যেমন, আমি বলতে পারি নীলনদ যখন জলে ভেসে যায়, চারিদিক জলে ডুবে যায়, তার কারণ দক্ষিণদিকের বৃষ্টিপাত, কিন্তু ভারতের নদীতে বন্যা হয় উত্তরভাগে বৃষ্টিপাতের জন্য। আফ্রিকার থিবাইস (Thebais) থেকে সিয়েনা (Syene) পর্যন্ত, এমনকি মেরো (Meroe)-র মতো বাণিজ্যনগরী ধরলেও তাই। ভারতেও পাতালিন (সিন্ধু প্রদেশ) থেকে হাইডাসপিস (ঝিলম নদী) পর্যন্ত কোনো বৃষ্টির দেখা নেই। কিন্তু এই অঞ্চলের উপরে যে সমস্ত দেশ আছে, সেখানে বৃষ্টি হয়, তুষারপাত হয় আবার চাষ-আবাদও হয় দেশের অন্যান্য জায়গার মতো, ভারতের বাইরে যারা অবস্থান করে তাদের ক্ষেত্রেও হয়, কারণ বৃষ্টিপাত আর তুষারের জল তারা পেয়ে থাকে। অ্যারিষ্টবুলাসের বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য বোধ হয় যখন তিনি বলেন যে এই স্থান ভূমিকম্প-প্রবণ এলাকা, কারণ প্রচুর আর্দ্রতার জন্য এখানকার জমি সচ্ছিদ্র আর এই কারণে নদীর খাতও পরিবর্তন হয়ে যায়। তিনি বলেন যে, যখন তিনি এর আগে এখানে প্রেরিত হয়েছিলেন, তখন একটা দেশ দেখেছিলেন যেখানে হাজারো নগর আর গ্রাম ছিল, যে সব নগর, গ্রাম, জনপদ এখন জনমানবশূন্য, কারণ সিন্ধুনদ এখন তার পথ পাল্টেছে, যেখান থেকে বয়ে যেতো সেখান থেকে বাঁদিকে সরে গিয়ে বইছে। এই নতুন নদীখাত অনেক গভীর, আর সিন্ধুনদ সেই কারণে বন্যার সময় অনেক জল গ্রহণ করে রাখে, আগের অঞ্চল ভাসিয়ে দেয় না, ফলে চাষ-আবাদ কম হয়, নগর এখন অনেক উপরে হয়ে গেছে, শুধুমাত্র সিন্ধুর স্রোত থেকে নয়, বর্ষার জল নদী গ্রহণ করার পরও নগর উঁচুতে থাকে, বেশ উঁচুতে।

২০. নদীর বন্যা পরিস্থিতি আর স্থলবায়ুর অনুপস্থিতি সম্পর্কেও ওয়ানসিক্রিটাস বলেছেন—সমুদ্রতীর অধিকাংশ জুড়ে মগ্নচড়া বা পলিমাটি জমে জমে সমুদ্র অগভীর হয়ে আসে (জাহাজের পক্ষে বিপজ্জনক), বিশেষ করে নদীর মোহানাগুলো জোয়ার বা কোটালের জন্য এবং সর্বোপরি গভীর সমুদ্র থেকে ভেসে আসা হাওয়ার জন্য এই পরিস্থিতি হয়। ভারতের উর্বরতা সম্পর্কে মেগাস্থিনিস বলেছেন যে এদেশে ফলমূল আর শস্য বছরে দুবার করে জন্মায়। ইয়েটোসথেনিস ওই একই কথা বলেন, শীতকালের চাষ আর গ্রীষ্মকালের চাষ আর তার সঙ্গে দুই সময়ের বৃষ্টিপাত, কারণ তিনি এমন কোনো বছর দেখেননি যখন বৃষ্টি হয়নি। দুটো ঋতুতেই বৃষ্টি হয়েছে। দেশের ঋতুকাল খুবই ভাল, কোনো বছর শস্য ছাড়া ফাঁকা জমি যায় না, আর গাছগুলোও প্রচুর ফল উৎপন্ন করে; আর বিভিন্নধরনের কন্দমূল ও খাদ্যমূল জন্মায়। দীর্ঘ নলখাগড়ার মতো উদ্ভিদ মিষ্টস্বাদের হয়, প্রকৃতি আর রৌদ্রতাপ দুটো এর কারণ, কারণ আকাশের জল কী নদীর জল সূর্যের উত্তাপে গরম হয়ে যায়, ফলে ইয়ে টোসথেনিসের মতে অন্য দেশের মানুষ যাকে ‘পেকে ওঠা’ বলে সেটা ফল বা ফলের রস যেটাই হোক, এদেশের লোক বা ভারতীয়রা তাকে বলে ‘তপ্ত হয়েছে’। আর পেকে ওঠা ফল ভারি সুন্দর একধরনের গন্ধ ছড়ায়। এ ছাড়া তিনি বলেন, যে গাছ থেকে গাড়ির চাকা বানানো হয় সেগুলোও নমনীয় হয়, আর কিছু গাছে পশম উৎপন্ন হয়ে থাকে। সেই পশম থেকে, নিয়েরকাস বলেছেন, সুন্দর সুতোর পোশাক বোনা হয়, এমনকি ম্যাসিডনিয়রা তাই দিয়ে বালিশ তৈরি করে। ঘোড়ার পিঠে বসার জন্য জিনের উপরে ব্যবহার করে, সেরিকা ঠিক ওই ধরনের বস্তু, বাইসাস তৈরি হয় গাছের ছাল শুকিয়ে। তিনি এমন একটা নলখাগড়া গোছের গাছের কথা বলেছেন, যেখান থেকে মধু প্রস্তুত হয়। যদিও সেখানে কোনো মৌমাছির অস্তিত্ব নেই, আসলে এটা একটা গাছ যার ফল ফলে, আর সেই ফল থেকে মধু তৈরি হয়, কিন্তু যদি কেউ সরাসরি ফলটা খেয়ে ফেলে তাহলে সে মাতাল হয়ে পড়বে (অনেকটা মহুয়া ফলের মতো)।

২১. সত্যি কথা বলতে ভারতে এরকম অনেক বিচিত্র বৃক্ষ আছে; তার মধ্যে একটা গাছ আছে যার শাখাগুেলো মাটির দিকে নুয়ে থাকে। তাদের পাতাগুলো এক একটা ঢাল-এর মাপের। ওয়ানসিক্রিটাস নিজেও যে বিবরণ দিয়েছেন তার মধ্যে বাড়িয়ে বলার লক্ষণ দেখা যায়, যখন তিনি মিউজিকেনাসের রাজত্ব সম্পর্কে বলেন। মিউজিকেনাস সিন্ধুনদের একদম মাথায় রাজত্ব করতেন বলে জানা যায়, কিন্তু এক্ষেত্রে ওয়ানসিক্রিটাস বলেছেন ভারতের দক্ষিণতম অংশে, আর মিউজিকেনাস-এর রাজত্বে এক ধরনের গাছ দেখা যায়, যেগুলো প্রথমে বারো কিউবিট উচ্চতায় বেড়ে ওঠে, তারপর মাটির দিকে ফিরে আসে উপর থেকে বেঁকে আর মাটি স্পর্শ করে, স্তরে স্তরে এইরকম উপর-নিচ করে গাছটা বেড়ে ওঠে, গুঁড়িও এভাবেই বাড়ে (সম্ভবত বটগাছ, ঝুরিওয়ালা), ফলে একটা গাছ থেকে ছাতার মতো একটা বিরাট ছায়া রচনা করে, মনে হয় একটা প্রকাণ্ড তাঁবু অনেকগুলো থাম না স্তম্ভের উপর টাঙানো আছে। পাঁচজন মানুষ হাত ছড়িয়েও সেই গাছের কাণ্ড ধরতে পারে না। এছাড়া এরিষ্টবুলাস যখন বলছেন, এ্যাকোসিনেস (চন্দ্রভাগা নদী) সম্পর্কে, আর হাইয়ারোটিস (সম্ভবত বিপাসা) নদীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার কথা, তখন এই ধরনের গাছের কথা বলেছেন, যার ছায়ায় পঞ্চাশজন ঘোড়সওয়ার অথবা চারশ’ মানুষ দুপুরের প্রবল রোদ থেকে বাঁচতে পারে। এ্যারিস্টবুলাস আর একটি গাছের কথা উল্লেখ করেছেন, যেটা বড় গাছ নয়, শিমের মতো দশ আঙুল লম্বা ফল জন্মায় সেখানে আর মধুতে পূর্ণ—কিন্তু ঐ মধু খেলে বাঁচা মুশকিল। কিন্তু সমস্ত বিবরণ ছাপিয়ে গেছে একটি গাছের বিশালতার ক্ষেত্রে, যেখানে কয়েকজন বলেছেন হাইয়ারোটিস নদী পেরিয়ে এক বিশালকায় গাছের কথা, যার ছায়া দুপুরবেলায় পাঁচ ষ্ট্যাডিয়া জুড়ে পড়ে। আর যে গাছ থেকে পশম (Wool) উৎপন্ন হয়, অ্যারিষ্টবুলাস তার সম্পর্কে বলেন যে, গাছের ফুলের মধ্যে একটি বীজ থাকে, আর যখন সেই বীজ নিষ্ক্রান্ত হয়, তখন পেঁজা তুলোর মতো বাকি অবশিষ্টাংশ পশম উৎপন্ন করে।

২২. অ্যারিষ্টবুলাস এখানে নিজে থেকে জন্মানো একটি শস্যের উল্লেখ করেছেন, যে শস্য গমের দানার মতো শস্য উৎপাদন করে, মিউজিকানাস অঞ্চলে, আর একপ্রকার আঙুরলতার কথা বলেছেন যা থেকে আসব বা মদ্য প্রস্তুত হয়। যদিও অন্য লেখকরা বলছেন, ভারতে দ্র্রাক্ষালতা পাওয়া যায় না, যে জন্য অ্যানাকারসিস বলেন যে সেখানে কোনো বাঁশি নেই, অথবা অন্য কোনো সংগীতের বাদ্যযন্ত্রও পাওয়া যায় না শুধু বড় করতাল, ঢাক, ঢোল, আর ক্যাস্টনেট বা করতালসদৃশ যন্ত্র, যেটা শুধুমাত্র যারা জাদুকর ও ভোজবাজি দেখায় তারা সঙ্গে রাখে। কিন্তু দু-পক্ষের বিবরণকাররা মেনেছেন যে, ভারতে প্রচুর ভেষজ গাছ আর মূল শিকড় পাওয়া যায় যেগুলো রোগ ভালো করে, আবার কোনো কোনোটা বিষও বটে। বহু রঙের গাছপালাও পাওয়া যায়, অ্যারিস্টবুলাস বলছেন, এদের একটা আইন আছে, যদি কোনো ব্যক্তি প্রাণনাশক কোনো কিছু আবিষ্কার করে বা খুঁজে বের করে, তাহলে ঐ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়; যদি না সে একইসঙ্গে তার জীবনদায়ী প্রতিষেধক আবিষ্কার না করে। তিনি আরও বলেছেন যে, ভারতের দক্ষিণভাগে দারুচিনি ও সুগন্ধী নিস্যন্দ পাওয়া যায়, আরব ও ইথিওপীয়ার মতো ভারতে এই সুগন্ধী এবং আরও একই ধরনের পদার্থ জন্মায় কারণ সূর্যের রশ্মি আর উষ্ণ আবহাওয়া, তবে বৃষ্টির প্রবলতা আবহাওয়াকে গরমের সঙ্গে আর্দ্র রাখে, ফলে পুষ্টিকর আর উৎপাদনক্ষম ফলন হয়। জল এবং স্থল, দুজায়গাতেই এর ফল পাওয়া যায়—তাই ভারতের স্থলভূমি আর জলের মধ্যে যে সমস্ত জন্তু-জানোয়ার বাস করে তারা আকারে অন্যদেশের তুলনায় বড় হয়ে থাকে; যদিও নীলনদের প্রজননক্ষমতা অন্য নদীর তুলনায় বেশি, তাই তারা বিশালাকায় জন্তুদের জন্ম দেয়, বিশেষ করে উভচরদের। মিশরীয় মহিলারা সময়ে সময়ে চারটি সন্তানের জন্ম দেয়। এ্যারিষ্টটল বলেছেন, একজন মহিলা সাতটি সন্তানের জন্ম দেয়, তিনি এছাড়া বলেন নীলনদ প্রবল উৎপাদনক্ষম এবং উৎপাদিত জীবজন্তুর স্বাস্থ্যও খুব ভাল হয়, কারণ সূর্যের রশ্মিতে সহনীয় উষ্ণতা আছে, তার ফলে পুষ্টিকর অংশ থেকে যায়, আর অনাবশ্যক অংশ উবে যায়।

২৩. এ্যারিস্টটলের মতে, সম্ভবতঃ ওই একই কারণে নীলনদের জল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, অন্য নদীর জল উত্তপ্ত হতে যতটা উষ্ণতা লাগে তার অর্ধেক উষ্ণতায়। কিন্তু তুলনা করলে দেখা যাবে যে, নীলনদ যেহেতু দেশের একটা সোজা আর লম্বা সঙ্কীর্ণ খাত বেয়ে এগিয়েছে, কিন্তু ভারতের নদীগুলো অনেক বিস্তৃত আর বঙ্কিম পথ ধরে গেছে; নীলনদ বিভিন্ন জলবায়ু আর আবহাওয়ার মধ্যে দিয়ে গেছে অন্যদিকে ভারতের নদীসমূহ দীর্ঘ সময় ও দীর্ঘ দূরত্ব ধরে একই জলবায়ুর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে—ফলে ভারতের নদ-নদী নীলনদের তুলনায় বেশি উৎপাদনক্ষম। জন্তুগুলো সংখ্যায় বেশি আর বড়; আর বৃষ্টি যখন মেঘ থেকে বর্ষিত হয়, তখন জল উত্তপ্ত থাকে।

২৪. এ্যারিষ্টবুলাস এবং তাঁকে যাঁরা অনুসরণ করেন, তাঁরা কেউ মানতে চাইবেন না যে সমতলে বৃষ্টি হয়, কারণ এ্যারিষ্টবুলাস বলেছেন যে ভারতে সমতলভূমিতে বৃষ্টি পড়ে না। কিন্তু ওয়ানসিক্রিটাস বিশ্বাস করেন যে বর্ষার জলের কারণে জন্তুদের মধ্যে পরিষ্কার প্রভেদ দেখা যায়। প্রমাণ হিসাবে তিনি বলেছেন যে বিদেশের গবাদি পশু, যারা এই জল পান করে তারা স্থানীয় গবাদি পশুর রঙ ধারণ করে। এই ব্যাপারে তিনি সঠিক, কিন্তু যখন তিনি ইথিওপীয়দের কালো রঙের চামড়া আর পশমী চুলের জন্য জলকেই দায়ী করেন, এবং থিওডেকটিসের মতকে গুরুত্ব দেন না যে, সূর্যই এজন্য দায়ী। থিওডেকটিসের মতে, ‘এই মানুষদের কাছে এসে সূর্যদেব তাঁর রথ চালিয়ে দেন, শরীরের রঙ পাল্টে ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকারের রূপ প্রদান করেন, এবং তাদের চুল পাকিয়ে গোল হয়ে যায় সূর্যের উত্তাপে। কিন্তু ওয়ানসিক্রিটাসেরও কিছু বক্তব্য আছে। যেগুলো শোনা দরকার। প্রথম বক্তব্য, সূর্য অন্যান্য জাতির তুলনায় ইথিওপীয়দের খুব কাছাকাছি (কাছে এসে) একথার ভিত্তি কম, বরং একটা সমান্তরাল রেখা বরাবর সূর্য উত্তাপ দিয়ে থাকে, আরও অনেক জায়গায়—ফলে সূর্য সমস্ত মানুষের থেকে একই দূরত্বে অবস্থান করছে; দ্বিতীয় কারণ হলো, সূর্যের উত্তাপের জন্য এই কৃষ্ণবর্ণ হয় না, তাহলে মায়ের গর্ভে যে শিশু থাকে, তার উপর তো সূর্যের আলো পড়ে না তাহলে সে কালো গাত্রবর্ণ নিয়ে জন্মাবে কেন? বরং অন্য যুক্তিটাই উত্তম, যারা বলছে যে সূর্যের উত্তাপ, আর ঝলসানো সে উত্তাপে শুকিয়ে যায় জলীয় ভাব। ফলে গাত্রবর্ণের উপর তার প্রভাব পড়ে; আর আমি এই কথায় বিশ্বাস রাখি কারণ ভারতীয়দের চুল এতো কোঁকড়ানো নয়, আর গায়ের রঙ এতো কালো নয়। অর্থাৎ আমার ধারণা আর্দ্র আবহাওয়ার জন্য এটা হয়। সর্বত্র এবং অন্তঃসত্ত্বা শিশু তাদের অন্তর্নিহিত শরীরিক কারণেই তাদের বাবা-মা যে রঙের দেহবর্ণের মানুষ হন সেই রঙই ধারণ করে। তাদের প্রতি শিশুর যে জন্মগত আকর্ষণ বা অন্যান্য মিল, সবই এই সূত্রে ব্যাখ্যা করা যায়। তাছাড়া, সূর্য যে সমস্ত মানুষের থেকে একই দূরত্বে অবস্থান করছে, এই বক্তব্য কিন্তু যুক্তি দিয়ে নয়, তার পর্যবেক্ষণ থেকেই মানুষ এই মন্তব্য করেছে; এটা কোনো হালকা মন্তব্য হিসেবে ভাবা যুক্তিযুক্ত হবে না, বরং আমি যেভাবে বলছি সেটা বিবেচনা করা উচিত। পৃথিবী, সূর্যের তুলনায় একটা বিন্দুর চেয়ে বড় নয়, ফলে আমাদের পর্যবেক্ষণ যে সূর্য কাছে আসলে গরম বাড়ে, দূরে গলে উত্তাপ কমে যায়, এটা বিবেচনা করার বিষয়, কারণ সূর্য সবার থেকে সমান দূরত্বে নেই, আর সেই কারণেই ‘সীমার কাছাকাছি’ শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে, ইথিওপীয়রা বলেছে, ওয়ানসিক্রিটাস যেভাবে ভাবছেন সে অর্থে নয়।

