Accessibility Tools

জলঙ্গীর অন্ধকারে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

জলঙ্গীর অন্ধকারে – ৩

শীতের সকালে একটু দেরি করেই বেলা আটটা নাগাদ তাদের ঘুম ভাঙল৷ তখনও কিছুটা সাদা কুয়াশা রয়েছে নদীর দিকটাতে৷ দাওয়াতে বেরিয়েই মল্লার দেখতে পেল নিজের ঘরের সামনে তমসাময় দাঁড়িয়ে আছেন৷ মল্লারকে দেখতে পেয়ে দূর থেকে তিনি হাতজোড় করে নমস্কার জানালেন৷ মল্লারও প্রতি নমস্কার জানাল৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই মল্লারদের কাছে চায়ের কেটলি আর কাপ নিয়ে হাজির হল বুনো৷ শীতের সকালে বেশ আয়েস করে ধূমায়িত চা পান করে, সঙ্গে আনা কেক বিস্কুট দিয়ে প্রাতরাশ সাঙ্গ করে বেরবার জন্য তারা তৈরি হয়ে নিল৷ ঘরের দাওয়া ছেড়ে যখন তারা নীচে নামল তখন কুয়াশা কেটে গিয়েছে৷ সকালের সূর্যালোকে ঝলমল করছে সারা আশ্রম৷ চূর্ণী বুক ভরে শ্বাস টেনে বলল, ‘এখানকার বাতাস কী ফ্রেস, দেখেছিস! কোনও পলিউশন নেই! এমন বাতাস পেলে হয়তো মুমূর্ষ মানুষও নবজীবন লাভ করতে পারে৷’

কথা বলতে বলতে তারা কিছুটা এগতেই একটা ঘরের পিছন থেকে বেরিয়ে এলেন তমসাময়৷ সবাইকে সুপ্রভাত জানিয়ে তিনি জানতে চাইলেন, ‘রাত কেমন কাটল?’

চূর্ণী হেসে বলল, ‘এমনিতে ভালো, শুধু এই শিয়ালের ডাক ছাড়া৷ মাঝরাতে ওদের ডাক শুনে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার৷ আসলে ওই ডাকের সঙ্গে আমি ঠিক অভ্যস্ত নই তো৷’

তমসাময় হেসে বললেন, ‘ওরা হল রাত্রির সন্তান৷ সূর্য ডুবলেই নদীর পাড়ের গর্ত থেকে বাইরে বেরিয়ে ডাকাডাকি করে৷ অনেক সময় খাবারের খোঁজে আশ্রমের ভিতরেও চলে আসে৷ তবে কদিন এখানে যদি আপনারা থাকেন তখন দেখবেন ওদের ডাকের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন৷ শিয়ালের ডাক শুনে আর অস্বস্তি হবে না৷ সবই অভ্যাসের ব্যাপার৷’

এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘চলুন আপনাদের এবার ঘুরিয়ে দেখাই৷ আর যাদের জন্য আপনারা এসেছেন তাদের সঙ্গে অর্থাৎ বাচ্চাগুলোর সঙ্গেও আপনাদের পরিচয় করাই৷ তারপর আপনাদের জলঙ্গীর পাড়ে নিয়ে যাব৷’

মল্লারদের নিয়ে তিনি ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আশ্রম দেখাতে শুরু করলেন৷ বেড়ার ঘরগুলো কোনটা কী কাজে ব্যবহৃত হয় তা তিনি বুঝিয়ে দিতে লাগলেন৷ তার কোনটা বাচ্চাদের পড়ার ঘর, কোনটা প্রার্থনা কক্ষ, কোনটা খাবার ঘর, কোনটা রান্নাঘর৷ আশ্রমের সীমানার গা ঘেঁষে বেশ কিছু জায়গাতে কপি, পেঁয়াজ কলি, শাক ইত্যাদি শীতের সব্জি চাষ করা হয়েছে, সে সব জায়গাও ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে তিনি বললেন, ‘অনেক পরিকল্পনা আছে৷ যেমন বাচ্চাদের জন্য একটা পাকা ঘর তৈরি করা৷ কারণ বেশি শীত পড়লে বেড়ার ঘরে বেশ ঠান্ডা ঢোকে৷ ইলেকট্রিসিটি আনাও অত্যন্ত প্রয়োজন৷ গঞ্জের হাটটা এখান থেকে বেশ খানিকটা দূর, সেখান থেকে জিনিসপত্র কিনে আনার জন্য, রাত বিরেতে কোনও বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য একটা ছোট গাড়িরও দরকার৷ আর এসব করতে হলে বেশ মোটা টাকার প্রয়োজন যা আমার কাছে নেই৷’

