Accessibility Tools

জলঙ্গীর অন্ধকারে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

জলঙ্গীর অন্ধকারে – ৯

মল্লারের পাঁচ মিনিট সময় লাগল বাইরে বেরোনোর জন্য তৈরি হতে৷ তারপর সে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে চূর্ণীকে নিয়ে রওনা হয়ে গেল সোহমের বাসার দিকে৷

সকালবেলা, তার উপর ছুটির দিন, রাস্তা ফাঁকা৷ বেশ স্পিডেই মল্লার গাড়ি চালাচ্ছিল৷ তবুও চূর্ণীর যেন মনে হল, রাস্তা ফুরচ্ছে না৷ উৎকণ্ঠিতভাবে সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘প্লিজ একটু তাড়াতাড়ি চালা৷’

অ্যাক্সিলেটরে আরও জোরে চাপ দিল মল্লার৷ আধ ঘণ্টাও লাগল না তাদের সোহমের বাসায় পৌঁছতে৷ গাড়ি থেকে নেমেই তারা দেখতে পেল সোহমের বাড়িওয়ালা উমাপতিবাবু কিছুটা তফাতে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজছেন৷ চূর্ণী প্রায় ছুটে গিয়ে দাঁড়াল তাঁর সামনে৷ আর তার পিছন পিছন মল্লার৷ তারা ভদ্রলোককে কিছু প্রশ্ন করার আগেই তিনি বললেন, ‘বন্ধুর খোঁজে এসেছেন? তিনি তো নেই৷’

‘নেই মানে?’ আতঙ্কিতভাবে প্রশ্ন করল চূর্ণী৷

উমাপতিবাবু মাজন করতে করতে বললেন, ‘উনি সকাল সাতটা নাগাদ বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন৷ যাবার আগে বলে গেলেন, অফিসের কাজে তিনি বাইরে যাচ্ছেন৷ ফিরতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে৷ যাবার আগে এ মাসের ভাড়াটার সঙ্গে সামনের মাসের ভাড়াটাও আমাকে দিতে আর তার বাইরে যাবার খবরটা জানাতে এসেছিলেন৷’

কথাটা শুনেই চূর্ণী উল্লসিতভাবে বলে উঠল, ‘বেঁচে আছে! সোহম বেঁচে আছে!’

 চূর্ণীর কথার অন্তর্নিহিত ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে উমাপতিবাবু মৃদু বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘কেন? উনি বেঁচে থাকবেন না কেন? ওনার কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছিল নাকি?’

ব্যাপারটা ধামাচাপা দেবার জন্য মল্লার এরপর চূর্ণীকে আর কোনও কথা বলতে না দিয়ে ভদ্রলোককে প্রশ্ন করল, ‘কোথায় গিয়েছে বা আর কিছু সে আপনাকে জানিয়ে গেছে?’

বাড়িওয়ালা উমাপতিবাবু বললেন, ‘না, কোথায় গিয়েছেন বলেননি৷ তবে সঙ্গে বেশ বড় দুটো ব্যাগ ছিল৷ দূরে কোথাও যাচ্ছেন বলে মনে হল৷ আর হ্যাঁ, তিনি যাবার আগে বলে গিয়েছেন যে আপনারা এলে জানিয়ে দিতে, যেন তার জন্য চিন্তা না করেন৷ প্রয়োজন হলে তিনি আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবেন৷’

‘তার কোনও ফোন নম্বর আপনাকে দিয়ে গিয়েছে?’ জানতে চাইল চূর্ণী৷

ভদ্রলোক বললেন, ‘না নতুন কোনও ফোন নম্বর তো দেননি৷ পুরোনো ফোন নম্বরটা অবশ্য আমার কাছে আছে৷ কেন সে নম্বর আপনাদের কাছে নেই?’

বাড়িওয়ালার কথা শুনে মল্লারের যা বোঝার সে বুঝেছে৷ তার গন্তব্য সম্পর্কে সোহম কোনও সূত্র দিয়ে যায়নি৷ পাছে চূর্ণীর মুখ দিয়ে বেফাঁস কোনও কথা বেরিয়ে যায় তাই মল্লার ভদ্রলোকের সঙ্গে আর কোনও কথা না বাড়িয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, পুরোনো ফোন নম্বর আমাদের কাছে আছে৷ এবার আমরা চলি৷’ এ কথা বলে সে চূর্ণীর হাত ধরে টেনে এগলো গাড়ির দিকে৷

গাড়ি স্টার্ট করল মল্লার৷ সোহম জীবিত আছে জেনে চূর্ণী কিছুটা শান্ত হলেও সোহমকে নিয়ে দু’জনের মনের আশঙ্কা কিছুতেই কাটছে না৷

মল্লার সোহমের বাসা ছেড়ে এগতেই চূর্ণী বলল, ‘তোর কী মনে হয়? সোহম এভাবে কোথায় গেল?’

গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে মল্লার জবাব দিল, ‘আমার মনে হয় ও তমসাময়ের আশ্রমের উদ্দেশে রওনা হয়েছে৷ ওখানেই তো ওর যাবার ইচ্ছা বলেছিল৷ অফিসের কাজে যাচ্ছে, এ কথাটা মিথ্যা৷ আদৌ কোনও নতুন চাকরিতে জয়েন করেছে বলে মনে হয় না!’

চূর্ণী বলল, ‘আমার মনও তাই বলছে৷ কিন্তু ও ওখানে যাবার জন্য এত উদগ্রীব হয়ে উঠল কেন?’

