হেরোডটাস – নির্বেদ রায়
হেরোডটাস
ইতিহাস লেখার কাজ শুরু আজ থেকে আড়াই হাজার বছরের কিছু আগে। এশিয়া মাইনরের কিছু গ্রীক পণ্ডিত গদ্যরীতিকে আশ্রয় করে বিজ্ঞান, দর্শন আর ইতিহাসের কিছু কিছু বিষয় নিয়ে লেখাপত্র শুরু করেন খ্রিস্টজন্মের প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে। এশিয়া মাইনরের আইওনিয় নগরীতে তাদের বসবাস ছিল। সে লেখাপত্রে ইতিহাস বলতে ভূগোল, অর্থনীতি এমনকি নৃতত্ত্ব ঢুকে থাকত একান্তভাবে। তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রতিভা হেকাটিউসের (Hecataeus of Miletus) মতো মানুষ ছিলেন।
হেরোডটাস এই পণ্ডিতদের লেখা পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, প্রভাবিত হয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁর লেখা মহাগ্রন্থ ‘হিস্টরিজ’ বা ‘দি হিস্টরিজ’—গ্রীক ভাষায় যার অর্থ ‘অনুসন্ধান’ বা ‘গবেষণা’, তর্কাতীতভাবে ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। তিনি ‘ইতিহাসের জনক’।
হেরোডটাসের জন্ম অনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০ থেকে ৪৮০ সালের মাঝামাঝি কোনো সময়ে এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ-পশ্চিম সাগরতীরে কেরিয়া অঞ্চলের একটি শহর হ্যালিকারনেসাসে। কেরিয়ায় তখন পারসিকদের রাজত্ব।
হেরোডটাসের জীবনীকার বলেছেন যে, এক দীর্ঘ পর্যটকের জীবন ছাড়াও যুদ্ধ-বিগ্রহ, বণিকের কাজ ও এই বৈচিত্র্যময় জীবনে বহু দেশ ও জনজাতির সঙ্গে ওতপ্রোত হওয়ার ফলে তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি ছিল সমৃদ্ধ। আর লেখনী ছিল অপূর্ব। ফলে একদিকে তাঁর বিপুল অভিজ্ঞতা, সহযাত্রীদের কাছ থেকে শোনা বিবরণ আর অন্যদিকে তাঁর অপরূপ লেখার ক্ষমতা রূপ দিয়েছে ‘দি হিস্টরিজ’ মহাগ্রন্থের।
তিনি নিজে এই গ্রন্থের খণ্ড ভাগ করেননি বটে, কিন্তু পরবর্তীকালে আলেকজান্দ্রিয়ার গবেষক ও পণ্ডিতরা তাঁর ‘ইতিহাস’ গ্রন্থের নয়টি খণ্ড ভাগ করেন বিষয় অনুসারে। মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ থেকে ৪৭৯ পর্যন্ত বিস্তৃত আলোচনা আর বিবরণে সমৃদ্ধ এই কাজ।
প্রথমে মনে হয়, খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ সালে যখন পারসিকরা গ্রীস আক্রমণ করে—সেই যুদ্ধের বর্ণনা দেওয়ার জন্যই লেখা শুরু করেন হেরোডটাস, কিন্তু পরে ক্রমশ গ্রীক আর পারসিক সাম্রাজ্যের চৌহদ্দি শুধু নয়, এশিয়ার অন্যান্য রাজত্ব, তাদের পরিসর আর জনজাতি তাঁর লেখার আওতায় এসে পড়ে গুরুত্বের সঙ্গে।
এইভাবে ভারতবর্ষ তাঁর লেখায় জায়গা করে নেয় অনিবার্যভাবে। ভারত-সভ্যতা তখন পৃথিবীর প্রধান সভ্যতাগুলোর অন্যতম।
তৃতীয় খণ্ডের ৩৮, ৮৯-৯৭, ৯৮-১০৬; চতুর্থ খণ্ডের ৪০ আর ৪৪; সাত নম্বর খণ্ডের ৬৫, ৭০, ৮৬, আর ১৮৭; আট নম্বর খণ্ডের ১১৩ অনুচ্ছেদগুলোয় ভারতের উল্লেখ ও বিবরণ আছে। সাত নম্বর খণ্ডের চারটি পরিচ্ছেদে সম্রাট জেরক্সেস (Xerxes)-এর বাহিনীতে ভারতীয় পদাতিক আর অশ্বারোহী সৈন্যদের উল্লেখ আছে। অষ্টম খণ্ডে একটি পরিচ্ছেদে ভারতীয় অশ্বারোহীদের পারদর্শিতার কথা বলা হয়েছে।
জর্জ রাওলিনসন, অ্যালফ্রেড ডেনিস, গডলে, জর্জ ক্যাম্পবেল মেকলে এবং রমেশচন্দ্র মজুমদার—এই চার প্রখ্যাত পণ্ডিতদের মতামতকে আশ্রয় করে এবং বাংলায় প্রথম এই অনুবাদের কাজ করার সময় অধ্যাপক এ এল ব্যাশমের অনুপ্রেরণাটুকু স্মরণ করে সাহসী হয়ে এগিয়েছি।