বাচ্চারা যেখানে থাকে সেখানে নিয়ে যাবার আগে মল্লারদের নিয়ে তিনি এসে দাঁড়ালেন একটা কুঁড়েঘরের সামনে৷ শনের ছাউনি দেওয়া ঘর৷ দরমার বেড়ার গায়ে আলকাতরার প্রলেপ দেওয়া দেখেই মনে হয় ও ঘরটা অন্য ঘরগুলোর তুলনায় বেশ পুরনো৷ তমসাময় তালাবন্ধ ঘরটা দেখিয়ে বললেন, ‘শ্মশানের কাছে এটাই ছিল আমার প্রথম আস্তানা৷ তারপর আশ্রমটা গড়ে ওঠে৷ আমার সাধনকার্যের বেশকিছু জিনিস এখনও এ ঘরে রাখা আছে৷’ আশ্রমের সব থেকে প্রাচীন কুঁড়েঘরটা তাদের দেখাবার পর তমসাময় মল্লারদের নিয়ে উপস্থিত হলেন ছেলেদের থাকার ব্যারাকের মতো বাড়িটাতে৷ বেশ কয়েকটা ঘর৷ দাওয়ায় উঠে তমসাময়ের সঙ্গে তারই একটাতে ঢুকল৷ সে ঘরের মেঝেতে একটা শতরঞ্চি বিছানো৷ মল্লাররা দেখা করতে আসবে বলে হয়তো বাচ্চারা অপেক্ষা করছিল৷ নানাভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসা বাচ্চা ছেলেগুলো মল্লাররা ঘরে প্রবেশ করতেই উঠে দাঁড়াল৷ তারপর বুকের কাছে হাতজোড় করে প্রণাম জানাল৷ তাদের সকলেরই উৎসুক দৃষ্টি মল্লারদের প্রতি৷ একটা বছর আটেকের ছেলেকে দেখিয়ে তমসাময় বললেন, ‘ও হল নবজীবন৷ ওকেই প্রথম উদ্ধার করে এনেছিলাম আমি৷ যার কথা কাল আপনাদের শোনালাম৷ ওর নামকরণটা আমারই করা৷ আর সে নামেই আশ্রমটাও৷’ এ কথা বলার পর তিনি বাচ্চাগুলোর উদ্দেশে বললেন, ‘এনারা তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে, কথা বলতে এসেছেন৷’—এ কথা বলে মল্লারদের ছেলেগুলোর সঙ্গে ঘরে রেখে তিনি ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ মল্লার নবজীবনকে প্রশ্ন করল, ‘এখানে থাকতে তোমাদের কেমন লাগে?’ প্রশ্নটা সে নবজীবনকে করলেও, সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, ‘ভালো৷’

চূর্ণী অন্য একজনকে প্রশ্ন করল, ‘তোমার নাম কী? রাতে তো এখানে আলো জ্বলে না৷ অন্ধকারে ভয় লাগে না তোমার?’

যাকে চূর্ণী প্রশ্নটা করল তার আকৃতি দেখে মনে হল ছেলেগুলোর মধ্যে সে-ই সবথেকে বয়সে ছোট৷ ছেলেটা জবাব দিল, ‘আমার নাম সঞ্জীবন৷ না, ভয় লাগে না৷ ভালো লাগে৷’

চূর্ণী মৃদু বিস্মিতভাবে বলল, ‘অন্ধকারে তোমার ভালো লাগে?’