মল্লার জাবব দিল, ‘তার উত্তর একমাত্র সে-ই জানে৷ তবে সোহমের আচরণের মধ্যে যে অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে তার সঙ্গে কোনওভাবে তমসাময় বা তাঁর আশ্রমের একটা যোগসূত্র আছে বলে আমার মনে হয়৷’

কথাটা শুনে মুহূর্তখানেক চুপ করে থেকে চূর্ণী বলল, ‘চল তবে আমরাও সেই আশ্রমে যাবার জন্য রওনা হই৷’

মল্লার বলল, ‘কিন্তু ওখানে গেলে তো আজ ফেরা যাবে না৷ কাল তোরও অফিস আছে আর আমারও৷ বেশ কয়েকটা ক্লায়েন্ট মিট আছে৷’

চূর্ণী বলল, ‘আমি বেশ বুঝতে পারছি গঙ্গাতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার না জেনেও কোনওভাবে বেঁচে গেলেও ও যেন কোনও বিপদের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে৷ কখন কী ঘটে যাবে কে জানে৷ তা থেকে ওকে বাঁচাতেই হবে৷ প্লিজ চল, আমরা রওনা হই৷’—একটা করুণ আর্তি ভেসে উঠল চূর্ণীর গলাতে৷’

মল্লার বলল, ‘সোহমের জন্য আমারও দুশ্চিন্তা হচ্ছে৷ কিন্তু এমন হুট করে কি অতদূর যাওয়া যায়? একটা দিন না হয় অপেক্ষা করে দেখি? তারপর সিদ্ধান্ত নেব৷ এমনও হতে পারে ও হয়তো আজ বা কাল ফোনে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করল৷’

চূর্ণী মল্লারের কথায় কান দিল না৷ সে বলল, ‘না, আজই আমি সোহমের খোঁজে সেখানে যাব৷ তুই না নিয়ে যেতে পারিস তো গাড়ি থেকে এখনই আমাকে নামিয়ে দে৷ আমি কোনও গাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে রওনা দেব৷’

তার কথা শুনে মল্লার বলল, ‘কী পাগলামি করছিস? ঠান্ডা মাথায় আমাকে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে দে৷ আর তুইও ভাব৷’

চূর্ণী বলল, ‘আমার যা ভাবার তা ভাবা হয়ে গিয়েছে৷ তুই হয় আমাকে ওখানে নিয়ে চল, নইলে গাড়ি থেকে নামিয়ে দে৷ আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি সোহম বিপদের মধ্যে রয়েছে৷ ওর কাছে যেতে হবে, কথা বলতে হবে৷ ওর যদি কোনও ক্ষতি হয়ে যায় তবে আমিও বাঁচব না৷ আমাকে তুই বরং এখনই গাড়ি থেকে নামিয়ে দে৷’

ঠিক এই সময় একটা সিগনালে এসে দাঁড়িয়ে পড়তে হল মল্লারকে৷ আর চূর্ণীও এরপর আর মল্লারের জবাবের প্রতীক্ষা না করে হাত বাড়াল দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ার জন্য৷ চূর্ণীকে আর কোনওভাবে তার ইচ্ছা থেকে সরানো যাবে না বুঝতে পেরে মল্লার বলল, ‘কী করছিস কী? ঠিক আছে, চল যাব৷ কিন্তু একটা ঘণ্টা সময় তো অন্তত দিবি৷ জামা-কাপড় তো নিতে হবে৷ তুইও কি এক কাপড়ে থাকতে পারবি? এমন যদি হয় যে আমাদের কালকেও আশ্রম থেকে ফেরা হল না তখন?’

মল্লারের কথায় চূর্ণী এবার একটু আশ্বস্ত হল৷ সে বলল, ‘ঠিক আছে৷ কাপড় জামা নিয়ে নিই৷ কিন্তু দেরি করা যাবে না৷ যত দ্রুত সম্ভব রওনা দিতে হবে জলঙ্গীর দিকে৷’

গাড়ি চালাতে চালাতেই ফোন করল তার ব্যাঙ্কের ঊর্ধ্বতন ম্যানেজারকে৷ বাধ্য হয়েই মিথ্যা বলল তাকে৷ সে বলল, ‘তার এক বিশেষ পরিচিত মরণাপন্ন৷ তাকে দেখার কেউ নেই৷ বাধ্য হয়ে তাকে দেখার জন্য মল্লারকে কলকাতার বাইরে যেতে হচ্ছে৷ দু-তিনদিন সে অফিসে নাও যেতে পারে৷

চূর্ণীকে নিয়ে মল্লার প্রথমে নিজের বাড়িতে গেল৷ চূর্ণী গাড়ি থেকে নামল না৷ মল্লার দ্রুত একটা ব্যাগে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভরে নিয়ে গাড়িতে ফিরে এল৷ তারপর চূর্ণীর বাড়ি৷ চূর্ণী গাড়ি থেকে নেমে ছুটেতে ছুটতে তার ফ্ল্যাটে ঢুকল৷ আর খুব বেশি হলে তিন মিনিটের মধ্যেই তার ব্যাগ নিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে উঠল গাড়িতে৷ সোহমের খোঁজে তারা রওনা দিল জলঙ্গীর পাড়ে তমসাময়ের নবজীবন আশ্রমের উদ্দেশে৷