২৫. যাঁরা ভারতের সঙ্গে মিশর ও ইথিওপীয়য়ার তুলনা করে মিল বা গরমিল খুঁজতে চান, তাঁরা সকলে একমত যে জলপ্লাবিত না হলে, জলের অভাবে সেই সব অঞ্চল বন্ধ্যা থেকে যায়। নিয়েরকাস বলেন যে, নীলনদের প্রসঙ্গে এ কথা আগেই উঠেছিল, তার বন্যা বা প্লাবনের ক্ষেত্রে, এবং ভারতীয় নদীসমূহ তার উত্তর তখনই দিয়ে দিয়েছে, গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টির জন্য এটা হয়। কিন্তু আলেকজাণ্ডার যখন হাইডাসপিসে (ঝিলম নদীতে) কুমীর দেখেন আর আমেচিনেস এ (চন্দ্রভাগা নদীতে) ভারতীয় পদ্ম বা ইজিপ্সিয়ান বিন দেখেন, তখন তাঁর ধারণা হয় যে তিনি নীলনদের উৎসে পৌঁছে গেছেন; মিশর অভিযানের জন্য তিনি সেনাবাহিনীকে তৈরি করার কথা ভাবেন, এবং এই নদীপথে যতটা যাওয়া যায় ততটাই পৌঁছাবেন, এইরকম চিন্তাভাবনা করেন। যদিও অচিরেই তাঁর ধারণা ভুল প্রমাণিত হয় কারণ তাঁর আশা আর বাস্তবের মাঝে কয়েকটা বিরাট নদ-নদী আর তাদের ভয়ংকর স্রোত এসে পড়ে। এগুলো সবই ভারতীয় নদী, মিশরের নয়। মহাসমুদ্র দেখেন, যেখানে ভারতের নদীগুলো এসে মিলিত হয়, সব নদীর জল এসে যেখানে পড়ে। এর পরে আছে আরিয়ানা বা পবিত্র ভূমি, (অধুনা আফগানিস্তান), পারস্য উপসাগর, আরব উপসাগর এবং সবশেষে ট্রোগ্লোডাইট বা নিঃসঙ্গ গুহাবাসী সন্যাসীদের স্থান। এই হল, বৃষ্টি আর আবহাওয়ার কথা, বন্যা আর খরার বিবরণ।

২৬. কিন্তু এছাড়াও আমি ভূগোলের প্রয়োজন আর চাহিদা অনুযায়ী নদী সম্পর্কে আরও কিছু বলতে সক্ষম, যেটা আমি তাদের ইতিহাস পড়ে জেনেছি। নদীর ক্ষেত্রে দেখেছি সেগুলো প্রাকৃতিক সীমা এবং দেশের মাপটাও নির্ধারণ করে দেয়, ফলে আমাদের ক্ষেত্রে সুবিধা হয়, কিন্তু অন্যান্য নদীর ক্ষেত্রে একথা সত্য হলেও নীলনদ আর ভারতীয় নদনদীর ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা হল, এদের বাদ দিয়ে দেশগুলো, যোগাযোগের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে, আবার উল্টোদিকে এই নদীগুলো যাতায়াতের পক্ষে সুবিধাজনক, পরিবহনযোগ্য আর দুপাশে চাষবাসের উপযুক্ত জমি আছে। আর নদীপথ ছাড়া দেশটিকে আগাপাশতলা ঘোরা বা দেখা অসম্ভব। এখন আমি সেই নদীগুলো সম্পর্কে কিছু কথা বলবো, যেগুলো ভিন্ন ভিন্ন দেশ অতিক্রম করে এসে সিন্ধুনদে মিশেছে; কিন্তু অন্যান্য নদী সম্পর্কে আমার সবিশেষ জ্ঞান নেই। আলেকজাণ্ডার, যাঁর থেকে এই অঞ্চল কেউ অধিক জানে না, বেশি ওয়াকিবহাল নয়, তিনি ঠিক করলেন দারিয়াসকে যারা নির্মমভাবে হত্যা করে ব্যাকট্রিয়ানার (আধুনিক আফগানিস্থান) বিদ্রোহ সংগঠিত করেছিল, তাদের আক্রমণ করে শেষ করে দিতে হবে। তিনি সেজন্য ভারতে ঢুকলেন আরিয়ানা (পবিত্র স্থান/আধুনিক আফগানিস্থান) দিয়ে, ডান দিকে ভারতবর্ষকে রেখে পারোপামিসাস পর্বত পার হয়ে (হিন্দুকুশ পর্বত আর আফগানিস্থানের পাহাড়ী অংশ) উত্তর ভাগ এবং ব্যাকট্রিয়ানাতে সমস্ত বিদ্রোহ দমন করলেন, পারসিক এবং অন্যান্যদের সবাইকে পরাস্ত করে, আবার ফিরলেন ওই পাহাড়িপথে, এবার অন্য পথ ধরে, কিছুটা কম সময় লাগলো—ভারতকে বাঁ দিকে রেখে খানিকটা এগিয়েই আবার ঘুরে গেলেন ভারতবর্ষের দিকে—এ বিষয়ে তাঁকে অনেক প্রাজ্ঞ মানুষ বর্ণনা দিয়েছিলেন ঠিক, কিন্তু খুব পরিষ্কার নয় সে বিবরণগুলো, তবু ভারতের পশ্চিম সীমা ধরে এগোলেন—কোফেস এবং কোয়াসপেস নদী (কাবুল নদী এবং কোয়েসপেস নদী), যে কোয়েসপেস, কোফেস-এ গিয়ে মিশেছে প্লেমিরিয়ান শহরের কাছে এসে। তার আগে গোরিস শহর ছাড়াও দুটি শহর বান্দোবিনি আর গ্যানভারাইটিস পেরিয়ে এসেছে। আলেকজাণ্ডার জেনেছিলেন খোঁজখবর নিয়ে যে, পাহাড়ি অঞ্চল এই উত্তরভাগে লোকজনের বসতি আর ফলপ্রসবিনী। কিন্তু দক্ষিণভাগে একটা অংশে বৃষ্টি হয় না, আর অন্য অংশ প্রচুর বৃষ্টিপাত আর বন্যার ফলে জন্তুজানোয়ারের বাসস্থান বটে, তবে মানুষের নয়। প্রচণ্ড গরম। ফলে তিনি উত্তরভাগকেই লক্ষ্য করে এগোলেন আর যে সমস্ত নদী ওই পথে পার হতে হবে, সে সম্পর্কে তথ্য যোগাড় করলেন। নদীর স্রোত তির্যকভাবে বইছে, আর যে দেশগুলো জয় করতে চাইছেন সেখানে পৌঁছতে গেলে নদী পৌঁছে পার হতে হবে, ফলে এই নদী পার হতে গেলে সুবিধা হল উৎস মুখে পার হওয়া; তার সঙ্গে তিনি এটাও শুনেছেন যে, একাধিক নদী একটি স্রোতে বইছে এখানে, যত এগোবেন তত নদীর সংখ্যা বাড়বে, যারা একটা স্রোতপথে বইছে। ফলে দেশগুলো পার হওয়া বা সেখানে পৌঁছনো খুব কঠিন কাজ। বিশেষ করে জলযান, নৌকা বা জাহাজের অভাব হলে। এই ব্যাপারে আশাঙ্কিত হয়ে তিনি পুবমুখী যে সমস্ত পাহাড়ি অঞ্চল ও প্রদেশ তাদের জয় করতে শুরু করলেন। এ কাজ করতে তাকে শুধু বা কোফেস কোকেসাস কাবুল নদী পেরোতে হলো।

২৭. আলেকাজণ্ডার কাবুল নদী (Cophes) হয়ে সিন্ধুনদ (Indus) পৌঁছলেন। সেখান থেকে চেনাব বা চন্দ্রভাগা (Acesines) আর ইরাবতী নদী হয়ে (Hyarotis) শেষ করলেন বিপাসার তীরে (Hypanis) এসে। কারণ দুটো—একটা দৈববাণী, জ্ঞানী মানুষদের কাছে শুনলেন, আর দ্বিতীয় তাঁর বাহিনীর চাপে—দীর্ঘ পথশ্রম আর একের পর এক যুদ্ধে তারা ক্লান্ত, অবসন্ন। সবচেয়ে কষ্ট জলের, আবার বর্ষায় তারা ভিজেছে দিনের পর দিন। পূর্বদিকে হাইপানিস নদীর (বিপাসা) এপাশে আমরা জানতাম কোথায় কি আছে, আর অন্যদিকের বিবরণ পেয়েছি পরবর্তী বিবরণকারীদের কাছ থেকে, যারা নদী পার হয়ে ওপারে গেছে। আলেকজাণ্ডারের পরে গঙ্গা এবং গঙ্গা-শোন নদীর মোহনায় অবস্থিত পলিবোথরা (পাটলিপুত্র বা পাটনা) পর্যন্ত তাদের বিবরণে আছে। এখন কাবুল (কোফেস) নদী আর সিন্ধু (Indus) নদের মাঝখানে আসাকানি, মাসিয়ানি, নাইসি আর হাইপাসি উপজাতিদের বসবাস; তারপর আসাকানুসের রাজত্ব, তার রাজধানী মেসোগা। আবার সিন্ধুনদের কাছে এসে পাবে আর এক শহর পিউকোলাইটিস, সেখানে নদীর উপর দিয়ে একটা সেতু তৈরি করা ছিল, ফলে নদী পার হতে আলেকাজাণ্ডারের সেনাদলকে আর বাড়তি কোনো কিছু করতে হল না।

২৮. সিন্ধুনদ আর ঝিলাম নদীর মাঝখানে তক্ষশিলা (Taxila),—এক বৃহৎ শহর আর যার আইনকানুন খুবই উল্লেখযোগ্য। আর যে অঞ্চল নগরকে বেষ্টন করে চলে গেছে, সেটা বেশ বড়সড় আর খুব উর্বর। সমভূমির উপর দিয়ে একেবারে নগরের সীমান্ত ধরে শুরু হয়েছে। তক্ষশিলার অধিবাসীরা এবং রাজা তাক্সিলেস, আলেকজাণ্ডার আর তাঁর সেনাবাহিনীকে খুব আদরের সঙ্গে গ্রহণ করলেন। আলেকজাণ্ডার তাঁদের যা উপহার দিলেন, সেটা ওঁরা অভ্যর্থনা জানাবার জন্য যা উপহার সামগ্রী দিয়েছিলেন, তার থেকে বেশিই দিলেন। ম্যাসিডোনীয়রা তা দেখে পরশ্রীকাতর হয়ে থাকবে, কারণ আলেকজাণ্ডার সিন্ধুনদ পার হওয়ার আগে একজন মানুষকেও এই সম্মান দেননি। কারো কারো মতে এই দেশটা মিশরের থেকে বড়ো। এই দেশের উপরে পাহাড়ের মাঝে এ্যাবিসেরাস দেশটা আছে, যেখান থেকে যে সমস্ত দূত এসেছিল, বলেছে যে সেখানে দুটো সাপ রাখা আছে, একটা আশি কিউবিট এবং অন্যটা একশ চল্লিশ কিউবিট দীর্ঘ (অর্থাৎ প্রায় একশ কুড়ি ফুট আর দুশ’ দশ ফুট)। ওয়ানসিক্রিটাস কিন্তু আলেকজাণ্ডারের দিকনির্দেশ বা পথপ্রদর্শক ছিলেন না, যেমন সম্রাটের স্তাবকরা নিজেদের মনে করতেন। কিন্তু তিনি অবিশ্বাস্য, অদ্ভুত সব বিষয়ের কথা বলতে সক্ষম ছিলেন। যেসব কথা সম্রাটের দরবারে বিশ্বাস করা হতো, এবং সেগুলো অন্যদের থেকে ভালো বলতে পারতেন। কিন্তু তিনি যেসব বিশ্বাসযোগ্য এবং উল্লেখ করার মতো বিষয়, সেগুলোই বলতেন, যার ফলে উপস্থিত লোকজন তাঁর বক্তব্য অস্বীকার করতে পারতেন না। যাই হোক, এই সাপ সম্পর্কে অন্যরাও বলেছিল, তাদের কথা অনুযায়ী ইমোডি পাহাড়ে তাদের ধরা হয়েছিল আর পাহাড়ের গুহাতেই তারা থাকে।

২৯. হাইডেসপিস (ঝিলাম) আর এ্যাকেসিনেস (চন্দ্রভাগা) নদীর মাঝখানের অঞ্চলে প্রথমে পড়বে পুরু (Porus)-র রাজত্ব, বড় আকারে, আয়তনে আর উর্বরতায় সমৃদ্ধ। তিনশ নগর বা জনপদে বিস্তৃত, আর ইমোডি পর্বতের সন্নিহিত অরণ্য যেখান থেকে আলেকজাণ্ডার কেটে সংগ্রহ করেছিলেন প্রচুর পরিমাণে কাঠ, গাছ কেটে জাহাজ বানানোর জন্য, যার ফলে তিনি হাইডাসপিস বা ঝিলম নদীর পাড়ে যে দুটো নগর তথা জনপদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দুই দিকে, সেটায় পৌঁছে পুরু-কে পরাজিত করেন। ফার, পাইন, সিডার ইত্যাদি পাহাড়ি গাছ কেটে জাহাজ বানানো হয়। যে দুটি জনপদ তথা নগর তিনি নদীর দুই পাড়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার একটির নাম দেন বুসেফেলিয়া (Bucephalia), নামটি তার প্রিয় ঘোড়া বুসেফেলাস এর নাম অনুসারে দেওয়া। পুরুর সঙ্গে যুদ্ধে ঘোড়াটি মারা যায়। (তার উন্নত আর প্রশস্ত ললাটের জন্য ঐ নাম দেওয়া হয়। অসাধারণ ঘোড়া যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য, আলেকজাণ্ডার নিজে এই ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করতেন)। পরবর্তী সময়ে যে ঘোড়াটিকে আলেকজাণ্ডার যুদ্ধে ব্যবহার করেন, যুদ্ধের শেষে তার নাম দেন ‘নাইসিয়া’ (Nicaea)। একটু আগে যে অরণ্যের কথা বলেছি, সেখানে প্রচুর সংখ্যায় বড় বড় বাঁদর থাকে, যাদের লেজও লম্বা। ম্যাসিডোনীয়রা একবার বিপদে পড়েছিল। পাহাড়ের উপর, ন্যাড়া পাহাড়, সারি দিয়ে এই বাঁদরগুলো বসে ছিল। দূর থেকে মানুষের সারি বলে মনে হচ্ছিল, অনেকে তার মধ্যে দাঁড়িয়েও ছিল, ঠিক যেন একটা সৈন্যবাহিনী আক্রমণের জন্য উদ্যত হয়ে আছে। ম্যাসিডনীয়দের দেখে তারা আক্রমণ করবে বলে ভেবে নিয়েছিল, যদি ম্যাসিডনীয় সেনা তাদের আক্রমণ করে প্রথমে—কিন্তু তক্ষশিলার রাজা তখন আলেকজাণ্ডারের সঙ্গে ছিলেন, তাঁর কথামতো সবাই নিবৃত্ত হয়, বোঝে যে ওটা মানুষের পল্টন নয়। দুটো পদ্ধতি এদের ধরার জন্য প্রয়োজন হয়। প্রথম পদ্ধতি হল, বাঁদরদের নকল করার প্রবণতা; যখন বাঁদররা গাছে বসে থাকে তখন শিকারি তাদের দেখিয়ে একপাত্র জল এনে চোখে ঝাপটা দেয়, তারপর এই জলের পাত্রে পাখি ধরার আঠা (Bird line) দিয়ে চলে যায়। শিকারী চলে গেলে বাঁদরা ওই ‘জল’ নিজের চোখে মাখে, আর খানিকক্ষণ পরে যখন চোখের পাতা ফেলে তখন পাতা আটকে যায় আর চোখ বন্ধ হয়ে যায়। তখন শিকারী খুব সহজে জ্যান্ত বাঁদরকে ধরে ফেলে। এই একটা পদ্ধতি, আর একটা পদ্ধতি হল কতগুলো বস্তার মতো বস্তু ফেলে রেখে শিকারি চলে যায়। সেই বস্তার ভিতরটায় পাখি ধরার আঠার গন্ধ থাকে, আর এমন রোমশ আর জালের মতো হয় ভিতরের অংশ যে একবার তার মধ্যে ঢুকে পড়লে, বেরোনো প্রায় অসম্ভব। তখন সহজেই শিকারী বস্তাবন্দী করে বাঁদর ধরে ফেলে। (বস্তাগুলোর আকার অনেকটা আধুনিক ব্যাগি-প্যান্টের মতো হয়।)

৩০. ক্যাথিয়া (Cathaea) এবং সোপাইথেস (Sopeithes) শাসন করতেন একজন আঞ্চলিক প্রশাসক, কিন্তু এই দুই নদীর মাঝখানে আর কোনো রাজ্য ছিল না, অন্য রাজ্য অ্যাকেসিনেস আর হাইয়ারোটিসের থেকে দূরে ছিল, দ্বিতীয় পুরু-র (যে পুরুকে আলেকজাণ্ডার পরাজিত করেন তাঁর খুড়তুতো-মাসতুতো ভাই) রাজত্বের সীমানায়। তাঁর অধীনে যে রাজ্য ছিল তার নাম, গ্যাণ্ডারিস (Gandaris)। ক্যাথিয়া-তে সৌন্দর্য্যের খুবই কদর ছিল, এমনটাই শোনা যায়। এখানকার ঘোড়া আর কুকুরদের সৌন্দর্য্যের জন্য পুরষ্কৃত করা হতো। ওয়ানসিক্রিটাস বলেছেন যে, তারা সব থেকে সুন্দর মানুষটিকে রাজা নির্বাচন করতো; আর তার শরীর এবং আচরণের সৌন্দর্য্য বিচার হত নিয়মের বা আইনের ধারা অনুসারে, বিচার করে দেখা হতো যে তাঁর বাঁচার অধিকার আছে না মৃত্যুই কাম্য। বিচারপতি সেটি ঠিক করতেন। মানুষজন সাধারণতঃ উজ্জ্বল রঙ দিয়ে তাদের দাড়ি রঙ করতো, শুধুমাত্র সৌন্দর্য্যের জন্য, অন্যান্য ভারতীয়রাও অবশ্য এইভাবে রঙ করার অভ্যাস চালু রেখেছে, কারণ এখানে ভারী সুন্দর রঙ পাওয়া যায়, বলে ওয়ানসিক্রিটাস জানিয়েছেন। এই মানুষরা তাদের দাড়ি ছাড়া পোশাকও রঙ করে আর অন্যদিকে শ্রীহীন হলেও অলঙ্করণ পছন্দ করে। এছাড়া নিম্নে বর্ণিত নিয়মটাও খুব অদ্ভুত, কিন্তু ক্যাথিয়রা এই রীতি মেনে চলে। স্বামী আর স্ত্রী পরস্পরকে পছন্দ করে। বিয়ে করে এবং স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী, মৃত স্বামীর সঙ্গে একসঙ্গে পুড়ে মারা যান। কারণ, বোধহয় স্ত্রী কোনো তরুণের সঙ্গে ভালোবাসায় লিপ্ত হয়ে স্বামীকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে না পারে, তার জন্য ক্যাথয়িরা এই বিষয়টাকে আইনে গ্রহণ করেছে যার ফলে বিষপ্রয়োগ বন্ধ হতে পারে। কিন্তু খুব বিস্তারিত করা নেই আইনে, কারণটাও সেভাবে পরিষ্কার করা নেই। বলা হয়ে থাকে সোপইথেস দেশে একটা খনিজ লবণের পাহাড় আছে, যেখান থেকে গোটা ভারতের লবণ পাওয়া যেতে পারে। আর একটু দূরে পাহাড়গুলোর মধ্যে সোনা আর রূপোর খনি আছে, খুব ভালো খনি—এটা আবিষ্কার করেন গরগাস (Gorgus), যিনি আলেকজাণ্ডারের সঙ্গে ধাতু ও খনি বিশেষজ্ঞ হিসাবে এসেছিলেন। কিন্তু ভারতীয়রা যেহেতু খনি বা ধাতু সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিল, ফলে তারা এই সম্পদ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল না। সাদামাটাভাবে ব্যবসা করতো।

৩১. লেখকরা বলেছেন যে সোপাইটদের দেশে (Sopeithes) খুবই ভাল কুকুর পাওয়া যায়। তাদের মতে, আলেকজাণ্ডার দেশটা জয় করে ফেরার সময় প্রায় একশত পঞ্চাশটা কুকুর ওদের কাছ থেকে উপহার পান, ওই কুকুরদের শক্তি প্রমাণ করার ওরা প্রথমে দুটো কুকুর একটা সিংহের সঙ্গে লড়াই করতে ছেড়ে দেয়। এবার লড়াই হয় সমানে সমানে। সোপাইটরা কুকুর আর মানুষের মধ্যেও লড়াই করাতে অভ্যস্থ, হেরে গেলে কুকুরের একটা পা কেটে নেওয়া হয়। আলেকজাণ্ডার প্রথমে কুকুরের পা কাটতে রাজি ছিলেন না, কিন্তু স্থানীয়রা বলে, এই পদ্ধতিতে অনুমতি প্রদান করলে তাকে একটার জায়গায় চারটে কুকুর দেওয়া হবে। আর কুকুরের পা আস্তে আস্তে কেটে নেওয়া হয়, ফলে তার শক্ত করে কামড়ে ধরাটাও তখন খুলে আসে।

৩২. ঝিলম নদীর দিকে যেতে হলে দক্ষিণের দিকে যেতে হবে, কিন্তু সেখান থেকে বিপাসা নদী পূর্বদিকে পড়ে, আর গোটা পথ জুড়ে পাহাড়ের পাদদেশে অতিক্রম করতে হবে, সমতলভূমির তুলনায়। আলেকজাণ্ডার যখন বিপাসা থেকে ঝিলমের দিকে এলেন, নৌবন্দরে এসে ঝিলমের উদ্দেশে রওনা হলেন তার নৌবাহিনী নিয়ে। এই নদীগুলো, যার শেষে আছে বিপাসা নদী—সব এসে মিশেছে সিন্ধুনদে। বলা হয় যে সিন্ধুনদে এসে মিশেছে পনেরোটা নদ-নদী, ফলে সিন্ধুনদ বিরাট চওড়া হয়ে উঠেছে। যারা একটু বাড়িয়ে বলে তাদের মতে একশ ষ্ট্যাডিয়া (গ্রহণযোগ্য মাপ ১ ষ্ট্যাড = ১৮৫ মিটার, কিন্তু অন্যান্য মাপ অনেকটাই বেশি) চওড়া, আর যাঁরা একটু রয়ে-সয়ে বলেন তাঁদের মতে পঞ্চাশ ষ্ট্যাডিয়া চওড়া। এই পঞ্চাশ ষ্ট্যাডিয়া যেখানে সবচেয়ে বেশি বিস্তার আর সাত ষ্ট্যাডিয়া যেখানে সবথেকে কম। এই নদীপথে অনেক জাতি-উপজাতি বাস করে, অনেক জনপদ রয়েছে। সিন্ধুনদ এর পর দক্ষিণ সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। দুটো মুখ দিয়ে, মাঝখানে পাটালিন (Patalene) দ্বীপ তৈরি করে। পূর্বের পথ আলেকজাণ্ডার এড়িয়ে যাওয়ার পর দুটো কথা ভাবেন, প্রথমতঃ তাকে বিপাসা যেতে বাধা পড়ছে, আর দ্বিতীয়তঃ তার অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছেন যে সমতলের এই অঞ্চল এতটাই উষ্ণ যে মানুষের থেকে জঙ্গলের পশুদের চারণভূমি হিসাবে গণ্য হয়, সুতরাং তিনি অন্য সমস্ত পথ বাতিল করে নতুন পথের সন্ধান করেন।

৩৩. এখন ঝিলাম আর বিপাসার মাঝখানে নয়টি জনজাতি বাস করে আর প্রায় পাঁচহাজার জনপদ, যেগুলোর কোনোটা বড় জনপদের (Cos Meropis) চেয়ে কম নয়; যদিও আমার মনে হয় সংখ্যাটা বড্ড বেশি বলা হয়েছে। আমি এই লোকদের কথা বলেছি যারা সিন্ধু আর ঝিলমের মাঝখানের অঞ্চলে থাকে, আর তাদের পরে সিবেই (Sibae) রা থাকে, আমি তাদের কথাও উল্লেখ করেছি; আর দুটো বড় জনজাতি মাল্লি (Malli) এবং সাইড্রাসি (Sydracae) থাকে। মাল্লিদের সঙ্গে সংঘাতে আলেকজাণ্ডার জখম হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন, একটা ছোট জনপদ দখল করতে গিয়ে; আর সাইড্রাসি সম্পর্কে ডাইয়োনিসাসের কথা এসে পড়ে, উপকথা। পাটালিন থেকে খুব কাছে মিউজিকেনাস (Musicanus), তারপর সাবুস (Sabus), সেখানেই আছে সিনডোমানা (Sindomana) আর পোরটিকেনাস ও অন্যান্য দেশ; এই সমস্ত দেশ আলেকজাণ্ডার জয় করেছিলেন, এই দেশের মানুষরা সব সিন্ধুনদের জলা এবং জমিতে বাস করে। এই কথা, এরা বলে আর আমিও যা শুনেছি সেটাই বিবৃত করছি। কিন্তু এই সমস্ত দেশ পার হয়ে পাটালিন-এ পৌঁছতে হয়, যে দেশ সিন্ধুনদের মোহনার দুটি মুখ তৈরি করেছে মাঝখানে—এখন অ্যারিষ্টবুলাস বলছেন যে এই দুটি মোহনার মাঝখানে এক হাজার ষ্ট্যাডিয়ার ফারাক, নিয়েরকাস বলেছেন আটশ ষ্ট্যাডিয়া, ওয়ার্নসাইক্রিটাস গণনা করে, মাপ নিয়ে বলেছেন দ্বীপসুদ্ধ দুই নদীর ধার ধরলে দু’হাজার ষ্ট্যাডিয়া হবে, দ্বীপটি ত্রিকোণ আকৃতির, আর নদী যেখানে দুটো ভাগ হয়েছে, তার ঠিক আগে দুইশত ষ্ট্যাডিয়া বিস্তৃতি আছে সিন্ধুনদের। তিনি এই দ্বীপটিকে ব-দ্বীপ বলেছেন, আর বলেছেন যে আকারে এটি মিশরের যে ব-দ্বীপ তার সমান আকৃতির—এটা ঠিক কথা নয়। কারণ, এটা বলা হয় যে মিশরীয় ব-দ্বীপটির তলদেশ হলো এক হাজার তিনশ ষ্ট্যাডিয়া, যদিও ত্রিভুজ আকৃতির দ্বীপটার অন্য দুটো বাহু ‘বেস’ বা নিচের বাহুর তুলনায় ছোট। পাটালিন নামটা এসেছে একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জনপদ ‘পাটালা’ থেকে।

৩৪. ওয়ানসাইক্রিটাস বলেন যে এই অঞ্চলে নদীর তীরবর্তী মগ্নচড়া অছে, ফলে জল পলিমাটির উপর দিয়ে বয়ে যায়; পলিমাটির স্তর ধীরে ধীরে নদীর গভীরতা কমিয়ে দেয়, তাই বন্যা বা প্লাবন ঘটে, আর চড়া মাথা তোলে এখানে-ওখানে, সাবধানে জলযান চালাতে হয়। তীর থেকে হাওয়া আসে না, আসে গভীর সমুদ্রের হাওয়া। তিনি আরও বিবরণ দিয়েছেন মিউজিকেনাস দেশটি সম্পর্কে, প্রশংসা করেছেন এই দেশটির বা জনপদটির সম্পর্কে, যেমন দীর্ঘদিন বাঁচার ব্যাপারে। ভারতীয়রা অনেকদিন বাঁচে এই জনপদটির অধিবাসীদের মতো, প্রায় একশ ত্রিশ বছর (কথিত আছে সেরেস-এ, মরুপ্রান্তরের আগে যে তৃণভূমি সেখানে মানুষ আরও বেশিদিন বাঁচে।), তাদের স্বাস্থ্য, তাদের সাদাসিধে খাদ্য, যদিও তাদের অঞ্চলে সবকিছুই প্রচুর পরিমাণে ফলে থাকে, এই দীর্ঘজীবনের কারণ। (Seres সম্ভবতঃ চিনে)।

তাদের একটা সর্বজনীন যৌথ খাবার আছে, অনেকটা গ্রীস দেশের ল্যাকোনিয়দের মতো; তারা যে সব জন্তু তাড়া করে শিকার করে তাদের মাংস খায়। খনি থাকা সত্ত্বেও তারা সোনা বা রূপা কোনোটা ব্যবহার করে না। তারা ক্রীতদাস বা দাস ব্যবহার করে না, তার জায়গায় তারা যুবকদের, যারা জীবনশক্তিতে ভরপুর তাদের কাজে লাগায়, যেমন ক্রেটরা অ্যাফামিওটায় আর ল্যাকোনিওরা হেলোটদের ব্যবহার করে। বিজ্ঞানের অন্য কোনো শাখায় তাদের জ্ঞানচর্চা কম, শুধু আয়ুর্বেদ ছাড়া; তারা মনে করে যুদ্ধ করা ভাল কাজ নয়, পাপ—আর একাজ করার জন্য দীর্ঘ সময়ের সাধনা করা অনৈতিক আর অপ্রয়োজনীয়; একমাত্র হত্যা আর বলাৎকার ছাড়া অন্য অপরাধের কোনো আইনি দণ্ড নেই। কারণ, এই দুটো অপরাধ এড়াবার জন্য সেই হতভাগ্যের কোনো দোষ নেই, কিন্তু চুক্তি বা নিয়মপত্রে দু-পক্ষেরই ভূমিকা থাকে, আর চুক্তিভঙ্গ হলে সতর্ক হয়ে বিচার করতে হবে যে কাকে বিশ্বাস করা যায় আর কাকে যায় না। শহর বা জনপদ নাহলে শুধু আইনি মামলায় ভরে যাবে। এইরকম বক্তব্য রেখেছেন সেই সমস্ত ‘জ্ঞানী’ মানুষরা যারা আলেকজাণ্ডারের সঙ্গে এখানে এসেছেন।

৩৫. কিন্তু এ ছাড়াও মা অ্যারিষ্টপাত্রা-কে লেখা একটি চিঠি পাওয়া যায়, লিখেছেন ক্রিটেরাস—আলেকজাণ্ডারের ম্যাসিডনীয় সেনাধ্যক্ষ বা জেনারেল। যে চিঠিতে বহু অবিশ্বাস্য ঘটনা বা জিনিসপত্রের উল্লেখ আছে, যার মধ্যে কোনোটাই তিনি বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণ করেননি। যেমন তার একটি হলো—আলেকজাণ্ডার গঙ্গা পর্যন্ত অভিযান করেছেন! যদিও তিনি নদী এবং তার পাড়ে দৈত্যাকৃতি প্রাণীদের দেখেছেন, বলেছেন, আর নদীর চওড়া ও গভীরতা নিয়ে যে সমস্ত কথা বলেছেন, সেগুলো বিশ্বাসযোগ্য তো নয়ই, বরং সত্যের থেকে বহুদূরে। যদিও এ কথা প্রায় সবাই মানে যে তিনটে মহাদেশের মধ্যে গঙ্গা হচ্ছে সবচেয়ে বড় নদী, তারপর সিন্ধু, তারপরে ঈষ্টার এবং তারপরে নীল নদ—কিন্তু বিভিন্ন লোক ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিয়েছেন—কেউ বলছেন এই নদী সংকীর্ণ জায়গায় তিরিশ ষ্ট্যাডিয়া, আবার কেউ বলেছন তিন ষ্ট্যাডিয়া, কিন্তু মেগাস্থিনিস বলেছন, যেখানে এই নদী সবচেয়ে সরু খাত দিয়ে বয়ে গেছে সেখানেও অন্তত একশ ষ্ট্যাডিয়া প্রশস্ত, আর কুড়ি ফ্যাদম (এক ফ্যাদম অর্থ এক বাঁও; ছয় ফুট) গভীর।

পালিবোথরা (পাটলিপুত্র, পাটনা শহরের কাছে) নগর গঙ্গা ও অন্য আর একটি নদীর সঙ্গমে অবস্থিত, এই নগর দৈর্ঘ্যে আশি ষ্ট্যাডিয়া আর প্রস্থে পনেরো ষ্ট্যাডিয়া, আকারে সমান্তরাল ক্ষেত্র, দু-পাশের দুটি করে বাহু একই মাপের প্রায়। নগরের চারদিক কাঠের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। মাঝখানে ছিদ্র, যে ফুটো দিয়ে পাঁচিলের আড়াল থেকে তীর ছোঁড়া যায় আর শহরের নিকাশী ব্যবস্থাও ওইরকম ফুটো দিয়েই বাইরে জঞ্জাল বা ময়লা জল ফেলার জন্য আছে।

প্রাচীরের বাইরে একটা পরিখা আছে, যেটা প্রতিরক্ষার জন্য আবার বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত হয়। নগরে যে সব মানুষ বাস করে তাদের প্রাসাই (Prasii) বলে, তারা অন্য সমস্ত জনজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ আর তাদের যিনি রাজা তাঁর নামের সঙ্গে পালিবোথরা-র নাম জড়িয়ে আছে, বলা হয় পলিবোথরিয়, তাঁর নামের সঙ্গে যোগ করে —যেমন রাজা সান্দ্রাকোট্টাস-এর কাছে মেগাস্থিনিস দূত হিসাবে গেছিলেন। কিন্তু নামের সঙ্গে পলিবোথরার নাম সান্দ্রাকোট্টাস-এর (চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য) সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। পার্থিয়দের ক্ষেত্রেও এরকম রীতি আছে—সবাই এখানে আরসাসেস (Arsaces) যদিও রাজাদের ব্যক্তিগত নাম আলাদা যেমন একজনের নাম ওরোডেস, অন্য একজনের নাম ফ্রাটেস, আবার অন্য কেউ আছে আলাদা নামের।

৩৭. লেখকরা সব একমত যে হাইপানিসের (বিয়াস বা বিপাশা নদী) অপর পার খুবই উর্বর অঞ্চল, যদিও আমাদের নির্দিষ্ট ধারণা নেই সে সম্পর্কে। বরং আমাদের এই না-জানা এবং অনেক দূরের বস্তুর উপস্থিতি, এদের সম্পর্কে আমাদের চমৎকৃত করে তোলে, অবিশ্বাস্য সব বর্ণনার কথা এসে পড়ে। উদাহরণ হিসাবে বলি, সোনা খুঁড়ে তোলা পিঁপড়ে কি অন্যান্য প্রাণীদের সম্পর্কে, জন্তু কি মানুষ সবার সম্পর্কে বর্ণনায় কতগুলো প্রাকৃতিক গুণাবলী পুরো পাল্টে যায়, যেমন সেরেসদের সম্পর্কে, এরা বলে দীর্ঘজীবনের অধিকারী, দুশ’ বছর পর্যন্ত বাঁচে বা তারও বেশি—তারা আরও সমস্ত গল্প বলে, যেমন বলে এখানে এক সম্ভ্রান্ত সরকারের কথা, যারা পাঁচ হাজার পর্ষদ সদস্য বা কাউন্সেলর নিয়ে গঠিত, যারা প্রত্যেকে এই সম্মলিত রাষ্ট্রপুঞ্জ বা কমনওয়েলথকে একটি করে হাতি উপহার দেন, নতুন পর্ষদ তৈরি হওয়ার সময়।

মেগাস্থিনিস বলেছেন যে প্রাসাই (Prasii) তে সবচেয়ে বড় বাঘের দেখা মেলে, যেটা এক একটা সিংহের দ্বিগুণ। এরা এতটা শক্তিশালী হয় যে, পোষা বাঘ পর্যন্ত যাদের চার-চারটে মানুষ সঙ্গে নিয়ে যায়, তারা একটা অশ্বেতর বা খচ্চরের পিছনের একটা পা কামড়ে গায়ের জোরে তার কাছে টেনে নিয়ে আসে; এখানে দীর্ঘ লাঙ্গুল বানরগুলো সবচেয়ে বড় কুকুরের থেকে আকারে বড় হয়, তাদের মুখটা কালো আর সমস্ত দেহ সাদা, আবার উল্টোটাও হয়। তাদের লেজ প্রায় দু’হাত লম্বা হয় (two Cubits), তারা কখনো ক্ষতি করে না, আর পোষ্য মানসিকতার। চুরিও করে না। বৃক্ষ থেকে নিষ্কাশিত সুগন্ধী বা লবান-এর রঙের এবং মধু অথবা ডুমুরের চেয়ে মিষ্টি স্বাদের পাথর এখানে পাওয়া যায়। দু হাত লম্বা সাপ পাওয়া যায়, যার ডানা আছে এবং বাদুড়ের মতো চামড়ার ডানা মেলে উড়তে পারে। রাত্রে তারা উড়ে বেড়ায় আর তাদের ঘাম অথবা প্রস্রাব যদি কখনো কোনো লোকের গায়ে পড়ে, যারা সুরক্ষিত নয়—তাহলে তাদের চামড়া পচে যায়। ডানাওয়ালা কাঁকড়া বিছে আছে, খুব বড় মাপের। আর আবলুস কাঠও তৈরি হয়। এখানে ভয়ংকর সব কুকুর আছে, যাদের কামড় ছাড়ানো দুঃসাধ্য, যতক্ষণ না তাদের নাকের ফুটোয় জল দেওয়া হয়, কামড়ের জোর এতটাই যে তার ফলে তাদের চোখ বিকৃত হয়ে যায়, এমনকি চোখ ঠিকরে বেরিয়ে পড়ে পর্যন্ত। এই কুকুরগুলো সিংহকে কামড়ে ধরে আর ষাঁড়কেও ছাড়ে না। শেয়ালের থেকে বড় আকৃতির এই কুকুর যখন ষাঁড়ের নাক লক্ষ্য করে কামড় বসায় তখন ষাঁড় বা বৃষ মরে যায়, কারণ কামড় ছাড়ানো যায় না।