হেরোডটাসের কাজ ও জীবন সম্পর্কে আধুনিক গবেষকরা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। তাঁদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৪ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪২৫ সাল পর্যন্ত হেরোডটাসের মোটামুটি জীবনকাল।
তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ উত্তরসূরী থুসিডিডিস (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০—৪০০), যাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ ‘পেলোপনেসিয়ার যুদ্ধ’ (Peloponnesian war)। তিনি বাস্তব ও বিজ্ঞানমনস্ক ইতিহাস রচয়িতাদের জনক বলে অভিহিত। থুসিডিডিস এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক কেউ কেউ হেরোডটাসের লেখায় সময়ের ক্রমপঞ্জী এবং বিবরণের কিছু ক্ষেত্রে প্রমাণের অভাব লক্ষ্য করেছেন, কিন্তু সেই সময় ওই বিস্তৃত পৃথিবী জুড়ে কোনো একটি দিনপঞ্জিকা মেনে চলা হতো না। দ্বিতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রে পণ্ডিতরা বলেছেন যে থুসিডিডিসের ইতিহাস রচনার পরিসর ছোট—শুধুমাত্র অ্যাথেন্স এবং স্পার্টার মধ্যে খ্রিস্টপূর্ব ৪১১ সালে সংঘটিত যুদ্ধ। হেরোডটাসের বিপুল পরিসরে তিনি ইতিহাস লেখেননি।

কিন্তু এই আলোচনার ক্ষেত্র গবেষকদের জন্য তুলে রেখে আমরা ইতিহাসের প্রথম সূর্যোদয়ের মুহূর্তে ভারতবর্ষের বিবরণটুকু জানার চেষ্টা করব।
আমরা জানি যে, ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের আকর উপাদান হল প্রত্নবস্তু, সমকালের সাহিত্য আর বিদেশি ঐতিহাসিক বা পর্যটকদের বিবরণ।
প্রত্নবস্তু খবর দেয় শিল্প-সংস্কৃতি, সমাজ-ব্যবস্থা, লোকবৃত্তের জীবনধারা, অস্ত্রশস্ত্রসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের, কিন্তু বিদেশী বিরবণ খুবই প্রয়োজনীয়।
আমাদের দেশে রামায়ণ আর মহাভারত, এই দুই মহাকাব্যকে ইতিহাস বলা হয় বটে, এবং সে সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা ভিন্ন। সাধারণভাবে সমকালীন সাহিত্যে ধর্মের প্রভাব প্রবল। আধুনিক ঐতিহাসিক আস্থা রাখবেন আরও বেশি যে সমকালীন ইতিহাসচর্চা বা সাহিত্যের ওপর, মুঘল যুগের আগে তার খোঁজ পাওয়া যাবে না। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইতিহাসের বিবরণ জানতে তাই বিদেশি ঐতিহাসিক আর পর্যটকদের লেখাপত্র আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
হেরোডটাসের ভারত
একথা আমাকে মানতেই হবে যে, ক্যামবাইসেস ছিলেন এক কাণ্ডজ্ঞানহীন সম্রাট। না হলে প্রচলিত ধর্ম আর প্রথাগুলো অস্বীকার করেন কী করে? কারণ, সমস্ত রাজ্যগুলোর কাছে যদি কখনো জানতে চাওয়া হয় যে সবচেয়ে সেরা নিয়মকানুন বা রীতিনীতি কোনটি— তাহলে সবরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রত্যেকে নিজের দেশের প্রথাকেই সেরা বলবে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। সুতরাং, উন্মাদ না হলে কেউ কখনো এই প্রথাগুলো নিয়ে তামাশা করে না, বিশেষ করে যারা এই রীতিগুলো মেনে চলে তাদের সঙ্গে। অনেক উদাহরণের মধ্যে থেকে আমি একটা দিচ্ছি—এই ঘটনা যখন ঘটে তখন সম্রাট দারিয়াসের আমল। অনুগত গ্রীকদের ডেকে বলা হল যে কত টাকা দিলে তারা তাদের পিতার মৃতদেহ ভক্ষণ করবে? তারা বলল, কোনো মূল্যের বিনিময়ে এ কাজ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। দারিয়াস এরপর ‘ক্যালেটিয়ে’ গোষ্ঠীর ভারতীয়দের ডেকে পাঠান, যারা মৃত পিতার শব ভক্ষণ করে থাকে। তাদের প্রশ্ন করা হল (গ্রীকরা তখন উপস্থিত ছিল আর দোভাষীর মাধ্যমে তারা প্রশ্ন-উত্তর শুনতে ও বুঝতে পারছিল) যে কোনো কিছুর বিনিময়ে তারা পিতার মৃতদেহ আগুনে সংস্কার করতে রাজি কি না? উত্তরে এই ভারতীয়রা আর্তকণ্ঠে বলে উঠল যে সম্রাট যেন তাদের এই ভয়াবহ কাজ করার কথা কখনো না বলেন। এত দৃঢ় তাদের বিশ্বাস এই প্রথার উপর যে, পিণ্ডারের কবিতার কথা মনে পড়ে। তিনি ঠিক কথাই বলেছিলেন, ‘প্রথা আমাদের আসল ঈশ্বর। আমরা সেটাই মেনে চলি।’

দারিয়াস যে বিরাট সাম্রাজ্য শাসন করতেন, সে রাজত্ব তিনি কুড়িটি প্রদেশে ভাগ করে দিয়েছিলেন। প্রতিটি প্রদেশের জন্য একজন করে অধিকর্তা বা ক্ষত্রপ নিযুক্ত করেন। প্রত্যেকটি প্রাদেশিক শাসনকর্তা বা ক্ষত্রপকে কর দিতে হতো সম্রাটকে, নির্ধারিত হারে।
এরপর হেরোডটাস কুড়িটি প্রদেশ আর তাদের প্রত্যেকের করের পরিমাণ ও বিবরণ দিয়েছেন—কর বা রাজস্ব অথবা উপঢৌকন দিতে হতো বার্ষিক হিসাবে। যেসব প্রদেশ রুপো দিয়ে সে উপহার প্রদান করত তাদের ব্যাবিলনীয় ট্যালেন্ট (১ ট্যালেন্ট = ৩০.৩ কিলোগ্রাম = ৬৭ পাউন্ড) মাপে সেটা দিতে হতো। আর যারা সোনার গুঁড়ো বা সোনা দিত তাদের উবোইক ট্যালেন্ট (১ ব্যাবিলনীয় ট্যালেন্ট =৭৮ উবোইক ট্যালেন্ট) মাপে দিলেই চলত। সম্রাট সাইরাস আর ক্যামবাইসেসের আমলে কোনো নির্দিষ্ট হারে রাজস্ব দিতে হতো না বটে, কিন্তু উপহার দিতে হতো সব প্রদেশকে। দারিয়াস এসে প্রত্যেকের রাজস্বের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দিলেন; পারসিকরা এজন্য এবং আরও কিছু নিয়মকানুন চালু করার কারণে সম্রাট দারিয়াসকে ‘বণিক’ বা ‘ব্যবসাদার’ বলে ডাকত। ক্যামবাইসেস-কে বলত ‘মালিক’ আর সাইরাসকে ‘পিতা’ বলে তারা সম্বোধন করত। কারণ দারিয়াস সব কাজের মধ্যে মুনাফাটুকু বুঝে নিতেন, ক্যামবাইসেস ছিলেন উগ্র মেজাজের, উদ্ধত প্রকৃতির মানুষ আর সাইরাস ছিলেন উদার, ক্ষমাশীল ও প্রজাদের মঙ্গলকামী।
দারিয়াসের প্রথম প্রদেশের অধিবাসী ছিল আইয়নীয়, ম্যাগনেশিয় (এশিয়ার অধিবাসী), ইলিয়, কেরিয়, লিসিয়, মিলিয়ার এবং প্যামফিলিয়ার জনজাতি; এরা সকলে মিলে চারশো ট্যালেন্ট রুপো সম্রাটকে উপহার দিত প্রতি বছর।
দ্বিতীয় প্রদেশে ছিল মিশিয়, লিডিয়, ল্যাসোজিয়া, ক্যাবালিয় ও হাইটেনিয় জনজাতির মানুষজন। তাদের বাৎসরিক রাজস্ব দিতে হতো পাঁচশো ট্যালেন্ট ওজনে রুপো।
হ্যালেসপনটিয় জনজাতির যে ভাগ নদীর মোহনার মুখে দক্ষিণদিকে বসবাস করত, এ ছাড়া ফ্রিজিয়, এশিয়ায় যেসব থ্রেসিয় জনজাতির মানুষরা থাকে প্যাফলাগেনিয়, ম্যারিয়াডিনিয় এবং সিরিয়ারা মিলেমিশে তৈরি হয়েছিল তৃতীয় প্রদেশ। তাদের বরাদ্দ ছিল তিনশো ষাট ট্যালেন্ট রাজস্ব।
চার নম্বর প্রদেশ সিলিসিয়া। প্রতিদিন একটা সাদা রঙের ঘোড়া দিতে হতো তাদের। বছরে তিনশো ষাটটি ঘোড়া। আর পাঁচশো ট্যালেন্ট রুপো, যার মধ্যে একশো চল্লিশ ট্যালেন্ট বছরে খরচ হতো ওই ঘোড়ার সওয়ারিদের জন্য, যারা সিলিসিয়ার রক্ষী ছিল। বাকি তিনশো ষাট ট্যালেন্ট দারিয়াসকে পাঠাতে হতো।
