Accessibility Tools

জলঙ্গীর অন্ধকারে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

জলঙ্গীর অন্ধকারে – ১১

গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে একবার ভালো করে তাকালেন বক্সী৷ তারপর তিনি মল্লারদের দেখতে পেয়ে হাত নেড়ে ডাকলেন৷ মল্লার আর চূর্ণী তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি মৃদু বিস্মিত ভাবে বললেন, ‘আপনারা ফিরে যাননি! এতদিন ধরে এখানেই রয়েছেন! ব্যাপারটা কী বলুন তো?’

মল্লার প্রশ্ন শুনে জবাব দিল, ‘ফিরে গিয়েছিলাম৷ আবার কালই এখানে এসেছি বাচ্চাগুলোকে দেখতে৷’ কৌশলে এখানে আসার কারণ চেপে গেল সে৷

তার কথা শুনে বক্সী তাঁর ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘হয়তো বা এরপর আর আপনাদের এখানে আসার কোনও প্রয়োজন হবে না৷’

চূর্ণী বলল, ‘তার মানে?’

সরকারি অফিসার বক্সী বললেন, ‘তমসাময় কোথায়? তাঁকে ডাকুন৷ তারপর সব বুঝতে পারবেন৷’

তমসাময়কে অবশ্য ডাকতে হল না৷ তাঁর ঘরের দিকে তাকিয়ে মল্লার দেখতে পেল গাড়ির শব্দ পেয়ে তিনি বাইরে বেরিয়ে এসেছেন৷

তমসাময় এসে উপস্থিত হলেন মল্লারদের কাছে৷ বুনোও হাজির হল৷ তমসাময় হাসি মুখে বক্সীকে নমস্কার জানিয়ে বললেন, ‘কোনও খবর এনেছেন?’

অফিসার গম্ভীর ভাবে বললেন, ‘খবর এনেছি ঠিকই, তবে সেটা আপনার পক্ষে ভালো কি না জানি না৷ আপনার আবেদন পত্র পরীক্ষা করে দেখার পর তা নাকচ করে দিয়েছে সরকার৷’

সরকারি অফিসারের কথা শুনে তমসাময় বললেন, ‘তবে কি আবার নতুন করে দরখাস্ত জমা দিতে হবে?’

অফিসার জবাব দিলেন, ‘না, তা আর করে কোনও লাভ নেই৷ সরকারের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে এ অঞ্চলে নতুন করে কোনও অনাথ আশ্রমকে অনুমোদন দেওয়া হবে না৷’

মিস্টার বক্সীর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মল্লার আর চূর্ণী দেখতে পেল ছেলেদের থাকার জায়গার দিক থেকে সোহমও আসছে৷

তমসাময় সরকারি অফিসারকে প্রশ্ন করলেন, ‘আমাকে কী করতে হবে, কোথায়, কার কাছে যেতে হবে বলুন? সেখানেই গিয়ে আমি আশ্রমের অনুমোদনের জন্য দরবার করব৷’

বক্সী বললেন, ‘বললাম তো, ওসব করে আর লাভ হবে না৷ সরকারি সিদ্ধান্ত এভাবে বদল করা যায় না৷’

তাঁর কথা শুনে কী বলবেন তা ঠিক বুঝে উঠতে না পেরেই সম্ভবত নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন তমসাময়৷ সোহম এবার সেখানে এসে হাজির হল৷

বক্সী প্রশ্ন করলেন, ‘ছেলেগুলো কোথায়? ঘরেই আছে তো?’

তমসাময় জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ ঘরেই আছে৷’

একটু চুপ করে থেকে বক্সী বললেন, ‘আমরা যে কারণে এখানে এসেছি সেটা এবার আপনাকে বলি, বাচ্চাগুলোকে নিয়ে যেতে এসেছি৷ ওরা এবার থেকে সরকারি হোমে থাকবে৷’

কথাটা শুনে তমসাময় আঁতকে উঠে বললেন, ‘কী বলছেন! ছেলেরা আশ্রম ছেড়ে চলে যাবে! কত কষ্ট করে ওদেরকে আমি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছি, আমার যা ছিল তা দিয়ে ওদের জন্য আশ্রম গড়ে তুলেছি! আমি নিজের জীবনের থেকেও ওদের বেশি ভলোবাসি৷ আর ওরা চলে যাবে!’

অফিসার বললেন, ‘হ্যাঁ, আর আজই ওদেরকে আমরা নিয়ে যেতে এসেছি, জেলার অপরপ্রান্তে কল্যাণীর এক সরকারি হোমে ওদের নিয়ে যাওয়া হবে৷’

কথাটা শুনে তমসাময় আবারও আঁতকে উঠে বললেন, ‘এ কী বলছেন আপনি! ওদের ছাড়া আমি থাকব কীভাবে? ওরাই তো আমার জীবনের সবকিছু৷’

বক্সী প্রথমে একটু কঠিন কণ্ঠে বললেন, ‘হ্যাঁ, আজই ওদের আমার সঙ্গে যেতে হবে৷ সরকারি নির্দেশ এমনই৷’

একথা বলে একটু থেমে তিনি তমসাময়কে বোঝাবার জন্য একটু নরম স্বরে বললেন, ‘সরকার চাচ্ছেন না ছেলেগুলো আর একদিনও এখানে থাকুক৷ এই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে শিশু পাচারকারীর দল সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে আমাদের ডিপার্টমেন্টের কাছে খবর আছে৷ ধরুন যদি কোনও রাতে তেমন একটা দল এখানে হামলা চালাল, বন্দুক দেখিয়ে, বাচ্চাগুলোকে তুলে নিয়ে গেল! তখন পারবেন তাদের আটকাতে? পরদিন সকালে যখন পুলিশের কাছে খবর যাবে তখন হয়তো তারা বাচ্চাগুলোকে নিয়ে সীমান্ত টপকে বাংলাদেশে চলে গেছে৷ তখন আর কিছু করার থাকবে না আমাদের৷ পুলিশের কাছে খবর আছে অনেক সন্দেহভাজন লোক এ তল্লাটে যাওয়া আসা শুরু করেছে৷ কার মনে কী আছে তা বলা যায় না৷’ এ কথা বলে তিনি তাকালেন মল্লারদের দিকে৷

মল্লাররা এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল বক্সী আর তমসাময়ের কথোপকথন৷ কিন্তু মিস্টার বক্সী তার কথা শেষ করে মল্লারদের দিকে এমনভাবে তাকালেন যে মল্লার বলে উঠল, ‘আপনি কি আমাদেরও ছেলে পাচারকারী ভাবছেন নাকি? এর আগের দিন তো পরিচয়পত্র দেখলেন তবু বিশ্বাস হল না?’