৩৮. মেগাস্থিনিস বলেন যে পাহাড়ি অঞ্চলে সাইলাস (Silas) বলে একটি নদী আছে যেখানে কোনো বস্তু পড়লে ডুবে যায়, কোনোকিছু ভেসে থাকে না। ডেমোক্রিটাস যিনি এশিয়ার অনেক অঞ্চল ঘুরেছেন, তিনি কথাটা বিশ্বাস করেন না। এ্যারিষ্টটলও বিশ্বাস করেন না, যদিও এমন আবহাওয়া পাওয়া যায় যেখানে হাওয়া একটা হাল্কা যে কোনো পাখাযুক্ত বা ডানাওয়ালা প্রাণী সেখানে উড়তে পারে না। তাছাড়া একধরনের বাষ্প এখানে আকাশে ঘুরে বেড়ায়, কোনো পক্ষী উড়লেই তাকে টেনে নেয় আর ডুবিয়ে দেয়, যেমন লোহা আর চুম্বকের সম্পর্ক, যেমন তুষ আর অ্যামবারের আকর্ষণ। হতে পারে যে এই জলের তেমন কোনো আকর্ষণ ক্ষমতা আছে। এখন, এই বিষয় পদার্থবিদ্যার আলোচনার বস্তু এবং ভাসমান বস্তুর প্রকৃতি বিষয়ক ভাবনা, কিন্তু আমি এখানে ভৌগলিক বিষয় ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে আলোচনা করছি না, যে সমস্ত বিষয় ভূগোলের কাছাকাছি বড়জোর সেই সব ব্যাপার ছাড়া।

৩৯. তিনি বলেছেন, ভারতীয়রা সাতটি জাতে (Castes) বিভক্ত। প্রথম জাত সবচেয়ে বেশি সম্মানীয়, সংখ্যায় অল্প, তাদের মধ্যে দার্শনিকরা আছেন। এই দার্শনিকরা (পূজারী) প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে মানুষদের পূজাপাঠ আর মৃত মানুষের প্রতি আহ্বান করার ক্ষেত্রে কাজে লাগেন, আর রাজা এদের সবাইকে একসঙ্গে ডেকে নিয়ে মহাসম্মেলন করেন বছরের শুরুতে। তখন তারা রাজার কাছে তাদের ভবিষ্যদ্বাণী জানায়, কেমন ফলমূল জন্মাবে, রাজ্য কেমন চলবে—তাদের মঙ্গল-অমঙ্গল সম্পর্কে। এই ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষেত্রে যাদের তিনবার ভুল হয় তারা সারাজীবন মৌনব্রত অবলম্বন করেন, আর যারা ঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করে তাদের সমস্ত রাজকর আর রাজন্যকুলকে প্রদেয় উপঢৌকন থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

৪০. দ্বিতীয় শ্রেণি হচ্ছে কৃষক। এরা সংখ্যায় অনেক আর খুবই সম্মানিত মানুষ। কারণ তারা সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত হয় না, আর এদের ব্যক্তি-স্বাধীনতা আছে চাষবাসের ক্ষেত্রে। তারা কখনো নগরে যায় না, নগর আক্রান্ত হলেও নয় অথবা অন্য কোনো কাজেও নয়। প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটে যে সেনাবাহিনী দেশের হয়ে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করছে আর কৃষক দেশের মানুষকে খাদ্য সরবরাহ করার জন্য চাষ করা যাচ্ছে, দেশের সেনাবাহিনী যুদ্ধ করার সঙ্গে এই কৃষকদেরও রক্ষা করছে। দেশটা পুরোপুরি রাজার, কিন্তু কৃষক এই জমি ভাড়া নিয়ে চাষ করে আর ফসলের এক-চতুর্থাংশ রাজাকে দিয়ে থাকে।

৪১. পশুপালক বা রাখাল এবং শিকারীরা হলো তৃতীয় শ্রেণি বা জাতি। এদের অনুমতি আছে পশুপাখি শিকারের, গবাদি পশু পালনের এবং যে সমস্ত পালিত পশু আর কোনো উৎপাদনের কাজে লাগে না তাদের বিক্রি করে দেওয়ার; আর কৃষিজমিকে বন্যজন্তু থেকে মুক্ত করার জন্য, শস্যবীজ খেয়ে ফেলে যে সব পাখি তাদের থেকেও মুক্ত করার জন্য এরা রাজার কাছ থেকে শস্যের একটা অংশ পেয়ে থাকে। এদের জীবন ঘুরে ফিরে বেড়ানোর, আর তাঁবুতে থাকতে এরা অভ্যস্থ। ব্যক্তিগতভাবে কোনো মানুষ ঘোড়া অথবা হাতি রাখতে পারে না, এই অধিকার শুধু রাজার। তার জন্য লোকজনেরও ব্যবস্থা আছে।

৪২. হাতি ধরার পদ্ধতি এইরকম বৃক্ষহীন এক বনপথে তারা চার থেকে পাঁচ ষ্ট্যাডিয়ার একটা গর্ত গোল করে কাটে, আর সেখানে পৌঁছবার জন্য একটা সরু সেতু তৈরি করে রাখে। সেই সেতু পেরিয়ে তাদের সবচেয়ে শান্ত আর পোষা মেয়ে হাতি বা হস্তিনী গোটা তিন-চার ওই গর্তে প্রবেশ করে, আর শিকারির দল গুপ্তকুটীরে লুকিয়ে অপেক্ষা করে। দিনের বেলায় বুনো হাতি আসে না, কিন্তু রাত হলে এক এক করে সেতু পেরিয়ে গর্তে ঢোকে। বুনো হাতি ঢোকার পর, ঢোকার রাস্তা গোপনে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর পোষা হাতিদের মধ্যে যেটা সবচেয়ে সাহসী সেটা লড়াই শুরু করে, আর বন্যহাতিগুলো খাবারের অভাবে ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্বল হয়ে গেলে পোষা হাতির মাহুতরা সতর্কভাবে মাটিতে নেমে তাদের হাতিগুলোর পেটের তলায় আশ্রয় নেয়, তারপর সেখান থেকে বুনো হাতির পেটের নিচে গিয়ে তার পা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। বাঁধা হয়ে গেলে তারা পোষা হাতিদের দিয়ে লড়াই শুরু করে যতক্ষণ পা-বাঁধা বুনো হাতিগুলো মাটিতে পড়ে না যায়। মাটিতে পড়ে গেলে তখন মাহুতরা বুনোহাতির গলায় একটা ষাঁড়ের কাঁচা চামড়া থেকে তৈরি ফাঁস লাগিয়ে সেটা পোষা হাতির গলার সঙ্গে জুড়ে দেয়। এখন ফাঁস লাগানোর সময় বুনো হাতিরা মাথা ঝাঁকিয়ে মাহুতকে পিঠ থেকে ফেলে দিতে চাইতো। তাই সে কাজ যাতে না করতে পারে, তার জন্য একটা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তারা বুনো হাতির গলায় অল্প করে কেটে দেয় আর তার উপর দিয়ে ষাঁড়ের চামড়ার দড়িটা যায়। ফলে মাথা নাড়লে যন্ত্রণা হয়, তাই হাতিগুলো মাথা নাড়তে পারে না। এবার বুড়ো আর বাচ্চা হাতিদের বাদ দেওয়া হয়, বাকি সমস্ত হাতি একটার সঙ্গে আরেকটা বেঁধে একটা বড় স্তম্ভের সঙ্গে তাদের বাঁধা হয় বড় খোলা জায়গায়, খেতে না দিয়ে জন্তুগুলোকে প্রথমে কাবু করা হয়, পরে কাঁচা আখ আর ঘাস দেওয়া হয় খাওয়ার জন্য।

এর পরে শুরু হয় তাদের পোষ মানাবার পালা। কোনো কোনো হাতিকে কথা বলে, কাউকে আবার ঢাক-ঢোল আর কর্ত্তাল বাজিয়ে, সুর শুনিয়ে বশ করতে হয়। পোষ মানে না এমন হাতির সংখ্যা খুব কম, কারণ হাতি সাধারণত একটা শিষ্ট জন্তু, এবং বুদ্ধিমানও বটে। রণহস্তী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আহত যোদ্ধা, যে তার পিঠে চড়ে যুদ্ধ করতে করতে আহত হয়েছে, অথবা অধিক রক্তপাতে অবসন্ন হয়ে পিঠ থেকে পড়ে গেছে তাদের নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যায়। যদি কোনো লোক আশ্রয় চায়, তাকেও উদ্ধার করে তার চারটে পায়ের মাঝে আশ্রয় দেয়। যদি কখনো রাগের বশে সে তার মালিক অথবা যে তাকে খাবার দেয়, তাদের কারোকে মেরে ফেলে, তাহলে পরে অনুতাপে সে খাবার খাওয়া ছেড়ে দেয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে না খেয়ে মারা যায়।

৪৩. তাদের মিলনের পদ্ধতি আর সন্তান প্রসবের বিষয় ঘোড়াদের সঙ্গে মেলে, অধিকাংশই বসন্তকালে ঘটে। পুরুষ হাতি যখন মিলনের সময় হয়, তখন উন্মত্ত আর ভয়ংকর হিংস্র হয়ে ওঠে, তখন সে তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের যে ছিদ্র সেখান থেকে একধরনের মদস্রাব হয়, এই ছিদ্র তার কপালে রগের পাশে হয়। আর স্ত্রী-হাতির ক্ষেত্রেও মিলনের সময় ওই রস নির্গত হয়। তাদের সন্তান ধারণের সময় ষোলো মাস থেকে আঠারো মাস, আর মায়েরা ছয় বছর ধরে সন্তানদের দেখাশোনা করে। দীর্ঘ আয়ুবিশিষ্ট মানুষের মতই তারা বাঁচে, যদিও কেউ কেউ দুইশত বছর বাঁচে; অবশ্য হাতিদের অনেক অসুখ আছে, সেসব অসুখের কবল থেকে বাঁচা মুশকিল। গরুর দুধ দিয়ে স্নান করিয়ে তাদের চোখের অসুখ সারানো হয়। কিন্তু অধিকাংশ অসুখের ক্ষেত্রে তাদের গাঢ়বর্ণের আসব পান করানো হয়, আর ক্ষতস্থানে মাখন, গলানো অবস্থায় ব্যবহার করা হয় (কারণ তার ফলে লোহার কুচি বেরিয়ে যায়), আর ঘা হলে শূকরের মাংস কাজে লাগে, দেওয়া হয় সেখানে। ওয়ানসাইক্রিটাস বলেছেন যে হাতি তিনশ বছর পর্যন্ত বাঁচে, ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে পাঁচশ বছর; যখন তাদের বয়স দুশ বছর হয়, তখন সে সবথেকে পরাক্রমশালী হয়। হস্তিনীরা দশ বছর ধরে গর্ভধারণ করে। তিনি এবং আরও সবাই বলেছেন যে ভারতীয় হাতি লিবিয়ার হাতির চেয়ে শক্তিশালী, আকারেও বড়। পিছনের দু’পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে তারা দুর্গের প্রাচীর ভেঙে ফেলতে পারে, আর শুঁড় দিয়ে মূলশুদ্ধ গাছ তুলে ফেলতে পারে। নিয়েরকাস বলেছেন যে যেখানে চলার পথ এসে মিশেছে সেই পথের উপর ফাঁদ পেতেও বুনো হাতি ধরা হয়, তাদের সেখানে তাড়িয়ে আনতে পোষা হাতি ব্যবহার করা হয়, মাহুত এই কাজ করে, পোষা হাতিগুলো খুব শক্তিশালী আর হাতি পোষ মানানো খুব সোজা। পোষ মানা হাতিকে শিক্ষা দেওয়া হয় পাথর ছুঁড়তে অব্যর্থ লক্ষ্যে আর তারা অসাধারণ সাঁতার কাটতে পারে। যদি কোনো রথ হাতি টেনে নিয়ে যায়, তবে রথের মালিক খুব সম্মানিত মানুষ হিসাবে গণ্য হন। হাতিকে সেখানে জোয়াল বা লাগাম ছাড়া উটের মতো ব্যবহার করা হয়। কোনো মহিলা যদি তার প্রেমিকের কাছ থেকে হাতি উপহার হিসাবে পায় তাহলে সেটি খুবই সম্মানের উপহার। কিন্তু এই বক্তব্য তাঁদের কথার সঙ্গে মেলে না। তাঁরা বলেন যে ঘোড়া অথবা হাতি শুধুমাত্র রাজার সম্পত্তি।

৪৪. নিয়েরকাস বলেন মিরমেকিস (Myrmekes) বা সোনা সংগ্রহকারী পিঁপড়েদের চামড়া চিতাবাঘের মতো হয়। কিন্তু মেগাস্থিনিস এই পিঁপড়ে সম্পর্কে যা বলেছেন সেটা এইরকম—দর্দ (Derdae) বলে একটি বড় জনজাতি পূর্বদিকে আর পাহাড়ী অঞ্চলে থাকে, এরা ভারতীয় জনজাতি। এখানে প্রায় তিন হাজার ষ্ট্যাডিয়া পরিধির এক মালভূমি বা অধিত্যকা আছে, তার নিচে সোনার খনির অবস্থান। যেখানে ‘খনিশ্রমিক’ বা ‘খনিমালিক’ এই পিঁপড়ের দল যারা শেয়ালের থেকে ছোট তো নয়ই, আর অত্যন্ত দ্রুতগামী। তারা যে শিকারগুলো ধরে তাই খেয়ে বেঁচে থাকে। শীতকালে তারা গর্ত খোঁড়ে আর গর্তের খোঁড়া মাটি গর্তের মুখে জমিয়ে রাখে, অনেকটা গন্ধমূষিক বা ছুঁচোর মতো। সোনার গুঁড়ো কিন্তু একটু পরিশুদ্ধ করে নিতে হয়। এই অঞ্চলের মানুষরা তখন খুব সতর্কভাবে মালবাহক পশুদের (এক্ষেত্রে গাধা, পক্ষান্তরে উট) নিয়ে অগ্রসর হয়, কারণ যদি তারা অসতর্ক হয়ে প্রকাশ্যে যায় তাহলে পিঁপড়ের দল তাদের বাধা দেবে, শুধু তাই নয় তাদের তাড়া করে ধরবে আর মানুষ এবং মালবাহক পশু উভয়কে মেরে ফেলবে, তাই পিঁপড়েদের আকর্ষণ অন্য দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা বুনো জানোয়ারের মাংসের টুকরো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রাখে আর পিঁপড়েরা যখন সেই মাংস খেতে যায়, তখন গর্তের মুখ থেকে তারা সোনার গুঁড়ো নিয়ে পালায়। যদিও সোনা পরিশুদ্ধ করার পদ্ধতি জানা না থাকার ফলে তারা যে দাম পায়, সে দামেই বণিকদের কাছে সেই সোনার গুঁড়ো বেচে দেয়।

৪৫. এই পর্যন্ত আমি বলেছি শিকারী আর বন্যপশুদের নিয়ে মেগাস্থিনিস এবং অন্যান্যরা যা মতামত দিয়েছেন, তার সবটুকু। আমি নিম্নবর্ণিত অংশটুকুও বলবো: নিয়েরকাস এই অধিক সংখ্যার সরীসৃপ আর তাদের ভয়ংকর আচরণ দেখে বিস্মিত হয়েছেন, বলেছেন মহাপ্লাবনের সময় তারা এমন জায়গায় ছিল যেখানে প্লাবনের জল প্রবেশ করেনি, আর সেখানে সমস্ত বাড়ির মধ্যে ঢুকে তারা আস্তানা গেড়েছিল। তখন সেই সব বাড়ির অধিবাসিরা ঘরের উপরে অথবা প্রয়োজনে ঘর ছেড়ে অন্য বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। তবে যদি এই সাপ-খোপদের বা অন্যান্য সরীসৃপদের জলে ডুবে যা মহাপ্লাবনে মৃত্যু না হতো তাহলে পৃথিবী জনশূন্য হয়ে যেতো। ফলে অনেক সরীসৃপ জলে ডুবে মারা গেছে, এটাই ধারণা। এদের মধ্যে যারা ক্ষুদ্রাকৃতি তাদের দেখে শুনে ঠিকঠাক আটকানো কঠিন, আর যারা বিশালাকার যেমন প্রায় ষোলো কিউবিট লম্বা সাপ, তাদেরও আটকানো মুশকিল কারণ তাদের শক্তি, প্রবল শক্তিধর এই সব সরীসৃপ। যাদুকরেরা ঘুরে বেড়ায়, মানুষের ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার জন্য। এটাই বোধহয় একমাত্র ওষুধের প্রয়োগ—কারণ সাদাসিধা খাবার জন্য আর মদ না খাবার জন্য তাদের অসুখবিসুখ করে না, তারা সুস্থ থাকে। এতদসত্ত্বেও যদি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন জ্ঞানী মানুষরা তাদের নীরোগ করে তোলে।

কিন্তু অ্যারিষ্টবুলাসের বক্তব্য হল, তিনি সেইসব অতিকায় জন্তুদের একটিকেও দেখেননি, যাদের গল্প বলা হয়। শুধু একটি সাপ ছাড়া, যেটা নয় কিউবিট আর এক স্প্যান (১৪ ফুট ৪ ইঞ্চি, বাইবেলের হিসাবে) লম্বা। আর আমি নিজে মিশরে একটা সাপ দেখেছি, এতটাই বড়, সেটা ভারত থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁর মতে আরও অনেক সরীসৃপ ছোটো বড়ো পাওয়া যায়। বড়ো আকারের বৃশ্চিক, সাপ—কিন্তু ন’ ইঞ্চি মাপের (১স্প্যাম) ছোটো সাপ যারা তাঁবুর মধ্যে, ঘড়া বা কলসের মধ্যে, অথবা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, যারা একবার কামড়ালে আর রক্ষা নেই, প্রতি রোমকূপ দিয়ে রক্ত নির্গত হয় আর চিকিৎসা না পেলে কিছু সময় পরে লোকটা মারা যায়। যদিও এই চিকিৎসা পাওয়া কঠিন নয়, ভারতীয় গাছের শিকড় আর ওষধি দ্রুত পাওয়া যায়। তিনি এছাড়া বলেছেন যে কুমীর সিন্ধুনদে বাস করে বটে কিন্তু সংখ্যায় অগুনতি নয়, মানুষের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকারকও নয় আর অন্য যে সব প্রাণী এখানে দেখা যায়, সেগুলো নীল নদেও পাওয়া যায়, শুধু জলহস্তী ছাড়া, যেটা একমাত্র নীলনদেই পাওয়া যায়। ওয়ানসাইক্রিটাস অবশ্য বলেন যে হিপোপটেমাস এদেশেও পাওয়া যায়। অ্যারিষ্টবুলাসের মতে নীল নদীতে কুমীর থাকার ফলে মাত্র কয়েকটা মাছ ছাড়া অন্য মাছ নীলনদে সমুদ্র থেকে আসে না, ত্রিষা, সেসট্রিউস আর ডলফিন ছাড়া, কিন্তু সিন্ধুনদে প্রচুর মাছ থাকে। কিন্তু কেরিডস বা চিংড়িগোছের মাছ একটু বিশেষরকম, ছোট মাছ সাঁতার কেটে সিন্ধুনদ ধরে পাহাড়ের কাছে চলে যায়, তবে বড়ো মাছগুলো এ্যাসেসিন্স (চন্দ্রভাগা নদী) আর সিন্ধুনদের মিলনস্থলের মুখ পর্যন্ত আসে। এখন পর্যন্ত সমস্ত বন্য জীব, জন্তু এবং মাছ নিয়ে বললাম, এখন মেগাস্থিনিসের বিবরণে ফিরে যাব, যেখানে শেষ করেছিলাম, তার পরের অংশে।