পোসাইডন নগর আর মিশরের মাঝখানের অঞ্চল জুড়ে ছিল পাঁচ নম্বর প্রদেশ। এই নগর সিলিসিয়া আর সিরিয়ার সীমান্তে স্থাপন করেছিলেন এ্যামফিয়ারসের পুত্র এ্যামফিলোকাস। কিন্তু এই অঞ্চলের যে অংশ আরবদের দখলে ছিল, তারা কোনো কর বা রাজস্ব দারিয়াসকে দিত না। পুরো অঞ্চলটাই ফিনিশীয় বসতি, আর সিরিয়ার অংশ বলতে প্যালেস্টাইন আর সাইপ্রাস ছিল। রাজস্বের পরিমাণ তিনশো পঞ্চাশ ট্যালেন্ট।
ষষ্ঠ প্রদেশ মিশর আর লিবিয়ার অংশ। তার সঙ্গে সাইরিন আর বার্সা। এইখান থেকে আসত সাতশো ট্যালেন্ট আর বিশাল মোয়েরি হ্রদের মাছ বিক্রি করে যে লাভ হতো তার অংশ রৌপ্যধাতুতে। এছাড়া খাদ্যশস্য এক লক্ষ কুড়ি হাজার বুশেল।
সাত্তাজাইদি, গান্দারাই, ডেডিসি, অপারাইটি একসাথে যোগ করে যে সাত নম্বর প্রদেশ ছিল, তারা দিত একশো সত্তর ট্যালেন্ট। সুসা আর সিসিয় অঞ্চলের অবশিষ্ট ভাগ মিলে তৈরি হয়েছিল আট নম্বর প্রদেশ, তারা দিত তিনশো ট্যালেন্ট।
নবম প্রদেশটি থেকে দারিয়াস পেতেন এক হাজার ট্যালেন্ট রুপো। আর পাঁচশো ‘খোজা’ ছেলে! ব্যাবিলন আর আসিরিয়ার অংশ নিয়ে তৈরি হয়েছিল এই প্রদেশ।
ইকবাতানা আর মিডিয়ার অবশিষ্ট অংশ মিলে তৈরি হয়েছিল দশম প্রদেশ। পারিকার্নিয় আর অর্থোকরিবেনটিও জনজাতি বাস করত এই অঞ্চলে। চারশো পঞ্চাশ ট্যালেন্ট রুপো ধার্য ছিল তাদের জন্য।
এগারো নম্বরের রাজস্ব ছিল দুশো ট্যালেন্ট। ক্যাসপাই-পসিসি, প্যানটিমাটি আর দারিটি মিলে এই কর দিত।
ইগলি-র প্রান্তসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত ব্যাকট্রিয়দের দ্বাদশতম প্রদেশ দিত তিনশো ষাট ট্যালেন্ট।
প্যাকটাইস আর ইয়োক্সিন সাগরের তীর পর্যন্ত বিস্তৃত আর্মেনিয় ভূ-ভাগের মানুষ দিত চারশো ট্যালেন্ট ত্রয়োদশ প্রদেশ হিসাবে।
চোদ্দোতম প্রদেশের মধ্যে ছিল সগারটাই, সারানজি, থামানাই, উটাই, মাইসি আর দক্ষিণ সমুদ্রের সেই সমস্ত দ্বীপ যেখানে রাজা সমস্ত উদ্বাস্তু মানুষদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। রাজস্ব ধার্য করা ছিল ছয়শো ট্যালেন্ট।
শখি আর ক্যাসপাই মিলে পনেরোতম, আড়াইশো ট্যালেন্ট আর পার্থিয়, কোরাসমিয়, সোগডি আর আরই মিলে ষোলো নম্বর প্রদেশকে তিনশো ট্যালেন্ট জমা দিতে হতো।
এছাড়া যেসব মিশরীয় আর পারিসানাই এশিয়ায় বসবাস করে তারা সতেরো নম্বর, দিতে হয় চারশো ট্যালেন্ট, আঠারো নম্বর মাতিনি, সাসপিরি আর আলারোদাই দেয় দুশো ট্যালেন্ট। মোসচি, তিবেরেনি ম্যাক্রন, মোসিনোচি আর মেয়ার—দেয় তিনশো ট্যালেন্ট, উনিশতম প্রদেশ হিসাবে।
ভারতীয়রা হল বিশতম প্রদেশ। তাদের চেয়ে বেশি জনসংখ্যা কোনো প্রদেশে নেই। তারা রাজস্বও দেয় সবার চেয়ে বহুগুণ বেশি—তিনশো ষাট ট্যালেন্ট সোনার গুঁড়ো।
এখন যদি এই ব্যাবিলনীয় রৌপ্য ট্যালেন্টকে ইউবোয়িক টাকাতে হিসাব করা যায় তাহলে দাঁড়াবে নয় হাজার আটশত আশি ইউবোয়িক ট্যালেন্ট।
এবং স্বর্ণমুদ্রা মানে রৌপ্যমুদ্রার তেরো গুণ মূল্য হিসাব করলে, স্বর্ণরেণুর মূল্য দাঁড়ায় চার হাজার ছয়শো আশি ইউবোয়িক ট্যালেন্ট। সুতরাং সব যোগ করলে দারিয়াসের বাৎসরিক কর দাঁড়ায় চৌদ্দ হাজার পাঁচশ ষাট ট্যালেন্ট; আমি এখানে দশ-এর নীচে কোনো সংখ্যাকে হিসাবে ধরিনি।
এশিয়া আর লিবিয়া থেকে দারিয়াস এই রাজস্ব সংগ্রহ করে থাকেন। লিবিয়ার কিছু অংশ থেকেও এই রাজস্ব আসে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দারিয়াসের কর আরও বিভিন্ন জায়গা থেকে আসতে শুরু করে; দ্বীপগুলো থেকে, এমনকি ‘থেসালি’ পর্যন্ত ইয়োরোপের বিভিন্ন অধিবাসীদের কাছ থেকে।