বক্সী বললেন, ‘যা যুগ পড়েছে তাতে কেউই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয় আজকাল৷ আর অতদূর কলকাতা থেকে বারবার এখানে আসাটা যে কারওর মনেই সন্দেহের উদ্রেক ঘটাতে পারে৷’

এ কথার জবাবে সরকারি অফিসারকে কী বলা উচিত তা বুঝতে না পেরে চুপ করে গেল মল্লার৷ মিস্টার বক্সী তমসাময়কে বোঝাবার চেষ্টা করলেও তিনি বললেন, ‘আপনারা বিশ্বাস করুন, তেমন কোনও ছেলেপাচারকারীর দল যদি ছেলেগুলোকে নিতে আসে তবে আমাকে না মেরে একটা ছেলেকেও এখান থেকে নিয়ে যেতে পারবে না৷ দোহাই আপনাদের, বাচ্চাগুলোকে আশ্রমেই থাকতে দিন৷ আপনারা যখন খুশি এসে দেখে যাবেন ওরা ঠিক আছে কি না?’

সোহমও এবার পাশ থেকে বলল, ‘আমিও এই আশ্রমে আছি জীবনবাবার সঙ্গে৷ পাচারকারীরা অত সহজে কাউকে নিয়ে যেতে পারবে না৷’

সোহমের কথা শুনে বক্সীর এক সঙ্গী এবার বলল, ‘ধরা যাক, ছেলেগুলোকে বাঁচাতে আপনারা পাচারকারীদের হাতে জীবন দিলেন৷ কিন্তু তাতে কি আমরা ছেলেগুলোকে ফিরে পাব? বক্সী সাহেব যা বলছে তা শুনুন৷ আমাদের সঙ্গে আজই ওদের সরকারি হোমে যেতে হবে৷’

অনুরোধে কাজ হল না দেখে সোহম একটু উত্তেজিতভাবে বক্সীর উদ্দেশে বলল, ‘ওদের যদি আপনাদের হাতে তুলে না দিই, কী করবেন আপনারা? বাচ্চাগুলোও এ আশ্রম ছেড়ে যাবে না৷’

মিস্টার বক্সী বললেন, ‘তাহলে পুলিশ আনতে হবে, পুলিশের সাহায্য নিয়ে আমরা ছেলেদের নিয়ে যাব৷’

এ কথা বলার পর বক্সী তমসাময়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী করবেন বলুন? ছেলেগুলোকে আমাদের সঙ্গে যেতে দেবেন, নাকি পুলিশ আনব? পুলিশ এলে কিন্তু আপনাদের সমস্যা বাড়বে৷ সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে পুলিশ আপনাদের নামে মামলা রুজু করবে৷ ছেলেগুলোকে তো আশ্রমে আপনি রাখতেই পারবেন না, উপরন্তু কিছু দিন আপনাকে হাজতবাসও করতে হবে৷ ছেলেগুলোকে ভালোভাবে সরকারের হাতে তুলে দিলে, আমি বরং চেষ্টা করব যাতে আপনি হোমে গিয়ে মাঝেমধ্যে ওদের দেখে আসতে পারেন সে ব্যাপারে৷’

সোহম একথা শুনে বলে উঠল, ‘আপনারা এভাবে ওদের নিয়ে যেতে পারেন না৷ আমি কোর্টে সরকারের বিরুদ্ধে মাললা করব৷’

তার কথা শুনে মিস্টার বক্সী কয়েক মুহূর্ত সোহমের দিকে তাকিয়ে থেকে ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘যদিও আপনাকে কোনও কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন নেই তবু বলি, মামলা আপনি করতেই পারেন, কিন্তু সে মামলা ধোপে টিকবে না৷ পঁচিশ বছর আমি এই সরকারি অফিসারের পদে আছি৷ এমন অনেক মামলা দেখেছি শুনেছি৷ তবুও যদি আপনি মামলা করতে চান করবেন৷ আপাতত আমরা বাচ্চাগুলোকে নিয়ে যাব৷ মামলাতে আপনি জিতলে তখন না হয় বাচ্চাগুলোকে ফিরিয়ে আনবেন৷’ মল্লারের মনে হল শেষ বাক্যটা যেন বেশ বিদ্রুপের সুরেই বললেন মিস্টার বক্সী৷

সোহম তবুও কিছু একটা কথা মিস্টার বক্সীকে বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু চূর্ণী সোহমকে থামিয়ে দিয়ে মৃদু ধমকের স্বরে বলল, ‘তুই কথা বলিস না৷ তমসাময়বাবুর আশ্রম, যা কথা বলার ওনাকেই বলতে দে৷’

সোহম যাতে নতুন কোনও ঝামেলাতে না জড়িয়ে পড়ে সে জন্যই চূর্ণী থামাবার চেষ্টা করল তাকে৷ সোহম থেমে গেল৷

মিস্টার বক্সী আবারও তমসাময়কে প্রশ্ন করলেন, ‘কী করবেন বলুন? ছেলেগুলোকে আমাদের সঙ্গে দেবেন? নাকি পুলিশ আনতে হবে?’

তমসাময়ের মুখমণ্ডলে একটা অসহায়ভাব ফুটে উঠেছে৷ তিনি বললেন, ‘না, পুলিশ ডাকার দরকার নেই৷ কিন্তু ওদের নিয়ে যাওয়ার আগে যদি ক’টা দিন সময় দেন? আসলে এভাবে হঠাৎ করে ওদের চলে যেতে হবে তা তো আমার বা ওদের কারও জানা নেই৷ একটা মানসিক প্রস্তুতির তো দরকার৷’

সরকারি অফিসারকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা যে তমসাময়ের নেই তা তাঁর কথা শুনে বুঝতে পেরে মিস্টার বক্সী কী যেন একটা ভেবে নিয়ে গলার স্বর একটু নরম করে বললেন, ‘আপনার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু আর একটা দিনও ছেলেদের এখানে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ আজকের মধ্যেই ছেলেগুলোকে এখান থেকে হোমে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার৷ আমি চাকরি করি৷ ওপরতলার নির্দেশ আমাকে মেনে চলতে হয়৷ হ্যাঁ, আমি একটা কাজ করতে পারি৷ ওরা সারাদিন এখানে থাকুক৷ আপনি ওদের সঙ্গে সময় কাটান, আদর যত্ন করুন৷ আমি ওদের নিয়ে রাতে রওনা হব৷ ওদের কাল সকালের আগে হোমে পৌঁছে দিতে হবে৷’

তমসাময় সরকারি অফিসারের কথা শুনে অসহায়ের মতো বললেন, ‘ঠিক আছে, তবে তাই নেবেন৷’

বক্সী বললেন, ‘হ্যাঁ, ওদের রাতের খাবার খাইয়ে দেবেন৷ তারপর ঠিক দশটা নাগাদ ওদের নিয়ে রওনা হব আমরা৷’