কলকাতা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল মল্লার আর চূর্ণী৷ এয়ারপোর্ট গেট হয়ে প্রথমে যশোর রোড৷ তারপর চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে সোজা কৃষ্ণনগরের দিকে৷ ঘড়ির কাঁটাও এগিয়ে চলল তাদের সঙ্গে৷ আগের বার যখন তারা এ পথ ধরে তমসাময়ের অনাথ আশ্রমের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল তখন যাত্রাপথে কত হাসি, ঠাট্টা আনন্দে মেতে ছিল৷ কিন্তু আজ গাড়ির ভিতর এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য বিরাজ করছে৷ চূর্ণীর মুখমণ্ডলে জেগে আছে স্পষ্ট উৎকণ্ঠার ছাপ, কোনও কথা বলছে না সে৷ মল্লারের মনেও যে উৎকণ্ঠা বা উত্তেজনা কাজ করছে না এমন নয়৷ কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য, চূর্ণীর উৎকণ্ঠা কিছুটা প্রশমিত করার জন্য মল্লার বারকতক চেষ্টা করল অন্য প্রসঙ্গে চূর্ণীর সঙ্গে কথা বলার৷ কিন্তু সে সব কথায় কোনও আগ্রহ প্রকাশ করল না চূর্ণী৷ অগত্যা নিশ্চুপভাবে গাড়ি চালাতে লাগল মল্লার। পঁচিশে ডিসেম্বর, নানা ধরনের গাড়ি করে উল্লাসধ্বনি করতে করতে, মাইক বাজিয়ে যাওয়া আসা করছে পিকনিক পার্টি৷ কিন্তু আনন্দের সামান্য রেশ নেই মল্লারের গাড়ির ভিতর৷

বেলা একটা নাগাদ রানাঘাটে পৌঁছল মল্লারদের গাড়ি৷ বেশ খিদে পেয়েছে মল্লারের৷ রাস্তার গায়েই একটা ধাবা আর কয়েকটা দোকান দেখে মল্লার বলল, ‘চল, দুপুরের খাবার খেয়ে নিই?’

চূর্ণী জবাব দিল, ‘না, আমার খিদে নেই৷ তুই বরং কিছু শুকনো খাবার কিনে নে৷’ মল্লার বুঝতে পারল চূর্ণী কোনওমতেই এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করতে চাইছে না৷ কাজেই মল্লার সেই মতো কাজ করল৷ গাড়ি থামিয়ে কেক, বিস্কুট আর জলের বোতল কিনে এনে আবার গাড়িতে উঠে গাড়ি চালাতে চালাতে খেতে শুরু করল৷ চূর্ণী একটা কেকে একবার কামড় দিয়ে সেটা হাতে নিয়ে বসে রইল৷ উৎকণ্ঠায় সত্যিই খিদে তৃষ্ণা হারিয়ে গেছে তার৷

বিকেলের কিছুটা আগেই প্রথমে কৃষ্ণনগর পৌঁছে গেল তারা৷ রাস্তার পাশে এখানে বেশ কয়েকটা খ্রিস্টান জনবসতি আর চার্চ আছে৷ বড়দিন উপলক্ষে সেগুলো সাজানো হয়েছে৷ আশপাশে উৎসবমুখর মানুষের ভিড়৷ অনেকটা যেন দুর্গাপুজোর মতো ব্যাপার৷ সে সব জনসমাগম, কোলাহল অতিক্রম করে নির্দিষ্ট পথ ধরল মল্লার৷ এরপর ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগল জনবসতির চিহ্ন। রাস্তার পাশে চোখে পড়তে লাগল দিগন্তবিস্তৃত পতিত জমি, খাল বিল, কোথাও বা বড় বড় গাছ৷ ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল জলঙ্গী৷ গাড়ির উইন্ড স্ক্রিন দিয়ে বিকালের রোদ এসে পড়েছে চূর্ণীর মুখে৷ মল্লার খেয়াল করল নিশ্চুপ চূর্ণীর ঠোঁট দুটো তির তির করে কাঁপছে!

মল্লার বুঝতে পারল যে তমসাময়ের আশ্রম যত এগিয়ে আসছে ভিতরে ভিতরে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ছে চূর্ণী৷ মল্লার বলল, ‘আশ্রমে যদি আমরা সত্যিই সোহমের দেখা পাই তবে প্রথমেই তুই খুব একটা রিঅ্যাক্ট করিস না৷ ঠান্ডা মাথায় জানতে হবে, ওর ওই অদ্ভুত আচরণের কারণ কী? তারপর সেই মতো ওকে বুঝিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে৷ অযথা চিৎকার চেঁচামেচি করলে পরিস্থিতি বিগড়ে যেতে পারে৷’

মল্লারের কথা শুনে চূর্ণী সংক্ষিপ্ত জবাব দিল—‘আচ্ছা।’

শীতের বিকালের রোদ আরও নরম হতে শুরু করল৷ তারপর এক সময় মল্লারের চোখে পড়ল সেই গাছটা৷ যার মাথার ওপরের ডাল থেকে বিশাল বিশাল বাদুড় ঠিক আগের মতোই ঝুলছে৷ গাছপালার আড়াল দিয়ে চোখে পড়তে লাগল নদী, ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল জলঙ্গী৷ তারপর দেখা দিল বাঁশের বেড়ার প্রাচীর দিয়ে ঘেরা আশ্রমটা৷ মল্লার আর চূর্ণী পৌঁছে গেল গন্তব্যে৷

বাঁশের ঝাঁপের গেটটা ভিতর থেকে বন্ধ৷ মল্লার গাড়িটা তার সামনে দাঁড় করাতেই চূর্ণী উত্তেজনার বশে গাড়ি থেকে গেটের মুখেই নেমে পড়তে যাচ্ছিল৷ তা দেখে মল্লার তাকে সতর্ক করে বলল, ‘মাথা ঠান্ডা রাখ, উত্তেজিত হবি না৷ এ কথাটা তোকে আবারও বলছি৷’

মল্লার গাড়ির হর্ন বাজাতে শুরু করল৷ আজ যেন আগের দিনের তুলনায় বেশ খানিকটা বেশি সময় লাগল আশ্রমের প্রবেশ পথ খোলার জন্য৷ তারপর আগের দিনের মতোই বেড়ার গেটটা একটু ফাঁক করে ভিতর থেকে উঁকি দিল বুনো৷ তাকে দেখেই গাড়ির জানলার বাইরে মাথা বার করে চূর্ণী জিগ্যেস করল, ‘সোহম, এখানে এসেছে?’