৪৬. শিকারী আর পশুপালকদের পর চতুর্থ জাতি হলো কারিগর, ব্যবসায়ী আর শ্রমিকের দল; এদের মধ্যে কেউ কেউ রাষ্ট্রকে কর প্রদান করে আর শ্রমদান করে। কিন্তু অস্ত্র নির্মাতারা বা জাহাজ প্রস্তুতকারকরা রাজার কাছ থেকে পারিশ্রমিক পায়, খাদ্য ও জীবনধারণের রসদ পায়, কারণ শুধু রাজার জন্যই তারা কাজ করে। সেনাপতি, অধীনস্থ সেনাদের অস্ত্র দেয় আর নৌসেনাপতি জাহাজ ভাড়া দেয়, যারা নাবিক আর বণিক তাদের।

৪৭. পঞ্চম জাতি হলো যোদ্ধা, যারা যুদ্ধ না হলে একেবারেই অলস জীবনযাপন করে। রাজকোষের অর্থে মদ্যপান করে, আর যখন যুদ্ধের জন্য ডাক পড়ে বা অন্য কাজে তখন দ্রুত সেখানে পৌঁছে যায় কারণ নিজের শরীরটুকু ছাড়া আর কিছুই তাদের বহন করতে হয় না।

৪৮. ছয় নম্বরে আছে পরিদর্শক (বা অন্যত্র বলা আছে গুপ্তচর) যারা ঘুরে ঘুরে সমস্ত পরিদর্শন করে আর রাজাকে গোপনে সব জানায়। তারা একাজে নগরের বারাঙ্গনাদের ব্যবহার করে—নগরের পরিদর্শক নগরীর বারাঙ্গনাকে এবং ছাউনিতে সেখানকার বারবণিতাদের ব্যবহার করে ছাউনি বা শিবিরের পরিদর্শক। এদের বলে এফোরই (Ephoroi)।

৪৯. সাত নম্বর জাত হলো উপদেষ্টা আর বিচার ব্যবস্থা ও কর নির্ধারণের সঙ্গে জড়িত লোকজন, সমস্ত প্রশাসন যারা দেখাশোনা করে। একজন মানুষ অন্যজাতের স্ত্রী-কে বিবাহ করা বেআইনি, একজন যে কাজ করে অন্য লোকের সে কাজ করা আইনবিরুদ্ধ। একজন মানুষ বিভিন্ন কাজও করতে পারে না, যদি না সে একজন ‘জ্ঞানী মানুষ’ (Philosopher) হয়, কারণ মেগাস্থিনিস বলেছেন জ্ঞানী মানুষরা যে কোনো কাজ করতে পারে, কারণ তাঁরা শ্রেষ্ঠ।

৫০. সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের মধ্যে বাজার কর্মকর্তা ছিলেন কয়েকজন, অন্যরা শহরের আধিকারিক হিসাবে দেখভাল করতেন। দুজনকেই কমিশনার বলা যায়। তৃতীয় দল সৈন্যদের দেখাশোনা করতো। প্রথম দলের কাজ হলো নদীকে ভাল করে রাখা, দেখভাল করা আর জমির মাপ নেওয়া। এ কাজ তাদের বারবার করতে হয়। মিশরে যেমন এরা বদ্ধ খালগুলো পরিদর্শন করে, যেখান থেকে পয়ঃপ্রণালী ধরে জল যায়, যেন প্রত্যেকে সমান পরিমাণ জল পায়। এই কর্মচারীরা শিকারীদেরও লক্ষ্য রাখে এবং তাদের কাজ অনুযায়ী পুরষ্কার আর দণ্ড প্রদান করে। তারা কর আদায় করে আর জমির সঙ্গে যুক্ত পেশা সম্বন্ধে দেখাশোনা করে, যেমন কাঠুরে, ছুতোর; কাঁসার কারিগর বা খনির কর্মীদের—এছাড়া তারা রাস্তা তৈরি করে আর প্রতি দশ ষ্ট্যাডিয়া অন্তর রাস্তার ধারে একটা করে স্তম্ভ বসায়, যেটাতে বিভিন্ন স্থানের দূরত্ব লেখা থাকে আর পার্শ্বসড়ক বা ‘বাই-রোডের’ নির্দেশ দেওয়া থাকে।

৫১. শহর বা নগর কর্মাধক্ষ্যরা (পক্ষান্তরে City Comissioners) ছয় ভাগে বিভক্ত, প্রতি ভাগে পাঁচজন করে থাকে। এক ভাগ (group) নজর রাখে হস্তশিল্পের সৌন্দর্য্য আর মান-এর উপর। দ্বিতীয় ভাগের লোকেরা নগরে যে সমস্ত অচেনা, অজানা অতিথি আসে তাদের দেখাশোনা করে, বিলাসব্যসনের ব্যবস্থা করে, থাকার ব্যবস্থা করে দেয়, আর তাদের পাহারা দিয়ে নগরের সীমানা পার করে দিয়ে আসে। যদি কোনো বিদেশী বা অপরিচিত ব্যক্তির মৃত্যু হয়, তাহলে তারা মৃতের সম্পত্তি তার আত্মীয় পরিজনদের দেওয়ার ব্যবস্থা করে; অসুস্থ অবস্থায় অতিথির দেখাশোনা করে আর মারা গেলে তার সৎকার করে। তৃতীয় ভাগের লোকেরা নাগরিকদের জন্ম আর মৃত্যুর খোঁজ রাখে, কারণ কর ব্যবস্থা তার উপর নির্ভর করে ওঠানামা করে, আর জন্মমৃত্যুর ক্ষেত্রে মানুষদের সম্পর্কে ভালো-মন্দ সবই তারা জেনে রাখে।

চতুর্থ শ্রেণি বিক্রিবাটা এবং বিনিময় প্রথার দেখাশোনা করে, তারা সমস্ত মাপ এবং ঋতু অনুযায়ী ফলমূল ও অন্যান্য বেচাকেনার দেখাশোনা করে, আর সবটাই হয় ছাপ (stamp) মেরে। একই মানুষ একাধিক জিনিসপত্রের বা পণ্যের ব্যবসা করতে পারে না, যদি না সে দ্বিগুণ কর দেয়।

পঞ্চম শ্রেণি, কারিগরদের কাজকর্ম আর বিক্রির ব্যাপারে দেখাশোনা করে। পাকা নিয়মের বিক্রি (by stamp)—নতুন আর পুরোনো জিনিস আলাদা আলাদা বিক্রি হয়, যদি কেউ ঐ দুই বস্তু মিশিয়ে দেয়, তাহলে তার অর্থদণ্ড হবেই। ষষ্ঠ দল লক্ষ্য রাখে জিনিসপত্র বিক্রির দিকে, যা বিক্রির অর্থ হবে, তার দশভাগের একভাগ এরা সংগ্রহ করে, যদি কেউ ফাঁকি দেয় বা চুরি করে তাহলে তার সাজা হয়—মৃত্যুদণ্ড! এই সমস্ত বিশেষ কাজ এই সব দল করে থাকে, কিন্তু যৌথভাবে এরা যতো ব্যক্তির বা সরকারের কাজ দেখাশোনা করে; প্রাচীর, বাজার, বন্দর আর মন্দিরের সারাই আর দেখভাল করে থাকে।

৫২. নগরের কর্মাধ্যক্ষদের পরে তৃতীয় আর একটা দল আছে, যারা প্রশাসনিক ব্যবস্থা দেখে; তারা মূলতঃ সেনাবাহিনীর দিকে নজর রাখে। তাদেরও ছ’টা ভাগ, প্রতি ভাগে পাঁচজন করে লোক থাকে। এঁদের মধ্যে একজন নৌ-সেনাপতি সঙ্গে থাকেন। অন্যজন বলদ বা ষাঁড়ের বাহিনীর সঙ্গে থাকে যারা যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র, জিনিসপত্র এবং খাদ্য—মানুষের এবং ঘোড়া বা অন্যান্য ভারবাহী পশুদের, বয়ে নিয়ে যায়। এই কমিশনাররা লক্ষ্য রাখে, বাদ্য বাজায় যারা তাদের প্রতি—যারা ঢাক বা ঢোল বাজায় আর বড়ো কর্ত্তাল বাজায় তাদের উপর, আর যারা সহিস, অশ্বপাল, যন্ত্রনির্মানে বিশেষজ্ঞ ও তাদের সহকারীদের উপর। পশুখাদ্যের জন্য বিশেষতঃ ঘাসের জন্য তারা সেই লোকজন ঘণ্টাধ্বনি শুনে লোক পাঠায়, আর দ্রুত কাজ করার জন্য সেই লোকজন পুরস্কার পায়, দেরি হলে শাস্তি প্রদান করা হয়। তাহলে, তৃতীয় দল পদাতিক বাহিনীর বিষয় দেখাশোনা করে, চতুর্থ দল ঘোড়াগুলোকে দেখাশোনা করে, পঞ্চম দল রথ আর ষষ্ঠ দল হাতিদের দেখভাল করে। ঘোড়া আর হাতির জন্য রাজার নিজস্ব হাতিশাল আর ঘোড়াশাল; অন্যান্য জন্তুদের জন্য সেইরকম আস্তাবল আছে, যেখানে জন্তুগুলো বাঁধা থাকে না। রথ টেনে নিয়ে যায় বলদ, কিন্তু ঘোড়া নিয়ন্ত্রিত হয় বলগা দ্বারা, যার ফলে তাদের পা যেন ঘর্ষণে আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, ফুলে না ওঠে; তাদের মানসিক স্থিতি ভেঙ্গে না পড়ে রথ টানার সময়। একটা রথে দু’জন যোদ্ধা থাকে, রথচালক ছাড়া, আর হাতির পিঠে চারজন সওয়ার হতে পারে, মাহুত আর তিনজন তীরন্দাজ, এই তিনজনে মিলে তীর নিক্ষেপ করে শত্রুর প্রতি।

৫৩. যখন কোনো অভিযানে বা যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকে তখন ভারতীয়রা অত্যন্ত সংযত থাকে, খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রে বা হই-হট্টগোল করার ক্ষেত্রে, সাধারণভাবে ভারতীয়রা অনুশাসন মেনে সংযমী জীবন যাপন করে। আর ভারতীয়দের সবচেয়ে বড়ো গুণ হলো আত্মসংযম। মেগাস্থিনিস যখন সান্দ্রাকোট্টাসের (চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের) শিবিরে ছিলেন তখন চল্লিশ হাজার সেনা সেখানে ছিল (মতান্তরে চার লক্ষ সৈন্য), কিন্তু তিনি একবারের জন্যও একটি চুরির ঘটনার কথা শোনেননি, যেখানে দু-হাজার ড্রাকমা-র (গ্রীকদের প্রাচীন রৌপ্যমুদ্রা, বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মূল্য) বেশি চুরি গেছে। খেয়াল করতে হবে যে এদের কোনো লিখিত আইন নেই, পড়তে জানে না, শুধুমাত্র স্মৃতির উপর নির্ভর করে চলে—কিন্তু তা সত্ত্বেও এরা সুখে জীবননির্বাহ করে, সমস্ত ভালমন্দ ওই আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, কারণ এদের সরল এবং মিতব্যয়ী জীবনচর্চার জন্য। পশুবলির সময় ছাড়া এরা মদ্যপান করে না, কিন্তু বার্লির বদলে ভাত দিয়ে তারা একটা তরল পদার্থ তৈরি করে সেবন করে। তাদের খাবারের অধিকাংশ ভাতের মণ্ড থেকে হয়। তাদের সরল জীবনযাত্রার একটা প্রতীক হলো মামলা বা বিচারে তাদের অনাগ্রহ, তাদের আইন বা তাদের কথার দাম, তাদের ধার দেওয়া বা নেওয়া সবই বোঝাপড়ার উপর বেশি নির্ভর করে, সাক্ষীসাবুদ বা লিখিত চুক্তির তুলনায়; কারণ এরা মামলা পছন্দ করে না। বাড়িঘর মোটামুটি খুলে রেখেই তারা বের হয়, কোনো সুরক্ষার ব্যবস্থা না রেখে। এই সমস্ত ব্যাপার সভ্যসমাজের প্রমাণ বটে। কিন্তু একা একা খাদ্যগ্রহণ করা অথবা প্রত্যেকের নিজস্ব সময় অনুযায়ী রাতের খাবার আর প্রাতরাশ সারার বিষয়টা ঠিক নয়। সামাজিক জীবনে এর বিপরীত নিয়মটাই ভাল ও গ্রহণযোগ্য।

৫৪. ব্যায়ামের ক্ষেত্রে, এরা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গমর্দন পদ্ধতি পছন্দ করে, আর আবলুস কাঠের দণ্ড দিয়ে শরীর মর্দন করা এদের নিয়ম। এদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া খুব আড়ম্বরহীন সাদাসিধে, আর সমাধিস্তূপটিও নেহাত ছোটোখাট হয়। কিন্তু এই সরল, আড়ম্বরহীন জীবনযাপনের পাশাপাশি তারা কিন্তু নিজেদের সুন্দর করে সাজাতে ভালবাসে—তাদের জামাকাপড়ে সোনার সুতো দিয়ে এমব্রয়ডারি করা থাকে, দামী-পাথর বসানো গয়না পরে, সুন্দর ফুলের ছাপওয়ালা পোশাক পরে আর তাদের সঙ্গে মাথায় ছাতা ধরে লোক যায়, কারণ সৌন্দর্য্য তাদের অত্যন্ত প্রিয় বস্তু, সুতরাং দেখতে যেন সুন্দর লাগে সেদিকে তারা খুবই দৃষ্টি দেয়। সৎমানুষ আর গুণবান মানুষকে তারা শ্রদ্ধা করে, শুধু বয়স্ক মানুষ হলেই শ্রদ্ধার পাত্র হয় না। যাকে শ্রদ্ধা করে তাকে জ্ঞানী হতে হয়। তারা বহুবিবাহ করে, একজনের অনেক স্ত্রী হয়, তারা স্ত্রী ক্রয় করে, একটি করে বলদের হাল দেয় বিনিময়ে। কয়েকটা স্ত্রী তাদের কথা শোনার জন্য, কাজকর্ম করার জন্য তারা বিয়ে করে, বাকিদের সঙ্গে আনন্দ করার জন্য আর বহু সন্তান উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করে। তবে স্বামী যদি তাদের ‘সতী’ বা ‘পবিত্র’ থাকতে জোর না করে, তারা বহুগামিনী বা কার্যত বারবণিতা হয়ে ওঠে। কেউ মালপরিহিত হয়ে তর্পণ বা বলিদান করে না। তারা বলিদানের সময় শিকারের গলা বিচ্ছিন্ন করে না বা কাটে না, কিন্তু কণ্ঠরোধ করে মারে, কারণ তারা বিশ্বাস করে যে গোটা শরীরটা অক্ষত রেখে তাহলে দেবতাকে অর্পণ করা যায়, শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করে নয়। যদি কেউ মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করে তবে তার হাত আর পা কেটে নেওয়া হয়, আর যদি কেউ কারো অঙ্গহানি করে, তবে তারও সেই অঙ্গ কেটে দেওয়া হয়, এটা শাস্তি; আর যদি সে কোনো শিল্পী বা কারিগরের হাত অথবা চোখের ক্ষতি করে, যার ফলে তাকে হাত অথবা চোখ হারাতে হয়, তাহলে যে ক্ষতি করে তার মৃত্যুর শাস্তিবিধান করা হয়। যদিও মেগাস্থিনিস বলেছেন যে ভারতীয়রা ‘দাস’ ব্যবহার করে না, কিন্তু ওয়ানসাইক্রিটাস বলেন যে মিউজিকেনাসে দাসত্বপ্রথা খুব অদ্ভুত এবং আশ্চর্যের এবং ভারতীয়রা কত সাফল্য লাভ করেছে এই বিষয়ে। দেশের অন্যান্য সফলতার প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি এখানকার সুন্দর আইনের শাসনের কথা বলেছেন।