তমসাময় এরপর বুনোকে বললেন, ‘এই বাবুদের থাকার জন্য একটা ঘর খুলে দে৷’

মিস্টার বক্সী বললেন, ‘ধন্যবাদ! হ্যাঁ, আমাদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ঘরের দরকার ছিল৷’

বুনোর পিছনে বক্সী তাঁর সঙ্গী দু’জনকে নিয়ে এগলেন একটা ঘরের দিকে৷ একটা ঘর খুলে বুনো তাদের সেই ঘরে ঢুকিয়ে দিল৷ ঘরটা তমসাময়ের ঘরের কাছে, মল্লারদের গাড়িটা যেখানে পার্ক করা আছে তার গায়েই৷

লোকগুলো ঘরে ঢোকার পর তমসাময় কিছুক্ষণ নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন৷ তারপর সোহম তাঁকে বলল, ‘আপনি এভাবে ছেলেগুলোকে ওদের হাতে তুলে দিচ্ছেন কেন?’

তমসাময় হতাশভাবে বললেন, ‘উপায় তো নেই৷ সরকারি আইন ওদের পক্ষে৷ বাধা দিলে সমস্যা বাড়বে বই কমবে না৷ এক যদি ওরা নিজেরা ফিরে আসে সে অন্য কথা৷’

সোহম বলল, ‘ওদের ফিরতে তো অন্তত দশ-বারো বছর সময় লাগবে৷ যতদিন না ওরা প্রাপ্তবয়স্ক হবে ততদিন ওরা স্বাধীন নয়৷’

তমসাময় সোহমের কথার কোনও জবাব দিলেন না৷

মল্লারেরও বেশ খারাপ লাগল তমসাময়ের মনের ভাব অনুমান করে৷ ছেলেগুলোকে তিনি এতদিন ধরে রেখেছেন, ভীষণ মনঃকষ্ট তো তার হবেই৷’

কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পর তমসাময় বললেন, ‘দেখি ছেলেগুলোর জন্য আজ কী খাবারের ব্যবস্থা করা যায়! যাওয়ার আগে ওদের একটু ভালো করে খাওয়ানোর চেষ্টা করতে হবে৷’

তাঁর কথা শুনে চূর্ণী হঠাৎ বলে উঠল, ‘এ দায়িত্বটা আজ আমি নিতে চাই৷ ওরা তো মাংস খেতে ভালোবাসে৷ ওদের জন্য গঞ্জে গিয়ে মাংস কিনে আনি৷ আর কী আনতে হবে বলুন?’

তমসাময় বললেন, ‘ধন্যবাদ৷ আপনাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। শুধু মাংস আনলেই হবে৷ ওরা যাতে পেটপুরে আজ একটু মাংস খেতে পারে৷ চাল কেনার দরকার নেই৷’ এই বলে মাথা নীচু করে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে তমসাময় এগলেন তাঁর ঘরের দিকে৷

চূর্ণী এবার বলল, ‘চল, তিনজনে এবার বাজারে যাওয়া যাক?’

সোহম এই প্রস্তাব শুনে প্রথমে বলল, ‘তোরা ঘুরে আয়৷ ছেলেগুলো চলে যাওয়ার আগে আমি আজ সারাদিন ওদের সঙ্গে কাটাতে চাই৷’

এ কথা শুনে চূর্ণী আর গঞ্জে যাওয়ার জন্য তাকে জোর করল না৷ ছেলেদের ঘরের দিকে পা বাড়াবার আগে সোহম তাদেরকে বলল, ‘একটা শোল মাছ পেলে কিনে আনিস৷ মরা নয়, জ্যান্ত৷’

সোহম এগলো ছেলেদের ঘরের দিকে, আর মল্লার-চূর্ণী এগলো তাদের গাড়ির দিকে৷

গাড়িতে উঠে মল্লার ইঞ্জিন চালু করে গাড়ির মুখটা ঘুরিয়ে নিচ্ছিল৷ ঠিক এমন সময় ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন বক্সী আর তাঁর এক সঙ্গী৷ বক্সী মল্লারকে প্রশ্ন করল, ‘কলকাতা ফিরে যাচ্ছেন নাকি? আপনাদের আর এক সঙ্গী কই?’

মল্লার জবাব দিল, ‘আমরা গঞ্জের হাটে যাচ্ছি৷ আপনারা ছেলেগুলোকে নিয়ে যাওয়ার আগে ওদের একটু মাংস খাওয়াব, কিনতে যাচ্ছি৷’

বক্সী প্রথমে বললেন, ‘ভালো করবেন ওদের মাংস খাইয়ে৷ আসলে আমি যত বড় অফিসার হই না কেন, আসলে তো আমরা সরকারের চাকর, এসব কাজ করতে খারাপ লাগলেও সরকারি নির্দেশ আমাদের পালন করতেই হয়৷’

একথা বলার পর একটু হেসে তিনি বললেন, ‘আমরা যে এখান থেকে বাচ্চাদের নিতে এসেছি তা গঞ্জের বাজারের কাউকে না জানাতে অনুরোধ করছি৷ এসব গ্রামীণ মানুষদের কৌতূহল অত্যন্ত বেশি৷ দেখা গেল যে তারা হয়তো খবর পেয়ে দলে দলে এসে ভিড় জমালো এখানে৷ তখন আবার তাদের সরাবার জন্য পুলিশ ডাকতে হবে৷ এর আগে এমন ঘটনা ফেস করেছি আমরা৷’

বক্সীর কথা শুনে গাড়ির ভিতর থেকে চূর্ণী তাঁর উদ্দেশে বলল, ‘আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন৷ আমরা আপনাদের কথা কাউকে বলব না৷ সরকারি কাজে ব্যাঘাত ঘটবে না৷’

গাড়ি নিয়ে গেটের মুখে এসে হর্ন বাজাল মল্লার৷ বুনো এসে দরজা খুলে দিতেই গাড়ি নিয়ে জলঙ্গীর সমান্তরাল রাস্তা ধরে গঞ্জের দিকে রওনা হয়ে গেল মল্লার আর চূর্ণী৷

কিছুটা পথ এগবার পর মল্লার একসময় বলল, ‘তমসাময়ের জন্য আমার বেশ খারাপ লাগছে৷ তবে সরকারি আইন তো সকলকেই মানতে হবে৷ তমসাময় ভলোই করলেন অযথা ঝামেলার মধ্যে না গিয়ে৷ টাকাটা কি তিনি আমাদের ফেরত দিয়ে দেবেন? তোর কী মনে হয়?’

চূর্ণী বলল, ‘ওসব টাকা ফেরতের ব্যাপার নিয়ে আমি ভাবছি না৷ তবে যা হল তা ভালো হল৷’

মল্লার জানতে চাইল, ‘তার মানে?’

