Accessibility Tools

ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

উপক্রমণিকা: শৈলশহরে মৃত্যুলীলা

সন্ধে হয়ে এল। বাতাসে শনশন শীত ধরেছে। সারাদিন ভেড়ার পালের মতো পাহাড়ের গায়ে দল বেঁধে বিশ্রাম করে যে মেঘেরা, তারা এখন ধীর পায়ে গেঁড়ি গুগলি হয়ে হামা দিয়ে নেমে আসছে দুই পাহাড়ের মাঝখানের গর্তে। লেফটেন্যান্ট গভর্নরের বাড়ির কম্পাউন্ডের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া অবজারভেটরি হিল বেয়ে পায়ে হেঁটে ফিরে আসছে দলে দলে মানুষ, মোট মাথায় ভুটিয়া কুলিরা। ইতিউতি টগবগিয়ে চলেছে টাট্টু ঘোড়া। আগে শুধু সাহেবদেরই ঘোড়ায় চাপতে দেখা যেত ইদানীং কিছু আলোকপ্রাপ্তা আধুনিক মেমসাহেব, বাঙালি বিবিরা ঘোড়া হাঁকিয়ে জলাপাহাড়ের দিকে বিকেলে ঘুরতে বার হন। মেমসাহেবদের অনুকরণে দেশি বিবিরাও ঘোড়ার বাঁকা জিনে দুই পা এক পাশে রেখে চড়েন। তফাত শুধু লং স্কার্ট আর শাড়িতে। এই শাড়ি পরা ঘোড়সওয়ারদের দেখলেই বাঙালি পথিকরা”বাপ রে” বলে পালাবার পথ পান না, যেন এই বুঝি তাঁদের ঘাড়ে এসে পড়ল। ইংরেজরা ঘাড় বাঁকিয়ে, ভুরু কুঁচকে বিরক্ত মুখে তাকান। কেউ কেউ বিড়বিড় করে বলেন”Damnation take them”। মেয়েদের এত বাড়াবাড়ি দেখলে তাঁদের খারাপ লাগারই কথা।

একটু আগেই এরা সবাই দাঁড়িয়ে ছিল ভিক্টোরিয়া পার্কের ব্যান্ডস্ট্যান্ডে। সন্ধ্যা হবার ঠিক আগে বেজে ওঠে ব্রিটিশ ব্যান্ড। নানারকম সুর বাজায়। এক-একদিন এক-একরকম। তবে সবার শেষে ‘গড সেভ দ্য ক্যুইন’। গোরার পায়ের বুটের আওয়াজে পাহাড় কেঁপে ওঠে। ব্যান্ডের কাঠের ঘরখানিতে বসে বিশ্রাম নেন প্রৌঢ়-প্রৌঢ়ারা। একটু নিচে নেমে এলেই দার্জিলিং প্ল্যান্টার্স ক্লাব। চা বাগানের মালিক, ম্যানেজারদের দিন শেষে আড্ডাস্থল। সেটা ছাড়িয়ে একটু উপরে উঠে চারদিকে বাগানঘেরা বাড়িটার নাম ‘ক্যামেলিয়া’। লাল মোরাম বিছানো পথ, পোর্টিকো, আর বাগানের পিছনে ধাপে ধাপে উঠে গেছে একফালি বাগান। সেখানে এখন শুরু হয়ে গেছে রাতচর পোকাদের চিরচির আওয়াজ। ফুলি একবার ঘাড় ঘুরিয়ে উত্তর দিকে তাকায়। অনেকদিন বাদে আজ আবার এই সময় খানিক ছুটি জুটেছে কপালে। কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে থাকা সাদা ধবধবে চূড়াগুলো সোনালি থেকে খুব ধীরে ধীরে গাঢ় লাল হয়ে শেষে অদ্ভুত ধূসর কালচে রূপ নিয়ে বিষণ্নতায় মুখ ঢাকে। ঠিক এই সময়টুকুর জন্য কাঞ্চনকে তার বড়ো আপনার, বড়ো নিজের বলে মনে হয়। চারিদিক একেবারে অন্ধকারে ডুবে যাবার আগেই দ্রুত পায়ে ফুলি নেমে আসে কালচে সবুজ মসে মোড়ানো, কলিয়াস ঘেরা ভেজা পাথরের সিঁড়ি বেয়ে। বাড়ির সব আলো জ্বেলে দিতে হবে। দেরি হয়ে গেছে আজ। মেমসাহেব বকাবকি করবেন। ফুলি শুনেছে কলকাতার দিকে নাকি বিজলিবাতি নামে এক আশ্চর্য জিনিস এসেছে। আলো হয়। কিন্তু সে আলো ঠান্ডা আলো। তাতে তাপ হয় না, ধোঁয়া হয় না। দার্জিলিং শহরের বড়ো বড়ো বাড়িতেও সেসব পৌঁছে উঠতে পারেনি।