বাচ্চাটা সরল মনেই জবাব দিল ‘হ্যাঁ, ভালো লাগে৷ আলো নেই বলে রাতে পড়তে বসতে হয় না৷’ এবার তার কথা শুনে হেসে ফেলল মল্লাররা৷

তৃতীয় একটা ছেলেকে সোহম জিজ্ঞেস করল, ‘তোর নাম কী?’

সে জবাব দিল, ‘উজ্জীবন?’

সোহম জানতে চাইল, ‘এখানে তোদের যে খাবার দেয় তাতে পেট ভরে?’

উজ্জীবন জবাব দিল ‘হ্যাঁ৷’

‘কী খেতে ভালো লাগে তোর?’ খাবারের কথা জানতে চাইল সোহম৷

উজ্জীবন বলল, ‘মাংস৷’ আর তার কথা সমর্থন করে অন্য ছেলেগুলো বলে উঠল ‘আমারও, আমারও৷’

চূর্ণী জানতে চাইল ‘তোমরা এখানে মাংস খেতে পাও?’

উজ্জীবন বলল, ‘অকেনদিন পরে পরে যখন মেলে তখন খাই৷ তোমরা মাংস খাওয়াবে?’

চূর্ণী ছেলেটার প্রশ্ন শুনে তাকাল মল্লারের দিকে৷

মল্লার এরপর গলাটা একটু খাদে নামিয়ে একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাদের কেউ মারে এখানে? গায়ে হাত দেয়? কষ্ট দেয়? সত্যি কথা বললে তোমাদের মাংস খাওয়াব৷’

ছেলেটা বলল, ‘না, কেউ মারে না আমাদের তবে দুষ্টুমি করলে ভয় দেখায়৷’

‘কী বলে ভয় দেখায়?’ জানতে চাইল মল্লার৷

বাচ্চাটা বলল, ‘জীবনবাবা বলে, তাঁর কথা না শুনলে আশ্রমের বাইরে বার করে দেবে৷ তখন আমরা আর বাঁচব না৷’

মল্লাররা বুঝতে পারল তমসাময়কে বাচ্চাগুলো জীবনবাবা বলে ডাকে৷

মল্লাররা আরও বেশ কিছু প্রশ্ন করল বাচ্চাগুলোকে৷ তাদের মুখ থেকে তাদের জীবনবাবা তমসাময় বা তাঁর আশ্রম সম্পর্কে কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল না৷ প্রশ্ন-উত্তরের পালা মেটার পর যখন তারা সে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরতে যাচ্ছে তখন উজ্জীবন বলে উঠল, ‘তাহলে আমাদের মাংস খাওয়াবে তো?’

মল্লার হেসে ফেলে বলল, ‘তোমাদের জীবনবাবা যদি অনুমতি দেন তবে নিশ্চয়ই খাওয়াব৷’ মল্লারের জবাব শুনে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে তালি দিয়ে উঠল অনাথ ছেলেগুলো৷

বাড়িটার বাইরে দাওয়ার নীচে দাঁড়িয়ে ছিলেন তমসামসয়৷ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়াল তিনজন৷ তমসাময় বললেন, ‘কেমন দেখলেন ওদের?’

চূর্ণী বলল, ‘বেশ লাগল ওদের সঙ্গে কথা বলে৷ সহজ সরল সব বাচ্চা৷’

তমসাময় বললেন, ‘ওদের মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলার স্বপ্ন আছে আমার৷ আপনাদের মতো মানুষরা যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তবে হয়তো সে স্বপ্ন আমার সফল হবে৷ চলুন এবার জলঙ্গীর পাড়টা আপনাদের দেখিয়ে আনি৷’