চূর্ণী বলল, ‘আমার কথাটা হয়তো স্বার্থপরের মতো শোনাবে৷ ছেলেগুলোকে নিয়ে গেলে তো আশ্রমটাই বন্ধ হয়ে যাবে৷ আর সোহমও নিশ্চয় আমাদের সঙ্গে ফিরতে আপত্তি করবে না৷ তারপর সোহমের কাছ থেকে তার অদ্ভুত আচরণের কারণটা বার করতে পারলেই আমরা ওর সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে পারব বলেই মনে হয়৷ যদি ওর মানসিক কোনও সমস্যা হয়ে থাকে তবে ভালো ডাক্তার দেখিয়ে নিশ্চয় ওকে সারিয়ে তোলা যাবে৷ আর যে যাই বলুক, কলকাতায় ফিরে আমি ওকে নিজের ফ্ল্যাটেই রাখব৷ কত লোকই তো বিয়ে না করেই লিভ ইন করে৷ আর আমাদের তো কয়েক মাস পরই বিয়ে হওয়ার কথা৷’—একটানা কথাগুলো বলে থামল চূর্ণী৷

গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে মল্লার বলল, ‘তুই কি সোহমকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আনন্দেই ছেলেগুলোকে মাংস খাওয়াবি বললি?’

চূর্ণী বলল, ‘সত্যি কথাটা হল, হ্যাঁ৷ তুই তো জানিস যে আমিই প্রথম প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে, একটা ফাণ্ড তৈরি করে অনাথ শিশুদের সাহায্য করার৷ কিন্তু আমি ততক্ষণই অন্যকে সাহায্য করতে রাজি যতক্ষণ পর্যন্ত আমার স্বার্থ সুরক্ষিত৷ তাই এক্ষেত্রে আমি আমার নিজের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেব৷’—স্পষ্ট জবাব দিল চূর্ণী৷

মল্লার বলল, আমারও মনে হয় এই আশ্রমের সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে সোহমের পরিবর্তনের ব্যাপারটা জড়িয়ে আছে৷ আশ্রম বন্ধ হয়ে গেলে হয়তো সোহম আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে৷ কোনও একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার আছে এই আশ্রমে৷ যদিও সেটা কী তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়৷’

এরপর টুকটাক নানান কথা বলতে বলতে কয়েকটা গ্রাম অতিক্রম করে মল্লাররা পৌঁছে গেল গঞ্জের বাজারে৷

জায়গাটা আগের দিনের মতোই জমজমাট৷ চারপাশে লোকজনের ভিড়, চিৎকার চেঁচামেচি৷ মল্লার গাড়িটা দাঁড় করাল গতবারের সেই মাংসর দোকানের সামনে৷ গাড়ি থেকে নামার পর চূর্ণী বলল, ‘মাছের বাজারটা কোথায় জেনে নিতে হবে, সোহমের জন্য শোল মাছ কিনতে হবে৷’

মল্লারের চোখে মুহূর্তের জন্য ভেসে উঠল সেই দৃশ্য৷ আস্ত একটা ছালসমেত পোড়া শোল মাছে কামড় বসাচ্ছে সোহম!

সে কি তবে অমনভাবে পুড়িয়ে খাবার জন্যই শোল মাছ কিনতে বলল? তবে যাই হোক না কেন, কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত, সেসব কিছু খুলে না বলা পর্যন্ত সোহমের মন রক্ষা করে চলা ভালো৷ তাই সে বলল, ‘হ্যাঁ, পেলে নেব৷’

প্রথমে মাংস কিনল মল্লাররা৷ ভদ্রতাবশত সরকারি লোক তিনজনের কথা মাথায় রেখে একটু বেশি পরিমাণেই কিনল গতদিনের থেকে৷ এরপর মাংসওলার থেকে মাছ বাজারের সন্ধান জেনে নিয়ে কাছেই সেখানে গিয়ে হাজির হল৷ দরমা আর প্লাস্টিকের ছাউনি বিছিয়ে বসে আছে মাছ বিক্রেতারা৷ একজনের কাছে একটা শোল মাছ দেখতে পেয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল মল্লাররা৷ তাদের দেখে মাছ বিক্রেতা বলল, ‘জ্যান্ত শোল মাছ বাবু৷ সস্তায় দিয়ে দেব৷ পুরো দেড় কিলো ওজন, তিনশো টাকা গোটা নিলে৷ জলঙ্গীরই মাছ৷ একবার খেয়ে দেখুন৷ এ মাছ খেলে মরা মানুষও জ্যান্ত হয়ে ওঠে৷’

মাছওয়ালার কথা শুনে আবারও কেন জানি আরও একটা দৃশ্য মল্লারের মনে পড়ে গেল—আশ্রমের সেই কালো ঘরটার ভিতর সিঁদুরলেপা মাটির বেদিতে প্রায় নগ্ন অবস্থাতে শুয়ে আছে নিশ্চল সোহম৷ আর তার চারপাশে মাটির সরাতে রাখা খণ্ড খণ্ড পোড়া শোল মাছ! আর তার সামনে প্রদীপের আধো আলো-ছায়াতে দাঁড়িয়ে আছেন রক্তাম্বর পরিহিত তমসাময়৷ মল্লার মাছটা গোটাই দিয়ে দিতে বলল লোকটাকে৷ একটা বড় ক্যারি ব্যাগে সে জ্যান্ত শোল মাছটা পুরে দিল৷ মল্লার যখন পার্সের থেকে টাকা বের করে মাছওয়ালাকে দিল তখন লোকটা হেসে বলল, ‘আপনারা যে শোল মাছ কিনতে আসতে পারেন, এমন একটা ধারণা আমার হয়েছিল৷’

মাছের ব্যাগটা হাতে নিয়ে মল্লার বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করল, ‘এ ধারণা তোমার কীভাবে হয়েছিল?’ লোকটা জবাব দিল, ‘আজ সকালে আর এক বাবু আমাকে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, কোনও শহুরে বাবু আমার থেকে শোলমাছ কিনতে এসেছিলেন কি না? তাই আমি ভাবছিলাম কোনও শহুরে বাবু হয়তো শোলমাছ কিনতে এখানে আসবেন৷ আপনাদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে আপনারা শহরের লোক৷’

মল্লার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল, ‘যিনি তোমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, সে বাবুকে চেনো তুমি?’ মাছওয়ালা জবাব দিল, ‘না তাকে আমি আগে দেখিনি৷ মাঝবয়সি একজন বাবু৷ পোশাক দেখে বুঝতে পারলাম তিনিও শহরেরই লোক৷’

মল্লার আর এ নিয়ে লোকটাকে কোনও প্রশ্ন করল না৷ মাছ নিয়ে সে জায়গা ছেড়ে এগলো তার গাড়ির দিকে মাংসর দোকানের কাছে৷ সেদিকে হাঁটতে হাঁটতে মল্লার ভাবতে লাগল, যে লোক মাছওয়ালার কাছে জানতে চেয়েছিল সে কি সোহমের খোঁজ করছে? নাকি ব্যাপারটা নিছকই কাকতালীয়?

