আত্মতত্ত্ব (জালালগীতিকা)
এক
আমার আমার, কে কয় কারে ভাবতে গেল চিরকাল,
আমি আদি, আমি অন্ত- আমার নামটি রুহুজ্জামাল ॥
আমারি এশকের তুফান, আমার লাগি হয় পেরেশান,
আবাদ করলাম সারে জাহান, আবুল বাশার বিন্দু-জালাল ॥
আমিময় অনন্ত বিশ্ব— আমি বাতিন আমি দৃশ্য,
আমি আমার গুরু শিষ্য, ইহকাল কি পরকাল ॥
আমার লাগি আমি খাড়া, আমার স্বভাব হয় অধরা,
আমি জিতা, আমিই মরা- আমার নাহি তাল-বেতাল ॥
আমি লায়লি আমি মজনু, আমার ভাবনায় কাষ্ঠতনু,
আমি ইউছুফ, মুই জোলেখা, শিরি-ফরহাদ কেঁদে বেহাল ॥
আমি রোমের মৌলানা, শাম্ছ-তরেজ দেওয়ানা,
“জুম্লে-আলম” মোর শাহানা, খাজা, সুলতান, শাহ-জালাল ॥
আমার বান্ধা কারাগারে আমিই বদ্ধ অন্ধকারে,
মনের কথা বলবনারে, কেঁদে কহে দীন জালাল ॥
দুই
আমারে কেউ চিনতে গেলে, সোজা রাস্তা হয় যে বেঁকা,
বয়সে খোদ খোদার বড়, নামটি কিন্তু নিচে লেখা ॥
একং দশং শতং হাজার, চৌরাশি লাখের বাজার,
সকল ঘরে দোকান দার, আমি মাত্র আছি একা॥
দেখতে আমার মুখের হাসি, কত বেটা জঙ্গলবাসী,
লইয়াছে পিরিতের ফাঁসি, তবু নাহি পাইল দেখা॥
মুনশি আর মৌলানা কাজি, আমি সবার নায়ের মাঝি,
আমার ছিফত লেখতে আজি, অন্ত পায়না হাদিছ-ফেকা ॥
আমি রাখছি খোদার নাম, খোদায় করে আমার কাম,
জালালে কয় সব বুঝিলাম, ভুল ভাঙিতেই বিষম ঠেকা ॥
তিন
আমি বিনে কে বা তুমি দয়াল সাঁই;
যদি আমি নাহি থাকি, তোমার জায়গা ভবে নাই ॥
যা করেছ আমায় নিয়ে, সৃষ্টিকে সৌন্দর্য দিয়ে;
প্রাণে-প্রাণে মিশে গিয়ে, মহা-প্রাণে করছ ঠাঁই ॥
বিশ্ব-প্রাণের স্বরূপ-ছায়া, আমাতে তোমারি মায়া;
ছেড়ে দিলে এসব কায়া, তুমি বলতে কিছুই নাই॥
তুমি যে অনন্ত অসীম, আমাতে হয়েছ সসীম;
কালী-কৃষ্ণ, করিম-রহিম কত নামে ডাকছি তাই ॥
যথায় বাগান তথায় কলি, যথা আগুন তথা ছালি;
কথা শুধু ভিন্ন বলি, আসলে এক বুঝতে পাই ॥
মস্ত বড় প্রেম শিখিয়ে, তুমি গেছ আমি হয়ে;
ভুলের জালে ঘেরাও দিয়ে, ঘুম পাড়ায়ে খেলছ লাই ॥
জালাল কয় সেই ঘুমে থেকে, ঘর পোড়া যায় স্বপ্নে দেখে;
গলা ভাঙ্গছি ডেকে ডেকে, শক্তি নাই যে উঠে পালাই ॥
চার
ও মন–চিনবে তারে কেমন করে,
তার সনে তোর উঠা-পড়া, দেখলে না তুই নয়ন ভরে ॥
চিনতে যদি মনে ধরে, নিজ মূর্তি লও ধ্যান করে,
যারে চিনবে সে তোর ঘরে, ত্রিবেণিতে নড়ে চড়ে ॥
দেখছনি তার রং ছুরত, অবিকল তোমারই মত,
সংসার জুড়ে দেখলে যত, তোর মতো আর দেখছ কারে ॥
তুমি চল যত দেশে, সেও তো চলে তোমার বেশে,
তুই হাসিলে সেও যে হাসে, কাঁদিলে তোর অশ্রু ঝরে ॥
তোর ক্ষুধায় সে খেতে চায়, ঘুমাইলে সে যায় তন্দ্রায়,
তোর কানে সে শুনিয়ে যায়, তোর মুখে তার বাক্য সরে ॥
ধান্ধাবাজি ধান্ধার ঘর, জালাল পাগলার কথা ধর,
“খোদ খোদা” জেনে ঠিক কর, কেবা জন্মে কেবা মরে ॥
পাঁচ
স্বভাবে সাকার মানুষ আকার,
অভাবেতে অবশিষ্ট থাকবে নিরঞ্জন ॥
শব্দ গন্ধ স্পর্শ আদি, রূপ-রস তার