এই কর বা রাজস্ব দারিয়াস সঞ্চিত রাখেন; এই সমস্ত মুদ্রা বা স্বর্ণরেণু গলিয়ে সেটি মাটির পাত্রে রাখেন, পাত্র ভর্তি হয়ে গেলে তখন পাত্র ভেঙে ফেলেন, আর যতটা মুদ্রা তাঁর প্রয়োজন ততটাই রাখেন।
এই হল শাসনব্যবস্থা আর রাজস্ব নির্ধারণের বিবরণ। শুধু মাত্র পারস্য দেশকে আমি এই রাজত্বের সীমা থেকে বাইরে রেখেছি; কারণ, পারস্যের মানুষ কর দেয় না, তারা কর থেকে মুক্ত।
আর যারা রাজস্ব দেয় না, কিন্তু উপহার প্রদান করে, তাদের মধ্যে প্রথমে আসে ইথিওপিয়রা, এই ইথিওপিয়রা মিশরের কাছে থাকে, ক্যামবাইসিস যাদের পরাজিত করেন; দীর্ঘজীবী ইথিওপীয়দের দিকে সেনা নিয়ে যাত্রা করার সময়, আর যে সব মানুষ বাস করে পবিত্র নাইসার কাছে, যাদের উৎসবে তারা ডাইওনোসিসকে দেবতা হিসাবে পূজা করে। এই ইথিওপীয়রা আর তাদের প্রতিবেশীরা একই বীজ ব্যবহার করে, যে বীজ ভারতীয় ক্যালানটিয়াই বা নরমাংসভোজীরা ব্যবহার করে, তারা মাটির তলায় বসবাস করে।
এরা মিলে প্রতি এক বছর মাঝখানে বাদ দিয়ে ধরলেও দুই খৈনিস্ক (চার পাঁইটের অধিক শুকনো বস্তু) অপরিশোধিত সোনার গুঁড়ো, দুইশত আবলুশ কাঠের বড় খণ্ড, পাঁচজন ইথিওপিয় ছেলে আর কুড়িটা বড় হাতির দাঁত পাঠায়।
কোলচিয়ানদের থেকেও উপহার আসে। উপহার আসে তাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও যারা সেই সুদূর ককেশাস পর্বতমালায় বাস করে (যতদূর পর্যন্ত পারসিক রাজত্ব বিস্তৃত ততদূর পর্যন্ত, তারপর ককেশাসের উত্তরে যারা থাকে তারা পারসিকদের আদৌ শ্রদ্ধা করে না); প্রতি চার বছরে সেখান থেকে একশো ছেলে আর একশো অবিবাহিত মেয়ে পাঠানো হয়।
আরব থেকে হাজার হাজার ট্যালেন্ট ওজনের সুগন্ধী ওষধি আসে প্রতি বছর। এই সব উপহার রাজা পেয়ে থাকেন কর বাদ দিয়েও।
কিন্তু বিশতম প্রদেশ ভারত থেকে, এই বিরাট পরিমাণ সোনা তারা কর হিসাবে দিতে পারত কারণ তাদের দেশের মরুভূমি থেকে সোনা সংগ্রহের এক আশ্চর্য কৌশল তাদের জানা ছিল। বিশদভাবে সেই অদ্ভুত বিবরণ পেশ করার আগে প্রাথমিকভাবে ভারতের একটা সামাজিক ও ভৌগোলিক বর্ণনা দিয়েছেন হেরোডটাস।
তাঁর কথামতো, সূর্যোদয়ের দিকে ভারতবর্ষের যে ভূখণ্ড বিস্তৃত তা শুধুই বালিতে ঢাকা। এশিয়ার যে সমস্ত জাতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে এই ভারতীয়রাই হল সবচেয়ে পূর্বদিকের বাসিন্দা। তারপরই শুরু হয়েছে দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমি।
ভারতীয়দের মধ্যে অনেক উপজাতি, তারা কথাও বলে বিভিন্ন ভাষায়। এদের মধ্যে কেউ যাযাবর, কেউ বা পশুপালক আবার অন্য জীবিকার লোকজনও রয়েছে।
নদীর তীরে জলাভূমিতে যে ভারতীয়রা বাস করে তারা শর বা বাঁশের ভেলায় চড়ে নদীতে মাছ শিকার করে। এরা কাঁচা মাছ খায়। তাছাড়া নদীর ধারে জন্মানো এক ধরনের নল-খাগড়া বা শর পিটিয়ে দিয়ে মাদুরের মতো বুনে তারা গায়ে দেয়। বুকের ওপর বর্মের মতো আচ্ছাদনও ওই মাদুর দিয়েই তারা তৈরি করে।
আরও পুবদিকের যে যাযাবর ভারতীয়রা কাঁচা মাংস খেতে অভ্যস্ত তাদের বলে ‘প্যাডিয়ান’। এদের দলের মধ্যে কোনো পুরুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার সবচেয়ে নিকট আত্মীয় বা স্বজন তার মৃত্যুর ব্যবস্থা করে; স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে করে তার নিকট আত্মীয়ারা। অসুস্থ লোক এভাবে মরতে না চাইলে হত্যা করা হয়। কারণ তারা বিশ্বাস করে অসুখে ভুগে ভুগে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার মাংস নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তাদের মেয়ে ফেলে তাদের মাংসে ভোজের ব্যবস্থা করাটাই এদের রীতি।