সে জায়গা ছেড়ে তমসাময়ের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল৷ মল্লার হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘আপনার আশ্রমের ছেলেদের নামগুলো কিন্তু বেশ৷ নবজীবন, সঞ্জীবন, উজ্জীবন৷ আপনাকেও শুনলাম ওরা জীবনবাবা বলে ডাকে৷ নবজীবন আশ্রমের সবকিছুর সঙ্গেই দেখছি জীবন শব্দটা জড়িয়ে আছে!’ তমসাময় হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, ওদের নামগুলো সব আমারই দেওয়া আশ্রমের সঙ্গে নাম মিলিয়ে৷’ সোহম তাঁকে বলল, ‘কিছু মনে করবেন না, আপনার নামটা কিন্তু বেশ আনকমন—তমসাময়৷ এ নাম সচরাচর শোনা যায় না৷’ আপনার গায়ের রংও তো তমসার মতো নয়৷’

তমসাময় বললেন, ‘তা ঠিক৷ আসলে আমার জন্ম হয়েছিল কালীপুজোর রাতে৷ জানেন নিশ্চয়ই দেবী কালীকে তমসাময়ী নামেও ডাকা হয়৷ অমাবস্যার রাতে তমসাময়ীর আরাধনার সময় জন্ম হয়েছিল বলে আমার নাম রাখা হয় তমসাময়৷’

কথা বলতে বলতে তারা পৌঁছে গেল আশ্রমের পিছনের অংশে৷ বেড়ার প্রাচীরের গায়ে একটা বাখারির দরজা বা ঝাঁপ আছে বাইরে যাবার জন্য৷ তার একপাশে পড়ে আছে আধ-পোড়া কাঠের স্তূপ৷ কেমন যেন একটা পোড়া গন্ধ সে জায়গাতে৷ তমসাময় ঝাঁপ ঠেলে তাদের নিয়ে বাইরে বেরবার আগে সোহম নিছক কৌতূহল বশতই তমসাময়কে প্রশ্ন করল, ‘এই কাঠগুলো দিয়ে কী হয়?’

তমসামসয় বললেন, ‘কাঠগুলো শ্মশান থেকে তুলে আনা৷ চিতার কাঠ৷ জ্বালানি হয়৷ কোনও সময় রান্না বা ঘর তৈরির কাজেও লাগে৷ এগুলো তুলে এনে যতটুকু পয়সা সাশ্রয় করা যায় আর কী৷’ কথাটা শুনে চূর্ণী চমকে উঠে বলল, ‘এ কাঠে রান্না হয়!’

তমসাময় বললেন, ‘তা হয়৷ আমি প্রতিটা টাকা বাঁচিয়ে বাচ্চাগুলোর পিছনে তা ব্যয় করার চেষ্টা করি৷ ব্যাপারটা অস্বস্তিকর লাগতে পারে আপনাদের৷ কিন্তু আমি সত্যি কথাই বললাম৷ তবে আপনাদের শঙ্কিত হবার ব্যাপার নেই৷ বুনো আপনাদের রান্না তেলের স্টোভেই করছে৷ আপনাদের রান্নার জায়গাও আলাদা৷ সন্দেহ হলে যে-কোনও সময় গিয়ে দেখে আসতে পারেন, অথবা নিজেরাও রান্না করে খেতে পারেন৷ বুনো সব জোগাড় যন্তর করে দেবে৷’

মল্লার বলল, ‘না না, ওসবের দরকার নেই৷ আপনার কথা অবিশ্বাস করব কেন? বাচ্চাগুলোকে বলেছি মাংস খাওয়াব৷ গঞ্জ বা হাটটা কোথায় তা জানাবেন৷ নদীটা দেখা হলে মাংস কিনে আনব আপনার অনুমতি থাকলে৷’

তমসাময় ঝাঁপ সরাতে সরাতে বললেন, ‘আপত্তির কোনও কারণ নেই৷ আমি জানি ওরা মাছ-মাংস খেতে খুব ভালোবাসে৷ কিন্তু প্রতিদিন তো ওদের সে সব খাওয়ানোর ক্ষমতা হয় না আমার৷ কখনও সখনও মাংস জোটে তাদের কপালে৷ আপনারা মাংস খাওয়ালে খুব খুশি হবে বাচ্চাগুলো৷’