৫৫. রাজার মন্ত্রী, অমাত্য এবং লোকজনদের দেখাশোনা করে মহিলারা, এই মেয়েদের কেনা হয় তাদের পিতার কাছ থেকে, রাজা বা অন্যান্য রাজার ঘনিষ্ঠ লোকজনদের পাহারাদার এবং সৈন্যরা সব ঘরের বাইরে থাকে। একজন মহিলা রাজাকে হত্যা করেছিল, যখন রাজা মদ্যপান করছিল। তার পুরস্কার হিসাবে সে পরবর্তী রাজার সঙ্গিনী বা স্ত্রীর মর্যাদা লাভ করে, এদের সন্তান সিংহাসনের দাবীদার হয়ে ওঠে-ভবিষ্যতে। রাজা দিনের বেলা ঘুমোয় না, এমনকি রাতেও তাকে বিছানা পাল্টে পাল্টে, একঘর থেকে অন্যঘরে গিয়ে ঘুমোতে হয়, তাঁর বিরুদ্ধে গুপ্ত ষড়যন্ত্রের কারণে। সেনা পরিবৃত না হয়ে যখন রাজা তাঁর প্রাসাদ থেকে নির্গত হন, তার প্রথম কারণ হলো তাঁর ‘আদালত’ যেখানে তিনি সারাদিন ধরে ‘মকদ্দমা’ শোনেন, এমনকি যখন তাঁর শারীরিক পরিচর্যার সময় হয়, তখনও তিনি সেই পরিচর্যা গ্রহণ করতে করতে দু-পক্ষের বক্তব্য শোনেন। তখন চারজন লোক তাঁর চারদিক ঘিরে দাঁড়িয়ে কাঠের দণ্ড দিয়ে শরীর মালিশ করে দেয়; তিনি মকদ্দমা শুনে যান। দ্বিতীয় ঘটনা হলো বলি দেবার সময় বা দেবতাকে কোনো মহার্ঘ বস্তু উৎসর্গ করার সময়। আর তৃতীয় সময় হলো যখন রাজা শিকার বা মৃগয়াতে বের হন। তখন তিনি মহিলা পরিবৃত হয়ে থাকেন। যেন ব্যাকাসের অর্থাৎ গ্রীকদের সুর আর আসবের দেবতা, ইন্দ্রিয়পরায়ণ দেবতার মৃগয়া যাত্রা। মহিলাবাহিনীর পরে থাকে বর্শা হাতে লোকজন; সমস্ত রাস্তা ঘেরা থাকে দড়ি দিয়ে। যে পথে রাজা এই বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন। সেই বেষ্টিত অঞ্চলের মধ্যে যদি কোনো পুরুষ বা মহিলা ঢুকে পড়ে, তাহলে তার মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত। রাজার সামনে ঢাক আর কাঁসর বাজাতে বাজাতে লোকজন যায়। ওই বেষ্টনীর মধ্যে একটি উঁচু আসন থেকে তিনি তীর ছুঁড়ে শিকার করেন, দু’জন বা তিনজন সশস্ত্র মেয়ে তখন তাঁর কাছে থাকে। যখন আবার তিনি উন্মুক্ত বা খোলা জায়গায় শিকারে যান, তখন তিনি একটা হাতির উপর থেকে তীর ছোঁড়েন এবং মহিলারা এক ভাগ রথে, এক অংশ ঘোড়ার উপর, অন্য অংশ হাতিতে চড়ে তাঁর সঙ্গে যায়। তারা যেভাবে অস্ত্র নিয়ে শিকারে যায়, মনে হয় যেন পুরুষদের সাথে সব অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তারা যুদ্ধে চলেছে।

৫৬. এখন এই সব রীতিনীতি বা নিয়মকানুন আমাদের কাছে খুবই নতুন মনে হয়, আমাদের নিয়মনীতির তুলনায়—কিন্তু নিম্নেবর্ণিত সব কিছু যেন আরও অভিনব, অদৃষ্টপূর্ব। যেমন মেগাস্থিনিস বলেছেন যে ককেশাস পর্বতের অধিবাসিরা মেয়েদের সঙ্গে উন্মুক্ত স্থানে খোলাখুলি সঙ্গমে লিপ্ত হয় এবং তাদের পরিজন মারা গেলে তাদের দেহ ভক্ষণ করে। বানরের দল যারা এখানে বাস করে উঁচু পর্বতমালার খাড়াই অঞ্চলে তারা তাদের অনুসরণকারীদের উপর পাথর ছুঁড়ে মারে; যে সমস্ত জন্তু আমাদের দেশে শান্ত বা পোষ মানে, তারা সব এদেশে বন্য ও দুর্দান্ত। এছাড়া মেগাস্থিনিস বলেছেন, এখানে এক শৃঙ্গওয়ালা ঘোড়া পাওয়া যায়, যার মুখাবয়ব বা মাথার আকৃতি হরিণের মতো। আর বাঁশ বা বেণুবাঁশ ত্রিশ ফ্যাদম (এক ফ্যাদম = ছয় ফুট) উঁচু হয়, অন্যথায় মাটিতে প্রায় পঞ্চাশ ফ্যাদম লম্বা হয়ে শুয়ে থাকে। একটি বাঁশের ব্যাস হলো তিন কিউবিট (এক কিউবিট = আঠারো ইঞ্চি) থেকে ছয় কিউবিট পর্য্যন্ত।

৫৭. কিন্তু মেগাস্থিনিস সমস্ত বাস্তবকে অস্বীকার করে রূপকথার রাজ্যে পৌঁছে যান, যখন তিনি পাঁচ বিঘত (Span)। লম্বা মানুষের কথা বলেন, এছাড়া তিন বিঘত লম্বা মানুষ যাদের নাসিকা নেই, শুধু মুখের উপর দুটো রন্ধ্র আছে; তিনি এও বলেছেন যে তিন বিঘত মানুষেরা সারসের পিঠে চড়ে যুদ্ধে যায় (হোমার যে যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন) আর তিতির পাখিও নিয়ে যায়, যে তিতির পাখিগুলো এক একটা রাজহাঁসের আকারে হয়। এই মানুষরা সারসের ডিম খুঁজে খুঁজে সেগুলোকে নষ্ট করে; ফলে না ডিম, না শিশু সারস পাখি কোনোটাই পাওয়া যায় না, আর প্রায়ই তীরের চিহ্ন নিয়ে সারস যুদ্ধ থেকে অব্যাহতি পায়। এইরকম আরও গল্প আছে—কানের মধ্যে শুয়ে থাকা মানুষদের, এত বিশাল তাদের কান; বন্য মানুষের কথা এবং আরও সব অবিশ্বাস্য আর বিস্ময়কর কাহিনী। কিন্তু তিনি বলেছেন যে চন্দ্রগুপ্তের (Sandracottas বা মৌর্য চন্দ্রগুপ্ত) কাছে এই সমস্ত মানুষদের নিয়ে আসা হতো না, তাহলে তারা না খেয়ে উপবাস করে মারা যাবে; এদের পায়ের গোড়ালী সামনের দিকে থাকে, আর আঙুল সব পিছনের দিকে; কিন্তু যাদের মুখ নেই এমন কিছু মানুষকে রাজার কাছে আনা হয়েছিল, এরা গঙ্গার উৎপত্তিস্থলে বাস করে আর ঝলসানো মাংসের গন্ধ শুঁকে আর ফুল ও ফলের ঘ্রাণ নিয়ে জীবনধারণ করে, এরা নম্র স্বভাবের মানুষ। কারণ এদের মুখ নেই কিন্তু ঘ্রাণশক্তি আছে, খারাপ গন্ধ নাকে গেলে এরা বেদনাহত হয়, ফলে লোকালয়ে বা কোনো শিবিরে এরা খুব কম দিন বেঁচে থাকে। তিনি বলেছেন যে তাঁকে জ্ঞানী ও প্রকৃতিবিজ্ঞানীরা বলেছেন যে ‘ওসিপোডস’ (Ocypodes) হলো এক শ্রেণীর মানুষ যারা ঘোড়ার চেয়ে দ্রুতগতিতে দৌড়তে পারে আর ‘এনোটোকোটাই’ (Enotocoetae)। জনজাতির কান এতো বড়ো হয় যে তারা কানের মধ্যে শুয়ে থাকে, তারা এতো শক্তিশালী যে গাছ উপড়ে ফেলতে সক্ষম, ধনুকের ছিলা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে পারে। অন্য এক জাতির মানুষ যাদের কুকুরের মতো কান হয়, আর চোখ থাকে ঠিক কপালের মাঝখানে (Monommati), খাড়া চুল আর রোমশ বক্ষস্থল; অ্যামিকটেরেস (Amycteres)। সর্বভুক, তারা প্রায় সব কিছুই খেয়ে থাকে, এমনকি কাঁচা মাংস পর্যন্ত, কিন্তু এরা ক্ষণজীবী, অল্প কয়েক বছর, বৃদ্ধ হওয়ার আগে মারা যায়, এদের উপরের ঠোঁট অনেকটা এগিয়ে থাকে নিচের ঠোঁটের তুলনায়। দেশের উত্তর প্রান্তে যে সূর্যের পূজারী মানুষা থাকেন (Hyperboreans), যারা সহস্র বৎসর বাঁচে তাদের সম্পর্কে মেগাস্থিনিস বলেছেন যা পিণ্ডার, সাইমোনিডস বা অন্য পুরাণকথার কাহিনীকাররাও বলেছেন—তাঁদের থেকে খুব বেশি আলাদা কিছু নয়। টাইমাজেনিস (Timagenes) যা বলেছেন, তাও পুরাণকথা—বলেছেন, যে আকাশ থেকে পিতলের বৃষ্টি হয় (পক্ষান্তরে পয়সার বৃষ্টি) আর তা সারা দেশে ছড়িয়ে যায়। মেগাস্থিনিস কিন্তু সত্যের খানিকটা কাছাকাছি গিয়েছিলেন যখন তিনি বলছেন যে নদীর স্রোত সোনার গুঁড়ো বহন করে নিয়ে আসে, আর তার একটা অংশ রাজাকে কর হিসাবে দিতে হয়, কারণ আইবেরিয়া-তে এটাই নিয়ম।

৫৮. প্রাণী ও ধার্মিক মানুষ সম্পর্কে বলতে গিয়ে মেগাস্থিনিস বলেছেন যে, যাঁরা পাহাড়-পর্বতে বাস করেন তাঁরা ডাইয়োনিসাস (বা Bachhus)এর পূজারী, প্রমাণ হিসাবে তাঁরা (যে দেবতা এখানে এসেছিলেন) বুনো লতা, লরেল, মেদিগাছ বা মারটেল আর চিরহরিৎ বক্স-ট্রি গাছের কথা বলেছেন; অন্যান্য চিরহরিৎ বৃক্ষের কথাও বলেন। তিনি বলেন, এই উদ্ভিদগুলো ইউফ্রেটিস নদীর এপাড়ে পাওয়া যায় না, যদি দেখা যায়, তাহলে সে সব গাছ কেউ যত্ন করে উদ্যানে সাজিয়েছে। আর লিনেন কাপড়ের জামা, পোশাক, উষ্ণীষ বা ধূসর রঙের কাপড় এবং রাজা প্রাসাদ থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার সময় ঢাক-ঢোল বা কর্ত্তাল বাজানো তার প্রমাণ। কিন্তু সমতলের জ্ঞানী বা দার্শনিক হারকিউলিস বা হেরাক্লেসের উপাসক। মেগাস্থিনিসের এই বক্তব্য ঠিক নয়, অনেক লেখক একে উপকথা হিসাবে অস্বীকার করেছেন, বিশেষ করে বন্য আঙুরলতা, আর তার থেকে প্রস্তুত মদ্যের ব্যাপারে। তাদের মতে আর্মেনীয়ার অনেকটা জুড়ে, পুরো মেসোপটেমিয়া আর সেই অঞ্চল অতিক্রম করে মেডিয়ার (Media) বেশ কিছু অঞ্চলে, পারস্য আর কারমেনিয়া পর্য্যন্ত ইউফ্রেটিসের এপাড়েই অবস্থিত; আর এখানে যে জনগোষ্ঠি বাস করে তারা উৎকৃষ্ট মানের আঙুরলতা আর মদ গ্রহণ করে।

৫৯. মেগাস্থিনিস এখানে আবার জ্ঞানী ও ধার্মিক মানুষদের ভাগ করেছেন। তাঁর মতে এরা দু-ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগ ব্রাকমনেস (Brachmanes/ ব্রাহ্মণ) আর দ্বিতীয় ভাগ জারমানেস (Garmanes/ শ্রমণ)। ব্রাহ্মণদের সম্মান উঁচুতে, কারণ তারা তাদের বিশ্বাসে স্থির। কারণ জন্মমুহূর্তের আগে, যখন শিশু মাতৃগর্ভে থাকে, তখন থেকেই তাদের শিক্ষা শুরু হয়। জ্ঞানী মানুষরা যাঁরা গর্ভস্থ মায়ের কাছে যাওয়ার অধিকারপ্রাপ্ত, তাঁরা সেখানে গিয়ে তাদের শুভ কামনা করে, যেন প্রসব সুন্দর হয়। কিন্তু আসলে তাঁরা, যিনি মা হতে চলেছেন তাঁকে উপদেশ দেন, এবং যাঁরা ওই উপদেশ গ্রহণ করেন আনন্দের সঙ্গে, তাদের সন্তানভাগ্য খুবই ভাল হয়, এটাই বিশ্বাস। আর সন্তান জন্মানোর পরে একের পর এক মানুষ তার যত্ন করতে আসে, সন্তান যত বড় হয় ততই সে আরও ভাল শিক্ষকদের সংস্পর্শে আসে; আর জ্ঞানী মানুষের দল নগরের কাছে একটি কুঞ্জে বসবাস করে, যেখানে শুধু তাঁদের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি থাকে, একেবারেই মিতব্যয়ী তাঁদের জীবনযাত্রা—তাঁরা খড়ের বিছানা বা চামড়া পেতে সেই শয্যায় শয়ন করে, কুঞ্জের ছোট কুটীরে তারা জীবজন্তুর বা মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য গ্রহণ করে না, স্বল্পাহারে তারা দিন কাটায়, কোনো আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা থাকে না। সবসময় শুধুমাত্র পবিত্র স্তোত্র উচ্চারণ করে চলে, আর যদি কেউ এসে তাদের সেই স্তোত্রপাঠ শুনতে আগ্রহী হয় তাহলে তার কথা বলা বারণ, শুধু তাই নয় তার কাশি বা থুতু ফেলাও গর্হিত অপরাধ হিসাবে গণ্য হয়, কারণ তার আত্মসংযমের অভাব। তখন তাকে সমাজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এভাবে দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছর কাটলে পরে তারা আবার সমাজে সবার সঙ্গে মেলামেশা করার অধিকার ফিরে পায়, আবার তারা লিনেনের আলখাল্লা বা জোব্বা পরে, কানে আর হাতে স্বর্ণালঙ্কার ভূষিত হতে পারে, কিন্তু কতগুলো সংযম তাকে অভ্যাস করতে হয়, তারা যে সমস্ত পশু মানুষের কর্মকে সাহায্য করতে অপারগ, তাদের মাংস গ্রহণ করে, কিন্তু তীব্র ঘ্রাণযুক্ত সুপক্ক মাংস গ্রহণ করে না। তারা বহু স্ত্রীলোক বিবাহ করে, এবং বহু সংখ্যায় সন্তান উৎপাদন করে, স্ত্রীর সংখ্যার চেয়ে সন্তানের সংখ্যা অধিক হয়, তাদের দাসপ্রথা নেই তাই সন্তানদের শ্রম বা সাহায্য তাদের কাজে লাগে। ব্রাহ্মণরা কিন্তু তাদের জ্ঞান, স্ত্রী-দের সঙ্গে ভাগ করে না কারণ তারা ভয় পায়, যে তাদের জ্ঞান কোনো অপবিত্র স্থানে চলে যেতে পারে, যদি তাদের স্ত্রীরা চরিত্রহীনা হয়ে পড়ে। অথবা নিজেরাই যদি ভাল জ্ঞান আহরণ করে গুণী হয়ে ওঠে, তাহলে স্বামীকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। ফলে যারা সুখ আর দুঃখ, আনন্দ আর বেদনা, জন্ম আর মৃত্যুকে একই ভাবে বিচার করতে পারে না, তারা অন্যের পাণ্ডিত্য এবং জ্ঞানে বিশ্বাস করে, ধর্মবিশ্বাসী নিষ্ঠাবান মানুষরা সেরকমই হয়ে থাকেন। তাঁদের আলোচনার অধিকাংশ জুড়ে থাকে মৃত্যুর বিষয় কারণ মনে করা হয় যে এই জন্ম ক্ষণিকের অবস্থামাত্র, মৃত্যুই একজন জ্ঞানীকে সুন্দর আর সুখী জীবন দিতে পারে অনন্তের দ্বারপ্রান্তে, সেজন্য তারা প্রত্যেকে নিজেদের মৃত্যুর জন্য সুশৃঙ্খলভাবে প্রস্তুত করে, তারা বিশ্বাস করে মানুষের জীবনে ভাল আর মন্দ বলে আলাদা কিছু ঘটে না, না হলে একই ঘটনায় একদল মানুষ খুশী হয়, অন্য দল দুঃখ পায় কেন? আবার অনেক ক্ষেত্রে একই মানুষ একটি ঘটনায় বিষণ্ণ এবং কিছু ব্যবধানে খুশী হয়ে ওঠে কেন? এরা স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে থাকে বলে মনে হয়। পার্থিব বিষয় সম্পর্কে ব্রাহ্মণদের কাজকর্ম, ক্রিয়াদি খুব সোজাপথে চলে, তাদের যুক্তির চেয়ে তাদের কাজ অনেক ভাল বলে মনে হয়েছে মেগাস্থিনিসের, কারণ, তাদের বিশ্বাস বা প্রত্যয়গুলো মূলতঃ শ্রুতি ও উপকথার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক বিষয়ে তাদের মত আর দৃষ্টিকোণ গ্রীকদের সঙ্গে মিলে যায়। যেমন ব্র্যাকমেনেসদের (ব্রাহ্মণ) মতে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা হয়েছে, এবং এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে পারে, যেটা গ্রীকরাও বিশ্বাস করে, আর দুই পক্ষই বিশ্বাস করে যে পৃথিবী গোলাকার আর যে ঈশ্বর এই বিশ্ব তৈরি করেছেন তিনি এর সর্বত্র জুড়ে বিরাজমান। আর সমস্ত পৃথিবীর জন্ম হয়েছে জল থেকে, বাকি সমস্ত বস্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত। চারটি আদি মৌলবস্তু ছাড়া আর একটি আদি বস্তু প্রকৃতিতে আছে যার দ্বারা মহাজাগতিক জ্যোতির্মণ্ডলী এবং মহাকাশ তৈরি হয়েছে; এবং পৃথিবী এই মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থলে বিরাজ করছে। এই এক চিন্তার কথা ঐতিহাসিকরা বলেছেন ব্রাহ্মণদের বীজ ও আত্মা সম্পর্কে, আরও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁদের চিন্তা সম্পর্কেও আলোকপাত করেছেন। তাঁরাও প্লেটোর মতো উপকথার উপর ভিত্তি করে বলে—’আত্মা অবিনশ্বর, মৃত্যু নেই।’ তারা বিশ্বাস করে হেডিস-এর বিচারে, মানুষের মৃত্যুর পর যমালয়ে গিয়ে যে বিচার হয় তার উপর, এবং এরকম আরও কিছু বিষয়ে। ব্র্যাকমেনেস সম্পর্কে মেগাস্থিনিস এরকম বিবরণ দিয়েছেন।