চতুর্বিংশ তত্ত্ব নিয়ে গঠিত সংসার,
অহম্ জ্ঞানে আমার আমার, ভোগবিলাসে লিপ্ত অনুক্ষণ ॥
মহা-প্রাণের অঙ্গ হতে পরমাণু হয়ে
খণ্ড ভাবে বিরাজে প্রাণ সকল হৃদয়ে,
প্রাণ টানে তাই সব সময়ে, নাম নিলে তার জুড়ায় জীবন ॥
জীবত্বে ফুটিবে যখন সোহহং ব্রহ্ম ভাব
বিশ্ব-প্রেমের ভাণ্ডারেতে হবে প্রীতি লাভ,
চায় না তখন কোরান কেতাব স্বপ্ন-রাজ্যের সিংহাসন ॥
আমিত্ব আরোপ করি দেহধারী জীব
কর্ম ভেদে নাম ধরেছে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব,
কেহ ধনী কেহ গরিব, যোগ-বিয়োগ আর ভাগ-পূরণ ॥
জালালে কয় চিন্তা করে বুঝিব আর কত
অবহেলায় দিন যে আমার হয়ে গেল গত,
আসল কাজে হই না রত, কাঁচা মাটির করছি যতন।
ছয়
সকালে উঠিয়া আসিলাম ছুটিয়া
দিবা অবসানে যাব চলে ॥
মেঘেতে বিদ্যুৎ মিশে চুম্বকের মতন-
আকাশ পানে কর যদি লোষ্ট্র নিক্ষেপন,
স্থান না পেয়ে সেথায় তখন
ফিরে আসে ধরাতলে ॥
সাগরের জল বাষ্প হইয়া ওঠে অবিরত
পাহাড় নাইয়ে নদী বইয়ে তাতেই পরিণত,
এই ভাবেতেই হবে যত
সৃষ্টি-স্থিতি-লয় সকলে ॥
ভালো মন্দ দোষ গুণ আধারে ধরায়
ভুজঙ্গ অমৃত খেয়ে গরল ঢেলে যায়,
কাকের বাসায় কোকিলের ছায়
জাত-বুলি তার আপনি বলে।
যাহার যেমন মনে ধরে বল আমারে
পাছের ভয় কি জালাল উদ্দীন রাখে সংসারে?
জীবের নামে শিব-সাকারে
ঘুরে বেড়াই কর্মফলে।
সাত
জীবনে কি তোমায় কভু চেয়েছিলাম একটি বার?
দেখাইতে মহিমা নাহি যার সীমা
সৃজিলে প্রতিমা অতি চমৎকার ॥
কি-বা স্বর্গ নরক বেহেশত দোজখ
কে বিচারক, কিসেরি আবার?
কিছুই জানি না কারেও মানি না
তুমি যে আমারই আমি যে তোমার ॥
তোমারি আগমন আমারি জাগরণ
জীবন মরণ সকলি তোমার ॥
হাসি কাঁদি নাচি গাই পুলকে বেড়াই
কইতে কথা শেষ নাই, রহস্য অপার ॥
কোলে নিয়ে আছ কোলে পড়ে আছি ভুলে
ভাবিয়ে দেখি মূলে ঘুচায়ে আঁধার,
তুমি উপর কিম্বা নিচে আগে নইলে পিছে
এ-সব কথা মিছে স্বরূপ সংসার ॥
আট
অনেক দিনের পাগল আমি, ঘুরে বেড়াই তার তালাশে;
শতকে একটা সত্য কথা, শুনলে আবার মরায় হাসে ॥
হাঁটি পিছন দিকে চাইয়ে, শুকনাতে যাই তরী বাইয়ে;
পেট ভরে তিন বেলা খাইয়ে, দিনটা কাটাই উপবাসে ॥
রাজা বাদশা উজির নাজির, সবাই মোর খেদমতে হাজির;
জরু-লাড়কা মন বাবাজির, তখত আমার জলে ভাসে ॥
দালানকোঠায় মানুষ নাই, বন-জঙ্গলে গেছে সবাই;
পুড়ে যদি হইতাম ছাই, উড়ে যাইতাম ঐ আকাশে ॥
দুনিয়ার সব আমার গড়া, পৃথিবী মোর পেটে ভরা;
মরব বলে জেতা মরা, গোর খুদতেছি বাতাসে ॥
জালালে কয় ওরে বেটা, তোর মত আর ভাল কেটা;
চিনতে লাগে বিষম ল্যাঠা, কেবল মাত্র অবিশ্বাসে ॥
নয়
আসল নামটি কী হয় তোমার, জানতে আমি জিজ্ঞাস করি,
এক বিনে যার দুই মিলে না, সেই শব্দ কই বিশ্ব জুড়ি॥
ফলে কিন্তু নাম নাই তোমার, ডাকছে মানুষ নানা প্রকার,
তবে তুমি কেটা আবার, মিথ্যা নামের ছড়াছড়ি ॥
নিশ্বাস করে চলাচল, নষ্ট করে আয়ুর বল,
নিরক্ষর ধ্বনি কেবল, সে কি নামের পড়া-পড়ি?