অবশ্য সব ভারতীয়দের রীতি এক নয়। একদল ভারতীয়ও আছে যারা কোনোরকম প্রাণীহত্যা করে না, শস্য বোনে না, এমনকী ঘরবাড়ি বানিয়ে থাকতেও তারা অভ্যস্ত নয়। লতাগুল্ম খেয়েই এর বেঁচে থাকে আর মাটির ওপর নিজের থেকে জন্মানো ভুট্টার আকারের এক ধরনের শস্যদানা সেদ্ধ করে খোসাশুদ্ধ খায়। দলের মধ্যে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সে নিজেই মরুভূমিতে চলে গিয়ে শুয়ে পড়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করে। তার সম্পর্কে কেউ আর চিন্তাভাবনা করে না, খোঁজখবরও নেয় না।
যে সমস্ত ভারতীয়দের কথা এতক্ষণ বলা হল এরা সবাই পশুপাখির মতোই যেখানে-সেখানে সঙ্গমে লিপ্ত হয়। মিশরীয়দের মতোই এদের গায়ে রং তামাটে, আর শুধু তাই নয়—এমনকি এদের বীর্যের রং-ও মিশরীয়দের মতোই কৃষ্ণবর্ণের, অন্য মানুষদের মতো শ্বেতবর্ণের নয়। এইসব ভারতীয়রা পারস্য থেকে বহুদূর দক্ষিণে থাকে। এরা কেউই দারিয়াসের প্রজা নয়।
কিন্তু উত্তরে ক্যাসটাপাইরাস নগর আর প্যাকটাইস রাজ্যের সীমান্তে যে যুদ্ধপ্রিয় ভারতীয়রা বসবাস করে তাদের জীবনযাত্রা ব্যাকট্রিয়ানদের অনুরূপ। দারিয়াসকে এরাই সোনার গুঁড়ো কর দিয়ে থাকে।
এই ভারতীয়রা যে ভূখণ্ডে বাস করে তার কাছেই বিস্তৃত বিশাল মরুভূমিতে আছে বিরাট আকারের একজাতের পিঁপড়ে। আকারে কুকুরের মতো না-হলেও শেয়ালের চেয়ে বড় তাদের এক-একটা নিশ্চয়ই। এরকম কয়েকটা পিঁপড়ে এখন পারস্যরাজের কাছে আছে।
গ্রীসের সাধারণ পিঁপড়ের মতো এই বিরাট পিঁপড়েরাও মাটির তলায় গর্ত খুঁড়ে থাকে, এমনকী ওই গর্ত খোঁড়া বালিও একইভাবে তারা গর্তের মুখে ঢিবির মতো করে জমা করে। ওই জমা করা বালিতেই মিশে থাকে সোনা। ভারতীয়রা সেই বালি সংগ্রহ করতেই মরুভূমিতে যায়।
তারা প্রত্যেকে সঙ্গে তিনটে করে উট নেয়। কারণ উট ঘোড়ার চেয়ে কিছু কম জোরে দৌড়ায় না তো বটেই, উল্টে অনেক বেশি বোঝা টানতে পারে। তিনটের মধ্যে দু’পাশে দুটো পুরুষ উট আর মাঝে থাকে একটা স্ত্রী-উট। স্ত্রী-উটটাকে তারা এমনভাবে বেছে নেয় যার সবে বাচ্চা হয়েছে। তারই পিঠে সওয়ার হয়ে দুটো উটকে তারা চালিয়ে নিয়ে যায়।
আমি উটের কোনো বিবরণ গ্রীকদের কাছে দিতে চাই না। কারণ, তারা সেটা জানে; কিন্তু তাদের কয়েকটা ব্যাপার বলতে চাই, যেগুলো উট সম্পর্কে তারা জানে নাঃ উটের পিছনের পা দুটোয় চারটে উর্বস্থি (Thigh bone) আর চারটে জানুসন্ধি বা হাঁটু; আর এদের জননেন্দ্রিয় পিছনের দুটো পায়ের মাঝখানে লেজের দিকে মুখ করা থাকে।
এরপর উটের আরও কিছু বিবরণ দেওয়ার পর হেরোডটাস বলেছেন যে, সোনা সংগ্রহের অভিযানে বেরোবার সময়ে কিন্তু একটা ব্যাপারে ভারতীয়রা নিশ্চিন্ত হয়ে নিত যাতে সংগ্রহের কাজটা তারা দিনের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়টুকুর মধ্যে শেষ করতে পারে। কারণ, ওই সময়ই পিঁপড়েরা মাটির তলায় থাকে। সকালের দিকটাই ভারতে সবচেয়ে গরম, দুপুরের পর সূর্যের তাপ কমে আসতে থাকে, সন্ধের পরে রীতিমতো ঠান্ডা পড়ে, ভারতীয়রা সেজন্য সকালেই স্নান করে।