বুনো মাথা ঝাঁকিয়ে বুঝিয়ে দিল, সে এসেছে৷

চূর্ণী সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘দরজা খোল, ভিতরে ঢুকব৷’

নিঃশব্দে দরজা খুলে দিল বুনো৷ গাড়ি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে মল্লাররা সোজা গিয়ে থামল তমসাময়ের ঘরটার সামনে৷ তারা দু’জন গাড়ি থেকে নামতেই ঘরের বাইরে দাওয়াতে বেরিয়ে এলেন তমসাময়৷ তারা তাঁকে কিছু বলার আগেই তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘আমি অনুমান করেছিলাম, বন্ধুকে খুঁজতে আপনারা এখানে আসবেন৷ তবে আজই যে আসবেন ভাবিনি৷’

চূর্ণী প্রশ্ন করল, ‘কোথায় সে?’

তমসাময় দাওয়া থেকে নীচে নেমে আঙুল তুলে দেখালেন বাচ্চাদের থাকার ঘরটার দিকে৷ সেখানে সেই আগের দিনের মতোই মাটির দাওয়াতে শেষ বিকালের আলোতে পা ঝুলিয়ে বসে আছে ছেলেগুলো৷ আর তাদের মাঝে বসে আছে সোহম!

তাকে দেখতে পেয়েই চূর্ণী এগলো সেদিকে৷ আর তার সঙ্গে মল্লারও৷ ঘরটার কাছাকাছি পৌঁছতেই সোহম দাওয়া ছেড়ে নামল৷ তারপর ধীরে-সুস্থে এগয়ে এল মল্লারদের দিকে৷ তাদের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল সোহম৷ আপাতদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে কোনও পরিবর্তন লক্ষ করল না মল্লার৷ সোহমের মুখ শান্ত-স্বাভাবিক৷

চূর্ণী আর সোহমের মধ্যে কয়েক মুহূর্ত দৃষ্টি বিনিময় হল৷ সোহম এরপর তার ঠোঁটের কোণে আবছা হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘তোরা যে আজই এখানে আসবি তা ভাবিনি৷ বাড়িতে নিশ্চয়ই আমাকে খুঁজতে গিয়েছিলি?’

চূর্ণী, মল্লারের পরামর্শ মতো নিজেকে যথাসম্ভব সংযত রাখার চেষ্টা করে বলল, ‘হ্যাঁ, গিয়েছিলাম৷ তুই হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে এখানে এভাবে চলে এলি কেন?’

সোহম জবাব দিল, ‘এই আশ্রমের জন্য, এই বাচ্চা ছেলেগুলোর জন্য আমার মন টানছিল৷ তাই এখানে ক’দিন থাকব বলে চলে এলাম৷’—এই বলে হাসল সে৷

তার হাসি দেখে, এবার আর রাগ চাপতে না পেরে চূর্ণী বেশ ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল, ‘এখানে আসার আগে আমাকে একবার জানাবার প্রয়োজন মনে করলি না! হাসতে লজ্জা করছে না তোর? ভেবেছিসটা কী? কাল রাতে তুই কোথায় ছিলি?’

সোহমের মুখটা এবার কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল৷ সে জবাব দিল, ‘কাজে বেরিয়েছিলাম৷ সকালে বাড়ি ফিরে এখানে আসার জন্য রওনা দিয়েছিলাম৷’

চূর্ণী বলল, ‘কোন কাজ? কোথায় কাজ? তোর নতুন অফিসের ঠিকানা আর ফোন নম্বর আমাকে বল?’

সোহম এবার গম্ভীর স্বরে বলল, ‘সব কিছু বলতেই হবে?’

বাগবিতণ্ডা শুরু হতে যাচ্ছে দেখে মল্লার দু’জনকেই হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে সোহমকে বলল, ‘তোরা বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করিস না৷ আসলে তুই আমাদের কাউকে কিছু না বলে এমন হুট করে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়াতে চূর্ণী ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ওর রাগ বা আমাদের উদ্বেগের কারণ, মাথা ঠান্ডা করে ভাবলেই বুঝতে পারবি৷ জানিয়ে এলে কোনও সমস্যাই হতো না৷ তুই কখন এখানে এসে পৌঁছলি বল?’

মল্লারের কথা শুনে সোহম আর চূর্ণী দু’জনেই কিছুটা সংযত হল৷ কিছুটা তফাতে দাওয়ায় বসে তাদের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নবজীবন, সঞ্জীবনসহ অন্য বাচ্চাগুলো৷ মল্লারদের কথাবার্তা নিশ্চয়ই তাদের কানেও যাচ্ছে৷

মল্লারের কথার জবাবে সোহম কিছুটা নরম গলায় বলল, ‘আসলে আমি ভেবেছিলাম কাল গঞ্জে গিয়ে সেখান থেকে ফোন করে খবরটা জানিয়ে দেব৷ দুপুরবেলায় আমি এখানে এসে পৌঁছেছি৷ তারপর জীবনবাবার সঙ্গে কথা বলে, স্নান, খাওয়া সেরে, বিকালবেলা বাচ্চাগুলোর সঙ্গে গল্প করছিলাম৷’

পরিস্থিতি বিবেচনা করে চূর্ণীও এবার বেশ খানিকটা স্বাভাবিক স্বরে বলল, ‘তোকে কিছু ব্যাপার জিগ্যেস করার আছে৷ তুই কি কোনও ঝামেলা বা বিপদের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিস সোহম? সত্যি করে বল?’