৬০. জারমানি (শ্রমণ) সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে, এদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় যাঁরা তাদের বলে হাইলোবাই (Hylobii)। র্তারা অরণ্যে থাকে আর বুনো ফল, গাছের পাতা খেয়ে জীবনধারণ করে; গাছের মূল, ছাল পরে লজ্জা নিবারণ করে, মদ্যপান ও সঙ্গম থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকে। রাজা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন বার্তাপ্রেরকের দ্বারা কার্যকারণ বিধি (Four Causes of Aristotle, the material, the formal, the efficient and the final) প্রসঙ্গে, তাঁরাও বার্তাপ্রেরকের কাছ থেকে সমস্ত কারণ বুঝে সেই অনুযায়ী ‘হাইলোবাই পূজা-প্রার্থনা’ করে দেবতাকে সন্তুষ্ট করে। এই হাইলোবাইদের পরে সব থেকে সম্মানীয় দল হলো ‘চিকিৎসক’, যাঁরা মানুষের জীবনচর্যা সম্পর্কে জ্ঞানী ও দার্শনিক চিন্তাগুলো সেখানে প্রয়োগ করে থাকেন। তাঁরা খুব সংযমী জীবনযাপন করে, কিন্তু মাঠে ময়দানে ঘুরে বেড়ায় না, তারা অন্ন এবং যব (Barley Oats) খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে এবং সব গৃহস্থ এটি তাঁদের প্রদান করে। তাঁরা দান হিসাবে গৃহস্থের কাছে চায়। আর গৃহস্থ আতিথ্য হিসাবে তাঁদের দিয়ে থাকে। যাদু বিদ্যাবলে তারা লোকজনের বহু সন্তান লাভ করাতে পারে, ছেলে এবং মেয়ে উভয়ই; এরা মানুষের রোগমুক্তি ঘটায় পথ্য দিয়ে, ওষুধ দিয়ে খুব একটা নয়; আর ওষুধের ক্ষেত্রে তারা মলম আর প্রলেপ দিয়ে অধিকাংশ চিকিৎসা করে, বাকি যে সমস্ত ওষুধ তাদের আছে সেগুলো তারা ব্যবহার করে না, কারণ তার ফল ভাল হয় না। এই শ্রেণীর মানুষ এবং অন্যরাও আত্মত্যাগের মাধ্যমে এবং কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে দিয়ে সারাদিন এক আসন বা ভঙ্গিমায় নড়াচড়াহীন অবস্থায় থাকতে পারে, এজন্য তাদের সাধনা করতে হয়। এখানে মন্ত্র বা স্তোত্রপাঠের মানুষ আছেন, দৈবজ্ঞরা আছেন যারা মৃতদেহের সৎকার্য সম্পর্কে অবহিত, তারা নিয়মকানুন আর প্রথা দুটোই জানেন। তারা ভিক্ষা বা দান নিয়ে ফেরে গ্রাম থেকে গ্রাম, শহর থেকে শহরে। অন্য লোকজনও আছেন, যাঁরা এই গোত্রের মানুষের তুলনায় আরও সংস্কৃতিবান ও ভদ্র-সভ্য মানুষ, কিন্তু তারাও মৃত্যু ও তারপর যমের দুয়ার (Hedes) সম্পর্কে আলোচনা করেন, যে পর্যায় পর্যন্ত ধার্মিক আর সততা নিয়ে করা যায়, ঠিক ততটাই পুরুষদের সঙ্গে মহিলারাও শাস্ত্রচর্চা ও ধর্মচর্চায় ব্যাপৃত থাকেন, সংখ্যায় হয়তো কম—কিন্তু তাঁরা যৌন সম্পর্ক থেকে নিজেদের নিবৃত্ত রাখে।

৬১. এ্যারিষ্টবুলাস বলেন যে তক্ষশিলায় তিনি দু’জন ব্র্যাকমেনিস (ব্রাহ্মণ) দেখেছেন, তাদের মধ্যে প্রবীণ মানুষটির মাথা কামানো, তিনি মুণ্ডিত মস্তক—আর নবীন ছেলেটির মাথায় চুল আছে। দু’জনেই সঙ্গে ভক্তদের নিয়ে চলেছেন, আর অন্য কাজে ব্যস্ত না থাকলে তারা বাজারের মধ্যে সময় অতিবাহিত করে, পরামর্শদাতা এবং দেখাশোনা করার কাজ করে, সম্মানিত মানুষ হিসাবে তারা বিক্রির জন্য সাজানো জিনিসপত্রের মধ্য থেকে উপহার হিসাবে বিনাপয়সায় মালপত্র গ্রহণ করে, এই মালপত্র তাদের ইচ্ছা অনুসারে তারা পছন্দ করে থাকে। আর যদি কোনো মানুষ তাদের পছন্দ করে বা আহ্বান করে তাহলে তারা তার মাথায় প্রচুর তিল তেল ঢেলে দেয়, যেন সেটা তার চোখের পাতা বেয়ে নেমে আসে, আর তিল ও মধু প্রচুর পরিমাণে বিক্রির জন্য বাজারে থাকে, এরা তাই দিয়ে মণ্ড বা পিঠে তৈরি করে নেয়, আর বিনামূল্যে গ্রহণ করে। তারা আলেকজাণ্ডারের সমীপে আসে আর তার টেবিলে দাঁড়িয়ে আহার গ্রহণ করে আর তাঁকে সহ্যশক্তির একটা পাঠ দেখায়—একটু দূরে একটি জায়গায় গিয়ে প্রবীণ মানুষটি মাটিতে পিঠ দিয়ে শুয়ে পড়ে—সূর্যের তাপ আর বৃষ্টির জল তার দেহের উপর গ্রহণ করে (তখন বসন্তকাল, বৃষ্টি এসে গেছে) আর নবীন মানুষটি হাতের উপর তিন কিউবিট (প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা) দীর্ঘ গাছের গুঁড়ি বহন করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে এক পা তুলে। একটা পা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন অন্য পা মাটিতে রেখে শ্রান্ত পা-টি তুলে নেয়। যুবকটি যেন বেশি আত্মসংযমের পরিচয় দেয়। যদিও সে খানিকটা পথ রাজাকে অনুসরণ করেছিল, কিন্তু সামান্য পথ গিয়েই সে নিজের বাড়িতে ফিরে যায়, কিন্তু রাজা যখন তাঁকে খুঁজতে সম্রাটের দ্বারা নির্দেশিত হন, তখন তিনি যুবকের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, তাঁর কিছু চাই কি না সম্রাটের কাছ থেকে?—যদিও প্রবীণ মানুষটি রাজার সঙ্গে পুরো পথ অতিক্রম করে, তার পোষাক-পরিচ্ছদ ও জীবনযাত্রার রকমটাও পাল্টে যায়, আর সে বলে চল্লিশ বছর ধরে যে সংযম পালন করার ব্রত তিনি নিয়েছিলেন তার সমাপ্তি হয়েছে, কিন্তু যুবকটি, রাজার প্রয়োজন হলে তাঁর কাছে আসতে বলে। আলেকজাণ্ডার প্রবীণ মানুষটির সন্তান-সন্ততিদের উপহার প্রদান করেন।

৬২. এ্যারিষ্টবুলাস তক্ষশিলার কিছু অসাধারণ ও নতুন নিয়ম উল্লেখ করেছেন। যেমন, যে সব নাগরিক বা গ্রামীণ মানুষ দারিদ্র্যের জন্য মেয়ের বিয়ে দিতে পারে না, তারা মেয়ে নিয়ে বাজারে গমন করে, এবং ফুটন্ত যৌবনের এই মেয়েদের নিয়ে গিয়ে ঢোল আর শিঙা (সাধারণতঃ যুদ্ধের বাজনা) বাজায়, ফলে লোক জমা হয়। যখন কোনো একজন তাদের মধ্যে থেকে সামনে আসে, তখন মেয়েরা তাদের পিছনের দিকের আবরণ ঘাড় পর্য্যন্ত তুলে দেখায়, তারপর তাদের সম্মুখভাগ। এই নগ্নতা দেখে যদি করোপছন্দ হয় এবং মহিলা যদি প্ররোচিত হন, তাহলে প্রথাসিদ্ধ নিয়মে তারা বিবাহ করেন। যারা মারা যায় তাদের শকুনের খাদ্য হিসাবে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। বহুবিবাহ অন্যদের ক্ষেত্রেও রীতিসম্মত। এছাড়া অ্যারিষ্টবুলাস বলেছেন যে, তিনি শুনেছেন যে কিছু কিছু জনজাতির (Tribes) মধ্যে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী সহমরণ পছন্দ করেন, এবং একসঙ্গে দু’জনকে দাহ করা হয়। যে সমস্ত স্ত্রী এই প্রথা অনুসারে সহমরণে যায় না, তারা হীন চরিত্রের বলে গণ্য হন; এই প্রথার কথা অন্য লেখকরাও বলেছেন।

৬৩. ওয়ানসাইক্রিটাস বলেন, যে তিনি নিজে ওই তার্কিক পণ্ডিতদের সঙ্গে গিয়ে কথা বলেছেন। কারণ, আলেকজাণ্ডার শুনেছিলেন যে এই সফিষ্টরা (Sophist বা গ্রীসদেশের ভাষায় কূট তার্কিক পণ্ডিত) সবসময় নগ্ন থাকে আর আত্মসংযম, রিপুদমন অভ্যাস করে; তারা সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভক্তির পাত্র; তাদের আমন্ত্রণ জানালে তারা কখনোই সেখানে যায় না, বরং অমন্ত্রণকারীদের তাদের কাছে আসতে বলে যদি তাদের মধ্যে কারো কিছু বোঝার বা শোনার প্রয়োজন থাকে—ফলে সেই কারণে আলেকজাণ্ডার, ওয়ানসাইক্রিটাসকে ওদের কাছে পাঠিয়েছিলেন; কারণ আলেকজাণ্ডারের পক্ষে স্বয়ং এদের কাছে যাওয়া সম্ভব নয়, আবার এই তার্কিকদের জন্মজন্মান্তরের লালিত সংস্কারকে তিনি আঘাত করতেও চাইছেন না, তাই ওয়ানসাইক্রিটাস কে পাঠানো হলো। তিনি নগর থেকে কুড়ি ষ্ট্যাডিয়া (৩ ষ্ট্যাডিয়া = ১৮৫ মিটার) দূরে পনেরো জন মানুষকে দেখেন যারা শুয়ে, বসে অথবা দাঁড়িয়ে আছে অথবা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে শুয়ে আছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ; সম্পূর্ণ ভাবে স্থির বা অনড় হয়ে তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত এইভাবে থেকে তারপর নগরে ফিরে আসেন। সূর্যের তাপ সহ্য করা এই সময় খুবই কঠিন, বিশেষ করে দুপুরবেলা, যখন খালি পায়ে পর্যন্ত মাটিতে হাঁটা দুষ্কর।

৬৪. ওয়ানসাইক্রিটাস বলেছেন যে তিনি এই সাধকদের মধ্যে একজনের সঙ্গে কথা বলেন, তার নাম ‘কালানোস’ (Calanos)। যিনি পারস্য পর্যন্ত রাজার সঙ্গে যান ও তারপর তাঁর ‘দেশের প্রথা অনুসারে’ মারা যান। তাঁর পূর্বপুরুষদের প্রথা ছিল চিতা প্রস্তুত করে তার উপর বসে শরীরে অগ্নিসংযোগ করা, এবং এইভাবে মৃত্যুবরণ করা। যখন ওয়ানসাইক্রিটাস প্রথম কালানোস-কে দেখেন তখন তিনি পাথরের উপর শুয়ে ছিলেন। ওয়ানসাইক্রিটাস তাঁর কাছে যান এবং বলেন যে রাজা তাকে পাঠিয়েছেন জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করতে, শিক্ষা নিতে—এবং যদি কোনো আপত্তি না থাক তাহলে তিনি তাঁর শিক্ষা ওয়ানসাইক্রিটাসকে দান করতে পারেন। কালানোস যখন গ্রীক দার্শনিকের দিকে তাকালেন ও পর্যবেক্ষণ করলেন, তখন তার পোশাক, তার ঘেরওয়ালা টুপি ও তার বুটজুতো দেখে হেসে ফেললেন এবং বললেন ‘প্রাচীন’ কালে পৃথিবী গম আর যব-এ পরিপূর্ণ ছিল, এখন যেমন ধূলোতে ভর্ত্তি, ভিন্ন ভিন্ন ঝরণা থেকে বিভিন্ন স্রোত নির্গত হতো। কোনো ঝরণা থেকে জল, কোনোটা থেকে দুধ, কোনোটা থেকে মধু, কোনোটা থেকে মদ্য আবার কোনোটা থেকে জলপাই তেল বা অলিভ তেলের স্রোত বইতো। কিন্তু লোভ আর বিলাসবহুল জীবনযাপন করার কারণে মানুষ অহংকারী আর স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠলো। দেবরাজ জিউস (ইন্দ্র) তখন সমস্ত কিছু ধ্বংস করে, মানুষের জন্য এক পরিশ্রমী জীবন তৈরী করলেন। যেখানে আত্মসংযম আর অন্যান্য গুণ অর্জন করলে আবার ঈশ্বরের আশির্বাদ পাওয়া যায়। যদিও মানুষ এর মধ্যে অহংকার আর অসংযমের সমস্ত প্রবৃত্তির স্বাদ পেয়ে গেছে, সেজন্য ধ্বংসের ঝুঁকিও প্রবলভাবে থেকে গেছে। ওয়ানসাইক্রিটাসকে এরপর কালানোস বলেছেন যে, আরও জানতে হলে তাকে কালানোসের মতো নগ্নদেহে ওই পাথরের উপর শুয়ে পড়ে, তারপর শিক্ষা গ্রহণ করতে। যখন ওয়ানসাইক্রিটাস এই কথায় দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন, তখন এই জ্ঞানী মানুষদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠ এবং বয়স্ক সেই মান্দানিজ, কালানসকে তিরস্কার করেন, যদিও তাঁর নিজের অহংকার বা পাণ্ডিত্যের গর্বকে প্রকাশ না করে; মান্দানিজ এরপর ওয়ানসাইক্রিটাসকে বলেন যে রাজাকে আমি প্রশংসা করছি কারণ এত বৃহৎ সাম্রাজ্য শাসন করেও তাঁর জ্ঞানের পিপাসা রয়েছে, যিনি ক্ষমতার সঙ্গে জ্ঞান ও দর্শনকে মিলিয়ে দেখেন। এই দার্শনিক ও জ্ঞানী রাজা যাদের ক্ষমতা আছে তারা পৃথিবীর কাছে খুবই দরকারি কারণ, তারা ইচ্ছুক মানুষদের সাহায্য করতে পারে আর অনিচ্ছুকদের বাধ্য করতে পারে এই আত্মসংযমের শিক্ষা নিতে। যদিও তিনি এই তিনজন দোভাষীর মাধ্যমে কথা বলার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী কারণ, এই দোভাষীরা ভাষা ছাড়া সাধারণ মানুষের মতো আর কিছুই জানে না, ফলে এই গভীর বাক্য তাদের পক্ষে বোঝানো সম্ভব নয়। এদের পক্ষে এই দর্শনের তাৎপর্য্য বোঝা আর মাটির উপর দিয়ে প্রবাহিত জলধারাকে বিশুদ্ধ পরিষ্কার জল মনে করা একই ব্যাপার।

৬৫. এই উপদেশের সারমর্ম, ওয়ানসাইক্রিটাস বলেছেন যে মানুষের জীবন থেকে সুখ আর দুঃখ পরিহার করা। দুঃখ আর পরিশ্রম করা ভিন্ন ভিন্ন ব্যাপার, এক জিনিস নয়, কারণ দুঃখ মানুষের মনে প্রতিকূল প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়, আর পরিশ্রম তার পক্ষে অনুকূল। পরিশ্রমী মানুষ তার মতামতকে দৃঢ় করে তোলে, সমস্ত বিভেদ আর অনৈক্যের পরিবেশ সরিয়ে দিয়ে মানুষকে উত্তম উপদেশ দিতে সক্ষম হয়, ব্যক্তিকে এবং সাধারণ জনগণকে। তক্ষশিলার রাজা তক্ষিলেসকে তিনি উপদেশ দেবেন আলেকজাণ্ডারকে গ্রহণ করার জন্য, কারণ বন্ধু হিসাবে যদি তিনি তাঁকে আরও বিশিষ্ট মানুষ মনে করেন তাহলে তাঁকে বিশেষভাবেই আমন্ত্রণ জানাবেন, আর যদি তাঁকে তুলনায় কম মনে হয়, তাহলে তাঁর উন্নতির জন্য চেষ্টা করবেন। এরপর ওয়ানসাইক্রিটাস বলেন যে মান্দানিজ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন যে গ্রীকদের কি ধরনের দর্শন বা উপলব্ধি শিক্ষা দেওয়া হয়? তখন ওয়ানসাইক্রিটাস বলেন যে পিথাগোরাস ঠিক এই রকম শিক্ষা দিয়েছেন— তিনি তাঁর ছাত্রদের সমস্ত জীবিত প্রাণী থেকে দূরে থাকতে বলেছেন, রসনা তৃপ্ত করার ব্যাপারে। সক্রেটিস আর ডাইওজেনিস একই শিক্ষা দিয়েছেন, ওয়ানসাইক্রিটাস বলেন যে তিনি ডাইওজেনিসের ছাত্র—উত্তরে মান্দানিজ বলেন যে তিনি গ্রীকদের বুদ্ধিমান ও মেধাসম্পন্ন বলে মনে করেন কিন্তু একটি ক্ষেত্রে তারা ভুল পথের পথিক, তারা প্রকৃতির থেকে অধিক প্রথাকে মূল্য দেন। তা না হলে তারা নগ্ন থাকতে দ্বিধাবোধ করতো না, যেরকম মান্দানিজ নিজে থাকেন আর অত্যন্ত সংযত জীবন যাপন করেন। কারণ সেই গৃহ শ্রেষ্ঠ আবাস, যার সব থেকে কম সংস্কারের প্রয়োজন হয়।

ওয়ানসাইক্রিটাস তাঁর পর্যবেক্ষণের কথা বলেন। বলেন যে ভবিষ্যদ্বাণী, বর্ষা, খরা, বন্যা এবং অসুখ সংক্রান্ত বিষয়ে তারা পর্যবেক্ষণ করেছেন, বিভিন্ন বাজারে ঘুরেছেন আর যেখানে ডুমুর বা আঙুর বিক্রেতাদের সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে সেখানে তারা সেইসব ফল উপহার পেয়েছেন, বিনা পয়সায়, আর যদি তেল হয়, তাহলে সেই তেল তাদের মাথায় ঢেলে দেওয়া হয়েছে, সসম্মানে। আর তাদের জন্য সম্পন্ন গৃহস্থ তাদের বাড়ি উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, এমন কি মহিলাদের ঘর পর্যন্ত, তাদের আতিথ্যের জন্য, তারা আতিথ্য গ্রহণ করেছেন আর খাদ্যও গ্রহণ করেছেন, কথাবার্তাও বলেছেন। এখানকার অধিবাসীরা শরীর অসুস্থ হলে সব থেকে অপমান আর লজ্জার বিষয় বলে মনে করে। যদি কেউ সন্দেহ করে যে সে অসুস্থ, তাহলে সেই ব্যক্তি চিতা প্রস্তুত করে সেই আগুনে আত্মহত্যা করে, তারা স্থির হয়ে আগুনের কুণ্ডের উপর বসে থাকে এবং পুড়ে মারা যায়।