মরুভূমিতে পৌঁছে ভারতীয়রা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সঙ্গের বস্তাগুলোয় বালি ভরার কাজ শেষ করে। কারণ পিঁপড়েরা মাটির ওপর জমায়েত হওয়ার আগেই ফেরার পথে রওনা হতে না পারলে আর রক্ষে নেই! কেননা পারসিকরা বলে এই পিঁপড়েদের সঙ্গে কোনো জন্তুই দৌড়ে পারে না।
ফেরার পথে পুরুষ উটগুলো কিছুটা আস্তে দৌড়োলেও স্ত্রী-উটরা তাদের বাচ্চাদের জন্য উতলা হয়ে খুবই জোরে দৌড়োয়। ফলে এইভাবেই ভারতীয়রা তাদের সংগৃহীত সোনার বড় অংশটা জোগাড় করে নেয়। বাকি অংশটুকু নদীর জল থেকে আর মাটি খুঁড়ে তারা সংগ্রহ করে।
সভ্যতার প্রান্তসীমায় যে সমস্ত দেশ অবস্থিত সেসব জায়গায় কিছু কিছু আশ্চর্য সম্পদ পাওয়া যায়। গ্রীস দেশে যেমন আছে সবচেয়ে সুন্দর সামঞ্জস্যপূর্ণ আবহাওয়া, সবচেয়ে পূর্বদিকে অবস্থিত বলে ভারতবর্ষের সমস্ত পশুপাখিই পৃথিবীর যে-কোনো দেশের তুলনায় আকারে-আয়তনে অনেক বড়। একমাত্র ঘোড়া ছাড়া। ভারতীয় ঘোড়ার চেয়ে মেডিক শ্রেণীর নাইসিয় ঘোড়া বড়। তাছাড়া ভারতে এক ধরনের বুনো গাছ হয় যে গাছে ফলের বদলে পশম জন্মায়। ভেড়ার লোমের থেকে যে পশম পাওয়া যায় তার চেয়ে এই পশম মিহি এবং সুন্দর। ভারতীয়রা এই পশম দিয়ে পোশাক তৈরি করে।
দারিয়াসের অধীনে এশিয়ার এক বিরাট ভূখণ্ড জুড়ে অভিযান চলেছিল। সিন্ধুনদ কোনখানে গিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছে, সেই মোহনা খুঁজে বের করতে দারিয়াস জলপথে যে ক’জন বিশ্বাসী অভিযাত্রীকে পাঠিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হল আমাদের প্রতিবেশী শহর ক্যারিয়ানডার অধিবাসী স্কাইল্যাস্ক। এই সিন্ধুনদ হল পৃথিবীর দ্বিতীয় নদী যেখানে কুমীর রয়েছে।
প্যাকটাইস রাজ্য আর ক্যাসপাটাইরাস নগরের সীমান্ত থেকে যাত্রা শুরু করে অভিযাত্রীরা নদীপথে পাড়ি দিয়েছিল সূর্যের উদয় যে দিকে হয় সেই পূর্বদিকে। তারপর সমুদ্রপথে পশ্চিমে পাড়ি দিয়ে তিরিশ মাসের মাথায় তারা এসে পৌঁচেছিল সেই জায়গায় যেখান থেকে মিশরের রাজা ফোনিসিয়ানদের পাঠিয়েছিল জলপথে লিবিয়া ঘুরে আসতে। অভিযাত্রীরা ফিরে আসার পর দারিয়াস অভিযান করে ভারতীয়দের বশীভূত করেন।
ভারতীয়রা গাছ থেকে উৎপন্ন পশমের জামা পড়ে, বাঁশ বা নলখাগড়া দিয়ে তৈরি ধনুক আর তীর ব্যবহার করে। তীরের ফলায় লোহা থাকে। এই অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তারা ফারনাজাথ্রেসের সৈনাপত্যে যুদ্ধে যোগদান করে। এই ফারনাজাথ্রেস হল আর্টাবেটিস-এর পুত্র।
মিশরের উপর দিকে যে ইথিত্তপীয় মানুষরা থাকে তাদের ও আরবদেশীয়দের নেতৃত্ব দেন আরসামেস (Arsames), কিন্তু যে সব ইথিওপীয় পূর্বদিকে থাকে (কারণ, দুই ধরনের ইথিওপীয়রাই সেনাদলে যোগ দেয়), তারা ভারতীয়দের সঙ্গে বাহিনীতে কাজ করে; তাদের সঙ্গে অন্য ইথিওপীয়দের দেখতে এমন কিছু আলাদা নয়, শুধু চুল আর যে ভাষায় কথা বলে, সে দুটো ছাড়াঃ পুবদিকের ইথিওপীয়দের চুল লম্বা, সোজা হয়, কিন্তু লিবিয়া থেকে যে ইথিওপীয়রা আসে তাদের চুল সব থেকে রোমশ আর পশমের মতো।
এশিয়া থেকে এই যে ইথিওপীয়রা আসে তারা অধিকাংশ ভারতীয়দের মতো অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকে, কিন্তু ওরা মাথায় ঘোড়ার কপালের চামড়া পরে থাকে, চামড়াটা ঘোড়ার কপাল, কেশর আর দুটো কান মিলে থাকে; ঘোড়ার কান দুটো শক্তভাবে খাড়া হয়ে থাকে; ঢাল হিসাবে তারা সারসের চামড়া থেকে ছোট ছোট ঢাল তৈরি করে।