সোহম মৃদু চুপ করে থেকে বলল, ‘না, কোনও ঝামেলায় জড়াইনি৷ সব কিছু ঠিকই আছে৷’ চূর্ণী আর মল্লার দু’জনেই বুঝতে পারল, সোহম সহজে মুখ খুলবে না৷ চূর্ণী এরপর কিছুটা নরম গলায় বলল, ‘তোর থেকে কিছু ব্যাপারে আমার জানার আছে৷’

সোহম বলল, ‘হয়তো আমারও তোকে কিছু বলার আছে৷’

চূর্ণী বলল, ‘তবে চল, কোথাও গিয়ে বসে কথা বলি?

হবু স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে কথা বললে হয়তো সমস্যা দূর হতে পারে৷ চূর্ণীকে হয়তো বা আসল ব্যাপারটা সোহম জানাতে পারে৷ মল্লারের মনে হল তাদের দু’জনকে কথা বলার জন্য আলাদা ছেড়ে দেওয়া উচিত৷ সোহম আর চূর্ণী আর কয়েক মাসের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্কে বাঁধা পড়তে চলেছে৷ তাদের মধ্যে এমন কিছু কথা থাকতে পারে যা মল্লারের সামনে বলতে অস্বস্তি বোধ করতে পারে৷ কাজেই মল্লার তাদের উদ্দেশে বলল, ‘এখানে কোনও ঘর ফাঁকা থাকলে তোরা দু’জন সেখানে বসে কথা বলতে পারিস৷’

সোহম কথাটা শুনে বলল, ‘না, এখন নয়৷ আমি যে কথা বলতে চাই তার জন্য একটা রাত সময় দিতে হবে৷ এত দূর থেকে এসে তোরা নিশ্চয় আজ রাতেই ফিরবি না৷ কাল সকালে আমি আমার কথা বলব৷’

তারা কথা বলতে-বলতেই শীতের বিকালের সূর্যের আলো দ্রুত কমে আসতে শুরু করল। চূর্ণী সোহমের কথা শুনে বলল, ‘হ্যাঁ, আজকে না হয় আমরা ফিরব না, কিন্তু কী এমন কথা যে এক রাত ভেবে বলতে হবে?’

মল্লাররা এবার খেয়াল করল, ‘তমসাময় আর বুনো তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। সোহম তাদের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘বললাম তো আমার যা বলবার তা কাল সকালে বলব।’

চূর্ণী প্রত্যুত্তরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, সে সময়ে মল্লার বলে উঠল, ‘ঠিক আছে সোহম যখন কাল বলবে বলছে তখন কালই ওর কথা শোনা যাবে৷ একটা রাতের তো মাত্র ব্যাপার৷’

সোহমকে চাপ দিলে পাছে সে তার মত পরিবর্তন করে, কোনও কথা বলতে অস্বীকার করে সে জন্যই মল্লার কথাটা বলল চূর্ণীকে৷

হঠাৎ তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন তমসাময়৷ মল্লার আর চূর্ণীর উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই আজ আর ফিরবেন না?’

মল্লার জবাব দিল, ‘না, আজ ফিরব না৷ আজকের রাতটা এখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে৷’

তমসাময় মল্লারের কথা শুনে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘এক রাত কেন আপনারা যত দিন খুশি এ আশ্রমে থাকতে পারেন৷ আগের বার যে ঘরে ছিলেন সেখানেই রাতে থাকবেন৷ একটু পরেই অন্ধকার নামবে৷ আপনাদের সঙ্গে ব্যাগপত্র থাকলে সেগুলো নিয়ে ঘরে চলুন৷ আপনাদের চা দেবার পর বুনো রাতের খাবার রান্না করতে বসবে৷’

মল্লার চূর্ণীকে বলল, ‘চল তবে ঘরে গিয়ে জিনিসপত্র রেখে আড্ডায় বসি আমরা৷’

এরপর সে জায়গা ছেড়ে সকলে এগলো তমসাময়ের ঘরের দিকে৷ সেখানে পৌঁছে নিজের ঘরে উঠে গেলেন তমসাময়৷ মল্লার গাড়িটা ঠিক জায়গাতে রাখার পর চূর্ণী আর তার ব্যাগ নামাল গাড়ি থেকে৷ তারপর তারা সকলে মিলে রওনা হল সেই ঘরের দিকে যেখানে ইতিপূর্বে তারা রাত্রিবাস করেছিল৷

ঘরের দাওয়াতে উঠে বুনোই প্রথমে দরজাটা খুলল৷ অন্ধকার হাতড়ে ঘরে রাখা লণ্ঠন জ্বালাল বুনো৷ মল্লাররা পা রাখল ঘরের ভিতর৷ শূন্য ঘরে শুধু সেই চৌকি, বিছানা একই রকম আছে৷ চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে নিয়ে মল্লার সোহমকে প্রশ্ন করল, ‘কী রে, তোর ব্যাগ কই?’

সোহম জবাব দিল, বাচ্চাগুলো যেখানে থাকে সেখানেই একটা ঘরে৷’

চূর্ণী বলল, ‘সেখানে কেন?’