কেনাকাটার কাজ মিটিয়ে গাড়িতে উঠে বসল মল্লার আর চূর্ণী৷ গাড়ি নিয়ে একটু এগতেই মল্লারের চোখে পড়ল সেই চায়ের দোকান, যেখানে নেমে আগের দিন তারা চা খেয়েছিল, আর তার সঙ্গে সঙ্গে মল্লারের মনে পড়ল, এখানেই চা খেয়ে গাড়িতে ওঠার সময় তাদের সঙ্গে খাস্তগীরের পরিচয় হয়েছিল৷

দোকানটা দেখতে পেয়েই মল্লার বলল, ‘এখানে একটু দাঁড়াই, চা সিগারেট খাব৷’

চূর্ণী মল্লারের কথায় আপত্তি না করলেও সে চা খাবে না জানিয়ে দিল৷ গাড়ি থেকে মল্লার একাই নেমে দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল৷ আগের দিনের মতোই দোকানের বাইরে বসে জটলা করছিল গ্রাম্য বৃদ্ধরা৷ তারা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল মল্লারের দিকে৷ চা দোকানের ছেলেটা মল্লারকে চিনতে পেরে মৃদু হেসে বলল, ‘আসুন বাবু আসুন৷ আপনারা কি নদীর পাড়ের আশ্রমে এখনও রয়েছেন?’

মল্লার মৃদু হেসে বলল, ‘না, ফিরে গেছিলাম৷ আবার কাল এসেছি৷ একটা চা দাও৷’

মল্লার আর ছেলেটার কথা শুনে বুড়োরাও এবার মল্লারকে চিনতে পারল৷ মল্লার খেয়াল করল নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করল তারা৷

সিগারেট ধরাল মল্লার৷ ছেলেটার এগিয়ে দেওয়া চায়ের ভাঁড় নিয়ে সে বেঞ্চের এক কোনাতে বসতে যেতেই পাশের বুড়ো লোকটা হঠাৎ তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আরে করেন কী! আর একটু হলেই সর্বনাশ হতো!’

মল্লার বসতে গিয়েও উঠে দাঁড়িয়ে বুড়ো লোকটাকে বলল, ‘আমাকে কিছু বললেন?’

সে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আপনাকেই, আপনি মড়ার আশ্রম থেকে এসেছেন তো? ছোঁয়া লেগে গেলেই সর্বনাশ হতো৷ বাড়ি ফিরেই ঠান্ডার মধ্যে স্নান করতে হতো৷ আমার আবার নিমুনিয়ার ধাত৷’ লোকটার কথা শুনে তার সঙ্গীরাও এবার উঠে দাঁড়াল৷

তার কথাটা শুনে খারাপ লাগলেও মল্লার বলল, ‘ঠিক আছে আমি বসছি না৷ চা খেয়েই চলে যাব৷’

কিন্তু বৃদ্ধ লোকগুলো আর দাঁড়াল না৷ অসন্তুষ্টভাবে দল বেঁধে পা বাড়াল দোকান ছেড়ে৷ তারা চলে যাওয়ার পর মল্লার চায়ের দোকানের ছেলেটাকে বলল, ‘সরি, আমি মনে হয় তোমার খদ্দের নষ্ট করে দিলাম৷’

ছেলেটা জবাব দিল, ‘ওরা যাবে কোথায়? একটু পরই আবার ফিরে আসবে৷ তবে ওদের কথা শুনে কিছু মনে করবেন না৷ ওরা ওইরকমই৷’

মল্লারের মাথার মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে৷ তার মধ্যে একটা হল, কিছুক্ষণ আগে মাছওয়ালার মুখে শোনা সেই লোকটার কথা৷ যে খোঁজ নিতে এসেছিল কেউ শোলমাছ কিনতে এসেছিল কি না? তাই সে একটু ইতস্তত করে ছেলেটাকে প্রশ্ন করল, ‘আমাদের মতো কোনও শহরের লোককে আজ এখানে দেখেছ তুমি?’

এ প্রশ্নের জবাবে ছেলেটা মল্লারকে বলল, ‘হ্যাঁ, আজই বেশ কয়েকজন লোক এসেছিল একটু আগে গাড়ি নিয়ে৷ আমার দোকানেও এসেছিল চা খেতে৷ বলল, জলঙ্গীর পাড়ে নাকি পিকনিক করতে এসেছে৷ এই শীতকালে মাঝে মাঝে অনেকে এখানে আসে জলঙ্গীতে পিকনিক করতে৷’

তার কথা শুনে মল্লার কিছুটা আশ্বস্ত হল৷ তার মনে হল তাদের কেউই হয়তো মাছওয়ালার কাছে তাদের কোনও সঙ্গী শোল মাছ কিনতে এসেছিল কি না সে খোঁজ করছিল৷

মল্লার এরপর চায়ের ভাঁড় শেষ করে পয়সা মিটিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল৷

তমসাময়ের আশ্রমে ফিরে এল মল্লার আর চূর্ণী৷ আশ্রমের গেটের মুখে পৌঁছে হর্ণ বাজাবার সময় চূর্ণী বলল, ‘শোলমাছটা সোহমের হাতেই দেব৷’

বুনো এসে গেট খোলার সময় চূর্ণী তার কাছে জানতে চাইল, ‘সোহম কোথায়?’

সে জবাব দিল, ‘ছেলেদের ঘরে৷’

আশ্রমের ভিতরে ঢুকে আগের জায়গাতে গাড়ি রাখল তারা৷ বুনো সেখানে ফিরে আসার পর তার হাতে মাংসটা ধরিয়ে দিতেই বুনো বলল, ‘জীবনবাবা বলেছেন রাতে মাংস রাঁধার জন্য৷’

মল্লার আর চূর্ণী এরপর এগলো ছেলেদের থাকার জায়গার দিকে৷ সেখানে পৌঁছে দাওয়ায় উঠে এগতেই সামনের ঘরের ভিতর থেকে একটা ছেলের গলার শব্দ ভেসে এল, ‘না, আমরা কোথাও যাব না৷’

তারা দু’জন গিয়ে দাঁড়াল সে ঘরের দরজার সামনে৷ সে ঘরে শুধু বাচ্চা ছেলেরাই নয় সোহম আর তমসাময়কেও দেখতে পেল৷ মল্লারদের দেখে তমসাময় বললেন, ‘ও আপনারা ফিরে এসেছেন!’