আমাতে তোর কী অধিকার, আমি-যে কেবলই আমার,
এভাব-সেভাব স্বভাব আমার, স্বভাবেরই মরা মরি ॥
আমি গেলেই গেল সকল, জালাল কয় মোর নামটি কেবল,
থাকবে বাকি, তুই রসাতল, ছুটবে যেদিন ধরাধরি;
দশ
সদায় তোমার নামটি শুনি-ওহে ধনী
সারাটা জগৎ জুড়ে;
কোথায় বা থাক তুমি—অন্তর্যামী
জগৎ-স্বামী কই তোমারে-
আমায় তুমি কোলে লয়ে, আছ বয়ে
আমার কোলেই জনম ভরে ॥
তুমি বা কে আমি বা কে-কোথায় থেকে
পথ দেখাইয়ে অন্ধকারে-
ফেলে দেও এই কি ধারা? বুদ্ধিহারা
এক্কেবারে করছ মোরে ॥
লাগছে বিষম ঠেলাঠেলি-যার তার বুলি
বলছি সবেই সমস্বরে-
আমি-তুমি আসল নকল, কথায় কেবল
আলেক সাঁই বলছি তোরে ॥
যে করে এই ভুল সংশোধন-সে মহাজন
শমন এলেও যায়গে দূরে-
পেয়ে শুধু নরাকৃতি, পশুবৃত্তি
জালাল পাগলার মনটা ঘুরে ॥
এগারো
মন পাখি তুই তারে ডাকি, কেন ভাস আঁখিজলে,
তারে ডাকলে আগুন জ্বলে ॥
ডাক ছেড়ে দেও ডাকিও না, ভাব ছেড়ে দেও ভাবিও না,
সাধন ছাড় সাধিও না, সাধলে উজান চলে ॥
যে-পথে যাইতে মানা, সেই পথেই হও রওয়ানা,
নিষেধ-আজ্ঞায় কান দিও না, চল উল্টা কলে ॥
সিদ্ধ পুরুষ ভবে যারা, উল্টা পথেই গেছে তারা,
এই তার স্বভাবের ধারা, হাসে ভাসাইয়ে অকূলে ॥
পথে গেলে পন্থ ভুলায়, খুঁজিলে সে অমনি পলায়,
খুশি থাকে অবাধ্যতায়, মান করিলে কোলে তুলে ॥
বারো
মনে যা চায় করবি না কেন, ভয় পেয়েছ কার কথায়?
স্পৃহাশূন্য না হইলে, আসতে হবে ফের দুনিয়ায় ॥
আমিত্ব রূপান্তর করি, হবে দেহধারী
কাঙ্গাল হলে কষ্ট ভারি, ধনী সুখে কাল কাটায় ॥
কর্মফলের আশ্রয় করে, জন্ম নিবে ঘরে ঘরে
রোম শ্যাম কি চীন শহরে, ঠিক নাহিরে কোন জায়গায় ॥
আশি লক্ষ যোনির শেষে, আসিয়াছ মানুষ বেশে
আর যাবে না সেই দেশে, শৃগাল হয়ে বন জঙ্গলায় ॥
দুটানা ভাব ছেড়ে দিয়া, মানুষ কোনটা লও চিনিয়া
জালালে কয় প্রাণ সঁপিয়া দেওগে গুরুর রাঙা পায় ॥
তেরো
সাধন ভজন পারব না আর, মনটা যদি ঠিক না হবে;
উপর হতে নিচই ভাল, পড়ে আছি খুব নীরবে ॥
আমি একটা জেতা-মরা, পঞ্চভূতে দেহ গড়া
মধ্যে একটা বাতাস ভরা, তার কি আবার হিসাব লবে?
নিতে গেলে ভাব-কান্তি, দুঃখ বিনে আর নাহি শান্তি,
লোকসান ভিন্ন কড়া ক্রান্তি, স্বার্থ কে পেয়েছে কবে ॥
পার যদি মোরে টেনে নিতে, মনটাকে ঠিক করে দিতে
জালাল কয় তোর নাম জপিতে, কোনও মতে পারি তবে ॥
চৌদ্দ
মন পাগল তুই যা বুঝিলে তাই হবে তোর শেষ কালে;
সত্য-মিথ্যা আবোল-তাবোল, কত কিছুই লোকে বলে ॥
ন্যায়-অন্যায় করে বিচার, আপন মতে থাক এবার
খাটিবে না কারও অধিকার, আত্মশক্তি জেগে উঠলে ॥
যে সাক্ষী দিতেছে প্রাণে, সবই সত্য এই জীবনে
মিছে তবে কী কারণে, ভাবা-গোনা হৃৎকমলে;
বিশ্বাস করে হও সাহসী, আপনি বাজবে ভাবের বাঁশি
কাজ নাহি আর মক্কা কাশী, ভেবে জালাল উদ্দীন বলে ॥