সোহম বলল, ‘আমাকে দেখে ওরা খুব খুশি হয়েছে৷ ওরা ওদের ওখানেই আমাকে থাকতে বলল৷ জীবনবাবাও ব্যাপারটাতে আপত্তি করলেন না, তাই আমার জিনিসপত্র ওখানে নিয়ে গিয়ে রাখলাম৷’

এ কথা শুনে চূর্ণী বলল, ‘মালপত্রগুলো তুই আবার এ ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে আয়৷ আমরা তো এবার এসে গেছি৷’

সোহম বলল, ‘না, আমি ওখানেই থাকব৷ আমি ওদের কথা দিয়েছি ওখানেই থাকব৷ কথা না রাখলে ওরা মনে দুঃখ পাবে৷ এবার আমি যাই৷ তোরা রেস্ট নে৷ কাল যা কথা হবার হবে৷’ সোহম বেরিয়ে গেল ঘর থেকে৷ চূর্ণী তাকে ডাকতে যাচ্ছিল কিন্তু মল্লার তাকে ইশারায় থামিয়ে দিল৷

বাইরে দ্রুত অন্ধকার নামতে শুরু করেছে৷ সোহম দাওয়া ছেড়ে নেমে ছেলেগুলোর ঘরের দিকে রওনা হয়ে যাবার পর মল্লার, চূর্ণীকে বলল, ‘কাল সকাল পর্যন্ত আমাদের ধৈর্য ধরে থাকতে হবে৷ দেখি কাল সকালে ও কী বলে?’

চূর্ণী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘ও কেন যে এমন করছে, আমি তো কিছুই বুঝছি না৷’—এ কথা বলে সে লণ্ঠানটা উঠিয়ে নিয়ে বেড়ার পার্টিশনের ওপাশে চলে গেল৷

দরজা খুলে দিয়ে বুনো চলে গিয়েছিল৷ বাইরে অন্ধকার নামার কিছুক্ষণ পর সে চা আর একটা লণ্ঠন দিয়ে গেল৷ চূর্ণী আর মল্লারের পোশাক পাল্টানো হয়ে গেছিল৷ দাওয়াতে চা নিয়ে বসল দু’জন৷ অন্ধকারে ডুবে গিয়েছে চারদিক৷ শুধু রান্না ঘরের ভিতর থেকে এক বিন্দু আলো যেন বাইরে আসছে৷ সম্ভবত কাঠের আগুন জ্বালিয়েছে বুনো৷ ওই আলোক বিন্দু তারই৷

নিঃশব্দে অন্ধকারে বসে চা খেল তারা দু’জন৷ অন্ধকার মুছে গিয়ে চাঁদ উঠল এক সময়৷ পূর্ণিমার চাঁদ নয়, অর্ধেক চাঁদ৷ তার আলোতে ঔজ্জ্বল্য না থাকলেও আসপাশে দেখা যাচ্ছে৷ সেই আলোতে দৃশ্যমান হল ব্যারাকের মতো দেখতে, খড়ের ছাউনি দেওয়া ছেলেদের থাকার জায়গাটা৷ চূর্ণী সেদিকে তাকিয়ে বলল, ‘চল ওখানে যাবি নাকি? দেখে আসি সোহম কী করছে?’

মল্লার মৃদু ভেবে নিয়ে বলল, ‘না, থাক৷ ওকে এখন বিরক্ত করে লাভ নেই৷ এটা স্পষ্ট যে এই মুহূর্তে আমাদের চেয়ে ও ছেলেগুলোর সঙ্গে থাকতে বেশি পছন্দ করছে৷ দেখা যাক কাল কোন রহস্য উন্মোচন করে? এখন ওকে ওর মতো থাকতে দে৷’

এ কথা শুনে চূর্ণী চুপ করে তাকিয়ে রইল চাঁদের দিকে৷ আর মল্লার সামনে তাকিয়ে ভাবতে লাগল নানান কথা৷ অন্ধকার নামার পর থেকেই ধীরে ধীরে ঠান্ডা বাতাস আসতে শুরু করেছে নদীর দিক থেকে৷

এরপর চাঁদের আলো হঠাৎই যেন ম্রিয়মাণ হয়ে গেল! আর চূর্ণী বলে উঠল, ‘ওগুলো কী পাখি রে?’

মল্লার ওপর দিকে তাকিয়ে দেখল, মাথার ওপর আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়তে উড়তে এগচ্ছে নদীর দিকে৷ তাদের বিরাট বিরাট ডানার আড়ালে মাঝে মাঝে চাঁদ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে৷ তাদের বিশেষ আকৃতির ডানার জন্যই মল্লার চিনতে পারল প্রাণীগুলোকে৷ সে বলে উঠল, ‘ওরা পাখি নয়, বাদুড়৷ আমরা যে গাছে বাদুড় ঝুলতে দেখেছিলাম হয়তো বা সে গাছ থেকেই ওরা রাতে খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়েছে৷’

বাদুড়গুলো উড়ে চলে গেল নদীর দিকে৷ আর তারপরই নদীর পাড় থেকে ভেসে এল শিয়ালের সম্মিলিত চিৎকার৷ সে ডাক থামার পর হঠাৎই চারপাশে, তমসাময়ের আশ্রমে কেমন যেন অপার্থিব নিস্তব্ধতা নেমে এল৷ কুয়াশা নামতে শুরু করেছে৷ সঙ্গে ঠান্ডাও৷ চূর্ণী আর মল্লার ঘরের ভিতরে ঢুকে বসল৷ নিশ্চুপভাবে বসে দু’জন ভাবতে লাগল সোহমের ব্যাপারটা নিয়ে৷ রাত আটটা নাগাদ বুনো খাবার আনল৷ চূর্ণী তাকে জিগ্যেস করল, ‘সোহমের খাবার দিয়ে এসেছ? কী করছে সে?’