মল্লার মৃদু হেসে বলল, ‘এই ফিরলাম৷ মাংস কিনে এনেছি৷’

তমসাময় এবার ছেলেদের উদ্দেশে বললেন, ‘আজ মাংস খেতে পাবে তোমরা৷ ভালো করে খেয়ে তারপর রওনা দেবে৷’

মাংসের কথা শুনে বাচ্চাগুলোর চোখ মুখ মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হয়েও আবার নিষ্প্রভ হয়ে গেল৷ নবজীবন বলে উঠল, ‘আমাদের মাংস চাই না৷ আমরা তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না৷’

সঞ্জীবনও তাকে সমর্থন করে বলল, ‘ওই লোকগুলোর সঙ্গে আমরা যাব না৷’

মল্লাররা বুঝতে পারল তমসাময় ছেলেগুলোকে তাদের সরকারি হোমে যাবার খবরটা জানাতে এসেছেন৷

বাচ্চা ছেলে দুটোর কথার জবাবে তমসাময় তাদেরকে বললেন, ‘তোমরা না যেতে চাইলে ওরা পুলিশ ডাকবে৷ তখন আরও বিপত্তি হবে৷ ওরা জোর করে নিয়ে যাবে তোমাদের৷’ এ কথা শুনে অন্য একটা বাচ্চা ছেলে বলে উঠল, ‘ওদের আমরা ধরে নিয়ে যেতে দেব না৷’ শিশুসুলভ উক্তি৷ কিন্তু কথাটা শুনে তমসাময় ছেলেগুলোর দিকে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে থাকার পর মৃদু হেসে বললেন, ‘তোমরা ওদের সঙ্গে যাও৷ ভালো না লাগলে ফিরে এসো৷’

মল্লাররা জানে, সরকারি হোমে গেলে যতদিন না ছেলেগুলো প্রাপ্তবয়স্ক হবে ততদিন তারা কোথাও যেতে পারবে না৷ পালিয়ে এলেও আবার তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সরকারি লোকেরা৷ তমসাময়ের কথা শুনে মল্লার আর চূর্ণীর মনে হল তিনি বাচ্চা ছেলেগুলোকে আপাতত আশ্বস্ত করার জন্যই ফিরে আসার কথাটা বললেন৷

এ কথা বলার পর তিনি ছেলেগুলোকে বললেন, ‘আমি এখন যাচ্ছি৷ রাতে তোমরা যাবার আগে আবার কথা বলতে আসব৷’

সে ঘর ছেড়ে বাইরে দাওয়ায় বেরিয়ে এলেন তমসাময় আর সোহম৷ দাওয়া ছেড়ে সকলে নীচে নামার পর তমসাময় বললেন, ‘ওদের খুব কষ্ট হচ্ছে খবরটা শুনে৷ আমাকে ছেড়ে থাকার কথা ওরা ভাবতেই পারছে না৷’

মল্লার বলল, ‘সেটাই তো স্বাভাবিক৷ কিন্তু কী আর করবেন? সরকারি সিদ্ধান্তই শেষ কথা৷’ তমসাময় বললে, ‘হ্যাঁ’, তারপর তিনি হাঁটতে শুরু করলেন ঘরের দিকে৷

তিনি এগবার পর সোহম প্রশ্ন করল, ‘শোল মাছ পেয়েছিস?’

চূর্ণী তার হতে ধরা ক্যারিব্যাগটা তুলে ধরে বলল, এই তো, জ্যান্ত শোল মাছ৷’

কথাটা শুনে সোহম চূর্ণীর হাত থেকে ব্যাগটা খপ করে নিয়ে তার ভিতরে রাখা মাছটা দেখে প্রথমে উৎফুল্লভাবে বলল, ‘হ্যাঁ ঠিক এমন মাছই আমার দরকার ছিল৷’

কথার পর সে তাদেরকে বলল, ‘তোরা এখন যা, আমি ছেলেগুলোকে বোঝাবার চেষ্টা করি৷ বিকেলবেলাতে আমি তোদের ডাকব৷’—একথা বলে সে মল্লারদের আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দাওয়াতে উঠে পড়ল৷ অগত্যা চূর্ণীকে নিয়ে মল্লার তাদের ঘরের দিকে এগলো৷ বিষণ্ণ ভাব ফুটে উঠল চূর্ণীর মুখমণ্ডলে৷ তাকে শান্ত করার জন্য মল্লার বলল, ‘ওকে আজ যা ইচ্ছা করতে দে৷ আমার ধারণা, আজ রাতে ছেলেগুলো চলে যাবার পর ধীরে ধীরে সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে৷ এ জায়গার প্রতি সোহম আর তেমন আকর্ষণ অনুভব করবে না৷

একথা শুনে চূর্ণী অস্ফুট ভাবে বলল, ‘তাই যেন হয়৷’

নিজেদের ঘরে ফিরে এল দু’জন৷ দুপুরে নির্দিষ্ট সময় খাবার দিয়ে গেল বুনো৷ চূর্ণী দুপুরের খাবার খেয়ে পার্টিশানের ওপাশে চলে গেল৷ মল্লার আধশোয়া অবস্থায় বিছানার পাশে জানলার মতো জায়গাটা দিয়ে বাইরে চেয়ে রইল৷ নিস্তব্ধ দুপুর৷ কেমন যেন একটা নিঝুম পরিবেশ বিরাজ করছে চারপাশে৷ তারই মাঝে এক সময় যেন একটা অস্পষ্ট হরিধ্বনি ভেসে এল জলঙ্গীর দিক থেকে৷ এরপর শেষ দুপুরের দিকে মল্লার দেখল, তমসাময় আশ্রমের একদিকে যাচ্ছেন৷ আর কিছু সময়ের মধ্যেই সোহমকেও দেখতে পেল সে৷ সেই শোল মাছের ব্যাগটা নিয়ে সেও এগলো তমসাময় যেদিকে এগলেন সেদিকে৷ ওদিকে কী আছে? একটু ভাবার পর মল্লার বুঝতে পারল, তমসাময় আর সোহম যেদিকে গেল সেদিকেই আছে সেই কালো ঘরটা!

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকেল হয়ে গেল৷ চূর্ণী পাশের পার্টিশনের আড়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে এল৷ চূর্ণী আর মল্লার ঘরের বাইরের দাওয়াতে গিয়ে দাঁড়াতেই তারা দেখল সেই কালো ঘরের দিক থেকে সোহম আসছে৷

তাকে দেখে দাওয়া ছেড়ে নীচে নামল চূর্ণী আর মল্লার৷ সোহম এসে দাঁড়াল তাদের সামনে৷ মল্লারদের উদ্দেশে সে বলল, ‘বাঃ তোরা উঠে পড়েছিস! চল তাহলে নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াই?’