আশ্রমের বাইরে বেরিয়ে তারা দেখল কিছুটা তফাতেই নদী প্রবাহিত হচ্ছে৷ নদী আর আশ্রমের মধ্যে মাত্র পঞ্চাশ কদমের ব্যবধান হবে৷ তমসাময় বললেন, ‘এই হল জলঙ্গী নদী৷ এটা পদ্মার শাখানদী৷ মুর্শিদাবাদ জেলা অতিক্রম করে দক্ষিণে এসে কৃষ্ণনগর থেকে পশ্চিমে গিয়ে ভাগীরথীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে৷’

নদীর পাড় বরাবর ফালি জমিটাও উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত হয়েছে৷ নদীর পাড়ের দিকে এগতে এগতে উত্তর দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে তমসাময় বললেন, ‘ওদিকে একটু এগলেই শ্মশান৷ আশপাশের গ্রামের লোক ওখানে দেহ সৎকার করতে আসে৷ গঞ্জের দিকে যাবার পথে কয়েকটা গ্রাম দেখতে পাবেন৷’

তমসাময়ের সঙ্গে তারা এসে দাঁড়াল নদীর পাড়ে৷ মল্লাররা যেখানে এসে দাঁড়াল তার হাত পাঁচেক নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নদী৷ তার জল স্বচ্ছ নয়, বরং ঈষৎ কালচে ধরনের৷ পাড়ের গায়ে স্থানে স্থানে কলমি, ঝাঁঝি ইত্যাদি জলজ উদ্ভিদের ঝোপ৷ নদী এখানে বেশি চওড়া নয়, তবে স্রোত আছে৷ কচুরিপানা ভেসে চলেছে নদীতে৷ কয়েকটা কালো পানকৌড়ি ডুব দিচ্ছে জলে৷ তমসাময় বললেন, নদীকে এখন শীর্ণ মনে হলেও বর্ষার সময় এ নদী জেগে ওঠে৷ এদিকের পাড় ওপাশের তুলনায় উঁচু বলে জল না উঠলেও ওদিকের পাড়টা অনেকটাই জলে ডুবে যায়৷ তখন নদীর অন্য রূপ৷ আমার ঘরে বসেই রাত্রে জলপ্রবাহের শব্দ শোনা যায়৷’

মল্লাররা শহুরে মানুষ বলেই হয়তো কচুরিপানা ভাসা এ নদীই তাদের বেশ লাগল৷ বিশেষত বেশ বাতাস নদীর পাড়ে৷ বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায় এ বাতাসে৷

সোহম জানতে চাইল, ‘এ নদীতে মাছ পাওয়া যায়?’

তমসাময় বললেন, ‘হ্যাঁ৷ বোয়াল, শোল, মাগুর এসব মাছ পাওয়া যায়৷’

এরপর একটু থেমে তিনি বললেন, ‘অনেকেই জানে না৷ এ সব মছের আসল খাদ্য কিন্তু মড়া৷ নদীর জলে যে সব মৃতদেহ ভাসে তারা ওসব খায়৷’

চূর্ণী কথাটা শুনে জানতে চাইল, ‘মানুষেরও?’

তমসা বললেন, ‘হ্যাঁ৷ অনেক লোক নদীতে ডুবে মারা যায়৷ গ্রামের দিকে অনেকে সাপে কাটা মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেয়৷ ওরা সেসব খায়৷’

কথাটা শুনে চূর্ণী নাক সিটকে বলল, ‘এ বাবাঃ, এরপর এসব মাছ খাওয়া যাবে না দেখছি!’ সোহম চূর্ণীকে বলল, ‘তুই এবার থেকে শাকাহারী হয়ে যায়৷ তবে শুনেছি শাক, সব্জি চাষ করার সময় নাকি সার হিসাবে হাড়ের গুঁড়োও দেওয়া হয়৷’ মল্লার একটা সিগারেট ধরাল৷ বেশ কিছুক্ষণ নদীর পাড়ে থাকার পর আবার তারা আশ্রমে ফেরার পথ ধরল৷