‘দেব৷’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে খাবার রেখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল বুনো৷

মল্লারের বেশ খিদে পেয়েছিল৷ চটপট খেয়ে নিল সে৷ চূর্ণী নিজের খাবারের অর্ধেকও খেল না৷ কোনওরকমে খাওয়া শেষ করে সে বলল, ‘আমি শুয়ে পড়ছি৷ এত মানসিক চাপ আর আমি নিতে পারছি না৷ খুব ক্লান্ত লাগছে৷ শুয়ে পড়ছি৷’—এ কথা বলে সে ঘরের পার্টিশানের অন্যদিকে গিয়ে ভিতর থেকে বেড়ার ঝাঁপ বন্ধ করে দিল৷ আর মল্লারও ঘরের দরজা বন্ধ করে, লণ্ঠনের আলোটা কমিয়ে, কম্বল গায়ে শুয়ে পড়ল৷ জলঙ্গীর পাড়ে শ্মশানের গায়ে তমসাময়ের আশ্রমে বেড়ে চলল রাত৷

মল্লার এতটা পথ গাড়ি চালিয়ে এসেছে৷ পরিশ্রম তারও কম হয়নি৷ কিন্তু চূর্ণী ঘুমিয়ে পড়লেও মল্লারের ঘুম এল না৷ রাত যত বেড়ে চলল, বাইরের নিস্তব্ধতা যত বেড়ে চলল ততই যেন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি ঘিরে ধরতে লাগল তাকে৷ তার মনে হতে লাগল বাইরে যেন কোথাও এক অদ্ভুত কিছু ঘটবে বা ঘটে চলেছে! কম্বলমুড়ি দিয়ে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে লাগল সে৷ এভাবেই তিন-চার ঘণ্টা সময় কেটে গেল৷ তারপর হঠাৎ একসময় আবার জলঙ্গীর পাড় থেকে ভেসে এল শিয়ালের ডাক৷

রিস্ট ওয়াচ দেখল মল্লার৷ রাত বারোটা বাজে৷ মনের ভিতরের একটা অস্থিরতা যেন উঠে বসাল তাকে৷ কম্বলমুড়ি দিয়ে বসে বেড়ার দেওয়ালের গায়ের জানলার মতো জায়গাটা দিয়ে সে তাকাল বাইরের দিকে৷ আর দেখতে পেল সেই দৃশ্য৷ বাচ্চা ছেলেগুলো নিজেদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আশ্রমের ফাঁকা জমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ কিছুক্ষণের মধ্যে তমসাময়ও সেখানে হাজির হলেন৷ ছেলেদের দল তারপর কুয়াশাময় রাত্রিতে তাঁর পিছনে সার বেঁধে এগলো নদীর দিকে যাবার জন্য৷

তমসাময় আর ছেলের দল মল্লারের দৃষ্টির বাইরে চলে গেল একসময়৷ মল্লার ভাবতে লাগল সোহম এখন কী করছে? সে কি জেগে আছে? নাকি ঘুমিয়ে পড়েছে? সে কি নিশাচর হয়ে গেছে? এ সব কথা ভাবতে ভাবতেই মল্লার দেখতে পেল সোহমকে! সেও এসে দাঁড়াল আশ্রমের মধ্যে ফাঁকা জমিতে৷ সেখানে দাঁড়িয়ে একেবারে সে যেন তাকাল মল্লারদের ঘরটার দিকে৷ তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকল তমসাময় আর ছেলের দল যেদিকে অদৃশ্য হয়েছে সেদিকে৷

মল্লারের মনটা এবার চঞ্চল হয়ে উঠল৷ সোহমের কোনও বিপদ হবে না তো? মল্লার নিজে একবার তমসাময়দের অনুসরণ করে কুয়াশায় পথ হারিয়ে আর একটু হলে জলে পড়ে যাচ্ছিল৷ সোহমের যদি তেমন কোনও দুর্ঘটনা ঘটে? আবারও যদি সে জলে পড়ে যায়? অথবা অন্য কোনও ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে? মল্লারের মনে হল আটকাতে হবে সোহমকে৷ বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল মল্লার৷

পার্টিশানের ওপাশটা নিস্তব্ধ৷ চূর্ণী ঘুমিয়ে পড়েছে৷ মল্লার নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে যখন দাওয়া ছেড়ে নীচে নামল তখন সোহম আশ্রমের পিছনের অংশের গেটের কাছে অনেকটা পৌঁছে গেছে৷ মল্লারও দ্রুত এগলো সেদিকে৷ মল্লার তার কাছাকছি পৌঁছবার আগেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল আশ্রমের বাইরে৷

মল্লারও বাইরে বেরিয়ে এল৷ ওঃ কী প্রচণ্ড কুয়াশা জলঙ্গীর পাড়ে৷ নদী, পাড়, চরাচর সব মিলেমিশে একাকার রাত্রির অন্ধকার আর কুয়াশাতে৷ চারপাশে তাকিয়ে মল্লারের মনে পড়ে গেল এমনই কুয়াশাময় রাতে তার আগেরবারের অভিজ্ঞতার কথা৷ সোহমও নিশ্চয়ই শ্মশানের দিকেই গেছে৷ গতবারের ঘটনাটা তার মনে পড়ায় মল্লার একবার থমকে দাঁড়াল৷ তারপর ‘কপালে যা আছে তা হবে’—ভেবে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল শ্মশানের দিকে৷

নদীর ধারটা কোথায় তা অনুমান করে নিয়ে তার থেকে যথা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে সতর্ক ভাবেই সে এগলো৷ ঘন কুয়াশা চারপাশে৷ চার-পাঁচ হাত তফাতে কিছু দেখা যাচ্ছে না। কুয়াশা বলয়ের মধ্যে প্রবেশ করে মল্লার কুড়ি-পঁচিশ পা এগতেই সে তার সামনেই একটা আবছা মূর্তি দেখতে পেল৷ ধীর পায়ে সে এগচ্ছে শ্মশানের দিকে৷ সেই মূর্তির পরনে প্যান্ট-শার্ট দেখে কুয়াশার মধ্যে তাকে সোহম বলেই মনে হল মল্লারের৷ তমসাময় এ পোশাক পরেন না৷ আর এত রাতে নদীর পারে অন্য কেই বা আসবে?