কথাটা শুনে চূর্ণীর মুখে হাসি ফুটে উঠল৷ সে বলল, ‘হ্যাঁ, চল৷’

তিনজনে মিলে সেদিকে এগলো তারা৷

আশ্রমের গেটের বাইরে বেরিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল তারা তিনজন৷ ঠিক তখনই তাদের চোখে পড়ল, যেদিকে শ্মশান তার বিপরীত দিকে নদীর পাড়ে বেশ খানিকটা দূরে বেশ কয়েকজন লোক নাচানাচি করছে৷ সাউন্ড সিস্টেমের মৃদু শব্দও ভেসে আসছে সেদিক থেকে৷ একটা গাড়িও দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে৷ লোকগুলোকে দূর থেকে দেখে সোহম মৃদু চমকে উঠে বলল, ‘কারা ওরা?’

মল্লার বলল, ‘বাজারে গিয়ে শুনলাম, একদল লোক নাকি জলঙ্গীর পাড়ে পিকনিক করতে এসেছে৷ ওরাই হবে মনে হয়৷’

মল্লার খেয়াল করল, লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে সোহমের মুখমণ্ডলে হঠাৎ যে মৃদু উত্তেজনা ফুটে উঠেছিল তা তার কথা শুনে যেন স্তিমিত হয়ে গেল৷ বিকেলের আলোতে বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে চারপাশ৷ সামনে দিয়ে ধীর গতিতে বয়ে চলেছে জলঙ্গী৷ একঝাঁক হলুদ প্রজাপতি ওড়াউড়ি করছে নদীর পাড়ের সামনের ঝোপটাতে৷ চূর্ণী আর সোহম পাশাপাশি দাঁড়িয়ে৷ মল্লার দেখল নদীর বুকে দিন শেষের সূর্যের মায়াবী প্রতিবিম্বর দিকে তাকিয়ে চূর্ণী আলতো করে স্পর্শ করল সোহমের হাতটা। তা দেখে মল্লার তাদের উদ্দেশে বলল, ‘তোরা কথা বল, আমি ওই গাছটার কাছে গিয়ে একটা সিগারেট খেয়ে আসি৷’

মল্লারের কথাতে সোহম বা চূর্ণী কেউই আপত্তি করল না৷ তা দেখে মল্লার বুঝতে পারল তার অনুমানই ঠিক৷ হবু দম্পতি এই মুহূর্তে একটু নিভৃত সময় কাটাতে চাইছে৷ মল্লার তাদের ছেড়ে কিছুটা তফাতে যে গাছটা আছে তার সামনে গিয়ে একটা সিগারেট ধরাল৷ সে খেয়াল করল, সোহম আর চূর্ণী নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করেছে৷ হাতে, হাত ধরা দু’জনের৷ পড়ন্ত সূর্যের আলো এসে পড়েছে দু’জনের মুখে৷ মল্লারের খুব সুন্দর লাগল দৃশ্যটা৷ মনে মনে সে তাদের উদ্দেশে বলল, ‘সব ঝড় যেন কেটে যায়৷ তোরা দু’জন সারাটা জীবন যেন এমন ভাবেই কাটাতে পারিস৷’

বেশ কিছুক্ষণ ধরে হাতে হাত ধরে কথা বলল সোহম আর চূর্ণী৷ শীতের বিকালের আলো দ্রুত আরও নরম হতে শুরু করেছে৷ এক সময় কথা শেষ হল তাদের৷ ধীর পায়ে তারা এগিয়ে এসে দাঁড়াল মল্লারের সামনে৷ চূর্ণীর মুখে বেশ খুশি খুশি ভাব, সোহমের মুখমণ্ডলেও যেন বেশ একটা শান্ত ভাব৷ মল্লারের কাছে এসে উপস্থিত হওয়ার পর সোহম, মল্লারকে বলল, ‘সন্ধ্যা নামতে আরও কিছুটা দেরি আছে৷ তোরা গল্প কর৷ আমি আশ্রমের ভিতরে যাই৷ বাচ্চাগুলো তো আজই চলে যাবে৷ ওদের এই শেষ সময় একটু সঙ্গ দিই৷’

চূর্ণী বলল, ‘আচ্ছা যা৷’

সোহম এরপর সে জায়গা ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে আশ্রমের ভিতরে চলে গেল৷ সে চলে যাওয়ার পর মল্লার চূর্ণীকে বলল, ‘কী রে ও কিছু বলল? না, তোদের হবু দাম্পত্য নিয়ে গোপন কথা জানতে চাইছি না৷ ও ফেরার ব্যাপারে কিছু বলল? বা ওর অস্বাভাবিক আচরণ সম্পর্কে কিছু জানতে পারলি?’

চূর্ণী মৃদু হেসে বলল, ‘ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সোহম মোটামুটি রাজি হয়ে গেছে৷ তবে ও বলছে যে কালকের দিনটাও ও এখানে থাকতে চায় তমসাময়কে সান্ত্বনা দেবার জন্য৷ আজ বাচ্চাগুলো চলে যাবার পর তমসাময় নিশ্চয় খুব ভেঙে পড়বেন৷ ও যখন ফিরতে রাজি হয়েছে তখন আর আমি এ ব্যাপারটা নিয়ে আপত্তি করলাম না৷ একটা দিনের তো মামলা৷ তবে ও হঠাৎ শ্মশানে-মশানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল কেন তা নিয়ে আমি ওকে প্রশ্ন করিনি পাছে ও রেগে যায় ভেবে৷ আশা করছি নিশ্চয়ই নিজেই মুখ খুলবে এরপর৷’

মল্লার বলল, ‘ঠিক করেছিস৷ ও কলকাতাতে না ফেরা পর্যন্ত ওর মন রক্ষা করে চলাই ভালো৷ কলকাতাতে ফেরার পর বাকি সব দেখা যাবে৷’

মল্লারের কথা শেষ হবার সঙ্গে-সঙ্গেই তারা দেখতে পেল শ্মশানের দিক থেকে বুনো আসছে৷ মল্লার আর চূর্ণীকে যেন খেয়ালই করল না সে৷ তাদের কিছুটা তফাত দিয়ে হেঁটে দ্রুত আশ্রমের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল৷

চূর্ণী ঘর থেকে বেরোবার সময় গায়ে কোনও গরম পোশাক পরেনি৷ আলো নরম হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জলঙ্গীর বুক থেকে ঠান্ডা বাতাস উঠতে শুরু করেছে৷ চূর্ণী তাই বলল, ‘চল এবার ভিতরে যাই, ঠান্ডা লাগছে৷’