৬৬. নিয়েরকাস এই জ্ঞানী মানুষদের সম্পর্কে বলেছেন যে, ব্র্যাকমেনিস বা ব্রাহ্মণরা দেশের বিভিন্ন ব্যাপার, বিশেষত রাজার উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করে, অন্যান্য জ্ঞানী মানুষরা প্রাকৃতিক শক্তি ও তার পরিবর্তন এবং প্রভাব সম্পর্কে ধ্যানধারণা বা চিন্তাভাবনা করেন, যেমন কালানোস তাদের মধ্যে একজন। তাদের স্ত্রীরাও এই দর্শনের সাধনায় অংশ নেন, তাদের জীবনযাত্রাও খুবই কঠোর সংযমের। বাকি ভারতীয়দের জীবনযাত্রা নিয়ে তিনি বলেছেন, তাঁদের আইনকানুন ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত যেটাই হোক না কেন, লিখিত আইন নয়। আর তাদের প্রথাগুলো খুবই আশ্চর্য্যের, অন্য জনগোষ্ঠির থেকে স্বতন্ত্র। যেমন একটি কুমারী মেয়েকে পুরস্কার হিসাবে রেখে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বী মুষ্টিযুদ্ধ করে, আর যে জেতে মেয়েটি তাকেই বিবাহ করে, কোনো পণ দিতে হয় না। অন্য জনজাতির ক্ষেত্রে যেমন পরিবাররা একসঙ্গে চাষ-আবাদ করো, যখন ফসল ফলে তখন সকলে আলাদা আলাদা করে সেই ফসল ভাগ করে নেয়, যা দিয়ে তাদের বছরের ক্ষুণ্ণিবৃত্তি হয়, কিন্তু যেটুকু অতিরিক্ত ফসল সেটা তারা পুড়িয়ে ফেলে, কারণ পরের বছর যেন তাদের কাজ থাকে, যেন কর্মহীন হয়ে বসে থাকতে না হয়। তাদের অস্ত্র হলো ধনুক আর তীর, তীর সাড়ে চার ফুটের অথবা বর্শা, আর একটি ছোট ঢাল এবং সাড়ে চার ফুটের তলোয়ার বা খড়গ। সেটাও চওড়া। লাগামের জায়গায় তারা নাসাবন্ধ (লাগামের যে অংশ নাকের উপর দিয়ে যায়) ব্যবহার করে, যেটা মুখবন্ধের থেকে সামান্য আলাদা। এছাড়া ঘোড়ার ঠোঁটে ফুটো তৈরি করা হয় বড় পেরেক দিয়ে (সেখান সম্ভবতঃ আরেকটি লাগামের মতো লাগাম হয়)।

৬৭. নিয়েরকাস, ভারতীয়দের হাতের কাজ এবং তাদের দক্ষতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, যখন তারা ম্যাসিডনীয়দের (গ্রীক) স্পঞ্জ ব্যবহার করতে দেখলো, তখন তারা স্পঞ্জের নকল করে একগুচ্ছ পশম নিয়ে তাকে চুল, সরু সুতো আর দড়ি দিয়ে বেঁধে ডেলা পাকায় (Felt)। তারপর সেই দলা পাকানো হয়ে গেলে তারা দড়ি, সুতো আর চুলের বাঁধন খুলে সেই দেলাটাকে রঙ দিয়ে রাঙিয়ে নেয়, গরম জলে স্নানের পর বাঁকা ফলার সাহায্যে ঘাম এবং ময়লা শরীর থেকে ঘষে দূর করার যন্ত্র আর তেল নেওয়ার পাত্র তৈরির লোকজন দ্রুত এসে গেল ওই পশম ব্যবহারের জন্য; কাপড় ঘষে ঘষে কাগজের মতো করে তারা সেখানে চিঠি লিখতো। যদিও একদল গ্রীক-লেখক বলেন যে এদের লেখার ভাষা জানা নেই; এরা ঢালাই পিতল ব্যবহার করে, পেটাই পিতল নয়, কোনো কারখানায় তৈরি করে না। কারণ জানা যায় নি তবে এই পিতলের পাত্র ভঙ্গুর, সহজেই মাটিতে পড়লে ভেঙে যায়। ভারত সম্পর্কে মতামত নিম্নে বর্ণিত আছে, যেখানে দেখা যায় যে প্রভুত্ব স্বীকার করা বা বশে থাকার পরিবর্তে এরা রাজা এবং অন্যান্য সম্মানীয় মানুষদের, উচ্চপদস্থদের কাছে আবেদন করে।

এই দেশে বহুমূল্য পাথর, পদ্মরাগ মণি, স্ফটিক এবং মুক্তা পাওয়া যায়।

৬৮. ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতান্তর নিয়ে একটা উদাহরণ দেওয়া যায়, যেমন কালানোস সম্পর্কে। সমস্ত ঐতিহাসিক একমত যে সে আলেকজাণ্ডারের কাছে গিয়েছিল এবং সে আলেকজাণ্ডারের সামনে স্বেচ্ছায় আগুনে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু কিভাবে কোন কারণে মৃত্যুকে সে বরণ করে, তাই নিয়ে মতান্তর বিস্তর, আর কি ভাবে সে আত্মাহুতি দিয়েছে তা নিয়েও আলাদা আলাদা মত পাওয়া যায়। একটা মত হলো, সম্রাটের সঙ্গে তিনি কার্যত স্তাবক হিসাবে ভারত ছেড়ে আসেন, যেটা জ্ঞানী মানুষদের নিয়মবহির্ভূত তারা রাজা বা সম্রাটকে ভারতের সীমার মধ্যে আসলে তবেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তাদের সঙ্গে ঈশ্বরের আধ্যাত্মিক সম্পর্কের ভিত্তিতে রাজাদের তারা উপদেশ প্রদান করে। যেরকম পারসিক রাজাদের প্রাচীনকালে পারসিক পুরোহিতরা (Magi) উপদেশ দিতেন—কিন্তু পাসারগাদি (অধুনা ইরানে) পৌঁছবার পর তিনি অসুস্থ বোধ করেন। জীবনে প্রথম অসুস্থ বোধ করেন এবং তিয়াত্তর বছর বয়সে তিনি আত্মাহুতির ব্যবস্থা করেন। সম্রাটের অনুরোধেও তাঁকে নিবৃত্ত করা যায় নি। চিতা সাজানো হয়, তার উপর একটা সোনার সিংহাসন দিয়ে তিনি তার উপর উপবেশন করেন, তার সমস্ত দেহ আবৃত করে চিতায় আগুন দেওয়া হয়, তিনি পুড়ে মারা যান।

অন্যদের মত হলো, একটা কাঠের বাড়ি তৈরি করা হয়েছিল, বাড়িটা পাতা দিয়ে ভর্তি করা হয়েছিল, আর বাড়ির ছাদে চিতা প্রস্তুত করা হয়। কালানোস সেই ঘরে বন্দী রাখেন নিজেকে, তারপর তাকে যারা মিছিল করে নিয়ে আসে তারা এসে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছোয়, তারপর তাঁকে চিতায় ছুঁড়ে দেওয়া হয়, তিনি একটা কাঠের টুকরোর মতো জড় ভরতের ন্যায় ওই ঘরশুদ্ধ পুড়ে যান।

মেগাস্থিনিস বলেন যে এটা জ্ঞানী দার্শনিকদের মতামত বা ধর্মের নির্দেশ নয় যে আত্মহনন করা, যারা করে তারা যৌবনের আবেগ আর উদ্দামতার শিকার। তাদের মধ্যে যারা কষ্টসহিষু তারা ঝড়ের মুখে পড়ে অথবা শৈলশিখর থেকে পতিত হয়। যারা এই কষ্টস্বীকার করতে অপারগ তারা জলে ডুব দেয়। যারা অধিকতর কষ্ট স্বীকার করতে ইচ্ছুক তারা ফাঁসিতে নিজেকে ঝুলিয়ে দেয়, আর যাদের তিরিক্ষি আগুনে মেজাজ তারা আগুনে আত্মাহুতি দেয়। যেমন কালানোস, যার কোনো আত্মসংযম নেই, আলেকজাণ্ডারের কাছে দাসবৃত্তি করতো, কালানোস সেইজন্য নিন্দিত—কিন্তু মান্দানিজ প্রশংসিত। আলেকজাণ্ডারের দূত যখন মান্দানিজকে বললো যে দেবরাজ জিউসের পুত্র তাকে দেখা করতে বলেছেন, গেলে উপহার পাবেন আর না গেলে দণ্ডপ্রাপ্তি নিশ্চিত, তখন মান্দানিজ উত্তর দেন যে, প্রথমে বলি যে আলেকজাণ্ডার দেবরাজের (জিউস বা ইন্দ্র) পুত্র নন, তিনি এই মহাপৃথিবীর সামান্য অংশের শাসকমাত্র; আর দ্বিতীয় কথা হলো তার আলেকজাণ্ডারের কাছ থেকে কোনো উপহার গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই, কারণ সেই উপহার তাকে মন থেকে তৃপ্ত করতে পারবে না; আর তাকে ভীতি প্রদর্শনে কোনো লাভ নেই, যতদিন তিনি বেঁচে আছেন ভারতবর্ষ তাকে যথেষ্ট দিয়ে আসছে, কোনোদিন তাকে ক্ষুধা বা পিপাসায় কাতর হতে হয়নি, আর যখন তিনি মারা যাবেন, তখন বৃদ্ধ বয়সের এই শরীর ছেড়ে তিনি এক পবিত্র ও সুন্দরতর জীবনযাপন করবেন।

আলেকজাণ্ডার এই উত্তর শুনে তাঁকে নীরবে প্রশংসা করেন।

৬৯. ঐতিহাসিকরা এটাও বলেন যে ভারতীয়রা জিউস (ইন্দ্র অথবা মতান্তরে বরুণদেব), গঙ্গানদী আর স্থানীয় দেবদেবীর পূজা করে। রাজা যখন স্নান করতে যান, তাঁর স্নানযাত্রা বিপুল উৎসবের সঙ্গে হয়ে থাকে। তিনি অনেক বড়োসড়ো উপহার আনেন, আর শ্রেষ্ঠিদের মধ্যে তখন কে কতো ধনী তার প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা চলে, একে অপরের থেকে বেশি ধনদৌলত দেখায়।

তারা বলেন যে পিঁপড়ের দল সোনার খনিতে থাকে, তাদের মধ্যে কোনো কোনো পিঁপড়ের পাখা আছে; আর সেনার গুঁড়ো নদীর জলে ভেসে আসে, যেমন সাইবেরিয়ার নদীগুলোয় আসে।

স্নানের শোভাযাত্রায় অনেক হাতি, সোনা আর রূপোয় ঢাকা, অলংকার পরে, ওইভাবে চার ঘোড়ায় টানা রথ আর বলদের পাল সঙ্গে আসে, তারপর আসে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ সামরিক পোশাক পরে। শেষে সোনালী পাত্রে বড়ো বড়ো বাটি আর গামলা, এক একটা ছয় ফুট করে চওড়া, টেবিল, উচু চেয়ার, পানপাত্র আর স্নানের জন্য বাথটব—এই সব ভারতীয় তামা দিয়ে তৈরি আর অধিকাংশ জিনিসের গায়ে দামী পাথর বসানো—পান্না, ফিরোজা, ও রক্তবর্ণ অ্যানথ্রাক্স পাথর। নানাবর্ণের কাপড় তার উপর সোনার চুমকি বসানো। পোষা বাইসন, চিতাবাঘ আর সিংহ, বিচিত্র সব পাখি যারা মিষ্টি সুরে ডাকে। ক্লেইটারকাস বলেছেন যে চার চাকাওয়ালা গাড়িতে বড়ো বড়ো পাতাওয়ালা গাছ নিয়ে যাওয়া হয়, আর তার ডালে আর পাতায় পোষা পাখিরা বসে সুন্দর সুরে ডাকে—তাদের মধ্যে হলুদ কালো পালকের ওরিয়ান পাখির ডাক সবথেকে মিষ্টি আর ক্যাট্রিয়াস পাখি সবথেকে সুন্দর দেখতে, অনেকটা ময়ূরের মতো। বাকিটুকু জানতে হলে ক্লেইটারকাসের বিবরণ দেখতে হবে।

৭০. জ্ঞানী, ধার্মিক ও দার্শনিক মানুষদের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকরা বলেন যে ব্রাহ্মণদের বিরোধ করতে বৌদ্ধরা ছিল, এই বৌদ্ধরা (Pramnai) ছিল তার্কিক এবং তর্ক করতে ইচ্ছুক। তারা বলতো ব্রাহ্মণরা (Brachmanes) প্রাকৃতিক দর্শন আর জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করে, তারা মূর্খ আর প্রতারক—এই বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কেউ পাহাড়ে থাকে, কেউ নগ্ন থাকে, কেউ শহরে আবার কেউ কেউ প্রতিবেশী হিসাবে থাকে। পাহাড়ে যারা থাকে তারা হরিণের চামড়া পরে, সঙ্গে একটা ঝোলায় ওষধি আর গাছগাছড়ার শিকড় থাকে যার সাহায্যে তারা অসুস্থ মানুষকে নাকি সুস্থ করে তোলে। সঙ্গে যাদুবিদ্যা, তাবিজ ইত্যাদির সাহায্য নেয়। আর নগ্ন বৌদ্ধরা নগ্ন হয়ে ঘোরাফেরা করে, সহ্যশক্তি বা সহনশীলতার পরিচয় দেয় যেমন আমি আগে বলেছি, সাঁইত্রিশ বছর ধরে এই জীবনের অধিকাংশ সময় প্রকাশ্যে নগ্ন হয়ে এই সাধনা করে; মহিলারা এদের সঙ্গে থাকে, কিন্তু তারা শারীরিকভাবে মিলিত হয় না; এই সাধকদের অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা হয়।

৭১. শহরে যে বৌদ্ধ সাধকরা থাকে তারা পট্টবস্ত্র বা লিনেন কাপড় পরে, শহরে বসবাস করে, অথবা দেশের বাইরে হরিণের অথবা গাঢ় বর্ণের অজিন বা চীর পরে যেত। সাধারণভাবে ভারতীয়রা শুভ্র পট্টবস্ত্র বা সূতীর কাপড় পরে—যারা তাদের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন যে তারা রঙিন জামা বা কাপড় পরে, তারা সঠিক বলেন নি। তারা লম্বা চুল আর দাড়ি রাখা পছন্দ করে, লম্বা চুলে বেণী বাঁধে। ফিতে জড়িয়ে রাখে মাথায়।

৭২. আর্টেমিডোরাস বলেছেন যে গঙ্গানদী ইমোডা পর্বত থেকে সৃষ্টি হয়ে দক্ষিণবাহী হয়েছে, আর যখন গঙ্গানদী এসে গঙ্গা-শহরে পড়েছে, সেখান থেকে পূর্বদিকে ঘুরে নদী এসে পলিবোথরা (পাটনা) হয়ে সমুদ্রে এসে মিলেছে। এই নদীর একটি শাখাকে আর্টোমিডোরাস, ওয়েডেনেস (Oedanes) বলেছেন কারণ সেখানে কুমীর আর শুশুক দুই-ই পাওয়া যায়। এছাড়া তিনি আরও বর্ণনা দিয়েছেন কিন্তু সেগুলো এতটাই বিভ্রান্তিমূলক আর এলোমেলোভাবে দেওয়া যে তাদের আলোচনার মধ্যে আনা যায় না। তবে নিকোলাস দামাসকেনোস-এর বিবরণ কেউ এর সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন।

৭৩. তিনি বলেন যে দফনের (Daphne) নিকটবর্ত্তী যে এ্যান্টিয়োক (Antioch)-এ ভারতীয় দূতের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল, যারা রাজার কাছ থেকে বার্তা নিয়ে সীজার অগাস্টাসের কাছে চিঠি পৌঁছতে যাচ্ছিল। বার্তায় তিনজনের অধিক বার্তাবাহকের উল্লেখ ছিল, কিন্তু চিঠিতে যতজনের কথা লেখা থাকুক, তিনি তিনজনকেই দেখেন, সম্ভবত বাকি সঙ্গীরা তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়েই মারা গেছে। চিঠিটা একটা চামড়ার উপর গ্রীক ভাষায় লেখা ছিল আর পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে চিঠির লেখক রাজা পুরু (Porus)—যদিও তাঁর অধীনে ছয়শ, রাজা ছিলেন, তবু তিনি সীজারের বন্ধুত্বের জন্য আগ্রহী—তিনি তৈরি ছিলেন, সীজারকে তাঁর রাজত্বের মধ্যে দিয়ে কোনো জায়গায় যাওয়ার সুযোগ করে দিতে এবং সম্মানজনক যে কোনো বিষয়ে সীজারকে সাহায্য করতে। নিকোলাস বলেন যে সীজারকে লেখা চিঠির সারবস্তু হলো এটা, এবং উপহারসামগ্রী সীজারের কাছে তুলে দেয় আট জন ভৃত্য, তাদের পরনে ছিল একটা করে কটিবস্ত্র, বাকি দেহ নগ্ন আর সুগন্ধী মাখা। উপহারের মধ্যে ছিল হারমেস—গ্রীকদের বার্তাবাহী দেবতা, একটি মানুষ যে জন্মাবধি তার দুটো হাত ছাড়াই জন্মেছে—আমি নিজে তাকে দেখেছি, এছাড়া একটা বড় ভাইপার সাপ, প্রায় দশ কিউবিট (১কিউবিট হল ১৮ ইঞ্চি) লম্বা—একটা সাড়ে চার ফুট লম্বা নদীর কচ্ছপ আর একটা তিতির পাখি যেটা শকুনের চেয়েও বড়ো আকারের। এছাড়া এই রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে একটি লোক ছিল, যে লোকটা অ্যাথেন্সে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিল। এরা দুর্বিপাকে পড়লে আত্মহনন করে, অসুখ থেকে মুক্ত হতে আত্মহত্যা করে, আবার খুব সুখে থাকলেও আগুনে আত্মাহুতি দেয়—এই লোকটি তাই করেছিল। সে জীবনে সব কিছু পেয়েছে, তার মনে হয়েছে এখনই জীবনত্যাগ করার উপযুক্ত সময়, না হলে কোনো অজানা দুর্বিপাক তার ভবিষ্যৎ জীবনে হঠাৎ এসে পড়তে পারে—তাই হাসিমুখে, নগ্নদেহে একটা মাত্র কোমরবদ্ধ পরে সে চিতায় আরোহণ করলো। তার সমাধিতে লেখা ছিল ‘এখানে শায়িত আছেন জারমানোশেগাস, একজন ভারতীয় যিনি বারগোসার অধিবাসী—নিজেকে যিনি অমর করেছেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রথা মেনে।’