যে হেঁটে চলেছে তার অবয়বটাও সোহমের মতোই লাগল মল্লারের৷ কাজেই মল্লার সেই ছায়া মূর্তির উদ্দেশে হাঁক দিল ‘অ্যাই সোহম, তুই কোথায় যাচ্ছিস?’

কিন্তু কোনও জবাব এল না সোহমের কাছ থেকে৷ তবে কি সোহম কোনও ঘোরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছে? আবারও ডাক দিল মল্লার—’সোহম দাঁড়া৷ এত রাতে তুই কোথায় যাচ্ছিস?’

মল্লারের ডাকে এবারও সোহম সাড়া দিয়ে থামল না৷ বরং তার হাঁটার বেগ যেন আরও বেড়ে গেল! মল্লারের মনে হল সোহম যেন দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যেতে চাইছে কুয়াশার আড়ালে৷

মল্লার ভেবে নিল আর দেরি করা যাবে না৷ সোহম কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে যাবার আগে, কোনও দুর্ঘটনা ঘটার আগেই তাকে ধরতে হবে৷ কাজেই সে প্রায় ছুটে গিয়ে পিছন থেকে সোহমের কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‘দাঁড়া সোহম, তুই কোথায় যাচ্ছিস৷’

সোহম এবার দাঁড়িয়ে পড়ল৷ তারপর ফিরে দাঁড়াল মল্লারের দিকে৷ সঙ্গে সঙ্গে মল্লার চমকে উঠল৷ এ তো সোহম নয়! এমনকী কোনও জীবন্ত মানুষের মুখমণ্ডল এমন ভয়ঙ্কর হতে পারে না৷ চোখের পাতা, ঠোঁট বা চামড়ার কোনও অস্তিত্ব নেই, সেই মুখমণ্ডলের মুখগহ্বর থেকে হিংস্র দাঁতের সারি বাইরে বেরিয়ে আছে! কোটরাগত চোখ দুটো যেন হিংস্র আক্রোশে জ্বলছে মল্লালের দিকে তাকিয়ে৷ হতভম্ব মল্লারের কয়েক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি বিনিময় হল তার সঙ্গে৷ আর তারপরই সেই ভয়ঙ্কর মূর্তি প্রচণ্ড জোরে মল্লারকে ধাক্কা দিল৷ মল্লার ছিটকে পড়ল মাটিতে৷ তবে সেই ভয়ঙ্কর মূর্তি কিন্তু এরপর এগিয়ে এল না মাটিতে পড়ে থাকা মল্লারের দিকে৷ মল্লার মাটিতে পড়ে যেতেই সে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল ঘুন কুয়াশার মধ্যে৷

উঠে দাঁড়িয়ে তাকে অনুসরণ করা বা সোহমের খোঁজে যাবার মতো মানসিক অবস্থা মল্লারের আর তখন নেই৷ মল্লার যাকে দেখল সে কে? এই রকম ভয়ঙ্কর মুখমণ্ডলের অধিকারী কিছুতেই তো জীবন্ত মানুষ হতে পারে না! শীতল রক্তের স্রোত বইতে শুরু করেছে মল্লারের শরীরে৷ মাটি থেকে সে কোনওরকমে উঠে দাঁড়াল৷ তারপর আর কাল বিলম্ব না করে কুয়াশা হাতড়ে এগলো আশ্রমে ফেরার জন্য৷

মল্লার যখন ঘুরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল তখনও হাত কাঁপছে তার৷ হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনতে পাচ্ছে৷ সে চৌকিতে গিয়ে বসল৷ বেশ কিছুটা সময় লাগল তার মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে৷ জানলার বাইরে তাকিয়ে সে ভাবতে লাগল, কাকে দেখল সে? ওই মূর্তি কি কোনও প্রেতাত্মার? কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? মল্লারের যুক্তিবাদী মন কীভাবে স্বীকার করবে প্রেতাত্মার অস্তিত্ব? মল্লারের মনে হতে লাগল কুয়াশার মধ্যে তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি তো! অনেক সময় মানুষ নাকি এমন ভুল দেখে বলে শুনেছে মল্লার৷ সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না ব্যাপারটা৷ এরপর তার মনে হল, ‘সোহম এখন কোথায়, কী করছে? তার সঙ্গে কি ওই ভয়ঙ্কর মূর্তির সাক্ষাৎ হয়েছে?’

রাত আরও বেড়ে চলল৷ কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে ঘরের বাইরের দিকে তাকিয়ে মল্লার তার প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল৷ একসময় কুয়াশাময় রাত্রির নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে জলঙ্গীর পাড় থেকে আবারও ডেকে উঠল শিয়ালের দল৷ আর এরপরই মল্লার দেখতে পেল বাচ্চাগুলোকে নিয়ে আশ্রমে প্রবেশ করেছেন তমসাময়৷ আর তাদের সঙ্গে সোহমও আছে৷ সোহমকে দেখে মল্লারের মনে হল সে সুস্থ, স্বাভাবিকই আছে৷ তাকে দেখে মল্লারের মন থেকে কিছুটা উৎকণ্ঠা দূর হল৷ আশ্রমের মধ্যে ফাঁকা জমিটাতে এসে দাঁড়াল পুরো দলটা৷ তারপর তমসাময় সম্ভবত তাঁর ঘরের দিকে এগলেন, আর ছেলেগুলোকে নিয়ে সোহম এগলো তাদের বাসস্থানের দিকে৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই আবারও শূন্য হয়ে গেল বাইরেটা৷ কুয়াশা আরও ঘন হয়ে নেমে আসতে লাগল তমসাময়ের আশ্রমের বুকে৷