সব আলো জ্বালিয়ে উঠতে মিনিট পনেরো সময় লাগল। আর তারপরেই যে কাঁটাটা এতক্ষণ ধরে ফুলির মনে খচখচ করছিল, সেটা এবার ভয়ানকভাবে বিধতে শুরু করল। দোতলায় মালকিনের দরজা এখনও বন্ধ। দুই বছর হল এই বাড়িতে কাজ করছে ফুলি। এ বাড়ির সব কিছু ঘড়ির কাঁটার মতো চলে। কিচ্ছুটি এদিক ওদিক হবার জো নেই। সেই হিসেবে উপরের মেমসাহেবের ঘরের দরজা খুলে যাবার কথা অন্তত ঘণ্টাখানেক আগেই। ঘরে ঢোকার পর থেকে প্রতি মুহূর্তে সে ভেবেছে, এই বুঝি দরজা খুলবে। মেমসাহেব নিচে নেমে আসবেন। হয়নি। দরজা তেমনই আঁট বন্ধ।

দরজায় সামনে গিয়ে দাঁড়াল ফুলি। কান দিয়ে শোনার চেষ্টা করল। ভারী সেগুন কাঠের দরজার অন্য পাশ থেকে বোবা নৈঃশব্দ্য বাদে কিচ্ছু ভেসে এল না।”হুজুর, হুজুর”, কয়েকবার ডাকও বৃথা গেল। এবার ফুলির ভয় করতে শুরু করল। অনেক পাহাড়িয়ার মতো ফুলিও দুপুরে ঘুমায় না। ফুলি বিশ্বাস করে এই পাহাড়ের আড়ালে আবডালে ঘুরে বেড়ায় উপোসি প্রেতাত্মারা। দুপুরের ঘুম মরণঘুম। এই সময় আত্মা আর দেহের বশে থাকে না। আর তখনই সেই আত্মাকে গ্রাস করে নেয় লুকিয়ে থাকা বকশি, মাসান আর জেফোরা। মেমসাহেবকে অনেকবার সাবধান করেছিল সে। তিনি হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন।

উপায় না দেখে অবশেষে দরজায় ধাক্কা মারে ফুলি। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। ফুলির চিৎকারে নিচ থেকে উঠে আসে রাঁধুনি পাসান আর গাড়োয়ান ভানু। দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে চোখ লাগায়। ভিতরের কিচ্ছুটি দেখা যাচ্ছে না। তিনজনের ঠেলাঠেলিতে দরজা সামান্য ফাঁক হয়। ঘরের ভিতরের বিরাট কৌচটা ঠেসে দরজার সঙ্গে লাগানো। অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য মেমসাহেব দরজায় একটা শিকল লাগিয়েছিলেন। সেটাও নিজের জায়গায় আটকে আছে। ভিতরে একফোঁটা আলোর দেখা নেই। ঘন নিকষের মতো কালিমা জড়িয়ে আছে গোটা ঘরে।

“হামিলে ইও ঢোকা তরনু পর্ছ”, দরজা ভাঙার প্রথম পরামর্শ দিল ভানুই। ফুলি আর পাসান সাততাড়াতাড়ি নিচের তলা থেকে নিয়ে এল চারটে কেরোসিনের ছোটো টেবিল ল্যাম্প। ততক্ষণে শিকল ভেঙে কৌচ সরিয়ে ভানুরা সবে ঘরের ভিতরে পা রেখেছে। ফুলি একটা ল্যাম্প পাসানের হাতে দিয়ে অন্যটা নিয়ে ভিতরে উঁকি মারতেই তার হাত থেকে জ্বলন্ত ল্যাম্প পড়ে গেল মাটিতে। ভানু সঙ্গে সঙ্গে পায়ের বুট দিয়ে সে আগুন না নেভালে বিপদ হতে পারত।

তীব্র আতঙ্ক আর উত্তেজনায় আছাড়িপিছাড়ি করতে থাকা ফুলিকে সামলাতে সামলাতেই ভানু দেখতে পেল ঘরের ঠিক মাঝখানে এক পুকুর রক্তের মধ্যে শান্ত শুয়ে আছেন তাদের মেমসাহেব ওফেলিয়া উইলিয়ামসন। গোটা ঘরে আর কেউ নেই।