মিডিয় অশ্বারোহীরা তাদের পদাতিক বাহিনীর মতোই সজ্জিত ছিল, আর সিসিয়ানরাও ছিল একইরকম। ভারতীয়রা তাদের পদাতিক বাহিনীর মতোই অস্ত্র ধারণ করত, তারা দ্রুতগামী ঘোড়ায় আরোহণ করত আর রথ চালানোয় পারদর্শী ছিল। রথ টানত ঘোড়া আর বুনো গাধা। ব্যাকট্রিয়রাও তাদের পদাতিকদের মতো সশস্ত্র ছিল, এবং কাস্পিও-রাও।
লিবিয়ার অধিবাসীরাও তাদের পদাতিক বাহিনীর অনুরূপ অস্ত্রে সজ্জিত থাকত, এবং তাদের সবাই রথ চালাতে পারত। একই রকম ভাবে কাস্পীয়রা এবং প্যারিকানিয়রা তাদের পদাতিক বাহিনীর মতোই অস্ত্র বহন করত। আরবরাও যে অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত থাকত বা যে সব অস্ত্র বহন করত, সেগুলো সবই তাদের পদাতিক বাহিনীরা যা ব্যবহার করত তাই, আর তারা সবাই বাহন হিসাবে উট ব্যবহার করে, যারা ঘোড়ার থেকে কম দ্রুতগামী নয়।
এই হল জেরসেস-এর পুরো বাহিনীর সংখ্যা। যদিও তার মধ্যে কত রাঁধুনি মহিলা, কতজন নপুংসক, কঞ্চুকী আর কতজনই বা উপপত্নী কি নাগরী ছিল তা বলা সম্ভব নয়, যেমন কত ভারবাহী পশু সঙ্গে যাচ্ছিল অথবা কত সংখ্যায় ভারতীয় কুকুর এই বিশাল দলের সঙ্গে যাচ্ছে সেটা বলা মুশকিল। তাই আমার কাছে এটা অবাক হওয়ার ব্যাপার নয় যে জলের স্রোত অনেকগুলোই শুকিয়ে গেছে। কিন্তু যেটা আমায় বিস্মিত করছে, তা হল এই লক্ষ লক্ষ মানুষের অন্নের সংস্থান হচ্ছে কীভাবে?
কারণ, আমার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষ যদি এক খৈনিক্স (choenix) বা দুই পাঁইটের বেশি গম মাথাপিছু বরাদ্দ হিসাবে নেয় তাহলে প্রতিদিন এগারো লক্ষ তিনশ চল্লিশ বুশেল (প্রতি বুশেল মানে আট গ্যালন শুকনো বস্তু)। আমি এই হিসাবের মধ্যে মহিলা, হিজরে, ভারবাহী জন্তু আর কুকুরদের খাদ্য ধরিনি। এই বিশাল বাহিনীতে মহিমা আর সৌন্দর্য্যে জেরসেস-এর কোনো তুলনা কারো সঙ্গে হয় না। ফলে তিনিই নেতৃত্ব দিতেন।
যারা জোরসেস (Xerxes) এর সঙ্গে ছিল তারা সাগরে যুদ্ধ করার পর কিছুদিন বিশ্রাম নিয়ে (বা অপেক্ষা করে) তারপর বোয়েঅশিয়ার (Bocotiar) দিকে এগোলো, যে রাস্তা দিয়ে তারা স্থলপথে এসেছিল, সেই একই রাস্তা ধরে। মার্ডিনাস চাইছিল রাজাকে সরকারি নিরাপত্তা দিতে, সেটা যুদ্ধকালীন সময়ে পাওয়া যায়—এবং ভেবেছিল এই সময়টা যুদ্ধের উপযোগী সময় নয়, তার মনে হয়েছিল থেসলিতে যুদ্ধ করার জন্য শীতকাল উপযুক্ত সময় আর তারপর পেলোপলিস আক্রমণ করার সময় বসন্তকাল।
যখন তারা থেসালিতে পৌঁছলো, মারডোনিয়াস প্রথমে মৃতুঞ্জয়ী পারসিকদের বেছে নিল, তবে তাদের প্রধান হাইডারনেসকে বাদ দিয়ে, কারণ সে রাজার রক্ষাকর্তা হিসাবে থাকবে বলল, তাছাড়া সঙ্গে রইলো পারসিক অশ্বারোহী সৈনিক, এক হাজার ঘোড়া, আর মেড, শক, ব্যাকট্রিয় আর ভারতীয়দের পদাতিক আর অশ্বারোহী সেনা।
যে সমস্ত দেশ থেকে এই সৈন্যদের নিয়ে সেনাদল তৈরি করা হয়েছিল, তার সব বন্ধু দেশ; সমস্ত দেশ থেকে সেরা মানুষদের বাছাই করেছিল মারডোনিয়াস, যারা শ্রেষ্ঠ আর কাজের লোক কেবলমাত্র তাদের। সবচেয়ে বেশি ছিল পারসিক সেনা (সোনার কণ্ঠহার আর কঙ্কন বা করভূষণ কবজির অলঙ্কার পরে থাকতো যারা) অন্য দেশের তুলনায়, তারপরে থাকতো মিড; তারাও পারসিকদের মতোই সংখ্যায় একইরকম ছিল, কিন্তু পারসিকদের মতো বলিষ্ঠ চেহারা ছিল না। সেই সব লোকজন মিলে মিশে, অশ্বারোহী সেনা ধরে, সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল তিন শত সহস্র বা তিন লক্ষ মানুষের।’