সোহম, চূর্ণীকে নিয়ে এগলো আশ্রমের ভিতরে ঢোকার জন্য৷ কিন্তু আশ্রমের ভিতরে ঢোকার মুখেই পুরুষ কণ্ঠের কান্নার শব্দ শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা৷ বেশ কিছু লোকজন শ্মশানের দিক থেকে আসছে৷ তাদের মধ্যেই একজন বিলাপের স্বরে কাঁদতে কাঁদতে শ্মশান থেকে ফিরছে৷ কৌতূহলবশত লোকগুলোর দিকে মল্লাররা তাকিয়ে রইল৷ মল্লারদের কাছে এসে পড়ল লোকগুলো৷ দলটার সামনে একজন মাঝবয়সি লোককে ধরে নিয়ে চলেছে কয়েকজন৷ আর সেই মাঝবয়সি লোকটা কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘সাত বছরের ছেলেকে বাবা হয়ে নিজের হাতে মাটি চাপা দিতে হবে আমি তা কোনও দিন ভাবিনি! আমাকেও তোরা শ্মশানে রেখে আয়৷’

হৃদয়বিদারক দৃশ্য! অন্য লোকগুলো সন্তানহারা পিতার হাত ধরে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে৷

ক্রন্দনরত লোকটা ও তার সঙ্গীদের পিছনে রয়েছে কয়েকজন বৃদ্ধ৷ তারাও একজন বিধ্বস্ত বৃদ্ধকে নিয়ে চলেছে৷ তাদের দেখে চিনতে পারল মল্লার৷ গঞ্জের চায়ে দোকানের সেই বৃদ্ধরা! আজ সকালে যে বুড়ো লোকটা মল্লারের ছোঁয়া লাগার ভয়ে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে পড়েছিল সেই বৃদ্ধও যেন মল্লারকে দেখে চিনতে পারল৷ মল্লারদের দেখে চাপা স্বরে সে তার সঙ্গীদের কী যেন বলল৷ চলে যেতে যেতে সেই বৃদ্ধর দল তাকাল মল্লারদের দিকে৷ শ্মশান ফেরত লোকগুলো চলে যাবার পর মল্লার আর চূর্ণী ঢুকে পড়ল আশ্রমে৷ বিকালবেলা হলে বাচ্চাগুলো তাদের বাড়ির দাওয়াতে পা ঝুলিয়ে বসে৷ আজ কিন্তু তাদের সেখানে দেখতে পেল না তারা৷ সোহম, তমসাময় বা বুনোকেও চোখে পড়ল না। তবে বক্সী আর তার সঙ্গী দু’জনকে এক জায়গাতে দেখতে পেল মল্লাররা৷ দূর থেকে মল্লারদের উদ্দেশে বক্সী বললেন, ‘আপনারা কোথায় গেছিলেন?’

মল্লার জবাব দিল, ‘নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলাম৷’

বক্সী আবারও প্রশ্ন করলেন, ‘ওদিকে কোনও লোকজন দেখলেন?’

মল্লার বলল, ‘কিছু দূরে শুধু একটা পিকনিক পার্টি নাচানাচি করছে৷ আর কোনও লোক নেই৷’

বক্সী এরপর আর কোনও প্রশ্ন করলেন না৷ মল্লাররা ফিরে গেল তাদের থাকার জায়গাতে৷ ঘরে ঢুকে চূর্ণী গরম পোশাক পরে আসার পর দাওয়ায় তারা কিছুক্ষণ বসল৷ বাচ্চাদের দেখতে না পেলেও তারা এবার বুনোকে দেখতে পেল৷ সূর্য ডুবতে শুরু করেছে৷ বুনো মাথায় এক বোঝা কাঠ এনে রান্না ঘরের সামনে রেখে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে গেল৷ মল্লাররা অন্ধকার নামতেই ঘরে ঢুকে পড়ল৷ সন্ধ্যাবেলাতে বুনো যখন চা আনল তখন তার থেকে মল্লাররা জানতে পারল সোহম ছেলেদের ঘরেই আছে৷ চা দিয়ে চলে যাবার সময় বুনো বলে গেল, আজ একটু তাড়াতাড়ি খাবার আনবে সে, তারপর ছেলেদের ঘরে খাবার দিতে যাবে৷

চা খাবার পর নানা গল্প করে কিছুটা সময় কেটে গেল৷ ঘরের বাইরে তাকিয়ে চূর্ণী এরপর দেখতে পেল কাঠগুলো দিয়ে রান্না ঘরের সামনে আগুন জ্বেলেছে বুনো৷ তা দেখে চূর্ণী মল্লারকে বলল, ‘তুই একবার দেখে আয়, শ্মশানের কাঠ দিয়ে বুনো আগুন জ্বেলেছে কি না? তবে ও মাংস আমি খাব না৷’ মল্লার অগত্যা তাদের দাওয়া থেকে নেমে এগলো রান্না ঘরের দিকে৷ যেখানে অগ্নিকুণ্ডর সামনে দাঁড়িয়ে আছে বুনো৷

সে জায়গার কাছাকাছি পৌঁছতেই মাংস-পোড়া গন্ধ এসে লাগল মল্লারের নাকে৷ বুনোর কাছে পৌঁছেই সে অগ্নিকুণ্ডর দিকে তাকিয়ে দেখল মাংসর টুকরো ফেলা হয়েছে অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে৷ শ্মশানের কাঠে পোড়ানো হচ্ছে মাংস৷ মল্লার বিস্মিতভাবে বুনোকে বলল, ‘এভাবে মাংস পোড়াচ্ছ কেন?’

বুনো জবাব দিল, ‘ছেলেগুলো চলে যাবার আগে এমন মাংসই খেতে চেয়েছে৷ তাই রান্না না করে মাংস পুড়িয়ে সিদ্ধ করছি৷’

এরপর সম্ভবত সে আঁচ করতে পারল মল্লারের আসার কারণটা৷ তাই সে মল্লারকে বলল, ‘আপনাদের মাংস আলাদা রান্না হচ্ছে ঘরের ভিতর৷ ওই দেখুন—৷’

রান্না ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে তাকিয়ে মল্লার দেখল একটা কেরসিন স্টোভে ডেকচিতে মাংস রাঁধা হচ্ছে তাদের জন্য৷ মল্লার আর বুনোর সঙ্গে কোনও কথা বলল না৷ ঘরে ফিরে এসে সে চূর্ণীকে শুধু বলল, ‘আমাদের জন্য স্টোভে আলাদা মাংস রাঁধা হচ্ছে৷’

রাত আটটা নাগাদ বুনো এসে মাংস-ভাত দিয়ে গেল৷ স্বাভাবিক রান্না হলেও পোড়া মাংসের গন্ধটা মল্লারের নাকে এমনভাবে চেপে বসেছিল যে, মল্লার তৃপ্তি করে মাংস খেতে পারল না৷